জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং – পার্ট ৮

রচনা  : জি নরম্যান লিপার্ট, ভাষান্তরঃ প্রতিম দাস

অলঙ্করণ : মূল প্রচ্ছদ, সুদীপ দেব

অষ্টম পরিচ্ছেদ

লুকিয়ে থাকা দ্বীপ

জ্যান, জেমস আর হার্ডক্যাসল গ্র্যাপের কাঁধে চেপে চলল মাগল অভিযানে। জ্যান আর জেমস দুহাতে শক্ত করে ধরে রাখল গ্র্যাপের ছিন্ন জামার অংশ।মিঃ হার্ডক্যাসল বাচ্চারা যে ভাবে বাবা বা মায়ের গলা আঁকড়ে পিঠে ঝোলে সেই ভাবে এক হাত দিয়ে ধরে ঝুলে আছেন। অন্য হাতে উঁচিয়ে ধরে আছেন নিজের প্রজ্জ্বলিত জাদুদন্ড। সেই আলোতে নিচের জমি ভালো করেই দেখা যাচ্ছে। গ্র্যাপকে লেকের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন উনি। অন্যদিকে টেড এবং হ্যারি কিভাবে প্রেচকার কাঁধে চাপবে সেটা নিয়ে চিন্তিত।

     ‘আমাদের একটা মই এর দরকার, তাই না?’ টেড বলল।

     ‘ওকে ঝুঁকে হাতের ওপর ভর দিয়ে বসাতে হবে,’ হ্যারি বললো। সেটা বুঝিয়ে দিতে গ্র্যাপের দৈত্য বান্ধবী সেটাই করলো কিন্তু হ্যাগ্রিডের সাধের বাগানের দফারফা করে ছাড়লো। রসালো কুমড়োগুলো দেখে লোভ সামলাতে না পেরে এক খাবলা তুলে পুরে দিল মুখে।

     ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, ওটা কোন ব্যাপার না,’ হ্যাগ্রিড যথেষ্ট মোলায়েম স্বরে বললো। ‘আর একটু ঝোঁকো তাহলেই হবে। এই তো, হ্যাঁ, ব্যাস। ওহো!’

     একটা কাঠের কিছু ভাঙার শব্দ শোনা গেল। এবার প্রেচকা হ্যাগ্রিডের মালবহনের গাড়িটারও বারোটা বাজিয়ে দিলো।

     হ্যাগ্রিড মাথা নেড়ে, বিশাল কনুইটায় চাপড় মেরে বললো, ‘যাই হোক এবার অন্তত ওর কাঁধে চড়তে পারবে হ্যারি। ওই পাঁচিলটায় ওঠো, একটা সিঁড়ি আছে ওখানে। এই তো ব্যাস হয়ে গেছে।’

     প্রেচকা সোজা হয়ে দাঁড়ালো, হ্যারি আর টেড ঠিকঠাক করে জায়গা করে নিল দৈত্যাকার কাঁধটিতে। গ্র্যাপ জঙ্গলে ঢুকতেই বড় বড় গাছের আড়ালে হারিয়ে গেল হগওয়ারটসের চিরপরিচিত ছবিটা। এখন শুধুই গাছ আর গাছ।

     গ্র্যাপ তার কাঁধে থাকা মানুষদের কথা ভেবেই সম্ভবত গাছপালা বাঁচিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো। জেমস গ্র্যাপের প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সৃষ্টি হওয়া কাঁপুনি অনুভব করছিল। একেই বলে দৈত্যর কাঁধে চেপে সফরের অভিজ্ঞতা। এদিকে প্রায় কান ঘেঁষে বসে হার্ডক্যাসল পরিচালিত করছেন গ্র্যাপকে। কথা বলছেন অতি সন্তর্পণে। একেবারে সোজাসুজি লেকটাকে ঘিরে পরিভ্রমন না করে উনি জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে একবার লেকের ধারে একবার জঙ্গলে এইভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন গ্র্যাপকে নিয়ে। ফলে কাজটা হচ্ছে খুব ধীর গতিতে, যার ফলে জেমসের ঘুম পেয়ে যাওয়ার মতোই অবস্থা হচ্ছে। মাঝেমাঝেই নিজেকে ঝাঁকিয়ে নিয়ে ঘুম কাটিয়ে নিচের দিকে তাকাচ্ছে যদি কোন কিছু দেখা যায় ড্যাডের বলা কথামতো। নিজেকে জাগিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় জেমস জ্যান এবং হার্ডক্যাসলকে লোকটাকে প্রথম দিন ক্যামেরাসহ দেখার ঘটনা থেকে শুরু করে কুইডিচ মাঠে দেখার ঘটনা পর্যন্ত খুলে বললো।

     ‘তার মানে তুমি ওই লোকটাকে মোট তিনবার দেখেছ?’ বিন্দুমাত্র স্বরমাত্রার হেরফের না ঘটিয়ে হার্ডক্যাসল প্রশ্ন করলেন।

     ‘হ্যাঁ,’ জেমস মাথা ঝুঁকিয়ে বললো।

     ‘আজকের রাতের কথা বাদ দিলে তোমার ড্যাড ছাড়া আর কেউ লোকটাকে দেখতেই পেল না?’

     জেমস প্রশ্নটায় কিছুটা থতমত খেয়ে গেলেও জবাবটা জোরের সঙ্গেই দিল, ‘না, কেউ দেখেনি। বা দেখেছে লক্ষ্য করেনি।’

     এরপর বেশ কিছুটা সময় কথা বন্ধ থাকলো। জেমস অনুমান করলো এক তৃতীয়াংশ পথ চলা হয়ে গেছে। লেকের কাছে এলেই আলোকিত দুর্গের অংশ চোখে আসছে। আশেপাশের গাছপালাতে কোন রকম কিছু চিহ্নমাত্র নেই যা ওরা খুঁজছে। চারদিকে শুধু সমবেত ঝিঁ ঝিঁ পোকাদের ঐকতান। এদিক ওদিক তাকালে জেমস দেখতে পাচ্ছে জোনাকি পোকাদের আলোকিত ঊড়ান। কোথায় কোন চিহ্নমাত্র নেই যার থেকে মনে হবে এই সব স্থানে সম্প্রতি কারো আগমন ঘটেছে।

     ‘গ্র্যাপ, দাঁড়াও,’ হার্ডক্যাসল হঠাৎই বললেন উত্তেজনার ছোঁয়া মাখা স্বরে। গ্র্যাপ পাথরের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। বিরাট মাথাটা শুধু ঘুরিয়ে এদিক ওদিকে চাইলো। জেমস গ্র্যাপের অতি নোংরা কানের পাস দিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলো হার্ডক্যাসল কি দেখার বা শোনার চেষ্টা করছেন। তিরিশ সেকেন্ড মতো কেটে গেল, জেমস জানে কোনও কথা বলা যাবে না এখন। কাছেই কিসের একটা শব্দ হল। কিছু একটা শুকনো পাতার ওপর দিয়ে চলে যেতে যেতে থেমে গেল। একটা ডাল ভাঙ্গার শব্দ হল, সম্ভবত কারোর পা পড়লো ওটার ওপর। জেমসের হৃদপিণ্ড সহসাই ধড়ফড় করে উঠলো। হার্ডক্যাসল এবং গ্র্যাপ এখনও নিশ্চল। জেমস দেখল হার্ডক্যাসল তার মাথাটা সামান্য নড়িয়ে শব্দটার সঠিক স্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করছেন।

     শব্দটা আবার শোনা গেল, এবার বেশ কাছেই কিন্তু কিছু দেখা গেল না। ওদের সামনেই শব্দটা হল, নিচে পাশের দিকে অপেক্ষাকৃত ছোট গাছপালাগুলোর মধ্যে। জেমসের মনে হল কিছু একটা না-মানবিক ব্যাপার আছে ওই শব্দের পেছনে। যে এই মুহূর্তে খুব ব্যস্ত। উত্তেজনায় ওর ঘাড়ের লোম খাড়া হয়ে উঠলো।

     হার্ড ক্যাসল আস্তে করে গ্র্যাপের মাথার পেছন দিকে টোকা মারলেন এবং সামনের দিকটা দেখালেন। জেমস বুঝলো দৈত্যটা নিচু হচ্ছে। হাতটা পেতে রাখতে গিয়ে কিছু ডালপালা ভাঙ্গার আওয়াজ হল। হার্ডক্যাসল নেমে গেলেন হাত বেয়ে। নজর শব্দের উৎসস্থলের দিকে।

     ‘ওখানেই থা—’

     কথাটা শেষ করতে পারলেন না পুনরায় শব্দটা হওয়াতে। ওটা এখন আরো কাছে এসে গেছে, জেমস ওটার নড়াচড়া বুঝতে পারছে। এক অবিশ্বাস্য গতিতে চারপাশের গাছপালা নাড়িয়ে শুকনো পাতা উড়িয়ে একটা ছায়া ছায়া অবয়ব উঠে এলো ওখান থেকে। গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে ওটা বেরিয়ে এলো আবার ঢুকেও গেল, ঘাস পাতা মাড়িয়ে। মনে হল বস্তুটার অনেকগুলো পা আছে।ওটার সমানে থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল এক অদ্ভুত রকমের নীলচে আলো। আলোগুলো দপ দপ করছিল এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। হার্ডক্যাসল গ্র্যাপের গায়ে সেঁটে গিয়েছিলেন ওটা এগিয়ে আসতেই। একজন দক্ষ অরোরের মত এবার উনি জঙ্গলের দিকে ছুঁড়ে দিলেন লাল রঙের স্টানিং মন্ত্র। অজানা অবয়ব তার গতিপথ বদলালো। ওদেরকে একপাক ঘুরে নিয়ে ধেয়ে গেল গাছের সারিতে তৈরি হওয়া একটা গলির মত পথ দিয়ে। নীল আলোর বিচ্ছুরণ জানান দিলো ওটা শুকনো ডালপালা ভেঙে ক্রমশঃ গভীর অরন্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে।

     ‘তোমরা দুজন গ্র্যাপের কাছেই থাকো। গ্র্যাপ, আমার বদলে অন্য কিছু এখানে এলে তাকে শেষ করার দায়িত্ব তোমার।’ হার্ডক্যাসল কথাটা বলেই ঘুরে ছুট লাগালেন অজানা জীবটার গতিপথ অনুসরণ করে। শরীরের আকৃতির অনুপাতে যে গতিতে হার্ডক্যাসল ছুটলেন তা সত্যিই অবাক করে দেওয়ার মতো। পনের সেকেন্ড পর না ওই জীবটার না হার্ডক্যাসল কারো কোন শব্দই আর ভেসে এলো না। জেমসরা দুজনেই নেমে পড়লো গ্র্যাপের কাঁধ থেকে, এগিয়ে গেল গলিপথটার দিকে যদি কিছু দেখা যায় এটা ভেবে।

     ‘ওটা কি ছিল?’ জ্যান বিস্ময় জড়ানো কণ্ঠে জানতে চাইলো।

     জেমস মাথা নেড়ে বললো, ‘আমি নিশ্চিত নই আমি সেটা জানতে চাই কিনা। তবে এটা বলতে পারি আমরা যে মানুষটার খোঁজে এখানে এসেছি ওটা সেটা নয়।’

     ‘যাক এটা জানতে পেরে ভালো লাগলো,’ জ্যান বেশ খানিকটা স্বস্তি নিয়েই যেন কথাটা বললো।

     ওরা সেই গলির মত পথটার দিকে চেয়ে থাকল যেটার ভেতর অজানা জীব আর হার্ডক্যাসল অদৃশ্য হয়েছেন। আবার চারদিকে শুরু হয়েছে ঝিঁঝিঁ পোকার কলতান। সঙ্গেই সংগত দিচ্ছে জোনাকিদের আলোর নাচন। মনেই হচ্ছেনা কিছু আগে এখানে একটা অদ্ভুত কিছু ঘটেছে। কোনও সাড়া শব্দ কিছুই আসছে না ওই প্রান্ত থেকে।

     জ্যান জিজ্ঞেস করলো, ‘উনি কতদূর পর্যন্ত ওটাকে ধাওয়া করবেন?’

     জেমস কাঁধ উচিয়ে বললো, ‘মনে হয় যতক্ষণ না উনি ওটাকে ধরতে পারবেন।’

     ‘বা ওটা ওকে ধরে নেবে,’ জ্যান বললো কম্পিত স্বরে। ‘সত্যি বলছি ওই গ্র্যাপের ওপর থাকতে পারলেই আমি অনেকটাই স্বস্তি বোধ করতাম।’

     ‘আরে তাইতো,’ জেমস সায় দিলো, গ্র্যাপের দিকে ঘুরে বললো, ‘গ্র্যাপ, কি রকম হয় বল দেখি যদি…’

     কথা থেমে গেল, গ্র্যাপ ওখানে নেই। হতভম্বের মত ওরা দুজন এদিকে ওদিকে তাকালো, কথা বলার শক্তিটাও কে যেন কেড়ে নিয়েছে। ‘ওই তো!’ জ্যান বলে উঠলো, লেকের দিকে আঙুল তুলে। জেমস তাকালো। গ্র্যাপ একটা বিরাট শ্যাওলা মাখা পাথরের আড়ালে চলে গেল ধীরে ধীরে। ‘চল! চল! ওকে কিছুতেই চোখের আড়াল করা যাবে না।’

     দুজনেই ছুটলো পড়ে থাকা বড় বড় গাছের গুঁড়ি ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে। পা মাঝে মাঝেই পিছলে যাচ্ছিল পাতায় ঢাকা পাথরের ওপর পড়তেই। একটা বাড়ির মাপের যে পাথরটার আড়ালে ওরা গ্র্যাপকে যেতে দেখেছিল সেটা ছাড়িয়ে গ্র্যাপ এখন এগিয়ে গেছে একটা কাত হয়ে থাকা মরা গাছের গুঁড়ির দিকে।

     হাঁফাতে হাঁফাতে জ্যান বললো, ‘ও যাচ্ছেটা কোথায়?’

     ‘গ্র্যাপ!’ জেমস যতটা পারলো নিচু একটা চিৎকার করলো। ও চায় না ওর আওয়াজে আকৃষ্ট হয়ে আবার কোন ভয়ানক জীব ওদের দিকে ছুটে আসুক। রাতের আলো কমে আসছে। চাঁদকে ঢেকে দিচ্ছে মেঘের দল। অরণ্যটা পরিণত হচ্ছে একটা ঝাপসা জমাট বাঁধা ছায়াতে। ‘গ্র্যাপ ফিরে আয়। কি করছিস তুই?’

     বেশ কিছুটা সময় ধরে ওরা গ্র্যাপের পেছন পেছন ছুটে বেড়ালো। ওদের পথে পড়লো নুড়ি পাথর বিছানো লেকের ধার থেকে শুরু করে বড় বড় গাছের গুঁড়ি, যা দৈত্যটা পেরিয়ে যাচ্ছিলো এক এক পদক্ষেপে। অবশেষে ওরা ওর কাছে পৌছালো লেকের ধরে এসে, যেখান থেকে লেকের মধ্যে কিছু ছোট ছোট গাছ সমেত একটা দ্বীপ দেখা যাচ্ছিলো। হাওয়ায় একটা ভিজে ভিজে জলজ গাছপাতার গন্ধ সঙ্গেই নানা রকমের পোকামাকড়ের গুনগুনানি। গ্র্যাপ একটা ঝুঁকে থাকা গাছের কাছে দাঁড়িয়ে তার ডাল থেকে ওয়ালনাট পেড়ে খাচ্ছিল। কড়মড় করে তার খোলা চিবানোর শব্দ শোনা যাচ্ছিলো। জেমসরা হাঁপাতে হাঁপাতে ওখানে গিয়ে দাঁড়ালো।

     ‘গ্র্যাপ!, জ্যান চিৎকার করে বললো, কোন ক্রমে হাঁপানো সামলে। ‘কি করছিস তুই?’

     গ্র্যাপ জ্যানের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘গ্র্যাপের খিদে পেয়েছে। গ্র্যাপ খাবারের গন্ধ পেল। গ্র্যাপ খাবে এবং অপেক্ষা করবে। ছোট মানুষ ফিরে আসবে।’

     ‘গ্র্যাপ আমরা হারিয়ে গিয়েছি! টাইটাস জানেনও না আমরা এখন কোথায়!’ জেমস বললো, অনেক কষ্টে নিজের রাগ সামলে। গ্র্যাপ জেমসের দিকে তাকালো, ওয়ালনাট চিবাতে চিবাতে, মুখের হাবভাব দেখে বোঝা যাচ্ছিলো কিছুই ওর বোধগম্য হচ্ছে না।

     ‘ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই। ওকে আরো কিছুটা খেয়ে নিতে দে তারপর ওই আমাদের কাঁধে চাপিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে যে পথ দিয়ে এসেছিল।’ জ্যান কথাগুলো বলে ধপ করে বসলো একটা পাথরের ওপর। তারপর দেখতে থাকলো শরীরের কোথায় কোথায় কেটে টেটে গেছে। জেমস রাগে দাঁত কিড়মিড় করলো। ও বুঝতেই পারছে দৈত্যটার সঙ্গে বকবক করে কোন লাভ নেই।

     ‘ঠিক আছে, তাই হোক। গ্র্যাপ তুই তোর কাজ সেরে নে তারপর আমাদের ফিরিয়ে দিয়ে আসিস যেখান থেকে এসেছিলি। বুঝতে পারলি?’

     গ্র্যাপ সম্মতির শব্দ গোঙাল। তারপর আবার একটা গাছে ডাল টেনে ধরল নিজের দিকে।

     জেমস অন্যমনস্ক ভাবে জলের দিকে তাকিয়ে থাকলো। দূর থেকে আসা স্রোতের ধাক্কা জলজ ঝোপঝাড়গুলোকে ঠেলে ঠেলে দিচ্ছে। এই জায়গায় লেকটাকে একটা ছোট্ট খালের মতো লাগছে। জলজ গাছপালায় ভরা একটা সরু জলের ধারা আর একটা গুল্মলতায় ভর্তি ছোট্ট দ্বীপের মধ্যবর্তী এলাকা। দ্বীপটা গাছপালা সহ একটা বন্য পরিবেশ নিয়ে অবস্থান করছে। দেখে মনে হচ্ছে ওটা যেন বছরের অনেকটা সময় জলের তলাতেই ছিল। ফুট কুড়ি দূরে, বেশ কিছু গাছ পড়ে আছে। জেমস অনুমান করে নিল ওগুলো কিছুদিন আগে হয়ে যাওয়া ঝড়ের ধাক্কা সামলাতে না পেরে জলস্থিত শিকড়সহ উপড়ে পড়েছে। এই ছায়াময় রাতে পুরো দৃশ্যটা খুব একটা দর্শনীয় নয় এবং গা ছম ছম করার পক্ষে যথেষ্ট।

     নাহ, এবার ফিরে যেতে হবে মনে মনে বললো জেমস। হয়তো হার্ডক্যাসল ফিরে এসে ওদের দেখতে না পেয়ে চিন্তা করছেন। এমন সময় চাঁদটা মেঘের আড়াল থেকে বার হয়ে এলো। রুপালী আলো ছড়িয়ে পড়লো পুরো অরন্য জুড়ে। জেমস থমকে দাঁড়ালো, একটা অতি মন্থর গতির শীতল কাঁপুনি ওর মাথা থেকে পা পর্যন্ত বয়ে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো সহসাই তাদের ডাক থামিয়ে দিয়েছে। চরম নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে চারদিকে। জেমসের মনে হলো ও যেন জমির সঙ্গে আটকে গেছে, জমে গেছে এক জায়গায়। শুধুমাত্র দেখতে পাচ্ছে। আর সেই দৃষ্টি দিয়ে ও পুরো অরন্যটাকে দেখতে থাকলো। ঝিঁঝিঁ পোকাদের নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়াটাই একমাত্র পরিবর্তন নয়। জোনাকি পোকাদের আলোর ঝিকিমিকিও থেমে গেছে। গাছেদের জমাট জটলা একেবারে থম মেরে অপেক্ষা করছে চাঁদের আলোর চাদর গায়ে চাপিয়ে। 

     ‘জেমস?’ জ্যানের উৎকন্ঠায় ভরা কণ্ঠস্বর শোনা গেল নিস্তব্ধতা চিরে। ‘এই যা হচ্ছে… মানে বলছি যে… এটা কি স্বাভাবিক?’ ও জেমসের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ‘আর ওই জায়গাটায় ওটা কি হচ্ছে?’

     জেমস জ্যানের দিকে তাকালো। ‘কোন জায়গা?’ জ্যানের চোখ লক্ষ্য করে জায়গাটা দেখেই ও ঢোঁক গিললো।

     যে দ্বীপটা জলের ওপর ভেসে ছিল সেটায় একটা বদল এসেছে। কোন বিশেষ একটা জায়গায় কিছু বদলেছে তা বলা যাবে না। কিন্তু কিছু আগেই যে জায়গাটাকে একটা গাছ ও ঝোপঝাড় ভর্তি স্থান বলে মনে হচ্ছিল এখন সেটাই রুপালী চাঁদের আলো পড়ে দেখতে লাগছে অনেক পুরানো দিনের কোন এক প্রাচীন স্থাপত্য। ভুল করার কোন উপায়ই নেই বেশ ভালই চেনা যাচ্ছে থামের ও দরজার আকৃতিদের। গারগয়েল বা বাট্রেসেসের মূর্তিগুলোকেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। দ্বীপটার ওপর নিখুঁতভাবে কি করে যেন ওদের রুপের পরিস্ফুটন ঘটছে। ঠিক যেন এক বিরাট মাপের জটিল দৃশ্যমায়ার খেলা দেখাচ্ছেন কেউ।

     জ্যান নিচু গলায় বললো, ‘ আমার ওই জায়গাটা দেখে মোটেই ভালো বোধ হচ্ছে না।’

     জেমস তাকালো, দ্বীপটার সঙ্গে ঠেকে ভাসতে থাকা কাটা গাছের গুঁড়িগুলো জ্যানের নির্দেশিত জায়গা। ওগুলোও আর আগের মতো দেখাচ্ছে না। জেমসের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে ওগুলোকে একটা বিশেষ পদ্ধতিতে সাজানো হয়েছে। দুটো গুঁড়ি এমন ভাবে পড়ে আছে যা একটা সেতুর রুপ নিয়েছে। মোটেই সাধারন সেতু নয় সেটা। সামনে ড্রাগনের মাথার নকসা করা আছে ওটায়। একটা বাদামী রঙের পাথর যা ওর শিকড়ের ওপর পড়ে আছে ওটাই ড্রাগনটার চোখ।দুটো আধ ঝোঁকা গাছের গুঁড়ি পরিণত হয়েছে ওপরের চোয়ালে। দেখে মনে হচ্ছে কেউ ওই সেতু পার হওয়ার চেষ্টা করলেই তাকে গিলে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।

     জেমস সন্তর্পণে সেতুটার দিকে এগিয়ে গেল।

     জ্যান ডেকে বললো, ‘কিরে তুই ওটার ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিস নাকি? আমার মনে হয় না সেটা খুব ভালো কাজ হবে।’

     ‘কাম অন,’ জেমস পেছন দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলো, ‘তুইই তো বলেছিলি একটা রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার করতে চাস।’

     ‘না মানে, আমি বলতে চাইছি যে আমি অ্যাডভেঞ্চার চাইছি তবে অল্প মাত্রায়। ইতিমধ্যেই এক অদ্ভুত জীবের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়ে গেছে, তুই কিছু মনে করিস বা না করিস আমার পক্ষে ওটা যথেষ্টই।’

     জেমস ঝোপঝাড় লতাপাতা কাঠের গুঁড়ি লাফিয়ে লাফিয়ে পেরিয়ে পৌঁছে গেল সেতুটার সামনে। কাছে গিয়ে দেখলো দূর থেকে যা মনে হচ্ছিল তার থেকেও নিখুত ভাবে ওটা বানানো। দুপাশে ধরার জন্য রেলিং ও আছে যা নির্মিত হয়েছে ভেঙে পড়া ডাল দিয়ে সুন্দর ভাবে। যে দুটো গুঁড়ি পাশাপাশি ভাসছে তার ওপর বিছানো আছে জলজ গুল্ম বেশ মোটা করে। যার ফলে হেঁটে যাওয়াটা বেশ আরামদায়ক হবে।

     ‘ওকে, তুই এখানেই দাঁড়িয়ে থাক,’ জেমস কথাটা বললো, জ্যানের ওপর বিন্দুমাত্র রাগ না করেই। এই রহস্য জেমসকে দারুন ভাবে আকর্ষণ করছে। ও পা দিলো সেতুর ওপর।

     ‘ধ্যাত তেরে কি,’ জ্যান চাপা আর্তনাদের মতো শব্দ করে জেমসকে অনুসরণ করলো।

     সেতুর অপরদিকটায়, ছোট গাছ আর বিভিন্ন লতাগুল্মের জটিল সংবদ্ধতা একটা লম্বা কারুকার্যময় গেটের নির্মাণ করেছে। ওটার পেছন দিকে একটা অন্ধকার ছায়াময় এলাকা। জেমস আর এগিয়ে যেতেই লক্ষ্য করলো গুল্মলতার ডালপালাগুলো নড়েচড়ে একটা চিনতে পারার মতো নক্সা বানাচ্ছে।

     জেমস ফিস ফিস করে নিজেকে বললো, ‘আমার মনে হচ্ছে এটা কোন একটা বানান তৈরি করছে। আরে তাইতো, ঠিক ধরেছি। এটা তো একটা কবিতা মনে হচ্ছে, বা ছড়া বা ওই রকমের কিছু একটা।’

     প্রথম শব্দটা পড়তে না পড়তেই পুরো লেখাটা তৈরী হয়ে ওদের চোখের সামনে এসে গেল… অথবা ওদের চোখ লেখাটা বোঝার মতো ক্ষমতা প্রাপ্ত হল। আর না এগিয়ে জেমস ওটা চিৎকার করে পড়তে শুরু করলো…

 

‘যখন ঝকমকে শশির আলোয় জগত করবে স্নান/ আমি খুজে পাবো লুক্কায়িত স্থান;

যখন রাত্রি হবেনির্দিষ্ট নিঃঝুম/ভাঙ্গবে কি তার সেই ঘুম।

ফিরে আসবে সেই আকাঙ্খার ভোর/ না হারিয়ে একটিও পবিত্র চিহ্নডোর;          

জীবনকে ফেলে এসে, এক নতুন জীবন/ আসছে হল অফ এল্ডারস ক্রসিং এর ক্ষন।’

 

     যে কোন কারনেই হোক কথাগুলো জেমসকে ভেতরে ভেতরে কাঁপিয়ে দিলো।

     বার দুয়েক পড়ে জ্যান জানতে চাইলো, ‘এটা কি বোঝাতে চাইছে?’

     জেমস কাঁধ উচিয়ে বললো, শশী তো শুদ্ধ ভাষায় চাঁদ। আমি ওটা জানি। আমার মনে হচ্ছে ওর প্রথম দুটো লাইন বলছে তুমি বিশেষ জায়গাটাকে তখনই খুঁজে পাবে যখন চাঁদ উঠবে। আর এটা এখন প্রমানিত। কারণ অন্ধকারে যখন আমি এই দ্বীপটাকে দেখেছিলাম ওটাকে নেহাতই একটা ছন্নছাড়া জায়গা ছাড়া কিছুই মনে হয়নি। তার মানে এই সেই লুক্কায়িত দ্বীপ, বা যাই হোক।’

     জ্যান লেখাটা দেখে বললো, ‘ওই অংশটার মানে কি? “ফিরে আসবে সেই আকাঙ্খার ভোর”। মনে হচ্ছে সূর্য ওঠার আগেই আমাদের ফিরে যেতে হবে, তাই না? এটা একদম ঠিক কথা বলেছে। আমাদের পালাতে হবে’

     জ্যানের কথায় কান না দিয়ে, জেমস গেটটাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ঝাঁকানোর চেষ্টা করলো। কাঠে কিছু ক্যাঁচ কোঁচ শব্দ হলেও বিশেষ কিছু ঘটলো না। যদিও এই ঘটনায় দ্বীপটায় একটা হালচাল শুরু হলো। ওদের পায়ের তলা থেকে একটা জোরালো ঘষঘষে আওয়াজ শোনা গেল। জেমস নিচের দিকে তাকিয়ে এক লাফে পিছিয়ে গেল। সেতুটার তলা দিয়ে কাঁটাওলা ডালপালা ওপর দিকে উঠতে শুরু করেছে। আগুনে খবরের কাগজ পোড়ার মত চড়বড় শব্দ করে ডালপালাগুলো গেটটায় জড়াতে শুরু করলো। কাঁটাগুলোর রঙ বেগুনী, মনে হচ্ছে ওগুলো বিষাক্ত। জেমসের চোখের সামনেই ওগুলো বড় হতে থাকলো। একসময় পুরো গেটটা তার লেখাগুলো সমেত ঢেকে গেল। থেমে গেল সব শব্দ।

     ‘তাহলে এখানেই এর সমাপ্তি,’ জ্যান অদ্ভুত রকমের জোরালো গলায় বললো। জেমসের পেছন থেকে আস্তে আস্তে পিছিয়ে যেতে যেতে।

     ‘আমি আর একটা ব্যাপার করে দেখতে চাই,’ কথাটা বলে জেমস পোষাকের ভেতর থেকে নিজের জাদুদন্ডটা বার করলো। বিশেষ কিছু না ভেবে গেটটার দিকে ওটা তাক করে বললো, ‘আলহমোরা।’

     একটা সোনালী আলোর ঝলক দেখা গেল… ফলাফলটাও হল বেশ জোরালো এবং চট জলদি। গেটটার ওপর মন্ত্রের প্রভাব পড়লো, বিচ্ছুরিত হল একঝাঁক আলোকবিন্দু, গোটা দ্বীপটা কেঁপে উঠলো উত্তেজনায় ভয়ানক ভাবে। মনে হল একই সঙ্গে হঠাৎই যেন শত সহস্র লোক নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করলো। তারপরই শোনা গেল এক কণ্ঠস্বর, এক অমানবিক কণ্ঠ, মৌমাছির গুঞ্জনের মত করে বললো।

     ‘চলে যাও এখান থেকে …’

     জেমস শব্দের ধাক্কায় ছিটকে পিছিয়ে আস্তে গিয়ে ধাক্কা খেল জ্যানের সঙ্গে এবং দুজনেই পড়ে গেল সেতুটার ওপর। সেতুটাও কাঁপছিল থরথরিয়ে। জেমস দেখতে পেল গেটটা ওদের ওপর ঝুঁকে পড়ছে। আধ ভাঙা যে ডালটা ড্রাগনের ওপরের চোয়ালের আকৃতি নিয়েছিল সেটা এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। ওর ভেতরের ভাঙা ডালপালাগুলোকে দেখাচ্ছে একেবারে আসল দাঁতের মতন।

     ‘চলে যাও এখান থেকে … ‘ দ্বীপটা থেকে আবার ভেসে এলো কথাটা। শব্দটা শুনে মনে হচ্ছে হাজার হাজার ফিসফিসে কন্ঠস্বর একসঙ্গে কথাগুলো উচ্চারণ করছে।

     কাঁপতে কাঁপতে সেতুর জোড়া কাঠ দুদিকের জমি থেকে সরে সরে যাচ্ছে। চোয়ালের ফাঁক কাছে এসে গেছে ওদের দুজনকে গিলে নেওয়ার প্রচেষ্টায়। ওরা হাঁচড়পাঁচড় করে পিছিয়ে গেল, একে ওপরের সঙ্গে জড়ামড়ি করে এবং গিয়ে পড়লো ঘাসে ভরা জমিতে। সঙ্গে সঙ্গেই সেতুটার সঙ্গে জমির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। ড্রাগনের চোয়ালটা হিংস্র ভাবে উঠছিল আর নামছিল। ভাঙা ডালপালা গাছের ছাল ছিটকে ছিটকে এসে পড়ছিল জেমস আর জ্যানের গায়ে মুখে। ওরা পড়ে থাকা পচা পাতা আর পাইন ফলের কাঁটার খোঁচা খেয়ে চেষ্টা করছিল উঠে দাঁড়ানোর।

     ওদের শরীরের নিচে জমি কাঁপছিল। পৃথিবীর বুক চিরে শেকড় বাকড় সব উঠে আসছিল। জেমস বুঝতে পারছিল জমি আস্তে আস্তে ওর নিচ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ওর পা ঢুকে গেল একটা হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া গর্তে। কোনওমতে পা বার করে আনতেই ওটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সুঁচালো একটা গাজরের মতো শেকড়। জেমস চেষ্টা করছিল জমিটাকে খুঁজে পাওয়ার, কিন্তু ওটা ক্রমশই ডুবে যাচ্ছিল এবং সঙ্গে ওকেও যেন টেনে নিচ্ছিলো জলের দিকে। লেকের দিকটা হঠাৎ করেই নিচু হয়ে একটা গর্তের মতো আকৃতি নিয়েছে। অসীম সে গর্ত লেকের সব জল টেনে নিচ্ছিল ভেতরে। ওদের পাগুলো এগিয়ে যাচ্ছিলো সেই গর্তের দিকে, যেন কেউ চাইছে ওদের ভেতরে ঢুকিয়ে নিতে। জ্যান হাঁপাচ্ছিল। ওকে আস্তে আস্তে জলস্রোত টেনে নিচ্ছে নিজের গহ্বরে। জেমস কিছু একটা ধরার জন্য হাতড়াচ্ছিল এপাশে ওপাশে, কিন্তু হাতের নাগালে শক্ত কিছুই ছিল না, সব কিছুই হড়হড়ে কর্দমাক্ত।

     সহসাই ওখানে আবির্ভাব হল গ্র্যাপের। হাঁটু গেড়ে বসে, এক হাতে কাছের একটা গাছের ডাল ধরে অন্য হাত দিয়ে প্রথমে তুলনামূলকভাবে কাছে থাকা জ্যানকে তুলে নিলো মাটি থেকে। বসিয়ে নিল নিজের কাঁধে। জ্যান দুহাতে চেপে ধরলো গ্র্যাপের জামা না হলে পড়েই যেত। কারন গ্র্যাপ এবার অনেকটাই ঝুঁকেছে জলের দিকে। তা না হলে জেমসকে তোলা যাবে না। জেমসের শরীরের বেশী অংশটাই ডুবে গেছে জলে। একটা লোমযুক্ত শিকড় এই মুহূর্তে জেমসের গোড়ালি আঁকড়ে ধরেছে, টানছে জলের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এদিকে গ্র্যাপও ধরেছে ওকে, জেমসের মনে হচ্ছে এই টানাপোড়েনে ওর দেহ ছিঁড়ে দু টুকরো হয়ে যাবে। শিকড়ের টানে ওর জুতো খুলে গেল পা থেকে। জেমস দেখতে পেল শিকড়টা ভীষণ ক্রোধে জুতোটাকে পাকড়ে ধরে চলে গেল জলের তলায়।

     গ্র্যাপ এবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু চারদিক থেকে অসংখ্য শিকড় ওকে ঘিরে ধরেছে। বড় মোটা গাছের শাখাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে পা দুটোতে। সবুজ গুল্মগুলো বাড়ছে বিদ্যুতের গতিতে। গ্র্যাপের প্যান্টে জালের মত ছেয়ে যাচ্ছে ওদের সুতোর মতো শিকড়ের গুচ্ছ। গ্র্যাপ গর্জন করে চিৎকার করে টেনে হিঁচড়ে শিকড় ডালপালা ছেঁড়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু ওই শয়তানি শক্তির সম্মিলিত জোর অনেক অনেক বেশী। গ্র্যাপকে পুনরায় হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করলো সেই অজানা শক্তি। এবার শিকড় জড়িয়ে গেল ওর কোমরে, পিঠ বেয়ে উঠতে থাকলো কাঁধের দিকে। জ্যান এবং জেমসের গায়েও আছড়ে পড়তে থাকলো শেকড়ের ঝাপ্টা। ওরা কাঁধের ওপর থাকুক এটাও যেন সহ্য করতে পারছে না অজ্ঞেয় বিভীষিকা। গ্র্যাপ সজোরে আর্তনাদ করে উঠলো। একটা সবুজলতা ওর গলায় পাক দেওয়া শুরু করেছে। টেনে আরো নিচুতে জলের মধ্যে নামিয়ে নিচ্ছে মাথাটাকে। লক্ষ্য লেকে যে জলের গর্ত সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে ওকে টেনে নিয়ে যাওয়া।

     গ্র্যাপের কাঁধ থেকে পিছলে যাচ্ছে জেমস, হঠাৎ একটা উল্টো টান অনুভব করলো ও। অনেকগুলো শক্তপোক্ত লতা যেন ওদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে জমির দিকে। চারদিকে একটা অদ্ভুত রঙের আলো বাড়তে শুরু করেছে। সবজেটে সোনালী তার আভা। সঙ্গে একটা নিচু মাত্রার গুনগুন শব্দ হচ্ছে। শয়তানি শাখাপ্রশাখা শিকড় সব গুটিয়ে যাচ্ছে। চাপ কমাচ্ছে ওরা কিন্তু প্রবল অনিচ্ছা শিকার ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে। আলোর ঢেউ আস্তে থাকল একের পর এক।প্রতি ঢেউ এর ধাক্কায় ছোট ছোট শিকড় ডালপালাগুলো মরার মতো হয়ে গেল। বড়গুলো বদখৎ ঘরঘরে শব্দ করে ফিরে যাওয়া শুরু করলো জমির অভ্যন্তরে।

     গ্র্যাপ, জেমস আর জ্যান প্রায় হামাগুড়ি দিয়েই জল থেকে শক্ত মাটিতে উঠে এলো। ওদের আর শক্তি অবশিষ্ট নেই। মরা পচা পাতা  ভাঙা ডালপালার মধ্যে শুয়েওরা হাঁফাচ্ছে, কাঁপছে।

     জেমস অনেক কষ্টে নিজেকে হাঁটু গেড়ে বসার অবস্থায় খাড়া করলো। ওর কাছেই একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। যে সবজেটে আলোর ধাক্কায় বিপদ দূর হয়েছে সেই রকম হাল্কা আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে অবয়বটার গা থেকে। জেমস স্বচ্ছ অবয়বটার ভেতর দিয়ে পেছনদিকটাকেও দেখতে পাচ্ছিলো। মাঝে মাঝেই যা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিলো। এ যেন বৃষ্টি ধারার মধ্যে দিয়ে কিছু দেখা। অবয়বটিকে দেখতে একটি মহিলার মতো, বেশ লম্বা এবং রোগা। পড়ে আছে একটা কালছে সবুজ রঙের গাউন। যেটা পেছন দিকে অনেকটা জমি জুড়ে লুটিয়ে পড়ে আছে। সবজেটে সাদা চুল ছড়িয়ে আছে মাথার চারপাশে গোল হয়ে জ্যোতির মতো। অসামান্য সুন্দরী কিন্তু মুখাবয়ব ভাবলেশহীন।

     ‘হে পৃথ্বীর সন্তানেরা, জেমস পটার, জ্যান ওয়াকার এবং গ্র্যাপ, তোমরা এখানে বিপদের মধ্যে আছো। এ অরণ্যছেড়ে চলে যাও। কোন মানবসন্তান এই স্থানে নিরাপদ নয় এই মুহূর্তে।’

     জেমস কোন ক্রমে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ‘কে আপনি? ওখানে কি ছিল?’

     ‘আমি একজন ড্রায়াড, অরণ্যঅশরীরী। আমি ওই দ্বীপের কণ্ঠস্বরকে কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ রাখতে পেরেছি। কিন্তু বেশি সময় সেটা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যত দিন যাচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে ওটার শক্তি বেড়েই চলেছে।‘

     ‘অরণ্যের অশরীরী?’ জ্যান প্রশ্ন করলো, গ্র্যাপ ওকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করার পর। ‘অরণ্যের নিজস্ব ভুত আছে?’

     ‘আমি একজন ড্রায়াড। একটি গাছ ভুত, বা একটি গাছের প্রেতাত্মা। এই অরণ্যের সব গাছের প্রেতাত্মা আছে, কিন্তু তারা ঘুমিয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে, এই পৃথ্বীর তলায়। প্রায় মুছেই গেছে অস্তিত্ব। এখনো পর্যন্ত। নাইয়াডস আর ড্রায়াডস জেগে উঠেছে। যদিও আমরা জানি না কেন। কিছু মানুষ ছিল যারা যারা কোন একসময় গাছেদের সঙ্গে সংযোগস্থাপন করতে পেরেছিল। তারা আজ আর নেই। বিস্মৃত হয়েছে তারা। আমাদের সময় চলে গেছে কবেই। তবুও আবার আমাদের আহ্বান করা হয়েছে।’

     জেমস জানতে চাইলো, ‘ কে আহ্বান করেছে আপনাদের?’

     ‘আমরা সেটা জানতে পারিনি, যদিও অনেক চেষ্টা করেছি। আমাদের মধ্যে অরাজকতা চলছে। অনেক গাছই কেবলমাত্র মানুষের করাত চালানোটাই মনে রাখছে। তারা যে গাছও লাগাচ্ছে সেটা ভুলে যাচ্ছে। যারা অনেক বয়স্ক, তারাখুব রেগে গেছে। তাদের একটাই ইচ্ছে মানব জগতটার ক্ষতি করা। তারা অন্য পথে হাঁটছে। তোমরা সেই রাগের কিছু পরিচয় আজ পেয়েছ, যদিও এই রাগ আসলে তাদের মধ্যে নেই।’

     ‘অন্য পথে হাঁটছে বলতে আপনি কি বলতে কি চাইছেন?’ জ্যান জানতে চাইলো, একটু এগিয়ে গিয়ে ড্রায়াডের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে। ‘এটাই কি সেই জায়গা? সেই দ্বীপ? সেই … দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং?’

     ‘মানুষের জীবন কাল এই পৃথ্বীতে খুবই কম। কিন্তু আমরা গাছেরা সময়ের চক্রাবর্তন দেখে চলেছি। তারারা তোমাদের কাছে স্থির বস্তু, কিন্তু আমরা দেখছি এবং অধ্যয়ন করে চলেছি স্বর্গকে একটা নাচের তালে।’ এই মুহূর্তে ড্রায়াডের কণ্ঠস্বর অতি নরম স্বপ্ন মাখা। ‘ আমরা জেগে ওঠার পর থেকে অবশ্য তারাদের নাচ অনেকটাই স্তিমিত দেখছি। এ জগতের মানুষের জন্য শত সহস্র কালো নিয়তি দৃশ্যমান হচ্ছে, সবাই ছুটে আসছে আগামী দিনগুলোর জন্য। কেবলমাত্র একটি নিয়তি নিয়ে আসছে সম্ভাব্য ভালো সংবাদ। বাকিদের হাতে শুধুই ক্ষতি আর রক্তস্রোত। অপরিসীম দুঃখ অন্ধকারময় সময়, যুদ্ধ আর লোভে পরিপূর্ণ, শক্তিশালী নৃশংস শাসকদল, আতঙ্কের ছায়াস্রোত। অনেক কিছুই নির্ধারণ হয়ে যাবে এই চক্রপূর্ণ হতে হতে। এই মুহূর্তে, আমরা গাছেরা শুধু দেখতেই পারি। তবু যারা এখনো আমাদের পুরাকালের গাছ ও মানুষের সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল,তাদেরকে আমরা সাহায্য করবো যতটা পারবো, সময় এলেই।’

     জেমস ড্রায়াডের কথায় মোহিত হয়ে পড়েছিল, সঙ্গে সঙ্গেই মনের অন্তরস্থলে অনুভব করছিল একটা হতাশা ও কিছু করতে না পারার কষ্ট মিশে আছে মহিলাটির কন্ঠস্বরে। ‘আপনার কথা অনুসারে একটা সুযোগ আছে ওই যুদ্ধকে এড়িয়ে যাওয়ার। সেক্ষেত্রে আমরা কি করতে পারি? কি করে সেই ভালো নিয়তিকেই তার কাজটা করতে দিতে পারি?’

     ড্রায়াডের মুখটা এবার অনেক কোমল হয়ে এলো। বড় বড় জ্বলজ্বলে চোখ দুটোয় দুঃখ মাখানো হাসি ফুটে উঠলো। ‘সেরকম কোন একটি বিশেষ ভালো কাজের পথ খুঁজে নেওয়ার সম্ভাবনা নেই। যা তুমি বা তোমরা করে ফেলেছ শান্তি বজায় রাখার জন্য সেটাই তার নিজের কাজ করবে। হয়তো কোন একটা বিশেষ কাজ যা করা হয়েছে ভালোর জন্য সেটাই যুদ্ধের সময় ফলপ্রদ হয়ে দাঁড়াবে। তোমরা সেটাই করো যেটা তোমরা করতে জানো, কিন্তু সেটা করো একেবারে দ্বিধাহীনচিত্তে।’

     জ্যান বেশ সাহসের সঙ্গেই একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে বললো, ‘দরকারি কথাই বটে, বুঝতেই পারছি।’

     ‘জেমস পটার, তুমি এখনো জানোই না কি সাঙ্ঘাতিক বিপদের জাল নিয়তিরা বুনছে,’ ড্রায়াড কথা বলেই এগিয়ে এলেন জেমসের দিকে যাতে তার বিচ্ছুরিত আলো পড়ে ওর মুখে। ‘ তোমার বাবার যে শত্রু ছিল এবং সেই শত্রুকে যারা ভালোবাসতো তারা কেউ আর বেঁচে নেই। কিন্তু তার রক্ত বয়ে চলেছে এক অন্য শরীরের হৃদপিণ্ডে। তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু কিন্তু এখনো জীবিত।’

     জেমসের হাঁটু কাঁপছিল। টলে উঠলো গোটা শরীর। ও হাত বাড়িয়ে দিল কাছের একটা গাছের গুঁড়ির দিকে টাল সামলানোর জন্য। ফিসফিসিয়ে বললো, ‘ভল – ভল ডে মর ট?’

     ড্রায়াড মাথা ঝোঁকালো, বোঝাই গেল নামটা উচ্চারন করতে চায় না। ‘ওর সাজানো পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছিল তোমার বাবার জন্য। কিন্তু সে ছিল এক ধ্বংসহীন পরিকল্পনাকার। বানিয়ে ফেলেছিল দ্বিতীয় আরো একটা ছক। একজন উত্তরাধিকারী, রক্তের সম্পর্কজাত। সেই রক্ত সম্পর্ক আজ নেচে বেড়াচ্ছে, এই মুহূর্তে, এখান থেকে এক মাইলের মধ্যে।’

     জেমসের ঠোঁট কাঁপছিল থরথরিয়ে। ‘কে সে?’ প্রশ্নটা করলো শোনা যাবেনা প্রায় এরকম জোরে। ‘ বলুন কে সে?’

     কিন্তু ড্রায়াড মাথা নাড়াতে শুরু করে দিয়েছেন, বিষাদ মাখা মুখে। ‘আমাদের আটকে রাখা হয়েছে কিছু জানার থেকে। বাইরের থেকে জানা নয়, ভেতর থেকে জানা। যে সমস্ত গাছেরা অন্যপথে হেঁটে গেছে আমাদের বিরোধিতা করে, তারাই আমাদের মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে দিয়ে গেছে, প্রায় সবাইই সেই প্রভাবে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমরা কেবলমাত্র অনুভব করতে পারি সেই হৃদপিণ্ডের নাচন, বুঝতে পারি ওটা কোনখানে আছে, তার বেশি জানতে পারি না, তুমি সাবধানে থেকো জেমস পটার। তোমার বাবার যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। এবার শুরু তোমার যুদ্ধ।’

     ড্রায়াড মিলিয়ে যাচ্ছিলো। অবয়বের চোখ বুজে আসছিল। মনে হচ্ছে সে যেন মিশে যাচ্ছে কোন এক নেতির জগতে। আবার ঘুমিয়ে পড়ছে ড্রায়াড।

     দ্বীপের দিক থেকে পুনরায় ভেসে এলো কর্কশ গর্জন।

     জ্যান তার চিরাচরিত কোন কিছুকে পাত্তা না দেওয়া কণ্ঠস্বরে বললো, ‘তাহলে, এবার মনে হয় আমাদের দৈত্য বন্ধুর কাঁধে চড়ে এ জায়গা থেকে সটকে পড়াই ভালো। কে জানে কে আবার আমাদের পটকে দেওয়ার ছক কষছে?’

     যেখান থেকে ওরা এসেছিল সেখানে ফিরে যাওয়ার অর্ধেক পথ যেতে না যেতেই ওদের দেখা হয়ে গেল টাইটাস হার্ডক্যাসলের সঙ্গে। ওনার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল উনি বজ্রাঘাতগ্রস্থ হয়েছেন। যদিও উনিই জানতে চাইলেন, ‘তোমরা ঠিকঠাক আছো তো?’

     জ্যান গ্র্যাপের কাঁধ থেকে উত্তর দিল, ‘যথেষ্টই সুরক্ষিত বলা যায়। যদিও বলা দরকার আমরা এক পাগল করে দেওয়ার মতই সময় কাটালাম।’

     গ্র্যাপ নিচু হলো হার্ডক্যাসলকে কাঁধে উঠতে দেওয়ার জন্য। ‘তার মানে ওটা ফিরে এসেছিল, তাই না?’ হার্ড ক্যাসল ঘোঁতঘোঁতিয়ে বললেন।

     জ্যান একটা হাত বাড়িয়ে হার্ডক্যাসলকে উঠতে সাহায্য করতে গিয়ে নিজেই পড়ে যাচ্ছিল আর একটু হলে। ঢোঁক গিলে জানতে চাইলো, ‘আপনি কিসের পেছনে ধাওয়া করেছিলেন সেটা বুঝতে পারলেন কি?’

     ‘মাকড়সা। প্রাচীন অ্যারাগগ এর নাতিপুতি হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। শেষ এক দুই দশকে ওগুলো নির্বোধে পরিণত হয়েছে। কিন্তু যেটাকে আমরা দেখেছিলাম সেটা আসলে একটা খেলনা নিয়ে পালাচ্ছিল।’ হার্ডক্যাসল হাত উঁচু করলেন, জেমস দেখতে পেল ওনার হাতে ধরা আছে সেই ক্যামেরাটা যেটা দিয়ে অনুপ্রবেশকারী কুইডিচ মাঠে ছবি তুলছিল। ‘এটা ভালই কাজ করছিল যখন ওটা আমি দেখতে পাই ওই ফেরেব্বাজটার সঙ্গে, ছোট্ট স্ক্রীনটায় আলোও জ্বলছিল। তারপরই ওটা ভেঙে যায়, মানে, ইয়ে যখন আমি ওকে ওই জন্তুটাকে মারতে যাই, তখন। হয়তো ও ভেবেছিল এটা একটা ভালো খাবার।’

     গ্র্যাপ এগিয়ে চলা শুরু করলো ফেরার রাস্তায়। জেমস রীতিমতো শিহরণ সহকারে চমকে উঠলো। ‘আপনি নিশ্চিত … ওটা ঐ লোকটাকে খেয়ে ফেলেছে?’

     হার্ডক্যাসল চোয়াল শক্ত করে বললেন, ‘জেমস এটাই জীবনচক্র। তবে জেনে রাখো, মাকড়শারা মানুষকে খায় না। ওরা কেবলমাত্র শরীরের সমস্ত রস চুষে নেয়। একটু অন্য ভাবে সমাধানটা হলো যদিও তবু বলতেই পারি ওই লোকটার দিক থেকে আর কোন ঝামেলা হওয়ার চান্স থাকলো না।’

     জেমস কিছু বললো না যদিও তবু ভালো করেই বুঝতে পারছিল আসল সমস্যা তো সবে শুরু হলো।

বুধবার সকালে গ্রেট হলে ব্রেকফাস্ট করার জন্য যখন জেমস ঢুকলো শরীর বেশ ক্লান্ত। সকালটা কেমন যেন ঝিমোচ্ছে। হলের ওপর দিকটায় ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘে ভরা আকাশ। জানলা দিয়ে একটু একটু কুয়াশা এখনো দেখা যাচ্ছে। র‍্যালফ আর জ্যান বসেছে স্লিদারিন টেবিলে। জ্যানের হাতে ওর প্রিয় কফির মগ আর র‍্যালফ ব্যস্ত মাখন লাগানোর ছুরি দিয়ে কমলালেবু কাটার কাজে। ওরা কেউ কথা বলছে না। জ্যান সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার পাত্র নয় জেমসের মতই। জ্যান বা র‍্যালফ কেউই এদিকে তাকালো না দেখে জেমস একটু স্বস্তি পেল। র‍্যালফের ওপর থেকে রাগটা এখনো কমেনি। আসলে জেমস মনে মনে ভালোই দুঃখ পেয়েছে র‍্যালফের আচরণে। র‍্যালফের সঙ্গে গিয়ে বসেছে বলে জ্যানের ওপর খানিকটা রাগ হচ্ছে, কিন্তু শরীর এতটাই ক্লান্ত এবং সকালের আবহাওয়াটাও তেমন নয় যে কিছু করার ইচ্ছে জাগে।

     জেমস গ্রিফিন্ডোর টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ওপরে মঞ্চটার দিকে তাকালো। না ওর ড্যাড বা টাইটাস হার্ডক্যাসল কারোরই চিহ্ন নেই ওখানে। জেমস ধরেই নিলো কাল রাতে অনেক দেরী হলেও ওরা নিজেরা ঠিক সকাল সকাল উঠে ব্রেকফাস্ট সেরে নিজেদের দরকারি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। যে দরকারি কাজের মধ্যে আছে বিশেষ আলোচনা চক্র এবং অনেক গুপ্ত আলাপ আলোচনা। আর এদিকে ওকে সেই একঘেয়ে ক্লাস আর হোমওয়ার্কের বিরক্তিকর জগতে ঢুকতে হবে। চারদিকে গ্রিফিন্ডোরের সদস্যরা হাসছে খাচ্ছে ঠাট্টা ইয়ার্কি করছে কিন্তু জেমস নিরানন্দ ভাবে খেতে হয় তাই খাওয়া শুরু করলো।

     গতরাতে লেকের ওখান থেকে ফিরে আসার পর আরো প্রায় দুঘণ্টা ড্যাড, টাইটাস হার্ডক্যাসল এবং হেডমিস্ট্রেসের সঙ্গে ছিল। দুর্গের কাছে পৌঁছেই হার্ড ক্যাসল জাদুদন্ডের আলোকসঙ্কেত প্রেরন করেছিলেন হ্যারি, টেড, প্রেচকা এবং হ্যাগ্রিডকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে। ওরা একত্র হয়েছিল হ্যা্গ্রিড এর কেবিনে। গ্র্যাপ আর প্রেচকাকে সাহায্য করার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদসহ এক ব্যারেল বাটার বিয়ার দিয়ে বিদায় জানালেন হেড মিস্ট্রেস। এরপর হ্যাগ্রিডের খরখরে বিরাট কাঠের টেবিলে ওরই বানানো চা – যা রহস্যজনক রকম ধোঁয়ায় ভর্তি ছিল, রঙ বাদামী এবং স্বাদ ওষুধের মত- এবং কিছু বিষ্কুট – সাঙ্ঘাতিক শক্ত বলে ওরা খায়নি- খেতে খেতে আলোচনা শুরু হয়।

     হার্ডক্যাসল প্রথমে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। কিভাবে উনি মাকড়শাটাকে দেখতে পেয়ে ওর পিছু নেন এবং জ্যান ও জেমসকে ছেড়ে যান গ্র্যাপের জিম্মায়। হ্যারি একটু নড়েচড়ে বসলেও কোন মন্তব্য করা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। কারন উনি নিজেই জেমসকে এই অভিযানে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন, কিছুটা অনিচ্ছাসত্বেও জ্যানকেও। ম্যাকগনাগল বেশ খানিকক্ষণ হ্যারির দিকে তাকিয়ে ছিলেন বিস্ময়ের সঙ্গে জ্যান যখন কেবিনে ঢোকে। উনি এবার হার্ডক্যাসলের কাছে জানতে চাইলেন মাকড়সাটাকে কি ভাবে মারলেন উনি?

     হার্ডক্যাসলের বোতাম সদৃশ চোখ দুটো চকচক করে উঠলো, উনি বললেন, ‘যে মাকড়সাকে পায়ের তলায় চিপে মারা যায় না তাকে মারার সহজ উপায় হল ওটার পাগুলোকে ছেঁটে দেওয়া। প্রথম পাটা কাটাই সবচেয়ে কঠিন। তারপরেরগুলো সহজেই হয়ে যায়।’

     হ্যাগ্রিড মুখের ওপর হাত চাপা দিয়ে বললো, ‘বেচারা বুড়ো আরাগগ। ও যদি দেখতে পেতো ওর উত্তরপুরুষ বুনোজাতিতে পরিণত হয়েছে, ও নিজেই ওটাকে খুন করতো। ও প্রাণীটা সেটাই করেছে যা মাকড়সারা করে। এর জন্য ওকে দোষ দিতে পারা যায় না।’

     ‘মাকড়শাটার কাছে অনুপ্রবেশকারীর ক্যামেরাটা ছিল,’ হ্যারি টেবিলের ওপর রাখা ভাঙ্গাচোরা জিনিষগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন। লেন্সটা ফেটে গেছে আর স্ক্রিনটা তুবড়ে গেছে। ‘এটা বোঝা যাচ্ছে লোকটা লেকের ধারের অরণ্য দিয়েই পালিয়েছিল।’

     ‘ বিচ্ছিরি একটা পথ কোথাও যাওয়ার পক্ষে, তা সে যেই যাক না কেন,’ ম্যাকগনাগল বললেন।

     হ্যারির মুখে কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। ‘আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না ওই মানুষটাকে মাকড়শাতে খেয়েছে।’

     হার্ডক্যাসল তড়বড় করে বললেন, ‘তাহলে তো এটা বলতে হয় ওই বদখৎ জীবটা ক্যামেরাটা চেয়েছিল বাড়ি নিয়ে গিয়ে ওর ছেলে মেয়েদের মুভি বানাবে বলে। কি তাইতো নাকি? মাকড়সারা কোন অনুনয় বিনয় করার পক্ষপাতী নয়। ওরা শুধু জানে খেতে।’

     হ্যারি সম্মতি সুচক ঘাড় নত করে বললেন, ‘ তুমি সম্ভবত ঠিকই বলছ টাইটাস। তা সত্বেও একটা সুযোগ কিন্তু থেকেই যাচ্ছে অনুপ্রবেশকারীর কাছে থেকে ক্যামেরাটা পড়ে যায় এবং মাকড়শাটা সেটা পেয়ে যায়। মিনারভা আপাতত সুরক্ষা একটু বাড়ালে ক্ষতি কিছু হবে বলে মনে হয় না। আমরা তো জানতেই পারলাম না লোকটা কে এবং কি ভাবে এখানে ঢুকতে পারলো। যতক্ষণ না এই প্রশ্ন দুটোর উত্তর পাচ্ছি সুরক্ষা লঙ্ঘনের পুনরায় একটা সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।’

     ‘আমি আরো বেশী করে জানতে আগ্রহী কিভাবে এই ক্যামেরা মাঠে সবার সামনে ব্যাবহার করার সাহস পেল,’ হেডমিস্ট্রেস ভাঙা ক্যামেরাটার দিকে চেয়ে বললেন। ‘এটা সবাই জানে যে মাগলদের কোন জিনিষ স্কুলের ম্যাজিক্যাল আওতার মধ্যে কাজ করবে না।’

     হার্ডক্যাসল উত্তর দিলেন,’ হ্যাঁ এটা সবাই জানে, ম্যাডাম হেডমিস্ট্রেস। যদিও খুব কম লোকে সেটা বোঝে। মাগলরা ক্রমান্বয়ে কিছু না কিছু বানিয়েই চলেছে। ফলে যেটা একসময় সত্যি ছিল এখন হয়তো নেই। আর এটাও আমরা জানি সুরক্ষার যে মন্ত্র দিয়ে এখানটা ঘেরা হয়েছে ভলডেমরটের সঙ্গে যুদ্ধের সময় থেকে সেটা পুরোপুরি নিখুঁত নয়। ভগবান ওর আত্মাকে শান্তি দিন।’

     জেমসের র‍্যালফের গেমডেকটার কথা মনে এলেও উল্লেখ না করার সিদ্ধান্ত নিল। এই ভাঙা ভিডিও ক্যামেরাটাই প্রমান দিচ্ছে কিছু আধুনিক মাগলদের বানানো যন্ত্র আছে যা এই স্কুল এলাকায় কাজ করতে সক্ষম।

     এবার সবার নজর ঘুরলো জেমস আর জ্যানের দিকে। জেমস খুলে বললো কিভাবে গ্র্যাপ খাবার খোঁজার জন্য দূরে লেকের ধারে জলাভুমিতে চলে গিয়েছিল। ওরাও ওর খোঁজে পিছু ধাওয়া করে। এবার বলা শুরু করলো জ্যান। বর্ণনা দিল রহস্যময় দ্বীপ আর সেতুর। জেমস বেশ খুশী হলো যখন জ্যান বললো গেটটা খোলার জন্য জেমস কিরকম জাদুর সাহায্য নিয়েছিল। কাল বিপদের মুখে পড়ে নিজের কাজটা বেশ বোকাবোকা ধরনেরই হয়েছিল বলে ওর মনে হয়েছিল। আর এখন মনে হচ্ছে ওটাই স্বাভাবিক ছিল। এরপর ওরা দুজনে ভাগ ভাগ করে বলে গেল ড্রাগনমুখী সেতুর কথা যা ওদের গিলে নিতে চাইছিলো। আক্রমণকারী লতাগুল্মদের অভিপ্রায়, যারা চেয়েছিল ওদেরকে জলের মধ্যে নিয়ে যেতে। সবশেষে জেমস জানালো অরণ্যের অশরীরীর কথা।

     ‘নায়াডস এবং ড্রায়াডস?’ হ্যাগ্রিড বিষ্ময়ের সঙ্গে জানতে চাইলো। জেমস ও জ্যান একসঙ্গে হ্যাগ্রিডের দিকে তাকালো। ‘ওরা কি সত্যি আছে নাকি? ওসব তো গল্প রুপকথা। তোমাদের মতামত কি এ ব্যাপারে ?’ শেষ প্রশ্নটা হ্যারিদের উদ্দেশ্যে।

     ‘লেক সংলগ্ন জঙ্গলটা নিষিদ্ধ অরণ্যের অতিরিক্ত অংশ। এমন কোন জায়গা থাকতেই পারে যেখানে নায়াডস এবং ডায়াডসরা থাকে। সঙ্গে সঙ্গে এটাকে সত্যি মেনে নিলে এটাও বলতে হয় যে ওদেরকে কয়েকশ বছর ধরে দেখা যায়নি। যে কারনেই ওদের আমরা গল্প কথা ভেবে নিয়েছি।’

     ‘এটাকে সত্যি মেনে নিলে মানে? ড্যাড, আমরা ওনাকে দেখেছি। উনি আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।’ জেমস একটু অনুযোগের সুরে বেশ জোরেই বললো।

     ‘জেমস ভুলে যেও না তোমার বাবা একজন অরোর,’ ম্যাকগনাগল বললেন শান্ত স্বরে। ‘ সবরকম সম্ভাব্যতা ওকে  যাচাই করে নিতে হয়। তোমরা সবাই এই মুহূর্তে যথেষ্টই ক্লান্ত হয়ে পড়েছো, সঙ্গে মানসিক চাপটাও আছে। তার মানে এই নয় যে আমরা তোমাদের কথা বিশ্বাস করছি না। আমরা আসলে খোঁজার চেষ্টা করছি একটা সহজ সূত্র যা তোমরা দেখেছ সে বিষয়ে।’

     জেমস বিড়বিড় করে বললো, ‘আমার কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে সহজ বিশ্বাসটা হলো উনি যা বলেছেন আসলে উনি তাইই।’

     জেমস এই জন্যেই ড্যাড বা বাকি কাউকে শেষের দিকে ওই অশরীরী যা বলেছিলেন সেসব কিছু বলেনি। ভলডেমরটের উত্তরাধিকারী বা শত্রুর রক্ত বয়ে চলেছে এই মুহূর্তে অন্য কারো শরীরে এই কথা গুলো ইচ্ছে করেই না বলার পেছনে একটাই কারণ এই বিশ্বাস না করার প্রবণতা। ও জানে বা শুনেছে কি ভাবে জাদুজগত ওর ড্যাডের সঙ্গে ব্যবহার করেছে কোন একটা কিছু ঘটলেই। ট্রাই উইজার্ড কাপের গোলক ধাঁধাঁ থেকে ফেরার পর ভলডেমরট ফিরে আসতে চলেছে এই খবর হ্যারি যখন জানিয়ে ছিল সবাই অবিশ্বাসতো করেই ছিল সঙ্গে সঙ্গেই প্রাপ্য সম্মানটাও দিতে চায়নি অনেকে।

     সব কথা না বলার আরো একটা কারন ওর ড্যাড স্বয়ং বিশ্বাস করেননি ড্রায়াড এর ব্যাপারটা। ফলে ড্রায়াড রক্ত সূত্রে সম্পর্কিত নতুন এক ভলডেমরটের আগমনের কথা বলেছে সেটাও বিশ্বাস করবেন না ধরেই নেওয়া যায়। আরো একটা কথা যা আসলে জেমসকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে তা হলো ড্রায়াডের বলা শেষবাক্য, “তোমার বাবার যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, এবার শুরু তোমার যুদ্ধ।”

     ওদের আলোচনা অনেকক্ষন ধরে চললো, যা একসময় জেমসের একঘেয়ে লাগতে শুরু করলো। ও ফিরে যেতে চাইছিল দুর্গে। যাতে ঘুমাতে পারে কিংবা ড্রায়াড এর বলা কথাগুলোকে নিয়ে নিজের মতো করে ভাবতে পারে। খুঁটিয়ে ভাবতে এবং বুঝতে চায় ওই দ্বীপটা আসলে কি? কি মানে লুকিয়ে আছে ওই গেটে লেখা কথাগুলোর মধ্যে? ও মনে করে করে লিখে নিতে চাইছে এখনো মনের ভেতরে যা আছে। ও নিশ্চিত এর সঙ্গে আস্ট্রামাড্ডুক্স এর গল্প এবং মারলিনকে ফিরিয়ে আনার স্লিদারিনদের গোপন ছক এবং মাগল জগতের সঙ্গে অন্তিম যুদ্ধর একটা যোগাযোগ আছেই। আর এ নিয়ে ও নিজেকেও জিজ্ঞেস করতে চায় না এসব সত্যি না মিথ্যে। কারন ও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, এটা সত্যি হতে বাধ্য এবং এটাকে আটকাতে হবে ওকেই।

     একসময় বড়দের কথা চালাচালি শেষ হল। ওরা সিদ্ধান্তে এলেন ওই রহস্যময় দ্বীপটা নিশ্চিতভাবেই বিপদজনক।নিষিদ্ধ অরণ্যর মতোই অজানা বিপদ এবং চিন্তাজনক রহস্যে ভরপুর। প্রাথমিক ভাবে এটাই খুঁজে দেখা হবে কি করে ওই মাগল অনুপ্রবেশকারী এখানে ঢুকতে পারলো। সঙ্গে সঙ্গেই আগামী দিনে যাতে আর কেউ এটা করতে না পারে তার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আলোচনা সভার পরিসমাপ্তি এই সিদ্ধান্তের সঙ্গেই ঘটলো।

     জেমস, জ্যান ও টেডকে সঙ্গে নিয়ে হেডমিস্ট্রেস দুর্গে ফিরে এলেন এবং নির্দেশ দিলেন এই রাতের অভিযানের কথাটা ওরা যেন গোপন রাখে।

     ‘বিশেষ করে এই নির্দেশটা তোমার জন্য মিঃ লুপিন,’ উনি কাটাকাটা স্বরে বললেন। ‘আমি চাইনা যে তুমি এবং তোমার ছন্নছাড়া বন্ধুবান্ধবের দল রাতের অন্ধকারে অরণ্যের মধ্যে মিঃ পটার আর মিঃ ওয়াকারের মতো কোন অভিযানের চেষ্টা করো।’

     মজার ব্যাপারটা হলো, টেড ভালো করেই জানে ওরা এরকম কিছু একটা আগামীদিনে করবেও। তাই একটুখানি মাথা নেড়ে বাধ্য ছেলের মতো উত্তর দিল, ‘ বুঝলাম ম্যাম।’

 জেমস আর একবার ওর ড্যাডের দেখা পেল এই সফরে। বিকেলের দিকে ক্লাস করে ফেরার সময়। হ্যারি,টাইটাস এবং মন্ত্রকের প্রতিনিধিরা তখন ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছেন। নেভিল বিকালেই হগওয়ারটসে ফিরে এসেছেন। জেমসকে সঙ্গে নিয়ে উনি ছুটে গেলেন হেড মিস্ট্রেসের অফিসে হ্যারিদের বিদায় শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। হ্যারিরা ফ্লু নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হেডমিস্ট্রেসের ঘরের ফায়ারপ্লেসটাই বেছে নিলেন তার জন্য কারন এটাই সবচেয়ে সুরক্ষিত।কিছুক্ষণের জন্য উনি থমকে দাঁড়ালেন প্রাক্তন হেডমাষ্টারের পোরট্রেটের সামনে।

     ‘আরে উনি কি আবার কোথাও চলে গেছেন নাকি?’ হ্যারির কাছে জানতে চাইলেন।

     ‘আমার মনে হয় উনি এই ঘরে শুধু ঘুমাতে আসেন। ডাম্বলডোরের অনেক ছবি এই স্কুলের বিভিন্ন জায়গায় আছে,’ হ্যারি কিছুটা হতাশ হয়েই বললো।

     ‘তাও তো সেই সব পুরানো চকলেট ফ্রগকার্ডের কথা বাদই দিলাম। মাঝে মাঝে উনি ওখানেই দেখা দেন মজা করার জন্য। আমি আমার ওয়ালেটে একটা রেখে দিয়েছি, যদি কখনো।’ নিজের ওয়ালেটটা বার করে একটা কুকুরের কানের আকৃতির কার্ড বার করলেন। পোরট্রেটটা এখন ফাঁকা। হ্যারি হাসলেন, নেভিল ওটা আবার ঢুকিয়ে রাখলেন।

     নেভিল এগিয়ে গেলেন ফায়ার প্লেসের দিকে দলের অন্যদের শুভেচ্ছা জানাতে। হ্যারি মাথা ঝুঁকিয়ে নিচু হলেন জেমসের দিকে।

     ‘জেমস আমি তোকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’

     জেমস আপ্রান চেষ্টা করলো গর্বের ভাবটা লুকানোর, ‘আমি শুধু সেটাই করেছি যা তুমি আমায় করতে বলেছো।’

     হ্যারি বললেন, ‘আমি কিন্তু গতরাতে আমাদের সঙ্গে গিয়ে সাহায্য করার জন্য কথাটা বলছি না।’ জেমসের কাঁধে একটা হাত রাখলেন উনি। ‘আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি অনুপ্রবেশকারী বিষয়ে খুঁটিনাটি নজর রেখে খবরটা আমার কাছে তুলে ধরার জন্য। তোর যে একটা দারুন পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং পরিষ্কার মানসিকতা আছে এটা ভালোই বুঝতে পারছি। অবশ্য তার জন্য আমার অবাক হওয়া উচিত নয় মোটেই। আর আমি হচ্ছিও না।’

     জেমস মুচকি হেসে বললো, ‘থ্যাঙ্কস ড্যাড।’

     ‘ওই দিন রাতে কি কথা আমাদের মধ্যে হয়েছিল ভুলে যাস না যেন। মনে আছে তো?’

     জেমস মনে করলো। “আমি একার হাতে এই জগত রক্ষা করার চেষ্টা করবো না।” তবে এখন থেকে আমি জ্যানের সাহায্য নেব, কথাটা ভাবলেও বললো না মোটেই। এটাও ভাবলো হয়তো টেডের সাহায্যও নিতে হতে পারে কারন র‍্যালফ তো এখন আর আমার পক্ষে নেই।

     হ্যারি জেমসকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন বুকের মাঝে। একে ওপরের দিকে চেয়ে হাসলেন। খানিকক্ষণ জেমসের কাধে হাত রাখার পর হ্যারি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, এগিয়ে গেলেন ফায়ারপ্লেসের দিকে।

     জেমস ড্যাডকে চেঁচিয়ে বললো, ‘মামকে বোলো আমি রোজ শাকসবজি খাচ্ছি। আর ভালো হয়ে থাকার চেষ্টাও করে যাচ্ছি।’

     হ্যারি প্রশ্ন করলেন, ‘কথাটা কি সত্যি?’

     ‘না, মানে হ্যাঁ মানে ওই,’ জেমস বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল উত্তর দিতে গিয়ে কারন সবাই এখন ওর দিকেই তাকিয়ে।

     ‘যেটা বললে সেটা সত্যি করেই কোরো, চিন্তা নেই আমি মামকে বলে দেব,’ চশমাটা খুলে নিয়ে পোষাকের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে হ্যারি বললেন।।

     কিছুক্ষণ বাদে ঘরটায় শুধু জেমস, নেভিল আর হেডমিস্ট্রেস, বাকিরা চলে গেছেন নিজস্ব গন্তব্যে।

     ‘প্রফেসর লঙবটম,’ হেড মিস্ট্রেস বললেন, ‘আমার মনে হয় গত কুড়ি ঘন্টায় কি কি ঘটেছে আপনার সব জানা দরকার বা আমার সেটা বলা উচিত।’

     নেভিল জানতে চাইলেন, ‘আপনি কি ক্যাম্পাসে যে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছিল তার কথা বলছেন?’

     হেড মিস্ট্রেস একটু তাকিয়ে থাকলেন, ‘ও তার মানে আপনি এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই ওয়াকিবহাল হয়েছেন। তাহলে তো একই কথা আমার দুবার বলার চেয়ে ভালো হবে আপনি কি জানেন সেটা শোনা।’

     ‘আপনি কি ক্যাম্পাসের অনুপ্রবেশকারীর বিষয়টার কথা বলতে বলছেন ম্যাডাম?’ নেভিল পুনরায় জানতে চাইলো।

     হেডমিস্ট্রেস কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘ও তাহলে ঠিকই ধরেছি আমি পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছিলাম। যাই হোক আপনি যা শুনেছেন বা জানেন সেগুলো আমায় বলুন।’

     ‘অবশ্যই ম্যাডাম। শিক্ষার্থীরা বলাবলি করছে গতকাল কুইডিচ পিচে কোন এক ব্যক্তিকে দেখা গেছে বা ধরা পড়েছে। ওদের কথানুযায়ী লোকটি জুয়াচক্রের সঙ্গে জড়িত যে এসেছিল খবর সংগ্রহ করতে অথবা খেলাটাকে প্রভাবিত করতে। যতসব বাজে কথা বুঝতেই পারছি। কিন্তু আমার মনে হয় এই সব গুজবকে থামানোর জন্য সবকিছু খোলাখুলি বলাই ভালো। কারণ চেপে যেতে চাইলে আরো বড় গুজব জন্ম নেবে।’

     ‘আমি নিশ্চিতএ ব্যাপারে মিঃ পটার ও সহমত হবেন আপনার সঙ্গে,’ হেড মিস্ট্রেস কাটাকাটা স্বরে বললেন। ‘এই এলাকার সুরক্ষা বাড়ানোর জন্য আপনার সহযোগিতা আমার প্রয়োজন। তার আগে আপনাকে আমার জানানো দরকার ঠিক কি ঘটেছে। জেমস, আশা করি তোমার কোন তাড়া নেই কোথাও যাওয়ার? আমি বেশী সময় নেবোনা কথা বলার জন্য। নেভিল তোমায় নিচে পৌঁছে দিয়ে আসবেন।’ জেমসের উত্তরের অপেক্ষা না করেই উনি ঘুরে গেলেন নেভিলের দিকে এবং গতকালের ঘটনাটা বিস্তারিত ভাবে বলা শুরু করলেন।

     জেমসেরও তো সব জানার অধিকার আছে। কিন্তু এখানে ওকে কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না। এই সব ব্যাপারগুলো যথেষ্টই বিচ্ছিরি রকমের বিরক্তিকর। ওই লোকটার বিষয়ে কি আলোচনা সেটাও শোনার অধিকার ওর আছে বলেই ওর মনে হয়। কারন জেমসই প্রথম ওই লোকটাকে দেখেছিল, ওর পেছনে ধাওয়া করেছিল এবং কুইডিচ পিচেও খুঁজে বার করেছিল। বড়দের এই আচরণগুলো অদ্ভুত রকমের। ছোটরা কিছু বললেই এটা ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। আর যখন সত্য বলে প্রমানিত হয় পুরো দায়িত্ব নিজেরা নিয়ে নেয় আর আসল নায়ককে দূরে সরিয়ে রাখে। এই জন্যই তো জেমস স্লিদারিন-মারলিন পরিকল্পনাটার কথা কাউকে বলতে চায় না। আর এখন তো আর সঙ্কল্প দৃঢ় হলো, দারুন কিছু একটা প্রমান যোগাড় না করা পর্যন্ত কাউকে একটা কথাও বলবে না।

     বুকের কাছে হাতটা গুটিয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল জেমস। একবার ফিরে দেখলো নেভিল হেডমিস্ট্রেসের ডেস্কের ওপর ঝুঁকে বসে ম্যাকগনাগলের কথা শোনায় মগ্ন হয়ে গেছেন।

     ‘কি পটার, কিসের তল্লাসী চালাচ্ছ?’ পেছন দিক থেকে মৃদু কন্ঠস্বরটা চমকে দিলো জেমসকে। চারদিকটা ঘুরে ফিরে দেখলো। কিছু বলার আগেই আবার শোনা গেল, ‘একদম জিজ্ঞেস করবে না আমি কে। আর একগাদা মিথ্যে বলে আমার সময় নষ্ট করার চেষ্টাও কোরো না। তুমি ভালো করেই জানো আমি কে। আর তোমার ড্যাডের চেয়েও আমি বেশি ভালো করে জানি যে তুমি কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছ।’

     হ্যাঁ এ শব্দ আসছে সেভেরাস স্নেপের পোরট্রেট থেকে। কালো শীতল চোখ দুটো একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে জেমসের দিকে। পুরো মুখটা সামান্য ঝুঁকে আছে সামনের দিকে।

     ‘আমি …’ জেমস বলতে শুরু করেই থেমে গেল, ভালো করেই বুঝতে পারছিল যদি ও মিথ্যে কথা বলে ছবির মানুষটা বুঝতে পেরে যাবে। ‘আমি কিছুই বলবো না।’

     ‘তোমার ড্যাডের তুলনায় বেশ ভালো সৎ উত্তর, এটা স্বীকার করতেই হবে,’ স্নেপ যথেষ্টই নিচু স্বরে বললেন যাতে নেভিল বা ম্যাকগনাগল শুনতে না পান। ‘খুবই দুঃখজনক ব্যাপার যে আমি আর বেঁচে নেই আর হেডমাষ্টারও নই। তা নাহলে যেনতেন প্রকারে আমি তোমার মুখ থেকে কথা বার করে নিতাম।’

     ‘বুঝলাম,’ জেমস এখন বেশ ধাতস্থ বোধ করছে প্রাথমিক চমকটা কাটিয়ে। বেশ খানিকটা সাহসীভাবেই ফিসফিস করে বললো, ‘আমার তো মনে হচ্ছে আপনি যে আর হেডমাষ্টার নেই এটা ভালোই হয়েছে।’ মনে মনে বললো, ভালোই হয়েছেআপনি মারা গিয়েছেন। এটা বলাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যেতো। জেমস জানে ড্যাড সেভেরাসকে দারুন শ্রদ্ধা করেন। যে কারনে ওর ভাই আলবাসের নামের সঙ্গে সেভেরাসটাও জুড়ে রেখেছেন।

     পোরট্রেটের ভেতর থেকে স্নেপ একটু ক্রুদ্ধভাবে বললেন, ‘আমার সঙ্গে বেশি চালাকি করার চেষ্টা কোরো না। তোমার ড্যাড সে সময় জানতো না কিন্তু তুমি তো জানো, আমি আসলে আল্বাস ডাম্বলডোরের পক্ষেই ছিলাম ভলডেমরটকে পরাজিত করার জন্য। তোমার ড্যাড ভেবেছিলো লড়াইটা একার দায়িত্বে জিতে নেবে। ও একটা বোকার হদ্দ আর ধ্বংসাত্মক প্রকৃতির ছেলে ছিল সে সময়ে। আর সেই ধরনের চাউনি কিছুক্ষণ আগেই আমি তোমার চোখেও দেখেছি।’

     জেমস কি বলবে ভেবে পেল না। শুধু তাকিয়ে থাকলো ছবির মানুষটার কালো চোখদুটোর দিকে অপলকে।

     স্নেপ কিছুটা হতাশা নিয়েই একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। ‘ কি আর করা যাবে করো যা তুমি চাও। যেমন পটার তেমনই তার ছেলে। কেউ অতীতের থেকে শিক্ষা নেয় না। কিন্তু মনে রেখো আমি তোমার দিকে সব সময় নজর রাখবো। যেমন রাখতাম তোমার ড্যাডের ওপর। তবে এটাও মনে রেখো তোমার না বলা সন্দেহগুলো যদি সব বাধাবিপত্তি পেরিয়ে সত্যি বলে প্রমানিত হয় তাহলে আমাকে তোমার পাশেই পাবে। একবার চেষ্টা করেই দেখো পটার, তোমার ড্যাডের মতো ভুল দ্বিতীয়বার কোরো না। তোমার নিজের হঠকারিতার মাসুল যাতে অন্যদের দিতে না হয় সেটা মাথায় রেখো।’

     শেষ কথাগুলো জেমসের ভেতর পর্যন্ত নাড়িয়ে দিলো। আশা করেছিল এবার ছবি থেকে স্নেপ অন্তর্হিত হবেন। কিন্তু সেটা ঘটলো না। একই রকম অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিয়ে জেমসকে দেখতে থাকলেন যেন জেমস একটা গোপন বই। সেই তাকানোর মধ্যে অবশ্য কোন বিদ্বেষ নেই, কিন্তু ওনার বলা কথাগুলো এখনো অনুরণিত হচ্ছে জেমসের মনে।

     ‘বেশ,’ জেমস বললো অনেক ভেবে, ‘তাই হবে, আমি আপনার কথাগুলো মাথায় রাখবো।’ জেমস ভালো মতোই জানে এটা একটা কথার কথা মাত্র। কারন ওর বয়স মাত্র এগারো বছর।

     ‘জেমস?’ নেভিল ডাকলেন পেছন থেকে। জেমস ঘরে প্রফেসরের দিকে তাকালো। ‘যা শুনলাম তাতে মনে হচ্ছে গত রাতটাতো তোমার দারুন উত্তেজনার সঙ্গে কেটেছে। আমি ওই লতাগুল্মগুলো বিষয়ে জানতে আগ্রহী যারা তোমায় আক্রমণ করেছিল। আশা করছি ওদের বিষয়ে আরো কিছু জানা যাবে তোমার কাছ থেকে, কি তাইতো?’

     ‘অবশ্যই,’ জেমস অস্বস্তির সঙ্গে জবাব দিলো। নেভিলের সঙ্গে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে দেখল স্নেপ এখনো ছবিতেই আছেন। কালো চোখদুটো একইভাবে অনুসরণ করে চলেছে ওকে।

[চলবে]

লেখক পরিচিতিঃ  জর্জ নরম্যান লিপার্ট আমেরিকান লেখক এবং কম্পিউটার অ্যানিমেটর। তবে ওনার বর্তমান পরিচয় উনি জেমস পটার সিরিজের লেখক। যে কারনে ওনাকে “আমেরিকান রাউলিং” নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সিরিজের প্রথম লেখা “জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং” প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। নানান কারনে এটি অনেক বিতর্কে জড়িয়ে যায়। সেসব সমস্যা পেরিয়ে আজ এটি পাঠক পাঠিকাদের চাহিদায় সারা বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সিরিজের সব কটি বই ই-বুক এবং ফ্রি হিসাবেই প্রকাশ করেছেন মাননীয় জর্জ নরম্যান লিপারট। এই সিরিজ ছাড়াও ওনার আরো ১২ টি বই আছে। বর্তমানে উনি এরি, পেনসিল্ভ্যানিয়ার বাসিন্দা।

অনুবাদকের পরিচিতিঃ উপন্যাসটির অনুবাদক প্রতিম দাস মূলত চিত্র শিল্পী, ২০১৩ সাল থেকে ভারতের সমস্ত পাখি আঁকার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছেন। ৭৭৫+ প্রজাতির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে শুধু পাখি নয় অন্যান্য বিষয়েও ছবি আঁকা চলে একইসঙ্গে। দারুণ রকমের পাঠক, যা পান তাই পড়েন ধরনের। প্রিয় বিষয় রূপকথা, ফ্যান্টাসী, সায়েন্স ফিকশন, অলৌকিক। টুকটাক গল্প লেখার সঙ্গে আছে অনুবাদের শখ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *