বানভাসি

রচনা  : কোবো আবে

অলঙ্করণ : শিল্পী রয় বসু

(洪水Kouzui)

নেকদিন আগের বা সুদূর ভবিষ্যতের কথা (পাঠকের যা মর্জি ভেবে নিন), এক সৎ, কপর্দকহীন কিন্তু জ্ঞানী ভবঘুরে মহাবিশ্বের রহস্য উদ্ঘাটনের উচ্চাশায় একটা নদীর ধারে নতুন গড়ে ওঠা নীলচে রঙের লঙ্গরখানার ছাদে টেলিস্কোপ বাগিয়ে বসল। স্বাভাবিক ভাবেই টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে কিছু গোদা গোদা নুড়ি পাথরের অর্থহীন ছোটাছুটি আর হরতাল বা অবরোধে আটকানো ট্রেনের চাকার মত  কিছু মুখপোড়া তারার একবগগা স্থির অবস্থান ছাড়া আর কিছুই তার চোখে পড়ল না। তাও এসব দেখতে তার বেশ লাগছিল। কিন্তু হঠাৎ মনের খেয়ালে বা হয়ত দৈবাৎ-ই সে তার টেলিস্কোপের মুখ নিচে মাটির দিকে ঘোরালো। অমনি একটা পিচ বাঁধানো রাস্তার ছবি তার নাকের ডগায় এসে উল্টো হয়ে ঝুলে রইলো। আর সেই উল্টোনো রাস্তায় একটা অচেনা শ্রমিক এসে উল্টো হাঁটতে শুরু করল। একগাল হেঁসে ভবঘুরে মশাই মনে মনে উল্টো ছবিটা সোজা করে টেলিস্কোপের আতস-কাঁচ একটু আগুপিছু করে নিতেই টেলিস্কোপের জোরালো বিবর্ধনের গুনে স্পষ্ট দেখা গেল যে শ্রমিকটির ছোট্ট মাথাটা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। শ্রমিকটি সারা রাত কারখানায় কাজ করে সবে বাড়ি ফিরছে। কাজেই তার মাথার ভেতরে সেই মুহূর্তে হাড়ভাঙ্গা খাটনির ক্লান্তি ছাড়া আর কিচ্ছু নেই।

     খুবই ছাপোষা একটা দৃশ্য। কিন্তু কেন যেন ভবঘুরে তার থেকে টেলিস্কোপের মুখ সরাল না। একাগ্র মনে টেলিস্কোপে চোখ রেখে তার দৃষ্টি সেই শ্রমিককে অনুসরণ করতে থাকল আর ঠিক তখনই তার প্রথম চোখে পড়ল একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা। দৃশ্যপটে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটল। একটু ঝাপসা হয়ে এলো শ্রমিকের দেহ-রেখা। ভালো করে লক্ষ্য করতে দেখা গেল পা থেকে শুরু করে তরল হয়ে যেতে শুরু করেছে শ্রমিকের শরীরটা। প্রথমে অবয়ব হারিয়ে একটা কাদার তালের মত হয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল লোকটা। আর তার কয়েক মুহূর্ত পরেই দেখা গেল রাস্তার ওপরে শুধু তার পোশাক, জুতো ও টুপী পড়ে রয়েছে। সম্পূর্ণ শরীরটা তরল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে রাজপথ জুড়ে।

     তরল শ্রমিক পদার্থের স্বাভাবিক ধর্ম মেনে উঁচু জমি থেকে নিচের দিকে গড়িয়ে চলল। চলতে চলতে সে গড়িয়ে একটা গর্তে গড়িয়ে পরল। কিন্তু এর পরে যা ঘটল তাতে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভবঘুরের হাতের টেলিস্কোপ ফসকে পড়ে যাবার যোগাড় হল। তরল পদার্থের চিরন্তন ধর্মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শ্রমিকের সেই তরল শরীর সেই গর্ত থেকে বেয়ে বেয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করল। বেয়ে বেয়ে সে পথের ধারে পৌঁছে একটা বেড়ায় ধাক্কা খেয়ে একটা খোলস-বিহীন শামুকের মত সেই বেড়ার গা বেয়ে সেটা অতিক্রম করে তার উল্টো দিকে উধাও হয়ে গেল। ভবঘুরে তার টেলিস্কোপ থেকে চোখ সরিয়ে কিছুক্ষণ থমকে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরদিন সকালে সে ঘোষণা করল যে সারা পৃথিবী জুড়ে এক মহাপ্লাবন আসছে!

     চারদিকে গরীব মানুষ ও শ্রমিকদের তরলায়ন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল গণ-তরলায়ন। বড় বড় কলকারখানায় মেশিন-পত্র উৎপাদনের মাঝেই হঠাৎ থেমে যাচ্ছিল। কারখানার সব কর্মী একসাথে গলে একটা বৃহৎ তরলের ধারা দরজা, জানালা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে, ফাটক ও দেয়াল লঙ্ঘন করে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কখনো কখনো ত কারখানা জনশূন্য হয়ে যাবার পড়েও মেশিন-পত্র নিজেদের মত উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে চলতে থাকছিল, যতক্ষণ না সেগুলো বিকল হয়ে পড়ে। গন-তরলীকরণের ফলে জেলখানা বন্দি-শূন্য হয়ে পড়া বা এক একটা গোটা গ্রামের সম্পূর্ণ জনসংখ্যা গলে জল হয়ে গিয়ে ছোটখাটো বন্যার খবরে সংবাদপত্রের পাতা ভরে যেতে থাকল।

     সারা পৃথিবী জুড়ে এই মানুষের হঠাত করে গলে জল হয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রচুর বিভ্রাটও দেখা দিল। অপরাধী গলে গিয়ে সব তথ্যপ্রমাণ হারিয়ে বিভিন্ন অপরাধের মামলার সুরাহা করতে পুলিশের কালঘাম ছুটে সম্পূর্ণ আইনি ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়ার যোগার। স্বভাবতই বিভিন্ন দেশে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই সমস্যার সুরাহা করতে গোপনে বিজ্ঞানী ও পদার্থবিদদের শরণাপন্ন হল। কিন্তু পদার্থবিদ্যার সবরকম আইন-কানুন ভাঙা এই মানুষ গলা জল নিয়ে বিজ্ঞানীরা পরে গেলেন মহা ফাঁপরে। এই জল দেখতে, স্পর্শ করতে বা স্বাদে-গন্ধে সাধারণ জলের মতই। কিন্তু কখনো কখনো কোন অজানা কারণে এর পৃষ্ঠটান বেড়ে ওঠে। তখন এই বস্তু শুধু এম্যিবার মত যে কোন অনির্দিষ্ট আকার ধারণ করতে ও নিচু থেকে উঁচু জায়গায় বয়ে চলতে সক্ষম তা শুরুতেই সকলে জানা ছিল। আশ্চর্যের বিষয় এই যে এক মানুষ গলে সৃষ্ট জল অনন্য মানুষ গলা জল থকে শুরু করে সাধারণ প্রাকৃতিক জলে মিশে গেলেও কোন এক অদ্ভুত উপায়ে কোন অজানা উদ্দীপকের প্রভাবে হঠাত করে এই মানুষ গলা জল একে অপরের থেকে বা অন্য দ্রাব তরলের থেকে মুহূর্তে আলাদা হয়ে যেতেও সক্ষম। আবার অন্য একদল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করে দেখলেন যে এই জলবৎ তরলে ক্ষেত্র বিশেষে অত্যন্ত কম পৃষ্ঠটানও দেখা যায়, অনেকটা এলকোহলের মত। আর এই অবস্থায় এই তরলের ভেদ ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ফলে একই বস্তু, যেমন একটি কাগজের টুকরো, এক এক সময়ে এই তরলে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকছে ত অন্য সময়ে এতে দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে! এরকম আজব কাণ্ড দেখে বৈজ্ঞানিকদের ত মাথায় হাত পড়ল। কিন্তু বিভ্রাট এখানেই থামল না।

     দেখা গেল এই মানুষ গলা জল সাধারণ জলের মতই জমাট বেঁধে বরফ হয় আবার গরমে বাষ্প হয়ে উবেও যায়। কিন্তু যথারীতি এই সৃষ্টিছাড়া জলের কোন নির্দিষ্ট হিমাঙ্ক বা স্ফুটনাঙ্ক নেই। মেরু-অঞ্চলে অনেক জায়গা থেকে ঘোড়া, কুকুর সুদ্ধ স্লেজ গাড়ি পাথরের মত জমাট বরফে হঠাত তলীয়ে যাবার খবর এলো। শীতকালীন খেলার আসরে ত স্কি রেসের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রেস সমাপ্তি-রেখার একেবারে দোরগোড়ায় এসে হঠাত চোরাবালির মত বরফে সটান পাতাল-প্রবেশ করল। অন্যদিকে উষ্ণ অঞ্চলে হঠাত হঠাত সুইমিং পুলের জল জমাট বেঁধে পুলে সাঁতার দেওয়া লোকজন জলের মধ্যে জমে কাঠ হয়ে যাওয়ার মত ঘটনাও ঘটতে লাগল।

     কিছুদিনের মধ্যেই এই মানুষ-জলের ধারা নদী, সমুদ্রে মিশে, বাষ্প হয়ে মেঘের মধ্য দিয়ে বৃষ্টি বা তুষার হয়ে পাহাড়, বন হয়ে সারা বিশ্বে সব দেশে মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ল। ফলে পৃথিবী জুড়ে সৃষ্টি হল চরম বিভ্রান্তির। কখন কোথায় কি ঘটবে তার অজানা শঙ্কায় সিটিয়ে রইল সবাই। সমস্ত রাসায়নিক গবেষণা লাটে উঠল; বিদ্যুৎ-কেন্দ্রের বয়লার এই মানুষ-গলা জলের ধাক্কায় অচল হল; আর সবচেয়ে করুন দশা হল জলের মাছ ও ডাঙার গাছেদের, যাদের জীবনের প্রাথমিক সূত্রই হল জল। অনেক জায়গায় গাছের ফলপাকুড় আশে পাশে চলতে থাকা গান-বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে গাছ থেকে ঝড়ে পরে উদ্দেশ্যহীন ভাবে মাঠে ঘাটে গড়িয়ে বারাতে লাগল, কোথাও বা খেতের প্রায় পেকে ওঠা ফসল ফটরফট ফটরফট শব্দে পটকার মত ফেটে উঠল। তবে আসল দুর্ভোগ তখনো বাকি ছিল।

     প্রথমে যাকে বিভ্রাট মনে করা হয়েছিল, কয়েকদিনেই বোঝা গেল যে তা আসলে তার চেয়ে অনেক গুরুতর এক বিভীষিকা। সেটা বোঝা গেল যখন তখনো শরীর ধারণ করে থাকা মানুষদের ওপরে সরাসরি আক্রমণ শুরু হল এই গলে যাওয়া মানুষদের। প্রথম সরাসরি আক্রমণ এলো সমাজের উঁচুতলায় থাকা ধনী সম্প্রদায়ের ওপরে। এক সকালে এক কারখানার মালিক তার প্রাতরাশের কফির কাপে ঠোঁট ছোঁয়াতেই সরাসরি ওই কাপের তরলে ডুবে গেল। আর একজন শিল্পপতি একটা পার্টিতে একঘর লোকের চোখের সামনে এক পাত্তর হুইস্কিতে বিলীন হয়ে গেল। তবে চূড়ান্ত আতঙ্কজনক ঘটনাটা মনে হয় এক তারকা অভিনেত্রীর শুটিং চলাকালীন একফোঁটা নকল চোখের জলের মধ্যে সলিল সমাধি হওয়া। অবিশ্বাস্য হলেও এই সব ঘটনাই বাস্তবে ঘটেছিল।

     এই সমস্ত ঘটনার খবর দাবানলের মতই চারদিকে ছড়িয়ে পরল আর সঙ্গে সঙ্গে বেশীরভাগ বিত্তবান মানুষই সত্যিকারের জলাতঙ্কের শিকার হল। একজন উচ্চপদস্থ সরকারী আমলার বয়ানে –

“ যখনই আমি গেলাসে জল নিয়ে সেটার দিকে তাকাচ্ছি আমি জল দেখতে পাচ্ছি না। আমার মনে হচ্ছে আমার হাতে ধরা রয়েছে এক গেলাস বিষাক্ত কালো পোকার দল। মনে হচ্ছে এখুনি তারা আমার হাত বেয়ে মুখে উঠে আমার ঠোঁট, গালের মাংস ভেদ করে আমার গলায় তাদের বিষ ঢেলে দিতে উতলা হয়ে কিলবিলিয়ে ফুঁসছে! এই আতঙ্কের আক্রমণ আমি আর সহ্য করতে পারছি না! জল দেখলেই আমার কণ্ঠনালী রুদ্ধ হয়ে আসছে!”

যেখানে এই রকম কণ্ঠনালী রুদ্ধ হচ্ছে না সেখানে অনেক ক্ষেত্রে বয়স্ক মহিলা-পুরুষ জলের এক ঝলক দেখা মাত্র সংজ্ঞাহীন হয়ে পরছিলেন। বলাই বাহুল্য, প্রচলিত জলাতঙ্কের ওষুধ বা টিকা ব্যাবহার করে তাদের অবস্থার কোন উন্নতিই হল না।

     এই সব ঘটনার মাঝে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে এক আসন্ন অবশ্যম্ভাবী মহাপ্লাবনের কথা লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পরল। যদিও সব সংবাদ-মাধ্যমই কোনরকম প্লাবন বা বন্যার আশঙ্কা অমূলক বলে আশ্বাস-বানী প্রচার করতে থাকল আর কোন রকম গুজবে কান দেওয়ার থেকে জনগণকে বিরত হওয়ার অনুরোধ করতে থাকল।

-প্রথমত, সে বছর সারা পৃথিবীতেই আঞ্চলিক বা সামগ্রিক গড় বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক মাত্রার নিচেই ছিল।

-দ্বিতীয়ত, যে সমস্ত নদীতে বন্যা দেখা দিয়েছে বলে খবর আসছিল, সেই সব কটাই বিপদসীমার নিচ দিয়েই বইছিল।

-তৃতীয়ত, পৃথিবীতে কোনরকম ভূতাত্ত্বিক বা জলবায়ু সংক্রান্ত অস্বাভাবিকতা ধরা পরে নি।

     এই সবই নির্ভেজাল তথ্য। কিন্তু আরো নির্ভেজাল সত্য হল প্লাবন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। আর যত সরকার ও গণমাধ্যম গুলো এই সত্য কে অস্বীকার করতে চাইলো ততই জনসাধারণ এই নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠল। সকলেই বুঝতে পারছিল যে এই প্লাবন কোন স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। শেষে কিছুটা রেখেঢেকে হলেও সংবাদ মাধ্যম এই বিপদের সত্যতা মেনে নিলো। সঙ্গে প্রচারিত হল চিরাচরিত স্তোকবাক্য যে এই আজব ঘটনা গুলো নিতান্তই সাময়িক, কোন মহাজাগতিক দুর্ঘটনার ফলে এসব হচ্ছে এবং অতি শীঘ্রই পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি…।

     এদিকে মানুষ গলা জলের ধারা কিন্তু ভাসিয়ে নিয়ে চলল গ্রাম কে গ্রাম, শহর কে শহর। গ্রাম-শহরের বিত্তবান মানুষদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল এই জলের ধারাকে এড়িয়ে পাহাড়-মালভূমি গোছের উঁচু জায়গায় গিয়ে আস্তানা গাড়ার জন্য। যে সৃষ্টিছাড়া জল দেয়াল বেয়ে উপরদিকে উঠতে পারে তাদের কাছে পাহাড়ের উচ্চতা কোন বাধাই নয়, এই কথাটা তাদের অনেকের মাথায় এসে থাকলেও সেই মুহূর্তে তারা আর কোনো অন্য উপায় ভেবে পেলো না।

     অবশেষে সমস্ত দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরাও একে একে মেনে নিলো যে পরিস্থিতি সত্যিই গুরুতর।  দেশে দেশে সরকারি ঘোষণায় মানব সভ্যতাকে মহাপ্লাবনে ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচাতে বড় বড় বাঁধ ও পরিখা গরবার জন্য সব রকম ভাবে দেশের জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করা হল। লক্ষ লক্ষ মানুষকে সরকার বাধ্যতামূলক শ্রমদান কর্মসূচিতে নিয়োগ করে এই সব নির্মাণকার্যে নিয়োগ করল। সংবাদ মাধ্যমগুলো এঁদের এই মহান প্রচেষ্টা, সমগ্র মানব সভ্যতাকে বাঁচানোর জন্য সংগ্রাম ইত্যাদি প্রশস্তিতে সাজিয়ে দিলো। কিন্তু মনে মনে সরকার, জনসাধারণ বা সংবাদ মাধ্যম, সকলেই জানত যে এই মানুষ গলা জলের প্লাবনের সামনে এই সব বাঁধ, পরিখা অনেকটা কোয়ান্টাম ডাইনামিকসের ব্যাখ্যা নিউটনের গতিসূত্র দিয়ে বুঝতে যাওয়ার মত, একদমই বৃথা। তার ওপরে এই সব নির্মাণে কাজ করা শ্রমিকেরা এই সব বাঁধের ভেতরের অংশে নিজেরাই গলে জল হয়ে এইসবের কার্যকারিতার অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটাচ্ছিল।

      এই সময়ে একদল বিজ্ঞানী রাষ্ট্রপুঞ্জে প্রস্তাব রাখল যে পারমানবিক শক্তি ব্যাবহার করে মানুষ গলে সৃষ্টি হওয়া জলরাশিকে উবিয়ে দেওয়া হোক। রাষ্ট্রপুঞ্জ এই প্রস্তাবে সম্মত হলেও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে সব দেশ নানা সমস্যায় পড়ল। প্রথমত মানুষ গলে জল হওয়ার গতি চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে চলেছিল। গলে যাওয়া শ্রমিকদের জায়গা নেওয়ার মত যথেষ্ট শ্রমিক কোন দেশের কাছেই ছিল না। দ্বিতীয়ত এই গলে জল হওয়ার ঘটনা বিজ্ঞানীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পরছিল দ্রুতহারে। আর তৃতীয়ত সব দেশেই প্রচুর কলকারখানা এই মহাপ্লাবনের জলে ভেসে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই সমস্ত সমস্যার সমাধান করে কোন দেশের সরকারই প্রয়োজনীয় পারমানবিক শক্তি উৎপাদনকারী যন্ত্রাংশ বানানোর কাজ শুরুই করতে পারল না।

     এই অন্তহীন বিভীষিকার সন্মুখিন হয়ে পৃথিবী আক্রান্ত হল চরম হতাশা আর নৈরাজ্যে। আতঙ্কে জল না খাওয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ শুকিয়ে মৃত্যুবরণ করে মমিতে পরিণত হল। যারা বেঁচে রইল তাদের মধ্যেও দেখা দিল নানান মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয়।

     তবে এই চরম দুর্দিনে যখন মানুষ বিলুপ্ত হওয়ার জোগাড়, একজন মানুষ কিন্তু বেশ শান্ত ও খোশ মেজাজে ছিল। সেই মানুষের নাম নোয়া। প্রচণ্ড উদ্যমী ও আশাবাদী মানুষ এই নোয়া ছিল এই ধরনের প্লাবন ও তার মোকাবিলা করার ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ। এই বিচিত্র মহাপ্লাবনের আগাম সংকেত পেয়ে সে বিচলিত না হয়ে অনেকদিন ধরেই তার বিশাল নৌকা তৈরির কাজে মননিবেশ করল। যখনই তার মনে হত যে মানবজাতির ভবিষ্যৎ তার ও তার পরিবারের হাতে, তখনই মনে মনে সে নিজেকে মনে মনে এক অতিমানবীয় ক্ষমতার ধারক ও বাহক ভেবে আনন্দের তূরীয় স্তরে উত্তীর্ণ হত।

     বর্তমানে মানুষ গলা জলের মহাপ্লাবন দুর্দমনীয় মেজাজে নোয়ার নৌকার দিকে ছুটে চলেছে। নোয়াও প্রস্তুত। সে তার নিজের পরিবারবর্গ ও সমস্ত গবাদি পশু-পাখি সমেত নৌকায় চেপে বসেছে। কিন্তু এ কি! মানুষ গলা জলের এ কি আস্পর্ধা! তারা নোয়ার নৌকার প্রতি কোনরকম সমীহ না প্রদর্শন করে সটান তার গা বেয়ে তাদের স্বভাবসিদ্ধ অস্বাভাবিক চলনে উপরদিকে উঠে চলেছে!

-“ তফাৎ যাও, বেয়াদবের দল! জানো না এটা কার নৌকা? এটা কোনো হেঁজিপেঁজির নৌকা নয়! আমি আদি অকৃত্রিম মানব-প্রাণের রক্ষক নোয়া! দূর হও এখান থেকে!”

ক্রুদ্ধ স্বরে গর্জে উঠেছে নোয়া।

     কিন্তু নোয়ার হিসেবে একটা মস্ত বড় ভুল হয়েছে। এই গলে যাওয়া মানুষদের না আছে চেতনা না আছে শ্রবণ ক্ষমতা। আছে শুধু জলের পরিবর্তিত ধর্ম। মহাপ্লাবনই এই জলের মোক্ষ। আর কোন দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ তাদের যে আর নেই। মুহূর্তে তারা নৌকার ডেক-এ উঠে এসে নৌকার মানুষ পশু নির্বিশেষে সব প্রাণীকে গ্রাস করল। চারদিকে অথৈ জলের নিরবচ্ছিন্ন সমুদ্রের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার তোড়ে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ভেসে বেড়াতে লাগল শুধু সেই বিধ্বস্ত প্রাণহীন নোয়ার নৌকা।

     এইভাবে দ্বিতীয় মহাপ্লাবনে পৃথিবী থেকে মানবজাতি লোপ পেলো। কিন্তু যদি আপনারা সারা পৃথিবী ব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন এই সমুদ্রের তলদেশে ডুবসাঁতার দিয়ে নামতে পারেন তাহলে দেখতে পাবেন যে জলে ডুবে থাকা গ্রাম গঞ্জের পথঘাটের কোনায় কোনায় ইদানীং একটা হালকা দ্যুতিময় এই জলের থেকে ভিন্ন ধর্মী পদার্থ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সম্ভবত এই মানুষ-গোলা জল অবশেষে মানুষ-ভারে অতি-সংপৃক্ত হয়ে পড়েছে।

(সমাপ্ত)

ইংরেজি অনুবাদ – সিরো তোমুরা ও গ্রানিয়া ডেভিস 

  বাংলা অনুবাদ – সুপ্রিয় দাস                            

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *