জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং – পার্ট ১০

দশম পরিচ্ছেদ

ছুটির দিনে গ্রিমাল্ড প্লেসে

রের সোমবার ম্যাকগনাগল ম্যামের অ্যাডভান্সড ট্রান্সফিগারেশনের ক্লাস শেষ হওয়ার পর জেমস, জ্যান আর র‍্যালফ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলো যতক্ষণ না শেষ শিক্ষার্থীটি বের হয়ে আসে। হেডমিস্ট্রেস গুছিয়ে নিচ্ছিলেন নিজের সাজ সরঞ্জাম।

‘কাম ইন, কাম ইন,’ উনি বললেন ওদেরকে উদ্দেশ্য করেই অথচ তাকাননি একবারও। ‘ওরকম শকুনের মত উঁকিঝুঁকি মারার কোন দরকার নেই। বলো তোমাদের জন্য  আমি কি করতে পারি?’

‘ম্যাডাম হেডমিস্ট্রেস, আমরা ওই ডিবেট নিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।’ জেমস জানালো।

‘এক্ষুনি?’ জেমসের দিকে একঝলক তাকিয়ে কথাটা বলেই  ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিলেন। ‘কেন বলতে চাও সেটা নিয়ে ভাবতে আমি চাইছি না। তবে এটা বলতে পারি যত তাড়াতাড়ি ওই বিষয়টা ভুলে যেতে পারবে ততই ভালো।’

দরজার দিকে এগিয়ে যেতে থাকা হেড মিস্ট্রেসকে দ্রুত অনুসরণ করতে করতে জেমস বললো, ‘কিন্তু কেউই ওটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে না ম্যাডাম। এটা নিয়েই গত উইকেন্ডটা সরগরম ছিল। যারা শুনেছে তারা প্রায় সকলেই এটা নিয়ে যথেষ্ট ভাবনা চিন্তা করে চলেছে। গতকাল তো একটা মারামারি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল যখন মাস্ট্রাম জুয়েল শুনতে পায় রেভিস ম্যাকমিলান, টাবিথা করসিকাকে মিথ্যের উপাসিকা বলে ডাকে। প্রফেসর লঙবটম ওখানে না থাকলে মাস্ট্রাম বোধ হয় রেভিসকে খুনই করে ফেলতো।’

‘মিঃ পটার এটা একটা স্কুল। আর একটা স্কুল হলো খুব সোজা কথায় তোমাদের মতো অল্পবয়সীদের বিচরন ক্ষেত্র। অল্পবয়সীদের মধ্যে অতি সামান্য কারনেই কথা কাটাকাটি ঝগড়া বিবাদ হয়। এই জন্যই এবং আর অনেক কারণের জন্য হগওয়ারটস মিঃ ফিলচকে রেখেছে।’

‘এটা সাধারন কথা কাটাকাটি নয়, ম্যাডাম, ‘করিডোর ধরে হেডমিস্ট্রেসের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে র‍্যালফ বললো।  ‘ওরা পাগলের মতো আচরণ করছিল। আমি কি বলতে চাইছি আপনি বুঝতে পারছেন কিনা জানিনা। কেউই আর নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারছে না।’

‘তারজন্যই তো, যেমনটা মিঃ পটার বললেন, ভাগ্যক্রমে ওখানে প্রফেসর লংবটম ছিলেন। আমি কিন্তু বুঝতে পারছি না এতে তোমাদের সমস্যাটা কি হচ্ছে।’

জ্যান প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছিলো ম্যাকগনাগলের হাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যাওয়ার জন্য। বললো, ‘মানে ব্যাপারটা হল এই যে, ম্যাম, আমরা অবাক হয়ে যাচ্ছি আপনি কেন এই ব্যাপারটাকে এত সহজে পাশ কাটাতে চাইছেন? মানে বলতে চাইছি যে আপনি তো সেদিন ওখানে ছিলেন যখন যুদ্ধটা হয়েছিল। আপনি ভালো করেই জানেন ভলডেমরট কি রকম ধরনের ব্যক্তি ছিলেন। দয়া করে সেই কথাগুলো সবাইকে বলুন আর টাবিথার মুখটা বন্ধ করে দিন।’

ম্যাকগনাগল ঝট করে থেমে দাঁড়ালেন। ওরা প্রায় হোঁচট খাবার মত করে উনার কাছে এসে থমকে দাঁড়ালো। ওদের তিনজনকে এক এক করে দেখে, গলার স্বর নামিয়ে উনি বললেন, ‘আমি কি জানতে পারি, তোমরা তিনজন ঠিক কি চাইছো যেটা আমাকে করতে হবে? শোনো, ডার্ক লর্ড আর তার অনুগামীদের বিষয়ে আসল সত্যিটা গত তিরিশ বছর ধরে একটা অতি মাত্রায় জানা বিষয়। সেই দিন থেকে, যেদিন ও মিঃ পটারের দাদু দিদাকে হত্যা করে, ওর বিষয়ে সবাই সব কিছু জানেন। তোমরা কি মনে কর আমি আর একবার ওই কথাগুলো সবার সামনে বললেই ওই হতচ্ছাড়া উঠতি বিপ্লবীদের মিথ্যে প্রচারগুলো সব থেমে যাবে? সব থেমে যাবে এই স্কুল চত্বর সহ গোটা জাদু দুনিয়ায়, কেবলমাত্র আমি বললেই? কি মনে হয়?’ ওঁর চোখের মনি দুটো হীরের মতো জ্বলজ্বল করছিল। জেমস ভালোই বুঝতে পারলো তাদের তিনজনার তুলনায় উনিও মোটেই খুব কম একটা চিন্তাতে নেই এই ডিবেটের ঘটনাটা নিয়ে। ‘আচ্ছা ধরো আমি মিস করসিকাকে ডেকে পাঠালাম অফিস ঘরে এবং কিছুটা বকাঝকা করলাম এই সব মিথ্যেগুলো প্রচার করা নিয়ে। তাতেই কি প্রোগ্রেসিভ এলিমেন্ট সব বন্ধ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? সেইদিনটা দেখার জন্য খুব বেশি দেরী লাগবে বলে তো মনে হয়না,  যেদিন ডেইলি প্রফেটে একটা আর্টিক্যাল বার হবে যার হেডলাইন হবে – “স্কুল চত্বরে যে কোন রকম মুক্ত চিন্তার আদান প্রদান বন্ধ”। হগওয়ারটস এর পরিচালন কমিটি  অরোর ডিপার্টমেন্ট এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এ কাজ করেছে। এমনটাই রটতে শুরু করবে।’

জেমস স্তম্ভিত হলো। ও বুঝতে পারলো হেডমিস্ট্রেস কোনো এক বিশেষ কারনে টাবিথা করসিকাকে কিছু সময়ের জন্য সুযোগ দিচ্ছেন এই নাটকটা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। ওর কেন জানিনা মনে হচ্ছে এই ঘটনাটা আরো খানিকটা জলঘোলা না করা পর্যন্ত ম্যাকগনাগল কিছু করার সুযোগ পাবেন না।

জেমস জানতে চাইল, ‘তাহলে আমাদের কি করনীয় ম্যা’ম?’

ম্যাকগনাগল ভ্রু উঁচিয়ে বলে উঠলেন, ‘আমাদের? ডিয়ার জেমস আমি বলতে তুমি সত্যিই আমাকে একইসঙ্গে অবাক করেছ এবং প্রভাবিতও। তোমরা যাই বিশ্বাস করোনা কেন জাদু দুনিয়ার ভবিষ্যৎ তোমার এবং তোমার দুই বন্ধুর ওপর চাপানো কিন্তু নেই।’ একটা কঠোরতা জেমসের মুখে লক্ষ্য করে উনি সেই দুর্লভ হাসিটা হাসলেন।  একটু ঝুঁকলেন ওদের তিনজনকে কিছু কথা বলার জন্য। যেটা আর কেউ শুনুক উনি চান না। ‘ডার্ক লর্ড এর স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনাটা আমাদের মতো মানুষের কাছে খুব একটা চাপের ব্যাপার নয় কারন আমরা ওই সময়টাকে নিজের চোখে দেখেছি। এটা একটা সাময়িক ঝড় যা কিছু মানুষের মনকে আন্দোলিত করবে। হ্যাঁ মানছি ব্যাপারটা খুবই বিরক্তিকর। কিন্তু এটা বেশী দিন থাকবে না। এই সময়টায় তোমরা তিনজন যেটা করতে পারো সেটা হলো, ঠিকঠাক ক্লাস অ্যাটেন্ড করা, হোম ওয়ার্ক করা, এবং মানসিক স্তরে নিজেদের আর শক্তিশালী ও সচেতন করে তোলা। আর কেউ যদি তোমাদের আশেপাশে এটা বলার চেষ্টা করে যে টম রিডল আসলে হ্যারি পটারের চেয়েও ভালো মানুষ ছিলেন তাহলে তোমাদের জন্য আমার অনুমতি দেওয়া থাকলো – অনুমতি কেন নির্দেশ দেওয়া থাকলো – তাকে ট্রান্সফিগার করে দিতে পারো কুমড়োর জুস কিম্বা কুলকুচি করা জলে।’ কথাটা বলে তিনজনের দিকে এক এক করে  সিরিয়াস ভাবে তাকালেন। ‘যদি কেউ কেন করলে এটা জানতে চায়, তাহলে  বলবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে তোমাদের এটা প্র্যাক্টিস করার জন্য বলেছি। মাথায় ঢুকলো?’

জ্যান আর র‍্যালফ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলো। জেমস দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো। ম্যাকগনাগল সামান্য ঝুঁকলেন পুনরায় তারপর সোজা হলেন এবং টকাটক পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন নিজের পথে। গোটা পাঁচেক পদক্ষেপ ফেলেই ঘুরলেন।

‘ওহ হ্যাঁ, আর একটা কথা?’

জ্যান বললো, ‘বলুন ম্যাম?’

‘কুলকুচির জলে বদলে দেওয়ার জন্য দুবার জোরের সঙ্গে জাদু দন্ড নাড়িয়ে উচ্চারন করবে “নারগ্লামমনিয়াস”। জোর দেবে প্রথম এবং তৃতীয় সিলেবলে।’

‘ওকে ম্যাম!’ জ্যান উত্তর দিল। হাসতে হাসতে।

হেমন্তের দিন পেরিয়ে স্কুলের সময় এগিয়ে চললো শীতের ছুটির পথে। ফুটবল খেলার মাঠটা ঢেকে গিয়েছে ঝরা পাতায়। যা এই মুহূর্তে প্রফেসর কারির ছাত্রছাত্রীদের পায়ের চাপে চেপটে যাচ্ছে, ভাঙছে ছিটকে উঠছে। আন অফিসিয়াল ফুটবল চ্যাম্পিয়ান শিপে জয়ী হয়েছে জেমসের দল। জেমস জয়সূচক গোলটাও করেছে, ওই দিনের ওর নিজস্ব তিন নম্বর গোল। গ্রেমলিন সদস্য র‍্যাভেনক্ল এর হোরাস বারচকে বোকা বানিয়ে। ওর দলের সমর্থকরা ওর আশেপাশে এমন চিৎকার চ্যাঁচামেচি করছিল মনে হচ্ছিল ওরা বোধ হয় হাউস কাপটাই জিতে নিয়েছে।  অবশ্য এর জন্য প্রফেসর কারির তরফ থেকে একশো পয়েন্টও পেয়েছে নিজেদের হাউসের জন্য। জেমসকে কাঁধে করে ওরা দুর্গ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আগেকার দিনে ড্রাগনের সঙ্গে যুদ্ধ জয়ীদের এই সম্মান দেওয়া হতো। হেমন্তের পড়ন্ত সময়ের ঠান্ডা বাতাসে জেমসের গাল দুটো লাল হয়ে গিয়েছিল।  ও হাসছিল… মন খুলে। ওর আত্মবিশ্বাসটাও হঠাৎই যেন অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে।

স্কুল শুরুর সময়ে যে সমস্ত ক্লাস রুটিন এবং হোমওয়ার্ক এর কথা ভেবে ভয় লাগতো সেসব এখন একঘেয়ে মনে হয়। প্রফেঃ জ্যাক্সন একের পর এক  বিশাল বিশাল প্রবন্ধ লিখিয়ে চলেছেন তার আলোচনার ভিত্তিতে। সঙ্গেই আছে “পপ কুইজ” যা মোটেই কঠিন কিছু নয়। মঙ্গলবার রাতের কন্সটেলেশন ক্লাবে প্রফেঃ ট্রেলোওনি আর মাদাম ডেলাক্রয় এর কথা কাটাকাটির গল্প শুনিয়েছে জ্যান, জেমস আর র‍্যালফকে। ওঁদের ডিভাইনেশন ক্লাস শেয়ার করতে গিয়ে যার আঁচ অনেকেই ইতিমধ্যে পেয়েছে। টেড আর জ্যান এর সাহায্যে উড়ুক্কু ঝাড়ু নিয়ে ওড়ার ক্ষেত্রে এখন অনেকটাই সাবলীল জেমস। আশা করছে আগামী বছর গ্রিফিন্ডোর টিমে চান্স পেয়ে যাবে। কল্পনার চোখে দেখতে চেষ্টা করছে সেই দিনের বিশেষ প্রদর্শনটা যার সাহায্যে ও সবাইকে ভুলিয়ে দিতে সক্ষম হবে প্রথম বারের অসফলতা। অন্যদিকে জ্যান র‍্যাভেনক্ল এর জন্য নিজের পারফম্যান্স দিনকে দিন আরো ঝকঝকে করে তুলছে। নিজের মাগল প্রেক্ষাপটের কথা মাথায় রেখে ও একটা বিশেষ কৌশল সৃষ্টি করেছে ব্লাজার হিট করার। নাম দিয়েছে “বাজিং দ্য টাওয়ার”। প্রেসবক্সের কাছে এক চক্কর মেরে ব্লাজারে একটা জোরালো আঘাত করে অতি দ্রুত তার সঙ্গে চলে যাচ্ছে বলটার অপর দিকে। তারপর মারছে আর এক ঘা। যার ফলে গতি বেড়ে যাচ্ছে ওটার সঙ্গেই নিচ্ছে বিশেষ বাঁক। এই শটটা মেরে জ্যান ইতিমধ্যে দুজন খেলোয়াড়কে ঝাড়ু থেকে নিচে ফেলে দিতে পেরেছে।  ফল স্বরুপ ওকে বেশ কয়েকবার হাসপাতালেও যেতে হয়েছে ওই দুই খেলোয়াড়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য।

স্লিদারিন হাঊসে র‍্যালফের দিনগুলো মোটেই ভালো কাটছে না। টাবিথা, ডিবেটের মঞ্চ ত্যাগ করা বা প্রোগ্রেসিভ এলিমেন্ট এর মিটিং আর না যাওয়া বিষয়ে সরাসরি ওকে কিছু বলেনি। পুনরায় জেমসের সঙ্গে বন্ধুত্ব জোড়া লাগাটাই এর কারন বলে জেমস আর জ্যান ধরে নিয়েছে। পুরাতন স্লিদারিন সদস্যরাও খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না র‍্যালফকে। মাঝে মধ্যে এক আধটু কঠোর চাউনি আর দু চারটে টোন টিটকারি ছাড়া বিশেষ কিছু করেনি। কিছুটা অবাক করার মতো যেটা ঘটেছে তা হলো র‍্যালফ কিছু অন্যান্য প্রথম ও দ্বিতীয় বার্ষিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলেছে। নীল ব্যাজ পড়া কিছু ছাত্র ছাত্রী ছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি বৃহত্তর রাজনীতি করার ক্ষেত্রে। এটা ঠিক যে স্লিদারিনদের নাক উঁচু ভাব থাকা সত্বেও, যার মধ্যে কিছু প্রথমবার্ষিকীও আছে, বেশ কয়েকজন র‍্যালফকে নিশ্চিতভাবে পছন্দ করে। যাদের দ্বৈতাচারী হাবভাব দেখে হাসি পায় জেমসের।

জেমস, জ্যান আর র‍্যালফের সব চেয়ে পছন্দের ক্লাস ডিফেন্স এগেইন্সট দ্য ডার্ক আর্টস। প্রফেঃ ফ্র্যাঙ্কলিন নিজের দীর্ঘ জীবনের অনেক বাস্তব অভিযানের অভিজ্ঞতার কাহিনী বলে বাস্তবিক অর্থেই ক্লাসটাকে মনোমুগ্ধকর করে রাখেন। জেমস দ্বৈত মহড়া ক্ষেত্রে অন্যতম সেরা বিবেচিত হয়েছে। যেটা দেখে কেউ অবাক হয়নি। মিচকি হেসে ও স্বীকারও করেছে যে, ওর ড্যাড ওকে বেশ কিছু ডিফেন্সিভ টেকনিক শিখিয়ে রেখেছেন আগেভাগেই। র‍্যালফের সঙ্গে কেউই দ্বৈত মহড়া দিতে রাজি হয় না। এমন কি জেমস ও। না জানি কোন অজানা কারনে ডিফেন্সিভ মন্ত্র ব্যবহার ক্ষেত্রে র‍্যালফের সব গোলমাল পাকিয়ে যায়। প্রথমবার দ্বৈত মহড়ার সময় ও ভিক্টরির ওপর সাধারন এক্সপেল্লিয়ারমাস মন্ত্র প্রয়োগ করে। কিন্তু কি যে হয়ে যায় ওপরওয়ালাই জানেন। ওর জাদুদন্ড থেকে নীল বিদ্যুতের শিখা ছিটকে যায় ভিক্টরির মাথার ওপর দিয়ে। যার ফলস্বরুপ টানা অনেকটা জায়গার চুল উঠে যায় ভিক্টরির। হাত দিয়ে সেটা বুঝতে পেরে বিস্ময়ে চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসার যোগাড় হয় ভিক্টরির। রাগে তেড়ে যায় ওর থেকে তিনগুন বড় চেহারার অধিকারী র‍্যালফের দিকে। আরো তিনজনের দরকার পড়ে ভিক্টরিকে আটকানোর জন্য। ধোঁয়া বের হতে থাকা জাদুদন্ডটা হাতে নিয়ে দুপা পিছিয়ে গিয়ে র‍্যালফ ক্ষমা চাইতে থাকে ক্রমাগত।

এর মধ্যে একবার এক সন্ধেবেলায় র‍্যাভেনক্ল এর কমন রুমে ডিবেটের ঘটনা নিয়ে কিছু  কথা বলার  সাহস দেখায় একজন। জেমসরা  নিজেদের হোম ওয়ার্ক প্রায় শেষ করে ফেলেছে এমন সময় চতুর্থ বার্ষিকীর গাঁট্টাগোঁট্টা  চেহারার গ্রেগরী টেম্পলটন ওদের কাছের টেবিলে এসে বসলো।

‘আরে তোমরা দুজনেই সেদিনের ডিবেটে ছিলে তাই না?’ জ্যান আর র‍্যালফের দিকে আঙ্গুল তুলে বললো।

‘হ্যাঁ, গ্রেগরী,’ জ্যান উত্তর দিল, বইপত্র গোছাতে গোছাতে। ওর কণ্ঠস্বর অনেকটাই মোলায়েম এই মুহূর্তে যা মোটেই স্বাভাবিক নয়, কারন ও এই সব ছাত্রদের পছন্দ করে না।

‘তুমিতো করসিকার দিকের টেবিলে ছিলে, কি ঠিক বল্লাম না?’ র‍্যালফের দিকে ঘুরে  বললো গ্রেগরী।

‘ইয়ে। হ্যাঁ, কিন্তু…’ র‍্যালফ বললো।

‘শোনো, টাবিথাকে বলে দিওতো ওর ভাবনা চিন্তাগুলো একেবারে ঠিক পথে ছিল। আমি একটা বই পড়ছি যেখানে এই সব ব্যাপারে লেখা আছে। বইটার নাম “ডাম্বলডোর প্লট”। ওখানেই লেখা আছে ওই ব্যাটা বুড়ো আর হ্যারি পটার মিলে পুরো ঘোঁটটা পাকিয়েছিল। জানো বোধ হয় ওই রাতে বুড়ো মারা গেলে রিডল আর হোরক্রাকশ এর গল্পটা সাজানো হয়? কেঊ কেউ বলেন হ্যারি পটারই ওকে খুন করে, সব প্ল্যান সেট হয়ে যাওয়ার পর।’

জেমস অনেক কষ্টে নিজের রাগ সামলাচ্ছিল। সোজা তাকাল গ্রেগরীর দিকে। ‘তুমি কি জানো আমি কে?’

জ্যান তাকিয়ে ছিল গ্রেগরীর হাতে থাকা বোতলটার দিকে। ‘এই গ্রেগ,’ ডাকলো যতটা সম্ভব সংযত স্বরে, আস্তে আস্তে নিজের জাদুদন্ডটা বার করে, ‘ওটা কি খাচ্ছ তুমি?’

মিনিট দেড়েক পর, জেমস, জ্যান আর র‍্যালফ দ্রুত টেবিল ছেড়ে সরে দাঁড়ালো। কারন গ্রেগরী শুরু করে দিয়েছে গলগল করে গারগল করা জল উগরানো।

গ্রেগরীর বাড়ানো হাতের তলা দিয়ে চকিতে বেরিয়ে এসে জ্যান চেঁচিয়ে বললো, ‘প্র্যাক্টিস করছিলাম! সত্যি বলছি! ট্রান্সফিগারেশনের অভ্যাস করছিলাম। বোতলের  পানীয়টা কিভাবে যেন তোমার মধ্যে ঢুকে গেল! বিশ্বাস না হলে ম্যাকগনাগল ম্যামকে জিজ্ঞেস করে নিও।’

ঘর থেকে বেরিয়ে তিনজনেই উদ্দাম হাসিতে ভরিয়ে দিল চারপাশ।

ক্রিসমাসের ছুটি আসছে, জেমস প্রস্তুত সেটা উপভোগ করার জন্য। শেষ ক্লাসের দিনের লাঞ্চের পর জেমস চলে গেল গ্রিফিন্ডোর শয়ন কক্ষে জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। জানলার বাইরে আকাশের রঙ এখন ধুসর, বইছে ঠান্ডা হাওয়া। বারো নম্বর গ্রিমাল্ড প্লেসের বিরাট ফায়ার প্লেস হাতছানি দিয়ে যেন ডাকছে জেমসকে। সঙ্গেই ক্রিচারের বানানো বিশেষ হট চকলেট। যেটায় শেষবার ও গুনে গুনে অন্তত চৌদ্দ রকমের জিনিস পেয়েছিল। যার সঙ্গে ছিল এক কুচি সত্যিকারের চকলেটের টুকরো।

সিঁড়ির কাছ থেকে র‍্যালফের গলা শোনা গেল, ‘জেমস, আছিস নাকি ঘরে?’

‘হ্যাঁ, চলে আয়।’

‘থ্যাঙ্কস,’ হাঁপাতে থাকা স্বরে বললো র‍্যালফ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে। ‘লাঞ্চ করে নিয়ে পেট্রার সঙ্গে ওপরে এলাম। ওই জানালো তুই সম্ভবত ওপরেই আছিস, জিনিসপত্র গোছাচ্ছিস। সব রেডি তাহলে যাওয়ার জন্য।’

‘হ্যাঁ! এ বছরে আমরা ছুটি কাটাতে ওল্ড হেড কোয়ার্টারে যাচ্ছি। জর্জ ও রন আঙ্কেল এবং হারমায়োনি ও ফ্লেউর আন্টিও যাচ্ছেন। সঙ্গেই টেড এবং ওর গ্র্যান্ডমাম, ভিক্টরি এমন কি লুনা লাভগুডও জাচ্ছেন। ওকে অবশ্য তুই চিনিস না তবে ওর ব্যাপারে জানলে অর সঙ্গে আলাপ করতে ইচ্ছে তোর হবেই। আমার দেখা সবচেয়ে অদ্ভুত রকমের ক্ষ্যাপাটে মহিলা, অবশ্য ভালো দিক থেকে। আমার দাদু দিদা অবশ্য ওখানে যাচ্ছেন না।  এবছর ওরা প্রাগে গেছেন চার্লি আর বাকিদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। তবে আমার মনে হয় নেভিল ওখানে যাবেন। প্রফেসর লংবটম, বুঝলি তো।’

জেমসের ট্রাঙ্কের দিকে তাকিয়ে বিষাদগ্রস্থ ভাবে মাথা নাড়লো র‍্যালফ। ‘বাঃ! ভালোই। আশা করছি তুই  একটা দারুন ছুটি উপভোগ করবি।’

জেমস গোছানো থামালো। ওর মনে পড়ে গেল র‍্যালফের বাবা এই ছুটিতে ব্যস্ত থাকবেন ব্যবসার কাজে। ‘হ্যাঁ, তা তো হবেই। বলছিলাম তোর কি প্ল্যান? তুই কি ক্রিসমাসটা তোর দাদুদের সঙ্গে কাটাবি নাকি অন্য কোনো ভাবনা আছে?’

‘কি?’ র‍্যালফ উত্তর দিলো, ‘ওহ, নাহ। যা অবস্থা তাতে মনে হচ্ছে আমাকে ছুটির দিনগুলো এখানেই কাটাতে হবে। জ্যান পরের সপ্তাহ অবধি থাকছে, ফলে কিছুদিন ওর সঙ্গ পাবো। তারপর … যাকগে, ওনিয়ে ভাবছি না, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’ একটা বড় মাপের দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

ট্রাঙ্কের ভেতর একটা মোজা ছুঁড়ে দিয়ে জেমস বললো, ‘র‍্যালফ, আমার সঙ্গে যাবি? আমাদের পরিবারের সঙ্গে ক্রিসমাসের দিনগুলো কাটানোর জন্য?’

র‍্যালফ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বললো, ‘মানে? না না, তোদের পারিবারিক আনন্দের মধ্যে আমি নিজেকে … সেটা কি করে হয়, মানে বলতে চাইছি… আমি … না না…’

জেমস ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ‘ওই হতচ্ছাড়া, তুই যদি আমার সঙ্গে  যেতে রাজি না হোস আমি তোর জাদু দন্ডটা কেড়ে নিয়ে তোর ওপরেই একের পর এক ট্রান্সফিগারেশনের মন্ত্র প্রয়োগ করবো। সেটাই চাইছিস কি?’

র‍্যালফ বললো, ‘এ নিয়ে এরকম চাপ সৃষ্টি করাটা কি ঠিক হচ্ছে!’ আর তারপরই ফিক করে হেসে ফেললো। ‘তোর মা  বাবা কিছু মনে করবেন নাতো?’

‘মোটেই না। সত্যি কথাটা হলো, এতো এতো লোকজন ওখানে যাবে যে আমার মনে হয়না ওরা বুঝতে পারবেন আর একজন অতিরিক্ত ঢুকে পড়েছে।’

র‍্যালফ ছদ্মরাগের দৃষ্টিতে তাকালো জেমসের দিকে। ‘না মানে আমি বলতে চাইছি যে… আমি তো একবারে বিপক্ষ দলের। তার ওপর ডিবেটের দলেও ছিলাম। এসব নিয়ে কোন সমস্যা হবে নাতো।’

‘র‍্যালফ ওরা ওয়্যারলেসে সবই শুনেছেন।’

‘আমি জানি সেটা।’

‘এ নিয়ে আর একটাও কথা নয়।’

র‍্যালফ কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। একটি ভাবলো। তারপর মুচকি হেসে টেডের বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। ‘হুম আমি তোর কথা বুঝে গেছি। ভিক্টরিও ওখানে যাবে তাই না?’

‘ঠিক জানি না। ও একটু পাগলী ধরনের আছে। ওর দশ ফুটের মধ্যে কোন ছেলে আসলেই ও একেবারে ক্ষেপে যায়।’

‘আমি ওই ঘটনাটার ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে চাই। তুই তো দেখেছিলি দ্বৈত মহড়ার গণ্ডগোলটা।’

জেমস ধড়াস করে ট্রাঙ্কটায় চাপড় মেরে বললো, ‘র‍্যালফ, শোন, ওই ঘটনাটার কথা যত কম ভাববি এবং বলবি ততই ভালো।’

 

 

পরেরদিন সকালে গ্রেট হলে ব্রেকফাস্ট করার ভিড় ছিল না। ঘণ্টা খানেক আগে ভীষন তুষারপাত হয়েছে। জানলার কাঁচে জমে আছে তার রেশ। সেটা ভেদ করে বাইরের দিকটাকে আবছা রহস্যময় দেখাচ্ছে। জেমস আর র‍্যালফ একই সঙ্গে ঢুকলো। দেখতে পেল জ্যান আগে থেকেই বসে আছে র‍্যাভেনক্ল এর টেবিলে।

‘র‍্যালফ তুইতো দারুন ভাগ্যবান,’ জ্যান বললো কিছুটা বিমর্ষ ভাবে, কফি কাপটাকে নাড়াচাড়া করতে করতে। ‘ম্যাজিক্যাল ক্রিসমাস কি ভাবে পালন হয় এটা দেখার জন্য আমি মরতেও রাজি আছি।’

পামকিন জ্যুসে চুমুক দিয়ে জেমস বললো, ‘আমার তো মনে হয় না তোর কল্পনার জগতের সঙ্গে কিছু মিল পাবি ওতে।’

‘হয়তো তুই ঠিকই বলছিস। তবুও আমি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি আশেপাশের হালচাল দেখে মনে হচ্ছে এখানে হ্যালোইন পালন হচ্ছে।’

জেমস র‍্যালফকে একটা খোঁচা মেরে বললো, ‘শোন র‍্যালফিনেটর, যতক্ষণ না আমাদের ঐতিহ্যবাহী প্রেতাত্মাদের ক্রিসমাস প্যারেড শেষ না হবে তোর কিন্তু ঘুমানো চলবে না। তারপরই আমরা ক্যান্ডির রসে চুবানো বাদুড়ের লজেন্সগুলো খাবো। সঙ্গে থাকবে এলফদের খুলি দিয়ে ফোটানো হট চকলেট।’

র‍্যালফ বড় বড় চোখ করে তাকালো । জ্যান রাগ রাগ মুখে বললো, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ যত পারিস মজা করেনে। জোকারের দল।’

র‍্যালফ এতক্ষনে ইয়ার্কিটা বুঝতে পেরে বললো, ‘আরে ছাড়তো ওর কথা। তুইও তো তোর পরিবারের সঙ্গে দারুণ একটা ক্রিসমাস পালন করবি। আর কিছু না হোক তোর বাবা-মা তো তোর পাশে থাকবে।’

‘হ্যাঁ সে তো বটেই। আট ঘণ্টার প্লেন জার্নি করে যেতে হবে স্টেটসে। সঙ্গে থাকবে আমার বোন গ্রীয়ার। জাদু স্কুল বিষয়ে উল্টো পালটা প্রশ্ন করে করে মাথা খারাপ করে দেবে। এই যে ওখানে গিয়ে  আমি  জাদুদন্ডটা দিয়ে কাওকে সরাসরি আঘাত করা ছাড়া কিছুই করতে পারবো না এটা ওর মোটেই পছন্দ নয়।’

র‍্যালফ ঝট করে বললো, ‘ হগওয়ারটসের বাইরে আমাদের অনুমতি নেই জাদুর ব্যবহার করার। এটা বলে দিলেই হয়।’

জ্যান ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে বললো, ‘এরপর ওহায়ও তে ক্রিসমাস পালন আমার দাদু দিদা আর তুতো ভাইদের সঙ্গে। তোরা কল্পনাও করতে পারবি না কি পরিমাণ পাগলামো চলে ওখানে।’

জেমস থাকতে না পেরে জানতে চাইলো, ‘কিরকম একটু বলা যাবে কি?’

‘ভাবার চেষ্টা কর একটি ট্র্যাডিশনাল অল আমেরিকান নরম্যান রকওয়েল ক্রিসমাসের দৃশ্য।’ জ্যান বললো, দুহাতের আঙ্গুল দিয়ে একটা ফ্রেমের মত বানিয়ে মুখের সামনে রেখে। ‘চলছে উপহারের প্যাকেট খোলা। সঙ্গেই টারকি চিবানো। বাজছে ক্রিসমাস ক্যারল ক্রিসমাস ট্রিগুলো থেকে। বুঝতে পারলি?’ র‍্যালফ আর জেমস কষ্ট করে হাসি চেপে মাথা নাড়লো জ্যান এর ব্যাজার মুখটা  দেখে।

‘এবারে,’ জ্যান বললো, ‘কল্পনা করে নে ওখানে একটাও মানুষ নেই, সব হিঙ্কি পাঙ্ক। তাহলেই বুঝে যাবি আসলে ঠিক কি ঘটে।’

জেমস ফেটে পড়লো অট্টহাসিতে। র‍্যালফের বরাবরের মতই কোন হেলদোল দেখা গেল না। একবার জেমস একবার জ্যান এর মুখ দেখতেই ব্যস্ত থাকলো।

জেমস বললো, ‘তাহলেতো ফাটাফাটি ব্যাপার।’

জ্যান কষ্ট করে হাসলো। ‘হ্যাঁ বেশ মজারই বলা যায়। হই হট্টগোল, চিৎকার। চারদিকে উড়ছে মোড়কের কাগজ। কোনোটায় ফায়ারপ্লেস থেকে আগুন লেগে আরো দুচারটে জিনিসকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।’

আলচনার মধ্যে থাকার চেষ্টায় র‍্যালফ জানতে চাইলো, ‘হিঙ্কি পাঙ্কটা কি বস্তু?’

জেমস ফিকফিক করে হেসে বললো, ‘পরের কেয়ার অফ ম্যাজিক্যাল ক্রিচারস এর ক্লাসে হ্যাগ্রিডের কাছে জেনে নিস। তাহলেই সব বুঝতে পেরে যাবি।’

আরো কিছুটা সময় পরে জেমস আর র‍্যালফ বিদায় জানালো জ্যানকে। নিজেদের ট্রাঙ্কগুলো টানতে টানতে এগিয়ে চললো সামনের চত্বরের দিকে। টেড আর ভিক্টরি আগে থেকেই ওখানে বসে ছিল নিজেদের ট্রাঙ্কের ওপর। ওদের পেছন দিকে দেখা যাচ্ছিলো অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ হয়ে থাকা তুষারে ভরতি মাঠ। ভিক্টরির মাথায় এখন অনেকটাই চুল গজিয়ে গেছে। যার পুরো কৃতিত্ব হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা মাদাম কিঊরিওর। যদিও ভাল করে দেখলে চুলের রঙের এবং ধরনের পার্থক্য বেশ বোঝা যায়। ভিক্টরি ইদানীং বিভিন্ন রকম টুপি পড়া শুরু করেছে ওটা ঢাকার জন্য।  টুপি পড়ে ওকে দেখতে অনেকটাই অন্যরকম লাগে। বেশ ভালোই লাগে। কিন্তু  ভিক্টরির টুপি পড়ার ব্যাপারটাই পছন্দ নয় । আজকে পড়েছে একটা ছোট্ট এরমাইন পিলবক্স টুপি, টেনে নামানো আছে বাম চোখের ভুরু অবধি। র‍্যালফকে ট্রাঙ্ক টেনে আনতে দেখে একটা শীতল চাহনি ছুঁড়ে দিলো। কিছুটা সময় পরে হ্যাগ্রিডকে দেখা গেল একটা ঘোড়ার গাড়ির ওপর চেপে আসছে। র‍্যালফের মুখ হাঁ হয়ে গেল এটা দেখে যে গাড়িটা এমনিই এগিয়ে চলে আসছে, কোন বাহন ছাড়াই।

হ্যাগ্রিড বললো জেমস আর র‍্যালফকে উদ্দেশ্য করে, ‘এটাকে আর দেখতে পাবে না এক বছরের আগে।’ ব্রেক লিভার টেনে থামালো গাড়িটাকে। নেমে এলো ওপর থেকে। এক এক করে ওদের ট্রাঙ্কগুলো তুলে দিলো গাড়ির পেছন দিকে। ‘এভাবেই অবাক হওয়ার জন্য সামনের বসন্তকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, বুঝলে কিনা?’

ভিক্টরি কিছুটা বিরক্তি সহকারে বললো, ‘হ্যাগ্রিড এবার থামোতো। এই গাড়িটা ততটাই বিচ্ছিরী ঠিক যতটা আমার মাম্মী বলেছিল। বেশ কিছু দিন এটাকে আর দেখতে হবে না এটা জেনে আমার বেশ ভালোই লাগছে।’ হাতটা বাড়িয়ে দিলো টেডের দিকে যে ইতিমধ্যে গাড়িতে উঠে পড়েছে। প্রয়োজন নেই তবু সাহায্যের হাতটা বাড়িয়ে দিলো টেড।

আরো কিছু ছাত্র ছাত্রী এসে উঠলো গাড়িটায়। সকলেই দেরী করে ছুটিতে যাওয়ার দল। হ্যাগ্রিড ওদের নিয়ে  এলো হগসমীড স্টেশনে। ওরা উঠে পড়লো হগওয়ারটস এক্সপ্রেসে। এখানে যেদিন এসেছিল তার তুলনায় ট্রেন আজ ফাঁকা। শেষের দিকের কামরার একটা কম্পারটমেন্ট ওরা বেছে নিল। প্রস্তুত হলো আবার একটা দীর্ঘ যাত্রাপথের জন্য।

র‍্যালফ টেডকে জিজ্ঞেস করলো, ‘হগসমীড কি উইজারড গ্রাম?’

‘অবশ্যই। দ্য থ্রী ব্রুমস্টিক এবং হনিডাক স্যুইট শপ এর জন্য বিখ্যাত। এখানেই তৈরী হয় সবচেয়ে সেরা ককরোচ ক্লাস্টার। আরও অনেক দোকানও আছে। তুই যখন তৃতীয় বছরের পড়াশোনা শুরু করবি এখানে মাঝে মাঝেই আসার সুযোগ পাবি।’

র‍্যালফকে কিছুটা চিন্তিত দেখালো। এইসময় ওর ভুরু ঝুলে যায় নিচের দিকে, নিচের ঠোঁট উঠে যায় ওপর দিকে। পুরো মুখটা যেন নাকের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। ‘আচ্ছা উইজারডরা কিভাবে মাগলদের আটকায় এই গ্রামে আসার ব্যাপারে। মানে বলতে চাইছি যে রাস্তাঘাট কি কিছু আছে না নেই?’

‘তোর প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা সোজা কথায় দেওয়া কঠিন,’ কথাটা বলতে বলতে পায়ের জুতো খুলে ছুঁড়ে দিয়ে নিজের সিটে প্রায় শুয়ে পড়লো টেড।

ভিক্টরি নাক কুঁচকে বললো, ‘মিঃ লুপিন আপনার দুর্গন্ধওয়ালা জুতোটা আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিলে ভালো হয়।’

কথাটায় কোন পাত্তা না দিয়ে পা দুটো ছড়িয়ে দিলো সামনের সিটের ওপর। ‘আমি এই সেমেস্টারে বুড়ো স্টোনওয়ালের অ্যাপ্লায়েড অ্যাডভান্সড টেকনোম্যান্সির ক্লাস করেছি। সেই সূত্রে তোকে বলতে পারি যে হগস্মীড শুধুই মাগলদের চোখের সামনে থেকে সাধারন ভাবে  লুকানো একটা জায়গা নয়। এর পেছনে আছে কোয়ান্টাম। পেট্রা এখানে থাকলে তোকে ভাল করে বুঝিয়ে বলতে পারতো।’

জেমস কৌতূহলের সঙ্গে জানতে চাইলো, ‘কোয়ান্টাম মানে?’

টেড কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, ‘এটা অ্যাপ্লায়েড অ্যাডভান্সড টেকনোম্যান্সির ক্লাসে আমাদের একটা চালু জোক। যখনই কোন সমস্যায় পড়ি বলে দিই সব কোয়ান্টামের খেলা।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু ভেবে নিলো টেড তারপর বললো, ‘এমন একটা গর্তের কথা কল্পনা কর এই পৃথিবীতে যেটা ঢাকা আছে রাবারের আস্তরন দিয়ে, ঠিক আছে? যেটাকে দেখে ওপর থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই। এবার ধরেনে একজন উইজার্ড নিজের কোয়ান্টাম ক্ষমতা সম্বন্ধে জানেন। যিনি বললেন, “আরে এটা তো দারুন একটা জায়গা যেখানে একটা উইজার্ড গ্রাম বানানো যেতে পারে।” তখন উনি কি করলেন? একটা বিরাট ওজনের ছোট্ট জাদু জিনিস বানালেন। আর সেটা ফেলে দিলেন ওই রাবার ঢাকা গর্তের ওপর। ওজনের চাপে রাবারের আস্তরণটা নেমে গেল নিচে, নিচে…অনেক নিচে। ঠিক আছে। তাহলে কি হলো ওজনটা রাবারের বাস্তবটাকে নিয়ে গেল একটা অন্য ডাইমেনশনে, তৈরী করলো একটা স্পেস-টাইমের ফানেল।’

‘একটু দাঁড়াও,’ র‍্যালফ ভুরু কুঁচকে বললো, ‘স্পেস-টাইম ব্যাপারটা কি?’

‘ওটা নিয়ে ভাবার দরকার নেই,’ টেড বললো তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে। ‘না জানলেও ক্ষতি নেই। সব কোয়ান্টামের খেলা।  আমরা কেউই ঠিকঠাক ও ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। কি যে সব বলে গেল খ্যাটখ্যাট  ক্যাট ক্যাট করে বলে গেল প্রফেসর জ্যাক্সন! যাই হোক শোন, রাবারের বাস্তবতায় ওজনের চাপ তৈরী করলো একটা স্পেস-টাইমের ফানেল। মাগলেরা কেবলমাত্র বাস্তবটা দেখতে পায়। জাদুর সাহায্যে যে নতুন ডাইমেনশন স্পেস বানানো হলো সেটা ওরা দেখতে পাবে না। ওদের জগতে ওই স্থানটার কোন অস্তিত্ব নেই। আমাদের মত যারা জাদু জগতের অংশ তারা ওই ফানেলের পথ ধরে পৌছাতে পারি ওই স্থানটায়। তবে তার জন্যেও জানতে হবে আমরা ঠিক কি দেখতে চাইছি এবং সঠিক অবস্থান। আর এভাবেই বানানো হয়েছে হগসমীড।’

‘তারমানে হগসমীড এর অবস্থান মাটির নীচে কোন এক ফানেল সদৃশ উপত্যকায়?’ র‍্যালফ জানতে চাইলো।

‘না, ‘ টেড উত্তর দিল সোজা হয়ে উঠে বসে। ‘এটা হলো, যাকে বলে এক ধরনের মেটাফর। প্রেক্ষাপট দেখতে একই রকম কিন্তু ডাইমেনশনালি এর জন্য যেতে হয় স্পেস-টাইমের অপর পাড়ে। যেখানে মাগলরা যেতে পারে না। এভাবে অনেক অনেক উইজার্ড প্লেস বানানো হয়েছে। কোয়ান্টামের সাহায্য নিয়ে অনেক জাদু প্রাণীর প্রজনন ঘটানো হয়েছে গোপন স্থানে। দৈত্যরা যেখানে বাস করে সেই পাহাড়ি এলাকাটারও মাগলদের ম্যাপে কোন চিহ্নই নেই। এভাবেই কাজ করে অস্থানিক স্থান। খুবই সোজা ব্যাপার।’

‘খুবই সোজা ব্যাপার মানে?’ র‍্যালফ অবাক হয়ে জানতে চাইলো।

টেড ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বললো, ‘দ্যাখ ভাই, এটা অনেকটা হনি ডিঊক্সের ককরোচ ক্লাস্টার এর মতো। তোর জানার দরকার নেই ওরা ওটা কি করে বানায়। আসল কথা হলো খাওয়া।’

র‍্যালফ হতাশার গলায় বললো, ‘আমার মনে হয় না আমি একটাও  পারবো।’

জেমসের দিকে তাকিয়ে টেড বললো, ‘এই ছোটখাটো পাহাড়টা তোদের খুব হাসায় তাই না?’

‘তার মানে এসব জায়গায় মাগলরা ঢুকতে পারে না, তাহলে স্কুলের ভেতরে ওই মাগলটা ঢুকলো কি করে?’ জেমস জানতে চাইলো।

‘হ্যাঁ তাইতো হওয়া উচিত,’ টেড বললো পুনরায় হেলান দিয়ে বসে। ‘তুই রহস্যময় কুইডিচ অনুপ্রবেশকারীর কথা বলছিস তো? লোকজন এই সব বলছে বুঝি? ওই লোকটা একজন মাগল ছিল বুঝি?’

জেমস ভুলে গিয়েছিল যে  ও ওই অনুপ্রবেশকারী সম্বন্ধে যতটা জানে অন্যরা ততটা জানে না। মনে পড়লো নেভিল লংবটমের বলা কথাগুলো। ‘হ্যাঁ, ’ চেষ্টা করলো উত্তেজনা নিয়ন্ত্রনে রাখার। ‘আমি শুনেছি সবাই বলছে ওই লোকটা একজন মাগল হতেও পারে। আমি অবাক হচ্ছি এটা ভেবে কি করে একজন মাগল কোয়ান্টাম জাতীয় জিনিসপত্র থাকা সত্বেও ভেতরে  ঢুকে পড়লো।’

জানলার বাইরের ঝকঝকে আকাশের দিকে তাকিয়ে টেড বলডলো, ‘আমার মনে হয় যে কেউ এসব এলাকায় ঢুকতে পারে যদি কোন উইজার্ড তাকে সাহায্য করে। সোজা কথায় এরকম কোন নিয়ম নেই যে ওরা ঢুকতেই পারবে না। ওদের ইন্দ্রিয়ের দিক থেকে এই সব জায়গাগুলোর কোন অস্তিত্ব নেই। এখন কোন জাদু জগতের মানুষ যদি ওদের ঢোকার পথটা দেখিয়ে দেয় তাহলেই ওদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে যাবে জায়গাটা।  এটা আমার অনুমান। কিন্তু সেই বোকার হদ্দটা কে, যে এরকম কাজ করেছে?’

জেমস কাঁধ ঝাঁকালো এবং র‍্যালফের দিকে তাকালো। র‍্যালফের মুখেও সেই ভাবনার ছাপ যা জেমস ভাবছে। বোকার হদ্দ হোক বা না হোক, কেউ না কেউ নিশ্চিত ভাবে লোকটাকে হগওয়ারটসের চত্বরে ঢোকার পথ দেখিয়েছে। কেন এবং কি ভাবে সে এই কাজটা করলো সেটা এখনো ধাঁধাই হয়ে আছে। তবে জেমস এর উত্তর খুঁজে বার করবেই নিজের জানপ্রান দিয়ে।

সকালে হগওয়ারটসের কিচেন থেকে নেওয়া মোমকাগজে মোড়ানো স্যান্ডুইচ খেয়ে ওরা চারজন লাঞ্চ সারলো। এরপর নেমে এল এক নিস্তব্ধতা। বাইরের আকাশ এখন আরো আলোকোজ্জ্বল। সূর্যের আলো হীরের দ্যুতিতে আলো ছড়াচ্ছে মাঠে ঘাটে বন জঙ্গলে। সকালের তুষার গলে গেছে, মাটি এখন কাদায় পরিণত। মরা শুকনো পাতা ছড়িয়ে আছে কারপেটের মতো।  এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে পাতা ঝরে যাওয়া গাছের কঙ্কাল। র‍্যালফ কিছুক্ষন বই পড়ার পর এখন ঘুমাচ্ছে। ভিক্টরিও কিছুক্ষন কিছু ম্যাগাজিন নাড়াচাড়া করার পর বন্ধুদের খুঁজতে গেল অন্য কামরায়। টেড জেমসকে শেখানো শুরু করলো “উইঙ্কলস অ্যান্ড আউজারস” খেলা। যেখানে জাদু সাহায্যে পারচমেন্ট ভাঁজ করে তৈরী করা একটা ত্রিভুজাকৃতি বস্তুকে ভাসিয়ে রাখতে হবে। টেডের কথানুযায়ী এই বস্তুটাকে বলা হয় আউজার। আর জাদুদন্ডের নাম উইঙ্কল। দুজন খেলোয়াড়েরই চেষ্টা থাকবে ভাসিয়ে রাখা আউজারকে অপর খেলোয়াড়ের কাছে রাখা একটি পারচমেন্টের ওপর আঁকা গোল চিহ্নের ভেতর ঢোকানোর। জেমস আউজারটাকে ভালোই ভাসিয়ে রাখছিলো কিন্তু টেড আরো দক্ষতার সঙ্গে ওটাকে ছিনিয়ে নিচ্ছিলো নিজের গোলের এলাকায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই।

‘এ সবই অভ্যাসের ফসল জেমস,’ টেড বললো। ‘আমি স্কুলে ভর্তি হয়ার পর থেকেই এই খেলাটা খেলছি। কমনরুমের মধ্যে কখনো কখনো চারজন করে দল বানিয়েও আমরা এটা খেলি। যেখানে আউজারের সাইজ হয় গড্রিক গ্রিফিন্ডোর এর মূর্তিটার মাপের। ওই মূর্তিটার বাম কানটা ভাঙ্গার জন্য আমিই দায়ী বলতে পারিস। যেটা আঠা দিয়ে আটকানো আছে। তখন জানতাম না রিপারো মন্ত্র ব্যবহার করলেই ওটা ঠিক করা যেত। আর ঠিক করিও নি। ওভাবেই রাখা আছে।’

নয় পূর্ণ তিনের চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেনটা যখন ঢুকলো তখন সন্ধের আকাশে লেগেছে লাইল্যাক রঙের ছোঁয়া। জেমস, টেড আর র‍্যালফ অপেক্ষা করছিল ট্রেনটার সম্পূর্ণ ভাবে থামার। সেটা হতেই ওরা উঠে দাঁড়ালো। হাত পা টানটান করে শরীরের জড়তা ছাড়িয়ে বেরিয়ে এল প্ল্যাটফর্মে।

কর্মরত পোর্টার এসে ওদের কাছ থেকে টিকিট চেয়ে নিলো এবং আসসিও মন্ত্র ব্যবহার করে একেকজনের ট্রাঙ্ক  ব্যাগেজ কম্পারটমেন্ট থেকে বার করে এনে ওদের পায়ের কাছে নামিয়ে রাখলো। ওরা ট্রাঙ্কগুলো একটা বড় ঠেলা গাড়িতে চাপাতে চাপাতেই হাজির হল ভিক্টরি।

টেড গাম্ভীর্য সহকারে বললো, ‘আমি তোদের নিয়ে যাবো ওল্ড হেড কোয়ার্টারে। খুব দূরে নয় ওটা। জেমস, তোর বাবা মা কেউ আসতে পারছেন না। খুব ব্যস্ত অতিথিদের আগমনের গোছগাছ করা নিয়ে। সঙ্গেই অ্যাল্বাস আর লিলির স্কুল থেকে ফেরার সময় এটা।’

নয় পূর্ণ তিনের চার প্ল্যাটফর্মের গুপ্ত পোর্টাল এর পথ ধরে ওরা এসে দাঁড়ালো মাগলদের কিংস ক্রশ ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মে।

‘টেড তুমিতো গাড়ি চালতে জানো না। তোমার উড়ুক্কু ঝাড়ুতেও আমাদের চারজনের বসার জায়গা নেই। তাহলে কি ভাবে নিয়ে যাবে আমাদের?’ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল ভিক্টরি।

‘হ্যাঁ কথাটা ঠিকই,’ টেড উত্তর দিল লোকজনে ভর্তি জায়গাটায় দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখতে দেখতে। মাগল যাত্রীর দল এদিক থেকে ওদিকে ছুটে চলেছে ওদের আশপাশ দিয়ে। বেশির ভাগের পরনেই মোটা কোট আর টুপি। হইহট্ট গোলের মধ্যেই মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে ট্রেন আগমন নির্গমনের ঘোষনা। কোথাও রেকর্ডে ক্রিসমাস ক্যারল বাজছে, ভেসে আসছে তারও শব্দ।

টেড চাপা স্বরে বললো, ‘মনে হচ্ছে আমরা সমস্যার জালে আটকে গেছি। এটা একটা এমারজেন্সী ব্যাপার, কি বলিস তোরা?’

টেডকে ডান হাতে জাদুদন্ডটা উঁচিয়ে ধরতে দেখে ভিক্টরি চেঁচিয়ে উঠলো, ‘না টেড একদম না।’

একটা জোরালো ঘ্যাঁ-আ-আ-চ ধরনের শব্দ কাঁপিয়ে দিল জায়গাটাকে, যদিও সেটা মাগলদের কানে পোঁছাল বলে মনে হল না। বিরাট কাঁচের ধনুকাকৃতি দরজাটার তলা দিয়ে একটা বেগুনী রঙের বেশ বড় মাপের কিছু প্রবেশ করলো। আর সেই বড় সড় কিছুটা হলো, নাইট বাস। জেমস টেডকে জাদুদন্ড তুলে ধরতে দেখে আন্দাজটা করেছিল। কিন্তু ওর জানা ছিল না এই বাস চিরাচরিত রাস্তার বাইরেও চলাফেরা করে। তিনতলা বাসটা বিন্দুমাত্র গতি না কমিয়ে এদিক ওদিকে হাঁটতে থাকা মানুষকে পাশ কাটিয়ে সজোরে ব্রেক কষলো টেডের সামনে এসে। দরজাগুলো খুলে গেল এবং একজন বেঁটে খাটো বেগুনী ইউনিফর্ম পড়া লোক বেরিয়ে এলো।

‘নাইট বাসে স্বাগত,’ লোকটা বললো কিছুটা বিরক্তি নিয়ে। ‘আটকে পড়া উইচ এবং উইজার্ডদের জন্য বিশেষ পরিবহণ ব্যবস্থা। তোমরা জানো বোধহয় ? আমরা দাঁড়িয়ে আছি কিংস ক্রশ স্টেশনের মাঝখানে। আশা করছি এক পা হেঁটে বাসে চড়তে সক্ষম হবে।’

‘ইভিনিং, ফ্র্যাঙ্ক,’ টেড ভিক্টরির ট্রাঙ্কটা এগিয়ে দিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে এমন ভাবে বললো, ‘আবার আমার পায়ের ব্যথাটা বেড়েছে। সেই কুইডিচ খেলতে গিয়ে লেগেছিল। দরকারের সময়েই ব্যথাটা চাগাড় দেয়।’

‘নিকুচি করেছে তোমার কুইডিচ খেলায় পাওয়া ব্যাথার,’ ফ্র্যাঙ্ক বিড়বিড় করে বললো ট্রাঙ্ক গুলোকে দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকাতে ঢোকাতে। ‘এরপর কোনোদিন যদি আবার এই ব্যাথার অজুহাত দাও আমি এক গ্যালিয়ন জরিমানা ধার্য করে দেব অসভ্যতামির অভিযোগ জানিয়ে।

র‍্যালফ বাসটায় চড়তে অনীহা প্রকাশ করে বললো, ‘তুমি যে বললে জায়গাটা কাছেই? ওই হেড কোয়ার্টার? তাহলে তো আমরা হেঁটেই চলে যেতে পারি?’

টেড ঝট করে  উত্তর দিলো, ‘এই ঠান্ডায়?’

ফ্র্যাঙ্ক ফোড়ন কাটলো বিকৃত স্বরে, ‘তার ওপর আবার ওর পায়ে ব্যাথা, জানো না বুঝি?’

র‍্যালফ আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়লো। সবেমাত্র ওপরে উঠেছে দরজা গুলো ঝপাঝপ বন্ধ হয়ে গেল।

কাছের একটা পেতলের হাতল পাকড়ে টেড বলজলো, ‘প্যাঙ্ক্রাস আর সেন্ট চ্যাড এর মোড়এ যাবো আরনি।’

ড্রাইভার মাথা নেড়ে, মুখ বিকৃত করে স্টিয়ারিং হুইলটাকে এমনতভাবে চেপে ধরলো যেন ওটার সঙ্গে কুস্তি করবে। চাপ দিল আক্সেলেরেটরে। নাইট বাস সামনের দিকে এগিয়ে গেল রকেটের গতিতে, আর তার ধাক্কায় র‍্যালফ ছিটকে গেল পেছনের দিকে। জেমসের আগেভাগে বলে দেওয়া সত্বেও কিছু একটা আঁকড়ে ধরেনি। গিয়ে পড়লো বাসের পেছন দিকে সিটের বদলে থাকা একটা পেতলের বিছানার ওপর।

‘কি হলোটা কি?’ ঘুমিয়ে থাকা এক উইজার্ড বালিসের থেকে মাথা তুলে জানতে চাইলো, ‘গ্রসভেনর স্কোয়ার এসে গেল, এত তাড়াতাড়ি?’

বাসটা একটা হাড় কাঁপানো হেয়ার পিন বাঁক ঘুরলো একদল যাত্রীকে পাশ কাটিয়ে যারা ট্রেন নির্গমনের বোর্ড দেখছিলো। তারপর পুনরায় রকেটের গতিতে এদ্গিয়ে গেল সামনের দিকে আশেপাশের যাত্রীদের হাওয়ার ঝলকে নাড়িয়ে দিয়ে। সামনেই দেখা যাচ্ছে প্রবেশপথের কাঁচের ধনুকাকৃতি দরজাটা। জেমসের কেন জানি না মনে হল ওই পথ দিয়ে বাসটা বের হতে পারবে না। পরক্ষনেই মনে পড়লো ওই পথেইতো বাসটা এসেছে। নিজেই নিজেকে আকঁড়ে ধরলো দুহাতে। সরু কোন স্থান দিয়ে জল ভর্তি বেলুনের মত দুমড়ে মুচড়ে বাসটা দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে এলো জনস্রোতে ভরা রাস্তায়, এগিয়ে যেতে থাকলো উদ্দাম গতিতে।

ব্যস্ত মানুষের জমায়েত ভর্তি একটা মোড় পার হওয়ার সময় টেড জেমসকে চিৎকার করে বললো, ‘ শুনলাম আজ রাতে ডিনারে নাকি  রাজহাঁসের মাংসের ব্যবস্থা করা হয়েছে?’

‘হ্যাঁ!’ জেমস উত্তর দিলো। ‘ক্রিচার আমাদের প্রথমবার বাড়ি ফেরার আনন্দ উদযাপন করার জন্য ফুল কোর্স ডিনারের বন্দোবস্ত করেছে।’

‘ওই ব্যটা বিদঘুটে বদখত বাঁটকুলটাকে আমার সত্যিই ভালো লাগে!’ টেড চেঁচিয়ে বললো। ‘র‍্যালফের কি খবর?’

জেমস ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। ঘুমন্ত উইজার্ডটার পাশে বিছানাটা দুহাতে আঁকড়ে ধরে বসে  থাকতে থাকতে র‍্যালফ জোর গলায়  জানান দিল, ‘সব ঠিকঠাক আছে। আমি ঘুমিয়ে থাকার এই বিশেষ জায়গায় আছড়ে পড়ে ভালোই আছি।’

যেখানে সেন্ট চ্যাড স্ট্রীট আরজাইল স্কোয়ারে মিলিত হয়েছে সেই জায়গাটায় এসে নাইটবাস একটা বিকট আওয়াজ করে ব্রেক কষলো। এই হঠাৎ থামায় ভেতরের যাত্রীরা আরো একবার বড় ধরনের ঝাঁকুনি সহ্য করতে হলো। বিরাট মাপের বেগুনী বাসটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়লো। খুলে গেল দরজাগুলো। টেড, ভিক্টরি, জেমস আর র‍্যালফ কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এলো, মনে হচ্ছিল ওরা যেন নেশাগ্রস্থ। ফ্র্যাঙ্ক টেডের দিকে রোষায়িত চোখে তাকিয়ে থাকলেও ওদের ট্রাঙ্কগুলো যত্ন করে রাস্তার ধারে নামিয়ে দিয়ে হ্যাপি ক্রিসমাস বলে বিদায় জানালো। দরজাগুলো বন্ধ হলো, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নাইটবাস আবার শুরু করলো তার দৌড়। একটা লরিকে পাস কাটিয়ে মাতালের মত এদিক ওদিক চলতে চলতে ওটা অদৃশ্য হয়ে গেল।

টেড নিজের আর ভিক্টরির ট্রাঙ্কদুটো দুহাতে ধরে টানতে টানতে এগিয়ে যেতে যেতে বললো, ‘ঠিক যেমনটা আশা করেছিলাম একেবারে সেরকম সার্ভিস দিলো।’ পথের দুপাশে একের পর এক জীর্ণ পুরাতন সব বাড়ি।

র‍্যালফ নিজের বিরাট ট্রাঙ্কটা টেনে আনতে আনতে হাঁফিয়ে গিয়ে বললো, ‘বাড়িটার নম্বর কত?’

জেমস উত্তর দিলো, ‘বারো নম্বর। এক্কেবারে এখানেই।’ এতবার ও ওখানে এসেছে যে ভুলেই গিয়েছিল বেশীর ভাগ মানুষের কাছে বাড়িটা দৃশ্যমান নয়। র‍্যালফ সিঁড়ির ধাপের কাছে থামলো, ওর ভুরুযুগল ক্রমান্বয়ে ওঠানামা করছিল।

জেমস ঘাড় ঘুরিয়ে বললো, ‘ওহো, ভুলেই গেছিলামরে র‍্যালফ। এখন তুই ওটা দেখতে না পেলেও ওটা এখানেই আছে। নাম্বার টুয়েলভ গ্রিমাল্ড প্লেস।  এখানেই আছে এগারো আর তেরো নম্বরের ঠিক মাঝখানে। এটা ছিল আমার ড্যাডের গডফাদার সিরিয়াস ব্ল্যাকের। যেটা উনি ড্যাডকে উইল করে দিয়ে যান। অর্ডার অফ দ্য ফিনিক্স এর হেড কোয়ার্টার হিসাবে এটা ব্যবহার করা হতো ভলডেমরটের সঙ্গে লড়াইএর সময়। সেই সময়ের সবসেরা ভালো উইজার্ডদের গোপনতা আর ডিসইলিউশন মেন্টের মন্ত্র দিয়ে দ্বারা এটাকে ঢেকে রাখা হয়েছিল। এটাই ছিল সে সময়ের সবচেয়ে সেরা সিক্রেট প্লেস। সেই বিচ্ছিরি দিনটার আগে অবধি। যেদিন হারমায়োনি আন্টিকে, সাইড-অ্যালং অ্যাপারিশন মন্ত্রের সাহায্য নিয়ে, অনুসরন করে এক ডেথ ইটার এটার সন্ধান পেয়ে যায়। যাই হোক, এখনো পর্যন্ত এটা ড্যাডের নামেই আছে। যদিও আমরা এখানে থাকি না বলাই যায়। ক্রিচার এটার দেখাশোনা করে আমাদের অবর্তমানে।

‘দ্যাখ তুই যে কি বললি তার অর্ধেকের বেশী আমার মাথায় ঢুকলো না,’ র‍্যালফ বললো ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে। ‘মোদ্দা কথাটা হলো আমার খুব ঠান্ডা লাগছে। আমরা বাড়িটায় কখন ঢুকবো?’

জেমস নিচে নেমে এসে র‍্যালফের দিকে হাত বাড়ালো। র‍্যালফ ধরলো জেমসের হাতটা।  জেমস  ওকে টেনে প্রথম ধাপে ওঠালো বারো নম্বরের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। র‍্যালফ হোঁচট খেয়ে ঠিক মতো পা ফেলে ওপর দিকে তাকালো। চোখ বিস্ফারিত হলো সঙ্গেই ফুটে উঠলো একটা অবাক হওয়ার হাসি। জেমসের নিজের  প্রথমবারের দেখার স্মৃতি মুছে গেছে মন থেকে কিন্তু অন্যদের মুখে শুনেছে কিভাবে  নম্বর বারো  নিজেকে সামনে নিয়ে আসে। এগারো আর তেরো নম্বর বাড়িকে মানুষের মত কাঁধ দিয়ে দুপাশে ঠেলে সামনে এসে দাঁড়ায়। র‍্যালফের অবাক হওয়া দেখে জেমস আর হাসি সামলাতে পারলো না।

র‍্যালফ বললো, ‘কুউউউল!! একজন উইজার্ড হতে আমার ভালোই লাগবে।’

জেমস দরজাটা ঠেলে খুলতেই দেখা গেল ওর মা এদিকেই আসছেন একটা তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে। ‘জেমস!’, ওকে দেখেই দ্রুত এগিয়ে এলেন এবং দুহাতে জড়িয়ে ধরে প্রায় শূন্যে উঠিয়ে ধরলেন।

জেমস একই সঙ্গে অপ্রস্তুত ও খুশী হয়ে বললো, ‘মাম! এবার ছাড়ো, জামার পকেটে চকলেট ফ্রগগুলো মনে হচ্ছে গলে গেল।’

‘চার মাস পর বাড়ি ফিরে এসে কি এতোই বড় হয়ে গেলি যে মামকে একটা চুমু পর্যন্ত খেলি না,’ উনি মজার ছলে বললেন।

টেড দুঃখের ভাব ফুটিয়ে বললো, ‘জেমস জানিস তো এটা কিরকম ব্যাপার। কখনো ওনারা তোর ছিঁড়ে যাওয়া জামা যত্ন করে সেলাই করে দেবেন আর পরক্ষনেই ঝাঁটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবেন যাও গিয়ে বাথরুমের ড্রেনটা পরিষ্কার করো। বুঝতে পারিনা বাবা কি যে মতিগতি?’

জেমসের মাম হেসে টেডকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন। ‘টেড তুই বোধ হয় একটুও বদলাবি না। বেশী বকবক করা থামা। এখানে এসেছিস বলে আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে কি বলবো তোকে।। থ্যাঙ্কস!  তোমাকেও ভিক্টরি। আরে দারুন টুপিটা তো তোমার।’ র‍্যালফ একটু সঙ্কুচিত হলো, যদিও ভিক্টরির কিছু বলার আগেই জেমসের মাম বলতে শুরু করলেন, ‘তুমি নিশ্চয়  র‍্যালফ। হ্যারি তোমার কথা বলেছিল। জেমসের চিঠিতেও তোমার উল্লেখ বাদ যায় না বলাই যায়। আমার নাম জিন্নি। শুনেছি তুমি নাকি জাদুদন্ড ব্যবহারে একজন মাস্টার।’

ভিক্টরিকে কিছু বলার সুযোগ না দেওয়ার জন্য জেমস বলে উঠলো, ‘ মাম, ড্যাড কোথায়?’

‘ও কাজের শেষে অ্যান্ড্রোমিডাকে নিয়ে ফিরবে। এসে যাবে জলদিই। বাকি সব কাল এসে যাবে।’

‘জেমস!’ দুটো বাচ্চার গলা একসঙ্গে শোনা গেল সঙ্গেই ভেসে এলো ওদের  ছুটে আসার পায়ের আওয়াজ। ‘টেড! ভিক্টরি!’ লিলি আর অ্যাল্বাস ওদের মায়ের পাশ দিয়ে ছুটে এলো। ‘আমাদের জন্য কি এনেছো?’ অ্যাল্বাস জানতে চাইলো জেমসের সামনে দাঁড়িয়ে।

‘হগওয়ারটসের স্কুল অফ উইচক্র্যাফট অ্যান্ড উইজারডি থেকে সরাসরি,’ জেমস উচ্ছাস মিশিয়ে অ্যাল্বাসকে জড়িয়ে ধরে বললো , ‘আমি তোদের দুজনার জন্য নিয়ে এসেছি …… আদরের এক আলিঙ্গন!’  অ্যাল্বাস শরীরের সব জোর দিয়ে জেমসকে ঠেলে দিয়ে একই সঙ্গে হাসি আর বিরক্তি মিশিয়ে বললো, ‘এটা ঠিক না! আমি ট্রেনের বিক্রেতা মহিলার কাছ থেকে ড্রুবলস বেস্ট ব্লোয়িং গামস আনতে বলেছিলাম।’

টেড নিচু হয়ে লিলিকে জাপটে ধরলো। ‘আমি তোর জন্য কিন্তু দারুন কিছু নিয়ে এসেছি বুঝলি পুচকি।’

‘কি সেটা?’ জানতে চাইলো, বিষণ্ণ মুখে।

‘তারজন্য তো তোকে ক্রিসমাসের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। করতে পারবি নিশ্চয়? তোর মাতো সব ড্র্যাগন সিন্দুকে লুকিয়ে রেখে দিয়েছে তাই না?’

‘টেড লুপিন!’ জিন্নি ধমকে উঠলেন। ‘এই হতচ্ছাড়া, খবরদার ওর আশার বেলুনটাকে আর ফোলাতে হবে না। এবার বাদ দাও বকর বকর, সবাই চলো আমার সঙ্গে। গোটা বিকেলটা ক্রিচার বেসমেন্টে থেকে তোদের জন্য কিসব চা টা বানিয়ে রেখেছে। তবে বেশি খেয়ে ফেলিস না যেন লোভে পড়ে তাহলে রাতে ওরই বানানো রাজহাঁসের স্পেশ্যাল মেনু খাওয়ার জন্য পেটে জায়গা থাকবে না। আর সেটা দেখে ও বেচারা সারা সপ্তাহ কেঁদে বেড়াবে।’

হ্যারি আর টেডের গ্রান্ডমাম অ্যান্ড্রোমিডা টঙ্কস এসে গেলেন আধঘণ্টা বাদেই। এর পরের সময়টা চিৎকার চ্যাঁচামেচি হই হুল্লোড় খাওয়া দাওয়া গল্প গুজব করে কাটলো। জানা গেল হ্যারি আর জিন্নি হগওয়ারটসের ডিবেট শোনেন নি, জেমস যদিও ভেবে ছিল ওরা শুনেছেন। অ্যান্ড্রোমিডা অবশ্য শুনেছেন এবং টাবিথা করসিকা আর ওদের দলটার ওপর ওনার বেজায় রাগ। ভাগ্যক্রমে উনি জানেন না র‍্যালফও ওই দলের সদস্য ছিল। র‍্যালফ মনেমনে খুশিই হলো এটা জেনে যে উনি এই কথাটা জানেন না।

টেড ডেজারট খাওয়ার সময় বিড়বিড় করে বললো, ‘চিন্তা করিস না। কেউ যদি কিছু বলেও দেয়, আমি ম্যানেজ করে দেব। জানিয়ে দেব তুই আসলে আমাদের আন্ডারকভার এজেন্ট হয়ে ওই দলে ঢুকেছিলি। উনি এই সব গুপ্তচরগিরি ভালোবাসেন। ওর স্বামী ওই কাজই করতেন।’

ক্রিচারের স্বভাব একফোঁটা বদলায়নি। এক হাত বুকের সঙ্গে ঠেকিয়ে অন্য হাত প্রসারিত করে নিচু হয়ে বুলফ্রগের মতো গলগলে কন্ঠস্বরে জেমসকে বললো, ‘মাস্টার জেমস, ফিরে এলেন, স্কুলের প্রথম বছরের অভিজ্ঞতা লাভ করে। ক্রিচার মাস্টারের ঘর সেভাবেই সাজিয়ে দিয়েছে যা উনি পছন্দ করেন। মাস্টার আর তার বন্ধুরা কি ওয়াটার ক্রেস স্যান্ডুইচ খেতে পছন্দ করবেন?’

ক্রিচার বরাবরের মতই বাড়িটাকে দারুন ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে, এমন কি ছুটির দিনে বাড়ি সাজানোর কাজটাও করেছে। যদিও ওর ভাবনা অনুসারে আনন্দ উৎসব পালনের পদ্ধতিটা একটু উদ্ভট রকমের যা হয়তো জ্যানের পছন্দ হতো। এই বাড়ির দেওয়ালে আগেকার মালিকদের শুদ্ধ রক্তের দেখদারির নমুনা  স্বরুপ বেশ কিছু হাউস এলফের কাটা মুন্ডু টাঙ্গানো আছে। ক্রিচার সেগুলোর গলায় ঝুলিয়েছে ঘণ্টা, মাথায় পড়িয়েছে সবুজ টুপি, সঙ্গেই নকল সাদা দাড়িও লাগিয়ে দিয়েছে।

‘ক্রিচার ওদের মন্ত্রপূত করে ওদের দিয়ে গান গাওয়াবে, এটা পারবে ও,’ জেমস আর র‍্যালফকে কথাগুলো অনুনয় বিনয় করে বলেছে ক্রিচার। ‘কিন্তু মিসাস এর মতে এটা একটু বাড়াবাড়ি ধরনের … উৎসবের পক্ষে। ক্রিচার এটা করতে চায়। কিন্তু মিসাস আপত্তি,  ক্রিচার মেনে নিচ্ছে।’  ক্রিচার আসলে চাইছিল ওই মাথাগুলোর গান গাওয়ানোর ব্যাপারটা হোক। জেমস ওকে বলেছে এটা একটা দারুন আইডিয়া। ও মামের সঙ্গে কথা বলবে এ ব্যাপারে। সত্যি বলতে কি জেমসও মনে মনে দারুন ভাবে চাইছে ওই মরা মুন্ডুর গান শুনতে।

লিলি আর অ্যাল্বাস সমানে জেমস আর র‍্যালফের পিছু পিছু ঘুরে বেড়ালো যাতে ওরা  ওদেরকে জাদু স্কুলে শেখা কিছু কলাকৌশল দেখায়।

‘কাম অন জেমস! অ্যাল্বাস দাবি জানালো, ‘কিছু একটা শূন্যে ভাসিয়ে দেখা! লিলিকে ভাসা দেখি!’

লিলি চেঁচিয়ে উঠলো। ‘একদম না। অ্যাল্বাসকে ভাসা! উড়িয়ে জানলার বাইরে ছেড়েদে ওকে!’

‘তোরা দুজনেই ভাল করে জানিস একবার স্কুল চত্বর আর ট্রেনের বাইরে বেরিয়ে এলে জাদুশক্তি ব্যবহার করা যায় না। তাতে ঝামেলা হতে পারে।’ জেমস বললো।

‘আরে হাঁদারাম আমাদের ড্যাড হেড অরোর। আমি নিশ্চিত তোকে কোন ওয়ারনিং পর্যন্ত দেওয়া হবে না।’

জেমস গম্ভীরভাবে বললো, ‘সেটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচায়ক। তুই যখন বড় হবি তখন বুঝতে পারবি এর মানেটা কি।’

আ্যল্বাস ও কথায় কাননা দিয়ে বললো, ‘আসলে তোর জানাই নেই তাই না, কি করে শূন্যে ভাসাতে হয়? জেমস কৌশলটা জানে না! কি বাজে উইজার্ডরে তুই। পটার পরিবারের একেবারে অযোগ্য। মাম এটা জানতে পারলে লজ্জায় মরে যাবেন।’

‘তুই সেই দুষ্টু অ্যাল্বাস ব্ল্যাব্লাসই থেকে গেছিস।’

‘একদম ওটা বলে ডাকবি না আমাকে!’

‘কোনটারে, দুষ্টু নাকি অ্যাল্বাস ব্ল্যাব্লাস?’ জেমস হেসে বললো। ‘এমা তুই জানিস না অ্যাল্বাস ব্ল্যাব্লাসই তো তোর আসল নাম? তোর বার্থ সারটিফিকেটেও ওটাই লেখা আছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি।’

‘অ্যাল্বাস – ব্ল্যাব্লাস!’ লিলি সুর করে ডাকার সঙ্গে সঙ্গে নাচতে শুরু করলো অ্যাল্বাসকে ঘিরে।

আর সহ্য করতে না পেরে অ্যাল্বাস জেমসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।

আরো খানিকক্ষন পরে জেমস আর র‍্যালফকে দেখা গেল বেডরুমের দিকে যেতে। ওদের যাওয়ার পথে দেওয়ালের গায়ে একটা কালো পর্দা টাঙ্গানো ছিল। যেটার পেছন থেকে নাক ডাকার শব্দ ভেসে আসছিল।

জেমস জানালো, ‘মিসেস ব্ল্যাক বুড়ি। নচ্ছার পাজির পাঝাড়া। এটা ওনার বাবার বাড়ি ছিল। যখনই আমরা এখানে আসি উনিও এসে হাজির হয়ে যান। আর শুরু করেন বকরবকর। ড্যাড আর নেভিল অনেক চেষ্টা করেছে ওই ঝুলন্ত বাদুড়টাকে এখান থেকে হঠানোর কিন্তু পারা যায়নি। দেওয়ালের ওই অংশটা কেটে বাদ দেওয়ার কথাও ভাবা হয়েছিল যদিও সেটাও করা সম্ভব হয়নি।কারন এটাই বাড়িটার প্রধান দেওয়াল। ওটায় কিছু করতে গেলে ওপর তলা ভেঙে পড়ার চান্স আছে। ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠেকলেও ক্রিচারের সঙ্গে ওনার বেশ ভালো বনিবনা আছে। পুরানো মালকিন বলে কথা। তাই ধরেই নে এটা আমাদের পরিবারের একটা অঙ্গ হয়ে গেছে।’

র‍্যালফ সাবধানে পর্দাটা সরিয়ে উঁকি মারলো। ওর ভুরু ফুলে উঠলো ওপরের দিকে। ‘আরে…উনি টেলিভিশন দেখেন নাকি?’

জেমস কাঁধ ঝাঁকালো। ‘কয়েক বছর আগে আমরা ব্যাপারটা লক্ষ্য করি বুঝলি। নতুন একটা সোফা ঘরে ঢোকানোর জন্য ওই দরজাটা খোলা ছিল সেদিন। ওখান দিয়ে যে জানলাটা দেখা যায় ওটা দিয়ে তাকালে সামনের বাড়ির ভেতরের ঘরটা দেখা যায়। সেদিন ঘরটায় টিভি চলছিল। উনি সেটা দেখতে পেয়ে বকবকানি থমিয়ে দেন। অতএব একজন আর্টিস্ট ভাড়া করে আনা হয়, যিনি একটা ম্যাজিক্যাল টিভি উনার ছবির মধ্যে এঁকে দেন। বুড়ি চ্যাটশো দেখতে ভালোবাসে। ওটা করার পর থেকে অসুবিধা অনেকটাই কমে গেছে বলতে পারিস।’

র‍্যালফ আস্তে করে পর্দাটা ছেড়ে দিল। একটা মানুষের গলা ভেসে এলো,’ঠিক কখন বা কবে আপনি জানতে পারলেন আপনার কুকুরের ট্যুরেট সিনড্রোম আছে, মিসেস ড্রেকমন্ট?’

র‍্যালফের জন্য একটা আলাদা খাটের বন্দোবস্ত ক্রিচার করেই রেখেছে দেখা গেল। ট্রাঙ্কটা পায়ের কাছে রাখা আছে। সঙ্গেই একটা করে রিবন বাঁধা পাইনফল দুজনের বালিসে রাখা আছে। নিশ্চিত ভাবে ক্রিচারের বানানো ক্রিসমাস মিন্ট ওটা।

বিছানায় শুয়ে পড়ার পর  ঘুমজড়ানো কন্ঠে জেমস বললো, ‘এটা ড্যাডের গডফাদারের ঘর ছিল।’

‘দারুন ব্যাপার,’ র‍্যালফ বিড়বিড় করে বললো। ‘ কি রকম  মানুষ ছিলেন উনি? ভালো  নাকি ওই ছবির বুড়িটার মতই পাজির পাঝাড়া  ?’

‘ড্যাডের কথা মতো ওর দেখা অন্যতম একজন সেরা মানুষ। সময় পেলে তোকে একদিন ওর সম্বন্ধে বলবো। দশ বছর ধরে ওকে খোঁজা হয়েছিল একটা খুনের মামলায়।’

বেশ কিছুক্ষন নীরবতার পর অন্ধকারে র‍্যালফের গলা শোনা  গেল, ‘তোরা জাদুকররা  বেশ বিভ্রান্তিকর চরিত্রের মানুষ। সেটা জানিস কি?’

জেমস মুচকি হাসলো। আরও কিছুটা সময় পর বোঝা গেল দুজনেই ঘুমের জগতে চলে গেছে।

 

 

[চলবে]

লেখক পরিচিতিঃ  জর্জ নরম্যান লিপার্ট আমেরিকান লেখক এবং কম্পিউটার অ্যানিমেটর। তবে ওনার বর্তমান পরিচয় উনি জেমস পটার সিরিজের লেখক। যে কারনে ওনাকে “আমেরিকান রাউলিং” নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সিরিজের প্রথম লেখা “জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং” প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। নানান কারনে এটি অনেক বিতর্কে জড়িয়ে যায়। সেসব সমস্যা পেরিয়ে আজ এটি পাঠক পাঠিকাদের চাহিদায় সারা বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সিরিজের সব কটি বই ই-বুক এবং ফ্রি হিসাবেই প্রকাশ করেছেন মাননীয় জর্জ নরম্যান লিপারট। এই সিরিজ ছাড়াও ওনার আরো ১২ টি বই আছে। বর্তমানে উনি এরি, পেনসিল্ভ্যানিয়ার বাসিন্দা।

অনুবাদকের পরিচিতিঃ উপন্যাসটির অনুবাদক প্রতিম দাস মূলত চিত্র শিল্পী, ২০১৩ সাল থেকে ভারতের সমস্ত পাখি আঁকার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছেন। ৭৭৫+ প্রজাতির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে শুধু পাখি নয় অন্যান্য বিষয়েও ছবি আঁকা চলে একইসঙ্গে। দারুণ রকমের পাঠক, যা পান তাই পড়েন ধরনের। প্রিয় বিষয় রূপকথা, ফ্যান্টাসী, সায়েন্স ফিকশন, অলৌকিক। টুকটাক গল্প লেখার সঙ্গে আছে অনুবাদের শখ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!