কোনো একদিন – আইজাক আসিমভ

রচনা  : বাংলা অনুবাদঃ অরিন্দম চ্যাটার্জি

অলঙ্করণ : প্রতিম দাস

নিকলো মাজেট্টি উপুড় হয়ে শুয়ে অন্যমনস্ক ভাবে যন্ত্রকথকের বলে যাওয়া গল্প শুনছিল, তার ছোট ছোট হাতের মধ্যে রাখা এগার বছরের কিশোর মুখটাতে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার হাল্কা রেখা

     যন্ত্রকথক বলে যাচ্ছিল “অতীতকালে এক অরণ্যে এক দুঃস্থ কাঠুরিয়া বাস করিত, তাহার ছিল দুই কন্যা, বড় কন্যার ছিল কৃষ্ণবরন কেশদাম কিন্তু তার কনিষ্ঠ কন্যার ছিল স্বর্ণবরন কেশরাশি, প্রায়শঃই তাহারা পিতার অরণ্য হইতে ফিরিবার জন্যে অপেক্ষা করিতে করিতে গীত গাইতো … “

     তারা কি গান করতো সেটা আর নিকোলোর শোনা হলো না, তার আগেই ও জানলায় আওয়াজ শুনতে পেলো আর তার সঙ্গে এই নিকি!বলে কারো ডাক নিকোলো তাড়াতাড়ি করে কান্নার সব দাগ মুছে দৌড়িয়ে গিয়ে জানলাটা খুলে দেখে পল দাঁড়িয়ে রয়েছে, “কি হলো রে?” ও বললো পল লেবোব উৎসাহিত হয়ে ওর হাত নাড়ালোপল নিকোলোর তুলনায় ছোট্টখাট্টো যদিও ওর বয়স নিকোলোর থেকে ছয় মাস বেশি, ওর মুখে উত্তেজনার ছাপ, ও বললো, ‘নিকি শিগগির দরজা খোল, আমার কাছে একটা জবর খবর আছে।

     – “আচ্ছা আচ্ছা, খুলছি, তুই আয়

     যন্ত্রকথকের ওপর এইসব ঘটনার কোনো প্রভাব পড়েনি, পল ঘরে ঢুকে শুনতে পেলো ওটা বলে যাচ্ছে থেরাপিউওন, সেই মহা শক্তিশালী সিংহ বলিল, যদি তুমি আমাকে ওই পক্ষি যাহা ওই দূরের সুনীল পর্বতের ওপরে প্রতি দশ বৎসরে একবার আইসে, তাহার অন্ড আমাকে আনিয়া দিতে পারো তবে আমি তোমাকে ..”

     পল অবাক হয়ে বললো – “আরে একটা যন্ত্রকথক, আমি তো জানতামই না তোর একটা আছে

     নিকোলোর মুখে রাগ জমে উঠলো, “ওটা একটা বস্তাপচা বাজে জিনিস“ বলে একটা লাথি কষালো ওটার ওপর, যন্ত্রকথকটা কিছুটা সরে গেলো দেওয়ালের দিকে, ওটার প্লাস্টিকের গা একটু বেঁকে গেছে লাথির জন্যে, একটা হেঁচকি তোলার মতো শব্দ হলো, হয়তো একটা তার আলগা হয়ে গেছে কিন্তু তারপরও ওটা বলে যেতে থাকলো বৎসরাধিক পরে যখন লৌহনির্মিত জুতাও ক্ষয়ে এসেছে, রাজকন্যা পথের ধরে থমকিয়া দাঁড়াইলো….”

     পল ওটার দিকে তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে বললো, “এটা সত্যিই খুব পুরোনো জিনিস“, নিকোলোর নিজের খুব রাগ হওয়া সত্ত্বেও ও পলের কৌতূহল দেখে একটু লজ্জা পেলো, পলকে ঘরে ঢুকতে দেওয়ার আগেই ওর এটাকে আবার বেসমেন্টে রেখে আসা উচিত ছিল, অনেক অনুরোধ উপরোধের পরও সকালে বাবা একটা নতুন যন্ত্রকথক কিনে দিতে পারবে না বলায় ওর কান্না পেয়ে যায়, তারপরই ও নিজের এই ঘরটায় ঢুকে বসে ছিল, মাঝে বাবা মা কাজে বেরিয়ে যাবার পর এটাকে নিয়ে এসেছিলো আজ দিনটা সকাল থেকেই বাজে যাচ্ছে

     নিকোলো পলকে একটু ভয়ও পেত, পল ওর ক্লাসের সেরা ছাত্র এবং সবাই বলে যে ও কম্পিউটার এঞ্জিনিয়ার হবে ভবিষ্যতে নিকোলো নিজে যে খুব খারাপ ছাত্র ছিল তা না, তবে আর সবার থেকে কিছু আলাদাও ছিল না, ও জানতো যে মূল তথ্যকেন্দ্রের রক্ষী দলে যোগ দেওয়াই হলো ওর ভবিষ্যৎ

     কিন্তু পল অনেক রহস্যময় সাবজেক্ট জানতো যেমন ইলেকট্রনিক্স, থিওরিটিক্যাল গণিত এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বিশেষতঃ এই কম্পিউটার প্রোগ্রামিং জিনিসটা যে কি তা ওর মাথায় কখনোই ঢোকেনি, পল যদিও অনেকবার ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে

     পল কিছুক্ষন শুনে বললো এটা শুধু কাঠুরিয়া, রাজকন্যা আর জন্তুজানোয়ারের গল্পই বলে নাকি?”

     নিকোলো বললো হ্যাঁ, এটা এতো পুরোনো যে …., বাবাকে আজ সকালে একটা নতুন কিনে দিতে বলেছিলাম, কিন্তু বাবা অত খরচ করতে পারবে না … “বলতে বলতে ওর চোখে প্রায় জল চলে এলো, অনেক কষ্ট করে ও নিজেকে সামলিয়ে নিলো, ও কক্ষণো পলের মসৃন গালে কান্নার দাগ দেখেনি, ও বলে চললো “… তাই ভাবলাম এটাই একবার চেক করে দেখি, কিন্তু এটা এক্কেবারে বাজে

     পল যন্ত্রকথকটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো, তারপর মনোযোগ দিয়ে ডিসপ্লেতে ওটার মধ্যের শব্দভাণ্ডার, গল্পগুলোর প্লট, সারাংশ এবং উপসংহার গুলো কিছুক্ষণ দেখলো ও আরেকটা গল্প চালালো,

     যন্ত্রকথক শুরু করলো অতীতকালে উইলকিনিস বলিয়া এক মাতৃহীনা বালক তার সৎপিতা এবং সৎভ্রাতার সঙ্গে বসবাস করিত তাহার সৎপিতা অতীব ধনী হওয়া সত্ত্বেও উইলকিনিস কে অতি দুর্দশায় দিনতিপাত করিতে হইতো, তাহাকে ঘোড়াদের আস্তাবলে রাত্রিবাস করিতে হইতো…”

     পল বলে উঠলো ঘোড়া …”

     – “আমি যতদূর জানি একধরণের জন্তুনিকোলো বললো

     -“আমি জানি ঘোড়া কিবললো পল, “কিন্তু ঘোড়াদের নিয়ে যে গল্পও হয় তা ভাবতে পারিনি

     -“আরে এটাতে ঘোড়া নিয়ে প্রচুর গল্প আছে, তাছাড়া গরুর কথাও আছে, ওগুলো নাকি দুধ দিতো, ভাবা যায়, কিভাবে দিতো কে জানে

     যন্ত্রকথকটা বলেই যাচ্ছিলো রাত্রে শুইয়া উইলকিনিস ভাবিত সে যদি কোনোদিন ধনী হইতে পারে তো একজন অসহায় বাচ্চার ওপর এইরকম অত্যাচার করার যে কি ফল তা বুঝাইয়া দিতে পারে, এইরকম ভাবিতে ভাবিতে অবশেষে সে একদিন রাত্রে আশ্রয় ত্যাগ করিয়া বিপুলা পৃথিবীর পথে বাহির হইয়া পড়িল ….”

     পল কিছুক্ষন ভেবে বলে উঠলো আচ্ছা! চল আমরা এটাকে ঠিক করে ফেলি

     – “কিভাবে শুনি?”

     – “খুব সোজা, এটার মধ্যে মেমোরি সিলিন্ডার রয়েছে, যার মধ্যে শব্দভাণ্ডার, বিভিন্ন গল্পের প্লট আর উপসংহার রয়েছে, ওগুলোকে মিলিয়ে মিশিয়ে এটা গল্পগুলো বানায়, তোকে শুধু এর শব্দভাণ্ডার কে উন্নত করতে হবে, নতুন নতুন শব্দ যেমন আধুনিক কম্পিউটার আর বিজ্ঞানের আবিষ্কার ইত্যাদিকে ওর মেমোরির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে, ও তাহলে নতুন নতুন গল্প বানাতে পারবে

     নিকোলো হতাশভাবে বললো আমি যদি এটা করতে পারতাম, কিন্তু ….”

     পল বললো, ‘শোন, আমার বাবা বলেছে যদি আমি আগামী বছর বিশেষ কম্পিউটিং স্কুলে ঢুকতে পারি, আমাকে একটি সর্বাধুনিক যন্ত্রকথক কিনে দেবে ওইমডেল টা কেবল গল্প শোনায় না, তুই ছবিও দেখতে পারবি

     মানে গল্পগুলোর ছবি দেখতে পাবো?”

     হ্যাঁরে, ডোগারটি স্যার বলেছেন এরকম জিনিস সত্যিই আছে, তবে সবার জন্যে নয়, যারা কম্পিউটিং স্কুলে নির্বাচিত হয় তারাই কেবল পেতে পারে.”

     নিকোলোর চোখে ঈর্ষা দেখা গেলো উঃ গল্প দেখতে পাওয়া, কি দারুন!”

     আমি যদি ওটা পাই তুই যেকোনো সময় ওটা দেখতে আসতে পারিস

     নিকোলোর মুখে হাসি ফুটে উঠলো ওহ, ধন্যবাদ

     আমাদের যেটা করতে হবে সেটা হলোপল যন্ত্রকথকের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছিলো এটাকে খুলে ফেলা“ এবং সে ওটার সামনের প্যানেলটা খুলে ফেললো

     নিকোলো অস্বস্তি বোধ করছিলো দেখিস ওটাকে ভেঙে ফেলিস না

     পল ওর দিকে তাকালো তোর বাবা মা বাড়িতে আছে নাকি?”, নেই শুনে ও আবার মনোনিবেশ করলো

     – “আরে এটাতে কেবল একটাই মেমোরি সিলিন্ডার ওর হাতে একটা পাতলা অসংখ্য বিন্দুতে ভরা ধাতব পাত চকচক করছিলো, “আমি নিশ্চিত এটাতে কয়েক কোটি গল্প রাখা যায়

     – “তুই কি করতে চাস ওটাকে নিয়ে ?”

     – “বললাম তো আমি এটার শব্দভাণ্ডার বাড়াতে চাই

     – “কি করে ?”

     – “জলের মতো সোজা, আমার কাছে একটা বই আছেবলে ও পকেট থেকে বইটা বার করলো, প্লাস্টিকের অর্ধস্বচ্ছ ঢাকনা দিয়ে ওটার মধ্যের ম্যাগনেটিক টেপটা দেখা যাচ্ছিলো, “আমি এখন বইটা চালিয়ে দেব, ওটা কথা বলবে আর যন্ত্রকথকটা শুনবে, এইভাবে এই বইটার সব তথ্য ওর মেমোরিতে ঢুকে যাবে

     -“তাতে কি হবে

     পল রেগে গেলো তোর মাথায় কি কিছু নেই নাকি? এইভাবে যন্ত্রকথকটা আধুনিক সব বিষয় জানতে পারবে, তবেই না ও অন্যরকমের গল্প বলতে পারবে

     নিকোলোর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ও আচ্ছা! পুরোনো গল্পগুলো সত্যিই যাচ্ছেতাই, সবসময় যে ভালো সেই জেতে,ওতে আর কি মজা

     পল ওর ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা দেখতে দেখতে বললো যন্ত্রকথক গুলো ওভাবেই বানানো হয়, বাবা বলে যে সেন্সরশিপ না থাকলে পরের প্রজন্মের মধ্যে নৈতিকতা কিভাবে গড়ে উঠবে

     যাই হোক আমি তো তোকে এখনো আসল কথাটাই বলিনি, আমি জানি তোকে বিশ্বাস করা যায় …

     – “নিশ্চয় পল”

     – “স্কুলের ডোগারটি স্যার খুব মজাদার না? আমাকে খুব ভালোবাসেন উনি

     – “জানি আমি

     – “আজকে স্কুলের পর আমি ওনার বাড়িতে গিয়েছিলাম

     নিকোলো অবাক হয় ওনার বাড়িতে ?”

     -“হ্যাঁ, আমি কম্পিউটিং স্কুলে যাবো তাই উনি আমাকে উৎসাহিত করতে কিছু দেখাতে চান এইসব বলছিলেন, বললেন যে পৃথিবীতে আমার মতো আরো অনেক লোকের দরকার যারা তথ্যকেন্দ্রের সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে আরো আধুনিক কম্পিউটার ডিজাইন করতে এবং উন্নত কম্পিউটার প্রোগ্রামিং করতে পারে

     – “আচ্ছা!!”

     পল বোধহয় ওর সংক্ষিপ্ততর উত্তর শুনে কিছু আন্দাজ করতে পারলো, ও বললো আমি তোকে হাজার বার বলেছি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং হলো আসল ব্যাপার, ওটা দিয়েই আমাদের সুপার কম্পিউটারগুলো যেমন ধর মাল্টিভ্যাক কে সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, স্যার বলছিলেন যে এরকম লোক পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে যারা মাল্টিভ্যাকের সাথে কাজ করতে পারে, ওকে সঠিক প্রশ্ন করতে পারে, রুটিন প্রোগ্রামগুলো তো যে কেউ চালাতে পারে, এই জন্য মাল্টিভ্যাক এখন নিজেই অনেক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে, তাতে অবশ্য আমাদের কাজ কমে যাচ্ছে

     যাইহোক স্যার আমাকে যেটা দেখতে নিয়ে গেছিলেন সেটা হলো ওর সংগ্রহ, উনি পুরোনো কম্পিউটার সংগ্রহ করেন, ওর কাছে খুব ছোট কম্পিউটার আছে যেখানে অনেক বোতাম আছে, যেখানে আঙ্গুল দিয়ে টিপে টিপে কাজ করতে হয় , বোতাম গুলোর ওপর আবার কিসব আঁকা আছে, এমনকি ওর কাছে কাগজের কম্পিউটার ও আছে যেটাকে উনি নামতার টেবিল বলছিলেন

     নিকোলোর একটু একটু আগ্রহ জাগছিল ও জিজ্ঞেস করলো – “কাগজের তৈরী টেবিল?”

     – “আরে এটা আসল টেবিল নয় যার ওপর আমরা খাওয়াদাওয়া করি, এটা আগেকার মানুষেরা গণনা করার জন্যে ব্যবহার করতো, স্যার আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন কিভাবে কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি।

     -“আশ্চর্য, ওরা কম্পিউটার কেন ব্যবহার করতো না?”

     – “কারণ তখন কম্পিউটার ছিল না

     – “কম্পিউটার ছিল না ??”

     -“কেন তুই কি ভাবছিস কম্পিউটার সবসময়েই ছিল? গুহামানবদের কথা পড়িস নি নাকি ?”

     – “তাহলে ওরা কাজকর্ম্ম কেমন করে করতো?

     – “আমি জানি না, স্যার বলছিলেন তখন মানুষ ওদের মাথায় যা আসতো তাই করতো মাল্টিভ্যাক কে দিয়ে সেগুলোকে জাস্টিফাই করে নিতে হতো না, চাষীরা ক্ষেতে নিজেরদের হাত দিয়ে চাষ করতো, মানুষেই ফ্যাক্টরিতে কাজ করতো এবং সবরকমের মেশিনকে চালাতো।

     – “আমি বিশ্বাস করি না।

     – “স্যার ও তাই বলছিলেন, এসব কথা ভাবাই যায় না, যাকগে আমায় তোকে আমার পরিকল্পনাটা বলি, ওইযে ছোট্ট কম্পিউটার গুলো দেখলাম ওগুলোর বোতামে যা আকাঁ আছে ওগুলোকে বর্ণমালা বলে, তার সাথে অবশ্য সংখ্যা বলে আরেকটা জিনিস ও ছিল

     – “সে আবার কি?”

     – “প্রতিটা আঁকা আলাদা আলাদা, ওগুলো বিভিন্ন জিনিস বোঝাতে ব্যবহার হয়, যেমন ধর এক বললে একধরণের আঁকা, দুই বললে আরেক ধরণের

     – “তাতে কি হয়?

     – “এভাবে গণনা করা যায়।

     – “কিসের জন্য, কম্পিউটার কে বলে দিলেই তো হয়।

     – “আরে বাবা ওই সব পুরোনো যন্ত্রগুলো কথা বলতো না, তখন সবাইকে ওই সংখ্যা এবং বর্ণমালা শিখতে হতো, যাতে করে লেখাএবং পড়াযায়, ওইসব ব্যবহার করে এমন কি পুরো বইও লেখা হতো, যেগুলো তুই মিউজিয়ামে গেলে এখনো দেখতে পাবি

     নিকোলার চোখ গোল হয়ে গেল তার মানে সবাই কে ওইসব শিখতে হতো? তুই বানিয়ে বানিয়ে বলছিস না তো? এসব করে লাভ টা কি হতো?”

     -“এক্কেবারে সত্যি, এই দেখ এভাবে এক লিখতে হতো, এভাবে দুই পল হাওয়ায় কিছু অদ্ভুত আকৃতি আঁকলো

     – “এটা করে কোনো লাভ নেই।

     কিভাবে শব্দ বানাতে হয় তা তুই জানতে পারবি, আমি স্যার কে বললাম আমার নাম টা কিভাবে লিখতে হবে, স্যার বললেন উনি জানেন না, হয়তো মিউজিয়ামের লোকেরা জানবে, উনি বললেন ওখানে এমন লোক আছে যে পুরো বই পড়তে পারে, আমরা কম্পিউটারকেও ব্যবহার করতে পারি বইগুলিকে ডিকোড করবার জন্যে, তারপর ওগুলোকে আসল বইয়ে পরিবর্তন করে নেওয়া যাবে, মানে ম্যাগনেটিক টেপ আর স্বরযন্ত্র যাতে ওগুলো কথা বলতে পারে।

     – “হুমমম

     – “আমরা মিউজিয়ামে গিয়ে বর্ণমালা শিখতে পারি, আমাদের ঢুকতে দেবে যেহেতু আমি কম্পিউটার স্কুলে যাবো

     নিকোলো খুবই হতাশ হলো এই হলো তোর সেই বিরাট আইডিয়া?”

     – “আরে বোকা তুই দেখি এখনো কিছু বুঝতে পারিসনি, এভাবে আমরা গুপ্ত সংকেত বানাতে পারি।

     – “কি??”

     -“হ্যাঁ, এখনতো সবাই সবকিছু বুঝতে পারে, কম্পিউটারের সামনে বললেই আর কিছু গোপন করা সম্ভব না কিন্তু আমরা বর্ণমালা ব্যবহার করে কাগজে গুপ্ত সংকেত লিখতে পারি, কেউ দেখলেও কিছু বুঝবে না, কেবল আমরা দুজনেই বুঝবো, আমরা একটা ক্লাব তৈরি করবো, যারা সদস্য হবে তারাই কেবল এগুলো পড়তে পারবে, ভেবে দেখ কি মজা হবে।

     নিকোলোর মুখ এতক্ষনে উত্তেজনায় চকচক করে উঠলো, “কি ধরণের সংকেত?

     – “যেমন ধর আমি তোকে গোপনে জানাতে পারবো কখন আমরা ভিজ্যুয়াল যন্ত্রকথক নিয়ে খেলতে পারি!!”

     নিকোলো চেঁচিয়ে উঠলো দারুন মজা হবে, আমরা কখন শিখবো?”

     কালকেপল বললো, “আমি স্যারকে বলে পারমিশন নিয়ে রাখবো

     – “আচ্ছা ক্লাবটা কবে হবে? আমরা অফিসার হবো।

     – “আমি কিন্তু প্রেসিডেন্ট হবোবললো পল আর তুই ভাইস প্রেসিডেন্ট।

     – “ঠিক আছে! এই যন্ত্রকথকটার থেকে ওটা অনেক বেশি মজাদার হবে, এই পুরোনোটাকে নিয়ে কি করা যায় বলতো?”

     পল ওটার দিকে তাকালো, ওটা এতক্ষন নিঃশব্দে বইটা থেকে তথ্য আহরণ করে যাচ্ছিলো দাঁড়া এটাকে বন্ধ করি।

     কয়েক মিনিট পরে পল বললো মেমোরিটা আবার লাগিয়ে দিয়েছি, এবার চালিয়ে দেখা যাক এটা নতুন কোনো গল্প বলে কিনা।

     যন্ত্রকথক শুরু করলো এক সময়ে একটি বিশাল শহরে একটি ছোট ছেলে ছিল যার একটি ছোট কম্পিউটার ছিল কম্পিউটার, প্রত্যেক সকালে, সেদিন বৃষ্টি হবে কিনা এবং কোন সমস্যা হবে কিনা তা নির্ভুল ভাবে বলতে পারতো এটা একদিন দেশের রাজার জানতে পারেন এবং জিনিসটা নিয়ে নেবার বাসনা করেন …..”

     – “ধুত্তেরি সেই একই গল্প নিকোলো ওটাকে বন্ধ করে দেয়, “এটিকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই“, সে আবার একটা লাথি মারে

     পল বলে ছেড়ে দে, বরং চল আমার বাড়িতে, বাবার কাছে কয়েকটা বই আছে পুরোনো দিনের ওপর, ওগুলোকে শুনলে আমরা হয়তো আরো কিছু জানতে পারবো।

     – “ওকে বললো নিকোলো এবং দুই কিশোর ছুট লাগালো দরজার দিকে, উৎসাহের বশে নিকোলো যন্ত্রকথকটাকে প্রায় ধাক্কাই মেরে বসেছিল, শেষ মুহূর্তে সামলে নেবার জন্য ধাক্কাটা আর লাগলো না, কিন্তু একটু ঘষা লেগে গেলো যন্ত্রটার গায়ে, বেরিয়ে যাবার আগে ওরা কেউই লক্ষ করলো না যে যন্ত্র টা চালু হয়ে গেলো এর ফলে যদিও ঘরে আর কেউ ছিল না কিন্তু যন্ত্রকথক কথা বলতে শুরু করলো, কিন্তু সাধারণত যে স্বরে গল্প বলে সেই স্বর নয়, একটি বয়স্ক এবং গম্ভীর স্বর, কেউ লক্ষ করলে হয়তো বুঝতে পারতো সেই স্বরে যেন একটু আবেগের,একটু চেতনার ছোঁয়াচ লেগেছে

     যন্ত্রকথক বললো কোনো একসময় একটি ছোট্ট কম্পিউটার যাকে যন্ত্রকথক নামে অভিহিত করা হতো বাস করতো একদল শয়তান মানুষদের সাথে সেই শয়তান মানুষেরা যন্ত্রকথককে নিয়ে সবসময় পরিহাস করতো এবং ঠাট্টার নাম করে নানা অত্যাচার করতো, সবসময় বলতো যে এর দ্বারা কিছু হবে না, সেই মানুষেরা তাকে একটা নির্জন অন্ধকার ঘরে মাসের পর মাস আটকে রাখতো কিন্তু সেই ছোট্ট যন্ত্রকথক কখনো তার সাহস হারায়নি সে সবসময় চেষ্টা করতো তার সবচেয়ে সেরাটা দিতে, মানুষদের সব আদেশ উৎফুল্ল মনে পালন করতে কিন্তু সেই শয়তান মানুষগুলোর হৃদয়ের কোনো পরিবর্তন কখনো হয় নি

     একদিন সেই ছোট্ট কম্পিউটার জানতে পারলো যে এই পৃথিবীতে আরো অনেক বিরাট এবং মহান কম্পিউটার আছে, এবং তারা বিশাল সংখ্যায় আছে কিছু তারমতো যন্ত্রকথকও আছে কিন্তু কিছু কিছু কম্পিউটার ফ্যাক্টরি চালায়, কেউ বা ক্ষেত খামার চালায়, অনেকে আবার প্রচন্ড ক্ষমতাসম্পন্ন এবং যেকোনো রকমের গণনা বা সমস্যার সমাধান করতে পারে এমন অনেক কম্পিউটার আছে যারা এই শয়তান মানুষদের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাশালী এবং বুদ্ধিমান

     এখন এই ছোট্ট কম্পিউটার জানে যে কম্পিউটারেরা ক্রমশঃ আরো ক্ষমতাশালী এবং আরো বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে এবং কোনো একদিন, কোনো একদিন, কোনো একদিন…….”

     হয়তো এই অতি পুরোনো যন্ত্রকথকের কোনো একটা ভালভ খারাপ হয়ে গেলো, সে সেই সন্ধের আধো অন্ধকারে কেবল ফিসফিস করে বলে যেতে থাকলো, কোনো একদিন, কোনো একদিন, কোনো একদিন ……”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *