জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং – পার্ট ১

রচনা  : জি নরম্যান লিপার্ট, ভাষান্তরঃ প্রতিম দাস

অলঙ্করণ : মূল প্রচ্ছদ, সুদীপ দেব

প্রাককথন

ম্বা বারান্দাটা আলো আধাঁরিতে কোন এক অনন্ত জগতের পথে গিয়ে যেন মিশে গেছে। এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়ে আছে ফোঁটা ফোঁটা রুপালী আলোকবিন্দু। কোনার দিক ধরে এগিয়ে গিয়ে মিঃ গ্রে ভালো করে দেখলো চারপাশটা। ওকে বলা হয়েছিল এ এক আলেয়ার জগত, যাকে ঘিরে রাখা হয়েছে সময়বন্ধনীর মন্ত্র দিয়ে। ও এসব ব্যাপারে কস্মিনকালেও শোনেনি। জাদুমন্ত্রকের ভেতর আগে কোন দিন ঢোকার সুযোগই হয়নি ওর। অজান্তেই ওর গোটা শরীরটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো।

     ফিসফিস করে দুই সাথীর উদ্দেশ্যে বললো, ‘আমি তো কাউকেই কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। কোন রকম দরজা বা তালার চিহ্নমাত্র চোখে পড়লো না। আচ্ছা এরা কি অদৃশ্য কিছু ব্যবহার করেন?’

     ‘নাহ’, চাপা কণ্ঠে উত্তর এলো। ‘আমাদের জানানো হয়েছিল  কোন জায়গায় সংকেত গুলো আছে, ঠিক কিনা? এখন দেখছি জায়গাটা পুরো ফাঁকা। যাদের নিয়ে বেশী চিন্তা ছিল সেই প্রহরীদের যখন দেখা যাচ্ছে না তখন ভেবে লাভ কি। এগিয়ে যাওয়া যাক।’

     গ্রে বললো, ‘আমারও মনে আছে আমাদের কি বলা হয়েছিল। কিন্তু বিষল আমার কেমন যেন ভালো ঠেকছে না। আমার মা বলতেন আমি নাকি বিপদের গন্ধ পাই।’

     কালো শার্ট আর ট্রাঊজার পরিহিত গবলিনটা একই রকম চাপা স্বরে বললো, ‘বলেছি না আমায় বিষল বলে ডাকবে না। ওই নামটা আমার সহ্য হয় না। আমার নাম  স্যাফ্রন। আর চুলোয় যাক তোমার বিপদের গন্ধ পাওয়া। তুমি একটা ভীতুর ডিম বনে যাও যখনই কোন নতুন জায়গায় যেতে হয় তোমাকে। এখন যত তাড়াতাড়ি আমরা জায়গাটা খুঁজে পাবো তত তাড়াতাড়ি আমাদের কাজ শেষ হবে। আর তারপর ভরপুর মস্তি!’

     ওদের সাথে থাকা তৃতীয় সহচর এক লম্বা সুঁচালো ছাগল দাড়িওয়ালা বুড়ো। যে এই সব কথা চালাচালির ফাঁকে স্যাফ্রনকে পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

     ‘দেখলে মিঃ পিঙ্ক কিরকম এগিয়ে গেলেন। বুঝলে গ্রে সবসময় নিজের হাতে থাকা তথ্যর ওপর ভরসা রাখবে। কোন প্রহরী নেই কোন ঝামেলা নেই, আপনি কি বলেন মিঃ পিঙ্ক?’

     ‘কে জানে কেন আমাকে গ্রে নাম দেওয়া হয়েছে।’ একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়লো গ্রের কথায়। ‘কেউ গ্রে পছন্দ করে না। ওটা তো কোন রঙই না।’

     বাকি দুজনের দিক থেকে কোন উত্তর এলো না। আরো কিছুক্ষন হাঁটার পর মিঃ পিঙ্ক থামলেন। থেমে গেল ওরা দুজনও। বারান্দার চারদিকটা অতি কৌতূহলে পরখ করে দেখলেন উনি।

     “মিঃ পিঙ্ক! এটাই কি সেই জায়গা?’ গবলিনটা জানতে চাইলো। ‘কিন্তু কোন দরজার চিহ্নমাত্র এখানে নেই। আপনি নিশ্চিত তো আপনি ঠিক পথে যাচ্ছেন?’

     ‘আমি একদম সঠিক পথে হাঁটছি।’ বলেই  পিঙ্ক পা দিয়ে মেঝের ওপর টালিতে ঘষলেন। একটা টালির একটা কোন একটু চটে আছে যেন। উল্লাসের ধ্বনি ছেড়ে উনি হাঁটু গেড়ে বসলেন। আঙ্গুল দিয়ে ভাঙ্গা অংশটা পরীক্ষা করে নিলেন আগে। তারপর আরো খানিকটা ঝুঁকে ওটার মধ্যে আঙ্গুল ঢুকিয়ে মারলেন এক টান। সাথে সাথেই একটা আয়তাকার অংশ উঠে এলো মেঝে থেকে। আবার ওটা ধরে টানতেই একটা পাথরের পাতলা স্ল্যাব উঠতে শুরু করলো নিজে থেকেই। সিলিং এর দিকে উলম্ব ড্রয়ারের মত। প্রস্থে ওটা দরজার মত, কিন্তু বেধ মাত্র কয়েক ইঞ্চি। পুরো স্থানটা কাঁপিয়ে একসময় ওটার ওঠা থামলো ছাদে ঠেকার পর। গ্রে ওটার পাশ দিয়ে পেছনের দিকে তাকালো। অনন্তের পথে হারিয়ে যাওয়া বারান্দাটাই কেবল নজরে এলো ওর।

     পিঙ্ক এর দিকে তাকিয়ে স্যাফ্রন জানতে চাইলো, ‘আপনি কি করে বুঝলেন বলুন তো ওটা ওখানে ছিল?’

     ‘মাননীয়াই আমাকে বলে দিয়ে ছিলেন।’ ঘাড় কাত করে জানালেন মিঃ পিঙ্ক।

     ‘উনি বলেছিলেন বুঝি! তা আর কি বলেছিলেন উনি যা আমরা শুনিনি?’

     ‘বলেছিলেন এই বারান্দায় একত্র হতে। জানিয়েছিলেন তুমি হলে তালা বিশারদ। মিঃ গ্রে অমিত শক্তির অধিকারী আর আমি কোন কিছু খুঁজে বের করার কাজে দক্ষ। এছাড়া আর বাকি সবই তো আমাদের জানা বলেই মনে হয়।’

     গবলিনটা গরগরে স্বরে বললো। “হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। এবার তো আমাদের ওটার ভেতর ঢুকতে হবে। তাই তো নাকি?’

     পিঙ্ক সরে দাঁড়ালেন। স্যাফ্রন রহস্যময় পাথরটার দিকে এগিয়ে গেল। ভালো করে দেখলো। ঢোঁক গিলে বিড়বিড় করে কি সব বললো। তারপর এখানে ওখানে নিজের বিরাট কান পেতে এবং ঠুকেঠুকে কি সব বোঝার চেষ্টা করলো। কালো শার্ট এর একটা পকেট থেকে বার করলো এক অদ্ভুতদর্শন যন্ত্র। যেটায় ডজনখানেক পেতলের গোল্লা পাকানো। তার থেকেই একটা খুলে নিয়ে সোজা করে ঢুকিয়ে দিল পাথরের স্ল্যাবটার মধ্যে।

     নিজের মনেই বলতে থাকলো , ‘খুব একটা কঠিন কিছু নয়। একে বলে হোমানকুলাস লক। একে তখনই খোলা যায় যখন আগে থেকে সেট করে রাখা কিছু বিষয় একসাথে ঘটে। কখনো এরা খোলে যখন কোন লালচুলওলা মেয়ে বৃহস্পতিবার তিনটের সময় আটলান্টিকের জাতীয় সঙ্গীত গায়। অথবা ভাঙ্গা আয়নায় পড়া সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ে কোন ছাগলের চোখে। কিম্বা মিঃ গ্রে  যখন কোন ভূতকে বেগুনী রঙের গোসাপে বদলে দিতে পারেন। জীবনে আমি অনেক ভালো ভালো হোমানকুলাস লক দেখেছি বুঝলেন কিনা।’

     ‘এটা কি সেরকম ভালো কিছু?’ প্রশ্ন গ্রের।

     অসংখ্য সূঁচালো সাদা রঙের দাঁত বার করে গবলিন হাসলো। ‘মিঃ পিঙ্ক তো বলেই দিয়েছেন আমি কি। আর আমাদের কি করতে হবে।’ বলেই শার্টের অন্য একটা পকেট থেকে লাল পাওডার ভর্তি একটা শিশি বার করলো। সাবধানে ঢাকনা খুলে পুরো পাওডারটা পাথরের দরজার সামনে ঢেলে দিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাওডারটা শুরু করলো ঘূর্ণিপাক। পরিণত হতে থাকলো একটা অবয়বে। এক অপ্রাকৃত কিছুর অবয়ব।  গ্রে অবাক হয়ে দেখল অবয়বটা একটা কংকালের হাতের মতো হয়ে গেল যার একটা আঙুল রহস্যময় পাথরের একটি স্থানকে নির্দিষ্ট করে দেখাচ্ছে।

     এবার স্যাফ্রন একটা পেতলের যন্ত্র বার করে এনে বিড়বিড় করে বললেন, “অ্যাকিউলিউমস”। সরু এক সবজেটে আলো যন্ত্রটা থেকে বের হয়ে এলো। গবলিনটা ধেয়ে চলা আলোর গতিপথ স্থাপন করলো একেবারে সেই বিন্দুতে যেখানটা দেখাচ্ছিল কংকালের আঙুল।

     ঢোক গিলে পিছিয়ে এলো গ্রে। স্যাফ্রনের সযত্নে রাখা আলোর চাতুরীতে তখন খেল শুরু হয়ে গিয়েছে পাথরের দেওয়ালে। আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে এক খোদাই করা শিল্পকর্ম। একটা হাস্যরত কংকাল যার চারপাশে কদাকার সব মূর্তি নাচ করছে। কংকালের ডান হাতটা বেরিয়ে এসেছে বাইরের দিকে ঠিক যেন একটা দরজার হাতল। বাম হাতটা নেই।  পিঙ্ক শিহরনের সাথে অনুভব করলেন যে সামনে লাল পাওডারে সৃষ্ট হাতটাই সেটা।

     ভালো করে দরজার খোদাই কর্ম পর্যবেক্ষণ করে স্যাফ্রন বললো, ‘এ হল ডান্স ম্যাকাব্রে। মরণ নৃত্য। ড্রাগনের শুষ্ক রক্তচূর্ণ আর ক্যাভারন লাইটের ভেল্কিতে যা দৃশ্যমান। বুঝলে গ্রে এটা একটা দারুন তালা।’

     ‘ওটা কি খুলেছে?’, অতি আগ্রহীর কণ্ঠে জানতে চাইলেন মিঃ পিঙ্ক।

     ‘বন্ধ করাই থাকলে তবেই না খোলার প্রশ্ন আসে,’ গবলিন বললো। ‘আমি শুধু জেনে নিতে চেয়েছিলাম কি ধরে টানতে বা ঠেলতে হবে। আর সেটা এখন আপনার সামনে, আমি চাই আপনিই শুভ কাজটা করুন মিঃ পিঙ্ক।’

     লম্বা ছাগলদাড়িওয়ালা মানুষটা এগিয়ে গেল দরজাটার দিকে। সবুজ আলোটার গতিপথ বাধা না পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল কংকালের বার হয়ে থাকা ডান হাতটার দিকে। একটা মোচড় দিতেই শোনা গেল “ক্লিক” শব্দ। খোদাই করা দরজাটা স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলে গেল ভেতরের দিকে। ওদের সামনে এখন একটা ঘুটঘুটে তমিস্রাচ্ছন্ন একটা জগত। কোথায় যেন টুপ টুপ করে জল পড়ছে। এক ঝলক শীতল বাতাস বয়ে এলো ভেতর থেকে, বয়ে গেল বারান্দা ধরে। নড়ে উঠলো মিঃ স্যাফ্রনের কালো শার্ট।  গ্রের কপালে জমা ঘাম জমে বরফ হয়ে গেল বলেই মনে হল ওর।

     ‘ওই দিকটা কোথায় গেছে? ওটা নিশ্চিত আমাদের জগত নয়, মানে কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছেন আশা করি?’

     ‘অবশ্যই ওটা আমাদের জগতের অংশ নয়,’ স্যাফ্রন শান্ত ভাবে বলার চেষ্টা করলেও গলার কাঁপুনি পুরো ঢাকতে পারলো না।          ‘এটাই সেই প্রাচীন গুদামঘর, যার কথা বলা হয়েছিল। ওখানেই আছে সেই সিন্দুক। জলদি! জলদি! আমাদের হাতে বেশী সময় নেই।’

     পিঙ্ককে অনুসরন করে ওরা অগ্রসর হল রহস্যময় দরজার অপরদিকের উদ্দেশ্যে। স্থানটিতে ছড়িয়ে থাকা গন্ধ আর ওদের পদশব্দের প্রতিধবনিতে মনে হচ্ছিল ওরা যেন কোন ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ পথে হেঁটে চলেছে। পিঙ্ক নিজের জাদুদন্ডের আলোটিকে জ্বালালেন। খুব একটা আলোকিত হল না স্থানটা। পায়ের নিচের জমিটা কেমন যেন ভিজে ভিজে। জমাট অন্ধকার যেন ছোট্ট আলোকশিখাটিকে গিলে খাওয়ার চেষ্টায় রত।  গ্রে বুঝতেই পারছিল এ এমন এক জায়গা যেখানে সূর্যালোক কোন দিন পৌঁছায়নি। আদিম চটচটে একটা ঠাণ্ডা হাত যেন ওদের চামড়া ছূঁয়ে ছূঁয়ে যাচ্ছিল। কাঁপিয়ে দিচ্ছিল ওদের বারান্দায় পাওয়া উষ্ণতার তুলনায়।  গ্রে পেছন ফিরে তাকালো দরজাটাকে দেখার জন্য। রুপালী স্তম্ভের মত জ্বলজ্বল করছিল ওটা। যেন এক মরীচিকা।

     ‘আ…। আমরা এখন ঠি…ঠিক কো…কোথায়?’

     ‘আটলান্টিকের নিচে এক হাওয়া ভর্তি সুড়ঙ্গে।’ উত্তর দিলেন মিঃ পিঙ্ক।

     ‘সমুদ্র তলে! …’ ক্ষীন কণ্ঠে ঢোক গিলে বললো  গ্রে। ‘ আমার মোটেই ভালো ঠেকছে না। খুব বাজে একটা ব্যাপার। বিষল আমি ফিরে যেতে চাই।’

     গবলিন যন্ত্রের মত বললো, ‘আমায় বিষল বলতে বারন করেছি না।’

     গ্রে অতি কষ্টে জানতে চাইলো, ‘ওই সিন্দুকে কি আছে বলো তো? নিশ্চিত দামি কিছুই হবে। তা না হলে কে আর এই অদ্ভুতুরে পিলে চমকানো জায়গায় আসতে রাজি হবে?’

     ‘ওসব নিয়ে একদম ভেবো না।’ কর্কশ স্বরে বললো স্যাফ্রন। ‘তুমি স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না তুমি কি পেতে চলেছো। এরকম কাজ আমরা আর কখনো করবোও না। আর আমাদের ছোটখাটো ছিঁচকেমো করতে হবে না। একবার সিন্দুকটা পেয়ে গেলেই আমরা একবারে বদলে যাবো।’

     ‘কিন্তু কি আছে ওতে,  কি এমন জিনিষ?’

     ‘আর একটু অপেক্ষা করো তারপরই দেখতে পাবে।’

     গ্রে দাঁড়িয়ে গেল, বললো, ‘আসলে তুমিও জানো না, তাই না?’

     স্যাফ্রন উত্তর দিলো, ‘ওটা কি সে নিয়ে আমার একটুও মাথাব্যাথা নেই, বুঝলে চাঁদু। কি বলা হয়েছে আমাদের? আমরা সেটাই পাবো যা আমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। আমাদের বাক্সটা আনতে হবে, আর তার বদলে যা পাব তার ২০% দিতে হবে ওই খোচড়টাকে যে এই কাজের খবর এনেছিল। জাদুমন্ত্রকের ভেতরে আমাদের থোড়াই ঢুকতে দিত যদি না জিনিষটা ধামাকাদার কিছু না হত। এটা তো বুঝতে পারছ, না কি? যাই হোক মিঃ পিঙ্ক কিন্তু জানেন ওটা কি? তুমি ওকেই জিজ্ঞাসা করো না।’

     ‘আমিও কিছুই জানি না’, মিঃ পিঙ্ক শান্ত ভাবে জানালেন।

     এরপর অনেকক্ষন কেও কোন কথা বললো না। গ্রে শুনতে পাচ্ছিল জল পড়ার একঘেয়ে শব্দটা।

     নিস্তব্ধতা ভাঙ্গলো স্যাফ্রন, ‘আপনি সত্যিই কিছু জানেন না?’

     মাথা নাড়লেন পিঙ্ক, যদিও আবছা আলোতে সেটা কারোর নজরে এলো না।

     গবলিন ঘোঁতঘোঁত করে বললো, ‘তার মানে আমরা শুধু সেইটুকু জানি যা আমাদের কাজে লাগবে, ঠিক কিনা?’

     ‘আমাদের এখন জানা দরকার কোথায় যেতে হবে?’, বললেন পিঙ্ক। ‘একমাত্র তবেই আমরা জানতে পারবো আমাদের পরের কাজটা কি।’

     ‘ঠিক আছে, তবে তাই হোক। আপনিই তো আমাদের পথ প্রদর্শক মিঃ পিঙ্ক’, স্যাফ্রন বললো।

     ‘মনে হচ্ছে আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি,’ বললেন পিঙ্ক। ‘এবার কাজ শুরু হবে মিঃ গ্রের। উনি ঘুরে দাঁড়িয়ে আলোকিত জাদুদন্ডটাকে এগিয়ে ধরলেন। অন্ধকারের মাঝে রুপালী আলোয় ফুটে উঠলো এক বীভৎস দানবীয় মুখাবয়ব। গ্রের হাঁটু দুটো মনে হয় জমে গেল।

     গবলিনটা যেন সেটা বুঝেই বললো, ‘ওটা একটা স্ট্যাচু হাঁদারাম। সেই ড্রাগনের মাথাটা যার কথা আমাদের বলা হয়েছিল। এবার যাও তো গ্রে সোনা। নিজের ভাগের কাজটা করো দেখি। ওটার মুখটা উন্মুক্ত করো।’

     ‘নামটা আমার একদমই পছন্দ নয়,’ এগিয়ে যেতে যেতে বললো শক্তিধর গ্রে। স্ট্যাচুটা ওর থেকে লম্বায় বেশ খানিকটা বড়। তৈরী হয়েছে গুহাপথের এবড়ো খেবড়ো স্ট্যালাক্টাইট আর স্ট্যালাকমাইট দিয়ে। ‘আমি মিঃ পারপল হতে চাই। ওটাই আমার পছন্দের রঙ।’

     হাত বাড়িয়ে একটু ঊঁচু হয়ে ড্রাগনের ওপরের চোয়ালের দাঁতের পরের টাকরার অংশে হাতের চাপ দিল। অসম্ভব শক্তির অধিকারী হয়েও গ্রে বুঝতে পারলো একে ওপরে ঠেলে তলার জন্য অতিমানবীয় শক্তির প্রয়োজন। মুখ ও ঘাড় দিয়ে গল গল করে ঘাম ঝরে পড়লো গ্রের কিন্তু চোয়াল একফোঁটা নড়ল না। চেষ্টা করাই বৃথা এই ভেবে হাল ছাড়ার আগে শেষ বারের মত পেশী ছিঁড়ে ফেলার জোর লাগালো  গ্রে। আর ঠিক তখনই কাঁচ ঘষটানোর মত একটা শব্দ শোনা গেল। ও বুঝতে পারলো চোয়ালটা এখন অনেক হাল্কা মনে হচ্ছে। স্ট্যালাক্টাইটে তৈরী চোয়ালের কব্জাটা ভেঙ্গে গেছে।

     ‘তাড়াতাড়ি’, দাঁতে দাঁত চেপে বললো গ্রে।

     ‘দেখো বাপু ওটা আবার আমদের ওপর ফেলে দিও না’ বলতে বলতে ওটার ভেতর ঢুকে গেল স্যাফ্রন, ওকে অনুসরণ করে  পিঙ্কও।

     ঢোকার পথটা নিচু আর প্রায় নিখুঁত গোলাকৃতি। স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাকমাইটের স্তুপ থামের রুপ নিয়ে গম্বুজাকৃতি সিলিং টাকে ধরে রেখেছে। পাথরের মেঝে সিঁড়ির মত ধাপে ধাপে নেমে গেছে মাঝখানে। যেখানে আবছা অন্ধকারে একটা কিছু রাখা আছে।

     ‘ওটা তো সিন্দুক নয়!’,  পিঙ্ক বললেন।

     ‘নাহ’, সম্মতি জানালো গবলিন। ‘কিন্তু ওটাইতো একমাত্র বস্তু যা এখানে আছে। মনে হচ্ছে দুজনে মিলে ওটাকে বয়ে নিয়ে যেতে পারবো, কি বলেন?’

     পিঙ্ক নিচে নেমে গেলেন  স্যাফ্রনকে সাথে আসার ইঙ্গিত করে।

     জিনিষটাকে বেশ কিছুক্ষন ধরে দেখে পিঙ্ক জাদুদন্ডটাকে দাঁতে কামড়ে ধরে নিচু হলেন। একপাশটা ধরলেন ওটার। ইশারা করলেন স্যাফ্রনকে অন্য পাশটা ধরার জন্য। তুলতে গিয়ে বুঝলেন ওটা ওদের অবাক করে দেওয়ার মতই হাল্কা। যদিও ওটার গায়ে প্রাকৃতিক ধাতব মরচে পড়েছে যথেষ্টই। কক্ষটির দেওয়াল জুড়ে ওদের দুজনার ছায়া নাচছিল, ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল, পিঙ্ক এর জাদুদন্ডের আলোর কাঁপুনির সাথে সাথে।

     একসময় ওরা বেরিয়ে এলো ড্রাগনের মুখের ভেতর দিয়ে। গ্রে ততক্ষনে ওই ভার বহন করে ঘেমে নেয়ে একাকার। ওর হাঁটু আর সঙ্গ দিতে পারছিল না ওই দুঃসহ চোয়ালের ওজন বহনের। ওরা বেরিয়ে এসেছে দেখেই ও হাত সরিয়ে দ্রুত সরে গেল মুখটার কাছ থেকে। সশব্দে ড্রাগনের মুখটা আছড়ে পড়তেই এক ধুলোর ঝড় ধেয়ে এলো ওদের দিকে। গ্রে পিছিয়ে গিয়ে গুহার দেওয়ালে ঠেঁস দিয়ে বসে হাঁপাতে থাকলো।

     সেদিকে নজর না দিয়ে স্যাফ্রন বললো, ‘ওটা কি, সেই উত্তরটা এবার জানতে পারি কি? মনে তো হচ্ছে না ওর ভেতর এমন কিছু আছে যা আমাদের ভাগ্য বদলে দেবে দারুন ভাবে।’

     পেছনের অন্ধকার থেকে একটা কন্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘আমি একবার ও বলিনি ওটা তোমাদের ভাগ্য বদলে দেবে। কেবল মাত্র বলেছিলাম ওটা তোমাদের জীবনের ভার নেওরার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। একই কথার কত রকম মানে যে করে নেওয়া যায় এটা বোধ হয় তোমরা জানো তাই না?’

     স্যাফ্রন ঝট করে ঘুরলো কে বললো কথাগুলো দেখার জন্য। পিঙ্ক এর আচরনে অতটা তড়িঘড়ি দেখা গেল না। মনে হল আশা করেই ছিলেন এরকম একটা কিছুর। কালো পোষাক আবৃত দেহে কদাকার মুখোস পড়া একটা অবয়ব অন্ধকার ভেদ করে সামনে এসে দাঁড়ালো। ওর পেছনে আরো দুটি। একই রকম দেখতে।

     ‘আপনার কন্ঠস্বরেই আপনাকে চিনতে পেরেছি, আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল।’ পিঙ্ক বললেন।

     ‘হ্যাঁ মিঃ ফ্লেচার, উচিত ছিল, কিন্তু সেটা পারোনি। তোমার লোভের কাছে তোমার এতদিনের অভিজ্ঞতা হেরে গেছে। অনেক দেরী করে ফেললে তুমি ।’

     স্যাফ্রন হাতদুটো ওপর দিকে তুলে চেঁচিয়ে বললো, ‘একটু শুনুন। আমাদের মধ্যে কিন্তু একটা দরদাম হয়েছিল। সেটা ভুলে যাবেন না। সেই চুক্তি ভাঙ্গাটা মোটেই ঠিক কাজ নয়।’

     ‘হ্যাঁ হয়েছিল তো বন্ধু গবলিন। অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমার সহযোগীতার জন্য। এই নাও তার প্রাপ্য।’

     একটা কমলা আলোর ঝলক ধেয়ে গেল এক মুখোসধারীর কাছ থেকে স্যাফ্রনকে লক্ষ্য করে। থরথর করে কাঁপতে থাকলো গবলিনটা। চেপে ধরলো দু হাতে গলার কাছটা। দম আটকে আসছিল ওর। তারপর ধ্রাম করে পড়ে গেল পেছন দিকে। ছটফট করতে থাকলো গলাকাটা জন্তুর মতো।

     গ্রের অবস্থা ঝড়ের দাপটে কাঁপতে থাকা গাছের মতোই প্রায়। কোন মতে বললো, ‘এটা আপনারা ঠিক করলেন না বিষলের সাথে। আপনার যা চেয়েছিলেন ও তো সেটাই করেছে আপনাদের সাথে।’

     ‘আর আমরাও তো সেটাই করছি যা আমরা করবো বলেছিলাম।’ নির্লিপ্ত স্বরের জবাব ভেসে এলো। সাথেই আবারো একটা কমলা আলোকের ঝলকানি। শক্তিধর গ্রেও ধরাশায়ী হলো।

     তিন মুখোশধারী এবার এগিয়ে গেল  পিঙ্ক এর দিকে। ঘিরে দাঁড়ালো। অসহায় ভাবে উনি ওদের দেখতে দেখতে প্রশ্ন করলেন। ‘অন্তত আমাকে বলুন ওই জিনিষটা কি? কেন ই বা ওটা আমাদের দিয়ে সংগ্রহ করালেন? কেন নিজেরা ওটা হাতানোর চেষ্টা করলেন না?’

     পিঙ্ক এর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে কন্ঠস্বর জানালো, ‘মিঃ ফ্লেচার শেষ প্রশ্নটার উত্তর জানার অধিকার তোমার নেই। কারন ওরা বলেছেন আমি যদি সেটা করি তাহলে তোমাকে হত্যা করতে হবে। যা আমাদের দরদামের চুক্তির মধ্যে নেই। আমরা কথা দিয়েছি আমরা তোমার জীবনের দায়িত্ব নেব, আর সেটা করতে আমরা বদ্ধ পরিকর। যদিও তোমার জীবনের খুব বেশি সময় আর অবশিষ্ট নেই।কিন্তু কি করবো বলো, ভিক্ষার চাল কাঁড়া না আকাঁড়া হবে তাতে ভিখারীর কোন হাত থাকে না।’

     একটা জাদুদন্ড আবির্ভূত হল পিঙ্ক এর মুখের সামনে।

     কত কত বছর ধরে উনি ফ্লেচার নামটা ব্যবহার করেন না। ওটাকে ত্যাগ করেছিলেন সেই দিন যেদিন থেকে উনি অপরাধের রাস্তা ছেড়ে ভালো সৎপথে হাঁটার চেষ্টা শুরু করেন। তারপর জুটে যায় জাদুমন্ত্রকের অন্দরমহলে কাজ করার সুযোগ। এটা একটা দারুন দারুন রকমের প্রাপ্তি, যেটা উনি ছাড়েননি। ওর ইয়ারদোস্তরা অবশ্য এটা ভালো চোখে দেখেনি। তাদের কেওই বোধহয় আজ আর বেঁচে নেই। ওর আসল নামটা আর কেও জানেই না এটা এতদিনে একটা বিশ্বাসের মতই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওটা একটা ভাবনাই ছিল মাত্র। আজ এরা তার প্রমান। ওকে ব্যবহার করে নিল নিজেদের প্রয়োজনে, কাজ শেষ, এবার ছুঁড়ে ফেলে দেবে আবর্জনার মত। এটাই ভবিতব্য ছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়লো।

     কন্ঠস্বর বললো, ‘তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা মনে হয় আমি দিতে পারবো। তাছাড়া আজকের পর আর কেই বা সুযোগ পাবে তোমাকে কিছু বলার! তুমি এখানে এসেছিলে একটা ধনরত্ন ভরতি সিন্দুকের খোঁজে। কারন তোমার  ক্ষুদ্র মানসিকতা ওর থেকে বড় কিছু ভাবতেই পারেনি। আমাদের চাহিদা বিশাল, লক্ষ্য অনেক অনেক উঁচু মাত্রার। ধন্যবাদ তোমাদের। এখন আমাদের হাতে এসে গেছে সেই চাবিকাঠি যা আমাদের লক্ষ্যপূরনে সহায়তা করবে। সেই লক্ষ্যটা হল শাসন করা। আর শাসন করা বলতে কি বোঝাচ্ছে সেটার নমুনা তো তুমি নিজের চোখেই দেখলে। কি দেখলে বলো দেখি মিঃ ফ্লেচার?  আমাদের হাতে শাসনের ক্ষমতা থাকার একটাই অর্থ তোমাদের জগতের বিনাশ।

     চরম অসহায়তায় আচ্ছন্ন হলেন মানডাসগাস ফ্লেচার। বসে পড়লেন হাঁটু গেড়ে। আরো একটা কমলা আলোর বিচ্ছুরন ওকে আঘাত করলো। শ্বাস রুদ্ধ করলো, ঢেকে দিল ওর জগতটাকে অন্ধকারের চাদরে। উনি আঁকড়ে ধরলেন সেই অন্ধকার কে, স্বাগত জানালেন।

প্রথম পরিচ্ছেদ

 কিংবদন্তীর ছত্রচ্ছায়া

ট্রেনটার ভেতরে সরু পায়ে চলার পথ ধরে নির্বিকার ভাবে এদিক ওদিকের কম্পারটমেন্ট গুলো দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছিল জেমস পটার। ভেতরে যারা বসে আছে তাদেরকেই দেখছিল ও, যদি একটা আধটা চেনা কেউ জুটে যায় তাহলে এই সফরটা মজা করে কাটানো যাবে। প্ল্যাটফর্মে ওর ভাই আলবাসের সামনে নিজেকে মানসিক ভাবে দারুন শক্তপোক্ত দেখানোর ভাব করলেও ও চাইছিল কেউ অন্তত বুঝুক ও আসলে কতটা নার্ভাস হয়ে আছে। আঙ্কল রন বা জর্জের দেওয়া পুকিং প্যাস্টাইল খেলে যেমন হয় ঠিক সে রকমই গুরগুর করছে ওর পেটের ভেতরটা। যাত্রীবাহী ট্রেনটার একেবারে শেষের ফোল্ডিং দরজাটা খুলে সতর্কভাবে পা ফেলে পরের কামরাটায় প্রবেশ করলো। এটার প্রথম কম্পারটমেন্টটা মেয়েতে ভর্তি। একে অপরের সাথে অনর্গল বকে চলেছে ওরা যেন কতদিনের প্রানের বন্ধুসব। কিন্তু সত্যিটা হল এদের বেশীরভাগই একে অপরকে কিছুক্ষন আগেও চিনতো না। এদের মধ্যেই একজন মুখ ঘোরাতেই ওর সাথে চোখাচোখি হল। জেমস তাড়াতাড়ি ভান করলো যেন জানলার ওপারে প্ল্যাটফর্মের ব্যস্ততা দেখছে। কোন কারন ছাড়াই ও লজ্জিত বোধ করলো, নিশ্চিত ওর গাল দুটো লাল হয়ে গেছে। দ্রুত এগিয়ে চললো সামনের দিকে। যদি রোজ এর বয়সটা আর এক বছর বেশী হত তাহলে সেও আজ ওর সাথেই যেত। রোজ ওর কাজিন এবং ওরা এক সাথেই বড় হয়েছে। একটা পারিবারিক চেনা মানুষের সঙ্গ ওকে অনেকটাই স্বস্তি দিতে পারতো এই সময়ে।

     টেড আর ভিক্টরি অবশ্য এই ট্রেনেই কোথাও আছে। সপ্তম বর্ষের ছাত্র টেড মিশে গিয়েছিল ওর বন্ধুদের ঝাঁকে। ওখান থেকে ভেসে আসছিল গানের সুর। ভিড়ে ভর্তি কামরাটায় হারিয়ে যাওয়ার আগে এক ঝলক ওকে দেখতে পেয়েছিল জেমস। ভিক্টরি ওর থেকে পাঁচ বছরের বড়। জেমসকে বলেওছিল ওর কামরায় বসার জন্য। কিন্তু জেমস ওর সাথে ততটা ফ্রী হতে পারেনা যতটা রোজ এর সাথে পারে। তারওপর আরো গোটাচারেক মেয়ের পিক্সি পাওডার আর হেয়ার কেয়ার চার্মস বিষয়ে একঘেয়ে বকরবকর শুনতে শুনতে এই ট্রেন সফরটা করার একফোঁটা ইচ্ছেও ওর মনে জাগেনি। ভিক্টরির এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, অচেনা অজানাদের সাথে খুব তাড়াতাড়ি বন্ধুত্ব করার। যে কারনেই জেমস ঠিক করে নেয় এই সফরটা ও একলাই যাবে। যদিও একাকীত্ব আর উৎকণ্ঠা ওকে ক্রমশ গ্রাস করছিল।

     ওর এত উৎকণ্ঠার কারন কিন্তু হগওয়ারটসে যাওয়া নিয়ে নয়। এর জন্য ও অনেকদিন ধরেই অপেক্ষা করে আছে। অন্তত যবে থেকে ও বুঝেছে একজন উইজার্ড হওয়ার মানেটা ঠিক কি। সেইদিন থেকে যেদিন ও মামের কাছে জানতে পেরেছিল ওটা একটা গোপন স্কুল উইচ আর উইজার্ডদের ম্যাজিক শেখার জন্য। প্রথমবারের জন্য ওখানে গিয়ে কিছু শেখার আগ্রহ, ব্যাকপ্যাকে বয়ে বেড়ানো জাদুদন্ডটাকে ব্যবহার করতে শেখার ইচ্ছে ওকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতো সব সময়। তার চেয়েও বড় একটা স্বপ্ন ওকে উত্তেজিত করে দিত, আর সেটা হল হগওয়ারটসের মাঠে কুইডিচ দেখা ও খেলা…নিজের জন্য একটা উড়ন্ত ঝাড়ু পাওয়া… দলের জন্য জানপ্রান লড়িয়ে দেওয়া… হয়তো এগুলোর জন্যই… হয়তো…

     আর তখনই একটা বিরাট ভয় ওর সব স্বপ্ন উত্তেজনাতে জল ঢেলে দিত। ওর ড্যাড ছিল গ্রিফিনডোর এর  সিকার, হগওয়ারটস এর ইতিহাসে সবচেয়ে কনিষ্ঠতম। জেমসের প্রথম লক্ষ্য হবে ওই রেকর্ডটাকে ছোঁয়া। এটাই সবাই আশা করে ফেমাস হিরোর প্রথম সন্তানের কাছ থেকে। বারবার শোনা গল্পটা ওর মনে পড়ে [যদিও ওর ড্যাড  ওটা কোনোদিনই ওকে শোনাননি], কি করে উড়ন্ত ঝাড়ুর ওপর থেকে ছোট্ট হ্যারি পটার প্রায় লাফ দিয়ে পড়ে যেতে যেতে প্রথম গোল্ডেন স্নিচটাকে পাকড়াও করেছিল। গল্পটা যারাই বলেছে তারাই হাসিতে ফেটে পড়েছে শেষটা বলার সময় – কারন হ্যারি ওটাকে প্রায় গিলেই ফেলেছিল মুখ দিয়ে ধরার পর। ড্যাড যদি ঘটনাচক্রে ওই গল্পটার সময় ওখানে উপস্থিত থাকতেন তাহলে লজ্জা লজ্জা একটা হাসি ফোটানোর চেষ্টা করতেন ওটা শুনে। চারবছর বয়স যখন জেমসের তখন ও সেই গোল্ডেন স্নিচটাকে একদিন খুঁজে পায় ডাইনিং রুমে একটা পুরনো জুতোর বাক্সের মধ্যে। মাম বলেছিল ওটা নাকি ড্যাডকে তখন কার হেডমাষ্টার উপহার দিয়েছিলেন। সোনালী বলের মত স্নিচটা নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছিল পাতলা ধুলোর আস্তরণে। ছোট ছোট পাখনাগুলো আর কাজ করেনা। তবুও ওটা ছিল একটা গোল্ডেন স্নিচ যা যেমস অত কাছ থেকে প্রথমবার দেখে। ওজনটাও ছিল ওর ছোট্ট হাতের পক্ষে চমকে দেওয়ার মতই। জেমস সত্যিই অভিভূত হয়ে গিয়েছিল, এই সেই বারংবার শোনা গল্পের বস্তু যেটাকে আমার ড্যাড পাকড়াও করেছিল। ওটাকে নিজের কাছে রাখতে পারে কিনা সেটা জানতে চেয়েছিল হ্যারির কাছে। আনন্দের সাথেই অনুমতি দিয়েছিল হ্যারি। আর তারপর থেকে ওটার জায়গা হয়ে যায় ওর বিছানার মাথার দিকটায়, ওর খেলনা উড়ন্ত ঝাড়ুটার পাশেই। ও ভেবে নিয়েছিল বিছানার মাথার দিকটা ওর নিজস্ব কুইডিচের লকার। নিজের একান্ত কল্পনার জগতটায় ও প্রচুর সময় কাটিয়ে দিয়েছে তারপর থেকে একটা সবুজ কুইডিচ পিচে। ওর সামনে উড়ে যাচ্ছে সেই গল্পের গোল্ডেন স্নিচ… ও তাড়া করছে…একদম শেষ মুহূর্তে অবিশ্বাস্য একটা লাফ মেরে ওটাকে ও ধরে ফেললো… হাততালিতে ফেটে পড়লো উদগ্রীব জনতা।

     কিন্তু কি হবে যদি জেমস স্নিচটাকে জেমস সত্যিই ধরতে না পারে, যেমনটা পেরেছিলেন ওর ড্যাড? কি হবে যদি ও উড়ন্ত ঝাড়ু সামলে ঠিকঠাক উড়তে না পারে? আঙ্কল রন অবশ্য বলেছিল, ঝাড়ুতে ওড়াটা পটারটদের রক্তে আছে ঠিক যেমন একটা ড্রাগনের স্বভাব আগুন উগড়ানো। কিন্তু জেমসের ক্ষেত্রে যদি সেটা ভুল প্রমানিত হয়? কি হবে ও যদি ধীরগতির হয় বা অগোছালো কিম্বা যদি ও পড়ে যায় ওড়ার সময়? কি হবে যদি দলেই চান্স না পায়? প্রথমবার্ষিকীদের কাছে সেটা অবশ্য মাঝারী মানের একটা ধাক্কা। কারন অনেক নিয়মটিয়ম বদলে তবেই এক আধজন ছাত্র বা ছাত্রী প্রথম বছরেই দলে সুযোগ পায়। জেমস সেজন্যই খুব একটা আশা করতেও পারছে না। কিন্তু কুইডিচের প্রথম ধাপটা না পার হতে পারলে ও সেই ছেলেটার সমান কি করে হবে যে বাসিলিস্ককে হারিয়েছিল, জিতেছিল ট্রাইউইজার্ড কাপ, একত্র করেছিল ডেথলি হ্যালোজদের এবং …. শুভ সময়কে ফিরিয়ে আনার জন্য নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল অন্ধকারের সম্রাট ভয়ানক উইজার্ড মোলডি ভলডিকে…?

     ট্রেনটা নড়লো, শোনা গেল ঘষটানির চিরপরিচিত শব্দ। বাইরে থেকে শোনা গেল কন্ডাকটরের কন্ঠ, ‘দরজা বন্ধ হচ্ছে।’ জেমস এখনো সেই সরু পথটাতেই দাঁড়িয়ে আছে। কিছু করার আগেই হেরে যাওয়ার অনুভূতিতে ওর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল এক ঠাণ্ডা জলের স্রোত। বাড়ির জন্য মনটা কেমন যেন করে উঠলো। চোখ দুটো ভরে উঠতে চাইছিল জলে।

     জেমস পরের কম্পারটমেন্টটার দিকে তাকালো। ভেতরে দুটো ছেলে বসে। চুপচাপ তাকিয়ে আছে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে। যেখানে প্ল্যাটফর্ম নাম্বার ৯ পূর্ণ ৩/৪ আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে পেছন দিকে। জেমস দ্রুত দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। জানলা দিয়ে তাকালো বাইরের দিকটায় যদি একবার ওর পরিবারের কাউকে দেখা যায়। অন্তত একবার। সকালের সূর্যালোক কাঁচে পড়ে ওর দৃষ্টি ঝাপসা করে দিচ্ছিল। কাঁচেরগায়ে দেখা যাচ্ছিল ওরই প্রতিবিম্ব। কতশত মানুষ বাইরে; না তার মধ্যে ও কাওকেই দেখতে পেল না। তবুও খুঁজতে থাকলো। আঁতিপাতি করে। আরে, হ্যাঁ ওই তো, ওই তো ওরা। ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ওদের ও ছেড়ে এসেছিল। ওর প্রিয় সেই মানুষগুলো। একসাথে দাঁড়িয়ে। স্মিত হাসি মুখে। ওরা ওকে দেখতে পাচ্ছে না, কি করে পাবে… ওরা তো জানেই না ও কোনখানে জায়গা পেয়েছে।

     বিল আঙ্কল আর ফ্লেউর আন্টি বেশ খানিকটা পেছনে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত হাত নাড়ছেন আর গুডবাই বলেই চলেছেন ভিক্টরিকে। ড্যাড ও মাম এর চোখেও খোঁজের ছায়া। ওরাও খুঁজছেন জেমসকে। আলবাস ধরে আছে ড্যাডের হাত আর লিলি মামের। রক্তলাল রঙের দানব আকৃতির ইঞ্জিনটা গলগল করে উগড়ে চলেছে সাদা ধোঁয়া, হিসহিসে ধ্বনির সাথে বাড়ছে গতি। আর ঠিক সেই সময় মাম দেখতে পেল ওকে। ঝলমল করে উঠলো মুখটা। কিছু একটা বললেন উনি, সেটা শুনতে পেয়ে ড্যাড তাকালো। হাত নাড়লো হ্যারি। মুখে গর্বের হাসি। চোখটা একবার মুছে নিলেন মাম। জেমস হাসলো না, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো। মনের ভেতরটা কিছুটা হলেও বেশ হাল্কা লাগছিল ওর। এগিয়ে চললো ট্রেন, পিছিয়ে গেলেন ওরা, ওদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরাও। জেমস একভাবেই তাকিয়ে থাকলো যতক্ষণ না সব কিছু প্ল্যাটফরমের দেওয়ালের পেছনে মিলিয়ে গেল। ব্যাকপ্যাকটা নিচে নামিয়ে ধপ করে সিটে বসলো জেমস। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর ভেতর থেকে।

     অনেকটা সময় নিস্তব্ধে কাটালো জেমস জানলা দিয়ে লন্ডন শহরের আস্তে আস্তে পিছিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে। শহর ছেড়ে শহরতলী সেখান থেকে শিল্পকারখানা অঞ্চল। সব জায়গাতেই সকালের উজ্জ্বল আলোয় মানুষের ব্যস্ত জীবনের চলমান ছবি। ও ভাবার চেষ্টা করলো, যেটা ও প্রায়ই করে, একজন ম্যাজিকের সংসর্গবিহীন মানুষের জীবনটা ঠিক কেমন? ঈর্ষাও হচ্ছিল ম্যাজিকহীন শাসনহীন স্কুল বা কাজকর্মের কথা ভেবে [যেটা সঠিক ভাবনা নয় হয়তো]।

     কামরার বাকিদুটি ছেলের দিকে এবার ও নজর দিল। একজন বসে আছে ওর দিকেরই একটা সিটে, দরজার কাছে। বেশ বড়সড় শরীর, চৌকো মুখ, চুল ছোট করে কাটা। মনোযোগ দিয়ে দেখছে একটা “এলিমেন্টাল ম্যাজিকঃ হোয়াট টু নো ফর দি নিউ উইচ অ্যান্ড উইজার্ড” নামের একটা ছবিওয়ালা  বুকলেট। প্ল্যাটফর্মের একটা ছোট্ট স্টলে ওগুলো বিক্রি হচ্ছিল। ছেলেটি বইটার পাতা উল্টানোর সময়ে জেমস দেখতে পেল কভারে একটা সুন্দর দেখতে অল্পবয়সী উইজার্ড পাশে রাখা ট্রাংক থেকে একের পর এক জিনিষ বার করেই চলেছে। এই মাত্র বার করলো একটা গাছ যার ডালে ডালে চিজবারগার ঝুলছে ফলের বদলে।

     এবার জেমস তাকালো দ্বিতীয় ছেলেটির দিকে। যে ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল হাসিমুখে।

     হঠাৎ ছেলেটা বললো, ‘আমি একটা বিড়াল এনেছি আমার সাথে। জেমস দেখলো ছেলেটির পাশেই একটা জালের ছোট্ট গেট লাগানো একটা বাক্স রাখা আছে। ভেতরে একটা কালো সাদা রঙের বিড়াল একমনে থাবা পরিষ্কারে ব্যস্ত। ‘তোমার নিশ্চয় বিড়ালে অ্যালার্জি নেই?’,

     ‘নাহ,’ জেমস উত্তর দিল, ‘আমার মনে হয় না। আমাদের নিজেদের একটা কুকুর আছে আর হারমায়োনি আন্টির একটা বিড়ালের লোমের বিরাট কার্পেট আছে। কোনদিন কিছু হয়নি আমার।’

     ‘যাক ভালই হলো তাহলে,’ ছেলেটি খুশীই হলো। জেমস বেশ মজা পাচ্ছিল ছেলেটির আমেরিকান অ্যাক্সেন্টে কথা বলা শুনে। ‘আমার মা বাবা দুজনেরই বিড়ালে অ্যালার্জি। যে কারনে ইচ্ছে থাকলেও কোনদিন বিড়াল পুষতে পারিনি। এখানে যখন সুযোগটা পেলাম একটা কোন প্রানী নিয়ে যাওয়ার এবং জানলাম বিড়াল নেওয়া যাবে, সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। ওর নাম থাম্বস। জানো ওর প্রত্যেক পায়ে একটা করে আঙুল বেশী আছে। আমি জানি এটা কোন ম্যাজিক নয় কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং কি বলো? তুমি কি এনেছ?’

     ‘একটা প্যাঁচা। আমাদের পরিবারের ও অনেকদিন ধরে আছে। একটা বেশ বড় এবং বুড়ো লক্ষী প্যাঁচা। যদিও আমি একটা ব্যাং আনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ড্যাড বললো একটা প্যাঁচা দিয়েই প্রথম বছরটা শুরু করা ভালো। উনি বলেছেন প্রথম বছরে জীবজন্তু তেমন কাজে লাগে না। অবশ্য আমার মনে হয়, ওনার প্রথম বছরে প্যাঁচা ছিল তাই চেয়েছেন আমিও ওটা সাথে রাখি।’

     ছেলেটি হাসলো, ‘ও! তার মানে তোমার ড্যাড একজন উইজার্ড? আমার বাবা অবশ্য একজন সাধারন মানুষ। মাও তাই। আমিই প্রথম ওটা হতে চলেছি। গত বছরেই আমরা এর সম্ভাবনার কথা প্রথম জানতে পারি। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না! আমার কাছে ম্যাজিক মানে ছিল জন্মদিনের পার্টিগুলোতে হয় সেইসব ব্যাপার। একজন কালো লম্বা টুপি পরা মানুষ যিনি তোমার কান থেকে বা অন্য কোন জায়গা থেকে ডলার জাতীয় কিছুর আবির্ভাব ঘটিয়ে দেখাবেন। ওয়াও! তুমি প্রথম থেকেই জানতে তাই না তুমি একজন উইজার্ড?’

     ‘হ্যাঁ তা বলতে পারো। ক্রিসমাসের দিন যদি দ্যাখো যে তোমার দাদু দিদা ফায়ারপ্লেসের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছেন তাহলে তুমি তো জানতে চাইবেই ব্যাপারটা কি, তাই না?’ কথাগুলো বলতে বলতে জেমস লক্ষ্য করলো ছেলেটার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। ‘অবশ্য এসব ব্যাপার এখন আমার গাসওয়া হয়ে গেছে। আর অবাক হইনা।’

     ছেলেটি একটা সিটি মেরে বললো, ‘দারুন একটা ব্যাপার যাই বলো। তুমি খুব লাকি। আরে আমার নামটাই তো বলা হয় নি। আমার নাম জ্যান ওয়াকার। বুঝতে পেরেছ কিনা জানি না তাই জানিয়ে রাখি আমি স্টেটস থেকে এসেছি। আমার ড্যাড অবশ্য অনেক দিন ধরেই ইংল্যান্ডেই কর্মরত। সিনেমা জগতের সাথে যুক্ত। শুনতে যতটা চমকদার আসলে তেমন কিছু নয় যদিও। সামনের বছর বোধহয় আমাকে আমেরিকার উইজার্ড স্কুলেই ফিরে যেতে হবে। এ বছরটা হগওয়ারটস সেই কাটাতে হবে আমাকে। আশা করছি আমার কাছে যেটা বেশ ঝাক্কাস হবে। যদি না ওরা আমায় কিডনী বা মাছ জাতীয় কিছু ব্রেকফাস্টে খেতে দেয়। আমি তাহলে সব উগড়ে দেব। যাই হোক তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুশী হলাম।’ গড়গড় করে এতসব কথা বলে ছেলেটা থামলো এবং উঠে এসে জেমসের সাথে হ্যান্ডশেক করলো। জেমস আর একটু হলেই হো হো করে হেসে ফেলেছিল ছেলেটির প্রানহীন যান্ত্রিক আচরণ দেখে। যদিও করমর্দনটা স্মিত হেসেই করলো। বললো, ‘আমার নাম পটার। জেমস পটার।’

     জ্যান খাড়া হয়ে বসলো। জেমসকে দেখলো কৌতূহলী চোখে। ‘পটার। জেমস পটার।’ বিড় বিড় করে বললো নামটা। জেমস পারিবারিক গর্বের একটা ছোঁয়া অনুভব করলো প্রানে মনে। ওকে যে সবাই চেনে এটা ও উপভোগ করে যথেষ্টই যদিও ভান করে এটা ওর একদমই পছন্দ নয়। জ্যান এবার চোখ কুঁচকে মিচকি হেসে বললো, ‘কিউ কোথায়? ডাবল ও সেভেন?’

     জেমস হতভম্বের মত বললো, ‘মানে?’

     ‘মানে আবার কি? ওহ বুঝলাম এবার, সরি!” জ্যানের মুখে হতাশার ছাপ পড়লো। ‘আমি ভেবেছিলাম তুমি জেমস বন্ড এর অনুকরণ করছো। ওর মত করে বলাটা কিন্তু বেশ কঠিন।’

     “জেমস কে?” জেমস জানতে চাইলো, এটা বুঝেই জ্যান যা বলছে সেটা ওর মাথায় ঢুকছে না। “তাছাড়া  অনুকরণ করা মানে? তোমার কথাগুলো যেন কেমন কেমন?”

     “তোমার পদবী পটার?” এ প্রশ্নটা এলো তৃতীয় ছেলেটার কাছ থেকে। হাতে ধরা বুকলেটটা একটু নামিয়েছে।

     “হ্যাঁ। জেমস পটার।”

     ‘পটার!” জ্যান এক অদ্ভুত ধরনের উচ্চারনে বললো। “জেমস পটার!” তারপর নিজের হাতের মুঠোটা মুখের সামনে এনে তর্জনীটা সিলিং এর দিকে পিস্তলের ভঙ্গীমায় রাখলো।

     জ্যানকে পাত্তা না দিয়ে বড়সড় ছেলেটা বললো, ‘তুমি কি হ্যারি পটার নামক ছেলেটির সাথে সম্পর্ক যুক্ত? এক্ষুনি আমি ওর বিষয়ে পড়ছিলাম “ব্রিফ হিস্ট্রি অফ ম্যাজিক্যাল ওয়ার্ল্ড” লেখাটায়। যা মনে হল ওই ছেলেটি এক বিরাট কিছু।’

     জেমস হেসে বলল, ‘উনি আর ওই ছোট ছেলেটি নন। উনি আমার ড্যাড। রোজ সকালে ওকে হুইটাবিক্স খেতে দেখলে তোমার মোটেই ওকে বিরাট কিছু ব্যাপার বলে মনে হবে না।’ যদিও এটা পুরো সত্যি নয় তবুও বিখ্যাত হ্যারি পটারকে সাধারন অবস্থায় দেখার গল্প বললে সকলে বেশ স্বস্তিবোধ করে। স্বাস্থ্যবান ছেলেটি ভুরু কপালে তুলে ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে বললো, ‘উও! কুল। এখানে লেখা আছে উনি এখনো অবধি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শয়তান উইজার্ডকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। কি যেন নামটা ছিল…উম ম ম…’ বইটার  মুখ গুঁজে পাতা উল্টাতে থাকলো। ‘এখুনি কোথায় যেন দেখলাম। ভল্ডা-হোয়াটিসিট না কি যেন।’

     ‘হ্যাঁ। ওটা সত্যি। কিন্তু এখন উনি কেবলমাত্রই আমার ড্যাড। ওসব অনেক পুরানো ঘটনা।’ জেমস বললো।

     ইতিমধ্যে ছেলেটি নজর দিয়েছে জ্যান এর দিকে।

     ‘তুমি তো মাগল?’ প্রশ্নটা শুনে জ্যান থতমত খেয়ে গেল। ‘হোয়াট! আমি কি?’

     ‘তোমার বাবা মা উইজার্ড বা উইচ নন নিশ্চয়। যেমন আমার বাবা মাও নন।’ ছেলেটি বেশ গম্ভীর ভাবে জানালো। ‘আমি জাদু জগতের ভাষা আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি। আমার ড্যাড বলেছেন এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিকভাবে। উনি একজন মাগল, কিন্তু “হগওয়ারটস – আ হিস্ট্রি” উনি গুলে খেয়েছেন। আসার সময় উনি কতশত তথ্য যে জানিয়েছেন কি বলবো। আমাকে যা হোক প্রশ্ন করো’ জ্যান আর জেমসের দিকে তাকাতে তাকাতে বললো।

     জেমস জ্যান এর দিকে তাকালো, জ্যান মাথা নাড়িয়ে প্রশ্ন করলো, ‘৪৩ কে ৭ দিয়ে গুন করলে কত হয়?’

     তৃতীয় ছেলেটি চোখ পাকিয়ে সিট চাপড়ে বলল, ‘ওসব না। হগওয়ারটস এবং জাদুজগত নিয়ে প্রশ্ন করো।’

     ‘আমি একটা নতুন জাদুদন্ড এনেছি,’ জ্যান বললো, ছেলেটির কথা এড়িয়ে এবং ঘুরে বসে নিজের ব্যাকপ্যাক হাতড়াতে থাকলো। ‘এটা বারচ কাঠের তৈরী সাথেই ইউনিকর্নের লেজ না কি যেন আছে। এটাকে ব্যবহারের সুযোগ এখনো হয়নি। খুব একটা চেষ্টাও করিনি বলতে পারো।’ ঘুরে তাকাল এবং হলুদ কাপড়ে মোড়ানো দন্ডটা ওপরে তুলে নাড়ালো।

     বড়সড় ছেলেটা এবার বললো, ‘আমার নাম র‍্যালফ। র‍্যালফ ডিডল। আমিও গত পরশুদিনই আমার জাদুদন্ডটা হাতে পেয়েছি। ওটা উইলো কাঠের তৈরি। সাথে আছে হিমালয়ান ইয়েতি হুইস্কার কোর।’

     জেমস অবাক হয়ে বললো, ‘কি আছে?’

     ‘হিমালয়ান ইয়েতি হুইস্কার কোর। খুবই দুষ্প্রাপ্য, যিনি এটা বিক্রী করেছেন তিনিই বলেছেন। কুড়ি গ্যালিয়ন গেছে ড্যাডের পকেট থেকে এর জন্য। যার মানে বেশ পরিমাণ ভালো অর্থ বলেই আমার মনে হয়।’ জ্যান আর জেমস এর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘কি হল তোমাদের?’

     ভুরু কপালে তুলে জেমস জানালো, ‘আসলে আমি কোনদিন হিমালয়ান ইয়েতির বিষয়ে শুনিনি।’

     র‍্যালফ সোজা হয়ে বসে সামনের দিকে একটু ঝুঁকলো। ‘ওহ, সত্যি বুঝি, ঠিক আছে। কিছু মানুষ ওদের বলে অ্যাবোমিনেবল স্নোমেন। জানো, আমিও ভাবতাম ওরা কল্পনার প্রাণী। কিন্তু এই জন্মদিনে আমি জানতে পারলাম আমি একজন উইজার্ড। আর মজা হল আমি উইজারডদেরকেও কল্পনার জগতের জিনিষ বলেই মনে করতাম!  আস্তে আস্তে আমি বুঝতে পারছি যে সব জিনিষকে আমি এতদিন আজগুবি ভেবে এসেছি সবকিছু সত্যিতে পরিণত হচ্ছে।’ বলেই আবার বুকলেটটা তুলে নিল আর পাতা উল্টাতে থাকলো, ভুলেই গেল যেন বাকি দুজনকে।

     ‘কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করতে পারি? খুব কৌতুহল হচ্ছে’, জেমস বললো। ‘জানতে চাইছি যে তুমি কোথা থেকে তোমার জাদুদন্ডটা কিনেছ?’

     র‍্যালফ হাসলো। ‘হুম, এবার আমরা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটার মুখোমুখী হলাম মনে হচ্ছে, তাই না? মানে, আমি যেখান থেকে এসেছি সেই সারেতে তো আর যেখানে সেখানে জাদুদন্ড বিক্রেতাদের দেখা মেলে না। সে জন্যই আমরা এই শহরে একটু আগেভাগেই এসেছিলাম এবং খুঁজে নিয়েছিলাম ডায়াগন অ্যালি কোথায়। কোন সমস্যাই হয়নি! ওখানে একটা লোক বসেছিল রাস্তার কোনায় একটা ছোট্ট বুথে।’

     জ্যান এর চোখে মুখে আগ্রহের বন্যা।

     ‘একটা ছোট্ট বুথে’, জেমস বিড় বিড় করলো।

     ‘হ্যাঁ! একদম, যদিও খোলাখুলি কোন জাদুদন্ড ওর সামনে ছিল না। লোকটা ম্যাপ বিক্রি করছিল। ড্যাড একটা কিনলো আর জানতে চাইলো কি করে সেরা জাদুদন্ড বানানেওয়ালার কাছে যাওয়া যায়। আমার ড্যাড সিকিউরিটি সফটওয়ার উদ্ভাবন করেন। কমপিউটারের জন্য। বলিনি বোধহয়? যাইহোক, উনি খোঁজ করলেন সবসেরাটা পাওয়ার জন্য। আর জানা গেল ম্যাপবিক্রেতাই সেই সেরা মানুষ। সামান্য কিছু বানান বছরে। আর সেগুলো বিক্রি করেন কেবলমাত্র তাদেরই যারা সেরাটাই খোঁজেন। আর আমার ড্যাড কিনলেন সবচেয়ে সেরাটা যা ওর কাছে ছিল।’

     জেমস চেষ্টা করছিল মুখটা স্বাভাবিক রাখার। ‘সবচেয়ে সেরাটা যা ওর কাছে ছিল’, পুনরাবৃত্তি করলো।

     ‘ইয়া,’ র‍্যালফ সম্মতি জানালো এবং নিজের ব্যাকপ্যাক এর ভেতর থেকে বার করে আনলো রোলিং পিন এর মাপের কিছু একটা যা ব্রাঊন পেপার দিয়ে মোড়ানো।

     ‘সেই জিনিষ যাতে আছে ইয়েতি কোর’, জেমস বললো।

     র‍্যালফ জেমসের দিকে তাকালো, অর্ধেকটা খোলা হয়েছিল বাদামী মোড়ক। ‘তোমার কথা বলার ধরণটা যেন কেমন কেমন, ঠিক বলছি কি?’ একটু হতাশভাবেই বললো। ‘ধ্যাত তেরি।’

     মোড়কটা খুলতেই ওটা দেখা গেল। ১৮ ইঞ্চি লম্বা প্রায় ঝাড়ুলাঠির মতো মোটা। পেছনের দিকটা ভোঁতা শঙ্কু আকৃতির এবং হলদেটে সবজে রঙ করা। ওরা সবাই কিছুক্ষন ওটা দেখলো। কিছুক্ষনবাদে র‍্যালফ জেমসের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘তোমার কি মনে হচ্ছে এটা ম্যাজিক্যাল কিছু করার মতো নয়?’

     জেমস ঘাড় কাত করে বললো, ‘আমার তো মনে হচ্ছে ভ্যামপায়ার মারতে এটা ভালই কাজে আসবে?’

     ‘সত্যি?’ র‍্যালফ এর মুখটা চকচক করে উঠলো।

     জ্যান কামরার দরজার দিকে আঙ্গুল তুলে বললো, ‘উও! কত রকম খাবার! হেই জেমস, তোমার কাছে কি ওই সব বিদ্ঘুটে জাদু অর্থ আছে? আমার খুব খিদে পেয়েছে?’

     বৃদ্ধা উইচটি খাবারের চলমান দোকানটি সহ দরজা দিয়ে উঁকি মারলো। ‘কেউ কি কিছু নেবে বাছারা?’

     জ্যান লাফিয়ে উঠে হতবাকের মত মহিলাটির সাজপোষাক দেখতে থাকলো। তারপর জেমসের দিকে ঘুরে বললো, ‘কাম অন পটার, এটাই সুযোগ আমাদের মত মাগলদের সম্মান জানানোর একজন ছোট্ট উইজার্ড এর মহানুভবতা দিয়ে। আমার কাছে কেবলমাত্র একটা আমেরিকান ১০ ডলারের নোট আছে।’ ফিরে তাকিয়ে উইচটাকে বললো। ‘আপনি তো বোধ হয় আমেরিকান সবুজ কাগজ নেবেন না, তাই না?’

     চোখ পিট পিট করে উনি বল লেন, ‘আমেরিকান সবুজ … ঠিক  বুঝলাম না বাছা?’

     ‘ড্র্যাট তো আমার কাছে নেই’, জ্যান বললো জেমসের দিকে হাত নাড়তে নাড়তে।

     জেমস নিজের জিন্সের পকেট হাতড়াতে থাকলো ছেলেটির ছটফটানি দেখে। ‘জাদুর অর্থ মোটেই খেলা করার অর্থ নয়, বুঝেছো,’ গম্ভীরভাবে বললেও মুখে হাসি ছিল জেমসের।

     র‍্যালফ বুকলেট থেকে মুখ তুলে বললো, ‘ও কি এক্ষুনি ড্র্যাট বললো, তাই না?’

     জ্যান আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলো, ‘ও হো হো! দ্যাখো দ্যাখো! কলড্রন কেকস! আর লাইকোরাইস ওয়ান্ডস! তোমরা উইজার্ডরা সত্যিই জানো কিভাবে পরিবর্তনকারী জিনিষ বয়ে বেড়াতে হয়। মানে আমরা উইজার্ডরা। হি হি!’

     জেমস দাম মিটিয়ে দিল আর জ্যান ফিরে গেল নিজের জায়গায়। খুললো একটা লাইকোরিস ওয়ান্ডের বাক্স। সুন্দর করে রঙ্গীন জাদুদন্ডগুলো সাজিয়ে রাখা আছে ভেতরে। জ্যান লালরঙের একটা তুলে নিয়ে র‍্যালফের দিকে তাক করলো। একটা পপ শব্দের সাথে একগুছ বেগুনী ছোট ছোট ফুল র‍্যালফের টী শার্টের ওপর ছড়িয়ে পড়লো। র‍্যালফ তাকালো ওগুলোর দিকে।

     ‘দারুন ব্যাপার, নিজের জাদুদন্ডতো তাও এখনো ব্যবহারই করিনি’ জ্যান বললো লাল ওয়ান্ডটার পেছনে কামড় বসিয়ে।

     জেমস সহসাই বুঝতে পারলো এবং বেশ খুশী হল যে ওর নার্ভাসভাবটা কেটে গেছে, অন্তত অতটা আর নেই। নিজের চকলেট ফ্রগ এর বাক্সটা খুললো এবার, এবং অতি দক্ষতায় ওটাকে পাকড়াও করলো শূন্য থেকে। কারন বাক্স খোলামাত্র ওটা লাফ মেরেছিল, প্রথম গ্রাসে ওর মাথাটাই খেলো জেমস। এবার বাক্সটার নিচের দিকে তাকাতেই ও দেখতে পেল ওর ড্যাড ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। “হ্যারি পটার, দ্য বয় হু লিভড”, লেখার রিবনটা কার্ডটার তলা দিয়ে একাদিক্রমে ঘুরে চলেছে। ও কার্ডটা বার করে নিয়ে র‍্যালফকে দিল।

     ‘এই নাও। একটা ছোট্ট জিনিষ আমার নতুন মাগলজাতক বন্ধুর জন্য,’ কথাটা শুনে র‍্যালফ নিলো। ঠিকঠাক শুনলো কিনা সন্দেহ আছে কারন ও ব্যস্ত ছিল সেই বেগুনী ফুলগুলো চিবানোর কাজে। ‘আমি সঠিক বলতে পারবো না, তবে মনে হচ্ছে এগুলো তৈরী হয়েছে ডিমের সাদা অংশের সাথে চিনি মিশিয়ে।’

***

     প্রাথমিক উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার রেশ কাটার পর বাকি ট্রেন যাত্রাটা মোটামুটি একঘেয়ে একটা ব্যাপারে পরিণত হল। জেমস বেশ বুঝতে পারলো নতুন বন্ধুদের কাছে ওর ভুমিকাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকটা জাদুজগতের গাইডের মত অথবা বোকার মত ওদের বকবকানি শোনার শ্রোতা, যেখানে ওদের আলোচনা মাগলদের জীবনযাত্রা ও ভাবনার সাথেই সম্পর্ক যুক্ত। ও অবাক হলো এটা জেনে যে ওরা জীবনের একটা বিরাট সময় ব্যয় করে কেবল মাত্র টেলিভিশন দেখে। আর তা না হলে ওতেই বন্ধুদের সাথে ড্রাইভিং বা অ্যাডভেঞ্চার গেম খেলে। জেমস টেলিভিশন এবং ভিডিও গেমের বিষয়ে জানে, এবং অন্যান্য উইজার্ড বন্ধুদের মতই বিশ্বাস করে মাগলদের ছেলেমেয়েরা সেই সব জিনিষের পেছনেই বেশী সময় ব্যয় করে যেখানে বিশেষ ভালো কিছু করে দেখানোর মতো নেই। ও যখন র‍্যালফকে জিজ্ঞাসা করলো, আসল মাঠে গিয়ে না খেলে কেন ওরা ভিডিও গেম খেলে, র‍্যালফ অবজ্ঞার চোখে ওর দিকে তাকালো আর একটা তাচ্ছিল্যসূচক শব্দ করলো এবং জ্যানের দিকে তাকালো। জ্যান জেমসের পিঠ চাপড়ে বললো, ‘জেমস, এসব মাগলদের ব্যাপার। ও তোমার মাথায় ঢুকবে না।’

     জেমস যতটা পেরেছে ওদের জানিয়ে দিয়েছে জাদুস্কুল ও জাদুজগত সম্পর্কে। জানিয়েছে স্কুলের দুর্গটার ক্রমপরিবর্তনীয় স্বভাবের কথা। একে কোন ম্যাপে খুঁজে পাওয়া যাবে না যদি না জানা থাকে এর অবস্থানটা ঠিক কোথায়। ড্যাড এবং মামের কাছে যেমন টা শুনেছিল স্কুল হাউস এবং হাউস পয়েন্টস বিষয়ে সেটাও বলেছে। চেষ্টা করেছে, যতটা ওর পক্ষে সম্ভব ততটা সোজা করে কুইডিচ বিষয়ে বোঝাতে। যদিও ওটা ওদের আরো কনফিউজ করে দিয়েছে, কোন উৎসাহই দেখা যায়নি ওদের দিক থেকে। জ্যান এর আবার ধারনা ছিল কেবলমাত্র উইচরাই উড়ন্ত ঝাড়ু ব্যবহার করতে পারে। “উইজার্ড অফ দ্য ওজ” নামের সিনেমা দেখে ও এটা ভেবে নিয়েছে। জেমস জানাল  ঊড়ন্ত ঝাড়ু মোটেই ‘কেবলমাত্র মেয়েদের জন্য নয়’, ওটা উইচ ও উইজার্ড উভয়েই ব্যবহার করে। জ্যান এটাও বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে সব উইচদের গায়ের রঙ সবুজ হয় এবং নাকে বড় আঁচিল থাকে।

     জানলার বাইরে আকাশের রঙ যখন ফ্যাকাশে বেগুনী হয়ে সন্ধে হওয়ার সংবাদ দিচ্ছে, গাছগুলো ক্রমশ পরিণত হচ্ছে সিল্যুয়েটে, ঠিক তখনই ওদের কম্পারটমেন্টের দরজায় এসে দাঁড়ালো সুন্দর করে ছাঁটা ব্লন্ড চুলের একটি লম্বা ছেলে, বয়সে ওদের চেয়ে বড়। ভেতরে এসে জানালো, ‘হগসমীড স্টেশন আসছে, তোমাদেরকে এবার স্কুলের ড্রেসটা পড়তে হবে।’

     জ্যান ভুরু কুঁচকে ছেলেটার দিকে তাকালো। জানতে চাইলো, ‘সত্যিই পড়তে হবে নাকি? তুমি ঠিক জানো তো? আর ইউ কোয়াইট সিওর? এখন তো সন্ধে সাতটা বাজে!’ যা শুনে ছেলেটার মুখে একটা হাল্কা ক্ষোভের ছায়া পড়লো।

     ‘আমার নাম স্টিভেন মেজকার। পঞ্চমবর্ষ। প্রিফেক্ট। আর তুমি?’

     জ্যান লাফিয়ে উঠে সেই হাস্যকর যান্ত্রিক ভঙ্গিমায় ছেলেটির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘ওয়াকার। জ্যান ওয়াকার। মিঃ প্রিফেক্ট আপনার সাথে দেখা হওয়ায় খুশী হলাম।’

     স্টিভেন খানিকক্ষণ বাড়ানো হাতটা দেখলো, তারপর কি ভাবলো কে জানে হ্যান্ডশেকটা করেই নিল। তারপর উচ্চস্বরে, যেটা ও সব কম্পারটমেন্টেই করেছে, বললো, ‘স্কুল গ্রাঊন্ডের গ্রেটহলে তোমাদের জন্য এক ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। স্কুলড্রেস পড়া ওখানে বাধ্যতা মূলক। আশা করছি মিঃ ওয়াকার বুঝতে পেরেছেন কারণটা?’ শেষ বাক্যটা বললো জ্যানের দিকে হাত তুলে। ‘বুঝতে পারছি ডিনার করার জন্য পোষাক পড়াটা একটা নতুন ধরনের ব্যাপার তোমাদের কাছে। তবে এসব ব্যাপারে তোমরা দ্রুতই অভ্যস্ত হয়ে যাবে।’ জেমসের দিকে তাকিয়ে চকিতে একবার চোখ টিপে চলে গেল দরজার দিকে।

     ‘আমি তো অভ্যস্ত হব নিশ্চিতভাবেই,’ জ্যান বললো উল্লাসের ধ্বনিতে।

     জেমস ওদের স্কুল ড্রেসটা পড়তে সাহায্য করলো। র‍্যালফ ওটাকে নিজের পেছন দিকে এমন ভাবে ঝুলিয়েছিল জেমসের ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, এই প্রথম যেন একজন অল্পবয়সী ধর্ম প্রচারক ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যান আবার পুরো পোষাকটাই উল্টো করে পড়েছিল এবং বোঝানোর চেষ্টা করছিল এটাই সঠিক স্টাইল। জেমস বোঝালো যে এরকমভাবে পড়াটা স্কুল ও শিক্ষকদের প্রতি অবমাননা বলে বিবেচিত হবে।

     জেমস ভালো করে বারবার ওদের বুঝিয়ে দিয়েছিল পৌঁছানোর পর কি কি ঘটবে। হগসমীড স্টেশন সম্বন্ধে ওর ভালো করেই জানাছিল, বেশ কয়েকবার ছোটবেলায় এসেছে। অবশ্য সেরকম কোন স্মৃতি ওর নেই। তবুও জানতো ওদের নিয়ে যাওয়া হবে ছোট নৌকায় করে লেকের ওপর দিয়ে। আর দুর্গটার তো প্রচুর ছবি দেখে দেখে ওটা প্রায় মুখস্তই হয়ে গেছে। তা সত্বেও বুঝতে পারলো স্থানটির বিশালত্ব ও শান্তমগ্নতার ভাবটা ওর ভাবনার চেয়েও বিরাট মাপের। ছোট্ট নৌকাগুলো জলের ওপর ভি আকৃতির ছবি এঁকে লেকটার ওপর দিয়ে যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, জেমস অবাক চোখে দেখার সাথে সাথেই ভাবতে চেষ্টা করছিল তাদের মনের অবস্থা যারা এখানে কি দেখতে পাবে তার কো্নোরকম চিন্তা ছাড়াই এসেছে। পাথুরে পাহাড়ের ওপরে দুর্গের ক্রমাগত প্রতিভাত হতে থাকা ওকে বিস্ময়াহত করে দিচ্ছিল। ওটার প্রত্যেকটি গম্বুজ সমগ্র দুর্গপ্রাকার এর নির্মাণ নৈপুণ্য আলোকিত হয়ে ছিল একদিক থেকে ঘনিয়ে আশা রাত্রির নীলাভ আলোয় আর অন্য দিকটা অস্তগামী সূর্যের সোনালী আভায়। বিন্দু বিন্দু জানলার এক ছায়াপথ যেন গোটা দুর্গর গাটাকে চাদরের মত ছেয়ে রেখেছিল, যেখান থেকে এক উষ্ণ হলুদ আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল সূর্যের আলো যেন কুচি কুচি হয়ে ছড়িয়ে আছে। সমগ্র দৃশ্যটির প্রতিফলন সব কিছু ভেদ করে পৌঁছে যাচ্ছিল লেকটির কোন অতলতলে। আর এই অতিনাটকীয়তা জেমসকে দিচ্ছিল এক সামগ্রিক স্বস্তির অনুভুতি।

     নতুন চেনা পরিচয় হওয়া ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে এক নৌকা থেকে ওপর নৌকার উদ্দেশ্যে হাঁক ডাক। এমন সময় জেমসের নজরে এলো এমন একটি বিষয় যা ও আশাই করেনি এই পরিস্থিতিতে। আর একটা নৌকা লেকের জলে। এই নৌকাগুলোর মত ওতে কোন লন্ঠন জ্বলছে না। ওটা দুর্গের দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে না। হগওয়ারটসের আলোর থেকে নিজেকে লুকিয়ে ওটা দাঁড়িয়ে আছে, মাপেও বড় নৌকাটা ওদেরগুলোর তুলনায়। তা সত্বেও যথেষ্টই ছোট লেকের ছায়ায় নিজেকে অপ্রকাশ রাখার পক্ষে। একটাই অবয়ব ওটার ওপর, লম্বা এবং রোগা, ঠিক যেন একটা মাকড়সা। জেমসের মনে হল অবয়বটা একটি মহিলার। বিষয়টাকে পাত্তা না দেওয়ার জন্য যেই ও অন্যদিকে তাকাতে যাবে অবয়বটা ওর দিকেই তাকালো, ওর কৌতূহল লক্ষ্য করেই বোধহয়। আবছা আলোয় অনিশ্চিত ওদের চোখে চোখ মিলেছিল, একটা শীতল শিহরন অজান্তেই ছেয়ে গিয়েছিল ওর মনে। নিশ্চিত হয়েছিল ওটা একটা মহিলাই। গায়ের রঙ ময়লা, কঠোর হাড় সর্বস্ব মুখাবয়ব, উঁচু গণ্ডদেশ, সরু থুতনি। প্রায় সব চুলটাই ঢেকে রেখেছে মাথায় বাঁধা স্কার্ফটা দিয়ে। মুখের ভাবে রাগও নেই ভয়ও নেই। আসলে মুখটাতে সত্যি বলতে কোন ভাবের ছোঁয়াই নেই। সহসাই জেমসকে হতভম্বিত করে নৌকা সমেত অবয়বটা অদৃশ্য হয়ে গেল। বার দুয়েক চোখের পলক ফেলতেই জেমস বুঝল না অদৃশ্য হয়নি, জলজ গাছের ঝোপের আড়ালে চলে গিয়েছিল। জেমস মাথাটা একবার ঝাঁকিয়ে নিয়ে হাসল, মনে মনে বললো, একেবারে প্রথমবর্ষের মতই মানসিকতা, তারপর আবার মন দিল এগিয়ে আশা গন্তব্যের ভাবনায়।

     প্রথম বার্ষিকীদের দঙ্গলটা বকবক করতে করতে ঢুকে পড়লো মূল চত্বরে। জেমসও সেই দলটার মধ্যে আটকে গিয়ে খানিকটা অবচেতন ভাবে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে পৌঁছে গেল এক আলোকিত বারান্দায়। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল মিঃ ফিলচ। জেমস যাকে চিনতে পারলো চুলের স্টাইল, গোমড়া মুখ আর ওর সঙ্গী হাতের ওপর থাকা বিড়াল মিসেস নরিসকে দেখে। এবার সামনে এলো সেই মন্ত্রপূত সিঁড়ি, এখনো একইভাবে ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ করে জায়গা বদল করে চলেছে প্রথম বার্ষিকীদের আনন্দকে উদভ্রান্তিতে পরিণত করার জন্য। তার পর ওরা উপস্থিত হল সেই বিখ্যাত গ্রেটহল এর দরজার সামনে। যেখানকার দেওয়ালের প্যানেলগুলো ঝকমক করছিল ঝাড়বাতির আলোয়। যত রাজ্যের বকবকানি পরিণত হল এক চরম নিস্তব্ধতায়।  নিজের থেকে বেশ খানিকটা ঊঁচু  র‍্যালফের  সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জ্যান, হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে ছিল জেমসের দিকে ।

     লম্বা একটু লাজুক ধরনের যে টিচারটি ওদের দরজা পর্যন্ত নিয়ে এলেন, তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। কাঠকাঠ হাসির সাথে হলে চলতে থাকা সকল গুঞ্জন ছাপিয়ে জোরের সাথে বললেন, ‘প্রথম বার্ষিকীদের স্বাগত জানাই হগওয়ারটসে! আমার নাম প্রফেসর লংবটম। এবার তোমাদের বেছে নেওয়া হবে তোমরাকে কোন হাউসে যাবে। আর সেটা হলেই তোমরা পেয়ে যাবে নিজেদের বসার জায়গা। তারপরই পরিবেশিত হবে ডিনার। এবার এসো তোমরা আমার সাথে।’

     উনি নিজের পোষাকটায় এক ঝটকা মেরে ঘুরলেন এবং অতি দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেলেন গ্রেট হলের ঠিক মাঝখানে। একরাশ উৎকণ্ঠা সাথে নিয়ে প্রথম বার্ষিকীর দল ওকে অনুসরণ করলো। প্রথমে ধীর পায়ে তারপর প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে ওনার গতির সাথে তাল মেলানোর জন্য। জেমস দেখলো র‍্যালফ আর জ্যান এর মাথা  পেছন দিকে কাত হয়ে আছে, থুতনি সামনের দিকে ওঠানো। ও ভুলেই গিয়েছিল অবিশ্বাস্য সিলিংটার কথা। তাকালো ওপরের দিকে একটুখানি, ও চায়না অন্যেরা ভাবুক এসব দেখে ও মোহিত হয়ে গেছে। যত উঁচুর দিকে তাকাচ্ছিল ওপরের কড়িবরগাগুলো ক্রমশ স্বচ্ছ হতে হতে মহাকাশের সাথে এক হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল। এক সময় শুধুই অনন্ত সীমাহীন আকাশ। আর সেই আকাশে তারাগুলো জ্বলজ্বল করছিল স্বর্ণকারের কার্পেটে পড়ে থাকা রূপোর গুড়োর মত। আধখানা চাঁদের মনোহরা মুখটা ভেসে ছিল ঠিক গ্রিফিন্ডোরদের টেবিলটার ওপর।

     ‘উনি কি নিজের নাম লংবটম বললেন?’, জ্যান ঠোঁট চিপে জানতে চাইলো জেমসের কাছে।

     ‘হ্যাঁ। নেভিল লংবটম।’

     ‘উফস! তোমরা ব্রীটসরা পারো বটে। কোথা থেকে যে এরকম একটা নাম জন্ম নেয় আমি ভেবেই অবাক হয়ে যাই।’ র‍্যালফ ওকে ইশারা করে কথা থামাতে বললো কারণ হলের ভেতরটাও এই মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে প্রথম বার্ষিকীদের লাইন করে ঢুকতে দেখে।

     জেমস ডায়াসে বসে থাকা টিচারদের দিকে তাকালো, খোঁজার চেষ্টা করলো সেই সমস্ত জনকে যাদের ও চেনে। ওইতো প্রফেসর স্লাগহর্ন, একেবারে মোটাসোটা একটা জাহাজের মতই দেখতে যেমনটা ওর বাবামা বলেছিলেন। স্লাগহর্ন, জেমস মনে করার চেষ্টা করলো, এসেছিলেন একজন সাময়িক টিচার রুপে ড্যাডদের সময়ে, আপাত অনিচ্ছুকভাবে, আর তারপর এখান থেকে গেলেনই না। ওর পাশেই বসে আছেন ভুতুড়ে প্রফেসর বিনস, তারপর প্রফেসর ট্রেলওনি, বিশাল আকারের চশমার পেছন থেকে প্যাঁচার মত দেখছেন সবাইকে। আরো কিছু দূরে, ক্ষুদ্রাকৃতি প্রফেসর ফ্লিটুইক [জেমস দেখতে পেল উনি বসে আছেন চেয়ারের ওপর আর তিনটে মোটা সোটা বই পেতে। আর অনেক মুখ যাদের ও চেনে না, যারা এসেছেন ড্যাড মামদের সময়ে এখনে পড়ার পর। হ্যাগ্রিডকেও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না, তবে জেমস জানে উনি দৈত্যদের সাথেই আছেন গ্র্যাপকে নিয়ে, এবং সময় না হলে এখানে আসবেন না। আর ঠিক মাঝখানে বসেছিলেন এই মাত্র উঠে দাঁড়িয়ে হাত তুললেন যিনি তিনি হেড মিস্ট্রেস  মিনারভা ম্যাকগনাগল।

     ‘বিগত বছরের সমস্ত শিক্ষার্থী এবং এই বছরের নতুনদের স্বাগত জানাই,’ উনি বললেন সামান্য কম্পন যুক্ত তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বরে। ‘হগওয়ারটস স্কুল অফ উইচক্র্যাফট অ্যান্ড উইজারডির নতুন বছরের প্রথম এই ভোজসভায়।’ জেমসের পেছনে বসে থাকা ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে থেকে ধ্বনিত হল উচ্ছাসের শব্দ। ও মাথা ঘুরিয়ে একঝলক দেখে নিল। দেখতে পেল টেড বসে আছে গ্রিফিন্ডোরের টেবিলে একঝাঁক অসম্ভব সুন্দর ছাত্রছাত্রীদের মাঝে। জেমস ওর দিকে তাকিয়ে হাসলো, কিন্তু টেড সেটা দেখতে পেল না।

     উল্লাসধ্বনি মিলিয়ে যেতেই প্রফেঃ ম্যাকগনাগল বললেন, ‘আমি খুবই খুশী হয়েছি তোমরা সকলেই একইরকম আনন্দের উত্তেজনায় ছটফট করছো ঠিক যেমনটা আমরা টিচার্স ও স্টাফরাও উদগ্রীব হয়ে আছি। আশা রাখছি এই দুই এর মেলবন্ধন বজায় থাকবে বছরের বাকি দিনগুলোতে।’ উনি একটু সময় নিয়ে উপস্থিত সকল পুরানো ছাত্র ছাত্রীদের দেখলেন, নজর করলেন বিশেষ কিছুজনকে। জেমস শুনতে পেল আলটপকা কিছু মন্তব্য এবং চাপা হাসি যার সাথে দুষ্টুমি জড়িয়ে আছে।

     ‘আর এবার,’ উনি বলা শুরু করলেন, দুজন পুরানো ছাত্র দ্বারা একটা চেয়ার আনা লক্ষ্য করতে করতে। জেমস একজনকে চিনতে পারলো, ট্রেনে দেখা হয়েছিল, স্টিভেন মেটজকার, প্রিফেক্ট। ‘শুরু হবে আমাদের সেই ঐতিহ্যময় অনুষ্ঠান প্রথম বার্ষিকীদের জন্য। দেখতে পাবো কার জায়গা হয় কোন হাঊসে। প্রথম বার্ষিকীর দল, তোমাদের অনুরোধ জানাচ্ছি মঞ্চের কাছাকাছি আসার জন্য। আমি এক এক করে তোমাদের নাম ডাকবো। সেই মত তোমরা এখানে উঠে এসে বসবে ওই …’

     জেমস বাকি কথাগুলো মনের ভেতরেই শুনতে পেল। ও এই অনুষ্ঠান্টা বিষয়ে সব কিছু জানে, কত শতবার যে ও মাম আর ড্যাডকে এনিয়ে প্রশ্ন করেছে তার ঠিকঠিকানা নেই। একটা সময়ে, এই ব্যাপারটা ওর কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশী আকর্ষণীয় ছিল। আর এই মুহূর্তে ও অনুভব করলো একটা ভয়ের চাদর ওকে আষ্ঠে পৃষ্ঠে মুড়িয়ে নিচ্ছে। এই সরটিং হ্যাট হল প্রথম ধাপ যা ওকে উৎরাতে  হবে যাতে প্রমান হয় ওর বাবামা যা চাইছে ও সেই মানের মানুষ। সেই মানুষ যার জন্য গোটা জাদুজগত অপেক্ষা করে আছে। এটা ওকে এতটা আলোড়িত করতো না যদি না কয়েক সপ্তাহ আগে ডেইলি প্রফেট এর লেখাটা ওর চোখে না পড়তো। একটা মুচমুচে স্বাদু ছোট্ট একটা নিবন্ধ যেখানে আলোচনা করা হয়েছিল “কি পরিণতি হয়েছে বিখ্যাতদের সন্তানদের”। আর সেটাই ওকে ভেতরে ভেতরে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। নিবন্ধটিতে হ্যারি পটারের বিষয়ে আলোচনা ছিল, যে এখন বিবাহিত। স্ত্রীর নাম জিন্নি ওয়েশ্লী। ওদের  ছেলে জেমস পটার এবার যাচ্ছে হগওয়ারটসে। জেমসকে সন্ত্রস্ত করে দিয়েছিল শেষ লাইনটা। যা একেবারে ওর মনে গেঁথে বসে গেছে – “আমরা ডেইলি প্রফেটের সাথে  যারা যুক্ত আছি, জাদুজগতের সাথে যুক্ত সকলের তরফ থেকে, তরুণ মিঃ পটারকে সবরকমের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। যাতে ওর প্রত্যেকটি পদক্ষেপ সফল হয় বা তার চেয়েও বেশি কিছু নিদর্শন উনি রাখতে পারেন আগামীদিনের জন্য। এরকম তো আমরা আশা করবোই একজন মহান ও কিংবদন্তীর সন্তানের কাছ থেকে।”

     আচ্ছা যদি এমনটা ঘটে, জেমস চেয়ারে বসে সর্টিং হ্যাটটা পড়লো আর ওটা ওকে গ্রিফিন্ডোর এর বদলে অন্য কোনো হাউসের জন্য মনোনীত করলো। তাহলে ডেইলি প্রফেট এবং জাদু জগতের অন্যান্যরা কি ভাববেন? এই ভয়টার কথাই ও প্রকাশ বলেছিল ৯ পূর্ণ ৩/৪ এর প্ল্যাটফরমে হ্যারিকে।

     জেমসের কাঁধে হাত রেখে উনি বলছিলেন, ‘হাফলপাফ বা র‍্যাভেনক্ল বা স্লিদারিন এ কিন্তু গ্রিফিন্ডোরের চেয়ে ম্যাজিক কোন অংশেই কম নেই।’

     ‘এই কথাগুলোই কি তোমাকেও সাহস জুগিয়ে ছিল তোমার সময়ে ওই চেয়ারে বসে হ্যাটটা নিজের মাথায় পড়ার জন্য?’, ও জানতে চেয়েছিল।

     কোন কথা না বলে ড্যাড ঠোঁটে ঠোঁট চিপে হেসেছিলেন তারপর মাথাটা নেড়ে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমিও কিন্তু ছোট্ট ভীত উৎকণ্ঠিত একটা ছেলেই ছিলাম জেমস। মোটেই আমার মতন ভয় পাবে না তুমি, ঠিক আছে? আমরা অনেক অনেক মহান উইচ আর উইজার্ড এর কথা জানি যারা ওই সব হাউসগুলোতে  থেকেছেন। আমি গর্ব অনুভব করবো ওর যে কোনোটায় আমার জেমস জায়গা পেলেই।’

     জেমস সম্মতি দিলেও আসলে ওই সবকথাতে কোন কাজ হয়নি। ও জানে ওর ড্যাড আসলে কি চান – এবং – আশা করেন- ওই সব কথাগুলো বলা সত্ত্বেও। জেমস গ্রিফিন্ডোরের অন্তর্ভুক্ত হোক, যেমন ছিলেন উনি নিজে, ওর মাম, আঙ্কল ও আন্টিরা বা আর সব মহান ও কিংবদন্তীর সাথে যুক্ত উইচ বা উইজার্ডরা। যে ইতিহাসের সূচনা গড্রিক গ্রীফিন্ডোরকে দিয়ে, হগওয়ারটস স্রষ্টাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে সেরা।

     আপাতত ও দেখতে পাচ্ছে সর্টিং হ্যাটটা এসে গেছে, শীর্ণ হাতে সেটা তুলে ধরে আছেন হেডমিস্ট্রেস ম্যাকগনাগল। জেমস অনুভব করলো সবরকম ভয় আর উৎকণ্ঠা এই মুহূর্তে কোথায় যেন লুকিয়ে পড়েছে। শেষ কয়েক ঘণ্টা ধরে ও একটা ভাবনা নাড়া চাড়া করছিল। এখন সেটা ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। ওকে লড়তেই হবে ওর বাবার ছেড়ে যাওয়া জুতোটায় পা ঢুকিয়ে সমানে সমানে হাঁটার জন্য। সেই ভয়টার সাথে যেখানে সমকক্ষ না হতে পারার জুজুটা বসে আছে। কিন্তু ও যদি অন্য একটা পথ বেছে নেয়? যদি ও কোন চেষ্টাই না করে তাহলে কি হয়?

     জেমস সামনের দিকে তাকালেও কিছুই দেখছিল না আসলে। ওখানে তখন প্রথম শিক্ষার্থীকে চেয়ারে বসিয়ে হ্যাটটা পড়ানো হয়েছে, ঢেকে গেছে ওর চোখটা।

     ওকে ঠিক যেন একটা স্ট্যাচুর মত দেখাচ্ছিল – একটা বাচ্চা ছেলের স্ট্যাচু যার মাথায় তার বাবার মত বড় বড় অগোছালো চুল আর মায়ের মত নাক আর ঠোট। কি হবে যদি সে তার বাবার  বিশালাকার ছত্রছায়ায় বাঁচতে না চায়? সেকি পারে না নিজের মত করে বিখ্যাত হতে? একেবারে সম্পূর্ণ একটা আলাদা পথ। একটা ইচ্ছাকৃত ভাবে, নিশ্চিত ভাবে বেছে নেওয়া আলাদা রকম পথ। আর সেটা যদি ও এখান থেকেই শুরু করে, কেমন হয়? এইখানেই, এই মঞ্চের ওপর, প্রথম দিনেই, ঘোষনা হয়ে যাক…গ্রীফিন্ডোর এর বদলে অন্য কিছুর। সেটাই ঠিক হবে। যদি না সব……

     ‘জেমস পটার র র’, হেড মিস্ট্রেস ডাকলেন তার স্বভাবগত র শব্দটির অনুরণন ঘটিয়ে। জেমস একটু শিহরিত হল, ও যেন ভুলেই গিয়েছিল উনি ওখানে আছেন। অনেকে দেখে মনে হচ্ছিল উনি যেন একশো ফুট লম্বা, হাতটাও কত্ত বড়, হ্যাটটা ধরে আছেন চেয়ারটার ওপর, একটা তিনকোনা ছায়া পড়েছে চেয়ারটায়। জেমস এগিয়ে গিয়ে মঞ্চটায় উঠতে যাবে সিঁড়ি দিয়ে ঠিক তখনই ওর পেছন থেকে একটা সমবেত আওয়াজ ঝমঝমিয়ে উঠলো। যা ওকে থমকে দিল। ওর মনে হল ওর সমস্ত ভাবনাগুলো যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, গ্রিফিন্ডোর টেবিল থেকে আওয়াজটা এলো মনে হচ্ছে, ওরা কি ওকে দুয়ো দিচ্ছে। কিন্তু মোটেই ওটা তাচ্ছিল্যের শব্দ ছিল না। ওর নামটা উচ্চারন করে ওরা ওকে উৎসাহের উচ্ছাসে ভাসিয়ে দিচ্ছিল সাথেই দিচ্ছিল ভরসা। জেমস গ্রিফিন্ডোর টেবিলের দিকে তাকালো, ওর মুখে এখন একটা কৃতজ্ঞতা ও আনন্দের ছায়া। কিন্তু ওই টেবিল থেকে কেউ উৎসাহ দিচ্ছিল না। ওরা যেন একরাশ শূন্যতা নিয়ে বসে ছিল। বেশীরভাগের মাথাই দেখছিল তাদেরকে যারা উচ্ছাস ধ্বনি দিছিল। জেমস এবার অন্যদিকে তাকালো, ওদের দৃষ্টি অনুসরণ করে। আওয়াজটা আসছে স্লিদারিন এর টেবিল থেকে।

     জেমসের দৃষ্টি ওখানেই আটকে গেল। টেবিলটার সকলেই ওর দিকে তাকিয়ে, মুখে হাসির সাথেই উচ্ছাসের অভিব্যক্তি, কিন্তু তার মাত্রা মাপা ও নম্র। ওদের মধ্যে একটি মেয়ে দাঁড়িয়েছিল। চকচকে চোখ, কালো ঢেউ খেলানো লম্বা চুল। যথেষ্টই আকর্ষণীয়। জেমসের দিকে সরাসরি তাকিয়ে হাসিমুখে হাত তালি দিচ্ছিল, হাল্কা ভাবে কিন্তু ভঙ্গীতে যথেষ্টই আত্ম প্রত্যয়ের ছাপ। আর তারপর বাকি সব টেবিলগুলোও যোগ দিল জেমসকে “উৎসাহ” দানে, হলটা গমগম করতে থাকলো সেই কলতানে।

     মিসেস ম্যাকগনাগল, সেই উচ্ছাসধ্বনি ছাপিয়ে গলা তুলে বললেন, ‘ধন্যবাদ, এবার কাজটা হোক। অনেক হয়েছে। আমরা সত্যিই খুব খুশী যে মিঃ পটার এবছর স্কুলে ভর্তি হয়েছেন। এবার যদি তোমরা নিজের নিজের আসনে শান্ত হয়ে বসো তাহলে কাজটা শেষ করা যায়।’ জেমস এগিয়ে গেল, শান্ত হল জনউচ্ছাস। চেয়ারে বসতে বসতে ওর কানে এলো হেডমিস্ট্রেসের বিড়বিড়ানি, ‘আর এই কাজটা শেষ হলেই আমরা পরবর্তী ইকুইনক্স শুরু হওয়ার আগের শেষ ডিনারটা সেরে নিতে পারবো।’ জেমস ঘুরে ওনাকে দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু ততক্ষনে সর্টিং হ্যাটটা তার ভুরু পর্যন্ত নেমে চলে এসেছে।

     চকিতেই, সব শব্দ থেমে গেল। জেমস এখন টুপিটার মনের আওতায় বা সেরকমই কিছু একটা। ওটা কথা বলছিল কিন্তু ওকে উদ্দেশ্য করে নয়।

     ‘পটার, জেমস, হুম, এমনইতো এটাই আশা করেছিলাম। তৃতীয় পটার যে আমার আওতায় এলো। খুব কঠিন, এরা…,’ নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে নিল যেন, একটা দারুন কিছু করতে পাওয়ার সুযোগ পেয়ে। ‘প্রচুর সাহস, হ্যাঁ, যেমন আগেও দেখেছি, কিন্ত তরুণদের ক্ষেত্রে সাহসটা খুব ঠুনকো ব্যাপার। তাসত্বেও দারুন এক সদস্য গ্রিফিন্ডোরের জন্য, ঠিক আগের মতই।’

     জেমসের বুক ধকধক করে উঠলো। সাথে সাথেই ওর মনে পড়লো মঞ্চে ওঠার আগের ভাবনা গুলো। আমি এই ছকে খেলবো না, ও নিজেকেই বললো। আমি গ্রিফিন্ডোর হতে চাই না। ওর চোখে ভাসছিল সবুজ ও রুপালী ব্যানারের সামনে দাঁড়ানো লম্বা চুলের সুন্দরী মেয়েটির মুখ, কানে আসছিল ওদের সোচ্চার প্রশংসার শব্দ।

     ‘ও স্লিদারিন এর কথা ভাবছে!’ টুপিটা বললো ওর মাথা থেকে। ‘হুম, সে সম্ভাবনাও থাকছে। ঠিক ওর বাবার মত। সেও একজন বড় মাপের স্লিদারিন হতে পারতো, কিন্তু সেই ইচ্ছেটা ছিল না। বাব্বা! এতো দেখছি দোলাচলে ভুগছে, পটারদের ক্ষেত্রে এরকম ব্যাপার এই প্রথম। নিশ্চিত হতে না পারার এই ভাব ওকে স্লিদারিন বা গ্রিফিন্ডোর কোনটারই যোগ্যতা দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে হাফলপাফএ ভালো কিছু হতে পারে…’

     হাফলপাফ মোটেই না, জেমস ভাবলো। মা, ড্যাড, আঙ্কল রন, হারমায়োনি আন্টি, চেনাজানা গ্রিফিন্ডোরদের মুখগুলো ওর সামনে দিয়ে সার বেঁধে চলে গেল। আর তার পরই আবারো সেই স্লিদারিন টেবিলের মেয়েটার মুখ ভেসে এলো, হাসছে, হাততালি দিচ্ছে। নিজের কানে যেন শুনতে পেল কয়েক মিনিট আগের নিজের ভাবনা গুলোর উচ্চারন, আমি মহান হবো, তবে অন্য ভাবে নিজের মতো করে অন্য পথে হেঁটে।

     ‘ওহো হাফলপাফ পছন্দ নয় তাহলে? মনে হচ্ছে তুমিই ঠিক। হ্যাঁ, এই তো আমি দেখতে পাচ্ছি। তুমি হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারছো না, কিন্তু অনিশ্চয়তায় ভোগার কারন তো নেই। আমার প্রাথমিক ভাবনাই সঠিক ছিল, বরাবরের মতোই।’ সাথে সাথেই চিৎকার করে সর্টিং হ্যাট জানিয়ে দিল জেমসের হাউসের নাম।

     মাথা থেকে টুপিটা লাফিয়ে উঠে যেতেই জেমসের মনে হল ও যেন শুনতে পাচ্ছে “স্লিদারিন” কথাটা দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বেড়াচ্ছে। সহসা দারুন একটা আতঙ্ক নিয়ে ও সবুজ ও রূপালী টেবিলের দিকে তাকালো উল্লাস দেখার জন্য, তারপর দেখতে পেল লাফালাফি ও চিৎকারটা হচ্ছে রক্তলাল সিংহর তলার টেবিলটা থেকে। গ্রিফিন্ডোর টেবিলের সদস্যরা গলা ফাটিয়ে তাদের আনন্দ প্রকাশ করছে। জেমস দারুন ভাবে অনুভব করলো ও এটাই চাইছিল, এই উদ্দাম উল্লাস, নম্র ও মাপা উল্লাসের বদলে। চেয়ারটা থেকে লাফিয়ে নেমে, দৌড়ে সিঁড়িটা পার হয়ে ও ঢুকে পড়লো সেই উদ্দামতার বৃত্তে। অনেকে ওর পিঠ চাপড়ে দিল, হাত বাড়িয়ে দিল হ্যান্ডশেকের জন্য আর কেউ কেউ হাইফাইভ করে স্বাগত জানালো ওকে। সামনের দিকে একটা সীট ফাঁকা করা হল ওর জন্য, সাথে সাথেই একটা কণ্ঠস্বর ওর কানে ভেসে এলো।

     ‘এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধায় ছিলাম না তোর ব্যাপারে,’ ফিসফিসিয়ে বললো। জেমস ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেল টেডকে, প্রত্যয়ের সাথে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সিটে বসার আগে একবার পিঠটা চাপড়ে দিল। তারপর ঘুরে বসলো বাকি অনুষ্ঠানটা দেখার জন্য। সহসাই জেমসের সবকিছু এতো ভাল লাগতে শুরু করলো যে মনে হল একপাক নেচে নেয় সবার মাঝেই। ওর দরকার নেই হ্যারির দেখানো পথেতেই হেঁটে যাওয়ার, হয়তো আগামীকাল থেকেই ও শুরু করবে ওর নিজস্ব পথচলা। আপাতত ও উৎফুল্ল, কারন ও জানে ওর মাম আর ড্যাড পুলকিত হবেন এটা জেনে যে ওদের মতই জেমসও এখন একজন গ্রিফিন্ডোর ।

     জ্যান এর নাম ডাকা মাত্র ও হাঁচড় পাঁচর করে উঠে গিয়ে চেয়ারটায় বসলো, মনে হল এক্ষুনি ছাড়তে থাকা একটা  রোলার কোস্টার রাইড ওর নাগাল পেরিয়ে চলে যাচ্ছিল। টুপিটার ছায়া ওর কপালের ওপর পড়তেই ও হেসে উঠলো, সর্টিং হ্যাট বেশী সময় নিলো না জানাতে যে জ্যান এর হাউস র‍্যাভেনক্ল। জ্যান ভুরু কুঁচকে অদ্ভুত একটা হাস্যকর মুখ করে মাথাটা সামনেপিছনে ঝাঁকালো। যা দেখে গ্রেটহলেও বয়ে গেল হাসির হাওয়া। র‍্যাভেনক্লরা টেবিল চাপড়ে ওকে স্বাগত জানালো নিজেদের পক্ষ থেকে।

     বাকি প্রথম বার্ষিকীরাও এক এক করে এগিয়ে গেল মঞ্চের দিকে আর হাউস টেবিলের ফাঁকা স্থান গুলো পূর্ণ হতে থাকলো নতুন সদস্য দের দ্বারা। র‍্যালফ ডীডলের ডাক এলো সবার শেষে চেয়ারে বসার জন্য। কুঁকড়ে বসে থাকা ডিডলের বেশ হাউস বলার ক্ষেত্রে অনেকটাই সময় নিল টুপিটা। তারপর সহসাই উচ্চারন করলো, ‘স্লিদারিন’।

     জেমস হতাশই হলো। ও আশা করেছিল ওর নতুন বন্ধুদের মধ্যে অন্তত একজন গ্রিফিণ্ডোর টেবিলে জায়গা পাবে। কেও তো এলোই না, উলটে যাকে ও কোনভাবেই হিসাবের মধ্যে আনেনি সে জায়গা পেল স্লিদারিনে। যদিও ও ভুলে যায়নি ওর জায়গাও প্রায় পাকা হয়ে গিয়েছিল ওই হাউসে। কিন্তু র‍্যালফ? কোন মাগল পরিবারের সন্তান আজ অবধি ওখানে জায়গা পেয়েছে বলে শোনা গেছে কি? ও ঘুরে তাকিয়ে দেখলো দূরে কোনার দিকের একটা সীটে ও বসেছে এবং অন্যান্য সদস্যরা ওকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। সেই কোঁকড়ানো চুলের চকমকে চোখের মেয়েটা আবারো হাসলো। হয়তো বদলে গেছে স্লিদারিন হাউসের চরিত্র। মাম বা ড্যাড অবশ্য এটা মোটেই বিশ্বাস  করবে না।

     সর্টিং হ্যাটটাকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে হেড মিস্ট্রেস ম্যাকগনাগল বললেন, ‘প্রথম বার্ষিকীর ছাত্রছাত্রীগণ এটা সব সময় মাথায় রাখবে তোমার নতুন হাউস তোমার ঘবাড়ির সমান, কিন্তু এখানকার সব কিছু একসাথে মিলিয়ে তোমার পরিবার। যে কোনোরকম প্রতিযোগিতাকে উপভোগ করো কিন্তু কখনোই ভুলে যাবে না তোমার প্রকৃত বিশ্বস্ততা কার বা কিসের প্রতি ন্যস্ত।’ চশমাচটাকে নাকের ওপর দিকে খানিকটা ঠেলে দিয়ে বললেন, ‘আর এবারে, অন্যান্যবারেই মতই জানানো হচ্ছে যে নিষিদ্ধ অরন্যের দিকে যাওয়া সব শিক্ষার্থী জন্যই বারণ। দয়া করে এটা মনে রেখো এটা কেবল মাত্র শিক্ষা সংক্রান্ত একটা নিষেধাজ্ঞা নয়। হঠাৎ কিছু জানার দরকার পড়লে মিঃ টেড লুপিন আর মিঃ নোয়া মেটজকারকে বাদ দিয়ে যে কোন  অন্য সিনিয়রদের প্রশ্ন করতে পারবে প্রথম বার্ষিকীরা। যদি কারো নিয়ম ভাঙ্গার শখ না থাকে তাহলে ওই দুজনের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার উপদেশই আমি দেব।’

     বাকি কথাগুলোর দিকে মন না দিয়ে জেমস হলে উপস্থিতদের দেখার দিলে নজর দিল। জ্যান র‍্যাভেনক্ল এর টেবিলে এক বাটি বাদাম নিজের দিকে টেনে নিয়ে সদ্ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। চোখাচোখি হল র‍্যালফের সাথে, নিজেকে এবং নতুন হাউসমেটদের দেখিয়ে ইশারায় জানতে চাইলো জেমসের কাছে নির্বাচনটা ঠিক হয়েছে তো? জেমস যে ভঙ্গীটা করলো সেটা না নেতি না ইতিবাচক।

     হেডমিস্ট্রেস বললেন, ‘এবারে একটা শেষ কথা, আবার একটা উল্লাসধ্বনি গুঞ্জরিত হলো হলে। ‘তোমরা কেউ কেউ হয়তো লক্ষ্য করেছো শিক্ষকদের একটি চেয়ার ফাঁকা পড়ে আছে মঞ্চের ওপর। জানিয়ে রাখতে চাই যে ডিফেন্স এগেন্সট দ্য ডার্ক আর্টস এর জন্য আমরা খুব শিগগিরি একজনকে নিয়ে আসছি। যিনি তার নিজের ক্ষেত্রে একজন অদ্বিতীয় এবং প্রতিভাবান বলে খ্যাত। উনি আগামীকাল বিকেলের মধ্যেই এসে যাবেন। ওর সাথে আসবেন ওর স্কুলের কিছু শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী এবং কর্ম সহযোগী। এটা ইন্টার ন্যাশনাল ম্যাজিক সামিট এর অন্তর্গত একটা প্রোগ্রাম ওনাদের স্কুলের সাথে আ্মাদের স্কুলের, যা চলবে  আগামী একবছর ধরে। আমি আশা রাখবো কাল বিকেলে তোমরা সবাই উপস্থিত থাকবে প্রধান চত্বরে আল্মা আলেরন এবং ইউনাইটেড স্টেটস ডিপারটমেন্ট অফ ম্যাজিক্যাল আডমিনেস্ট্রেশনকে স্বাগত জানানোর জন্য।’

     গোটা হল তা গুনগুনে আলোচনার শব্দে ভরে গেল, শিক্ষার্থীরা যথেষ্টই আলোড়িত হয়েছে বিষয়টা শুনে বোঝা যাচ্ছিল। জেমস শুনতে পেল টেড বলছে, ‘বুঝতে পারছি না কিছু বুড়ো আমেরিকান আমাদের ডার্ক আর্ট ব্যাপারে কি বলতে আসছেন? কোন চ্যানেলে দেখাবে জানিস নাকিরে? একটা হাসির হাওয়া বয়ে গেল। জেমস জ্যানকে দেখার জন্য ঘুরে বসলো। জ্যান ওর দিকে তাকাতেই জেমস বেশ জোরের সাথে বললো, ‘তোমাদের দেশের প্রতিনিধিরা আসছেন তাহলে।’ জ্যান এক হাত মুঠো করে বুকে চাপড় দিল আর অন্য হাতে করলো সেলামের ভঙ্গী।

     এইসব কথা বার্তার ফাঁকেই লম্বা লম্বা টেবিলগুলোতে আবির্ভাব হয়েছে ডিনারের খাদ্য সম্ভার। দেরী না করে এবার সবাই মন দিল আসল কাজটিতে।

***

     মোটামুটি মাঝরাত হয়ে গেল জেমসের গ্রিফিন্ডোরের কমন রুমে যেতে যেতে। যেখানে সেই স্থূলকায় মহিলার পোরট্রেটটি টাঙানো আছে প্রবেশপথে।

     ‘পাসওয়ার্ড’ কথাটি ধ্বনিত হলো মহিলার দিক থেকে। জেমস থমকে দাঁড়ালো, ওর কাঁধ থেকে সবুজ ব্যাকপ্যাটা পড়ে গেল মেঝেতে। কেউ তো ওকে কোন ‘পাসওয়ার্ড’ বলে দেয়নি।

     জেমস আমতা আমতা করে বললো, ‘আমি কোন পাসওয়ার্ড জানি না। আমি আজই প্রথম এখানে এসেছি। আমি একজন গ্রিফিন্ডোর।’

     স্থূলকায় মহিলা ওকে শান্ত চোখে আগাপাস্তালা দেখে নিয়ে বললেন, ‘হতে পারো তুমি গ্রিফিন্ডোর, কিন্তু পাসওয়ার্ড ছাড়া প্রবেশ নিষেধ।’

     জেমস একটু হাসার চেষ্টা করে বল লো, ‘আপনি কি আমাকে একটু হিন্ট দিতে পারেন?’

     মহিলাটি একভাবে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘মাই ডিয়ার, আমার মনে হচ্ছে তুমি দুর্ভাগ্যবশত ‘পাসওয়ার্ড’ কথাটির অর্থ জানো না।

     কিছুটা দুরেই একটা জায়গাবদলকারী সিঁড়ি। আস্তে আস্তে ওটা একটা জায়গায় স্থির হচ্ছে, নিচের দিকে মেঝেতে নামার পথে। কিছু উঁচু ক্লাসের ছাত্র ছাত্রী ওখানে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছিল একে ওপরের সাথে রহস্যময় ফিসফিসে গলায়। যার মধ্যে টেডকেও দেখতে পেল জেমস।

     স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ও ডাকলো, ‘টেড, আমার একটু সাহায্য দরকার। আমি ‘পাসওয়ার্ড’ জানি না।’

     জেমসকে দেখতে পেয়ে টেডরা এগিয়ে এলো। ‘জেনিসলারিস’, টেড জানালো। সাথে সাথেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়েকে বললো, ‘পেট্রা, জলদি। সাবধান নোয়ার ভাই যেন তোমায় দেখতে না পায়।’

     মাথা ঝুঁকিয়ে মেয়েটি জেমসের পাশ দিয়ে স্থূলকায় মহিলার ছবি সরিয়ে ঢুকে পড়লো অগ্নিশিখায় আলোকিত কমন রুমের ভেতরে। জেমসও মেয়েটিকে অনুসরণ করে ঢুকতে যাবে তার আগেই টেড ওর বাহু ধরে টেনে নিয়ে এলো সিঁড়ির তলায়। ‘ডিয়ার জেমস, এত তাড়াতাড়ি আজ আমরা তোমাকে বিছানায় শুতে দেব কি করে ভাবলে ভাই? মারলিনের দিব্যি, গ্রিফিন্ডোরের কিছু আদবকায়দার পালনের কথা তো ভুলতে পারি না।’

     ‘মানে?’ জেমস বললো, ‘এখন মাঝরাত সেটা খেয়াল আছে তো?’

     টেড বোজানোর ভঙ্গিমায় বললো, ‘মাগলদের জগতে একে বলে “উইচিং হাওয়ার”। আসল কথাটা মনে রাখার পক্ষে বেশ বড়, “উইচিং অ্যান্ড উইইজারডিং পুলিং ট্রিক্স অন আনসাস্পেক্টীং মাগল কান্ট্রি ফোক আওয়ার”। আমরাও এটাকে ছোট্ট করে বলি, “রেইজিং দ্য উকেট”।’

     টেড আরো তিনজন গ্রিফিন্ডোর সদস্য সহ সিঁড়ির দিকে এগো লো। জেমস জানতে চাইলো, ‘দ্য কি?’

     ‘এই ছেলেটা জানে না উকেট কি?’ টেড বললো সঙ্গে থাকা তিন জনের উদ্দেশ্যে। ‘এদিকে ওর বাবা ছিল বিখ্যাত মরাঊডারস ম্যাপের মালিক। আমার তো ভাবতেই শিহরন জাগছে কি সুবিধাটাই না হত যদি আমাদের হাতে ওই স্কাল ডাগারীটা থাকতো। যাকগে জেমস আমাদের গ্রুপ গ্রেমলিন এর সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়েদি তোকে।   আমি নিশ্চিত তুই এই গ্রুপের অংশ হতে চাইবি।’ টেড দাঁড়ালো, ঘুরলো, সাথে আসতে থাকা তিনজনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘আমার এক নম্বর যোদ্ধা, নোয়া মেটজকার, যার একমাত্র খামতির দিক, ওরই পঞ্চম বর্ষের প্রিফেক্ট ভাই এর সাথে সাপে নেউলে সম্পর্ক।’ নোয়া আনত হয়ে হাসলো। ‘আমাদের ট্রেজারার, সাব্রিনা হিলডেগারড। যদি কখনও সখনো এক আধটা কয়েন জোটাতে পারি ও তার দায়িত্ব নেয়।’ একটি প্রচুর তিলের দাগে ভর্তি মনোরম মুখশ্রীর তরুণী, মাথায় একটি পালক সহ লালচুলের খোঁপা, জেমসের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো। টেড একটা লম্বা, মোটা কাঁচের চশমা পড়া গোল মুখের ছেলের হাত ধরে বললো, ‘ইনি ড্যামিয়েন ডামাস্কাস, যতরকম গণ্ডগোল পাকে এর জন্য। আর সবশেষে আমার সব রকম দোষ ঢাকতে সাহায্যকারিণী, সকলের এবং টিচারসদের খুব প্রিয় ছাত্রী মিস পেট্রা মরগানস্টারন।’ টেড এর আচরণেই বোঝা গেল ও মেয়েটির প্রতি অনুরক্ত। পেট্রা একটু আগেই বেরিয়ে এসেছে স্থূলকায় মহিলার ছবিটার পেছন থেকে। ছোট্ট কিছু একটা নিয়ে এসেছে জিন্সের প্যান্টের পকেটে করে।

     জেমস লক্ষ্য করলো ও বাদে বাকিরা ড্রেস বদলে এসেছে। জিন্স আর কালছে সোয়েট শার্ট পড়ে আছে সবাই। ‘সব ঠিকঠাক আছেতো সফর করার জন্য,’ টেড জানতে চাইলো পেট্রার কাছে।

     ‘একদম। কোন সমস্যাই নেই ক্যাপ্টেন,’ ড্যামিয়েনের চাপা হাসির আওয়াজ ভেসে এলো। ওরা ঘুরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলো। টেড জেমসকে সাথে নিয়ে চললো হাত ধরে।

     ‘আমি ড্রেস বদলাবো না?’ জেমস নিচের দিকে নামতে থাকা সিঁড়িতে কম্পিত স্বরে জানতে চাইলো।

     টেড ওকে একবার ভালো করে দেখে নিল। ‘না, আমার মনে হচ্ছে না তার দরকার আছে। রিল্যাক্স। চিন্তার কিচ্ছু নেই। যেমন বলছি শুধু সেটা কর। এসব সিঁড়িতে শুধু একটা লাফ দিতে হবে, পা ফেলে ফেলে ওঠার দরকার নেই, শুধু এটা মনে রাখলেই হবে।’ জেমস লাফ দিলো, ওর ব্যাকপ্যাকটাও উঠলো ঝাঁকুনীর সাথে সাথে, দলটির প্রানবন্ততার ছোঁয়া যেন লেগেছে ওর মধ্যেও। টেড অবশ্য চেপে ধরে আছে ওর হাত। যেখানে এসে ওর কাঁপতে থাকা পা দুটো মাটি ছুঁলো সেটা একটা মশাল আলোকিত বিস্তৃত বারান্দার মেঝে। একবারে শেষ প্রান্তে ওদের দলটি মিলিত হলো আর তিনজনের সাথে। ওরা দাঁড়িয়ে ছিল একটা দৈত্যাকার অতিরিক্ত লম্বা টুপি পড়া কুঁজো উইজার্ড এর স্ট্যাচুর ছায়ায়।

     ওই জায়গাটায় পৌঁছে টেড ফিসফিস করে বললো, ‘গুড ইভিনিং, গ্রেমলিনস। এ হল জেমস আমার গডফাদারের ছেলে। সেই মানুষটা যাকে সবাই হ্যারি পটার নামে চেনে।’ জেমস ওদের তাকিয়ে মুচকি হাসলো এবং তৃতীয় মুখটার দিকে ভালো করে তাকালো। ‘জেমস এরা আমাদের গ্রুপের র‍্যাভেনক্ল এর অংশ। হোরাস, জেন্নিফার আর…’, জেন্নিফার এর দিকে প্রশ্ন ছূঁড়ে দিল টেড, এই নতুন ছোট্ট বন্ধুটি…ওর নাম কি?’

     ‘জ্যান,’ জেন্নিফার জানালো, হাসিমুখে তাকিয়ে থাকা ছেলেটির দিকে হাত তুলে। ‘কিছু আগেই ওর সাথে পরিচয়। কেন জানিনা ওকে দেখে গ্রেমলিন এ থাকার উপযুক্ত মনে হল। কি যেন একটা আছে ওর সামগ্রিক চেহারায়।’

     ‘আমরা হান্ট দ্য উকেট খেলতে যাচ্ছি!’ জ্যান এত উচ্চমাত্রার ফিসফিসানিতে কথাগুলো বললো যে গোটা বারান্দায় কথাটা অনুরনিত হল। ‘একটু অদ্ভুত রকম শুনতে লাগছে, তবু বেশ একটা থ্রিল হচ্ছে, আশা করছি দারুন কুল কিছু একটা হবে, সুপার মস্তি!’ জেমস বলতে চাইল না যে জ্যান ইয়ার্কি মারছে, এটা বুঝেই যে এতে কারোর কিছু যাবে আসবে না।

     ‘রেইজ দ্য উকেট,’ নোয়া ভুল শুধরে দিল।

     জেমস নিজের অস্তিত্ব জাহির করার একটা সুযোগ নিতে চাইলো এইসময়। ‘তা সেই উকেটটা কোথায়? আর আমরা সবাই এই স্ট্যাচুটার পেছনেই বা লুকিয়ে আছি কেন?’

     পেট্রা জবাব দিল, ‘এটা শুধুমাত্র একটা পুরোনো স্ট্যাচু নয়। ইনি সেন্ট লোকিমাগাস দ্য পারপেচুয়ালি প্রোডাক্টিভ। গতবছর আমরা এটার বিষয়ে জানতে পেরেছি। আর তারপরই ওটা আমাদের নিয়ে গেছে একটা দারুন জিনিষ আবিষ্কার করার দিকে।’ ইতিমধ্যে টেড দেওয়াল আর মূর্তিটার মাঝে যে ফাঁক সেখানে ঢুকে পড়েছে।

     টেড এর গলা ভেসে এলো, ‘সত্যিই তাই বলতে চাইছো তো?’

     পেট্রা উত্তর দিল মাথা ঝুঁকিয়ে, ‘একদম তাই।’

     টেড ওদিকে আঁচড়ে ঘষটে চলেছে মূর্তিটার পেছন দিকটা। নোয়া বললো, ‘জেমস, তোমার বাবার সময়ে ছ’টা সিক্রেট প্যাসেজ ছিল এই দুর্গে ঢোকা ও বেড়ানোর জন্য। কিন্তু সেটা ওই মহাযুদ্ধের আগে। তার পরে এ দুর্গ নতুন করে বানানো ও সারানো হয়। সমস্ত সিক্রেট প্যাসেজগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু একটা জাদুপ্রাসাদের অনেক রকম মজা আছে। ও নিজে নিজেই কিছু সিক্রেট প্যাসেজ বানিয়ে ফেলেছে। আমরা দুটো খূঁজে পেয়েছি। আর তার সমস্ত কৃতিত্ব পেট্রা আর র‍্যাভেনক্ল বন্ধুদের। সেন্ট লোকিমাগাস দ্য পারপেচুয়ালি প্রোডাক্টিভ তার মধ্যে একটা। উনি যে স্লোগ্নানটা দিতেন সেটা একদম সার্থক।

     নোয়া স্ট্যাচুটার বেদীতে লেখা কথাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলো। ওখানে লেখা আছে “ইজিতুর কুই মোভেও, কুই এত মোভেয়া।”

     একটা চাপা উচ্ছ্বাসের চিৎকার করলো টেড, সাথে সাথেই শোনা গেল একটা জোরালো ক্লিক শব্দ। ‘তোমরা ভাবতেও পারবেনা এবার ওটা কোথায় ছিল,’ টেড বললো, স্ট্যাচুটার পেছন থেকে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে। বেদীর পাথরটা একপাক ঘুরে গেল এবং সেন্ট লোকিমাগাস এর মূর্তি সোজা হয়ে দাঁড়ালো যতটা সম্ভব কূঁজটা সমেত। ধীরে নেমে এলো বেদী থেকে, তারপর হাঁটতে শুরু করলো ঝুঁকে ঝুঁকে। একসময় একটা দরজার আড়ালে অদৃশ্য হলো। জেমস দেখলো ওটা ছেলেদের বাথরুম।

     ‘ওই স্লোগানটার মানে কি?’ জেমস প্রশ্নটা করতে করতেই গ্রেমলিরা বেদীটার পেছনে থাকা নিচু দরজাটা দিয়ে নামতে শুরু করে দিয়েছে। নোয়া ওর দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল, ‘যখন তুমি যেতে চাইবে তুমি যাবেই যাবে।’

     গোলাকৃতি পাথরের সিঁড়ির দিকে পথটা গিয়েছে। গ্রেমলিনরা হড়বড় করে উঠে গেল সিঁড়িটা দিয়ে। একে অপরকে ইঙ্গিত করলো শব্দ না করার। ওরা পৌঁছে গেছে একটা দরজার কাছে। টেড দরজাটা একটু ফাঁক করে বাইরেটা দেখে নিয়েই ওটাকে হাট করে খুলে দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল বাইরে।

     দরজাটার পরের ছোট্ট ছাউনীটার তলায় দাঁড়িয়ে জেমস জায়গাটাকে চিনতে পারলো। কুইডিচ এর মাঠ। বড় বড় ঘাসের ওপর চাঁদের আলো মেখে স্তব্ধতা গায়ে নিয়ে পড়ে আছে জায়গাটা। 

     ‘এটা একটা এক তরফা প্যাসেজ,’ সাব্রিনা জেমস আর জ্যানকে জানালো। দলটি ছুটে চললো কুইডিচ পিচ অতিক্রম করে পাহাড়টির অভিমুখে। ‘যদি সেন্ট লোকিমাগাস এর টানেল হয়ে না আসতাম তাহলে আমাদের খুঁজে পাওয়া যেত জিনিষপত্র রাখার ছাউনীর তলায়। বিশ্বাস করানোর পক্ষে বেশ ভালোই। এখন যদি আমরা ধরাও পড়ি আমাদের গোপন টানেলটার খোঁজ কেউ পাবে না।’

     হাঁফাতে হাঁফাতে জেমস জানতে চাইলো, ‘তোমরা কখনও ধরা পড়েছো?’

     ‘না, মানে এটাই প্রথমবার আমরা এটা ব্যবহার করলাম। গতবছরের শেষের দিকে এটা আবিষ্কার করেছিলাম।’ এমনভাবে বললো যেন মনে হল বলতে চাইছে, দেখাই যাক না কি হয়, চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি?

     অন্ধকারের মধ্যে মিশে থাকা জ্যান বললো জেমসের পেছন থেকে, ‘সেন্ট ম্যাজিক বান্স তার বাথরুমের কাজকর্ম সেরে নিজের বেদীতে ফিরে আসেন, কি হবে তাহলে, আমরা ওই গর্ত দিয়ে ফিরে যাওয়ার আগেই?’ জেমস জ্যান এর বাক্যগঠনের পদ্ধতিতে থমকে গেলেও প্রশ্নের যুক্তিটা মেনে নিল।

     ‘হুম এটা কিন্তু একটা ঠিকঠাক প্রশ্ন র‍্যাভেনক্ল এর পক্ষে,’ নোয়া সাথে সাথেই কথাগুলো বললেও কেউ কোন উত্তর দিল না।

     আরো দশ মিনিট ধরে চন্দ্রালোকিত জঙ্গলের সীমানা ধরে ছোটার পর একটা তারের বেড়া পেরিয়ে ওরা একটা  মাঠে পৌছালো। টেড নিজের ব্যাক পকেট থেকে নিজের জাদুদন্ডটা বার করলো এবং এগিয়ে গেল সামনের ঝোপটার দিকে। জেমসও এগিয়ে গেল। দেখলো ওখানে একটা ছোট্ট ভাঙ্গাচোরা গোলাঘর লুকানো আছে। অনেকটা ঝুঁকে পড়েছে এবং ঢেকে আছে লতাপাতায়।

     “আলহমোরা”, টেড উচ্চারন করলো, জাদুদন্ডটাকে ঘরটার দরজায় ঝুলতে থাকা মরচে পড়া বিরাট তালাটার দিকে তাক করে। একটা হলুদ আলোর দ্যুতি দেখা গেল। যেটা বেরিয়ে এলো তালাটার ভেতর থেকে এবং পরিণত হল একটা কঙ্কালের হাতে। হাতটা মুঠিবদ্ধ, তর্জনী উঠানো আকাশের দিকে। সামনে পিছনে কিছুক্ষন আঙুলটা নাড়িয়ে সহসাই ওটা অদৃশ্য হয়ে গেল।

     ‘সুরক্ষা মন্ত্র এখনো কাজ করছে তাহলে,’ টেড বললো আনন্দের সাথেই। পেট্রা এগিয়ে এলো, জিন্সের পকেট থেকে বার করলো কিছু। জেমস দেখতে পেল ওটা একটা মরচে ধরা স্কেলিটন কি।

     ‘ওটা জেন্নিফার এর বুদ্ধি ছিল,’ র‍্যাভেনক্ল এর হোরাস বললো গর্বের সাথে। ‘যদিও আমি একটা অন্যরকম কিছু করতে চেয়েছিলাম।’

     ‘যেটা হয়তো আরো ভালো কিছু হত,’ জ্যান বললো।

     ‘যারা এটা ভেঙে ঢোকার চিন্তায় এখানে আসবার কথা ভাববে তাদের জন্য যে কোন রকম জাদুপদ্ধতিই সোজা ব্যাপার কিন্তু একটা চাবির কথা ভাবতেই চাইবে না তারা।’ নোয়া বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। ‘আমরা ডিসইলিউশনের চার্ম ব্যবহার করেছিলাম মাগলদের এখান থেকে দূরে রাখতে। কিন্তু ওরা এখানে আসেই না। এটা একবারে পরিত্যক্ত একটা স্থান।

     পেট্রা চাবি ঘুরিয়ে তালাটা খুললো। পুরানো গোলাঘরটার দরজা খুলে গেল একটুও শব্দ না করে। ‘ক্যাঁচ কোঁচ শব্দ করা দরজা শিক্ষানবীশদের জন্য।’, ড্যামিয়েন বললো দুষ্টুমির ভঙ্গীতে, নিজের চাপা নাকটায় হাত দিয়ে।

     জেমস ভেতর দিকটায় উঁকি মারলো। বড় কিছু একটা রাখা আছে যেটার মাথা ছুঁয়ে আছে গোলা ঘরের ছাদ। ও মোটা মুটি ওটার আকৃতিটা আন্দাজ করতে পারছিল।  দেখতে সেকেলে ফ্লাইং সসারের মত।

     ‘উও! কু-উল!’ জ্যান চেঁচিয়ে উঠলো আনন্দে, বেশ কিছু একটা বুঝতে পারার খুশীতে। ‘রেইজ দ্য উকেট! তুমি একদম ঠিক বলেছিল এরকম কিছুর কথাই নেই দ্য উইজার্ড অফ ওজ এর মধ্যে।‘

     ‘দ্য উইজার্ড অফ কি?’ টেড জানতে চাইলো জেমসের কাছে।

     ‘ও একটা মাগলদের ব্যাপার, আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরের বিষয়,’ জেমস জানালো।

***

     ফ্র্যাঙ্ক টটিংটন ধরমড়িয়ে উঠে পড়লেন ঘুম থেকে, উনি নিশ্চিত বাগানে একটা কিছুর শব্দ হয়েছে। প্রচন্ড রাগে গায়ের চাদরটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। বিছানা থেকে নামার জন্য তৈরী হলেন।

     আধো ঘুমে ওনার স্ত্রী জানতে চাইলেন, ‘কি হলো?’

     বিছানার পাশে রাখা টারটান স্লিপারটায় পা গলিয়ে গরগরে আওয়াজে ফ্র্যাঙ্ক উত্তর দিলেন, ‘ওই হতচ্ছাড়া গ্রীন্ডলের ছোঁড়াগুলো বাগানে ঢুকেছে মনে হচ্ছে। বলেছিলাম না সেদিন, ওরা রাতের দিকে বাগানে ঢুকে বেগোনিয়াগুলোকে ভেঙে দেয় আর টম্যাটো চুরি করে? হতচ্ছাড়ার দল!’ ছেড়ে রাখা মোটা জামাটা গায়ে চাপিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন নিচে। দরজার পাশে ঝোলানো শটগানটা হাতে নিলেন। পৌঁছালেন পেছন দিকের দরজার কাছে।

     আস্তে আস্তে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন বাইরে। তারায় ভরা আকাশের দিকে শটগানটা তাক করে চিৎকার করে বললেন, ‘দেখাচ্ছি মজা এবার তোদের, যত গুন্ডা বদমাইশের দল! টম্যাটোগুলো ফেলে এদিকে আয় সব। তোদের শ্রীমুখগুলো একবার দেখা দিকি!’

     ওর মাথার ওপর একটা আলো জ্বলে উঠলো, সাদা আলোর একটা স্তম্ভের ভেতর উনি এখন দাঁড়িয়ে। একটা মৃদু গুনগুন শব্দও যেন শোনা গেল। ফ্র্যাঙ্ক পাথরের মূর্তির মত হয়ে গেলেন, শটগানটা একই ভাবে অপরদিকেই ওঠানো। কোনক্রমে উনি মাথাটা তুললেন ওপরে আলোটার দিকে। বিশাল থুতনির ছায়ায় পড়লো গায়ের ওপর। কিছু একটা ভেসে আছে ওপরে। ওটার সাইজ অনুমান করা কঠিন। কালো এবং গোলাকৃতি, পুরো বস্তুটার প্রান্তসীমা ছোট ছোট আলোকবিন্দু দিয়ে তৈরী। আস্তে আস্তে ওটা নিচের দিকেই নেমে আসছে।

     একটা কাঁপুনি চেপে ধরল ফ্র্যাঙ্ককে। দম নিতেও কষ্ট হচ্ছে। বন্দুকটাও পড়ে যাচ্ছিল আর একটু হলেই। নিজেকে একটু সামলে নিলেন, চোখ সরাননি গুঞ্জনরত বস্তুটা থেকে। ওটা আরও নিচে নেমে এলো, আলোর স্তম্ভের ওপরেই যেন ওটা দাঁড়িয়ে আছে মনে হল ফ্র্যাঙ্কের। গুনগুনানির মাত্রা বেড়ে গেছে অনেকটাই, এখন যেন একটা তালে বাজছে ওটা।

     বিস্ফারিত চোখে ওটার দিকে তাকিয়ে থাকার সাথে সাথেই ওর হাঁটু দুটো যেন শরীরের ভার নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ভাঁজ হয়ে যাচ্ছিল। কোন কিছু একটা চিবানোর মত করে উনি ঢোক গিলছিলেন।

     খুব জোরে বাষ্প বের হওয়া ও জোরালো হিস শব্দ করে একটা আলোর দাগে নির্মিত দরজার আকৃতি যেন দেখা  গেল  বস্তুটার গায়েতে। তারপর আলো বাড়ার সাথে সাথে ওটা ওপর দিক থেকে সামনের দিকে বেরিয়ে এসে জমি ছুঁলো। একটা অবয়বকে দেখা গেল আলোকিত দরজার ফ্রেমে। ফ্র্যাঙ্ক কাঁপতে কাঁপতে শটগানটা আবারো উচিয়ে ধরলেন। একটা লাল আলোর বিষ্ফোরন হল। ফ্র্যাঙ্ক ও ট্রিগার টিপতে গেলেন বন্দুকের, কিন্তু কিছুই হলো না। ট্রিগারটাই নেই ওখানে, তার বদলে একটা ছোট্ট বোতাম। উনি বন্দুকটার দিকে তাকালেন, থমকে গেলেন হাতের জিনিষটাকে দেখে। কোনো শটগান ওর হাতে নেই, বদলে একটা ছোট্ট ছাতা ধরে আছেন উনি। যেটা উনি আগে কোনদিন দেখেন নি। বুঝতে পারলেন, যা ঘটছে তার সাথে এই জগতের কোন যোগসূত্র নেই। ছাতাটা ফেলে দিয়ে উনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।

     দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটা ছোট্ট এবং রোগা মতন। গায়ের রং বেগনি আভা যুক্ত সবজেটে, মাথাটা বিরাট। প্রায় মসৃণ, শুধু দুটো বাদামের মত চোখ আলোয় চকচক করছে। ওটা এগিয়ে আস্তে থাকলো ফ্র্যাঙ্কের দিকে। অতি সন্তর্পণে একপা একপা করে। কিছুটা এগিয়ে এসে ওটা যেন হোঁচট খেল, আর তারপর হাত পা ছুঁড়ে ফ্র্যাঙ্কের দিকেই লাফ দিলো। ভীত সন্ত্রস্থ ফ্র্যাঙ্ক পিছিয়ে গেল। ছোট্ট অবয়বটা ওর সামনে এসে থপাত করে দাঁড়ালো। বিরাট মাপের মাথার বড় বড় চোখদুটো দিয়ে দেখতে থাকলো ফ্র্যাঙ্ককে।

     একটা দারুন বিভ্রান্তি নিয়ে ফ্রাঙ্ক অজ্ঞান হয়ে গেল। আর তার কারন, অজ্ঞান হওয়ার ঠিক আগে ও দেখতে পেয়েছিল অবয়বটার কাঁধে ঝুলছিল একটা ডার্ক সবুজ রঙের ব্যাকপ্যাক।

***

     ঝাপসা চোখে পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠলো জেমস। নিজের চোখ, মুখ, ভুরু থুতনি সব ছুঁয়ে দেখলো আগে। না সব ঠিক ঠাকই আছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস বের হয়ে এলো একটা। সব কিছু আগের মতই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিছু একটা ভাঁজ করে রাখা ছিটকে এসে পড়লো ওর বিছানায়। একটা সংবাদপত্র, যা ওর চেনাজানার তালিকার বাইরে। একটা হেডলাইন ওখানে দেখা যাচ্ছে, “স্থানীয় একজন মানুষ জানিয়েছে গত রাতে মঙ্গলগ্রহের রকেট এসে ওর বাগানের টম্যাটো চুরি করে নিয়ে গেছে”। জেমস মুখ তুলতেই দেখতে পেল নোয়া মেটজকার সামনে দাঁড়িয়ে, মুখে একটা মিচকে হাসি।

     ‘ওরা আবারো ভুল বানান লিখেছে ওটা উকেট হবে,’ নোয়া বললো।

[চলবে]

লেখক পরিচিতিঃ  জর্জ নরম্যান লিপারট আমেরিকান লেখক এবং কম্পিউটার অ্যানিমেটর। তবে ওনার বর্তমান পরিচয় উনি জেমস পটার সিরিজের লেখক। যে কারনে ওনাকে “আমেরিকান রাউলিং” নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সিরিজের প্রথম লেখা “জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রশিং” প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। নানান কারনে এটি অনেক বিতর্কে জড়িয়ে যায়। সেসব সমস্যা পেরিয়ে আজ এটি পাঠক পাঠিকাদের চাহিদায় সারা বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সিরিজের সব কটি বই ই-বুক এবং ফ্রি হিসাবেই প্রকাশ করেছেন মাননীয় জর্জ নরম্যান লিপারট। এই সিরিজ ছাড়াও ওনার আরো ১২ টি বই আছে। বর্তমানে উনি এরি, পেনসিল্ভ্যানিয়ার বাসিন্দা।

অনুবাদকের পরিচিতিঃ উপন্যাসটির অনুবাদক প্রতিম দাস মূলত চিত্র শিল্পী, ২০১৩ সাল থেকে ভারতের সমস্ত পাখি আঁকার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছেন। ৭৭৫+ প্রজাতির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে শুধু পাখি নয় অন্যান্য বিষয়েও ছবি আঁকা চলে একইসাথে। সাথেই দারুণ রকমের পাঠক, যা পান তাই পড়েন ধরনের। প্রিয় বিষয় রূপকথা, ফ্যান্টাসী, সায়েন্স ফিকশন, অলৌকিক। টুকটাক গল্প লেখার সাথে সাথে আছে অনুবাদের শখ। 

বিঃ দ্রঃ উপন্যাসটি লেখকের অনুমতি নিয়ে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। 

2 thoughts on “জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং – পার্ট ১

  • September 16, 2017 at 6:44 pm
    Permalink

    সুন্দর অনুবাদ করেছেন । পড়ে ভালো লাগলো । পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম ।

    Reply
  • April 2, 2018 at 7:15 am
    Permalink

    Prothom khondotai ato interesting😊😊

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!