অনন্তের খিলান

রচনা  : সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

অলঙ্করণ : অন্তর্জাল

প্রথম অধ্যায়

দুয়ারের ভ্রাতৃসঙ্ঘ

“ওই দুয়ার কোথায় পথ দেখায়?”

“চেনাশোনা এই দুনিয়ার কিনারায়”।

“কাহারা শেখান পূর্বজদের দুয়ার খোলার কল?”

“খিলান ওপারে বসত তাদের, কোর নাকো কোলাহল”।

“দান করি মোরা অর্ঘ্য কাদের, বড় ভয় ভীত মনে?”

“ওঁদের, যারা ওধারে থাকেন, তাঁদেরই সম্মানে”।

“খিলানের দ্বার খুলে রাখিবার আছে কি গো প্রয়োজন?”

“থাকিতে দাও অবারিত এ দুয়ার, কেন বৃথা বন্ধন”।

ল এনিস এতক্ষণ বিষণ্ণ মুখে ধৈর্য ধরে ছিল, কিন্তু আর থাকতে না পেরে বক্তাকে বাধা দিয়ে উঠল।

     “আরে এসবের মানেটা কি ইন্সপেক্টর? একই জিনিস এতবার করে আমাকে শোনানোর কোন অর্থই তো বুঝছি না”।

     “কাউকে আপনি এর আগে এভাবে কথা বলতে শুনেছেন?” ইন্সপেক্টর পিয়ার্স ক্যাম্পবেল একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলেন।

     “মোটেই না – এতো আমার কাছে পুরো পাগলের প্রলাপ মনে হচ্ছে” – এনিস ঝাঁঝিয়ে উঠল, “এর সাথে আমার বৌ এর সম্পর্ক কোথায়?”

     এনিস উঠে দাঁড়াল। সোনালি চুলের এই লম্বা হ্যান্ডসাম আমেরিকান ছেলেটির সুন্দর মুখে যেন কেউ কালি ঢেলে দিয়েছে, অন্তর্লীন যন্ত্রণার ছাপ ফুটে রয়েছে সেখানে। ঢেউখেলানো চুলগুলো মুখের সামনে অবিন্যস্ত হয়ে আছে –আর তার ঝকঝকে নীল চোখের তারায় স্পষ্ট বেদনা-ক্লিষ্ট ভয়ের চিহ্ন।

     চেয়ারটাকে এক ঝটকায় পেছনে সরিয়ে লম্বা অনিশ্চিত পদক্ষেপে সে সেই ছোট অন্ধকার অফিস-ঘরের ভেতর ইতস্তত চলাফেরা করতে লাগল। ঘরের ভেতর একটাই জানলা, যা দিয়ে তখন লন্ডনের গভীর কুয়াশাচ্ছন্ন মলিন গোধূলির আলো এসে পড়েছে অফিস-ঘরে। হঠাৎ সেই ঘরের নোংরা ডেস্কের ওপর ঝুঁকে পড়ে তার দু প্রান্তে হাতের ভর দিয়ে, উত্তেজিত ভাবে টেবিলের ওপারে বসে থাকা মানুষটির দিকে এনিস তার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো –

     “আপনি এখানে বসে সময় নষ্ট কেন করছেন?” চিৎকার করে উঠল সে, “এখানে ফালতু বকবক করছি, ওদিকে রুথের যে কি হচ্ছে কে জানে। এক ঘণ্টার ওপর হয়ে গেল রুথ কিডন্যাপড হয়ে গেছে – ওরা তাকে যেখানে খুশি নিয়ে যেতে পারে, হয়ত এতক্ষণ লন্ডনের বাইরে নিয়ে চলে গেছে তাকে। আর তাকে না খুঁজে উলটে আপনি এখানে বসে কিসব দরজা ফরজা নিয়ে বাজে বকে সময় নষ্ট করছেন?”

     ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেল স্থির হয়ে বসে রইলেন, দেখে মনে হোল না, এনিসের উত্তেজনা তাঁকে কিছুমাত্র স্পর্শ করতে পেরেছে। এই ভারী বিশেষত্বহীন চেহারার মানুষটির মাথার প্রায় সব চুল উঠে গেছে। তিনি তাঁর বিবর্ণ, ঝুলে পড়া মুখটি তুলে এনিসের দিকে তাকালেন – যার মধ্যে তাঁর চোখগুলো বাদামী চশমার আড়াল থেকে দু-টুকরো উজ্জ্বল কাঁচের মতো ঝকঝক করে উঠল।

     “দেখুন, আপনার উত্তেজনা আমাকে কিন্তু বিশেষ সাহায্য করছে না মিঃ এনিস”। খুব সাদামাটা গলায় বললেন ইন্সপেক্টর।

     “উত্তেজনা? কে উত্তেজিত হবে না ইন্সপেক্টর?” এনিসের গলা চড়ে গেল, “আপনি কি বুঝতে পারছেন না দাদা, রুথ নেই, রুথ, আমার বৌ! আরে আমরা সবেমাত্র গত-সপ্তাহে বিয়ে করেছি নিউ ইয়র্কে, আর আজ আমাদের লন্ডনে দ্বিতীয় দিন। আমি চোখের সামনে ওকে দেখলাম একটা লিমুজিনে উঠতে এবং চলে যেতে। আমি ভেবেছিলাম এটা নিয়ে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড খোঁজাখুঁজি শুরু করবে –  অন্তত কিছু তো করবে! তার যায়গায় আপনি আমার সামনে হাবিজাবি বকছেন”।

     “ওই শব্দগুলো হাবিজাবি নয়”, ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেল বললেন, “বরং আমার মনে হয়, ওই শব্দগুলোর সাথে আপনার স্ত্রীর অপহরণের একটা সম্পর্ক আছে”।

     “কি বলতে চাইছেন আপনি? সেটা কিভাবে সম্ভব?”

     ইন্সপেক্টরের উজ্জ্বল চোখদুটি এনিসের চোখে আটকে রইল, “আপনি কি কোনদিন দুয়ারের ভ্রাতৃসঙ্ঘের নাম শুনেছেন?”

     এনিস মাথা নাড়ল। ক্যাম্পবেল বলে চললেন, “আমি নিশ্চিত যে ওদেরই কোন সভ্য আপনার স্ত্রীকে অপহরণ করেছে”।

     “এ আবার কিরকম সঙ্ঘ? অপরাধীদের চক্র নাকি?” এনিস জিজ্ঞেস করল।

     “নাহ, এটা সাধারণ চোর ছ্যাঁচড়ের দল নয়”। গোয়েন্দা-প্রবর বলে চললেন, “যদি না আমি খুব ভুল করি, এই সঙ্ঘ হোল সর্বাপেক্ষা দুর্বৃত্ত, এবং অশুভ এক চক্র যার তুলনা সারা দুনিয়াতে নেই। ওদের নিজস্ব বৃত্তের বাইরে এই ব্যাপারে প্রায় কিছুই জানা যায় না। আমি এই বিশ বছরে এদের শুধু নাম আর অস্তিত্ব ছাড়া আর বিশেষ কিছুই জানতে পারিনি। যে লাইনগুলো আপনার সামনে বার বার বলছিলাম, আমি সেটা শুনেছিলাম, ওই সঙ্ঘেরই এক মৃত্যুপথযাত্রী সভ্যের মুখ থেকে – লোকটি ঘোরের মধ্যেই কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করছিলো”।

     ক্যাম্পবেল একটু ঝুঁকে এলেন, “কিন্তু আমি জানি, বছরের এই সময়টাতেই এই সঙ্ঘের সভ্যরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এই ইংল্যান্ডে এসে জড়ো হন, কোন গোপন ডেরায়। আর এই সময়েই এখান থেকে বেশ কিছু মানুষ অপহৃত হন এবং তাদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। আমার স্থির বিশ্বাস, এই সব মানুষকে এই রহস্যময় সঙ্ঘই কিডন্যাপ করে”।

     “কিন্তু সেই সব লোকজনদের কি হয়”? সেই বিবর্ণ আমেরিকান চিৎকার করে উঠল, “ ওরা তাদের সাথে কি করে”?

     ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেলের উজ্জ্বল বাদামী চোখে এক চাপা আতঙ্ক দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল, তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “আমি আপনার থেকে বেশি কিছু জানিনা। কিন্তু সেই হতভাগ্যদের সাথে যাই হোক না কেন, তাদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি”।

     “আপনি নিশ্চয়ই এর থেকে বেশি কিছু জানেন”। এনিস প্রতিবাদ করে উঠল, “ওই দরজাটা বা দুয়ারের ব্যপারটা কী?”

     ক্যাম্পবেল আবার মাথা নাড়লেন, “আমি ভালো বলতে পারব না। কিন্তু সেটা যাই হোক না কেন, সেই দরজা কিন্তু ওদের কাছে খুব পবিত্র। এবং সেই সঙ্ঘ-সভ্যরা “তাঁরা” বলতে যাদের বুঝিয়ে থাকেন, তাঁদের ওরা যেমন ভয় পায়, সেরকমই পুজোও করে”।

     “ওই দুয়ার কোথায় পথ দেখায়, চেনাশোনা এই দুনিয়ার কিনারায়”। – এনিস নিজের মনেই আওড়াতে থাকল, “এটার মানে কি হতে পারে?”

     “হয়ত এটার কোন প্রতীকী অর্থ আছে – হতে পারে এদের কিছু স্বতন্ত্র রীতিনীতি যেটা এদের দুনিয়ার অন্য সবার থেকে আলাদা করে রেখেছে, নয়ত’ – “

     ক্যাম্পবেল চুপ করলেন। “নয়ত’ কি?” এনিস ফ্যাকাসে মুখে আরো ঝুঁকে এলো।

     “নয়ত’ আক্ষরিক অর্থেই এটা একটা দরজা যা দিয়ে সত্যি সত্যি আমাদের এই বিশ্বের বাইরে যাওয়া যায়” ইন্সপেক্টর শেষ করলেন।

     এনিসের ভয়ার্ত চোখ তাকিয়ে রইল, “আপনি বলতে চাইছেন, এই বিশেষ দরজা কোনোভাবে অন্য কোন দুনিয়ার রাস্তা খুলে দেয়? কিন্তু সেটা তো অসম্ভব”।

     “সেরকম মনে হওয়া স্বাভাবিক”। ক্যাম্পবেল শান্তভাবে বলে চললেন, “কিন্তু অসম্ভব নয়। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের দেখিয়েছে যে আমাদের নিজেদের ছাড়াও অন্য অনেক জগত আছে যা এই দুনিয়ারই মতো এবং আমাদের দেশ-কালের  সম-স্থানিক – তা সত্ত্বেও আমাদের চেনা দুনিয়ার থেকে এক অদৃশ্য দুর্লঙ্ঘ বাধার দ্বারা বিচ্ছিন্ন, কারণ সেই সব জগত অন্য মাত্রায় বা ডাইমেনশনে অবস্থিত। এটা অসম্ভব কিছু না যদি কোন উন্নততর বিজ্ঞান এই দুই মাত্রার মধ্যে এরকম কোন ছেদ করতে পারে, যা দিয়ে আমাদের জগত আর ওরকম কোন একটি অদৃশ্য দুনিয়ার মধ্যে এক যোগসূত্র স্থাপিত হয়ে যায়  – এরকমই এক দরজার মধ্যে দিয়ে, এক অনন্ত বহির্জগতে, তাহলে ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগে বইকি”।

     “অনন্ত বহির্বিশ্বের দুয়ার?” এনিস বিড়বিড় করল, অন্যমনস্কভাবে।কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তার জড়তা ঝেড়ে ফেলে এক অসীম ব্যাকুলতার মধ্যে নিজেকে সঁপে দিলো – তার চোখে সেই পুরনো ভয় ফিরে এসেছে।

     “এইসব, দরজা, অন্য বিশ্ব, অন্য মাত্রা, আলোচনাতে কি লাভ? আমার রুথকে কি এসব থেকে খুঁজে পাওয়া যাবে? আমাকেই কিছু করতে হবে ইন্সপেক্টর। আপনার যদি বিশ্বাস থেকে থাকে যে সেই রহস্যময় সঙ্ঘই আমার স্ত্রীকে অপহরণ করেছে, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই জানবেন তাঁকে সেখান থেকে কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায়। আমাকে যা বলেছেন, আপনি নিশ্চিতভাবে তার থেকে বেশি কিছু জানেন ওদের ব্যাপারে”।

     “আমি এর থেকে বেশি কিছু জানিনা সেটা যেমন সত্যি, আবার আমার কিছু নির্দিষ্ট সন্দেহ থেকে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে, সেটাও সত্যি”। ইন্সপেক্টর বলে চললেন, “আমি এই ভাতৃসঙ্ঘের ওপর অনেকদিন ধরে অনুসন্ধান চালাচ্ছি, এবং একটা একটা বাধা পেরিয়ে আমি এমন একটা যায়গা চিহ্নিত করতে পেরেছি যেটা, আমার বিশ্বাস, সেই সঙ্ঘের স্থানীয় কেন্দ্র, সেই দুয়ারের ভাতৃসঙ্ঘের”।

     “জায়গাটা কোথায়?” এনিস আগ্রহ সহকারে জিজ্ঞেস করল।

     “ওয়াটারফ্রন্ট স্ট্রীটের এক ক্যাফেতে, ইষ্ট ইন্ডিয়া ডকের পেছনে। এর মালিক এক হিন্দু, নাম – চন্দ্র দাস। আমি ওখানে একাধিক বার ছদ্মবেশে গেছি, শুধু সরেজমিনে দেখার জন্য – কিন্তু খেয়াল করেছি, এই চন্দ্র দাস লোকটিকে সবাই বেশ ভয় পায়। এটা আমার বিশ্বাস আরো মজবুত করেছে যে এই লোকটা এই সঙ্ঘের কোন মাননীয় সভ্য হলেও হতে পারে। এরকম একটা ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষের পক্ষে ওরকম একটা জায়গায় কাজ ঠিক মানানসই নয়”।

     এনিস ছিলা ছেঁড়া ধনুকের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল, “তাহলে যদি এই সঙ্ঘই রুথকে অপহরণ করে থাকে, তাহলে সে নিশ্চয়ই এখনও সেখানেই আছে”।

     ক্যাম্পবেল তাঁর ন্যাড়ামাথাটা একবার দোলালেন, “হতে পারে। আমি আজ রাত্রে ছদ্মবেশে আবার ওখানে যাবো, এবং লোক নিয়ে যাবো যাতে যে কোন মুহূর্তে ওখানে হানা দেওয়া যায়। যদি চন্দ্র দাস আপনার স্ত্রীকে ওখানে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখে, তাহলে ওনাকে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার আগেই তাঁকে উদ্ধার করতে পারব। যাই ঘটুক না কেন, আমি আপনাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবো”।

     “সে নিয়ে কোন সন্দেহ আছে?” ফ্যাকাসে তরুণ এনিস ফেটে পড়ল। “আপনার কি মনে হয়, আপনি ওখানে যাবেন আর আমি এখানে বসে বসে আঙ্গুল মটকাবো? আমিও যাব আপনাদের সাথে, আর আপনি যদি কোনভাবে আমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করেন, তাহলে শপথ করে বলছি, আমি একাই সেখানে যাব”।

     সেই ম্লান কিন্তু তীব্র প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তরুণের মুখের দিকে ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেল অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর তাঁর কঠিন মুখমণ্ডল কিছুটা নরম হয়ে এলো। “ আচ্ছা ঠিক আছে। তবে আমি নিজে হাতে আপনাকে ছদ্মবেশ দেব যাতে কেউ চিনতে না পারে। কিন্তু একটা শর্ত, আপনি কোন অবস্থাতেই আমার কথার অন্যথা করবেন না, নাহলে আমাদের দুজনেরই মৃত্যু অনিবার্য”। তাঁর চোখের কোনে এক ভয়ের ছায়া খেলে গেল, যেন কুয়াশাবৃত অন্ধকারে এক নিবিড় আতঙ্কের আভাস পেলেন তিনি।

     “শোনা যায়-” ধীরে বলে চললেন ইন্সপেক্টর, “যারা এই সঙ্ঘের বিরোধিতা করবে, তাঁদের কপালে মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করে আছে –এই সম্প্রদায়ের গোপন রহস্যের মধ্যে কিছু একটা অপার্থিব, অমানুষিক বিভীষিকা লুকিয়ে আছে। এই সঙ্ঘের রহস্য উদ্ধারে এবং আপনার স্ত্রীকে ফিরে পাবার জন্য আমরা আমাদের জীবন বাজি রেখে নামছি। কিন্তু এবার আমাদের খুব দ্রুত কাজ করতে হবে এবং সেটা এই সঙ্ঘের আনুষ্ঠানিক জমায়েতের আগেই, নাহলে আপনার স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার কোন আশা থাকবে না”।

     রাত দশটা নাগাদ এনিস এবং ক্যাম্পবেলকে দেখা গেল ইষ্ট ইন্ডিয়া ডকের উত্তরে,  ওয়াটারফ্রন্ট স্ট্রীটের খোয়া বিছানো ফুটপাথের ওপর দিয়ে সতর্কভাবে হেঁটে চলতে।  বড় বড় গুদাম-ঘর গুলো পথের একদিকে নিঃশব্দ কালো অট্টালিকার মতো দাঁড়িয়ে আছে, অন্যদিকে পূতিগন্ধময় ডকের কালো জলে আলোর ক্ষীণ রেখা পিছলে যাচ্ছে।

     যখন দুই মূর্তি ধীরে ধীরে ডকের আধো অন্ধকারের, টিমটিম করে জ্বলা আলোর নিচে গিয়ে দাঁড়াল, দেখা গেল তাদের আসল রূপ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেছে – ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেলের পরনে একটা জীর্ণ স্যুট, এবং ততোধিক নোংরা টুপি- জামা দেখে মনে হয় সেটা কোনোদিন কাচা হয়নি, মুখখানা উজ্জ্বল লাল রঙের এবং তেল চুকচুকে, গলার স্বর উচ্চ এবং তীক্ষ্ণ। এনিসের পরনে একটা জেলেদের খড়খড়ে জ্যাকেট, একটা লম্বা টুপি মুখের সামনে অব্ধি টেনে নামানো – ওর না কামানো গাল, এবং তার সাথে মানানসই পোশাকে তাকে এক মাতাল জেলে ছাড়া আর কিছুই মনে হবার জো নেই। তার ওপর এনিস হাঁটছেও বেসামাল ভাবে। ক্যাম্পবেল মাতালের যোগ্য সঙ্গীর মতো এনিসের হাতটাকে ধরে তার সাথে বকতে বকতে চলেছে।

     এভাবেই সেই অশুভ ওয়াটারফ্রন্ট ষ্ট্রীটের এক অপেক্ষাকৃত জনাকীর্ণ অঞ্চলে ওরা চলে এলো। দোকানের ভাজা মাছের তীব্র গন্ধ, আশেপাশের শুঁড়িখানার জানলার মৃদু আলো এবং সেই সঙ্গে ভেতরের মিশ্র কোলাহল পেরিয়ে তারা অবশেষে এসে পড়ল এক পরিত্যক্ত, দীর্ণ, জেটির সামনে। তার কিছুটা পেছনে এক জরাজীর্ণ বাড়ির কাঠামো লক্ষ্য করা গেল। সেই বাড়ির জালনা গুলিতে পর্দা দেওয়া, কিন্তু দরজায় লাগানো কাঁচের ভেতর দিয়ে ঘরের নিষ্প্রভ লাল আলো চোখে পড়ছে।

     কিছু ইতর চেহারার লোকজন দরজার সামনে বসে ছিল বটে, কিন্তু ক্যাম্পবেল তাদের দিকে নজর দেবার প্রয়োজন বোধ করল না, এনিসের বাহু ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেল ঘরের ভেতরে।

     “আরে…এসসসো…দোস্ত,” খন খনে গলায় বলে উঠলেন ক্যাম্পবেল, “রাত এখনো আদ্দেকও শেষ হয়নি ভায়া – আর একটা হয়ে যাক?”

     “আর ভাল্লাগছে না” – এনিস বিড়বিড় করে বলল, বেসামাল ভাবে মুখে বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে, “বুড়ো মাতাল, ভাগো এখান থেকে”।

     তবুও, কষ্টের ভান করে ক্যাম্পবেলের সাহায্যে সে একটা টেবিলে এসে বসল, তার শূন্য দৃষ্টি তখন চতুর্দিকে ঘুরছে।

     চন্দ্র দাসের এই ক্যাফেটিকে ধোঁয়ায় আর লাল আলোতে মনে হচ্ছে একটা গুহার মতো, যার জানলা গুলো সস্তার কালো পর্দায় ঢাকা, আর ক্যাফের পেছন দিকটাতেও একটা কালো পর্দা লাগানো যাতে সেদিকটা দেখা না যায়। ক্যাফেতে একটা টেবিলও ফাঁকা নেই, সবেতেই খদ্দের ভর্তি। তাদের অর্থহীন প্রলাপে এবং হইচইতে কান পাতা দায়। তার মাঝে একটা তিন তারের গিটারের আওয়াজ বিলাপের মতো করুন সুরে ভেসে আসছে। সবকটা ওয়েটার মালয়-দেশিয়, কুচকুচে কালো এবং শার্দূলের মতো তাদের চলাফেরা – কিন্তু খদ্দেরদের দেখে বোঝা যায়, তারা বিভিন্ন দেশের অধিবাসী, তার মধ্যে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য দুধরনের মানুষই আছে। এনিসের মাতাল চোখ দেখতে পেল, লাইমহাউজ এবং পেনিফিল্ড থেকে আসা ফুলবাবু সাজ চাইনিজদের, সোহো থেকে আসা কালো বেঁটে লেভান্টিনদের, কিছু নিগ্রোকে, অভিব্যক্তি-শূন্য, শিরদাঁড়া টানটান করে থাকা অদ্ভুত কিছু বাদামী এবং হলুদ বর্ণের মানুষকেও বসে থাকতে দেখল সেখানে। এদিকে ক্যাফের বাতাস খাবারের উৎকট এবং ধোঁয়ার কটু গন্ধের আতিশয্যে ভারী হয়ে উঠেছে।  

     ক্যাফের পিছনদিকের পর্দার ধারের একটা টেবিলের দখল নিয়ে ক্যাম্পবেল আর এনিস বসেছিল। ক্যাম্পবেল কর্কশ গলায় একটা জিনের ফরমায়েশ করলেন এক মালয় ওয়েটারকে ডেকে, তারপর মাতাল-রূপী এনিসের দিকে একটু ঝুঁকে এসে প্রায় অর্ধোচ্চারিত স্বরে বললেন, “খবরদার তাকাবেন না, ওই কোনের দিকে চন্দ্র দাস দাঁড়িয়ে আছে, আর আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে”। এনিসের মুষ্ঠী-বদ্ধ হাত একটু নড়ে উঠল, “শালা বেহেড মাতাল” বলে আবার বিড়বিড় করে উঠল সে।

     দোদুল্যমান মাথাটা তুলে, সে তার নজর ভাসিয়ে দিল ইন্সপেক্টরের দেখানো ঘরের কোনের দিকে, যেখানে একটি লোক তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেই যদি চন্দ্র দাস হয়, তাহলে বলতেই হবে সে বেশ লম্বা, এবং মাথা থেকে পা অবধি ধবধবে সাদায় মোড়া, মানে জুতো থেকে শুরু করে, মাথার পাগড়ি অবধি, পুরোটাই নিষ্কলুষ সাদায় ঢাকা। এই শ্বেতশুভ্রতাই তার শ্যামবর্ণ, অভিব্যক্তিহীন, ধারালো অবয়বকে সবার থেকে আলাদা করে রেখেছে। তার সাথে চোখাচোখি হতে এনিস বুঝতে পারল, তার কুচকুচে কালো চোখ পাথরের মতো ঠাণ্ডা ও গভীর। এনিসের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল ওই হিন্দুর চোখের দিকে তাকিয়ে, সেখানে কিছু যেন আছে, কিছু অস্বাভাবিক, কিছু রহস্যময়ভাবে অস্বস্তিদায়ক। যেন কিছুই হয়নি, এভাবে, এনিস তার অলস দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল চন্দ্র দাসের থেকে কালো পর্দার ওপর, আর সেখান থেকে তার সঙ্গীর দিকে। এতক্ষণে সেই মালয় ওয়েটার মদ নিয়ে এসে গেছে। ক্যাম্পবেল একটি গ্লাস এনিসের দিকে ঠেলে দিল, “মেরে দাও গুরু, খাসা জিনিস – হেঃ হেঃ…হিক”।

     “ধুর, কিচ্ছু ভালো লাগছে না” বিড়বিড় করে বলল এনিস, “রুথ যদি এখানে থাকে তাহলে ওই পর্দার পেছনের দিকে কোথাও আছে। আমি গিয়ে একবার দেখে আসি?“

     “পাগল নাকি? সে চেষ্টাও করবেন না” গলা নামিয়ে ক্যাম্পবেল বলে উঠলেন, “চন্দ্র দাস এখনও আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। ওরকম কিছু চেষ্টা করলে, ওর ইঙ্গিতে ষণ্ডা মালয়গুলো এখনি আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। এখন নয়, আমার ইশারার জন্য অপেক্ষা করুন”।

     “ঠিক আছে দোস্ত,” ক্যাম্পবেল আহত স্বরে গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, “তুমি না খেলে, আমিই মেরে দি”। পর পর দু-গ্লাস নিঃশেষ করে ক্যাম্পবেল তার মাতাল সাথীর দিকে ক্রোধ-পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন, “তোমার কি মনে হচ্ছে, আমি জোচ্চোর? খুব ভালো! বন্ধুর সাথে কি ভাল ব্যবহারই না করছ গুরু”।

     কিছু পরে গলাটা খাদে নামিয়ে একটু নরম সুরে বললেন, “ঠিক আছে, আমায় চেষ্টা করতে দিন। প্রস্তুত থাকুন, যখন আমি সিগারেট জ্বালাবো, তখনি উঠে পড়বেন”। তিনি পকেট থেকে গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেটটা বের করে একটি সিগারেট মুখে নিলেন। এনিসের প্রতিটি পেশি টানটান হয়ে আছে উত্তেজনায়। ইন্সপেক্টরের তেল চুকচুকে মুখে ঝুলতে থাকা সিগারেটে যে মুহূর্তে অগ্নি সংযোজন ঘটল, ঠিক সেই সময় একটা বিকট গলায় ওই দরজার সামনে বসে থাকা ইতর-শ্রেণির লোকগুলির কেউ চিৎকার করে উঠল, তারপর ঝটাপটির আওয়াজ এবং রাগী গলার বাদানুবাদ শোনা যেতে লাগল।

     খদ্দেরদের সবার দৃষ্টি এখন সদর দরজার দিকে। এক মালয় ভৃত্য তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল লড়াই শান্ত করার জন্য। কিন্তু একটু পরেই সেই লড়াই একটা দাঙ্গার আকার নিয়ে নিল – কাঁচ ভাঙার আওয়াজের সাথে একটা ভোঁতা শব্দ বুঝিয়ে দিলো, কাউকে জানলা ভেঙ্গে বাইরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। উত্তেজিত জনতা এবার সবাই সামনের দিকে হুড়োহুড়ি করে ছুটতে থাকল, আর চন্দ্র দাস কে দেখা গেল ভিড় ঠেলে এগোনোর চেষ্টা করছেন এবং নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁর মালয় ভৃত্যদের।

     এই মুহূর্তে, কাফের পেছন দিকটি সম্পূর্ণরূপে ফাঁকা এবং অরক্ষিত। সুবর্ণ সুযোগ, ক্যাম্পবেল স্প্রিঙয়ের মতো লাফিয়ে উঠে ছুটলেন ক্যাফের পেছনের কালো পর্দার আবরণ লক্ষ্য করে, বুঝতে পারলেন এনিস তাঁকে অনুসরণ করে আসছে। পর্দার পেছনে একটা অন্ধকার দালান, এবং তার শেষে একটি লাল আলো টিমটিম করে জ্বলছে। পর্দার ওপাশ থেকে এখনও গোলমালের শব্দ ভেসে আসছে।

     ক্যাম্পবেল আর এনিস দুজনেই নিজের নিজের বন্দুক হাতে নিয়ে নিয়েছে – ক্যাম্পবেল হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “বেশি সময় হাতে নেই – এই গলিটা আর ওই ঘরগুলো দেখুন গিয়ে”।

     এনিস পাগলের মতো দড়াম করে একটা ঘরের দরজা খুলে ফেলল – অন্ধকার সেই ঘরের মধ্যে শুধু ওষুধের তীব্র গন্ধ। “রুথ”, এনিস ঘরের ভেতর চেঁচিয়ে উঠল, “রুথ”।

দ্বিতীয় অধ্যায়

মৃত্যুফাঁদ

কোন উত্তর নেই। পেছনের দালানে যে আলোটা জ্বলছিল, সেটা হঠাৎ নিভে গেল। এখন এনিসের চারদিকে আলকাতরার মতো কালো অন্ধকার। এনিস ঘর থেকে লাফিয়ে ছিটকে এলো দালানে – সেই মুহূর্তে তার কানে এলো এক ধ্বস্তাধস্তির শব্দ। “ক্যাম্পবেল” বলে চিৎকার করে সে ওই কালো অন্ধকারের সমুদ্রে ঝাঁপ দিলো। দু হাত সামনে বাড়িয়ে ইন্সপেক্টরকে খুঁজতে খুঁজতে সেই অন্ধকারের দুর্লঙ্ঘ বাধা এক পা এক পা করে পেরোতে লাগল এনিস।

     হঠাৎ তার গলায় লিকলিকে শুঁড়ের মতো কিছু একটা পেঁচিয়ে ধরল। হতবুদ্ধি এনিস পাগলের মতো সেটা টেনে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করতে লাগল – কিন্তু একটা রেশমি ফাঁসের মতোই তার গলার চারপাশে সেই নাগপাশ ক্রমশ এঁটে উঠে তাঁর দমবন্ধ করে দিতে লাগল। ক্যাম্পবেলের নাম করে সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে তার কোন আওয়াজ বেরোল না। সে মাটিতে ছিটকে পড়ল, অসহায়ভাবে উথালপাতাল করতে করতে তার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে সে বুঝতে পারল চোখ বেঁধে তাকে টেনে হিঁচড়ে কোথাও নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিছুক্ষণ এইভাবে খাবি খাওয়ার পর সে অনুভব করল, তার গলা থেকে ফাঁসটা স্বরে গেছে। চোখের কাপড়ও অন্তর্হিত। ধীরে ধীরে তার গুলিয়ে যাওয়া বুদ্ধি আবার কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে – এনিস চোখ খুলল।

     একটা সুন্দর পিতলের ল্যাম্পের আলোয় আলোকিত একটি ঘরের মেঝেতে সে নিজেকে আবিষ্কার করল। ঘরের দেওয়ালগুলোতে অদ্ভুতদর্শন ভারতীয় কারুশিল্প চিত্রিত দামি ঝালর লাগানো। এনিস জানে, তার হাত আর পা বাঁধা।  পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেলের ও সেই হাল। চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেল, তাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে মূর্তিমান বিভীষিকার মতো চন্দ্র দাস এবং তার দুই মালয় ভৃত্য। দুই মালয়ের মুখ দেখে মনে হোল ওরা এখুনি তাদের ছিঁড়ে খাবার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু মালিকের নির্দেশের প্রতীক্ষায় রয়েছে। চন্দ্র দাসের চোখ মুখ এখন অতটা ভাবলেশহীন নয়, বরং তার চোখ জ্বলছে, ঘৃণায় তার মুখ বিকৃত হয়ে আছে।

     “গাধাগুলো ভেবেছিলে আমাকে এত সহজে বোকা বানাবে?” কঠিন এবং গমগমে গলায় বলে উঠল সে, “আমরা ঘণ্টাখানেক আগেই জানতাম যে তোমরা, মানে ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেল এবং মিঃ এনিস এখানে আসতে চলেছ। তোমাদের এতদূর প্রশ্রয় দেবার কারণ, আমাদের ব্যাপারে তোমরা কিছুটা হলেও জেনে ফেলেছ। তাই তোমাদের এখানে অবাধে আসতে দিলাম আর দেখলাম কি সুন্দর ফাঁদে পা দিলে তোমরা। অনেক হয়েছে – এখন তোমাদের শেষ করে ফেলতে হবে”।

     “চন্দ্র দাস, আমার লোক বাইরে অপেক্ষা করছে”। হিসহিস করে উঠলেন ক্যাম্পবেল, “যদি আমরা না ফিরি, তারা আমাদের উদ্ধার করতে আসবেই”।

     হিন্দু লোকটি তার গর্বিত মুখ থেকে ঘৃণার ভাব একটুও না কমিয়ে বলল, “ইন্সপেক্টর, ওদের আসতে একটু সময় লাগবে। কিন্তু সেই সময়টুকুর মধ্যেই তোমাদের ভবলীলা সাঙ্গ হবে আর আমি আমার বন্দীদের নিয়ে নিশ্চিন্তে সরে পড়ব। আর মিঃ এনিস, আপনার স্ত্রীও সেই বন্দিদের মধ্যে একজন”। মাটিতে অসহায় ভাবে শুয়ে থাকা এনিসকে লক্ষ্য করে চন্দ্র দাস বলে চলল, “খুব ইচ্ছে করছে আপনার এবং ইন্সপেক্টরের চোখের সামনে আপনার স্ত্রীর শেষ পরিণতিটা দেখানোর, কিন্তু আমি অপারগ। আমার বোটে, জায়গা খুব সীমিত”।

     “রুথ এখানে?” এনিসের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে হাত পা বাঁধা অবস্থাতেই কনুইয়ের ভর দিয়ে উঠে বসতে চেষ্টা করল।

     “আচ্ছা আমি যদি আপনাকে প্রচুর টাকা দি? ওকে ছেড়ে দেবেন? আপনি যা বলবেন আমি করব, যা চাইবেন দেব, আপনি ওকে দয়া করে ছেড়ে দিন”। এনিসের গলায় আকুতি ফেটে পড়ল।

     “পৃথিবীর কোন অর্থই দুয়ারের ভ্রার্তৃসঙ্ঘের থেকে ওকে কিনতে পারবে না”। চন্দ্র দাস ধীরভাবে উত্তর দিলো। “কারণ, সে এখন আর আমাদের নয়, এখন ওদের, ওরা, যারা দরজার ওদিকে থাকে। কিছু ঘণ্টা পরেই, সে এবং তার মতো আরও অনেকে সেই সুমহান দরজার সামনে দাঁড়াবে। আর দরজার ওদিকের ওই ওনারা, তাদের গ্রহণ করবেন”।

     “তুমি কি করতে চলেছ ওকে নিয়ে?” এনিস চিৎকার করে বলল, “এই হতচ্ছাড়া দরজাটাই বা কি? আর “ওঁরা” মানে কারা?”

     “আমি যদি বলিও, আমার মনে হয়না, তোমাদের এই সঙ্কীর্ণ মন, ওই মহতী সত্যকে উপলব্ধি করতে পারবে”। চন্দ্র দাসের অঙ্গার কালো চোখের মণি উন্মত্ততায় ঝলসে উঠল, “তোমাদের মত নগণ্য পৃথিবীর কীটদের, ওই বিপুল মনীষাকে বোঝার চেষ্টা না করাই ভালো। তোমাদের পার্থিব জ্ঞানের অনেক ঊর্ধ্বে আছে ওই দরজা এবং তার পেছনে যারা বাস করে, তাঁরা। ওই দরজার ওপাশের জগতের ব্যাপারে সামান্য আভাস পেলেও মাথা ঘুরে পড়ে থাকবে। এই ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে তাঁদের নাগাল পাওয়া সম্ভব না। ওই জগতের অধিবাসীরা এই বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী, সর্বাপেক্ষা ধূর্ত ও মূর্তিমান আতঙ্ক”। 

     হঠাৎ একটা ঠাণ্ডা বাতাস এসে সুসজ্জিত ঝাড়বাতিটাকে দুলিয়ে দিয়ে চলে গেল। একইসঙ্গে, সেই হিন্দুর মধ্যেকার ক্ষণিক উত্তেজনা এবং উন্মত্ততার বহিঃপ্রকাশ যেমন হঠাৎ এসেছিল, সেরকমই এক লহমায় চলেও গেল। ঠাণ্ডা গলায় সে বলে উঠল, “এই নর্দমার কীট গুলোর সাথে অনেক দহরম মহরম করেছি, আর না। ওজন গুলো নিয়ে আয়”।

     শেষ কথা গুলো একজন মালয় ভৃত্যকে উদ্দেশ্য করে বলা, যে এতক্ষণ ঘরের কোনের দিকে অন্ধকারে মিশে দাঁড়িয়ে ছিল।

     ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেল ধীরভাবে বললেন, “যদি আমার লোকেরা এসে দেখে যে আমরা বেঁচে নেই, তাহলে তোমাদের একটাকেও জ্যান্ত ছাড়বে না”।

     মনে হোল না চন্দ্র দাস ইন্সপেক্টরের কোথায় কিছুমাত্র গুরুত্ব দিল। সেই কালো ভৃত্যের কাছে চাবুকের মতো নির্দেশ এলো “ওজন গুলো পায়ের সাথে বেঁধে ফেল”।

     আলমারির থেকে দুটো পঞ্চাশ পাউন্ডের লোহার বল বার করে, মালয় ভৃত্যগুলো এনিস এবং ইনস্পেক্টরের পায়ে বেঁধে দিলো। তারপর ওদের টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে দিলো সেই সুন্দর নরম ভারতীয় কারুকাজ করা কার্পেটের ওপর থেকে যার ওপর শুয়ে শুয়ে এতক্ষণ চন্দ্র দাসের বিদ্রূপ হজম করছিল তারা। দেখা গেল, সেই কার্পেটের নিচেই আছে এক গুপ্ত-দ্বার। সেটা খুলতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা সোঁদা বাতাস এসে ঝাড়বাতিটাকে আবার একটু দুলিয়ে দিয়ে গেল, সেই সঙ্গে শোনা গেল ঢেউ ভাঙ্গার শব্দ। জেটির নিচে সমুদ্র বিপুল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তার স্তম্ভের ওপর।

     “জেটির নীচের সমুদ্র, বেশি না, মাত্র কুড়ি ফুট গভীর। এত মনোরম মৃত্যু দিতে হচ্ছে বলে দুঃখ লাগছে ঠিকই, কিন্তু তোমাদের যোগ্য পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ আপাতত আমার নেই”। চন্দ্র দাসের মুখে মুচকি হাসি দেখা দিলো।

     এনিস শেষ চেষ্টা করল, “শুনুন, প্লিজ শুনুন। আমি বলছি না আমাকে ছেড়ে দিতে, আপনি আমাকে যেভাবে মেরে ফেলতে চান মারুন, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু রুথকে —-“

     কথা শেষ করতে পারল না এনিস, ভয়ার্ত চোখে দেখল, একজন মালয় ভৃত্য ক্যাম্পবেলের পা ধরে টেনে নিয়ে গেল সেই খোলা দরজার কাছে। দরজার ফাঁক দিয়ে অদৃশ্য হবার আগে এক মুহূর্তের জন্য ইন্সপেক্টরের শান্ত মুখটা চোখে পড়ল এনিসের, তার কিছুক্ষণ পড়েই খুব নিচে এক হাল্কা জলোচ্ছ্বাসের শব্দ শোনা গেলো – তারপর সব নিস্তব্ধ।

     এবার মালয় গুলোর কঠিন হাত টেনে নিয়ে চলল এনিসকে। পাগলের মতো লড়তে লাগল সে, সেই হাত পা বাঁধা অবস্থায়। যতটা সাধ্য বাধা দিতে লাগল, চেষ্টা করতে লাগল, মেঝের ওপর কোনোকিছুকে আঁকড়ে ধরতে। লহমায় নজরে পড়ল চন্দ্র দাসের শ্যামলা, ভাবলেশহীন মুখ – তারপরই এনিসের মাথাটা ঝুলে গেল সেই গোপন দরজার কিনারায়, আর উপর্যুপরি ধাক্কায় সে পড়তে লাগল সেই স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকারের ভীতর দিয়ে, নিচে, আরও নিচে। মুহূর্ত পরেই তার শরীর বরফঠান্ডা জলের সংস্পর্শে এসে গেল। জলে পড়েই এনিস হাঁ করে এক ফুসফুস শ্বাস নিয়ে মুখ বন্ধ করল, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার সমস্ত শরীর জলের তলায় চলে গেল। গোড়ালিতে বাঁধা ওজন তাকে বিনা বাধায় টেনে নিয়ে চলল সমুদ্র তলদেশের দিকে।

     কিছুক্ষণ পরেই তার পা সমুদ্রের কর্দমাক্ত তলদেশ স্পর্শ করল। পায়ে বাঁধা ওজনের জন্য তার শরীর সেখানেই স্থির হয়ে দুলতে লাগল। এক ঝলক বাতাসের জন্য এনিসের ফুসফুস তখন খাবি খাচ্ছে, সে অনুভব করল যেন একটা আগুনের গোলা তার বুক থেকে উঠে আসছে, আর বেশিক্ষণ শ্বাস চেপে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। একটু পরেই এই জল তার নাকে মুখে ঢুকে গিয়ে তার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেবে। শেষ অবস্থায় তার মনে ভেসে উঠল রুথের মুখ, – তাকে না দেখতে পাওয়ার গভীর হতাশায় ডুবে যেতে যেতে সে বুঝতে পারল, তার পেশিগুলি বিদ্রোহ শুরু করেছে, শরীর শিথিল হয়ে আসছে তার। কিছুটা নোনা জল তার মুখে ঢুকে গেল, নাকের চারপাশে এবার সে জলের নাগপাশ অনুভব করতে পারছে।

     হঠাৎ একটা চরম বিভ্রান্তি যেন মসৃণভাবে দূর হয়ে গেল, ফ্লাডগেট খুলে যাবার মতো জলের তোড় সব বাধা সরিয়ে প্রবেশ করল তার নাকে মুখে। চারপাশে জলের চাপা কলকল শব্দ। বুকের থেকে ঠেলে উঠে আসা সেই আগুনের গোলা তার মাথায় আঘাত করল, আর কে যেন ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, “এবার মরণ”। ঠিক সেই সময়ে, অবচেতনে সে বুঝতে পারল, তার শরীরটা কিছুর সাথে ধাক্কায় নড়ে উঠল।

     অস্পষ্ট অনুভূতিতে এনিস বুঝতে পারল তীব্র বেগে সে উপরের দিকে ছুটে চলেছে। কিছু পরে তার মাথাটা জল থেকে এক ঝটকায় উঠে খোলা বাতাসে এসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার উপোষী ফুসফুস গোগ্রাসে গিলতে লাগল সমুদ্রের উপরিতলের খোলা ঠাণ্ডা বাতাসকে। মুখ, নাক দিয়ে তাজা বাতাসে শ্বাস নিয়ে সে চোখ খুলে চাইল।

     অন্ধকারে চারপাশের বিপুল জলরাশির ওপর সে ভেসে আছে। শুধু সে নয়, সে অনুভব করল তার পাশেও কেউ আছে, যে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। এনিসের থুতনিটা তার কাঁধে একবার ধাক্কা খেতেই পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে, “একটু দাঁড়ান” ক্যাম্পবেলের গলা ভেসে এলো, “আপনার হাতের ফাঁসটা কাটা অবধি একটু অপেক্ষা করুন”।

     “ক্যাম্পবেল”, এনিসের বিশ্বাস হলো না, “আপনি বাঁচলেন কি করে? হাত পায়ের বন্ধন মুক্ত হলেন কিভাবে?”

     “পরে বলছি”, ইন্সপেক্টর উত্তর দিলেন, “শব্দ করবেন না, তাহলে ওই ওপরে ওরা শুনতে পেয়ে যেতে পারে”।

     একটা ধারাল ছুরি দিয়ে ক্যাম্পবেল তার হাতের বাঁধন কেটে দিলেন। তারপর দুজনে হাল্কা চালে সাঁতার কেটে চললেন সেই অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে। জেটির নিচের কালো কালো, শ্যাওলা ধরা, মরচে পড়া থাম গুলোর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে ফ্যাকাসে আলো চোখে পড়ল এনিসের, আকাশের গায়ে জেগে থাকা তারাদের আলো, কিন্তু সেই ম্লান আলোও যেন জেটির নিচের ওই কুচকুচে কুটিল অন্ধকারের থেকে অনেক উজ্জ্বল। পেছনে তাকিয়ে দেখল, সেই জেটির ওপরে চন্দ্র দাসের কালো বাড়িটা ভুতের মতো দাঁড়িয়ে আছে, আর জানলার ফাঁক দিয়ে লালাভ আলো বেরিয়ে সেটাকে আরও অদ্ভুত দেখাচ্ছে।

     একটু দূরে একটা ভাসমান বয়ার সাথে কিছু ডিঙি বাঁধা ছিল, তার ওপর ক্লান্ত শরীর গুলোকে হেঁচড়ে তুলে, ছইয়ের ওপর চিত হয়ে শুয়ে বিপুল হাঁপাতে লাগল এনিস এবং ইন্সপেক্টর। ক্যাম্পবেলের হাতে ঝলসে ওঠা ছুরিটা এতক্ষণে ভালোভাবে নজর করল এনিস, সেটার বাঁটটা জুতোর হিলের মতো।ইন্সপেক্টর জুতোটা হাতে নিলেই পরিষ্কার হোল ব্যাপারটা। সেই জুতোর হিল নেই। ক্যাম্পবেল, খুব সাবধানে সেই গুপ্ত ছুরিটা বাঁটে মুড়ে দিলেন, এবং জুতোর সোলের তলায় ঢুকিয়ে দিতেই সেটা দিব্যি একটা নির্বিষ হিলে পরিণত হোল।

     “এতক্ষণে বুঝলাম, আপনি তাহলে এই দিয়েই হাত পায়ের বাঁধন কেটে ফেলেছিলেন” – এনিস ব্যগ্র কণ্ঠে বলে উঠল।

     “এই কৌশল আগেও অনেক কাজে এসেছে আমার। তাছাড়া হাত পিছমোড়া করে বাঁধা থাকলেও এটা বার করতে কোন অসুবিধা হয় না, কারণ একটু ছোঁয়া  যায়গা মতো লাগলেই জিনিসটা খুলে যায়। তবে সেদিক থেকে হিসেব করলে, আমি যতক্ষণে নিজেকে মুক্ত করেছি, মনে হয় আপনাকে বাঁচাতে খুব একটা দেরি করিনি”।

     এনিস ইন্সপেক্টরের কাঁধ খামচে ধরল, “ক্যাম্পবেল, রুথ এখানেই আছে। আমরা ওকে খুঁজে পেয়েছি, আর চেষ্টা করলে আমরা এই নরক থেকে ওকে হয়ত বের করেও নিয়ে যেতে পারব”।

     “ঠিক আছে। দু মিনিটের মধ্যেই আমি আমার লোকজন নিয়ে ওই বাড়ির সদর দরজার সামনে পৌঁছচ্ছি”। ইন্সপেক্টর উৎসাহিত কণ্ঠে বলে উঠলেন।

     ডিঙি থেকে নেমে হাঁটুজল পেরিয়ে পারে উঠেই, দুজনে নিঃশব্দে এগিয়ে চললেন চন্দ্র দাসের মহল লক্ষ্য করে। ইন্সপেক্টরের গুন্ডামার্কা স্যাঙাতগুলো সেখানে এখন নেই বটে, কিন্তু ছায়ামূর্তির মতো তারা আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এনিস এবং ক্যাম্পবেলকে আসতে দেখে তারা এগিয়ে এলো।

     “এবার বাড়িতে হানা দিয়ে হবে। চন্দ্র দাসকে যে কোন মূল্যে ধরতে হবে কিন্তু খেয়াল রাখবে যাতে কোন বন্দীর গায়ে আঁচড়টি না লাগে”।

     তিনি একটা ইশারা করা মাত্র, একজন এগিয়ে এসে দুজনের হাতে দুটি পিস্তল দিয়ে দিলো। এবার সবাই নিঃশব্দে কিন্তু দ্রুত এগিয়ে চলল চন্দ্র দাসের বাড়ির সদর দরজার দিকে – যার ফাঁক দিয়ে এখনও লালাভ আলো বেরিয়ে আসছে, ভেতরের অস্পষ্ট কোলাহল শোনা যাচ্ছে বাইরে থেকে। ইন্সপেক্টর এক লাথি মেরে দরজাটা খুলে ঢুকে পড়লেন ভেতরে, পেছনে পেছনে তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা। লাল আলোতে ওদের হাতের বন্দুকগুলো চকচক করছিল। এনিসের মুখের পেশি ইস্পাত কঠিন সংকল্পে তিরতির করে কাঁপছে। চিত্রবিচিত্র মানুষের সমাবেশে সেই আচমকা আক্রমণ দেখে কেউ কেউ চিৎকার করে উঠল। নিমেষে, একজন মালয় পরিচারকের হাতের সামান্য কাঁপুনিতে এক চকচকে ছুরি তীরের ফলার মতো এসে বিঁধে গেল এনিসদের পাশের দেওয়ালে। গোলমালের ভেতরে এনিসের নজরে পড়ল চন্দ্র দাসের দিকে, সে চেঁচিয়ে উঠল। দেখা গেল, হতভম্ব মুখে, তার মালয় স্যাঙাতদের সাথে চন্দ্র দাস পালিয়ে যাচ্ছে সেই কালো পর্দার আড়ালে।

     চন্দ্র দাসের তাঁবেদারদের অনিচ্ছুক ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে লাগলেন ইন্সপেক্টর এবং পেছনে পেছনে এনিস। যে মালয়টি ছুরি ছুঁড়ে মেরেছিল একটু আগে, তাকে দেখা গেল, কাউন্টারের পেছনে থেকে আবার একটা ছুরি তুলে নিয়ে ছোঁড়ার উদ্যোগ করছে। ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেলের হাতের বন্দুক একবার গর্জন করে উঠল, আর সংগে সংগে মালয়টি ঘুরে পড়ে গেল কাউন্টারের পেছনে। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে এনিস আর ক্যাম্পবেল যখন পর্দার পেছনে পৌঁছলেন, দেখা গেল একটা ইস্পাতের দরজা তাঁদের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। যে যায়গায় তারা আগের বার পৌঁছেছিল, সেখানে যাবার পথ বন্ধ। এনিস পাগলের মতো দরজায় লাথি ঘুসি মারতে লাগল, ইন্সপেক্টর বাধা দিলেন, “কোন লাভ নেই, আমরা এই দরজা ভাঙতে পারব না”। বাইরে বিশাল চেঁচামেচির কানে তালা লাগানো আওয়াজের মধ্যে গলা তুলে ইন্সপেক্টর বললেন, “ বাইরে চলুন, এই বাড়ির পিছনদিকে”।

     সেই পাগলাগারদের থেকে বেরিয়ে রাস্তার কালো অন্ধকার দিয়ে তারা ছুটে চলল বাড়ির পিছনদিকে। নদীর শেষ প্রান্তে জেটির ধার ঘেঁষে একটা সরু পাড় চলে গেছে সমুদ্রের মুখে – চওড়ায় খুব বড়জোর ইঞ্চি-খানেক হবে। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে এনিসে চেঁচিয়ে উঠল। দেখা গেল, কয়েকটি কালো মূর্তি সেখানে অন্ধকারে ঘোরাফেরা করছে, কালো কালো বস্তা নামিয়ে দিচ্ছে কিছুর উপর।

     “ওই যে শয়তানগুলো” – চিৎকার করে উঠল সে, “বন্দীদের ওরা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে”। ক্যাম্পবেলের বন্দুকের নল মাটির সমান্তরাল ভাবে ঘুরে গেল সেদিকে, কিন্তু এনিস এক ধাক্কায় সেটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “একদম নয়, রুথের লেগে যেতে পারে”। এনিস আর ইন্সপেক্টর দুজনেই সেই সরু পাড় বেয়ে যতটা সম্ভব গতিতে ছুটে গেলেন সেই মূর্তিগুলোর দিকে। হঠাৎ, অন্ধকারে একটা আলো ঝলকে উঠল, আর তার পরেই সমুদ্রের ধারে পড়ে থাকা আশেপাশের কাঠের নৌকায় বুলেট লাগার ভোঁতা আওয়াজ শোনা গেল।

     আচমকা নদীর তলা থেকে ধেয়ে আসা একটা যন্ত্রচালিত বোটের ইঞ্জিনের শব্দে বাকি সব আওয়াজ ডুবে গেল। এনিস আর ক্যাম্পবেল পাড়ের প্রান্তে পৌঁছে দেখলেন একটা ধুসর রঙের শক্তিশালী ইঞ্জিন বিশিষ্ট মোটর বোট নদীর বুক চিরে তীব্র গতিতে পূর্বদিকের কালো অন্ধকারে হারিয়ে গেল।

     হিস্টিরিয়াতে পাওয়া রোগীর মত এনিস গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “পালাচ্ছে, ওরা পালাচ্ছে”। ক্যাম্পবেল মুখের কাছে হাত দুটো জড়ো করে হাঁক দিলেন, “জল পুলিশ, এদিকে এদিকে”। তারপর এনিসের দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত ভাবে বললেন, “আজ রাতে এদিকে জল পুলিশের একটা স্পীড-বোট থাকার কথা। আমরা এখনো ওদের ধরতে পারি”।

     একটু পরেই দুরের অন্ধকার থেকে আগত মোটরের শব্দ ক্রমশ শোনা গেল, এবং একটা তীব্র সার্চলাইট ওদের চোখের ওপর পড়ে কিছুক্ষণের জন্য ওদের অন্ধ করে দিল। “ওই তো ওদিকে” একটা গমগমে গলা ভেসে এলো, “আপনিই কি ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেল?”

     “হ্যাঁ, আমিই – এই এদিকে আসুন” ক্যাম্পবেল গলা তুলে উত্তর দিলেন। যখন সেই বড় মোটর-বোটটি জেটির ধারে দৃশ্যমান হোল, দেখা গেল, তার বিপরীতমুখী ঘূর্ণায়মান প্রপেলার তীব্র-বেগে নদীর কালো জলকে ছিন্নভিন্ন করে তুলছে। জেটির মুখে বোটটা লাগতেই ইন্সপেক্টর এবং এনিস এক লাফে তাতে উঠে পড়লেন। “এখুনি নদী দিয়ে যে বোটটা বেরিয়ে গেল, তার পিছু নাও – জলদি”। চালকের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত মানুষটিকে লক্ষ্য করে ইন্সপেক্টর নির্দেশ দিলেন, “কিন্তু কেউ গুলি চালাবে না”।

     ইঞ্জিনের জোরলো আওয়াজ করে বিদ্যুৎ বেগে সেই মোটর-বোটটি নদীবক্ষ চিরে ছুটে চলল। সামনের দিকের প্রবল আচমকা ঝটকায় দুজনেই সেই বোটের মেঝের উপরে আছড়ে পড়ে গড়াগড়ি যেতে লাগলেন – বোট ছুটে চলল দুপাশে আলো-ঝলমলে লন্ডনকে পাশে রেখে। সামনের দিক থেকে আসা যাত্রীবাহী নৌকা, প্রমোদ-তরীগুলির আলো দ্রুত পিছলে যেতে লাগল নদীর ঘন অন্ধকারের ওপর ধাক্কা খেয়ে। বোটের ক্যাপ্টেন চেঁচিয়ে কিছু নির্দেশ দিলেন তার তিনজন নাবিককে। তার মধ্যে যে সার্চলাইটের কাছে বসে ছিল, সে তাড়াতাড়ি আলোর তীব্রতা বাড়িয়ে সেই ঘন অন্ধকার জলের ওপর ফেলল, মুহূর্তে দৃশ্যমান হয়ে উঠল দূরের নদী, চকচক করে উঠল কালো জল।

     কিছুক্ষণ পরেই দূরে এক ধুসর চলমান বিন্দু দেখা গেল। জলের সাদা ফেলা পেছনে রেখে সেটা এগিয়ে চলেছিল পূর্বদিকে। “ওই দেখা যাচ্ছে ওদের”। চিৎকার করে উঠল সার্চলাইট অপারেটর, “কিন্তু ওরা আলো না জ্বালিয়েই চলেছে”।

     “ওদের সার্চলাইটের মধ্যেই রাখো, সাইরেন বাজাও আর নৌকার মুখ ওদের দিকে করো”। হুকুম দিলেন ক্যাপ্টেন। দুলতে দুলতে পুলিশের বোটের মুখ ঘুরে গেল এবং তীব্র গতিবেগে ধাওয়া করল দূরে সেই ধুসর বিন্দুটিকে। ব্ল্যাকওয়াল রিচ পেরোনোর পরেই বোঝা গেল দুজনের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছে।

     “ওদের টপকে যেতে হবে আমাদের” ক্যাম্পবেল নির্দেশ দিলেন। বোটের তীব্র গতি আর দুলনির থেকে বাঁচতে একটা খুঁটিকে শক্ত করে ধরে আছেন তিনি। তীরের মতো ছিটকে আসা জলের ছিটা আর হাওয়ার বেগের মধ্যে কোনক্রমে সামনের দিকে দেখতে দেখতে তিনি বলে উঠলেন, “ওরা সেই জায়গাতেই যাচ্ছে যেখানে এই দুয়ারের ভ্রাতৃসঙ্ঘের লোকজন জড়ো হয়েছে – কিন্তু ওরা সেখানে কোনদিনই পৌঁছতে পারবে না”।

     “ওরা বলছিল আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাকি বন্দীদের সাথে রুথও সেই অশুভ দরজার ওদিকে চলে যাবে”। এনিস চিৎকার করে উঠল, “ক্যাম্পবেল, এদের কোনমতেই ছাড়া চলবে না”।

     দুটি মোটরবোটই গোঁয়ারের মতো ক্রমশ চওড়া হতে থাকা নদীর মোহনার দিকে ছুটে চলেছে। পুলিশের বোটটির গতি এবং প্রপেলারের আওয়াজে কানে তালা লাগার যোগাড়। লন্ডনের আলো ঝলমল তট এখন অদৃশ্য, বাঁদিকে টিলবেরির তটের আলোও পিছনে চলে যাচ্ছে দ্রুত। নদীর মোহনার কাছাকাছি সমুদ্রের দিকে বড় বড় ঢেউ এনিসদের মোটর-বোটের ওপর আঘাতের পর আঘাত হানছে। এখন তাদের ডানদিকে কেন্ট উপকূলকে একটা কালো অবছায়ার মতো দেখাচ্ছে। ধুসর মোটর বোটটি সেই ছায়ার গা ঘেঁষে, উপকূলবর্তী আলোর একদম নিচে দিয়ে প্রায় অদৃশ্যভাবে এগিয়ে চলেছে।

     “ওরা নর্থ ফোরল্যান্ডের দিকে চলেছে, আর তারপর মসগেট বা ডোভারের দক্ষিণ উপকূল ধরে এগোবে”। পুলিশ বোটের ক্যাপ্টেন চেঁচিয়ে ক্যাম্পবেলকে জানিয়ে দিলো, “কিন্তু চিন্তা নেই। মারগেট পৌঁছনোর আগেই ব্যাটাদের ধরে ফেলব”। ধুসর মোটর বোটটি তখন আর সিকি মাইল দূরে, কিন্তু পুলিশের বোট এত দ্রুত এগিয়ে চলেছে যে ব্যবধান প্রতি মুহূর্তে কমে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ বোটের সার্চলাইটের সম্পূর্ণ বৃত্তের মধ্যে চলে এলো ধুসর মোটর বোটটির সমস্ত অংশ। বোটের ওপর চলমান মূর্তি দেখা যেতেই, পুলিশ বোটের ক্যাপ্টেন হাতে মাইক তুলে নিলেন, আর তারপরই দুই বোটের গগন-বিদারক আওয়াজ আর বিক্ষুব্ধ তরঙ্গের গর্জন ছাপিয়ে শোনা গেল ক্যাপ্টেনের হুঁশিয়ারি, “দাঁড়িয়ে পড়, নাহলে গুলি করতে বাধ্য হব”।

     “ওরা শুনবে না”। ক্যাম্পবেল দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “ওরা জানে আমরা গুলি করব না, কারণ ঐ মেয়েটি বোটে আছে”। “দেখা যাবে,” পুলিশের ক্যাপ্টেন বলে উঠলেন, “একটু অপেক্ষা করুন, বদমাইশগুলো তো হাতের মুঠোয়”। বাস্তবিকই দুটো বোটের মধ্যে তখন দূরত্ব মাত্র কয়েকশ ফুট। এনিস এবং ক্যাম্পবেল মোটর বোটের কাঠের খুঁটি ধরে অসীম আগ্রহে চেয়ে আছে ক্রমশ এগিয়ে আসা ধূসর রঙের চন্দ্র দাসের বোটটির দিকে।

     হঠাৎ একটা সাদা রঙের মূর্তি দেখা দিল সেই বোটের উপর। পরিষ্কার বোঝা গেল, সে তাদের দিকেই ইশারা করে হাত নাড়ছে, এবং সেই সঙ্গে তার বোটের গতিবেগ কমে আসছে।

     “ঐ তো, ঐ তো শয়তান চন্দ্র দাস, হাত নেড়ে আত্মসমর্পণ করছে”। এনিস উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, “ওদের নৌকাও দাঁড়িয়ে পড়েছে”।

     “হে ভগবান, সত্যি তো”। ইন্সপেক্টর বলে উঠলেন, “আমাদের বোটকে ওদের একদম পাশে নিয়ে চলো। তারপর ব্যাটার হাতে হাতকড়া পরাবো”।

     পুলিশের বোট যত কাছে এগোতে লাগল, এনিস দেখতে পেল, চন্দ্র দাস এবং তার পাশে দুজন মালয় সঙ্গী হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ঠিক পিছনেই নৌকার ডেকে পড়ে আছে সাদা কাপড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো কিছু অবয়ব। “ঐ ওদের বন্দীদের দেখা যাচ্ছে। বোটটার কাছে নিয়ে চলুন, যাতে আমরা লাফ মেরে ওদের বোটে নামতে পারি”। এনিস বলে উঠল।

     ইন্সপেক্টর এবং এনিস তাদের পিস্তল হাতে নিয়ে সমস্ত পেশি টানটান করে রাখল ওদের বোটে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। ক্রমশ, দুটো বোটের কানা পরস্পরকে স্পর্শ করল, ঘড়ঘড় আওয়াজে ইঞ্জিন দুটো বন্ধ হতে লাগল। কিন্তু ইন্সপেক্টর এবং এনিসের ঝাঁপ দেওয়ার পূর্বমুহূর্তে পরপর সিনেমার মতো কিছু ঘটনা ঘটে গেল।

     বোটের ডেকে পড়ে থাকা দুটো সাদা র‍্যাপার থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এলো অন্য দুই মালয় দস্যু। উন্মত্ত রক্ত-খদ্যোতের মতো, স্প্রিঙলাফ মেরে তারা চলে এলো এনিসদের বোটে। হাতে তাদের উদ্যত ছুরি ঝকঝক করে উঠেছে।

     “এটা একটা চাল”। ক্যাম্পবেল চেঁচিয়ে উঠে দুই মালয়ের দিকে তাক করে পিস্তল ছুঁড়লেন। গুলি ফস্কেছে, কিন্তু মালয়দের ছুরি ফস্কায়নি। শনশন শব্দে একটা শানিত ছুরি ইন্সপেক্টরের আস্তিনে ঢুকে গেল এক লহমায়। বোটে এসেই এক অদ্ভুত শাঁখের মতো চিৎকার করে মালয় গুণ্ডা গুলো যাকে সামনে পেল, তার ওপর ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। “হা ঈশ্বর, এই পাগল খুনিদের থেকে আমাদের বাঁচাও”। কথা শেষ করতে পারলেন না পুলিশ বোটের ক্যাপ্টেন। এক মালয় খুনির ছুরির আঘাতে, তাঁর গলার নলি দু-ফাঁক হয়ে গেল,  সেখান থেকে অনর্গল স্রোতের মত বেরিয়ে এলো গরম রক্ত। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসার আগের মুহূর্তে শুনতে পেলেন, তাঁর পাশেই কেউ ভয়ানক ভাবে কাশতে কাশতে ডেকের ওপর গড়িয়ে পড়ল – মালয় খুনিদের আরও এক হতভাগ্য শিকার।

তৃতীয় অধ্যায়

জলের উপর সুড়ঙ্গ

সার্চলাইটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি, কোমর থেকে নিজের বন্দুক খুলতে খুলতে মালয় দস্যুদের ওপর লাফিয়ে পড়ার উপক্রম করতেই একটা ছুরি মাখনের মতো তাঁর গলার ধমনী চিরে ঢুকে গেল। রক্তবমি করতে করতে সে হতভাগ্য ঘাড় গুঁজেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। এক মালয় ইতিমধ্যে ইন্সপেক্টরকে মেঝেতে ফেলে দিয়ে তাঁর বুকে চেপে বসেছে। তার উদ্যত ছুরি ইন্সপেক্টরের গলায় নেমে আসার মুখে এনিস গুলি চালাল। অব্যর্থ লক্ষ্যে গুলি গিয়ে লাগল সেই দস্যুর দুই ভুরুর ঠিক মাঝখানে। নিস্তেজ ভাবে সে গড়িয়ে পড়ল ক্যাম্পবেলের আহত ভূপতিত শরীরের ওপর থেকে। এদিকে দ্বিতীয় মালয়টি ততক্ষণে এনিসকে পেছন থেকে আক্রমণ শানিয়েছে। এনিস পেছন ফিরে তার আক্রমণকারীর মুখোমুখি হতে গিয়ে একটু দেরী করে ফেলল। সেই ক্ষিপ্র মালয় দস্যুর ছুরি ততক্ষণে এনিসের গাল ছুঁয়ে চলে গেছে – তার মনে হল যেন একটা জ্বলন্ত লোহার শিক যেন তার গালে ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুহূর্তের অসতর্কতায়, সেই পাগল খুনি এনিসকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল বোটের এক কোনে। তার গরম নিঃশ্বাস মুখে লাগছিল এনিসের। বেশ বুঝতে পারল, সেই লিকলিকে ছুরির চকচকে ফলা তার গলায় ঠেকে আছে এবং তার চাপ বেড়েই চলেছে। হটাত উপর্যুপরি দুবার পিস্তলের আওয়াজ শোনার সঙ্গে সঙ্গে এক ঝাঁকুনি দিয়ে ছুরির ফলা এনিসের গলা থেকে সরে এলো। সে ঘাড় কাত করে দেখল, সেই মালয়ের খুনি চোখের তীব্র দৃষ্টি ক্রমে কমে আসছে, কিন্তু তার তেজ তখনও কমেনি। তখনও সে চেষ্টা করে যাচ্ছে, সেই আমেরিকানের গলায় ছুরির ফলাটা আমূল ঢুকিয়ে দেবার জন্য।পেছন থেকে আরও একবার গুলির আওয়াজের পর তার শরীরটা শেষ বারের মতো ঝাঁকানি দিয়ে উঠেই মেঝেতে একটা কাটা কলাগাছের মত পড়ে গেল। এনিস দেখতে পেল, পেছনেই বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ইন্সপেক্টর, আহত, কিন্তু প্রত্যয়ী। পেছন থেকে এই হত্যাকারীকে গুলি করে এনিসের প্রাণ বাঁচিয়েছেন তিনি।

     দুজনে তাদের নিজেদের বোটের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। ইতস্তত ছড়ানো রয়েছে ক্যাপ্টেন এবং তাঁর দুই সঙ্গীর মৃতদেহ। তৃতীয় সঙ্গী, মানে যে হুইল ধরে ছিল, সে তাঁর রক্তাক্ত কাঁধ চেপে গোঙাচ্ছে। এনিসের কি মনে হতে পেছনে তাকালো – চন্দ্র দাসের নৌকা উধাও। বোঝা গেল, এদিকে ধস্তাধস্তির সুযোগে সে, তার দুই মালয় স্যাঙাত তাদের বন্দীদের নিয়ে চম্পট দিয়েছে। দূর দূর অবধি তাদের চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছে না।

     “ক্যাম্পবেল, সে নেই। পালিয়েছে শয়তানগুলো”। এনিস পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল। ইন্সপেক্টরের চোখ তখন রাগে জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো হয়ে আছে, “শয়তান – নিজের দুজন শাগরেদকে অবলীলায় কুরবানি দিলো শুধু একটু পালাবার মতো সময় পাওয়ার জন্য”। চালকের দিকে তাকিয়ে ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, “কি হে? তুমি কি খুব আহত?” “নাহ, শুধু কিছু আঁচড় লেগেছে, কিন্তু পড়ে গিয়ে আমার কাঁধটা প্রায় ভেঙে যাচ্ছিল”। হুইল থেকে জবাব এলো।

     “বেশ, তাহলে নর্থ ফোরল্যান্ডের দিকে মুখ ঘোরাও”। ক্যাম্পবেল নির্দেশ দিলেন, “আমরা হয়ত এখনও ওদের ধরতে পারব”।

     “কিন্তু ক্যাপ্টেন উইলসন এবং বাকিরা মৃত। আমাকে ফিরে গিয়ে রিপোর্ট করতেই হবে স্যার”। চালক প্রতিবাদ করে উঠল।

     “রিপোর্ট পরে করলেও চলবে”। ইন্সপেক্টর ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “যা বলছি করো। আমি সব দায়িত্ব নিচ্ছি”।

     “ঠিক আছে স্যার”। চালক এক লাফে হুইলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

     মিনিট-খানেকের মধ্যে সেই বড় মোটর বোটখানি হুঙ্কার দিয়ে সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলতে লাগল। চন্দ্র দাসের বোটের দেখা দূর দূর অবধি কোথাও নেই ঠিকই, কিন্তু ইন্সপেক্টরদের বোটের সার্চলাইটের তীব্র আলো   নিবিড় তমিস্রাচ্ছন্ন পটভূমিকে ছিন্ন ভিন্ন করতে লাগল তাদের খোঁজে। মার্গেট কে পাশ কাটিয়ে, নর্থ ফোরল্যাণ্ডকে ঘোরার সময় বোঝা গেল, এবার অসীম সমুদ্রের সাথে মোলাকাত হতে চলেছে।

     মৃতদেহ গুলিকে ডেক থেকে সরিয়ে কেবিনের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখার জন্য ক্যাম্পবেল নীচে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর, ডেকে এসে, এনিসের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে দুটি জিনিস বার করে দেখালেন। “এগুলো মালয় দস্যুগুলোর থেকে পেলাম” ক্যাম্পবেল বললেন। ধূসর, ধাতব তারার মতো একটি নকশা এবং তার মধ্যে আটকানো আছে এমন একটি ঝকঝকে রত্ন যার রঙ অস্বাভাবিক ভাবে অচেনা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মানুষের চোখ এরকম রং কখনো দেখেনি, যেন পৃথিবীর বাইরে থেকে নিয়ে আসা হয়েছে এই অদ্ভুতদর্শন পাথরকে।

     “হলফ করে বলতে পারি, পৃথিবীতে এই রঙ সম্পূর্ণ অপরিচিত”। ক্যাম্পবেল বলে চললেন, “আমার বিশ্বাস, এই রত্নগুলো ঐ রহস্যময় দরজার ওধার থেকেই আমদানি করা হয়েছে। আর এগুলো দিয়ে বানানো হয়েছে এই ভ্রাতৃসঙ্ঘের ব্যাজ”।

     সারেঙ স্টুয়ার্ট চেঁচিয়ে বলল, “নর্থ ফোরল্যাণ্ড ঘুরে ফেলেছি স্যার”। ক্যাম্পবেল গর্জন করে উঠলেন, “উপকূল বরাবর সোজা দক্ষিণে চলো। ব্যাটারা এদিকেই গেছে, সেই  সংঘের  জমায়েতে- খুব স্বাভাবিক ভাবেই ভাবতে ভাবতে গেছে যে আপদ বিদেয় হয়েছে”।

     “আমাদের বোটটা এসব বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে চলার জন্য মোটেই উপযুক্ত নয় স্যার, তবু আমি চেষ্টা করছি”। সারেঙ এর গলা শোনা গেল।

     মসগেটের আলোকে ডাইনে রেখে, তাদের বোট উপকূল বরাবর দক্ষিণদিকে এগিয়ে চলল। এদিকে খাঁড়ি অনেক চওড়া, তাই বিধ্বংসী ঢেউ গুলো একবার বোটকে ধাক্কা মেরে উপরে তুলে দিচ্ছে, পরমুহূর্তেই একদম খাড়া নিচে নেমে আসছে। ঢেউ এর প্রবল ধাক্কায় মোটর বোটটিকে মনে হচ্ছে একটা মোচার খোলা, অসহায় ভাবে ঢেউ এর ওপর নেচে চলা ছাড়া তার যেন নিজের কোন ইচ্ছে নেই। এনিস বিপদজনক ভাবে বোটের সামনের অংশ ধরে ঝুলে, এক হাতে সার্চ লাইটটিকে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে সেই গভীর অন্ধকার ভেদ করে চন্দ্র দাসের সন্ধান পাওয়ার বিফল চেষ্টা করে যাচ্ছিল। এদিকে জলোচ্ছ্বাস ক্রমশ বেড়েই চলেছে, নৌকার চারপাশে ভাঙা ঢেউ এর ফেনা একরাশ ঝকঝকে দাঁতের সারির মতোই তার পাশে পাশে ভেসে চলেছে।

     আকাশে গুড়গুড় ধ্বনি শোনা গেল, “সামুদ্রিক ঝড় আসছে,” সারেঙ স্টুয়ার্টের হুঁশিয়ারি ভেসে এলো, “এখানে ঝড়ের পাল্লায় পড়লে আমরা গেছি”।

     “আমাদের এগোতেই হবে যে করেই হোক”, এনিস একগুঁয়ে ভাবে চীৎকার করে বলে উঠল, “ওদের ধরতেই হবে”। 

     উপকূলের ডানদিকে এখন এক খাড়া পাথরের দেওয়াল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই পাথরের স্তম্ভে এখানে সেখানে এবড়ো খেবড়ো পাথরের ফলা বিপদজনক ভাবে বেরিয়ে রয়েছে। এনিসদের বোট উন্মত্ত ঢেউ এর মাথায় একটা কাগজের ভেলার মতো ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলেছে সেই দেওয়ালের পাশ দিয়েই। স্টুয়ার্টের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে, বোটের মুখকে কোনভাবে দেওয়াল থেকে দূরে রাখতে গিয়ে। এক একটা ঢেউ ভয়ানক ভাবে ধাক্কা মেরে পলকা বোটটিকে খেলনার মতো এক একবার দেওয়ালের এমন কাছে নিয়ে যাচ্ছে, যেন মনে হচ্ছে এখুনি সংঘর্ষ হয় হয়।

     আকাশের গুরুগুরু শব্দ এখন বাতাসের তীক্ষ্ণ চিৎকারে পর্যবসিত হয়েছে। প্রলয়ের আগমনী বার্তা হিসাবে এক ঝোড়ো হাওয়ার প্রবল ঝাপটা এসে সেই উত্তাল সমুদ্রকে আরও মাতাল করে দিল। কালো কালো ঢেউ এর বিরাট বিরাট পাহাড় যেন ভেঙে পড়ছে সেই মোটর বোটের উপর, আকাশে চমকে উঠছে মত্ত প্রভঞ্জন – আরোহীরা সবাই হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই আঁকড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই মহাপ্রলয়ের সাথে যুঝবার জন্য। প্রকৃতির এই রূপ তাদের হতবুদ্ধি করে দিয়েছে, এবং প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া ছাড়া আর তাদের এখন আর কোন কাজ নেই।

     “ঐ তো ওদিকে, বোটের আলো দেখা যাচ্ছে” এনিস চিৎকার করে উঠল, “ঐ যে, পাথরের দেওয়ালটার দিকেই চলেছে”।

     এনিসের দৃষ্টি অনুসরণ করে, সেই অন্ধকার এবং জলের প্রবল ঝাপটার মধ্যে প্রায় অন্ধত্বের মধ্যে, বাকি দুজন দেখতে পেলেন, একটি মোটর বোটের ক্ষীণ আলো তীব্র গতিতে এগিয়ে চলেছে সেই পাথুরে দেওয়ালের দিকে। হটাত সেটি মিলিয়ে গেল – যেন কেউ গিলে ফেলল সেটিকে।

     “নিশ্চয়ই ওখানে একটা গুপ্ত পথ আছে, বা একটা বন্দর গোছের কিছু থাকাও অসম্ভব নয়”।  ক্যাম্পবেল বলে উঠলেন, “কিন্তু এটা চন্দ্র দাসের বোট কি করে হতে পারে, সে বোটে তো কোন আলো ছিল না”।

     “তাহলে এই সঙ্ঘের অন্য কোন সদস্যের হতে পারে। সেও হয়ত চলেছে এই জমায়েতে যোগ দিতে। আমাদের খোঁজ নিয়ে দেখা উচিত”। এনিস উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল।

     স্টুয়ার্ট, জলের বিপুল ঝাপটার মধ্যে চেঁচিয়ে বলে উঠল, “পাহাড়ের এই সব খাঁজে এরকম অনেক জল গুহা আছে। কিন্তু সেগুলোতে কিছু আছে বলে তো মনে হয়না”।

     “দেখা যাবে”। ক্যাম্পবেল নির্দেশ দিলেন, “আপাতত সোজা ওই খাড়া চুড়ো লক্ষ্য করে চলতে থাকো যেখানে ঐ নৌকাটা অদৃশ্য হয়ে গেল”।

     “কিন্তু স্যার, যদি কিছু না পাওয়া যায়, ঐ খোঁচা খোঁচা পাথরে ধাক্কা লেগে আমাদের সলিল সমাধি কেউ আটকাতে পারবে না”। সারেঙ মৃদু প্রতিবাদ জানালো।

     “আমি বাজি ধরে বলতে পারি ওখানে কিছু আছে। এখন সময় নষ্ট না করে চলতে থাকো”। ইন্সপেক্টর অ-সহিষ্ণু ভাবে বলে উঠলেন।

     “যো হুকুম স্যার”। স্টুয়ার্ট ভাবলেশহীন ভাবে বলে উঠে শক্ত হাতে নৌকার হাল ধরে দাঁড়াল।

     যে মুহূর্তে নৌকার মুখ ঘুরল, তখনি ভীম-বেগে সমুদ্র তাদের টেনে নিয়ে চলল সেই পাহাড়ের এবড়ো খেবড়ো শরীরের দিকে। বিপুল তরঙ্গের স্রোতে নিয়ন্ত্রণ-হীন বোট ছুটে লক্ষ অশ্বের বেগে ছুটে চলল সেই করাল কালো ভীষণ প্রাকারের দিকে। নৌকার সামনের তীব্র সার্চলাইট সেই নিবিড় অন্ধকারের মধ্যে যেন ছুরির মতো গেঁথে আছে। সেই আলোতে ক্রমে স্পষ্ট হতে লাগল পাহাড়ের প্রত্যেকটা খাঁজ। এমনকি কিছুক্ষণ পরে আরোহীরা ভয়ার্ত-ভাবে লক্ষ্য করলেন, নৌকা সেই পাথরের দেওয়ালের বড্ড কাছে এসে পড়েছে, এবং এতই কাছে যে, দেওয়ালের অমসৃণ খাঁজে লেগে ভেঙে যাওয়া ঢেউয়ের সাদা ফেনার প্রত্যাবর্তন অবধি প্রত্যক্ষ করতে পারছেন তাঁরা।

     স্টুয়ার্টের ভয়চকিত কণ্ঠ শোনা গেল, “স্যার, কোন গুহা কিন্তু চোখে পড়ছে না। যে কোন মুহূর্তে ধাক্কা লাগতে পারে দেওয়ালের সাথে”। – তার মুখে মৃত্যুর ছায়া।

     “বাঁদিকে, বাঁদিকে” ক্যাম্পবেল ভয়ানক জলোচ্ছ্বাস এবং তুফানের আওয়াজ ছাপিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “একটা রন্ধ্র দেখা যাচ্ছে”।

     এবার এনিসের চোখেও পড়ল সেটা –  ধনুকের মতো বাঁকা এক গুহামুখ যেটা দারুণভাবে একটা পাথরের আড়ালের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। স্টুয়ার্ট কাল-বিলম্ব না করে প্রাণপণে নৌকার মুখ সেদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু স্টিয়ারিঙের ওপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। উন্মত্ত তরঙ্গ সেই নৌকাকে একটা শোলার টুকরোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে নিজের গতির অভিমুখে।

     ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে, নৌকা এগিয়ে চলেছে সেই গুহামুখ লক্ষ্য করেই। কিন্তু এনিস চোখের আন্দাজে বুঝতে পারল, যেভাবে তেরচা করে তাদের নৌকা ভেসে চলেছে, তাতে গুহার মুখে সংঘর্ষ অনিবার্য। নৌকা আরো এগোতেই ভয়ে এনিস চোখ বন্ধ করে ফেলল – এই বুঝি শুনতে পেল পাথরের সাথে কাঠের টক্করের মড়মড় আওয়াজ।

     কিন্তু সেরকম কিছুই কানে এলো না। উল্টে ক্যাম্পবেলের উচ্ছ্বাস শুনে চোখ খুলে দেখতে পেল, তাদের নৌকা সেই বিশাল গুহার মধ্যে বিপুল গতিতে এগিয়ে চলেছে, চারপাশে পাথরের খাঁজের মধ্যে তৈরি হওয়া এক সুড়ঙ্গপথ দিয়ে। এই সুড়ঙ্গ সেই কালো পাথরের প্রাচীরের মধ্যেই প্রাকৃতিক কারণে তৈরি হওয়া এক আশ্চর্য জায়গা। মাথার উপর প্রায় চল্লিশ ফুট উঁচু পাথরের ছাদ। বাইরে বিপুল জলোচ্ছ্বাস এবং মত্ত মাতন পেরিয়ে এই গুহার ভেতর যেন অপরিসীম শান্তি, কোন শব্দ নেই, নিঃসীম স্তব্ধতার মধ্যে নৌকা তার তিন আরোহীকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে স্রোতের অভিমুখে গা ভাসিয়ে। মাঝে মাঝে সার্চলাইটের আলোতে দেখা যাচ্ছে কালো পাথরের বাঁক, কিন্তু সেটা পেরিয়েই নৌকা আবার ঢুকে পড়ছে এক নতুন অজানা পথে, এক সম্পূর্ণ নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে।

     “উফফফ, জোর বেঁচেছি”। উচ্ছ্বসিত ইনস্পেকটর বলে উঠলেন। “এনিস, মনে হচ্ছে সেই গুপ্ত জমায়েত স্থান আমরা খুঁজে পেয়েছি। যে নৌকাটাকে অদৃশ্য হতে দেখলাম, সে ব্যাটা এখানেই আশে পাশে কোথাও আছে। তাহলে ঐ শয়তান চন্দ্র দাসও আছে, সঙ্গে আপনার স্ত্রী”।

     বন্দুকের বাঁটে এনিসের আঙুল শক্ত হয়ে চেপে বসল, “যদি তাই হয়, শুধু একবার ওদের সামনে পেলে……”।

     “মাথা ঠাণ্ডা রাখুন”। ইনস্পেকটর শান্তভাবে বলে উঠলেন, “নিশ্চয়ই সঙ্ঘের সব সভ্যেরাই এখানে থাকবে। সবার সাথে যুদ্ধ করা বাতুলতা ছাড়া কিছু না”।

     নিজের মনেই কথাগুলো বলতে বলতে, কি ভেবে ইন্সপেক্টরের চোখ জ্বলে উঠল। তিনি তাড়াতাড়ি সেই রত্নখচিত ব্যাজগুলো পকেট থেকে বের করলেন, “এই তো, হয়েছে। এই গুলো লাগিয়ে নেবো, তাহলেই আমরা সঙ্ঘের সভ্যের ভান করে ঢুকে যেতে পারব সেখানে – মোটামুটি আপনার স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার মতো সময় পাওয়া যাবে আশা করি”।

     “কিন্তু ঐ চন্দ্র দাসও তো ওখানে থাকবে, সে যদি আমাদের চিনে ফেলে” –

     “ক্যাম্পবেল কাঁধ ঝাঁকাল, “এটুকু চান্স তো নিতেই হবে। আর কোন রাস্তা নেই”।

     নৌকা স্রোতের টানে এগিয়ে চলেছে মোড়ের পর মোড় ঘুরে, স্টুয়ার্ট পাকা হাতে ইঞ্জিনকে চালিয়ে নৌকার অভিমুখ ঠিক রাখতে রাখতে চলেছে। এদিকে এনিস আর ক্যাম্পবেল মিলে, “পুলিশ” লেখা রিবন ছিঁড়ে ফেললেন নৌকার গা থেকে, তাছাড়া এমন সমস্ত প্রমাণ লোপাট করলেন, যেগুলো থেকে বোঝা যেতে পারে যে ওটা একটা পুলিশ বোট।

     হঠাৎ নৌকার সার্চলাইটের আলো নিভে গেল। অন্ধকারের মধ্যে স্টুয়ার্টের চাপা গলা শোনা গেল, “স্যার, একটা আলো দেখা যাচ্ছে”।

     পরের বাঁকেই আলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। একটা অদ্ভুত ধরনের উজ্জ্বল কিন্তু নরম আলোয় ভেসে যাচ্ছে সুড়ঙ্গের ঐ অংশটি।

     “সাবধান” ক্যাম্পবেল হুঁশিয়ারির সুরে বলে উঠলেন, “স্টুয়ার্ট, আমাদের যেতে হবে। যাই ঘটুক না কেন, তুমি নৌকাতেই থাকবে। ইঞ্জিন চালু রাখো এবং প্রস্তুত থাকো যে কোন মুহূর্তে চট করে পালাবার জন্য”।

     স্টুয়ার্টের ভাবলেশহীন মুখ যেন একটু ফ্যাকাসে মেরে গেল, কিন্তু সে টানটান ভাবে স্টিয়ারিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল, যেন তার মনের ভয় মুখে না প্রকাশ পেয়ে যায়।

     পরের বাঁক নিতেই এক আলোকোদ্ভাসিত গুহামুখে প্রবেশ করল তাদের নৌকা। সেই নরম অপার্থিব আলোয় চারদিকে উজ্জ্বল হয়ে আছে, কিন্তু সেই আলোয় যা দেখা গেল, তাতে আরোহীদের চোখ ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম হোল।

     সেই বিরাট গুহার মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে সারি সারি সমুদ্র যাত্রার উপযোগী শক্তিশালী বোট, জাহাজ, স্পীড-বোট, বজরা ইত্যাদি – প্রত্যেকটি জলযান অত্যন্ত উন্নতমানের, অত্যাধুনিক সজ্জায় সজ্জিত। এক একটা জলপোত এতটাই বড়, যে তাদের পুরোটা সেই গুহায় ঢুকতেও পারেনি। বড় বড় মাস্তুল-ওয়ালা জাহাজগুলি তাদের মাস্তুল নামিয়ে সেই জল-গুহার মধ্যে প্রবেশ করেছে।  এনিস দেখতে পেল, জলপোতের ভিড়ের মধ্যে চন্দ্র দাসের সেই ধূসর রঙের স্পীড-বোটটিও দাঁড়িয়ে রয়েছে। গুহার মধ্যে সেই তাজ্জব বন্দরের একদিকে একটি পাথরের তাক বেরিয়ে এসেছে যেখান দিয়ে ভেতরে প্রবেশের একটি পথ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হোল, এত জলযানের সারি থাকলেও সেখানে জন-মনিষ্যির দেখা নেই। তাছাড়া চারিদিকে তাকিয়েও সেই সাদা নরম উজ্জ্বল অদ্ভুত আলোর উৎস কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না।

     “দেখে মনে হচ্ছে দুনিয়ার প্রতিটি প্রান্ত থেকে এগুলো এখানে জড়ো হয়েছে”। বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, “সেই ভ্রাতৃসঙ্ঘের জমায়েত এখানেই হয়েছে। আমরা খুঁজে বের করেছি সেই গোপন জায়গা”।

     “কিন্তু তারা কোথায়? কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না”। এনিস বলে উঠল।

     “খুব শিগগিরি দেখা পাবো তাদের”। ইন্সপেক্টর বলে উঠলেন, “স্টুয়ার্ট, নৌকার মুখ ঐ পাথরের খাঁজের দিকে ঘোরাও, আমরা ওদিকেই নামবো”।

     নৌকা পাড়ে লাগতেই ইন্সপেক্টর এবং এনিস লাফিয়ে নেমে পড়লেন। স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই ক্যাম্পবেল হাঁটু গেড়ে বসে আগে চারপাশ দেখে নিলেন, কিন্তু জনপ্রাণী দেখা গেল না। তাঁরা যেন পৃথিবীর বাইরে কোথাও এসে পড়েছেন। সেই বিরাট সুড়ঙ্গ গুহা, তাতে অসাধারণ এক আলো, এত জলযানের সারি, কিন্তু একটিও মানুষ নেই – চারদিকে বিরাজ করছে এক হিমশীতল নিস্তব্ধতা। এ কিরকম যেন অস্বস্তিকর, ভূতুড়ে। 

     “আমার পিছনে আসুন”, ক্যাম্পবেল চাপা গলায় বলে উঠলেন, “এখানেই আশে পাশে কোথাও আছে সবাই”।

     কিছুটা এগিয়ে, এনিস দাঁড়িয়ে পড়ে ফিসফিস করে বলল, “ইন্সপেক্টর, শুনতে পাচ্ছেন?“

     পাথরের দেওয়াল ভেদ করে অস্পষ্ট শোনা গেল, অনেকগুলো গলায় সুর করে যেন কিছু বলা হচ্ছে – যেন একটা স্তোত্র পাঠ চলছে ভেতরে। হঠাৎ, তাদের পেছনে একটা পাথরের দেওয়াল ঘড়ঘড় শব্দে  সরে গেল, যেন কব্জার ওপরে বসানো দরজা। সেদিকে তাকিয়ে একটা মানুষ প্রমাণ আলোকোজ্জ্বল রাস্তা দেখা গেল, আর সেই পথের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই দৈত্যাকার লোক। তাদের পরনে এক বিশেষ কাপড়ে তৈরি ধূসর রঙের ঢিলেঢালা আলখাল্লা এবং একই রঙের মুখঢাকা আবরণ, যা তারা তাদের পোশাকের ওপর পরে আছে। সেই মুখোশের চোখ এবং ঠোটের কাছটা শুধু কাটা।কিন্তু দুজনেরই বুকে শোভা পাচ্ছে, সেই উজ্জ্বল রত্নখচিত ব্যাজ।

     সেই মুখোশের ছাঁদার মধ্যে দিয়ে তাকিয়েই তারা ক্যাম্পবেল দের জরিপ করে ফেলল। এনিসের বুকে ততক্ষণে হাতুড়ির ঘা পড়ছে, হঠাৎ করে এদের আবির্ভাবে ইন্সপেক্টরও হকচকিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। “আপনারা কি দুয়ারের ভ্রাতৃসঙ্ঘের সদস্য” মাপা গলায় মংগোলিয়ান উচ্চারণে জিজ্ঞাসা করল একজন। ইন্সপেক্টরের গলা নিরস, উত্তেজনাহীন, “আমরা ভাতৃসঙ্ঘের পক্ষ থেকেই এসেছি”।

     “তাহলে সঙ্ঘের ব্যাজ পরেননি কেন?”

     উত্তরে ইনস্পেকটর পকেট থেকে ব্যাজটা বার করে কলারের নিচে লাগিয়ে নিলেন। দেখাদেখি এনিসও তাই করল।

     “আসুন ভ্রাতৃবৃন্দ, আপনাদের স্বাগত”। এই বলে সেই দুই মূর্তি সরে দাঁড়িয়ে জায়গা করে দিল ওদের যাওয়ার। দরজা পেরিয়ে ঢোকামাত্র একজন বলে উঠল, “আপনারা অনেক দেরি করে ফেলেছেন। এখনি গিয়ে আপনাদের সংরক্ষিত আলখাল্লা নিয়ে পরে ফেলুন। অনুষ্ঠান এখুনি শুরু হল বলে”।

     ক্যাম্পবেল কিছু না বলে মাথাটা একদিকে হেলিয়েই হনহন করে হাঁটা লাগালেন, পেছনে এনিস। দুই দ্বাররক্ষীর চোখের আড়াল হতেই, এনিস ইনস্পেকটরের হাত খামচে ধরল, “ইনস্পেকটর, কি বলল শুনলেন তো। অনুষ্ঠান একটু পরেই শুরু হতে চলেছে। আমাদের যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে”।

     “চেষ্টা করছি,” ক্যাম্পবেল তাড়াতাড়ি বলে চললেন, “দেখুন আমার মনে হয় এই আলখাল্লাটা সকলের পরা বাধ্যতামূলক। আর এতে একটা মস্ত সুবিধা এই যে, মুখ দেখতে পাবার বালাই নেই। তাই চন্দ্র দাস আমাদের দেখলেও চট করে চিনতে পারবে বলে মনে হয় না”।

     সুড়ঙ্গটি হঠাৎ এক-জায়গায় একটি চওড়া অংশে গিয়ে মিশে গেছে। সেখানে দেখা গেল বেশ কিছু আলখাল্লা পরিহিত সভ্যেরা ঘোরাফেরা করছে। দু তিনজন আলখাল্লা এবং মুখোশ পরা মূর্তি একটি কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে তাক থেকে নতুন পোশাক নামিয়ে সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করছে। কিছু প্রাচ্যদেশীয় সভ্য যারা তাদের মতোই কিছুক্ষণ আগে প্রবেশ করেছে এই গুহায়, তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই পোষাকের জন্য।

     পোশাক হাতে পেয়েই সেই সভ্যেরা চটপট সেটাকে পরে ফেলল এবং অন্য এক সুড়ঙ্গ পথে নেমে গেল।

     দেখাদেখি, এনিস আর ক্যাম্পবেলও গিয়ে দাঁড়ালেন সেই কাউন্টারের সামনে এবং হাত পাতলেন পোশাকের জন্য। দুজন আলখাল্লা পরিহিত মূর্তি তাদের দিকে দুটো পোশাক বাড়িয়ে দিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে, তৃতীয় মূর্তি তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আধ-ডজন মূর্তি তাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল কিছু বুঝে ওঠার আগেই। নিমিষের মধ্যে কিছু হাত এসে এনিস আর ক্যাম্পবেলের গলা টিপে ধরল, এবং কিছু হাত ওদের এমন ভাবে বেঁধে ফেলল যে ওদের আর নড়বার উপায় রইল না। চোখ তুলে দেখতে পেল, অন্তত চারখানা পিস্তল তাদের দিকে তাক করা রয়েছে।

     আশাভঙ্গের হতাশায় ইনস্পেকটর এবং এনিস তাকিয়ে দেখল, সেই চিৎকার করে ওঠা আলখাল্লা, তার মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে ফেলেছে – এবং সেই মুখোশের তলা থেকে বেরিয়ে এলো           ঘৃণায় কালো হয়ে ওঠা, চন্দ্র দাসের মুখ।

চতুর্থ অধ্যায়

খিলান – গুহা

“ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম যে তোরা হয়ত আমার লোকেদের ছুরির আঘাত বাঁচিয়ে পালাতে পেরেছিস।কিন্তু তারপরেও আমাদের পিছু ছাড়তে পারিস নি”। চন্দ্র দাসের গমগমে গলায় ঘৃণার সাথে অসীম তাচ্ছিল্য ঝরে পড়ল, “তোদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম গাধার দল, দেখছিলাম কখন তোরা আসিস”।

     “এদের তল্লাশি নাও”, আর একটা মুখোশ-ধারীকে আদেশ দিলো চন্দ্র দাস, “যা কিছু অস্ত্রের মতো মনে হবে, সব বাজেয়াপ্ত করো”।

     এনিস শূন্যদৃষ্টিতে হতবাক হয়ে রইল যতক্ষণ সেই মুখোশ-ধারীরা তাদের দুজনের খানাতল্লাশি চালাচ্ছিল। প্রতিবার তার রুথ কে উদ্ধারের আশার ফানুস এভাবে অন্তিম মুহূর্তে ফেটে যাওয়াটা তার পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠছিল।

     এনিস আর ক্যাম্পবেলকে তল্লাশি করে দুটি পিস্তল আগেই কেড়ে নেওয়া হয়ে গেছিল, সঙ্গে এবার গেল ইন্সপেক্টরের পুরনো আমলের সোনার ঘড়ির চেন এর সাথে লেগে থাকা ছোট ছুরিটাও। অসহায় এনিস দেখতে পেল, ওদের থেকে কেড়ে নেওয়া পিস্তল এখন উল্টে ওদের দিকেই তাক করা।

     চন্দ্র দাস বেশ সন্তুষ্ট হয়ে তার বন্দীদের দিকে তাকিয়ে রইল। এনিস খেয়াল করল, অন্যান্য মুখোশ-ধারীর থেকে চন্দ্র দাসের আলখাল্লা যেন একটু আলাদা। চন্দ্র দাসের বুকের ব্যাজে দুটি তারা ঝকমক করছে, যেখানে বাকিদের মাত্র একটি।

     এনিসের দৃষ্টি এবার চন্দ্র দাসের মুখের ওপর স্থির হোল, “রুথ কোথায়?”, তার আপাত শান্ত গলা এবার তীক্ষ্ণ চিৎকারে পর্যবসিত হোল, “ওড়ে পাষণ্ড, শয়তান, আমার স্ত্রীকে কথায় রেখেছিস?”

     “তিষ্ঠ, তিষ্ঠ” শীতল গলায় বলে উঠল চন্দ্র দাস, “খুব শিগগিরি তুই তোর বৌ এর দেখা পাবি, আর তার সাথে দরজার ওধারেও যাবি, আমাদের বন্দী হিসাবে। তবে এরকম ব্যাপার বড় একটা ঘটে না। বলির বন্দী ধরে আনার জন্য আমাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। এখানে তো বন্দী যেচে ফাঁদে পা দিয়েছে”।

     চন্দ্র দাসের ইশারায় দুই পিস্তল-ধারী এখন এনিসদের সামনে থেকে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

     “এবার খিলান গুহার দিকে যেতে হবে যে”। সেই হিন্দু বলে উঠল, “ইন্সপেক্টর ক্যাম্পবেল, আপনার বুদ্ধি এবং উদ্যমের প্রশংসা করতেই হয়। কিন্তু আর আপনার জারিজুরি খাটবে না। যদি পালাবার কোন চেষ্টা করেছেন, তাহলে পেছন থেকে আসা বুলেটে আপনার হৃৎপিণ্ড ফুটো হয়ে যাবে। তাই চুপচাপ এগোতে থাকুন”। চন্দ্র দাসের গলায় রসিকতা শোনা গেল, “ব্যাপারটা খুব সোজা। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। কিন্তু একবার এই বন্দুক কথা বললেই সব আশায় জলাঞ্জলি”।

     পিছনের বন্দুকধারীদের ধাক্কায়, ওরা এগিয়ে চলল একটা সরু সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে। চন্দ্র দাস আগে আগে এগিয়ে চলেছে। এনিস একবার ক্যাম্পবেলের মুখের দিকে তাকাল – সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন সেই মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তাঁর মনের মধ্যে কি ঝড় বয়ে চলেছে। এনিস স্পষ্ট বুঝতে পারল, ইন্সপেক্টরের মাথার মধ্যে প্ল্যানের পর প্ল্যান খেলছে, কিভাবে এই বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

     সুড়ঙ্গটা একটু নিচের দিকে নেমে তারপর সোজা চলে গেছে সামনের দিকে। লম্বা একটা গুহা-পথ, যার দুপাশের দেওয়াল অদ্ভুতভাবে মসৃণ, এবং সেখানে অনেক কিছু খোদাই করা। এনিসদের কাছে অত সময় ছিল না সেগুলো ভালো করে খেয়াল করার কিন্তু বোঝা গেল সেখানে অজানা ভাষায় অনেক কিছু লেখা রয়েছে।

     “হে ভগবান! মনে হচ্ছে ইজিপ্সিয়ান হায়ারোগ্লিফিক্স এর মত কিছু দেখতে পাচ্ছি”। ক্যাম্পবেল বিড়বিড় করে উঠলেন।

     “চন্দ্র দাসের শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “প্রি-ইজিপ্সিয়ান লেখাও আছে ইনস্পেকটর। এমন অনেক লেখা আছে যে সব ভাষা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে চিরকালের জন্য। তখন ইজিপ্ট সভ্যতার জন্মই হয়নি। ইজিপ্ট, রোমান, এই সব সভ্যতা পৃথিবীর আলো দেখার বহুযুগ আগে থেকেই এই দুয়ারের ভ্রাতৃসঙ্ঘের অস্তিত্ব ছিল, এবং সেই প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকেই এইখানে, এই গোপন গুহার মধ্যেই খিলানের ওধারের অধিবাসীদের আরাধনা করা হয়ে আসছে”।

     চন্দ্র দাসের গলায় এমন একটা কিছু ছিল, যা এনিসের শরীরে একটা কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। সেটা সুড়ঙ্গের ভেতরের শীতলতার জন্য নয়, কিছু একটা অজানা অপার্থিব আতঙ্কের চেতনা যা চন্দ্র দাসের মধ্যে দিয়ে তার মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছিল।

     “শুনতে পাচ্ছ আমাদের মাথার ওপর সমুদ্রের গর্জন? এই খিলান গুহার অবস্থান উপকূল থেকে কয়েকশো যোজন দূরে এবং সমুদ্রের তলদেশের ঠিক নিচে”। চন্দ্র দাসের উচ্ছ্বসিত গলা ভেসে এলো।

     আলোকিত সুড়ঙ্গপথের শেষে নতুন গুহা-পথ শুরু হচ্ছে, কিন্তু সেখানে কোন আলো নেই। যেন এক অন্ধকার হাঁ করে গ্রাস করতে চলেছে তাদের। মাথার ওপর সমুদ্রের গুমগুম ধ্বনি ছাপিয়ে কানে আসছে সমবেতভাবে উচ্চারিত গীত, যা তারা আগেও শুনেছে সেই গুহা-বন্দর দিয়ে ঢোকার সময়। এখানে সেই আওয়াজ অনেক স্পষ্ট এবং গমগমে। চন্দ্র দাসের চলার গতি বেড়ে গেল।

     হঠাৎ ইন্সপেক্টর কিছুতে যেন হোঁচট পড়ে গেলেন। নিমেষের মধ্যে চন্দ্র দাস এবং দুই শাগরেদ মুখোশ-ধারী ছুটে এলো ইন্সপেক্টরের দিকে। দুটি পিস্তল তাক করে ভয়ানক কণ্ঠে চন্দ্র দাস বলে উঠল, “কোন চালাকি নয় ইনস্পেকটর – এখানে ওসব কায়দাবাজি খাটবে না”।

     “আরে, কি পিচ্ছিল পথ। পা হড়কেছে, আমি কিছু করিনি”। ইন্সপেক্টর অনুযোগ জানালেন।

     “আর একবার – শুধু আর একবার এরকম হলে, একটা গরম বুলেট মেরুদণ্ড ফুঁড়ে দেবে, এটা মনে থাকে যেন”। চন্দ্র দাস বলে উঠল, “নিন, এবার চলুন”।

     সুড়ঙ্গ এবার হঠাৎ বাঁক নিয়েছে দু তিনটে। একটার পর একটা বাঁক ঘোরার সময় এনিসের চোখ ক্যাম্পবেলের হাতের দিকে যেতেই একটা আশার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সুড়ঙ্গের মৃদু আলোয় একবার ঝলসে উঠল ক্যাম্পবেলের হাতে ধরা সেই জুতোর হিলের ছুরিটা। সে বুঝতে পারল, হোঁচট খাওয়ার নাম করে ক্যাম্পবেল ছুরিটা হস্তগত করেছেন। এবার ইন্সপেক্টর একটু কাছে ঘেঁষে এলেন এনিসের, ফিসফিস করে কেটে কেটে বললেন, “প্রস্তুত থাকুন – ওদের ওপর – ঝাঁপানোর জন্য” –

     “কিন্তু কিভাবে? আপনি কিছু করলেই তো গুলি করবে – “

     ক্যাম্পবেল কোন কথা বললেন না, কিন্তু এনিস বুঝতে পারল ইন্সপেক্টরের শরীর টানটান হয়ে আছে। আর একটা বাঁকের মুখে এসে পড়ল তারা। সেই সমবেত কণ্ঠে সঙ্গীত এবার খুব কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে।

     বাঁকটা ঘোরার মুখেই লহমায় ঘটনা গুলো ঘটতে থাকল।

     হঠাৎ একটা লাটিমের মতো ক্যাম্পবেল একপাক ঘুরে গেলেন, আর কারুর কিছু কিছু বোঝার আগেই তাঁর হাতের শানিত ছুরি গিয়ে পড়ল পেছনের মুখোশ-ধারীর ওপর। দুটি গুলির নির্ঘোষ শোনা গেল, খুব কাছ থেকে। প্রায় ইন্সপেক্টরের পেটের কাছে ফায়ার হোল, তাঁর শরীরটা একবার কেঁপে উঠল কিন্তু তিনি পড়লেন না। বরং বিদ্যুৎ-গতিতে তাঁর ছুরি সেই মুখোশ-ধারীর গলায় বসে গেল। ছুরির আঘাতে এক মুখোশ-ধারী গড়িয়ে পড়তেই ইনস্পেকটর আরেক জনের দিকে ছুটে গেলেন। এনিস দেখল এই সুযোগ। সেও বিপুল উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ল চন্দ্র দাসের ওপর। কিন্তু এক ধাক্কায় তাকে মাটিতে ফেলার পর সে বুঝতে পারল এই লোকটি কি অমিত-শক্তিশালী। মাটিতে ফেলে এনিস তাঁর বুকের ওপর চেপে বসার আগেই সে এক ঝটকায় সেই আমেরিকানকে ফেলে লাফিয়ে উঠে পড়ল। তার চোখ তখন অঙ্গারের মত ধকধক করে জ্বলছে। এখুনি সে বাঘের মতো লাফিয়ে পড়বে এনিসের ওপর।

     এনিস যখন অপেক্ষা করছে প্রতি-আক্রমণের জন্য, তখনি মনে হোল চন্দ্র দাসের উদ্যত শরীরটা মুচড়ে উঠল। গলা দিয়ে একটা অব্যক্ত শব্দ করে খাবি খেতে খেতে চন্দ্র দাসের প্রাণহীন দেহ সশব্দে ভূপতিত হোল এনিসের পাশে। দেখা গেল, ইন্সপেক্টরের শানিত ছুরি তাঁর পিঠে আমূল বেঁধা। এক টানে ছুরিটা খুলে ক্যাম্পবেল সেটা জুতোয় লাগিয়ে নিলেন।

     “আপনার গুলি লেগেছে ক্যাম্পবেল। আপনি সাংঘাতিক আহত”। এনিস উৎকণ্ঠিত ভাবে বলে উঠল।

     “সেরকম কিছু না”। ক্যাম্পবেলের মুখে শুকনো হাসি দেখা দিল, “চন্দ্র দাসের জানার কথা নয়, আমার জামার ভেতরে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরা ছিল। যাইহোক, আমাদের এখানে বেশিক্ষণ থাকা নিরাপদ নয়। এইসব মৃতদেহ গুলোকেও সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যে কোন মুহূর্তে কেউ এসে পড়তে পারে”।

     এনিস হঠাৎ কান খাড়া করে কিছু শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল। ক্যাম্পবেলের দিকে তাকিয়ে বলল,

     “ইনস্পেকটর, শুনতে পাচ্ছেন?”

     এতক্ষণে সেই সঙ্গীতের সুরে পরিবর্তন এসেছে। এবার অনেকগুলো কণ্ঠ একসাথে গর্জন করে উঠছে কীসের এক অজানা আহ্বানে। সেই অদ্ভুত গানের সুর একবার চড়ায় উঠছে, তারপর নেমে আসছে একদম খাদে।

     “ক্যাম্পবেল, অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। এনিস কম্পিত-কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, “রুথ”।

     ডিটেকটিভ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে সুড়ঙ্গের এক অন্ধকার অংশের দিকে ইঙ্গিত করলেন, “ওদিকে – এই মৃতদেহ গুলো টানতে সাহায্য করুন”।

     সুড়ঙ্গের এক অন্ধকার কোনে চন্দ্র দাস এবং তার দুই শাগরেদের দেহ গুলি টেনে হিঁচড়ে রাখার পর ক্যাম্পবেল আদেশ দিলেন, “এখনি ওদের আলখাল্লা এবং মুখোশ খুলে পরে ফেলুন। অন্তত একটু সুযোগ তো পাবো ভেতরে যাওয়ার”।

     আলখাল্লা এবং মুখোশ ইত্যাদি পরে নেওয়ার পর তাদের সাথে বাকি সব সদস্যদের কোন পার্থক্য রইল না। কেবল, এনিসের আলখাল্লার বুকের কাছে তারার সংখ্যা রইল দুই।

     এনিস এবং ক্যাম্পবেল সুড়ঙ্গপথ ধরে এগিয়ে চললেন আলো এবং সেই গানের উৎস লক্ষ্য করে। পেছনে পদশব্দ শুনে এনিস তাকিয়ে দেখল, কিছু আলখাল্লা পরিহিত সদস্য তাদের অতিক্রম করে প্রায় ছুটে চলে গেল সেইদিকে। ক্যাম্পবেল চাপা স্বরে বললেন, “গার্ড দুটো এবং আলখাল্লা কাউন্টারের লোকগুলো। চলুন আমরাও যাই। আর দেরি করা ঠিক হবে না”।

     একটু এগোনোর পরেই সুড়ঙ্গ শেষ হয়ে গেল। এখন সামনে এক বিশাল তোরণ আর তার ভেতরে, একটি মাঠের মতো বড় খালি যায়গা যেখানে জড় হয়েছে শয়ে শয়ে আলখাল্লা পরিহিত মানুষের দল। উজ্জ্বল আলোয় সেই বিরাট হলঘর আলোকিত হয়ে আছে। মাথার ওপর সমুদ্রের ধ্বনি এবং তার নিচে এই বিশাল আয়োজনের ঘটা দেখে এনিস আর ক্যাম্পবেলের বাক্যস্ফূর্তি হোল না। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে সেই বিশালত্বের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকা এনিসের কানের কাছে ফিসফিস করে ক্যাম্পবেল বলে উঠলেন, “এই গুহাই তাহলে – সেই খিলান – গুহা”।

     বিরাট এই হলঘরের আকৃতি উপবৃত্তাকার – যার লম্ব অক্ষ কম করেও প্রায় তিনশ ফিট। কালো ব্যাসাল্টের তৈরি চারপাশের দেওয়াল, বড় বড় এবড়ো খেবড়ো বিরাট বিরাট কালো থাম সমুদ্র তলদেশের সেই বিরাট গুহাকে রক্ষা করেছে মাথার ওপর বিপুল জলরাশির ভার বহন করে। মাটি থেকে সেই ছাদের উচ্চতা কম করেও একশ ফিট হবে। সমস্ত হলঘরটা এক অপার্থিব উজ্জ্বল আলোতে ভরে আছে – দীপ্তিমান কিন্তু উৎস বিহীন সেই আলো। ঘরের মধ্যে খালি জায়গায় সারি সারি লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে আলখাল্লা পরিহিত মূর্তি। তাদের সবার মুখ ঘরের এক নির্দিষ্ট কোনের দিকে ঘোরানো। সেদিকে তাকিয়ে দেখা গেল একটা কালো ব্যাসাল্ট পাথরের স্ল্যাবের ওপর পাঁচটি আলখাল্লা পরিহিত মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চারজনের বুকে দুটি তারা থাকলেও, একজনের বুকে তিনটি তারা খচিত ব্যাজ। দুজন দাঁড়িয়ে আছে একটা কিউব টাইপের অদ্ভুতদর্শন ধূসর ধাতুর তৈরি একটি যন্ত্রের সামনে – যার থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক সূক্ষ্ম তার। সেই তারের জাল খানিকটা উপরের দিকে বিন্যস্ত হয়ে তৈরি করেছে একটা গোলক। সেই অসাধারণ জটিল তারের বিন্যাসের মধ্যে কিছু তার কাঁপছে, যেন তাদের মধ্যে এক শক্তির সঞ্চার হচ্ছে থেকে থেকে। আর সেই তারের কাঁপুনির সাথে তাল রেখে ঘরের মধ্যে সেই অদ্ভুত আলোর দ্যুতির ওঠাপড়া অনুভূত হচ্ছে।

     যন্ত্র যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে ওপরের দিকে কালো ব্যাসাল্ট প্রাচীরের রুক্ষ শরীরে খোদাই করা রয়েছে এক অদ্ভুত দৈত্যাকৃতি অবয়ব। খোদাই করাই বলতে হবে, কারণ চারপাশে এবড়ো খেবড়ো পাথরের দেওয়ালে ঐ জায়গাটি যেন খুব যত্ন করে কেটে মসৃণ করা হয়েছে। সেই ডিম্বাকৃতি মুখের মাঝে গভীর ভাবে চারটি অক্ষর খোদাই করা রয়েছে। সেই বিরাট পাথরের মসৃণ দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে এনিসের মন যেন ঘৃণায় কুঁকড়ে আসতে লাগল। হঠাৎ এক আওয়াজে চমকে তাকিয়ে সে দেখল, আবার সেই প্রার্থনা সঙ্গীত শুরু হয়ে গেছে। এবার তার প্রাবল্য ক্রমশ চড়ছে, এবং সে এমন এক অনুরণনে উৎসারিত হয়ে চলেছে – এনিসের মনে হোল তার সাথে সুউচ্চ ব্যাসাল্ট পাথরের ছাদটাও অনুরণিত হচ্ছে। তারপর সেই প্রাবল্য ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে লাগল।

     এনিস ইন্সপেক্টরের ধূসর আলখাল্লা চেপে ধরল, “রুথ কোথায়? আমি তো একটা বন্দীকেও আশে পাশে দেখতে পাচ্ছি না”।

     “নিশ্চয়ই অন্য কোথাও আছে” ক্যাম্পবেল গলা নামিয়ে বলতে গেল, “শুনুন – “

     হঠাৎ সেই সঙ্গীত থেমে গেল। চারপাশে বিরাজ করতে লাগল এক গভীর শান্তি। এবার ব্যাসাল্ট ডায়াসের সামনে থাকা তিনটি তারকা খচিত মূর্তিটি এগিয়ে এলো, এবং কম্বুকণ্ঠে বক্তৃতা দিতে শুরু করল। তার গলার আওয়াজ ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকল, সমুদ্রের নীচের সেই গোপন গুহার প্রতিটি সুড়ঙ্গে –

     “দুয়ারের ভ্রাতৃবৃন্দ, আমরা আবার মিলিত হয়েছি এই গুপ্ত খিলান গুহায়। যেমন মিলিত হতেন আমাদের পূর্বপুরুষরা আজ থেকে দশ হাজার বছর আগে – ঐ ওনাদের পুজো করার জন্য যারা দুয়ারের ওদিকে থাকেন। অর্ঘ্য দান করতেন ওঁদের – যা ওনারা ভালোবাসেন।

     সহস্র বছর আগে তাঁরা প্রথম তাঁদের বিপুল জ্ঞানের এবং ক্ষমতার কিছু অংশ আমাদের পূর্বজদের দান করেছিলেন। ওনাদের বিশ্ব এবং আমাদের বিশ্বের মধ্যে এই আদান প্রদানের যে বাধা, সেটা তাঁরা নিজেরা কোনোদিন অতিক্রম করতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের শিখিয়েছিলেন কিভাবে এই দুয়ার খুলতে হয় – কিভাবে তাঁদের সাথে যোগাযোগ করতে হয়”।

     “এইভাবে তাঁদের দেখানো পথে, প্রত্যেক বছর আমরা এখানে জমায়েত হয়েছি, এই দরজা খুলেছি, তাঁদের অর্ঘ্য দান করেছি- এবং তার বদলে তাঁরা আমাদের বিশেষ শক্তি দিয়েছেন, এমন বিশেষ সেই ক্ষমতা যা সাধারণ মানুষের নাগালের বহুদূরে”।

     “ভ্রাতৃবৃন্দ, আজ আমরা আবার সবাই এখানে জমায়েত হয়েছি – তাঁদের আহ্বান করতে, তাঁদের অর্ঘ্য দিতে। সেই মহা-মুহূর্ত আগত এবং তাঁরা ওধারে অপেক্ষা করছেন –  তাই দেরী না করে বন্দীদের এখানে আনা হোক”।

     কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে, গুহার একটা গুপ্ত অংশ থেকে একদল মানুষ সারি দিয়ে বেরিয়ে এলো। প্রথম দল অবশ্যই আলখাল্লা এবং মুখোশ পরিহিত সঙ্ঘ সভ্যের দল –  আর তাদের মাঝে প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ জন সাধারণ পুরুষ এবং মহিলা। এদের কোন আলখাল্লা নেই। কিন্তু এদের সবার মধ্যে একটা মিল আছে –  আর সেটা হোল এদের হাটা চলায়। সবাই যেন কিরকম যন্ত্রের মতো চলেছে, একটু ঝুঁকে, শূন্যদৃষ্টিতে, মেশিনের মতো। যেন মানুষ নয়, একপাল জ্যান্ত মড়ার মিছিল।

     “ড্রাগ দেওয়া হয়েছে”। ক্যাম্পবেলের গলা কেঁপে গেল, “প্রত্যেককে ড্রাগ দেওয়া হয়েছে। হতভাগারা জানতেও পারছে না কি ঘটছে ওদের চারপাশে”।

     এনিসের চোখ স্থির হল লাইনের শেষে দাঁড়ানো একটি ছোট্ট খাট্টো চেহারার মেয়ের উপর। বাদামী রঙের ঢেউ খেলানো চুলের মেয়েটির মুখও লাইনের বাকিদের মতো ফ্যাকাসে এবং ভাবলেশহীন।

     “ঐ তো রুথ”। এনিসের চিৎকার তার মুখোশের মধ্যে থেকে চাপা শোনাল। এনিস প্রায় ছুটেই যাচ্ছিল, ইনস্পেকটর বাধা দিলেন। “নিজে ধরা পড়ে গিয়ে কোন লাভ আছে?”

     “তাতে কি? আমি তো ওর সাথেই থাকতে চাই, অন্তত ওর সাথে তো মরতে পারব। আমাকে আটকাবেন না”। এনিস বলে উঠল।

     ক্যাম্পবেলের বজ্রমুষ্টি এনিসের হাতের কব্জির ওপর আরো চেপে বসল, “ওভাবে নয়, মিঃ এনিস। আপনি যে আলখাল্লাটা পরে আছেন, সেটায় ডাবল স্টার আছে। তার মানে, আপনি চন্দ্র দাসের মত একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং ঐ মঞ্চে দাঁড়ানোর উপযুক্ত। আর মুখোশ পরে থাকায় কেউ আপনাকে চিনতেও পারবে না। আপনি যতক্ষণ মঞ্চে গিয়ে দাঁড়াবেন, আমি লুকিয়ে ঐ পথে একবার যাবো যেখান থেকে ঐ বন্দিদের আনা হোল। আমি নিশ্চিত ঐ গোপন সুড়ঙ্গের সাথে মূল সুড়ঙ্গের একটা যোগ আছে। তারপর আমি যখন ওখান থেকে ফায়ার করব, তখন আপনি আপনার স্ত্রী এর হাত ধরে সোজা দৌড় লাগাবেন ঐ গোপন সুড়ঙ্গের দিকে। যদি সেটা করতে পারেন, তাহলে আমাদের বাঁচার কিছু আশা থাকবে”।

     এনিস ইন্সপেক্টরের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে মাপা পদক্ষেপে এগিয়ে চলল মঞ্চের দিকে। সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সদস্যদের ভিড়ের মধ্যে মাথা উঁচু করে সে মঞ্চের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর ধীর পায়ে মঞ্চে উঠে গেল। আড়চোখে দেখল, ইন্সপেক্টরের আলখাল্লা সেই গোপন সুড়ঙ্গ পথে মিলিয়ে যাচ্ছে।

     মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই তারকা খচিত ব্যক্তি তার দিকে বিরক্তিপূর্ন দৃষ্টিতে তাকাল, দেরী করে আসার অভিব্যক্তি। কিন্তু সামনে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিগুলির মধ্যে কোন চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেল না। তারা অধির আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে সমস্ত বন্দিদের দিকে, যাদেরকে এখুনি ব্যাবহার করা হবে সেই রহস্যময় দরজার ওধারে  অজানা কিছুর বলি হিসাবে।

     বন্দিরা ধীরে ধীরে ডায়াসে উঠল। এনিসের গা ঘেঁষে রুথও উঠে গেল সেই মঞ্চে। তার মুখ তখনও একই রকম অভিব্যক্তি-হীন – অচেনা।

     এবার সমস্ত বন্দিদের সার দিয়ে দাঁড় করানো হোল সেই ডিম্বাকৃতি পাথরের দৈত্যাকৃতি অবয়বের নিচে। তাদের সেখান রেখে গার্ডেরা তাদের পেছন থেকে সরে গেল। এনিস সুযোগ বুঝে প্রায় পা টিপে টিপে রুথের একদম কাছ ঘেঁষে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল এবং তখনই খেয়াল করল, মঞ্চের ওপর থাকা দুই পুরোহিত সেই কম্পমান তারের জালের নিচে ধূসর রঙের ধাতব কিউবের কোনায় দুটো এবোনাইটের নব লাগিয়ে দিয়ে গেল।

     ডায়াসে দাঁড়ানো প্রধান পুরোহিত হাত তুলল। তারপর তার গলা থেকে মন্দ্র স্বর বেরিয়ে এলো, আর সেই আওয়াজ সারা গুহার মধ্যে অনুরণিত হতে থাকল।

পঞ্চম অধ্যায়

খুলিল দুয়ার

“ঐ দুয়ার কোথায় পথ দেখায়?” –প্রধান পুরোহিতের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

     উত্তরে শতকণ্ঠের আওয়াজ গর্জে উঠল, যদিও মুখোশের মধ্যে দিয়ে চাপা আওয়াজ তবু গমগম করে উঠল গুহার অভ্যন্তর।

     “চেনাশোনা এই দুনিয়ার কিনারায়”।

     প্রধান পুরোহিত অপেক্ষা করলেন যতক্ষণ না সেই সমবেত স্বর মিলিয়ে যায়, তারপর আবার তিনি শুরু করলেন –

     “কাহারা শেখান পূর্বজদের দুয়ার খোলার কল?”

     এনিস এবার মরিয়া হয়ে বন্দিদের আরও কাছে চলে যেতে লাগল। যেতে যেতেই শুনতে পেল সমবেত কণ্ঠে আসা উত্তর –

     “খিলান ওপারে বসত তাদের, কোরো নাকো কোলাহল”।

     এবার এনিস আরও একটু সরে এসেছে, প্রায় পৌঁছে গেছে বন্দিদের সারির দিকে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি পুরোহিতদের থেকে এনিস এখন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।

     “দান করি মোরা অর্ঘ্য কাদের, বড়ো ভয় ভীত মনে”।

     গমগমে স্বরটা মিলিয়ে যেতে না যেতেই একটা কঠিন হাত এসে এনিসের বাহুমূল ধরে ঝাঁকানি দিল এবং তাকে এক ঝটকায় টেনে দাঁড় করিয়ে দিল মঞ্চে অবস্থিত বাকি পুরোহিতদের সাথে।

     “ওঁদের যারা ওধারে থাকেন, তাঁদেরই সম্মানে”।

     এনিস ঘাড় ঘুরিয়ে সেই মুখোশ-ধারীর দিকে তাকাল। মুখোশের ভেতর থেকে আওয়াজ এলো, “চন্দ্র দাস, মাথা-টাথা খারাপ হয়ে গেছে? নাকি তোমার শখ জেগেছে ওদের সাথে দরজার ওদিকে যাওয়ার”।

     এনিস বুঝতে পারল, কোন আশা নেই। সেই মুখোশ-ধারী ওর হাত চেপে ধরে আছে শক্ত করে। উত্তেজনায় এনিস প্রধান পুরোহিতের দিকে তাকাল। তিনি তখন উচ্চারণ করছেন স্তোত্রের শেষ স্তবক,

     “খিলানের দ্বার খুলে রাখিবার আছে কি গো প্রয়োজন?”

     অত্যাশ্চর্য এবং অসামান্য উচ্ছ্বাসে এবং উচ্চনাদে এই প্রশ্নের উত্তর অসুরের মতো গুহার দেওয়ালে দেওয়ালে আছড়ে পড়ল,

     “থাকিতে দাও অবারিত এ দুয়ার, কেন বৃথা বন্ধন”।

     প্রধান পুরোহিত হাত তোলা অবস্থাতেই একটি আঙ্গুলের ইশারা করলেন। এনিসের সমস্ত পেশি টানটান হয়ে আছে, যে কোন মুহূর্তে সে মুখোশ-ধারীর হাত ছাড়িয়ে দৌড় লাগাবে রুথের দিকে – তখনই সে দেখতে পেল, পেছনের দুই পুরোহিত গিয়ে সেই এবোনাইটের নব দুটো ঘুরিয়ে দিয়ে এলো।

     তারপর যা ঘটল, ঐ হলঘরে অবস্থিত শখানেক হতবাক মূর্তির সাথে এনিসও নিশ্চল ভাবে নিঃসীম আতঙ্কে তার সাক্ষী হয়ে থাকল।

     সেই তারের জালের তৈরি গোলোক অসম্ভব ভাবে কাঁপতে শুরু করে দিল – যেন কোন এক তীব্র শক্তির প্রভাবে সেই গোলোকের প্রতিটি তার আন্দোলিত হয়ে চলেছে অপরিসীম প্রাবল্যে। সেই সঙ্গে ওপরে ডিম্বাকৃতি পাথরের অবয়বের কেন্দ্র থেকে এক অদ্ভুত সবুজ আলো বিচ্ছুরিত হওয়া শুরু হল। সেই আলো ক্রমশ বহির্মুখী হয়ে বিস্তার লাভ করতে থাকল, যেন এক ভয়াবহ বিকটাকৃতি ফুল ক্রমশ প্রস্ফুটিত হয়ে চলেছে বাইরের দিকে, গ্রাস করতে চলেছে সমগ্র হলঘরটিকে। আলো ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল, এবং এনিস সেখতে পেল, এখন তারা সবাই সেই আলোর বৃত্তের ভেতরে চলে এসেছে – দেখতে পাচ্ছে সেই অস্বস্তিকর সবুজ আলো ভেদ করে এক নতুন দৃশ্য। সে দেখতে পেল, এক নতুন জগত, এক সম্পূর্ণ অপরিচিত দুনিয়া। এমন এক জায়গা যেটা আমাদের চেনাশোনা জগতের থেকে বহুদূরে কিন্তু অন্য মাত্রায় অবস্থিত – যেখানে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা হোল এই দুয়ার। এনিসের সামনে দৃশ্যমান এক সবুজ বিশ্ব, যা বীভৎস সবুজ রঙের আলোয় প্লাবিত হয়ে আছে –  এ এক এমন আলো যা অন্ধকারের থেকেও বেশি কুটিল, অশুভ এবং বিবমিষা উদ্রেককারী।  

     এনিস অস্পষ্টভাবে দেখতে পেল, একটি নগরের কিছু অংশ, এক সবুজাভ পান্না রঙের একটি শহর যার মধ্যে কিছু অপ্রতিসম আঁকাবাঁকা গম্বুজ এবং মিনার সবুজাভ কালো আকাশের দিকে নারকীয় আস্ফালনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই গম্বুজগুলি যেন এক অদৃশ্য বাতাসের আঘাতে ধীরে ধীরে দুলছে। সে আরও খেয়াল করল যে সেই শহরের উৎকট সবুজের উৎস হোল কিছু ইতস্তত ভ্রাম্যমাণ হলুদ রঙের বস্তু – এনিসের মনে হোল সেগুলি যেন বিরাট বিরাট চোখের মত দেখতে।

     তাকিয়ে থাকতে থাকতে এনিসের মন এক গভীর আশঙ্কায় পূর্ণ হয়ে উঠল। না না- ওগুলো চোখই। বীভৎস, ভয়ানক, হাড় হিম করা উপলব্ধি হোল এনিসের। এই পুরো ভিন-জাগতিক শহর জীবন্ত, ভীষণ ভাবে জীবন্ত। এই অপরিচিত জগতের জীবন হয়ত একটিই কিন্তু তা বহুত্বে শতধা বিভক্ত – এক প্রাণ কিন্তু তার প্রকাশ বিভিন্ন। তারই এক অংশ হলুদ চোখে নিষ্পলক তাকিয়ে রয়েছে সেই দরজার মধ্যে দিয়ে এই পৃথিবীর দিকে।

     এবার সেই সৃষ্টিছাড়া সবুজ শহর থেকে সবুজ আলোর জোয়ারে ভেসে এলো কিছু কিলবিলে সবুজ পদার্থ। ভাসতে ভাসতে সেই মাত্রাভেদী দরজা পেরিয়ে তারা প্রবেশ করল মানুষের দুনিয়ায়। তারা এসে দাঁড়াল সেই ব্যাসাল্ট মঞ্চের ওপর। প্রত্যেকটি সবুজ কিলবিলে জিনিসগুলোর একটা করে বড় এবং উৎকট হলুদ চোখ আছে। তাদের চোখের দৃষ্টি এখন বন্দিদের ওপর নিহিত। এনিস অনুভব করতে পারল যে সেই দরজা ভেদ করে এক বিপুল শক্তিপুঞ্জের তরঙ্গ প্রবাহিত হয়ে চলেছে, যা মুখোশ ভেদ করে ক্রমশ সারা শরীর মন আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সারা ঘরের মুখোশ-ধারী সদস্যরা বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেই নারকীয় সবুজ মূর্তিমান আতঙ্কদের ভিড়ের সামনে। 

     প্রাণীগুলোর সেদিকে খেয়াল নেই। তারা তাদের হলুদ লালসা-পূর্ণ দৃষ্টি ফেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সেই সব বন্দীদের দিকে যারা ড্রাগের নেশায় বেহুঁশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই পাথরের নীচে।

     এনিস অসহায় ভাবে দেখতে পেল, সেই সব সবুজ শয়তানগুলো এক এক করে বন্দিদের কাছে যাচ্ছে – একজন এগিয়ে গেল রুথের দিকে। এনিসকে যেন কেউ সম্মোহন করেছে, জাদু করেছে তার পার্থিব শরীরের ওপর। সে নড়তে পারছে না। প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সে চেষ্টা করতে লাগল কিভাবে সে এই সম্মোহনের প্রভাব কাটিয়ে রুথ কে ঐ নরকের কীট গুলোর হাত থেকে উদ্ধার করতে পারবে।

     দুম, দুম।

     উপর্যুপরি দুবার বন্দুকের নির্ঘোষ শোনা গেল। বিকট শব্দে সেই গুহার প্রতিটি পাথর যেন অকস্মাৎ কেঁপে উঠল। একটা বুলেট গিয়ে সেই তারের গোলোকের বেশ কিছু তার ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। এদিকে দরজা বন্ধ হতে শুরু করেছে, চারদিকের সবুজ আলো ম্লান থেকে ম্লানতর হয়ে আসছে – এবং চারপাশে ঘনিয়ে আসছে গভীর অন্ধকার। দরজা বন্ধ হবার আভাস পেয়ে সেই সব পরাজগতিক প্রাণীগুলি বন্দিদের কাছ থেকে সরে এলো, এবং চলতে লাগল ক্রমশ কাঁপতে কাঁপতে বন্ধ হয়ে আসা দরজার দিকে। তারা সেই দুয়ার ভেদ করে ওদিকে চলে যাওয়া মাত্র দরজাটা প্রবল ভাবে দুলতে শুরু করল এবং সেই বিপুল আলোকচ্ছটা ক্ষীণ হতে হতে এক সময় মিলিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হবার সাথে সাথে গুহা-ঘরের মধ্যেকার আলোও তার দীপ্তি হারাতে থাকল। এনিস স্প্রিঙের মতো এক লাফে ছুটে গিয়ে রুথ কে জাপটে ধরল আর তক্ষুনি শোনা গেল ইন্সপেক্টরের কণ্ঠস্বর, “এনিস, এদিকে এদিকে – তাড়াতাড়ি আসুন”।

     প্রধান পুরোহিত মঞ্চের ওপর থেকে চিৎকার করে বললেন, “দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। বিধর্মীগুলোর মৃত্যু চাই”।

     “মারো বিধর্মীদের” পেছন থেকে শতকণ্ঠে চিৎকার শোনা গেল।

     এনিসের পিস্তল গর্জন করে উঠল এবং প্রধান পুরোহিত ভূপতিত হলেন। আর সেই মুহূর্তেই গুহার মধ্যের সব আলো নিভে গেল।

     এনিস বুঝতে পারল যে সমস্ত সদস্য যারা এতক্ষণ তারই মতো ভয়ে সম্ভ্রমে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছিল, তারা জেগেছে এবং প্রবল প্রতিহিংসায় ছুটে আসছে তাকে ছিঁড়ে ফেলতে। সে শক্ত হাতে রুথকে ধরে থাকল, এবং পাগলের মতো অন্ধকারের দিকে ফিরে তার বন্দুকের পুরো ব্যারেল খালি করে দিল। শুনতে পেল, সেই সব হতভাগ্য বন্দীরা শয়ে শয়ে মাতালের মতো ছুটে আসা প্রতিহিংসা পরায়ণ মূর্তিদের নিচে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে।

     এনিস পাগলের মতো লড়তে লাগল। এই নিবিড় অন্ধকারে বোঝার উপায় নেই, কে বন্ধু কে শত্রু। পিস্তল খালি হয়ে যাবার পর সে পিস্তলের বাট দিয়ে দু তিন জনকে আঘাত করল, কিন্তু সে বুঝতে পারল সে হেরে যাচ্ছে। এতগুলো রক্তপিপাসু উন্মাদের সাথে একা লড়া সম্ভব নয়। সে প্রাণপণে খুঁজতে চেষ্টা করতে লাগল সেই দরজাটা সেখান দিয়ে ইনস্পেকটর তাকে যেতে বলেছিল।

     বিপুল হিংসাত্মক কোলাহল ছাপিয়ে ক্যাম্পবেলের চিৎকার শোনা গেল, “এদিকে এনিস, এদিকে”।

     এনিস পাগলের মতো ইন্সপেক্টরের কণ্ঠস্বরের উৎস লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল। সামনে যেই এলো, তাকে ধাক্কা মেরে, গুঁতিয়ে রুথ কে প্রায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে সমস্ত শক্তি এক করে ছুটে চলল সেই প্রাকারের দিকে। দেওয়ালের কাছে পৌঁছে সে হাঁপাতে হাঁপাতে হাতড়াতে লাগল সেই গুপ্ত দরজার খোলা মুখটা – আর তখনই ক্যাম্পবেলের বলিষ্ঠ হাত তাকে টেনে ঢুকিয়ে নিল সেই দরজা দিয়ে।

     এনিস সবে সেই গুপ্ত দরজা দিয়ে প্রবেশ করেছে, তখনই অন্ধকারে কিছু হাত এসে তাকে আঁকড়ে ধরল। প্রচণ্ড ভাবে টানতে লাগল যাতে এনিস আর রুথ কে আলাদা করে দেওয়া যায়। ইন্সপেক্টরের পিস্তল দুবার গর্জে উঠল। নিমেষে এক আর্ত চীৎকারের সাথে সাথে হাতগুলোর মুঠি আলগা  হয়ে গেল। এনিস রুথ কে প্রায় কোল-পাঁজা করে লাফিয়ে ঢুকে পড়ল। শুনতে পেল, ইনস্পেকটর পেছনে দরজাটা বন্ধ করে তাতে শিকল তুলে দিলেন। কিন্তু পাগল জনতার কাছে সেটা কোন বাধাই নয়। উপর্যুপরি ধাক্কায় শিকল ভেঙ্গে পড়ার শব্দ কানে এলো।

     “পালাও পালাও, ঈশ্বরের দোহাই, পালাও”। হাঁপাতে হাঁপাতে ইনস্পেকটর অন্ধকারে চেঁচিয়ে উঠলেন। “আমাদের পিছু পিছু আসছে সবাই। আমাদের এখনই সুড়ঙ্গটা পেরিয়ে সেই গুহা বন্দরের কাছে পৌঁছতেই হবে যে করে হোক”।

     রুথকে এখন ক্যাম্পবেল ধরে আছেন আর এনিস মাতালের মতো তাঁকে অনুসরণ করে চলেছে। যখন তারা মূল সুড়ঙ্গে এসে পৌঁছল, তখনও পেছন থেকে কোলাহল এগিয়ে আসছে। পেছনে তাকিয়ে এনিস দেখল অন্ধকারের মধ্যে মৃদু আলোর ঝলকানি। ক্যাম্পবেল বলে উঠলেন, “ওরা আমাদের পেছনেই আছে আর আলোও যোগাড় করেছে”। ক্যাম্পবেল চেঁচিয়ে উঠলেন “পালাও, আরও জোরে”।

     এ যেন এক দুঃস্বপ্নের রাত। ওদিকে মাথার ওপরে সমুদ্রের গুমগুম শব্দ, সামনে অন্ধকার সুড়ঙ্গের এবড়ো খেবড়ো রাস্তা, আর পেছনে রক্তলোলুপ শিকারি কুকুরের মতো দৌড়ে আসছে পিশাচের দল।

     একটা মোড় ঘুরতে গিয়ে পিচ্ছিল পথে তিনজনেই পা হড়কে পড়ে গেল। আর বুঝতে পারল, পেছনের ভিড় আরও কাছে চলে আসছে। কোনমতে উঠে প্রাণপণে ছুটে চলেছে এনিস এবং ক্যাম্পবেল, সঙ্গে অর্ধ-চেতন অবস্থায় রুথ কে জাপটে ধরে আছে ক্যাম্পবেল।

     যখন তাঁরা প্রায় শেষ ধাপে চলে এসেছে এবং আর একটু এগোলেই সেই গুহা বন্দরে প্রবেশ করতে পারবে, পেছনে থেকে একটা টর্চ-লাইট জ্বলে উঠল। এবং সেই আলোতে ওদের দেখা যেতেই মুখোশ-ধারী মূর্তিগুলো উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল।

     শেষ ধাপ পেরোনোর সময় এনিসের পা হড়কাল। ক্যাম্পবেল রুথকে নিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু এনিসের জন্য দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভিড় অনেক কাছে চলে এসেছে। এনিস বুঝতে পারল, তাঁকে নিতে গেলে কেউই পার পাবে না। “আমাকে ছেড়ে দিন, রুথ কে এখান থেকে বার করে নিয়ে যান ইনস্পেকটর”। এনিস পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠল।

     “না” ইন্সপেক্টর চাবুকের মতো জবাব দিলেন, “আর একটা উপায় আছে। যদিও তাতে আমরা সবাই মরতে পারি কিন্তু এ ছাড়া আর কোন রাস্তা দেখছি না”। এই বলে ইন্সপেক্টর পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলেন সেই পুরনো আমলের সোনার ঘড়িটা। নিমেষের মধ্যে ঢাকনাটা খুলে দুবার দম দিয়েই তিনি সেটা ছুঁড়ে দিলেন নিচের সুড়ঙ্গের মধ্যে যেখান থেকে সেই কোলাহল ক্রমশ এগিয়ে আসছে অবিশ্বাস্য গতিতে।

     “এখনি পালাও, নাহলে সবাই মরব”। ক্যাম্পবেল চিৎকার করে উঠলেন।

     ক্যাম্পবেল টেনে হিঁচড়ে এনিসকে তুলে এক হাতে রুথকে আর এক হাতে হত-ক্লান্ত এনিসকে বগলদাবা করে এগিয়ে চললেন বন্দরের মুখে। কয়েক মুহূর্ত পরে তারা বন্দরের সামনে এসে দেখতে পেলেন সেখানেও বিরাজ করছে নিবিড় তমিস্রা, কিন্তু তার মধ্যে তাঁদের নৌকার একমাত্র আলো দেখা যাচ্ছে। পাথরের ওপর দিয়ে এগিয়ে সেদিকে পা বাড়াতেই এক বিকট আওয়াজ এবং কাঁপুনিতে তিনজনই ভূতলশায়ী হলেন। মনে হোল মাটির নিচে ফেলে আসা সুড়ঙ্গপথে কোথাও একটা বোমা ফাটল। এবং তার সাথে সারা গুহা বন্দর যেন টলমল করে উঠল। আওয়াজের সাথে সাথে চারপাশে পাথর পড়ার শব্দে তাঁরা যেন কিছুক্ষণ বধির হয়ে থাকলেন।

     “নৌকার দিকে পালাও” ছুটতে ছুটতে ক্যাম্পবেল বলে চললেন, “ঐ ঘড়িটার মধ্যে আমাদের জানা এখনও অবধি সবথেকে মারাত্মক বিস্ফোরক ভর্তি করে এনেছিলাম। সেটাই সুড়ঙ্গপথ চুরমার করে দিয়েছে। কিন্তু এই পুরো গুহাটাই আলগা পাথরে তৈরি, তাই নীচের পাথর খসে গেলে এ কোন মুহূর্তে পুরো গুহাটাই আমাদের ওপর নেমে আসতে পারে”।

     চারপাশে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে প্রবল পাথর বৃষ্টি। চারপাশের পাথর গুড় গুড় শব্দে কানে তালা লাগানো আওয়াজে ভেঙে পড়ছে। গুহার মাথা থেকে পাথর খসে খসে পড়ছে বন্দরের জলে।

     স্টুয়ার্ট নির্বিকার মুখে ঠিক ইঞ্জিন চালু রেখেই বসেছিল। তার সাহায্যে রুথ কে নৌকাতে তুলে ক্যাম্পবেল হাঁক দিলেন, “ফুল স্পীড। এখনি এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে”।

     নিমেষের মধ্যে ইঞ্জিনের ঘড়ঘড় আওয়াজে বোটটি জ্যা মুক্ত তীরের মতো ছুটে চলল চারপাশের জলে ঢেউ তুলে। দুদিকে পাথর পড়ার অবিশ্রান্ত আওয়াজ। গুহার ওপর থেকে পাশ থেকে পাথর খসে খসে ছপ ছপ শব্দে জলে পড়ছে। আর পাকা নাবিকের মতো স্টুয়ার্ট তার নৌকাকে বাঁচাতে বাঁচাতে নিয়ে চলেছে। মাথার ওপর টন টন পাথরের বোঝা, চারপাশে নিরেট পাথরের দেওয়াল থেকে থেকেই কেঁপে উঠছে।

     হঠাৎ স্টুয়ার্ট প্রাণপণে ব্রেক কষল। তবুও নৌকা গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারল একটা বিরাট পাথরের সাথে।

     “কি হোল?” ইন্সপেক্টর চেঁচিয়ে উঠলেন।

     “স্যার, অন্ধকারে দেখতে পাইনি কিন্তু সামনে একটা কালো পাথর পড়ে রাস্তা পুরো বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা আটকা পড়ে গেলাম”। বাস্তবিকই সার্চলাইটের আলোয় দেখা গেল একটা কালো পাথর নৌকার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে যা মূল স্রোতকে কেটে দুটি ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। কিন্তু তার আশপাশ দিয়ে নৌকা নিয়ে এগোনো অসম্ভব।

     “পুরোপুরি বন্ধ হতে পারে না”। ইনস্পেকটর বলে উঠলেন, “ভালো করে তাকিয়ে দেখো জলের স্রোত কিন্তু পাথরের পাশ দিয়ে বেরিয়ে চলেছে। একটা উপায় হতে পারে যদি আমরা জলের মধ্যে ডুবসাঁতার কেটে এই পাথরের স্তূপটা পেরিয়ে যেতে পারি। নাহলে এই পুরো ছাদটা আমাদের মাথার ওপর ভেঙে পড়বে যে কোন সময়ে”।

     “কিন্তু স্যার এই স্তূপটা লম্বায় কত বড় সেটা তো জানা নেই”। সারেঙ চেদিয়ে উঠল।

     ইতিমধ্যে ক্যাম্পবেল এবং এনিস নিজেদের জামাকাপড় খুলতে শুরু ঝাঁপ দেবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। দেখাদেখি স্টুয়ার্টও আর সময় নষ্ট না করে ওদের অনুসরণ করল। ক্যাম্পবেল পরম মমতায় রুথের অর্ধ-চেতন দেহটাকে জলে নামিয়ে দিল। “ওর নাক এবং মুখের ওপর হাত চাপা দিয়ে রাখুন” এনিসকে বললেন ক্যাম্পবেল। “স্টুয়ার্ট, তাড়াতাড়ি”। চারপাশে পাথর ভেঙ্গে পড়ার শব্দ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

     ইঞ্জিন বন্ধ করে ফ্যাকাসে মুখে সারেঙ জলে ঝাঁপ দিল, আর বুকভরা নিশ্বাস টেনে তিনজনেই ডুব দিল জলের তলায়। মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র স্রোত তাঁদের টেনে নিয়ে চলল মাথার ওপর পাথরের চাঙড়ের নিচে দিয়ে খড়কুটোর মত। কনকনে ঠাণ্ডা জলের মধ্যে দিয়ে তাঁরা ভেসে চললেন নিরুদ্দেশের দিকে, যেদিকে সেই স্রোতের বেগ তাঁদের টেনে নিয়ে চলেছে। চারপাশে এবং মাথার ওপর পাথরের সাথে তাদের শরীর ঠোক্কর খেতে খেতে এগিয়ে চলল। এনিসে মাথা ঘুরছে, গলা জ্বালা করছে সামান্য অক্সিজেনের আকাঙ্ক্ষায়, কিন্তু সে শক্ত হাতে রুথ কে ধরে রেখেছে। কিছুটা পথ ঘুরে চারপাশের নিশ্ছিদ্র পাথরের দেওয়াল পেরিয়ে এক গহ্বরের মধ্যে দিয়ে সেই কারেন্ট তাঁদের এনে ফেলল এক অন্ধকার গুহায়।

     এতক্ষণ পরে জলের ওপর মাথা তুলে শ্বাস নিতে পারল তিন অভিযাত্রী। কিন্তু সভয়ে দেখল, সেই গুহার দেওয়াল রীতি মতো কেঁপে উঠছে, যে কোন মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়তে পারে তাঁদের ওপর। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে, সেই স্রোত তাঁদের তখনও টেনে নিয়ে চলেছে আরও বাইরের দিকে। সেই টানে ভাসতে ভাসতে তাঁরা বেরিয়ে এলেন সেই গুহার কালো করাল গ্রাস থেকে এক তারকাখচিত রাতের আকাশের নিচে। স্টুয়ার্ট এসব জায়গা চেনে, তাই সে আগে আগে সাঁতরাতে লাগল, আর বাকিরা তাকে অনুসরণ করে চলতে থাকলেন।

     “পল—“ রুথের মুখ থেকে অব্যক্ত আওয়াজ বেরিয়ে এলো।

     “ইনস্পেকটর, রুথ ঠিক হয়ে যাচ্ছে। জলের জন্য বোধকরি ড্রাগের প্রভাব কেটে গেছে ওর”। আনন্দে অস্থির হয়ে উঠল এনিস।

     “ওদিকে দেখুন মিঃ এনিস” ক্যাম্পবেল গম্ভীর ভাবে বলে উঠলেন সেই কালো প্রাকারের দিকে আঙ্গুল তুলে।

     রাতের তারার সামান্য আলোয় দেখা গেল, সেই বিরাট ভয়াবহ পাথরের প্রাকার ভেঙে পড়ছে, পাথরে পাথরে ঘষে এক অপার্থিব শব্দ উঠছে। ধীরে ধীরে তাঁদের চোখের সামনে সমস্ত পাহাড়টাই ভেঙ্গে জলের তলায় চলে গেল। তাঁদের চারপাশের জল যেন ফুটতে শুরু করে দিয়েছে, উত্তাল হয়ে উঠেছে সমুদ্র। কিছুক্ষণ পর যখন সমুদ্র শান্ত হোল, তখন তাঁরা দেখলেন, কিছুদূরে এক বালুকা তট তৈরি হয়েছে সমুদ্রের ওপর। তাঁরা প্রাণপণে সেদিকে সাঁতরে চললেন।

     “এই পাহাড়ের ভেতরে থাকা সমস্ত সুড়ঙ্গ, গুহা সবার মধ্যে জল ঢুকে যাওয়ায়, পাহাড়টা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না”। ক্যাম্পবেল বলে উঠলেন, “আর তার সাথে চিরকালের মতো সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেল, সেই অভিশপ্ত খিলান আর দুয়ারের ভ্রাতৃসঙ্ঘ”।

************************

(লেখক পরিচিতিঃ এডমন্ড মুর হ্যামিল্টনের জন্ম হয়েছিল ১৯০৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহিওতে। ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব বুদ্ধিমান হ্যামিল্টনের প্রথম গল্প প্রকাশ পায় ১৯২৬ সালের উইয়ার্ড টেলস ম্যাগাজিনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কল্পবিজ্ঞান লেখক হিসেবে তিনি প্রভূত খ্যাতি লাভ করেন। রোম্যান্টিক অ্যাডভেঞ্চার স্টাইলের কল্পবিজ্ঞান গল্প লেখার জন্যে তিনি বিখ্যাত ছিলেন। দা স্টার কিং, দা ক্রাসিং সান, ক্যাপ্টেন ফিউচার অ্যান্ড দা স্পেস এম্পেয়ারার – ইত্যাদি তার বিখ্যাত গল্প গুলির মধ্যে অন্যতম। কল্পবিজ্ঞান লেখিকা লেই ব্রেখেটকে বিবাহ করেন তিনি। ১৯৭৭ সালে তার জীবনাবসান হয়েছে।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!