ব্লু

রচনা  : ঋজু গাঙ্গুলি

অলঙ্করণ : দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য (চিত্রচোর)

যেহেতু পায়ের নিচে মেঝেটা সরু একফালি সাদা লিনোলিয়ামের স্ট্রিপ মাত্র, আর ধবধবে সাদা দেওয়ালটাই অর্ধবৃত্তাকারে বাঁক নিয়ে মাথার ওপরে ছাদ হয়ে গেছে, তাই রয়ের মনে হচ্ছিল, ও যেন একটা টানেলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

     সামনে পড়ে ছিল নিরাপত্তা রক্ষীটির শরীর। হাতে ব্লাস্টার থাকলেও মৃত্যুকে সে ঠেকাতে পারেনি। শুধু তাই নয়, তার যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে, ক’বছরের ক্রাইম বিটের অভিজ্ঞতা নিয়েও, শিউরে উঠছিল রয়।

     বিচিত্র এই বডিস্যুট পরে হাঁটা ভীষণ কঠিন, কিন্তু তাই নিয়েও যথাসম্ভব দ্রুত পা ফেলতে হচ্ছিল ওকে। এর মধ্যেই ওর ঘাড়ের ওপর টাইট করে বসানো হেলমেট-টা ভারী হয়ে উঠেছে। কপালে জমে ওঠা ঘামের সঙ্গে ওর শ্বাসও ঝাপসা করে তুলছে হেলমেটের সামনেটা।

     কিন্তু অন্য সব অনুভূতি ছাপিয়ে উঠছে সামনে দেখা দৃশ্যের নিচের দিকে ডান কোণে লাল হরফে জ্বলতে থাকা সংখ্যাগুলো, যা বোঝাচ্ছে, ওর হাতে থাকা অক্সিজেনের পুঁজি নিঃশেষিত হচ্ছে অতি দ্রুত।

     দেখতে না পেলেও রয় বোঝে, এর থেকেও দ্রুত শূন্য-র দিকে এগোচ্ছে ল্যাবরেটরির দরজার ওপরের ডিসপ্লে-প্যানেল।

     দরজার স্লটে ডক্টর কেইন-এর কার্ডটা সোয়াইপ করতেই সবুজ হয়ে ওঠে ওপরের আলোটা। দরজাটা খুলে যায়।

     এগিয়ে যায় রয়। মোড় ঘোরামাত্র ও দেখতে পায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ফুয়াদ-কে।

     না, ওর মুখে বিকৃতির চিহ্ন নেই বটে, তবে ব্লাস্টারের তীব্র তাপ ওর বুকে একটা নিখুঁত গর্ত করে দিয়েছে।

     সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে রয়।

     এই করিডরটা সোজা, কিন্তু অনেকটা লম্বা, যার অন্য প্রান্তে দরজার পাশে দুই নিরাপত্তা রক্ষীর দাঁড়িয়ে থাকার কথা।

     হেলমেটের মধ্য দিয়ে দেখলে সবকিছু ‘টানেল ভিশন’-এর মতো করেই দেখায়, যেখানে কাছের জিনিসগুলো সবচেয়ে বড়ো, আর দূরের জিনিসগুলো ছোটো হতে-হতে প্রায় বিন্দুবৎ। কিন্তু তাতেও রয় স্পষ্ট বুঝতে পারল, দরজার পাশে যার দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল সেই রক্ষীটি এই মুহূর্তে মাটিতে পড়ে আছে।

     শুধু দরজার ওপর লাল আলোটা দপদপ করছে।

     ওই আলোর নিচে ওকে পৌঁছতে হবে, যেভাবে হোক।

     গা ঘিনঘিনিয়ে উঠলেও ফুয়াদের শরীরটা টেনেহিঁচড়ে এনে, সেটাকে দরজার সেন্সর প্যানেলের গায়ে ঠেকিয়ে রাখে রয়, তারপর আবার এগোতে থাকে।

     পিং করে একটা আওয়াজ ভেসে আসে ওর কানে। ও বোঝে, সিকিউরিটি প্রোটোকল মেনে ওর পেছনে আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল দরজাটা, যেটা খুলে ও এই করিডরে ঢুকেছিল। আপাতত সেটা ঠেকানো গেছে।

     কিন্তু আসল বিপদ, যার সঙ্গে ওর হেলমেটের ভেতরে ফুরিয়ে আসতে থাকা অক্সিজেনের, এমনকি করিডর দিয়ে এই মুহূর্তে বয়ে চলা বিষ-বাতাসের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং ল্যাবের নিচে রাখা মৃত্যুবাহী বাক্সটাই যার উৎস, তাকে কি ঠেকাতে পারবে ও?

     রয়ের মনে পড়ে, মাত্র কিছুক্ষণ আগে এই করিডর দিয়েই হনহনিয়ে হেঁটে গেছিল ও, শুধু তখন সঙ্গে ছিলেন প্রফেসর ধৃতিমান।

     

*****

“আমি জানি এই কাজটা আপনার রেগুলার ‘বিট’-এ পড়ে না প্রফেসর”, যথাসম্ভব দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বলছিল রয়, “কিন্তু তা বলে কপালটা এতখানি, আর এতক্ষণ ধরে, কুঁচকে নাই বা রাখলেন”।

     “তোমার ভাষায় যেটা ‘বিট’, আর আমার ভাষায় যেটা ল্যাবরেটরিতে নিজের কাজে ডুবে থাকা”, স্বভাবসিদ্ধ চেবানো ভঙ্গিতে বলেন ধৃতিমান, “সেখান থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে বলে আমার খারাপ লাগছে ঠিকই। কিন্তু আমার বিরক্তির আসল কারণ সেটা নয়”।

     চুপ করে যান ধৃতিমান। রয় জানে, না খোঁচালে ওঁর মুখ থেকে কথা বের করা শক্ত। তাই ও একটা টোপ ফেলে, “আপনি কি ডক্টর কেইন-এর ওপর কোনো কারণে…”

     প্রত্যাশিত বিস্ফোরণ হয় না, বরং একটু বিষণ্ণ গলায় বলেন ধৃতিমান, “কেইন, এবং ওর মতো আরো অনেকে সেই কাজটা অনেক দিন ধরেই করছে, যেটা আমাকে বহুবার করতে বলা হয়েছিল। আমি যে অফারগুলো পেয়েছিলাম, এবং পাই, সেগুলো ওদের পাওয়া যেকোনো প্রস্তাবের থেকেও লোভনীয়। কিন্তু…”

     রয় বুঝতে পারে ব্যাপারটা। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অংশে ওরা যাচ্ছে সেদিকটা বিভিন্ন ধনী ব্যক্তির শখ-আহ্লাদ মেটানো, বা কর্পোরেট সংস্থাগুলোর দেওয়া সুনির্দিষ্ট কিছুর প্রোটোটাইপ সংক্রান্ত গবেষণার জন্যেই বানানো।

     এখানে যা কাজ হয় তা থেকে সাধারণ মানুষ কোনো ভাবেই উপকৃত হয়না, কিন্তু বাজেটে কাটছাঁটের ধাক্কায় নাভিশ্বাস তোলা বিশ্ববিদ্যালয়, এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিরুপায় হয়ে এগুলো করতেই হয়।

     এটাও ভারি কাকতালীয় যে এথিক্স কমিটির তরফে ওদের দুজনকেই আজ এখানে আসতে বলা হয়েছে ডক্টর কেইন, এবং তাঁর নিজস্ব ‘প্রোডাক্ট’-কে ভালো ভাবে দেখার জন্য।

     নিজের অজান্তেই গম্ভীর হয়ে ওঠে রয়।

     একটা অসহায় নিরপরাধ প্রাণীকে এক বড়োলোকের খেয়াল মেনে গিনিপিগ বানিয়েছে লোকটা। কে জানে কী ভয়ংকর একটি হাঁসজারু বা বকচ্ছপ গোছের জিনিস দেখতে হবে এখন।

     শুধু একবার এটা প্রমাণ হোক যে প্রাণীটিকে কষ্ট দিয়ে কাটাছেঁড়া করে এই কাইমেরা বানানো হয়েছে, তারপর ও দেখবে ডক্টর কেইনের ক’বছর শ্রীঘর-বাস হয়!

     ওদের সঙ্গে ডক্টর আলি-র আসার কথা ছিল, কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে খবর আসে যে উনি আসতে পারছেন না। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছিল অবশ্য আলি-র না থাকাটা। ভদ্রলোকের কিছু-কিছু চিন্তাভাবনা এতটাই রণচণ্ডী গোছের, যে মাথা ঠাণ্ডা রেখে ব্যাপারটার গভীরে ঢোকা যেত না।

     রয় লক্ষ করেছিল, পাহাড়ের মাথায় বানানো এই বাড়ির স্থাপত্যে চেনাজানা গড়নের বদলে একটা সম্পূর্ণ অন্য রকম গঠনশৈলী অনুসৃত হয়েছে। এখানে উপবৃত্তাকার ঘরগুলো গোলাকার বা টানেলের মতো করিডর দিয়ে যুক্ত।

     কৌতূহলী চোখে ও তাকিয়েছিল ধৃতিমানের দিকে।

     দ্রুত হাঁটার ফলে হাঁফ ধরেছিল ধৃতিমানের। কিন্তু রয়ের কাছ থেকে সেটা আড়াল করার জন্য শীর্ণ চেহারাটা টানটান করে নেওয়ার ফাঁকে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে চলেন তিনি, “এখানে প্রায়ই এমন সব জিনিস নিয়ে কাজ করতে হয় যেগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে গেলে সাংঘাতিক বিপদ। তাই ল্যাবগুলো এমনভাবে বানানো, যাতে বিপদ ঘটলে সেগুলোকে দ্রুত মূল বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যায়, যতক্ষণ না বায়োহ্যাজার্ড সামলাতে পারা বিশেষজ্ঞের দল এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়”।

     ততক্ষণে ওরা পৌঁছে গেছিল ওই দরজাটার ওপাশে। আর তখনই একগাল হাসি আর হাতে একটা ট্যাব নিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে এসেছিল ওই লোকটা।

 

*****

     “রয়”, হেলমেটের ভেতরে স্পিকারটা হঠাৎই হিসহিসিয়ে ওঠে, তারপরেই ধৃতিমানের গলাটা স্পষ্ট হয়, “তোমাকে আমরা আর দেখতে পাচ্ছিনা। তুমি ঠিক আছ তো?”

     “হ্যাঁ প্রফেসর”, অমূল্য অক্সিজেন আরো কিছুটা ব্যয় করতে বাধ্য হয় রয়, “আমি মূল করিডরে এসেছি। যা আশংকা করেছিলাম আমরা, সেটাই সত্যি হয়েছে দেখতে পাচ্ছি। রক্ষীটি জীবিত নেই।

     আর ফুয়াদও এখানেই পড়ে আছে। তবে ওর অবস্থা দেখে বুঝতে পারছি, ও মারা গেছে ব্লাস্টারের আঘাতেই”।

     ও-প্রান্ত কিছুক্ষণ নীরব থাকলেও রয় কিন্তু অত্যন্ত দ্রুত নিজের কর্মপন্থা বদলানোর কথা ভাবছিল।

     প্রতিটি সেকেন্ড যেখানে মূল্যবান সেখানে হেলমেট আর বডিস্যুটের এই কম্বিনেশন ওর চলাফেরা মারাত্মক রকম আড়ষ্ট করে তুলেছে। এভাবে চললে ওর পক্ষে সময় থাকতে-থাকতে কিছু করার সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। তার তুলনায়…

     ওর মনের কথাটা সম্ভবত আন্দাজ করেছিলেন ধৃতিমান, তাই স্পিকার সরব হয়ে ওঠে তখনই, “হেলমেট খোলার কথা ভেবো না। তুমি এখনও বেঁচে আছ স্রেফ ওটার জন্যেই। ফুয়াদ, মানে যদি লোকটার নাম আসলে ওটাই হয়, এমন কোনো অস্ত্র নিয়ে এগোয়নি যা দিয়ে রক্ষীটিকে দূর থেকে মেরে ফেলা যাবে, কারণ ওর পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। কিন্তু তবুও রক্ষীটি মারা গেছে, এটা থেকে একটাই জিনিস স্পষ্ট হয়।

     ব্লাস্টারের আঘাতে মারা যাওয়ার আগেই ফুয়াদ আরো একটা ভায়াল বের করার সুযোগ পেয়েছিল। অথবা, হয়তো ব্লাস্টার থেকে বেরোনো রে যেখানে আঘাত করেছিল, ওর অ্যাপ্রনের সেখানেই ছিল ওটা।

     অর্থাৎ, ওখানের বাতাসেও এখন শ্বাস নেওয়ার অর্থ মৃত্যুকে ডেকে আনা”।

     ধৃতিমানের গলার আওয়াজটা আবছা হয়ে আসে রয়ের কানে। কান, এবং নজর স্পষ্ট করার জন্যে মাথাটা ঝাঁকানো মাত্র রয়ের মনে হয়, যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। কোনো রকমে পাশের দেওয়ালে ভর দিয়ে নিজেকে সামলায় ও, তারপর নিচের ঠোঁটটা কামড়ে দরজার দিকে এগোতে থাকে একটু-একটু করে।

আর মিনিট দুয়েকের মধ্যে ওই দরজাটা না খুললে ওদের কারো নিস্তার নেই।

 

*****

     “ডক্টর ধৃতিমান? মিস্টার রয়?” হাসিমুখে এগিয়ে এসে ওদের দিকে হাত বাড়িয়েছিল লোকটা।

     “আমি ফুয়াদ”, ওদের হাত ঝাঁকানোর ফাঁকে বলেছিল লোকটা, “যাঁর ফরমায়েশি ‘জিনিস’ দেখতে চলেছেন আপনারা, আমি তাঁরই সামান্য খিদমতগার।

     আপনারা যাতে কোনো ভাবে তাঁর সম্বন্ধে ভুল না ভাবেন, সেজন্যে তাঁকে, বা এই ‘জিনিস’ বানানো নিয়ে যেকোনো প্রশ্নর উত্তর দেওয়ার এক্তিয়ার আমার আছে। তাই আজকে আপনাদের এসকর্ট আমি, এমনটাই ভাবতে পারেন”।

     ধৃতিমানের মুখচোখের অবস্থা দেখে রয় বুঝেছিল, উপায় থাকলে এমন একটা লোকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন বলে এখনই নিজের হাত ধুতেন তিনি। রয় নিজেও অবশ্য নিজেকে সামলে রেখেছিল, কারণ যতবার ফুয়াদ ‘জিনিস’ বা প্রোডাক্ট কথাটা বলছিল, ততবারই ওর প্রবল ইচ্ছে হচ্ছিল, লোকটার মুখে একটা জোরালো ঘুষি মারতে।

     ফুয়াদ নামের লোকটা কিন্তু ওদের এই অস্বস্তি রীতিমতো উপভোগ করছিল বলেই মনে হয়। তবে কথা না বাড়িয়ে ও ‘বাও’ করে ওদের দুজনকে নিয়ে এই করিডরে ঢুকেছিল।

     ঢোকার সময়ে ওদের কোনো কার্ড সোয়াইপ, বা কি-প্যাডে পাসওয়ার্ড এন্টার করতে হয়নি। ধৃতিমান সংক্ষেপে রয়-কে বুঝিয়ে বলেছিলেন, এই দরজাগুলো শুধু ভেতর থেকে খোলে, যাতে অনুমতি ছাড়া কেউ কোনো মতেই ভেতরে ঢুকতে, বা ভেতর থেকে বেরোতে না পারে। দরজার পাশে ব্লাস্টার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা রক্ষীই শুধু পারে তার কার্ড দিয়ে এই দরজা খুলতে।

     লম্বা করিডরটা সোজা এসে একটা বাঁক নিয়েছিল, যার মুখেই ছিল আর একটা দরজা। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ওদের আসার ব্যাপারটা দেখে, এবং রক্ষীটির কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে এই দ্বিতীয় দরজাটিও খুলে যায় ভেতর থেকে।

     একটা অপেক্ষাকৃত ছোটো, কিন্তু একই রকম আকারের করিডরে এসে পড়ে ওরা, যার অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল আরো এক নিরাপত্তা রক্ষী।

     বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই ঢিলেঢালা, কিন্তু শুধুমাত্র এই একটি ল্যাব ও তার করিডরেই এই বজ্র আঁটুনি ব্যবস্থা দেখে রয় বুঝেছিল, যাঁর জন্যে কাজ হচ্ছে এখানে, সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তরফে মোতায়েন আছে এই রক্ষীবাহিনী।

     করিডরের শেষ প্রান্তে ল্যাবের দরজাটা খুলে যায় এবার। দরজায় দাঁড়িয়ে সহাস্যে ওদের অভ্যর্থনা জানান ডক্টর কেইন। অনিচ্ছাসত্ত্বেও, কেইনের ছোটোখাটো চেহারা আর হাসিভরা মুখটা দেখে তাঁর ওপর রাগটা ঠিক জমিয়ে রাখতে পারেনা রয়।

     রাগটা পুরোপুরি উড়ে গিয়ে তার বদলে একটা বিস্ময় জমা হয় ওর মনে, যখন ও বুঝতে পারে, কেইনের গলা জড়িয়ে তাঁর পিঠে লেপটে আছে একটা নীল রঙের লোমশ বল।

     না, বল নয়। কেইনের মাথার পেছন থেকে উঁকি দেওয়া বুদ্ধিদীপ্ত অথচ নরম চোখজোড়া, আর কেইনের কোমরে জড়িয়ে থাকা মোটাসোটা লেজটা দেখে রয় বোঝে, ল্যাবে ‘তৈরি’ এই প্রাণীটিকে নিয়ে ও যা-যা ভেবেছিল, তার সবই ভেঙে পড়ছে প্রশ্নোত্তর শুরু হওয়ার আগেও।

     ধৃতিমান নিজেও বিস্মিত হয়েছিলেন, তবে সেটা চাপা দেওয়ার জন্যে তিনি নিজস্ব অননুকরণীয় ভঙ্গিতে বলেও উঠেছিলেন, “যাক, নীল রঙের বাঁদর-দর্শনও হল আমার। আর কিছু বাকি রইল না তাহলে”।

     “প্রফেসর! মিস্টার রয়!”, রীতিমতো হইচই করে এগিয়ে এসেছিলেন কেইন, “মিট ব্লু”।

     কেইনের মাথার পেছনে লুকিয়ে থেকেও জুলজুলে চোখে ওদের দেখছিল বাঁদরটা। সম্ভবত কেইনের গলার আওয়াজেই ভরসা পেল ও, আর ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দিল ওদের দিকে।

     রয়ের মনে হল, যেন একটা বাচ্চার হাত ধরছে ও। নরম, শুধু তেলোটা খসখসে। বৈজ্ঞানিক-সুলভ নিঃস্পৃহ ভাব নিয়ে এই প্রাণীটিকে পরীক্ষা করা যে কতটা কঠিন হবে, সেটা ভাবার ফাঁকেই ও খুব সাবধানে বাঁদরটার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল।

     ধৃতিমান সবিস্ময়ে বাঁদরটাকে দেখছিলেন। সম্ভবত ওঁর চোখেই প্রশ্নটা আন্দাজ করেছিলেন কেইন, তাই তিনি সোৎসাহে বলেন, “নো জেন্টলমেন, ওর গায়ের এই রঙ কোনো ডাই দিয়ে করা নয়। কীভাবে আমরা এই অসাধ্য সাধন করেছি সেটা ট্রেড সিক্রেট। তবে ব্লু আমাদের কাছে এমন কোনো গিনিপিগ বা ইঁদুর নয় যাকে আমরা পরীক্ষাগারে কাটাছেঁড়া করে তৈরি করেছি। আমি আপনাদের দুজনকেই অনুরোধ করব, আপনারা ব্লু-কে খুঁটিয়ে দেখুন, ওর ওপর কোনো রকম নির্যাতন বা জোর খাটানোর নজির পান কি না।

     আমি ততক্ষণে আমার গোপন ভাঁড়ারের সীমিত মালমশলা দিয়েই আপনাদের জন্যে কফি বানাই”।

     “কিন্তু ডক্টর”, ধৃতিমানের গলার আওয়াজটা মোলায়েম হলেও জোরালো ছিল, “এই ‘ব্লু’-কে আপনি যার জন্যেই ‘বানিয়ে’ থাকুন না কেন, একটা নীল বাঁদর তাঁর কেন দরকার হল, সেটা কি কখনও জানতে চেয়েছেন?”

     “নাঃ”, একটা শ্বাস ছেড়ে উত্তর দেন কেইন, “আমি অনেক দিন আগেই জেনে গেছিলাম, কাস্টমারকে যত কম প্রশ্ন করা যায় তত ভালো”।

     ততক্ষণে, সন্তর্পণে ফুয়াদ-এর হাতে ব্লু-কে তুলে দিয়েছিল রয়। কেইন তাঁর ল্যাবে ‘কফি’ বানাতে গিয়ে পাছে কোনো বেখাপ্পা রাসায়নিক ব্যবহার করেন, তাই ও খুব খুঁটিয়ে কেইনের কাজকর্মই লক্ষ করছিল তখন। তার মধ্যেও হঠাৎ ওর মনে পড়ে সেই লোকটির কথা যে নাকি আজ তাদের এসকর্ট, “প্রফেসর, এই প্রশ্নটার উত্তর তো ফুয়াদ দিতে পারবে, তাই না?”

     ঘুরে দাঁড়িয়েই দুজনে দেখতে পায় এক অদ্ভুত দৃশ্য।

     ল্যাবের প্রায় মাঝখানে দাঁড়ানো কেইন আর ব্লু-র কাছে সেই মুহূর্তে ছিল রয়, আর তার একটু পেছনে ধৃতিমান।

     ব্লু-কে নিজের হাতের ভাঁজে শক্ত করে ধরে ফুয়াদ ততক্ষণে দরজার বাইরে চলে গেছে, এবং পায়ে-পায়ে পিছিয়ে যাচ্ছে করিডরের অন্য দিকের দরজাটার দিকে।

     হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন কেইন, “লোকটা কে?”

     “লোকটা বলেছিল যে ও নাকি আপনার এমপ্লয়ার-এর প্রতিনিধি”, ধৃতিমান বলে ওঠেন, “তবে এখন বুঝতে পারছি, পরিচয়টা মিথ্যে ছিল”।

     “ওকে ধরো কেউ!”, প্রায় আর্তনাদ করে ওঠেন কেইন, “ও ব্লু-কে নিয়ে পালাচ্ছে!”

     রক্ষীটি সম্ভবত এই আকস্মিক ঘটনাপ্রবাহে হতচকিত হয়ে গেছিল, তাই ব্লাস্টারটা তুলতে তার একটু সময় লেগেছিল।

     সেই সময়টুকুর মধ্যেই ফুয়াদের হাতে উঠে এসেছিল একটা পাতলা পাত, যেটা নিঃসন্দেহে ওর গায়ের চামড়ার সঙ্গে আটকে ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত। পাতটাকে ব্লু-র গলায় চেপে ধরেছিল ফুয়াদ।

     ধৃতিমান যে এই পরিস্থিতিতেও মাথা ঠাণ্ডা রেখেছেন সেটা বোঝা গেছিল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলা কথাগুলো থেকেই, “চমৎকার প্ল্যান! এমন একটা পরিচয় আমাদের সামনে তুলে ধরা হল যাতে আমরা বিরক্ত হয়ে বেশি খুঁটিয়ে প্রশ্ন না করি। আবার ঢোকা হল আমাদের সঙ্গেই, যেহেতু নিরাপত্তা রক্ষীদের বলা হয়েছিল, এথিক্স কমিটির তরফে মোট তিন জন আসবে। সবথেকে বড়ো কথা, মেটাল ডিটেক্টরকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য সঙ্গে আনা হল সিরামিকের পাত।

     সত্যিই আটঘাট বেঁধে এগোনো হয়েছে, বোঝাই যাচ্ছে”।

     ফুয়াদ এসব কথা শুনে খুব একটা ইম্প্রেসড হয়েছে বলে মনে হয়নি, কারণ ও চিৎকার করে বলে উঠেছিল, “কেউ আমার দিকে এক পা এগোনোর চেষ্টা করলে রাবাত-এর এই খেলনা আমার হাতেই শেষ হয়ে যাবে!”

     রাবাত!

     নামটা শোনা মাত্র রয় চমকে উঠেছিল। কুইপার বেল্টে মাইনিং কন্ট্রাক্ট পাওয়া এই কোটি-কোটিপতি ব্যবসায়ীর নাম ও শুধু শোনেইনি, সহকর্মীদের কাছ থেকে তার সম্বন্ধে যা শুনেছে তাতে ওর এটাই মনে হয়েছে যে দামি ধাতুর লোভে রাষ্ট্রপুঞ্জ এই ব্যবসায়ীটির হাতে শ্রমিকদের কার্যত দাস হয়ে যেতে দেখেও লোককথার তিন বাঁদরের নীতি মেনে চোখ-কান-মুখ সব বন্ধ করে রেখেছে।

     তাহলে রাবাত-ই ফরমায়েশ দিয়ে বানিয়েছিল ব্লু-কে।

     কিন্তু হঠাৎ একটা নীল বাঁদরের কী প্রয়োজন হতে পারে এমন এক ব্যবসায়ীর?

     তারপরেই ওর মনে পড়ে, কনফেডারেশনের সদস্য বেশ কিছু দেশে রাবাত ঘোষিত অপরাধী, কারণ লুপ্তপ্রায় প্রজাতির চামড়া বা অন্যান্য অঙ্গ নিয়ে হওয়া বে-আইনি কারবারের অন্যতম শরিক সে, ক্রেতা হিসেবে, এবং বিভিন্ন নামীদামী লোকেদের জন্যে দুর্লভতম উপহারের যোগানদার হিসেবে।

     সম্ভবত ব্লু-র ভবিতব্য ছিল রাবাত-এর, বা অন্য কারো গলার স্কার্ফের জন্যে কাঁচামাল হওয়া।

     ইতিমধ্যে ও দেখতে পাচ্ছিল, ব্লাস্টারটা নিচে নামিয়ে রেখে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছিল রক্ষীটি। ফুয়াদের চোখের ইশারায় নিজের কার্ডটাও বের করে দিতে বাধ্য হয়েছিল সে।

     তার মধ্যেই চিৎকার করে উঠেছিলেন কেইন, “ব্লু-কে নিয়ে কী করতে চাও তুমি?”

     ফুয়াদ বলে উঠেছিল, “ডক্টর, অর্থের লোভে আপনারা মূল্যবোধ বিসর্জন দিলেও আমরা দিইনি। ওই শয়তানের জন্যে গর্ত খুঁড়তে গিয়ে যাতে আরো নিরপরাধ মানুষ মারা না যায়, সেজন্যেই আমাদের এই বাঁদরটাকে দরকার। বিশ্বাস করুন, ওর ক্ষতি করতে আমরাও চাই না”।

     কার্ডটা নিয়ে, আর ব্লু-কে শক্ত করে ধরে দরজার কাছে পৌঁছে গেছিল ফুয়াদ। ল্যাবের দিকে মুখ ফেরানো অবস্থাতেই কার্ড সোয়াইপ করে দরজাটা খোলার চেষ্টা করছিল ও।

     ঠিক তখনই নিজের লোমশ লেজটা দিয়ে ফুয়াদের চোখে একটা ঝাপটা মেরেছিল ব্লু!

     টাল সামলাতে না পেরে পেছনে হেলে গেছিল ফুয়াদ। তৎক্ষণাৎ ওর হাতের ভাঁজ থেকে আশ্চর্য কায়দায় পিছলে বেরিয়ে এসেছিল ব্লু, আর বিদ্যুৎ-গতিতে দুধ-সাদা দেওয়ালের গায়ে মিশে থাকা প্রায় অদৃশ্য হাতলগুলো ধরে ঝুল খেতে-খেতে ও এগিয়ে এসেছিল ল্যাবের দিকে।

     রয়, আর রক্ষীটি, একইসঙ্গে ছুটে গেছিল ফুয়াদের দিকে। দরজা খোলার সময়টুকুতে রক্ষীটি পৌঁছেও গেছিল তার ফেলে রাখা ব্লাস্টারের দিকে।

     ফুয়াদ নিশ্চই বুঝতে পেরেছিল, তার আর পালাবার পথ নেই। হয়তো সেজন্যেই দর কষার জন্যে শেষ সম্বল হিসেবে, অথবা সব শেষ করে দেওয়ার জন্যে, ও একটা লম্বা ভায়াল বের করেছিল অ্যাপ্রনের ভেতর থেকে।

     বিপদটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন কেইন, তাই ব্লু-কে কোলে তুলে নিতে গিয়েও রুদ্ধকন্ঠে বলে উঠেছিলেন তিনি, “ডোন্ট শুট!”

     কথাটা রক্ষীটি হয় শুনতে পায়নি, নয় কথাটা সে সচেতনভাবে উপেক্ষা করেছিল।

     ফুয়াদ ভায়ালটা ছুঁড়ে দিয়েছিল ল্যাবের দিকে। প্রতিবর্ত ক্রিয়ার বশেই রক্ষীটি ভায়ালের দিকে ফায়ার করেছিল।

     একটা নীল তরল ছড়িয়ে পড়েছিল ফোয়ারার মতো। কিন্তু মাটিতে পড়ার আগেই বাতাসে মিশে গেছিল তরলের প্রতিটি ফোঁটা।

     দ্বিতীয় শট নেওয়ার আগেই রক্ষীটি ছটফট করতে-করতে পড়ে গেছিল। ফুয়াদ ততক্ষণে দরজার ওপাশে বাঁক নিয়ে দৌড়তে শুরু করেছিল।

     দরজাটাও তখনই বন্ধ হয়েছিল আপনা থেকে।

     রয় তখন করিডরে। ফুয়াদ ভায়ালটা ছুঁড়ে দেওয়া-মাত্র ও থেমে গেছিল। কিন্তু ধৃতিমানের গলায় “রয়!” বলে চিৎকারটা ওর মাথায় খেলাধুলোর সময়কার স্মৃতিটা জাগিয়ে তুলেছিল।

     একটা মরণপণ লাফ দিয়ে ল্যাবে ঢুকেছিল রয়। ল্যাবের দরজাটা বন্ধ হয়েছিল তৎক্ষণাৎ।

     আসল দুঃস্বপ্নটা শুরু হয়েছিল তারপর।

 

*****

     নিজের শরীরটা মূল দরজার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল রয়। হেলমেটের স্পিকার থেকে বেরনো আওয়াজ কিছুটা হলেও ওর আচ্ছন্নতা কাটিয়ে দেয়, এবার ডক্টর কেইনের গলায়, “মিস্টার রয়, আমাদের সবার বাঁচামরা এখন আপনার হাতে। আপনি অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছেন, আরেকবার বলে দিচ্ছি দরজার কাছে পৌঁছনোর পর কী করতে হবে আপনাকে।

     আপনি প্রথমে আমার কার্ডটা দরজার স্লটে সোয়াইপ করবেন। নিয়মমতো তারপর স্ক্যানারে আমার রেটিনা স্ক্যান হওয়ার কথা, কিন্তু অবস্থা বুঝতে পেরে মাস্টার কন্ট্রোল ওটাকে ওভাররাইড করেছে।

     তারপর দরজার একেবারে ওপর দিকে দপদপ করতে থাকা আলোর নিচের বোতামটা টিপে প্রেসার-লক রিলিজ করবেন, না হলে কিছুতেই এই দরজা খুলবে না।

     বা, আরো ঠিকঠাক বলতে গেলে, দরজা যতক্ষণে খুলবে ততক্ষণে আর ল্যাবের নিচে রাখা বিস্ফোরকের অটো-ডেস্ট্রাক্ট সিকোয়েন্স থামানোর উপায় থাকবে না।

     তাই, যেভাবে হোক, আপনি এগোন।“

     কথাটা যতক্ষণ প্রায় চিৎকার হয়ে কানে বাজছিল, ততক্ষণ রয় দম নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কথাটা থেমে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ও বুঝতে পারল, ওর প্রত্যেকটা নিঃশ্বাস হাপরের মতো আওয়াজ তুলছে ওর কানেই।

     আর হেলমেটের ভেতরে লাল রঙে জ্বলা-নেভা অক্ষরগুলো হঠাৎই স্থির হয়ে গেছে “ক্রিটিক্যালি লো” ফুটিয়ে তুলে।

     বড়োজোর এক মিনিট শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেন আছে ওর হেলমেটে।

 

*****

     ল্যাবের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কয়েক মুহূর্তের জন্যে রয় এবং দুই বিজ্ঞানী ভেবেছিলেন, তাঁরা নিরাপদ।

     ঠিক তখনই, ল্যাবের নিজস্ব স্পিকারটা সরব হয়ে উঠেছিল প্রবলভাবে।

     “ডক্টর কেইন! ডক্টর কেইন! আপনি কি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছেন?”

     তখনও অ্যাড্রেনালিনের ধাক্কায় বেসামাল কেইন উত্তরে চিৎকার করে উঠেছিলেন দরজার কাছ থেকেই, “হ্যাঁ, আমরা ঠিক আছি। কিন্তু লোকটাকে কি ধরা গেছে?”

     স্পিকার কিছুক্ষণ নীরব থাকাতেই রয় বুঝতে পেরেছিল, ওদের বিপদ কাটেনি। কিন্তু সেটা যে কতটা বেড়েছে সেটা ও বুঝতে পেরেছিল একটু পরেই, যখন স্পিকার দিয়ে ভেসে এসেছিল একটা অন্য, তুলনামূলক ভাবে পালিশ-করা, ঠাণ্ডা গলায় বলা কথাগুলোঃ “ডক্টর কেইন, প্রফেসর ধৃতিমান, মিস্টার রয়, আমাদের তরফে আপনাদের এই মুহূর্তে উদ্ধার করায় একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।

     আমাদের স্ক্যানার বলছে, করিডরের বাতাসে এমন কিছু একটা রিএজেন্ট রয়েছে, যেটা বাইরে বেরিয়ে এলে খুব বিপদ। আমরা সেজন্য মূল দরজার ঠিক বাইরের অংশটায় হাওয়ার চাপ বাড়াচ্ছি অনেকটা, যাতে দরজা খুললে ভেতর থেকে কিছু বেরোবার আগেই বাইরে থেকে ভেতরে বাতাস ঢোকে। আমরা সেই বাতাসেই অ্যারোসল হিসেবে বেশ কিছু জিনিস ঢুকিয়ে দেব, যা ওই রিএজেন্টকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে।

     কিন্তু একটাই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি আমরা।

     সম্ভবত ল্যাবের ঠিক সামনে ব্লাস্টার ফায়ার হয়েছে বুঝে দরজার সামনে যে নিরাপত্তা রক্ষীটির থাকার কথা, সে প্রোটোকল মাফিক প্রেসার-লক এনগেজ করে দেয়। এখন সে আমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। আর দরজাটা ভেতর থেকে প্রেসার-লক রিলিজ না হওয়া অবধি খোলা যাবেনা।

     তাই, দরজাটা আপনাদের মধ্যে কাউকে এসে, প্রেসার-লক ডিসএনগেজ করে, খুলতে হবে”।

     ঘোষণাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে গেছিল সবাই। এমনকি ব্লু -ও ডক্টর কেইনের কাঁধে প্রায় লেপটে থেকে নিজের মুখটা লুকিয়ে রাখছিল, হয়তো বাতাসে জমে ওঠা টেনশনটা বুঝতে পেরেই।

     তারপর মাউথপিসটার কাছে মুখ নিয়ে যান ধৃতিমান।

     “যে ভায়ালটা, বা ভায়ালগুলো ভেঙে গিয়ে এই অবস্থা, তাতে ঠিক কী ছিল সেটা আমি জানিনা। তবে মনে হচ্ছে, এমনকিছু মিশেছে হাওয়ায়, যা বাতাসের নিষ্ক্রিয় নাইট্রোজেনকে সক্রিয় করে তুলছে। আমার ধারণা, ব্লাস্টারের আঘাতে ভায়াল ভাঙায় এই প্রক্রিয়াটা আরো দ্রুত ঘটেছে।

     করিডরের সবকিছু, মায় আমাদের সর্বাঙ্গ মুড়ে থাকা এই বডিস্যুট, এগুলোর প্রত্যেকটাই নিষ্ক্রিয়। তাই ওই অ্যাক্টিভ নাইট্রোজেন শুধু খোলা থাকা মুখ বা মাথার সংস্পর্শে আসামাত্র শ্বাসের সঙ্গে বেরনো কার্বন-ডাই-অক্সাইড ভেঙে নাকের কাছেই তৈরি করছে সায়ানোজেন গ্যাস। আর তাতেই…”

     নিজের অজান্তেই ভয়ে শিউরে ওঠে রয়।

     ওই করিডরের বাতাসে এখন এমন কিছু আছে যা ওর শরীর থেকে বেরনো হাওয়াকেই বিষ-বাতাসে পরিণত করতে পারে!

     ওর খেয়াল হয় যে অধ্যাপক-সুলভ ভঙ্গিতে ধৃতিমানের কথা তখনও চলছে।

     “কিন্তু এমন জিনিসের বিশেষত্ব হল, এটি খুব বেশিক্ষণ সক্রিয় থাকবে না। খুব বেশি হলে মিনিট দশেকের মধ্যেই ওই রিএজেন্ট নিজেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। তারপর আপনারা দরকার হলে বোমা ফাটিয়ে দরজা খুলুন। আমরা এই ল্যাবেই আছি, নিরাপদ”।

     কিছুক্ষণ চুপ ছিল স্পিকারটা। তারপর, মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত কয়েদিকে শেষ খবর দেওয়ার মতো করে ওখান থেকে এবার শোনা গেল, “অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি প্রফেসর, আপনার কথায় কোনো ভুল না থাকলেও একটা বিশেষ জিনিস আপনি জানেন না। আর সেটাই ল্যাবে আপনারা কতক্ষণ থাকতে পারবেন, সেটা ঠিক করে দিচ্ছে।

     ব্লু-কে নিয়ে কাজের আগে ওই ল্যাবে এমন কিছু নিয়ে কাজ হয়েছিল যেটা বিশেষ ভাবে গোপনীয়”।

     বক্তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ধৃতিমান বলে ওঠেন, “মানে কোনো অনামা ধনীর নাম ব্যবহার করে মিলিটারি কিছু একটা বানাতে চাইছিল। বেশ তো, তাতে কী হয়েছে?”

     স্পিকারটা আবার চুপ হয়ে গেছিল। হয়তো বক্তা ভাবার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক কীভাবে উত্তর দিলে ধৃতিমানের কথাটায় “হ্যাঁ” বা “না” বলার হাত থেকে বাঁচা যায়। শেষ অবধি রণে ভঙ্গ দেওয়া গলার আওয়াজটা ভেসে আসে, “সেই গবেষণায় এমন কিছু নিয়ে কাজ হচ্ছিল, যেখানে সিকিউরিটি-ব্রিচ হলে চরম ব্যবস্থা নেওয়া নিশ্চিত করা হয়েছিল।

     ল্যাবের নিচে রাখা ছিল একটা বিস্ফোরক। কোনোভাবে করিডরে ব্লাস্টার ফায়ার, এবং মূল দরজা জ্যাম হয়ে গেলে সেই বিস্ফোরক আপনা থেকেই চালু হয়ে যায়, যাতে ল্যাব এবং করিডর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

     সেই প্রোজেক্টটা এখন চলছে না, কিন্তু বিস্ফোরকটা, ভুলবশত, সরানো হয়নি।

     সেটা আছে, এবং চালু হয়ে গেছে। তাই, পাঁচ মিনিটের মধ্যে মূল দরজাটা আপনারা কেউ খুলে না দিলে…”।

     বিস্ফারিত দৃষ্টিতে স্পিকারের দিকে চেয়ে ছিলেন ধৃতিমান আর কেইন। শুধু রয়ের খুব হাসি পাচ্ছিল, কারণ ওর মনে হচ্ছিল, ও একটা নাটকের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। নইলে ঘন্টাখানেকের মধ্যে এত কিছু দেখার, শোনার, মায় সম্ভাব্য মৃত্যু নিয়েও রকমফেরের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ কারো হয়?

     কেইন চিৎকার করে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু ধৃতিমান তাঁকে থামিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলেন, “ঠিক কী নিয়ে হতভাগারা কাজ করছিল তার কিছুটা আন্দাজ আমার আছে, আর তাই আমি জানি এই বিস্ফোরকের ব্যাপারটা ব্লাফ নয়”।

     ঠিক তখনই করিডরে যাওয়ার বন্ধ দরজার ওপরে ঘড়িটার স্বাভাবিক ঘণ্টা-মিনিট-তারিখ মুছে গিয়ে ফুটে ওঠে ০৫-০০ সংখ্যাটা, আর তারপরেই সেটা নামতে শুরু করে শূন্যের দিকে।

 

*****

     “রয়! রয়! তুমি শুনতে পাচ্ছ?”

     ধৃতিমানের গলাটা ওর আচ্ছন্নভাব কিছুটা কাটিয়ে দেয়।

     শ্বাস নিতে গিয়ে টের পায় রয়, অ্যাপ্রনের সঙ্গে প্রায় সিল করে লাগিয়ে দেওয়া এই হেলমেটের ভেতরের অক্সিজেন শেষ হয়ে গেছে, আর ওর চোখের সামনেটা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে।

     এক ঝলকে ওর মনে পড়ে ল্যাবের দরজা খুলে বেরিয়ে আসার আগে কেইনের পইপই করে বলা কথাটা, “হেলমেট খুলবেন না। কার্ড সোয়াইপ করে লাল আলোর নিচের বোতামটা টিপে দেবেন। মূল দরজা একবার খুলে গেলে ওপাশে যারা আছে তারা আপনাকে সুস্থ করতে পারবে। আমাদের পায়ের নিচের বিস্ফোরকের সঙ্গে লাগানো টাইমারটাও তারাই থামাবে। আপনি শুধু দরজাটা খুলুন”।

     “রয়, তুমি কি দরজাটার কাছে পৌঁছেছ? আমাদের হাতে আর একদম সময় নেই কিন্তু!

     রয়!!!!”

     চিৎকারটা কানের মধ্য দিয়ে একটা চাবুক হয়ে আছড়ে পড়ে ওর চেতনায়। রয়ের মনে পড়ে, কলেজে এবং তারপরেও এই চিৎকার ওকে কত অসাধ্যসাধনের জন্যে দরকারি রাগ, জেদ, বা সাহস জুগিয়েছে।

     এবারের চিৎকারটার মধ্যে একটা অন্য জিনিসও মিশে ছিলঃ অসহায়তা, যেটা প্রফেসর ধৃতিমানের গলায় কখনও শোনার কথা ভাবেনি ও।

     অন্ধের মতো নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যায় রয়, যতক্ষণ না ও প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দরজার কাছে।

     নিরাপত্তা রক্ষীর মৃতদেহ কোনো রকমে ডিঙিয়ে কার্ডের স্লটের কাছে পৌঁছয় রয়। ততক্ষণে ও বুঝতে পেরেছে যে ওর মাথা আর কাজ করছে না, কিন্তু যন্ত্রের মতো করে কার্ডটা ও সোয়াইপ করতে পারে সেই অবস্থাতেও।

     দরজার পাশে আলোটা সবুজ হয়ে ওঠে।

     এবার শুধু লাল আলোর নিচের বোতামটা টেপা…

     কিন্তু আর পারছে না ও।

     হেলমেটের মধ্যে কেউ কি চিৎকার করছে? করুক, সেই আওয়াজটাও একটু-একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে তো।

     ওর সারা শরীর পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। মাথার ভেতরে একটা অসহ্য যন্ত্রণা দপদপ করছে। জিভ নাড়তে পারছে না ও।

     আর না, এবার শুধু চোখ বন্ধ করার অপেক্ষা।

     আর কিছু কি করার ছিল ওর? কী করার ছিল যেন?

     ও হ্যাঁ, ওই বোতামটা টিপতে হবে। কিন্তু ও তো হাত তুলতেই পারছে না। ও বসে পড়ছে একটু-একটু করে।

     বোতামটা কেউ কি টিপে দিতে পারবে না?

     ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসতে থাকা পৃথিবীতে হঠাৎ একটা নীল ঝলক দেখে রয়।

     এক মুহূর্তের মধ্যে ওর মনে ভেসে উঠতে চায় একটা ভয়ের স্মৃতি। একটু আগেই নীল রঙের কী যেন একটা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বাতাসে…

     সেটাই কি আবার ছড়ানো হল ওর দিকে?

     না তো!

     এ তো একটা বাঁদর। কী যেন নাম বাঁদরটার? ও, হ্যাঁ, ওর নাম ব্লু। কিন্তু ব্লু  কেন ছুটে আসছে ওর দিকে?

     রয়ের মাথার মধ্যে ঝলসে ওঠে কয়েকটা ভাবনা।

     করিডরের বাতাসে বিষ, তার মধ্যে ব্লু  খুব বেশি হলে কয়েক সেকেন্ড বাঁচবে।

     ও কীভাবে ল্যাব থেকে বেরোল সেটা ও জানেনা, কিন্তু ওর মাথা আবার কাজ করতে শুরু করেছে।

     ওই বোতামটা ওকে টিপতেই হবে।

     মরিয়া চেষ্টা করে নিজেকে মেঝে থেকে তুলে ধরে রয়। তারপর বোতামটা টিপে দেয়।

     দরজাটা খুলে যাওয়া মাত্র উঁচু চাপে হাওয়া, আর অন্য কিছু ঢুকতে থাকে করিডরে।

     জ্ঞান হারানোর আগে রয়ের শেষ স্মৃতি ছিল, ওর মাথার পাশে প্রবল ভাবে হাত-পা ছুঁড়ছে ব্লু, আর কারা যেন দৌড়ে আসছে করিডর দিয়ে।

 

*****

     জ্ঞান ফেরার পর রয়ের প্রথমেই মনে হল, ও নিশ্চই স্বপ্ন দেখছে, কারণ ওর মাথার ঠিক ওপরেই একটা নীল রঙের সূর্য রয়েছে। তারপর ওর খেয়াল হল যে ওটা নীল রঙের সূর্য নয়, এমনকি নীল রঙের বলও নয়।

     ওর মাথার কাছে বসে ওর দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে ব্লু।

     নিজের চারপাশে তাকিয়ে প্রথমেই রয় দেখতে পায় প্রফেসর ধৃতিমানকে। তারপর ও দেখতে পায় ডক্টর কেইন-কে।

     “পার্মানেন্ট ড্যামেজ হয়নি, তাই ঘাবড়িও না”, ধৃতিমানের গম্ভীর গলার তলায় বয়ে চলা টেনশনের স্রোতটা রয়ের কানে ধরা পড়ে। “তুমি প্রায় দেড় মিনিট অক্সিজেন ছাড়া ছিলে, সেটাও চরম আশংকা আর অন্যান্য শারীরিক অবস্থার মধ্যে। আমাদের ভয় হচ্ছিল, তাতে তোমার মস্তিষ্কে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না। রিপোর্ট বলছে, তেমন কিছু হয়নি। তবে এখন ক’টা দিন উত্তেজনা থেকে দূরে থাকাই দরকার তোমার”।

     “কিন্তু…” যে কথাটা জ্ঞান হারানোর মুহূর্তে, এবং জ্ঞান ফিরে আসার সময় থেকেই ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল সেটাই এবার বেরিয়ে আসে, “আমি করিডরে ব্লু-কে দেখেছিলাম। ও কি সত্যিই সেখানে ছিল?”

     কেইন আর ধৃতিমানের চোখাচোখি হয়। গলা খাকড়ে বলেন কেইন, “অফ কোর্স নট। ব্লু  আমাদের সঙ্গেই ছিল, ল্যাবের ভেতরে। সম্ভবত অক্সিজেনের অভাবে আপনার একটা বিভ্রম হয়েছিল”।

     পাক্কা ষড়যন্ত্রকারীর স্টাইলে এদিক-ওদিক দেখে নেন ধৃতিমান। তারপর চোখের ইশারায় কেইনকে তিনি বোঝান যে তাঁদের কথা শোনার আর কেউ নেই।

     রয়ের কানের কাছে প্রায় মুখ নিয়ে কেইন কথা শুরু করেন।

     “আপনি ঠিকই দেখেছিলেন রয়। আমার আর ধৃতিমানের ডাকাডাকিতে আপনি যখন আর সাড়া দিচ্ছিলেন না, তখন আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, অন্য কোনো ভাবে আপনাকে সজাগ করে তুলতেই হবে।

     প্রফেসর নিশ্চিত ছিলেন যে অন্য কারো জন্যে না হলেও, ব্লু-র মতো একটা নিষ্পাপ প্রাণীকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে আপনি সজ্ঞান-অজ্ঞান যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, দরজাটা খোলার ব্যবস্থা করবেন।

     তাই আমি আর প্রফেসর নিজেদের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে দরজাটা একটু ফাঁক করে ব্লু-কে আপনার কাছে যেতে বলি।

     শুধু আপনিই ব্লু-কে পছন্দ করেছিলেন তা নয়, ব্লুর-ও আপনাকে ভালো লেগেছিল। তাই দরজা খোলা পেয়েই ও আপনার দিকে ছুটেছিল।

     আর ওকে দেখে আপনি ঠিক তাই করেছিলেন, যা আমরা আশা করেছিলাম।

     তবে ব্লু-কে এমন একটা বাতাসে এক্সপোজ করা হয়েছিল একথা সেনাবাহিনী জানতে পারলে ওরা ওকে নিয়ে তাই করবে, যা ফুয়াদের লোকজন করতে চেয়েছিল। তাই ডাক্তাররা আপনার কাছে আসার আগেই আমরা ব্লু-কে লুকিয়ে ফেলি। সত্যিটা শুধু আপনিই জানলেন”।

     ইতিমধ্যে বাঁদরটা তার ছোট্ট হাতে রয়ের বড়ো হাতটা তুলে নিয়েছিল। সেদিকে তাকিয়ে রয়ের খুব রাগ হয়, কেইন আর ধৃতিমানের ওপর। মাথাটা খুব ভারী ঠেকলেও সেটাকে তুলে ও বলে, “কিন্তু এমন নিষ্পাপ প্রাণীটার জীবন বিপন্ন করতে আপনাদের একটুও খারাপ লাগল না? ওকে ওই বিষ-বাতাসের মধ্যে আপনারা পাঠালেন কীভাবে?”

     এবারো ধৃতিমান আর কেইনের মধ্যে চোখাচোখি হয়, তবে এটার মধ্যে একটা ছেলেমানুষি আনন্দ লুকিয়ে ছিল।

     এবার উত্তরটা দেন ধৃতিমান, “মাই বয়, যে ব্যাপারটা ডক্টর কেইন আর তাঁর টিম অবশ্যই অস্বীকার করবেন, কিন্তু যে কথাটা সত্যি বলে আমার চোখে প্রথম দর্শনেই ধরা পড়ে গেছিল, সেটা হলঃ ব্লু-র গায়ের রঙটা প্রুশিয়ান ব্লু  হলেও তার নিচে ওর আদি চেহারাটার রঙ ছিল সোনালি। ডাই করা না হলেও মাদাগাস্কারের গোল্ডেন লেমুরের জিন-স্প্লাইসিং করে তৈরি করা হয়েছে ব্লু-কে। একে তো গোল্ডেন লেমুরের সায়ানাইড-জাতীয় জিনিস বরদাস্ত করার ক্ষমতা প্রকৃতিতে সবচেয়ে বেশি, তায় যে রিএজেন্ট দিয়ে ওর গায়ের রঙ প্রুশিয়ান ব্লু  করা হয়েছে, সেটার সঙ্গে আজন্ম সংস্পর্শের ফলে সায়ানোজেন-এ ব্লু-র কিস্যু হত না।

     কুইপার বেল্টে মাইনিং চালানোর জন্যে শ্রমিকরা যখন জমাট নাইট্রোজেন লেয়ারে খনন করে, তখন সেখান থেকে তৈরি হওয়া সায়ানোজেন অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়।

     কিন্তু ব্লু যে এই গ্যাসে অবধ্য, এই খবরটা লিক হয়ে গেছিল ফুয়াদ আর তার দলবলের কাছে, যারা বুঝতে পেরেছিল, ব্লু-র ক্লোনিং করে শ্রমিকদল তৈরি করলে রাবাত আর তার মতো অন্য খনির ঠিকাদারদের সঙ্গে বোঝাপড়া করা যাবে”।

     “তাহলে এখন…?” প্রশ্নটা অসম্পূর্ণ রেখে দিয়ে দুই বিজ্ঞানীর দিকে তাকায় রয়।

     “আপনি ইন্টার্নাল বুলেটিনটার খবর এখনও জানেন না,” কৃত্রিম গাম্ভীর্য মেশানো গলায় বলেন কেইন, “ল্যাবরেটরিতে মারাত্মক দুর্ঘটনার ফলে এক আততায়ী আর দুই নিরাপত্তা রক্ষীর পাশাপাশি ব্লু-ও মারা গেছে। বিষ বাতাস সে সহ্য করতে পারেনি”।

     চমকে নিজের ডান দিকে তাকিয়ে দেখে রয়, যেখানে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে কেইনকে দেখছিল ব্লু।

     ধৃতিমান বলেন, “কাগজ-কলমে ব্লু  আর বেঁচে নেই। কিন্তু ওকে কীভাবে নিরাপদ রাখা যায় সেটাই ভাবছি”।

     হঠাৎ রয়ের মনে পড়ে একলা ঘরে জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দিন গোণা একটি মানুষের কথা, নীল রঙ যার বড়ো প্রিয়।

     জোর গলায় রয় বলে ওঠে, “রুচিরার খুব প্রিয় রঙ হল নীল, প্রফেসর। আর ওর কাছে ব্লু-কে কেউ খুঁজবে না”।

     চমকে ওঠেন ধৃতিমান। নতুন চোখে উনি তাকান কেইন, রয়, আর শেষে ব্লু-র দিকে।

     আর তারপর, যা কখনও তাঁকে কেউ করতে দেখেছে বলে রয়ের জানা নেই, সেটাই হয়। ব্লু-র দিকে দু’হাত বাড়িয়ে বলে ওঠেন ধৃতিমান, “তাহলে আমার সঙ্গেই চলো হে ব্লু। তোমাকে বন্ধু হিসেবে পেলে আমার মেয়ের দিনগুলো একটু হলেও…”।

     এক লাফে ধৃতিমানের গলা জড়িয়ে ধরে ব্লু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *