অপার্থিব মেধার সন্ধানে – পর্ব ২

রচনা  : সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী

অলঙ্করণ : দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য্য (চিত্রচোর)

গোল্ডিলক জোন  

রের রবিবার যথারীতি উৎসাহী ছাত্রের মতন হাজির হলাম প্রফেসর মহাকাশ ভট্টের বাড়িতে। আমি আসতেই স্যার জলখাবার আনতে বললেন। খেতে খেতে কথা হতে লাগল। আজ লুচি তরকারি – স্যারের প্রিয় খাবার। আমার তো বটেই।

     স্যার বললেন – “হ্যাঁ তুমি যেন সেদিন কী প্রশ্নটা করেছিলে?”

     আমি বললাম – “এই যে অগুনতি কোটি কোটি তারা। তাদের কোন গ্রহে মানুষ আছে আর কোথায় নেই তা বুঝব কী করে আর খুঁজবই বা কী করে?”

     স্যার বললেন – “আগে বুঝবটা কী করে বলি তারপর না হয় খোঁজা যাবে”। ইতিমধ্যে স্যারের সহকারী ধরণী দুটো প্লেটে করে সীতাভোগ আর মিহিদানা নিয়ে এল। স্যার বললেন – “আমার এক মামাতো ভাই বর্ধমানে থাকে, তার ছেলে গতকাল এসেছিল। ও নিয়ে এসেছে, ওখানকার এক নামকরা মিষ্টির দোকানের। ছোটবেলায় বর্ধমান থেকে দাদু, মামারা যখন আসতেন এত এত সীতাভোগ আর মিহিদানা নিয়ে আসতেন। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে।”

     কফি খেয়ে পাইপ ধরিয়ে স্যার বলতে শুরু করলেন – “দেখো প্রাণের উদ্ভব আর বিবর্তন শুধুমাত্র গ্রহের মধ্যেই হওয়া সম্ভব। আবার কোন গ্রহ পরিবারের সব সদস্যের মধ্যেই যে প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশ হবার মতন পরিবেশ থাকবে – সেটাও সম্ভব নয়। এটা অন্তত আমরা ভালভাবেই জানি যে সৌরজগতে আমাদের একমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণের বিকাশ হয়েছে – আর কোনটাতেই নয়। যদিও আমাদের হাতের সামনে একটিই উদাহরণ আছে তবুও তারই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অনুমান করতে পারি যে প্রাণের উদ্ভব আর বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ শুধুমাত্র পৃথিবী-সদৃশ গ্রহদের মধ্যেই থাকা সম্ভব।

     কোন একটি গ্রহ-সমন্বিত তারার চতুর্দিকে একটি বেল্টের বা বলয়ের মতন বৃত্তাকার জায়গাকে জ্যোতির্বিদরা চিহ্নিত করেছেন, যাকে বলা হয়ে থাকে Circum-stellar Habitable Zone’ বা CHZ অঞ্চল অর্থাৎ তারাকে ঘিরে একটি ‘বাসযোগ্য এলাকা’ যা প্রাণধারণের ও জীবনযাপনের পক্ষে সবচেয়ে অনুকূল স্থান। কারণ এই বলয়ের মতন অঞ্চলের তাপমাত্রা এমন যে সেখানে অবস্থিত গ্রহদের উপরিতলে যথেষ্ট পরিমাণ জল অন্তত কয়েক’শ কোটি বছর ধরে তরল অবস্থায় থাকতে পারে। আর প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকতে হলে তরল জল একান্ত অপরিহার্য্য অর্থাৎ শুধু বাষ্প বা শুধু বরফ হলে চলবে না। বলয়ের মতন অঞ্চলের দুটি বৃত্তাকার সীমানা। তার মধ্যে যেটি তারার কেন্দ্রের নিকটবর্তী – সেখানে কোন কক্ষপথে আবর্তিত গ্রহের সব জল বাষ্প হয়ে উবে যায় না আর দূরবর্তী যে সীমানা সেখানে অবস্থিত কোন গ্রহের সব জল কঠিন বরফে পরিণত হয় না। এখন তুমি যদি তাপামাত্রার কথা ভাব তা’ হলে এই অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা শূন্য থেকে একশ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের মধ্যে থাকতেই হবে। তারার এই বাসযোগ্য বলয়ের এলাকা কতটা তা তারার ভর থেকে গণনা করে আন্দাজ করা যেতে পারে।      

     আমাদের এই পৃথিবীর অবস্থানটা চিন্তা কর না। স্বাভাবিক ভাবেই পৃথিবী সূর্যের বাসযোগ্য বা CHZ এলাকাতেই অবস্থিত। সৌরমন্ডলে এই CHZ-এর ভেতরের সীমানা শুক্রগ্রহের কক্ষপথের সামান্য দূরে আর বাইরের সীমানা মঙ্গলের কক্ষপথ থেকে কিছুটা ছাড়িয়ে। যেহেতু মঙ্গল এই বাসযোগ্য এলাকার ভেতরে সে কারণে মঙ্গলে কোন রকম প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায় কি না – তা নিয়ে এত গবেষণা – যদিও কিছুই পাওয়া যায় নি।

     CHZ-এর অনুরূপ আরও একটি এ’রকম ‘বাসযোগ্য এলাকা’ আছে – সেটা Galactic Habitable Zone বা GHZ অঞ্চল – যা কোন গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে প্রায় ২২০০০ আলোকবর্ষ দূরত্ব থেকে আরম্ভ করে ৩০০০০ আলোকবর্ষ পর্যন্ত বলয়ের মতন জায়গা। অর্থাৎ এই অঞ্চলে যে সমস্ত তারা আছে তাদের অধীন গ্রহগুলিতে প্রাণ থাকা সম্ভব। তবে তারার মধ্যে CHZ বা বাসযোগ্য এলাকার সীমানা নির্ধারণে জল যেমন প্রধান বিবেচ্য, এই গ্যালাক্সিগত বাসযোগ্য এলাকার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ –

     ১) বাসযোগ্য গ্রহের গঠনে কতটা পদার্থ উপাদান হিসেবে পাওয়া যেতে পারে এবং

     ২) মহাজাগতিক বিপদ থেকে সে যায়গা কতটা সুরক্ষিত।

     আমি বললাম –“ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলাম না তো।”  

     স্যার বললেন – “বলছি। প্রথমটা কি বললাম – যে গ্রহের গঠনের জন্য উপাদান হিসেবে কতটা পদার্থ পাবার সম্ভাবনা। আমাদের এই মহাবিশ্বের যে সৃষ্টিতত্ত্ব বর্তমানে আপাতত স্বীকৃত তা’ হ’ল ‘বিগ ব্যাঙ’ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে আজ থেকে প্রায় ১৩৭০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের এক বিন্দুবৎ অবস্থা ছিল যার ঘনত্ব ও তাপমাত্রা ছিল অসীম। তখন স্থান ও কাল বলে কিছু ছিল না – উভয়ের মান ছিল শূন্য। এ অবস্থাকে বলা হয়েছে সিঙ্গুলারিটি – এটি শুধুমাত্র গাণিতিক ধারণা – বাস্তব ধারণা করা যায় না। সময়কে যদি t বলি তা হ’লে এই সময়টা হ’ল t=0 থেকে t=10-43 সেকেন্ড বা প্ল্যাঙ্ক মোমেন্ট। এই সময়কালে কি ঘটেছিল তার কোন সর্ব্বজনগ্রাহ্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এখনও গড়ে ওঠেনি। প্রকৃতির কোনও বৈজ্ঞানিক সুত্রই এখানে খাটে না। এই বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে বিশ্ব খুব দ্রুত প্রসারিত হতে থাকে এবং আজও বিশ্ব প্রসারিত হয়ে চলেছে।  

     এবারে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে যেমন বিশ্বের প্রসারণ হচ্ছিল তেমনি সে কারণে তাপমাত্রা কমে ক্রমে ক্রমে ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রন ও অন্যান্য উপ-পারমাণবিক পদার্থের সৃষ্টি হতে থাকে। বিশ্বের বয়স যখন ৩ মিনিট তখন তার তাপমাত্রা ১০৩২ ডিগ্রী কেলভিন থেকে ১০ ডিগ্রী কেলভিনে নেমে আসে আর এর ফলে ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রনদের সংযোজন প্রক্রিয়ায় হাল্কা মৌলিক পদার্থের অর্থাৎ হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ইত্যাদির সৃষ্টি হয় – এই প্রক্রিয়াকে বলে নিউক্লিও-সিন্থেসিস। বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী ঐ সময়ে যত মৌলিক পদার্থের উদ্ভব হয়েছিল তার ৭৫% হাইড্রোজেন, ২৪% হিলিয়াম ও ডিটেরিয়াম, ট্রিটিয়াম, লিথিয়াম, বেরিলিয়াম ও বোরন মিলে ১%। তবে সমস্ত বিশ্বই তখন মৌলিক পদার্থগুলির নিউক্লিয়াস ও মুক্ত ইলেক্ট্রনের মিশ্রণ বা প্লাসমা অবস্থায় ছিল। বিখ্যাত নোবেল প্রাইজ পাওয়া পদার্থবিদ স্টিভেন ওয়াইনবার্গের মহাবিশ্বের সৃষ্টির আধুনিক তত্ত্ব নিয়ে একটা বই আছে – সেটা অবশ্যই পপুলার সাইন্সের – নাম ‘দি ফার্স্ট থ্রি মিনিটস’। আসাধারণ বই – আমার কাছে আছে পড়ে দেখো।”   

     আমি বললাম – “বুঝতে পারবো’তো?”

     স্যার বললেন –“যা’তে বুঝতে পার – সে ভাবেই তো লেখা – তারপর আমি’তো আছি। হ্যাঁ যে কথাটা হচ্ছিল – প্রথম তিন মিনিটের প্রায় তিন লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ বছর পরে বিশ্বের তাপমাত্রা যখন প্রায় ৩০০০ ডিগ্রী কেলভিনে নেমে এল তখন মুক্ত ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসে বাঁধা পড়ে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম প্রভৃতির পরমাণুতে পরিণত হ’ল। এর পর কয়েক’শ বছর ধরে এই বিপুল পরিমাণ গ্যাস থেকে ধীরে ধীরে কোটি, কোটি গ্যালাক্সি আবার গ্যালাক্সিগুলোতে কোটি, কোটি তারা গড়ে উঠল। প্রথম প্রজন্মের তারাগুলোর উপাদান ছিল হাইড্রোজেন গ্যাস।

     আমি একটা ব্যাপার বুঝতে না পেরে স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম – “আচ্ছা স্যার, আপনি যা বললেন তা’তে দেখছি যে মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন, হিলিয়াম আর সামান্য লিথিয়াম-বেরিলিয়াম-বোরন থাকার কথা – তা’হলে পৃথিবীতে বাতাসে অক্সিজেন-নাইট্রোজেন কোথা থেকে আসছে বা লোহা, তামা, সোনা থেকে শুরু করে শ’খানেকের বেশী মৌলিক পদার্থই বা কোথা থেকে পাচ্ছি?”  

     “খুব ভাল প্রশ্ন করেছ” – স্যার বললেন –“সেটাই এবার বলব। তোমার মোটামুটি তারাদের জন্ম, বিবর্তন ও জীবনচক্রের সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা আছে। সুর্যের বা যে কোন তারার অভ্যন্তরে প্রায় দেড় কোটি ডিগ্রী তাপমাত্রায় তাপ-নিউক্লিও প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম ও শক্তির উদ্ভব হয়। এই শক্তিই আমরা তাপ আর আলো রূপে পাই। ততদিনই তারার জীবন  যতদিন পর্যন্ত তারার মধ্যে হাইড্রোজেন গ্যাসের জোগান থাকে। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তারারা কতকগুলো পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। তখন অভ্যন্তরের তাপমাত্রা ৫০ কোটি ডিগ্রী হয়ে গেলে তাপ-নিউক্লিও প্রক্রিয়ায় হিলিয়াম থেকে কার্বনের উদ্ভব হয়। এইভাবেই ক্রমান্বয়ে তারার মধ্যে বিশেষত যে সমস্ত তারার ভর সূর্যের থেকে বেশী – আরও উচ্চতর তাপমাত্রায় সর্ব্বাধিক ৩৮০ কোটি ডিগ্রীতে লোহা পর্যন্ত বিভিন্ন মৌলিক পদার্থের উদ্ভব হয়। এর পর থেকে ইউরেনিয়াম পর্যন্ত বা তারও পরবর্তী বাকি সব ভারী মৌলিক পদার্থগুলির উদ্ভব হয় সূর্যের থেকে বহুগুণ বেশি ভরসম্পন্ন তারাদের নোভা বা সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময়ে যখন তাপামাত্রা বেড়ে যায় প্রায় ১০,০০০ কোটি ডিগ্রী কেলভিন পর্যন্ত।   

     একটা জিনিস জেনে রাখ – জ্যোতিঃপদার্থবিদরা হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়া বাকি সব মৌলিক পদার্থদের ধাতু বলে থাকে। ধাতু পরমাণুর সংখ্যা ও হাইড্রোজেন পরমাণুর সংখ্যার অনুপাতকে বলা হয় মেটালিসিটি বা ধাতবতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যত বেশী সংখ্যক তারার বিস্ফোরণ হয়েছে তত বেশী পরিমান নতুন ধাতুর সৃষ্টি হয়েছে আর তার সঙ্গে ধাতবতার মানও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধাতুগুলিই আমাদের পৃথিবীর মতন গ্রহদের গঠনের মূল উপাদান। গ্রহের আকারও নির্ভর করে ধাতুর প্রাচুর্যের ওপর।  

     মহাকাশে তারা আর গ্রহদের জন্ম হয় নীহারিকার মধ্যে। নীহারিকা জান তো? হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও ধাতু সমন্বিত গ্যাস ও ধুলোর দানবাকৃতির মেঘ। এদের আকার কয়েক আলোকবর্ষ থেকে কয়েক’শ আলোকবর্ষ হতে পারে। প্রথম প্রজন্মের তারাদের ধাতবতা প্রায় ছিল না বললেই চলে। এই সব তারাদের জীবনকালে ও বিস্ফোরণে যে সব ধাতুর সৃষ্টি হ’ল তারা নীহারিকায় মিশে গেল। আবার সেই নীহারিকা থেকে পরবর্ত্তী প্রজন্মের তারাদের ও তারা সংলগ্ন গ্রহদের সৃষ্টি হ’ল।    

     এটা ধরে নেওয়া যায় যে কোন তারার ধাতবতা যত বেশী হবে তার পৃথিবী-সদৃশ গ্রহ থাকার সম্ভাবনাও তত বেশী। জ্যোতির্বিদরা আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিকে মোটামুটি চারটি ভাগে ভাগ করেছেন – জ্যোতির্বলয় (Halo) যা গ্যালাক্সির একদম বাইরের গোলাকার অঞ্চল, কেন্দ্রের স্ফীত অঞ্চল (Bulge), মোটা চাকতি (Thick Disc) আর পাতলা চাকতি (Thin Disc)। গ্রহগুলো যেমন নিজেদের কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, তারারাও তেমনি সপরিবারে গ্যালাক্সি কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে। আমাদের সূর্য সৌরমন্ডল সমেত মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের চতুর্দিকে প্রায় সাড়ে বাইশ কোটি বছরে একবার করে ঘুরে আসে। একে বলে গ্যালাক্টিক বছর।  

     এখন গ্যালাক্সির এই হ্যালো ও মোটা চাকতি অঞ্চলে আছে যত পুরোন তারা যাদের ধাতবতা খুবই কম। অধিকাংশ গুচ্ছ তারা স্তবক (Globular cluster) এখানে দেখা যায়। এগুলো আসলে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ ঘন সন্নিবেশিত তারার গুচ্ছ। তাই এ অঞ্চলে কোন তারার পৃথিবী সদৃশ গ্রহ থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আবার কেন্দ্রীয় স্ফীত অংশের তারাদের ঘনত্ব খুব বেশী। সেখানে প্রায়শঃই তারাদের মধ্যে সংঘর্ষ, নোভা বা সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটছে। এর ফলে যে গামা রশ্মি, এক্স-রে ও অন্যান্য মহাজাগতিক বিকিরণ নির্গত হচ্ছে তাতে তাদের ত্রিসীমানায় যদি বাসযোগ্য গ্রহ থেকেও থাকে – তাতে কোন বাসিন্দা যে থাকবে না সেটা নিশ্চিত। ধর আমাদের এই পৃথিবীর একশ আলোকবর্ষের মধ্যেও যদি দুটো তারার মধ্যে কোন সংঘর্ষ হয় – তাতে যে পরিমাণ মহাজাগতিক রশ্মি বিশেষ করে গামা রশ্মির বিকিরণ হবে পৃথিবীর একটি কাক প্রাণীও বেঁচে থাকবে না।  

     এখন বাকি রইল পাতলা চাকতি অঞ্চল। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এই অঞ্চলেই আমাদের সূর্যদেব সপরিবারে বিরাজ করছেন। কাজেই এ কথা নিশ্চিত যে গ্যালাক্সির বাসযোগ্য এলাকার মধ্যেই সূর্য অবস্থিত। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে আন্দাজ ৮ কিলোপারসেক বা ২৬০০০ আলোকবর্ষ দূরে ওরায়ন-স্পার বাহুতে সূর্য অবস্থান করছে”।

     আমি বলে উঠলাম –“স্যার ঐ কিলোস্পার কি বললেন ঠিক বুঝলাম না।”

     স্যার হেসে বললেন – “আরে কিলোস্পার নয়। একটা হ’ল কিলোপারসেক – জোতির্বিদ্যায় পারসেক হ’ল দূরত্বের একক – আলোকবর্ষের মতন। আলোর তরঙ্গ এক সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার যায় আর এভাবে এক বছরে যত পথ যায় – সে দূরত্বকে বলে এক আলোকবর্ষ। আর এক কিলোপারসেক হল ৩২৬১.৫৬ আলোকবর্ষ। আমাদের মিল্কিওয়ে হ’ল স্পাইরাল বা সর্পিল গ্যালাক্সি। মানে কেন্দ্র থেকে কয়েকটা নীহারিকা আর তারা সমন্বিত লম্বা লম্বা হাতের মতন বেরিয়ে গোল হয়ে কেন্দ্রকে পেঁচিয়ে আছে – অনেকটা চড়কিবাজির মতন। অবশ্য মিল্কিওয়ে ঠিক স্পাইরাল নয় – বলা হয় বার স্পাইরাল – কেন্দ্রটা সাবানের বারের মতন। দুটো বড় বাহু সাজিটেরিয়াস আর পার্সিয়াসদের মাঝে একটা ছোট বাহু আছে – নাম ওরায়ন-স্পার – সেখানেই এক কোনা দিয়ে সুয্যিমামার বাসা।   

     গবেষণা করে দেখা গেছে যে গ্যালাক্সি কেন্দ্র থেকে যত দূরে যাওয়া যায় – ধাতবতার মান ততই কমতে থাকে – প্রথমে কিছুটা দ্রুত হারে – তারপরে ধীর গতিতে। সূর্য যে জায়গায় অবস্থান করছে সেখানে অর্থাৎ গ্যালাক্সি কেন্দ্র থেকে ৮ কিলোপারসেক দূরে ধাতবতা প্রতি কিলোপারসেকে শতকরা ১৭ ভাগ করে কমতে থাকে। কোন অঞ্চলে কি হারে তারা গঠিত হচ্ছে তার ওপর সেখানকার ধাতবতার মানের এই ক্রমনিম্নগতির মাত্রা বা নতিমাত্রা নির্ভর করে। কেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরে গ্যাসের পরিমান হ্রাস পাওয়ায় কম তারা গঠিত হয় ও ফলে ধাতুর সৃষ্টিও কম হয়। যে কারণে গ্যালাক্সির সীমানা অঞ্চলে ধাতুর পরিমান কম থাকে।  

     একটা গ্যালাক্সির চাকতি অঞ্চলের ধাতবতার প্রকৃতি থেকে বাসযোগ্য এলাকাকে নির্ধারণ যেতে পারে। দেখা গেছে আমাদের সূর্যের যে ধাতবতার মান তার ষাট থেকে দু’শ শতাংশ মানযুক্ত তারারা সাধারণতঃ গ্যালাক্সির কেন্দ্র হ’তে ৪.৫ থেকে ১১.৫ কিলোপারসেক দূরত্বে থাকে – এই বাসযোগ্য এলাকাটা ৭ কিলোপারসেক চওড়া একটা বেল্ট। আর এই বেল্টের মধ্যে গ্যালাক্সির মাত্র ২০ শতাংশ তারা আছে। সূর্যের সমবয়সী ও প্রতিবেশী যে সমস্ত তারা আছে তাদের তুলনায় সূর্যের ধাতবতার মান ৪০ শতাংশ বেশী – যা তার গ্রহদের গড়ে ওঠার পক্ষে বাড়তি সুবিধা ছিল। সে জন্য সূর্যকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের তারা বলে মনে করা হয়।       

     আবার শুধুমাত্র ধাতবতাই যে বাসযোগ্য গ্রহ গঠনের পূর্ব্বশর্ত তা নয় – বিভিন্ন মৌলিক পদার্থের আপেক্ষিক প্রাচুর্যও বিচার বিবেচ্য। দেখ না – মৌলিক পদার্থের যে পর্যায় সারণি বা মেন্ডেলিভের পিরিওডিক টেবিল কেমিস্ট্রিতে পড়েছ – তাতে বিশ্বে যত রকম মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হওয়া সম্ভব সবগুলোই আছে আর এই সবকটাই পৃথিবীতে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় যে সমস্ত পদার্থ আমাদের জীবন ধারণ ও সভ্যতা গড়ে ওঠার জন্য অধিক প্রয়োজন – তাদের প্রাচুর্যও বেশী। যে সমস্ত পদার্থ ক্ষতিকারক যেমন রেডিয়াম, পোলোনিয়াম জাতীয় তেজস্ক্রিয় বা ক্যাডমিয়াম, আরসেনিক বা পারদের মতন বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ কম। এসব শর্ত মিলে গেলেই যে বাসযোগ্য বলে সারটিফিকেট পাবে তা নয় – দেখতে হবে নানাবিধ ক্ষতিকারক মহাজাগতিক বিকিরণ বা ধুমকেতু, উল্কা, গ্রহাণুদের অতর্কিত আক্রমণ থেকে দূরে সুরক্ষিত অঞ্চলে অবস্থান করছে কি না। সেইদিক থেকে লক্ষ্য কর একটা গ্যালাক্সির বা তারার বাসযোগ্য এলাকা না তাদের কেন্দ্রের কাছে, না তাদের সীমানায় – মোটামুটি একটা মধ্যবর্ত্তী অঞ্চলে। এ জন্য এই অঞ্চলগুলোকে বলা হয়ে থাকে ‘গোল্ডিলক জোন’। গোল্ডিলক প্রিন্সিপল মানে কতকটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করা – সেই যে গোল্ডিলক বলে একটি ছোট্ট মেয়ে আর তিন ভালুকের রূপকথার গল্প আছে না – সেখান থেকেই কথাটা এসেছে।”      

     আমি বললাম – “স্যার! তা’হলে দেখা যাচ্ছে যে একটা গ্যালাক্সির মধ্যে যে সব তারারা গ্যালাক্টিক হ্যাবিটেবল জোনে অবস্থান করছে এবং সে সব তারাদের মধ্যে আবার যে সব গ্রহরা সারকাম-স্টেলার হ্যাবিটেবল জোনে রয়েছে সেগুলোই বাসযোগ্য গ্রহ এবং সেগুলোতেই প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটবে। আর অপার্থিব মেধার খোঁজ করতে গেলে আমাদের এই সব গ্রহদের লক্ষ্যবস্তু করতে হবে।”

     স্যার খুশী হয়ে বললেন – “ভেরি গুড – ঠিকই ধরেছ, তবে… কিছু কিন্তু, যদি রয়ে গেছে। প্রথম কথা এই গোল্ডিলক জোনে অবস্থিত গ্রহদের মধ্যে ‘প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটবে’ – এ কথা বলা যায় না বরঞ্চ বলতে পারো প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটার সুযোগ আছে। আর দ্বিতীয় কথা প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে থাকলেই যে আমরা তাদের সন্ধান পাব এমনটা নাও হতে পারে। 

     আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে যদি দশ হাজার কোটি তারা থেকে থাকে – তবে তার ২০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় দু’হাজার কোটি তারা বাসযোগ্য এলাকায় রয়েছে। এদের যদি একটা করেও গ্রহ থাকে তা’হলে ধরে নিচ্ছি দু’হাজার কোটি গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে। গত রবিবার তোমাকে যখন ফের্মি প্যারাডক্স নিয়ে বলছিলাম, তোমার মনে আছে নিশ্চয় হার্বার্ট ইয়র্ক ই’মেলে এরিক জোনসকে জানিয়েছিলেন যে ফের্মি সেদিন কিছু সম্ভাব্যতার হিসেব করেছিলেন। যেমন, আমাদের পৃথিবীর মতন কত গ্রহ থাকতে পারে, তাদের মধ্যে কতগুলিতে প্রাণ এবং কতগুলিতে মানুষ থাকা সম্ভব, তাদের মধ্যে আবার কতগুলিতে পৃথিবীর মতন উন্নত প্রযুক্তিগত সভ্যতা থাকতে পারে ইত্যাদি। গণনার ভিত্তিতে তিনি বলেছিলেন যে – ইতিমধ্যেই ভিনগ্রহীদের পৃথিবীতে আসা উচিৎ ছিল এবং তাও অনেকবার।  

     এবার আমি তোমাকে আর একজন বিখ্যাত আমেরিকান নভপদার্থবিদের কথা বলব যার নাম ডঃ ফ্রাঙ্ক ড্রেক – ষাটের দশক থেকে যাঁরা এই বহির্বিশ্বে উন্নত মেধাবিশিষ্ট প্রাণীর সন্ধানে গবেষণা করেছেন তাঁদের মধ্যে ফ্রাঙ্ক ড্রেক একজন অন্যতম পথিকৃৎ। এটা ঠিক কথা যে অন্যান্য গ্রহে প্রাণ হয়তো থাকতে পারে – কিন্তু আমাদের মতন উন্নত বা আরও বেশী বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সভ্যতা না থাকলে আমরা তাদের সন্ধান পাব না। এখন কত এ ধরণের উন্নত সভ্যতা বিরাজ করছে তার একটা সম্ভাব্য অনুমান করার জন্য ড্রেক একটা সমীকরণ তৈরী করেছিলেন যেটা ‘ড্রেক সমীকরণ’ নামে প্রসিদ্ধ”।

     এই বলে স্যার সোফা থেকে উঠে সামনের টেবিল থেকে একটা লেখার প্যাড আর কলম নিয়ে এসে একটা পাতায় লিখলেন-

     এখন এই সমীকরণ ড্রেক তৈরী করেছিলেন ভিনগ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণী আছে কি না সেই নিয়ে একটি আলোচনা চক্রের এজেন্ডা হিসেবে। অবশ্য এই সমীকরণ সে ভাবে কোন আভাস দিতে পারেনি কারণ এর শেষ চারটে ফ্যাক্টরের কোন রকম মান জানা নেই আর আন্দাজ করাও কষ্টসাধ্য। নানা জনের নানা রকম আন্দাজের ফলে দেখা গেছে যে একমতে তাবৎ মহাবিশ্বে একমাত্র আমাদের পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও প্রাণের উদ্ভব হয়নি – আবার কারোর মতে সর্ব্বাধিক প্রায় দেড় কোটি গ্রহে মেধাবী জীবের সন্ধান পাবার সম্ভাবনা। তাই ড্রেক সমীকরণ সে ভাবে কাজে না লাগলেও এতগুলো ফ্যাক্টরের এত অনিশ্চয়তা একটা বিষয় স্পষ্ট করেছিল যে আমাদের অনেক কিছু এখনও জানতে বাকি আছে।  

     তাহলেই দেখও প্রথমতঃ গ্যালাক্সির ও দ্বিতীয়তঃ তারাদের গোল্ডিলক জোনে কোন গ্রহ থাকলেই যে সেখানে প্রাণের বিকাশ ঘটবে এমন কোন কথা নেই, আবার প্রাণের বিকাশ ঘটে থাকলেও যে আমরা তার সন্ধান পেয়ে যাব তারও মানে নেই। তবুও এ কথা ঠিক বহির্বিশ্বে যদি প্রাণের সন্ধান করতেই হয় তবে এই গোল্ডিলক জোনে অবস্থিত গ্রহদেরকেই লক্ষ্যবস্তু করতে হবে।

     তোমার যে দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল কি ভাবে খুঁজব – সেটা আমরা আবার সামনের রবিবার আলোচনা করব। সেদিন তুমি দুপুর বেলা আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবে।”    

[ক্রমশঃ]

4 thoughts on “অপার্থিব মেধার সন্ধানে – পর্ব ২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *