অন্ধকারের অবয়ব – রাসকিন বন্ড

পেশায় স্কুল মাস্টার অলিভারবাবু একজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। এক সন্ধ্যায় তিনি সিমলা স্টেশনের গা ঘেঁষা পথ দিয়ে স্কুলের দিকে ফিরছিলেন। সাধারণত রোজ বিকেলে তিনি বেড়াতে বের হন। ভদ্রলোকের নিজের বলতে তেমন কেউ নেই, বিয়েও করেননি। কাজেই কোনও ঝুট ঝামেলার মধ্যে উনি থাকেন না।

     তিনি যে স্কুলটিতে পড়ান, বলা যায় সেটি অভিজাত সম্প্রদায়েরই স্কুল। এখানে ছেলেরা ব্লেজার, টুপি ও গলায় টাই পরে স্কুলে আসে। অনেকে তো স্কুলটিকে ‘ইটন কলেজ’-এর সঙ্গেও তুলনা করে থাকেন।

     সিমলা বাজার খুব জমজমাট জায়গা। রেস্টুরেন্ট, সিনেমা-হল, মানুষজন সর্বদাই গম্‌গম্‌ করছে। সিমলা বাজার থেকে অলিভারবাবুর স্কুলের দূরত্ব প্রায় তিন মাইল। বাজার পেরোনোর পর তিনি পাইন বনের পথ ধরলেন। এই রাস্তাটি অত্যন্ত নির্জন ও অন্ধকারচ্ছন্ন বলে সচরাচর রাতের দিকে এ পথে কেউ আসে না।   

     যখন সেখানে ঝড়ো হাওয়া বয়, পাইন গাছগুলো গম্ভীর হয়ে গিয়ে একটা গা ছমছমে ভাব সৃষ্টি করে। কিন্তু অলিভারবাবু মোটেই ভীতু বা কল্পনাপ্রবণ মানুষ নন। তার সঙ্গে সবসময় একটা টর্চ থাকে। আজ অনেকক্ষণ ধরে জ্বলার জন্য টর্চের ব্যাটারি প্রায় শেষের পথে।

     পথ চলতে চলতে হঠাৎই সেই টর্চের আলো গিয়ে পড়ল একটি জিনিসের ওপর। তিনি দেখলেন পথের ধারের একটা উঁচু পাথরের উপর একটা বাচ্চা ছেলে একাকী বসে আছে।

     অলিভারবাবু ছেলেটির কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি এখানে একা একা কি করছ বাবু?’

     তখনই অলিভার বাবু বুঝতে পারলেন যে ছেলেটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

     ‘তুমি কে? তোমার কি হয়েছে আমায় বলো। এসময় তোমার এখানে একা থাকা উচিত নয়।’

     ছেলেটি কোনও উত্তর দেয় না। কেবল মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকে।

     এবার অলিভারবাবু তার টর্চের আলোটা ছেলেটির মুখের উপর ফেললেন। একি! এ কি দৃশ্য দেখছেন চোখের সামনে! এটা কি মুখ! সেই মুখের কোথাও কোনও চোখ নেই, কোনও নাক নেই, কোনও কান নেই, কোনও ঠোঁট নেই। শুধু আছে কেবল একটা মুখ!

     কিন্তু এ কি করে সম্ভব! অলিভারবাবু আরও লক্ষ্য করলেন ছেলেটির পরনে রয়েছে ব্লেজার, গলায় টাই, মাথায় টুপি। ঠিক যেমনটা তার স্কুলের ছেলেরা পরে।

     এখানেই হয়ত গল্পটা শেষ হয়ে যেতে পারত, কিন্তু হল না। অলিভারবাবুর হাত থেকে সেই মুহূর্তে টর্চটা পড়ে গেল।

     তিনি প্রাণপণে দৌড়াতে লাগলেন। দিশাহীনভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে, বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করতে করতে কখন যে তিনি স্কুলবিল্ডিং-এর সামনে চলে এসেছেন খেয়ালই করেননি। স্কুলের দারোয়ানের কাছে এসে হাঁপাতে লাগলেন।

     ‘কি হয়েছে বাবু আপনার? এত হাঁপাচ্ছেন কেন?’ দারোয়ান সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল।

     ‘আমি! আমি একটা ভয়ঙ্কর জিনিস দেখে এলাম!’

     ‘কী জিনিস বাবু?’

     ‘একটা ছেলে…একটা বাচ্চা ছেলে…. কি ভয়ঙ্কর দেখতে!’

     ‘কেমন দেখতে বাবু?’

     ‘ছেলেটার মুখ আছে। কিন্তু সেই মুখে কোনও চোখ, নাক, কান, ঠোঁট নেই। খালি মুখটাই আছে।’

     কিচ্ছুক্ষণ থামার পর দারোয়ান বলল, ‘দেখুন তো বাবু আপনি কি এইরকম একটা মুখের কথা বলতে চান?’

     দারোয়ান তার হাতের লণ্ঠনটা তার মুখের কাছে তুলে ধরতেই অলিভারবাবু আঁতকে উঠলেন। সেই মুখেও কোনও চোখ নেই, কোনও কান নেই, কোনও নাক নেই, কোনও ঠোঁট নেই। কেবল মুখটাই রয়েছে!

     এমন সময় একটা ঝোড়ো হাওয়ায় দারোয়ানের হাতের লণ্ঠনটা নিভে গেল।

কল্পবিশ্ব সম্পাদকঃ গল্পটি  রাসকিন বন্ডের লেখা ‘এ ফেস ইন দ্য ডার্কনেস’ গল্পের অনুবাদ। 

One thought on “অন্ধকারের অবয়ব – রাসকিন বন্ড

  • April 6, 2018 at 5:33 am
    Permalink

    অনুবাদটিও বেশ টান টান হয়েছে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!