জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং – পার্ট ৫

রচনা  : জি নরম্যান লিপার্ট, ভাষান্তরঃ প্রতিম দাস

অলঙ্করণ : মূল প্রচ্ছদ, সুদীপ দেব

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

 আস্ট্রামাড্ডুক্স এর কিতাব

‘র‍্যাভেনক্ল এর কমনরুমে বসে জ্যান বললো, ‘আরে এটাকে ঊড়ুক্কু ঝাড়ুতে ওড়ার ক্ষেত্রে একটা হতাশাব্যঞ্জক দিক হিসাবে কেন দেখছিস? একদিক থেকে এটা র‍্যালফির একটা দারুন কিছু করে দেখানোর ঘটনাও তো বটে!’

জেমস কোন সাড়া দিল না। সোফাটার এক প্রান্তে দুহাতের মধ্যে মুখ ঢেকে ও বসে ছিল।

‘অবশ্য, আমি তো কিছু না ভেবেই তোর পেছন পেছন ধাওয়া করে গেছিলাম আমার ঝাড়ুটায় চেপে। আমি কিছু করতে পারবো এরকম কিছু আশা মোটেই করিনি। এখন আর নিয়ে বেশী ভাবার কোন মানেই হয় না। সত্যিই বলছি।’

উঁচু ক্লাসের একটি ছাত্র ওখান দিয়ে যাওয়ার সময় জ্যানের ভিজে চুলগুলো নেড়ে দিয়ে বললো, ‘ওয়াকার, দারুন হয়েছে প্রথম দিনের ওড়া।’

ঘরের আর একপ্রান্ত থেকে আর একজন সায় দিল, ‘একদম। সাধারণত প্রথম বার্ষিকীদের বাছাই পর্বটা আমাদের কাছে হাসির খোরাকই হয়। কিন্তু ওয়াকার আমাদের হাসির সাথে দক্ষতার প্রমান ও দিয়েছে।’ একই সাথে হাসি এবং হাততালি গুঞ্জিত হল ঘরটায়। জ্যানকে বেশ খানিকটা লজ্জিত দেখালো।

‘যাই বলিস, কিন্তু…,’ আগুনের দিকে পিঠ দিয়ে মেঝেতে বসে থাকা র‍্যালফ বললো, ‘…তুই কি করে করলি বলতো?  ঝাড়ুতে উড়তে পারাটা বেশ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার শেখার পক্ষে।’

‘আমি,……জানি না বিশ্বাস কর,’ জ্যান উত্তর দিলো। ‘আমি দেখলাম জেমস ক্রমাগত আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। আমিও পিছু নিলাম। আমি অনেকক্ষন বাদে বুঝতে পারলাম আমি আসলে কি করছি, যখন নিচের দিকে খাড়া নেমে আসতে শুরু করলাম।  একেবারে শেষ মুহূর্তে আমি ঝাড়ুটাকে টেনে ধরলাম আর যখন আমার পাশ দিয়ে একটা হিউম্যান টর্পেডো বেরিয়ে গেল তখন আমি নিজেকে বললাম “ আরে আমিতো উড়ছি!” হয়তো এটা পেরেছি আমার ড্যাডের সাথে অত্যধিক রেসিং গেমস আর ফ্লাইট সিম্যুলেশন গেম খেলার অভিজ্ঞতা থাকার জন্য। আমি শুধু এটাই বলতে পারি।’ বলতে বলতেই জ্যান বুঝতে পারলো এই সব কথাবার্তা জেমসকে মোটেই উদ্বুদ্ধ করছে না। ‘র‍্যালফি, আমার কথা ছাড় এবার। তোর ব্যাপারটা বল দেখি?’

র‍্যালফ দু একবার চোখ পিটপিট করে দেখে নিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা ওর ভিজে পোষাকের ওপর থেকে নিজের জাদুদন্ডটা তুলে নিল। সেই বিরাট মাপের আর অদ্ভুত জাদুলাঠিটা। যার নিচের দিকটা কোনাকৃতিতে চাঁছা আর লাইম গ্রীন রঙ করা। এখন আর ওটা দেখে কেউ হাসলো না। ‘ আমিও জানি না। তুই এরকমই কিছু একটা বললি , তাই না?  আমিও কিছুই ভাবি নি। শুধু   দেখলাম জেমস নিচে আছড়ে পড়তে চলেছে। আমার মনে পড়ে গেল ফ্লিটঊইকের ক্লাসে পালক ওড়ানোর কথা । এর পর আমার মনে পড়ছে আমি আমার জাদুদন্ডটা ওর দিকে তাক করে চিৎকার করে বললাম …’

অনেকগুলো ছাত্র ছাত্রী সহ জ্যান নিচু হলো ঝট করে এবং চেঁচিয়ে উঠলো, র‍্যালফকে ওদের দিকে জাদুদন্ড তাক করতে দেখে। সেটা দেখে র‍্যালফ মুচকি হেসে বললো, ‘অত ভয় পাওয়ার কিছু নেই আমি মন্ত্রটা বলছি না।’

জেমস মুখ তুলে বললো, ‘তোদের একে অপরের পিঠ চাপড়ানো শেষ হয়েছে কি? নাহলে আমি একটা জায়গা খুঁজে নিতে চাই যেখানে লুকিয়ে থাকতে পারব এই বছরটা।’

‘আমার মনে হয় গ্র্যাপ এর দৈত্য বান্ধবীর নতুন কুটীরে তোর লুকানোর মতো গর্ত আছে,’ র‍্যালফ বললো। জ্যান র‍্যালফের দিকে চেয়ে ইশারা করলো চুপ করার।

র‍্যালফ না বুঝে বললো, ‘ কেন, আমি তো ঠিকই বললাম। ওর গর্ত খোঁজার সময় বেঁচে যাবে।’

জ্যান একটু হেসে জেমসের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ও ইয়ার্কি করছে। আমি কিন্তু কিছু বলিনি।’

‘ধন্যবাদ দল পাকিয়ে পেছনে লাগার জন্য,’ জেমস শান্ত ভাবে বললো, উঠে দাঁড়ালো এবং এগিয়ে গিয়ে আগুনের কাছে ঝোলানো নিজের পোশাকটা নিলো।

‘যেই জেমস, সত্যি বলছি। মাফ চাইছি, এরকম ধরনের কথাবার্তার জন্য। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি এই বিষয়টা এতো গুরুত্বপূর্ণ তোর কাছে।’

জেমস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো আগুনের দিকে চেয়ে। জ্যান এর ক্ষমা চাওয়াটা ওকে যথেষ্টই নাড়া দিয়েছে। ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছে। মুখটা গরম হয়ে উঠছে আর চোখ দুটো জ্বালা করছে। একবার পলক ফেলে ও হাঁটতে শুরু করলো।

‘না ওটা খুব একটা দরকারী কিছু ছিল না আমার কাছে,’ ও বললো। ‘ এটা ছিল সামান্য ব্যাপার কিন্তু সত্যি সত্যি খুব প্রয়োজনীয় কিছু।’

পেছন দিকে দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় জেমস শুনতে পেল র‍্যালফ বলছে, ‘ কিছুই বুঝলাম না কি দরকার না আর কি প্রয়োজন!’

মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে হাঁটছিল জেমস। গায়ের পোষাক এখনো ভিজে।  দারুন জোরে পড়তে পড়তে হঠাৎই র‍্যালফের ভাসিয়ে রাখার জাদুর ধাক্কায় ওর গোটা শরীর ব্যাথায় টনটন করছে, কিন্তু সেসব ওকে তেমন কষ্ট দিচ্ছে না । ও হেরে গেছে। গ্রিফিন্ডোরে সদস্য হওয়ার পর ও বেশ নিশ্চিত ছিল কুইডিচ দলেও ওর জায়গা পেতে অসুবিধা হবে না।

তাতো হলোই না উলটে ও একটা তস্য বোকারামে পর্যবসিত হল গ্রিফিন্ডোর আর র‍্যাভেনক্লদের সামনে ওড়ার ব্যাপারে। যেখানে ওর বিখ্যাত ড্যাড  অসাধারন ওড়ার কৌশল দেখিয়ে ছিল সেখানে জেমস নিজেকে প্রায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এরকম পরাজয় থেকে ফিরে আসার কোন পথ নেই।  কখনোই এটা ভুলতে পারবে না। কেউ ওকে নিয়ে মজা যদিও করছে না, অন্তত ওর সামনে, কিন্তু সামনের বছর ও আবার যখন বাছাই পর্বের জন্য যাবে তখন ? জেমস ভাবতেই পারছিল না।

কি করে বলবে ও ওর ড্যাডকে? যিনি সামনের সপ্তাহেই এখানে এসে যাবেন এবং জানতে পারবেন ওর কীর্তিকলাপ। উনি সবই বুঝতে পারবেন। উনি বলবেন কুইডিচ নিয়ে ভাবার কিছু নেই। নিজের দিকে মনোযোগ দাও আর সব কিছু উপভোগ করো। যেটা উনি মন থেকেই বলবেন। এটা বুঝতে পেরেও জেমসের মোটেই কিছু ভালো লাগছিল না।

জ্যান র‍্যাভেনক্ল টিমে চান্স পাবে। জেমস এর ভেতরে একটা ঈর্ষার চাকু গেঁথে বসছিল। এরকম ভাবতে ওর মন দুঃখও পাচ্ছিল। কিন্তু তাতে ঈর্ষাটা বিলীন হচ্ছিল না। জ্যান মাগল সন্তান। এবং একজন আমেরিকান, এখানে ঢুকে পড়েছে পাকেচক্রে! যার কাছে কুইডিচ ব্যাপারটা একটা ধাঁধা । হিসেব মতো জেমসের থাকা উচিত ছিল সহজাত ঊড়ন ক্ষমতা এবং বিপদ থেকে অন্যদের রক্ষা করার মতো হিরো সুলভ প্রতিমূর্তি। কিন্তু হল একেবারে উল্টো। এত তাড়াতাড়ি সব উলটে পালটে গেল কেন?

গ্রিফিন্ডোরের কমন রুমে পৌঁছে ও এক দিকের প্রান্ত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকলো। ও চায় না যারা এই ঘরে আছে, হাসছে , গল্প করছে, সঙ্গীত শুনছে, হোমওয়ার্ক নিয়ে আলোচনা করছে বা সোফায় বসে সময় কাটাচ্ছে তারা কেউ ওকে দেখুক। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ও চলে গেল শয়নকক্ষে । নিস্তব্ধ এবং অন্ধকার ঘরটা। ওর ড্যাডের সময়ে , বর্ষ হিসাবে শিক্ষারথিদের আলাদা আলাদা থাকতে হত। এখন আর সেই ব্যবস্থা নেই। জেমস খুশী যে ও উঁচু ক্লাসের ছেলেদের সাথে থাকতে পারছে। যাদের কাছ থেকে বেশ একটা ভরসা পাওয়া যায়। সেই ভরসা এখন ওর দরকার , অন্তত এখন কেউ যে ওর দুঃখটা বুঝবে এবং ওকে সান্তনা দেবে। ফাঁকা ঘরে একটা বড় দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো জেমস।

ছোট্ট বাথরুমটায় গিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নিয়ে জেমস বসলো গিয়ে বিছানায়। তাকালো বাইরের দিকে রাতের আকাশে। নবি ওকে দেখছে খাঁচার ভেতর থেকে, ঠোঁট ঠুকে ঠুকে বোঝানোর চেষ্টা করছে আমায় বাইরে যেতে দাও। দু চারটে ইদুর যদি ধরতে পারি খিদেটা মেটে। জেমস সেটা নজরই করলো না। বৃষ্টি থেমেছে অবশেষে। ফেটে গেছে মেঘের চাদর, বেরিয়ে এসেছে রুপালি চাঁদ। জেমস একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো। ও নিজেই জানে না ও কিসের অপেক্ষা করছে। বা ও যে কিছুর অপেক্ষা করছে সেটাও তো কেউ বুঝতে পারছে না । একসময় ওর অপেক্ষার কোন ফল লাভ হল না। কেউ ওপরে এলো না। নিচ থেকে শব্দ ভেসে এলো ওর কানে। আজ শুক্রবারের রাত। কারোরই ইচ্ছে নেই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ার । ওর নিজেকে দারুন ভাবে একাকী আর নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল। ও ঢুকে গেল চাদরের তলায় , চোখ থাকলো সেই চাঁদের দিকেই।

একসময় ঘুম নেমে এলো ওর চোখে।

সপ্তাহের শেষ দিন দুটো জেমস গ্রিফিন্ডোর কমনরুম এর ভেতরেই বন্দী রাখলো নিজেকে। ও জানে র‍্যালফ বা জ্যান কেও এই কমন রুমে আসতে পারবে না পাসওয়ার্ড ছাড়া। আর ওর একটুও ইচ্ছে নেই ওদের বা অন্য কা্রো সাথে দেখা করার। নির্দিষ্ট হোমওয়ার্কগুলো সেরে রাখলো। সাথেই কিছু জাদু দন্ডের ব্যবহার অভ্যাস ও করলো। আর এটা বুঝতে পেরে যথেষ্টই বিরক্ত হল নিজের ওপর যে ও একটা পালককেও ওড়াতে পারছে না জাদুদন্ড দিয়ে। প্রায় কুড়ি মিনিট চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিল এমন একটা শব্দ উচ্চারন করে যা শুনলে ওর মা দু ঘা কষিয়ে দিতেন । রাগের চোটে দন্ডটা দিয়ে টেবিলে মারল এক চাপড়। কিছু বেগুনী রঙের আলোর ফুলকি ছিটকে বার হল ওটা থেকে, জেমসের রাগের প্রতীক হয়েই সম্ভবত।

আরগাস ফিলচের সাথে শনিবার রাতে কাজের শাস্তি ভোগের সময় এসে গেল। জেমস চললো ফিলচের পেছন পেছন একটা বালতি আর একটা বিরাট মাপের শক্ত কাঁটাওলা ব্রাস নিয়ে। মাঝে মাঝেই ফিলচ থামছিলো আর মেঝেতে বা দেওয়ালে  বা কোন স্ট্যাচুর বিশেষ জায়গা দেখিয়ে দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দিচ্ছিল। সেসব জায়গাগুলোর কোথাও কেও ছবি এঁকে রেখেছে বা আটকে রেখেছে “লঙ ট্রডেন-আপন গাম”। জেমস দুহাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঘষে ঘষে ওগুলো উঠাচ্ছিল। ফিলচের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল যেন ওই সব নোংরাগুলো জেমসই লাগিয়েছে। বিড়বিড় করে বকেই যাচ্ছিল, এর থেকে আর ভালো রকমের শাস্তি দেওয়া দরকার ছিল, যেমন আগেকার দিনে দেওয়া হত। সময় শেষে জেমস যখন নিজের ঘরে ফিরছে তখন ওর আঙুলগুলো ঠান্ডা এবং লাল হয়ে গেছে। ব্যাথাও করছে ভালই আর তারথেকেও বিচ্ছিরী ব্যাপার ফিলচের ব্যবহৃত বদখৎ গন্ধওয়ালা বাদামী সাবানের গন্ধ ছাড়ছে ওগুলো থেকে।

রবিবারের বিকেলে, জেমস মেজাজ বদলানোর জন্য মাঠে গেল। ওখানে পেট্রা আর টেড একটা কম্বল পেতে তার ওপর অনেক পারচমেন্ট ঢেলে কিসব গ্রহ নক্ষত্র নিয়ে আলোচনা করছিল। জেমস গেল ওদের দিকেই।

‘মাদাম ডেলাক্রয় এর সাথে ট্রেলোওনি ডিভাইনেশন এর ক্লাস নিচ্ছেন আর আমাদের ঘাড়ে চাপছে হোমওয়ার্কের বোঝা,’ টেড বললো অভিযোগের সুরে। ‘ কিছু চায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে আমাদের এখন ভবিষ্যত অনুমান করতে হবে। এসব ফালতু মজা আমার ভালো লাগে না।’

পেট্রা একটা গাছে হেলান দিয়ে বসে কোলের ওপর কিছু ম্যাপ আর চার্ট ঘাঁটছিল। মিলিয়ে মিলিয়ে দেখছিল কম্বলটার ওপর খুলে রাখা একটা বিশাল মাপের নক্ষত্রমণ্ডলীয় বই এর সাথে। ‘ট্রেলোওনির তুলনায়, ডেলাক্রয় বেশী পছন্দ করেন অ্যাস্ট্রোলজিকে শক্তপোক্ত একটি বিজ্ঞান রুপে,’ পেট্রা বললো বিরক্তির সাথে মাথা নেড়ে। ‘ বুঝিনা কোন সুদূর মহাকাশে ভেসে থাকা কিছু পাথরের টুকরো কিকরে আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে?’

টেড জেমসকে আশেপাশেই থাকতে বললো এবং জিনিষপত্র যেন নাড়াচাড়া না করে। জেমস লক্ষ্য করলো ওরা ওর কুইডিচ মাঠে ঘটা বিষয় নিয়ে ওকে কোন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলো না। ও কম্বলের একধারে বসে উঁকি দিল স্টার চার্টের বইটার দিকে। কালো আর সাদা রঙে আঁকা সব ছবি। প্রত্যেকটার সাথে নাম লেখা এবং পৌরাণিক সব জন্তু জানোয়ারদের ছবি । ঘুরপাক খাচ্ছে আস্তে আস্তে বইয়ের পাতার ওপর লাল রঙে আঁকা ডিম্বাকৃতি  কক্ষপথ ধরে।

‘এর কোনটা থেকে ওই উকেটটা এসেছিল?’ জেমস হাল্কাচ্ছলে জিজ্ঞেস করলো।

পেট্রা একটা পাতা উলটে বললো, ‘হারডি-হার।’

জেমস আস্তে করে একটা পাতা উল্টালো নক্ষত্র মন্ডলীর বইটার, দেখতে থাকলো সঞ্চরণশীল গ্রহদের এবং অন্যান্য বিভিন্ন ভিনজাগতিক চিহ্ন বা সঙ্কেতদের নড়াচড়া। ‘তাহলে প্রফেঃ ট্রেলোওনি আর মাদাম ডেলাক্রয় একসাথে কাজ করছেন কি করে?’ জেমস খানিকক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করলো । জেমসের মনে পড়লো ড্যামিয়েন বলেছিল ওই দুজনের মধ্যে কিছু বিষয়ে বিরোধ আছে।

‘একেবারে তেল আর জলের মতো করে,’ টেড উত্তর দিলো। ‘ট্রেলোওনি চেষ্টা করছেন ভাল ব্যবহারের , কিন্তু উনি একদমই ওই ভুডু কুইনকে পছন্দ করেন না। আর ডেলাক্রয় এর দিক থেকে বিন্দুমাত্র ভান নেই এটা দেখানোর যে উনি ট্রেলোওনিকে পছন্দ করেন। ওরা দুটো ভিন্ন ধারার ও ভাবনার জগত থেকে এসেছেন এটা সব সময় বোঝা যায়।’

পারচমেন্টে কিছু একটা লিখতে লিখতে পেট্রা বললো, ‘ আমার ট্রেলোওনির ভাবনাগুলোই বেশি ভালো লাগে।’

‘আমরা সবাই জানি ডিয়ার তোর ভাবনা কোন খাতে বয়ে চলে,’ টেড বললো এবং ঘুরলো জেমসের দিকে । ‘পেট্রা ট্রেলোওনিকে পছন্দ করে কারন ও জানে যে মূলগত দিক থেকে ডিভাইনেশন আসলে কিছু এলোমেলোভাবে পাওয়া বিকল্প   যার সাহায্যে নিজের ভাবনাকে সাজিয়ে নেওয়া যায় । ট্রেলোওনি জানে বা ভাবে এগুলো অজ্ঞেয় ব্যাপার, সাথে সাথেই এটাও জানে যে এগুলো আসলে একগুচ্ছ  অর্থহীন আচার অনুষ্ঠান। পেট্রা  বাস্তবতত্ত্ব বিশ্বাসী মেয়ে, তাই যদি ট্রেলোওনি এগুলোকে সিরিয়াস বলে মেনেও নেয়, ও এর দ্বারা কিছু করার চেষ্টা করবে না। একগুঁয়ে বুঝিস তো।’

পেট্রা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে  সশব্দে বইটা বন্ধ করে বললো, ‘ ডিভাইনেশন কোন বিজ্ঞান নয় । ওটা মনোস্তত্ব । আর ট্রেলোওনি সেটা তার আচার ব্যবহারে সেটাই দেখাতে চান, বিশ্বাস করুন বা না করুন। আর ডেলাক্রয় ….।’ হাতের বইটাকে ছঁড়ে দিল পাশের বই এর স্তুপে।

টেড বেশ দুঃখ দুঃখ করে বললো, ‘এই সপ্তাহে একটা পরীক্ষা আছে। একেবারে আসল ডিভাইনেশন এর পরীক্ষা। আগামী বছরে ঘটবে এরকম কিছু অদ্ভুত অ্যাস্ট্রোলজিক্যাল ঘটনার ওপর। গ্রহদের এক লাইনে আসা না কি যেন।’

জেমস অবাক হয়ে বললো, ‘গ্রহগুলো এক লাইনে আসবে মানে?’

‘গ্রহদের সহাবস্থান,’ পেট্রা বললো শান্তভাবে। ‘সত্যিই এটা একটা বিরাট ব্যাপার। কয়েকশো বছরে এটা একবার ঘটে। আর সেটা পুরো বিজ্ঞান সম্মত ব্যাপার। আর আমাদের সেখানে  জানতে হবে প্রত্যেক গ্রহের প্রতিনিধিস্বরুপ পৌরাণিক প্রানীদের। যারা ছিল কোন এক সময়ের আদিম মানুষদের কাছে দেবতাস্বরুপ। আর তারফলে কি মানে দাঁড়াতে পারে ওদের একত্রতার সংবন্ধনে।’

টেড জেমসের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো, ‘আশা রাখছি আগামী কোনো একদিনে আমরা পেট্রার কাছ থেকে জানতে পারবো এবিষয়ে ওর সত্যিকারের ভাবনাটা ঠিক কি।’

পেট্রা কথাটা শুনে একটা বড় নক্ষত্র চার্ট দিয়ে মারলো টেড এর মাথায়।

ডিনার  করতে গিয়ে জেমস দেখতে পেলো জ্যান আর র‍্যালফ একসাথে র‍্যাভেনক্ল এর টেবিলে বসেছে। জ্যান একবার ওর দিকে তাকালেও কাছে ঊঠে এলো না কথা বলার জন্য। জেমস এতে স্বস্তিই পেলো। ও বুঝতে পারছিল এই ভাবনাটাই মোটেই ভালো কিছু নয়। কিন্তু সেই ঈর্ষা আর হতাশার বাঁধন এখনো ওকে বেঁধে রেখেছে। তাড়াতাড়ি করে খেয়ে নিয়ে ও গ্রেট হল ছেড়ে বেরিয়ে এলো। কোথায় যাবে কিছু ঠিক না করেই হাঁটতে থাকলো।

সন্ধেটা আজ বেশ মনোরম এবং ঠান্ডা। সূর্য ডুবে যাচ্ছে পাহাড়ের পেছনটদিকে। পুরো মাঠটাকে এক চক্কর দিলো জেমস। কানে এলো ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। লেকের জলে ছুঁড়লো বেশ কয়েকটা পাথর। গেল হ্যাগ্রিডের কেবিনে। বন্ধ দরজা । ঝুলছে একটা চিরকুট, বড় বড় আঁকাবাঁকা অক্ষরের লেখা সহ। ও্টা থেকে জানতে পারলো, হ্যাগ্রিড সোমবার সকাল পর্যন্ত অরণ্যে থাকবে। জেমস অনুমান করলো গ্র্যাপ আর ওর বান্ধবীর কাছেই গেছে হ্যাগ্রিড । এবার অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে । জেমস  খানিকটা হতাশ হয়েই ফিরে চললো দুর্গের দিকে।

কমন রুমের কাছে পৌঁছে ওর মাথায় একটা অন্য ভাবনা এলো। একটা কৌতূহলী ভাবনা।

অনেক গুলো মশালের আলোতে ট্রফি, কাপ, স্ট্যাচু ইত্যাদিগুলো ঝকমক করছিল। জেমস ধীরে ধীরে হেঁটে গেল পুরানো দিনের জয়ী কুইডিচ টিমগুলোর ছবির পাশ দিয়ে। ওদের ড্রেসগুলো আজকের দিনে অচল হয়ে গেছে কিন্তু ওদের মুখের হাসি আর উচ্ছাস এখনো অমলিন ঝকঝকে। সোনা ও ব্রোঞ্জের ট্রফি, অ্যান্টিক স্নিচ, এখনো কাঁপতে থাকা চামড়ার ফিতে দিয়ে বাঁধা ব্লাজার সব সারি সারি সাজানো।  পেরিয়ে গেল ওগুলো।

প্রায় শেষ প্রান্তে গিয়ে জেমস থামলো, তাকালো ট্রাইউইজার্ড টুর্নামেন্টের জিনিষগুলোর দিকে। সেই একই রকম অস্বস্তিকর হাসি নিয়ে ওর ড্যাড তাকিয়ে আছেন। খুবই অল্পবয়সী ও ছন্নছাড়া দেখাচ্ছে ওনাকে। জেমস ঝুঁকে ট্রাইউইজারড কাপের অন্য দিকের ছবিটা দেখলো। সেড্রিক ডিগরি। ছবির ছে্লেটি সুন্দর দেখতে,  অকপট মুখে সেই উচ্ছাস যা ছড়িয়ে আছে কিছু আগে দেখা ছবি গুলোতে দেখেছে জেমস।  যৌবনের সীমাহীন হিম্মতের প্রতিচ্ছবি। জেমস ভালো করে ছবিটা দেখলো। প্রথম দিনের দেখার সাথে সাথে যে ভাবটা দেখেছিল সেটা মেলানোর চেষ্টা করলো।

‘ওটা আপনিই ছিলেন, তাই না,’ জেমস ছবিটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো। ঠিক প্রশ্ন ছিল না এটা।

ছবির ছেলেটি হাসতেই থাকলো, একটু ইতিবাচক মাথা নাড়লো! সম্মতির!

জেমস কোন উত্তর আশা করেনি, কিন্তু ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সামনে ট্রাইউইজারড কাপটার তলায় লেখাটাতে একটা পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। খোদাই করা অক্ষর গুলো মিশে যাচ্ছে রুপোর পাতটাতে,  কিছুক্ষনের মধ্যেই একটা নতুন লেখা ফুটে উঠলো ওখানে। এক এক করে, নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে।

জেমস পটার ……হ্যারির ছেলে …

একটা শিহরণের স্রোত বয়ে গেল জেমসের শিরদাঁড়া বেয়ে। ও মাথা ঝুঁকিয়ে ফিস ফিস করে বললো,‘হ্যাঁ।’

সব লেখা মিলিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত গেল আর তারপরই আবার শুরু হল লেখার আগমন।

কতদিনের…… ঘটনা এটা …

জেমস প্রথমে বুঝতে পারেনি প্রশ্নটা। ও মাথা নেড়ে বললো, ‘মাফ করবেন আ-আমাকে। ঠিক বুঝলাম কিসের কতদিন?’

লেখা মুছে আবার লেখা এলো নতুন ভাবে, বেশ খানিকটা সময় বাদে। মনে হচ্ছে যথেষ্টই কষ্ট করতে হচ্ছে ওটা করার জন্য।

আমি মারা যাওয়ার পর থেকে …

জেমস ঢোক গিললো। ‘আমি সঠিক জানিনা। সতেরো বা আঠারো বছর হবে মনে হয়।’

লেখাটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। প্রায় এক মিনিট কোন লেখা এলো না। তারপর  …

সময় এখানে বড়ই অদ্ভুত রকম…… কখনো বড় …… আবার কখনো ছোট…

জেমস বুঝতে পারলো না কি বলবে। করিডোরটায় একটা একাকীত্ব বোধের এবং দুঃখের আস্তরন যেন চেপে বসছিল। জেমস তার ছোঁয়া ভালোই টের পাচ্ছিলো। যেন একটা ঠান্ডা মেঘ নেমে আসছে।

‘আমার –’ জেমসের কথা আটকে গেল। গলাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে ও বলতে শুরু করলো, ‘আমার ড্যাড আর মাম, জিনি ওয়েস্লী …. ওরা আপনার কথা বলেন। মাঝে মাঝে। ওরা আপনার… স্মৃতিচারন করেন। ওরা আপনাকে যথেষ্টই পছন্দও করেন।’

লেখা মুছে গেল, আবার ফিরেও এলো।

জিনি আর হ্যারি …… আমি বুঝতে পেরেছিলাম ….. ওদের মধ্যে কিছু একটা চলছে….

সেড্রিক এর ভুত সম্ভবত চলে গেল এবার, করিডোরটায় একটা হাওয়া বইয়ে দিয়ে। লেখাগুলো আবার মিলিয়ে গেল। জেমসের আরো প্রশ্ন করার ছিল। ওই মাগল অনুপ্রবেশকারী বিষয়ে, কি করে লোকটা ভেতরে ঢুকলো । কিন্তু এখন সেসব অপ্রয়োজনীয়। ও শুধু দুঃখের এই পরিবেশ টাকে একটু হাল্কা করতে চায় যা সে সেড্রিক এর উপস্থিতিতে অনুভব করেছে। কিন্তু কিভাবে সেটা বুঝতে পারছে না। আবারো লেখা ফুটে  উঠলো। খুব হাল্কা ভাবে এবং অনেক বেশী সময় নিয়ে।

ওরা সুখী তো……

 জেমস প্রশ্নটা পড়েই বুঝতে পারলো। ‘হ্যাঁ, মাননীয় সেড্রিক। ওরা ভালো আছেন। আমরা ভালো আছি।’

জেমসের কথা শেষ হতে না হতেই লেখাগুলো মিলিয়ে গেল। আবারো সেই দমবন্ধ করা ভাব যেন ঘিরে ধরলো চারদিক থেকে। একসময় কেটেও গেল অস্বস্তিকর অনুভুতিটা। জেমস করিডোরটার এদিক ওদিকে তাকালো। কেউ কোথাও নেই। ও একেবারে একা। তাকাল ট্রাইউইজার্ড কাপটার দিকে। লেখাগুলো আগের মতই হয়ে গেছে। জেমস থরথরিয়ে কেঁপে উঠে ধাতস্থ হলো। আর দাঁড়িয়ে না থেকে সোজা হাঁটা দিলো গ্রেট হলের দিকে।  অশরীরী অবশেষে তার পরিচয় জানালো জেমসকে ।

জেমস ভাবলো, আমরা সুখী। কমন রুমের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে  বুঝতেও পারলো সত্যিই ওরা সুখী। নিজেকে বোকাই মনে হল গত কয়েকদিনের নিজস্ব আচরণের প্রেক্ষিতে। লুকিয়ে লুকিয়ে থাকা, দলে সুযোগ না পাওয়াটাকে বড় করে দেখা এবং ঈর্ষা করা, সব বোকামো। এই মুহূর্তে ওগুলো সব মূল্যহীন। ও খুশী যে ও এখানে , হগওয়ারটসে আসতে পেরেছে। ওর সামনে এখন অনেক নতুন বন্ধু,   অনেক চ্যালেঞ্জ, অনেক অ্যাডভেঞ্চার অপেক্ষা করে আছে । ও প্রায় দৌড়ে পৌঁছে গেল পোরট্রেট দরজার কাছে। হগওয়ারটসে ওর জীবনের প্রথম সপ্তাহের শেষ কয়েকটা ঘণ্টা ও হেসে খেলে মজা করে কাটিয়ে দিতে চায়। কুইডিচ টিমে সুযোগ না পাওয়ার বোকা বোকা কষ্টটাকে ফুৎকারে ঊড়িয়ে দিয়ে। ও এখন বুঝতে পারছে সেদিন যেটা ঘটেছে সেটাও কিন্তু কম মজার ব্যাপার নয়।

কমনরুমে ঢুকেই ও থমকে দাঁড়ালো, চারদিক দেখলো। র‍্যালফ আর জ্যান জানলার কাছের একটা টেবিলে গ্রেমলিন সদস্যদের সাথে বসে আছে। সকলেই জেমসের দিকে তাকালো।

জ্যান উল্লাসের স্বরে বললো, ‘এই তো আমাদের ছোট্ট এলিয়েন এসে গেছে। আমরা তোর ঝাড়ু নিয়ন্ত্রনের ব্যাপারটাকে নিয়ে কিছু একটা করার কথা ভাবছি। রসওয়েল ধ্বংসাবশেষ এর মতো কিছু একটা করলে কেমন হয় বল দেখি? র‍্যালফ রেডি আবার তোকে মাটিতে পড়ার আগেই আটকে দেওয়ার জন্য।’

র‍্যালফ নিজের জাদুদন্ডটা নাড়ালো মুচকি হাসির সাথে। জেমস ঢুকে পড়লো ওদের আড্ডায়।

সোমবার সকালে একটু দেরীতেই ঘুম ভাঙল জেমসের। কোন ক্রমে রেডি হয়ে ও ছুটলো গ্রেটহলের দিকে অন্তত এক টুকরো টোস্ট জোগাড়ের আশায়। ট্রান্সফিগারেশনের ক্লাসে যেতে হবে। হলে ঢোকার মুখেই দেখা হল জ্যান আর র‍্যালফের সাথে। ওরা বেরিয়ে আসছিল।

‘আর সময় নেই, ইয়ার,’ র‍্যালফ বললো জেমসের হাত টেনে ধরে। ‘ম্যাকগনাগল ম্যামের প্রথম ক্লাস কোন ভাবেই মিস করা যাবে না। আমি শুনেছি উনি অমনোযোগী শিক্ষার্থীদের উনি খুব কঠিন সব শাস্তি দেন।’

জেমস ব্যাজার মুখে ওদের সাথে হাঁটতে শুরু করলো কোলাহল ও ভিড়ে ভরা করিডোর দিয়ে। ‘আশা করি উনি সেই সমস্ত ছাত্র ছাত্রীদের কোন শাস্তি দেন না যাদের পেট খালি থাকলে আওয়াজ করে।’

জ্যান হাঁটতে হাঁটতে জেমসের হাতে কিছু একটা দিলো। ‘সময় পেলে এটা একবার দেখিস। আমি এটা র‍্যালফিকে দেখিয়েছি। ওটা ওর মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে বলতে পারিস, তাই নারে? আমি তোর জন্য একটা জায়গা দাগিয়ে রেখেছি।’ ওটা একটা মোটা ব্যবহারে জীর্ণ বই। কাপড় দিয়ে বাঁধানো । যার রঙ কোন সময় লাল ছিল বলেই মনে হচ্ছে। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, ভয় হচ্ছে এই বুঝি সব খুলে পড়ে যাবে বাঁধাই ছিঁড়ে।

সময়ের সাথে সাথে মলিন হয়ে প্রায় মিলিয়ে যাওয়া নামটা পড়তে না পেরে জেমস জিজ্ঞেস করলো, ‘এটা আবার কি বই? আগামী টার্ম আসা পর্যন্ত যা বুঝছি জ্যাক্সন আর ফ্লিটউইকের জন্যই আমাকে অনেক বই পড়তে হবে।’

‘ আমার স্থির বিশ্বাস তোর এটা ভালো লাগবেই। এর নাম “বুক অফ প্যারালাল হিস্ট্রী, ভলিউম সেভেন”।  এটা আমি পেয়েছি র‍্যাভেনক্ল এর লাইব্রেরীতে। আর কিছু না হলেও আমি যা দাগ দিয়ে রেখেছি সেটা পড়িস।’

ব্যাকপ্যাকের মধ্যে ট্রান্সফিগারেশন এর বইটাকে  ঠেলে ঢোকাতে ঢোকাতে র‍্যালফ বললো, ‘র‍্যাভেনক্ল এর নিজস্ব লাইব্রেরী আছে নাকি?’

‘তোদের স্লিদারিনদের দেওয়ালে শুধু ড্রাগনের মাথাই ঝোলানো আছে নাকি?’ জ্যান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো। ‘সবার নিজের নিজের লাইব্রেরী আছেরে বাবা।’

ট্রান্স ফিগারেশন ক্লাস রুমে ঢোকার আগেই ওরা এক দল শিক্ষার্থীর পাস দিয়ে গেল যারা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। ওদের মধ্যে অনেকেই পড়েছিল “কোশ্চেন দ্য ভিক্টরস ” ব্যাজ। যতদিন যাচ্ছে ব্যাজ পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। কিছু বুলেটিন বোর্ড এর লেখা থেকে এটা বোঝা যাচ্ছে এই ব্যাজগুলোর পেছনে আছে একটা ক্লাব বা সংগঠন। যার নাম “প্রোগ্রেসিভ এলিমেন্ট”। জেমস অবাক হয়ে যাচ্ছিল এটা লক্ষ্য করে যে ব্যাজ পড়া সব ছাত্র ছাত্রীই কিন্তু স্লিদারিন হাউসের নয়।

‘তোমার ড্যাড, স্টেটস থেকে আসা ওনার কিছু  জাহাঁবাজ এর সাথে মিটিং করার জন্য  আজ আসছেন তাইনা, ইয়ে, পটার?’ একটা উঁচু ক্লাসের ছেলে ব্যঙ্গাত্বক হাসির সাথে প্রশ্নটা করলো।

জেমস দাঁড়িয়ে গেল। তাকালো বক্তার দিকে, বললো, ‘হ্যাঁ উনি আজ আসছেন,’ ওর গাল লাল হয়ে গিয়েছিল উত্তেজনায়। ‘তবে আমি বুঝতে পারছি না তুমি ওর কিছু জাহাঁবাজ বলতে কি বোঝাতে চাইছো। উনি এর আগে কোন দিন আমেরিকানদের সাথে দেখা করেননি। আমার মনে হয় কোন মন্তব্য করার আগে তোমার একটু খোঁজখবর নেওয়া উচিত।’

‘ওহো, মাইরি বলছি, আমরাও একটু আধটু পড়াশোনা করেছি,’ হাসি দূরে রেখে ছেলেটি বললো। ‘ তোমার চেয়েও বেশী। তোমার বাবার চেয়েও হয়তো বেশি বলেই আমার ধারনা। তোমরা  সত্যিটাকে চিরকালের জন্য ধামা চাপা দিয়ে রাখতে পারবে না।’

‘কিসের সত্যি ধামাচাপা দেওয়ার কথা বলছো? এসবের মানেটা কি?’ জেমসের রাগ চড়ছিল ক্রমশই।

‘ব্যাজ এর লেখাগুলো পড়ো পটার। তাহলেই বুঝে যাবে আমরা ঠিক কি নিয়ে কথা বলছি। আর যদি না বুঝতে পারো তাহলে তোমাকে যতটা বোকাবোকা দেখায় তার চেয়েও বেশী বোকা তুমি।’ ছেলেটি কথাগুলো বলে, নিজের ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে নিয়ে বন্ধুদের সাথে ওখান থেকে চলে গেল।

জেমস রাগের সাথেই অবাক হয়ে চোখ পিটপিট করতে করতে বললো, ‘ এসব কি বলে গেল আমাকে?’

র‍্যালফ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো, ‘ চল চল, বেশি ভাবতে হবে না ওসব নিয়ে। দেরী হলে হয়তো ক্লাসে জায়গাই পাবো না। আমিতো তোকে বলেইছি আমিও ঠিক মতো কিছুই বুঝতে পারছি কি চলছে এখানে।’

ক্লাসের আগে আপাতত এসব নিয়ে আলোচনার সময় নেই ওদের হাতে। হেড মিস্ট্রেস ম্যাকগনাগল,    যিনি জেমসের মা বাবাকেও ট্রান্স ফিগারেশন এর ক্লাস করিয়েছেন, এখনো নিয়ে চলেছেন একই রকম স্বাভাবিক নিয়মানুবর্তিতার সাথে। উনি ওদের বোঝালেন জাদুদন্ড ব্যবহারের প্রাথমিক চলন এবং আদেশ বিষয়ে। একটা বইকে একটি হেরিং স্যান্ডুইচে পরিবর্তন করেও দেখালেন। শুধু তাই নয়, কারসন নামের এক ছাত্র ডেকে এক টুকরো সেই স্যান্ডুইচ খাওয়ালেন পর্যন্ত। তারপর ওটাকে আবার বই এর রুপে ফিরিয়ে আনলেন এবং ক্লাসের উদ্দেশ্যে দেখালেন যে কারসনের কামড়ানোর দাগ থেকে গেছে বইটার ওপর। ক্লাসে একটা অবাক হওয়ার ধ্বনি গুঞ্জিত হলো। কারসন বইটার দিকে একবার তাকিয়ে নিজের পেটে হাত দিলো, একটা হতভম্বতার ছাপ ওর মুখে। ক্লাস শেষ হওয়ার কিছু সময় আগে ম্যাকগনাগল শিক্ষার্থীদের নির্দেশ দিলেন নিজের নিজের জাদুদন্ড বার করে সেটা চালনা করার অভ্যাস করতে । সাথেই একটি করে কলা নিয়ে সেটাকে পীচ ফলে পরিণত করা যায় কিনা তার চেষ্টা করে দেখতে।

‘পারসিকা আলটেরামাস, জোর দেবে প্রথম শব্দটার উচ্চারনে। প্রথম চেষ্টায় বেশি কিছু হওয়ার আশাকেও কোরো না,’ উনি জানিয়ে দিলেন উচ্চস্বরে। ‘ কেউ যদি কলাটায় সামান্যও পীচ এর গন্ধ বা আকৃতি আনতে পারো সেটাই হবে বড় ধরনের সাফল্য। মিস মাজারিস! চারদিকের কথা মাথায় রেখে ছোট্ট করে জায়গা নিয়ে দন্ডটাকে চালনা করো।’

জ্যান কলাটার দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে জাদুদন্ডটা ওটার দিকে তাক করে বললো, ‘পারসিকা আল্টেরামাস!’ কিছুই হল না। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে জেমসকে বললো, ‘ তুই কর দেখি কি হয়।’

নিজেকে একটু ঝাঁকিয়ে নিয়ে, জেমস নিজের জাদুদন্ড বাগিয়ে এবং নেড়ে মন্ত্রটা বললো। কলাটা উলটে গেল। কিন্তু ওটা কলাই থেকে গেল পীচে পরিণত হল না।

জ্যান বললো, ‘হয়তো ওটা ভেতরে ভেতরে বদলে গেল। আমাদের ওটা ছাড়িয়ে দেখা উচিত, কি বলিস?’

জেমস একটু ভাবলো, তারপর নেতিবাচক মাথা নাড়লো। ওরা আবার চেষ্টা করলো। র‍্যালফ দেখছিল।  বললো, ‘ আমার মনে হয় তোদের কব্জির আর একটু মোচড় দেওয়া দরকার। তোদের দেখে মনে হচ্ছে তোরা প্লেন ওড়ার সঙ্কেত দিচ্ছিস।’

‘বলা খুব সোজা ভাই, করে দেখাও,’ জ্যান বললো চেষ্টা করতে করতে। ‘ কথা না বলে মিঃ র‍্যালফিনেটর দেখাও দেখি  তোমার কামালটা।’

‘ কাম অন , র‍্যালফ,’ জেমস বললো। ‘তোর জাদুদন্ডের কাজ এখনো পর্যন্ত কিন্তু দারুন ফল দেখিয়েছে। অত কি ভাবছিস?’

‘কি না তো, আমি আবার কি ভাববো,’ কিছুটা রক্ষনের ধাঁচে জবাব দিলো র‍্যালফ।

‘নিকুচি করেছে!’ জ্যান বললো জাদুদন্ডটাকে টেবিলে রেখে কলাটাকে হাতে তুলে নিয়ে। তারপর কলাটাকে তাক করলো দন্ডটার দিকে । ‘হয়তো আমি এই ভাবে ভালো কিছু করতে পারবো, কিরে কি মনে হচ্ছে?’

জেমস আর র‍্যালফ ওর দিকে তাকালো। ও চোখ বড় বড় করে বললো, ‘ কিরে র‍্যালফ কি হলো? পীচ করে দেখা এটাকে। তুই জানিস যে তুই পারবি। তাহলে কিসের জন্য অপেক্ষা করছিস বলতো?’

র‍্যালফ সামান্য হাসলো, একটা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো তারপর বাগিয়ে ধরলো ওর সেই বিরাট জাদুদন্ডটা। হাল্কা করে ওটা নাড়িয়ে হেলাফেলা করে বললো মন্ত্রটা, যেন ও ইচ্ছে করেই ভুল করতে চায়।  একটা আলোর ঝলক দেখা গেল সাথেই একটা শব্দ যেন একটা পাইনফল  আগুনের মধ্যে বিস্ফোরিত হল। ক্লাসের সবাই শব্দটা শুনে র‍্যালফের দিকে তাকালো। র‍্যালফের সামনে টেবিলে একরাশ ধোঁয়া। র‍্যালফ পিছিয়ে এলো চোখ কচলাতে কচলাতে। ধোঁয়া কমতেই জেমস ঝুঁকে দেখলো। র‍্যালফের কলা যেমন কার তেমন পড়ে আছে, একটুও নড়েনি।

‘হুম, তাহলে ব্যাপারটা হল গি-’ জ্যান বলতে গিয়েও থমকে গেল।

 কলাটা থেকে একটা ছোট্ট খুচ করে আওয়াজ হল। গায়ের খোসাটা আস্তে আস্তে দুভাগ হয়ে গেল, ঠিক যেন একটা হলুদ ফুল। সমস্ত শিক্ষার্থীকে চমকে দিয়ে কলাটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সবুজ একটা  ছোট্ট গাছের ডাল। হাওয়ায় ওটা যেন শ্বাস নিলো, নড়েচড়ে এবার বাড়তে থাকলো লতানো গাছের মতো । যত বড় হতে থাকলো তত খাড়াও হতে শুরু করলো, বেশ একটা ছন্দময় কম্পনের সাথে। আরো কিছু শাখাপ্রশাখা বেরিয়ে এলো কলাটার ভেতর থেকে। ছড়িয়ে যেতে থাকল চারপাশে, নেমে গেল টেবিলের কানায়, আঁকড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। বড় হওয়ার সাথে সাথেই প্রধান কান্ড থেকে জন্ম নিল ডালপালা। মোটা হয়ে তাতে লাগলো কাঠের রঙ, হলদেটে ধূসর। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রচুর পাতায় ঢেকে গেল পুরোটা। গাছটির উচ্চতা যখন চার ফুট হয়ে গেল প্রায়, শোনা গেল একধিক ছোট মাত্রার পুটপুট শব্দ। গোটা ছয়েক পীচ ফল নিচের দিকে ডালে আবির্ভূত হল, ভারে ঝুলে গেল নিচের দিকে। প্রত্যেকটাই  বেশ রসালো, মোটাসোটা এবং লোভনীয়।

জেমস গাছের দিক থেকে চোখ সরিয়ে ক্লাসের অন্যদের দিকে তাকালো। প্রত্যেকেই স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়ে আছে। যে যেমন ভঙ্গীতে জাদু দন্ড চালনা করছিল একেবারে সেই অবস্থায়। মুখ হাঁ, চোখ সবার ওই পিচ ফলগুলোর মতোই গোল্লা পাকানো। হেড মিস্ট্রেস ম্যাকগনাগলও গাছটাকে দেখছিলেন, ওনার মুখেও তাজ্জবতার ছায়া। সহসাই ঘরে প্রান ফিরে এলো। একটা সম্মিলিত উচ্ছাসের চিৎকার এবং বাহবা ধ্বনি।

‘ও আমার বন্ধু! ট্রেনে সবার আগে আমার সাথে ওর দেখা হয়েছিল!’ জ্যান উঠে দাঁড়িয়ে র‍্যালফের কাঁধে হাত রেখে বললো। র‍্যালফ গাছের দিক থেকে চোখ সরিয়ে জ্যানের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসলো। জেমস কিন্তু দেখেছে র‍্যালফের মুখে হাসি ছিল না, গাছটা যখন ডালপালা বিস্তার করছিলো।

কিছুক্ষন বাদে, বাইরের করিডোরে। জ্যান মুখ ভর্তি পীচ নিয়ে বললো, ‘সত্যি বলছি র‍্যালফ , তুই আমাকে কিন্তু ভালই চমকে দিলি আজ। এতো পাগল করে দেওয়া জাদুর কান্ডকারখানা। বলতেই হবে তোকে আসল ব্যাপারটা কি?’

র‍্যালফ নিজস্ব আধা হাসির সাথে বললো, ‘আসলে ব্যাপারটা আর কিছুই নয় …’

জেমস র‍্যালফের দিকে তাকালো। ‘কি তাহলে? র‍্যালফ ?’

 র‍্যালফ হাঁটা থামালো, ওদের নিয়ে এগিয়ে গেল একটা জানলার দিকে। ‘বলছি, যদিও এটা একটা অনুমান মাত্র, আগেই জানিয়ে রাখছি।’

জেমস আর জ্যান মাথা নাড়ল ইতিবাচক এবং উৎসাহ সহকারে, র‍্যালফের যুক্তি শোনার জন্য।

‘ আমি অন্য স্লিদারিনদের সাথে রাতের বেলায় জাদুদন্ড চালনা অভ্যাস করছি, বুঝলি। একেবারে প্রাথমিক ব্যাপারগুলো। ওরা আমাকে কিছু জিনিষ শিখিয়ে দিয়েছে। কিছু ট্রিক্স। ডিসআরমিং স্পেল। প্র্যাঙ্কস। শত্রুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য।’

পীচের রস মাখা আঙুল চাটতে চাটতে জ্যান জিজ্ঞাসা করলো, ‘র‍্যালফ ! তোর আবার কে শ্ত্রু হল এতো তাড়াতাড়ি?’

র‍্যালফ হাত ঝেড়ে বললো, ‘আরে, ওটা একটা কথার কথা। এভাবেই আমার হাঊসের ছেলেমেয়েরা কথা বলে। বাদদেতো! ওরা বলেছে আমি একটু আলাদা আর পাঁচজনের থেকে। ওদের মতে আমি নাকি সেই সব সাধারন মাগলসন্তানদের মতো নই যারা কোন না কোন ভাবে কিছু ম্যাজিক “জিন” পেয়ে যায়। ওরা মনে করছে হয়তো আমার মা বাবা কোন এক মহান উইজার্ড পরিবারের সাথে সম্পর্ক যুক্ত যার খবর অন্যরা জানেন না।’

‘যাই বলিস এটা কিন্তু একটা বিরাট ব্যাপার না জানার পক্ষে, তাই নয় কি?’ জেমস বললো দ্বিধা জড়িত স্বরে। ‘ মানে বলতে চাইছি যে তুই তো বলেছিলি তোর বাবা মাগলদের জন্য কম্পিউটার বানান, ঠিক তো?’

‘ হ্যাঁ বানান তো,’ র‍্যালফ উত্তর দিল , সাথে সাথেই স্বর নিচু করে বললো, ‘কিন্তু আমার মাম… আমি কি তোদের আগে বলেছি ? উনি আর আমাদের মধ্যে নেই। অনেক দিন আগেই মারা গেছেন। বলিনি না?’ নিজের প্রশ্নের নিজেই উত্তর দিলো। ‘না মোটেই বলিনি। উনি যখন মারা যান তখন আমি খুবই ছোটো। আমার ওনার কথা কিছুই মনে নেই। এমন তো হতে পারে উনি উইচ ছিলেন? মানে  বলতে চাইছি যে উনি হয়তো কোন নামকরা শুদ্ধ রক্তের উইজার্ড পরিবারের মেয়ে ছিলেন যেটা আমার ড্যাড জানতেন না। হতেই পারে এটা, তোরা বুঝতেই পারছিস। জাদু জগতের লোক কোন মাগল কে ভালবাসলো কিন্তু নিজের সত্যিটা সারা জীবন গোপন রেখে দিলো । শুদ্ধ রক্তের জগতের লোকেরা এটা পছন্দও করে না । সবই  আমার অনুমান, যদিও…’ কথাটা শেষ না করে ও জেমস আর জ্যানের মুখ দেখতে  থাকলো

‘হুম, হ্যাঁ। ঠিক। হতেই পারে। অনেক অদ্ভুত ঘটনাই তো ঘটে।’

জ্যান ভ্রূ কপালে উঠিয়ে বললো, ‘ এর থেকে কিন্তু অনেক কিছুই ভাবতে পারি আমরা তাই না? বলা যায় না তুই একটা, রাজপুত্র জাতীয় কিছু হতেও পারিস। হয়তো তুই কোন বিরাট শক্তি এবং জিনিষপত্র এবং ধনসম্পদের উত্তরাধিকারী।’

র‍্যালফ জানলার ছাউনির তলা থেকে বেরিয়ে এলো। ‘এটা নিয়ে বেশী ভাবার কিছু নেই। আমি কিন্তু বলেই দিয়েছি এটা আমার অনুমান মাত্র।’

ওরা তিনজন পরের ক্লাস না শুরু হওয়া পর্যন্ত এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ালো। জ্যান আর র‍্যালফের হারবোলজির ক্লাস না থাকায় জেমস ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এগিয়ে গেল গ্রীন হাউসের দিকে। বিকেলে দেখা হবে আবার, কথা হয়ে গেল।

গ্রীন হাউসে ঢোকামাত্র, প্রফেঃ লঙবটম  হাসিমুখে  নাম ধরে জেমসকে ডাকলেন। জেমসের পছন্দের মানুষ নেভিল, যদিও ড্যাড বা আঙ্কল রনের তুলনায় মানুষটি শান্ত শিষ্ট এবং কথাও কম বলেন। জেমস জানে একবারে শেষ বছরে সেই মহাযুদ্ধের সময় নেভিল কিভাবে প্রতিবাদ করেছিল। সেই দুঃসময় যখন ভলডেমরট মন্ত্রক আর হগওয়ারটসের দখল নেয়।  একেবারে শেষ মুহূর্তে নেভিলই সেই মানুষ যিনি ভলডেমরট এর অমরতার শেষ চাবি কাঠি মহাসর্প “নাগিনী” র মাথা কেটে   উড়িয়ে দেন । এই শক্তপোক্ত কিন্তু জুবুথুবু মানুষটাকে দেখে বিশ্বাস করাই কঠিন যে উনি ওই কাজটা করেছিলেন। এই মুহূর্তে উনি ব্যস্ত ক্লাসের জন্য টেবিলে বিভিন্ন পাত্রসহ গাছগাছালি সাজাতে।

‘হারবোলজি হলো –’ নেভিল  কথা শুরু করতে গিয়ে হাতের টোকায়  একটি ছোট্টপাত্রকে ফেলে দিয়ে থেমে গেলেন। তাড়াতাড়ি পাত্রটাকে সোজা করে পাশে রাখা কাগজপত্রর ওপর থেকে ধুলো ঝাড়লেন। তারপর শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে একটু অপ্রস্তুতের হাসি হাসলেন। ‘হারবোলজি হলো সেই জ্ঞান … মানে অবশ্যই,  হার্ব বা ভেষজ গাছপালা বিষয়ে। যেমনটা তোমরা দেখতে পাচ্ছো।’ উনি হাত তুলে সামান্য ঝুঁকে দেখালেন বিভিন্ন রকম আকৃতির পাত্র রাখা নানা ধরনের লতাপাতা গুল্মদের সম্ভার, যা সাজানো আছে পুরো গ্রীন হাউস জুড়ে, জেমসের মনে হলো প্রফেঃ লংবটম সুযোগ পেলে নিশ্চিত ভাবে ট্রান্সফিগারেশন ক্লাসে সৃষ্টি হওয়া পীচ গাছটাকে পরীক্ষা করে দেখবেন।

‘হার্ব হলো মূল ভিত্তি, ইয়ে, মানে বলতে চাইছি যে, বেশীর ভাগ জাদুবিদ্যার প্রধান বুনিয়াদী বিষয়। জাদু তরল, ঔষধি, জাদুদন্ড নির্মাণ, এমন কি অনেক মন্ত্রর ভিত্তি হলো ঠিকঠাক  জাদু গাছপালার চাষ এবং তাকে প্রসেস করা। এই ক্লাসে আমরা শিখবো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শাকসবজির নানা ধরনের ব্যবহার। সাধারন মানের বিউবোটিউবার থেক শুরু করে অতি দুষ্প্রাপ্য মিম্বিউলাস মিম্বলেটোনিয়া সম্বন্ধে জানবো।’

চোখের কোন দিয়ে পুরোপুরি না তাকিয়েও জেমস বুঝতে পারলো কিছু একটা নড়ছে। জানলার কাছে বসে থাকা এক প্রথম বার্ষিকী ছাত্রী যে খুবই ব্যস্ত নেভিলের বলা কথার নোটস নিতে, তার দিকে একটা গাছ তার একটি শাখা বিস্তার করছে। আলতো করে পিঠের ওপর দিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ইয়ার রিংটাকে। মেয়েটি চোখ বড় বড় করে ভয়ে কলম টলম সব ফেলে দিলো। গাছটা ওদিকে টানতে শুরু করে দিয়েছে মেয়েটির কান।

‘উঃ! ঊফ! উঁহু! উঃ!’ চিৎকার করে উঠলো একহাতে কানটা ধরে চেয়ারে একধারে কাত হয়ে গিয়ে। নেভিল ঘরে তাকালেন শব্দ লক্ষ্য করে, দেখতে পেলেন মেয়েটির অবস্থা। দ্রুত গেলেন ওর দিকে।

‘হ্যাঁ, ডালটাকে ধরো মিস পেটোনিয়া! হ্যাঁ, ওই ভাবেই।’ কাছে পৌঁছে সাবধানে ইয়ার রিংটা থেকে ডালটাকে ছাড়ালেন। ওটা গুটিয়ে চলে গেল পেছনের দিকে। ‘ তুমি এই মাত্র আবিষ্কার করলে লারসেনাস লিগোলাসকে বা বলা যেতে পারে ওই তোমাকে খূঁজে বার করলো। আমি ক্ষমা চাইছি তোমার ওখানে  আসার আগেই আমি  তোমায় সাবধান করে দিইনি বলে। জলদস্যুদের দ্বারা কয়েকশত বছর আগে এই গাছের চাষ বিস্তার লাভ করে। কারন এরা দক্ষ চকমকে জিনিষ খুজে বার করতে । যা  এই গাছগুলো কাজে লাগায় সূর্যের আলোর পরিমাণ বাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত সালোক সংশ্লেষ করার জন্য। এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, একসময়ে এদের খুঁজে বের করে পুড়িয়ে নষ্ট করে দেওয়ার অভিযান করার পর।’ নেভিল গাছটার গোঁড়া খুজে বার করে হাতে ধরে থাকা শাখাটাকে ওটায় জড়িয়ে দিলেন পদ্ধতিগত ভাবে। আর মাথাটাকে আটকে দিলেন একটা হীরে লাগানো ক্লিপ দিয়ে।  পেটোনিয়া কানে হাত বোলাতে বোলাতে এমন ভাবে গাছটার দিকে তাকিয়ে ছিল মনে হচ্ছিল ওর মনেও ইচ্ছে জাগছে ওটাকে পুড়িয়ে মেরে ফেলার।

নেভিল ফিরে এলেন নিজের জায়গায় এবং শুরু করলেন সাজিয়ে রাখা গাছপালাগুলো বিষয়ে বলা। কিছুবাদেই জেমসের হাই উঠতে শুরু করলো। গ্রীন হাউসের ভেতরের উষ্ণতা ওকে তন্দ্রার ভাবে আচ্ছন্ন করছিল। নিজেকে জাগিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় পারচমেন্ট আর কলম বার করতে যেতেই হাত ঠেকলো জ্যানের দেওয়া বইটার গায়ে। বার করলো ওটাকে। পারচমেন্টের সাথে ওটাকেও রাখলো কোলের ওপর। এবং যখন নিশ্চিত হয়ে গেল নেভিল তার পড়ানোর জগতে একেবারে বুঁদ হয়ে গেছেন আর কোন দিকে ওনার নজর নেই তখন জ্যানের চিহ্নিত করে দেওয়া পাতাটা খুললো। পাতাটার ওপরে লেখা নামটা ,”ফিওদ্রে আস্ট্রামাড্ডুক্স” ,দেখেই ওর উৎসাহ কয়েকগুন বেড়ে গেল। বইটার ওপর ঝুঁকে  শুরু করলো পড়া।

প্রপোনেন্ট অফ রিভারস প্রিকগ্নিশন বা কাঊন্টার ক্রনোলজিক্যাল পদ্ধতিতে ইতিহাসকে নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে স্তম্ভ স্বরুপ ইতিহাসবিদ আস্ট্রামাড্ডুক্সকে আধুনিক জাদুজগত মনে রেখেছে মূলত মারলিনাস অ্যাম্ব্রোসিয়াসের শেষ জীবনের  চাঞ্চল্যকর কাহিনী লিখে রাখার জন্য। মারলিনাস যিনি একজন কিংবদন্তী  হয়ে যাওয়া জাদুকর এবং অর্ডার অফ মারলিন এর স্রষ্টা। অ্যাস্ট্রামাড্ডুক্স এর “ইনভারস হিস্টরী অফ দ্য ম্যাজিক্যাল ওয়ার্ল্ড” এর ১২ তম অধ্যায়ে, লেখা আছে  কর্মজীবনের শেষ দিকে মারলিন ইউরোপের রাজারাজড়াদের জাদু সহায়ক রুপে কাজ করতেন। ক্রমবর্ধমান নন ম্যাজিক্যাল জগতের দ্বারা ম্যাজিক্যাল জগত ক্রমশঃ “সংক্রামিত”  হয়ে পড়ছে দেখে মারলিন “ইহজগতের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার” সিদ্ধান্ত নেন। পরে অবশ্য এটাও জানান যে কয়েক শতক অথবা সহস্রাব্দ পরে উনি আবার ফিরে আসবেন। যখন নন ম্যাজিক্যাল আর ম্যাজিক্যাল জগতের ভারসাম্য  প্রায় সমান হবে । অ্যাস্ট্রামাড্ডুক্স এর কথানুজায়ী “মারলিনের পক্ষে সুবিধজনক একটি পরিস্থিতি শাসন করার”। এই ফিরে আসার ভবিষ্যৎবানী অনেক প্লট আর ষড়যন্ত্রের জন্ম দিয়েছে যুগ যুগ ধরে। হয়েছে বিপ্লব। করেছে তারাই যারা বিশ্বাস করেছে মারলিনাসের ফিরে এসে তাদের সমর্থন  করবেন । নন ম্যাজিক্যাল জগতটাকে রাজনৈতিক বা সরাসরি যুদ্ধ করে দখল নেওয়ার পরিকল্পনা ক্ষেত্রে।”

জেমস পড়া থামালো। ওর মন যা পড়লো সেটা কে ঠিকমতো বোঝার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠলো। ও মারলিন সম্বন্ধে ছোট থেকে শুনে এসেছে, ঠিক যেমন ভাবে মাগলদের বাচ্চারা সেন্ট নিকোলাসের কথা শুনতে শুনতে বড় হয়। কোন ঐতিহাসিক চরিত্র হিসাবে নয় বরং কিছুটা পৌরাণিক কার্টুন চরিত্র রুপে। জেমসের মনে কোন দিনই সন্দেহ ছিল না যে মারলিন একজন সত্যিকারের মানুষ ছিলেন। তবে কোন দিনই এরকম কোন ভাবনাও ওর মনে আসেনি যা তিনি আসলে কি ধরনের মানুষ বা চরিত্র ছিলেন। ওর বড় হওয়ার পথে মারলিনের উদাহরণ টানা হত মারলিনের মত দাড়ি বা মারলিনের মতো প্যান্ট এর উপমা টেনে।  যা দিয়ে মোটেই ওই বিরাট মাপের জাদুকরকে মাপা সম্ভব নয়। অ্যাস্ট্রামাড্ডুক্স এর লেখা অনুসারে মারলিন ছিলেন মাগলরাজা বা নেতাদের সহযোগী জাদুকর । তাহলে কি এটাই ধরে নিতে পারা যায় যে সে সময়ে উইচ এবং উইজার্ডরা মাগল জগতে খোলাখুলি ভাবেই বসবাস করতো, কোন গোপনীয়তার আইনকানুন ছিল না? দরকার পড়ত না লুকিয়ে জীবনযাপনের? প্রয়োজন হত না কোন ডিস ইলিউশন মন্ত্রর? মারলিন কি বোঝাতে চেয়েছিলেন মাগলদের দ্বারা ম্যাজিক্যাল জগত “সংক্রামিত” হয়ে পড়েছে কথাটি দিয়ে? আরো কৌতূহল জনক ব্যাপার , ওই ভবিষ্যতবানীর মানেটাই বা কি, যেখানে উনি ফিরে এসে  “সুবিধাজনক একটি পরিস্থিতিতে শাসন করার” কথা বলেছেন? এটা মিথ্যে নয় যে যুগ যুগ ধরে ডার্ক উইজার্ডরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যেনতেন প্রকারনে মারলিনের পুনরায় এ জগতে ফিরে আসার ব্যাপারটাকে সত্যি করার জন্য। ডার্ক উইজার্ডরা সব সময় চায় মাগলদের জগতে রাজত্ব করতে। আর নিশ্চিত কিছু একটা ব্যাপার আছে যার জন্য ওরা বিশ্বাস করেন যে সর্বকালের সেরা এবং শক্তিশালী ওই উইজার্ড ফিরে এসে এ ব্যাপারে ওদের সাহায্য করবেন।

হঠাই একটা ভাবনা মাথায় আসতেই ও প্রায় চমকে গেল। অ্যাস্ট্রামাড্ডুক্স এর নাম ও প্রথম জানতে পারে কোন এক স্লিদারিন দ্বারা একটি গেম প্রোফাইল তৈরী হওয়ার মাধ্যমে। স্লিদারিন হল সেই সব ডার্ক উইজার্ডদের আখড়া যেখানে মাগল জগতকে শাসন করার চিন্তার চাষ হয়। এমনটা কি হতে পারে না যে এই নামটার ব্যবহার আসলে নেহাতই খামখেয়ালে করা হয়নি? কে বলতে পারে এটাই আসলে এক নতুন অন্ধকারময় পরিকল্পনার সঙ্কেত নয়? হতেও তো পারে যে স্লিদারিন এই নামের প্রোফাইলটা বানিয়েছে সেও এই পরিকল্পনার একজন সহযোগী? যারা মারলিনাস অ্যাম্ব্রোসিয়াস কে ফিরিয়ে আনতে চায় মাগল জগতের বিরুদ্ধে  যুদ্ধের নেতা রুপে।

জেমস দাঁতে দাঁত চিপে বইটা বন্ধ করে ভাবতে থাকলো। সম্ভবত ওর ভাবনার অনেকটাই একেবারে সত্যি।  আর এর থেকেই প্রমান হয় যে নামটা স্লিদারিন হাউসের প্রধান ব্যবহার করেন ইয়ারকির ছলে সেটা কেন অন্যকেও ব্যবহার করে গুরুত্ব দিয়ে। কারন স্লিদারিনরা জানে উনি মোটেই ইয়ারকির পাত্র নন। আর সেটা প্রমান হয়ে যাবে যখন ওরা জয়লাভ করবে। জেমসের হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল। এ কথা গুলো ও এখন কাকে বলবে? জ্যান আর র‍্যালফকে তো অবশ্যই। হয়তো ওরাও এসব ভেবেছে। ড্যাডকে বলবে কি? জেমস সিদ্ধান্ত নিলো না বলবে না। এখন তো মোটেই নয়। জেমসের এটা বোঝার মতো বয়েস হয়েছে যে বড়রা ছোটদের এই ধরনের কথাগুলো মোটেই বিশ্বাস করেন না তা সে যতই প্রমান দেওয়া হোক না কেন।

জেমস নিজেও জানে এই ধরনের পরিকল্পনা থামাতে হলে কি করতে হবে। কিন্তু ও জানে এই সময়ে ওর কি করা দরকার। ওকে আগে খুঁজে বার করতে হবে কোন স্লীদারিন সদস্য র‍্যালফের গেমডেকটা হাতিয়েছিল। ওকে খুঁজে বার করতে হবে, কে সেইজন যে আ্যস্ট্রামাড্ডুক্স এর নামে প্রোফাইল বানিয়েছিল।

এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ক্লাস শেষ হওয়া মাত্র জেমস গ্রীন হাউস থেকে বেরিয়ে ছুটতে শুরু করলো। ভুলেই গেল আজই ওর ড্যাড, হ্যারি পটার, আসছেন, আমেরিকানদের সাথে  মিটিং করার জন্য।

মাঠের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে যেতে যেতে ওর কানে এলো  সম্মিলিত চিৎকারের আওয়াজ। ছোটার গতি কমিয়ে ও চেষ্টা করলো শোনার। চিৎকার এবং শ্লোগান মিলে মিশে আছে কর্কশ এবং উত্তেজিত অনেক কণ্ঠের। মুল চত্বরের দিকে ঘুরতেই আওয়াজটা জোরে শোনা গেল। জেমস দেখতে পেল শিক্ষার্থীদের একটা দঙ্গল জমা হচ্ছে বিভিন্ন দিক থেকে । যাদের মধ্যে বেশীর ভাগই জড় হচ্ছে ব্যাপারটা কি দেখার জন্য। আর ঠিক মধ্যে একটি দল যারা চিৎ কার করছে, শ্লোগান দিচ্ছে, কেউ কেউ হাতে আঁকা বড় বড় ব্যানার ধরে আছে। জেমস এগিয়ে গিয়ে একটা ব্যানারের লেখা পড়লো। দপাং করে ওর হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠলো। ওটায় লেখা ‘মন্ত্রকের অরোর ফ্যাসিজম বন্ধ করো’। আকাশের দিকে তুলে ধরা একটা ব্যানারে লেখা , ‘ সত্যিটা এবার বলে ফেলুন, হ্যারি পটার!’

জেমস  গ্রুপটার চারদিকে একটা চক্কর মারলো। শান্ত  ও কৌতূহলী ভঙ্গিতে মেইন হলের কাছে সিঁড়ির ধাপে টাবিথা করসিকার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন একজন মহিলা। বেগনি রঙের গোল আইগ্লাস চোখে এবং হাবভাবে অতিরিক্ত সপ্রতিভতা। জেমসের অস্বস্তি আরো বেড়ে গেল ওকে চিনতে পেরে। নাম রিটা স্কিটার। ডেইলি প্রফেটের প্রধান ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার। যাকে ওর ড্যাড মোটেই পছন্দ করেন না।

টাবিথা ওকে দেখতে পেয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসলো। মনে হল বলতে চাইছে …সরি, এই সব ব্যাপারের জন্য, কি করবে বলো সময়টা খারাপ যাচ্ছে আর আমরা সেটাই করছি যা আমরা করতে চাই…

জেমস সবে মেন হলের সিঁড়িতে উঠতে যাবে হেডমিস্ট্রেসের আগমন ঘটলো। কঠোর মুখাবয়বসহ এগিয়ে এলেন যেখানটায় সূর্যালোক এখনো আছে। গলায় ঠেকালেন জাদুদন্ড এবং একেবারে ওপরের ধাপ থেকে গোটা চত্বর কাঁপিয়ে সমস্ত চিৎকার ছাপিয়ে বললেন।

‘আমি জানতেও চাই না এটা কি হচ্ছে, কারন আমার কাছে এটা দারুন ভাবে বিরক্তিকর একটা বিষয়ের মত।’ চিরকালই মিনারভা ম্যাকগনাগলকে কাঠখোট্টা ধরনের বলেই জানে জেমস, তবে এতটা রাগতে আগে কোন দিন ওনাকে দেখেনি। ওনার মুখ এই মুহূর্তে মৃত মানুষের মত ফ্যাকাশে সাদা, রাগের দ্যুতি লাল হয়ে ফুটে উঠেছে গালে। পুনরায় ধ্বনিত হলো চত্বরে ওনার টনটনে কিন্তু মাত্রাযুক্ত কণ্ঠস্বর । ‘যে ধরনের অভব্য আচরণ ইতিমধ্যেই তোমরা করে ফেলেছ এবং করে চলেছ সেসবের কথা বাদ দিয়েই বলছি, তোমরা যে পথ বেছে নিয়েছ বা বিশ্বাস করো সেটা স্কুলের নিয়ম নীতি অনুসারে অমার্জনীয়। এভাবে তোমরা সম্মানীয় অতিথিদের অপমান করতে পারো না।’

উঁচুতে থাকা ব্যানারগুলো কিছুটা নিচে নামলেও পুরো নামানো হল না। জেমস দেখলো রিটা স্কীটার হেডমিস্ট্রেসের কাছে উঠে গেলেন, ওনার চোখে মুখে উত্তেজনালাভের লালসা। ওর সাথে থাকা কুইক-কোটস কলম স্বয়ংক্রিয় ভাবে লিখে চলেছে পারচমেন্টের প্যাডে। ম্যাকগনাগল একটা নিঃশ্বাস ফেলে, এবার কি বলবেন ভেবে  নিলেন।  ‘তোমাদের নিশ্চয় জানা আছে অপছন্দের কথা কি ভাবে বা কি পদ্ধতিতে পেশ করতে হয়। এই …সমাবেশ… বিক্ষোভ… এর কোন দরকার ছিল না সাথেসাথেই পদ্ধতিটাই ,নিয়ম বিরুদ্ধ। সেই জন্য আমি চাইছি, তোমরা এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাও এই ভাবনা নিয়ে যে তোমরা নিশ্চিত ভাবে …,’ উনি তাকালেন রিটা স্কীটারের দিকে, ‘ তোমাদের বক্তব্য পেশ করে ফেলেছ।’

‘ম্যাডাম হেডমিস্ট্রেস?’, না তাকিয়েও জেমস বুঝতে পারলো এটা টাবিথা করসিকার গলা। একটা থমথমে নীরবতা গোটা চত্বরে। রিটা স্কীটারের স্বয়ংক্রিয় কলম নড়ার শব্দই শুধু কানে আসছে।

ম্যাকগনাগল কথা থামিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলেন টাবিথার দিকে। ‘ইয়েস, মিস করসিকা?’

‘আমি আপনার সাথে একমত হতে পারছি না ম্যাম,’ করসিকা নম্রভাবে বললো। ওর মিষ্টি কণ্ঠস্বর পৌঁছে গেল চত্বরের প্রতিটি প্রান্তে। ‘আমার দিক থেকে বলতে পারি, আমি আশা করছি আমরা এই বিষয়টাকে আরো সহজবোধ্য ও প্রাসঙ্গিক ভাবে আলচনার ক্ষেত্রে নিয়ে যেতে পারি, যেটা আপনি একটু আগেই বলেছেন। খুব তাড়াতাড়ি এই বিষয়টা নিয়ে একটা অল স্কুল টপিক্যাল ডিবেটের আয়োজন হতেই পারে, কি বলেন আপনি? আর তা হলেই এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ পাওয়া যাবে মনে হয় এ ব্যাপারে আপনার সম্মতি পাওয়া যাবে।’

ম্যাকগনাগল চোয়াল শক্ত করে একদৃষ্টে করসিকার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এতটাই সময় ধরে যে টাবিথা ওনার দিক থেকে চোখ সরিয়ে জনতার দিকে তাকালো। ভিড় যেন কিছুটা কম । কুইক কোটস স্বয়ংক্রিয় কলমটাও লেখা থামিয়ে ভেসে আছে পারচমেন্টের ওপর।

‘আমি স্বাগত জানাচ্ছি তোমার ভাবনা কে মিস করসিকা। কিন্তু এটা সেই সময় নয়, যখন ডিবেট হবে কি  না তার সময় নির্ধারণের,  এটা ভালো করেই বুঝতে পারছো তুমি।’ ম্যাকগনাগল উত্তর দিলেন শীতল স্বরে। ‘আর এবারে,’ উনি তাকালেন চত্বরে জমায়েত হওয়া শিক্ষার্থীদের দিকে ভৎসনার নজরে, ‘আমার হিসেব অনুসারে এ বিষয়ের এখানেই সমাপ্তি। আর যদি আলোচনার ইচ্ছে থাকে কারো তাহলে সে তার নিজের ঘরে গিয়ে করতে পারে। আমি এই মুহূর্তে সবাইকে এখান থেকে চলে যাওয়ার উপদেশ দিচ্ছি। অবশ্য যদি তোমরা চাও আমি ফিলচকে পাঠাতে পারি, তোমাদের হাজিরার একটা তালিকা প্রস্তুত করার জন্য।’

দঙ্গল এবার ভাঙ্গতে শুরু করলো। ম্যাকগনাগল জেমসকে দেখতে পেলেন, সাথে সাথে সাথেই ওনার মুখের ভাবে পরিবর্তন এলো । ‘পটার, আমার সাথে এসো,’ কিছুটা অস্বস্তির সাথেই উনি ডাকলেন। জেমস বাকি সিঁড়ি কটা উঠে ওনাকে অনুসরণ করলো। বিরাট হলটার ছায়া আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে । ম্যাকগনাগল রাগে বিড়বিড় করছিলেন। ওনার পোশাকের দ্রুত নড়াচড়া থেকে একটা সুস সুস শব্দ শোনা যাচ্ছিল। জেমস ওকে লক্ষ্য করে এগিয়ে চললো।

‘যত সব হতচ্ছাড়া ঘোঁট পাকানোর দল,’ উনি তিক্তকণ্ঠে কথাটা বললেন, জেমসের ধারনা অনুযায়ী স্টাফরুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে। ‘ জেমস, আমি খুবই দুঃখিত যে এই সব তোমাকে দেখতে হল। তার থেকেও বেশি লজ্জিত হচ্ছি এই ধরনের একটা  বাজে নোংরা গুজব স্কুলের চার দেওয়ালের মধ্যে গুঞ্জরিত হচ্ছে। ’

একটুও না ঝুঁকে বা থেমে উনি একপাশে ঘুরে গিয়ে একটা দরজা খুললেন। জেমস দেখলো ঘরটা বিরাট বড় , অনেক চেয়ার , সোফা, ছোট টেবিল, বুকশেলফ অগোছালো ভাবে ছড়িয়ে  ছিটিয়ে পড়ে আছে এক বিরাট শ্বেত পাথরের ফায়ারপ্লেসের আশে পাশে। আর সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন মুচকি হাসি সহ ওর  ড্যাড। এক গাল হেসে ম্যাকগনাগল এর পাশ দিয়ে ও দৌড়ে গেল ।

‘জেমস,’ হ্যারি পটার উচ্ছাসের সাথে বললেন ওকে জড়িয়ে ধরে এবং চুল গুলো নেড়ে দিয়ে। ‘ মাই বয়। দারুন ভালো লাগছে আজ তোকে এখানে দেখে। স্কুল কেমন চলছে?’

জেমস কাঁধ ঝঁকিয়ে হাসলেও একটা অস্বস্তি ওকে চেপে ধরছিল।  ড্যাডের   আশেপাশে আরো কয়েক জন দাঁড়িয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। যাদের ও চেনে না।

‘জেমস তুই  জানিস বোধহয়,’ জেমসের কাঁধে হাত রেখে বললেন হ্যারি। ‘ এরা মন্ত্রকের কয়েকজন প্রতিনিধি যারা আমার সাথে এসেছেন। তোর নিশ্চয় মনে আছে টাইটাস হার্ডক্যাসলকে? আর ইনি মিঃ রিক্রিয়ান্ট এবং ইনি মিস সাকারিনা। এরা দুজনেই কাজ করেন ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যাম্বাসাডোরিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিভাগে।’

জেমস নিয়মমাফিক হ্যান্ডসেক করলো। টাইটাস হার্ডক্যাসলকে ওর মনে পড়ে গেছে ওর দিকে তাকানো মাত্রই, যদিও অনেকদিন পর ওকে দেখলো জেমস। ড্যাডের প্রধান কর্মসহযোগী বা হেড অরোরদের মধ্যে উনি একজন। মোটাসোটা এবং শক্তসমর্থ, চৌকোণা মাথার আকার । দেখেই বোঝা যায় বেশ কড়া ধাঁচের মানুষ। মিঃ রিক্রিয়ান্ট লম্বা এবং রোগা ধরনের।পরনে কালো ডার্বি এবং ই পিন স্ট্রাইপড আলখাল্লা।। হ্যান্ডশেক করার ধরনটা আলতোভাবে এবং দ্রুত, মনে হল যেন একটা মরা স্টারফিসকে  ছোঁয়া হল। মিস সাকারিনা, হ্যান্ডশেক করলেন না। বড় মাপের একটা হাসি সহ উনি নিচু হলেন এবং জেমসকে খুঁটিয়ে  খুঁটিয়ে দেখলেন।

আমি তোমার মধ্যে তোমার বাবার ছায়া দেখতে পাচ্ছি, ইয়ং ম্যান,’ মাথা নেড়ে বেশ খানিকটা রহস্যময়তার ভঙ্গীতে। ‘সেই রকম প্রতিশ্রুতিবান এবং ক্ষমতা সম্পন্ন। আমি আশা করছি আজ সন্ধেতে তোমাকে আমাদের সাথে পাবো ।’

উত্তর না দিয়ে জেমস ওর বাবার দিকে তাকালো। হ্যারি হেসে ওর কাঁধে দুহাত রেখে বললেন, ‘আজ রাতে আমাদের ডিনার আছে আল্মা আলেরনদের সাথে। তুই কি যেতে চাস সেখানে? সম্ভবত সেখানে  প্রকৃত আমেরিকান খাবার পরিবেশিত হবে। যার অর্থ হ্যামবার্গার থেকে চিজবার্গার, অন্তত এটা আমার অনুমান বলতে পারিস।’

‘অবশ্যই যাবো!’ জেমস বললো একরাশ হাসির সাথে। হ্যারি হেসে চোখ টিপলেন।

‘কিন্তু তার আগে,’ সাথে থাকা অন্যদের উদ্দেশ্যে হ্যারি বললেন, ‘আমরা যাবো আল্মা আলেরনের বন্ধুদের সাথে দেখা করতে । ওদের কিছু বিশেষ ম্যাজিক দেখার জন্য। দশ মিনিটের মধ্যেই ওদের সাথে দেখা করার কথা। আরো কয়েকজনের আসার কথা আছে। সেখানেই যাওয়া যাক তাহলে?’

‘আমি তোমাদের সাথে যেতে পারছি না,’ ম্যাকগনাগল বললেন। ‘আমায় মাফ করে দিও। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে আমাকে বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রীর দিকে কড়া নজর রাখতে হবে। অন্তত যেকদিন তুমি এখানে থাকছো মিঃ পটার ।’

‘ বুঝতে পারছি মিনারভা,’ হ্যারি বললেন। জেমসের কাছে এটা খুব আশ্চর্যের মনে হয় যখন ওর ড্যাড হেডমিস্ট্রেসকে সরাসরি নাম ধরে ডাকেন। যেটা আবার ম্যাম বেশ পছন্দও করেন বলেই মনে হয়। ‘ সে আপনি যা খুশী করুন, তবে এসব ছোটখাটো গণ্ডগোলের দিকে নজর না দিলেও চলে। খাটনিই সার হয়।’

‘ আমি তোমার সাথে পুরোপুরি সহমত হতে পারছি না হ্যারি,কিন্তু আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে আমি নিয়ম শৃঙ্খলা ঠিকঠাক নিয়ন্ত্রন করতে পারছি না। যাই হোক রাতে দেখা হচ্ছে। ’ বলেই হেডমিস্ট্রেস ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, রাগ এখনো কমেনি আচরণেই বোঝা গেল।

মিস সাকারিনা বললেন, ‘এবার যাওয়া যাক , কি বলেন আপনারা?’ দলটি এগিয়ে চললো ঘরটির বিপরীত প্রান্তের একটি দরজার দিকে। হাঁটতে হাঁটতে হ্যারি ছেলের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন । ‘ আমি খুব খুশী , তুই আজ রাতে ডিনারে আসতে রাজি হয়েছিস । সাকারিনা আর রিক্রিয়ান্ট ভ্রমন সঙ্গী রুপে মোটেই ভালো নয়। কিছু করার ছিল না পারসির চাপে পড়ে ওদের নিয়ে আস্তে হলো। আমার এখন ভয় হচ্ছে পুরো ব্যাপারটাই না একটা রাজনৈতিক চেহারা নিয়ে নেয়।’

জেমস বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়লো কিছু না বুঝেই। এটা ও করেই থাকে ড্যাডকে সাহস যোগানোর জন্য। ‘তা তোমার সফর কি রকম ছিল?’

হ্যারি উত্তর দিলো, ‘ প্রায় লুকিয়ে চুরিয়ে আসতে হয়েছে। খুব প্রয়োজন না হলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিইনি। মিনারভা আমাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন পি ইরা বিক্ষোভ দেখাতে পারে।’

জেমসের একটু সময় লাগলো এটা বুঝতে যে ওর ড্যাড আসলে প্রোগ্রেসিভ এলিমেন্ট এর কথা বলছেন। ওএকটু অবাক হয়েই বললো, ‘উনি ওদের ব্যাপারে আগে থেকেই জানতেন?’

হ্যারি মুখে একটা আঙুল ঠেকালেন, সামনে থাকা সাকারিনা আর রিক্রিয়ান্ট এর দিকে ঈশারা করে। ওরা খুব আস্তে আস্তে কিছু নিয়ে কথা বলছেন। ‘এ নিয়ে পরে কথা হবে জেমস।’

এদিক ওদিক দিয়ে খানিকক্ষন হাঁটার পর মিঃ রিক্রিয়ান্ট একটা বড় দরজা খুললেন এবং বেরিয়ে গেলেন সূর্যালোকে, বাকিরাও ওকে অনুসরণ করলো। চওড়া পাথরের সিড়ি নেমে গেছে একটা ঘাসে ঢাকা এলাকায়। যার একদিকে নিষিদ্ধ অরন্যের সীমানা আর অন্যদিকে নিচু পাথরের টানা দেওয়াল। নেভিল লঙবটম আর প্রফেঃ স্লাগহর্ন ওখানে দেওয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। ওদের আস্তে দেখে ওরা তাকালেন।

‘হাই, হ্যারি!’ একটু হেসে নেভিল এগিয়ে এলো। ‘ ধন্যবাদ আমাকে এবং হোরাসকে এখানে আসার  আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। যেদিন থেকে আমেরিকানরা এসেছে সেদিন থেকে আমি ছটপট করছিলাম এরকম একটা সুযোগের জন্য।’

হ্যারির দুটো হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে প্রফেসর স্লাগহর্ন আন্তরিকতার সাথে বললেন, ‘হ্যারি পটার, একেবারে সেই ছেলেটা। খুব ভালো কাজ করেছো আমাকে তোমাদের সাথে সামিল করে। জানোতো, আমি সব সময়েই আগ্রহী আন্তর্জাতিক স্তরে ম্যাজিক্যাল কমিউনিটির নতুন নতুন উন্নতির খবর জানার জন্য।’

হ্যারি দলটাকে নিয়ে এগিয়ে গেল পাথরের দেয়ালে স্থিত একটা দরজার দিকে। যেটা খুলতেই দেখা গেল একটা সুন্দর নুড়ি বিছানো পথ সোজা চলে গেছে লেকের দিকে। ‘ আপনি বা নেভিল কারোরই আমাকে ধন্যবাদ জানানোর দরকার নেই। আপনাদের নিয়ে আসার একটাই কারন, আমি চাই   ওরা  আমাদের যা দেখাবে সে বিষয়ে আপনারা ওদের চোখাচোখা প্রশ্ন করে সব বুঝে নেবেন।’

স্লাগহর্ন হাসলেন হো হো করে, নেভিল মুখে হাসির ভাব আনল কেবল । জেমস অনুমান করলো ওর ড্যাড পুরো ব্যাপারটা এখনো খুলে বলেন নি কাওকে, নেভিল সম্ভবত জানেন কিছুটা।

জলের ধারে একটা বড় ক্যানভাস কাপড়ে তৈরী তাঁবুর দিকে ওরা এগিয়ে গেল। তাঁবুর একটি পোলে আমেরিকান ফ্ল্যাগ টাঙানো। তারই নিচে আরো একটি ফ্ল্যাগ যেটায় আল্মা আলেরনের চিহ্ন অঙ্কিত আছে। কাছেই দুজন আমেরিকান শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে। ওদের মধ্যে একজন হ্যারিদের দলটাকে দেখতে পেয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান দেখালো এবং তাঁবুর কাছে গিয়ে ডাক দিলো, ‘প্রফেসর ফ্রাঙ্কলিন !’

একটু বাদেই ফ্রাঙ্কলিন বেরিয়ে এলেন একটা বড় কাপড়ের টুকরোতে হাত মুছতে মুছতে। ‘ ও আপনারা এসে গেছেন! স্বাগতম অতিথি বৃন্দ। অনেক অনেক ধন্যবাদ এখানে আসার জন্য।’ উনি উচ্ছসিত সম্মান সহকারে বললেন।

হ্যারি হ্যান্ডসেক করলেন ওনার সাথে। বোঝাই গেল ওরা আগে থেকেই এই দেখাসাক্ষাতের কথাটা জানতেন। হ্যারি সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন , সবশেষে জেমসেরও।

‘আরে হ্যাঁ , তাইতো, ওকে তো আমি চিনি,’ ফ্রাঙ্কলিন জেমসের দিকে তকিয়ে বললেন। ‘আমার ক্লাসে দেখেছি তো মিঃ পটার কে। হাও আর ইউ জেমস?’

‘ ভালই দিন কাটছে স্যার,’ জেমস হেসে উত্তর দিলো।

‘খুব ভালো, এরকম একটা সুন্দর দিনে সেটাই স্বাভাবিক,’ ফ্রাঙ্কলিন সামান্য ঝুঁকে বললেন। ‘ এবার চলুন আপনাদের কিছু দেখানো যাক। আমার সাথে আসুন, বন্ধুগন। হ্যারি আপনিতো দেখতে চান আমরা কি ভাবে আমাদের গাড়ির দেখভাল করি, তাই না?’

‘একদম তাই। যদিও আমি এখানে আপনাদের আগমন দেখতে পাইনি তবুও সব আমি শুনেছি। বিশেষ করে ঊড়ন্ত গাড়িগুলোর কথা। আমি ছটফট করছি বলতে পারেন ওগুলো দেখার জন্য। সাথে সাথেই আপনাদের জিনিষপত্র রাখার বিশেষ ব্যাপারটা। অনেকের মুখে অনেক রকম কথা শুনেছি ওই বিষয়ে, যদিও স্বীকার করতে লজ্জা নেই বুঝেছি অনেক কম।’

‘ও হ্যাঁ, আমাদের ট্র্যান্স-ডাইমেনশনাল গ্যারেজের কথা যদি বলেন তাহলে আমাদের অনেকেই ওটার ব্যাপারে খুব বেশী বোঝেন বা জানেন না,’ ফ্রাঙ্কলিন বললেন দ্বিধাগ্রস্থ কণ্ঠে। ‘সত্যি বলতে যদি আমাদের টেকনোম্যান্সি বিশেষজ্ঞ থিওডোর জ্যাক্সন না থাকতেন , আমাদের বিন্দু মাত্র ধারনা হতনা এটা কি ভাবে দেখাশোনা করতে হবে। যার কথা বলছি তিনি আগাম ক্ষমা চেয়ে রেখেছেন এই মুহূর্তে এখানে উপস্থিত থাকতে না পারার জন্য। উনি সন্ধেবেলায় আমাদের সাথে যোগ দেবেনএবং এই বিষয় নিয়ে আলোচনাটা তখনই করবেন। আমি নিশ্চিত কিছু প্রশ্ন থাকবে আপনাদের কাছে ওকে করার মতো ।’

টাইটাস হার্ডক্যাসল চাপা গলায় বললেন, ‘ সে তো থাকবেই, আমরা জেনেও নেবো।’

জেমস বাবার পেছন পেছন তাঁবুটার খোলা দিক দিয়ে ভেতরটা দেখে আর একটু বলে চমকে গিয়ে প্রায় পরেই যাচ্ছিলো । বিশাল আয়তনের তাঁবুটা। অনেক রকম জটিল কাঠের কাঠামো এবং ফ্রেম ওটাকে ধারন করে আছে। সেই তিনটে ঊড়ন্ত গাড়ীই ওখানে রাখা আছে। সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা আছে যন্ত্রপাতি, অতিরিক্ত পার্টস এবং প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্রাদি। কাজের পোশাক পরা বেশ কিছু মানুষ গাড়ি গুলোর এদিক ওদিকে ঘোরা ফেরা করছে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো তাঁবুটার পেছনদিক বলে কিছু নেই। জেমস নিশ্চিত বাইরে থেকে ও ওখানে তাঁবুর অন্যান্য দিকের মত ক্যানভাসের দেওয়াল দেখেছিল। আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল ওখান দিয়ে যে অংশটা দেখা যাচ্ছে তার সাথে হগওয়ারটস মাঠের কোন সাদৃশ্য নেই। বদলে অনেকটা দূরে পরিষ্কার ভাবে দেখা যাচ্ছে লাল ইঁটের ইমারত এবং বিরাট মাপের  ঝাঁকড়া গাছপালা । তার চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় ওখানে যে আলো দেখা যাচ্ছে তার সাথে এই মুহূর্তের হগওয়ারটস এর রোদ ঝলমলে আবহাওয়ার আকাশ পাতাল পার্থক্য। ওখানকার আকাশে ফ্যাকাশে গোলাপি রঙের আভা। বিরাট বিরাট মেঘের গায়ে সোনালী রঙের ছোঁয়া লেগেছে। গাছ এবং ঘাস যেন চিকচিক করছে সকালের কুয়াশার জমা জলে আলো পড়ে। কয়েকজন কাজের পোষাকপড়া মানুষ ফ্র্যাঙ্কলিনের দিকে ঝুঁকে সম্ভাষন করে, হাত দিয়ে পোষাকটা ঝাড়তে ঝাড়তে বেরিয়ে গেল ওই দৃশ্যটির দিকে।

‘আপনাদের স্বাগত দুনিয়ার কয়েকটি ট্রান্স-ডাইমেনশনাল বুদবুদের মধ্যের একটিতে,’ ফ্র্যাঙ্কলিন বললেন,  যথেষ্টই গর্বের ভঙ্গীতে। ‘ আমাদের এই গ্যারেজটি একই সাথে দুই জায়গায় অবস্থান করছে, সাময়িক ভাবে হগওয়ারটসের মাঠে এবং স্থায়ীভাবে ইউনাইটেড স্টেটস , পেনসিলভানিয়া , ফিলাডেলফিয়ার আল্মা আলেরন ইউনিভারসিটির ইষ্ট কোয়াড্র্যাংগলে এ। ’

‘গ্রেট ঘোস্ট অফ গলগামেথ এর দিব্যি,’ স্লাগহর্ন বললেন সামনের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে, ‘আমি এরকম জিনিষের কথা আগে পড়েছি। কিন্তু কোন দিন ভাবিনি স্বচক্ষে দেখতে পাবো। এটা কি স্বাভাবিক সাময়িক একটি ঘটনায় ঘটছে ? নাকি এটাকে তৈরী করা হয়েছে কোয়ান্টাম ট্র্যান্সফারেন্স মন্ত্র ব্যবহার করে?’

হ্যারি হাসি মুখে চারদিক দেখতে দেখতে বললো, ‘মাননীয় প্রফেসর আপনাকে তো এই জন্যই আমার সাথে নিয়ে এসেছি?’

ফ্র্যাঙ্কলিন ডজ হরনেট আর ভক্স ওয়াগন বীটল এর মধ্যের ফাঁকটাতে এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘দ্বিতীয়টা ব্যাবহার করা হয়েছে। এটা হল জানা শোনার মধ্যে থাকা তিনটি ডাইমেনশনাল প্লুরালিটি বুদবুদের একটি। এর মানে হল, যা  একটু আগেই আমি বললাম, এই তাঁবুটা অবস্থান করছে একটা ডাইমেনশনাল সেতুবন্ধের মধ্যে। একই সাথে একই সময়ে দুটি জায়গায় বিস্তারন লাভ করে। যে কারনেই একদিকে আমরা হগওয়ারটসের দ্বিপ্রহর দেখছি,’ উনি ঘুরে দেখালেন যে পথ দিয়ে জেমসরা তাঁবুতে ঢুকেছে সেই খোলা দিকটা।  ‘যেটাকে আপনারা বলতে পারেন বুদবুদের আপনাদের দিক। আর ওটা হলো ,’ হাত বাড়িয়ে দেখালেন সেই ম্যাজিক্যাল দিকটা যেখানে একটা অন্য আলোর জগত দেখা যাচ্ছে, ‘ বুদবুদের আমাদের প্রান্ত , যেখানে আল্মা আলেরনের কোয়াড্রাংগলে এখন ভোর হচ্ছে। পরিচয় করিয়ে দিই , ইনি আমাদের প্রধান মেকানিক মিঃ পীটার গ্রাহাম।’

স্টুটজ ড্রাগন ফ্লাইটার খোলা হুডের কাছে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন মানুষটি। হাসলেন এবং হাত নাড়লেন। ‘ আপনাদের সাথে দেখা হয়ে খুশী হলাম এবং কথা বলতে পেরেও।’

‘আমরাও,; নেভিল উত্তর দিলেন একটু হতভম্ব ভাবে।

গ্রাহাম এবং ওর বাকি সহকারীরা সবাই আছে বুদবুদের অপর প্রান্তে,’ ফ্র্যাঙ্কলিন বললেন। ‘দেখতেই পাচ্ছেন ওদের হাতেই দেওয়া আছে এই গাড়িগুলোর দেখভালের গুরুদায়িত্ব। তার জন্য ওদের বিশেষ ভাবে ট্রেনিংও দেওয়া হয়েছে। যাতে আমরা ভ্রমনকালীন সময়েও ওদের সার্ভিস পেতে পারি। আশা করি আপনারা বুঝতে পেরে গেছেন যে টেকনিক্যালি ওরা এখানে উপস্থিত নেই।’ বিষয়টার প্রমান দেওয়ার জন্য ফ্র্যাঙ্কলিন একটু এগিয়ে গিয়ে একজন কর্মচারীর শরীরের ভেতর দিয়ে হাত নিয়ে গেলেন। দেখে মনে হল একটা ধোঁয়া দিয়ে তৈরী অবয়বের ভেতর দিয়ে ওনার হাতটা চলে গেল। লোকটা সেটা বুঝতেও পারলো না।

‘তারমানে,’ হ্যারি বললো, চোখ কুঁচকে, ‘ ওরা আমাদের কথা শুনতে  পাচ্ছে এবং আমাদের দেখতে পাচ্ছে। আমরাও ওদের দেখতে পাচ্ছি ওদের কথা শুনতে পারছি । অথচ ওরা আছে আমেরিকাতে আর আমরা আছি হগওয়ারটসের মাঠে। যে কারনে আমরা ওদের ছুঁতে পারছি না।’

‘একদমই তাই,’ ফ্র্যাঙ্কলিন বললেন।

জেমস প্রশ্ন করলো, ‘তাহলে কিকরে ওরা বা আমরা গাড়িটাকে ছুঁতে পারছি?’

জেমসের পিঠ চাপড়ে দিয়ে স্লাগহর্ন বললেন, ‘খাসা প্রশ্ন করেছ জেমস?’

‘সত্যিই ভালো প্রশ্ন,’  ফ্র্যাঙ্কলিনও সায় দিলেন। ‘আর এই উত্তরের সাথেই জড়িয়ে আছে , ইয়ে, মানে কোয়ান্টাম। সহজ উত্তরটা হলো এই গাড়িগুলো বানানো হয়েছে মাল্টি-ডাইমেনশনাল পদ্ধতিতে, যা আমরা নই। তত্ত্বানুসারে আমাদের জানা চারটে ডাইমেনশনের বাইরেও আরো অনেক ডাইমেনশন আছে, এটা আশা করি আপনারা জানেন ?’

জেমস বাদে সবাই মাথা নাড়লো। ও এরকম কোন তত্ত্বের কথা আগে শোনেনি। যদিও ব্যাপারটা মোটামুটি বুঝতে পারছে।

ফ্র্যাঙ্কলিন বলে চললেন। ‘তত্ত্ব অনুযায়ী অনেক এমন ডাইমেনশন আছে যাদের আমরা আমাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে পারি না, কিন্তু তাদের অস্বীকার করাও যায় না। তারাও বাস্তব। আর এই সুত্র মেনেই প্রফেসর জ্যাক্সন একটা মন্ত্র বানিয়েছেন যা এই গাড়িগুলোকে ওই ডাইমেনশনের সাথে জুড়ে দেওয়া যায়। যার ফলে একই সাথে একই সময়ে দুটো আলাদা জায়গায় ওদের অস্তিত্ব বজায় থাকছে, কেবল মাত্র তখনই যখন গাড়িগুলো এই গ্যারেজের মধ্যে ঢোকানো হচ্ছে। এখানে ওদের আনা হলেই ওরা ডাইমেনশনাল বুদবুদের দুই প্রান্ত ভেদ করার উপযোগী হয়ে যাচ্ছে। যে কারনে ওদের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে এক সাথে দুটো স্থানেই।’

‘অসাধারন,’ স্লাগহর্ন বললেন, হরনেট গাড়িটায় হাত ছুঁইয়ে। ‘কি দারুন ভাবে আপনাদের মেকানিকরা সাথে না এসেও তাদের কাজ ঠিকঠাক করে দিচ্ছেন। আবার আপনারাও যেতে না পারলেও আপনাদের হোমের একটা ছোঁয়াচ সবসময় অনুভব করছেন।’

‘একদম ঠিক বলেছেন,’ ফ্র্যাঙ্কলিন সম্মতি জানালেন। ‘এটা একটা বিশেষ ধরনের সুযোগসুবিধা  আবার সাথে সাথেই একটু আরামদায়ক অনুভুতি ।’

নেভিলের আগ্রহ গাড়িগুলো্র বিষয়ে জানার। ‘ওগুলো স্বাভাবিক মেকানিক্যাল গাড়ি নাকি মন্ত্রপূত মেশিন?’

পাখাওয়ালা গাড়ি গুলোর বিষয়ে ফ্র্যাঙ্কলিনের বিস্তারিত বিবরন শুনতে ভালো লাগছিল না জেমসের। ও এগিয়ে সেই দিকটায় যেখান দিয়ে আমেরিকান স্কুলের এলাকাটা দেখা যাচ্ছিলো। সূর্যের আলো ছড়ানো শুরু হয়েছে, গোলাপি রঙের আভা ছড়িয়ে পড়েছে ক্লক টাওয়ারে। ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে ওখানে এখন সকাল ছটা। কি অদ্ভুত রকমের অস্বাভাবিক এবং দারুন একটা ব্যাপার, জেমস ভাবলো। হাতটা বাড়িয়ে দিল নিজের , নিছক কৌতূহলে , ওখান কার শীতলতা অনুভব হয় কিনা দেখার জন্য। প্রথমে একটা অসাড় অনুভুতি ছেয়ে গেল ওর আঙ্গুলের ডগাগুলোতে , তারপরই স্পর্শ পেল ঝুলে থাকা ক্যানভাসের যা আপাতত অদৃশ্য। নিশ্চিতভাবেই ওখানে পৌঁছানোর বা ওখানকার হাওয়ায় শ্বাস নেওয়ার কোন সুযোগ নেই।

‘খুব খারাপ লাগছে ছোট্ট বন্ধু এটা বলতে, যে তুমি এখানে আসতে পারবে না,’ একটা কণ্ঠ ভেসে এলো। জেমস তাকালো। প্রধান মেকানিক হাসি মুখে বীটল গাড়ীটার পাশে দাঁড়িয়ে। ‘এখন আমাদের ব্রেকফাস্টের সময় এবং আজ আমরা খাবো মাশরুম অমলেট।’

জেমস হেসে বললো, ‘ বাহ দারুন। এখানে এখন লাঞ্চ করার সময়।’

‘প্রফেসর ফ্র্যাঙ্কলিন,’ জেমস মিঃ রিক্রিয়ান্ট এর জোরালো কণ্ঠ শুনতে পেল। ‘ইয়ে, বলছিলাম কি ইন্টারন্যাশনাল ম্যাজিক্যাল কোয়ালিশন এর অপ্রমানিত বা ডার্ক ম্যাজিকের যে নিষেধাজ্ঞা আছে সেটার বাধা এই পুরো ব্যাপারটায় সামলালেন কি ভাবে? নিশ্চিতভাবেই এরকম একটি অদ্বিতীয় জিনিসের সেফটির বিষয়টা বেশ গোলমেলে প্রমান করার পক্ষে।’

‘হুম, একদম ঠিক কথা,’ মিঃ রিক্রিয়ান্ট এর দিকে তাকিয়ে ফ্র্যাঙ্কলিন সম্মতি জানালেন। ‘ সৌভাগ্য বশত আজ পর্যন্ত কোন সমস্যা হয়নি। যে কারনেই বোধ হয় কোয়ালিশন এখনো সেভাবে এ বিষয়টার দিকে নজর দেয়নি। তাছাড়া প্রমান করাও বেশ কঠিন যে এর থেকে কোন বড় রকমের ক্ষতি হতে পারে। যদি কোন কারনে প্রফেসর জ্যাক্সনের মন্ত্র পুরোপুরি ফেল করে যায় , তাহলে সবচেয়ে খারাপ যেটা হবে তাহলো, আমাদের এই প্রিয় গাড়ি গুলোর বদলে ট্যাক্সি ভাড়া করে বাড়ি ফিরতে হবে।’

‘এক্সকিউজ মি,’ মিস সাকারিনা বলে উঠলেন বিস্ময়ের ওপর কোন মতে হাসি বজায় রেখে। ‘কি ভাড়া করে?’

‘আমায় মাফ করবেন মিস,’ ফ্র্যাঙ্কলিন বললেন। ‘ ওটা মাগলদের গাড়ি। যা ভাড়ায় পাওয়া যায়। আমি একটু অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে ফেলেছি।’

সাকারিনা হাসিটাকে সামান্য প্রসারিত করলেন। ‘হ্যাঁ , মানে, তাইতো। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম মাগলদের মেশিন সংক্রান্ত বিষয়ে আমেরিকান উইজার্ডদের একটা ফ্যাসিনেশন আছে। কি করে যে আমার এই ভুলটা হল।’

ফ্র্যাঙ্কলিন সাক্রিনার ব্যঙ্গাত্বক মন্তব্যে একটু থমকে গেলেন। ‘দেখুন, আমি আমার সহকর্মীদের ব্যাপারে বলতে পারবো না, কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে এটা স্বীকার করতেই পারি যে আমি সত্যিই ভালোবাসি।  এই গ্যারেজকে আপ্রিসিয়েট করার কারন এটা আমাকে আমাদের বহনকারী  যানবাহন দেখাশোনা করার অতিরিক্ত চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছে।  তাছাড়া, আমার কখনোই ক্লান্তি বোধ হয়না এটা খুঁজে দেখতে যে কোন জিনিষ কি ভাবে কাজ করে। সাথেই আমি চেষ্টা করি সেটাকে আরো উন্নত করার ।’

‘উম ম ম… বুঝলাম,’ সাকারিনা সামান্য মাথা নেড়ে , গাড়িগুলোর দিকে দৃষ্টি ফেরালেন।

স্টুটজ ড্রাগনফ্লাই টার হুডের তলায় একজন মেকানিক একটি তারে হাত ছোঁয়াতেই কিছু নীল আলোর বিচ্ছুরন দেখা গেল। একটু ঝাঁকানি দিয়ে বেশ কিছু ক্যাঁচ কোঁচ শব্দ করার পর গাড়িটা পাখনা মেলে দিয়ে বেশ কয়েকবার ঝাপ্টালো। তারপর থেমে গেল । নেভিল কোন ক্রমে  নিচু হয়ে ওটার ঝাপ্টা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে সরে এলেন।

‘দারুন রিফ্লেক্স, নেভিল । আর একটু হলেই খবর হয়ে যেত যান্ত্রিকপাখার ঝাপ্টায় মানুষের পতন,’ হ্যারি বললেন।

নেভিল হ্যারির দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলো। হার্ডক্যাসল গলা ঝেড়ে নিয়ে বলেন, ‘ম্যাম অ্যান্ড জেন্টলম্যান এবার বোধহয় আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।’

‘হ্যাঁ, এবার যেতে হবে,’ হ্যারি সম্মতি জানালেন। ‘মিস্টার ফ্রাঙ্কলিন।’

ফ্র্যাঙ্কলিন হাত উঠালেন। ‘আমি চাই আপনি আমায় বেন বলে ডাকুন। আমার বয়স তিনশো বছর, মানুন বা না মানুন, ওই মিস্টারটা শুনলেই আমার বয়েসের কথা মনে পড়ে যায়। এই আবদারটা রাখবেন কি?’

হ্যারি মুচকি হাসলেন। ‘অবশ্যই রাখবো, বেন। তাহলে আজ রাতে ডিনারে আবার দেখা হচ্ছে। অসংখ্য ধন্যবাদ এই অসাধারন গ্যারেজটা আমাদের দেখানোর জন্য।’

‘আমাদের সৌভাগ্য,’ ফ্র্যাঙ্কলিন বললেন গর্বিত ভাবে। ‘আপনি যখন স্টেটসে যাবেন আমি আপনাকে দেখাবো আরো একটা জিনিষ। মনের চিন্তার শক্তিতে চালানো  হচ্ছে এমন একটা প্রেস। আমি সেই ঘণ্টাটাও দেখাবো যেটা আমি বানিয়ে ছিলাম আমার দেশের জন্মের মুহূর্তে। যদিও ওটা এখন ভেঙে গেছে এবং ওরা আমাকে ওটা সারাতেও দেবেনা।’

‘ওনার কথা একদম শুনবেন না,’ গ্রাহাম বলে উঠলেন হ্যারিদের  উদ্দেশ্যে। ‘উনি বিশ্বাস করিয়ে তবে ছাড়বেন যে স্ট্যাচু অফ লিবারটির তামাটাও উনিই গলিয়ে  দিয়েছিলেন।’ বাকি মেকানিকরা একসাথে হেসে উঠলো কথাটা শুনে।

ফ্র্যাঙ্কলিন ওদের দিকে চেয়ে মুখ ভেংচালেন। তারপর হ্যারিদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়লেন । ‘ তাহলে বন্ধু, রাতেই দেখা হবে আবার । খিদে সঙ্গে করে এনো। আর সাথেই দরকার মতো ঠান্ডার মন্ত্র। আমার মনে হয় মাদাম ডেলাক্রয় বিশেষ কিছু গাম্বো নিয়ে যাবেন।’

 

[চলবে]

লেখক পরিচিতিঃ  জর্জ নরম্যান লিপারট আমেরিকান লেখক এবং কম্পিউটার অ্যানিমেটর। তবে ওনার বর্তমান পরিচয় উনি জেমস পটার সিরিজের লেখক। যে কারনে ওনাকে “আমেরিকান রাউলিং” নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সিরিজের প্রথম লেখা “জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং” প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। নানান কারনে এটি অনেক বিতর্কে জড়িয়ে যায়। সেসব সমস্যা পেরিয়ে আজ এটি পাঠক পাঠিকাদের চাহিদায় সারা বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সিরিজের সব কটি বই ই-বুক এবং ফ্রি হিসাবেই প্রকাশ করেছেন মাননীয় জর্জ নরম্যান লিপারট। এই সিরিজ ছাড়াও ওনার আরো ১২ টি বই আছে। বর্তমানে উনি এরি, পেনসিল্ভ্যানিয়ার বাসিন্দা।

অনুবাদকের পরিচিতিঃ উপন্যাসটির অনুবাদক প্রতিম দাস মূলত চিত্র শিল্পী, ২০১৩ সাল থেকে ভারতের সমস্ত পাখি আঁকার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছেন। ৭৭৫+ প্রজাতির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে শুধু পাখি নয় অন্যান্য বিষয়েও ছবি আঁকা চলে একইসাথে। সাথেই দারুণ রকমের পাঠক, যা পান তাই পড়েন ধরনের। প্রিয় বিষয় রূপকথা, ফ্যান্টাসী, সায়েন্স ফিকশন, অলৌকিক। টুকটাক গল্প লেখার সাথে সাথে আছে অনুবাদের শখ। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *