জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং – পার্ট ১৬

জি নরম্যান লিপার্ট, ভাষান্তরঃ প্রতিম দাস

অলংকরণ:মূল প্রচ্ছদ, সুদীপ দেব

ষোড়শ অধ্যায়

মারলিনের জাদু লাঠির বিপর্যয়

রের দিন সকালে জেমস, র‍্যালফ আর জ্যান গ্রেট হলে ব্রেকফাস্ট করতে এসে সোজা গ্রিফিন্ডোর টেবিলের শেষ প্রান্তের দিকে এগিয়ে গেল।

হলের ভেতর দিকে হেঁটে যেতে যেতে র‍্যালফ বলল, ‘তুই নিশ্চিত তো এ ব্যাপারে? আশা করি বুঝতে পারছিস এখান ফেরার কোনও পথ আর আমাদের সামনে খোলা থাকবে না।’

জেমস ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল, কিন্তু কোনও কথা বলল না। আশেপাশে টেড, নোয়া এবং অন্যান্য গ্রেমলিন সদস্যরা সব আগে থেকেই বসে আছে।

‘এই তো আসল লোক এসে গেছে,’ জেমস, টেড আর সাব্রিনার মাঝের জায়গাটায় ঢুকে বসতেই, টেড বলল। ‘জানিস জেমস, আমরা নিজেদের ভেতর বাজি ধরছিলাম কেন তুই আমাদের সবাইকে আজ সকালে ব্রেকফাস্টের সময় এক জায়গায় জড়ো হতে বলেছিস এই নিয়ে। নোয়ার ধারণা তুই অফিসিয়ালি গ্রেমলিন সদস্য হতে চাস এটা ঘোষণা করবি। সেক্ষেত্রে তোকে কিছু সাঙ্ঘাতিক পরীক্ষা দিতে হবে। সেক্ষেত্রে আমার সবচেয়ে পছন্দের চ্যালেঞ্জটা হল তোকে সাব্রিনার একটা গাউন পরে হগওয়ারটস স্কুলকে নিয়ে লেখা একটা গান গাইতে গাইতে গোটা স্কুল চত্বরে পাক মারতে হবে। আরও অনেক কিছু থাকবে তারপরেও। ডামিয়েন আবার শামুক আর সরষের ঝোল খাওয়ার চ্যালেঞ্জটাও দিতে পারে।’

জেমস দাঁত কিড়মিড় করে বলল, ‘আমরা তিনজন তোমাদের সবাইকে ডেকেছি একটা বিশেষ ব্যাপার জানার জন্য।’ গ্রেমলীনদের কাউকেই তেমন অবাক হতে দেখা গেল না। ওরা নিজের নিজের খাওয়ার দিকে মন দিল। জেমস বুঝতে পারছিল না কোথা থেকে কথা শুরু করবে। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ও বুঝতে পেরেছে একদিনের মধ্যে মারলিনের জাদু লাঠি হাতানো ওদের তিনজনের পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়। তা ছাড়া ওদের কোনও নির্দিষ্ট প্ল্যানও নেই এই মুহূর্তে। স্নেপের পোরট্রেট কিছু সাহায্য করতে পারত হয়তো, কিন্তু উনি তো বিশ্বাসই করেন না যে টাবিথার কাছে লাঠিটা আছে। তাহলে কার সাহায্য নেওয়া যায়? আর সেক্ষেত্রে ওর যাদের কথা প্রথম মাথায় এল তারা একটা গ্রুপ যারা এই স্কুলে বিখ্যাত বা কুখ্যাত এবং দক্ষ বিভিন্ন রকম দুষ্টমি আর গণ্ডগোল পাকানোর জন্য। অনেকটা সময় লাগবে সব কিছু খুলে বলতে হলে টেড সহ অন্য গ্রেমলিন সদস্যদের। হয়তো সব শুনে ওরা সাহায্য করবেই না। কিন্তু এটাই শেষ আশা ওর কাছে। জেমস একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে নিজের পামকিন জ্যুসের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমরা তোমাদের সাহায্য চাই… একটা জিনিস হাতিয়ে আনার জন্য? এক অর্থে!’

‘ধার করাও বলতে পারো’ নোয়া পুনরাবৃত্তি করল কথাটা প্রশ্নসূচকভাবে। ‘কি সেটা? অর্থ? এক কাপ চিনি? বিশেষ ধরনের কারো মাথার চুল? এসব নিশ্চয় তুই চাইছিস না।’

‘মেটজকার বকবক থামা,’ টেড বলল। ‘জেমস কি হাতাতে চাইছিস বল দেখি?’

জেমস আবার একটা বড় শ্বাস নিয়ে ঝট করে বলল, ‘টাবিথা করসিকার উড়ুক্কু ঝাড়ু।’

ডামিয়েন জ্যুসে চুমুক দিতে গিয়ে কেশে ফেলল। বাকি গ্রেমলিন সদস্যরা চোখ বড় বড় করে তাকাল জেমসের দিকে। কেবলমাত্র টেড ছাড়া। সাব্রিনা চাপা স্বরে জানতে চাইল, ‘কী জন্য জানতে পারি কি? আজ রাতেই তো স্লিদারিন আর র‍্যাভেনক্ল এর খেলা। সেটাই কারণ নাকি? তুই কি চাইছিস স্লিদারিনদের জেতার আশাটাকে নষ্ট করতে? আমি মানছি যে ওর ঝাড়ুটায় কিছু একটা ব্যাপার আছে, কিন্তু এভাবে চিটিং করাটা তোর ঠিক নয় জেমস।’

‘না এর সঙ্গে ম্যাচের কোনও সম্পর্ক নেই,’ জেমস বলল। ‘সব খুলে বলার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। আমার অনুমতিও নেই এই ব্যাপারটা সবাইকে খুলে বলার। ম্যাকগনাগল ম্যাম আমাকে এ ব্যাপারে একটা কথাও বলতে নিষেধ করেছেন।’

পেট্রা বলল, ‘যতটা বলা সম্ভব সেটাই বল তাহলে।’

‘ঠিক আছে। জ্যান আর র‍্যালফ আমাকে সাহায্য করবি। যদি তোদের মনে হয় আমি কিছু মিস করে যাচ্ছি। শুনতে ব্যাপারটা আজব লাগবে হয়তো, কিন্তু তবুও বলছি।’ তিনজন মিলে এরপর ওদের সামনে শোনালো মারলিন ষড়যন্ত্রের পুরো কাহিনি। মাদাম ডেলাক্রয়কে লেকের ওপর দেখা থেকে শুরু করে লুক্কায়িত দ্বীপের রহস্য। তারপর বলল র‍্যালফ আর জেমসের কাছে ভুতুড়ে ড্রায়াডের মারলিনের পোশাক ফেরত চাওয়ার অংশটাও। সঙ্গেই জানালো কিভাবে ওরা প্রফেসর জ্যাক্সনের কাছে থেকে পোশাকটা হাতিয়েছে। জেমসের ভয় হচ্ছিল এতো খাপছাড়াভাবে ওরা সব ঘটনা বলছে যে গ্রেমলিনরা ঠিকঠাক বুঝতে পারছে কিনা। টেড মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিল খেতে খেতে বক্তার মুখের দিকে তাকিয়ে। বাকি গ্রেমলিন সদস্যরা মাঝে মাঝেই ছুঁড়ে দিচ্ছিল প্রশ্ন। যাতে মিশে থাকছিল সন্দেহ, উৎকণ্ঠা এবং উত্তেজনা।

ডামিয়েন ভুরু কুঁচকে বলল, ‘তোরা এতদিন ধরে এই ব্যাপারটা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিলি আর আজ এসব জানাচ্ছিস আমাদের?’

‘আমি তো বললামই, ম্যাকগনাগল ম্যাম আমাদের বারণ করেছিলেন লুক্কায়িত দ্বীপ বিষয়ে কাউকে যেন কোন কথা না বলি,’ জেমস গম্ভীর গলায় বলল। ‘তা ছাড়া আমাদের কেন জানি না মনে হয়েছিল তোমরা এসব বিশ্বাস করবে না। আমাদের নিজেদেরই প্রচুর সময় লেগেছে পুরো ব্যাপারটাকে ঠিকঠাক বুঝতে। আশা করছি তোমরা বুঝতে পারছ আমি কি বলতে চাইছি। এবার বলো তোমাদের মতামত?’

সাব্রিনা ভুরু উঁচিয়ে বলল, ‘আমার কাছে সবটা পরিষ্কার নয়। ঘটনাগুলো একে ওপরের সঙ্গে জড়িয়ে মিশিয়ে আছে এটা বুঝতে পারছি। ডিবেট চলাকালীন সময়ে আতসবাজির খেলা দেখানো এক জিনিস। আর এই স্কুলের অন্যতম ভয়ানক জাদুকরী, এটা একেবারেই আমার নিজস্ব মত। তার এলাকায় গিয়ে তারই উড়ুক্কু ঝাড়ু হাতিয়ে আনা একেবারেই আলাদা ব্যাপার। মানে চুরি মতো কথাটা এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।’

জ্যান বলল, ‘এটা কে আমরা চুরি তখনই বলতে পারি যখন প্রমাণিত হবে আমাদের কথা মিথ্যে। যদি টাবিথার ঝাড়ুটা সত্যিই মারলিনের জাদুলাঠি হয় তাহলে ওটা মোটেই ওর নয়। আমিও জানি না ওটা কার, সেটা কোনও ব্যাপার না, একদিক থেকে টাবিথাও তো তাহলে ওটা চুরি করে বেআইনি ব্যবহার করছে।’

দামিয়েন তবু পুরো সন্তুষ্ট হতে না পেরে বলল, ‘ঠিক আছে, যদি ধরেনি টাবিথা কাজটা করেছে, তাহলে আমরাই একমাত্র যারা ব্যাপারটা জানি। যদি ও আমাদের বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে হেডমিস্ট্রেসের অফিসে যায়, তাহলে আমরা কী উত্তর দেব? আমরা জানি না ও কার কাছ থেকে ওটা চুরি করেছে। যদি ওটা সবচেয়ে সেরা জাদুকরের জাদুলাঠি হয়, তাহলে ওটা করসিকার কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়ে জগতের আমারা ঠিক কী ভালোটা করতে চলেছি? ওটা তো একটা মরা প্যাঁচার মতো ওড়া ছাড়া আর কিছুই করে না।’

‘সত্যি না হওয়ার কি আছে?’ র‍্যালফ বলল। ‘যদি বাকি সব সত্যি বলে ধরে থাকি তাহলে এটাও সত্যিই।’

নোয়া একটু বিকৃত হাসি হেসে বলল, ‘কথাটা কে বলছে দেখতে হবে এবার। একজন স্লিদারিন।’

র‍্যালফ চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘একথার মানেটা জানতে পারি কি?’

জেমস মাথা নাড়ল, ‘র‍্যালফ ওটা নিয়ে ভাবতে হবে না। ও তোর পেছনে লাগছে। এখানে আসল কথাটা হল যদি আমাদের কথা সত্যিও হয়, তবু সেটা প্রমাণ করার সুযোগ নেই। আমি চাইছি না তোমরা কেউ এই ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ো। আমি শুধু বলতে চাই যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে চুরির দায়ে ম্যাকগনাগল ম্যামের অফিসে যাওয়াটা খুব সাধারণ ব্যাপার। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি চাও এ ব্যাপারে জড়াতে না চাও আমি মোটেও জোর করব না। জানি এটা ঝুঁকির কাজ। এর কারণে দারুণ রকমের একটা ঝামেলায় আমরা জড়িয়ে যেতে পারি। আমাদের সেরা চেষ্টা করে আমরা সফল নাও হতে পারি।’

‘এবার তুই একটু বকবক করাটা থামা,’ নোয়া বলল, ‘ভুলে যাস না কাদের সামনে কথাগুলো বলছিস। গ্রেমলিনদের সামনে।’

পেট্রা সোজা হয়ে বসল এবং সকলের দিকে একবার তাকিয়ে নিল, ‘মোদ্দা কথা যদি জেমস, র‍্যালফ আর জ্যান এর কথা ভুল হয়, আমরা কালকেই সেটা জানতে পেরে যাব। যদি করসিকার ঝাড়ু ধার মানে হাতিয়ে আনতে পারি, আমরা ওটা ফেরত দিতেও পারব কোনও না কোনওভাবে। সম্ভবত কোনওরকম ঝামেলা ছাড়াই। তাতে কোনও ক্ষতি বা পেনাল্টি হবে না বলেই আমার ধারণা। সবাই ধরেই নেবে এটা একটা কুইডিচ খেলা নিয়ে করা দুষ্টুমি। এভাবেও তো ভাবা যেতে পারে, নাকি? কিন্তু যদি ওদের গল্প সত্যি হয় এবং ঝাড়ুটা আসলে মারলিনের জাদুলাঠি হয়, তাহলে কাউকেই হেড মিস্ট্রেসের অফিসে যেতে হবে বলে মনে হয় না।’

সাব্রিনা কৌতূহলী কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘কেন যেতে হবে না?’

‘কারণ টাবিথা অনেক গভীর জলের মাছ ধরার জন্য,’ নোয়া বলল চিন্তামগ্ন কন্ঠে। ‘যদি টাবিথা এই ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে থাকে এবং জাদুলাঠির দায়িত্ব পালনে সক্ষম না হয়, তাহলে নিশ্চিত ভাবে ওকে দারুণ কোনও শাস্তি পেতে হবে। এরকম কাজের পরিকল্পনা যারা করে তারা এধরনের ভুলকে সহজে ক্ষমা করে না এটা বোঝা কঠিন নয়। এমনও হতে পারে যে আমরা আর ওর দেখাই পাবো না।’

পেট্রা বিড়বিড় করে বলল, ‘এটা কেবলমাত্র একটা আশা।’

টেড নিজেকে একবার ঝাঁকিয়ে নিল। ‘সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলছি। আপাতত সব কিছু আমাদের সামনে পরিষ্কার, শুধু আমার দিক থেকে একটাই চিন্তার বিষয়। আর সেটার ব্যাপারেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা কি জেমসের কথায় বিশ্বাস করতে পারি? আমি নিজে জ্যান আর র‍্যালফের কথা বলতে পারব না, কিন্তু জেমস আমার চোখের সামনে বড় হয়েছে। ও হয়তো মাঝে মাঝে গোঁয়ার্তুমি করে, কিন্তু ওর সততা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র প্রশ্ন নেই। সঙ্গে সঙ্গেই ও আমার গডফাদারের ছেলে। আর তোরা সেই মানুষটাকে তো ভালভাবেই চিনিস। কি তাইতো? আমি ওর জন্য এই ছোট্ট ঝুঁকিটা নিতে তৈরি। এর কারণ শুধু এটা নয় যে ও আমার পরিবারের অংশ, কারণটা হল ও একজন পটার। ও যদি বলে এই লড়াইটা দরকারি, তাহলে জানিয়ে রাখছি আমি একপা এগিয়ে রাখলাম ওর সঙ্গে থাকার জন্য।’

‘দারুণ বলেছিস মাইরি,’ নোয়া বলল চাপা স্বরে, টেডের পিঠে চাপড় মেরে। ‘সঙ্গে সঙ্গেই এটা ভুললে চলবে না এর মাধ্যমে আমরা টাবিথা করসিকার কাছে হারটাকে সমান করে নিতে পারব।’

সাব্রিনা বলল, ‘এটা করতে পারলে আজ রাতের কুইডিচ ম্যাচটাও সঠিক মানের হবে।’

ডামিয়েন মিচকি হেসে বলল, ‘যখন ও আকাশে ওপরে থাকবে তখনই ঝাড়ুটা কেড়ে নিতে পারব বোধহয় যেন তেন প্রকারে।’

‘আমিও সেটাই বলেছি!’ জ্যান সমর্থনের কণ্ঠে বলল।

পেট্রা ধমকের স্বরে বলল, ‘তোরা দুটোই পাগল। একেবারে ওর মতোই বদমাইশ।’

জ্যান থমথমে গলায় বলল, ‘আমরা ওকে মেরে ফেলতে চাইছি না। চাইছি কয়েকশো ফুট ও পড়তে থাকুক ওপর থেকে। রিডকালি নিশ্চিতভাবে ওকে শেষ মুহূর্তে মাটিতে আছড়ে পড়া থেকে বাঁচিয়ে দেবেন। ঠিক যেমনটা র‍্যালফিনেটর করেছিল জেমসের জন্য। এরপর তুমি আমাদের রাক্ষস বলে ভাবতে চাইলে ভাবতেই পারো।’

টেড জানতে চাইল, ‘তাহলে আমরা সবাই এই কাজটার পক্ষে?’ সকলেই মাথা ঝুঁকিয়ে সমর্থন জানিয়ে চাপা গলায় কথা বলা শুরু করল।

র‍্যালফ জানতে চাইল, ‘এটা দারুণ ব্যাপার যে আমরা সবাই এক সঙ্গে এটা করতে চলেছি। কিন্তু কাজটা কীভাবে শুরু করব আমরা?’

টেড হেলান দিয়ে বসে ওপরে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থুতনিতে আঙুল দিয়ে ঠুকতে শুরু করল। একসময় একটা হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। ‘কারোর কোনও আইডিয়া আছে আজ রাতে কীরকম আবহাওয়া হতে পারে?’

************

 

সেরকম কিছুই নেই যা করার জন্য গ্রেমলিনদের প্রস্তুতি নিতে হবে। লাঞ্চের পর সাব্রিনা আর নোয়া চলল বেসমেন্টের দিকে হাউস এলফদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। জেমস আর টেড বিকেলের দিকে একটা ক্লাস ফাঁকা পেয়ে লাইব্রেরিতে সময় কাটাল বিশাল বিশাল কিছু বায়ুমণ্ডল এবং আবহাওয়া-মন্ত্র বিষয়ক বই পড়ে।

টেড বলল, ‘এসব পেট্রার বিষয়, সত্যি বলছি। আজ বিকেলে যদি ওকে ডিভাইনেশন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে না হত আমাদের পক্ষে কাজের কাজ হত।’

জেমস একটা লেখার ওপর চোখ বুলিয়ে বলল, ‘মনে হচ্ছে আমাদের দরকারি জিনিস আমার পেয়ে গেছি, কি বলিস?’

‘মনে হয়,’ টেড হাল্কাচ্ছলে উত্তর দিয়ে একটা বিরাট মাপের কাগজ ভাঁজ করল। মিনিটখানেক পর জেমসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়াটা তোর কাছে খুব কঠিন ব্যাপার, তাই না?’

জেমস টেডের দিকে তাকাল, তাকাল ওর চোখের দিকে, সেখান থেকে কাছের এক জানলার দিকে, ‘হ্যাঁ, একটু কঠিন তো বটেই। আমি জানতাম না ঠিকঠাক বোঝাতে পারব না। আমি এটাও জানতাম না তোরা ওটা বিশ্বাস করবি কিনা?’

টেড ভুরু ওপরে তুলে বলল, ‘শুধু এই?’

‘দেখ…,’ জেমস বলতে শুরু করেও থেমে গেল। হাতের কলমটা নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, ‘না আমারও তা মনে হয় না। এটা অনেকটা কি বলব… অনেকটা সেইরকম কাজ যা আমি নিজে করতে চেয়েছি। অস্বীকার করব না জ্যান আর র‍্যালফ প্রচুর সাহায্য করেছে। ওরা প্রথম থেকে আমার সঙ্গে থেকেছে। কিন্তু তবুও। আমাদের মধ্যে আমিই এটা নিয়ে বেশি ভাবলেও আসলে আমরা তিনজনেই কাজটা করতে পেরেছি। আমি ওটাকে রূপ দিতে পেরেছি। এর অনুভূতিটা অনেকটা…’ থেমে গেল জেমস, বুঝতে পারল ও যেটা বলতে চাইছে, সেটা আশ্চর্য ধরনের কথা।

টেড জানতে চাইল, ‘অনেকটা কীসের মতো?’

জেমস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘অনেকটা পরাজয়ের মতো। মানে আমরা যদি তিনজন এটা করতে না পারি, তাহলে আমরা তো আসলে হেরেই গেলাম।’

‘তোরা তিনজন। ঠিক যেমন তোর ড্যাড, রন আর হারমাইওনি।’

জেমস তাকালো টেডের দিকে। ‘কি? না… না…’ বলল বটে কিন্তু ওর নিজেরই মনে হল কোনও জোর নেই কথাটায়।

‘আমি এমনিই বললাম,’ টেড জানাল। ‘এরকম ভাবলে একটা মানে দাঁড়ায় কিনা তাই। এভাবেই তো তোর ড্যাড কাজ করেছিলেন। উনি ছিলেন অনেক বড় মাপের একজন যিনি এই বিশ্বের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন। সেই বোঝা বওয়ার কষ্ট কাউকে পেতে দিতে চাননি। কেবলমাত্র নিজে, রন আর হারমাইওনি। কিন্তু জানিস আশেপাশে অনেক মানুষ আছে যারা তোকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত, মাঝে মাঝে তারা সেটা করেনও। কিন্তু সেটা করার জন্য তাদেরকে ঠিকঠাক উস্কে দিতে হয়।’

জেমস চাপা স্বরে বলল, ‘তুই স্নেপের মতো কথা বলছিস।’ এই মুহূর্তে অদ্ভুত একটা অস্বস্তির অনুভুতি ওকে ঘিরে ধরছে।

টেড উত্তরে বলল, ‘দেখ মানি বা না মানি ওই হামবড়া ভাব নিয়ে থাকা বুড়ো স্নেপও হয়তো সঠিক কথাই বলেন মাঝে মধ্যে।’

দু চোখে জল আসছে এরকম একটা অনুভুতিতে অবাক হয়ে জেমস বলল, ‘বাদ দে ওঁর কথা।’ কয়েকবার চোখ পিটপিট করে জলটাকে সামলে নিয়ে পুনরায় বলল, ‘উনি সত্যি করেই সাহায্য করার জন্যেই ছিলেন তাই না? দু-পক্ষেই যাতায়াত বজায় রেখে, পরিষ্কার করে কাউকেই বুঝতে দেননি ওর আনুগত্য আসলে কোন দিকে। আর সেটা করতে গিয়ে সব গণ্ডগোল বেঁধেছিল, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল বুঝতে সকলের। এর জন্য কি তুই আমার ড্যাডকে দায়ী করতে পারিস? ঠিক এই জন্যই আমিও ওকে বিশ্বাস করতে পারি না। হয়তো আমার ড্যাড অনেক কাজ করেছিলেন রন আঙ্কল আর হারমাইওনি আন্টিকে সঙ্গে নিয়ে। বোধহয় তার দরকারও ছিল। তাই না? ওরা জিতেছিলেন। উনি এমন দুজনকে সঙ্গে পেয়েছিলেন যাদের উনি সবসময় বিশ্বাস করতে পারতেন। আমিও পেয়েছি সেরকম দুজনকে। আমার সঙ্গে আছে র‍্যালফ আর জ্যান। সে কারনেই আমিও ড্যাডের মতোই ভালো ফলের আশা করি। কিন্তু এটাও জানি আমি ড্যাডের মতো নই মোটেই। অতএব আমার সাহায্য দরকার।’ আরও অনেক কথা বলার ছিল জেমসের, কিন্তু ও থেমে গেল। কারণ সাজিয়ে গুছিয়ে যে বলতে পারছে না সেটা বুঝতে পারছিল। এটাও বুঝতে পারছিল না আর কিছু বলা উচিত কিনা।

টেড অনেকক্ষণ চিন্তামগ্ন চোখে জেমসের দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর টেবিলে কনুইয়ের ভর রেখে ঝুঁকে বলল, ‘আসলে এটা তোর ড্যাডের বিশাল ছায়ার তলায় দিন কাটানোর প্রশ্ন, ঠিক কিনা বল?’ জেমস কোনও উত্তর দিল না। একটু পরে টেড আবার বলতে শুরু করল, ‘আমি আমার ড্যাডকে জানা বা বোঝার সুযোগই পাইনি। উনি এখানেই মারা গিয়েছিলেন, এই স্কুল চত্বরে। সঙ্গেই মামও। ওরা অংশ নিয়েছিলেন ব্যাটল অব হগওয়ারটসে। তোকে আর কি বলব। সবই তো জানিস। তুই হয়তো ভাববি যে সমস্ত মানুষদের চেনাজানার সুযোগ হয়নি তাদের প্রভাব অনুভব করা যায় না। কিন্তু সেটা সত্যি না। আমি ওদের মৃত্যুর প্রভাব অনুভব করি। মাঝে মাঝে তো এটাও অনুভব করি ওরা এখানেই আছেন। মানে বলতে চাইছি যে বুঝতে পারি ওরা কি ভাবছেন? দুজনেই চলে গেলেন এক মহান যুদ্ধে অংশ নিতে। বাড়িতে থেকে গেল ওদের সন্তান। তোর কি মনে হয় এটা দায়িত্বের পরিচায়ক? আমার তো মনে হয় না।’ টেড এবার সেই জানলাটার দিকে তাকালো যেটার দিকে একটু আগে জেমস তাকিয়েছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘তবে হ্যাঁ এটা বলতেই পারি আমি ওদের জন্য গর্ব অনুভব করি। একদা কোনও একজন বলেছিলেন তোমার মৃত্যুর কারনটা যদি দামি না হয় তাহলে জীবনটাই বৃথা। মাম আর ড্যাড সেরকম একটা দামি মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তাদেরকে হারিয়েছি বদলে একটা সম্মানের ভাগীদার হয়েছি। যে সম্মানটা অতি মূল্যবান, কি বলিস?’ আবার জেমসের দিকে তাকাল টেড, সরাসরি মুখের দিকে। জেমস সম্মতির ভঙ্গীতে মাথা নামাল, ভাষা খুঁজে পেল না কিছু বলার। টেড কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘এই কথাগুলো বললাম, কারণ আমার ড্যাড নিশ্চিত আমাকে কিছু একটা করার জন্য পেছনে ফেলে রেখে গিয়েছিলেন।’

অন্তত এক মিনিট চুপ করে থাকল টেড, নিজের সঙ্গে নিজের মনের জগতে একটা টানাপোড়েন সামলানোর জন্য। তারপর বলল, ‘ড্যাড একজন ওয়ারউলফ ছিলেন। আমার কাছে এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। তুই এটা জানতিস না বোধহয়?’

জেমস নিজের চমকে যাওয়া মুখাবয়ব না দেখানোর চেষ্টা করল। ও জানতো রেমাস লুপিনের একটা রহস্যজনক ব্যাপার ছিল। যা কোনওদিন ওর সামনে আলোচিত হয়নি। জেমস শুধু এটা জানতো যে রেমাস ছিলেন সিরিয়াস ব্ল্যাক, প্রথম জেমস পটার আর পিটার পেত্তিগ্রিউ এর বন্ধু। শেষ লোকটি ওদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকটা করেছিল। জেমস জানতো ওর ড্যাডের সময়ে রেমাস এই স্কুলে এসেছিলেন শিক্ষকতা করার জন্য। রেমাস লুপিন ওর ড্যাডকে শিখিয়েছিলেন কী করে রক্ষক পূর্বপুরুষদের আহ্বান করতে হয়। রেমাসের অতীতের সব কিছু কেন অত গোপন? কী তার বিশেষত্ব? উনি তেমন বিশেষ কোনও সাংঘাতিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলেই জেমস অনুমান করেছিল। সে মনে করত অল্পবয়সে ডার্ক আর্টের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে টেডের বাবা আজকাবানে বন্দী ছিলেন কিছুদিনের জন্য। কিন্তু এটা জেমস কখনওই ভাবতে পারেনি যে রেমাস ওয়ারউলফ ছিলেন।

জেমস চমকে যাওয়ার ভাবটা প্রকাশ করতে না চাইলেও টেড কিন্তু বুঝতে পারল ব্যাপারটা। ‘চমকানোর কিছু নেই, এটা সত্যিই দারুণ রকমের সিক্রেট। কয়েক বছর আগে, আমার ঠিকঠাক বোঝার মতো বয়েস হওয়ার পর তোর ড্যাড আমাকে এ বিষয়ে খুলে বলেছিলেন। গ্র্যান্ডমাম অবশ্য কখনও এ নিয়ে একটাও কথা বলেননি। আজও বলেন না। আমার মনে হয় উনি ভয় পান। ব্যাপারটা যা ছিল সেটার বিষয়ে নয়, বরং …যাকে বলে, কি হতে পারে এটা ভেবে।’

জেমস একটু ভয়ের সঙ্গেই প্রশ্নটা করলো, ‘কি হতে পারে মানেটা কি টেড?’

টেড কাঁধ উঁচু করে বলল, ‘তুইতো জানিস ওয়ারউলফ ব্যাপারটা কি। ওরকম হতে পারার দুটো উপায় আছে। হয় তোকে ওয়ারউলফ কামড়াবে অথবা তোর জন্ম হবে ওরকম কারও সম্পর্ক থেকে। অবশ্য এটাও ঠিক করে কেউ জানে না কেবলমাত্র বাবা বা মা ওয়ারউলফ হলে কি হয়। হ্যারি আমায় বলেছিলেন ড্যাড নাকি খুশি হতে পারেননি মামের পেটে আমার আসার খবরটা শুনে। ভয় পেয়েছিলেন বুঝতে পারছিস বোধহয়? উনি চাননি ওঁর সন্তান ওঁর মতোই হোক। যাকে বাঁচতে হবে সমাজের অংশ না হয়ে, অভিশপ্ত হয়ে, ঘৃণার পাত্র হয়ে। উনি মামকে বিয়ে করতেও চাননি, কারন মামের দাবি ছিল সন্তানের। ড্যাডের ভয় ছিল ওঁর অভিশপ্ত জীবনের ছাপ পড়বে আগত সন্তানের ওপর। আমি যখন জন্ম নিলাম আমার মনে হয় সকলেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। কারণ আমি ছিলাম একেবারে স্বাভাবিক। হ্যাঁ, মায়ের মেটামরফম্যাগাস শক্তি পেয়েছিলাম। শুনেছি ছোটবেলায় আমার চুলের রং পলকে পলকে বদলে যেত। এটা অবশ্য গ্র্যান্ডম্যাম হাসতে হাসতেই বলে থাকেন। জানিস আমি এখনও এটা করতে পারি, সঙ্গে আরও কিছু। যদিও সেসব আমি করি না। একবার যদি তুই জানতে পারিস তোর এই ধরনের ক্ষমতা আছে তাহলে সেটা বেশি মানুষ জানুক তুই মোটেই চাইবি না। আশা করছি আমি কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছিস। সেখান থেকেই আমি বুঝতে পারি ড্যাড মারা গেছেন চিন্তা মুক্ত হয়ে। উনি জেনে গেছেন আমি স্বাভাবিক, সামান্য কিছু ব্যাপার ছাড়া। এর জন্য আমি গর্বিত।’ টেড আবার জানলার দিকে তাকাল। বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে জেমসের দিকে তাকাল। ‘হ্যারি আমায় বলেছেন কীভাবে তোর দাদু প্রথম জেমস পটার, সিরিয়াস ব্ল্যাক আর পেত্তিগ্রিউ সবসময় ড্যাডের সঙ্গে থাকতেন। যখন পূর্ণ চাঁদের আলোয় ড্যাড বদলে যেতেন পশুতে। ওরা ওকে পাহারা দিতেন যাতে মানব জগতের সঙ্গে কোনও সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি না হয়। আমার তো প্রথমে শুনে মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা যথেষ্ট রোমাঞ্চকর ও রোম্যান্টিক। কারণ মাগলদের গল্প পড়ে পড়ে ধারণা হয়েছিল ওয়ারউলফরা সব হ্যান্ডসাম, আবেদনময় এবং রহস্যজনক। আমিতো মনে মনে চাইছিলাম আমি যেন ওয়ারউলফ হতে পারি। আর তারপরই…’ টেড থেমে গেল, একটা টানাপোড়েন ওর মনে। কণ্ঠস্বরের মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে বলল, ‘আসলে, ব্যাপারটা হল, কেউ ঠিকমতো জানেই না ওয়ারউলফদের আচরণ কেমন, জানে কি? আমি এটা নিয়ে বেশি ভাবিইনি কখনও। কিন্তু, গত বছর… গত বছর, আমার অনিদ্রা শুরু হয়েছে। সেটা কোনও বড় ব্যাপার নয় কি বলিস? কিন্তু যদি সেটা স্বাভাবিক অনিদ্রা না হয়। আমার ঘুম হচ্ছিল না, তার কারণ খাটাখাটনি কম হওয়া নয় মোটেই। আমি… আমি…’ থেমে গেল টেড, হেলান দিয়ে বসে জানলা দিয়ে বাইরের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকল একদৃষ্টে।

‘এই টেড,’ জেমস ডাকল, আওয়াজে ভয় ও হতভম্বতা মেশানো, জানে না কি তার কারণ। ‘তোর এসব কথা আমাকে বলার দরকারই ছিল না। ভুলে যা সব কিছু। ওটা কোনও ভাবার ব্যাপার নয়।’

‘না,’ টেড উত্তর দিল জেমসের দিকে পুনরায় তাকিয়ে, ‘আমার দরকার ছিল তোকে বলার। যতটা আমার নিজের জন্য ততটাই তোর জন্যও। কারণ এটা আমি এখনও কাউকে বলিনি, গ্র্যান্ডমামকেও না। আমার মনে হচ্ছিল আমি যদি কাউকে বলতে না পারি তাহলে আমি পাগল হয়ে যাব। আমি কেন ঘুমাতে পারছিলাম না জানিস, কারণ আমার দারুন খিদে পাচ্ছিল। খিদের অনুভুতি! আমি ক্ষুধার্ত! বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে এই অনুভুতিটা আমার প্রথম হয়, নিজেকে বোঝাতে চেয়েছিলাম এটা একটা পাগলামো ছাড়া আর কিছু না। আমিতো পেটভরে ডিনার করেছি, যে সময় রোজ করি। কিন্তু নিজের মনকে যাই বলি না কেন আমার পাকস্থলী জানান দিচ্ছিল ওর খাবার দরকার। আর সেটা সাধারণ কোনও খাবার নয়। সে চাইছে মাংস। কাঁচা মাংস। হাড়ের গা থেকে ছিঁড়ে নিতে হবে। বুঝতে পারছিস আমি কি বলছি?’

জেমস ভালই বুঝতে পারলো, ‘ওই দিন …,’ বলতে শুরু করে গলাটা একবার ঝেড়ে নিল। ‘ওই দিন কি পূর্ণিমা ছিল?’

টেড গম্ভীরভাবে ধীরে মাথা নাড়ল ইতিবাচকভাবে। ‘এরপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। গত বছর স্কুলের শেষ দিনগুলোতে আমি যেতে শুরু করি গ্রেটহলের তলার রান্না ঘরে, যেখানে এলফরা কাজ করে। ওদের একটা বিরাট মাংসের লকার আছে ওখানে। আমি শুরু করি… আশা করি বুঝতেই পারছিস। আমি খেতে থাকি। একটা সাংঘাতিক রকমের পরিনতির দিকে যাচ্ছে বুঝতেই পারছি।’ টেড কেঁপে উঠল, সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘যাই হোক, আসল কথা হল, আমি ওয়ারউলফে পরিণত হওয়ার ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলতে পারতে পারব না। আমার ড্যাডও আমাকে একটা ছায়া দিয়ে গেছেন জীবনভোর বয়ে বেড়ানোর জন্য। কি বলিস? আমি মোটেই এর জন্য ওঁকে দায়ী করছি না। শুধু এটা জানি, এটার সবচেয়ে খারাপটা কি হতে পারে। সেটা অবশ্য খুব একটা খারাপ কিছু না। এটা আমাকে কুইডিচ খেলার ক্ষেত্রে ভালোই সাহায্য করছে। কিন্তু… এটা একটা ভয় পাওয়ার মতোই ব্যাপার। আমি জানি না এটাকে কি করে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এটা নিয়ে আর কারোর সঙ্গে আলোচনাও করতে পারছি না। মানুষ…’ টেড ঢোঁক গিলে জেমসের দিকে তাকাল। ‘মানুষ ওয়ারউলফদের মোটেই ভালো চোখে দেখে না।’

জেমস বুঝতে পারছে না টেডের কথাকে সমর্থন করবে না কি করবে না। কারণ এটা নয় যে কথাটা অসত্য, কারণ এটা যে ও নিশ্চিত হতে পারছে না টেডের এ ব্যাপারে ও আর সায় দেবে কিনা। বলল, ‘আমার ড্যাড তোকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে এটা বলতে পারি। আর আমার দিক থেকে বলতে পারি আমি একটুও ভয় পাচ্ছি না তোকে, সে তুই ওয়ারউলফ হোস বা না হোস। আমি তোকে ছোট থেকে চিনি। আচ্ছা আমরা দুজন তো এ ব্যাপারটার একটা সমাধান বার করতে পারি। যেভাবে তোর ড্যাড আর ওঁর বন্ধুরা করতেন। ওঁর একজন জেমস পটার ছিল, তোরও একজন জেমস পটার আছে।’

টেড হাসল, আর সেটা একটা সত্যিকারের হাসি। ‘তোর মাংসের স্বাদ মোটেই ভালো না। আমার মোটেই খেতে ভালো লাগবে না। শিখেনে তো কীভাবে নিজেকে বিশাল মাপের কুকুরে বদলে নেওয়া যায়। যেভাবে সিরিয়াস ব্ল্যাক করতেন। তাহলে হয়তো ওয়ারউলফ হওয়াটা তত খারাপ লাগবে না। দুজন মিলে এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াব। ধুসসস! কথা বলতে বলতে আমি তো ভুলেই গেছি আসল কথাটা, যেটা বলার জন্য তোকে এসব বললাম।’ টেড সামনের দিকে ঝুঁকে এল, সিরিয়াস ভাব মুখে। ‘তুই বড় হচ্ছিস তোর ড্যাডের ছত্রছায়ায়, ঠিক আমার মতোই। আমিও ঠিক করতে পারছি না আমি আমার ড্যাডের মতো হবো কিনা। কিন্তু তুই সিদ্ধান্ত নিতেই পারিস। জেমস তোরটা কোনও অভিশাপ নয়। তোর ড্যাড একজন বিরাট মাপের মানুষ। খুঁজে নে ওর ভালোগুলো আর সেগুলোর আত্মস্থ কর। অবশ্য যদি তুই চাস তবেই। অন্য দিকটাও আছে, সেটাও তোর হাতে, তাই না? হয় চেপে ধর নয় ছেড়ে দে। অনেক জায়গা আছে যেগুলো বেছে নিয়েও তুই সেরা হতে পারিস। তোর ড্যাড অন্যদের সাহায্য বেশি নিতে পছন্দ করতেন না, করতেন কি? কিন্তু তার অর্থ এটা নয় যে ওঁর সাহায্যের দরকার ছিল না। তুই আমাদের সাহায্য চেয়েছিস এর অর্থ আমার কাছে এটা নয় যে তুই ওর চেয়ে কোনও অংশে কম। এটার অর্থ তুই এটা শিখেছিস যেটা উনি শিখতে পারেননি। আর এটাই তোকে তোর ড্যাডের কপি হওয়া থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করবে। আমার তো মনে হয় এটা খুবই ভালো একটা দিক। তুই আমাকে টাবিথা করসিকার কাছ থেকে কিছু একটা হাতানোর সুযোগ করে দিয়েছিস বলে এসব মোটেই বলছি না।’

জেমস বলার মতো কোনও কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। ফ্যালফ্যাল করে টেডের দিকে তাকিয়ে থাকল শুধু। বুঝতেও পারছে না টেড যা বলল সেগুলো সত্যি না মিথ্যে। শুধু এটুকুই বুঝতে পারছে ও নিজে অবাক হয়েছে সঙ্গে সঙ্গেই কৃতজ্ঞ হয়েছে, আর সেটা ইতিবাচক অর্থে। কারন টেড বলেছে ওর গুণের কথা। সামনে রাখা বড় বইটা সশব্দে বন্ধ করল টেড।

বলল, ‘এবার চল দেখি, এই তথ্যগুলো কমনরুমে দিয়ে আসি যাতে ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে পেট্রা এগুলো দেখার সু্যোগ পায়। এর সঠিক ব্যবহার করতে একমাত্র ওই সাহায্য করতে পারে না হলে সব জলে যাবে। ডিনারের আর এক ঘণ্টা বাকি আছে, তারপর বাকি রাতটার জন্য আমাদের কাছে কোনও প্রস্তুতি থাকবে না। জানি না আমার কথাগুলো বুঝতে পারছিস কিনা।’

 

************

 

শেষ কুইডিচ ম্যাচের আগের বিকেলটা যথেষ্টই ঠাণ্ডা আর কুয়াশায় ভরে ছিল। আকাশে ধুসর রঙের মেঘের চাদর। সেন্ট লোকিমাগাস দ্য পারপেচুয়ালি প্রোডাক্টিভ এর স্ট্যাচুর পেছনের টানেল ধরে অযাচিত রকমের গম্ভীর আর নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছিল গ্রেমলিন বাহিনী। ওরা পৌঁছাল ইকুইপমেন্ট ছাঊনীর তলায়, টেড হাঁটার গতি কমিয়ে এবং আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এগিয়ে গেল। রিডকালি সম্ভবত ইতিমধ্যেই তার কুইডিচের ট্রাঙ্ক নিয়ে চলে গেছেন। কিন্তু সাবধানতা নিতে দোষ কোথায়। টেড চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল। কিছু ধুলোভর্তি তাক আর কিছু ভাঙা ঝাড়ু ছাড়া আর কিছু নেই ওখানে। বাকিদের ইশারা করল পেছন পেছন আসার।

‘ইটস অল ক্লিয়ার। আমরা এখানে নিশ্চিতভাবে সুরক্ষিত, রিডকালিও চলে গেছেন। উনিই একমাত্র মানুষ যিনি এই ছাউনী ব্যবহার করেন।’

র‍্যালফ সিঁড়ি দিয়ে উঠে চারদিকটা কৌতূহলের সঙ্গে দেখল। জেমসের মনে পড়ল সেই প্রথম রাতে গ্রেমলিনদের সঙ্গে উকেট এর অভিযানে র‍্যালফ ছিল না। ‘এটা একটা জাদু সুড়ঙ্গ। এটা এক তরফা কাজ করে।’ ফিসফিস করে র‍্যালফকে বলল। ‘আমরা এটা ধরে আবার ফিরে যেতে পারব কারণ আমরা ওই পথে এসেছি। কিন্তু যারা সামনের দিক দিয়ে ছাউনীতে ঢুকবে তারা যেতে পারবে না। তারা এই পথ দেখতেই পাবে না।’

র‍্যালফ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘কুল। জেনে ভালো লাগল।’

একমাত্র ঝাপসা জানলাটার কাচে চোখ রাখল জেমস, র‍্যালফ আর সাব্রিনা। দেখতে পেল কুইডিচের মাঠটাকে। সঙ্গেই তিনটে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড, যেগুলো ব্যানার হাতে সমর্থক শিক্ষার্থী দর্শকদের দ্বারা ইতিমধ্যেই ভরে উঠতে শুরু করেছে। বাইরে অপ্রত্যাশিত ঠাণ্ডা তবুও উৎসাহে কমতি নেই। র‍্যাভেনক্ল আর স্লিদারিনের দলের খেলোয়াড়রা পিচের দুপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখছে ওদের ক্যাপ্টেন রা রিডকালির সঙ্গে করমর্দন সেরে চিরাচরিত নিয়ম কানুন শুনছে।

সাব্রিনা চাপা স্বরে বলল, ‘আমি এসবের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। এই হাত মেলানোর ব্যাপারটা। জ্যানকে এর জন্য বাহবা দিতেই হবে, ওই কথাটা মনে করিয়ে দিল।’

জেমস মাথা নাড়ল সম্মতির ভঙ্গীতে। এটা জ্যানেরই আইডিয়া। ম্যাচ শুরুর আগে কিছু সময়ের জন্য দু-দলের খেলোয়াড়রা তাদের ঝাড়ুগুলো রেখে যায় গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের নিচে ওই হাত মেলানোর জন্য। মাথা ঘামিয়ে কথাটা মনে করেছে বটে। এটাই একমাত্র সময় যখন ঝাড়ুর মালিকেরা তাদের নিজস্ব ঝাড়ু থেকে দূরে থাকে।

‘সময় হয়ে গেছে,’ টেড বলল জেমসের কাঁধে একটা টোকা দিয়ে। ‘ওখানে করসিকাকেও দেখা যাচ্ছে।’

জেমস একটা ঢোঁক গিললো, মনে হল পাথরের একটা বল যেন নেমে গেল গলা দিয়ে। হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে ধড়াস ধড়াস করে। ব্যাক প্যাক থেকে ইনভিজিবল ক্লোকটা বার করে একবার ঝেড়ে নিয়ে নিজের আর র‍্যালফের মাথার ওপর চাপাল। এগিয়ে গেল দরজার দিকে। পেট্রা পেছন থেকে বলে উঠল, ‘আমি তোদের পা দেখতে পাচ্ছি। র‍্যালফ আরও একটু নিচু হতে হবে তোকে।’ র‍্যালফ সেটা করতেই জেমস দেখল পোশাকের অংশ ওর পায়ের পাশগুলোকেও ঢেকে দিল।

‘যতটা সম্ভব নিচু হয়ে দ্রূত এগোতে হবে,’ টেড জানাল। জিনিসপত্র রাখার এই ছাউনী কুইডিচ মাঠের এক কোনে অবস্থিত। ম্যাচ অফিশিয়ালদের দ্বারা সেট করা ম্যাজিক্যাল বাউন্ডারির ঠিক বাইরেটায়। দরজা থেকে বেরলে পাশেই স্লিদারিনদের গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড।

‘আশপাশ ফাঁকাই আছে,’ টেড বলল দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে। ‘এখন সবাই যেন শুধু মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে এই দরজার দিকে নয় সেই কামনাই করতে হবে।’ বলেই দরজাটা খুলে দিল এবং পাশে সরে গেল। জেমস আর র‍্যালফ বেরিয়ে গেল। ওরা শুনতে পেল পেছনে দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

বাইরের বাতাস এলোমেলোভাবে বইছে। মাঠের ওপর দিয়ে দুরন্ত গতিতে বয়ে এসে ইনভিজিবল ক্লোকে মারছে ধাক্কা। পায়ের দিক থেকে উঠিয়ে দিচ্ছে ওপরে।

র‍্যালফ কাতর কণ্ঠে বলল, ‘মনে হচ্ছে আমার পা কেউ দেখে ফেলবে।’

‘আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি,’ জেমস বলল মাঠে চিৎকার এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ‘যতটা সম্ভব আমার কাছে আর নিচু হয়ে থাক।’

ইনভিজিবল ক্লোকের পাতলা কাপড়ের ভেতর দিয়ে জেমস দেখতে পেল স্লিদারিন খেলোয়ারদের ঝাড়ু রাখার ঘরটার দরজার অন্ধকার মুখ। বড় মাপের দরজাটা খোলা আছে হাট করে, দুটো পাল্লা দুপাশে আটকানো আছে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের দেওয়ালের সঙ্গে। একটু দূরেই খেলোয়াড়রা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য পায়ের শব্দও ওদের কানে পৌঁছে যেতে পারে। জেমস দম বন্ধ করে দৌড়ে যাওয়ার ভাবনাটাকে আটকালো। অতি ধীর পায়ে দুই বন্ধু একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে থাকা টম স্কোয়ালাসের পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়ল ছায়া ভরা দরজার ভেতরে। ভেতরে হাওয়া নেই, অদৃশ্য পোশাকের নড়াচড়া থেমে গেছে। জেমস সন্তর্পণে আটকে রাখা নিঃশ্বাস ফেলল।

‘জলদি জলদি,’ প্রায় শব্দহীন ফিসফিসানিতে বলল, ‘আমাদের হাতে বেশি সময় নেই।’

জেমস জানে গ্রেমলিনরা কি পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু কিভাবে কি হচ্ছে তা ও দেখতে পায়নি। জ্যান যে এখন র‍্যাভেনক্লয়ের দলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। মাঠের অপর প্রান্ত থেকে সব কিছু দেখতে পেয়েছিল। সেই পরে বলেছিল জেমসকে। টাবিথা আর জেন্নিফার টেল্লাস, র‍্যাভেনক্ল এর ক্যাপ্টেন, মাঠের মাঝে রিডকালির সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঝ আকাশ থেকে একটা শব্দ সবার কানে আসে। সারা দিন আকাশে ধূসর মেঘ ছিল, এখন সেখানে, দর্শক ও খেলোয়াড়রা তাকাতেই দেখতে পেল সব একসঙ্গে পাক মেরে ঘুরছে। একটা গোলা বানিয়ে সেটা আস্তে আস্তে নেমে আসছে মাঠের ওপর। তার সঙ্গে শোনা যাচ্ছে গুরুগম্ভীর কাঁপুনির মতো একটানা শব্দ। কেবলমাত্র জ্যান ছাউনীর দিকে তাকিয়ে দেখতে পেয়েছিল টেড আর পেট্রা ছোট্ট জানলাটার পেছনে দাঁড়িয়ে নিজেদের জাদুদণ্ড দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে মেঘটাকে। হেসেছিল জ্যান, তারপর চিৎকার করে বলেছিল, ‘কুইডিচ খেলা কখনও আবহাওয়ার গোলযোগের জন্য থেমে থাকে না তাই না জেন্নিফার?’

কাছের গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড থেকে হাল্কা কিছু হাসির শব্দ ভেসে এসেছিল। জেন্নিফার একবার জ্যানের দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই তাকিয়েছিল ওপরে। ওখানে একটা মেঘের সুড়ঙ্গ ভাসছিল। গ্রেমলিনের সদস্য হওয়ার কারণে টেড জেন্নিফারকে সব কথাই বলেছিল আগেই। তবু জ্যান বলেছিল, যে ভয়ের ছাপ জেন্নিফারের মুখে ছিল সেটা একেবারে নকল নয়। রিডকালি কি করবে বুঝতে পারছিলেন না। টাবিথাকেও হতভম্ব দেখাচ্ছিল। ও তাকাল মেঘের দিকে, চুল উড়ছিল শনশন করে। জাদুদণ্ড নিয়েছে হাতে। রিডকালির মুখে একটা দৃঢ় সংকল্পের ছায়া।

‘লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান,’ ঘোষকের কক্ষ থেকে প্রতি স্ট্যান্ডে প্রতিধ্বনিত হল ডামিয়েনের কন্ঠস্বর। ‘আমরা সম্ভবত স্থানীয় অতি উচ্চমাত্রার কোনও আবহাওয়া গত বিশেষত্বের সঙ্গে পরিচিত হতে চলেছি। দয়া করে নিজের নিজের আসনে বসে থাকুন। যারা মাঠে আছে তাদের জানাই আপনারাও নিজের জায়গা ছেড়ে নড়বেন না। যদি না নড়েন সাইক্লোন আপনাদের ছুঁয়েও দেখবে না।’

দর্শকদের মধ্যে থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে বলল, ‘ওই ব্যাটা বদ্ধ পাগল দেখতে পাচ্ছিস না নাকি ওটা একটা ডাইনোসর।’

‘ও একই ব্যাপার ভাই,’ ডামিয়েন চকিতে উত্তর দিল।

সাব্রিনা আর নোয়া বেরিয়ে এসেছে ছাউনি থেকে, সামলাচ্ছে নিজেদের ঘুড়ন্ত বাতাসের ঝাপ্টা থেকে। এগিয়ে যাচ্ছে হাফলপাফ স্ট্যান্ডের ছোট্ট কন্সেশন এরিয়াটার দিকে। কাউন্টারের দেখা শোনা করে হাফলপাফের শিক্ষার্থীরাই, কিন্তু খাবারটা বানিয়ে দেয় পেছন দিকে থাকা কিচেনে এলফরা। নোয়া আর সাব্রিনা আর একটু এগিয়ে একটা খোলা দরজার কাছে থামল।

চিৎকার করে সাব্রিনা বলল, ‘আরে তোমরা দেখেছো ওখানে কি হচ্ছে? আবহাওয়ার অবস্থাতো মনে হচ্ছে দারুণ খারাপ তাই না?’

কিচেনের ভেতর থেকে একটা ব্যাজার মুখো এলফ মুখ থেক পাইপ নামিয়ে বলল, ‘তা আমাদের কি করতে হবে বলে তোমরা মনে করো অ্যাঁ? নিশ্চয় এটাই চাইছো তাই না, যে আমরা আমাদের কান থেকে ঝড় থামানো পুঁচকে ভূতের পাওডার ওদিকে ছিটিয়ে দিই?’

নোয়া দরজার ভেতর মুখ ঢুকিয়ে চিৎকার করে বলল, ‘আমি ভাবছিলাম এল্ভস অব হগ ওয়ারটস কোয়ালিশন এগ্রিমেন্টের সেকশন ফিফটি ফাইভ এর নয় নম্বর প্যারাগ্রাফের কথা। ওখানে লেখা আছে সাঙ্ঘাতিক আবহাওয়ার সময় এইসব মাঠ রক্ষা করার দায়িত্ব এলফদের। বিশ্বাস করো আবহাওয়া সত্যিই ওখানে ভয়ানক হয়ে উঠেছে। তোমরা কি অনুমতি দিচ্ছ তোমাদের হয়ে খেলোয়াড়দের থাকার জায়গাগুলোর দরজা বন্ধ করার? চল সাব্রিনা সেটাই করি।’

এলফটা পাইপটা ঝেড়ে নিয়ে নিজের ন্যাপকিনের গিঁটে আটকে লাফিয়ে সামনে এল। ‘দয়া করে কিছু মনে করো না! ঘুরে দাঁড়িয়ে কিচেনের ভেতর দিক লক্ষ করে চ্যাঁচালো, ‘ওই! পেকল! ক্রাং! সিডি! আমরা একটা কাজ পেয়েছি যেটা এখুনি করতে হবে। তাড়াতাড়ি সব চলে আয়।’

সাব্রিনা আর নোয়াকে পেছনে রেখে চারটে এলফ দৌড়ে বেরিয়ে গেল। বেজারমুখো এলফ পেছন দিকে তাকিয়ে ছুটে যেতে যেতে বলল, ‘কৃতজ্ঞ থাকলাম মাস্টার এবং মিস্ট্রেস। যান এবার খেলা উপভোগ করতে চলে যান।’

এলফরা মাঠে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাইক্লোন এর শুঁড় ছুয়ে ফেলল কুইডিচের পিচ। সেন্টার লাইনকে ওটা প্রথম স্পর্শ করল। টাবিথা করসিকার থেকে কুড়ি ফুট দূরে। একটুও না চমকে ওটাকে দেখতে থাকল করসিকা। পরে অনেকজন বলেছে, যথেষ্টই মনে রাখার মতো কথা, এতো ছোট সাইক্লোন আগে কোনওদিন দেখা যায়নি। একটু ঘাস উড়ল, একশো ফুট মতো যেতে না যেতেই কমে গেল জোর। ফলে যারা গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে ছিল তাদের ওপর কোনও প্রভাবই পড়ল না। জেন্নিফার টেল্লাস ছুটে সাইড লাইনের দিকে নিজের দলের কাছে চলে গেল। রিডকালি সম্ভবত ব্যাপারটা লক্ষ করেননি। ওর পাশে দাঁড়িয়ে টাবিথা নিজের জাদুদণ্ড হাতে নিয়ে সাইক্লোনটাকে পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গীতে এদিক ওদিক দেখছিল। মনে হচ্ছিল ও কিছু একটা খুঁজছে।

ওদিকে স্লিদারিন খেলোয়ারদের ঘরের ভেতর থেকে জেমস আর র‍্যালফ শুনতে পেল সাইক্লোন আর গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাওয়ার শব্দ।

জেমস ক্লোকটা সরাতেই র‍্যালফ জানতে চাইল, ‘এখানে তো অনেক ঝাড়ু রাখা আছে। ওর মধ্যে কোনটা নিতে হবে?’

জেমস এগিয়ে গেল একের পর এক রাখা ঝাড়গুলোর পাশ দিয়ে। দরজা থেকে সবচেয়ে দূরের কোনায় একটা ঝাড়ু ভেসে আছে, অপেক্ষা করছে যেন কখন ওর মালিক ওটায় চেপে বসবে ওড়ার জন্য।

সেটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘ওইটাই হবে।’ উড়ন্ত ঝাড়ুটার দুপাশে দুজন দাঁড়ালো। কাছে যেতেই শোনা গেল মৃদু গুনগুন শব্দ আসছে ঝাড়ুটা থেকে। যেটা ভালোমতোই শোনা যাচ্ছে বাইরের ঝড়ের শব্দকে ছাপিয়ে। ‘জেমস দেরি করছিস কেন, নিয়ে নে ওটাকে। তাড়াতাড়ি কর, চল পালাই এখান থেকে।’

জেমস হাত বাড়াল, চেপে ধরল। কিন্তু ঝাড়ুটা একচুল নড়ল না। টানল ওটাকে, দুহাত দিয়ে ধরে। কিন্তু না, অনড় রইল ঝাড়ুটা। মনে হল পাথরের স্ট্যাচু যেন।

র‍্যালফ পেছনে দরজার দিকে তাকিয়ে গোঙানোর মতো করে বলে উঠল, ‘এ আবার কি ঝামেলা? আমরা এখানে থাকতে থাকতেই ওরা এসে পড়ে…’

‘আমাদের কাছে অদৃশ্য হওয়ার পোশাক আছে র‍্যালফ। আমরা লুকিয়ে থাকতে পারব,’ জেমস বলল বটে কথাটা কিন্তু র‍্যালফের কথা ফেলে দেওয়ার মতো নয় মোটেই। কেউ ওদের দেখতে পাক বা না পাক এই ঘরটা ছোটো, আর কোন দ্বিতীয় দরজাও নেই এখান থেকে বার হওয়ার। ‘ঝাড়ুটা কোনও কারনে আটকে আছে। আমি ওটাকে নড়াতে পারছি না।’

র‍্যালফ উত্তর দিল, ‘আরে বাবা ওটার তো একটা উড়ুক্কু ঝাড়ু। তোকে বোধ হয় ওটার ওপর চাপতে হবে।’

জেমসের পেটের ভেতরটা গুরগুর করে উঠল। ‘যদিও বা ওটাকে নড়াতে পারি কোনওভাবে, চাপতে বা চালাতে পারবো না কিছুতেই।’

‘সে আবার কেন?’

‘কারণ ওটা আমার নয়! মনে করে দেখ থান্ডারস্ট্রিকটা পাওয়ার আগে আমি কোনও ঝাড়ুকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। আমাদের এটাকে হাতাতে হবে, আর সেটা করতে গিয়ে আমি চাই না কোনও দেওয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেতে।’

র‍্যালফ বোঝানোর মতো করে বলল, ‘কিন্তু এখন তো তুই ভালোই উড়তে পারিস! এমনকি থান্ডারস্ট্রিক পাওয়ার আগেও মোটেই খারাপ উড়তিস না। প্রায় জ্যানের সমানই ছিল তোর উড়ানোর দক্ষতা। দেরি না করে চেপে পড় ওটায়! আমি… আমি এক লাফে তোর পেছনে উঠে বসে ক্লোকটা আমাদের ওপর ঢেকে নেব!’

জেমস হতাশভাবে হাত দুটো দুপাশে ঝুলিয়ে রেখে বলল, ‘র‍্যালফ ওটা পুরো পাগলামো হবে।’

সহসাই বাইরে থেকে একটা বুম শব্দর অনুরণন ভেসে এল। যার কাঁপুনিতে ঘরের স্ট্যান্ডগুলোতে জমে থাকা ধুলো উড়ল বেশ খানিকটা। জেমস আর র‍্যালফ দুজনেই চমকে উঠল। র‍্যালফ ভয়ার্ত কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘ওটা কি হল?’

জেমস ঝট করে উত্তর দিল, ‘আমি জানি না। কিন্তু এদিকে যা মনে হচ্ছে আমাদের হাতে আর কিছু করার মতো অন্য কোনও উপায় নেই। র‍্যালফ রেডি থাকিস লাফিয়ে চেপে বাসার জন্য।’

জেমস পা তুলে দিল ভাসতে থাকা গুনগুন আওয়াজ করতে থাকা ঝাড়ুটার ওপর। চেপে ধরল দুহাতে শক্ত করে। তারপর অতি সাবধানে বসে শরীরের ওজনটা ছেড়ে দিল ওটার ওপর।

এক মিনিট আগে টাবিথা করসিকা কিছু একটা আঁচ করেছিল। জ্যান দেখল টাবিথা তাকিয়ে আছে জিনিসপত্র রাখার ছাউনীটার দিকে। যে ভাবেই হোক বুঝতে পেরেছে সাইক্লোনটা সন্দেহজনক। আর এটাও বুঝতে পেরেছে কেঊ ওখানে লুকিয়ে থেকে কুইডিচের ম্যাজিক্যাল গন্ডির ভেতর জাদুর খেলা দেখাচ্ছে। জ্যান তৈরি হল দৌড়ে গিয়ে ধাক্কা মারার জন্য যদি টাবিথা ওই দিকে যেতে শুরু করে তাহলে। আর তার জন্য ও অজুহাত দেখাবে যে জ্যান আসলে টাবিথাকে বাঁচানোর জন্য এটা করেছে। যেভাবেই হোক ওকে ছাউনীর দিকে যেতে দেওয়া যাবে না। জ্যান দেখতে পেল টাবিথা এক পা বাড়িয়েছে ওই পথেই, সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পেয়েছে এলফরা খেলোয়াড়দের থাকার জায়গার দরজাগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। গতিপথ বদলে টাবিথা এবার এগিয়ে গেল স্লিদারিনের গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের নিচের দরজার দিকে।

জ্যান সব জোর লাগিয়ে দৌড়ালেও টাবিথাকে ধরতে পারত না। এখন একটাই আশা এলফরা টাবিথার কথায় পাত্তা না দিয়ে যেন নিজেদের কাজটা করে।

নোয়া আর সাব্রিনাও একটা দূরত্ব বজায় রেখে এলফদের অনুসরণ করে চলেছে স্লিদারিনের গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের দিকে। দেখতে পেল ওরা দরজা লাগিয়ে হুড়কোটাও যথাস্থানে সেট করে দিয়েছে। সাব্রিনা দেখল টাবিথা এগিয়ে আসছে লম্বা লম্বা পা ফেলে থমথমে মুখে, হাতে জাদুদণ্ড।

চেঁচিয়ে কিন্তু সংযত কণ্ঠে বলল, ‘দরজাটা খোলো।’ জাদুদণ্ড সমেত হাতটা উঠিয়ে বন্ধ দরজাটা দেখাল।

বেজারমুখো এলফ একটু মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, ‘খুব দুঃখিত, মিস। এটা চুক্তি অনুসারে করেছি। এই দরজা তখনই খুলবে যখন কোনওরকম বিপদ বা ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আর থাকবে না।’

টাবিথা বলল, ‘দরজাটা এখনই খোলো অথবা ওখান থেকে সরে দাঁড়াও। মাত্র ফুট তিরিশ দূরে দরজা থেকে করসিকা। সাব্রিনা লক্ষ করল একটা খুনীর মতো ভাব টাবিথার মুখে। নিজের জাদুদণ্ড ব্যবহার করে দরজা খোলার কথাই ভাবছে নিশ্চিত। সঙ্গেই পুঁচকে কর্মরত এলফগুলোকে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করবে না বলেই মনে হচ্ছে। যেভাবেই হোক ও বুঝে গেছে ওর ঝাড়ু নিয়ে কিছু একটা ছক চলছে।

‘হেই করসিকা,’ সাব্রিনা চিৎকার করে ডেকে দরজা আর করসিকার মাঝখানে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। ‘তাহলে তুমিই এই সাইক্লোনটাকে সৃষ্টি করেছ যাতে তোমার অতিরিক্ত গর্ব র‍্যাভেনক্লদের কাছে হেরে নষ্ট না হয়।’

টাবিথা সাব্রিনার দিকে তাকাল, কিন্তু চলার গতি কমাল না। জাদুদণ্ডটা নাড়িয়ে সাব্রিনার দিকে তাক করল, সাব্রিনা থমকে গেল। নোয়া লাফিয়ে সামনের দিকে এল ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। দুজনের কেউই শুনতে পেল না টাবিথা কি মন্ত্র উচ্চারণ করল কিন্তু দেখতে পেল একটা লাল আলোর ঝলক জাদুদণ্ডটার মুখে। যেটা ধাক্কা মারল সাব্রিনার মুখে। ছিটকে এসে পড়ল নোয়ার গায়ে। দুজনেই আছড়ে পড়ল মাটিতে, ওদের চিৎকার চাপা পড়ে গেল বাতাসের এবং অবাক হয়ে যাওয়া দর্শকদের চিৎকারে।

শোনা গেল ডামিয়েনের কন্ঠস্বর, ‘লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আমাদের প্রিয় কুইডিচ পরিচালক মিঃ রিডকালিকে আপনারা হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করুন। উনি সাইক্লোনটাকে সামলানোর চেষ্টা করছেন এক ধরনের… যাকে বলে, প্রথাগত নাচ নেচে, এছাড়া কি বলব বুঝতে পারছি না।’ সত্যিই সেরকমই মনে হচ্ছে যে মিঃ রিডকালি সাইক্লোনের শুঁড়টার আশেপাশে নেচে নেচে ওটার ভেতর ধূলোবালির একটা মেঘ বানিয়ে ছুঁড়ে দিতে চাইছেন। ঠিক মতো একটা লক্ষ্য খুঁজে নেওয়ার জন্য উনি ওটার এপাশে ওপাশে ছুটে বেড়াচ্ছেন। আর সাইক্লোনের শুঁড়টাও এদিকে ওদিকে কাটিয়ে পালাচ্ছে। বেশিরভাগ দর্শকের নজর এখন এদিকেই, তাই খুব অল্পজনই দেখতে পেল স্লিদারিন গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের নিচের দিকটায় কি হচ্ছে।

‘শেষ সুযোগ,’ টাবিথা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এলফদের উদ্দেশে বলল। এলফ দুজন তাকিয়ে আছে সাব্রিনার দিকে, যে এখনও নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে পড়ে আছে নোয়ার ওপর।

‘শুনুন, মিস্ট্রেস,’ বেজারমুখো এলফ কথাটা বলতে না বলতেই একটা লাল আলোর ঝলক এসে বন্ধ দরজার ওপর আছড়ে পড়ল। দুই এলফকে ছিটকে ফেলে দিয়ে দরজার বড় হুড়কোটা ভেঙে গেল একটা বিস্ফোরণের সঙ্গে, চারদিকে ছড়িয়ে গেল ভাঙাচোরা টুকরো টাকরা। টাবিথা দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার গতি কমায়নি। আর একবার নিজের জাদুদণ্ড তাক করল, দরজাটা হাট করে খোলার মন্ত্র প্রয়োগের জন্য। কিন্তু সেটা না করে থেমে গেল। মাথা ঘোরাল, কিছু একটা শুনতে পেয়ে। নোয়া, সাব্রিনার শরীরের নিচ থেকে বার হয়ে আসার চেষ্টা করছে। সাইক্লোনের শব্দ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসের শব্দ ভেদ করে কারও একটা চিৎকারের শব্দ ভেসে আসছে। তার জোর বাড়ছে।

স্লিদারিন খেলোয়াড়দের কক্ষটির দরজা হাট করে খুলে গেল চকিতেই, সেখান থেকে রকেটের গতিতে কিছু একটা বেরিয়ে চলে গেল। নোয়া এক ঝলক দেখতে পেল করসিকার পাশ দিয়ে কেউ একটা ঝাড়ুতে চেপে এতো জোরে চলে গেল যে তার গতির ধাক্কায় ফুট দশেক দূরে মাটিতে আছড়ে পড়ে গেল করসিকা। কুইডিচের পিচের ওপর দিয়ে চিৎকার করতে থাকা সেই আওয়াজ চলে গেল দূরে, আরও দূরে।

জেমস টাবিথার ঝাড়ুটাকে যতটা শক্ত করে ধরা যায় ধরেছিল। র‍্যালফ থেকে যায় পেছনেই, ঘরের ভেতর। জেমস ঝাড়ুটায় চেপে বসতেই ওটা বুনো ঘোড়ার মতো ধেয়ে যায় সামনের দিকে। ঘর থেকে বেরিয়ে ওটা সাইক্লোনটার ভেতর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যায় জেমসকে। এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকার পর জেমস চোখ খোলে এবং কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় পাগলের গতিতে উড়তে থাকা ঝাড়ুটাকে। অনেক চেষ্টা করে ঝাড়ুটা ওকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার। গোল গোল পাক মারে। কিন্তু জেমস চেপে ধরে ঝুঁকে বসে থাকে ওটার ওপর। র‍্যাভেনক্ল এর দর্শকদের ওপর দিয়ে ওটা উড়ে যায়, গতির ধাক্কায় উড়ে যেতে থাকে দর্শকদের টুপি, ব্যানার ইত্যাদি। ডামিয়েন চিৎকার করে কি সব বলছিল, যদিও সেসব কিছুই কানে ঢুকছিল না জেমসের। ওর কানে তখন শুধু ঝড় আর বাতাসের শনশন শব্দের ঝাপ্টা। একবার অতি কষ্টে পেছন ফিরে তাকাল। ভয় হচ্ছিল ওর কারণে কেউ আহত না হয়ে যায়। তবে সেরকম কিছু হতে দেখল না।

এখন ও আবার এগিয়ে যাচ্ছে স্লিদারিন গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের দিকে। উলটো দিকে ঝুঁকে টেনে ধরল ঝাড়ুটাকে। যার ফলে ওটা একটা বিপদজনক বাঁক নিল। স্লিদারিন গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড পড়ে থাকল পেছনে। জেমস বুঝতে পারল পাগলাটে ঝাড়ুটাকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে। এবার তাকাল সামনের দিকে এবং ঢোক গিলল। সামনেই সেই জিনিসপত্র রাখার ছাউনীর খোলা দরজা। কোনও ক্রমে মাথা নিচু করল জেমস।

ঝাড়ুটা নিজে নিজেই বাঁক নিচ্ছিল, মনে হচ্ছিল ওটার নিজস্ব একটা মন আছে। ভেতরের সুড়ঙ্গ পথে এদিক ওদিক কাটিয়ে ওটা এগিয়ে যাচ্ছিল, একটা হাওয়ার চাপ অনুভব করছিল কানের ভেতর জেমস। একসময় ওটা পৌঁছাল সেন্ট লোকিমাগাসের স্ট্যাচুর পেছনের ফাঁকা জায়গাটায়। তারপর করিডোরের দিকে এত জোরে ঘুরল যে জেমস প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।

চরম গতির সঙ্গে ঝাড়ুটা এগিয়ে যাচ্ছিল হলগুলোর ভেতর দিয়ে। সৌভাগ্যবশত স্কুলের শিক্ষার্থীর বেশিরভাগটাই কুইডিচের মাঠে চলে গেছে, করিডোরগুলো ফাঁকাই বলা যায়। সঞ্চরণশীল সিঁড়িগুলোকেও ঝাড়ুটা অসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে কাটাতে থাকল। জেমসকে সবদিক লক্ষ্য রেখে ওগুলোর সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে হচ্ছিল। পীভস ছিল সিঁড়ির নিচে, কিছু স্ট্যাচুর গোঁফ নিয়ে খেলায় মগ্ন। জেমস চোখের কোনা দিয়ে ওকে দেখতে পেল, তার পর সহসাই দেখা গেল পীভস বসে আছে ঝাড়ুর ওপর জেমসের সামনে ওর দিকেই মুখ করে।

‘পটার বয়! এটা তো অতি নচ্ছারগিরির নমুনা।’ পীভস চেঁচিয়ে উঠল খনখনে গলায়। ঝাড়ুটা ঢুকে পড়ল একটা সরু ক্লাস ঘরে। ‘এটা কি এক ধরনের প্রতিযোগিতার চেষ্টা পিভসের সঙ্গে? হি হি?’

পীভস একটা ঝাড় লণ্ঠনকে আঁকড়ে ধরে ঝুলে ঘুরতে শুরু করল। জেমস আবার ঝাড়ু সমেত এগিয়ে গেল সামনের দিকে। নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করল, কিন্তু কাজ কিছু হল না। ঝাড়ুটা নিজের ইচ্ছেতেই কাজ করছে পাগলের মতো। এবার ওটা নিচে নেমে এল পাথরের সিঁড়িওয়ালা এলফদের রান্নাঘরের কাছে। স্কুল ফাঁকা থাকলেও এই জায়গাটা এলফে ভর্তি। এভিনিং এর বাসনকোসন পরিষ্কারে ব্যস্ত এলফের দল। ঝাড়ুটা এগিয়ে চলল বড় বড় বাসনগুলোর ভেতর দিয়ে, এলফদের ছিটকে ফেলে দিয়ে। বাসনপত্র পড়ার আওয়াজে এক হুলুস্থুল কাণ্ড। সে সব শব্দ ও পেছনে পড়ে থাকল দুরন্ত গতির কারণে। পরেরটা জামাকাপড় কাচাকুচির ঘর। যথেষ্ট গরম। ঝাড়ুটা একই রকম গতিতে ঘরটিতে থাকা বিভিন্ন রকম বিশালাকৃতি যন্ত্র পাতির ভেতর দিয়ে কাটিয়ে কুটিয়ে চলা অব্যাহত রাখলো। জেমস সভয়ে দেখতে পেল ঝাড়ুটা এগিয়ে যাচ্ছে তার চরম পরিনতির দিকে, কারণ সামনেই ঘরটা শেষ, দেখতে পাওয়া যাচ্ছে পাথরের দেওয়াল। ঝাড়ু ছেড়ে এবার পাশের একটা তামার জল ভর্তি পাত্রের ওপর লাফ দেবে ঠিক করল জেমস। এমন সময় ঝাড়ুটা একটু বাম দিকে ঘুরল এবং ওপর দিকে সামনেটা ওঠাল। দেওয়ালে একটা দরজার মতো ফাঁক। জেমস চিনতে পারল ওটা লন্ড্রির কাপড়জামা আসার পথের মুখ। দাঁতে দাঁত চেপে ও আবার ঝাড়ুটাকে সজোরে চেপে ধরল। সেই রকেটের মতো গতিতে ওটা উঠতে থাকল ওপর দিকে, জেমস অতি কষ্টে পা-টাকে আটকে রাখল ঝাড়ুর সঙ্গে, ভেতরটায় শুধুই অন্ধকার আর এক চাপ ধরা অনুভুতি।

এক বান্ডিল কাপড় মাঝ পথে এসে পড়ল জেমসের ওপর, যার চাপে ঝাড়ু থেকে পিছলে যাওয়ার মতো অবস্থা হল। চেষ্টা করল ওগুলোকে নিজের শরীরের ওপর থেকে সরানোর, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আরও সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছিল ঝাড়ু থেকে পড়ে যাওয়ার। আবার পাশ কাটাল ঝাড়ুটা। ঠাণ্ডা হাওয়ার স্পর্শ আর কমে যাওয়া চাপ থেকে জেমস বুঝতে পারল ওরা বাইরে এসে গেছে। মুখের সামনে ঝুলতে থাকা কাপড়ের ভেতর থেকে দেখতে পেল আলোর ঝলকানি, ঝাড়ুর ওঠা নামার সঙ্গে সঙ্গে। জেমস ঝুঁকি নিয়ে এক হাতে ঝাড়ুটা ধরে থেকে বেশ কিছু কাপড় ছুঁড়ে ফেলে দিল। এবার আলো আরও স্পষ্ট হল ওর নিচের দিকে। সবেমাত্র বুঝতে পেরেছে যে ঝাড়ুটা আবার ওকে কুইডিচ মাঠেই ফিরিয়ে এনেছে, সামনেই দেখতে পেল গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডগুলোকে। একেবারে কাছেরটার নিচের দিকে একদল মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, ওর দিকে ঘুরে হাত তুলে চিৎকার করছে। সহসাই ঝাড়ুটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল, নড়াচড়া একেবারে বন্ধ। ঝাড়ুর প্রান্ত দেশ থেকে জেমস ছিটকে গেল, পড়তে থাকল নিচের দিকে, সময়টা অনন্ত মনে হয়েছিল জেমসের। আছড়ে পড়ল মাটিতে, গড়িয়েও গেল কিছুটা। বাম হাতে কষ্টদায়ক ভাবে কিছু একটা হল। গড়ানো থামতে ও দেখতে পেল অনেকগুলো চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

‘দেখে তো মনে হচ্ছে ও ঠিকই আছে,’ কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ একজন বলল।

আর একজন রাগতস্বরে বলল, ‘এর চেয়ে খারাপ হওয়াটাই ঠিক ছিল। টিম ক্যাপ্টেনের ঝাড়ু চুরি করে ম্যাচটাকে ভেস্তে দিতে চেয়েছিল। এরকম করার কথা আমি ভাবতেও পারি না।’

‘আরে বাবা সব ঠিক আছে, সত্যি বলছি,’ একটু দূর থেকে আরও একটা কন্ঠ ভেসে এল। জেমস কাতর একটা শব্দ করে ওঠার চেষ্টা করল বাম হাতের কনুইতে ভর দিয়ে। বাম হাতটা কাঁপছিল সাঙ্ঘাতিক ভাবে। ফুট কুড়ি দূরে দাঁড়িয়ে আছে করসিকা, দর্শক পরিবেষ্টিত হয়ে। ওর ঝাড়ু নিশ্চলভাবে ভেসে আছে ওর পাশে। একটা হাত দিয়ে ধরে আছে আলতো করে। ‘আমরা এই প্রথম বার্ষিকীর অতি উৎসাহকে ক্ষমা করে দিতেই পারি। আমি সত্যিই অবাক হয়েছি কুইডিচের জন্য একজন কি না করতে পারে এটা ভেবে। আরে জেমস, ভুলে যেও না এটা একটা খেলা মাত্র।’ ঝকঝকে দাঁত বার করে হাসল করসিকা জেমসের দিকে তাকিয়ে।

জেমস আবার পড়ে গেল ঘাসের ওপর, ডান হাতটাকে তুলে আনল নিজের সামনে। জটলা কমতেই ঠেলে ঠুলে এগিয়ে এলেন রিডকালি। হেড মিস্ট্রেস, প্রফেসর ফ্র্যাঙ্কলিন এবং প্রফেসর জ্যাক্সন ওঁর পেছনে। জেমস শুনতে পেল করসিকা চিৎকার করে ওর টিমমেটদের বলছে পিচের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে, ‘মানুষ মনে করে এটা মাগলদের হাতে তৈরি তাই এটা বোধহয় কম ক্ষমতা সম্পন্ন। কিন্তু দেখতেই পেলি তোরা। এর জাদু ক্ষমতা যে কোন থান্ডারস্ট্রিকের চেয়েও বেশি, এমন কি এক্সট্রা জেসচারাল এনহান্সমেন্ট শক্তি সম্পন্নগুলোর চেয়েও বেশি। এই ঝাড়ু জানে কে তার মালকিন। আমাকে শুধু একটাই কাজ করতে হয়, একে আহ্বান জানানো। আমার মনে হয় মিঃ পটার সেটা জানতো না। এর জন্য আমার বেচারীর জন্য দুঃখ হচ্ছে। ও শুধু জানতো ওকে ঝাড়ুটা হাতিয়ে পালাতে হবে।’

ম্যাকগনাগল জেমসের পাশে ঝুঁকে বসে বললেন, ‘পটার, সত্যি বলছি আমি কি বলব ভেবে পাচ্ছি না।’

প্রফেঃ ফ্র্যাঙ্কলিন জেমসের হাতের দিকে একটা বিভিন্ন মাপের লেন্স আর তামার রিং দিয়ে তৈরি যন্ত্র দিয়ে দেখে জানালেন, ‘ম্যাডাম, আলনা হাড় ভেঙেছে।’ তারপর ওটাকে ভাঁজ করে পকেটস্থ করলেন এবং বললেন, ‘আমার মনে হয় প্রশ্ন পরে করলেও চলবে আপাতত ওকে হাসপাতাল উইং এ নিয়ে যাওয়া দরকার। আমাদের আর অনেক কিছুর দিকে নজর রাখতে হবে।’

জেমসের দিক থেকে চোখ না সরিয়ে হেডমিস্ট্রেস উত্তর দিলেন, ‘একদম ঠিক বলেছেন। বিশেষ করে আর কিছুক্ষনের ভেতরেই মিস সাকারিনা আর মিঃ রিক্রিয়ান্ট এসে যাবেন। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি পটার, আমি তোমার আচরণে অবাক হয়ে গেছি। কারো একটা কিছু হাতানোর চেষ্টা করা এই রকম সময়ে।’ উঠে দাঁড়ালেন, যাওয়ার আগে বললেন, ‘ঠিক আছে তাহলে তাই হোক, মিঃ জ্যাক্সন আপনি মিঃ পটারকে একটু হাসপাতালে নিয়ে যাবেন? সঙ্গে সঙ্গেই যদি মাদাম কিউরিওকে একটু জানিয়েও দেবেন যে মিঃ পটার আজ রাতটা ওখানেই থাকবে?’ জেমসকে টেনে ওঠালেন মিঃ জ্যাক্সন। ম্যাকগনাগল তাকিয়ে ছিলেন কঠোর দৃষ্টিতে। ‘ও হ্যাঁ এটাও জেনে নেবেন ও কোথায় থাকবে। জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য যেতে হবে হয়তো। আর কারোর সঙ্গে ও যেন দেখা করতে না পারে এটাও বলে দেবেন।’

জেমসকে ক্যাসলের দিকে নিয়ে যেতে যেতে জ্যাক্সন উত্তর দিলেন, ‘ঠিক আছে ম্যাডাম। সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’

প্রথম পাঁচ মিনিট কেউ কোনও কথা বলল না। পেছনে মাঠের চিৎকার মিলিয়ে গেল, ওরা ঢুকল স্কুলচত্বরে। জ্যাক্সন বললেন, ‘পটার, আমি তোমাকে ততটা গুরুত্ব দিইনি এখনও অবধি।’

যন্ত্রণাটা জেমসের হাতটাকে অসাড় করে দিচ্ছিল, তার মধ্যেই কথাটা ওকে নাড়িয়ে দিল। ‘এক্সকিউজ মি, স্যার?’

জ্যাক্সন কথোপকথনের ভঙ্গীতে উত্তর দিলেন, ‘মানে বলতে চাইছি যে আমি তোমাকে ঠিকঠাক বুঝতে চেষ্টা করিনি এতদিন। তোমার বয়সের যে কোনও ছেলেমেয়ের চেয়ে তুমি একটু বেশি জানো বলেই মনে হচ্ছে। হয়তো তার একটা কারণ তোমার বাবা মন্ত্রকের হেড অরোর। এর আগে তুমি আমার ব্রিফকেস চুরির চেষ্টা করেছিলে। আর আজ মিস করসিকার ঝাড়ু চুরি করার জন্য বিশেষ একটা প্রচেষ্টা চালিয়েছিলে। তা ছাড়া সবাই যাই মনে করুক না কেন, বুঝলে পটার,’ মেন হলে ঢুকতে ঢুকতে জেমসের দিকে তাকিয়ে, ভুরু নিচু করে বললেন, ‘আমি নিশ্চিত তুমি র‍্যাভেনক্লদের জেতার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ঝাড়ুটা চুরির চেষ্টা মোটেই করোনি।’

জেমস গলা ঝেড়ে নিয়ে বলল, ‘আপনি কি বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

জ্যাক্সন ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে বললেন, ‘তাতে কিছু যায় আসে না পটার। তুমি কি ভাবছ তুমিই জানো, কিসের চেষ্টা করছ সেটাও তুমিই জানো। তবে এটা বলতে পারি আজ রাতের পর এসবের আর কোন দাম থাকবে না।’

জেমসের হৃৎপিণ্ড দপাং করে লাফিয়ে উঠল, বেড়ে গেল তার গতি। ‘কেন?’ ও জানতে চাইল, ওর ঠোঁটগুলোও যেন কেমন অসাড় হয়ে যাচ্ছে। ‘আজ রাতে কী হবে?’

জ্যাক্সন কোনও উত্তর দিলেন না। হাসপাতাল বিভাগের কাচের দরজাটা খুলে ধরে থাকলেন জেমসের এগিয়ে যাওয়ার জন্য। ঘরটা বড় এবং উঁচু, পর পর বিছানা সাজানো। মাদাম কিউরিও, যিনি কুইডিচ খেলার ফ্যান নন, নিজের ডেস্কে বসে ওয়্যারলেসে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক শুনছেন।

জ্যাক্সন জেমসকে সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মাদাম কিউরিও, আপনি মিঃ পটারকে চেনেন নিশ্চয়। কোন দলে না থাকা সত্বেও কুইডিচ ম্যাচ চলাকালীন সময়ে হাত ভেঙে ফেলেছে।’

মাদাম কিউরিও উঠে দাঁড়ালেন এগিয়ে এলেন জেমসের দিকে, মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘যত্ত সব গুন্ডা। আমি কখনোই বুঝে উঠতে পারি না ওই খেলাটা মানুষকে ঠিক কিসে পরিণত করে। কেনই বা আমরা খেলাটাকে এখানে চলতে দিচ্ছি?’ জেমসের হাতটাকে উঠিয়ে ধরে ভাঙ্গা জায়গাটার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করলেন। বুঝতে পেরে দাঁতের ফাঁক দিয়ে ইস ধরনের একটা শব্দ করে, জিব দিয়ে চিন্তাসূচক একটা আওয়াজ করে বললেন, ‘যথেষ্ট খারাপ ভাবেই ভেঙেছে, এটা বলতেই পারি। আরও খারাপ হতে পারত, তবু এটা বলতে পারি। খুব বেশি সময় লাগবে না এটা ঠিক করে দিতে।’

‘আর একটা কথা,’ জ্যাক্সন বললেন, ‘হেডমিস্ট্রেসের আদেশ অনুসারে আজ রাতে মিঃ পটার এখানেই থাকবে।’

মাদাম কিউরিও জেমসের হাতটা ভালো করে দেখতে দেখতে বললেন, ‘স্কেলি-গ্রো কাল সন্ধে পর্যন্ত সময় নেবে সব ঠিক করে দেওয়ার জন্য। যদিও খুব একটা বাড়াবাড়ি কিছু হয়নি। একটা ব্যান্ডেজ করে ওর ঘরে জলদি পাঠিয়ে দিতে পারবো আশা করছি।’

‘মাদাম, হেড মিস্ট্রেস মিঃ পটারের সঙ্গে কিছু কথা বলবেন। আর সেজন্য উনি চান ওর দিকে যেন কড়া নজর রাখা হয়। মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে কেন বলছি, সন্দেহ হচ্ছে উনি আন্দাজ করেছেন মিঃ পটার এই স্কুলের পক্ষে ক্ষতিকর কোনও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। এর বেশি কিছু বলতে পারব না। তবে এটা বলতে পারি বাইরে থেকে কেউ যাতে ওর সঙ্গে দেখা না করতে পারে এবং ও যাতে বাইরে না যেতে পারে তার জন্য অতিরিক্ত প্রহরার ব্যবস্থা আপনি নিতেই পারেন।’

জেমস বলল, ‘উনিতো এরকম কিছু বলেননি!’, যদিও জানতো ওর কথায় কিছু আসবে যাবে না। বরং ও যত বেশি বিরোধিতা করবে তত বেশি অপরাধী বলে সাব্যস্ত করা হবে ওকে।

কিউরিও ঢোঁক গিলে উঠে দাঁড়ালেন। ‘গত কাল স্কুল চত্বরে ঢুকে পড়া ওই সন্দেজনক লোকটার সঙ্গে এর সম্বন্ধ আছে নাকি? আমি শুনেছি লোকটা কোন এক মাগল সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত এবং এখনও এই স্কুলেই আছে! ওর সঙ্গে সব মিলে মিশে আছে তাই না?’ দুহাত মুখে চেপে ধরে ভয়ার্ত চোখে উনি জ্যাক্সন আর জেমসের দিকে তাকালেন।

‘আমার পক্ষে আর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয় মাদাম,’ জ্যাক্সন উত্তর দিলেন। ‘শুধু এটা বলতে পারি মিঃ পটারকে যেন বিশেষ নজরে রাখা হয়। আমরা সঠিক সময়ে ওর সঙ্গে দেখা করব। তা সে যাই হোক না কেন।’ জ্যাক্সন তাকালেন জেমসের দিকে, ঠোঁটের কোনে একটা ক্ষীণ হাসির রেখাসহ। ‘তাহলে জেমস, দেখা হচ্ছে আগামীকাল সকালে।’

ঘুরে বেরিয়ে গেলেন ঘরটা থেকে, দরজাটা লাগিয়ে দিলেন বাইরে থেকে।

 

 

[চলবে]

লেখক পরিচিতিঃ  জর্জ নরম্যান লিপার্ট আমেরিকান লেখক এবং কম্পিউটার অ্যানিমেটর। তবে ওনার বর্তমান পরিচয় উনি জেমস পটার সিরিজের লেখক। যে কারনে ওনাকে “আমেরিকান রাউলিং” নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সিরিজের প্রথম লেখা “জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং” প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। নানান কারনে এটি অনেক বিতর্কে জড়িয়ে যায়। সেসব সমস্যা পেরিয়ে আজ এটি পাঠক পাঠিকাদের চাহিদায় সারা বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সিরিজের সব কটি বই ই-বুক এবং ফ্রি হিসাবেই প্রকাশ করেছেন মাননীয় জর্জ নরম্যান লিপারট। এই সিরিজ ছাড়াও ওনার আরো ১২ টি বই আছে। বর্তমানে উনি এরি, পেনসিল্ভ্যানিয়ার বাসিন্দা।

অনুবাদকের পরিচিতিঃ উপন্যাসটির অনুবাদক প্রতিম দাস মূলত চিত্র শিল্পী, ২০১৩ সাল থেকে ভারতের সমস্ত পাখি আঁকার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছেন। ৭৭৫+ প্রজাতির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে শুধু পাখি নয় অন্যান্য বিষয়েও ছবি আঁকা চলে একইসঙ্গে। দারুণ রকমের পাঠক, যা পান তাই পড়েন ধরনের। প্রিয় বিষয় রূপকথা, ফ্যান্টাসী, সায়েন্স ফিকশন, অলৌকিক। টুকটাক গল্প লেখার সঙ্গে আছে অনুবাদের শখ। 

One thought on “জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং – পার্ট ১৬

  • June 26, 2019 at 3:00 am
    Permalink

    অসাধারন ছিলো এই পর্বটি,
    অাশা করি খুব শিঘ্রই পরবর্তী পর্বটি প্রকাশিত হবে
    ধন্যবাদ,কল্পবিশ্ব

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!