অ-শূন্য সম্ভাবনা

এন. কে. জেমসিন, বাংলা অনুবাদ - এম. ডি. মহাশ্বেতা

অলংকরণ:চিত্রা মিত্র

সৈনিক যেমন যুদ্ধে যাওয়ার আগে প্রস্তুতি নেয়, প্রতিদিন সকালবেলা অ্যাডেল কাজে যাওয়ার জন্য ঠিক সেইভাবেই যেন তৈরি হয় । প্রথমে একটু ঠাকুর দেবতার নাম করে নেয়, তার আইরিশ পূর্বপুরুষের আরাধ্য ক্রিশ্চান ঈশ্বর ও তার আফ্রিকান পূর্বপুরুষের আরাধ্য ওরিশা – দুই পক্ষকেই মন ভরে ডাকে সে। দ্বিতীয় দলটির সঙ্গে অবশ্য তার খুব একটা পরিচিতি নেই, কিন্তু সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

     তারপর সে চান সেরে নেয়। বিভিন্ন ঔষধি মেশানো জল, রোদে শোকানো চিকরি ও সামান্য অলস্পাইসের আভাস পাওয়া যায়। তার পাড়ার ছোট্ট গাছগাছড়ার দোকানে যে মহিলা বসে, সেই তাকে একটা গুঁড়ো মতন দিয়েছে। (সে স্প্যানিশ খুব ভালো জানে না, কিন্তু সে সেইটা শেখারও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আজকের শব্দ হল হল ‘সুয়ের্তে’)।

     তারপর, গা থেকে কফি ও পাম্পকিন পাই-এর হাল্কা সুবাস ছাড়তে ছাড়তে সে গায়ে বর্ম চড়াতে থাকে। তার মায়ের পাঠানো সেইন্ট ক্রিস্টোফারের একটা মেডেল, যাতে সব যাত্রা শুভ হয়, ল্যারির সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার সময় সে যে চুলের ক্লিপটা পরেছিল। সে এখনও সেটাকে তার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত বলে মনে করে।  যেদিন বিপদের সম্ভাবনা সত্যিই খুব বেশি হয়, সে একটি বিশেষ প্যান্টি পরে। ল্যারি চলে যাওয়ার পর এইটা পরেই সে প্রথম যৌন উত্তেজনা অনুভব করেছিল। এখন অবশ্য একটু ছিঁড়েখুড়ে গেছে সেটা, বারংবার দোকানের লন্ড্রোম্যাটে কাচাকাচি করার দরুন। (এখন সে সেটাকে নিজের হাতে ধোয়, উলাইট দিয়ে, তারপর মেলে দেয় শুকোনোর জন্য।)

     তারপর সে কাজে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়ে। তার একটা সাইকেল আছে বটে, কিন্তু সে সেটা চালায় না। তার একজন প্রতিবেশীর হাত ভেঙে গেছিল একবার। সাইকেল চালাতে চালাতে সামনের চাকাটা হঠাৎ করে খুলে এসেছিল। কেন তা জানা যায়নি। নিছকই একটা দুর্ঘটনা হয়তো। তবুও।

     অতএব অ্যাডেল বেরিয়ে পড়ে, হাত দোলাতে দোলাতে। রোদ উঠলে আরাম করে হাঁটে সে, বৃষ্টি পড়লে ফালতু ছাতাটার সঙ্গে কুস্তি লড়তে হয় তাকে। (বাড়ির ভেতর এখন সে আর কোনওক্রমেই ছাতাটা খোলে না)। চারদিকে তাকাতে তাকাতে যায় সে, খোঁজার চেষ্টা করে এমন কেউ আশপাশে আছে কি যে তার মতো সুরক্ষিত নয়। তার পাড়ায় একটা কথা আছে, এক হাতে তালি বাজে না ঠিকই, কিন্তু বাওয়াল করতে গেলে ওই একটা হাতই যথেষ্ট। ঠিক তাই, তিনটে ব্লক পার হতেই বীভৎস ভাবে একটা গাড়ি ধাক্কা খায়। মাটি কেঁপে ওঠে, গাড়ির অ্যালার্ম বেজে ওঠে ভোঁ ভোঁ করে, চারিদিকে চিৎকার, চেঁচামেচি, কত মানুষ ছুটছে। এরপর আসে ধোঁয়া, তাতে ওজোনের ঝাঁঝালো গন্ধ, তার স্বাদটা ঠিক যেন নোংরা রক্তের মতো। অ্যাডেল এখন ত্রস্ত, যে কোন মুহূর্তে পালানোর জন্য তৈরি। শেষমেশ মোড়ের মাথায় যখন সে এসে পৌঁছয় তখন দেখে যে ফ্র্যাঙ্কলিন অ্যাভিনিউয়ের ছোট্ট শাটল ট্রেনটা, যেটা তার অল্প রাস্তার কিছুটা একটা উঁচুতে বানানো লাইন দিয়ে যায়, সেইটাই কিনা গোটা অ্যাটলান্টিক অ্যাভিনিউ জুড়ে চুরমার হয়ে পড়ে রয়েছে। ঠিক যেন একটা অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি মৃত তিমিমাছ। লাইন থেকে ছিটকে পরে গেছে ট্রেনটা। প্রায় তিরিশ ফুট নীচে রাস্তায় আছড়ে পড়েছে। ভিতরে, বাইরে, নীচে যত মানুষ ছিল, সবাই শেষ।

     অ্যাডেল সাহায্য করতে দৌড়য়। সে ও আরও কিছু পরোপকারী মানুষ গিয়ে কোনও রকমে মৃত ও আহত শরীরগুলোকে টেনে হিঁচড়ে বের করতে থাকে ধ্বংসাবশেষের তলা থেকে। কিন্তু তা করতে করতেই অ্যাডেলের মনে কেমন যেন একটা অবজ্ঞার ভাব আসে। তার এই রাগটা আসলে ঝুটো। এই মৃত্যু ও মানব দেহাংশের জঙ্গলে ভয় অথবা উৎকন্ঠার চাইতে, রাগ অনুভব করাটা অনেক বেশি সহজ। তার একটু লজ্জাও হয় তাতে, কিন্তু রাগটাকে সে ধরে রাখে। রাগটা তার একটা বর্ম যেন।

     ওদের জানা উচিত ছিল, ট্রেন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। তার অর্থ একটাই, কখনও না কখনও ঘটবেই।

     তার প্রতিবেশী—অন্য আর একজন, তার ফ্ল্যাটের উলটো দিকে থাকে। অঙ্কের মাস্টারমশাইদের জটিল হিসেবনিকেশের অনেক আগে সে-ই তাকে বুঝতে সাহায্য করেছিল ব্যাপারটা।

     ‘দ্যাখো,’ ও বলেছিল, তারপর তাসের একটা ডেক উল্টো করে অ্যাডেলের কফি টেবিলের ওপর সাজিয়ে রেখেছিল। (কাপগুলোতে কফি ছিল, বেশ খানিকটা হুইস্কি মেশানো। ছেলেটা মানুষ ভালো ছিল বলেই অ্যাডেল ওকে নিশ্চিন্ত মনে এইসব দিয়েছিল)। খেলোয়াড়ের দক্ষতা দিয়ে ও তাসগুলোকে শাফল করল একবার, তারপর ভাগ করে আবার শাফল করেছিল। আবার উল্টো করে সাজিয়ে দিয়েছিল টেবিলের ওপর। তারপর বলেছিল, ‘একটা তাস তুলে নাও।‘

     নিয়েছিল অ্যাডেল। জোকার।

     ‘এই ডেকটাতে কিন্তু মাত্র দুখানা জোকার আছে,’ এই বলে ও আবার শাফল করে সাজিয়ে রেখেছিল। ‘আরেকটা তোলো।’

     অ্যাডেল আবার নিয়েছিল, এইবার তার হাতে অন্য জোকারটা।

     ‘কাকতালীয় ব্যাপার,‘ বলে উঠেছিল সে। (এইটা কিন্তু বেশ কয়েক মাস আগের কথা, তখনও তার পুরোপুরি বিশ্বাস হয়নি)।

     ছেলেটা তখন মাথা নাড়িয়ে তাসগুলোকে সরিয়ে রাখল। তারপর পকেট থেকে দুখানা ছক্কা বের করে আনল। (ছেলেটা মানুষ ভালো বলেই ফ্ল্যাটের ভিতরে ডেকেছিল সে, কিন্তু তবুও একটু কেমন যেন)। ‘দেখে নাও একবার,’ বলে ছক্কা দুটো টেবলের ওপর ফেলল ও। দুটো পুট। ও আবার ছক্কা দুটো তুলে নিল, একটু ঝাঁকিয়ে টেবিলের ওপর ফেলল। আবার সেই এক। তিন নম্বর বার দুটো ছক্কা; এইটা দেখে অ্যাডেল একটু আশ্বাস পেয়েছিল। কিন্তু চার নম্বরের বার আবার দুটো পুট।

     ‘তুমি ঠিক কী ভাবছ আমি জানি না, কিন্তু এগুলোতে কিন্তু কোনও চিটিংবাজি নেই,’ ও বলল, ‘ধারগুলো কেউ চেঁছে রাখেনি। এখান থেকে একটু এগিয়ে যে বোদেগাটা আছে না, আমি এগুলো ওইখানেই পেয়েছিলাম। বুড়োটা একগাদা জঞ্জাল ফেলে দিচ্ছিল খাবার রাখার তাক লাগাবে বলে। এক্কেবারে নতুন তাক, বাক্স থেকে বের করছিল সেইদিনই।’

     ‘খুঁতো হতে পারে ছক্কা দুটো,’ অ্যাডেল বলল।

     ‘তা হতে পারে। কিন্তু তাসগুলো তো খুঁতো নয়, তোমার আঙুলগুলোও নয়।’ ও একটু এগিয়ে এলো, হুইস্কির আরামদায়ক নেশা সত্ত্বেও ওর চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত একাগ্রতা। ‘চারবারে তিনবার দুটো পুট? আর একবার দুই ছক্কা? এটা তো জালি খেলাতেও হয় না। এবার এইটা দ্যাখো।’

     এই বলে সে তার অন্য হাতের দুটো আঙুল কাটাকুটি করে আবার ছক্কা দুটো ফেলল, ছ’বার ফেলল। দুই পুট আবার পড়ল বটে, কিন্তু তার সঙ্গে অন্য সংখ্যাও পড়ল, চার, তিন, দুই, পাঁচ। আর খালি একবার দুই ছক্কা।

     ‘এ কি ঢপের চপ!’ অ্যাডেল বলে উঠল।

     ‘হ্যাঁ, কিন্তু চোখের সামনে দেখলে তো।’

     ছেলেটা ঠিকই বলছিল। তাই অ্যাডেল ভাগ্যের রকমফের নিয়ে গভীরভাবে পড়াশুনা শুরু করে দিল। আর কখনও আয়না ভাঙবে না ঠিক করল। এমনকী ব্লকের অন্যদিকে যে আগাছা ভরা একফালি বাগান আছে সেইখানে চার পাতার ক্লোভার খুঁজতেও গেল সে। (চায়না টাউনে নাকি বেচে এইগুলো, কিন্তু সে শুনেছে ওগুলো নকল।) গত কয়েক মাস ধরে অনেকবার সেখানে হানা দিয়েছে সে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খুঁজেছে। আদৌ কিছু পায়নি কিন্তু তাও এখনও সে আশাবাদী।

     ব্যাপারটা শুধু নিউ ইয়র্কেই হয়। সেইটাই আশ্চর্যের বিষয়। ইয়ঙ্কার্স? কিচ্ছুটি হয় না। জার্সি? তাও ঠিক আছে। লং আইল্যান্ড? তাও ভালো। পূর্ব নিউ ইয়র্ক ছাড়ালে আর কিছু হয় না।

     নিউজ চ্যানেলগুলোই প্রথম এই খিঁচটা ধরতে পেরেছিল, কিন্তু ধর্মওয়ালাগুলো সত্যিই এইটাকে নিয়ে যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়ল। এদের মধ্যে অনেকেই শেষের সে দিন যে আসতে চলেছে তার চেতাবনি দিয়ে চলেছেন গত হাজার বছর ধরে; অ্যাডেল আর তাদের এই উত্তেজনাকে তাই দোষ দেয় না। কিন্তু তাদের পরিপ্রেক্ষিতটা ধরতে একটু অসুবিধে হয় তার। পৃথিবীতে নিশ্চয়ই নিউ ইয়র্কের থেকে আরও বড় বড় পাপের ডেরা রয়েছে। দিল্লিতে কিলবিল করছে গরিব লোক, মস্কোতে মব, মাফিয়ার আখড়া, ব্যাংককে পিডোফিলদের স্বর্গ। সে শুনেছে প্যাসিফিক নর্থ-ওয়েস্টে নাকি এখনও বেশ কিছু শুধু শ্বেতাঙ্গদের সানডাউন টাউন আছে। কিন্তু শেষমেশ সবাই নিউ ইয়র্ককেই গালাগালি দেয়।

     আর তা ছাড়া সব ক’টা ঘটনা তো খারাপ নয়। সরকার লটারি তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে কারণ একই সপ্তাহে গাদাগাদা বিজেতা এসে টাকা নিয়ে যাওয়াতে কোম্পানিপুরো ফতুর হয়ে গেছে। নিক-রা ফাইনাল অবধি উঠেছে আর মেট-রা সিরিজটা জিতে গেছে। অনেক ক্যানসার রোগী হঠাৎ করেই সেরে উঠেছে, অনেক এইডস রোগীর রক্তে ভাইরাস অদৃশ্য হয়ে গেছে। (আজকাল একটা নতুন ধরনের ট্যুর হচ্ছে। দোতলা বাস ভর্তি অসুস্থ অথবা বিকলাঙ্গ মানুষ বেড়াতে বেরচ্ছে। অ্যাডেল নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য কখনও কখনও বলে ওরা শুধুই সাধারণ ট্যুরিস্ট)।

     শহরের বাইরে থেকে যে মিশনারিরা আসে তারা বোধহয় সবচেয়ে খারাপ। প্রতিদিন রাস্তায় একজন না একজন তার সামনে এসে হাজির হয় আর হাতে একগাদা কাগজ ধরিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যায়, তার আত্মা ঈশ্বরের হাতে পরিত্রাণ পেয়েছে কি? আজকাল সে অনেক দূর থেকে ওদের ধরে ফেলতে পারে। রাস্তার জনসমুদ্রের মাঝে কয়েকটা ঘ্যানঘ্যানে দ্বীপের মতো ওরা দাঁড়িয়ে থাকে, মুখে সবসময় কেমন একটা তৃপ্তির জ্যোতি। কোন আত্মসম্মানযুক্ত নিউ ইয়র্কার পেটে তিনটে বিয়ার আর হাতে মাইনের মোটা চেক না থাকলে এইরকম মুখভঙ্গি করবেই না। ওই যে একটা, ওইখানে, ভাড়া বাঁধার একটা মইয়ের ঠিক নীচে দাঁড়িয়ে আছে। গাধা কোথাকার; আর দু’পা পিছোলেই ওর বাস চাপা পড়ার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। (আর তারপরে বাসে ঠিক আগুন লেগে যাবে)।

     ঠিক যে মুহূর্তে অ্যাডেল ওকে দেখে, ছেলেটিও অ্যাডেলকে দেখে ফেলে, আর ওর দাগে ভরা মুখে একটা হাসি খেলে যায়। অ্যাডেলের ওকে দেখে গোসাপজাতীয় একটা প্রাণীর কথা মনে পড়ে যায়। অন্ধ বলেই হয়তো এদের গা ভর্তি আলো আঁচ করবার জন্য বুটি বুটি দাগ। এইজন বোধহয় পাপীতাপী দেখলে বুঝে ফেলে। অ্যাডেল ডানদিকে ঘুরে গিয়ে বাঁধা ভাড়াটার ধার দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই ছেলেটা এক পা সরে গিয়ে ঠিক ওর সামনে এসে হাজির হয়। সে এবার বাঁদিকে যাওয়ার চেষ্টা করে; ছেলেটা আবার ঠিক সেইখানেই উপস্থিত।

     অ্যাডেল দাঁড়িয়ে পড়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে, ‘কী?’

     ‘আপনি কি—?’

     ‘আমি ক্যাথলিক। আমাদের জন্মের ঠিক পরেই একবার পরিত্রাণ দিয়ে দেয়, জানেন না?’

     ছেলেটির মুখে এবার একটা ক্ষমাশীল হাসি। ‘তার মানে তো এই নয় যে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারব না।‘

     ‘আমি এখন খুব ব্যস্ত।’ সে ওর অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে ওকে হঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ছেলেটিও তুখোড়, অভিজ্ঞ লাইনব্যাকারের মতো এগিয়ে আসে তার সঙ্গে।

     ‘তাহলে আপনাকে খালি এইটা দেব,’ ও অ্যাডেলের হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দেয়। ধর্মবাণী নয়। তার থেকে বড়। একটা প্রচারপত্র। ‘দিনটা মনে রাখবেন, ৮ আগস্ট।’

     এটাতে অবশেষে অ্যাডেলের টনক নড়ে। ৮ আগস্ট! মানে ৮/৮— চিনারা এই দিনটাকে খুব শুভ মনে করে। সে-ও তার ক্যালেন্ডারে এই দিনটাকে দাগ দিয়ে রাখে গাড়ি ভাড়া করবার অথবা আইকিয়া যাওয়ার দিন হিসেবে।

     ‘ইয়ঙ্কি স্টেডিয়াম,’ ছেলেটি বলে, ‘আসবেন। আমরা একসঙ্গে প্রার্থনা করে শহরটাকে সমূহ বিপদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনব।’

     ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে,’ অ্যাডেল অবশেষে ছেলেটির হাত ফসকে বেরিয়ে আসে। (আসলে ও-ই ছেড়ে দিয়েছিল তাকে। ও জানে অ্যাডেল আসবে)।

     অ্যাডেল ডাউনটাউন থেকে বেরোনোর অপেক্ষা করে কাগজটা পড়ার জন্য। ডাউনটাউনের রাস্তাগুলো আসলে বড়ই সরু ও দমবন্ধটাইপ, আর তাকে তো চোখকান খোলা রাখতে হবেই। দিনটা বেশ গরম। অধিকাংশ বাড়িতে এসি চলছে আর যন্ত্রগুলোকে ঠিক করে জানালায় লাগাতেই পারে না এরা। কখন কী হয়!

     ‘শহরের আত্মার জন্য একটি প্রার্থনা,’ প্রচারপত্রটা ঘোষণা করছে। প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও অ্যাডেলের কৌতূহল হয়। তার নীচে লেখা যে পাঁচ লক্ষেরও বেশি শহরবাসী প্রতিজ্ঞা করেছে যে তারা ওইদিন একত্রিত হবে ও তাদের মিলিত প্রার্থনার শক্তি বেড়ে যাবে বহুগুণ। তাহলে আজকাল এইসব জিনিসেরও শক্তি আছে, সে ভাবে। প্রিন্সটনে একটা ল্যাব আছে এইসব নিয়ে গবেষণা করার জন্য—কয়েকদিন আগে নতুন করে সেটাকে উদ্বোধন করা হয়েছে আর অনেক টাকা দেওয়া হয়েছে—এরাই বোধহয় প্রমাণ করেছে এসব। তার মানে কি এই যে মহাবিশ্বে এমন কেউ আছেন যিনি তাদের সব প্রার্থনা শুনছেন? নাকি মানুষের চিন্তাতরঙ্গ এখন সত্যি সত্যিই বাইরের ঘটনাগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারছে? বিজ্ঞানীরা এইরকমই কিছু বলেছিল না? এসব প্রশ্নের উত্তর অ্যাডেলের কাছে নেই। তার জানার ইচ্ছাও নেই খুব একটা।

     কিন্তু সে মনে করে, আবার সে ট্রেনে উঠতে পারবে। এমনকী, ১৩ তারিখ শুক্রবারে পড়লেও সে হাসতে পারবে মন খুলে।

     সে আরও কত কিছু পারবে—এইখানে এসেই তার চিন্তাগুলো থেমে যায়, কারণ একটা বিষয় আছে যেটা নিয়ে সে ভাবতে চায় না, কিন্তু অনেকদিন কেটে গেছে, আর তা ছাড়া সে কখনই খুব একটা ভক্তিমতি ক্যাথলিক মেয়ে ছিল না। কিন্তু হয়তো সে আবার, হ্যাঁ আবার, প্রেম করতে পারবে।

     এই চিন্তাটা যখন তার মাথায় এল, তখন সে পার্কের ভিতর দিয়ে হাঁটছে। বিস্তৃত লন জুড়ে কৃষ্ণাঙ্গ বাচ্চারা খেলে চলেছে, ওদিকে শ্বেতাঙ্গ পুরুষ ও মহিলারা রোদ পোয়াচ্ছে, কিছু মেক্সিকান বৃদ্ধ ইটালিয়ান বরফ-গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে। সাধারণত এই ধরনের জিনিসগুলো সে আরও বেশি লক্ষ করে কিন্তু আজ, ওই প্রচারপত্রটা পড়ার পর থেকে সে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। অতএব সে খেয়াল করে না যে তার খুব কাছেই একটা বরফ-গাড়ি থেমে গেছে আর তার চালক স্প্যানিশে গালাগালি দিয়ে চলেছে কারণ গাড়িটার চাকা কাদায় আটকে গেছে।

     এর ফলে লোকটি সরাসরি একটা ছুটন্ত বাচ্চার দৌড়েরপথের মধ্যে পড়ে গেছে। বাচ্চাটার দৃষ্টি তখন একটা আকাশ থেকে পড়তে থাকা ফ্রিসবির ওপর আটকে রয়েছে। বাচ্চাটার মধ্যে শহরে বড় হওয়ার দরুন একটা স্বাভাবিক ঔদ্ধত্য আছে। আর তার ফলেই হয়তো সে ভেবেছে যে সে দৌড়তেই থাকবে আর তার পথ থেকে গাড়িটা সরে যাবে নিজে নিজেই। কিন্তু বাচ্চাটা সটান দৌড়ে গিয়ে ধাক্কা খেল গাড়িটার সঙ্গে।

     আর ঠিক তখনই গোটা বিষয়টা হঠাৎ অ্যাডেলের সামনে পরিষ্কার দেখা দিল।খুব দেরিতেই হয়তো, কিন্তু তবু শেষমশ সে বুঝতে পারল যে সে-ই হল এই ঘটনাগুলোর উপকেন্দ্র। বুঝতে পারল, গত কয়েক মাস ধরে যেসব বিধ্বংসী ঘটনার ঢেউ বয়ে যাচ্ছে তার এই পরিবর্তিত শহরের বুকে, তার ঠিক কেন্দ্রে আছে সে, অ্যাডেল। এসব ঘটনা তো সচরাচর হাসির সিনেমায় হয়। রিউব গোল্ডবার্গের কোনও কাজ যেন, রিলের পর রিল শুধু অসম্ভাব্যতা।

     গাড়িটা উল্টে গেল, বাটি বাটি রঙিন বরফ ছড়িয়ে পড়ল ঘাসের ওপর। বাচ্চাটা সার্কাসের খেলোয়াড়ের মতো উল্টে পড়ে গেল, সম্পূর্ণ দৈবক্রমে, তার পা দু’খানা দুটো বরফভর্তি বাটিতে। তার পতনের প্রবলতাই হয়তো বাটিগুলোকে বাধ্য করেছে বরফটাকে সটান ওপরের দিকে ঠেলে ছিটকে দিতে। ব্লু-বেরি-নারকেল-লাল-এর একটা মিলিত বিস্ফোরণ অ্যাডেলের মুখের দিকে ধেয়ে এল হঠাৎ। এত দ্রুত যে সে চিৎকার করারও সময় পেল না। খেতে অবশ্যই বেজায় ভালো হবে জিনিসটা, কিন্তু তার এহেন ধাক্কা হয়তো তাকে ঠেলে ফেলে দেবে রাস্তা ধরে চলতে থাকা বাইসাইকেলের ভিড়ের ঠিক তলায়।

     কিন্তু একদম শেষ মুহুর্তে ফ্রিসবিটা একটা উড়ন্ত বস্তুর গায়ে ধাক্কা খেল, বদলে গেল তার গতিপথ। এদিকে জমাট ফলের কিছু ফ্লেভার ছিটকে গিয়ে লাগল রোদ পোয়াতে আসা কয়েকজনের খোলা পিঠে, ফলে বড্ড মুষড়ে পড়ল তারা।

     অ্যাডেলর পায়ে আর শক্তি নেই। কী বাচান বেঁচে গেল সে একটুর জন্য! সে ধপাস করে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। তার বুকের ধুকধুকানি বেড়েই চলেছে। যাদের গায়ে বরফ লেগেছে তারা চেঁচামেচি করছে, বরফওয়ালা দৌড়ে গিয়ে দেখতে গেছে বাচ্চাটা ঠিক আছে কিনা। তাদের সবার মাথার ওপর কৌতূহলী পায়রার দল ভিড় করে উড়ে বেড়ায়। সে ঘাসের দিকে তাকায়। একটা চার পাতা-ওয়ালা ক্লোভার গজিয়েছে সেখানে, তার আঙুলটার পাশে।

     অবশেষে সে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। তার ব্লকের এক কোণে, সে একটা কালো বিড়াল দেখতে পেল। ডাস্টবিনের ওপর শুয়ে আছে। মাথাটা থেঁতলে গেছে আর কে যেন শরীরটাকে পুড়িয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করেছে। আহা রে! ভগবান, ও যেন এত অত্যাচারের আগেই মরে গিয়ে থাকে, এই ভেবে সে চলতে থাকে।

——

অ্যাডেলের একটা ছোট্ট বাগান আছে ফায়ার এস্কেপের ওপর। একটা টবে বেগুন আর বিভিন্ন ধরনের হার্ব; এখন সে সেখানে ক্লোভারও লাগিয়েছে। আরেকটা টবে লঙ্কা ও ফুল। আরেকটাতে টমেটো আর একটা অপুষ্ট কলার্ড। কিন্তু অ্যাডেল যেভাবে পাতাগুলো ছিঁড়ে নেয়, গাছটা কতদিন বাঁচবে কে জানে? (কিন্তু তার যে সবুজ তরকারি খেতে খুব ভালো লাগে!) এই তো ভাগ্য! উঁহু সৌভাগ্য! এই বছর তাকে বেছে নেওয়া হয়েছে একটা বাগান বানানোর জন্য। কারণ শহর এতটাই বদলে গেছে যে এখন পাইকারি বিক্রেতারা আর খাবার আনাতে পারছে না বাজারে, জিনিসপত্রের দাম তাই আকাশছোঁয়া। প্রতি শনিবার সে যে তরকারি-বাজারে যায় এখন সেখানে বিনিময় প্রথা শুরু হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে টব থেকে দুটো সরু, ঘনবেগুনি রঙের বেগুন তুলে নেয়, আর এক মুঠো ঝাল লঙ্কা। তার একটু তাজা ফলের প্রয়োজন। বেরি পেলে মন্দ হয় না।

     বেরনোর সময় সে তার এক প্রতিবেশীর দরজায় ধাক্কা দেয়। প্রতিবেশী ভদ্রলোকের মুখে বিস্ময়ের ছাপ, কিন্তু তাকে দেখে খুশিও হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তার মনে হয় হয়তো এই ছেলেটাও একটু সৌভাগ্যের আশায় বসে ছিল। একটু ভেবে সে তার হাতে একটা বেগুন ধরিয়ে দেয়। ছেলেটি একটু হতবুদ্ধি হয়েই তাকিয়ে থাকে বেগুনটার দিকে। (ওকে দেখে ও বেগুন খায় বলে মনে হয় না)।

     ‘কীভাবে রান্না করবে আমি পরে এসে তোমাকে দেখিয়ে যাব’খন,’ সে বলে। ছেলেটি একটু হাসে।

     তরকারি-বাজারে সে ঝাল লঙ্কাগুলোর বিনিময়ে বেশ কিছু দুষ্টুমিষ্টি রাস্পবেরি নেয়, আর বেগুনটার বদলে একটু রাবার্ব। তার কিছু তথ্যেরও দরকার, তাই সে খানিকক্ষণ সেখানে ঘোরাঘুরি করে, মানুষজনের সঙ্গে আড্ডা মারে। আগের থেকে সবাই বেশি কথা বলে এখন। কত ভালো।

     আর সবাই, সবাই তাকে বলে যে তারা যাবে সেই মিলিত প্রার্থনাসভায়।

     ‘আমার তো ডায়ালিসিস চলছে,’ ফুলভর্তি গাছের নীচে এক বৃদ্ধা তাকে বলে, ‘প্রতিবার আমার গায়ে তারগুলো লাগিয়ে দেয় ওরা, আমার প্রচণ্ড ভয় লাগে। ডায়ালিসিসে লোক মারাও যেতে পারে, জানো তুমি?’

     সে তো নিশ্চয়ই, অ্যাডেল ভাবে, তবে মুখে কিছু বলে না।

     ‘আমি ওয়াল স্ট্রিটে চাকরি করি,’ আরেকজন মহিলা বলে। খুব তাড়াতাড়ি কথা বলে সে, তার এক হাতে সে সোনার মতো করে আঁকড়ে ধরে আছে তাজা মাছের একটা ব্যাগ। সেটা খুবই স্বাভাবিক অবশ্য! মাছের এখন যা দাম! একটা ছোট্ট মিশরীয় স্ক্যারাব পোকার লকেট মহিলার নেকলেস থেকে ঝুলে আছে। ‘কোয়ান্টিটেটিভ অ্যানালিসিস। সব ক’টা মডেল ভোগে গেছে। হাউজিং মার্কেট পড়ে যাওয়ার পর শুধু এই আমাদের ক’জনের চাকরি ওরা খায়নি। আর এখন এইসব চলছে।’

     অতএব মহিলাও যাবেন প্রার্থনা করতে। ‘আমি অবশ্য নাস্তিক। কিন্তু যেরকম পরিস্থিতি, এখন সবকিছু করতেই রাজি আছি আমি।’

     অ্যাডেল আরও অন্য অনেককে খুঁজে বার করে। সবাই তাদের নিত্য যা যা কাজকর্ম করতে করতে থকে গেছে, সবাই চিন্তিত যে এরকম সবকিছু থেকে দূরে থাকতে থাকতে তারা সামনেই মারা পড়বে।

     সে তার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসে, কিছু মিষ্টি তুলসি পাতা ও একটা বেগুন নিয়ে চলে যায় পাশের ফ্ল্যাটে। তার প্রতিবেশী অল্প চিন্তিত। অ্যাপার্টমেন্টটা আগে কখনও সে এত পরিষ্কার দেখেনি, বাথরুমে পাইন সল-এর তীব্র গন্ধ। সে হাসি চাপে, তারপর প্রতিবেশীকে আস্তে আস্তে দেখিয়ে দেয় কীভাবে বেগুন ছাড়াতে হয়, তার গায়ে নুন মাখিয়ে টক্সিনগুলো বের করে দিতে হয় (‘নাইটশেড আর বেগুন খুব কাছাকাছি গোত্রের গাছ, জানেন তো’), তারপর তুলসি পাতার সঙ্গে হাল্কা করে অলিভ তেলে ভেজে নিতে হয়। প্রতিবেশী চেষ্টা করে মুগ্ধ সাজবার, কিন্তু অ্যাডেল বেশ বুঝতে পারে লোকটি তরকারি খেতে বিশেষ ভালোবাসে না।

     তারপরে তারা একসঙ্গে বসে আরসে লোকটিকে আসন্নগণপ্রার্থনার বিষয়ে বলে। ও একটু কাঁধ ঝাঁকায় শুধু। ‘তুমি যাবে?’ সে জিজ্ঞেস করে।

     ‘না।’

     ‘কেন? হয়তো এতেই কাজ হবে।’

     ‘হয়ত। অথবা, হয়ত বা এখন যেরকম পরিস্থিতি সেইরকম ভাবে থাকতেই আমার বেশি ভালো লাগে।’

     এই শুনে সে অবাক। বলল, ‘তোমার ভালো লাগে! ভগবান! গত সপ্তাহে ট্রেনটা লাইন থেকে পড়ে গেছিল। কুড়িজন মৃত। তারপরে প্রতি রাতে দরদর করে ঘামতে ঘামতে আমার ঘুম ভেঙেছে, কানে অগুন্তি মানুষের চিৎকারনিয়ে।’

     ‘সেটা তো অন্য সময়ও হতে পারত,’ ও বলে।

     শুনে অ্যাডেল হকচকিয়ে উঠল,  কারণ কথাটা অসম্ভব নয়। সরকারি তদন্তে বলেছে কেউ, একজন রেল কর্মচারী বোধহয়, পাওয়ার কাপলিং-এর কাছে একটা রেঞ্চ ফেলে গেছিল, তাতেই শর্ট সার্কিট ও বিস্ফোরণ। এটার সম্ভাবনা হয়তো কোটিতে এক, কিন্তু তাও তো শূন্য নয়।

     ‘কিন্তু… কিন্তু…’ সে অন্যান্য ভয়ঙ্কর সব ঘটনার কথা ওকে মনে করিয়ে দিতে চায়। গ্যাস লিক, বন্যা, হারলেমে একটা বাড়ি ধ্বসে গিয়েছিল, একদল হাঁসের আক্রমণে একজনের মৃত্যু। তার আশপাশের অনেক ফ্ল্যাটই ফাঁকা কারণ কেউই আর ঠিক পেরে উঠছে না। তার অন্য যে প্রতিবেশী, যার হাত ভেঙে গেছিল, সেও এই মাসের শেষেই বেরিয়ে যাবে। সিয়াটেল এ চলে যাবে, সেখানকার সাইকেলের রাস্তা অনেক ভালো।

     ‘এসব তো হতেই পারে,’ ও বলছিল, ‘আগেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে। বড়জোর একটু কম বেশি…’ আবার কাঁধ ঝাঁকায় ও, ‘কিন্তু দুর্ঘটনাই তো, তাই না?’

     সে কিছুক্ষণ চিন্তা করে। তারপর আরও বেশ খানিক্ষণ।

     ওরা তাস খেলে, তারপর একটু ওয়াইন খায়, তারপর অ্যাডেল ওকে ওর রান্না করা মুর্গির মাংস নিয়ে একটু ক্ষেপায়। ও যে অ্যাডেলকে খুশি করার জন্য এত চেষ্টা করছে সেটাতার ভালো লাগে। আরও ভালো লাগে যে অনেকদিন পর তাকে আর তার একাকিত্ব নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে না।

     তারপর ওরা ওর শোয়ার ঘরে চলে আসে।এ-বিষয়ে একটু আনাড়ি ওরা দুজনেই। তার একটু লজ্জাও হয় কারণ অনেক দিন পেরিয়ে গেছে, আর কিছু কিছু বিষয়ে চর্চা চলে গেলে অসুবিধে হয়। আর ও-ও একটু বেয়াক্কেলে। পর্ন দেখে দেখে বাজে অভ্যাস হয়ে গেছে ওর। কিন্তু শেষমেষ ওদের খুব সমস্যা হয় না। ওরা কন্ডোম ব্যবহার করে। ও যখন সেটা পরছে অ্যাডেল তখন দম বন্ধ করে প্রার্থনা করে। খাটের বাটামে একটা খরগোসের পায়ের মতো দেখতে লাকিচাবির রিং। ও অ্যাডেলের কাছে যাওয়ার আগে একবার সেটাতে হাত বুলিয়ে নেয়। ও বারংবার বলে যে ও একেবারে সুস্থ, আর অ্যাডেল তো বার্থ কন্ট্রোল পিল খাচ্ছেই, কিন্তু তবুও, কখন কী হয়।

     সে চোখ বন্ধ করে আর সবকিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে কিছুক্ষণের জন্য।

*

গণপ্রার্থনার খবর এখন চারিদিকে। তার পরের সপ্তাহেই তাদের একত্র হওয়ার কথা।সকালের টক শোগুলোতে বলাবলি হতে থাকে এটার নিশ্চয়ই কোন একটা ফল হবে, অবশ্য যদি সত্যিই যথেষ্ট পরিমাণে মানুষ সেখানে গিয়ে তাদের ‘পজিটিভ এনার্জি’ ছড়াতে পারে তবেই। খুব সাবাধানে আলোচনা সারছে ওরা,কোন একটা ধর্মের ভাষা যাতে না ব্যবহার হয় তারই চেষ্টা। হাজার হোক, এটা তো নিউ ইয়র্ক। যারা ক্রিশ্চান প্রার্থনায় যোগ দিতে না চায়, তারা অন্যান্য ব্যবস্থা করে নিচ্ছে। ইহুদিদের চলমান ‘সুক্কা’র গাড়িগুলো এদিক ওদিক যাতায়াত শুরু করে দিয়েছে, অথচ এইটা ওদের আদৌ চলার সময় না। কিন্তু সিনাগগ-গুলোতে যেহেতু কিছু প্রার্থনাসভা হচ্ছে, তারা সেইটাই ঘোষণা করতে বেরিয়ে পড়েছে। ফ্ল্যাটবুশে অ্যাডেল হাঁটতে বেরোলেই জেহোভাজ উইটনেসেস-দের পাল্লায় পড়ছে। নৈতিক মানবতাবাদীরাও কোথাও একটা ‘কন্সট্রাকটিভ ভিজুয়ালাইজেশন’এর ব্যবস্থা করেছে। সবাই তো আর ভগবানে, বা দেবদেবীতে বিশ্বাস করে না, আর এটাও বিশ্বাস করে না যে কেউ বাইরে থেকে এসে তাদের বাঁচাবে। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি, সবাইকে এইরকমই করতে হচ্ছে। আর সবাই বুঝতেও পারছে সেটা। যদি ভাগ্যের ওপর ভরসা করে ছক্কা ফেললে ফল অন্যরকম বেরোয়, তাহলে তার থেকেও বড় কিছু হতে ক্ষতি কী? এই আঙুল কাটাকুটির একটা বিশেষ মূল্য আছে। এটা শুধু তাদের জন্যেই শুভ যারা এটাতে বিশ্বাস করে। তারা যদি অন্য কিছুতেও বিশ্বাস করে, সেটা কাজ করবে।

     শুধু…

     অ্যাডেল বোটানিকাল গার্ডেন্স-এর পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। এখানে একটা বিরাট শিন্তো অনুষ্ঠান হবে। তারই প্রস্তুতি চলছে। কর্মচারীরা মিলে একটা সুন্দর লাল তোরণ বসাচ্ছে, খানিক থেমে সে সেটাকে দেখে।

     তার এখনও সাবওয়েতে একটু ভয় লাগে। আর প্রতিবেশীর কাছ থেকে সে খুব বেশি কিছু আশা করেও না, কিন্তু ছেলেটা ভালো। এখনও সে সকালবেলাটা বিভিন্ন রকমের তুকতাকের মধ্যে দিয়েই কাটায়, আর কাজে যাওয়ার পথটাও বিভিন্ন বিপজ্জনক জায়গা এড়িয়ে যাওয়ার মত করে সাজানো, কিন্তু সত্যিই তো, আগের থেকে এইটা খুব একটা আলাদা কিসে? আসলে, আগে সে এগুলো করত চুল আর মেক-আপ ঠিকঠাক করতে আর আর যাতায়াতের পথ ঠিক করত কোথায় গুন্ডা-ছিনতাইবাজের উৎপাত বেশি বা কম সেই হিসেবে। লাভের মধ্যে, এখন সে আগের থেকে অনেক বেশি হাঁটে, তার ওজন কমে গেছে বেশ খানিকটা, এমনকি প্রতিবেশীদেরও অনেকের নামও জানে সে এখন।

     চারিদিকে তাকিয়ে দেখে সে, অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে, সবাই মিলে তোরণটাকেই দেখছে। সে তাকাতে তারাও তাকায় তার দিকে, কেউ ঘাড় নাড়ায়, কেউ হাসে, কেউ চোখ ফিরিয়ে নেয়। তাকে আর এদের জিজ্ঞেস করতে হয় না তারা কোন একটা সভায় থাকবে কিনা; সে বুঝতে পারে যে তারা থাকবে না। কেউ কেউ ভয়ের মোকাবিলা করে সুরক্ষা দিয়ে, পরিবর্তন দিয়ে, নিয়ন্ত্রণ দিয়ে। বাকিরা বদলটাকে মেনে নেয় আর আগের মতই বাঁচে।

     ‘মিস?’ সে আশ্চর্য হয়ে পিছনে তাকায়। একটা অল্পবয়সি ছেলে, তার হাতে একটা প্রচারপত্র, খুব চেনা চেনা লাগছে। ডাউনটাউনের ছেলেটার মতো এ অতটা নাছোড়বান্দা নয় যদিও। কাগজটা সে যখন নিয়ে নেয়, ছেলেটি অন্যদিকে চলে যায়। কালকেই সেই গণপ্রার্থনা,‘শহরের আত্মার জন্য একটি প্রার্থনা।’ শাটল বাস শহর জুড়ে লোকজনকে তুলে নিয়ে আসবে কাল।

     প্রচারপত্রের একদম নীচে লেখা, ‘আমাদের প্রয়োজন আপনাদের বিশ্বাস।’

     অ্যাডেল একটু হাসে। তারপর মন দিয়ে কাগজটাকে ভাঁজ করে সে, ছোটবেলার একটা খেলার স্মৃতি তার আঙুলের ডগায় ডগায়, আর সেই স্মৃতি থেকে একদম নিখুঁত একটা কিছু তৈরি করে কাগজটা দিয়ে। প্রচারপত্রটা ছাপাতে কোনও ত্রুটি করেনি এরা। মোটা, ভারী কাগজ ব্যবহার করেছে।

     সে তার সেইন্ট ক্রিস্টফার-এর লকেটটা বের করে আনে, একটা আলতো করে চুমু খায়, আর প্রচারপত্রটার পিছনদিকের একটা ভাঁজের তলায় ঢুকিয়ে দেয় মেডেলটাকে, যাতে ভারসাম্য ঠিক থাকে।

     তারপর সে কাগজের প্লেনটাকে উড়িয়ে দেয়, আর সেটা উড়তে, উড়তে, উড়তে অনেকটা পথ চলে যায়, আস্তে আস্তে ছোট থেকে আরও ছোট হতে হতে একটা অসম্ভব দূরত্বের দিকে ধেয়ে যায়। সবশেষে আকাশের গাঢ় নীলে মিলিয়ে যায়।

One thought on “অ-শূন্য সম্ভাবনা

  • April 12, 2019 at 5:29 am
    Permalink

    যেমন সুন্দর গল্প, সেরকমই যথাযত অনুবাদ। মহাশ্বেতাকে অনেক অভিনন্দন এতো সুন্দর কাজের জন্যে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!