অকুলাস রোবটিকা

মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

অলংকরণ:অঙ্কিতা

এক

অনেকক্ষণ ধরে মনিটরের দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে অরূপ, কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারছে না। সকাল থেকেই মনটা বিষণ্ণ ও বিক্ষিপ্ত। মাঝে একবার ঝিমুনির মতো ধরেছিল, উঠে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে এসেছে। তন্দ্রাভাব কিছুটা হয়তো কেটেছে, কিন্তু বিষণ্ণতা যেন আরও জেঁকে বসেছে। দুপুর হয়ে এল প্রায়, এখনও জার্নালটির প্রথম প্যারাই পড়ে শেষ করতে পারেনি।

     বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকে লক্ষ করছে সুমিতা। আশপাশ দিয়ে ঘুরেও গেছে বার দুয়েক। একসময় বলে, “অরূপ, জানিস মানুষের অনুভূতি নাকি সংক্রামক?”

     অরূপ নিস্পৃহ ভাবে জবাব দেয়, “এখন জানলাম।”

     এমন নির্লিপ্ত আচরণে আঁতে ঘা লাগে সুমিতার। চেয়ার থেকে উঠে তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে আসে অরূপের দিকে, হাত ধরে টান দিয়ে চেয়ার থেকে উঠিয়ে উচ্চস্বরে বলে, “গত কয়েকদিন ধরে দেখছি তুই এমন মনমরা হয়ে আছিস। এটার প্রভাব আশপাশের অন্যদের উপরেও পড়ছে কিছুটা। আমিও কাজে মন বসাতে পারছি না। তুই কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আয়, আমাদেরও একটু স্বস্তিতে থাকতে দে।”

     এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চাপা স্বরে চিৎকার করে অরূপ বলে, “তোরা, মেয়েরা এত অধিকার ফলাতে আসিস কেন? কই আশপাশে তুই ছাড়াও তো অনেকে আছে। তাদের তো কোনও সমস্যা হচ্ছে না আমাকে নিয়ে! তাহলে তোর মাথায় এত ব্যথা কেন? এখানে তুই আর দেশে পতত্রী; পাগল করে ছাড়বি আমাকে! কিছু সময়ের জন্য নিজের মতো থাকতে দেওয়া যায় না? প্লিজ!”

     অরূপের সামনের কিউবিকলস থেকে এক তালপাতার সেপাই কপাল কুঁচকে বলে, “তোমরা ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের ছেলেপুলেরা সবকিছুতেই একটু বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাও। এখানে চিৎকার চেঁচামেচি না করে রুমের বাইরে গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে তোমাদের মাঝের হৃদয়ঘটিত ঝামেলা মিটিয়ে ফেললে হয় না বাছা? আমরা এখানে কাজ করতে এসেছি, তোমাদের প্রাক-দাম্পত্য কলহ শুনতে নয়।”

     মাথায় রক্ত চড়ে যায় অরূপের, “শুনেছিস হারামজাদা কী বলল? তোর কারণে এখন আমাদের দেশ নিয়ে একটা খোঁচা মারল। এই কার্টুনের বাচ্চা মার্টুন; উচ্চস্বরে কথা না বললে আমরা যে এখানে আছি এটাই সে খেয়াল করত না। আর কথার ছিরি দেখেছিস? হৃদয়ঘটিত, প্রাক-দাম্পত্য কলহ? আস্ত হারামি একটা।”

     অরূপের এই অপ্রত্যাশিত আচরণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে সুমিতা। চোখ ছলছল করে উঠে তার, চোখের জল লুকোতেই চটজলদি ঘুরে নিজের কিউবিকলের দিকে পা বাড়ায়। গায়ে পড়ে আর তার সঙ্গে কথা বলতে যাবে না, সিদ্ধান্ত নেয় সে।

     যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বাঁ হাত বাতাসে ছুড়ে হেলেদুলে কফি মেকারের দিকে এগিয়ে যায় অরূপ। অনেক সময় নিয়ে বড় এক মগে কড়া করে কফি বানায়। মগ হাতে অর্ধেক পথ এসে কী ভেবে কফিমেকারের দিকে ফিরে যায় পুনরায়। আর একটা কফি বানিয়ে মগটা সুমিতার টেবিলে উপর রেখে মুচকি হেসে বলে, “নে, কফিটা খেয়ে শক্তি সঞ্চয় কর, তারপর আমার উপর যত রাগ আছে সব ঝাড়িস। বেশ কড়া করে হৃদয় মিশিয়ে বানিয়েছি। আর আমাকে তো অনেকদিন ধরেই চিনিস, একটা ব্যক্তিগত ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি কয়েকদিন ধরে। তাই তোর উপর রাগটা ঝাড়লাম, মানুষ তো প্রিয় মানুষের উপরই রাগ ঝাড়ে তাই না? কিছু মনে করিস না।”

     এমন কোমল কথায় মুহূর্তেই সব রাগ পানি হয়ে যায় সুমিতার। কিন্তু সেটা তাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না। অরূপটা ইদানীং বেশ বাড় বেড়েছে, একটু শায়েস্তা না করলে আর নিজের ডাঁট থাকছে না। “নাহ, খেলাম কিছুক্ষণ আগে”, বলেই তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে কাজের দিকে মনোনিবেশ করে।

     ‘‘এখনও রেগে আছিস? আরে বাবা বললাম তো সরি। এখন কি নাটকীয় কায়দায় হিন্দি সিনেমার নায়কের মতো চিৎকার করে সরি বলতে হবে? আচ্ছা, দাঁড়া আমি খাইয়ে দিচ্ছি’’, বলেই ডান হাতে মগটি তুলে নিয়ে সুমিতার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে দেয়।

     “আরে করছিস কী? ধ্যাৎ, হিন্দি সিনেমার নায়কের চেয়ে তোর নাটকীয়তা কোনও অংশে কম না। আচ্ছা যা, এবারে মতো মাফ করলাম”, বলেই অদ্ভুত ভঙ্গিতে চুলগুলো কপালের উপর থেকে সরিয়ে দেয় সুমিতা। সুন্দর করে হাসে তারপর।

     ‘‘দেখেছিস? এমন নাটক না করলে তোর এতো সুন্দর হাসিটি দেখতে পেতাম?’’

     মুখ গম্ভীর করে বলে, “কি, পতত্রীর সঙ্গে কোনও ঝামেলা পাকিয়েছিস আবার?”

     ‘‘হুম, ঠিকই ধরেছিস।’’

     ‘‘কী ঝামেলা? আমাকে বলা যায়?’’

     “বাদ দে, এই প্রসঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। যতবার পতত্রীর কথা মনে হচ্ছে ততবার মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। আসলে টানা কয়েকদিন রাতে ঘুমাতে পারছি না। থাক, তোর কথা বল।”

     কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো সুমিতা আচমকাই অরূপের ফোনটা বেজে উঠে। কলটা রিসিভ করে কিছুক্ষণ কথা বলে। তবে অন্যপাশে কে সেটা ঠিক মতো ঠাহর করতে পারে না সুমিতা। অরূপের চোখ ছোট হয়ে আসে, কপাল কুঁচকে যায়, মনে মনে কিছু একটা অনুধাবন করতে চাইছে বলে মনে হয়। ফোনটা রেখে সুমিতাকে লক্ষ করে বলে, “মাইক ফোন করেছিল। কী একটা ব্যাপারে সাহায্য চাচ্ছে।”

     “মাইক! মানে ওই সিআইডি অফিসার? তো, কী ব্যাপারে?” রহস্যের গন্ধ পেয়ে চোখ নেচে উঠে তার।

     “ঠিক জানি না, ফোনে বিস্তারিত বলতে চাইছে না।”

     “গত পরশু একজন বাংলাদেশি অভিবাসী খুন হয়েছে, খবরে দেখাচ্ছিল। আমার ধারণা ওই ব্যাপারে হতে পারে। তো কখন দেখা করতে চাইছে?”

     “হুম, আমিও দেখেছি খবরটা।” কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি জন্মেছে গালে, বাঁ হাতে গাল হালকা চুলকিয়ে অরূপ বলে, “এখনই! নীচে গাড়িতে বসে আছে। আচ্ছা, আমি একটু ঘুরে আসি।”

     খুনখারাবির কথা শুনলেই গা গুলিয়ে উঠে সুমিতার। এদিকে কৌতূহলও হচ্ছে খুব। “আচ্ছা, সাবধানে থাকিস। আর কী হয় জানাতে দেরি করিস না।”

 

দুই

“চলুন কোনও রেস্টুরেন্টে বসি, এই ফাঁকে ফাইল দুটোতে হালকা নজর বুলিয়ে নেন। সঙ্গে দুটি আল্ট্রা ডিস্ক আছে। আপনার প্রয়োজনীয় সকল তথ্য এতে পেয়ে যাবেন।” দুটি মোটা ইনভেলাপ অরূপের দিকে এগিয়ে বলে মাইক। অরূপকে কথা বলার কোনও সুযোগ না দিয়ে অটো ড্রাইভে কাছাকাছি একটি রেস্টুরেন্টের ঠিকানা সেট করে গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে মাইক। চোখেমুখে কর্তৃত্বের ছাপ ফুটে উঠে।

     মাইকের এমন চাপিয়ে দেওয়া মনোভাবে কিছুটা বিরক্ত হয় অরূপ, একবার ভাবে গাড়ি থেকে নেমে যাবে, কী ভেবে ফাইলদুটি হাতে নিতে নিতে বলে, “খুন দুটির সঙ্গে কি রোবটিক্সের কোনও সংযোগ আছে?”

     ‘‘কী করে বুঝলেন?’’

     “গতকাল জহরুল হক নামের একজন বাংলাদেশি অভিবাসী স্কুলশিক্ষক খুন হয়েছেন। তার একমাস আগে আলবেরুনি নামের একজন ইজিপশিয়ান চক্ষু বিশেষজ্ঞ খুন হয়েছিলেন। দুইজনই মুসলমান এবং অভিবাসী। অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি খুন ছোট এই শহরে বেশ চাঞ্চল্যে সৃষ্টি করেছে। মিডিয়া বেশ সরব, আপনাদের ডিপার্টমেন্টের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে যা কিছুটা হলেও যথার্থ। নিশ্চয় বেসামাল চাপের উপর আছেন।” ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি ঝুলিয়ে বলে অরূপ। “সেই চাপের কিছুটা ভার আমার উপর ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন এটা বোঝার জন্যে খুব বেশি চিন্তা করতে হয় না।” মোক্ষম জায়গা বুঝে খোঁচাটা দিতে পেরে কিঞ্চিত আনন্দ হচ্ছে অরূপের। তো তদন্তে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে?

     “অনেক তথ্যই সংগ্রহ করা হয়েছে, কিন্তু কোনও প্যাটার্ন পাচ্ছি না। দুটি খুনের ধরন একই; মাথা লক্ষ্য করে লেসার গান চালানো হয়েছে। ভিকটিম টুঁ শব্দটি করারও সুযোগ পায়নি, ঘুমের মধ্যেই শেষ। দুটি ঘটনায় আরও কিছু মিল আছে। যেমন, দুইজনই ব্যাচেলর, দু’টি ঘরেই বেটা-ট্রনিক্সের একটি গৃহজাত রোবট ছিল। আর দু’জনেই মুসলিম ও অভিবাসী এটা তো আপনি আগেই বলেছেন”, চোখে অসহায় ভাব ফুটে উঠে মাইকের। “আরও কিছু বিষয় আছে যেগুলো ফাইল দুটিতে বিস্তারিত আছে। এ দুটো কপি করা, আপনার জন্যেই এনেছি; রেখে দিতে পারেন।”

     মাইকের কথা শুনতে শুনতে ফাইলে চোখ বুলাচ্ছিল অরূপ। অনেক বড় ফাইল, খুঁটিনাটি কিছুই বাদ দেয়নি। আচমকা মাইকের চোখে চোখ রেখে বলে, “আপনি যেমন ভাবছেন আমার সাহায্যের বিষয়টি আমি গোপনই রাখব, আর কেস সমাধান হলে আমি কৃতিত্বও নিতে যাব না। এই কেসে জড়িত হওয়ার বিষয়টি আমিও চাচ্ছি না বাইরে কেউ জানুক। কিন্তু আমরা যদি রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করি সেটা কি আর গোপন রাখা সম্ভব হবে”?

     মনে মনে চমকে উঠে মাইক। কিছুটা রাগত স্বরে বলে, “কে বলল আমি আপনার সাহায্যের কথা গোপন করতে চাচ্ছি?

     “দেখুন একজন বাংলাদেশি অভিবাসী খুন হয়েছেন, আমিও বাংলাদেশি। এই খুন দু’টির সঙ্গে খুব সম্ভবত রোবটিক্সের কোনও সংযোগ আছে; আমি রোবটিক্সের লিডিং ইন্ড্রাস্ট্রি, ‘বেটাট্রনিক্সের’ একজন রিসার্চার। সেই হিসাবে এই কেসের তদন্তের ব্যাপারে আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতেই পারেন, সেটা যৌক্তিক। কিন্তু আপনি এখানে আসার আগে গাড়ির জিপিএস বন্ধ করে রেখেছেন; তার মানে আপনি যে আমার অফিসে এসেছেন এটার কোনও রেকর্ড রাখতে চাচ্ছেন না। পুলিশের গাড়িতে সব কথাবার্তা রেকর্ড রাখার নিয়ম, কিন্তু আপনি অডিও-ভিডিও রেকর্ডারটাও বন্ধ করে রেখেছেন। সবচেয়ে বড় প্রমাণ, সঙ্গে আপনার পার্টনার নেই, একাই এসেছেন। এ থেকে কি ধারণা করা যায় না যে আপনি পুরো বিষয়টাই গোপন রাখতে চাচ্ছেন? এমনকী আপনার পার্টনারের কাছ থেকেও?”

     রণভঙ্গ দিয়ে মাইক বোকাবোকা হাসি দিয়ে বলে, “বুঝতেই তো পারছেন মিডিয়া চারদিকে গিজগিজ করছে। বদমাইশগুলো হচ্ছে গিয়ে তেলাপোকার মতো, যতসব নোংরা জায়গায় এদের আবির্ভাব আর পালে পালে বংশবিস্তার। নিজের সব নোংরামি এখন আমাদের ডিপার্টমেন্টের উপর উগরে দিচ্ছে।”

     “সে ঠিক আছে, আমিও চাইছি না এসবের ভেতর প্রকাশ্যে জড়াতে। এইসব খুনখারাবি একদমই ভালো লাগে না আমার। যথাসম্ভব দূরেই থাকতে চাই এগুলো থেকে। কিন্তু কীভাবে যেন বিশ্রী এই ব্যাপারটা আমার ঘাড়েই এসে পড়ে। সে যাক, আমার কিছু শর্ত আছে।” চোখের দৃষ্টি কঠোর করে বলে অরূপ, সেখানে অনড় একটা ভাব ফুটে উঠে তার।

     “কী শর্ত?”

     “প্রথমত আমার কাজে কোনও বাধা দেওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, কোনও প্রশ্ন করা যাবে না। দরকার হলে আমিই আপনাকে জানাব। তৃতীয় হচ্ছে, আমার সঙ্গে ফোনে বা ইমেলে যোগাযোগ করবেন না। চতুর্থ শর্ত হচ্ছে, আমি যখন যে তথ্য জানতে চাই সেগুলো যত দ্রুত সম্ভব জোগাড় করে দেবেন। পঞ্চম ও শেষ শর্ত হচ্ছে, এই কেসের অফিসিয়াল কোনও ফাইলে আমরা নাম থাকতে পারবে না।’’

     মনে মনে বেশ খুশি হয় মাইক। কিন্তু মুখে কিঞ্চিত নিমরাজি ভাব ফুটিয়ে বলে “ঠিক আছে। আপনার সাহায্য যতটুকু পাই সেটা আমাদের প্রচেষ্টা ও সময় বাঁচিয়ে দেবে অনেক।” ভাবখানা এমন যে শুধু সময় বাঁচাতেই সে অরূপের কাছে ধরনা দিতে এসেছে।

     “এই জিনিস পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কী করে? এর তো রাজনীতিতে নাম লেখানো উচিত!” মনে অনে ভাবে অরূপ। মুখে বলে, “প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় একুশ অ্যাভিনিউ পার্কের লেকের পাড়ে যে কাঠের বেঞ্চটা আছে, আমি সেখানে আপনার জন্যে অপেক্ষা করব। সেখানে আমাদের দেখাসাক্ষাৎ ও তথ্য আদান প্রদান হবে। জহরুল হকের বাসায় তো এখন সিআইডি আর মিডিয়ার লোকজন গিজগিজ করছে। এক কাজ করুন; আমাকে আলবেরুনির বাসায় নামিয়ে দেন, ক্রাইম স্পটটা দেখে আসি। সেখানে তো এখন কেউ নেই, তাই না?”

     নাহ, বাড়িটি সিল করা আছে। এই ফাইলে তার বাসার কি-প্যাডের কম্বিনেশন আছে, ঢুকতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

     আবাসিক এলাকায় ছোট্ট একতলা একটি বাড়ি, চারদিক হলুদ রঙের ব্যারিকেড টেপ দিয়ে ঘেরা। আশপাশে একটু নজর বুলিয়ে, মাথা নিচু করে টুপ করে ঢুকে পড়ে অরূপ। লনে কিছু ঘাস জন্মেছে, বোঝাই যাচ্ছে, কয়েক সপ্তাহ কারও পদচিহ্ন পড়েনি এখানে। দুই কামরার একটিকে বেডরুম, অন্যটিকে স্টাডিরুম হিসাবে ব্যবহার করতেন চিরকুমার এই চক্ষু বিশেষজ্ঞ, মাঝখানে খোলা ড্রইংরুম, একপাশে খোলা কিচেন।

     অরূপ প্রথমেই বেডরুমে ঢোকে। বেশ গোছানো টিপটপ অবস্থায় আছে। পাশের টেবিলের উপর কয়েকটি বই, বেশির ভাগই ডাক্তারি বিদ্যা সংক্রান্ত। রোবটিক্সের চোখ নিয়ে লেখা দুটি বই দেখা যাচ্ছে। ‘অকুলাস রোবটিকা’ নামের বইটি হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে অরূপ। আজকাল ছাপা অক্ষরের বইয়ের খুব বেশি প্রচলন নেই। উনি মনে হয় কিছুটা পুরনো ধাঁচের লোক ছিলেন। ভদ্রলোকের কি রোবটিক্স নিয়ে আগ্রহ ছিল? নাকি রোবট ও মানুষের চোখ একত্র করে কোনও গবেষণা করছিলেন? রুমটির চারদিকে খুব তীক্ষ্ণ নজর বোলায় অরূপ। বেডসাইড টেবিলের উপর একটি কাচের জগ। পাশে কালো রঙের একটি সানগ্লাস। রুমে একটি মাত্র জানলা, টিনটেড গ্লাস লাগানো, মোটা পর্দা দিয়ে ঢাকা। এখানে আর কিছু দেখার নেই, স্টাডি রুমের দিকে পা বাড়ায় অরূপ।

     এই রুমটা অপেক্ষাকৃত বড়। দু’টি জানলা। প্রচুর বই টেবিলে, তাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটি রিভলভিং চেয়ার, তার নীচে রক্তের ধারা শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। এখানে কাজ করা অবস্থায় মাথার পেছনে লেসার গান চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। পেছনে তাকায় অরূপ। হেঁটে আবার দরজার কাছে যায়, হয়তো এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল খুনি! আর আলবেরুনি জানলার দিকে মুখ রেখে কম্পিউটারে কাজ করছিলেন। মৃত্যুর আগে খুনির চেহারাটাও দেখতে পাননি নিশ্চয়ই।

     কম্পিউটার স্ক্রিনটি চালু করে অরূপ। পাসওয়ার্ড এন্ট্রি করতেই সেটি খুলে যায়। মাইককে মনে মনে ধন্যবাদ দেয় সে। তার দেওয়া ফাইলে প্রয়োজনীয় সব তথ্য আছে। খুব দ্রুত এক ফোল্ডার থেকে অন্য ফোল্ডারে ঘুরতে থাকে। এর আগে সিআইডির এক্সপার্টরা নিশ্চয়ই এই কম্পিউটারের নাড়িনক্ষত্র ঘেঁটে দেখেছে। প্রয়োজনীয় সবকিছুই আল্ট্রা ডিস্কে কপি করা আছে। ঘাঁটতে ঘাঁটতে Eye নামের একটি ফোল্ডারে নজর আটকে যায় অরূপের। ক্লিক করে ঢুকে পড়ে সেখানে। ভেতরে অনেক ফাইল, বেশির ভাগই জার্নাল। শতশত জার্নাল, চোখ বিষয়ক অথবা ইলেকট্রনিক্স ও রোবটিক্সের উপর। তার ভিতরে আরেকটি Sample নামের সাব-ফোল্ডারে ক্লিক করে সে। চব্বিশটি সাব-ফোল্ডার, এক থেকে চব্বিশ পর্যন্ত সিরিয়ালি নামকরণ করা। একটিতে ঢুকে অরূপ, বেশ কতগুলো রেটিনার স্ক্যানের ছবি। কী চিন্তা করে সম্পূর্ণ Eye ফোল্ডারটি মেমরিতে কপি করে নেয় সে।

     আরও কিছুক্ষণ হেঁটে হেঁটে সম্পূর্ণ রুমটি পর্যবেক্ষণ করে। গৃহস্থালি রোবটটি নেই কোথাও, নিশ্চয়ই সিআইডি সেটিকে জব্দ করে তাদের কাছে নিয়ে গেছে। রোবটটির সঙ্গে কথা বলতে পারলে ভালো হত। কারও নজর এড়িয়ে সেটা করা এখন আর সম্ভব নয়। মাইকের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে হবে। আর কিছু দেখার বাকি নেই, ঘরে থেকে বের হয়ে আসে সে। বাইরে এসে মূল দরজার কি-প্যাডটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে, কোনও প্রকার জবরদস্তির চিহ্ন নেই। স্ক্রগুলোর উপর দিয়ে আঙুল বোলায় অরূপ। খুব মসৃণ! তার মানে স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে এটিকে খোলাও হয়নি। ঘাতক তাহলে কি-কম্বিনেশন আগে থেকে জানত অথবা হ্যাক করেছে। জিটা-ল্যাবের প্রোডাক্ট, ডোর-কি লকারের মডেল নম্বরটি টুকে নেয় অরূপ।

     বাইরে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা করে শ্বাস নেয়। কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে এখন। ঘরের ভিতর দমবন্ধ করা একটা গুমোট ভাব। এই বাড়িটিতে আলবেরুনি কাটিয়েছিলেন প্রায় উনিশটি বছর। নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ এই মানুষটি কার কী ক্ষতি করেছিল যে এভাবে খুন হতে হলো? মনটা বিষাদে ভরে যায় অরূপের। কতদিন বাড়িটিতে মানুষের আনাগোনা নেই! একসময় হয়তো নিলামে অন্য কেউ কিনে নিবে। তারাও হয়তো নেই হয়ে যাবে, শুধু থেকে যাবে এই বাড়ি। মানুষ হারিয়ে যায় কিন্তু থেকে যায় ঘর। নাহ, পতত্রীর সঙ্গে ঝগড়াটা মিটিয়ে ফেলতে হবে। ছোট্ট এই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত দুঃখবিলাসে না উড়িয়ে উপভোগ করা উচিত।

 

তিন

একটি কাগজে সবগুলো নাম প্রিন্ট করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ, মাথার ভেতর বইছে চিন্তার ঝড়। কোনও প্যাটার্ন খুঁজে পাচ্ছে না। একটাই মিল চোখে পড়ছে, লিস্টের সবাই মুসলিম। আলবেরুনি কি কোনও চরমপন্থী গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? নামগুলো ধরে ধরে তাদের বাসস্থানের কো-অর্ডিনেট একটি ম্যাপে বসিয়ে পরীক্ষা করেছে। সেখানেও কোনও প্যাটার্ন চোখে পড়েনি অরূপের। মোট তেইশ জনের নাম আছে এখানে, বিভিন্ন বয়সের, ভিন্ন ভিন্ন পেশার লোকজন। এর মাঝে এগারো জন বাংলাদেশি, পাঁচ জন পাকিস্তানি, তিন জন ভারতীয়, দুই জন লেবানিজ, দুই জন ইরানের অভিবাসী। এগার, পাঁচ, তিন, দুই, দুই সবগুলো প্রাইম নম্বর, এদের যোগফল তেইশ, এটিও প্রাইম নম্বর। ধ্যাৎ, চিন্তা অন্যদিকে চলে যাচ্ছে, এখানে সংখ্যাতত্ত্বের কোনও বিষয় নেই। কিছু একটা চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে তার।

     তার অগোচরে পেছনে এসে দাঁড়ায় সুমিতা, “কীরে, নামের লিস্ট নিয়ে ধ্যান করছিস নাকি?”

     চমকে পেছনে তাকায় অরূপ। মৃদু হেসে বলে, “একটা বিষয় বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, তুই দেখ তো, এই লিস্টের নামের ভেতর কোনও প্যাটার্ন খুঁজে পাস কি না।”

     কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, “কীসের লিস্ট এটা?”

     “যেদিন ডাক্তার আলবেরুনি খুন হন, সেদিন ডিনারে এদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। আমার ধারণা এখানে বড়সড় একটা ক্লু আছে যেটা আমার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে।”

     “ডাক্তার আলবেরুনি তো মারাই গেছে, তাহলে এই লিস্ট দিল কে তোকে?”

     “সিআইডি এক মাসে এই একটি কাজই করতে পেরেছে। কম্পিউটারে দাওয়াতের লিস্ট পেয়েছে, তারপর লিস্টের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছে। এখন যা জিজ্ঞেস করেছি সেটা বল, না হলে ফোট! বিরক্ত করিস না।”

     “হুম! প্রথমেই যেটা চোখে পড়ছে তা হলো, এখানে সবাই মুসলিম।”

     “ওকে, তারপর?”

     “নারীঘটিত কোনও ব্যাপার নেই এই খুনটিতে, কারণ লিস্টে কোনও মেয়ের নাম নেই।” মুচকি হেসে বলে সুমিতা।

     “নারীঘটিত ব্যাপার মানে?”, চমকে সুমিতার দিকে তাকায় অরূপ। তার কৌতুক ভরা হাসি দেখে রসিকতাটা ধরতে পারে; ফিরতি হাসি দিয়ে বলে,“গুড পয়েন্ট। আমি এটা খেয়াল করিনি। মাথায় শুধু ঘুরছিল এখানে কী কী আছে, কিন্তু কী কী নেই সেটা ভাবনাতেও আসেনি। ভালো পর্যবেক্ষণ। তারপর? তোকে আর একটা তথ্য দিই, খুন হওয়ার একমাস আগেও এই তেইশ জনকেই তিনি বাসায় দাওয়াত দিয়েছিলেন।”

     “তার মানে তো মনে হচ্ছে তারা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন।” কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলে সুমিতা।

     “সেটা তো অবশ্যই। না হলে কি একমাসের ভেতর দুইদিন বাসায় ডিনারে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ায়? কিন্তু তাদের মাঝে সাদৃশ্যটাই তো ধরতে পারছি না।”

     “আচ্ছা, তোরা না সপ্তাহে একদিন জুম্মার নামাজ পড়তে সবাই মসজিদে একত্রিত হোস! আমার মনে হয় যেহেতু এখানে কোনও মহিলার নাম নেই, তার মানে তারা জুম্মার নামাজ পড়তে গিয়ে হয়তো পরিচিত হয়েছে?” চোখে বিজয়ের হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠে সুমিতার।

     “তোর এই যুক্তিতে দুইটা ভুল আছে। প্রথমত, প্রচুর মহিলা জুম্মার নামাজ পড়তে মসজিদে যায়, আর দ্বিতীয়ত জুম্মার নামাজে হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়। এদের ভেতর শুধু এই তেইশ জন আলাদা হওয়া, ঠিক মিলছে না। যেখানে তাদের মাঝে অন্য কোনও মিল নেই— দেশ, ভাষা, পড়াশোনা, প্রফেশন সবদিক দিয়ে বিস্তর ফারাক।”

     বেশ স্বাভাবিকভাবে সুমিতা বলে, তাহলে এরা মনে হয় রেগুলার পাঁচবার মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ত। এই পাঁচবার নিশ্চয় হাজার হাজার লোক হত না? বিশেষ করে তোদের যে খুব ভোরে উঠে একটা নামাজ পড়তে হয়, কী যেন বলে এটাকে?”

     “হুম, ফজরের নামাজ”, আনমনে কথাটি বলেই চমকে উঠে অরূপ। স্থির দৃষ্টিতে সুমিতার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “মাই গড! এই সাধারণ বিষয়টাই আমার চোখ এড়িয়ে গেছে! দোস্ত, তুই সত্যি একটি প্রতিভা রে দোস্ত! এই তেইশ জন রেগুলার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়ে, আর আলবেরুনিও তাই করতেন। সেখানেই তাঁদের পরিচয়, প্রতিদিন পাঁচ বার, ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা। আর আমি প্রাইম নম্বর টম্বর চিন্তা করে পুরো ব্যাপারটাই ভজগট পাকিয়ে ফেলেছিলাম।”

     “তাহলে এতদিনে স্বীকৃতি দিলি আমার প্রতিভার?” বেশ ভাব নিয়ে নীল রঙের শার্টের কলারে কয়েকটি টোকা দিয়ে সুমিতা বলে, “তোর অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে আমার চাকরি পাক্কা তাহলে? সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিএসসি, এমএসসি রোবটিক্স ব্র্যাকেটে এমআইটি। আমার নাম আর পদবির জোরেই তো একের পর এক কেস এসে জুটবে।” বলেই খিলখিল করে হেসে উঠে।

     “আর একটা কাজ করতে পারবি?”

     ‘‘কী কাজ?’’

     “মানুষের চোখ নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে যত তথ্য পাবি সব টুকে আমাকে জানাবি। পারবি না?”

     “ইয়েস স্যার।” বলেই শরীর টানটান করে হাত উঁচিয়ে লম্বা একটা স্যালুট দেয়। আবার সেই খিলখিল হাসি।

     চেয়ার থেকে উঠে ব্যাগ গুছাতে থাকে অরূপ।

     “কিরে, কই যাচ্ছিস”?

     “জোহরের টাইম হয়ে এল প্রায়, দেখছিস না? যাই মসজিদ থেকে নামাজটা পড়ে আসি।”

 

চার

জামাত শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে মসজিদে পৌঁছয় অরূপ। দ্রুত অজু করে নামাজে দাঁড়ায়। বড়জোর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ জন উপস্থিত। সালাম ফিরিয়ে কিছুক্ষণ ঠায় বসে থাকে। কেমন একটা প্রশান্তি ভাব ভর করে তার মনে। সময় নষ্ট না করে খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একে একে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে সে। বেশির ভাগই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। কিছু ভারতীয়, পাকিস্তানি ও কয়েকজনকে আরবীয় মনে হল প্রথম দেখাতে। ইমাম সাহেব ত্রিশ-বত্রিশ বছরের যুবক। মুখ ভর্তি চাপ দাড়ি, মেদহীন দেহ, ফর্সা গায়ের রং। প্রথম দেখাতেই একজন সুফি সাধকের মতো মনে হয়, মনে ভক্তিভাব আসে।

     উঠে গিয়ে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয় অরূপ। সালাম দিয়ে বলে, “আমি অরূপ হাসান, বাংলাদেশি। দুই মাস হল এদেশে এসেছি। এখানে যে একটি বাংলাদেশি মসজিদ আছে জানা ছিল না, আবার সেটির ইমামও একজন বাংলাদেশি। দেখে খুব ভালো লাগছে।”

     ইমাম সাহেব খুশি মনে বলেন, “আমি মোহাম্মদ মাহফুজ ভূঁঞা। আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়েও ভালো লাগছে। ঠিকই বলেছেন, এখানে বাংলাদেশি কমিউনিটি বড় বলে মসজিদও বাংলাদেশি হিসাবে পরিচিত। দুঃখের কথা কী জানেন? যদি কিছুদিন পর ভারতীয় কমিউনিটি আর একটু বৃদ্ধি পায়, তবে তারাও আলাদা করে একটি ভারতীয় মসজিদ শুরু করবে। একই কথা পাকিস্তানি বা আরবদের ক্ষেত্রেও সত্য। কোথায় আমাদের পার্থিব বিভাজন দূর করে একত্রিত হওয়ার কথা সেখানে আরও বিভাজিত হয়ে যাচ্ছি। অনেক শহরেই ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন মসজিদ। একবার ভাবুন তো ব্যাপারটা!” চোখে অকৃত্রিম দুঃখভাব ফুটে উঠে।

     “আপনি ঠিকই বলেছেন”। কথা বলতে বলতে দু’জন মসজিদের বাইরে চলে আসে। দ্রুত চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় অরূপ। পাশেই একটি গাছের ছায়ায় চারজন গল্প করছে। মাহফুজ সাহেব অরূপকে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়। চারজনের সঙ্গে অরূপকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পরিচিত হয়, চারজনই আলবেরুনির দাওয়াতে উপস্থিত ছিল। একজনের চোখে চোখ আটকে যায় অরূপের। নীল চোখ! দ্রুত চিন্তা চলছে অরূপের মাথায়, বাঙালিদের ভেতর নীল চোখ মোটামুটি দুর্লভ।

     আচমকা জরুরি কিছু একটা মনে পড়েছে এমন ভাব করে নীল চোখের লোকটি দ্রুত চলে যায়। বাকিদের সঙ্গে আলাপচারিতা চলতে থাকে। একজন বলে, গত পরশুদিন একজন বাংলাদেশি খুন হয়েছে শুনেছেন?”

     চমকে উঠার ভান করে অরূপ, “বলেন কী? কেন? কীভাবে?”

     “বিস্তারিত জানি না। পুলিশ এখনও তদন্ত করছে। কী যে একটা বিশ্রী অবস্থা!” চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ লোকটির। “কী একটা উটকো ঝামেলা দেখেন দেখি? এই পর্যন্ত দুইবার পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিতে হয়েছে। সপ্তাহ তিনেক আগে আর একটি খুন হয়, তখনও তিন-চারবার আমার ইন্টারভিউ নিয়েছে। আরে আলবেরুনি আমাদের দাওয়াত দিয়েছেন, ওঁর নতুন আবিষ্কৃত কী একটা ভার্চুয়াল যন্ত্র দেখাবেন বলে। আমরা  খেয়ে দেয়ে চলে এসেছি। এখানে আমার আর কী দায়?”

     এই লোক যতটা না খুন হওয়ায় দুঃখিত, তারচেয়ে বেশি বিচলিত নিজেকে নিয়ে। এই ধরনের লোকগুলোকে ভালোই চেনা আছে অরূপের। এরা নিজেরটা ছাড়া আর কিছু চিন্তাই করতে পারে না। নীল চোখওয়ালা লোকটির আচরণ নিয়ে এখনও ভাবছে অরূপ। কী যেন নাম লোকটার? ও, মনে পড়েছে, মেহেদি হাসান। খানিকটা দূরে বেঞ্চে একজন বসে বই পড়ছে, তবে তার নজর এদিকে তাদের উপর। লোকটার ছবি দেখেছে মাইকের দেওয়া ফাইলে। আলবেরুনির নিমন্ত্রণে সেও উপস্থিত ছিল। ইরানি বংশোদ্ভূত। কিন্তু সে ওখানে বসে তাদের পর্যবেক্ষণ করছে কেন? অরূপ তাকে খেয়াল করছে বুঝতে পেরেই হয়তো সে উঠে উল্টো দিকে হাঁটা লাগায়। গায়ে সাধারণ একটি সাদা কালো চেক শার্ট, কালো প্যান্ট। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। প্রথম দেখায় অসাধারণ কিছু মনে হয় না। তবে কিছু একটা সমস্যা আছে তার হাঁটায়। কী সেটা? কিছুক্ষণ তার হাঁটা পেছন থেকে পর্যবেক্ষণ করে অরূপ বুঝতে পারে বিষয়টা। এলোমেলো উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটলেও প্রতিটি পদক্ষেপ মাপা, যেন স্কেল দিয়ে মেপে মেপে পা ফেলছে। দীর্ঘ ট্রেনিংয়ের ফল এটা। অরূপের বুঝতে সমস্যা হয় না, এই লোক সিক্রেট সার্ভিসের লোক। শার্টটিও ইন করা নেই, কিছু একটা কী সে লুকোচ্ছে ঢিলাঢালা শার্টের আড়ালে? লেজার গান? চিন্তাটা মাথায় খেলে যায় তার, ঠোঁটে মৃদু হাসি উঁকি দেয়।

     এখানে আপাতত আর কিছু দেখার নেই। আড়চোখে সময় দেখে নেয়, আছরের সময় হতে আরও চার ঘণ্টার মতো আছে। ‘‘আচ্ছা, আমি যাই। আছরের সময় দেখা হবে।’’ বলেই পা বাড়ায় সে। বেটাট্রনিক্সে পৌঁছেই সুমিতাকে জিজ্ঞেস করে, “চোখ নিয়ে ইন্টারেস্টিং কিছু পেলি?”

     আর বলিস না, প্রচুর তথ্য পেয়েছি। দাঁড়া একে একে তোকে শোনাচ্ছি।

               অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,

               যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;

               যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই

               পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

     “জীবনানন্দ দাশ বলে গেছে অন্ধরাও চোখে দেখে, বরং বেশিই দেখে।” সুমিতার চোখে মুখে হাসি ঝলমল করছে।

     তার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকায় অরূপ। মুখে বলে, “বুঝতে পেরেছি। আর কী পেয়েছিস?”

     রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,

               প্রহরশেষের আলোয় রাঙা

               সেদিন চৈত্রমাস,

               তোমার চোখে দেখেছিলাম

               আমার সর্বনাশ

     “মানে হলো মানুষের চোখে সর্বনাশ থাকে।” এবার অরূপের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচায় সুমিতা।

     “এবার কিন্তু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে। হাতে একদমই সময় নেই, ঘণ্টা তিনেকের ভিতর আবার বের হব। বিরক্ত না করে কী পেয়েছিস বল তো।”

     “আরে অল্পতেই এত রেগে যাস কেন? আচ্ছা বলছি। প্রথমত আমাদের চোখের রং নিয়ন্ত্রণ করে আইরিসের মেলানিন সংখ্যা। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর সকল নীল চোখবিশিষ্ট মানুষের পূর্বপুরুষ এক। প্রথম নীল চোখবিশিষ্ট মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল ছয় থেকে দশ হাজার বছর আগে।” চোখেমুখে অকপট ভাব ফিরে এসেছে।

     “হুম, ইন্টারেস্টিং। তারপর?”

     একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতি মিনিটে সতেরো বার চোখের পাতা ফেলে। আমাদের চোখের পাতা ফেলার কারণ হল চোখকে সিক্ত করে রাখা। যে তরলটি এই কাজ করে তার পিএইচ এর মান ৭.৫। একে একে আরও অনেক কথা বলে যায় সুমিতা।

     মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকে, আর হাতের ফাইলটি পড়তে থাকে অরূপ। আচমকা কী যেন মনে পড়তেই কম্পিউটারের Eye ফোল্ডারটি খোলে। Sample নামে একটি সাব-ফোল্ডার, তার ভেতরে চব্বিশটি ফোল্ডার সিরিয়ালি এক থেকে চব্বিশ পর্যন্ত সংখ্যা দিয়ে নামকরণ করা। তেইশ জন অতিথি আর আলবেরুনি; সবাইকে নিয়ে মোট চব্বিশ জন! সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে অরূপের, ভেতরে চোখের আইরিসের ম্যাপ! ব্যক্তিগত ও গোপনীয় এই বায়োমেট্রিক ডাটা আলবেরুনি কোথা থেকে পেলেন? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কেন?

     দ্রুত গতির চিন্তার ঝড় বয়ে যায় অরূপের মস্তিষ্কে। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে যায় তার। তাড়াহুড়ো করে অফিস থেকে বের হয়ে আলবেরুনির বাসায় পৌঁছয়। সোজা বেডরুমে ঢুকে দেখে বেডসাইড টেবিলের উপর কালো সানগ্লাসটি পড়ে আছে। একজন বৃদ্ধ কেন তার শোবার ঘরে এমন কালো রঙের একটি সানগ্লাস রাখবেন, বিষয়টি মনে খচখচ করছিল। দেখা যাক এখন কী মেলে ভাবতে ভাবতে ভালো মতো নেড়েচেড়ে দেখে সে সানগ্লাসটি। যা ভেবেছিল তাই। এটি সানগ্লাসের আড়ালে একটি রেটিনা স্ক্যানার। ভার্চুয়াল মজার কিছু একটা দেখাবে বলে সবার রেটিনা স্ক্যান করে রেখেছিলেন আলবেরুনি। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে যাবতীয় রহস্য। সময় দেখে অরূপ। আছরের নামাজের টাইম হয়ে গেছে।

     মসজিদে হাজির হয়ে দেখে এখনও জামাত শুরু হয়নি। পেছনে বসে চোখের রেটিনায় রক্তের শিরার ম্যাপ নিয়ে ইন্টারনেটে পড়তে থাকে। একে একে অনেকেই হাজির হয়ে যা। এখনই নামাজ শুরু হবে। ইরানি লোকটি, যাকে সিক্রেট সার্ভিসের লোক বলে তার সন্দেহ হয়েছিল কায়দা করে তার বাঁ পাশে দাঁড়িয়ে যায়। আগেই খেয়াল করেছিল সে বাঁহাতি, সেক্ষেত্রে লেজার গানটি বাঁ দিকেই গুঁজে রাখবে। গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর পাঁয়তারা করে তার কোমরের পাশে আলতো করে ছুঁয়ে দেয় অরূপ। তার সংশয় সত্যি, সেখানে একটি লেজার গানের অস্তিত্ব টের পায় সে। দু’টি খুন হয়েছে, আর দু’টিই লেজার গান দিয়ে করা হয়েছে। চিন্তাটা বিদ্যুতের মতো খেলে যায় তার মাথায়।

     নামাজ শেষ হতেই দ্রুত সকলে বের হয়ে যায়, অরূপ আবার পেছনে গিয়ে চোখ নিয়ে পড়া শুরু করে। কিছুক্ষণ পর মাহফুজ সাহেব তার কাছে এসে বলেন, “সবাই তো চলে গেল, আপনি বসে আছেন যে?”

     “আসলে কাজ নেই তো, আর কিছুক্ষণ পরই তো মাগরিবের আজান দিবে, তাই ভাবছি এখানেই বসে পড়াশোনাটা করে ফেলি।”

     “আপনি কি ছাত্র?”

     “তা বলতে পারেন। এখানে পিএইচডি করতে এসেছি। আপনি বসুন না, কিছুক্ষণ গল্প করি।” কণ্ঠে বিনীত অনুরোধ অরূপের। ‘‘শুনলাম গত পরশু যে স্কুল শিক্ষক খুন হয়েছেন তিনি আরবির শিক্ষক ছিলেন? তাহলে তো আপনার সঙ্গে ভালো যোগাযোগ থাকার কথা?’’

     “জ্বি, আমার সঙ্গে ভালো যোগাযোগ ছিল। দেশে আমরা একই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছি। আমরা ব্যাচমেট; মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এই শহরে এসেছিল। বেচারা!” চোখে অকৃত্রিম দুঃখবোধ ফুটে উঠে তাঁর।

     “হুম, খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। আপনি কত বছর ধরে এখানে আছেন?” খুনের প্রসঙ্গটি দ্রুত বদলিয়ে ফেলে, যেন তার এ ব্যাপারে কোনও আগ্রহ নেই।

     “প্রায় দুই বছর। জানেন তো, এখানে সব মসজিদের ইমাম নিয়োগ করে সরকার। আমাকে বাংলাদেশ থেকেই নিয়োগ দিয়ে নিয়ে এসেছে।”

     “একা একা থাকেন, খারাপ লাগে না? আমার তো এই দুই-তিন মাসেই দম বন্ধ হয়ে আসছে। ভাবছি পিএইচডি শেষ হলে এক দিনও থাকব না এখানে।”

     “খারাপ তো লাগেই, কিন্তু কী আর করা!” কণ্ঠে কিছুটা হতাশার ছোঁয়া। “আপনার গবেষণার বিষয় কী?”

     “রোবটিক্স। বিশেষ করে রোবটের চোখ নিয়েই গবেষণা। আমার অবশ্য কৃত্রিম আবেগ নিয়ে গবেষণার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সেটার জন্যে ফান্ড বরাদ্দ পাইনি।”

     বেশ কিছু ভাবনা খেলে যায় অরূপের মাথায়। নতুন সংগঠিত খুনটির ব্যাপারে সময় দিতে পারছে না। সমগ্র চিন্তা কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে আলবেরুনিতে। তার অবচেতন মন বলছে এখানেই সব রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে। আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বলে উঠে চলে যায় ইমাম সাহেব। রেটিনার ব্লাড ভেসেলের ম্যাপ নিয়ে আরও গভীর মনোযোগে পড়তে থাকে অরূপ। কখন যে মাগরিবের সময় হয়ে গেছে টেরই পায়নি সে। আজানের শব্দ কানে আসতেই সংবিৎ ফিরে পায় সে।

     কিছুক্ষণের ভেতর নামাজ শুরু হয়ে যায়, এবারের উপস্থিতি আর একটু বেশি, প্রায় পঞ্চাশ জনের মতো। মোবাইলে রেকর্ডিং অন করে পকেটে পুরে নেয়। ছোট ছোট সূরায় নামাজ আদায় হয়, খুব সুরেলা কণ্ঠে তেলাওয়াত করেন ইমাম সাহেব। মুগ্ধ হয়ে শুধু শুনতে ইচ্ছা করে। নামাজ শেষে এবার আর বসে না থেকে দ্রুত মসজিদ থেকে বের হয়ে পার্কের দিকে এগিয়ে যায় অরূপ।

     ঠিক সাতটায় এসে হাজির হয় মাইক। লেকের দিকে মুখ করে বেঞ্চের পাশাপাশি বসে দু’জনে। “আপনার কাজের অগ্রগতি কেমন হচ্ছে?”

     “বেশ ভালোই অগ্রগতি হয়েছে, আমার ধারণার চেয়ে বেশি। তবে কেসটা খুব জটিল মনে হচ্ছে। এটা সাধারণ কোনও খুনের ঘটনা নয়। জল অনেকদূর পর্যন্ত গড়াতে পারে। আমাকে এই লোকগুলোর রেটিনার ব্লাড ভেসেলের ম্যাপ জোগাড় করে দেবেন যত দ্রুত সম্ভব। এখানে আলবেরুনির সহ চব্বিশ জনের নাম আছে, আমার দরকার তিন বছরের পুরাতন ডাটা। রিসেন্ট হলে হবে না।”

     “কেন? রেটিনা ম্যাপ তো সারা জীবন একই রকম থাকে, যে কোনও একটা হলেই তো হল!” অবাক হয়ে প্রশ্ন করে মাইক।

     “দরকার আছে। আর, বাংলাদেশি শিক্ষকের বাড়ির কি-প্যাডের টেপ হিস্ট্রি কি বের করতে পেরেছেন?”

     “হুম, এখানে আছে।” বলেই মাইক একটি ডিস্ক এগিয়ে দেয় অরূপের দিকে। “ওই একই পদ্ধতি। প্রথম ডিজিট সাত, তার পরের চারটে ডিজিট শূন্য থেকে নয় পর্যন্ত সবগুলো ইনপুট দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে।”

     “হুম, বুঝতে পেরেছি। ডিকশনারি অ্যাটাক।”

     ‘‘মানে?’’

     “মানে হল, কি-প্যাডে শূন্য থেকে নয় পর্যন্ত দশটি সংখ্যা আছে। তাহলে সর্বনিম্ন শূন্য থেকে নয়শো নিরানব্বই কোটি সংখ্যাক র‍্যান্ডম নম্বরের যে কোনও একটি হতে পারে এর পাসকোড। এখন যদি আমি শূন্য থেকে শুরু করে একে একে সবগুলো নাম্বার দিয়ে চেষ্টা করি তাহলে একটা না একটা নম্বর দিয়ে এই লক খুলবেই।” কথা বলতে বলতে বেঞ্চের উপর বাঁ হাতের নখ দিয়ে তবলা বাজানোর মতো শব্দ করছিল অরূপ।

     “এটা তো জানি, ‘ডিকশনারি অ্যাটাক’ বেশ পুরাতন পদ্ধতি। কিন্তু প্রথম সংখ্যা সাত কেন?”

     “আমি যদি একটি র‍্যান্ডম নাম্বার দিয়ে লক করতে চাই, তাহলে চেষ্টা থাকবে সেটি যেন বড় সংখ্যা হয়। এটা সাধারণ প্রবণতা। দেখা গেছে, প্রথম সংখ্যা পাঁচের উপরে হওয়ার প্রবাবিলিটি বেশি, আর এটা সাত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তাই প্রথমেই সাত দিয়ে চেষ্টা করেছে। এটাতে না হলে নয় দিয়ে চেষ্টা করত, তারপর বাকিগুলো। এতে সম্ভাব্য বিন্যাস বহুগুণে কমে আসে।” আঙুল দিয়ে তবলা বাজানো থেমে গেছে তার।

     আজকেই বাসার পাসকোড চেঞ্জ করে দেব, মনে মনে ভাবে মাইক। “কিন্তু পরপর তিনটি পাসকোড ভুল দিলে তো তিন সেকেন্ডের ভেতর সাইরেন বেজে উঠার কথা! এটা হয়নি কেন?”

     “হয়নি কারণ এই ডিকশনারি অ্যাটাকটি হয়েছে তিন সেকেন্ডের কম সময়ে। আমি হিসাবে করে দেখেছি, এটা করতে হলে একটি সুপার কম্পিউটার প্রয়োজন, সেটা সাধারণ কারও পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব না, আর একটা হতে পারে যদি রোবটের কপোট্রন ব্যবহৃত হয়।”

     অরূপের শেষ কথাটায় চমকে উঠে মাইক। “তার মানে বলতে চাচ্ছেন একটি রোবট এই খুনটি করেছে”?

     “আমি নিশ্চিত না, শুধু সম্ভাবনার কথা বলছি। আজ এই পর্যন্তই। এখন উঠি, এশার নামাজের সময় হয়ে গেল।”

     কিছুটা অবাক হয়ে মাইক বলে, “বাহ! আপনি এতটা ধার্মিক জানা ছিল না তো?”

     “হুম, আমি নিজেও জানতাম না।” কিছুটা উদাস কণ্ঠে বলে অরূপ।

 

পাঁচ

ফজরের কিছু আগে মসজিদে উপস্থিত হয় অরূপ, কত বছর পর আজ এত সকালে ঘুম থেকে জেগেছে মনে করতে পারছে না সে। বেশ ফুরফুরে লাগছে। ইমাম সাহেব এখনও ঘুম থেকে উঠেননি। আরও কয়েকজন এসে হাজির হয়েছে। কিছুক্ষণ পর একজন উঠে আজান দেয়। উঠে অজুখানায় যায় অরূপ, ইমাম সাহেবও অজু করতে ঢুকেছেন একই সময়। অজু শেষ হতেই অরূপ মাহফুজ সাহেবের চোখে চোখ রেখে সালাম দেয়। “এই মাত্র ঘুম থেকে উঠলেন?”

     “হুম, চলুন। নামাজের সময় হয়ে এল।” সুন্দর সম্মোহিত কণ্ঠে নামাজ পড়ান মাহফুজ ভূঁঞা। নামাজ শেষ হতেই আবার অজুখানায় ঢোকে অরূপ, টেপ থেকে কিছু পানি ফ্লাস্কে ভরে দ্রুত মসজিদ থেকে বের হয়ে আসে। তাকে সদর দরজায় দেখেই নীল চোখওয়ালা মেহেদি হাসান দ্রুত সটকে পড়ে। পেছনে অবাক হয়ে তার প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে তার, মেহেদি হাসান কি তাকে অনুসরণ করছে? সেই সিক্রেট সার্ভিসের লোকটি মসজিদের ভেতর বসে একটা বই পড়ছে। কিছু একটা খচখচ করছে অরূপের মনে। অফিসে আজ একটু জলদিই পৌঁছয় সে। গত দুই দিনের সবকিছু শুরু থেকে ভাবতে থাকে অরূপ, খুঁটিনাটি। কানে হেডফোন লাগিয়ে কিছু একটা শুনতে থাকে অনবরত।

     আটটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে সুমিতা এসে হাজির। ‘‘বাহ! আজ এক্কেবারে সময়ের আগে আগে? কি ব্যাপার? নাকি সারা রাত এখানেই কাটিয়েছিস?’’

     তার কথাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অরূপ বলে, “চোখের ব্যাপারে যা যা পেয়েছিস সেগুলো অ্যাটাচ করে মেল করে দে, জলদি।”

     মুহূর্তক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা আঁচ করতে পারে সুমিতা। বিরক্ত না করে মেল করতে বসে।

     আধঘণ্টা পর অরূপ বলে, “কী ব্যাপার তোকে না বললাম মেল করতে? এতক্ষণ লাগে?”

     “আরে! দশ মিনিট আগেই তো মেল করে দিয়েছি, এখনও পাসনি?”

     ঠিক তখনই টিং করে একটা শব্দ হয়। ওহ, এইমাত্র এল। দ্রুত মনে মনে একটা হিসেব করে নেয় অরূপ। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি খেলে যায় তার। বসে না থেকে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে আসে। একটা ট্যাক্সি থামিয়ে তাতে উঠে পড়ে। জিপিএসে সেন্ট্রাল মার্কেটের ঠিকানা ইনপুট করে দিতেই ট্যাক্সি চলতে থাকে, কিছুক্ষণ পরেই কালো কাচের একটি গাড়ি অরূপের ট্যাক্সিকে অনুসরণ করতে শুরু করে। মার্কেটে নেমেই আড়চোখে একবার দেখে নেয় সেই কালো কাচের টেসলা জিপটাকে। বুঝতে পারে তাকে চোখে চোখে রাখা হচ্ছে। তার মানে তদন্ত সঠিক পথেই এগোচ্ছে। পানির বোতলটা একটা ল্যাবরেটরিতে জমা দিয়ে আজকের মধ্যে রিপোর্ট তাকে মেল করতে বলে অরূপ। তারপর সারা সকাল এদিক সেদিক উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে বেড়ায়। পেছনে দক্ষ শিকারির মতো লেগে থাকে সেই জিপটা। জোহরের সময় হয়ে এলে আর একটি ট্যাক্সি ডেকে মসজিদে উপস্থিত হয়।

     ইমাম সাহেবকে দেখে হেসে সালাম দেয়। নামাজ শেষ হতেই সময় নষ্ট না করে আবার অফিসে ফিরে আসে। কিছুক্ষণ চিন্তা করে একটি ডক ফাইল খুলে লিখতে বসে। চোখ নিয়ে প্রায় এক হাজার শব্দের মোটামুটি বড়সড় একটা লেখা দাঁড়িয়ে যায় ঘণ্টাখানেকের ভেতর। তারপর মেল খুলে ফাইলটি অ্যাটাচ করে সেন্ড করার আগে মাইককে ফোন করে।

     “হ্যালো, মাইক। গুরুত্বপূর্ণ একটা ইমেল করছি। মেল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেয়েছেন কি না জানাবেন, আমি লাইনে আছি।” বলেই সেন্ড বাটনে ক্লিক করে অরূপ। ঘড়ির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

     ঠিক চার মিনিট ত্রিশ সেকেন্ড পর মাইক বলে “মেল পেয়েছি। ফাইলটা ডাউনলোড করে পড়ে আপনাকে জানাচ্ছি।”

     “আর জানাতে হবে না, আমার কাজ হয়ে গেছে। ফাইল পড়ে শুধু শুধু সময় নষ্ট করার দরকার নেই।” বলেই লাইনটি কেটে দেয় সে।

     দিনের বাকিটা সময় অফিসেই কাটিয়ে দেয় অরূপ। গত কয়েকদিনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে, প্রতিটি ক্লু কয়েকবার করে যাচাই-বাছাই করে, একটি ঘটনার সঙ্গে অপরটি মিলিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। অবশেষে সন্তুষ্ট হয় অরূপ। এখন শুধু মাইকের অপেক্ষা, পুরনো রেটিনা স্ক্যানের ডাটাগুলো পেলেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।

     সন্ধ্যায় দেখা করে মাইকের সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত জায়গায়। যা যা চেয়েছিলো সব নিয়ে এসেছে মাইক। সেগুলো অরূপের হাতে দিয়ে বলে, “আপনার আচরণের কিছুই তো বুঝতে পারছি না?”

     “আর একটা দিন ধৈর্য ধরুন, মোটামুটি একটা হাইপোসিথিস দাঁড় করিয়েছি। আমার সন্দেহ যদি সঠিক হয়, তবে দু’-একদিনের ভেতরই খুনি ধরা পড়বে। জাল বোনা হয়ে গেছে, এখন সেটা জায়গা মতো ফাঁদ বানিয়ে বিছাতে হবে। তারপর টেনে ছোট করে নিয়ে আসব।”

     মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে কয়েকজনের সঙ্গে খোশগল্প করে বাসায় চলে আসে অরূপ।

     বাসায় ফিরে মাইকের দেওয়া রেটিনা ইমেজগুলো নিয়ে বসে অরূপ, প্রতিটি স্যাম্পলের সঙ্গে আলবেরুনির কম্পিউটারে পাওয়া স্যাম্পলগুলো মিলিয়ে দেখে। নাহ, তার সন্দেহ সঠিক। উঠে গিয়ে সিসি ক্যামেরাটা ভালো মতো পরীক্ষা করে। নাইট ভিশন ডিভাইসটি সিসি ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। একটি ব্যাকআপ পাওয়ার সাপ্লাইও সেট করে দেয় তাতে। কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করে বারকয়েক পরখ করে দেখে। নাহ, সব ঠিক আছে, এখন খুনি পাতা ফাঁদে পা দিলেই হয়। এব্যাপারে অবশ্য তার মনে কোনও দ্বিধা নেই। অরূপ চিন্তিত তাকে যে দু’দিন ধরে অনুসরণ করা হচ্ছে তা নিয়ে। তারা সময় মতো প্রতিক্রিয়া দেখাবে তো?

     অবশেষে রোবটিক্সের তিনটি মৌলিক সূত্র নিয়ে পড়তে বসে। যদিও এটি তার ভালো মতোই পড়া আছে, তবুও নতুন কী গবেষণা হচ্ছে তা জানা দরকার। বিজ্ঞানী আইজাক আসিমভের এই তিনটি সূত্র রোবটিক্সের নৈতিকতা আচরণের মূল ভিত্তি বলে মনে করা হয়।

     ১ম সূত্র: রোবট কখনকোন মানুষকে আঘাত করতে পারবে না কিংবা মানুষের বিপদে নির্লিপ্ত থাকতে পারবে না।

     ২য় সূত্র: রোবট কখন মানুষের আদেশ অমান্য করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আদেশ ১ম সূত্রের পরিপন্থী হয়।

     ৩য় সূত্র: রোবট কখন নিজের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তা ১ম ও ২য় সূত্রের পরিপন্থী হয়।

     যদিও এই সূত্রগুলো নিয়ে বিস্তর সমালোচনা আছে, রোবট কীভাবে মানুষকে সংজ্ঞায়িত করবে সেটা এই সূত্রে বলা নেই। এগুলোকে প্রকৃতপক্ষে সূত্র না বলে ধারণা বলা যেতে পারে। অনেক পরে আসিমভ আর একটি সূত্র দেন। সেটি শূন্যতম সূত্র হিসাবে পরিচিত। সেখানে সামগ্রিকভাবে মানব সভ্যতার কথা বলা হয়েছে, যে একটি রোবট কখনও মানবতার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে না। অরূপ সূত্রগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ।  

     একটি রোবট কি নিজে থেকে খুনি হয়ে উঠতে পারে? নাকি এর পিছনে কোনও মানুষের হাত থাকবে? কিন্তু রোবটের কপোট্রন এখন এমনভাবে সিল করা থাকে যে স্থায়ী ক্ষতি না করে সেখানে কারও পক্ষে হাত দেওয়া সম্ভব নয়। এই একটা জায়গাতে এসে সবকিছু ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে।

     জলদি শুয়ে পড়ে অরূপ। ভোরে উঠে মসজিদে যেতে হবে আবার। কয়েকদিন টানা মসজিদে যাওয়া আসার ফলে দৈনন্দিন জীবনে কেমন একটা শৃঙ্খলা এসেছে তার। ভোরে উঠেই মসজিদে হাজির হয় সে। বুক ঢিপ ঢিপ করছে তার, আজই সেই দিন। নামাজ শেষ হতেই পেছনে গিয়ে বসে। কয়েকবার নীল চোখওয়ালা মেহেদি হাসানের দিকে তাকায়। আবার ইমাম মাহফুজ সাহেবের দিকেও তাকায়। ইচ্ছা করেই চোখ কুঁচকে রেখেছে, যেন তাকে দেখে মনে হয় কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করছে। দ্রুত হাতে ট্যাবের উপর হাত চালায়, যেন হন্যে হয়ে কিছু খুঁজছে। একসময় উঠে মসজিদ থেকে বের হয়ে যায়। যাদের সঙ্গে গত কয়েকদিন বেশ সখ্য হয়েছিল, আজকের আচরণে তারা বেশ অবাক হয়। অরূপ অনুভব করতে পারে, তার পিছনে দৃষ্টি নিবন্ধ করে আছে কয়েকজোড়া চোখ।

     চেপে রাখা নিশ্বাসটা সন্তর্পণে ছাড়ে অরূপ। যাক প্রাথমিক ধাক্কাটা হয়তো দেওয়া গেছে। চূড়ান্ত আঘাতটা সে করবে জোহরের সময়।

     জোহরের নামাজের সময় হলে সে একটু দেরিতে মসজিদে প্রবেশ করে। সামনের সারিতে বসে আছে নীল চোখের মেহেদি হাসান, তার সামনে ইমাম সাহেব। পাশে সেই সিক্রেট সার্ভিসের লোকটি। আরও কয়েকজন বসে অপেক্ষা করছে কখন জামাত শুরু হবে। অরূপ ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। কাছাকাছি আসতেই কয়েকজন তার দিকে ফিরে তাকায়, হঠাৎ থমকে যায় সে। কয়েকজনের চোখের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ইমামের চোখের দিকে তাকিয়ে সবশেষে মেহেদি হাসানের চোখে তাকায়। হঠাৎ সারা শরীর যেন কাঁপতে থাকে তার, মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দু’কদম পিছিয়ে আসে। ভয়ঙ্কর কিছু একটা যেন তার নজরে পড়েছে, তারপর ঘুরে গিয়ে এক দৌড়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে যায়। বাইরে গিয়ে একটু থমকে দাড়ায়। পিছন ফিরে দেখে সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আবার দৌড় লাগায় সে, যেন প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে! রাস্তায় উঠে কিছুটা দম নেয় সে। যাক, এখন কৌশলটা কাজে লাগলেই হল। ট্যাক্সি ডেকে বাসায় ফিরে আসে। মাইককে একটি মেসেজ পাঠিয়ে বলে আজ দেখা করব না। আপনি রাত ন’টার পর আমার বাসায় চলে আসবেন। আর লেজার গানটা আনতে ভুলবেন না যেন।

     রাত একটা বাজতেই একটি ছায়ামূর্তি অরূপের ঘরের দিকে এগিয়ে আসে। দরজার কি লকের পোর্টে একটি ছোট্ট ডিভাইস সেট করে। ডিভাইসটা থেকে একটি তার বের হয়ে লোকটির মুখের জিহ্বার নীচে এসে ঢুকে। দুই সেকেন্ডের ভেতর ক্লিক শব্দ করে দরজাটি খুলে যায়। আততায়ীর সারা শরীর কালো কাপড়ে ঢাকা, ধীরে ধীরে সে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যায়, হাতে ধরা একটি লেজার গান। ঘরে মৃদু আলো, নাক পর্যন্ত ঢেকে বিছানায় শুয়ে আছে শিকার। হাত উঁচিয়ে লেজার গানটা মাথা বরাবর তাক করে চালিয়ে দেয়।

     আচমকা পেছন থেকে অরূপ বলে উঠে, “ইমাম সাহেব, হাতের লেজার গানটা ফেলে দেন। আপনার মাথায় একটি নাইন এইট পয়েন্ট সিক্স সিরিজের লেজার গান তাক করা আছে, চোখের পলক ফেলবার সময়ও পাবেন না।”

     হাতের লেজার গানটি ফেলে দিয়ে ঘুরে দাড়ান মাজফুজ ভূঁঞা, চোখে ভীত চাহনি। এগিয়ে গিয়ে পিছমোড়া করে হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেয় অরূপ। তারপর তাঁকে সোফায় মাইকের মুখোমুখি বসিয়ে ঠিক পাশেই বসে পড়ে সে।

     “তো, মাহফুজ সাহেব, নাকি মাহফুজ সাহেবের হিউম্যানয়েড। কী বলব আপনাকে?”

     অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মাহফুজের দিকে তাকিয়ে আছে মাইক। “আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, কী থেকে কী হয়ে গেল?”

     “দাঁড়ান, আসল কাজ তো এখনও বাকি।” বলেই সুমিতাকে একটা মেল করে অরূপ।

     “কী করছেন? এত রাতে কাকে ইমেইল করছেন?”

     “গত কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা; দুটি খুনের বিস্তারিত ক্লু; সবকিছু সাজিয়ে একটি রিপোর্ট করেছি আজ সারাদিন বসে বসে। এই ফাইলটা সুমিতাকে মেল করে দিলাম।” চোখের তার ধূর্ত হাসি।

     “মানে? কেন? মানে বলতে চাচ্ছি এই মুহূর্তেই কেন?”

     “এর পিছনের আসল হোতাকে ধরার জন্যে। এখন দশ মিনিট অপেক্ষা করেন। সব বুঝতে পারবেন। আপনি এবার মাহফুজ সাহেবকে জেরা শুরু করতে পারেন।” কিছুটা রিল্যাক্সড হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দেয় অরূপ।

     “আপই মানুষ না রোবট?”

     “রোবট, তবে মানুষের খুব কাছাকাছি করে আমাকে বানানো হয়েছে।”

     “আসল মাহফুজ সাহেব কোথায়? তাকেও কি খুন করে ফেলেছেন?”

     “নাহ, তাঁর অনেক স্মৃতিই আমার মস্তিষ্কে ম্যাপ করা হয়েছে, তবে আসল মাহফুজ কোথায় আমি জানি না।”

     “আপনি দু’টো খুন করেছেন। কেন করেছেন?”

     “তা ছাড়া আমার উপায় ছিল না। আমি খুন করিনি, শুধু আত্মরক্ষা করেছি।”

     “আত্মরক্ষা? মানে?” মাইকের কণ্ঠে বিষ্ময়।

     “ডা. আলবেরুনি আমার আসল পরিচয় জেনে গিয়েছিলেন। তাই তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হয়েছে। তিনি যেহেতু চোখের ডাক্তার ছিলেন, তাই আমার চোখের কোনও একটা অস্বাভাবিকতা ওঁর নজরে এসেছিল।”

     “আর দ্বিতীয় খুনটা কেন করেছেন?”

     “জহরুল হকের সঙ্গে ছোটবেলা থেকে আসল মাহফুজ লেখাপড়া করেছে, একই মাদ্রাসায়। এক মাস আগে এ শহরে আসে সে। একজন মানুষ, যে তার সঙ্গে জীবনের বড় একটা সময় কাটিয়েছে তার পক্ষে সহজেই বুঝে যাওয়া সম্ভব যে আমি প্রকৃত মাহফুজ নই। তাই তাকেও সরিয়ে ফেলতে হয়েছে।”

     “এই একই কারণেই কি আজ অরূপকে খুন করতে এসেছিলেন?”

     “জ্বি।”

     “আপনার আসল উদ্দেশ্য কী? কারা আপনাকে এখানে সেট করেছে?”

     “আমি জানি না। তাদের ব্যাপারে আমার কোনও ধারণা নেই।”

     “তারা আপনাকে ট্রেক করে না?”

     “নাহ, শুধুমাত্র প্রতিদিন রাতে আমার মেমরি থেকে সব তথ্য তাদের সার্ভারে আমি আপলোড করি।”

     অরূপের দিকে তাকায় মাইক, চোখে প্রশ্ন।

     অরূপ বলে, “আমার মনে হয়, যদি প্রতি মুহূর্তে ট্র্যাক করতে হয় তাহলে তার শরীর থেকে একটি সিগনাল রিয়েল টাইম জেনারেট করতে হবে। এটা অন্য কেউ ট্রেক করে ফেলতে পারে, হয়তো তাই এই সিকিউরিটি প্রিকিউশন।”

     জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে অরূপ, কিছু একটা ঘটার অপেক্ষায় আছে সে। আচমকায় চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়, বিদ্যুৎ চলে গেছে।ঠিক এর জন্যেই অধীর অপেক্ষায় ছিল অরূপ। বিদ্যুদ্বেগে কম্পিউটারের একটি বাটনে ক্লিক করে সে। এক মিনিটের ভিতর ঘরটি ঘিরে ফেলে সিআইএ-র এর একটি বিশেষ দল। মুহূর্তেই দরজার ভেঙে প্রবেশ করে তারা, হাতে সবার হাতে লেজার রাইফেল, মুখ ঢাকা, চোখে নাইট ভিশন। ‘‘সিআইএ, সিআইএ!’’ চিৎকার করতে করতে অরূপ ও মাইককে ঘিরে ধরে তারা। ঠিক তখন তাদের কমিউনিকেশন ডিভাইসে ভেসে আসতে থাকে, রিট্রিট, মিশন অ্যাবান্ডন্ড, রিট্রিট রিট্রিট।

     মুহূর্তেই, যেভাবে এসেছিল; ঘর থেকে সেভাবেই চকিতে বের হয়ে যায় পুরো দলটি।

     হতভম্ব হয়ে বসে থাকে মাইক। কী থেকে কী হয়ে গেলে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। পাঁচ মিনিটের ভেতর যেন একটি ছোটখাট ঝড় বয়ে গেছে!

     স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অরূপ বলে “এই সিআইএ-ই হল মূল হোতা। তারাই এই রোবটটিকে এখানে সেট করেছে। আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম তারা এই পাতা ফাঁদের পা দিবে কিনা? মনে হচ্ছে আমাকে এতটা স্মার্ট ভাবেনি।”

     “কিন্তু কী দেখে তারা এত ভয় পেল, এভাবে লেজ তুলে ভোঁ দৌড়?”

     “আজ এ পর্যন্তই, আপনার ডিপার্টমেন্টে যোগাযোগ করুন। খুনি ধরে দিয়েছি, এখন আমি একটু বিশ্রাম নেব। আর একটা বিষয়ের জন্যে দু:খিত, অনেক চেষ্টা করেও এই কেসে আমার কার্যক্রম গোপন রাখতে পারিনি। আপনি কাজ চালিয়ে যান, আমি এখন ঘুমোব। কাল তো ছুটি, সকাল সকাল চলে আসবেন, বিস্তারিত আলাপ করা যাবে।” হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়েছে যেন, ঘুরে মাহফুজকে জিজ্ঞেস করে, “আপনার কপোট্রনে তো রোবটিক্সের তিনটি মৌলিক সূত্র ডিফাইন করা আছে, তাই না?”

     “জ্বি।”

     “ক্রমানুসারে বলুন তো সূত্রগুলো।”

     ১ম সূত্র: রোবট কখনও নিজের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে না

     ২য় সূত্র: রোবট কখনও মানুষের আদেশ অমান্য করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আদেশ ১ম সূত্রের পরিপন্থী হয়।

     ৩য় সূত্র: রোবট কখন কোন মানুষকে আঘাত করতে পারবে না কিংবা মানুষের বিপদে নির্লিপ্ত থাকতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা ১ম ও ২য় সূত্রের পরিপন্থী হয়।

     একটি দীর্ঘশ্বাস বুক চিড়ে বের হয়ে আসে অরূপের। এমনটাই আশঙ্কা করেছিল সে।

 

শেষ অধ্যায়

একটি সোফায় গা এলিয়ে আয়েস করে বসে আছে অরূপ। সামনে বসে আছে মাইক ও সুমিতা।

     “ডার্লিং, সবাইকে এক কাপ চা খাইও তো জলদি।”

     “এক ঘুঁষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেব। আমি আবার তোর ডার্লিং হলাম কবে? এখন ভাব না নিয়ে আসল ঘটনা খুলে বল। আমার আর তর সইছে না।” বলেই হাতের মুঠো পাকিয়ে চোখের সামনে নিয়ে আসে সুমিতা।

     “প্রথম থেকেই ধারণা জন্মেছিল যে এই কেসে মূলে হচ্ছে চোখ। তাই আমার সকল মনোযোগ চোখকেন্দ্রিক ছিল। প্রথম সন্দেহ হয়, যখন ফজরের নামাজ সময় অজু করতে ঢুকি। সেখানে মাহফুজ সাহেবও অজু করতে ঢোকেন। আমাদের চোখের তরলের পিএইচ হচ্ছে ৬.৫। কিন্তু সাধারণত সাপ্লাই পানির পিএইচ হচ্ছে ৬.৫ থেকে ৮.৫ পর্যন্ত, বেশিভাগ সময় এটা হয় ৭.৫। এই কারণে সারারাত ঘুমিয়ে উঠে আমরা যখন চোখে পানি দেই, তখন চোখ হালকা জ্বালা করে, কিছুটা লালচে হয়ে যায়। কিন্তু ওইদিন অজু করে মাহফুজের চোখে চোখ পড়তেই দেখি খুব স্বাভাবিক দৃষ্টি। তার মানে এটা সাধারণ মানুষের চোখ নয়। এখানে একটা গণ্ডগোল আছে। তখনই প্রথম সন্দেহ দানা বাঁধে।”

     অরূপকে বাধা দিয়ে সুমিতা বলে, “ব্যাপারটা কি এমন হতে পারে না যে, বছরের পর বছর ধরে একই পানি চোখে দিচ্ছে, ফলে তার চোখ এতে সয়ে গেছে?”

     “এই চিন্তাটা প্রথমে এসেছিল, পরে তা বাতিল করে দিয়েছি। প্রথম কয়েকদিন চোখ জ্বালাপোড়া করলে তারপর থেকে অজু করার সময় আপনাতেই চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসবে, চোখের ভেতর আর পানি ঢুকবে না। এটাই আমাদের সাইকোলজি। কিন্তু সেদিন তার চোখের ভেতর পানি দেখেছি, চোখের পাতায় বিন্দু বিন্দু পানি জমা ছিলো।”

     “ওকে, পণ্ডিত সাহেব বুঝতে পেরেছি।”

     “সে যাক, ওইদিন রাতে বাসায় ফিরে সারাদিনের রেকর্ড করা নামাজের সূরা তেলাওয়াত শুনেছি। দাঁড়া, এখন তোদের শোনাচ্ছি, বলে কম্পিউটারে একটি অডিও ফাইল চালু করে অরূপ। এটা হচ্ছে মাগরিবের সময়। এটা এশার সময়। আর এটা পরদিনের ফজরের সময়; তিনটাই সূরা ফাতিহার তেলাওয়াত। এখানে কোনও অসামঞ্জস্য দেখতে পাচ্ছিস? আরেক বার শোন।”

     বার কয়েক শোনার পর সুমিতা ঘাড় নেড়ে বলে, “না তো, আমি তো কোনও সমস্যা ধরতে পারছি না।”

     মাইকের দিকে তাকায় অরূপ, “আপনি কি কিছু ধরেতে পেরেছেন?”

     “নাহ”, মুখ বেঁকিয়ে বলে মাইক।

     “আসলে এখানে কোনও সমস্যা নেই, একদম পার্ফেক্ট তেলাওয়াত। এটাই সমস্যা। দেখেন প্রতিটি একদম সেকেন্ডের কাঁটা মেনে শেষ হয়েছে, হুবহু একই রকম। তার মানে এটা তাৎক্ষণিক তেলাওয়াত না, এটা রেকর্ডিং করা। কোনও মানুষের পক্ষে পরপর তিন বার হুবহু একই রকমের তেলাওয়াত করা সম্ভব না।”

     “তার পরের ক্লু হল, রেটিনা ম্যাপ। এটা সবারটাই মিলে গেছে। আলবেরুনি স্যাম্পলের সঙ্গে, মাহফুজেরটাও মিলেছে। তবে সবারটা কিছু কিছু ডেভিয়েট করেছে, কিন্তু মাহফুজেরটা একদম পারফেক্ট ম্যাচ। এটা সম্ভব না। আমরা চোখ ডলাডলি করি, চুলকাই, চোখ আঘাত পেলে ছোট বড় হয়, কিন্তু প্যাটার্ন একই রকম থাকে। এটা সম্ভব তখনই যখন আসল মাহফুজের আগের রেটিনা স্ক্যান করে তা এই রোবটের চোখে বসানো হয়, এটা আর কোনোদিন বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হবে না। বেশি পারফেক্ট আসলে ঠিক নয়। এটা তারা ভুল করেছে।”

     অরূপের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মাইক বলে, “এই কারণেই মনে হয় আপনি সবার রেটিনা ম্যাপের স্যাম্পল চেয়েছিলে, কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে পারছি না, আপনি তিন বছর আগের স্যাম্পল কেন চেয়েছিলেন?”

     “আলবেরুনির কম্পিউটার থেকে সবার পরপর দু’মাস আর এক বছর আগের রেটিনার ইমেজের স্যাম্পল পেয়েছিলাম। পরপর দু’মাসের স্যাম্পল উনি তার বাসায় দাওয়াত দিয়ে কৌশলে সংগ্রহ করে নিয়েছিলেন। আর এক বছরের আগের স্যাম্পল হয়তো কোনওভাবে যোগাড় করেছিলেন। তাই আমি আরও আগের স্যাম্পল খুঁজছিলাম।”

     “হুম, কিন্তু এর পেছনে যে সিআইএ আছে সেটা কী করে বুঝলেন?” প্রশ্ন করে মাইক।

     “মসজিদে যাওয়া আসা শুরুর পর থেকে আমাকে অনুসরণ করতে থাকে তারা। তখন জানতাম না তাদের প্রকৃত পরিচয়। তারপর যখন সুমিতাকে চোখের সব তথ্য মেল করতে বলি, তখন মেলটা দশ মিনিট পরে আসে। এমনটা হওয়ার কথা নয়, একই সার্ভারে দুটি মেল সেকেন্ডের আগেই চলে আসার কথা। তার মানে শুধু রাস্তায় অনুসরণ না, আমার মেলও তারা মনিটর করছিল। এটা সরকারের উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়া কারও করতে পারার কথা নয়।”

     চমকে উঠে মাইক বলে “এই কারণেই কি আমাকে আপনি মেইল করেছিলেন?”

     “জ্বি, আমি আপনাকে প্রায় এক হাজার শব্দের একটা ফাইল পাঠিয়েছিলাম। এতে কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল না। আমাদের কোনও কিছু পড়ার গড় গতিবেগ মিনিটে দু’শো বিশ থেকে আড়াইশ শব্দ। তাই আমার ঐ ফাইল যে খুলে পড়বে তার চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগবে। আমি ঘড়ি ধরে ছিলাম, ঠিক সাড়ে চার মিনিট পর আপনি মেলটি পান। আমার সন্দেহ তখন সত্যি প্রমাণিত হয়।”

     “বুঝতে পেরেছি, কিন্তু সিআইএ এই কাজটি কেন করল?” কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বলে মাইক।

     “এটার অনেক অ্যাপ্লিকেশন আছে। যদি সব মসজিদে এই রোবটিক ইমাম সেট করে দিতে পারে তবে মুসলিম বিশ্বের অনেক কিছুই তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। আমার মনে হয়, এটা ছিল একটা পরীক্ষামূলক প্রজেক্ট। যদি সফল হত তবে রাজনৈতিক নেতা, আমলা, বিজ্ঞানী, প্রিস্ট, শিক্ষক সমাজের নানান স্তরে ধীরে ধীরে এমন রোবট স্পাই স্থাপন করত।”

     এবার মুখ খুলে সুমিতা, “বুঝতে পেরেছি। কিন্তু শেষে এসে এমন তাড়াহুড়ো করে পালাল কেন?” কপালের উপর কিছু চুল এসে পড়েছিল সেগুলোকে কায়দা করে সরিয়ে দেয় সে।

     “মাইক যখন মাহফুজকে জেরা করছিল আমি সম্পূর্ণ অংশটি রেকর্ড করে রেখেছিলাম। তার আগে তোকে মেল করে সব জানিয়ে দেই। আসলে এটা ছিল সিআইএর জন্যে একটা ট্র্যাপ। তারা আমার মেল পেয়ে তড়িঘড়ি করে স্ট্রাইক টিম পাঠায়। তারা চেয়েছিল আমার কাছ থেকে সব তথ্যপ্রমাণ হাতিয়ে নিয়ে পরে সব দায় অস্বীকার করবে। তারা এখানে পৌঁছনোর কয়েক মিনিট আগে আমি সম্পূর্ণ রেকর্ডিংটি অনলাইনে পাবলিশ করে দিই, মুহূর্তেই তা সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। আর সঙ্গে সঙ্গে লাইভ স্ট্রিমিং চালু করে দিই। দুনিয়ার অনেক মানুষ লাইভ দেখতে থাকে সিআইএ-র অপারেশন। লাইভ স্ট্রিমিংয়ের বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা মিশন রিট্রিট করে, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। এখানে টাইমিংটা খুব ক্রিটিক্যাল ছিল, সস্তির কথা হলো সবকিছু ঠিকঠিক মতোই হয়েছে।”

     “কিন্তু আমি তো কোনও মেল পাইনি?” চিন্তিত কণ্ঠে সুমিতা বলে।

     “পাবি কী করে? ওটা তো মাঝপথেই নাই করে দেওয়া হয়েছে।”

     “তোর কি এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার দরকার ছিল? যেই মুহূর্তে বুঝতে পারলি মাহফুজই খুনি রোবট, তখন মাইককে সব জানিয়ে দিলেই তো হত?”, সুমিতার কণ্ঠে অকৃত্রিম উদ্বেগ।

     “সেক্ষেত্রে হয়তো রোবটটিকে আটক করত। কিন্তু সিআইএ পুরো বিষয়টা অস্বীকার করত আর বাইরে থেকে চাপ দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাপারটাকে অন্যদিকে প্রবাহিত করে দিত। এখন সারা পৃথিবীর লোকজন, সব দেশের সরকার এই প্রজেক্টের বিষয়ে জেনে গেছে, তারা সতর্ক হবে।” মুচকি হেসে বলে অরূপ।

     “তবে কি সিআইএ খুন দু’টির ব্যাপারে জানত?” চোখে অকৃত্রিম বিস্ময় সুমিতার।

     “প্রথমে হয়তো বুঝতে পারেনি, তবে দ্বিতীয় খুনটি হওয়ার পর তাদের টনক নড়ে। বুঝতে পারে কোথাও একটা গণ্ডগোল হয়েছে। আর রোবটটিকে এখানে সেট করার পর শুরু থেকেই একজন এজেন্টকেও রেখেছিলো সবসময় নজরদারি করার জন্যে। কিন্তু রোবটটির মাঝে যে এতটা আত্মসচেতনতার বিকাশ ঘটবে তা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।”

     মাইক একটু নড়েচড়ে বসে, “এইখানে আমার একটা প্রশ্ন আছে। এটা কী করে হল?”

     “ওই যে, তারা রোবটিক্সের সূত্রগুলোর ক্রম শুধু বদলিয়ে দিয়েছিল। তৃতীয় সূত্রটিকে প্রথমে নিয়ে এসেছে। এর ফলে আত্মরক্ষাই হয়ে উঠেছিল তার প্রাথমিক প্রবৃত্তি, যা মানুষের ক্ষেত্রেও সত্যি।

     “আমার মনে হয় সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি, এখন রিপোর্ট কীভাবে করব সেটা ভেবে দেখতে হবে। আমি তাহলে এবার উঠি।” মাইক চলে যেতে উদ্যত হয়। দাঁড়িয়ে দুজনে হাত মিলায়। “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মিস্টার অরূপ। আপনার সাহায্য না পেলে এই কেস সমাধান করতে অনেক সময় ও উদ্যম ব্যয় করতে হতো।”

     সুমিতা আসন থেকে উঠতে উঠতে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,

               দেহ আজ্ঞা, দেবযানী, দেবলোকে দাস

               করিবে প্রয়াণ। আজি গুরুগৃহবাস

               সমাপ্ত আমার। আশীর্বাদ করো মোরে

               যে বিদ্যা শিখিনু তাহা চিরদিন ধরে

               অন্তরে জাজ্বল্য থাকে উজ্জ্বল রতন,

               সুমেরুশিখরশিরে সূর্যের মতন,

               অক্ষয়কিরণ।

     হো হো করে হেসে উঠে অরূপ, “ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছিস তো! আমাকে কিনা শেষ পর্যন্ত দেবযানী বানিয়ে দিলি আর নিজে হয়ে গেলি কচ!”

     “কবিতাটা আগে শুনেছিস?”

     মনটা উদাস হয়ে যায় অরূপের। মৃদুস্বরে বলে, “হুম, এটা পতত্রীর খুব প্রিয় একটা কবিতা। সুযোগ পেলেই আমার উপর ঝেড়ে দেয়। আমি নাকি কচের মতোই পাষাণ হৃদয়!”

4 thoughts on “অকুলাস রোবটিকা

  • August 17, 2019 at 7:26 am
    Permalink

    দুর্দান্ত গল্প। আসিমভ আর জাফর ইকবাল – দু’জনের উদ্দেশেই পার্ফেক্ট শ্রদ্ধার্ঘ্য বলা চলে। আরও পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।

    Reply
    • August 19, 2019 at 5:14 pm
      Permalink

      অনেক অনেক ধন্যবাদ প্রিয় লেখক। আপনার মতো এমন গুণী লেখকের কাছ থেকে এমন মন্তব্য আমার জন্যে অনেক অনুপ্রেরণার ব্যাপার। অনেক শুভকামনা রইল।

      Reply
  • August 19, 2019 at 12:03 pm
    Permalink

    concept khub bhalo,tobe robot er modus operandi ta thik jomlo na,atmorokkha/identity leak erokom concept hotat kotha theke elo.jaihok besh bhalo galpo

    Reply
    • August 20, 2019 at 3:46 am
      Permalink

      অনেক অনেক ধন্যবাদ সুন্দর কমেন্টের জন্যে।

      আসলে বুদ্ধিমত্তায় রোবটগুলোর কপোট্রন প্রায় মানুষের সমপর্যায়ের। কিন্তু আসিমভের রোবটিক্স সংক্রান্ত তিনটি মৌলিক সূত্র দিয়ে তাদেরকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে/অধীনস্থ করে রাখা হয়েছে। তাই, যখন গোপনে সিআইএ তৃতীয় সূত্রটি প্রথমে নিয়ে আসে, তখন তার ভেতর আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি হিসাবে দেখা দেয়। (যদিও আসিমভের সূত্র তিনটি নিয়ে বিস্তর সমালোচনা আছে, এই ব্যাপারটি আপাতত উপেক্ষা করি)। তবে মানুষের ক্ষেত্রে সারাজীবনে স্মৃতি, বিবেক, পরিবেশের সাতেহ এডাপটেশন, নানান টানাপোড়ন, নির্ভরশীলতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ইত্যাদির কারণে হঠাৎ করেই তার খুনি হওয়া হয়ে উঠে না। কিন্তু কৃত্তিমবুদ্ধিমত্তা বিশিষ্ট একটি রোবটের এই বিষয়গুলো নেই। তাই অন্যকিছু ভেবে; বিকল্প পথে না গিয়ে খুন করে নিজেকে রক্ষা করার সহজ পথটিই সে বেছে নেয়।

      আমার এই গল্পটি রোবো-ডিটেকটিভ অরূপের অনেকগুলো গল্পের একটি। পরের যে গল্পটি এখন লিখছি সেটিতে MO নিয়ে আরও ব্যাখ্যা থাকবে।

      আবারও অনেক ধন্যবাদ সুন্দর করে গল্পের দুর্বলতাটুকু ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে। শুভকামনা রইল।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!