জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং – পার্ট ৭

সপ্তম পরিচ্ছেদ

চোট খাওয়া আনুগত্য

ড়ুক্কু ঝাড়ু ব্যবহারের প্রাথমিক ক্লাসে হাজির হল জেমস। শিক্ষকের নাম ক্যাব্রিয়েল রিডকালি। দশাসই একজন মানুষ। নিজস্ব অফিসিয়াল কুইডিচ টিউনিকের ওপর পরে আছেন ঘাস-ঘাস রঙের একটি স্পোর্টস ক্লোক। পেশীবহুল হাতের নমুনাই বুঝিয়ে দিচ্ছে মানুষটির শরীরের গঠন।

     গমেগমে কণ্ঠস্বরে বললেন, ‘গুডমর্নিং প্রথম বার্ষিকীর দল!’ জেমস রীতিমত উদ্দীপিত হল ক্যাব্রিয়েল রিডকালির উচ্চারণে। ‘উড়ুক্কু ঝাড়ুর প্রাথমিক শিক্ষার ক্লাসে তোমাদের স্বাগত জানাই। আশা করছি অনেকেই আমাকে কুইডিচ ম্যাচ বা টুর্নামেন্টে বা এখানে ওখানে দেখেছো। এই প্রথম বছরটায় আমরা ঝাড়ুতে ওড়ার একেবারে প্রথম নিয়ম কানুনগুলো রপ্ত করবো। খাতায় কলমের চেয়ে আমি হাতে হাতে ব্যবহারিক শিক্ষায় দিতেই বেশী পছন্দ করি। সে কারণেই আজ থেকেই আমরা উড়ুক্কু ঝাড়ু ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ কী করে করতে হয় সেটা শিখবো।সবাই যে যার ঝাড়ু নিয়ে প্রস্তুত হও।’

     জেমস পুনরায় ঝাড়ু ব্যবহার করা নিয়ে বেশ ভয় পাচ্ছিলো। কিন্তু ক্লাস এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলো মিঃ রিডকালির গাইডেন্স পেয়ে ও সহজেই ঝাড়ুটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। ওর ইচ্ছে মতোই ওটা ভেসে উঠছে নামছে এবং গতি নিয়ন্ত্রণ করতেও অসুবিধা হচ্ছে না। এটাও ধরতে পারলো যে ঝাড়ুটা কীভাবে সাড়া দেবে ওর নিয়ন্ত্রণে তার কিছু সূক্ষ্ম দিক আছে। সেগুলো নির্ভর করে গতি এবং উঁচিয়ে ধরার ওপর। কেবলমাত্র ভেসে থাকা অবস্থায় সামান্য ঝুঁকে ঝাড়ুতে চাপ দিলেই ওটা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। আবার টেনে ধরলেই পিছিয়ে আসে। একবার ঝাড়ুটা চলতে শুরু করলে ওই একই রকম পদ্ধতির একটু হেরফের ঘটালেই ওপর দিকে ওঠা যায়।গতি যত বাড়বে জেমসের শারীরিক অবস্থান নির্ধারণ করে দেবে সে কতটা ওপরে উঠবে বা নিচে নামবে। গতির সঙ্গে ঝোঁকা আর উচ্চতার সঙ্গে ঝোঁকার মধ্যে সামান্য হেরফেরটা নির্ভর করে যে কোন সময়ে ঝাড়ু্র গতির ওপরেই। জেমসের বুঝতে অসুবিধা হলনা ক্ষণিকের দ্বিধায় একটু খানি কৌণিক নড়াচড়ার পার্থক্য সমস্ত নিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আর এটাই ওর সঙ্গে ঘটেছিল বিচ্ছিরিভাবে, কুইডিচ টিম বাছাই পর্বে।

     নিজের ঝাড়ুকে নিজের ইচ্ছে মতো ব্যবহার করতে পেরে জেমস যতটা খুশী হচ্ছিল মনে মনে বেশ খানিকটা ঈর্ষাও হচ্ছিল।যখন দেখছিল জ্যান আরো বেশী দক্ষতার সঙ্গে ওটায় উড়ে বেড়াচ্ছে।

     ‘মিঃ ওয়াকার কসরত দেখানোটা থামাও,’ রিডকালি কিছুটা আদেশের স্বরেই বললেন, যেটা শুনে জেমস মনে মনে অনেকটাই শান্তি পেল। ‘আজ রাতের ম্যাচের জন্য ওগুলো জমিয়ে রাখলেই ভালো হয় বোধহয়?’

     র‍্যালফের পুরো শরীর শিহরিত হচ্ছিল ঝাড়ুর ওপর বসে থাকা অবস্থায়। ফুট চারেক শূন্যে ভেসে উঠে ওখানেই আটকে ছিল। জ্যানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটাকে কী করে নড়াবো চড়াবো বুঝতেই তো পারছি না?’

     জেমস মাথা নেড়ে বলল, ‘আমি যদি তোর জায়গায় থাকতাম তাহলে কেবলমাত্র ভেসে থাকতে পারার ব্যাপারটা নিয়েই চিন্তা করতাম।’

     দিনের বাকি ক্লাসগুলো তেমন আকর্ষণীয় ছিল না। প্রাথমিক স্তরের মন্ত্র ব্যবহারএবং প্রাচীন জাদু লিপি পাঠ করতে শেখা। লাঞ্চের সময় জেমস, র‍্যালফ আর জ্যানকে শোনালো গতরাতের অভিজ্ঞতার কথা। ফ্র্যাঙ্কলিনের ডেলাইট সেভিংস ডিভাইসের কথা থেকে শুরু করে ডিনার টেবিলে মাদাম ডেলাক্রয় এর ভুডুশক্তি বিষয়ে কী কথা শুনেছে সেটাও জানাল।ওর ড্যাড আর প্রফেসর ফ্র্যাঙ্কলিনের মধ্যে হওয়া কথাবার্তাগুলোও বাদ দিল না। যার সঙ্গে অ্যাস্ট্রামাড্ডুক্স এবং মারলিনের ফিরে আসাটা কী ভাবে মিলেমিশে আসা তাও বুঝিয়ে দিল।

     ‘তার মানে,’ জ্যান চোখ কুঁচকে জেমসের পেছনের দিকের দেওয়ালে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলল, ‘তুই বলতে চাইছিস যে তোর ড্যাডের কাছে একটা বিশেষ পোশাক আছে… যেটা পড়লে যে কেউ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।’

     জেমস কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ! কিন্তু সেটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। আশা করি ভুল বলছি না?’

     ‘বাজে বকা থামা। আরে এক্সরে চশমা তো এর কাছে কিছুই না। শুধু ভেবে দ্যাখ একটা ইনভিজিবল ক্লোক থাকলে একটা মানুষ কি না করতে পারে। আচ্ছা তোর কি মনে হয় ওটা বাষ্পের সংস্পর্শে এলেও দৃশ্যমান হয় না?’

     জেমস চোখ পাকিয়ে বলল, ‘আমার মনে হয় না যে কোন এক উইজার্ড তার সারা জীবনের মেহনতে একটা নিখুঁত অদৃশ্য হওয়ার পোশাক বানিয়েছিলেন মহিলাদের স্নান ঘরে উঁকি মারার জন্য।’

     জ্যান জেমসের কথাকে পাত্তা না দিয়ে বলল, ‘তোর কাছে কী কোন প্রমাণ আছে যে এরকম কিছু সেই মানুষটা করেন নি?’

     র‍্যালফ খাবার চিবাতে চিবাতে প্রশ্ন করল, ‘ফ্র্যাঙ্কলিন তাহলে তোর ড্যাডকে বললেন যে স্টেটসেও উইজার্ডরা প্রোগ্রেসিভ এলিমেন্ট এর মতো দল বানিয়েছে? মাগল আর উইজার্ডদের সমতা আনা ইত্যাদি বিষয় নিয়েই?’

     জেমস সম্মতি সূচক ঘাড় নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই একটা ভাঁওতা ছাড়া আর কিছু বলে মনে হচ্ছে কী? মানে বলে চাইছি যে স্লিদারিনরা আবার কবে থেকে মাগলদের ভালো করার কথা ভাবতে শুরু করল? হ্যাঁ এটা ঠিক যে সব সময়েই স্লিদারিনেরা সাধারণ জনগণের সঙ্গে মেশার একটা চেষ্টা করেছে।কিন্তু এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি এর পেছনে ওদের উদ্দেশ্য একটাই। আর সেটা হলো মাগল-জগত দখল করা আর সেখানে শাসন করা। ওরা সব সময়েই মনে করে মাগলরা আসলে ওদের চেয়ে নিচুমানের। কখনই চায় না মাগলরা ওদের সমান হয়ে যাক।’

     র‍্যালফকে যথেষ্টই অপ্রস্তুত মনে হচ্ছিল। ‘হয়তো তাই। আমি এসব ব্যাপার ঠিক কিছুই জানি না। তবে গতকাল ওই বিক্ষোভে যারা জড়ো হয়েছিল তাদের সবাই কিন্তু স্লিদারিন ছিল না। লক্ষ করেছিলি বোধ হয়।’

     জেমস সেটা অবশ্য লক্ষ করেনি। ‘ওটা কোন ব্যাপার না। স্লিদারিনরাই এই ব্যাপারটা প্রথম শুরু করেছে। প্রোগ্রেসিভ এলিমেন্ট বানিয়ে শ্লোগান দিয়ে, ব্যাজ পরিয়ে না জানি আরো কি কি করেছে। তুই নিজেই সেটা বলেছিস, র‍্যালফ। ট্যাবিথা করসিকা স্লিদারিনদের ব্যাজ দিচ্ছে। আমি নিশ্চিত এসবের পেছনে ওরই হাত আছে।’

     ‘আমার কিন্তু তা মনে হয় না।তুই যেভাবে ভাবছিস, মানে ওই মৃত্যুর জগত থেকে মারলিনকে ফিরিয়ে আনার প্লট সেটার সঙ্গে টাবিথা যুক্ত আছে,’ র‍্যালফ বলল। ‘ও শুধু চায় মাগল আর উইজার্ডদের আমরা যেন সমদৃষ্টিতে দেখি। কোন রকম যুদ্ধ বা অন্য কিছু শুরু করার কোন বদমতলব ওর নেই। মানে বলতে চাইছি যে আমরা মাগলদের সঙ্গে একসঙ্গে মিশে কাজ করি এটা কী ভালো ভাবনা নয়? মাগলদের খেলাধুলায় আমরাও অংশ নিই এটাতে খারাপ কী আছে? আমাদের জাদুর ক্ষমতা আছে বলে আমরা ওদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবো এটা ঠিক নয়।’

     ‘তুই একেবারে ওদের মতো করে কথা বলছিস,’ জেমস রাগের সঙ্গে বলল।

     ‘তাই নাকি?’ র‍্যালফ বলল, ওর মুখেও লালছে আভা বাড়ছে। ‘আমি কিন্তু ওদেরই অংশ এটা ভুলে যাস না। আর আমারও মোটেই ভালো লাগছে না যে ভাবে তুই আমার হাউস নিয়ে কথাবার্তা বলছিস। তোর ড্যাড যখন এখানে পড়ত সেই সময়ের তুলনায় এখনকার সময় অনেক বদলে গেছে। যদি তোর এতোই দুশ্চিন্তা থাকে ইতিহাস এবং সত্যি নিয়ে, তাহলে তোর উচিত এ নিয়ে একটা বিতর্কে অংশ নেওয়া। মনে হচ্ছে টাবিথা তোর বিষয়ে যা বলে সেটাই ঠিক।’

     জেমস হেলান দিয়ে বসলো, ওর মুখ হাঁ হয়ে গেছে।

     র‍্যালফ চোখ নামালো। ‘টাবিথা চায় আমি টিম এ-এর হয়ে প্রথম স্কুলবিতর্কে অংশ নিই। আমার মনে হয় তুই খবরটা জেনেই গেছিস। ওরা ওটার নাম দিয়েছে “অতীতে নেওয়া সিদ্ধান্তের পুনঃবিবেচনা – সত্যি নাকি ষড়যন্ত্র?”’

     ‘ও! তাহলে তুই ওই টিমে যোগ দিচ্ছিস? তুই বা তোরা এটাই প্রমাণ করতে চাইবি তো যে আমার ড্যাড আর ওর বন্ধুরা মিলে ভলডেমরটের  গল্পটা বানিয়েছিল লোককে ভয় দেখানোর জন্য? যাতে জাদু জগতটাকে গোপন করে রাখা যায়?’

     র‍্যালফকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ও মানসিক দ্বিধায় ভুগছে। ‘দ্যাখ কেউই বিশ্বাস করবে না যে, তোর ড্যাড পুরো ব্যাপারটা সাজিয়েছিল, কিন্তু…’ কথাটা কীভাবে শেষ করবে তা বুঝতে না পেরে থেমে গেল র‍্যালফ।

     ‘দারুণ!’ জেমস চেঁচিয়ে হাত শূন্যে ছুঁড়ে বলল, ‘খুব ভালো যুক্তি সাজিয়েছিস। আমার বলার কিছুই নেই! টাবিথা তোকে পার্টনার হিসেবে পেয়ে বেশ খুশীই হয়েছে তাহলে?’

     ‘হতেও তো পারে যে তোর ড্যাড সঠিক পক্ষে কোনসময় ছিলই না!’ কথাটা র‍্যালফবেশ উত্তপ্ত ভঙ্গীতেই বলল। ‘এটা কোনও দিন তোর মাথায় এসেছে কি? দ্যাখ,নিশ্চিতভাবেই ওই যুদ্ধের কারণে অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল।কিন্তু এই ভাগটা কেন হল তার কি উত্তর আছে তোর কাছে? তোদের পক্ষের লোকেরা হত্যা করলে সেটা ভালোর জন্য, আর অপরপক্ষ করলেই সেটা শয়তানি স্বেচ্ছাচারিতা? জয়ীরাই ইতিহাসের বইটা লেখে এটা অস্বীকার করতে পারিস না। হতেও তো পারে আসল সত্যিটাকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে? তুই আসল কথাটা জানবি কী করে? তুই তো জন্মাসনি তখন।’

     জেমস হাতের কাঁটা চামচটা টেবিলে আছড়ে ফেলে চিৎকার করে বলল, ‘আমি আমার ড্যাডকে ভালো করে চিনি! উনি কাউকে কখনো খুন করেননি। উনি সঠিক পক্ষেই ছিলেন, কারণ আমার ড্যাড একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ। ভলডেমরট এক রক্তপিপাসু দানব ছিলেন, যার একটাই লক্ষ ছিল ক্ষমতা দখল। আর তার জন্য যে তার পথের বাধা হয়েছে তাকেই খুন করেছেন। নিজের বন্ধুদেরও ছাড়েননি। আশা করি সেগুলো তুই মনে করতে পারছিস। না পারার তো কোনও কারণ নেই।বোঝাই যাচ্ছে তুই ঐ মানুষটার মতো লোকজনদের দলেই ভিড়ে গেছিস!’

     র‍্যালফ জেমস এর দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলল। জেমস বুঝতে পারছিল ওর মনের কোন এক অংশ ওকে জানান দিচ্ছে ও একটু বেশী রিঅ্যাক্ট করছে। র‍্যালফ একজন মাগল জন্মসূত্রে। ভলডেমরট আর হ্যারি পটার সম্বন্ধে ওর জ্ঞান মাত্র দু-সপ্তাহের পড়াশোনার। তার ওপরে এই সমস্ত কথাবার্তা ওর মাথায় ঢুকিয়েছে ওর হাউসমেটরা। আর সেগুলোই ও এখন আউড়ে চলেছে। তবুও, জেমস এসব কথা না বলে থাকতেও পারছে না। কারণ যারা ওর ড্যাডের বিষয়ে এই সব বানানো মিথ্যে গল্প ছড়াচ্ছে সেই সব স্লিদারিনদের কিছু বলার সুযোগ বা সাহস ওর কাছে নেই।

     জেমসই প্রথম চোখ নামালো। র‍্যালফ নিজের বই ব্যাকপ্যাকে গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে দেখতে পেল।

     ‘তাহলে, আজ রাতে ম্যাচের পর তোদের সঙ্গে দেখা হবে, গ্রেমলিনদের সঙ্গে বাটার বিয়ার খাওয়ার জন্য। তার আগে আমাকে আবার বৃষ্টির সম্ভাবনাটাও খতিয়ে দেখতে হবে।’

     জেমস বা র‍্যালফ কেউ কোন কথা বলল না। একটু বাদেই র‍্যালফ ওখান থেকে চলে গেল।

     ‘তুই কিন্তু ওকে বেশ ভয় পাইয়ে দিয়েছিস,বুঝতে পারলি কী সেটা?’ জ্যান বলল।

     ‘আমি?’ জেমস অবাক হয়ে জানতে চাইল।

     ‘নিজের সাফাই গাওয়ার আগে আমায় কথাটা শেষ করতে দে,’ জ্যান বলল, হাতটাকে মৈত্রীসূচক ভঙ্গীতে উঠিয়ে। ‘আমি বুঝতে পারছি যে তোর কথাই ঠিক।ওই সব হাওয়ায় ভেসে বেড়ান কথাগুলো মিথ্যে রটনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু র‍্যালফের দিকটা ভাব। ও কেবলমাত্র ওদের সঙ্গে চলতে চাইছে। বুঝতে পারছিস আমি কি বলছি?’

     ‘না,’ জেমস তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল। ‘বুঝতে চাইবও না যখন কেউ স্লিদারিনদের সঙ্গে থাকছে বলেই আমার ড্যাডের নামে একগাদা মিথ্যে কথা বলবে।’

     জ্যান বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘ও কিন্তু জানে না ওগুলো মিথ্যে।র‍্যালফএই প্রথম এই ধরণের কথাগুলো শুনেছে।ও তোকে বিশ্বাস করতে চায়, সঙ্গে সঙ্গেই চায়নিজের হাউসে শান্তিতে থাকতে। বেচারি একগাদা ছন্নছাড়া শয়তানের দলে গিয়ে পড়েছেএটা কি বুঝতে পারছিস তুই?পরিবেশটা ওর পক্ষে বেশ কষ্টকর।’

     জেমসের মন কিছুটা শান্ত হওয়ায় বুঝতে পারছিল জ্যান যা বলছে সেটা ঠিক। যদিও র‍্যালফের বিরুদ্ধে ওর রাগটা পুরো কমেনি। ‘তোর কথা না হয় মেনে নিলাম। তুইও তো এই সব কথাগুলো প্রথম শুনছিস। তাহলে তুই কেন প্রোগ্রেসিভ এলিমেন্ট এ যোগ দিয়ে শ্লোগান দেওয়া শুরু করছিস না?’

     ‘সেটা তোর সৌভাগ্য,’ জ্যান জেমসের কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, ‘আমাকে র‍্যাভেনক্ল এর জন্য মনোনীত করা হয়েছে। আর এই হাউসের সবাই ওই ওল্ডি ভোল্ডিকে ঘৃণা করে ঠিক যেমনটা তোরা গ্রিফিন্ডোররা করিস। আর তা ছাড়া,’ মুখটায় কিছূটা দুষ্টমীর ভাব এনে বলল, ‘টাবিথা করসিকার চেয়ে আমার কাছে পেট্রা মরগ্যানস্টারন অনেক বেশী আকর্ষণীয় বিষয়।’

     জেমস জ্যানকে কনুই দিয়ে খোঁচা মারলো।

     ওরা লাইব্রেরীতে গেল স্টাডি পিরিয়ডের সদ্ব্যবহার করার জন্য। নসাস সার্ট, প্রাচীন মন্ত্রলিপির প্রফেসর, দায়িত্বে আছেন পিরিয়ডটার। লম্বা লম্বা হাত পা সহমোটা কাঁচের চশমা এবং সবুজ রঙের পোষাক পরা মানুষটিকে দেখে মনে হচ্ছিল একটা বড় সড় প্রেইং ম্যান্টিস চেয়ারে বসে আছে।

     জ্যান অ্যারিথম্যান্সির থিয়োরেম করছিল, মাঝে মাঝেই বিরক্তিতে ওর কপাল কুঁচকে যাচ্ছিল সমাধান করতে না পেরে। জেমস ওকে ডিস্টার্ব করতে চাইছিল না, কিন্তু হোমওয়ার্ক করার মন ওর ছিল না। তাই ব্যাকপ্যাক থেকে ডেইলি প্রফেটের সকালের সংস্করণটা বার করল। যেটা বেকফাস্ট করার সময় ঢুকিয়ে নিয়েছিল। প্রধান আর্টিকেলটার দিকে তাকাল, ঠোঁট কামড়ে ধরল বিতৃষ্ণায়। প্রথম পাতার নিচের দিকে টাবিথা ছবিটা দেখে ওর ভেতরটা চিড় বিড় করে উঠল। দেখে মনে হচ্ছে অতি বিশ্বাসযোগ্য, ভাবুক এবং নম্র একটি মেয়ে। পাশেই লেখা ‘হগ ওয়ারটসের প্রিফেক্ট, ক্যাম্পাসে প্রোগ্রেসিভ মুভমেন্ট বিষয়ে মুখ খুললেন’। পুরো আর্টিকলটা পড়ার যোগ্য নয় এটা বিবেচনা করেই জেমস মাঝের কয়েকটা লাইনে চোখ রাখল।

     মিস করসিকা বলেছেন, ‘অবশ্যই আমি চাই না স্কুলের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হোক এই আলোচনার জন্য।কিন্তু এ বিষয়ে আমি অন্যান্য হাঊসের সদস্যদের কথাকে বিশেষ সম্মান ও গুরুত্ব দিয়ে জানতে চাই।’বর্তমান পরিস্থিতির কারণে মিস করসিকার চোখে ছিল সেই ভাব, যার অর্থ অনুশোচনা। তবে উনি যে খুশি সেটাও বোঝা যাচ্ছিল কারণ অন্যান্য শিক্ষার্থীদের উনি উৎসাহিত করতে পেরেছেন এই বিশেষ বিষয়ে। উনি আর বলেন,‘যদিও হেড-মিস্ট্রেসের নির্দেশে বিতর্কসভা করা সম্ভব হয়নি। তবুও জানি একদিন না একদিন আমাদের বিতর্ক করার সুযোগ দেওয়া হবে। হবেই এবং আমি নিশ্চিত এর সাহায্যেই অরোর আর তাদের নিয়মকানুন নিয়ে আলোচনার সুযোগ পাব। আশা করছি সেটা হবে একদম খোলাখুলি বিতর্ক সভা।’

     মিস করসিকা স্কুলের পঞ্চম বর্ষের ছাত্রী। সঙ্গেই হাউস কুইডিচ টিমের ক্যাপ্টেন। উনি বেশ হতাশার সঙ্গে জানিয়েছেন, ‘আমার উড়ুক্কু ঝাড়ুটার কারিগর মাগলদের একজন শিল্পী। যাদের কোন ধারণাই নেই কাঠের জাদুকরী ক্ষমতা বিষয়ে। আমি ওটাকে স্কুলের নিয়ম মেনে মাগল আর্টিফ্যাক্টরূপে নথিভুক্ত করিয়েছি। বলতে বাধ্য হচ্ছি মাগল বন্ধুদের হাতে তৈরী কোন জিনিস ব্যবহারের অভিজ্ঞতা দারুণ একটা ব্যাপার। জেনে খুশী হবেন হয়তো যে আমার ঝাড়ুটা অন্যতম দ্রুতগতির বলেই খ্যাতি লাভ করেছে। কিন্তু শুধু মন্ত্রশক্তি নয়, আমি এর বাহবাটা দিতে চাই সেই মাগলজাত মানুষটাকে, যিনি ওটা বানিয়েছেন। ’

     রেগেমেগে কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের ওপর ওটা দিয়ে এক চাপড় মারল জেমস। ফলস্বরূপ প্রফেসর সার্টের কাছ থেকে ভেসে এল শব্দ না করার সতর্কবাণী।

     না দেখার মতো করেই তাকিয়ে থাকল জেমস কাগজটার দিকে। এই সব আবোল-তাবোল কথাবার্তাকে বিশ্বাস করবে? টাবিথা করসিকার মাগলদের দিয়ে তৈরী করানো উড়ুক্কু ঝাড়ুর ব্যাপারটা তো একেবারে সোনায় সোহাগা, জনগণের আবেগে সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য। জেমস দেখেছিল স্কুলচত্বরে টাবিথার ইন্টারভিউ নিচ্ছিল রিটা স্কীটার। চোখের সামনে ভেসে উঠল রিটার অতি আগ্রহী মুখ এবং পারচমেন্টের ওপর স্বয়ংক্রিয় কলমের নড়াচড়া। একনম্বরের বদমাইশ এবং ঘোঁট পাকানো মহিলা। নিজের এবং নিজের লেখা পাঠকদের কিভাবে খাওয়ান যায় তার বাইরে কিছুই ভাবেন না। জেমস শুনেছে ওর ড্যাডের সঙ্গে রীটা স্কীটারের প্রথম সাক্ষাৎকারের কিস্যা। হারমায়োনি আন্টি বুঝতে পেরেছিলেন রিটা আসলে এক ধরনের অনথিভুক্ত অ্যানিগামাস। যিনি বিটলের রূপ ধরতে পারেন। হারমায়োনি বিটল রূপে রিটাকে একবার ধরেও ফেলেছিলেন। ডেইলি প্রফেটে নিজের লেখনী দিয়ে সত্যকে ক্রমাগত বিকৃত করার শাস্তি হিসাবে আটকেও রেখেছিলেন বেশ কিছুদিন। যদিও আজ সকালেই হ্যারি ওকে বলেছেন সত্যর পথে থাকার জন্যই রিটার মত মানুষদের বেশি পাত্তা না দেওয়াই ভালো। কিন্তু ড্যাডের চেয়ে হারমায়োনি আন্টির পথই বেশী পছন্দ জেমসের।

     এই সব ভাবতে ভাবতেই জেমসের চোখ গেল সংবাদপত্রের পেছনের পাতার হেড লাইনগুলোতে। একটা হেডলাইন ওকে আকৃষ্ট করল। ঝুঁকে পড়লো ওটা পড়ার জন্য।

     “মন্ত্রকে চুরির ঘটনা এখনো রহস্যের ছায়ায়”

     লন্ডন: গত সপ্তাহে জাদুমন্ত্রকের সদর দপ্তরে যে চুরির ঘটনাটি ঘটেছে সেটা সংশ্লিষ্ট কর্মচারী এবং অরোরদের হতচকিত করে দিয়েছে। কী কারণে এই চুরি এবং এর সঙ্গে ভেতরের লোক জড়িয়ে আছে কিনা প্রশ্নের কোন কিনারা মেলেনি। গত সপ্তাহের সংবাদ সংস্থার খবর অনুযায়ী তিনজন সন্দেহভাজনকে সোমবার ৩১ আগষ্ট সকালে গ্রেপ্তার করা হয়। ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে ওরা জাদুমন্ত্রকে বেআইনিভাবে প্রবেশ করেছিল এবং বেশ কিছু দপ্তরে ভাঙচুর করে। ধৃত তিনজনের একজন গবলিন আর বাকি দুজন মানুষ। জাদুমন্ত্রকে অনধিকার প্রবেশ ঘটেছে জানতে পারার পর তল্লাসী চালানো হলে ওদের ধরা সম্ভব হয়।

     জিজ্ঞাসাবাদের সময় যখন বোঝা যায় ওরা ভাষাহীনতার মন্ত্র দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে আছে, তখন তিনজনকেই সেন্ত মাঙ্গো’স হাসপাতাল ফর ম্যাজিক্যাল ম্যালাডিজ অ্যান্ড ইনজুরিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভাঙচুর হওয়া দপ্তরগুলি হল ইন্টারন্যাশনাল ম্যাজিক্যাল কর্পোরেশন, কারেনসী কনভারশন অফিস এবং ডিপার্টমেন্ট অফ মিস্ট্রি। যদিও খবর অনুসারে কোনও জায়গা থেকেই কোনজিনিস বাঅর্থ খোয়া যায়নি। যে কারণে ওই তিনজনকে খুব কড়া কোন শাস্তি দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে না। আর যে গল্প বাজারে ছড়িয়েছে,তা বেশ কৌতূহলজনক।ভাষাহীনতার মন্ত্র দ্বারা আচ্ছন্ন ওই তিনজনের ওপর নাকি কোন রকম কাউন্টার কার্স বা জিঙ্কস বা স্পেল কাজ করছে না। যদিও এটাকে অস্বীকার করা হয়েছে।

     সেন্ট মাঙ্গোস এর কাউন্টার জিঙ্কস ফেসিলিটির প্রধান ডাঃ হোরাসিও  ফ্ল্যাক বলেছেন, ‘ওদের ওপর প্রয়োগ করা অভিসম্পাত খুবই শক্তিশালী ধরণের, যার সঙ্গে অতি উচ্চমানের ডার্ক ম্যাজিকের যোগাযোগ রয়েছে। যদি আমরা এই সপ্তাহের মধ্যে ওদের আছন্নতা কাটাতে না পারি, তাহলে হয়তো ওরা আর কোনও দিনই কথা বলতে পারবে না।’

     যা জানা গেছেতার সূত্র ধরেই এটা বলা যেতে পারে গবলিন মিঃ ফিক্লিস বিষল সাসেক্সের বাসিন্দা। যিনি ওই অভিসম্পাত কাটিয়ে সামান্য পরিমাণে সাড়া দিতে শুরু করেছেন। ‘ওর কাছ থেকে কিছু গোঙানি এবং শব্দই শুধু শোনা গেছে। কোন কথা নয়।’ একজন অজ্ঞাত পরিচয় নার্স এই কথাটা বলেছেন। কিন্তু দুঃখের খবরটি হল আজ ভোরেই মিঃ বিষলকে তার ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। ভুল ঔষধ দেওয়ার একটি অভিযোগ বাতাসে ভাসতে শোনা যাচ্ছে। যে কারণে পুরো ব্যাপারটি আরও রহস্যর জালে জড়িয়ে গেছে। পুনরায় তদন্তের কথা ভাবা হচ্ছে।

     এ বিষয়ে তদন্তকারী দলের প্রধান কিওরিনা গ্রীন বলেছেন, ‘প্রাথমিক ভাবে আমরা খুঁজে বার করার চেষ্টা করছি কী ভাবে এই তিনজন মন্ত্রকের ভেতরে ঢুকলো। তিনজনেই ছিঁচকে ধরনের বদমাইশ। এর আগে এতো বড় মাপের কিছু কোনদিন করেনি। আমরা বাইরে থেকে বড় ধরনের কোন সাহায্য বা মন্ত্রকের ভেতরের কারো সাহায্য করার সম্ভাবনার বিষয়টাও খতিয়ে দেখছি। মিঃ বিষলের মৃত্যুটা যদিও রহস্যজনক তবুও আমরা আপাতত ওটাকে একটা দুর্ঘটনা বলেই ধরে নিচ্ছি। আমরা নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করতেই পারি, যেহেতু ওই তিন দুষ্কৃতি কিছুই চুরি করতে পারেনি।’

     জেমসকে পড়ায় মগ্ন দেখে জ্যান ফিসফিসিয়ে বলল, ‘কি রে যাবি নাকি? উড়ুক্কু ঝাড়ু নিয়ে একটু অভ্যাস করার জন্য? তাড়াতাড়ি এজন্যেই এসেছিলাম। একজন পটারকে আমার গুডলাক রূপে সঙ্গে পেতে চাই।’

     নিজের অনুসন্ধিৎসাকে দূরে সরিয়ে রেখে আপাতত জ্যানের সঙ্গে যাওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে বলেই মনে হল জেমসের।ওর নিজেরও কিছুটা অভ্যাস করা দরকার।কাগজটাকে ভাঁজ করে ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে নিল।

     ‘উড়ন্ত অবস্থায় কী করে স্থির ভাবে বসে থাকতে হয়ও ঘুরতে হয় আমায় একটু দেখিয়ে দিবি? আমি ক্লাস করার সময় দেখছিলাম কী সহজেই তুই ওই কাজ দুটো করছিলি।’ পোষাক পাল্টানোর জন্য কমন রুমের দিকে যাওয়ার পথে সিঁড়িতে ওঠার সময় জেমস জ্যানকে বলল।

     জ্যান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘অবশ্যই। কিন্তু ওটা র‍্যালফকে শেখানো যাবে না, কারণ ওই কাজ দুটো ঠিক মতো করতে হলে মনকে আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ওই ব্যাটা পাহাড়টার ভেতরে মনটা যে কোথায় থাকে কে জানে?।’

     র‍্যালফের নামটা শুনেই জেমসের মনে একটা কেমন ঘিনঘিনে ভাব এল। জোর করে ভাবনাটা ও দূরে ঠেলে দিল। কিছু সময় বাদের দুজনেই টিশার্ট আর জিন্স পরে ছুটে চলল বিকেলের সূর্যালোককে সঙ্গে নিয়ে কুইডিচ পিচের দিকে।

     জেমস পুরো বিকেলটাই ওখানে কাটিয়ে দিল জ্যানের সঙ্গে, অভ্যাস করল সামান্যই। মনোযোগটা পড়ে থাকল গ্রিফিন্ডোর আর র‍্যাভেনক্ল টিমের প্র্যাকটিস দেখার দিকে। জ্যান ওর দলের সঙ্গে ফিরে গেল তাড়াতাড়ি ডিনারটা সেরে নেওয়ার জন্য। জেমস চলে গেল টেড আর গ্রিফিন্ডোরদের সঙ্গে কমনরুমের পথে।ওদের উদ্দেশ্যও জলদি জলদি ডিনারটা করে নেওয়া। মরসুমের প্রথম ম্যাচের আগে একটা ভালো রকম উত্তেজনা চিরকালই ছড়িয়ে থাকে চারপাশে। গ্রেট হলের ভেতরটা গমগম করছিল একে অপরকে ইয়ার্কি মারা, চিৎকার এবং মাঝে মাঝেই হাউসের নিজস্ব অ্যান্থেমের উদাত্ত গায়নে। শেষ পাতে ডেজারট খাওয়ার পর নোয়া, টেড, পেট্রা এবং সাব্রিনা কুইডিচের জার্সি পরে একে অপরের হাত ধরে গ্রিফিন্ডোর টেবিলের সামনে দাঁড়াল। একসঙ্গে পা ঠুকলো পাথরের মেঝেতে, গোটা হলের মনোযোগ নিজেদের দিকে আনার জন্য। তারপর ড্যামিয়েনের আজকেই লেখা একটা উৎসাহব্যঞ্জক শব্দে তৈরি কবিতা আবৃত্তি করল একসঙ্গে।

     ও হো হো হো, ভালোবাসি মজা আর হইহুল্লোড়, আমরা যে গ্রিফিন্ডোর

     আজকুইডিচের মাঠে আমরা দেখাবো বিজয়রথের দৌড়

     র‍্যাভেনক্লয়ের দল বুঝেছিস কি তোরা? কিস্যা খতম তোদের,

     যখন পড়বে ঝাঁপিয়ে সর্ব শক্তি দিয়ে সিংহবাহিনী মোদের

     ও হো হো খেলাটা হবে জবরদস্ত, শরীরে শরীর খাবে ধাক্কা

     আর তোদের শিকারের ভাগ্যে জুটবে লবডঙ্কা

     কিন্তু আমরা হলাম গ্রিফিন্ডোর, লুকিয়ে করিনা যে তোড়জোড়

     জানিয়ে দিলাম আগেই, সাবধান বিপদ অতি …

     শেষ কথাটা আর শোনা গেল না গ্রীফিন্ডোর সদস্যদের উল্লাস ধ্বনি এবং র‍্যাভেনক্লদের তাচ্ছিল্যসূচক চিৎকারের চোটে। গ্রেমলিনরা একসঙ্গে হেসে সবাইকে আনত হয়ে সম্মান জানিয়ে, নিজেদের প্রতি আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে বেরিয়ে গেল কুইডিচ মাঠের উদ্দেশ্যে। দলের অন্য সদস্যরা ওখানেই অপেক্ষা করছে।শেষ মুহূর্তে কিছু অভ্যাস সেরে নেওয়ার জন্য।

     জেমস জানে মরসুমের প্রথম এবং শেষ এই দুটো ম্যাচ দেখতে সবচেয়ে বেশী ভিড় হয়। বছরের শেষে হয় ফাইনাল ম্যাচ।সবাই জানে যে দুটো দলই উঠুক না কেন খেলাটা যথেষ্টই আকর্ষণীয় হয়। আর শুরুর দিনটায় নিজ নিজ হাউসের জন্য সবাই গলা ফাটাতে একটু বেশীই আগ্রহী থাকে। গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডগুলো ফাঁকা থাকেই না বলা যায়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকরাও হাজির থাকেন নিজ নিজ হাউসের জারসি পড়ে উৎসাহ বাড়ানোর জন্য। মাঠে পৌঁছেই জেমস চনমনে হয়ে গেল উপস্থিত দর্শকদের চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনে। শিক্ষার্থীরা চেনা বন্ধুদের দেখতে পেলেই ডাকাডাকি করে নিজেদের হাজিরা জানান দিয়ে মাতিয়ে রেখেছে পুরো জায়গাটাকে। শিক্ষকরা বসে পড়েছেন নিজ নিজ হাউসের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোতে। গ্রিফিন্ডোরের জন্য নির্দিষ্ট আসনগুলোর দিকে পৌছানোর জন্য সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় জেমস দেখতে পেল হ্যারি বসে আছেন প্রেসবক্সের কাছে। ওনার ডান দিকে বসেছেন মন্ত্রকের প্রতিনিধিরা আর বামদিকে আল্মা আলেরনের অতিথিবৃন্দ। হ্যারি জেমসকে দেখতে পেয়েই হেসে হাত নাড়ালেন।ও সোজা উঠে গেল ওখানে।আলাদা করে ওর বসার জন্য জায়গা ছিল না।যে কারণে সবাইকে একটু সরে সরে বসতে হল। জেমস আমতা আমতা করে ক্ষমা চেয়ে নিলো সবার কাছে।মিস সাকারিনার মুখে এখনো সেই নকল হাসির প্রলেপ।একটু যেন বিরক্তির ভাব। ও নিয়ে মাথা ঘামাল না জেমস।

     ‘আমি বোধ হয় বলেছিলাম স্টেটসে আমাদেরও কুইডিচ টিম আছে,’ প্রফেঃ ফ্র্যাঙ্কলিন হ্যারিকে বললেন, ওনার গলার স্বর দর্শকদের চিৎকার ছাপিয়ে শোনা গেল। ‘কিন্তু বিশেষ কিছু কারণে ততটা জনপ্রিয় নয়। সুইভেনহজ, গ্রাঞ্জবল বা ব্রুমস্টিক গান্তলেট বেশি পছন্দ করে মানুষ। এবছরে আমাদের ওয়ার্ল্ড কাপ দল কিছুটা আশা জাগিয়েছে, বলেছিলাম বোধ হয়। যদিও জানি শেষ অবধি কিছুই করতে পারবে না।’

     জেমস আমেরিকানদের দিকে তাকাল, বোঝার চেষ্টা করছিল কারা কারা এসেছেন এবং ওদের মতামত কী এই খেলাটার বিষয়ে। একেবারে শেষের আসনে বসে আছেন মাদাম ডেলাক্রয়। মুখ ভাবলেশহীন, মুঠিবদ্ধ হাত কোলের ওপর রাখা। দূর থেকে যেটাকে একটা বাদামী রঙের গাঁটওলা বলের মতো দেখাচ্ছে। প্রফেঃ জ্যাক্সনের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই উনি হেসে মাথা নাড়লেন। জেমস দেখতে পেল সেই কালো চামড়ার ব্যাগটা পায়ের কাছেই নিয়ে বসে আছেন। প্রফেঃ ফ্র্যাঙ্কলিনের পরনে উঁচু সাদা কলারওয়ালা চিরন্তন শিক্ষকের পোষাক সঙ্গেইটাই এর বদলে পড়ে আছেন ধাতব অ্যাস্কট।চারকোনা চশমার কাঁচ মাঝে মাঝেই ঝলসে উঠছে যখনই উনি এদিকে ওদিকে মাথা ঘুরিয়ে কিছু দেখছেন।

     ‘র‍্যালফ কোথায়? আমি তো ভেবেছিলাম আজ ও তোর সঙ্গেই আসবে।’ হ্যারি বলল।

     জেমস কাঁধ ঝাঁকালো, চোখ সরিয়ে নিল হ্যারির চোখ থেকে।

     ‘আহ! এবার মনে হচ্ছে খেলা শুরু হবে,’ নড়েচড়ে বসে ফ্র্যাঙ্কলিন বললেন।

     গ্রিফিন্ডোরের টিম তাদের শিবিরের দিকের দরজা দিয়ে মাঠে প্রবেশ করল। প্রত্যেকের লাল ক্লোক ওদের পেছনে পতাকার মতন উড়ছিল।

     প্রেস বক্স থেকে ড্যামিয়েন দামাস্কাসের কণ্ঠে ঘোষিত হল, ‘ক্যাপ্টেন জাস্টিন কেনেলির নেতৃত্বে এইমাত্র মাঠে প্রবেশ করল গ্রিফিন্ডোর দল।’

     কর্ক স্ক্রূ ফরমেশনে বেরিয়ে আসার পর নিজ নিজ ঝাড়ুসহ একটি জি আকৃতি গঠন করে ওরা নিজেদের শিবিরের সামনে দাঁড়ালো। তারপর বিভিন্ন অ্যাক্রোব্যাটিক কলাকৌশল প্রদর্শন করে একটি পি অক্ষর গঠন করল। সকলেইনিজ নিজ ঝাড়ুর ওপর বসে ভেসে উঠলো শূন্যে। হ্যারি আর জেমসের দিকে মুখ করে হেসে স্যালুট করল একসঙ্গে। গ্রিফিন্ডোরের গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড উচ্ছ্বাসের চিৎকারে ফেটে পড়ল। জেমস লক্ষ করল দর্শক আসন থেকে অনেকেই তাকালেন হ্যারির অভিব্যক্তি দেখার জন্য। হ্যারি একটু উঠে ঝুঁকে ওদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন।

     ‘ওরা যা করছে তাতে মনে হচ্ছে যেন স্বয়ং রাণী আজ দর্শকদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন,’ জেমস শুনতে পেল হ্যারির মন্তব্য।

ড্যামিয়েনের কন্ঠ পুনরায় প্রতিধবনিত হল চত্বরটায়, ‘এবার মাঠে প্রবেশ করছে গতবারের বিজয়ী দল র‍্যাভেনক্ল। নেতৃত্বে জেন্নিফার টেল্লাস।’

     র‍্যাভেনক্ল দলটি মাঠে প্রবেশ করল বিস্ফোরণের স্টাইলে। দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে এসেই খেলোয়াড়রা দোলায়িত ছন্দে ছিটকে গেল বিভিন্ন দিকে। একটি কোয়াফেল এক থেকে অপরের দিকে ছুঁড়ে দিতে দিতে। বেশ খানিকক্ষণ কসরত বাজি দেখিয়ে ওরা গিয়ে জড় হল পিচের ঠিক মাঝখানে। একটু থেমে নিজেদের ঝাড়ুগুলো দর্শকদের তুলে ধরে এক পাক দিয়ে নিল। সবার ডান হাত তোলা, শুধু জেন্নিফার মধ্যে দাঁড়িয়ে উচিয়ে ধরেছে কোয়াফলটা। র‍্যাভেনক্লের গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড এর দিক থেকে শোনা গেল উচ্ছ্বাসের ঝড়। অন্যান্য দর্শকরাও হাত নেড়ে চিৎকার করে অভিনন্দিত করল গতবারের বিজয়ী দলকে।

     জেন্নিফার এবং জাস্টিন উড়ে উঠে গেল ঠিক পিচের মাঝখানে। দুই দলের বাকি সদস্যরা নিজ নিজ ক্যাপ্টেনের পেছনে তৈরি ব্যুহ সাজিয়ে। নিচে পিচের অপর দাঁড়িয়ে অফিশিয়াল কুইডিচ টিউনিক পড়ে ক্যাব্রিয়েল রিডকালি, কোয়াফেলটা ধরে আছেন পাঁজরার কাছে বাহুর চাপ দিয়ে। একপা তোলা কুইডিচ ট্র্যাঙ্কের ওপর।

     ‘আমি চাই একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন খেলা,’ উনি খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে বললেন। ‘ক্যাপ্টেনস রেডি? খেলোয়াড়রা যে যার নিজের পজিশন নিয়ে নাও। আর ররর … এই আমি ছুঁড়েদিলাম……!’

     বলার সঙ্গেসঙ্গেসঙ্গেই সোজা কোয়াফেলটাকে ছুঁড়ে দিলেন ওপর দিকে। আরো একটা ঘটনাও ঘটল একই সঙ্গে। উনি ট্র্যাঙ্ক থেকে পা সরালেন। ওখান থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল দুটো ব্লাজার আর একটা স্নিচ। চারটে বলই এখন শূন্যে ভাসছে। যার ফলস্বরূপ ভাসমান খেলোয়াড়দের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে এদিক ওদিক ভেসে যাওয়ার কসরত। দুই দলের সমর্থকদের চিৎকারে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড় হল।

     র‍্যাভেনক্ল দলে জ্যানের দিকে নজর দিল জেমস। খুঁজে পেতে অসুবিধা হচ্ছে না। রয়্যাল ব্লু রঙের পোষাকের সঙ্গে ওর ব্লন্ড রঙের চুল ভালই দেখাযাচ্ছে। যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে জ্যানকে খেলোয়াড়দের পাশ দিয়ে একপাক ঘুরে একটা ব্লাজারে ব্যাকহ্যান্ড চাপ মারতে দেখা গেল। যদিও ব্লাজারটা গিয়ে লাগল না তার লক্ষ বস্তুতে। কারণ ঠিক সময়মত নোয়া নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছিল। ফলে দর্শকদের দিক থেকে তার জন্য যুগপৎ উল্লাস হতাশার আওয়াজ ধ্বনিত হল।

     গ্রীষ্মের এই সান্ধ্যকালে গরমের মাত্রা চরম। অস্তগামী সূর্যের আলো এসে পড়ছে দর্শক ও খেলোয়াড়দের ওপর। মাঠের মধ্যে দু-দলের জন্যই একটি করে কুলডাউন এরিয়া নির্দিষ্ট করা আছে, পিচের দুই প্রান্তে। দু জায়গাতেই বারোটা করে বড় বড় বালতিতে রাখা আছে জল। মাঝে মাঝে কোন উড়ন্ত খেলোয়াড় ইশারা করছে নিজ দলের কুলডাউন করার দায়িত্বে থাকা সদস্যকে। সেই সদস্যটি নিজের জাদুদন্ড দিয়ে বালতির জলকে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতায় বুদবুদের আকারে তুলে দিচ্ছে। উড়তে থাকা খেলোয়াড়টি এসে ভেসে থাকছে নির্দিষ্ট স্থানে। আর একজন সদস্য নিচে থেকে তার জাদুদন্ডের কেরামতি দেখিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে বুদবুদটির। আর তার ফলে সৃষ্টি হওয়া জলকণায় নিজেকে ভিজিয়ে নিচ্ছে খেলোয়াড়টি। রামধনু রং এর ছটা প্রত্যেকবার দেখা যাচ্ছে যখনই কোন বুদবুদ ফেটে যাচ্ছে। আর এই ঘটনাটাও বেশ মজা করেই উপভোগ করছে উপস্থিত দর্শকেরা।

     শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রিফিন্ডোর এগিয়ে গেল পয়েন্টে। র‍্যাভেনক্ল শুরু করল পালটা আক্রমণ। সময় গড়ানোর সঙ্গেসঙ্গে একসময় গ্রিফিন্ডোরকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল র‍্যাভেনক্ল। অবস্থা এখন এমনযে সবাই বুঝতে পারছে দারুন একটা উত্তেজনাকর সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এই খেলা। জেমস তাকাল সিকারদের দিকে, ওরা খুঁজে বেড়াচ্ছে মুল্যবান স্নিচটাকে।কোথাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না সোনালী রঙের ছোট্ট বলটাকে। হাফলপাফ দর্শক আসনের দিকে পড়ন্ত সূর্যের আলোয় কী যেন একটা চিকচিক করে উঠলো বলে মনে হল জেমসের। চোখ ছোট করে দেখার চেষ্টা করতেই নজরে এল ওটা, পতাকার দন্ডটা ঘিরে ঘুরছে সোনালী স্নিচ। র‍্যাভেনক্ল এর সিকার দেখে ফেলেছে ওটাকে। গ্রিফিন্ডোরের সিকার নোয়াকে উদ্দেশ্য করে জেমস লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে, চেঁচিয়ে উঠল।নোয়া চকিতে ঝাড়ু ঘুরিয়ে তাকাল জেমসের দেখানো দিকে। স্নিচটা চোখেপড়তেই এগিয়ে চলল উড়ন্ত খেলোয়াড় এবং ধেয়ে আসা ব্লাজারদের অতি দক্ষতার সঙ্গে পাশ কাটিয়ে।

     র‍্যাভেনক্লের সিকার স্নিচটাকে ধরতে পারলো না। ওটা বেরিয়ে গেল ওর পাশ দিয়ে। খেলোয়াড়টি আর একটু হলেই পড়ে যেত নিজের ঝাড়ু থেকে। কোনও মতে সামলে নিয়ে দুপাক খেয়ে ফিরে এলো নিজের জায়গায়। গ্রিফিন্ডোরের বিটারের দায়িত্বে থাকা টেড একটা ব্লাজারকে চাপ মেরে পাঠিয়ে দিল র‍্যাভেনক্ল এর সিকারের দিকে। কিন্তু ছেলেটি বাঁচিয়ে নিল নিজেকে এবং পুনরায় উড়ে গেল স্নিচটটাকে পাকড়ানোর জন্য। নোয়াও পিচের অপর দিক থেকে এগিয়ে আসছিল অন্যান্য উড়ন্ত খেলোয়াড়দের কাটাতে কাটাতে। দর্শকেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখে যাচ্ছিলো উত্তেজনাময় মুহূর্তগুলো। আসন ছেড়ে উঠে পড়েছে অনেকেই। চিৎকার করছে উৎসাহ দিচ্ছে। এই রকম একটা টানটান সময়ে, জেমসের চোখে যা ধরা পড়লো তাতে খেলা থেকে ওর মনটা অন্যদিকে চলে গেল।

     সেই মাগল অনুপ্রবেশকারী! দাঁড়িয়ে আছে র‍্যাভেনক্ল এর কুল ডাউন এরিয়ার কাছে। জেমসের বিশ্বাস হচ্ছিল না নিজের চোখকে। কিন্তু সত্যিই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে কুলডাউন মেম্বারদের পোষাক পড়ে। ম্যাচ দেখছে চরম বিস্ময়ের দৃষ্টিতে। কিছু একটা ধরে আছে চোখের ওপর। জেমস ভালো করে তাকাতেই বুঝলো ওটা মাগলদের একটা ক্যামেরা। ম্যাচটার ছবি তুলছে লোকটা! আগন্তুকের দিক থেকে চোখ সরিয়ে জেমস তাকালো ড্যাডের দিকে। হ্যারিও দাঁড়িয়ে গেছেন ম্যাচের শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা উপভোগ করার জন্য। জেমস হ্যারির পোষাকের প্রান্ত ধরে টান দিলো এবং চিৎকার করে বলল।

     ‘ড্যাড! ড্যাড, ওই নিচে, ওইখানটায় একজন লোক!’ আঙুল দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করল উত্তেজনায় লাফাতে চিৎকার করতে থাকা জনতার ভেতর দিয়ে।

     হ্যারি কৌতূহলী মুখে জেমসের দিকে তাকিয়ে, ঝুঁকে চেষ্টা করলেন শোনার জেমস কি বলতে চাইছে। ‘কী?’

     ‘ওই নিচে তাকাও!’ জেমস হাত দিয়ে দেখিয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে বলল। ‘ওই লোকটার এখানে থাকার কথা নয়! ও একজন মাগল! আমি ওকে এর আগেও দেখেছি!’

     হ্যারির মুখ বদলে গেল। হাসি উধাও। চেষ্টা করলেন যতটা সম্ভব উঁচু হয়ে দর্শকদের মধ্যে দিয়ে দেখার। জেমসও তাকালো মাগল অনুপ্রবেশকারীকে পুনরায় দেখার জন্য। ও ভেবেছিল লোকটাকে আর দেখা যাবে না। কিন্তু ওর অনুমান ভুল হলো লোকটা এখনো ওখানে দাঁড়িয়ে আছে এবং আকাশে ভাসমান ক্রীড়াযুদ্ধ দেখছে মন দিয়ে। ক্যামেরাটা এই মুহূর্তে নামানো। ধরে আছে ডান হাতে। জেমস আর ভালো করে তাকাতেই দেখতে পেল হাতের ওপর দিকটায় ব্যান্ডেজ করা আছে। মুখেও দুটো ছোট্ট ব্যান্ডেড টেপ লাগানো। সেদিন জানলা ভেঙে পড়ে যাওয়ার আঘাতের চিহ্ন। যদিও তেমন গুরুতর কিছুই হয়নি বোঝাই যাচ্ছে।না হলে আজ আবার ফিরে আসতো না।

     হ্যারি আমেরিকান প্রতিনিধিদের কাছে নম্রভাবে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ওদের সামনে দিয়ে দ্রুত এগোতে থাকলেন সিঁড়ির দিকে। জেমস অনুসরণ করল বাবাকে। দুটো দুটো করে ধাপ লাফিয়ে ওরা এগিয়ে চলো নিচে মাঠের দিকে। জেমস বুঝতে পারল এই মুহূর্তে ওর ড্যাড অরোর এর দায়িত্ব পালনের পথে। বিশেষ কোনও ভাবনা থেকে নয় নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকেই উনি এটা করতে চলেছেন। ওনার মধ্যে কোন উত্তেজনার ছাপ নেই, কেবলমাত্র অদম্য কর্তব্যবোধের চলমান রূপ। ওরা মাঠে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই খেলাটা শেষ হল। একটা জলস্রোতের মতো উচ্ছ্বাস নিয়ে উল্লসিত জনতা ঢুকে পড়ল মাঠের মাঝে। কুলডাউনের কর্মীরা বেরিয়ে এসেছেন খালি বালতিগুলো ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। উড়ন্ত খেলোয়াড়রা একে একে নেমে আসছে মাটিতে। ক্যাব রিডকালি একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার জাদুদন্ডের সহায়তায় ফিরিয়ে আনছেন বলগুলোকে। যেখানটায় জেমস আর হ্যারি লোকটাকে দেখতে পেয়েছিল সেদিকে ঠেলেঠুলে ওরা এগিয়ে গেলেও কিছুই লাভ হল না। দেখতে পাওয়া গেল না মাগলটাকে। এই মুহূর্তে চারপাশে অনেক অনেক মানুষ, চিৎকার করছে, কথা বলছে ছোটাছুটি করছে। জেমস বুঝতে পারছে এর মধ্যে দিয়ে পালিয়ে গিয়ে পাহাড় জঙ্গলের দিকে লুকিয়ে পড়াটা এমন কিছু কঠিন নয় ওই লোকটার পক্ষে।

     হ্যারি কিন্তু থামেননি। গেলেন সেই জায়গাটায় ঠিক যেখানে আগন্তুক দাঁড়িয়ে ছিল। ওখানে দাঁড়িয়েই চারদিক আস্তে আস্তে ঘুরে উনি বুঝতে চেষ্টা করছিলেন কি উদ্দেশ্য ছিল আগমনের।

     ‘ওইখানে,’ উনি হাত তুলে দেখালেন। একটা গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের নিচের দিকে জেমস তাকালো, যেদিকটা ওর ড্যাড দেখাচ্ছেন।ওখানে সেই দরজাটা যেটা দিয়ে র‍্যাভেনক্ল এর দল মাঠে এসেছিল। ‘অথবা ওটাও হতে পারে অথবা ওটা,’ হ্যারি বললেন, কিছুটা নিজেকে উদ্দেশ্য করে কিছুটা জেমসের দিকে চেয়ে। হাত তুলে দেখালেন হাফলপাফ এবং স্লিদারিন গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের মাঝের পথটা। তারপরেই হাতটা ঘুরল ইকিউপমেন্ট শেডের দিকে। ‘না সম্ভবত শেডের দিকটা বেছে নেবে না, কারণ লোকটা নিশ্চিত জানতো ফিরে যাওয়ার কোনও পথ ওখান দিয়ে নেই। একমাত্র লুকানোর পক্ষেই ওটা ভালো। আর ওর লক্ষ পালিয়ে যাওয়া, লুকিয়ে থাকা নয় মোটেই। গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের ভেতর দিয়েবেরিয়ে যাওয়াও অসম্ভব কারণ ওটা চলে গেছেস্কুল এলাকায়। তার মানে লোকটা বেছে নিয়েছে দুই স্ট্যান্ডের মধ্যবর্তী পথটাই। জেমস!খুব বেশী হলে মিনিট দুয়েক আগেও লোকটা এখানে ছিল তাই না?’

     জেমস ড্যাডের দিকে তাকিয়ে চোখ বড়বড় করে বলল, ‘হ্যাঁ, তাই হবে।’

     ‘শোন, হেড-মিস্ট্রেসকে গিয়ে বলবি আমরা কি দেখেছি এবং টাইটাসকে জানাবি আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওকে ওই পথটার দরজার কাছে ওকে আসতে বলেছি। ছুটবি না। আমরা জানি না কেন ওই লোকটা এসেছিল।এটার জন্য কোন রকম উত্তেজনা তৈরি হোক সেটা চাইনা। তুই শুধু তাড়াতাড়ি হেঁটে যাবি আর যা বললাম সেটা করবি। ঠিক আছে?’

     জেমস মাথা ঝোঁকালো এবং ঘুরে হাঁটতে শুরু করল সেই দিকে যেদিক থেকে ওরা এখানে এসেছিল। ‘দৌড়ানো চলবে না’ বলল নিজেকে। স্ট্যন্ডের সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকা দর্শকদের ঠেলে ও উঠছিল। জানাও হল না কে জিতলো। তবে এই মুহূর্তে ও দারুণ ভাবে খুশী এটা বুঝতে পেরেযে ড্যাড ওর কথায় বিশ্বাস করেছেন। একটু হলেও ওর মনে দ্বিধা ছিল যে হয়তো ওর কথাকে ড্যাড পাত্তাই দেবেন না। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে ওর ড্যাড ওকে কতটা ভালো করে বোঝেন, যে কারণেই বিশ্বাসটাও করেন। কোন রকম প্রশ্ন না করেই হ্যারি ব্যাপারটার তদন্ত করতে নেমে পড়েছেন।কে জানে হয়তো এভাবেই অরোররা কাজ করেন। আগে তদন্ত, তারপরে যদি দরকার পড়ে তবেই জিজ্ঞাসাবাদ।তবুও এই মুহূর্তে জেমসের খুশীর ঠিকঠিকানা নেই, কারণ ওর কথাকে হ্যারি এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন।

     আনন্দের সঙ্গেসঙ্গেই খারাপও লাগছে জেমসের, কারণ ওই সন্দেহজনক লোকটাকে ধরা গেল না। ও বুঝতেই পারছে হ্যারি বা টাইটাস কেউই লোকটা কোথায় গেল সে বিষয়ে কোনও সুত্র খুঁজে পাবেন না। জেমসের অবস্থানটাও সেই এক জায়গাতেই থেকে গেল। শুধু ওর গল্পের সঙ্গে আর একটু অংশ যুক্ত হল, কুইডিচের পিচে লোকটাকে আরো একবার দেখা গেছে।

     এই সব ভাবতে ভাবতে টাইটাস হার্ডক্যাসলের দেখা পেয়ে জানিয়ে দিল হ্যারির নির্দেশ। সহকর্মীদের কাছে তাৎক্ষনিক বিদায় নিয়ে টাইটাস দ্রুত এগিয়ে গেলেন সিঁড়ির দিকে। হাত পকেটে ঢোকানো, ওখানে ওনার জাদুদন্ডটা আছে। ম্যাকগনাগল এবং মন্ত্রকের সদস্যরা জেমসের কথা শুনলেন। হেডমিস্ট্রেসের মুখে ফুটে উঠল কাঠিন্য। মিস সাকারিনা এবং মিঃ রিক্রিয়ান্টএর হাবভাবে বোঝা গেল ওরা অবাক হয়েছেন।

     ‘তুমি বলতে চাইছ লোকটার সঙ্গে ক্যামেরা ছিল?’ সাকারিনা জানতে চাইলেন।

     ‘হ্যাঁ, আমি ওই রকম ক্যামেরা আগে দেখেছি। ওটা দিয়ে সিনেমার মতো ছবি তোলা যায়। লোকটা কুইডিচের মুভি করে নিয়েছে।’

     সাকারিনা মিঃ রিক্রিয়ান্টের দিকে যে ভাবে তাকালেন তাতে বোঝা গেল জেমসের কথা ওনার একটুও বিশ্বাস হচ্ছে না। জেমস এতে আশ্চর্য হল না। কিচ্ছু এসে যায় না এতে,কারণ ম্যাকগনাগল ম্যাম ওর কথায় বিশ্বাস করেছেন। ও বলতে যাচ্ছিল সেদিন রাতের আগন্তুক আর আজকের লোকটা একই। কিন্তু সাকারিনার হাবভাব দেখে থেমে গেল এবং সিদ্ধান্ত নিল এসব কথা ম্যামকে আলাদা ভাবে জানাবে।

     ম্যাকগনাগল, মন্ত্রকের প্রতিনিধি এবং আল্মা আলেরনের অতিথিদের সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামার সময়েই জেমস জানতে পারল খেলার ফলাফল। র‍্যাভেনক্লরা ম্যাচটা জিতে নিয়েছে। ধুসসস!!অবশ্য জ্যানের কথা ভেবে ওর মন ততটা খারাপ হলনা যতটা হওয়া দরকার।

     দুর্গের কাছাকাছি চলে আসার পর হেডমিস্ট্রেস ম্যাকগনাগল একপাশে সরে দাঁড়ালেন।

     ‘মাননীয় প্রফেসরগণ এবং অতিথিবৃন্দ, আশা করছি এখান থেকে নিজের নিজের বাসস্থানে ফিরে যেতে আপনাদের অসুবিধা হবে না। আমি বর্তমান পরিস্থিতি নিজে থেকে একটু খতিয়ে দেখতে চাই,’ বলেই উনি আবার ঘুরে হাঁটতে শুরু করলেন গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড অভিমুখে।জেমস বিনা বাক্য ব্যয়েউনাকে অনুসরণ করতে শুরু করল। কাছাকাছি পৌঁছে যেতেই উনি ওর দিকে ফিরে তাকালেন।

     ‘আমার মনে তোমাকে এটা বলার কোন অর্থই নেই যে, এটা কোন প্রথম বার্ষিকীর নাক গলানোর মতো কাজ নয়,’ উনি কথাটা বললেও এটা মনে হল না যে উনি চান জেমস দুর্গে ফিরে যাক। ‘তোমার বাবা স্বয়ং অরোর প্রধান, সম্ভবত উনি তোমায় বলেছেন ওনার কাছে ফিরে যেতে। আমি অবাক হচ্ছি মিস গ্র্যাঞ্জারকে ছাড়া হ্যারি কিকরে মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করছে।’

     জেমসের একটু সময় লাগলো মিস গ্র্যাঞ্জার মানে হারমায়োনি আন্টি এটা বুঝতে। যার পদবী এখন ওয়েস্লী।

     জেমসের বেশ মজাই লাগলো এটা ভেবে যে, হেডমিস্ট্রেস ম্যাম এখনো ড্যাড, হারমায়োনি আন্টি আর রন আঙ্কলকে আগের মতই দুষ্টুমিতে ভরপুর ছোট্ট শিক্ষার্থীদের মতই মনে করেন।

     ওরা যখন স্লিদারিন আর হাফলপাফ এর গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের মাঝের পথটায় পৌঁছে দেখতে পেল ড্যাড আর টাইটাস এলাকাটির সরেজমিন তদন্ত সেরে ফিরে আসছেন।

     ম্যাকগনাগল জানতে চাইলেন, ‘কোনও কিছু বোঝা গেল?’

     হার্ডক্যাসল ঘরঘরে স্বরে বললেন, ‘আপাতত না। রাস্তা শুকনো পায়ের ছাপ পাওয়ার পক্ষে।সঙ্গে অন্ধকার, ফলে আরো কিছু মানুষ বা কুকুরের সাহায্য ছাড়া খুঁজে পাওয়া কঠিন।’

     ‘ম্যাডাম হেডমিস্ট্রেস,’ হ্যারির বলার ভঙ্গীতেই জেমস বুঝে গেল ড্যাড এখন হেড অরোরের ভুমিকায়, ‘আমরা কি আরো ভালোভাবে এলাকাটিকে খুঁজে দেখারঅনুমতি পেতে পারি? আমাদের নিজস্ব একটি ছোট্ট দলকে একাজে দরকার।’

     উত্তর না দিয়ে ম্যাকগনাগল ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি মনে করো ওই ব্যক্তিটি বিপদজনক?’

     হ্যারি হাত ছড়িয়ে কাঁধ ঝাকালেন। ‘কিছুই বলা সম্ভব না যতক্ষণ না আর কিছু খবরাখবর পাচ্ছি। শুধু এটাই বলতে পারি ওই আগন্তুক কোন ছাত্র ছিল না, কারণ বয়েস যথেষ্ট বেশী। আবার এখানকার কোন কর্মী বা শিক্ষকও ওই লোকটা নয়। কুলডাউন স্টাফদের পোশাক পড়ে ও নিশ্চিতভাবেই বিশেষ কারও চোখে ধুলো দিতে চাইছিল, সবার চোখের আড়ালে থাকা ওর উদ্দেশ্য নয়। তাছাড়া জেমস আমায় বলেছে লোকটাকে ও আগেও দেখেছে এখানেই।’

     বাকি দুজন জেমসের দিকে তাকাতেই জেমস ম্যাকগনাগলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এ সেই লোকটা ম্যাম যার কথা আমি সেদিন আপনাকে বলেছিলাম। আজ আমি একেবারে নিশ্চিত।কারণ ওর হাতে আর মুখে ব্যান্ডেজ করা ছিল। আমার মনে আমি যখন ওকে জানলা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিই ওর তখনই ওই সব জায়গায় কেটে যায়।’

     হাসি চেপে হ্যারি বিড়বিড় করে বললেন, ‘আর আমি নিশ্চিত তোর গল্পটা দারুণ ইন্টারেস্টিং হবে।’

     ‘কিন্তু মিঃ পটার, মিঃ হার্ডক্যাসল এটা তো আপনারা মানবেন এই স্কুলকে ঘিরে রাখা সুরক্ষাবন্ধনী ভেদ করে কারো পক্ষে এর ভেতরে আসা সম্ভব নয়। একমাত্র যদি না কেউ কাউকে এর ভেতরে আসার বিশেষ অনুমতি দেয়… ’

     হ্যারি বলল, ‘আপনি ঠিকই বলছেন মিনারভা। কিন্তু যাকে আমি দেখলাম তাকে দেখে মনে হলনা সঠিক অর্থে কেউ ওকে সেই পারমিশনটা দিয়েছে। তাহলে ও পালাত না। তাই প্রশ্ন হল ওকে পারমিশনটা দিল কে এবং কী ভাবে? এই প্রশ্নটার উত্তর আমাকে সবার আগে জানতে হবে। আর তা-রো আগে আমাকে চারপাশের এলাকা ভালো করে খুঁজে দেখতে হবে।’

     ম্যাকগনাগল হ্যারির চোখের দিকে তাকিয়ে সম্মতির ইশারা করলেন। ‘অবশ্যই, কাজ শুরু করে দাও। কাকে দরকার?’

     ‘প্রাথমিক ভাবে হ্যাগ্রিডকে দরকার। এই এলাকাটাকে ওর মতো ভালো কেউ চেনে না।সঙ্গেই দরকার ট্রাইফকে। আমরা তিনটে দলে ভাগ হয়ে কাজ করব। হ্যাগ্রীড এর সঙ্গে থাকবে ট্রাইফ।আমি একটা দল নিয়ে ঢুকব নিষিদ্ধ অরণ্যে। আর টাইটাস আর একটা দল নিয়ে খোঁজ শুরু করবে লেকের প্রান্তসীমা ধরে। আমাদের আর কিছু লোককে পেলে ভালো হত এই সুত্র খোঁজার কাজে। নেভিল থাকলে বেশ ভালো হত, কিন্তু সে-তো বাইরে গেছে।’

     হার্ডক্যাসল বললেন, ‘ওকে ডেকে আনার ব্যবস্থা করতে পারি।’

     হ্যারি মাথা নেড়ে বললেন, ‘মনে হয় না সেটা করার দরকার আছে। আমরা মাত্র একজনকে খুঁজছি, সে সম্ভাব্য রূপে একজন মাগল। আমাদের দরকার মাত্র কয়েকজনকে যারা পিছু নিতে ওস্তাদ। টেডি লুপিন আর জেমসকে নিয়ে দলটা বানালে কেমন হয়?’

     জেমস নিজের আন্তরিক উচ্ছ্বাসটাকে প্রকাশ না করলেও শিহরিত হল রোমাঞ্চ এবং গর্বে। ড্যাডের দিকে তাকিয়ে সামান্য ঝুঁকে কর্তব্য এবং আত্মবিশ্বাস দেখাতে চাইল। বুকের ভেতরে নাচতে থাকা উদ্দাম উচ্ছ্বাসকে চেপে রেখে।

     টাইটাস জানতে চাইল, ‘ম্যাম এই মুহূর্তে স্কুলে কোন হিপ্পোগ্রিফস আছে? উড়ন্ত অবস্থায় ওপর থেকে জায়গাটাকে দেখতে পেলে ভালো হত। যেহেতু আগন্তুক আগেও এই মাঠে এসেছে তার অর্থ কাছে পিঠেই কোথাও আস্তানা বানিয়েছে।’

     ‘না মিঃ হার্ডক্যাসল এই মুহূর্তে নেই। চাইলে থ্রেস্টাল এর বন্দোবস্ত করতে পারি।’

     হ্যারি মাথা নড়ল। ‘কাজ হবে না। থ্রেস্টাল কেবলমাত্র একজনকে নিয়েই উড়তে সক্ষম। তার ওপর আমার বা টাইটাসের মতো ওজন নিতে পারবেও না। হ্যাগ্রিড চাপলে তো নিশ্চিত ওটার দফারফা হবে।’

     হার্ডক্যাসল জেমসের দিকে তাকালেন আড়চোখে। ‘মানুষের চেয়ে একটু বেশী উচ্চতা সবসময়েই কার্যকরী ব্যাপার। বেশ খানিকটা উচুঁ থেকে এলাকাটা দেখতে পেলে ভালোই হত, কিন্তু সময় নষ্ট হবে অনেক ঠিকঠাক খুঁজে দেখতে। কি জুনিয়র,কিছু আইডিয়া এল নাকি মাথায়?’

     ‘দৈত্যদের সাহায্য নিলে কেমন হয়?’ জেমস একটু ভেবে বলল। বলেই চিন্তায় পড়ল, কথাটা বোকার মতো হয়ে গেল বোধহয়। ভয় পেলোএবার ওর ড্যাড নিশ্চিত ওর ওপর থেকে ভরসা হারাবেন। ‘ওখানে গ্র্যাপ আছে। ওতো প্রায় গাছের মতই লম্বা, সঙ্গেই আছে ওর বান্ধবী। হ্যাগ্রিড বলছিল সে নাকি আবার গ্র্যাপের থেকেও লম্বা।’

     হার্ডক্যাসল হ্যারির দিকে তাকালেন, মুখের ভাবে ভাবনা বোঝা মুশকিল। হ্যারিকে দেখে মনে হল চিন্তা করছেন ব্যাপারটা নিয়ে। হেড মিস্ট্রেসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাগ্রিড এখানে কত তাড়াতাড়ি আসতে পারবে বলে আপনার মনে হয়?’

     ‘এটা একটা বেশ ভালো প্রশ্ন,’ উনি উত্তর দিলেন একটু হাল্কাভাবেই। ‘বুঝতেই পারছি আমার ধারণাই ছিল না আমরা দুটো দৈত্যকে নিয়ে এখানে বসবাস করছি। আমি যাচ্ছি, হ্যাগ্রিডকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ জানাতে সাহায্য করার জন্য।’ জেমসের দিকে ঘুরে বললেন, ‘তুমি চলে যাও লুপিনকে ডেকে আনার জন্য। আর কাউকে যেন বলোনা কি জন্যে ওকে ডেকে আনছ। ১৫ মিনিটের মধ্যে নিজেদের পোষাক পড়ে আর জাদুদন্ড নিয়ে হাজির হও হ্যাগ্রিডের কেবিনে। আমায় ফিরে যেতে হবে দুর্গে, অতিথিদের দেখাশোনা করার জন্য।’

     হ্যারি তার সেই বিখ্যাত মুচকি হাসিটা হেসে বললেন, ‘জেমস, মাই বয় এবার আর হেঁটে নয় ছুটে যাও।’

     কমনরুমের কাছে জেমস যখন পৌঁছাল তখন ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতেই ওর কষ্ট হচ্ছিল। দেখলো টেড তখনও কুইডিচ জার্সিটা পড়েই আছে, এক কোণায় আরো কিছু খেলোয়াড় সঙ্গে জটলা পাকিয়ে আলোচনায় মগ্ন।

     ‘টেড একটু এদিকে আসবি! আমদের হাতে বেশী সময় নেই,’ জেমস হাঁফাতে হাঁফাতে বলল।

     সাব্রিনা বলল সোফার ওপর দিয়ে ঘুরে তাকিয়ে, ‘এভাবে ঘরে ঢোকা উচিত নয়, যে কেউ ধরে ফেলবে তুই কিছু একটা ঝামেলা পাকিয়েছিস।’

     ‘আমি, মানে আমরা,’ জেমস হাঁটুর ওপর দু হাতের ভর দিয়ে দম নিতে নিতে বলল। ‘এক্ষুনি আমি কিছু বলতে পারছি না। সে অনুমতি নেই। সব পরে বলব। টেড তোর সাহায্য ওদের দরকার। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাদের হ্যাগ্রিডের কেবিনে যেতে হবে, ক্লোক আর জাদুদন্ড নিয়ে।’

     টেড লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। মরসুমের প্রথম হারটার কথা ভুলে যেতে এর চেয়ে ভালো কিছু নেই। তাও ওপর একটা অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ‘আমি জানতাম এরকম একটা দিন আসবে। আমার ইউনিক স্কিল আর দূরদৃষ্টি একদিন দাম পাবে আমি জানতাম। ওকে, বন্ধুগণ আপাতত বিদায়, আবার দেখা হবে আমাদের অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শোনানোর জন্য। আশা করছি সেটা শোনানোর জন্য তোদের কাছে ফিরে আসবো। চল জেমস কোথায় যাবি।’

     টেড ক্লোকটা নিয়ে নিল কাঁধের ওপর আর জাদুদন্ডটা গুঁজে নিল পিছনের পকেটে।

     দুজনেই এগিয়ে গেল স্থূলকায় মহিলার পোরট্রেট এর দিকে। জেমস এখনো হাঁফাচ্ছিল, টেড এগিয়ে যাচ্ছিল চোয়াল শক্ত করে, সাব্রিনা পেছন থেকে ডেকে বলল, ‘ফিরে আসার সময় বেশি করে বাটারবিয়ার নিয়ে ফিরে এসো, হে মহান যোদ্ধা।’

     ব্যালকনির বাঁকটা ঘুরতেই দেখা গেল জ্যান সিঁড়ি দিয়ে নেমে এদিকেই আসছে।যার ফলে জেমস একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল ওকে কি বলবে এটা ভেবে। নিচে নেমেই ওদের দিকে এগিয়ে এল জ্যান।

     ‘হেই, টেড আজ খেলা কিন্তু দারুণ হল!’

     টেড উত্তর না দিয়ে একটা হুম ধরনের শব্দ করল। পরাজয় মনে করার কোন ইচ্ছেই ওর নেই।

     ‘তোরা যাচ্ছিস কোথায়?’ জ্যান জানতে চাইল, জেমসদের পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে।

     ‘অ্যাডভেঞ্চারে সঙ্গেই মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে,’ টেড উত্তর দিল। ‘ইচ্ছে আছে যাওয়ার?’

     ‘অবশ্যই! তা প্ল্যানটা কি?’

     ‘বলা যাবে না,’ জেমস উত্তর দিল। ‘সরি ভাই। এটা আমার আর টেডের নিজের একটা ব্যাপার। আমার ড্যাড বলেছেন …’

     জ্যানের ভুরু কপালে উঠে গেল। ‘তোর ড্যাড? কুউউউউল! তার মানেই বিশেষ কিছু ব্যাপার! এটা কিন্তু ঠিক নয়। তুই হ্যারি পটার স্টাইলের অ্যাডভেঞ্চার করতে যাচ্ছিস। আর সেখানে তোর সঙ্গী হিসাবে আমি থাকবো না। এটা করতে পারবি তুই?’

     জেমস মেন হলের মধ্যে থমকে দাঁড়াল, একটু ভাবল তারপর বলল, ‘ঠিক আছে! তুই আসতে পারিস আমাদের সঙ্গে। কিন্তু ড্যাড যদি তোকে ফিরে যেতে বলে সেটাই তোকে মেনে নিতে হবে। আর এ নিয়ে কাউকে একটা কথাও বলতে পারবি না। রাজি?’

     ‘উ উ হু উ! সেন্ট পারসেন্ট’ জ্যান চেঁচিয়ে উঠল প্রায়। ছুটে এগিয়ে গেল ওদের আগে এবং বলল, ‘তাড়াতাড়ি পা চালাও ভাইসব। সামনে বিরাট একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’

     হ্যারি আর টাইটাস, হ্যাগ্রিডের কেবিনের বাইরে জাদুদন্ডের আলো জ্বালিয়ে অপেক্ষা করছিলেন ওদের জন্য।

     ‘এখানে আসার জন্য ধন্যবাদ টেড,’ হ্যারি বললেন, মুখে কাঠিন্য। ‘এবং জ্যান তোমাকেও। তুমি আসবে সেটা অবশ্য আশা করিনি।’

     ‘হ্যারি, আমি ওকে নিয়ে এলাম,’ টেড বলল, কিছুটা থমথমে গলায়। ‘যদিও ও একেবারে নতুন তবু যথেষ্ট শার্প। আমার মনে হল তোমার প্ল্যান অনুসারে হয়তো ওকে কাজে লেগে যেতেও পারে।’ টেড জ্যানের দিকে তাকিয়ে বলল। জ্যান মুখ থেকে হাসি সরিয়ে একটা ব্যর্থ সিরিয়াস ভাব আনার চেষ্টাকরছে। যেটা হ্যারি ভালোভাবে লক্ষ করলেন।

     ‘আসলে এই মুহূর্তে আমাদের চোখের প্রয়োজন। মানে আমরা কিছু খুঁজে দেখার চেষ্টা করব। আর যেহেতু জ্যানের ও আমাদের মতোই দুটো চোখ আছে অতএব ওকেও দলে নেওয়া যেতেই পারে। শুধু একটা দিকে খেয়াল রাখতে হবে মিনারভা যেন জানতে না পারেন আমি প্রথম বছরের আরও একটি ছাত্রকে আমার দলে সামিল করেছি। আমাদের সবার ভাগ্যে কঠিন কোন শাস্তি জুটুক এ আমি চাই না। জেমসতো বোধহয় বলেনি আমরা আজ রাতে কি করতে চলেছি?’

     টেড মাথা নাড়লো, ‘একটা শব্দ ও না। শুধু বলেছে এটা খুব গোপন ব্যাপার।’

     হ্যারি জেমসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হেড-মিস্ট্রেস তোকে এরকম কোন নির্দেশ দিয়েছে নাকি?’

     ‘আমি কিন্তু ওই কথাটা বলিনি!’ জেমস প্রতিবাদ করল টেড এর দিকে তাকিয়ে। ‘আমি বলেছি আমরা কি করতে চলেছি সেটা বলার অধিকার আমার নেই।’

     ‘মানুষকে যে কোনও বিষয়ে কৌতূহলী করে তোলার সবচেয়ে সেরা উপায় হল এই বাক্যটা, কি করতে চলেছি সেটা বলার অধিকার আমার নেই।’ হ্যারির কথার ভঙ্গীতে বোঝা গেল উনি একটুও রাগ করেননি। বরং বেশ উপভোগ করছেন পরিস্থিতিটা। ‘যাকগে, ওটা কোন ব্যাপার না। আমরা কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ করে নিয়ে দুর্গে ফিরে যাবো যাতে তোর গ্রেমলিন বন্ধুরা বেশী চিন্তা করার সুযোগ না পায়। তাহলেই হবে তো টেড?’

     ‘একদম! এসব নিয়ে যদি আলোচনা করতেও যাই আমার মনে হয় ওরা কম্বল মুড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়বে,’ টেড বলল হাল্কাভাবে। হ্যারি চোখ পাকিয়ে তাকালেন।

     জেমস জমিতে একটা মৃদু কম্পন অনুভব করছিল। কিছুক্ষণ বাদেই শোনা গেল ট্রাইফের ঘেউ ঘেঊ শব্দ, হ্যগ্রিডের বুলম্যাস্টিফ। বোরহাউন্ড ফ্যাং এর পর এটাই আপাতত হ্যাগ্রিডের প্রিয় পোষ্য। উপস্থিত সকলেই ঘুরে জঙ্গলের দিকে তাকাল, কারণ ওদিক থেকেই মাটিতে যে কম্পন অনুভুত হচ্ছিল তা আর জোরে এদিকে এগিয়ে আসতে থাকলো। মিনিটখানেক পর কিছু অতিকায় অবয়ব অন্ধকারে আরো অন্ধকারের জমাট মহীরুহসম উচ্চতার কিছু একটা এসে দাঁড়ালো ওদের সামনে। যাদের পদচারণে এবার আর জোরে কেঁপে উঠলো মাটি। ট্রাইফ ওই দৈত্যাকার অবয়বদের পায়ের মধ্যে দিয়ে ছোটাছুটি করছিল। জানেও না অসাবধানে একবার যদি ওদের কারো পা ওর ওপর পড়ে তাহলে …। ওদের দিকে তাকিয়ে সমানে চিৎকার করে যাচ্ছিল, অত বড় মাপের কুকুরটাকে নেহাতই খেলনা মনে হচ্ছিল। হ্যাগ্রিড এগিয়ে এল, ট্রাইফকে বার বার চিৎকার থামানোর জন্য নির্দেশ দিতে দিতে, যদিও সেরকম কোন জোর তাতে থাকছিল না।

     ‘গ্র্যাপকে সঙ্গে নিয়ে আসাটা কোন ব্যাপারই না, জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে হ্যাগ্রিড বলল। ‘ও সবসময়েই সাহায্য করতে প্রস্তুত। খুবই বড় মাপের হৃদয়ের অধিকারী। সঙ্গেসঙ্গেই যতদিন যাচ্ছে ওর কথাবার্তাও বেশ ভালো হচ্ছে। অবশ্য ওর বান্ধবী…’ ওর গলার জোর কমে গেল হ্যারিকে দেখেই, এতটাই কুকড়ে গেল যেন জোঁকের মুখে নুন দেওয়া হয়েছে। ‘মানে ওই মেয়েটি মানুষের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে তত অভ্যস্ত নয় কিনা গ্র্যাপের মতো। ওকে এখানে জোর করে আনাটাও বোধ হয় ঠিক হলনা। আমরা কী বলি সেটা ঠিকঠাক বুঝতেও পারে না। তবু কথা বলে বলে ওকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।কিছুটা সময় লাগবে।’

     জেমস নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল এই হলো সেই হ্যাগ্রিড যে কেবলমাত্র আনন্দ পাওয়ার জন্য ব্লাস্ট এন্ডেড স্ক্রীউটটাকে বড় করেছিল।ড্রাগন দেখে ওর নাকিমনে হয়েছিলওরা খুব কিউট। সেই হ্যাগ্রিড যখন কোন প্রাণীর বিষয়ে সতর্ক করছে সেটা মেনে নেওয়াটাই সঠিক কাজ। সবাই ঘুরে দাঁড়াল দৈত্যদ্বয়কে স্বাগত জানানোর জন্য। গ্র্যাপ প্রথম বেরিয়ে এলজঙ্গল থেকে,পিটপিট করে হাসল। হ্যারির দিকে বাড়িয়ে দিল বিশাল হাতটা।

     ‘হাল্লু হ্যারি,’ গ্র্যাপ গম্ভীর স্বরে ধীর বলল। জেমস বুঝতে পারল শব্দ সাজিয়ে কথা বলাটা বেশ কঠিন কাজ গ্র্যাপের পক্ষে। ‘কেমন হারম এই নাওন … হার মাইম নিন …’

     হ্যারি গ্র্যাপের প্রচেষ্টকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হারমায়োনি ভালো আছে গ্র্যাপ। তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে জানলে সে নিশ্চয় আগে থেকে তোমায় হ্যালো বলতে বলে দিত।’

     হ্যারি আসলে কি বলল এটা গ্র্যাপের মাথায় ঢুকল না, ‘হাল্লু, হারমি নিম্মিনি …’ ও নামটা ঠিক করে উচ্চারণ করার চেষ্টাতেই মনোযোগ দিল। ওদিকে জঙ্গল থেকে এবার বেরিয়ে এল গ্র্যাপের বান্ধবী। জেমসপেছন দিকে মাথা কাত করে দেখল, একটা শিহরনের স্রোত বয়ে গেল ওর শিরদাঁড়া বেয়ে। মেয়ে দৈত্যটা এতটাই লম্বা যে ওর মাথা গাছগুলোর মাথা টপকে চলে গেছে।খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসার সময়ে বেশ কিছু ডালপালা ভেঙে গেল ওর নড়াচড়ায়। জাদুদন্ডের আলো গ্র্যাপের মুখ পর্যন্ত পৌছাচ্ছিল, যা ওর বান্ধবীর খুব বেশী হলে বুক পর্যন্ত হবে। তারা ভরা আকাশের প্রেক্ষাপটে মাথাটা একটা জমাট অন্ধকারের মত গাছের উচ্চতা ছাড়িয়ে অবস্থান করছিল।নড়াচড়াটা গ্র্যাপের চেয়েও ধীর গতির। প্রতি পদক্ষেপে আশেপাশের গাছপালা কেঁপে কেঁপে উঠছিল।

     দানবাকৃতি দেহধারিণীর দিকে তাকিয়ে হার্ডক্যাসল বলেন, ‘ভাগিয়ে নিয়ে আসার পক্ষে একটু বেশি বড়ই।’

     ‘হ্যারি, টাইটাস, জেমস, জ্যান আর টেড,’ হ্যাগ্রিড ধীরে ধীরে নামগুলো বলল, ‘পরিচয় করিয়ে দিই, এ হল প্রেচকা। প্রেচকা এরা সব বন্ধু।’

     প্রেচকা নিচু হয়ে মুখটা নামিয়ে আনল গ্র্যাপের কাঁধের কাছে। একটা প্রশ্নসূচক গরগরে শব্দ করল। সেই আওয়াজে হ্যাগ্রিডের কেবিনের জানলা ঝনঝনিয়ে উঠল। হ্যারি নিজের প্রজ্জ্বলিত জাদুদন্ডটা উঁচু করে তুলে ধরে হাসলেন। ‘প্রেচকা, গ্র্যাপ তোমাদের দুজনকেই ধন্যবাদ আমাদের সাহায্য করার জন্য এখানে এসেছ বলে। আশা করছি আমরা তোমাদের বেশীক্ষন আটকিয়ে রাখব না। হ্যাগ্রিড কি তোমাদের বলেছে কেন তোমাদের ডেকে আনা হয়েছে?’

     গ্র্যাপ এবার বেশ সাজিয়েই কথা বলল, ‘হ্যারি একজন লোক খুঁজছে। গ্র্যাপ আর প্রেচকা সাহায্য।’

     ‘দারুণ,’ হ্যারি বললেন, এবার বাকিদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হ্যাগ্রিড তুমি ট্রাইফকে নিয়ে ওই পথটার দিকে যাও। অরণ্যের সীমানা পর্যন্ত এবং লেকের চারপাশটায় দেখো যদি গন্ধ শুঁকে কিছু হদিশ ও বার করতে পারে।কিছু পেলেই লাল আলোর নিশানা দিও। টেড তুই আমি আর প্রেচকা অরণ্যে ঢুকবো। জ্যান, জেমস আর টাইটাস লেকের চারপাশটা গ্র্যাপকে সঙ্গে নিয়ে খুঁজে দেখুক। আমরা খুঁজে পেতে চাই অনুপ্রবেশকারীর পালিয়ে যাওয়ার চিহ্ন, হয়তো কিছু ভাঙা ডালপালা, জমিতে চেপ্টে যাওয়া ছোট গাছ যা হোক কিছু একটা। আর সঙ্গেসঙ্গেই যে কোন রকম চিহ্ন যার সঙ্গে মানুষের সংযোগ আছে, যেমন কাপড়ের টুকরো, কাগজ ধরনের কিছু। বুঝতে পেরেছো সবাই?’

     ‘আমরা কাকে খুঁজছি হ্যারি?’ টেড জানতে চাইল।

     হ্যারি ততক্ষণে প্রেচকার দিকে এগিয়ে গেছে। ‘সেটা তো জানতে পারব যখন আমরা লোকটাকে খুঁজে পাব, তাই নয় কি?’

[চলবে]

লেখক পরিচিতিঃ  জর্জ নরম্যান লিপারট আমেরিকান লেখক এবং কম্পিউটার অ্যানিমেটর। তবে ওনার বর্তমান পরিচয় উনি জেমস পটার সিরিজের লেখক। যে কারনে ওনাকে “আমেরিকান রাউলিং” নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সিরিজের প্রথম লেখা “জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং” প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। নানান কারনে এটি অনেক বিতর্কে জড়িয়ে যায়। সেসব সমস্যা পেরিয়ে আজ এটি পাঠক পাঠিকাদের চাহিদায় সারা বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সিরিজের সব কটি বই ই-বুক এবং ফ্রি হিসাবেই প্রকাশ করেছেন মাননীয় জর্জ নরম্যান লিপারট। এই সিরিজ ছাড়াও ওনার আরো ১২ টি বই আছে। বর্তমানে উনি এরি, পেনসিল্ভ্যানিয়ার বাসিন্দা।

অনুবাদকের পরিচিতিঃ উপন্যাসটির অনুবাদক প্রতিম দাস মূলত চিত্র শিল্পী, ২০১৩ সাল থেকে ভারতের সমস্ত পাখি আঁকার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছেন। ৭৭৫+ প্রজাতির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে শুধু পাখি নয় অন্যান্য বিষয়েও ছবি আঁকা চলে একইসাথে। সাথেই দারুণ রকমের পাঠক, যা পান তাই পড়েন ধরনের। প্রিয় বিষয় রূপকথা, ফ্যান্টাসী, সায়েন্স ফিকশন, অলৌকিক। টুকটাক গল্প লেখার সাথে সাথে আছে অনুবাদের শখ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!