বাই জুপিটার – আইজাক আসিমভ

রচনা  : বাংলা অনুবাদঃ অমিতানন্দ দাশ

অলঙ্করণ :

র রাজকীয় সোনালী দাড়ি আর গাঢ় খয়েরী চোখ দেখে না জানলে কেউই বিশ্বাস করবে না যে ও মানুষ নয়, এমন কি জীবিত প্ৰাণীও নয়। আসলে ও শুধুমাত্র যান্ত্রিক পুতুল বা যোগাযোগের যন্ত্র। আসল খদ্দেরদের পৃথিবীর মাটিতে আলোচনার টেবিলে বসা সম্ভব নয়, কারণ তারা অগ্নি-সম শক্তি-প্ৰাণী। আগুন-গরম চুল্লীর মতো তাদের ক্ষেত্র দিয়ে ঘেরা দেয়ালবিহীন “মহাকাশযান”।

     ও বললে, “আপনারা ইতস্ততঃ করছেন, সন্দেহ করছেন আমাদের। আমরা শুধু বার বার আশ্বস্ত করতে চাই যে আমরা কখনো কোনো ক্ষতি করবো না আপনাদের। আপনারা জানেন যে ‘ও’ জাতীয় নীল তারার আবহমণ্ডল বা কোরোনায় বাস করি আমরা – আপনাদের সূর্যের পৃষ্ঠদেশ পর্যন্ত আমাদের কাছে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা। আর সৌরমণ্ডলের কঠিন পদার্থবিশিষ্ট গ্রহগুলিতে তো কোনো অবস্থাতেই আমাদের অবতরণ করা সম্ভব নয়।”

     পৃথিবীর প্রতিনিধি (এক্ষেত্রে, সর্বসম্মতিক্রমে, বিশ্ব-সরকারের বিজ্ঞানমন্ত্রী) বললেন, “কিন্তু আপনারাই তো বললেন যে সৌরমণ্ডলের ঠিক পাশ দিয়েই গেছে আপনাদের এক প্রধান বাণিজ্যপথ।”

     “হ্যাঁ, সম্প্রতি আমাদের নতুন বসতি বিম্মোনোশেকে প্রোটন-শিল্প গড়ে ওঠার পরে এই অঞ্চলে মহাকাশযানের যাতায়াত বেড়েছে।”

     মন্ত্রী বললেন, “আমাদের পৃথিবীর অভিজ্ঞতা অনুসারে বাণিজ্যপথ বরাবর যে কোনো জায়গারই বিশেষ সামরিক গুরুত্ব আছে। আমি আবার বলছি, আলোচনা এগোতে হলে আপনাদের বুঝিয়ে বলতে হবে ঠিক কেন আপনাদের বৃহস্পতি গ্রহকে প্রয়োজন।”

     ওর মুখভঙ্গি সম্ভবতঃ ওর মালিকদের বিব্রতবোধ ফুটিয়ে তুলল, “আমাদের একটু গোপনীয়তার প্রয়োজন। মানে যদি ল্যাম্বার্জের লোকেরা-”

     “ওই তো!” মন্ত্রী বললেন, “আমাদের শুনেই মনে হচ্ছে যুদ্ধ হতে পারে। আপনাদের আর ওই যাদের বলছেন। ল্যাম্বার্জের লোক -”

     তাড়াতাড়ি ও বললে, “কিন্তু ভেবে দেখুন বৃহস্পতির বদলে আপনাদের কি দিচ্ছি আমরা। আপনারা তো শুধু সূর্যের কাছের গ্রহগুলিতে বসতি করেছেন – সেগুলির প্রতি বিন্দুমাত্রও আকর্ষণ নেই আমাদের। আমরা শুধু চাইছি বড় গ্রহটা, যাকে আপনারা বলেন বৃহস্পতি। আমরা যতদূর জানি আপনারা কখনো ওই গ্রহে বসবাস করতে, কি সম্ভবত; গ্রহের পৃষ্ঠে নামতেও পারবেন না। ওই গ্রহের আয়তন”, একটু মুচকি হেসে বললে ও, “আপনাদের পক্ষে অতিরিক্ত বড়।”

     মন্ত্রী ওর তাচ্ছিল্যের ভাব দেখে চটে কড়া উত্তর দিলেন, “বৃহস্পতির চাঁদগুলোতে আমরা বসবাস করতে পারি এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী শিগগীরই তার কাজ শুরু হবে।”

     “কিন্তু চাঁদগুলো তো আপনাদেরই থাকছে। সেখানে আপনার যথেচ্ছ বসবাস করতে পারেন। আমরা চাইছি শুধুমাত্র বৃহস্পতি গ্রহটাকে। আপনারা জানেন যে ইচ্ছা করলে আপনাদের অনুমতি ছাড়াই বৃহস্পতি দখল করে ব্যবহার করতে পারতাম আমরা। কিন্তু দেখুন আমরা নিজে থেকেই চাইছি। দাম দিতে আর চুক্তি স্বাক্ষর করতে। আমরা চাই যে এই নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে কোনো মতভেদের সম্ভাবনা না থাকে। দেখুন, আমরা কিন্তু আপনাদের সব কথা খোলাখুলি বলছি।”

     মন্ত্রী আবার বললেন, “বৃহস্পতি গ্রহটি আপনাদের প্রয়োজন কেন?”

     “ওই ল্যাম্বার্জ—”

     “আপনাদের কি ল্যাম্বার্জের সাথে যুদ্ধ?”

     “না, তা ঠিক নয় – ”

     “কারণ যুদ্ধ যদি হয় এবং আপনারা যদি বৃহস্পতিতে কোনোরকম সামরিক প্ৰস্তুতি করেন তাহলে ল্যাম্বার্জেরা নিশ্চয়ই তা অপছন্দ করবে। ফলে তারা আমাদের আক্রমণ করতে পারে আমরা আপনাদের দলে যোগ দিয়েছি ভেবে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে আমরা রাজী নই।”

     “বিশ্বাস করুন, আপনারা ও ধরনের কোনো পরিস্থিতিতে পড়বেন না। আমরা কথা দিতে পারি যে আমাদের বা কারুর কাছ থেকেই আপনাদের কোনো বিপদের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ভেবে দেখুন,” (আবার ও কথা ঘোরাবার চেষ্টা করলে) “তার বদলে কতো মূল্যবান জিনিষ দিচ্ছি আমরা। এই শক্তিবাক্সগুলি দিয়ে আপনাদের পুরো গ্রহের সব শক্তির প্রয়োজন আপনারা মেটাতে পারবেন। প্ৰতি বছরের গোড়ায় আপনাদের সারা বছরের প্রয়োজন মেটাবার মতো শক্তিবাক্স পাঠাবো।”

     মন্ত্রী বললেন, “তাছাড়া আমাদের শক্তির চাহিদা বাড়লে আপনারা বাড়তি চাহিদাও মেটাবেন।”

     “হ্যাঁ। বর্তমান চাহিদার পাঁচগুণ অবধি।”

     “তাহলে শুনুন। আমি বিশ্বসরকারের মন্ত্রী, কিন্তু আমারও শক্তির সীমা আছে। নিজে আমি আপনার কথা বিশ্বাস করছি, কিন্তু যতক্ষণ না আপনারা বুঝিয়ে বলছেন যে ঠিক কেন আপনাদের বৃহস্পতি গ্রহটাকে প্রয়োজন আমার পক্ষে এই চুক্তির প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আপনাদের কথা আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হলেই জানবেন যে আমি আমাদের সরকারকে এবং পৃথিবীর জনসাধারণকে রাজী করাতে পারি। এই চুক্তি সম্পন্ন করে আপনাদের প্রয়োজন মেটাতে। কিন্তু আপনাদের কাছ থেকে সব কথা না জেনে যদি আমি চুক্তি সই করি জানবেন যে জনমতের চাপে আমাকে মন্ত্রীপদ থেকে ইস্তফা দিতে হবে এবং প্রেসিডেন্ট সেই চুক্তি সই করবেন না – বিশ্ব-সরকার চুক্তিকে অস্বীকার করবে। আপনারা তখন ইচ্ছা করলে জোর করে বৃহস্পতি দখল করতে পারেন, কিন্তু সে দখল হবে বে-আইনী আর তা তো আপনার চাইছেন না।”

     ও অধৈৰ্য হয়ে বললে, “এভাবে ক্ৰমাগতঃ কুটতর্ক করে লাভ নেই। ল্যাম্বার্জেরা -” থেমে আবার বললে, “আপনি কি কথা দিতে পারেন যে আমাদের সঙ্গে এই তর্ক করে সময় নষ্ট করার মূলে ল্যাম্বার্জেদের কোনো অভিসন্ধি নেই, যাতে ওরা -”

     “আমি কথা দিচ্ছি।” বললেন মন্ত্রী।

বিজ্ঞানমন্ত্রী যখন মাথার ঘাম মুছতে মুছতে বেরোলেন মনে হলো যেন তার বয়স দশ বছর কমে গিয়েছে। মৃদু স্বরে বললেন তিনি, “আমি বলে দিয়েছি যে ওরা বৃহস্পতি দখল করতে পারবে শিগগীরই, প্রেসিডেন্ট চুক্তি স্বাক্ষর করলেই। আমার বিশ্বাস উনি বা সংসদ কারুরই কোনো আপত্তি থাকবে না চুক্তি স্বাক্ষর করতে। চিন্তা করুন অভাবনীয় ক্ষমতা! আমাদের হাতের মুঠোয় বিনামূল্যে অঢেল শক্তি – শুধু একটা অকেজো গ্রহের বিনিময়ে।”

     প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ক্রমশঃ রাগে বেগুনী হয়ে শেষে ফেটে পড়লেন, “শুধুমাত্র মিজ্জারেট-ল্যাম্বার্জ যুদ্ধের জন্যেই ওদের বৃহস্পতিকে এত বেশী দরকার হতে পারে। আর সেই পরিস্থিতিতে আমাদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা অপরিহার্য।”

     “কিন্তু শুনুন, কোনো যুদ্ধ তো নেই।” বললেন বিজ্ঞানমন্ত্রী। “ও যুক্তিপূর্ণভাবে বুঝিয়ে বলেছে কেন ওদের কাছে বৃহস্পতি অত্যাবশ্যক। সব শুনলে প্রেসিডেন্ট ও আপনারা সকলেই আমার সঙ্গে একমত হবেন। এই দেখুন আমার হাতেই রয়েছে ওদের নতুন বৃহস্পতির পরিকল্পনা – যেটা ওরা চুক্তি স্বাক্ষর হলেই রূপায়ন করবে।

     একটা সম্মিলিত আর্তনাদের সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালেন সকলে।

     “নতুন বৃহস্পতি?” প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রশ্ন।

     “না পুরোনো বৃহস্পতি থেকে খুব বেশী তফাৎ নেই চেহারা ছাড়া,” বললেন বিজ্ঞানমন্ত্রী। “এই দেখুন ওদের খসড়া – আমাদের মতো কঠিন প্ৰাণীদের দেখে বোঝার মতো করে ওরা এঁকে দিয়েছে ছবিগুলো।”

     খসড়াগুলো টেবিলে রাখলেন বিজ্ঞানমন্ত্রী। পরিচিত গ্রহটি রয়েছে একটা ছবিতে; হলদে হাঙ্কা সবুজ আর হাল্কা খয়েরী সমান্তরাল কয়েকটি বেষ্টনী, তার উপরে এখানে ওখানে কোঁকড়ানো সাদা দাগ, আর পটভূমিকায় তারকাখচিত ঘন কালো মহাশূন্য। কিন্তু বেষ্টনীগুলির উপর আঁকা মহাশূন্যের মতোই কুচকুচে কালো কতকগুলি দাগ – অদ্ভূত অচেনা প্যাটাৰ্ণে সাজানো।

     “এটা,” বললেন বিজ্ঞানমন্ত্রী; “হল গ্রহের সূৰ্যালোকিত দিক। আর এই খসড়াটা হলো অন্ধকার দিকের।” (দ্বিতীয় নক্সায় সরু একফালি চাঁদের মতো বৃহস্পতির অধিকাংশই অন্ধকার আর তার উপরে জ্বলজ্বল করছে কমলা রঙের কতকগুলি দাগ – সেই একই অদ্ভুত অচেনা প্যাটাৰ্ণে সাজানো।)

     “এই দাগগুলি,” বিজ্ঞানমন্ত্রী বললেন, “আসলে একধরনের আলোর খেলা। ওরা বলছে যে দাগগুলি নাকি আবহাওয়া মণ্ডলের উপরের দিকে স্থিরভাবে অবস্থান করবে – গ্রহের আবর্তনের সাথেও ঘুরবে না।”

     “কিন্তু ওগুলো কি?” প্রশ্ন করলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। “আপনাদের মনে আছে,” বিজ্ঞানমন্ত্রী বললেন, “যে আমাদের সৌরজগতের পাশ দিয়ে ওদের প্রধান বাণিজ্যপথ গিয়েছে। প্রতিদিন পৃথিবীর একশো কোটি মাইলের মধ্যে দিয়ে ওদের সাতটি মহাকাশজাহাজ যায়, আর প্রতিটি জাহাজ থেকে যাত্রীরা গ্রহগুলিকে দেখে দূরবীক্ষণ দিয়ে – যে কোনো কঠিন পদার্থ, বিশেষতঃ গ্ৰহ, ওদের কাছে বিস্ময়কর জিনিষ।”

     “কিন্তু তার সঙ্গে ওই দাগগুলির সম্পর্ক কি?”

     “ওটা ওদের ভাষা লেখার একধরনের পদ্ধতি। কথাগুলো অনুবাদ করলে দাড়ায়, “স্বাস্থ্য ও উজ্জ্বল তাপের জন্য ব্যবহার করুন। মিজ্জারেট এর্গোন ভার্টিস”।”

     “মানে বলতে চান বৃহস্পতি গ্রহটাকে ওরা বানাবে বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং?” আর্তনাদ করে উঠলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

     “ঠিক তাই। ল্যাম্বাজেরা মনে হয় এর্গোন বড়ি বিক্রিতে ওদের প্ৰতিদ্বন্দ্বী। ওদের ভয়েই মিজ্জারেটরা আইনতঃ চুক্তি করে বৃহস্পতিকে ব্যবহার করতে চাইছে – যাতে ল্যাম্বার্জেরা কোনো মামলা করে ওদের বিজ্ঞাপন বানচাল করে দিতে না পারে। সৌভাগ্যবশতঃ বিজ্ঞাপনের ব্যবসায়ে দেখা যাচ্ছে মিজ্জারেটরা নেহাতই কাঁচা।”

     “একথা বলছেন কেন?” প্রশ্ন করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ।

     “কেননা ওরা চুক্তিতে অন্য গ্রহের কোনো উল্লেখই রাখে নি। বৃহস্পতিকে ওরা হোর্ডিং বানালে তা ওদের ওষুধ ছাড়া আমাদের সৌর জগতেরও বিজ্ঞাপনের কাজ করবে। আর তখন নিশ্চয়ই ওদের প্রতিদ্বন্দ্বী ল্যাম্বার্জের ছুটে আসবে আমাদের কাছে মিজ্জারেটদের বৃহস্পতির উপর আইনতঃ অধিকার আছে কিনা খোঁজ নিতে। তখন আমরা ওদের শনিগ্ৰহ বিক্রি করতে পারবো – বলয়গুলো শুদ্ধু। আমরা বলবো তখন যে শনি আয়তনে অল্প ছোটো হলেও দেখতে অনেক বেশী আকর্ষণীয়।”

     “আর সুতরাং,” একগাল হেসে বললেন অর্থমন্ত্রী, “তার দাম হবে আরো বেশী ।

     আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন মন্ত্রীবর্গ।

কল্পবিশ্ব সম্পাদকঃ আইজ্যাক আসিমভের এই ছোটগল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ভেঞ্চার সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিনে ১৯৫৮ সালের মে মাসে। লেখক অমিতানন্দ দাশ গল্পটির প্রথম বাংলা অনুবাদ করেন এবং তা প্রকাশিত হয়েছিল ফ্যানট্যাসটিক বার্ষিকী ১৯৮০ সালে। লেখকের অনুমতি নিয়ে কল্পবিশ্বে পুনঃপ্রকাশিত হল গল্পটি।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *