জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং – পার্ট ২০

জি নরম্যান লিপার্ট, ভাষান্তরঃ প্রতিম দাস

অলংকরণ:মূল প্রচ্ছদ, সুদীপ দেব

বিংশ অধ্যায়

 বিশ্বাসঘাতকের গল্প

মি কিন্তু দেখেছিলাম!’ ল্যান্ডরোভার দুটোর মধ্যে দিয়ে ভিন্সের পেছনে যেতে যেতে প্রেস্কট খসখসে গলায় প্রমাণ করার ভঙ্গীতে বললেন। ‘দৈত্যদের দেখেছি! একটা তো ওই গাছগুলোর মতো লম্বা! ওদের পায়ের ছাপের মাপ … ছাপের মাপ …!” দুদিকে হাত প্রসারিত করলেন। পাত্তা না দিয়ে ভিন্স ক্যামেরাটা ঢুকিয়ে রাখলো ফোম দিয়ে ঘেরা স্যুটকেসের ভেতর।

টাই দিয়ে চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে ডিটেক্টিভ ফিনি বললেন, ‘মিঃ প্রেস্কট আপনি ইতিমধ্যেই একটা বড়সড় গোলমাল পাকিয়েছেন।  আমি চাই না যে, সেটা আরো খারাপ হোক।’

প্রেস্কট বয়স্ক মানুষটার দিকে ঘুরে উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘এই এখানে যা চলছে সেটার তদন্ত আপনার করা উচিত, ডিটেক্টিভ! কিছুই ঠিকঠাক হল না! ওরা আপনাদের সবাইকে ঠকালো!’

‘আমি যদি কোন তদন্তের ব্যবস্থা করিও, মিঃ প্রেস্কট,’ ফিনি উত্তর দিলেন, ‘সেটা হবে আপনার কার্যপদ্ধতি বিষয়ে। এই স্কুল চত্বরে যে আপনি প্রবেশ করেছেন তার অনুমতি নিয়েছিলেন?’

প্রেস্কট চেঁচিয়ে উঠলো, ‘কি! আপনি কি পাগল?’ তারপর থেমে গিয়ে নিজেকে সামলালেন। ‘অবশ্যই নিয়েছিলাম। আর সে ব্যাপারে আমি আপনাকে বলেছি। এখানকার খবরাখবর আমার কাছে আগেই পৌছেছিল। এখানকারই কোন একজন আমাকে এখানে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসেন।’

‘আপনি সেই ব্যক্তির সম্বন্ধে খোঁজ খবর নিয়েছিলেন?’

‘সেক্ষেত্রে বলতে হয় সেই ব্যক্তির পাঠানো চকলেট ফ্রগটা আমাকে যথেষ্টই অনুপ্রানিত করেছিল। আমি কখনোই সে অর্থে…’

‘এক্সকিউজ মি। কি যেন বললেন আপনি, চকলেট ফ্রগ? সেটা কি?’ ফিনি ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলেন।

‘আমি…ইয়ে, মানে। ব্যাপারটা হল, হ্যাঁ, আমার গোপন সোর্স অত্যন্ত নিশ্চিত যে এখানে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে …’

‘আর সেগুলো হলো, যাকে বলে, জাদু শেখানো। তাইত?’

‘হ্যাঁ। ইয়ে না…মানে! কৌশল করা ম্যাজিক নয়! আসল ম্যাজিক! সঙ্গে আছে দৈত্য দানব আর…আর… অদৃশ্য হতে পারে এমন দরজা আর উড়ন্ত গাড়ি!’

‘একটা চকলেট ফ্রগ এগুলো আপনাকে ভাবতে সাহায্য করেছে, এটাই বলতে চাইছেন?’

প্রেস্কট কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো, ‘আপনি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছেন?’

‘আপনি সেটা করতে আমাকে বাধ্য করছেন স্যার। এবার আপনার ওই সোর্সের ব্যাপারে কি জানেন ঝটপট বলুন দেখি?’

প্রেস্কটের মুখটা চকচক করে উঠলো। ‘হ্যাঁ! আমি সেটাই বলতে যাচ্ছিলাম! আমি মিস সাকারিনার সঙ্গে ব্যবস্থা করেছিলাম তার এখানে আসার ব্যাপারে। উনি এসে যাবেন …’ ভুরু উঁচিয়ে চারদিকে দেখতে থাকলেন।

‘আপনি মিস সাকারিনার সঙ্গে ব্যবস্থা করেছিলেন?’ সিঁড়ির ধাপের দিকে তাকিয়ে ফিনি জানতে চাইলেন। অধিকাংশ শিক্ষক শিক্ষিকা এবং ছাত্র ছাত্রীর দল অতিরিক্ত আগ্রহের সঙ্গে দেখছিল জিনিসপত্র গুটানোর কাজ। মিস সাকারিনা বা মিঃ রিক্রিয়ান্ট কারোরই দেখা নেই ওখানে। ‘উনি আপনার এই সোর্সের বিষয়ে জানতেন নাকি?’

ভিড়ের দিকে তাকিয়ে প্রেস্কট জবাব দিলো, ‘উনি জানতেন এটুকুই বলতে পারি, ব্যস। গেলেন কোথায় উনি?’

ফিনি চারদিকে তাকাতে বললেন, ‘সোর্স কি তোমার দলের সঙ্গে এসেছেন? আমার তো এরকম কারো সঙ্গে দেখা হয়েছে বলে মনে পড়ছে না।’

‘ও ওখানেই ছিল। শান্ত জড়সড় ধরনের মানুষ। ডান ভুরুতে একটা কাটা দাগ আছে।’

‘ওহ, সেই লোকটা,’ ফিনি সম্মতি সূচক মাথা নাড়লেন। ‘আমার তো লোকটাকে অদ্ভুত ঠেকেছিল। আমি অন্তত একবার লোকটার সঙ্গে কথা বলতে চাইব।’

প্রেস্কট গম্ভীর কন্ঠে বললো, ‘সেতো আমিও চাইবো।’

ওদিকে মিঃ হুবার্ট সিঁড়ির একেবারে ওপরের ধাপে হেডমিস্ট্রেস ম্যাকগনাগল, নেভিল এবং হ্যারি পটারের দিকে ঘুরলেন। ‘আমার মনে হয় আমাদের বন্ধুরা এখান থেকে ঠিকঠাক ফিরে যেতে পারবেন। ম্যাডাম হেড মিস্ট্রেস, আমার বিশ্বাস আমাদের কিছু সমাধান না হওয়া সূত্রকে এবার যাচিয়ে দেখার সময় হয়েছে?’

ম্যাকগনাগল সম্মতি সূচক মাথা ঝোঁকালেন এবং ভেতর দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত করলেন। হ্যারি জেমসের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘চলে আয় জেমস। র‍্যালফ, জ্যান তোমরাও এসো।’

হেডমিস্ট্রেসের হলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া দেখতে দেখতে র‍্যালফ বললো, ‘আপনি সত্যিই যেতে বলছেন?’

হ্যারি জানালেন, ‘মিঃ হুবার্ট বিশেষ করে তোদের তিনজনকে যাওয়ার জন্য বলে দিয়েছেন।’

জ্যান উচ্ছাসের স্বরে বললো, ‘বড় বড় মাপের লোকজনদের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকাটা কিন্তু দারুণ ব্যাপার। তাই না বল?’

‘তাহলে,’ হেডমিস্ট্রেস গ্রেট হলের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বললেন, ‘যেমনটা ভেবেছিলাম ঠিক  তেমনটাই ঘটে গেল। যদিও মিঃ অ্যাম্ব্রোশিয়াস একটু বেশি মাত্রাতেই অ্যামোরাস মন্ত্রের ব্যবহার করেছেন। মিঃ ফিনি তো আমাকে আন্তরিক ভাবে জানিয়ে রাখলেন এরপর যখনই আমি লন্ডনে যাবো উনি আমার সঙ্গে ডিনারে উপস্থিত থাকবেন।’

‘মাদাম, আমার তো মনে হয় সুযোগ পেলে সেটা আপনার নেওয়াই উচিত হবে,’ মারলিন উত্তর দিলেন, ‘আমি মানুষটাকে সামান্য “হতেও পারে” মন্ত্রের দ্বারা প্রভাবিত করে রেখেছিলাম। কি করে জানবো বলুন ডিটেকটিভ ফিনির লম্বা, ব্যক্তিত্বসম্পন্না, সুন্দরী মহিলাদের প্রতি একটু বেশী পরিমানে আগ্রহ আছে।’

‘এটা কি ঠিক স্যার। আমার তো মনে হচ্ছে আপনি বেশ আনন্দই পাচ্ছেন?’ ম্যাকগনাগল বললেন।

জেমস বলে উঠলো, ‘মারলিন, আপনি গ্যারাজের ব্যাপারটা সামলালেন কি ভাবে? আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম আর বাঁচার কোনও আশা নেই!’

মারলিন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। ‘জেমস পটার, আমি গ্যারাজের ব্যপারে কিছুই জানতাম না। ওটা গাছেদের জ্ঞান সীমানার বাইরের ব্যাপার। এর চেয়ে সহজ অ্যাংলিয়া গাড়ি বা মাদাম ডেলাক্রয়ের বিষয়ে জানা। পরিস্থিতি অনুসারে নিজের কল্পনাশক্তিকে ব্যবহার করাটা চিরকালই আমার অন্যতম একটা শক্তি।’

র‍্যালফ জানতে চাইলো, ‘কিন্তু আপনি উকেটটাকে ওখানে নিয়ে গেলেন কিভাবে? স্বীকার করতেই হবে ওটা চমকে দেওয়ার মতই!’

মারলিন উত্তর দিলেন , ‘গাছেরা ওটার ব্যাপারে জানতো, ফলে আমার জানতে অসুবিধা হয়নি। শুধু একটু উৎসাহিত করে দুটো পরিবেশের মধ্যে অদলবদল ঘটিয়ে দিয়েছি।’

জ্যান ফিক করে হেসে বললো, ‘তারমানে আল্মা আলেরনের গাড়িগুলো এখন সেই ভাঙ্গা কুঁড়ে ঘরের ভেতর রাখা আছে?’

মারলিন মাথা ঝুঁকিয়ে ব লেন, ‘আমার মনে হয় তাতে খারাপ কিছু হবে না।’

গ্রেট হল পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওরা সবাই উঠে এলো মঞ্চের ওপর। ম্যাকগনাগল পেছনের দেওয়ালে একটা লুকানো দরজা খুলে সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। পাথরের মেঝে এবং অন্ধকার একটা ফায়ারপ্লেস সহ এটা একটা অ্যান্টি চেম্বার। সাকারিনা আর রিক্রিয়ান্ট ছিলেন ওখানে, তৃতীয় আর একটি মানুষের দুপাশে বসে ছিলেন ওরা।  মানুষটাকে জেমস চিনতে পারলো না।

ওদেরকে দেখে রিক্রিয়ান্ট উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এটা একধরনের বিদ্রোহ, হেড মিস্ট্রেস! ‘প্রথমে আপনি এই …ব্যক্তিটিকে নিয়ে এসে অন্যায় ভাবে আমাদের অথরিটির দুর্ব্যবহার করেছেন। তারপরে আপনি দুঃসাহস দেখিয়েছেন আমাদের ওপর ল্যাং লক মন্ত্র প্রয়োগের! মন্ত্রীমশাই নিশ্চিত—’ 

‘ট্রেন্টন বকবকানিটা থামাও,’ সাকারিনা চোখ পাকিয়ে বললেন। রিক্রিয়ান্ট চোখ পিট পিট করলো, অবাক হয়েছে বোঝা গেল, তবে আর কিছু বললও না। সাকারিনা এবং হেডমিস্ট্রেসের দিকে বার কয়েক তাকালো।

হ্যারি বললেন, ‘একেবারে সঠিক উপদেশ, যা এই প্রথম দিতে শুনলাম। আর আমার মনে হয় মন্ত্রী মশাই অবশ্যই এ ব্যাপারে শুনতে চাইবেন।’

বোকার মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সাকারিনা বললেন, ‘মিঃ পটার আপনি ভালো করেই জানেন যে আমরা ভুল কিছু করিনি। মিঃ আ্যম্ব্রোসিয়াসের আগমন ম্যাজিক্যাল জগতের গোপনতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। সব ভালোভাবে মিটে গেছে।’

হ্যারি সামান্য নত হলেন। ‘আমি খুশী হয়েছি ব্রেন্ডা আপনি এভাবে এটা ভেবেছেন বলে। তার থেকেও বড় কথা আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি এটা দেখে যে আপনি মিঃ হুবার্টের আসল নামটা জানেন। ভালো করেই জানি কোনও সূত্রই পাওয়া যাবে না ওনাকে, আপনাকে এবং মাদাম ডেলাক্রয়কে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখার। এখন প্রশ্ন হল আমরা আপনাদের বন্ধুটিকে কি করবো?’

সবার নজর এবার গেল সাকারিনা আর রিক্রিয়ান্টের মাঝের চেয়ারে বসে থাকা  মানুষটার দিকে। ছোট খাটো গোলগাল কালো চুলের একটি মানুষ যার ডান চোখের ভুরুতে কাটা দাগ। সকলের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করতে পারলে ভাল হয় এমন হাবভাব।

র‍্যালফ ঘরে ঢুকলো সবার শেষে, মারলিন আর লংবটমকে ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে এসে লোকটাকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো। ‘ড্যাড?’ ভ্রু কপালে তুলে জানতে চাইলো, ‘তুমি এখানে কি করছ?’

লোকটা মুখ বিকৃত করে দুহাত দিয়ে সেটাকে ঢাকলো। মারলিন র‍্যালফের দিকে তাকালেন, ওঁর বিশাল পাথরের মতো মুখটা গম্ভীর। একটা হাত রাখলেন র‍্যালফের কাঁধে। ‘এই মানুষটা নিজের নাম বলেছে ডেনিশ ডিডল। আমার মনে হচ্ছে তুমি একে চেনো।’

নেভিল জানতে চাইলো, ‘উনি এখানে কি করছেন?’

‘আমার মনে হয় এই সমস্ত ঘটনার পেছনে ওনার উপস্থিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,’ হেড মিস্ট্রেস হতাশার স্বরে বললেন। ‘ইনিই সেই মানুষ যিনি মিঃ প্রেস্কট কে এই স্কুলে প্রবেশ করতে সহায়তা করেছেন।’

র‍্যালফ, ম্যাকগনাগলের দিকে ঘুরে গিয়ে বলে উঠলো, ‘মানে? আপনি এধরনের কথা বলছেন কেন? এ তো সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার!’

হ্যারি ধীর কন্ঠে বললেন, ‘উনি এসেছেন মিঃ প্রেস্কটের দলের সঙ্গে। চেষ্টা করেছেন সব সময় আড়ালে থাকার। কারণ ওনার চিন্তা ছিল তুমি হয়তো ওনাকে দেখে ফেলবে। সব কিছু ঠিকঠাক ঘটে যাওয়ার পর দেখতে পেলে অবশ্য কোন সমস্যা হত না। কিন্তু বলতেই হবে, সব কিছু সেরকম হলো না যা উনি ভেবেছিলেন।’

‘এ হতেই পারে না, যতসব উলটো পালটা কথা, ‘র‍্যালফ বলে উঠলো। ‘ড্যাড একজন মাগল! উনি মাগলদের নন-ডিসক্লোজার কন্ট্র্যাক্টে স্বাক্ষর করেছেন। করেছেন তো? ফলে চাইলেও তো উনি এটা করতে পারেননা! আমি জানি না উনি এখানে কি করতে এসেছেন, তবে আমার মনে হয় না আপনারা যা ভাবছেন সেটা ঠিক!’

মারলিনের হাত র‍্যালফের কাঁধে রাখাই ছিল। আস্তে আস্তে চাপড় দিলেন। ‘মিঃ ডিডল তুমি নিজেই জিজ্ঞেস করে নাও তাহলে।’

র‍্যালফ বিশালাকায় জাদুকরের মুখের দিকে তাকালো  রাগ আর অনিশ্চয়তার দৃষ্টিতে। তারপর তাকাল ঘরে উপস্থিত বাকিদের দিকে এক এক করে। বাবার মুখের ওপর এসে তার চোখ থেমে গেল। ‘ঠিক আছে তবে তাই হোক। ড্যাড তুমি এখানে কি জন্য এসেছ?’

ডেনিস ডিডল এখনো দুহাতে মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ একটুও নড়তে দেখা গেল না ওঁকে। অবশেষে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে পেছনে হেলান দিয়ে বসে মুখের ওপর থেকে হাত সরালেন। তাকিয়ে থাকলেন র‍্যালফের দিকে আরো কিছুক্ষণ। তারপর চারদিকের মানুষগুলোকে দেখলেন।

‘হুম, বলেই ফেলি তাহলে। হ্যাঁ,’ নিজেকে খানিকটা গুছিয়ে নিলেন, ‘আমিই প্রেস্কটকে বলেছিলাম এখানকার কথা। আমিই ওকে চকলেট ফ্রগ আর গেমডেক পাঠিয়েছিলাম। আমি এই স্কুল এলাকার কোন একজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। এমন একজন যে অ্যাস্ট্রামাড্ডুক্স নাম ব্যবহার করতো। একবার যোগাযোগ করতে পেরেই বুঝে গিয়েছিলাম প্রেস্কটের পক্ষে তার জিপিএস দিয়ে এই স্কুলের অবস্থান খুঁজে বার করতে কোনো অসুবিধা হবেনা।’

র‍্যালফের মুখে ছেয়ে গেল অবিশ্বাস আর চরম হতাশার ছায়া। ‘কিন্তু কেন ড্যাড? কেন তুমি এরকম একটা কাজ  করলে?’

‘ওহ র‍্যালফ! আয়াম সরি। আমি জানি বিষয়টা তোর জন্য খারাপ হচ্ছে,’ ডেনিস বললেন। ‘কিন্তু পুরো ব্যাপারটা খুবই …খুবই জটিল প্যাঁচালো। প্রেস্কটের শো “ইন্সাইড ভিঊ” ঘোষনা করেছিল সুপারন্যাচর‍্যাল কিছুর প্রমাণ দিতে পারলে টাকা দেবে। আমার আর্থিক অবস্থাটা মোটেই ভালো নেইরে র‍্যালফ। আমি সেই কবে থেকে একটা কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সময়টাই খারাপ। আমাদের টাকা দরকার। আমি ভেবেছিলাম চকলেট ফ্রগটাই যথেষ্ট হবে প্রমাণের জন্য। সত্যি বলছি! কিন্তু প্রেস্কট আরো প্রমাণ চাইল। আমি বুঝেছিলাম আমাকে দারুণ রকমের চমকপ্রদ কিছু ওকে দেখাতে হবে, তাই…’ কথা থামিয়ে উদভ্রান্ত ভাবে ঘরের সবাইকে আরো একবার দেখলেন।

‘কিন্তু তুমি কোনো অর্থই পাওনি,’ মারলিন নিচু কাঁপানো স্বরে বললেন। ‘কিন্তু সেটাই একমাত্র বিষয় নয় এখানে, তাই না?’

ডেনিশের ভ্রু কাঁপতে থাকলো মারলিনের দিকে তাকানোর পর, কি বলবেন সম্ভবত সেটা ঠিক করতে পারছে না। পাশে দাঁড়ানো সাকারিনা অর্থবহ ভাবে গলা খাঁকারি দিলেন। ডেনিশ তাকালেন ওর দিকে, মারলিনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে। ‘অর্থ,’ অনিশ্চিত ফ্যাঁসফেঁসে স্বরে বললেন, ‘প্রেস্কট বলেছিল যখন অনুষ্ঠানটা সম্প্রচার হবে তখন টাকা দেবে। আমায় প্রমিস করেছিল।’

‘কিন্তু এখন তো আর কোন অনুষ্ঠানই হবে না,’ মারলিন বললেন শান্ত গলায়।

‘ড্যাড, তুমি বাকি জগতের সামনে ম্যাজিক্যাল জগতকে বেচে দেওয়াটাকে দামি বলে মনে করেছিলে। যা করে তুমি কিছু অর্থ পেতে। যা আমাদের জীবনে কিছু সময়ের জন্য স্বস্তি নিয়ে আসত। ব্যস? র‍্যালফের কথাগুলো বলার ভঙ্গীতে দোষ চাপানো নয়, ছিল এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন। সে স্বরে এমন এক হতাশার সুর ছিল যা জেমসের বুকের ভেতর গিয়ে ধাক্কা মারলো।

‘না, না রে র‍্যালফ না! ডেনিস বললেন, তারপর অন্যদিকে তাকালেন। ‘সত্যি বলছি আমি একবারও ভাবতে পারিনি যে এটার জন্য পুরো জাদুজগতের অস্তিত্বে ঘা লাগবে। মানে আমার মাথায় ছিল শুধুমাত্র একটা ফালতু টিভি শো এর কথা। তা ছাড়াও …’ থেমে গেলেন, কি বলবেন সেটার ভাবনা নিয়ে যে ওর মনের ভেতর একটা টানাপোড়েন চলছে, তা বোঝা যাচ্ছিলো।

‘তাছাড়া কি?’ মারলিন শান্ত ভাবে জানতে চাইলেন।

ডেনিশ মারলিনের দিকে তাকালেন, মুখে উদ্বেগের ছাপ, ডান ভুরু কাঁপছে। ‘তাছাড়া, এই ম্যাজিক্যাল দুনিয়া আজ অবধি আমার জন্য কি করেছে?’ কথাটা বলেই দুহাতে মুখ ঢাকলেন। শরীর কাঁপিয়ে একটা বড় শ্বাস নিলেন। ‘আমাকে একা ছেড়ে দিয়েছিল, ব্যাস। দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল অবহেলায়, ঠিক যেন আমি একটা…আমি একটা অপদার্থ মিউট্যান্ট! আমার নাম… আমার পরিবার সব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল আমার কাছ থেকে। আমার বাবা মা পর্যন্ত আমাকে ত্যাগ করেছিলেন! কারন আমি তাদের মতো নই! তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা বা কথা বলা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল আমার জন্য। ওরা বলেছিলেন আমাকে মাগল জগতে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে, কারণ আমি ওখানকার জন্যই জন্মেছি। ওরা বলেছিল আমি ওখানেই আনন্দে থাকবো। কতটা আনন্দে সেটা বোধ হয় আমি ওদের দেখাতে পেরেছি – কি বলেন আপনারা? ওনারা চান নি আমার জন্য ওনাদের সম্মান নষ্ট হোক জাদুর দুনিয়ার। তাহলে আমিই বা কেন ম্যাজিক্যাল জগতের গোপনীয়তা নিয়ে মাথা ঘামাব ?’

র‍্যালফের মুখে কেউ যেন একটা অবিশ্বাসীর মুখোশ চাপিয়ে দিয়েছিল ওই মুহূর্তে। ‘তুমি কি সব বলছো ড্যাড? তুমি তো উইজার্ড নও। গ্র্যান্ড মা আর গ্র্যান্ডপা মারা গিয়েছিলেন আমার জন্মের আগেই। তুমি নিজেও তো ঠিক আমার মতই অবাক হয়ে গিয়েছিলে যখন হগওয়ারটস থেকে চিঠিটা আসে।’

ডেনিশ ছেলের দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলেন। ‘র‍্যালফ আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম রে আমার অতীতের কথা। অনেক অনেক দিন আগের ব্যাপার ওসব। আমি চেষ্টা করেছিলাম ওগুলোকে মুছে ফেলতে। আমি আসলে একটা কলঙ্ক আমাদের পরিবারে। তোর ঠাকুরদা ঠাকুরমা এবং তোর কাকারা সবাই জাদুকর ছিলেন। কিন্তু আমি জন্মেছিলাম কোন ক্ষমতা ছাড়াই। ওরা আমাকে যতদুর সম্ভব বড় করে তুলেছিলেন। আসলে আমার আচার আচরণকে ওনারা ঘৃণা করতেন। নির্দিষ্ট বয়সে পৌছানর পর যখন নিশ্চিত হলেন আমার কোন ম্যাজিক্যাল ক্ষমতা নেই তখন ওরা সেটা আর সহ্য করতে পারলেন না। আমাকে লুকিয়ে রাখলেন পুরো জাদু জগতের কাছ থেকে। আমি ছিলাম ওদের জীবনের এক ঘৃণ্যতম গুপ্তকথা। কিন্তু আমাকে পুরোপুরি লুকিয়ে রাখা ওদের পক্ষে সম্ভব হল না। অবশেষে যখন আমার বারো বছর বয়স হল, ওরা আমাকে দূরে পাঠিয়ে দিলেন। আমাকে রাখা হলো একটা মাগল অনাথাশ্রমে। ওখানে জানানো হলো আমার বাবা মা দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। শপথ করিয়ে নিলেন যে, আমি কখনোই ওদের ব্যাপারে কোন কথা বলবো না। কখনোই ওদের খুঁজে বার করার চেষ্টা করব না। আমার মা … এটায় দুঃখ পেয়েছিলেন। উনি কাঁদতে কাঁদতে নিজের মুখ লুকিয়েছিলেন আমার কাছ থেকে। কিন্তু আমার বাবা ছিলেন কঠোর মানুষ। মা ওনার বিরুদ্ধে যেতে পারেননি। এক মাগল ড্রাইভার জোগাড় করে আমাকে অনাথাশ্রমে নিয়ে যাওয়া হয়। মা থেকে গেলেন গাড়ির ভেতরে আর বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন ভেতরে। মা আমাকে আলিঙ্গন করে বিদায় জানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাবা সেটাও করতে দেননি। বলেছিলেন যত মায়া কাটাতে পারবে ততই আমাদের পক্ষে মঙ্গল। অনাথাশ্রমের কর্মীদের ওপর উনি স্মৃতি বিনির্মাণের মন্ত্র প্রয়োগ করেন। ওদের বিশ্বাস করিয়ে দেন যে আমাকে আমার বাবা মার মৃত্যুর পর এখানে রেখে যাওয়া হয়েছে। আমাকে একটা বিছানা আর এক প্রস্থ জামা কাপড় দিয়ে আমার বাবা বিদায় নেন। এরপর আমি আর কোনদিন আমার বাবা মাকে দেখতে পাইনি।’

চুপ করে গেলেন মিঃ ডিডল । তাকিয়ে থাকলেন র‍্যালফের মুখের দিকে। মারলিন বললেন, ‘মিঃ ডিডল বোঝাই যাচ্ছে আপনি অনেক কষ্টভোগ করেছেন জীবনে। আমার মনে হয় ডিডলটা আপনার আসল পদবী নয়?’

‘না। আমার বাবা এই পদবীটা বানিয়েছিলেন আমার জন্য,’ তিক্ত স্বরে বললেন ডেনিস। ‘যেটাকে আমি ঘেন্না করি।’

‘স্যার আপনার আসল নাম পদবীটা বলবেন?’

‘ডলোহভ,’ র‍্যালফের বাবা উত্তর দিলেন, প্রায় এক মৃতপ্রায় কণ্ঠস্বরে। ‘আমার নাম ডেনিস্টন গাইলস ডলোহভ। ম্যাক্সিমিলিয়ন এবং উইলহেল্মিনা ডলোহভ এর সন্তান আমি। অ্যান্তোনিন এর সৎ ভাই।’

ঘরে কিছু সময়ের শীতল নীরবতা জমাট বেঁধে রইলো। ম্যিলগনাগল বললেন, ‘মিঃ ডলোহভ আপনি কি অনুমান করতে পারছেন আপনি যা করেছেন তার জন্য আপনাকে আজকাবানে পাঠানো হতে পারে?’

ডেনিস চোখ পিট পিট করে তাকালেন মনে হল একটা ঘোরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। ‘কি? না, না, কখনোই ভাবিনি । আমি আইনের বিরুদ্ধাচরণ করার মত কিছু করবো না এই শপথ নিয়েছিলাম।’

সাকারিনা আবার হাল্কাভাবে কাশলেন। ‘আমার মনে হয় মিঃ ডিডল আপনার আর কোন উত্তর দেওয়া উচিত নয় যতক্ষণ না আপনার পক্ষের আইনজীবী উপস্থিত হচ্ছেন।’

‘কেন?’ ডেনিস বললেন সাকারিনার দিকে তাকিয়ে। ‘আমি কি কোন ঝামেলায় জড়িয়ে গেছি? আপনি বলেছিলেন—’

সাকারিনা কথা চাপা দিয়ে বললেন, ‘এটা আপনার ভালোর জন্যই বললাম। স্যার।’

ডেনিস উঠে দাঁড়ালেন, ‘কিন্তু আপনিই তো বলেছিলেন, এই জগতের ভালোর জন্য আমার এই কাজ।’ হ্যারির দিকে তাকালেন। ‘জানেন, এই মহিলা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যদি প্রেস্কট ও তার দলবল আর্থিক ব্যাপারে ঝামেলা করে উনি সেটা দেখবেন! উনি এটাও বলেছিলেন এই ব্যাপারটা যেকনো মূল্যের আর্থিক বিষয়ের থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ! যখন আমি ওদের কাছে গিয়েছিলাম—’

সাকারিনা বরফশীতল কণ্ঠে বললেন, ‘সিট ডাউন, মিঃ ডিডল!’

‘ওইটা বলে আমায় ডাকবেন না! আমি ওই শব্দটাকে ঘেন্না করি!’ ডেনিশ সাকারিনার কাছ থেকে সরে গিয়ে বললে।  তাকালেন হ্যারির দিকে। ‘ওরা আমায় বলেছিলেন প্রেস্কটের সঙ্গে এবিষয়ে কথা বলায় কোন সমস্যা নেই! আমি ওদের বলেছিলাম আমি কি ভাবছি এ বিষয়ে। আমি জানতাম এটা নিয়ে আমাকে মন্ত্রকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ওরা বলেছিল, যে কন্ট্র্যাক্টটায় আমি স্বাক্ষর করেছি সেটা আমাকে আটকাতে পারবে না এ কাজ করা থেকে কারণ আমি তো মাগল নই। আর যেহেতু আমি অনেক অনেক দিন আগেই জাদু দুনিয়াকে ত্যাগ করেছি, এমন একটা সময়ে ত্যাগ করেছি যখন আমার বয়স হয়নি সুরক্ষার চুক্তি পত্রে স্বাক্ষর করার, তাই আমার দিক থেকে কোন রকম আইনভঙ্গ হবে না এ কাজ করলে। উনি জানিয়েছিলেন চিন্তার কিছুই নেই! উনি এটাও বলে ছিলেন যে এই কাজটা করা হচ্ছে সবার ভালর জন্য। কাজটা করলে আমি হিরো হয়ে যাব!’

‘মিস সাকারিনা,’ হ্যারি নিজের জাদুদন্ড বার করলেন, ব্যবহার অবশ্য করলেন না, ‘এই ব্যাক্তিটির অভিযোগের ভিত্তিতে আপানার কিছু বলার আছে?’

অত্যন্ত স্বাভাবিক কন্ঠে সাকারিনা উত্তর দিলেন, ‘আমার এব্যাপারে কিছুই বলার নেই। উনি একজন সাঙঘাতিক মানুষ । এরকম একজন মানুষের কথায় কেউই বিশ্বাস করবে না।’

‘মিঃ রিক্রিয়ান্ট?’ হ্যারি হতভম্ব হয়ে থাকা মানুষটার দিকে ঘুরে বললেন, ‘আপনি কি মিস সাকারিনার বলা কথাকে সমর্থন করেন?’

রিক্রিয়ান্টের চোখ একবার হ্যারি একবার সাকারিনার দিকে ঘোরা ফেরা করতে থাকলো। ‘আমি …’ কথা বলা শুরু করে মাথা ও স্বর দুটোই নামালেন। ‘আমি এ ব্যাপারে মিস সাকারিনার অনুপস্থিতিতে কথা বলতে চাই।’

‘মিঃ রিক্রিয়ান্ট, আপনার সুপিরিয়র হিসাবে, আমি সাবধান—’

‘আপনি কাউকেই সাবধান করে দিতে পারেন না ম্যাডাম,’ নেভিল কঠোর স্বরে বললো, নিজের জাদুদন্ডটা হাতে নিয়ে।

‘অ্যাম্বাসাডোরিয়াল সিকিউরিটির নামে শপথ করে বলছি, আমি বাধ্য হচ্ছি …,’ সাকারিন কথা বলতে শুরু করেও থেমে গেলেন হ্যারিকে ওর দিকে জাদুদন্ড তাক করতে দেখে।

‘মিনিস্ট্রি অফ ম্যাজিক এবং অরোর ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে,’ হ্যারি গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘মিস ব্রেন্ডা সাকারিনা আমি আপনাকে গ্রেপ্তার করছি ইন্টার ন্যাশনাল কোড অফ উইজারডিং সিক্রেসীর সেকশন টু উলঙ্ঘন এবং মিনিস্ট্রি অফ ম্যাজিকের সম্পত্তি চুরির দায়ে।’

সাকারিনা হাসার চেষ্টা করলেন কিন্তু সেটা ভালো মতো ফুটে উঠলো না । ‘মিঃ পটার, আপনি কিছুই প্রমাণ করতে পারবেন না।  বোকার মতো ভয়ানক একটা খেলা আপনি খেলছেন। আমি শুধু সাবধান করে দিতে পারি আপনি এসব থেকে দূরে থাকুন।’

‘মিস সাকারিনা, আমার মনে হয় এবার থেকে যারা আপনাকে সহ্য করতে পারেনা তাদের সঙ্গে   কোন ষড়যন্ত্র পাকানোর আগে দুবার ভাববেন,’ মারলিন বললেন অর্থময় হাসি হেসে। ‘অরণ্যের ভেতর আমি মাদাম ডেলাক্রয়কে খুঁজে পেয়ে ওনার সঙ্গে এক অতি মনোরম এবং তথ্যময় বাক্যালাপ করেছি । উনি আপনার বিষয়ে অনেক কথাই বলেছেন। সেখানে এমন অনেক কথা বলেছেন উনি যেগুলো, আমার ভয় হচ্ছে সেগুলো আপনার পক্ষে  সুবিধাজনক নয় বোধহয়।’

নেভিল মিঃ রিক্রিয়ান্টকে ঘরের বাইরে নিয়ে গেলেন, হেডমিস্ট্রেস অনুসরণ করলেন ওদের দুজনকে। হ্যারি জাদুদন্ড নেড়ে ইশারা করলেন। ‘আসুন মিস সাকারিনা, টাইটাস হার্ড ক্যাসল অপেক্ষা করছেন আপনাকে মন্ত্রকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ওনার আবার বেশি অপেক্ষা করা ধাতে সয় না।’

সাকারিনার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। বুঝতে পারছিলেন এছাড়া আর কোনো পথ এই মুহূর্তে ওর সামনে খোলা নেই।

ড্যাডের আগে আগে সাকারিনা কে বেরিয়ে যেতে দেখে জেমস মনে মনে ভাবলো – সন্দেহ নেই নিজেকে বাঁচানোর মতো শক্ত পোক্ত ঢাল তৈরীই আছে ওঁর। ওদের মতো মানুষদের সব সময়েই অনেক রকম পন্থাপদ্ধতি থাকে দোষ ঢাকার। যদিও এই মুহূর্তে ব্রেন্ডা সাকারিনার সময়টা ভালো যাচ্ছেনা। গ্রেট হলের দিকে দরজাটা খুলে যেতেই জেমস দেখতে পেলো টাইটাস হার্ড ক্যাসল জাদুদন্ডটা মাটির দিকে নামিয়ে রেখে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

জেমস দেখলো আপাতত ঘরে ও নিজে, মারলিন, র‍্যালফ, জ্যান আর ডেনিস ডলোহভ।

ডেনিস ছেলের দিকে তাকিয়ে ওর কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, ‘সরি র‍্যালফ। আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি …বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।’

র‍্যালফ চোখ নামিয়ে বইলো, ‘তুমি আমায় সব কথা বলতে পারতে ড্যাড।’

ডেনিস মাথা ঝুঁকালেন। একটু বাদে মারলিনের দিকে তাকালেন। ‘আমাকে কি জাদুকরদের কারাগারে পাঠানো হবে? জানতে চাইলেন স্থির স্বরে। ‘আমি তাহলে… আমি তাহলে সেখানেই চলে যাবো।’

‘সম্ভবত, আমার সেটা মনে হচ্ছে না মিঃ ডলোহভ,’ মারলিন ওদেরকে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন। খুললেন দরজাটা। ‘যদিও আপনার কাজটা একটা বিরাট হইচই পাকিয়ে দিয়েছে ।  তার থেকে ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে একসময় এই স্কুলের সুরক্ষা ব্যবস্থা যেরকম ছিল সেরকম আর নেই। অন্তত আধুনিক মাগল টেকনোলজির সামনে তো নয়ই। আপনার কাছেই হয়তো এব্যাপারে চিন্তা ভাবনা আছে কিভাবে এটাকে উন্নত করা যায় ।’

ডেনিস ভুরু উঁচিয়ে তাকালেন। ‘আপনি কি বলতে চাইছেন বলুন তো? আপনি কি আমার সাহায্য চাইছেন এ ব্যাপারে?’

মারলিন কাঁধ উঁচু করলেন। ‘আমি আসলে দুটো আগ্রহজনক বিষয়কে একত্রিত করার চেষ্টা করছি। আপনার একটা কাজ দরকার আর আমাদের দরকার একটা নতুন করে ঢেলে সাজানো সুরক্ষা ব্যবস্থা। মাগল টেকনোলজির ব্যবহারে আপনি একজন প্রায় জাদুকরদের মতই দক্ষ। আমার মনে হয় আপনি এই ব্যাপারে বেশ ভালোই কাজ করতে পারবেন।’

ডেনিস স্বস্তির হাসি সহ বললেন, ‘আমি অবশ্যই এ ব্যাপারটা নিয়ে ভাববো স্যার।’

লম্বা লম্বা পায়ে গ্রেট হলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মারলিন বললেন, ‘অবশ্য, এই স্কুলের পক্ষ থেকে আমি আপনাকে এরকম কোন কাজের বরাত দেওয়ার মতো ব্যক্তি নই। তবে আপনাদের হেডমিস্ট্রেসকে আমি চিনি। দেখি আপনার জন্য কি করতে পারি।’

র‍্যালফ আর জেমসের সঙ্গে হেঁটে  যেতে যেতে জ্যান বললো, ‘তাহলে, র‍্যালফ তোর অতীতটা সত্যি সত্যিই দারুণ একটা জাদুর জগতের সঙ্গে জড়িত। যদিও তারা ছিলেন খুবই নিষ্ঠুর এবং শুদ্ধ রক্তের গর্বে মেতে থাকা মানুষ। তাতে কিছু আসে যায়না। তবে উত্তরটা পাওয়া যায় কেন তোকে স্লিদারিনে পাঠানো হয়েছে।’

‘হয়তো তাই,’ র‍্যালফ আস্তে করে বললো। ‘একটা দিনের পক্ষে আজকের ঘটনাটা আমার কাছে খুবই বাড়াবাড়ি রকমের মারাত্মক। তবে যাই হয়ে থাকুক আজ অবধি কোন কৌশলই আমি নিজে করিনি  সেটা ভালোই বুঝতে পারছি। সব করেছে ওই জাদু লাঠি।’

মারলিন সিঁড়ির কাছে থেমে ঘুরলেন। তাকালেন র‍্যালফের দিকে। ‘তুমি আমার জাদু লাঠিটার রক্ষক ছিলে?’

‘হুম,’ র‍্যালফ অনিচ্ছার সঙ্গে জবাব দিলো। ‘কাউকে মেরে ফেলা থেকে বাঁচানোর জন্য ওটাকে সঙ্গে রেখেছিলাম বলেই আমার ধারনা। না জেনে বুঝেই যদিও।’

জ্যান বললো, ‘একদম ওর কথা শুনবেন না। ও ওটাকে দারুনভাবে ব্যবহার করেছে । একবার জেমসের জীবনও বাঁচিয়েছে ওটা দিয়ে। একটা কলা থেকে গোটা একটা পীচ গাছের জন্ম দিয়েছে জানেন! আবার সঙ্গে সঙ্গেই ডার্ক আর্ট প্রতিরোধ শেখার ক্লাসে ভিক্টরির মাথার চুল উঠিয়ে টাকও বানিয়েছে ওটা দিয়েই। যেটা অবশ্য বার বার ভিক্টরির বকবকানি থামানোর জন্য আমরা অনেকেই করতে চেয়েছিলাম।’

মারলিন র‍্যালফের  কাছে ফিরে এলেন। জেমস নিশ্চিত একটু আগেও মহান উইজার্ডের কাছে ওঁর জাদু লাঠিটা ছিল না, র‍্যালফের সামনে একটা হাঁটু জমিতে রেখে বসা মাত্রই ওটা দেখা গেল ওঁর ডান হাতে। পুরোটা কালচে রঙের, কিন্তু জেমসের মনে পড়লো আগের রাতেই ওটা কিরকম সবুজ আলোর দ্যূতি ছাড়চ্ছিল।

‘মিঃ ডিডল নাকি—মিঃ ডলোহভ কি বলে ডাকবো তোমাকে?’ মারলিন বললেন।

র‍্যালফ উত্তর দিলো, ‘আমি ডিডল শব্দটার সঙ্গেই বেশী জড়িয়ে আছি। আমি জানি না আমি ডলোহভের উপযুক্ত কিনা। সরি ড্যাড।’ ডেনিস স্মিত হাসলেন ।

‘তাহলে মিঃ ডিডলই বলি,’ মারলিন বললেন। ‘সব জাদুকর এই জাদু লাঠি সামলানোর ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়না। তুমি শুনেছ নিশ্চয় যে জাদুদন্ড জাদুকরকে বেছে নেয়। আর সেটা খুবই সত্যি কথা। মাদাম ডেলাক্রয় মনে করতেন তুমি আর পাঁচটা সাধারণ বাহক যে ওটা বহন করেছিল। কিন্তু ওর ভাবনা ভুল। এই লাঠিই তোমাকে বেছে নিয়েছিল। ব্যবহার করা তো দূরে থাক এটাকে ধরে রাখতে পারাই কোন সাধারণ মাপের জাদুকরের পক্ষে অসাধ্য কাজ। কিন্তু তুমি কিছু না জেনেই এটাকে নিজের সাধ্যমতো ব্যবহার করেছ। তুমি জানতেও না এটার শক্তি কতটা, তবুও ওটাকে দিয়ে কাজ চালিয়ে নিয়েছ। ওটা তোমার কথা শুনেছে, আর সেটাই হলো একজন সেরা জাদুকরের সবচেয়ে বড় ক্ষমতার চিহ্ন। মিঃ ডিডল এই জাদুলাঠির কিছুটা এখন তোমার মালিকানাভুক্ত। আমি সেটা অনুভব করতেও পারছি। আমি বুঝতে পারছিলাম এর কিছু অংশ আর আমার আয়ত্ত্বে নেই, কিন্তু মালিককে ধরতে পারছিলাম না। এখন বুঝলাম সেটা কে।’

মারলিন লাঠিটা নামিয়ে রাখলেন হাঁটুর ওপর। চোখ বন্ধ করে লাঠিটাকে স্পর্শ না করে কিছু একটা মাপলেন। সেই সবুজ আলোর দৌড়াদৌড়ি আবার দেখা গেল লাঠিটায়। লাঠিটার নিচের দিকটা চেপে ধরলেন একহাতে। তারপর আরেক হাতের চাপে নিচ থেকে এক ফুট মতন ভেঙে ফেললেন এক মোচড়ে। চোখ খুললেন এবং সেই অংশটুকু বাড়িয়ে ধরলেন র‍্যালফের দিকে।

‘মিঃ ডিডল আমার মনে হয় তোমার একটা জাদুদন্ডের দরকার আছে।’

র‍্যালফ কাঠের টুকরোটা নিলো মারলিনের কাছ থেকে। সঙ্গে সঙ্গেই ওটা রূপান্তরিত হল সেই আগের মতোই মোটা ভোঁতা অদ্ভুত দর্শন একদিক চাঁছা লেবু সবুজ রঙ করা লাঠিতে। র‍্যালফ হেসে বার কয়েক এহাত ওহাত করলো ওটাকে।

মারলিন বললেন, ‘আমার মনে হয়না এটা আর আগের মতো অত শক্তিশালী হবে বা কাজ করবে।’ নিজের লাঠিটায় ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ওটা এখন অনেকটাই ছোট দেখাচ্ছে ওঁর শরীরের তুলনায়। ‘তবুও আমি নিশ্চিত তুমি ওটা দিয়েই অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ করতে সমর্থ হবে।’

র‍্যালফ যথেষ্ট সিরিয়াস ভঙ্গীতে বললো, ‘ধন্যবাদ।’

মারলিন ভ্রু ওপরে তুলে বললেন, ‘আমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার দরকার নেই । ওটা তোমার প্রাপ্য মিঃ ডিডল। ওটার স্রষ্টা যে তুমি।’

জ্যান মুচকি হেসে বললো, ‘তাহলে মহান জাদুকর ভীতু সিংহকে তার সাহস প্রদান করলেন। আচ্ছা জেমস কবে একটু বুদ্ধি পাবে বলুন তো?’

মারলিন আর একটু ভুরু উঁচিয়ে জ্যান এবং জেমসকে দেখলেন।

‘ওর কথায় কান দেবেন না,’ জেমস বললো, হাসতে হাসতে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে। ‘ওসব মাগলদের ব্যাপার স্যাপার। আমরা বুঝতে পারবো না।’

‘চল চল তাড়াতাড়ি চল! সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে র‍্যালফ হাঁক দিলো। ‘আমি টেড আর বাকি গ্রেমলিন সদস্যদের দেখাতে চাই আমি আমার জাদুদন্ড ফিরে পেয়েছি! টাবিথা করসিকা তার বিচ্ছিরী ঝাড়ুটা নিজের কাছেই জমিয়ে রাখুক।’

ওরা সঞ্চরণশীল সিঁড়ি দিয়ে অতিরিক্ত উৎসাহের সঙ্গে উঠতে থাকলো। ওদের অনুসরণ করলেন মারলিন আর নতুন জন্ম লাভ করা ডেনিস ডলোহভ।

ডেনিস মারলিনের কাছে জানতে চাইলেন, ‘র‍্যালফ ওটা সামলাতে পারবে তো?’

মারলিন মৃদু হাসলেন এবং সিঁড়ির ধাপে নিজের লাঠিটা ঠুকলেন। কেউ লক্ষ্য করলো না একরাশ লেবু সবুজ রঙা আলোর ফুলকি জোনাকির মতো ওপর দিকে উড়ে গেল।

 

 

 

[চলবে]

লেখক পরিচিতিঃ  জর্জ নরম্যান লিপার্ট আমেরিকান লেখক এবং কম্পিউটার অ্যানিমেটর। তবে ওনার বর্তমান পরিচয় উনি জেমস পটার সিরিজের লেখক। যে কারনে ওনাকে “আমেরিকান রাউলিং” নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই সিরিজের প্রথম লেখা “জেমস পটার অ্যান্ড দ্য হল অফ এল্ডারস ক্রসিং” প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। নানান কারনে এটি অনেক বিতর্কে জড়িয়ে যায়। সেসব সমস্যা পেরিয়ে আজ এটি পাঠক পাঠিকাদের চাহিদায় সারা বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সিরিজের সব কটি বই ই-বুক এবং ফ্রি হিসাবেই প্রকাশ করেছেন মাননীয় জর্জ নরম্যান লিপারট। এই সিরিজ ছাড়াও ওনার আরো ১২ টি বই আছে। বর্তমানে উনি এরি, পেনসিল্ভ্যানিয়ার বাসিন্দা।

অনুবাদকের পরিচিতিঃ উপন্যাসটির অনুবাদক প্রতিম দাস মূলত চিত্র শিল্পী, ২০১৩ সাল থেকে ভারতের সমস্ত পাখি আঁকার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছেন। ৭৭৫+ প্রজাতির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে শুধু পাখি নয় অন্যান্য বিষয়েও ছবি আঁকা চলে একইসঙ্গে। দারুণ রকমের পাঠক, যা পান তাই পড়েন ধরনের। প্রিয় বিষয় রূপকথা, ফ্যান্টাসী, সায়েন্স ফিকশন, অলৌকিক। টুকটাক গল্প লেখার সঙ্গে আছে অনুবাদের শখ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!