জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং – পার্ট ৪

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

প্রোগ্রেসিভ এলিমেন্ট

 

ঘুম ভেঙে ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলো জেমস। গলা শুকিয়ে গেছে। আবছা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে ঘরটা। ভালো করে চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো। যে সমস্ত শব্দ শোনা যাচ্ছে তা নিদ্রারত গ্রিফিন্ডোরদের। টেড ঘুরে শুলো, কিসব বিড় বিড় করেই আবার নাক ডাকাতে শুরু করলো। জেমস বেশ খানিকক্ষণ নড়াচড়া না করে  বসে থাকলো। কেউ ওকে ডেকেছে ওর নাম ধরে। একেবারে কানের কাছে এসে। সেটাই ওর ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ। ঠিক যেন স্বপ্নের মধ্যে কারো ডাক শুনতে পাওয়া। অনেক দূর থেকে ফিস ফিস করে। অন্ধকার লম্বা সুড়ঙ্গর ভেতর থেকে জমা বাষ্প ধোঁয়া বের হয়ে এলে যেমন শব্দ হয় ঠিক সেরকম ভাবে। প্রথমে ওর মনেও হয়েছিল যে ও স্বপ্নই দেখেছে। কিন্তু নতুন করে ঘুমানোর উদ্যোগ করতে যেতেই ডাকটা আবারওর কানে এলো। কোন সূদূর থেকে ভেসে আসা একটা ডাক…ফিসফিসানির একটা কোরাস যেন ওর নামটা উচ্চারন করেছে।

     অতি সন্তর্পণে জেমস বিছানা থেকে নেমে বাথরোবটা গায়ে চাপালো। পায়ের তলায় বরফের মত ঠান্ডা পাথরের মেঝে। এদিকে ওদিকে মাথা ঘুরিয়ে কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করলো কোথা থেকে এলো শব্দটা। সহসাই দেখতে পেলো দরজার কাছে একটা অবয়ব নড়ছে। কিভাবে এল ওটা এখানে! কোনো দিক থেকেই তো ওটাকে ও ঢুকতে দেখেনি। একটু আগে ওখানে শুধুই অন্ধকার ছিল। সেখানেই আবির্ভূত হয়েছে ওটা…শূন্যে ভাসছে!! হাঁটু দুটো কেঁপে উঠলো জেমসের। ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে শুরু করলো বিছানার দিকে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ও চিনতে পারলো ভৌতিক অবয়বটাকে। এটা সেই তরুণ যুবকের সাদা চেহারাটা স্কুলের মাঠে যে তাড়া করে গিয়েছিল অনুপ্রবেশকারীর দিকে। সেদিন সূর্যের আলোয় যেমন দেখেছিল তার তুলনায় দরজার কাছের আবছা অন্ধকারে অবয়বটাকে এখনঅনেক পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একটুও না নড়ে অবয়বটার দিক থেকে আবার ভেসে এলো সেই ডাক…

     জেমস পটার … 

     এবং চোখের পলক ফেলার আগেই ঘুরে নেমে গেল সিঁড়ির দিকে।

     জেমস একটু ইতস্তত ভাবটাকে ঝেড়ে ফেলে অনুসরণ করলো অবয়বটাকে। যতটা সম্ভব হাল্কা পা ফেলে শব্দ না করে এগিয়ে চললো পাথরের সিঁড়ির ধাপে ধাপে।

     ফাঁকা কমনরুমে পৌঁছেই দেখতে পেল ভৌতিক আকৃতিটা পোরট্রেটের গর্তটা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, স্থুলকায় মহিলাটির পিছন দিক দিয়ে। জেমস ছুটে গেল।

     জেমস নিশ্চিত মহিলাটি ওকে কষে বকুনি দেবেন যদি ও বিনা অনুমতিতে পার হয়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করে। বাস্তবে দেখা গেল মহিলাটি ঘুমে অচেতন। জেমস বেরিয়ে এসে আস্তে করে ছবিটাকে ঠেলে দিল গোলগর্তটার কাছে। একেবারে স্বাভাবিক মহিলাদের মতই নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন মহিলাটি। জেমসের মনে হল এর পেছনে আসলে ওই ভুতুড়ে অবয়বের কোন জাদু আছে।

     নিঝুম চারিধার। মাঝরাতে সারিসারি হলঘরগুলো সব নিস্তব্ধ এবং অন্ধকার। রুপালী নীলচে চাঁদের আলো ঢুকছে কিছু কিছু জানলা দিয়ে। জেমসের উচিত ছিল নিজের জাদুদন্ডটা নিয়ে আসা। যদিও জাদুদন্ডের ব্যবহার ও খুব একটা জানে না, তবু একটা মোটামুটি একটা আলো জ্বালানোর মতো মন্ত্র ওর জানা ছিল। চাঁদের আলোয় তৈরি হওয়া আলোছায়ার নকশার মাঝে ও খুঁজতে শুরু করলো অবয়বটাকে। কিন্তু কোত্থাও কিছু নেই। বেশি না ভেবে নাক বরাবর এগিয়ে চললো জেমস।

     এদিক ওদিক অনেক ঘোরার পর যখন কিছুই দেখতে পেল না, তখন হাল ছেড়ে ফিরে যাবে বলেই ঠিক করলো। কিন্তু গ্রীফিন্ডোর কমনরুমে ফিরে যাওয়ার রাস্তা কোনটা সেটাই তো ওর জানা নেই। খুঁজতে খুঁজতে কোথায় এসে পড়েছে সেটাও বুঝতে পারছে না। করিডোরটা অনেক উঁচুতে এবং সরু। কোথাও কোনো জানলা দেখা যাচ্ছে না। পেছনে ধনুকাকৃতি দরজাটার কাছে একটাই মাত্রমশাল জ্বলছে। ওটার তলা দিয়েই ও এখানে এসেছে। দুদিকেই সারি সারি বন্ধ কাঠের দরজা যার ওপর লোহার বার আটকানো।ওগুলোরই কোনো একটার পেছন থেকে ঘুমন্ত দৈত্যর গোঙানির মত হাল্কা টানাটানা আওয়াজ আসছিল। যে অবস্থায় জেমস এখন দাঁড়িয়ে আছে তাতে ওই শব্দ যে যথেষ্টই শিহরণ উদ্রেককারীতা বলাই বাহুল্য।কিন্তু জেমস জানে না ফিরে গেলে ঠিক কোন জায়গায়ও পৌছাবে। তার চেয়ে এগিয়ে যাওয়াই ভালো। মশালের আলোয় ওর ছায়াটা ওর সামনেই মাপে বড় হতে হতে মিশে যাচ্ছিল দূরে অন্ধকারে।

     ‘হ্যালো?’ ক্ষীণ স্বরে জেমস জানতে চাইলো, ‘আপনি কি এখানে আছেন? আমি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না।’

     কোন উত্তর নেই। করিডরে ঠান্ডার মাত্রা যেন বাড়ছে। জেমস দাঁড়িয়ে গেল। কিছু একটা দেখতে পাওয়ার আশা নিয়ে অন্ধকার ছায়ায় ঢাকা জায়গাটার দিকে ভালো করে দেখে চট করে পিছন ঘুরে তাকালো। কি যেন একটা নড়লো! ওইতো, কিছুটা দূরেই। সেই সাদা অবয়ব, ঢুকে গেল একটা দরজা দিয়ে। ভালো করে তাকাতেই জেমস বুঝতে পারলো দরজাটা মোটেই বন্ধ করা নেই। নীলচে চাঁদের আলোয় ফাঁকটা ভালোভাবেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কাঁপা কাঁপা হাতে দরজাটা ঠেললো জেমস। খুলে গেল হাল্কা শব্দ করে। সঙ্গেসঙ্গেই মেঝেতে পড়ে থাকা কিছুতে ঘষটে গিয়ে আটকেও গেল পাল্লাটা। জেমস দেখতে পেলো মেঝেতে ভাঙ্গা লোহার টুকরো পড়ে আছে বেশ কিছু। পাশেই কালো লম্বা হুক লাগানো কিছু একটা রাখা। সিঁদকাঠি। পা দিয়ে ওটাকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে দরজাটা আর খানিকটা খুলে তারপর ঢুকলো ভেতরে।

     লম্বাঘরটা ধুলোয় ভর্তি। ভাঙ্গা ডেস্ক আর চেয়ার ডাঁই করে রাখা আছে। মনে হয় কখনো ওগুলো এখানে পাঠানো হয়েছিল সারানোর জন্য। সে কাজ আর করা হয়নি। সিলিংটা ঝুঁকে নেমে গিয়ে মিশেছে সামনের দেওয়ালে। যেখানে চারটে খোলা জানলা দিয়ে ঢুকছে চন্দ্রালোক। একেবারে ডান দিকের জানলাটা ভাঙ্গা। কাঁচ পড়ে আছে মাটিতে। বড় বাদুড়ের ডানার মতো একটা পাল্লা ভেঙে ঝুলছে। ভৌতিক অবয়বটা দাঁড়িয়ে আছে ওখানেই, দেখছে ভাঙ্গা কাঁচগুলোকে। মাথা তুলে তাকালো জেমসের দিকে। এখন ওটার সম্পূর্ণ রূপটা দেখা যাচ্ছে। জেমস একটা ঢোঁক গিললো, ও চিনতে পেরেছে ছেলেটির মুখ। তৎক্ষণাৎ একসঙ্গে দুটো ঘটনা ঘটে গেল। অবয়বটা মিলিয়ে গেল রুপালী ধোঁয়াশা হয়ে আর বাইরে করিডর থেকে ভেসে এলো ধাক্কা খেয়ে কিছু ছিটকে পড়ার মতো শব্দ।

     জেমস দ্রুত ছুটে গেল কি হলো দেখার জন্য। উঁকি দিল দরজার বাইরেটায়। কিছুই দেখতে না পেলেও একটা খ্যাটখ্যাটে শব্দের অনুরণন অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এলো। জেমস আবার ঘরের ভেতরে ফিরে এলো। ওর হৃৎপিণ্ড এতো জোরে জোরে লাফাচ্ছিল যে সবুজ আলোর নাচানাচিও দেখতে পাচ্ছিল অবচেতন মনে। একটু ধাতস্থ হয়ে চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখলো। অন্ধকার ঘরটায় ভাঙ্গা জানলা আর মাকড়সার জালে ঢাকা কিছু আসবাবপত্র ছাড়া কিছুই নজরে এলো না। অবয়বটাও আর দেখা দিলো না। একটা বড় করে শ্বাস নিয়ে জেমস বেরিয়ে এলো করিডোরটায়।

     দূর থেকে একটা ছোট্ট ঠুকঠাক আওয়াজ ভেসে এলো ওর কানে। আওয়াজটা এলো সামনে অন্ধকারে ঢেকে থাকা করিডোরের প্রান্ত থেকে। নিঝুম রাতে শব্দটার অনুরণন পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। জেমস আবার নিজেকেই মনে মনে গালাগাল দিলো জাদুদন্ডটা ফেলে চলে আসার জন্য। পা টিপে টিপে এগিয়ে চললো অন্ধকারের দিকে। একেবারে শেষপ্রান্তে পৌঁছে দেখতে পেল আরও একটা খোলা দরজা। কাঠের দরজার পাশের পাথরের ফ্রেমে হাত রেখে ঊঁকি মারলো ভেতরে।

     অস্পষ্টভাবে হলেও বুঝতে পারলো এটা জাদু তরলের স্টোরেজ রুম। ভেতরে একজন লোক। কালো জিন্স আর কালো শার্ট পড়ে আছে। এই লোকটাকেও চিনতে পারলো জেমস। এই সেই মানুষ যে নিষিদ্ধ অরণ্যের পাশ দিয়ে এসে ছবি তুলছিল। মেঝেতে রাখা টুলটার কাছে ছোট ছোট কিছু কাঁচের ভায়াল ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। জেমস লক্ষ্য করলো লোকটা মুখে পেনলাইট ধরে শেলফের ওপর থেকে আরেকটা জার নামানোর চেষ্টা করছে একহাতে। অন্য হাতে ধরে আছে উল্টোদিকের শেলফটাকে।

     ‘হেরিয়াথ হেরাং,’ঘাড় বেঁকিয়ে আলোটা জারটার ওপর ফেলে পড়লো লোকটা। ‘কি সব অং বং চং এগুলো?’ নিচুস্বরে নিজের মনেই বললো। তারপর কি মনে হতে তাকালো দরজার দিকে। চোখে চোখ পড়লো জেমসের সঙ্গে। বেশ খানিকক্ষণ দুজনেই একটুও নড়ল না। জেমস নিশ্চিত যে লোকটা ওকে তেড়ে আসবে। কোন সন্দেহই নেই যে লোকটা একজন অনধিকার প্রবেশকারী। জেমস ওকে দেখে ফেলেছে। চেষ্টা করলো ঘুরে দৌড় লাগানোর। কিন্তু ওর মাথা আর নিম্নাঙ্গের মধ্যে যেন যোগাযোগই নেই। মন চাইছে দৌড়ে পালাতে। পা জমে আটকে গেছে মেঝেতে। দরজার পাথরের ফ্রেমটাকে সজোরে খামচে ধরলো অযাচিত ত্রাসে। ওদিকে জেমসের ভাবনা মতোই লোকটা ধেয়ে এলো ওর দিকে। 

     কিছু বুঝতে পারার আগেই লোকটা ওর পাশ দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল। স্টোরেজ রুমে ঝোলানো পর্দাটাকে ছিঁড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। জেমসের মনের ভেতর কে যেন বলে উঠলো ওর পিছু নাও।

     জাদু তরলের এই ঘর থেকেই ওই বিষয়ের ক্লাসরুমে যাওয়া যায় এটা জেমস জানে। অন্ধকারে টানা হাইটেবিল আর তারসঙ্গে আটকানো বসার জায়গাগুলো রাখা আছে সার সার করে। জেমস একটু থেমে পরিস্থিতিটা বুঝে নিলো। করিডোরে লোকটার পালানোর পদশব্দ শোনা যাচ্ছে। অন্ধকারে অনুমানে টেবিল চেয়ারগুলো পাশ কাটিয়ে এগোনোর সময় ওর নিজের পা ফেলার শব্দও নিশ্চিত পৌছে যাচ্ছে করিডরে।

     লোকটা থমকে গেল একটা জায়গায় এসে। সামনে দুটো করিডরে যাওয়ার পথ। পেছন দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল জেমস ধেয়ে আসছে। লোকটা চেঁচিয়ে উঠলো। ঠিক এরকম ভাবেই চেঁচিয়েছিল সেইদিন সকালে ভৌতিক অবয়বটাকে ধেয়ে যেতে দেখে। পিছলে পড়তে পড়তে সামলে নিলো নিজেকে, তারপর অপেক্ষাকৃত চওড়া করিডোরটা বেছে নিয়ে ছুটতে থাকলো। জেমস এবার বুঝতে পেরেছে ও এখন ঠিক কোথায়। লোকটা সেই হলে পৌঁছাবে যেখানে জায়গা বদলকারী সিঁড়িদের অবস্থান। ভাবতে না ভাবতেই এক অবাক হওয়ার শব্দ ভেসে এলো। জেমসের মুখে ফুটে উঠলো হাসি।

     সামনের রেলিং এর কাছে গিয়ে থেমে ঝুঁকে নিচের অন্ধকার মেঝের দিকে তাকালো। প্রথমে সিঁড়িগুলোর মৃদু নড়াচড়ার শব্দ কানে এলো ওর। তারপরই লোকটার জুতোর খট খট শব্দ শোনা গেল। ওইতো লোকটা, সিঁড়ির একটা রেলিং ধরে নামতে চেষ্টা করছে। ভয়ে ভয়ে কারণ সিঁড়িটা দুলছে। জেমস আবার একটু ইতস্তত করলো, তারপর সেটাই করলো যা সে সবসময় করতে চেয়েছে কিন্তু কখনো করার সাহস জোগাতে পারেনি। একেবারে কাছের সিঁড়ির রেলিংটায় লাফ দিয়ে চেপে বসলো। তারপর ওটাকে চলতে দিল ইচ্ছেমতো।

     হাউস এলফদের দ্বারা রোজ পরিষ্কার করা চকচকে মোটা কাঠের রেলিং ঠান্ডা হয়ে আছে বরফের মতো। নিচের দিকে নামতে থাকা রেলিংটা থেকে মাথা ঘুরিয়ে ও দেখার চেষ্টা করলো কোথায় পোঁছাবে এটা। কিছু আগেই ঘামে লেপ্টে যাওয়া চুলগুলো এখন শনে শনে হাওয়াতে উড়ছে। প্রায় জমির কাছাকাছি এসে যেতেই ও রেলিংটা চেপে ধরলো শক্ত করে। সামনের দিকে একটু ঝুঁকে টুক করে লাফিয়ে নেমে গেল মেঝেতে। এদিক ওদিক তাকাতেই  দেখতেও পেয়ে গেল লোকটাকে। ওর ঠিক নিচের তলাতেই। প্রায় পৌঁছে গেছেনামার মতো জায়গায়।

     ড্যাড ওকে অনেকদিন আগে বুঝিয়ে দিয়েছিল সঞ্চরণশীল সিঁড়ি ব্যবহারের ঘাঁতঘোঁত। জেমস সেই মতো একটু দেখে নিল নড়াচড়ার ছকটাকে। তারপর বেছে নিল আর একটা সিঁড়িকে যেটা জায়গা পরিবর্তন করতে শুরু করেছে সবে। ঝাঁপ দিয়ে হাঁচড় পাচড় করে পাকড়ে ধরলও ওটার রেলিং। চলতে শুরু করলো ওটার গতিপথ অনুসারে। একদিকে কিছু সিঁড়ি ক্রমশ জায়গা পরিবর্তন করে চলেছে। আর অন্য দিকে ঝটপট করে মিলিয়ে যাচ্ছে ধাপগুলো। জেমস দাঁতে দাঁত চিপে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। লোকটা নিচের তলায় নামার একেবারে মুখে পৌঁছে গেছে। অদৃশ্য হতে থাকা একটা ধাপে হোঁচট খেয়ে বোকার মতো লোকটা ওপর দিকে তাকালো। আর তখনই বুঝতেই পারলো জেমস নেমে আসছে ওকে লক্ষ্য করে রকেটের মত।

     রেলিং ছেড়ে জেমস লাফিয়ে পড়লো লোকটার ওপর। লোকটা ছিটকে পড়ে গেল পাথরের মেঝের ওপর। তৃতীয় বার চিৎকার বেরিয়ে এলো লোকটার কণ্ঠ দিয়ে, এবারেরটা যুগপৎ হতাশার এবং অবাক হওয়ার। টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে করতেই আবার লোকটা পড়ে গেলো। শোনা গেল কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ। জেমস গড়িয়ে যেতে যেতে নিজের মুখ ঢাকলো হাত দিয়ে। যখন সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল, জেমস আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারলো। দেখতে পেল কাছেই স্টেইনগ্লাসের জানলাটার গায়ে মানুষের আকৃতির একটা গর্ত। যেখান দিয়ে রাতের তারা ভর্তি আকাশের প্রেক্ষাপটে হাওয়ায় নড়তে থাকা কালো কালো গাছের ডাল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

     ‘কি হচ্ছে এখানে?’ একটা খসখসে রাগ মেশানো কণ্ঠস্বর প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলো। জেমস সাবধানে পা ফেলছিল যাতে ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো না ঢুকে যায়। জানলার গর্তটার কাছে গিয়ে বাইরের দিকটায় তাকালো। বলা খুব মুস্কিল জানলাটা ঠিক কতটা উঁচুতে। গাছ পাতার ফিসফাস শব্দ ছাড়া চরাচর শান্ত নীরব।

     মিসেস নরিস নামের বিড়ালটা এসে দাঁড়ালো সিঁড়িটার কাছে। গোল গোল কমলা রঙের চোখ দিয়ে ওটা জানলাটা, ভাঙ্গা কাঁচগুলোকে এবং সবশেষে জেমসকে দেখলো। পেছন পেছন এসে দাঁড়ালেন মিঃ ফিলচ। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই শুরু হয়ে গিয়েছিল অভিসম্পাতের বর্ষণ।

     ‘ও হো, এতো দেখছি খুদে পটার। নাহ এতে তো অবাক হওয়ার কিছুই নেই!’ ব্যঙ্গাত্মক কাঁপা কাঁপা কন্ঠস্বরে বললো ফিলচ।

     ‘তাহলে পটার,তুমি এটাই বলতে চাইছো তো, রাতের বেলায় দুর্গের এখান ওখান দিয়ে একা একা একজন অচেনা ব্যক্তিকে ধাওয়া করছিলে?’ হেড মিস্ট্রেস ম্যাকগনাগল নিজের ডেস্কের ওপর দুটো হাতের ভর রেখে কঠোর সুরে জানতে চাইলেন। চোখে সংশয়, মুখাবয়ব গোমড়া।

     ‘আমি মানে-’ কথা শুরু করতে না করতেই উনি থামিয়ে দিলেন হাত তুলে।

     ‘কোনো কথা বলবে না। এই সকালে আমার ধৈর্য নেই বাজে কথা শোনার।’ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চশমাটা একটু নাকের ওপর ঠেলে দিলেন।‘আমি পটারদের অনেক অনেক বাহানা শুনে শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, এটা মাথায় রেখো।’

     ফিলচ কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল, ওর চোয়াল নড়ানো আর চোখের নড়াচড়া প্রমান দিচ্ছিল যে ও খুব উপভোগ করছে  পটারকে ধরতে পারাটা। মিসেস নরিস ওর হাতের ওপর বসে ভুর ভুর করে আওয়াজ করছিল। জেমস হেডমিস্ট্রেসের ঘরের চারদিকটা একবার দেখে নিলো। সমস্ত প্রাক্তন হেডমাস্টার ও হেডমিস্ট্রেসরা ঘুমাচ্ছেন তাদের নিজের নিজের ছবির মধ্যে। জেমস ওর ভাইএর নামের মানুষটার ছবিও দেখলো। আলবাস ডাম্বলডোর। বসে আছেন চেয়ারে, থুতনি ঠেকে আছে বুকে, হ্যাটটা নেমে এসেছে চোখের ওপর। ঠোঁট নড়ছে সামান্য।

     ম্যাকগনাগল বসলেন চেয়ারে। ‘মিঃ পটার, তুমি নিশ্চয় এটা বলতে চাইবে না যে তুমি জানতে না রাতের বেলায় স্কুল চত্বরে ঘোরাফেরা করা শিক্ষার্থীদের জন্য নিষিদ্ধ?’

     জেমস ঝট করে উত্তর দিলো, ‘না, ইয়ে হ্যাঁ, আমি জানি নিয়মটা। কিন্তু ওই ভুতটা …’

     ম্যাকগনাগল আবার হাত ওঠালেন। ‘হ্যাঁ, ওই ভুতটার গল্প, আমি শুনেছি।’ জেমসের বলা কাহিনির এই অংশটা নিয়ে ওনার দ্বিধা প্রকাশ পেল বলার ভঙ্গীতে। ‘কিন্তু মিঃ পটার, এর অর্থ তো এটা নয় যে কোন একটা ভুত কোন এক ছাত্র বা ছাত্রীর শয়নকক্ষে গেল মানেই সে যে কোন নিয়মকানুন ভাঙ্গার ফ্রি পাস পেয়ে গেল।’

     মিঃ ফিলচ এগিয়ে গেল, সম্ভবত ওর মনে হয়েছে ও আর যা দেখেছে সেটা বলার এটাই উপযুক্ত সময়। ‘ছেলেটি হেরাক্লেসের জানলাটাও ভেঙে ফেলেছে, হেড ম্যাম। অমূল্য একটা জিনিষ ছিল ওটা। আর কোন ভাবেই ওটার দ্বিতীয় পাওয়া যাবে না। আমি হলফ করে বলতে পারি।’ কথা বলা শেষ করে চোখ টেরিয়ে তাকালো জেমসের দিকে।

     ‘জানলা ভাঙ্গাটা একটা আলাদা ব্যাপার, মিঃ ফিলচ,’ ম্যাকগনাগল বললেন ওর দিকে না তাকিয়েই। ‘কিন্তু স্কুলের চত্বরে অনধিকার প্রবেশ একটা পুরো অন্য বিষয়। আমি আশা করছি আপনি এ ব্যাপারে ক্যাম্পাসে খোঁজ খবর নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন? হেরাক্লেসের জানলার আশপাশটাকে ভালো ভাবে খতিয়ে দেখেছেন?’

     ‘ইয়েস ম্যাম, কিছুই পাইনি ওখানে। ওই জানলাটার ঠিক তলাতেই ভেনাস রোজ এর বাগান। জায়গাটা একটু তছনছ হয়েছে, ভাঙা কাঁচ পড়েছিল বেশ কিছু, কিন্তু কোন অনুপ্রবেশকারীর চিহ্ন মেলেনি। একমাত্র এই ছেলেটি বলতে চাইছে অনুপ্রবেশকারী এসেছিল।’

     ‘হ্যাঁ,’ ম্যাকনগনাগল বললেন, ‘আর দুর্ভাগ্যবশত আমি ওর কথাটা বিশ্বাসও করছি। কেউ একজন ওই জানলা ভেঙে বেরিয়ে গেছে, যদি না আপনি বলতে চান যে মিঃ পটার ওটা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছিল।’

     ফিলচ দাঁত কিড়মিড় করে চোখ টেরিয়ে জেমসের দিকে তাকালো। মনে হচ্ছিল সেরকম কোন সম্ভাবনাও থাকতে পারে বলেই বিশ্বাস করে।

     ম্যাকগনাগল জেমসকে বার কয়েক দেখে বললেন, ‘মিঃ পটার, আমি মেনে নিচ্ছি যে তুমি কাউকে দেখেছো। কিন্তু স্কুল চত্বরের বাইরে থেকে কোন ব্যক্তির ভেতরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। তুমি নিশ্চয় জানো হগওয়ারটসকে সুরক্ষিত করা আছে সবচেয়ে সেরা সুরক্ষা ব্যবস্থা আর অ্যান্টি-ম্যাজিক মন্ত্র দ্বারা। কোন উইচ বা উইজার্ড দারুণ ক্ষমতার অধিকারী না হলে বা প্রকৃত অনুমতি না পেলে এখানে প্রবেশ করতেই পারবে না।’

     ‘হ্যাঁ ম্যাম। আমি জানি। কিন্তু আমার অনুমান যে এসেছিল সে উইজার্ড নয়। ভুল যদি না করি সে একজন মাগল!’

     জেমস আশা করেছিল এটা শুনে অবাক হয়ে হবেন হেডমিস্ট্রেস এবং ফিলচ। কিন্তু আদতে সেটা হলো না। হেডমিস্ট্রেস এর মুখে কোন পরিবর্তনই দেখা গেল না। ফিলচ দুজনকেই বারকতক দেখে নিয়ে একটা বিচ্ছিরি ধরনের হাসি হাসলো।

     ‘আপনার এ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা উচিত, হেড ম্যাম। ওরা দুষ্টুমির নিত্যনতুন পদ্ধতি বার করে প্রতি বছর।’

     ‘জেমস’, ম্যাকগনাগল নম্র গলায় বললেন, ‘স্কুলটি সর্বসমক্ষে যাতে প্রকাশিত না হয় তার জন্য বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাপক পরিমাণে ছড়িয়ে রাখা ডিসইলিউশনমেন্ট মন্ত্র এই জায়গাটাকে লুকিয়ে রেখে দিয়েছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। বিশেষ করে মাগলদের জন্য এর পথ খুঁজে পাওয়াই কঠিন। আশা করি এটাও তোমার জানা আছে?’

     জেমস একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো, ‘হ্যাঁ জানি। কিন্তু তার জন্য আমি যা দেখেছি সেটা তো বদলে যাবে না। ওই অনুপ্রবেশকারী একজন মাগল ছিল। জাদুদন্ডের বদলে লোকটা একটা পেনলাইট আর একটা সিঁদকাঠি ব্যবহার করেছে।’

     ম্যাকগনাগল আরো খানিকটা সময় ধরে জেমসের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর একবারে কাজের কথায় এলেন। ‘ওকে মিঃ পটার যদি তোমার কথা সত্যি হয়, তাহলে যথেষ্টই চিন্তার ব্যাপার এবং আমাদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে কিছু একটা করা হবেই এটা আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি। আর এ ঘটনার জন্য আমি তোমায় কোন রকম দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু প্রথমে যা করেছ তার শাস্তি ভোগ করতেই হবে। আগামী শনিবার রাত্রে তোমায় দুঘণ্টা মিঃ ফিলচের সঙ্গে থাকতে হবে এবং ওর নির্দেশিত কাজ করতে হবে।’

     ‘কিন্তু-’ জেমস কিছু বলার আগেই ফিলচের হাত চেপে বসলো ওর কাঁধে।

     গরগরে শব্দ সহযোগে বললো, ‘আমি এবার এই ছেলেটার দায়িত্ব নিলাম। তাড়াতাড়ি ওদের ধরতে পারলে তাড়াতাড়ি সব মিটিয়ে দেওয়াই ভালো, ঠিক বললাম কিনা?’

     ‘পটার, মিঃ ফিলচকে জাদু তরলের ঘরের সেই জায়গাটা আর অন্য ভাঙা জানলাগুলো দেখিয়ে দিতে পারবে বোধহয়? ক্লাস শুরু হওয়ার আগে সব পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। ওকে, গুড মর্নিং।’

     জেমস দাঁড়িয়েই ছিল, ফিলচ ওকে এক রকম ধাক্কা মেরেই দরজা দিয়ে বার করে নিয়ে এলো।

     ‘চলো চলো, সোনা আমার। যে দুষ্টুমি করেছ সেটার ভরপাই করতে হবে, ভুলে গেলে নাকি?’

     বের হওয়ার ফাঁকে জেমস দেখতে পেল একজন হেডমাস্টার তার ছবির মধ্যে ঘুমাচ্ছেন না। চোখের মনি কালো।  কালো লম্বা চুল ফ্রেমের মতো ধরে রেখেছে লম্বা সাদা মুখটাকে। সেভেরাস স্নেপ। শীতল চোখে দেখে চলেছেন, ফিলচের সঙ্গে জেমসের প্রস্থান।

     টিনা কারি, মাগল স্টাডিজ এর প্রফেসর, শিক্ষার্থীদের নিয়ে এলেন খোলা মাঠে। সকালের রোদ ঝলমলে দিন এখন অনেকটাই মেঘাচ্ছন্ন। বেশ ভালোই হাওয়া দিচ্ছে। আর সেই হাওয়াতে ঊড়ছে প্রফেঃ কারির স্পোর্টস ক্লোক এবং কিছুক্ষন আগে হ্যাগ্রিড এর ঝুলিয়ে দেওয়া জাল। যা মাটিতে পোঁতা কাঠের তিনটে কাঠ দিয়ে তৈরী ফ্রেমে লাগানো হয়েছে।

     হাওয়ার দাপটে ওর হাত থেকে ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া উড়তে থাকা জাল দেখে, হ্যাগ্রিডবললো, ‘আপনাকে ধন্যবাদ মিস কারি। উফ্‌, দারুণ একটা চ্যালেঞ্জ এটা। অন্তত এই অংশটা, মোটেই নিয়ন্ত্রণে থাকতে চায় না।’

     হ্যাগ্রিড যে কাজটা করেছে সেটা খুব সাধারণ একটা কাজ। দুটো করে কাঠের দন্ড পুঁতে তার ওপর একটা কাঠের দন্ডকে আড়াআড়ি ভাবে লাগানো হয়েছে। আর সেই আয়তাকার ফ্রেম এর তিন প্রান্ত থেকে একটি জাল পেছন দিকে কিছু দূরে মাটিতে আটকানো। একই জিনিষ করা হয়েছে মুখোমুখী ভাবে বেশ খানিকটা দূরে। এখন হাওয়াতে দুটোরই জাল উড়ছে।

     ‘কারির এটা এ বছরের নতুন আমদানি,‌ টেড বললো জেমসকে। ‘নিশ্চিত ভাবেই এক পাগলামো মাগলদের ব্যাপার স্যাপার বোঝানোর জন্য। উনি যা শুরু করছেন এরপর থেকে সবাই চাইবে এই ধরনের ক্লাস একেবারে শেষ বছরে গিয়ে করতে।’

     ‘এই সঙের মতো পোশাকটাওবেশ ভালো, কি বলিস!’ ড্যামিয়েন বললো তিক্ত কণ্ঠে নিজের শর্টস আর মোজার দিকে তাকিয়ে। প্রত্যেক বৃহস্পতিবারে মাগল স্টাডিজ এর ক্লাসে শর্টস, অ্যাথলেটিক শ্যু আর হগওয়ারটস এর দুটো রঙের জারসির যে কোন একটা পরতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অর্ধেক ক্লাস পরেছে সোনালী জারসি আর বাকিরা বার্গান্ডি রঙের।

     ‘ড্যামিয়েন তোকে মোটেই খুব একটা, ইয়ে, দারুণ দেখাচ্ছে না। যদি সাদা মোজা পরতিস,’ সাব্রিনা বললো বেশ খানিকটা মজা করেই।

     ড্যামিয়েন ওর দিকে যা খুশী বল আমি থোড়াই কেয়ার করি ধরনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, ‘থ্যাঙ্কস সুইটি। এটা আমার মামকে একটু জানিয়ে দিসতো স্কার অ্যান্ড ব্লাডি রো মারটে যাওয়ার সময়।’

     জ্যান ড্যামিয়েনের বকবকানির দিকে নজর না দিয়ে মনে মনে বেশ উৎফুল্ল হচ্ছিল উপস্থিত বাকিদের তুলনায়। ওরতো ভালোই লাগছিল। ‘আমার দারুণ লাগছে ওগুলো দেখে। এবার মনে হচ্ছে তোমরা বুঝতে পারবে আসল খেলা কাকে বলে। মজা লোটার জন্য রেডি হও।’

     ড্যামিয়েন জ্যানের দিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বললো, ‘এই তুই বকবক করছিস কেন?’

     টেড ভালো মানুষের মতো বললো, ‘ও তো ঠিক কথাই বলছে ড্যামিয়েন। পুরানো সব কিছু ঝেড়ে ফেলে নতুন কিছু করার জন্য তৈরি হতে অসুবিধা আছে নাকি?’

     ‘এই যে সবাই শোনো,’ কারি বললেন, হাততালি দিয়ে। ‘দুটো লাইনে ভাগ হয়ে গেলে কাজটা সুবিধার হবে। চলো চলো, তাড়াতাড়ি সোনালী দল এদিকে আর বার্গান্ডি ওই দিকে। হ্যাঁ একদম, ঠিকঠাক হচ্ছে। বাঃ দারুণ।’

     লাইন হয়ে যেতেই প্রফেসর কারি হাতের তলা থেকে বার করলেন একটা লম্বা বাস্কেট। এগিয়ে গেলেন বার্গান্ডি রঙের দলটির লাইনের মাথার দিকে। ‘সবাই জাদুদন্ড বার করো,’ বললেন উনি। যে যার জাদুলাঠি বার করে রেডি হলো। দু একজন প্রথম বার্ষিকী এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিল ঠিক ভাবে ধরা হয়েছে কিনা। জেমস দেখলো জ্যান চকিতে একবার তাকিয়ে নিলো টেডের দিকে এবং ডান হাত থেকে বাঁহাতে নিয়ে নিল লাঠিটাকে।

     ‘দারুণ, এবার ওটাকে এর মধ্যে দিয়ে দাও’ কারি বললেন এবং বাস্কেটটাকে সামনের দিকে বাড়িয়ে ধরে হাঁটতে শুরু করলেন লাইনের সামনে দিয়ে। একটা সমবেত গোঙানির মত আওয়াজ শোনা গেল দুদিকের লাইন থেকেই। ‘আমি চাই তোমরা তোমাদের জাদুদন্ড থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে থাকো। সত্যিই যদি মাগলদের বিষয়ে কিছু শিখতে বা বুঝতে চাও তাহলে আমাদের প্রথমেই ম্যাজিকবিহীন ভাবে ভাবতে এবং শিখতে হবে। আর সে জন্যই জাদুদন্ড কাছে থাকা চলবে না। থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ মেটজকার, মিঃ লুপিন, মিস হিলডেগারড আর কি যেন তোমার নাম, হ্যাঁ মিস ম্যাকমিলান। ধন্যবাদ। সবাই দিয়ে দিয়েছো আশা করি?’

     উৎসাহহীন একটা শব্দ ভেসে এলো দুদিকের লাইন থেকে।

     ‘ওহো, কাম অন,’ জাদুদন্ড ভর্তি বাস্কেটটা জাল লাগানো তেকাঠির কাছে রেখে আসতে আসতে কারি বললেন, ‘আচ্ছা তোমরা কি এটাই প্রমাণ করতে চাইছো যে তোমরা জাদুর ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে একটা সাধারণখেলা, খুবই সাধারণ খেলাও খেলতে পারবে না? এটাই কি ধরে নেব?’ সরু নাসাগ্র কিঞ্চিৎ ওপর দিকে উঠিয়ে একের পর এক উনি সব শিক্ষার্থীদের দিকে তাকালেন। ‘মনে হয় না দরকার আছে। তবু শুরু করার আগে একটু আলোচনা করে নেওয়া যাক। মাগলদের জীবনযাত্রা বিষয়ে আমাদের জ্ঞান অর্জনের দরকার কেন সে বিষয়ে। আচ্ছা কেউ বলতে পারবে কেন?’

     জেমস কারির সঙ্গে চোখে চোখ মেলালো না যখন উনি এক এক করে সবার দিকে তাকালেন। খোলা মাঠে কারোর মুখে কোন শব্দ বের হলো না। শুধু দুর্গের অপরের পতাকা নড়ার শব্দ আর হাওয়ার দাপটে গাছের নড়াচড়ার শব্দ ছাড়া চারদিক নিস্তব্ধ।

     অতএব উত্তরটা দিতে হল প্রফেসর কারিকেই। কাটা কাটা উচ্চারনে যথেষ্ট আবেগের সঙ্গে উনি বলতে শুরু করলেন, ‘আমরা মাগলদের সম্বন্ধে কেন জানবো এটা বলতে হলে প্রথমেই বলতে হয় যে, অনেক বিষয়ে আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ওরা এবং আমরা সবাই কিন্তু মানুষ। আমরা যখন ভুলে যাবো এই অতি প্রয়োজনীয় সমতাটা, যখন আমরা ভুলে যাবো কি করে একসঙ্গে জীবন পথে হাঁটতে হয়… তখনই সেই ভুলটাই আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করবে এক বিরাট মাপের ভুল বোঝাবুঝির। যার একটাই পরিণাম দ্বন্দ্ব।’ একটু থেমে কথার রেশটাকে ছড়িয়ে দিতে দিলেন উনি। ‘ম্যাজিকবিহীন জগতে আমাদের মাগল বন্ধুরা নিজেদেরকে গড়ে তুলেছেন আবিষ্কারের সম্ভাবনাময়তায় এমন এক পথে, যা আমাদের জাদুজগত কখনোই করতে পারেনি। আর তার ফলেই, বুঝলে, ওদের খেলা গুলো সহজ সরল এবং দর্শনীয়। যেখানে দরকার নেই কোন উড়ুক্কু ঝাড়ুর বা কোন মন্ত্রপূত স্নিচের বা উড়ন্ত ব্লাজারের। কেবলমাত্র দরকার দুটো জালের যা আটকানো থাকবে তিনটে কাঠের দন্ডে, ঠিক ওইগুলোর মত,’ বাঁহাত তুলে দেখালেন হ্যাগ্রিডের খাটাখাটনির ফসল দুটোকে। আর ডান হাতটা তুলে ধরে বললেন, ‘আর একটা বল।’

     ‘অসাধারণ,’ জ্যান বললো ব্যঙ্গের সুরে, কারির হাতে ধরা বলটার দিকে তাকিয়ে। ‘সকার খেলা শেখার জন্য আমাকে আসতে হল জাদুর স্কুলে, বাহ রে বাঃ।’

     ‘এখানে আমরা একে ফুটবল বলি,’ ড্যামিয়েন বললো একই রকম তিক্ত স্বরে।

     ‘ম্যাডাম কারি,’ একটি সুমিষ্ট আওয়াজ শোনা গেল। জেমস তাকালো আওয়াজ লক্ষ্য করে। সোনালী জারসি পরা উল্টোদিকের লাইনে ট্যাবিথা করসিকা। একটা কালো ক্লোক পড়ে আছে জার্সির ওপর। ওর কাছেই লাইনে স্লিদারিনের অন্য সদস্যরা, বিরক্তিতে ভরা সব কটি মুখ। ‘মাগলদের একটি খেলা শেখার প্রয়োজনটা কি যদি বলেন তো ভালো হয়। ওদের ইতিহাস এবং জীবনযাত্রা বিষয়ে পড়াটাই কি যথেষ্ট নয়? ইন্টারন্যাশন্যাল ম্যাজিক্যাল আইন অনুসারে আমরা চাইলেও তো মাগলদের কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবো না। আশা করছি ভুল কিছু বলছি না?’

     ‘একদমই না, মিস করসিকা,’ কারি ঝট করে উত্তর দিলেন। ‘কিন্তু তুমি কি জানো কেন এটা করা হয়েছে?’

     টাবিথা ভ্রু উঠিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, ‘না, আমি জানি না ম্যাম।’

     প্রফেসর কারি টাবিথার দিক থেকে ঘুরে অন্যদের দিকে চেয়ে বললেন, ‘মিস করসিকার প্রশ্নের উত্তর কেউ কি দিতে পারবে?’

     জেমস দেখতে পেল হাফলপাফের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্র হাত তুললো। ‘ম্যাম, আমার মনে হয় ওই প্রতিযোগিতাগুলোতে উইজার্ডরা ম্যাজিক করবে আর তার ফলে ভারসাম্য নষ্ট হবে, তাই।’

     কারি ওর দিকে যেতে যেতে বললেন, ‘একদম মিঃ টেরেল। বুঝিয়ে বলো।’

     ‘আমার মাম মন্ত্রকে কাজ করেন। উনি বলেছেন ইন্টারন্যাশনাল আইন অনুসারে মাগলদের কোন খেলায়, প্রতিযোগিতায় বা লটারি ইত্যাদি জেতার জন্য জাদুর ব্যবহার করা উইজার্ডদের জন্য নিষিদ্ধ। যদি উইচ আর উইজার্ডরা মাগলদের খেলায় অংশ নিয়ে জাদুর ব্যবহার করে, তাহলে সেটা থেকে একটা বেআইনি চক্রের সৃষ্টি হতে পারে। তাই নয় কি?’

     ‘তুমি ইন্টারন্যাশনাল ডিপার্টমেন্ট ফর দ্য প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার অ্যাডভান্টেজ এর কথা বলছো মিঃ টেরেল। আর কম বেশী হলেও তোমার যুক্তিটা একদম ঠিক।’ কারি বলটাকে পায়ের কাছে ফেলে হাল্কা করে শট মারলেন। ঘাসের ওপর দিয়ে ওটা খানিক দূর গড়িয়ে গেল। ‘সত্যি কথা বলতে হলে বলতে হয় উইচ আর উইজার্ডরা মাগলদের খেলায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ঘোষিত এটা সঠিক তথ্য নয়। যে কেউ ওখানে অংশ নিতে পারেন জাদু জগতের অংশ হয়েও। তার আগে তাদেরকে জাদুজগতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দ্বারা কিছু বিশেষ মন্ত্রপাঠ শুনতে হবে। যার প্রভাবে সাময়িক ভাবে ইচ্ছুকদের জাদুশক্তি অকেজো হয়ে যাবে কিছু সময়ের জন্য। এটা মেনে না নিলে অবশ্য…’

     প্রফেসর কারি নিজের জাদুদন্ডটা বার করলেন ক্লোকের পকেট থেকে, নিশানা করলেন বলটায়। ‘ভেলসিটো এক্স পেন্ডাম,’ বললেন। দন্ডটাকে পুনরায় পকেটস্থ করে এগিয়ে গেলেন বলটার দিকে। আবার শট মারলেন হেলাফেলা করে। তা সত্ত্বেও বন্দুকের গুলির মতো বলটা ছিটকে গেল ঘাসের ওপর দিয়ে। সোজা গিয়ে ঢুকলো তিন কাঠিতে বাঁধা জালে।

     ‘আশা করছি তোমরা বুঝতে পারলে আমি কি বলতে চাইছি,’ কারি বললেন দুই লাইনের মধ্যবর্তী জায়গাটায় ফিরে এসে। ‘উইজার্ড ও মাগলদের নিয়ে একসঙ্গে কোন ক্রীড়ার আসর করা হলে হয়তো সেটা খুব একটা আকর্ষণীয় কিছু হবে না। কারণ সেখানে তো কোন উইজার্ড বা উইচ থাকবেই না। আর তোমরা জাদু ছাড়া কিছু বোঝো না। যদিও এটাও নিশ্চিত করে বলা যায় না যে মাগলদের ক্রীড়াজগতের নিয়মকানুন ভাঙ্গার চেষ্টা উইচ বা উইজার্ডরা করছেন কি করছেন না।’

     ‘ম্যাডাম কারি?’ টাবিথা আবার হাত তুললো। ‘এটা কি সত্যি, যে মন্ত্রক এবং ইন্টারন্যাশনাল ম্যাজিক্যাল কমিউনিটি বিশ্বাস করে, মাগলেরা জাদু দুনিয়ার কৌশলগত দিকের সঙ্গে নিজের খাপ খাওয়াতে পারে না। আর সে জন্যই উইচ আর উইজার্ডদের উচিত ওদের সমান হওয়ার জন্য নিজেদের ক্ষমতা কিছুটা কম ব্যবহার করা?’

     এই প্রথম প্রফেসর কারি একটু থমকে গেলেন। ‘মিস করসিকা, এই ক্লাসটা ওই ধরনের আলোচনার জন্য নয়। যদি তুমি মন্ত্রকের রাজনৈতিক কাজকর্ম বিষয়ে আলোচনা করতে চাও …’

     ‘সরি, ম্যাডাম কারি,’ টাবিথা জোর করে হেসে বললো। ‘আমি শুধু জানতে চাইছিলাম। এই ক্লাসটা মাগলদের ব্যাপার স্যাপার নিয়ে। তাই আমি ভেবেছিলাম আমাদের ক্ষমতার প্রেক্ষিতে মাগলরা কমজোরী, জাদু দুনিয়ার এই অপমানজনক ভাবনা নিয়েও আলোচনা হবে। আমায় ক্ষমা করবেন।’

     কিছুটা রাগের দৃষ্টিতেই টাবিথার দিকে তাকালেন কারি। কিছু করার নেই যদিও। অনেক তিক্ত কথাই সামনে এসে গেছে। জেমস শুনতে পেল চারপাশে একটা ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেছে। অনেকেই টাবিথার কথায় মাথা নেড়ে সমর্থন ও জানিয়েছে। জেমস এটাও দেখতে পেলো সোনালী জার্সির ওপর স্লিদারিন সদস্যরা “কোশ্চেন দ্য ভিক্টরস” লেখা ব্যাজ পরে আছে।

     কারি সবার উদ্দেশ্যে বললেন,‘তাহলে এবার কি আমরা শুরু করতে পারি?’

     পরের চল্লিশ মিনিট উনি বিভিন্ন রকম ড্রিল করালেন এবং বলটা ব্যবহারের পদ্ধতি শেখালেন। জেমস প্রথমে উৎসাহ পাচ্ছিল না, কিন্তু কিছু বাদেই খেলাটির সহজ সরল দিকটা ওকে ভালোই আকর্ষণ করলো। শুধুমাত্র জাদুদণ্ডই নয় এ খেলায় হাতের ব্যবহারও নিষিদ্ধ। আর এই ব্যাপারটাই জেমসকে বেশী মনোযোগী করে দিল খেলাটার প্রতি। কিছু ছাত্রছাত্রী যারা কোন রকম স্পোর্টস এই ভালো কিছু করতে পারে না তারাও এটায় মেতে গেল কোন রকম ভুল হওয়ার ভয় নেই ধরে নিয়ে। জ্যান আগেও ফুটবল খেলেছে, যদিও জানালো খুব বেশী এলেম ওর নেই এতে। জেমস দেখতে পেল বল নিয়ে ছুটতে গিয়ে জ্যান পড়ে গেল। বল বেরিয়ে গেল ও পড়েই থাকলো আকাশের মেঘগুলোর দিকে একটা ভাবুক ভাবুক ভাব নিয়ে।

     টাবিথা আর তার স্লিদারিন অনুগামীরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল মাঠের এককোণায়, ওদের সামনেই একটা ফুটবল পড়ে আছে। ওরা কারির দেখানো ড্রিলগুলো করছেও না। কারিও ওদের দিকে নজর না দিয়ে তিন কাঠির গোল নামক জাল লাগানো জায়াগার ব্যস্ত। যেখানে অন্য শিক্ষার্থীরা গোলে শট মারতে প্রস্তুত হচ্ছে।

     জেমস ভালোই উপভোগ করছিল। বলটা রাখা আছে সামনে, বেশ কিছুটা পেছন থেকে ও দৌড় শুরু করলো। হিসাব করে জায়গা মত পৌঁছে বাঁ পাটাকে বলের পাশে রেখে ডান পা দিয়ে সজোরে কষালো এক লাথি। যেটা করতে পেল ও বেশ সন্তুষ্টও হল। বলটা ধনুকের মত বাঁক নিয়ে প্রফেসর কারির বাড়ানো হাতের পাশ দিয়ে উড়ে গেল। উনি গোলকিপারের কাজটা করছিলেন। বলটা জড়িয়ে গেল জালে।

     ‘খুবই ভালো, মিঃ পটার,’ কারি সজোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন। ওনার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছোট্ট মুখটার চারপাশে ঝুলছিল। হাতা গুটিয়ে নিয়ে উনি বলটা কুড়ালেন। ‘সত্যিই খুব ভালো! স্বীকার করতেই হবে!’

     হাসি মুখে লাইনের একেবারে পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো জেমস।

     ‘ওহ  হো…টিচারের প্রিয় ছাত্র হয়ে গেলি বোধ হয়,’ জ্যান বিড়বিড় করে বললো।

     দুর্গের পথে ফিরে যাওয়ার সময় টেডও শটটার প্রশংসা করলো। ‘দারুণ মেরেছিস রে। এই ব্যাপারটাকে আমাদের উকেট এর মধ্যে ঢোকাতে হবে। সাব্রিনা ভেবে চিনতে দেখিস তো কিছু করা যায় কিনা। গোলাট্রন গ্রহ থেকে আসা সুপারকিক করনেওয়ালা এলিয়েন। বুঝলি?’

     ‘ঠিক হ্যায় ক্যাপ্টেন,’ সাব্রিনা দুর্গের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটা স্যালুট মেরে বললো। ‘বলছিলাম কি ক্যাপ্টেন আপনার সোনাপোনাতে ঘাসের দাগ লেগেছে। মন্দ  লাগছে না যদিও দেখতে।’

     লাঞ্চ এর পর জেমস আর জ্যান র‍্যালফের সঙ্গে লাইব্রেরীতে একত্র হলো। নিজেদের বইটইগুলো সব বার করে ওরা বসলো কোনার দিকের একটা টেবিলে। র‍্যালফকে আজ আরো বিষন্ন দেখাচ্ছিল অন্যান্য দিনের চেয়ে।

     জ্যান চাপা স্বরে, কারণ এই মুহূর্তে লাইব্রেরীর দায়িত্বে থাকা প্রফেঃ স্লাগহর্নের কানে কিছু পৌঁছাক ওরা চায় না, জানতে চাইলো, ‘কি হয়েছে র‍্যালফ? তোর গেঞ্জি বা শর্টসগুলো ঠিকঠাক ম্যাজিক্যাল নয় এরকম কিছু বলেছে নাকি তোর হাউসমেটরা?’

     র‍্যালফ চারদিকটা ভালো করে দেখে নিয়ে বললো, ‘আমার সঙ্গে আজ সকালে প্রফেসর স্লাগহর্ন এর একটা খিটিমিটি হয়েছে?’

     ‘এরকমই হচ্ছে মনে হয় চারদিকে,’ জেমস বললো। ‘আজ সকালটা আমাকেও কাটাতে হয়েছে ম্যাকগনাগল ম্যামের অফিসে।’

     ‘ম্যাকগনাগল?’ র‍্যালফ আর জ্যান একসঙ্গে বলে উঠলো। ‘তাহলে তোরটাই আগে বল। ম্যাকগনাগল এর কাছে স্লাগহর্ন নেহাতই বাচ্চাদের ব্যাপার।’

     জেমস ওদের জানালো রাতে দেখা ভুতটাকে অনুসরণ করে গিয়ে দেখা অনধিকার প্রবেশকারীর ব্যাপারটা।

     ‘তুই এত সব করেছিস?’ র‍্যালফ অবিশ্বাসী স্বরে। ‘ব্রেকফাস্টে যাওয়ার পথে আমরা সবাই দেখেছি ভাঙা জানলাটা। ফিলচ ওটাকে ক্যানভাস দিয়ে ঢাকছিল এবং বিড়বিড় করে কিসব বকে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ও আমাদের কাছে জানতে চায় কে করেছে এটা। তাহলে তাকে কয়েক ঘা দিতে পারে।’

     জ্যান জানতে চাইলো, ‘তোর কি মনে হয়, ওটা কে ছিল?’

     ‘জানি না। শুধু এটা বলতে পারি এ সেই লোকটা যে সেদিন সকালে অরণ্যের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল।  আমার ধারনা ও একজন মাগল।’

     ‘তো কি হয়েছে? আমি একজন মাগল। র‍্যালফ একজন মাগল।’ জ্যান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো।

     ‘না তোরা সেরকম নোস। তোরা মাগলজাত, কিন্তু দুজনেই উইজার্ড। আর ওই লোকটা ছিল একটা সাধারণ বয়স্ক মাগল। যদিও ম্যাকগনাগল ম্যামের কথানুযায়ী এটা সম্ভব নয়। কোন মাগলের পক্ষে ডিসইলিউশনমেন্ট মন্ত্রর প্রভাব কাটিয়ে স্কুলের ভেতর ঢোকা অসম্ভব।’

     ‘কেন? কি হবে তাহলে?’ র‍্যালফ জানতে চাইলো।

     ‘দ্যাখ, আমি তোদের একটা ব্যাপার বলে ছিলাম ট্রেনে আসার সময়। হগওয়ারটসকে সাধারণ ভাবে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কোনো ম্যাপে এর অস্তিত্ব নেই। কোন মাগল আজ অবধি এর কথা শোনেনি। যদিও বা কোনক্রমে কোন মাগল দুর্গের কাছাকাছি এসেও যায় সে বুঝতেই পারবে না কারণ দেখতেই পাবে না একে। যদি মন্ত্রের এলাকার মধ্যে ঢুকে পড়ে তাহলে বোধ বুদ্ধি হারিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাবে। ওদের কাছে যদি কম্পাস থাকে তাহলে সেটা উলটোপালটা দিক নির্দেশ করবে। কখনোই একে জোর করে ভেঙে কেউ ঢুকতে পারবে না। এরপরেও যেটা হবে যারা ভুল করে এপথে ঢুকে পড়েছিল তারা আওতার বাইরে গিয়ে ভাববে আসলে এসব কিছুই ঘটেনি, সব কল্পনা।’

     জ্যান ভ্রু কুঁচকে বললো, ‘তাহলে আমরা কি করে ভেতরে এলাম?’

     ‘আমরা আসলে কি সেটা কেন ভুলে যাচ্ছিস? আমরা হলাম সিক্রেট কিপারস।’, জেমস বললো। তারপর বুঝিয়ে দিল সিক্রেট কিপার বিষয়টা। সঙ্গেসঙ্গেই কি করে একজন সিক্রেট কিপার কোন গোপন জায়গা খুঁজে পায় বা অন্যদের সেই পথে নিয়ে যেতে পারে। ‘তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই সুরক্ষা ব্যবস্থা আমাদের অনেকের অসাবধানতার কারণেসুরক্ষিত থাকে না। যে কারণেই একটা আইন করা হয়েছে। কোনো মাগল বাবামাতাদের সন্তানরা যে এখানকার ছাত্র বা ছাত্রী সেটা কাঊকে বলতে পারেন না।’

     জ্যান বললো, ‘হুম, ওই জন্যই আমার এখানে আসার আগে ড্যাডকে বেশ কিছু ধরনের নন–ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টে সই করতে হয়েছে। বলার ধরনেই বোঝা গেল এই ব্যাপারটার মত দারুন কিছু ও এই প্রথম শুনলো। ‘ওটায় বলা ছিল কোন “বিশেষ সুযোগ প্রাপ্ত মাগল” যেমন আমার বাবামা কখনোই অন্য কোন মাগলকে হগওয়ারটস বা জাদু জগতের কথা বলতে পারবেন না। যদি বলেন, তাহলে চুক্তিভঙ্গের দায়ে ওনাদের জিভ উলটে যাবে। যতক্ষণ না মন্ত্রকের কেউ এসে অ্যান্টি-স্পেল পাঠ করবে ততক্ষণ কথা বন্ধ হয়ে থাকবে। আরে বাপরে!’

     ‘একদম ঠিক,’ জেমস বললো। ‘টেড আমায় বলেছিল ওর এক মাগলজাত বান্ধবীর কথা। যার বাবা মা ভুল করে একটি ডিনার পার্টিতে হগওয়ারটসের কথা বলে ফেলার সঙ্গেসঙ্গেই অজ্ঞান হয়ে যান। মাগলদের ডাক্তার এসে কিছুই বুঝতে পারেনি কি হয়েছে। মন্ত্রকের প্রতিনিধিরা এসে উপস্থিত সকলের ওই সময়টুকুর স্মৃতি মুছে দিয়ে গিয়েছিল। কি ঝামেলা বল দেখি? যদিও বেশ মজার।’

     ‘কু উ ল,’ র‍্যালফ বললো সহসাই। ‘এই ডিসইলিউশনমেন্ট চার্মটা আমার ব্যাগটাতে করতে পারলে ভালো হত। আমি তাহলে অনেক সমস্যা থেকে বেঁচে যেতাম।’

     জ্যান এবার র‍্যালফের কাছে জানতে চাইলো, ‘এবার তোরটা শুনি। প্রবলেমটা কি ঝটপট বল?’

     ‘আমি মোটেই ব্যাপারটার সঙ্গেজড়িত নই!’ র‍্যালফ বেশ জোরেই কথাগুলো বলেই স্বর নিচু করলো। সঙ্গেসঙ্গেই দেখে নিল প্রফেঃ স্লাগহর্ন শুনতে পেলেন কিনা। না, উনি উনার খুদে চশমার ভেতর দিয়েএকটা বিরাট মাপের বই পড়ায় ব্যস্ত। সামনে পাথরের মগে কিছু একটা তরল পানীয় রাখা আছে। মাঝে মাঝেই চুমুক দিচ্ছেন ওটায়। র‍্যালফ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। ‘স্লাগহর্ন আজ সকালে আমার গেমডেকটা পেয়েছেন। উনি বলেছেন আমি নাকি ওটা কমনরুমে ফেলে এসেছিলাম। উনি ভালই ব্যবহার করেছেন আমার সঙ্গে। সঙ্গেই বলেছেন, এসব জিনিষের ব্যাপারে আমার আরো সজাগ থাকা উচিত। এটাও বলেছেন এসব মাগলদের খেলনা বাড়িতে রেখে আসাটাই বাঞ্ছনীয় ছিল।’

     জেমস বললো, ‘তুই যে বলেছিলি ওটা পাওয়া যাচ্ছে না?’

     র‍্যালফ রীতিমত উত্তেজিতভাবে বললো, ‘বলেছিলাম তো! সত্যি কথাই তো বলেছিলাম! আমি মোটেই ওটাকে কমন রুমে ফেলে আসিনি! ওই হতচ্ছাড়া জিনিষটাকে টয়লেটে রেখে দিয়েছিলাম! কেউ ওখান থেকে ওটাকে ঝেড়ে দেয়। তারপর কমনরুমে রেখে দেয় যাতে স্লাগহর্ন ওটা খুঁজে পান। ওই সব বদমাইশদের আমি ঘেন্না করি!’ র‍্যালফের গলার স্বর ফিসফিসানিতে নেমে এলো। চারদিকটা একবার দেখে নিল এমনভাবে যেন মনে হলো ও ভয় পাচ্ছিলো এক্ষুনি দু চারজন স্লিদারিন হাঊসমেট এদিক ওদিক থেকে বের হয়ে আসবে।

     জ্যান চিন্তার সুরে বললো, ‘তুই তাহলে জানতিসনা বলছিস কে ওটা নিয়েছিল সে বিষয়ে?’

     ‘না, আর সে ব্যাপারে আমার কোন দ্বিধা নেই।’ র‍্যালফ রুক্ষ স্বরে উত্তর দিলো।

     ‘এখন ওটা তোর কাছে আছে?’

     ‘হ্যাঁ,’ কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে বললো র‍্যালফ। ‘ওটাকে এক মুহূর্তও চোখের আড়াল করবো না যতক্ষণ না ওটাকে বিদায় করতে পারছি। এখানে কোন কিছুই ঠিকঠাক ঘটবে বলে মনে হচ্ছে না। চারিদিকে শুধু ম্যাজিকের ছড়াছড়ি।’ নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে ডেকটাকে বার করে টেবিলের তলা দিয়ে জ্যানকে দিলো।

     জেমস দেখলো জ্যান অতি দ্রুত বোতামগুলোতে আঙুল নাড়াতেই ওটার স্ক্রীনটা আলোকিত হয়ে উঠলো। র‍্যালফ বিড়বিড় করে বললো, ‘এখন কেউ যদি ওটা সমেত তোকে দেখে আমি অস্বীকার করে দেব যে ওটা আমার। সোজ্জা কথা।’

     জ্যান আর কিছু বোতামে চাপ দিতেই একটা আলোর ঝলক সহ একটা ছবি ঘুরতে থাকলো। ‘আমি দেখতে চাইছি যে শেষ এটা খেলেছিল সে কোন প্রোফাইল বানিয়েছিল কিনা।’

     ‘প্রোফাইল কি? ’ জেমস স্ক্রীনের দিকে ঝুঁকে জানতে চাইলো।

     জ্যান ওকে সরিয়ে দিয়ে বললো, ‘উফ, এভাবে দেখিস না। স্লাগহর্ন দেখে নেবেন। র‍্যালফ মিঃ উইজার্ডকে বলেদেতো গেম প্রোফাইল বস্তুটা কি।’

     ‘এর সাহায্যে তুই তোর আগে খেলা গেমগুলো কি অবস্থায় আছে সেটা জানতে পারবি,’ র‍্যালফ ফিসফিস করে বললো। ‘খেলা শুরু করার আগে, তোকে একটা প্রোফাইল বানাতে হবে একটা নাম আর কি কি ব্যবহার করবি সেইসব জানিয়ে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আসল নাম বা অন্য কিছু কেউ সেট করে না। এরপর তুই গেমে যা করবি সব ওই প্রোফাইলের ভেতর সেভ হয়ে থাকবে। পরে আবার খেলা শুরু করলে যেখানে গেমটা বন্ধ করেছিলি সেখান থেকেই শুরু করতে পারবি।’

     ‘তুই র‍্যালফিনেটর?’ জ্যান জানতে চাইলো গেম ডেকটা নাড়া চাড়া করতে করতে।

     র‍্যালফ বললো, ‘আমি কিছুই বলবোনা।’

     ‘মনে হচ্ছে পেয়ে গেছি,’ জ্যান বললো, স্ক্রীনে একজায়গায় আঙুল ঠেকিয়ে। ‘আস্ট্রামাড্ডুক্স নামটা চেনা জানার মধ্যে মনে হচ্ছে কি?’

     ‘না, ওই নামে কোন প্রোফাইল আছে নাকি ওখানে?’ র‍্যালফ ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইলো।

     ‘আছেই তো। কাল মাঝরাতের সামান্য আগেপরে ওটা বানানো হয়েছে। তবে কোন ইনফো নেই। আর কোনো গেম খেলার প্রমাণও নেই।’

     জেমস চোখ বড় বড় করে বললো, ‘কোনো গেমই খেলা হয়নি?’

     ‘না,’ জ্যান বললো এবং ডেকটা শাটডাউন করে আবার টেবিলের তলা দিয়েই র‍্যালফকে ফিরিয়ে দিল। ‘অনেকবার লগ ইন হওয়ার ডাটা আছে, কিন্তু খেলা হয়নি। সম্ভবত বুঝতেই পারেনি কি করে ব্যবহার করতে হয়। আপ ডি প্যাড আর লেফট বাটন ব্যবহার না করতে জানলে সুপার অ্যাটাক তো হবেই না। একেবারে কাঁচা পার্টি।’

     জেমস চোখ পিট পিট করে বললো, ‘তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? ওই অ্যাস্ট্রা না কি যেন বললি সেটা কে?’

     ‘ওটার কোন মানে নেই। একটা ফেকনেম প্রোফাইল, কি রে তাই তো,’ গেম ডেকটাকে ব্যাগের একেবারে নিচে ঢুকিয়ে দিল র‍্যালফ।

     শেষ কথাটা র‍্যালফ জ্যানকে বললো, যে বেশ একটা হাস্যকর মুখ করে কিছু একটা ভেবে চলেছে।একটু মাথাটা নাড়ালো, ভ্রু কূঁচকালো, দাঁতে দাঁত চিপলো, যার ফলে ওর গালে একটা টোল পড়লো। আর একবার মাথাটা ঝাঁকিয়ে বললো, ‘আমি জানি না। নামটা খুব চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু মনে করতে পারছি না কোথায় শুনলাম।’

     ‘আপাতত আমি একটা কথাই জানি,’ র‍্যালফ বললো হাতের ওপর থুতনি পেতে, ‘ড্যাড এলেই এটাকে পত্রপাঠ বিদায় করবো। আমি আর ওটাকে দেখতে চাই না।’

     ‘মিঃ পটার,’ সহসাই একটা শব্দ শোনা গেল। তিনজনেই চমকে উঠলো। প্রফেসর স্লাগহর্নের কন্ঠ। উনি টেবিলটার কাছে এসে জেমসে চেয়ারের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। ‘আমি তোমার সঙ্গে দেখা করবো ভাবছিলাম। কি ভালোই লাগছে তোমায় দেখে। দারুণ, দারুণ।’

     ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার,’ জেমস বললো প্রফেসর ওর পিঠ চাপড়ে দিতেই।

     ‘তুমি জানো বোধ হয়, আমি তোমার বাবাকে চিনতাম। সে সময় থেকে যখন ও এখানকার ছাত্র ছিল। আজকের বিখ্যাত অরোর হয়ে ওঠেনি।’ স্লাগহর্ন চোখ টিপলেন। কারণ হ্যারি পটার হেড অরোর হওয়ার অনেক আগে থেকেই বিখ্যাত হয়ে গেছে এটা ওনার ভালই জানা আছে। ‘আমার কথা ও নিশ্চয় বলেছে তোমাকে। আমাদের মধ্যে ভালোই সম্পর্ক ছিল। অবশ্য অনেক দিন ধরে আমার সঙ্গে ওর তেমন কোন যোগাযোগ নেই। পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতে আরো আরো বুড়ো হয়ে গেছি। আর ও ওদিকে বিবাহ করেছে। নিজের একটা ভালো কাজ বেছে নিয়েছে। আর তোমার মত ভালো একটি ছেলেকে এই জগতের আলো দেখাতে সাহায্য করেছে।’ স্লাগহর্ন আবার একটা চাপড় দিলেন জেমসের কাঁধে। ‘আমি অপেক্ষায় আছি পরের সপ্তাহের জন্য, ওতো এখানেই আসছে। তুমি একটু জানিয়ে দিও আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। ভুলে যাবে নাতো?’

     ‘না না স্যার, আমি বলে দেবো।’ জেমস কাঁধে হাত বুলাতে বুলাতে বললো।

     ‘বেশ, বেশ। ভালো, তাহলে তোমরা আবার পড়ায় মন দাও। আমি যাই’, বলতে বলতে একবার করে জ্যান আর র‍্যালফের দিকে তাকালেন। মনে হলো না চিনতে পারলেন র‍্যালফকে। আজ সকালেই ওর সঙ্গে কথা বলেছেন সেটা মোটেই ওনার হাবভাবে বোঝা গেল না।’

     ‘ওহ, ইয়ে, প্রফেসর স্লাগহর্ন? আমি কি একটা প্রশ্ন করতে পারি?’ জ্যান বললো।

     স্লাগহর্ন ঘুরলেন, ভুরু কুঁচকিয়ে বললেন, ‘অবশ্যই করতে পারেন মিঃ?’

     ‘ওয়াকার, স্যার। আমার যতদূর মনে পড়ছে আপনি জাদু তরলের ক্লাসে অ্যাস্ট্রামাড্ডুক্স নামটির একবার উল্লেখ করেছিলেন?’

     ‘ইয়ে, ও! হ্যাঁ হ্যাঁ। বুধবার বিকেলের ক্লাসে, তাই না? মনে পড়েছে,’ স্লাগহর্ন সামনের ডেস্কটার দিকে এগিয়ে গেলেন। ‘হ্যাঁ যদিও ওটা জাদুতরল সম্বন্ধীয় নয়, তবু ওই নামটা আমার মুখে এসে গিয়েছিল। অ্যাস্ট্রামাড্ডুক্স একজন ইতিহাসবিদ এবং বিখ্যাত মানুষ অতীত সময়ের। ওনার লেখাগুলো, সত্যিই, প্রমাণের আওতার বাইরে সেরা জিনিষ। আমার মনে হয় আমি সামান্য ঠাট্টা করেছিলাম উনাকে নিয়ে, মিঃ ওয়াকার।’

     ‘ওহ। ঠিক আছে স্যার। অনেক ধন্যবাদ,’ জ্যান বললো।

     ‘কখনই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে কোন দ্বিধা করবে না,’ স্লাগহর্ন আশ্বস্ত করলেন এবং লাইব্রেরীর চারদিকটা একবার দেখে নিলেন। ‘ওকে, এবার আমি চললাম। আমার কাজ করতে। তোমাদের কাজ তোমরা করো।’

     ‘এটা একটা কাকতালীয় ব্যাপার,’ স্লাগহর্ন চলে যেতেই র‍্যালফ ফিসফিস করে বললো টেবিলের ওপর ঝুঁকে।

     ‘মোটেই না। উনি ওই নামটা ঠাট্টার ছলেই বলেছিলেন ক্লাসে। আমার ভালোই মনে পড়ছে এখন। কিছু একটার উদাহরণ দিতে গিয়ে যাকে ঠিকঠাক বিশ্বাস করা যায় না বা গোলমেলে ধরনের বোঝাতে গিয়ে উনি ওটা বলেছিলেন। ঠিক যেমনভাবে আমরা কোন সংবাদপত্র বা মিডিয়ার খবর বিষয়ে বলি। স্লাগহর্ন স্লিদারিন হাউসের হেড। তার অর্থ তিনি এই ঠাট্টা আগেই করে থাকতে পারেন তোর হাউস মেটদের সামনে। ওরা নামটা ভালো করেই জানে। আর সেরকমই কেউ তোর গেম ডেকে ওই নামটা ব্যবহার করেছে।’

     ‘হুম বুঝলাম,’ র‍্যালফ বললো দ্বিধাগ্রস্থ ভাবে।

     ‘কিন্তু কেন?’ জেমস জানতে চাইলো ‘কেন এরকম একটা নাম ব্যবহার করা হল যার অর্থ আমাকে বিশ্বাস কোরো না, আমি একটা ধাপ্পাবাজ।’

     ‘কে জানে কি প্যাঁচের খেলা চলছে স্লিদারিনদের মনের কোনে?’ জ্যান উত্তর দিলো।

     ‘এটা কোন কথা হলো না,’ জেমস বললো। ‘স্লিদারিনরা সব সময়েই একটু দেখনদারি পছন্দ করে। ওরা ভালো ভালো পোশাক আর অস্ত্রশস্ত্র, সঙ্গেই ড্রাগনের মাথার মত জিনিষ আর সিক্রেট প্যাসেজ এই সব ভালোবাসে। আমার মাথায় ঢুকছে না  যে নামটাকে ওদের হাউসহেড স্বয়ং ঠাট্টার ছলে ব্যবহার করেন সেটাকেই ওরা প্রোফাইল নাম হিসাবে ব্যবহার করলো কেন?’

     ‘যাই হোক, আমাকে এবার সত্যি সত্যিই কিছু হোমওয়ার্ক সারতে হবে। তাই যদি আপনারা আমায় অনুমতি দেন…,’ র‍্যালফ বললো।

     পরের আধঘণ্টা ওরা হোমওয়ার্ক করায় মগ্ন রইলো। তারপর সব গুছাতে গুছাতে জ্যান জেমসের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আজ রাতেই তো কুইডিচের বাছাই পর্ব তাইনা?’

     ‘হ্যাঁ আমার আছে জানি, তোরও আজই নাকি?’

     জ্যান মাথা নাড়লো ইতিবাচক ভাবে। ‘মনে হচ্ছে এক মাঠেই দু’দলের কাজ চলবে। শুভেচ্ছা রইলো।’ জ্যান জেমসের মুঠি হাতে নিয়ে বললো।

     জেমস যথেষ্টই অনুপ্রানিত হলো। ‘ধন্যবাদ! তোকেও শুভেচ্ছাজানালাম।’

     ‘আমি জানি তুই ওখানে দারুণ কিছু করে দেখাবি,’ জ্যান বললো ঘোষণার মত করে। ‘আমি নিজেকে ধন্য মনে করবো উড়ুক্কু ঝাড়ুর ওপর চেপে থাকতে পারলেই। আচ্ছা তুই কতক্ষণ এর আগে উড়েছিস?’

     ‘আমি একটা খেলনা ঝাড়ু করে ছোটবেলায় বাড়ির চারপাশে একবারই মাত্র উড়েছিলাম,’ জেমস বললো। ‘ঝাড়ুতে ওড়ার ক্ষেত্রে একসময় নিয়ম বেশ শিথিল ছিল। আন্ডারএজদের জন্য কত উচ্চতায় উঠবে বা কত দূর পর্যন্ত উড়ে যাবে এব্যাপারে বাধা নিষেধ ছিল সব সময়েই।তবে যত দূর খুশী যে কোন বয়সেই ওড়া যায় শুধু নজর রাখতে হবে যাতে কোন মাগল যেন দেখতে না পায়। ড্যাড যে বছরে অনারারি ডিপ্লোমা পায় হগওয়ারটস থেকে, সে বছরে কিছু টিন এজার ফায়ার হুইস্কি খেয়ে ট্রাফালগার স্কোয়ারে কুইডিচ খেলে। তখন থেকেই আইনটা কড়া করা হয়। এখন তো এটা মাগলদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার মত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। আইনসম্মত ভাবে ওড়ার অনুমতি পেতে হলে আগে ওড়ার ক্লাস করতে হবে এবং সার্টিফিকেট পেতে হবে। কিছু কিছু উইজার্ড পরিবার তার ছেলেমেয়েদের প্র্যাকটিস করতে দেন লোকচক্ষুর আড়ালে। কিন্তু জানিস বোধহয় আমার ড্যাড একজন দায়িত্ববান অরোর …’

     ‘তোর বাবা মা দুজনেই ওদের নিজের সময়ের সেরা কুইডিচ খেলোয়াড় ছিলেন, তাই না?’জ্যান জানতে চাইলো, জেমসকে হেসে কনুইয়ের একটা খোঁচা মেরে। ‘যে কারণে তোর যদি জানানাও থাকে ঝাড়ুর কোন দিকটা আকাশের দিকে ওঠে তবুও তুই কামাল করে দেখাবি। এটা হওয়াটাই স্বাভাবিক।’

     জেমস অস্বস্তির হাসি আনলো মুখে।

     ওরা চললো ক্লাসের পথে। জেমসের যথেষ্টই নার্ভাস হয়ে পড়ছিল। ওর কিছুই মনে নেই কুইডিচ এর বাছাই পর্বে কি হয়। আর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সব ফয়সালা হয়ে যাবে। একটা দলীয় ঝাড়ু নিয়ে প্রথমবার ওড়ার চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা করতে হবে প্রথম বার্ষিকীদের ভেতর থেকে নিজেকে গ্রিফিন্ডোর দলভুক্ত করার। ও সেই স্নিচটার কথা ভাবতে চেষ্টা করছিল, ওর বিখ্যাত বাবার প্রথম স্নিচ, যেটা নিয়ে ও কত খেলা করেছে। তখন ও নিজের ভবিষ্যত নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা করতো না। আঙ্কল রন যেভাবে গল্পগুলো বলতো তাতে মনে হতো জেমসের জন্মসিদ্ধ অধিকার আছে গ্রিফিন্ডোরের কুইডিচ টিমে চান্স পাওয়ার। আর সে ব্যাপারে জেমস কখনো প্রশ্নই করেনি। আর এখন বাস্তবের সামনে এসে ও যথেষ্টই ভয় পাচ্ছে। সেই ভয় যেটা একবার ওকে জড়িয়ে ধরেছিল সর্টিং হ্যাট পড়ার আগে। সেটা অবশ্য ভালোয় ভালোয় উৎরে গেছে। ও এতটাই দ্বিধায় ছিল যে সর্টিং হ্যাটকে বলেই ফেলেছিল যে ও স্লিদারিনে যেতে চায়। এখন বোঝে ও কত বড় একটা ভুল করতে যাচ্ছিলো। এখন একমাত্র উপায় নিজেকে শান্ত রাখা। গ্রিফিন্ডোরে চান্স পাওয়ার মতই কুইডিচ ওর রক্তে আছে। ওকে শুধু সেটাতেই মন দিতে হবে এবং কোন দুশ্চিন্তা করা চলবে না।

     ডিনারের সময় ও বুঝতে পারলো ও কতটা নার্ভাস হয়ে পড়েছে। খাবার ওর গলা দিয়ে নামতেই চাইছিল না।

     জেমসের প্লেটের দিকে তাকিয়ে নোয়া বললো, ‘চিন্তার কিছু নেই পটার।যত কম খাবি, তত বেশি উঁচু আকাশেতে উঠতে পারবি। অবশ্য আমাদের দেখা আছে এই শরীর খারাপের বাহানা করে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টাগুলো। প্রফেসর রিডকালির কাছে প্রথম ঝাড়ু ওড়ানোর ক্লাস তো করেছিস?’

     জেমস বড় বড় চোখে তাকিয়ে বললো, ‘না তো! আমার প্রথম ক্লাস তো সেই সোমবারে।’

     নোয়াকে একটু চিন্তিত দেখালো, তারপর মাথা নেড়ে বললো, ‘এইরে! ইয়ে, হুম, তুই ভালই পারবি। মনে রাখিস সামনের দিকে ঝুঁকতে হবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য, টেনে ধরবি থামানোর জন্য। আর ঝুঁকে নিজেকে ঘুরাবি বাঁক নেওয়ার জন্য। খুবই সোজা ব্যাপার।’

     ‘একদম,’ টেড সম্মতি জানালো। ‘আর বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে হাওয়াও বইছে, সুবিধাই হবে। ওপর থেকে তুই মাঠটা দেখতেই পাবি না । তার ওপর আছে কুয়াশা। ওসব না ভেবে নিজের মনের জোরে সব করবি।’

     দূর থেকে কেউ একজন বললো, ‘চেষ্টা চালিয়ে যেও ভাই যা শুনলে সেটাকে মনের ভেতরেই রাখার।’ একটা জোরালো হাসি শোনা গেল সঙ্গেসঙ্গেই। জেমস দুহাতের ওপর কপাল ঠেকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইলো।

     কুইডিচ পিচটা কাদায় প্যাচপেচে হয়েছিল। এত জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল যে জেমস তার ধাক্কা বেশ ভালোই অনুভব করতে পারছিল। চারদিকটা সত্যিই মনে হচ্ছিল কুয়াশায় ঢাকা। জাস্টিন কেনেলি, গ্রিফিন্ডোরের ক্যাপ্টেন তার দলবল নিয়ে মাঠে ঢুকে পড়লো, বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ওর গলা শোনা যাচ্ছিলো।

     ‘বৃষ্টির কারণে কুইডিচ খেলা ব্যাহত হয় না। বেশ কিছু সেরা কুইডিচ ম্যাচ এরকমই বা এর থেকেও বাজে আবহাওয়াতে খেলা হয়েছে। আশাকরছিতোমরা জানো, ১৯৮৪ এর কুইডিচ বিশ্বকাপ খেলা হয়েছিল টাইফুন ঝড়ের তান্ডবে জাপানের উপকূলে। সিকারসরা স্নিচকে ধরতে গিয়ে গেইল-ফোরস হাওয়ার দাপটে ৬০ মাইলের বেশী দূরে উড়ে চলে গিয়েছিল। তার কাছে এটা তো কিছুই নয়। বাছাই পর্বের জন্য আজকের দিনটা একেবারে পারফেক্ট।’

     মাঠের একেবারে মাঝখানে গিয়ে কেনেলি থামলো। ঘুরে দাঁড়ালো। ওর নাকের ডগা আর থুতনি দিয়ে বৃষ্টির জল চুঁইয়ে পড়ছিল। ওর পায়ের কাছে একটা বড় কুইডিচ ট্রাঙ্ক রাখা। ভিজে ঘাসের ওপর সারি দিয়ে রাখা আছে অনেকগুলো উড়ুক্কু ঝাড়ু। জেমস ওগুলোকে দেখে একটু স্বস্তি পেলো। বেশিরভাগই নিম্বাস টু থাউজ্যান্ড। ওকে যদি থান্ডারস্ট্রীক নিয়ে উড়তেহতো তাহলে নিশ্চিতভাবে ওকে খুঁজে পাওয়া যেত কয়েকশ মাইল দুরের কোন গাছে। উল্টোদিকে বেশ খানিকটা দূরে জেমস দেখল র‍্যাভেনক্ল এর দলও জড় হচ্ছে। যদিও বৃষ্টিপাতের কারণে কাউকেই চেনা যাচ্ছে না।

     ‘চলো শুরু করা যাক,’ কেনেলি চেঁচিয়ে বললো। ‘প্রথম বার্ষিকীর দল তোমাদের দিয়েই শুরু হবে। আমাকে জানানো হয়েছে যে তোমাদের মধ্যে অনেকেই এখনো প্রথম ঝাড়ু ওড়ানোর ক্লাস করার সুযোগ পাওনি। ধন্যবাদ নতুন নিয়মকানুনকে। যাতে তোমরা সই করেছিলে এখানে আসার আগে, ফলে ঝাড়ুতে ওড়ার সুযোগ দিতে আমরা বাধ্য। দেখে নেওয়া যাক তোমরা কে কি করতে পারো টিমের বাকিদের দেখার আগে। কোন কলাকৌশল দেখাতে হবে না। শুধু উড়ে দেখাও এবং মাথায় রেখো একে অপরের সঙ্গে যেন ধাক্কা না লাগে।‘

     জেমস পেটের মধ্যে আরশোলার সুড়সুড়ানি টের পাচ্ছিলো। ও আশা করেছিল আগে একটু সিনিয়র ছাত্রছাত্রীদের অভ্যাস কৌশল দেখে নেবে। আর এখন আগেই ওকে প্রথমবারের জন্য একা একটা ঝাড়ুতে উঠতে ও উড়তে হবে। হায়রে ও যদি ম্যাচ দেখার সময় একটু লক্ষ্য করতো ওরা কিভাবে কি করেন। তা না করে খেলোয়াড়দের স্টান্টবাজি আর ব্লাজারগুলোর ধেয়ে আসাই বেশী মনোযোগ দিয়ে দেখেছে চিরকাল। অন্যান্য প্রথম বার্ষিকীরা এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। বেছে নিয়েছে ঝাড়ু, হাত সামনে বাড়িয়ে আদেশ দেওয়ার অপেক্ষায়। জেমস মনের সমস্ত শক্তি এক করে নিজেকে ওদের সঙ্গে সামিল করলো।

     একটা ঝাড়ুর পাশে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো ওটার দিকে। প্রথম দেখায় ওটাকে দেখতে মোটেই কোন উড়ে যাওয়ার মত কিছু বলে মনে হবে না কারোর।একেবারে সাধারণ একটা কাঠের টুকরো, পেছন দিকে ঝাড়ন কাঠিগুলো বাঁধা। জল গড়িয়ে পড়ছে ওটার ভেতরে। জেমস নিজের হাতটা শূন্যে ভাসিয়ে রাখলো ওটার ওপর।

     ‘ভেসে ওঠ!’ বললো, নিজের কাছেই নিজের স্বর অচেনা ঠেকলো ওর। কিছুই হল না। ও ঢোক গিললো, যেন একটা স্টীলের বল ওর গলায় আটকে গেছে এমনই মনে হল। ‘ভেসে ওঠ!’ আবার বললো। ঝাড়ুটা একটু কেঁপে উঠলো ভিজে ঘাসের মধ্যে। জেমস অন্যান্য প্রথম বার্ষিকীদের দিকে তাকালো। কারোরই ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়। একজন ঝাড়ুটাকে ভাসাতে সক্ষম হয়েছে। পুরানো খেলোয়াড়েরা ব্যাপারটা থেকে বেশ মজাই পাচ্ছিলো। নোয়ার  সঙ্গে জেমসের চোখাচোখি হল। বুড়ো আঙুল আকাশের দিকে তুলে উৎসাহদানের ভঙ্গী করলো।

     ‘ভেসে ওঠ!’ জেমস আবারো বললো, গলায় যতটা সম্ভব ভারিক্কী ভাব এনে। ঝাড়ুটা বেশ খানিকটা ভেসে উঠলো। ধরতে পারার আগেই ওটা পড়ে গেল। নিজের ওজন বহন করতেই যেন পারছিল না। কিছু একটা ওর পাস দিয়ে স্যাঁৎ করে  চলে গেল।‘অনেক দূর যেতে হবে তোমাকে।’ টেড চেঁচিয়ে উঠলো সদ্য উড়ে যাওয়া ব্যাপ্তিশ্তে নামক মেয়েটির উদ্দেশ্যে। সোজা ওপর দিকে উঠে গেল মেয়েটি একটু কাঁপতে কাঁপতে। আরো দুটি প্রথম বার্ষিকী উড়তে সক্ষম হল; একজন দু সেকেন্ড উড়েই হাত পিছলালো আর সোজা পড়লো এসে মাঠে। একটা সমবেত হাসির শব্দ শোনা গেল। কেউ একজন বললো, ‘ভাগ্য ভালো ক্লেইন, তুমি আকাশের দিকে চলে যাওনি।’

     এবারে ঝাড়ুটা একটু ভেসে উঠতেই জেমস ঠোঁটে ঠোঁট টিপে খুব জোরে ঝাড়ুর লাঠিটাকে চেপে ধরলো। ওর আঙ্গুলের গাঁঠগুলো সাদা হয়ে এলো। থরথরিয়ে  কেঁপে উঠলো ওর শরীর।সঙ্গেসঙ্গেই বুঝলো ঝাড়ুটাওপরে ভেসে ওঠার জন্য তৈরী। জেমস দেখলো ওর নিচের ঘাস যেন ভাসছে। তাড়াতাড়ি করে ভালো করে বসতে গিয়ে পিছলে গেল। কোনোমতে সামলে নিয়ে পায়ের চাপ দিল মাটিতে। ঝাড়ু এগিয়ে যেতে শুরু করলো সামনের দিকে, বাড়তে থাকলো গতি। জেমস কোনভাবেই ওটাকে ওপরে উঠাতে পারছিল না। ঘাসের ওপর দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে জলের দাগ কেটে এগিয়ে যাচ্ছিলো। পেছন থেকে ভেসে আসছিল উৎসাহের ধবনি। মনোসংযোগ করতে চেষ্টা করছিল দারুণ ভাবে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে পায়ের চাপ দিয়েই যাচ্ছিল ওপরে ওঠার জন্য। সামনেই র‍্যাভেনক্ল এর দল। ওরা দেখছে ওর গতিবিধি। মনে মনে ও বলেই চলছিল “ওঠ! ওঠ … ওঠ!”। ডিনারের সময় বলা নোয়ার উপদেশ ওর মনে পড়লো “সামনের দিকে ঝুঁকবি এগোনোর জন্য, টেনে ধরবি থামতে হলে”। বুঝতে পারলো নিজের অজান্তেই টেনে ধরে ওটাকে ওঠানোর চেষ্টা করছে, যেটা মোটেই ঠিক নয়, বোধ হয়? ওকে সামনের দিকে ঝুঁকতে হবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ও যদি ঝোঁকে ওর কমনসেন্স বলছে ঝাড়ুটা সোজা মাঠের মধ্যে আছড়ে পড়বে। র‍্যাভেনক্ল এর সদস্যরা এবার সরে যেতে শুরু করেছে যাতে ওর সঙ্গে ধাক্কা না লাগে। ওখান থেকে উপদেশ এবং সতর্ক হওয়ার কথা ভেসে আসছে। জেমসের মাথায় ওসব কিছুই ঢুকছে না। অবশেষে  নিজের যুক্তি বিসর্জন দিয়, মাটি থেকে পা দুটো উঠিয়ে সামনের দিকে যতটা পারলো ঝুঁকে বসলো।

     এর ফলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার যে গতিটা সৃষ্টি হলো তা রীতিমত চমকে দিলো জেমসকে। কুয়াশা আর বৃষ্টিধারা ওর মুখে ঝাপ্টা মারলো আর পায়ের নিচের ঘাস এক নিমেষে ঝাপসাহয়ে গেল। কিন্তু জেমস এখনো  খুব একটা ওপরে উঠতে পারেনি। জমি থেকে কিছুটা উচুতে ভাসছে মাত্র। র‍্যাভেনক্লদের মধ্যে দিয়ে ধেয়ে যাওয়ার জন্য অনেক ধরনের মন্তব্য চিৎকার ওর কানে ভেসে এলো। ওরা হুটোপাটি করে সরে গেছে কোনোক্রমে।  ঝুঁকে থাকার জন্য ওর গতি বেড়েই চলেছে। সামনেই জেমস দেখতে পাচ্ছিল বিপদ। খাড়া বিশাল দুর্গ প্রাচীর আর কিছুটা দূরেই। জেমস আরো ঝুঁকে ওটার গতিপথ বেঁকাতে চাইলো। কাজ হচ্ছিল কিন্তু যতটা দরকার ততটা নয়। মনে মনে দারুণভাবে চাইছিল ওকে উঠতে হবে ওপরে, অনেক ওপরে! কিছু না হতে দেখে ও এবার উঠে বসে নিজের শরীর হেলিয়ে দিলো পিছন দিকে। সঙ্গেই টেনে ধরল ঝাড়ুটাকে যতটা সম্ভব। আর সঙ্গে সঙ্গেই ঝাড়ুটা যেন গা ঝাড়া দিয়ে শুরু করলো ওপরে ওঠা। সুবিশাল প্রাকার পড়ে থাকলো নিচে। সারিবদ্ধ আসন আর ব্যানার সব পিছিয়ে গেল। জেমস পৌঁছে গেল ধূসর রঙের আকাশের সীমানায়।

     গতি কমছিল না বাড়ছিল বুঝতে পারছিল না জেমস। হাওয়া আর বৃষ্টি ওর পাশ দিয়ে নেমে যাচ্ছিল ঝড়ের বেগে। জেমস একবার পেছনদিকে তাকালো। কুইডিচ পিচটাকে একটা পোস্টেজ স্ট্যাম্পের মত লাগছে। মাঝে মাঝেই মুছে যাচ্ছে কুয়াশা আর মেঘের চলাচলে। জেমস দম নিতে গিয়ে বেশ খানিকটা বৃষ্টির জল গিলে ফেললো হাওয়ার সঙ্গে। একটা আতঙ্ক ওকে দানবের থাবার মতোচেপে ধরতে শুরু করেছে। ও ওপর দিকে উঠেই চলেছে। বড় বড় ছাইরঙা মেঘ ভেদ করে। মাঝে মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে জমাট অন্ধকার আর ঠাণ্ডার মাঝে। আবারো ঝাঁটার ওপর ঝুঁকে বসলো জেমস। দাঁতে দাঁত চিপে ধরার আগে ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা ভয়ের চিৎকার।

     বুঝতে পারলো ঝাড়ুটা এবার নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। ওর আর ক্ষমতা নেই ওর ওপর বসে থাকার। কোনো মতে ওটাকে আঁকড়ে ধরে থাকা ছাড়া ওর আর করার কিছু নেই। কোন দিকে যাচ্ছে সেটা বোঝার ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে। চারিদিকে শুধু বৃষ্টি আর ঘন মেঘ। এই মুহূর্তে গ্রিফিন্ডোর টিমে চান্স পাওয়ার বিষয়টা  কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে। জেমসের আপাতত চাহিদা নিচে বা যেকোনো জায়গায় পৌঁছে সোজা হয়ে দাঁড়ানো।  হিসাব করতেই পারছে না কি গতিতে কোন দিকে ও ধেয়ে যাচ্ছে। হাওয়া আর কুয়াশার ঝাপ্টায় ওর চোখ দিয়ে গড়াচ্ছে জল, মিশে যাচ্ছে বৃষ্টির সঙ্গে।

     হঠাৎই কিছু অবয়ব ও দেখতে পেল কাছেই। যারা ওর চারিদিকে মেঘ ভেদ করে এগিয়ে আসছে, শুনতে পেল কাছেই কারা চিৎকার করে ওকে ডাকছে, একটা অবয়ব ওর দিকে এগিয়ে এলো। জেমস চমকে গেল জ্যানকে ঝাড়ুর ওপর দেখতে পেয়ে। মুখটা চকের মতো সাদা। ব্লন্ড চুল উড়ছে মাথার চারপাশে। জ্যান কিছু একটা বোঝাতে চাইলো ঈশারায়, জেমস বুঝতে পারলো না।

     ‘আমায় অনুসরণ কর!’ জ্যান চিৎকার করে বললো।

     জেমসকে মধ্যে রেখে আরো কিছু অবয়ব চারদিকে এসে গেল। ও দেখতে পেল টেডকে। সঙ্গেই র‍্যাভেনক্ল এর জেন্নিফার। ওর সঙ্গে ওরাও এগিয়ে চললো। টেড জেমসকে বিশেষ দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছিল, কিন্তু কিছুই ওর মাথায় ঢুকছিল না। ও শুধু চেষ্টা করছিল জ্যানকে লক্ষ্য করে ঝাড়ুটাকে সেদিকে নিয়ে যেতে। মেঘগুলো দ্রুতগতিতে ওর পাশ দিয়ে ট্রেনের মতো চলে যাচ্ছিল। জেমস মাঝে মাঝেই দেখতে পাচ্ছিল না বাকি উড়তে থাকা সদস্যদের। প্রচন্ড একটা ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপ্টার পর জেমসের চোখে পড়লো নিচের জমি। কুইডিচ পিচটা যেন ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ঘাস জমিটাকে দেখে মনে হচ্ছে ওটা দারুণ কঠিন কিছু একটা। জ্যান এখনো ওর সামনেই উড়ছে। গতি কমাচ্ছেআস্তে আস্তে।একটা হাত নাড়ছে পাগলের মত। জেমস টেনে ধরলো নিজের ঝাড়ুটাকে, জ্যানের অনুকরণে, কিন্তু হাওয়ার পাস কাটানোর গতি মোটেই কমছে না। মাটিতে আছড়ে পড়ার ভয়ে ও প্রায় যুদ্ধ করতে শুরু করলো ঝাড়ুটার গতি কমানোর জন্য। এতেই ওর বৃষ্টি ভেজা হাত গেল পিছলে। পিছন দিকে উলটে গিয়ে কোনো রকমে পা দিয়ে ধরে থাকলো ঝাড়ুটাকে। চড়কির মতো পাক খেতে খেতে ওটা নেমেই চলেছিল। জেমস বুঝতে পারলো ও জ্যানকে ছেড়ে এগিয়ে চলে গেল। পেছন থেকে ভেসে এলো জ্যানের চিৎকার। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর মাথা আছড়ে পড়তে চলেছে মাটিতে, নিচের জমি ওকে গিলে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত এক দানবের মত, জেমস শুনতে পাচ্ছিল সেই উল্লসিত দানবের চিৎকার, বেড়েই চলেছে, বেড়েই চলেছে, বেড়েই …

     সহসাই একটা দারুন ঝাঁকুনি। জেমস চোখ বুঁজে ফেললো, চেষ্টা করলো মাটিতে নিজের আছড়ে পড়ার শব্দটাও না শোনার। কিন্তু কোন শব্দই হলো না। সামান্য একটু চোখ খুললো, তারপর চারদিকটা দেখলো এবং একই সঙ্গে অবাক হলো এবং স্বস্তিও পেল। কুইডিচ পিচ থেকে ফুট পাঁচেক ওপরে ও ভাসছে। ভাসছে ওর ঝাড়ুটার ওপর দুদিকে পা ছড়িয়ে বসে, ধরে নেই হাত দিয়ে। বৃষ্টি ঝরে পড়ছে ওর চারদিক দিয়ে। র‍্যাভেনক্ল আর গ্রিফিন্ডোররা সবাই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। জ্যান, টেড আর জেন্নিফার জেমসের তিন দিকে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। টেড ঘুরে যেদিকে তাকালো, জেমসও সেইদিকেই তাকালো।

     মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আছে র‍্যালফ, পোষাক পুরো ভিজে জবজবে, লেপ্টে গেছে ওর গায়ে, একটা খোলা ছাতা পাশেই পড়ে আছে মাঠে। র‍্যালফের মুখের সমস্ত অংশ উত্তেজনায় টান টান। তাকিয়ে আছে জেমসের দিকে। তাক করে আছে ওর সেই অদ্ভুত দর্শন জাদুদন্ডটা জেমসকে লক্ষ্য করে। কাঁপছে ঠক ঠক করে। বৃষ্টির জলে ভিজে ওর চুল নেমে এসে ঢেকে দিয়েছে কপালটা ।

     ‘আমি কি এখনো ওকে ভাসিয়েই রাখবো নাকি ছেড়ে দেব?’ র‍্যালফ জানতে চাইলো।

[চলবে]

লেখক পরিচিতিঃ  জর্জ নরম্যান লিপারট আমেরিকান লেখক এবং কম্পিউটার অ্যানিমেটর। তবে ওনার বর্তমান পরিচয় উনি জেমস পটার সিরিজের লেখক। যে কারনে ওনাকে “আমেরিকান রাউলিং” নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সিরিজের প্রথম লেখা “জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রশিং” প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। নানান কারনে এটি অনেক বিতর্কে জড়িয়ে যায়। সেসব সমস্যা পেরিয়ে আজ এটি পাঠক পাঠিকাদের চাহিদায় সারা বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সিরিজের সব কটি বই ই-বুক এবং ফ্রি হিসাবেই প্রকাশ করেছেন মাননীয় জর্জ নরম্যান লিপারট। এই সিরিজ ছাড়াও ওনার আরো ১২ টি বই আছে। বর্তমানে উনি এরি, পেনসিল্ভ্যানিয়ার বাসিন্দা।

অনুবাদকের পরিচিতিঃ উপন্যাসটির অনুবাদক প্রতিম দাস মূলত চিত্র শিল্পী, ২০১৩ সাল থেকে ভারতের সমস্ত পাখি আঁকার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছেন। ৭৭৫+ প্রজাতির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে শুধু পাখি নয় অন্যান্য বিষয়েও ছবি আঁকা চলে একইসাথে। সাথেই দারুণ রকমের পাঠক, যা পান তাই পড়েন ধরনের। প্রিয় বিষয় রূপকথা, ফ্যান্টাসী, সায়েন্স ফিকশন, অলৌকিক। টুকটাক গল্প লেখার সাথে সাথে আছে অনুবাদের শখ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!