একজন দেবতার দিনলিপি

রচনা  : প্রতিম দাস

অলঙ্করণ : প্রতিম দাস

সিবাতারো ফেলিস রো এল ভেত্রো ডোরকাতনা না এ উচ্চারনে লেখাটা ঠিক হবে না। যদি কোন দিন কোনোক্রমে এ লেখনী পৃথিবীবাসীর হাতে পৌছায় তাহলে তাদের পড়তে অসুবিধা হবে। যদিও এসব উচ্চারনের মানে আমি লিখে রাখছি। কিন্তু যেখানে আর কখনই ফিরে যেতে পারবো না সেখানকার সুবিধা সুবিধার কথা ভেবে লাভই বা কি? চরম সর্বনাশ থেকে সিবাতাদের বাঁচানোটাই আমার প্রথম উদ্দেশ্য ছিল সেটায় কিছুটা হলেও আমি সফল হয়েছি।

     বরং এক কাজ করি আমার মাতৃভাষার সাথে ওদের উচ্চারন মিশিয়ে ওদের প্রচলিত লোকগল্পটি বরং লিখি। ইচ্ছে আছে এই গ্রহান্তরী মানুষদের আমার মাতৃভাষা শেখানোর। যাতে ওরা ওদের উন্নতির কারনটা বুঝতে পারে। এই গ্রহে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েছে কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতি হয়নি। থমকে গিয়েছিল। তার বদল ঘটিয়েছি আমি। এই লোককাহিনীটি এক গ্রহান্তরী মানবসভ্যতার যার সূত্রপাত কবে হয়েছিল আমার জানা নেই।

     শুরুতে যে অদ্ভুত উচ্চারন সম্বলিত বাক্যটি লিখেছি তার অর্থ সিবাতা (ভিনগ্রহী এই মানব প্রজাতির নাম) –দের দিনযাপনের হিসাব রাখেন ডোরকাতনা (ওদের একমাত্র আরাধ্য দেবতা)। এই গ্রহের হিসাব অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু মতসব (বছর) অন্তর এক নেফালিম (শয়তান) উনি পাঠান এখানে। যে গ্রাস করে ওদের অন্যতম সেহ (আলো) প্রদানকারী এপিলু (নক্ষত্র) দের। সেহর অস্তিত্ব মুছে যায় রাজম (গ্রহটির নাম) থেকে। নসির (আকাশ) জুড়ে দেখা যায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অসংখ্য এপিলুদের। যারা আর জোরালো আলো দিতে পারে না। নেফালিম সব সিবাতাদের লোগান (পাগল) করে দেন। চারদিকে জ্বলে ওঠে ঝকমর (আগুন)। যার বিধ্বংসী প্রভাবে ছাড়খাড় হয়ে যায় গোটা রাজম। লোগান সিবাতারা একসময় উরত (মারা) যায়। মহান ডোরকাতনা কিন্তু সব সিবাতাদের ভয়াদ (ধ্বংস) করেন না। একদ্র () মতসবের শিশু আর অনসেহ (অন্ধ) –দের রেহাই দেন উনি। ওদের দ্বারা আবার প্রথম থেকে শুরু হয় জীবন সভ্যতা চক্র।

*****

     আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা’ বহু প্রাচীন এই ছড়াটি মনে পড়ে মাঝে মাঝেই। কিন্তু যাকে নিয়ে লেখা সেই চাঁদ আর দেখতে পাই না। চোখ বন্ধ করে চেষ্টা করি সেই অনিন্দ্য সুন্দর মহাজাগতিক গোলকটিকে মনের আয়নায় দেখতে। যতদিন যাচ্ছে (দিনই যাচ্ছে শুধু। রাত একবারই দেখেছি এখানে আসার পর থেকে। মর্মান্তিকতা এবং সফলতা মিলে মিশে ছিল সেই রাতে।) ততই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সব স্মৃতিগুলো।

     আমার সেই সবুজ গ্রহটা থেকে কমপক্ষে ২০০ আলোকবর্ষ দূরের এই যমজ পৃথিবীটায় বসে নক্ষত্র শক্তি চালিত নোটবুকে লিপিবদ্ধ করে চলেছি আমার কাহিনী। লেখক তো নই, তাই কতটা সাহিত্যমানের হবে জানি না। না হলেই বা ক্ষতি কি? কেই বা পড়বে।

     ২০৬১ সাল, পৃথিবী

     স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রাদি চালিত ছয়টি মহাকাশযান একজন করে যাত্রী নিয়ে শুরু করলো উড়ান। মহাকাশের ছয়দিকে। কোন বিশেষ তথ্য প্রাপ্তির আশা না করেই। কারন মহাকাশ বিজ্ঞানে অনেক উন্নতি সাধন হলেও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হতে পারেন নি এই অভিযানের লক্ষ্যস্থল কোথায়। অভিযান আদপেই কোনদিন শেষ হবে কিনা? ফিরে আসার সম্ভাবনা যেখানে ১০০ তে ০.০৩% সেখানে কিছু আশা করাটাই বৃথা। ফিরে এসে অভিযাত্রীরা পৃথিবীর কাউকে যে দেখতে পাবেন সে সম্ভাবনা আরো কম।

     পরিবার আত্মীয় স্বজনের পিছুটানহীন সেই অসমসাহসী (নাকি দুর্ভাগা) ছয় মহাকাশযাত্রীর একজন আমি। বঙ্গসন্তান। আকাশ বসু। যাত্রার সময় আমার বয়স ছিল ৩৫ বছর ৩ মাস ১৭ দিন। এরপর পৃথিবীর ঘড়ি অনুযায়ী ৩ বছরের মত পেরিয়ে গেছে। আমি এখন ৪০ এর দোরগোড়ায়। মহাকাশযাত্রা অনুপাতে কতদিন পেরিয়েছে আমার গ্রহে আমি জানি না।

     ২০৫০ সালের শেষের দিকে নক্ষত্রদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে নিয়ন্ত্রন করার কৌশল আয়ত্বে আসে। এর সাথে পারমাণবিক শক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে এক ধাক্কায় অনেকটাই সহজ হয়ে যায় মহাকাশ ভ্রমণ। যার ফলস্বরূপ আজ আমি রাজমের মাটিতে।

     পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ ছিন্ন হয়েছিল ৫০ আলোকবর্ষ পেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই। বাকি ৫ মহাকাশযানের কি হয়েছে আমি জানি না। এই গ্রহটিতে আমার অবতরনের কারন মহাকাশযানের কলকব্জায় ঘটে যাওয়া বিকলন। নচেৎ যে পরিমাণ জ্বালানী ‘ভার্চুয়াল অ্যানালাইজার সিস্টেম’ এখনো দেখায় তাতে আরও শ’পাঁচেক আলোকবর্ষ অনায়াসে পাড়ি দেওয়া যায়। কিন্তু তাকে ব্যবহার উপযোগী করার মত কারিগরি জ্ঞান আমার নেই।

     বয়স বৃদ্ধি রোধ করতে প্রত্যেক মহাকাশ যানের আরোহীকে ক্রায়োজেনিক ক্যাপসুলে ঢুকিয়ে শীতঘুমে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। কলকব্জা বিকল হতেই এক প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে আমার সে ঘুম ভেঙে যায়। বেশ খানিকক্ষণ আমি বুঝতেই পারিনি আমি কোথায়? তারপর সব মনে পড়ে যায়। হাতের নাগালে থাকা বাটনটায় চাপ দিতেই খুলে যায় ক্যাপ্সুলের স্বচ্ছ আবরণ। তাকিয়ে দেখি কন্ট্রোল প্যানেলের ম্যাল ফাংশানের লাল আলোটা দপ দপ করছে। শরীরে সাড় ফিরে আসার পর উঠে গিয়ে প্রথমেই আঙুল ছোঁয়াই বহিঃদৃশ্য দেখার স্ক্রীনে।

     প্রথমে যা দেখলাম তাতে অবাক হয়ে গেছিলাম। গাছপালা, ঘাস এবং নীল আকাশ। তাহলে কি আমি পৃথিবীতেই ফিরে এসেছি আবার? ৩৬০ ডিগ্রী ক্যামেরা যুক্ত স্ক্রীন নড়াতেই অবাক হওয়ার মাত্রা দ্বিগুন হলো।

     বার কয়েক চাপড় মারলাম স্ক্রীনে। কোনো কারনে ক্যামেরা বিগড়েছে ভেবে। কারন আকাশে দুটো সূর্য দেখা যাচ্ছে। দু প্রান্তে। একটি অস্তাচলে আর একটি উদীয়মান। তখন বিন্দুমাত্র কল্পনা করতে পারিনি আরও কত বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য।

     যান্ত্রিক গোলযোগে মহাকাশ যানের ইঞ্জিন বিগড়ে গেলেও বাকি অনেক কিছুই ঠিক ঠাক কাজ করছিল। আর সেখান থেকেই জানতে পারলাম বাইরের আবহাওয়ার সাথে আমার পৃথিবীর বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই। তার মানে জবরজং পোশাক পরতে হবে না বাইরে যেতে হলে। সুরক্ষার জন্য সাথে নিলাম লেজার গানটাকে।

     সতর্ক হয়ে যান থেকে নেমে কিছুদূর এগোতেই দেখা পেলাম তাদের যাদের সাথে আমি এখন বসবাস করি। আকাশে সূর্যদ্বয়কে না দেখলে নিশ্চিত মনে করতাম আলোর গতি আমাকে সময়ভ্রমণ করিয়ে আমার নিজের গ্রহতেই ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। আদিম যুগে। সামনে বেশ কিছু মানুষ। যাদের পোশাক আশাক প্রমাণ দিচ্ছে এরা এখনো সভ্যতার হামাগুড়ি দেওয়ার সময়েই পড়ে আছে।

     সাহস করে একটু এগিয়ে যেতেই ওরা আসে পাশে পড়ে থাকা পাথরের টুকরো ও গাছের ডাল তুলে নিলো হাতে। না, লক্ষণ ভালো না। লেজার গানটা ওদের থেক বেশ কিছুটা দুরের একটা কাঠের গুঁড়ির দিকে তাক করে ট্রি্গারে হাত ছোঁয়ালাম। নিমেষের মধ্যে দপ করে জ্বলে ঊঠলো আগুন। ওরা চমকে উঠে চিৎকার করে উঠলো অজানা ভাষায়। সেদিন না বুঝলেও আজ জানি ওরা বলেছিল “ঝকমরডোরকাতনা”। এবং পড়ি মড়ি করে সব পালিয়ে গিয়েছিল ওখান থেকে।

     উনিশ শতকের একজন গবেষক লেখক এরিক ফন দানিকেন একটি বই লিখেছিলেন, ‘দেবতারা কি গ্রহান্তরের মানুষ?’ কাগজের বইটা আমি স্বচক্ষে না দেখলেও ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে পড়েছিলাম। ২০২৫ সালের পর থেকেই বন্ধ হয়ে যায় কাগজ বানানো। ইবুকের সহজ লভ্যতায় এবং পরিবেশবাদীদের ক্রমাগত চাপে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় পৃথিবীর প্রকাশনা সংস্থাগুলি। সেই বইটাতে উনি বলে ছিলেন আমাদের সহসা উন্নতির কারন বাইরের গ্রহ থেকে আসা কোন উন্নত মস্তিষ্কের প্রাণী। যাদেরকে বেশির ভাগ সভ্যতা দেবতা বলে মনে আখ্যা দিয়েছে। আজ রাজমে বসে আমার কাহিনী লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে বুঝতে পারছি ঐ মানুষটার ভাবনা কতটা সঠিক ছিল। বিশেষ করে দীর্ঘ মতসবের পর আসা রাতের পর (যদিও ওটা মোটেই রাত ছিল না) থেকে সিবাতাদের কাছে আমিতো দেবতাই।

     আকাশ পথে আমার এ গ্রহে অবতরণ আজও ওদের কাছে ভয়, শ্রদ্ধা ও রহস্য মেশানো একটা ঘটনা। আমি যে ওদের উপাস্য ডোরকাতনার অংশ এটা ওরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। প্রথম প্রথম আমার কাছে না ঘেঁষলেও ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা থেকেই আমার উদ্দেশ্যে ফলমূল এটা সেটা নিবেদন করেছিল। আজও করে। কয়েকশো আলোকবর্ষ দূরের দুটি গ্রহ অথচ মানসিকতায় কি অদ্ভুত মিল।

     পৃথিবীর ৯০% গল্প উপন্যাস সিনেমা গ্রহান্তরী প্রানীদের সবসময়েই মানুষের চেয়ে উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী এভাবেই দেখিয়েছে। কিন্তু অনুন্নতও যে থাকতে পারে সে ভাবনা ভাবা হয়নি। বিশ্ব ব্রম্ভান্ড মহাকাশ জুড়ে গ্রহ নক্ষত্র ধুমকেতু ইত্যাদির মূল প্রকৃতি একই রকম তাহলে অন্য গ্রহের প্রানীরাও মানুষের মতই হবেন এটাকেও ভাবতে চান নি। লেখকরাও তাদের কল্পনার ফানুস উড়িয়ে ওদের সৃষ্টি করেছেন বিকটাকার বিকৃতদর্শন রূপে। আমি আগে এসব নিয়ে কোনদিন ভাবিওনি। সিবাতাদের সাথে এতদিন থাকার পর এসব ভাবনা আমার মাথায় এসেছে। ওদের বলে কোন লাভ নেই তাই লিখে চলেছি।

     এখানে অবতরণের পর আমার ঘড়ি অনুসারে দিন দশেক বাদে এক অতি কৌতূহলী বালককে মহাকাশযানে মজুত থাকা চকোলেট ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। তারই লোভে সে আমার কাছে আসে এর পরে।

     সেই কৌতূহলী বালকটার নাম ত্রিস্নত। বয়স দশ বা বারো হবে। এই রাজমে ওর সাথে পরিচয়ের পর কেটে গেছে কয়েকশ ঘণ্টা। ও আপাততঃ আমার সব সময়ের সহচর। ওর জন্যই আজ আমি সিবাতাদের ভাষা বুঝতে পারি। বিকল মহাকাশযান সারানোর কোন উপায় নেই, তাই এই গ্রহে থাকতে হলে এদের ভাষা শিখতে হবে এটা উপলব্ধি করেছিলাম। ওই আমায় শুনিয়েছিল এ কাহিনীর প্রথমে লেখা গল্পটা। পরে ওর বাবার কাছ থেকে আরও কয়েকবার শুনি। মানুষটির কাছ থেকে জানতে পারি আর কিছুদিন বাদেই নাকি ঐ ভয়ঙ্কর ঘটনাটি আবার ঘটতে চলেছে। ত্রিস্নত আমায় বলে, আমি তো ডোরকাতনার সহচর। আমি কি পারি না ওদের বাঁচাতে?

     কাজতো করার মতো কিছুই নেই। জীবনের শেষ দিনগুলো এদের সাথেই কাটাতে হবে এটা ভালোই বুঝে গিয়েছি। অতএব ত্রিস্নতের আবেদনে উঠে পড়ে লাগলাম বিষয়টা নিয়ে। ওদের আরও কয়েকজনের কাছ থেকে আরও কয়েকবার শুনে লিখে ফেললাম কাহিনীটা। আর কি আশ্চর্য! ঠিক এরকম একটি ঘটনার কথা বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভ তার একটি গল্পে লিখে গেছেন। এটা খুব সাধারন একটা মহাজাগতিক ঘটনা। আমাদের পৃথিবীতে যা প্রায়শই ঘটে। কি সেটা তা বলার আগে রাজম গ্রহ ও সিবাতা সভ্যতা নিয়ে দু চারটে কথা লেখা খুব জরুরী।

     আমাদের পৃথিবীর ইতিহাসের ধারা অনুসারে রাজমে প্রাকমধ্যযুগের কাল। গোষ্ঠী জীবনের সূচনালগ্ন কিন্তু সামাজিক ব্যবস্থায় অনেক অমিল। কি ও কেন সে সব আপাততঃ অর্থহীন এ কাহিনীতে। যদিও আবহাওয়া, বেশ কিছু জীবজন্তু পৃথিবীর মতই। ফলে আমার অসুবিধা হচ্ছিল না। গণ্ডগোলটা অন্য জায়গায়। এখানে রাত হয় না। রাজমের আকাশে প্রথম দেখায় আমি দুটো সূর্যসম নক্ষত্র দেখলেও এদের প্রধান এপিলুর সংখ্যা চার। হেগন, ডাবাডন, ডিওডন ও সেরন। একটি অস্তাচলে গেলে অন্যটির উদয় হয়। এর মাঝে প্রায় ৪৬ ঘণ্টার ব্যবধান। ফলে অন্ধকার কাকে বলে ওরা প্রায় জানেই না। প্রায় বললাম কারন পাহাড়ের গুহা বা জঙ্গলের ভেতরে তার আভাস ওরা পায় কিন্তু গুরুত্ব দেয় না। বা হয়তো ভয়ে ও নিয়ে মাথা ঘামায় না। অন্ধকার হয় না বলেই আলোকবিজ্ঞান তার পা ফেলেনি এ গ্রহে। মানে কৃত্রিম আলো সৃষ্টির কোন প্রচেষ্টাই আজ অবধি হয়নি। আগুন জ্বালাতে জানলেও তার থেকে যে আলো হয় এটা ওরা বোঝে না।

     লোকগল্পটি বিশ্লেষন করে যেটা বুঝতে পেরেছিলাম সেটা হল এটা আসলে ‘গ্রহণ’। রাজমের তুলনায় কোন একটি বড় মাপের গ্রহ ঐ সময় তার বিশালাকার আবর্তন পথের ভ্রমণকালে রাজমের খুবই পাশ দিয়ে যায়। যার অনিবার্য পরিণতি রাজমকে অন্ধকারে ঢেকে দেওয়া। আর এই মহাজাগতিক মহাগ্রহটিকেই ওরা মনে করে নেফালিম। যাকে ডোরকাতনা পাঠিয়ে দিয়েছেন ওদের পাপের শাস্তি দিতে।

     চারটে এপিলু ছাড়াও যে আরও গ্রহনক্ষত্র থাকতে পারে এটা ওরা কল্পনাতেও আনতে পারেনি কোন দিন। তাই যখন ঐ আগন্তুক বিশাল গ্রহের ছায়ায় আসতে আসতে ঢেকে যেত কোন একটি এপিলু তখন আকাশে ফুটে উঠত বাকি দূরবর্তী নক্ষত্রদের আলো। একটি এপিলুকে গ্রহনে গ্রাস হতে দেখার পর ওরা ভাবতো সব শেষ। এপিলুরা আর আলো দিতে পারবে না। মাস হিস্টিরিয়ার সূচনা হত এতেই। উৎকণ্ঠা উদ্ভ্রান্ত তার তাড়নায় তারা ছুটে যেত নিজেদেরই লাগানো আগুনের দিকে। আর পুড়ে মরতো ।

     এই রাজম গ্রহটি কত বড় আমি জানি না। অন্যান্য প্রান্তে আর কোন সভ্যতা আছে কিনা তাও এরা বলতে পারেনি। ওদের জগতটা একটা ছোট্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ। ঠিক যেন সেই সময়ের পৃথিবী যখন একটি দেশ অন্য দেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতো না।

     বছরের পর বছর একাদিক্রমে অথবা সারা জীবনটাই আলোর জগতে থাকার পর সহসাই অন্ধকারের কবলে গিয়ে পড়লে তার প্রভাব কাটানো সত্যিই কঠিন। পৃথিবীর মনোবিজ্ঞান অনুসারে একাকী ১৫ মিনিটের বেশী সময় কোন মানুষকে তার ইচ্ছার বিরূদ্ধে অন্ধকারে রেখে দিলে মানসিক অসুস্থতার সূত্রপাত হতে পারে। সেদিক থেকে সিবাতাদের অবস্থাতো

     যে আগুনকে জীবৎকালে কোনদিন আলোর রূপে দেখেনি তাকেই আলোকবিচ্ছুরনকারী শক্তি রূপে দেখে অনুন্নত ভয়গ্রস্থ সিবাতারা আলোটা বড় করার চেষ্টা করে। হাতের কাছে যা পায় তাতেই লাগায় আগুন। লোককথার প্রভাবও এর জন্য দায়ী। ওরা এটাকে ভবিতব্য মনে করে। ভেবে দেখে না ভবিষ্যৎ পরিণাম। আগুন ছড়িয়ে যায় এদিক থেকে ওদিকে। তার বিধ্বংসী লীলায় ছাড়খাড় হয়ে যায় সব।

     অন্ধের কিবা দিন কিবা রাতি – আলোই বা কি আর কিই বা অন্ধকার! কোনক্রমে আগুনের গ্রাস থেকে বেঁচে গেলে বেঁচে যায় তারা। বিকারহীন মস্তিষ্কের কারনে। আর ৬ বছরের নিচের শিশুদের সেই অর্থে ভয় বোধ হয় না। ফলে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় তাদের মধ্যে কেউ কেউ। যা লোক গল্পের ভাষায় ডোরকাতনার কৃপালাভ।

     আর একটি বিষয় এ প্রসঙ্গে আমার মনে আসছে। সঠিক কিনা বলতে পারবো না। রাজমে কোন নেশা দ্রব্যর ব্যবহার নেই। মনে হয় ঐ সময় নেশাগ্রস্থ হলেও বেঁচে যাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। যদি না আগুনের কবলে পড়ে। কারন নেশাগ্রস্থ মস্তিস্কে ভয়ের প্রভাব পড়ে না বলেই আমার জানা আছে।

     আমি তো বুঝলাম আসল ব্যাপারটা কি। কিন্তু ওদের বোঝাবো কি করে? পৃথিবীতে দেখেছি বিজ্ঞান শিক্ষিত মানুষ চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণের দিন ধার্মিক আচার পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সেখানে গ্রহান্তরী এই অনুন্নত মানুষগুলোকে বোঝানো সম্ভব হবে কি?

     ত্রিস্নতের সাহায্য নিয়ে ওর বাবা সহ আরও কিছু সিবাতাবাসীকে একত্র করে রীতিমতো মডেল বানিয়ে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম। না মোটেই কাজ হয়নি ব্যাপারটায়। তাই বিজ্ঞান না বুঝিয়েই কিছু করার পথ বেছে নিতে হয় আমাকে। আমার আকাশ থেকে নেমে আসাটা আমার কথা মেনে নিতে ওদের অনেকটাই সাহায্য করেছিল। বিশ্বাসও করেছিল বেশ কিছু সিবাতাবাসী আমার দেখানো পথে চলে বাঁচার আশায়। পেরেছি তাদের বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে। সফল হইনি যদিও সব সিবাতাদের ক্ষেত্রে, কারন লোককথায় তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ভাঙতে পারিনি। দিনযাপনে করে থাকা একাধিক ‘পাপ’ কাজের অনুশোচনা মাস হিস্টিরিয়ায় পরিনত হয়ে তাদের ঠেলে দিয়েছিল যুগ যুগ ধরে চলে আসা পরিণতির দিকে। তবুও আজ নেফালিম এর অভিশাপ কাটিয়ে অনেক বেশী পরিমাণ সিবাতাই বেঁচে আছেন।

     কি করে সেই অসাধ্য সাধন করেছি এবার সেটাই বলি।

     যে আগুন ওদের ধ্বংস করেছে এতোদিন, সেই আগুনকেই ওদের বাঁচাতে ব্যবহার করেছি আমি।

     আগুন জ্বালাতে জানলেও মশাল বানাতে জানত না ওরা। পশু চর্বি মাখিয়ে সহস্রাধিক মশাল বানিয়ে বিলি করার ব্যবস্থা করেছিলাম। বলে দিয়েছিলাম কোন এপিলুর গায়ে কালো ছায়া পড়ার সামান্যতম চিহ্ন দেখতে পেলেই পাঁচজন করে দল বানিয়ে একটি করে মশাল জ্বালিয়ে মহাকাশ জানের কাছে খোলা প্রান্তরে হাজির হতে। প্রত্যেকে অন্তত দুটি করে মশাল রাখবে সাথে। একজনার মশাল নিভে এলেই আর একজন জ্বালিয়ে নেবে আর একটা। অন্ধকার যত বাড়বে তোমাদের অসংখ্য মশালের আলোয় আমি নেফালিমকে আটকে দেব তোমাদের ধ্বংস করার হাত থেকে।

     একই সাথে ওই বিশাল প্রান্তরে শুকনো কাঠের পাঁচটা বড় বড় স্তুপ জমা করেছিলাম ত্রিস্নতের বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে। কেন সেটা শুধু ওকেই বলেছিলাম। বড়মাপের আলো বানাতে এ ছাড়া আর কোন উপায়তো ছিল না আমার হাতে। কাঠের খুঁটি পুঁতে ঘিরে দিয়েছিলাম স্তুপগুলো যাতে কেউ কাছে যেতে না পারে।

     এলো সেই মহাক্ষণ। শুরু হল গ্রহান্তরী মহাগ্রহণ। আমার কথা মেনে মশাল হাতে জমায়েত হল অনেক সিবাতা। ওদিকে প্রথম স্তুপে আগুন লাগালো ত্রিস্নত। সেই আগুন আর অগুন্তি মশালের আলোয় আলোকিত হয়ে থাকলো প্রান্তর।

     একসময় নিয়মমতো নিষ্ক্রমণ ঘটলো মহাজাগতিক মহাকায় এর। এপিলুর আলো আবার ফিরে এলো রাজমের ওপর। সিবাতারা চেঁচিয়ে উঠলো উল্লাসে। রাজমে এই ঘটনা প্রথম ঘটলো। মহাকাশের বুকে একটি অনুন্নত সভ্যতা এক ঝটকায় এগিয়ে গেল অনেকটাই।

     ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার বেশ কয়েক দিন পরে সিদ্ধান্তটা নিয়েছি। আর কিছু পারি বা না পারি গ্রহান্তরী এই যমজ পৃথিবীর সভ্যতাকে আমার জ্ঞান বুদ্ধি মতো কয়েক ধাপ এগিয়ে দেব। তবে এক ঝটকায় হবে না। আগে আরো বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। যতই হোক এরাও তো মানুষ। ভাল করেই জানি স্বভাবগতভাবে যারা কখনই কারো অত্যধিক নাকগলানো সহ্য করতে পারে না।

     মধ্যযুগ পেরিয়ে এবার ওদের যাত্রা শুরু সামনের দিকে। যে পথে সাহায্য করবো আমি। আকাশ বসু। হয়তো এভাবেই আমার পৃথিবীর কোনও আদিম সভ্যতাকে এগিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন গ্রহান্তরের কোন সভ্য মানুষ।

     উন্নত সিবাতারা যখন নতুন লোক কাহিনী লিখবে তখন হয়তো আমার নবজন্ম হবে কল্পনার সহযোগিতায় একজন দেবতা রূপে যে নেফালিমকে হারিয়েছিল।

লেখকের কথাঃ আমার একজন অতি প্রিয় কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভ। যে গল্প তাকে প্রথম খ্যাতি এনে দিয়েছিল তার নাম ‘নাইটফল’। সেই গল্পের মূল সুত্রটি নিয়ে এই গল্পটি লিখেছিলাম প্রায় বছর দশেক আগে প্রিয় লেখককে শ্রদ্ধা অর্ঘ্য জানানোর ইচ্ছে নিয়ে। কিন্তু কোথাও পাঠাতে পারিনি কেমন একটা সঙ্কোচের বশে। “কল্পবিশ্ব” সেই লেখা প্রকাশ করে আজ আমায় চিরকৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করিল। 

3 thoughts on “একজন দেবতার দিনলিপি

  • July 30, 2017 at 8:25 am
    Permalink

    আমাদের গ্রহে সভ্যতা বিকাশের জন্য ও মনে হয় একই ঘটনা ঘটেছে ; যাদের আমরা দেবতা বলি তারাই প্রকৃত ভাবে ভিনগ্রহি জীব।।।খুব ভালো কল্পবিজ্ঞান এর গল্প ;আরও চাই

    Reply
  • August 3, 2017 at 5:33 am
    Permalink

    বেশ ভাল লাগল। আরও লেখা চাই।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *