আঁখিশ্রী

আঁখিশ্রী

লেখক – পার্থ দে

অলংকরণ – সুমিত রায় 

 

(১)

মার্চ, ২০১৮, বিক্রমশীল পাবলিক স্কুল, কলকাতা

     স্কুলের পরীক্ষার আজ শেষদিন। সকাল থেকেই ছেলেমেয়েদের মুখে আনন্দের ছাপ। আজ পরিবেশ বিজ্ঞানের পরীক্ষা, ছাত্রছাত্রীরা তাই অনেকটা চাপমুক্ত। এরপর লম্বা ছুটি তিন সপ্তাহের, স্কুল খুলে আবার নতুন ক্লাস, নতুন পড়াশোনা। বিক্রমশীল সিবিএসসি বোর্ডের পাবলিক স্কুল, উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা এখানে পড়ে।

     গেট থ্রি দিয়ে ঢোকার সময় ক্লাস টেনের নয়নিকা বলল, “হাই ডুরান, হোয়াটস আপ? ছুটি কেমন কাটাবি?”

     “কুল ডুড, ক্লিভল্যান্ড যাচ্ছি, বাবার কাছে”, ডুরান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল। নয়নিকার দিকে ভালো করে চোখ পড়তে বলল, “ওয়াও নয়না, নাইস হেয়ার কাট!”

     “ইয়া”, ঝিলমিল করে হেসে নয়নিকা বলল, “সাইড ব্যাংস উইথ ওয়েভস, কুল না? ফ্রম জাওয়েদ।”

     ওদের পেছন পেছন নাইন টেনের ছেলেমেয়ের দল গেট থ্রি দিয়ে প্রবেশ করে মন্থরগতিতে এগোচ্ছিল ক্লাসরুমের দিকে। আজ ওরা সবাই গল্পের মুডে আছে।

     প্রিন্সিপ্যাল অনিতা ফ্লিন তার ঘরে বসে টেবিলের পাশে রাখা মনিটরে গেট-থ্রির সিসি টিভির ফিড দেখে বিরক্ত হয়ে বিড় বিড় করলেন, “ইনডিসিপ্লিনড কিডস!” তিনি মনিটরে দেখতে পাচ্ছেন গেট লাগোয়া সিকিউরিটি রুমের ভেতর বিক্রম মাট্টু ঝিমোচ্ছে। বছর পঞ্চান্নর বিক্রম এক্স-সার্ভিসম্যান। স্কুলের একমাত্র লাইসেন্সধারী আর্মড সিকিউরিটি, গেট ওয়ান এবং টু-তে আরও দুজন সিকিউরিটি আছে, ওরা কেউ আর্মড নয়। তা বলে বিক্রম সকাল আটটায় স্কুল শুরুর সময় ঘুমোবে! মিসেস ফ্লিন অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে মাইকটা টেনে বলে উঠলেন, “মাট্টুজী ওয়েক আপ! ড্রাইভ দ্য স্টুডেন্টস টু দ্য ক্লাস। ক্লিয়ার গেট নাম্বার থ্রি ইমিডিয়েটলি।”

     গেট থ্রি-র সিকিউরিটি রুমে ঘুমন্ত বিক্রম মাট্টুর কানে শব্দগুলো কেমন যেন হাতুড়ির ঘায়ের মতো পড়ল। সে চোখ মেলে তাকাল। চোখের মনিগুলো বারতিনেক লাট্টুর মতো ঘুরে স্থির হয়ে গেল। মুখ দিয়ে কেমন যেন জন্তুর মতো ঘোঁৎ করে একটা শব্দ বেরিয়ে এল। দিনকয়েক ধরেই তার ভীষণ জ্বর, মাথার মধ্যে যেন একটা ঝড় চলছে, সব কিছু ওলটপালট করে দিচ্ছে। কখনও অসহ্য যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়ছে মাথা। আজ সকাল থেকে যেন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, হাঁটতে গেলে ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে, চোখের সামনেটাও ঘোলাটে হয়ে এসেছে।

     বিক্রম টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। অস্থিরতাটা তার মস্তিষ্কের কেন্দ্রস্থল ছেড়ে এখন শিরা ধমনীর অলিতে গলিতে ঢুকে পড়েছে। বার্ড ফ্লু হওয়া মুরগির মতো ঘাড়টা তার একদিকে কাৎ হয়ে আছে। মাট্টু আচমকা পাশে রাখা তার বোল্ট অ্যাকশন উইনচেস্টার রাইফেলটা তুলে নিয়ে টলতে টলতে সিকিউরিটি কিয়স্ক থেকে বেরিয়ে এল। তার মাথার মধ্যে হাতুড়ির ঘায়ের মতো যেন পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের কর্নেল কালরার হুকুম ভেসে এল। মাট্টুর মনে হল সে যেন কারগিলের দ্রাসের লাইন অফ কন্ট্রোলে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে ঘিরে আছে পাকসেনা। বন্দুকটা তুলে নিয়ে সে ঝট করে নিশানা নিয়ে নিল। তার মাথার মধ্যে একটা টাইমবোমা অনেকক্ষণ ধরে টিকটিক করছিল, সেই কাউন্টডাউনটা শেষ হওয়ার মধ্যে সে হাতে ধরা উইনচেস্টারের ট্রিগার টিপল। তার মাথার মধ্যেকার অসহ্য যন্ত্রণার মতো বোমাটা ফাটল আর তৎক্ষণাৎ বন্দুক থেকে ছিটকে বেরোনো গুলিটা লক্ষ্যহীনভাবে গিয়ে দেয়ালের কানায় লেগে ক্লাস টেনের ডুরান চ্যাটার্জীর কাঁধে এসে বিঁধল। একটা আর্তনাদ করে বছর পনেরোর ছেলেটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। চারপাশ থেকে ভেসে এল ভীত সন্ত্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের গলার আওয়াজ। সিকিউরিটি অফিসার প্রৌঢ় বিক্রম মাট্টুর শরীরটাও গোত্তা খেয়ে হাঁটু ভেঙে মাটিতে পড়ে গেল। চোখ থেকে চশমাটাও ছিটকে গিয়ে পড়ল দূরে, মাট্টুর চোখের মনিটা বারদুয়েক নড়ে একেবারে স্থির হয়ে গেল।

     এক ঘন্টার মধ্যে বিক্রমশীল পাবলিক স্কুলের চত্বরে দুটো পুলিশ ভ্যান আর পাঁচটা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ওবি ভ্যান এসে হাজির হল। মধ্যকলকাতার এই স্কুলটার এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে এক বড় নার্সিংহোমে ইতিমধ্যে ডুরান চ্যাটার্জীকে ভর্তি করা হয়েছে। ওর অবস্থা সঙ্কটজনক। আজকের দিনটা প্রিন্সিপ্যাল অনিতা ফ্লিনের কেরিয়ারের সবচেয়ে কঠিন দিন হতে চলেছে। স্কুল অ্যাসেম্বলি হলে এই মুহূর্তে গার্ডিয়ান ফোরামের তিরিশজন প্রতিনিধি ও মিডিয়ার জনা দশেক সাংবাদিক তাকে ছেঁকে ধরেছে। চারদিক থেকে ছুটে আসছে মুহূর্মুহূ প্রশ্নবাণ।

     “ডু ইউ থিংক দ্যাট গানম্যান বিক্রম মাট্টু হ্যাজ এনি কানেকশন উইথ টেররিস্টস?”

     “ম্যাম, বাচ্চোঁ কি জিম্মেদারি আপ কে উপর। ইস হাদসা কে বাদ বাচ্চোঁ আপ কে স্কুল মেঁ সুরক্ষিত নেহি হ্যায়, আপ মানতে হ্যায়?”

     “ম্যাডাম এই ঘটনার পর আপনি কি পদত্যাগ করবেন?”

     প্রেসের সামনে বসে অনিতা ফ্লিনকে কার্যত অসহায় লাগে। তিনি একটা রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে শুরু করেন।

 

(২)

১৪ মার্চ, ২০১৮, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড, কলকাতা

     নীলসাদা ম্যারাপ বাঁধা সামিয়ানার তলায় মঞ্চে আজ ভিআইপি মানুষদের সমারোহ। মঞ্চের পশ্চাৎপটে ২০ফুট বাই ১০ফুট ফ্লেক্স লাগানো আছে। তার মাঝখানে বিশাল একটি চোখের ছবি আঁকা। ওপরে লেখা ‘আঁখিশ্রী’, চোখের তলায় লেখা ‘প্রৌঢ়জনে দেহ আলো…’।

     এই ধরণের সরকারি অনুষ্ঠানে মনন শীল খুব একটা আসে না, পারতপক্ষে এড়িয়ে চলে। তবু কমিশনার সাহেবের নির্দেশে আজ এখানে আসা।

     সরকারের খুব বড় স্বাস্থ্যপ্রকল্পের প্রথম বছরের সাফল্যের উদযাপন আজকে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তরের মন্ত্রী, স্বাস্থ্যসচিবসহ দলীয় বড় বড় নেতারা তো আছেনই, তাছাড়াও এই ‘আঁখিশ্রী’ প্রকল্পের ক্যাম্পেনের প্রধানমুখ টালিগঞ্জের সিনেমা জগতের রূপোলি পর্দার প্রবাদপ্রতিম জুটি শৌনক মুখোপাধ্যায় এবং অন্তরা সেনও এসেছেন এই অনুষ্ঠানে। বিশেষ জরুরী কাজে মুখ্যমন্ত্রী দিল্লি থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি উপস্থিত থাকার কথা জানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উনি এক মঞ্চে থাকবেন কিনা সেই নিয়ে মিডিয়ামহলে জল্পনা থাকলেও সব চাপানউতোর পেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হাজির থাকবেন বলে জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানটার আয়োজক যখন রাজ্য সরকার তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতেও প্রচারের আলো যে মুখ্যমন্ত্রীর ওপরেই থাকবে বলাবাহুল্য। ইতিমধ্যে লোকসভা নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে। প্রচারের এমন সুবর্ণ সুযোগ কেন্দ্র এবং রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের কেউই ছাড়তে চায় না।

     “স্যার, মোটামুটি সব ভিআইপি আর সেলিব্রিটিরাই এসে পড়েছেন। বাইপাস পরমা আইল্যান্ড ট্রাফিক গার্ড থেকে পাঁচমিনিট আগে কনফার্ম করেছে এয়ারপোর্ট থেকে আসা সিএমের কনভয় মা ফ্লাইওভারে উঠে পড়েছে। শি উইল বি হিয়ার, এনিমিনিট”, ইনস্পেক্টর জাভেদ আলি ভিআইপি এনক্লোজারের দিক থেকে ডিসিপি মনন শীলের পাশে এসে ফিসফিস করে বলল।

     মনন চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিয়ে মাথাটা সামান্য ঝাঁকাল। সুবিশাল মাঠে আজ প্রায় হাজার তিরিশেক মানুষ এসেছে। বেশিরভাগ দলীয় সমর্থক সদস্য, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে। তবে কাজের দিনে এই অনুষ্ঠান হচ্ছে বলে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ‘আঁখিশ্রী’-র এই উদযাপন অনুষ্ঠান বিকেন্দ্রীকরণ করে জেলাগুলির মহকুমা স্তরেও পালন করা হচ্ছে। কলকাতায় মূল উদযাপন অনুষ্ঠানটাই ব্রিগেডে হচ্ছে।

     তুমুল একটা হর্ষধ্বনি শোনা গেল। মনন চমকে তাকাল মঞ্চের দিকে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং প্রবাদপ্রতিম জুটি শৌনক ও অন্তরাদেবী চারজনে মিলে একসঙ্গে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে অনুষ্ঠানের সূচনা করলেন। প্রৌঢ় অভিনেতা শৌনক সত্তর পেরিয়েও দর্শকদের কাছে তার জনপ্রিয়তা হারাননি, সত্তর ছুঁইছুঁই অন্তরাও সমান জনপ্রিয়। আঁখিশ্রী প্রকল্পের মুখ যে তারা, মঞ্চের পিছনের ফ্লেক্সে তাদের হাসিমুখের ছবিও জ্বলজ্বল করছে।

     মিডিয়ার ছেলেমেয়েগুলো মননকে বেশ সমীহ করে, পছন্দও করে। টুয়েন্টি ফোর টিভির তমোঘ্ন, হালচাল পত্রিকার ক্যামেলিয়া, তাজা খবরের কৃশানুরা ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তমোঘ্ন ফিসফিস করে বলল, “সিএম কখন ঢুকছেন, স্যার?”

     ক্যামেলিয়া বলল, “স্যার, আপনার ফোন নম্বরটায় ফোন করলে কখন কথা বলা যায়? মানে কখন আপনি ফ্রি থাকেন?”

     ক্যামেলিয়ার কথায় ওর সহকর্মীরা মিটমিট করে হাসল। মেয়েটাকে এমনিতে বেশ মিস্টি দেখতে তবে এসব গায়ে পড়া মন্তব্যগুলোকে প্রশ্রয় না দেওয়াই ভালো। মনন মেয়েটার দিকে ডেডপ্যান চোখে তাকাল। মেয়েটা চোখটা সরিয়ে নিল, বোধহয় নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে।

     আচমকা একটা গাড়ির কর্ণবিদারী হুটারের শব্দে মনন সজাগ হয়ে উঠল। মঞ্চে উপস্থিত বিশেষ অতিথিদের মধ্যেও যেন ঈষৎ তটস্থ ভাব। দর্শক আর সাংবাদিকদের মধ্যেও যেন একটা সাড়া পড়ে গেল। মনন তার সঙ্গী জাভেদকে নিয়ে ভিআইপি এনক্লোজারের দিকে এগিয়ে গেল। ততক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে লম্বা লম্বা পদক্ষেপে তড়িৎগতিতে এগিয়ে আসছেন সিএম। জেড ক্যাটেগরির দেহরক্ষীরাও তার সঙ্গে পদক্ষেপ মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছে। দ্রুত মঞ্চের সিঁড়ি ধরে উঠে গেলেন তিনি। এমন অনুষ্ঠানে পৌঁছতে দেরি হয়ে গেলে অনুষ্ঠানের রাশ আর পাদপ্রদীপের আলো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দিকে চলে যেতে পারে। সেটা মুখ্যমন্ত্রী বিলক্ষণ জানেন।

     ইতিমধ্যে দুটি কিশোরী মেয়ে মঞ্চে উঠে অতিথি অভ্যাগতদের দিকে এগিয়ে গেছে। প্রথমজন মুখ্যমন্ত্রীকে উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নিল, দ্বিতীয়জন একটা ফুলের স্তবক ওর হাতে তুলে দিয়ে পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। মুহূর্মুহূ ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের আলো ঝলকাচ্ছে মঞ্চের দিকে।

     মঞ্চে সঞ্চালকের ভূমিকায় থাকা উজ্জ্বল যুবক হাসিমুখে মুখ্যমন্ত্রীকে ভাষণ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাল। শাড়ির আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে দৃপ্তভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিন তিনি নিজেই স্বাস্থ্য দপ্তরের ভার সামলেছেন, বছরখানেক হল তার দলীয় কনিষ্ঠ এক নেত্রী চয়নিকা ভট্টাচার্যকে স্বাস্থ্যদপ্তরের প্রতিমন্ত্রীর ভার দিয়েছেন। তবে ‘আঁখিশ্রী’ প্রকল্পটি নিঃসন্দেহে তারই ব্রেনচাইল্ড।

     সিএমের বলার ভঙ্গিটি দৃপ্ত এবং অত্যন্ত আন্তরিক। তিনি গৌরচন্দ্রিকা পছন্দ করেন না, সরাসরি মূল আলোচনায় ঢুকে গিয়ে বলতে শুরু করেন, “বছর সাতেক আগে আমরা প্রথম সরকারে আসি। তখন কেন্দ্রে অন্য সরকার। আমরা সেই সরকারের সঙ্গে যেমন কাজ করেছি তেমনই বছর চারেক আগে কেন্দ্রে সরকার বদল হওয়ার পরও নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করেছি। তবু পশ্চিম বাংলার উন্নয়নের জন্য কখনও আমরা কারো মুখাপেক্ষী হইনি।

     হয়তো আমাদের সাধ অনেক কিন্তু সাধ্য কম। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ফান্ড অ্যালোকেশনের ব্যাপারে আমাদের রাজ্য যে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার শিকার হয়েছে তার তোয়াক্কা না করে আমরা এগিয়ে গেছি। নতুন সরকার সম্প্রতি যে ‘ভিশন ২০২০’ প্রকল্পটি এনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতির কথা বলছেন তা আমরা এই রাজ্যে আমাদের প্রথম সরকারের সময়কাল থেকে চালু করেছি। আপনারা জানেন খাদ্যসুরক্ষা প্রকল্পে গ্রামীন মানুষদের দুটাকা কেজি দরে চাল দেওয়া থেকে শুরু করে বছরে দশলক্ষ করে কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্রে স্কুলছুট মেয়েদের স্কুলশিক্ষা সম্পূর্ণ করে তোলার জন্য আমরা যে প্রকল্প চালু করেছি তা আজ গোটা ভারতবর্ষ কেন গোটা বিশ্বে মডেল হয়ে উঠেছে। আমাদের এই উন্নয়ন প্রকল্পটি রাষ্ট্রসঙ্ঘের স্বীকৃতি পেয়ে সেরা হয়ে উঠেছে। গতবছর আমরা পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রৌঢ় নাগরিকদের জন্য যে ‘আঁখিশ্রী’ প্রকল্প চালু করেছি তা গোটা দেশের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী প্রকল্প। আজ প্রথম বছরের শেষে এই প্রকল্পে অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছে। এই প্রকল্পে রাজ্যের চোখে ছানিপড়া প্রৌঢ় মানুষদের চোখ অপারেশন করে আমরা তাদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিচ্ছি। আর তার জন্য একটা পয়সাও লাগছে না। চোখের ছানি অপারেশন বাবদ দশ হাজার টাকার পুরো খরচটাই বহন করছে সরকার… এখানে শৌনকদা আছেন, অন্তরা আছে…ওরাই এই প্রকল্পের মুখ… প্রথমে পাইলট প্রজেক্টে চোখ অপারেশনের সুবিধা দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষদের জন্য চালু হলেও মাসছয়েক আগে দারিদ্রসীমার ওপরে থাকা মানুষদেরও এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। তবে এদের জন্য সিক্সটি-ফর্টি রেশিওতে। সরকার মার্জিন মানি হিসেবে অপারেশন পিছু ছয় হাজার টাকা অনুদান দেবে। বাকি চারহাজার টাকা নিজেকে বহন করতে হবে। তবে এক্ষেত্রেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক কিংবা সমবায় ব্যাঙ্কগুলো থেকে কম সুদে সহজ কিস্তিতে ঋণ পাওয়া যাবে। আমাদের এই প্রকল্পের সাফল্য…”

     মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য চলার মাঝেই মননের মেসেজ অ্যালার্টটা বাজল। সে দেখল ‘ক।পু’ হোয়াটস্যাপ গ্রুপে কমিশনার সাহেব একটা মেসেজ ফরোয়ার্ড করেছেন। স্বরাষ্ট্র সচিবের মেসেজ— ‘সিএম ওয়ান্টস টু নো দ্য লেটেস্ট আপডেট অন ইনভেস্টিগেশন অফ বিক্রমশীল পাবলিক স্কুল শ্যুটিং কেস।’

     মঞ্চের ডানদিকে দাঁড়ানো মনন মোবাইল স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে চাইল। সামনের সারিতে বসা কমিশনার সাহেব ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। মনন জানে ওই হাসিটাও এক ধরণের মেসেজ অ্যালার্ট। ওর মধ্যে লেখা আছে হাওড়া, ব্যারাকপুর কিংবা বিধান নগর কমিশনারেটে বদলির বার্তা।

     মেজাজটা খিঁচড়ে গেল ডিসিপি মনন শীলের। এখন তাকে জাভেদকে নিয়ে মধ্য কলকাতার পার্কভিউ নার্সিংহোমে যেতে হবে। ডুরান চ্যাটার্জির অবস্থা গতকাল থেকে একটু স্থিতিশীল। আজ কেসটার ইনভেস্টিগেশনের জন্য বাচ্চা ছেলেটার সঙ্গে কথা বলা দরকার। জানা দরকার ডুরানের ওপর সিকিউরিটি অফিসার বিক্রম মাট্টুর কোনও পুরোনো আক্রোশ ছিল কিনা। আরও রহস্যময় ব্যাপার হল গানম্যান মাট্টু গুলি চালানোর পর আত্মহত্যা করল কেন? যদিও ওর শরীরে কোনও গুলির ক্ষত ছিল না কিন্তু কোনও বিষ খেয়েও আত্মহত্যা করতে পারে। এরকম ক্ষেত্রে টেররিস্ট কানেকশনের সম্ভাবনাটাও রুল আউট করা যায় না। তবুও ফরেনসিক রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না, মনন ভাবল।

 

(৩)

১৬ মার্চ,২০১৮, লালবাজার কলকাতা

     ডুরান চ্যাটার্জীর জবানবন্দীর পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিল মনন। কোনও লিড পাওয়া গেল না এখান থেকে। ছেলেটা একটু বেশি প্যাম্পার্ড। বিখ্যাত শিল্পপতি সত্যবান চ্যাটার্জির মেয়ের ঘরের নাতি। মেয়েও বিখ্যাত অ্যাডভোকেট, হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করে, অধুনা মার্কিন প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে সেপারেশন হয়ে গেছে। তবে ডুরান এখনও ছুটিতে বাবার কাছে ক্লিভল্যান্ডে যায়। দাদু আর মা ছেলেটিকে একটু বেশি রকমের প্যাম্পার করে, ফলে এই বয়সেই ছেলেটির বেশ পাখা গজিয়েছে। বিক্রম মাট্টু এক্স-সার্ভিসম্যান তাই ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি ছিলেন। ডুরানকে বেশ কয়েকবার স্কুল পালানোর সময় ধরে প্রিন্সিপ্যালের ঘরে নিয়ে গেছে। একবার ছেলেটাকে টয়লেটে বুজ করার সময়ও পাকড়েছিল। সে এক বিচ্ছিরি কান্ড! শিল্পপতি সত্যবান চ্যাটার্জিকেও নাতির দুষ্কর্ম সামাল দিতে স্কুলে আসতে হয়েছিল।

     ডুরানের দিকে গুলি চালানোর জন্য এগুলো অত্যন্ত দুর্বল মোটিভ। তাছাড়া গুলিটা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ডুরানের কাঁধে লেগেছে।

     “নাহ্, এগুলো কোনও মোটিভই নয়, জাভেদ। অটোপসির ফরেনসিক রিপোর্ট কি বলছে দেখ তো”, লিকার চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে মনন বলল।

     “স্যার, টক্সিকোলজি পার্টে কোনও বিষক্রিয়া টিয়া নেই। শরীরেও কোনও অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন নেই। হার্ট, করোনারি আর্টারি আর অ্যাওর্টার আকার নর্মাল লিমিটের মধ্যেই আছে। কোনও ভেন্ট্রিকুলার হাইপারট্রফি নেই তাই তাৎক্ষণিক হার্ট অ্যাটাকটাকেও রুল আউট করেছে”, জাভেদ আলি পোস্ট মর্টেম রিপোর্টের পাতা উল্টে বলে।

     “তাহলে রিপোর্টে আছেটা কি?” ধৈর্য হারায় মনন।

     “স্যার, বলছে মাট্টুর ব্রেনের আকৃতি একটু অস্বাভাবিক ছিল। এই যে স্যার এখানে লিখেছে— সাফারিং ফ্রম নিউরো-ডিজেনারেটিভ ডিজিজ অফ আননোন ইটিওলজি। বায়োপসি অফ ব্রেন টিস্যু সাজেস্টেড।”

     “মানে, ব্রেন টিস্যুতে বিকৃতি আছে কিন্তু কারণটা অজানা! স্ট্রেঞ্জ! জাভেদ, কুইক বিক্রমশীল স্কুলে ফোন করে জানো তো কয়েকদিন ধরে মাট্টু অসুস্থ ছিল কিনা কোনওরকমের জ্বর মাথা যন্ত্রণা অথবা এর মধ্যে ও অসুস্থতার কারণে ছুটিছাটা নিয়েছিল কিনা?”

     জাভেদ টেবিলের ল্যান্ড ফোনটা থেকে স্কুলের নম্বরে ডায়াল করতে শুরু করল। মনন একটু অন্যমনস্কভাবে তার অফিস চেম্বারের দেয়ালে লাগানো এলইডি টিভিটা রিমোট অন করে চালিয়ে দিল। সংবাদের চ্যানেলটাই বেশিরভাগ সময় চলে। এক নজরে রাজ্যের ল অ্যান্ড অর্ডারের সিচ্যুয়েশনটা দেখে নেওয়া যায়। আজকাল তো আবার পুলিশ পৌঁছনোর আগে খবর শুঁকে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া স্পটে পৌঁছে যায়! যেমন এই মুহূর্তে সংবাদের সবচেয়ে বড় চ্যানেলটা একটা এক্সক্লুসিভ নিউজ দেখাচ্ছে—মুর্শিদাবাদে অজানা জ্বরে আক্রান্ত আটজন মানুষ। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সুপারিন্টেনডেন্ট জানাচ্ছেন, মাথার যন্ত্রণা ও জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়া এই রোগীদের মধ্যে গতরাত পর্যন্ত তিনজন মারা গেছেন। বাকিদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। সবার রক্ত পরীক্ষা হয়েছে তবে এখনও রোগের কারণ সঠিকভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এনকেফেলাইটিস জাতীয় রোগ হতে পারে।

     “স্যার, স্কুল থেকে বলছে, মাট্টু কোনও রোগে ভুগছিল কিনা ওরা নিশ্চিত করে বলতে পারবে না কারণ গত দু-এক সপ্তাহে মাট্টু কোনও ছুটি নেয়নি। তবে ওর সিকিউরিটি টিমের সহকর্মীরা জানাচ্ছে ও দিনকয়েক ধরে সম্ভবত অসুস্থ ছিল, আচারআচরণ একটু অস্বাভাবিক ছিল। প্রিন্সিপ্যাল অনিতা ফ্লিনও বলেছেন, দুর্ঘটনার দিন সকালবেলা গেট-থ্রির সিকিউরিটি কিয়স্কে বসে মাট্টু ঝিমোচ্ছিল।”

     “হুঁ…বেশ… আচ্ছা জাভেদ, তোমার দেশের বাড়ি কোথায় যেন?”

     “মানে স্যার…কান্দি…মুর্শিদাবাদ জেলা!” টেলিফোনের রিসিভারটা ক্রেডলে রেখে জাভেদ চমকে তাকাল।

     “এই দেখ, টিভির খবরটা। তোমার বাড়ির ওদিকে নতুন রোগ ছড়াচ্ছে সাসপেক্ট করছে এনকেফেলাইটিস…আচ্ছা বাই এনি চান্স কলকাতায় কি এখন কোথাও এনকেফেলাইটিস হচ্ছে? মাট্টুর যদি…”

     “স্যার যদিও কর্পোরেশনের কোনও না কোনও ওয়ার্ডে এখন সারা বছরই ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গি, চিকুনগুনিয়া এসব লেগেই আছে তবুও মাট্টুর বাড়ি বেকবাগানের যে অঞ্চলে ওদিকের কোনও ওয়ার্ডে তো এনকেফেলাইটিস হচ্ছে বলে শুনিনি। একমাত্র যদি না এর মধ্যে মাট্টু মুর্শিদাবাদের দিকে…”

     “সে সম্ভাবনা কম। একটু আগেই আমরা মাট্টুর স্কুল থেকে জেনেছি যে সে সপ্তাহদুয়েকের বেশি হবে কোনও ছুটি নেয়নি। যদি ধরেও নিই সে ছুটির দিন মুর্শিদাবাদ সংলগ্ন অঞ্চলে গেছে তাহলেও ব্যাপারটা দাঁড়ায় না কারণ এখনও পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আমরা জানি ওর দেশ গোরখপুর আর কলকাতার বাইরে কোনও জেলায় ওর আত্মীয়স্বজন কেউ থাকে না।”

     মনন হঠাৎ তার মোবাইলটায় একটা নম্বর টিপে একজনের সঙ্গে কথা বলে। তারপর ফোনটা রেখে বলে, “পোস্ট মর্টেম রিপোর্টের সঙ্গে ওরা মাট্টুর বডির ভিসেরার স্ন্যাপশটগুলো পাঠিয়েছে তো?”

     “হ্যাঁ স্যার, এই খামেই আছে।”

     “বেশ, তাহলে চলো, আজ সন্ধ্যেটা ক্যালকাটা ক্লাবে যাই। এক বন্ধুর কাছে ট্রিট পাওনা আছে। বলেছে, ভালো স্কচ খাওয়াবে।”

     সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টার মধ্যে লালবাজারে অফিসের কাজকর্ম সেরে মনন সঙ্গী জাভেদকে নিয়ে ক্যালকাটা ক্লাবের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। জাভেদ অবশ্য তার সাহেবের বন্ধুর দেওয়া ককটেল ডিনারের আড্ডায় আসতে একটু নিমরাজি ছিল। বোধহয় লজ্জা পাচ্ছিল, একবার সাহস করে ডিনারের উপলক্ষ্যটা জানতে চাইল।

     “জাভেদ লজ্জার কিছু নেই। নিউ পিঞ্চ জানো তো? ছোটবেলায় স্কুলের বন্ধুরা কেউ নতুন জামা, নতুন ব্যাগ, নতুন জুতো পরে এলে তাকে অন্য বন্ধুরা চিমটি কাটত। নতুন জিনিস কেনার গুনাগারি হিসেবে তাকে অন্যদের কেক-পেস্ট্রি কিছু একটা খাওয়াতে হত। আজকের ককটেল ডিনারটা সেই রকমই ব্যাপার!” মনন বেশ হালকা ফুরফুরে গলায় বলল।

     “মানে স্যার!”

     “আমার স্কুলের বন্ধু ডঃ ধর্মরাজ সেনগুপ্ত। খুব বড় নিউরোসার্জন। ব্যাটা বাইপাসের কাছে আরবানা প্রজেক্টে দু কোটি টাকার নতুন ফ্ল্যাট বুক করেছে। বুঝতেই পারছ জাভেদ, নিউ পিঞ্চ! হা হা!”

     আচার্য জগদীশ চন্দ্র বোস রোডের ঐতিহ্যবাহী এবং ঔপনিবেশিক আদবকায়দার ক্লাবটার ক্রিস্টাল বারে ডিসিপি মনন শীলের জন্য অপেক্ষায় বসে ছিলেন ডঃ ধর্মরাজ সেনগুপ্ত। ওরা পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে টেবিলে দামী স্কচের পেগ চলে এল। মনন তার বন্ধুর সঙ্গে জাভেদের আলাপ করিয়ে দিল। আড়ষ্টভাবটা কাটিয়ে ধীরে ধীরে জাভেদও সহজ হয়ে উঠল। ধর্মরাজ সেনগুপ্ত বেশ অমায়িক মানুষ, রসিকতাতেও সরস স্বভাবটি ধরে রেখেছেন, বললেন, “দেখেছেন জাভেদ আপনার সহকর্মী কেমন কসাই! ব্যাটা নিউ পিঞ্চের নাম করে কেমন দামি স্কচ আদায় করছে, ভেবেছিলাম বিষয়টা ইস্কুলের মতো কেক-পেস্ট্রিতে সারব, তা হল না! ব্যাটা পুলিশ, মানে শিক্ষিত গুন্ডা, আমাকে কিসব আইটি, ইডির ভয় দেখাল!”

     জাভেদ হেসে উঠল। মননও দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, “আজ শুধু বিনিপয়সায় স্কচই খাব না তোর কাছ থেকে একটা মেডিক্যাল কনসালটেন্সিও নেব। তাও বিনি পয়সায়!”

     “হ্যাঁ হ্যাঁ বল। লেটস গেট টু দ্য পয়েন্ট, আসলে তোর ডাকে আজ যে জন্য ক্যালকাটা ক্লাবে আসা”, ডঃ সেনগুপ্ত এবার খাঁটি প্রফেশনালদের মতো সিরিয়াস হয়ে উঠলেন।

     “এনকেফেলাইটিসের সিম্পটমগুলো কি?” মনন প্রশ্ন করে।

     “দেখ, জাপানী এনকেফেলাইটিস বেশি হচ্ছে। উপসর্গগুলো প্রথমে কমই থাকে তাই বোঝা মুশকিল। জ্বর, মাথা যন্ত্রণা, বমিবমি ভাব তো থাকেই তার সঙ্গে মাসল পেইন, জয়েন্ট পেইনও হয়। কয়েকদিন পর সিজার, ট্রেমর, হ্যালুসিনেশনের মতো উপসর্গও যোগ হয়। বাই দ্য ওয়ে, কেন বল তো?”

     “একটা কেসের ব্যাপারে এই ফান্ডাগুলো আমার দরকার। তা ছাড়া আজ খবরে দেখলাম, মুর্শিদাবাদের দিকে নাকি এনকেফেলাইটিস হচ্ছে। জাভেদের দেশের বাড়ি ওদিকটায়, তাই ও বেশ চিন্তিত।”

     “হুম, আমিও আজ খবরটা দেখেছি। আমার দু একজন কলেজের বন্ধু স্টেট মেডিক্যাল হেলথ সার্ভিসে আছে, ওদিকেই পোস্টেড। কথা হয়েছে ওদের সঙ্গে, দেখলাম ওরাও বেশ চিন্তিত। তবে আজকে সকালের দিকে বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজেও ওরম চার পাঁচটা কেস আইডেন্টিফায়েড হয়েছে।”

     “রাজ, কলকাতাতেও হয়তো এনকেফেলাইটিসের প্রকোপ শুরু হয়েছে।”

     “সেকি রে!” ডঃ সেনগুপ্তর ভুরু কুঁচকে উঠেছে, “আমি তো এখনও কোনও খবর পাইনি!”

     “তুই এই ছবিগুলো দেখ”, মনন শীল পকেটের ভেতর থেকে একটা খাম বের করে বলল, “এগুলো একজন এনকেফেলাইটিস ভিক্টিমের অটোপসির ছবি।”

     ডঃ সেনগুপ্ত একটা একটা করে ছবির প্রিন্টগুলো মন দিয়ে দেখতে শুরু করলেন। কখনও মাথা নাড়ছেন কখনও কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তা করছেন। মিনিটখানেক ধরে প্রায় কুড়িটা প্রিন্টেড ফটো দেখার পর তিনি মাথা তুলে বললেন, “মনন, মাই ফ্রেন্ড, এগুলো মনে হচ্ছে এনকেফেলাইটিস নয়…লুক অ্যাট দিস হিস্টোলজি পিকচার অফ ব্রেন টিস্যু… আয়াম শিওর এটা এনকেফেলাইটিস নয়!”

     “তুই এতটা শিওর হচ্ছিস কি করে রাজ!”

     “লুক বাডি, আয়াম শিওর দিস ইজ নট এনকেফেলাইটিস। এইরকম ব্রেন টিস্যুর হিস্টোলজির ছবি দেখে ভুল বলার জন্য আমার কেরিয়ারের একটা বছর নষ্ট হয়েছে। আমার এফআরসিএস করা এক বছর পিছিয়ে গিয়েছিল। প্ল্যাব পরীক্ষার পিকচার টেস্টে এইরকম ছবি দেখে আমি বলেছিলাম এনকেফেলাইটিস। আসলে ওটা অন্য কিছু ছিল।”

     “কি ছিল সেটা?”

     “ভিসিজেডি আক্রান্ত ব্রেন টিস্যুর ছবি!”

     “ভিসিজেডি? সেটা কি?” মনন উত্তেজনায় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

     “ভ্যারিয়্যান্ট ক্রুজফেল্ড জ্যাকব ডিজিজ। গোদা ইংরেজিতে সায়েবরা যেটাকে ম্যাড কাউ ডিজিজ বলে!”

 

(৪)

     এই স্পাইক্যামটা ক্যামেলিয়ার খুব প্রিয়। অনেকগুলো স্টিং অপারেশনে ওর অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। পেন বা আইগ্লাস পুরোনো হয়ে গেছে, সেদিক থেকে কানের স্টাডে লুকোনও স্পাইক্যামটা ওর বেশ অভিনব লেগেছিল। ফ্যান্সি মার্কেটের মুসাভাই এটা এনে দিয়ে বলেছিল, “বহেন, এই মাল একদম নয়া, হংকংয়ের আছে। এখন বিবিসি, সিএনএনের রিপোর্টার দিদিমণিরা এটাই পরছে। জাস্ট চেয়ারে বসে বাঁহাতের আঙুল দিয়ে নিজের চুলের লকসটা পিছনদিকে সরানোর সময় দুলপরা কানের লতির পিছনদিকে ছোট্ট সুইচটা অন করে দেবে, ব্যস্! একদম ঝকঝকে ছবি, অডিও রেকর্ড হয়ে যাবে।

     সেই মুহূর্তে ফ্যান্সি মার্কেটের মুসাভাইকে দেখে ক্যামেলিয়ার মনে হচ্ছিল যেন জেমস বন্ডের ‘কিউ’!

     ক্যামেলিয়া জার্নালিজমে আসার পর থেকে মুসাভাই তাকে বিস্ময়কর সব গ্যাজেট দিয়ে গেছে। কখনও একটা বিস্কুটের সাইজের ভয়েস রেকর্ডার, কখনও ছোট পেনড্রাইভ আকৃতির ডিক্টাফোন। ক্যামেলিয়া মিডিয়া দুনিয়ায় গত ছ’বছর ধরে কর্পোরেট মই বেয়ে যে অনেকটা উঠে এসেছে তার অনেকটা কৃতিত্ব যায় মুসাভাইয়ের ঝুলিতে। মানুষটাকে যখনই ফোন করেছে তখনই সে আপন দাদার মতো সাড়া দিয়েছে।

     এসব অত্যাধুনিক গ্যাজেটস ক্যামেলিয়া অনলাইনেও কিনতে পারত কিন্তু সে এটা করেনি। কারণ ও চায়নি অনলাইন ব্যবসায় থাকা কোম্পানিগুলোর কাছে জার্নালিস্ট ক্যামেলিয়া দত্তর কোনও রেকর্ড থাকুক। তার চেয়ে মুসাভাই মারফত জিনিসগুলো তার কাছে আসাটা অনেক সেফ।

     “ভাই, আজ আপ মুঝে বহুত আচ্ছা চিজ লাকর দিয়ে। শুক্রিয়া! কাল এই ইয়ার স্টাড দিয়ে যে এক্সক্লুসিভ ছবি তুলে আনব তা একদম ধামাকাদার নিউজ হবে, আমার কেরিয়ারটা কোথায় নিয়ে যাবে দেখবেন! আমি কলকাতা ছেড়ে ন্যাশনালে চলে যাব, এনডিটিভি, টাইমস নাউ থেকে আমার কাছে ভালো অফার আছে।”

     “আরে বহেন, তব তো পার্টি বনতা হ্যায়! লেকিন জরা সমহালকে কাম করনা”, মৃদু হেসে বলে খিদিরপুরের স্মাগলড গুডসের ব্যাপারী হায়দার মুসা।

     “আরে জরুর মুসাভাই! আপকে বিনা পার্টি তো আধুরা রহেগা!”

     মুসাভাইকে বিদায় জানিয়ে ক্যামেলিয়া চলে এসেছিল। তার লাইফ-চেঞ্জিং কভার স্টোরিটা তৈরির জন্য আগামীকাল একটা বড় ইন্টারভিউ নিতে হবে। একজন বিখ্যাত বাঙালি শিল্পপতির ইন্টারভিউ নিতে হবে। মাত্র চল্লিশ বছর বয়সেই ইনি সাফল্যের শিখরে উঠে এসেছেন। বেশ কতগুলো বেসরকারী ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ, সফটওয়্যার কোম্পানি আরও নানারকমের ছোটবড় সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টের কারখানার মালিক। খুব শিগগীর টেলিকম ব্যবসাতেও পা রাখছে তার চ্যাটার্জি গ্রুপ অফ কোম্পানিজ। বাঙালি শিল্পপতির এমন অভূতপূর্ব উত্থানকাহিনি এখনও কোনও বাঙলা পত্রিকার রবিবারের সাপ্লিমেন্টারি পাতার কভার স্টোরি হয়নি কেন সেটাই আশ্চর্যের!

     ক্যামেলিয়া প্রথমবার চ্যাটার্জী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের তরুণ কর্ণধারের সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসার কাহিনি নিয়ে কভার স্টোরি করছে। আগামীকালের সাক্ষাৎকার পর্বের জন্য প্রশ্নগুলো লিখে তার মোবাইলের ডকস ফাইলে সেভ করে নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল সে। এখন রাত দেড়টা বাজে, ভদ্রলোক কাল বিকেল চারটের সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছেন।
সকালে একবার ওর পত্রিকার অফিসে ঢুঁ মেরে আসতে হবে। আগামী রবিবারের হালচালের সাপ্লিমেন্টারি পেজে কালীঘাটের পটুয়াপাড়ার ওপর একটা স্টোরি জমা দেওয়া আছে। ফটোগ্রাফার বিনায়কের তোলা ছবিগুলোসহ লেখাটা কম্পোজ করা হয়ে গেছে। অফিসে গিয়ে প্রুফটা একটু নিজে দেখে নিতে চায় ক্যামেলিয়া।

     রাত প্রায় একটা বাজে। মাকে একবার ফোন করবে কিনা ক্যামেলিয়া ভাবল। মা জেগে থাকলেও তার বাবার জন্য হয়তো আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে। ইদানীং তার বাবার প্রেশারটা খুব বেড়েছে। ডাক্তার একটা ইকো ডপলার করতে বলেছে কিন্তু তার বাবা কিছুতেই গা করছে না। গত ছ’ বছর ক্যামেলিয়া তার পেশার জন্য শিলিগুড়ি ছেড়ে কলকাতায় থাকলেও প্রত্যেকদিন বাড়িতে ফোন করে বাবা-মায়ের খবর নিয়েছে। আজকেই ব্যতিক্রম হল। আসলে সারাদিন কাজের চাপে ফোন করা হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া মুসাভাইয়ের কাছ থেকে স্পাইক্যামটা ডেলিভারি নেওয়ার পরেও কালকের অ্যাপয়েন্টমেন্টটা নিয়ে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে আছে সে। আসলে ক্যামেলিয়া খুব ভালো করেই জানে কালকের কাজটা কত কঠিন। এটা কোনও সাদামাটা সাক্ষাৎকার নয়, শিল্পপতি ভদ্রলোকের প্রচার করাও এর উদ্দেশ্য নয়। আসল উদ্দেশ্য ভদ্রলোকের ওপর কথার জাল বিস্তার করে ওর মুখ থেকে এক গোপন ধূসর জগতের খোঁজ বের করে আনা! যার মধ্যে দিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তরের এক ভয়ংকর অনিয়মের কথা বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা আছে।

     ক্যামেলিয়া কি ভেবে হঠাৎ তার মোবাইলটা টেনে নিয়ে রিসিভড কলের লিস্টে চলে গেল। খুঁজতে খুঁজতে সেই অচেনা নম্বরটা পেয়ে গেল। সকাল সাড়ে সাতটায় ফোনটা এসেছিল। তখন ক্যামেলিয়া সদ্য ঘুম থেকে উঠেছিল। ব্রাশ করছিল, মুখে পেস্টের ফেনা, কথাও বলতে পারছিল না। শুধু ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে চাপা খসখসে গলায় কেউ বলেছিল, “দ্য গেম হ্যাজ স্টার্টেড। অ্যান আই ফর অ্যান আই।”

     “হোয়াট! ‘অ্যান আই ফর অ্যান আই’ মানে প্রতিশোধ! কিসের প্রতিশোধ? হু ইজ দিস স্পিকিং?” কোনওরকমে সে বলেছিল।

     “রটেন অ্যাপল স্পয়েলস দ্য ব্যারেল!” ওপাশ থেকে ভেসে এসেছিল।

     “হোয়াট!”  

     “ম্যাডাম, সলভ দিস রিডল! আপনার জন্য হোমটাস্ক! হা হা হা!”

     চাপা হাসির শব্দটা শেষ হতেই ফোনটা ওপাশ থেকে কেটে গিয়েছিল।

     তারপর বারতিনেক ওই নম্বরে ক্যামেলিয়া ফোন করেছিল। প্রতিবার একটা যান্ত্রিক স্বর ভেসে এসেছিল, “দিস নাম্বার ডাজ নট একজিস্ট।”

     এখন কি মনে হতে ক্যামেলিয়া ফের নম্বরটায় রিং করল। ওপাশ থেকে ভেসে এল ‘ইয়ে নম্বর মওজুদ নেহি হ্যায়।’

     টেবিলে পড়ে থাকা একটা সাদা প্যাড টেনে নিয়ে ক্যামেলিয়া পরপর লিখে ফেলল,

     ১) “অ্যান আই ফর অ্যান আই”।

     ২) “রটেন অ্যাপল স্পয়েলস দ্য ব্যারেল”।

     লেখাদুটোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল সে। নাহ্, ক্যামেলিয়ার মাথায় কিছুই খেলছে না। হয়তো এই ধাঁধাটা সে একদিন সলভ করতে পারবে। তবে আজ নয়। আলো নিভিয়ে ক্যামেলিয়া শুয়ে পড়ল।

     ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে আইআইএম পেরিয়ে চক রাজুমোল্লার ডানদিকে একটা রাস্তা ঢুকে গেছে। ক্যামেলিয়া যখন ওর স্কুটিতে চেপে সেই রাস্তাটায় কিছুটা ঢুকে উদ্দিষ্ট বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল তখন বিকেল চারটে বাজতে পাঁচ। প্রায় দশফুট উঁচু পাঁচিল ঘেরা বাড়িটা, পাঁচিলের পেছনেই বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁষা সারবাঁধা দেওদার আর সিলভার ওক। ক্যামেলিয়া হাসল, জেলখানার মতো সুরক্ষায় ঘেরা বাড়িটা। বিশাল লোহার গেটের বাইরে লাগানো সিসি টিভি ক্যামেরার দিকে ক্যামেলিয়া মুখটা তুলে তাকাল। লোহার গেটটা ভেতর থেকে খুলে গেল।

     গেট-লাগোয়া সিকিউরিটি রুমে রাখা একটা রেজিস্টার বাড়িয়ে দিল সিকিউরিটি গার্ড। ক্যামেলিয়া এন্ট্রিটা সেরে তার স্কুটি নিয়ে ড্রাইভওয়ে ধরে এগিয়ে গেল। এতক্ষণে ওর নজরে পড়ল অন্তত বিশ একর জায়গার ওপর চ্যাটার্জি গ্রুপের এই প্রপার্টি। প্রায় এক বিঘে জমির ওপর একটা কলোনিয়াল ভিলা আদলের বাড়ি। গেট থেকে বাড়ির সামনে পর্যন্ত লম্বা ড্রাইভওয়ে একটা পোর্টিকোতে গিয়ে শেষ হয়েছে। ড্রাইভওয়ের দুপাশে পাম গাছের সারি। পোর্টিকোর ঠিক সামনে সুবিস্তৃত লন। বাঁদিকে যতদূর চোখ যায় নানা রকমের গাছ। কোথা থেকে যেন গম্ভীর গলায় কুকুরের ডাক ভেসে এল। ক্যামেলিয়া সতর্ক হয়ে মূল বাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল।

     বাড়ির তলায় ভিজিটর্স রুমে ক্যামেলিয়াকে অপেক্ষা করতে বলে গেছে একটি মেয়ে। নিচের লবিতে ঢুকে রিসেপশনে এই মেয়েটিকেই বসে থাকতে দেখেছে ক্যামেলিয়া, সম্ভবত চ্যাটার্জী গ্রুপের অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো মেয়েটি হ্যান্ডেল করে।

     আধঘন্টা পরে ক্যামেলিয়া একটা বড় শীততাপ-নিয়ন্ত্রিত অফিস চেম্বারে গিয়ে বসল। উল্টোদিকে যিনি বসে আছেন তার বয়স পঁয়তাল্লিশ হতে পারে আবার চল্লিশও হতে পারে। ফরসা গায়ের রং, দাড়ি কামানো মসৃন গাল ঈষৎ সবুজাভ। ব্যাকব্রাশ করা কালো চুলের ভেতর দু-চারটে রজতনিভ চুলের রেখা। চোখে রিমলেস চশমা। অত্যন্ত সুদর্শন হলেও চ্যাটার্জী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের কর্ণধার সন্দীপ চ্যাটার্জীর সামনে বসে ক্যামেলিয়ার কেন যেন ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। ভদ্রলোক তাকে কেমন পলকহীন চোখে দেখছিলেন। ক্যামেলিয়া জানে তার মতো সুন্দরীর দিকে তাকালে বেশিরভাগ পুরুষের চোখে পলক পড়ে। খুব অমার্জিত কোনও কোনও পুরুষের চোখে হয়তো পলক পড়ে না, কিন্তু তার সামনে বসা সন্দীপ চ্যাটার্জী একজন সুভদ্র পুরুষ, তার দৃষ্টিও ক্যামেলিয়ার মুখ ছেড়ে এতটুকু সরেনি। খানিকক্ষণের মধ্যেই ক্যামেলিয়া বুঝতে পারল ভদ্রলোক যেন দৃষ্টি দিয়ে তার মাথার ভেতরটা স্ক্যান করে নিচ্ছে। এই মুহূর্তে সে কি ভাবছে তাও বোধহয় তিনি বুঝতে পারছেন।

     “আমার সম্বন্ধে জানতে এত দূর এসেছেন! চ্যাটার্জী গ্রুপের ওয়েবসাইটে আমার বায়োগ্রাফি দেওয়া আছে। আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, লিঙ্কডিন থেকেও সব তথ্য পেয়ে যেতেন!”

     ভদ্রলোক পলকহীন দৃষ্টিতে দেখছেন ক্যামেলিয়াকে।

     “সেগুলো তো শুকনো তথ্য। একটা রক্তমাংসের মানুষকে জানতে হলে তার সঙ্গে সামনে থেকে কথা বলতে হয়।” কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে ক্যামেলিয়া বলল।

     “নতুন কি জানতে চান বলুন?”

     “স্যার, ভিশন টুয়েন্টি টুয়েন্টিতে আপনাদের পার্টিসিপেশনটা রাজ্যস্তরে কি পর্যায়ে আছে? আরো প্রেসাইজলি বললে ‘আঁখিশ্রী’-তে চ্যাটার্জী গ্রুপ কিভাবে আছে?” বাঁদিকের কানের ওপর থেকে একগাছি চুল সরিয়ে ক্যামেলিয়া বলল।

     “আপনি ঠিক কি চাইছেন মিস ক্যামেলিয়া দত্ত?”এক মুহূর্তের স্তব্ধতার পর সন্দীপ চ্যাটার্জী বলেন, “আপনার এখনকার প্রশ্ন আর আমার উত্তরগুলো সব অফ দ্য রেকর্ড হবে। আপনার পত্রিকায় প্রকাশের জন্য নয়। যখন ভিশন টুয়েন্টি টুয়েন্টি প্রকল্পটা শুরু হল তখন আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এক্সপ্রেশন অফ ইন্টারেস্ট জমা দিয়েছিলাম। স্বাস্থ্যদপ্তর আমাদের কাছে ক্রেডেনশিয়াল চেয়েছিল, সেটাও জমা দিয়েছিলাম। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে আমাদের চেন্নাই, বেরিলি আর এখানকার বিবিরহাটের ফ্যাক্টরি ভিজিটও হয়েছিল। তারপর দেশের তিরিশটা কোম্পানির সঙ্গে আমাদেরও এমপ্যানেল করা হল।”

     “স্যার, তারপর? টেন্ডারিং কবে হল?”

     “প্রায় বছর দেড়েক আগে টেন্ডার হল। অ্যাসফেরিক হাইড্রোফোবিক, অ্যাক্রিলিকের তৈরি ইন্ট্রাঅকুলার লেন্সের তিনটে মডেল আমরা কোট করেছিলাম। টেন্ডার খোলার পর দেখা গেল আমরা এল ওয়ান মানে লোয়েস্ট কোট করেছি। আরও দুটো কোম্পানি ইনসিডেন্টালি একই দর দিয়েছিল।”

     “কিন্তু স্যার ভিশনের পাইলট প্রজেক্টে বিহারের গয়া জেলায় ইমপ্লিমেন্টেশনের সময় একটা বড় সমস্যা হয়েছিল শুনেছিলাম!”
এই প্রথম এক মুহূর্তের জন্য দুবার সন্দীপ চ্যাটার্জীর চোখের পলক পড়ল। ক্যামেলিয়া দেখল পরমুহূর্তে ভদ্রলোকের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মুহূর্তের নীরবতা কাটিয়ে আচমকা ভদ্রলোক ক্যামেলিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “নাইস ইয়ার রিং! আই লাভ ইওর ইয়ার রিং মিস ক্যামেলিয়া দত্ত!”

     ক্যামেলিয়ার বুকটা ধড়াস করে উঠল। মনে হল হৃদপিন্ডটা তার গলার কাছে এসে আটকে গেছে। একটা ঠান্ডা স্রোত যেন তার শিরদাঁড়া বেয়ে তলার দিকে নেমে গেল।

     “স্যার টয়লেটটা কোনদিকে? মে আই ইউজ ইট?” তড়িঘড়ি সে বলে উঠল।

     “বাইরে। করিডোরের শেষে বাঁদিকে।”

     ক্যামেলিয়া দেখল ভদ্রলোকের মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। চোখদুটো ধক করে জ্বলে উঠল। ‘এক্সকিউজ মি’ বলে চেয়ার ছেড়ে ক্যামেলিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বারান্দাটা একদম ফাঁকা। বাঁদিকে করিডোরের শেষে টয়লেট, ওদিকে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। ক্যামেলিয়া দ্রুত পায়ে করিডোর ধরে সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেল, লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। লবিতে বসা রিসেপশনিস্ট মেয়েটার দিকে তাকালও না। পোর্টিকোর বাইরে ওর স্কুটিটা রাখা আছে।
     দোতলার জানলার কাছে দাঁড়ানো দীর্ঘকায় সৌম্যকান্তি চেহারার রিমলেস চশমা পড়া মানুষটা মৃদু হাসলেন। তারপর শার্টের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে একটা নম্বর টিপলেন।

     নিজের স্কুটিটার কাছে পৌঁছনোর আগেই ক্যামেলিয়া সেই ভয়ংকর কুকুরের ডাক শুনতে পেল। স্কুটিতে স্টার্ট দেওয়ার মুহূর্তে ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখল দুটো ভয়ংকর চেহারার ডোবারম্যান কুকুর তার স্কুটির দিকে ছুটে আসছে। ক্যামেলিয়ার ভাগ্য ভালো, সে দেখল বাড়ির সামনের ফটকটা খুলে যাচ্ছে আর একটা বড় গাড়ি ভেতরে ঢুকছে। ইতিমধ্যে একটা কুকুর লাফিয়ে এসে তার কামিজের ঝুলন্ত অংশ কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে। ক্যামেলিয়া স্কুটির গতি বাড়িয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় দেখল বড় গাড়িটা তাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে। গাড়ির জানলা দিয়ে একটা মুখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। ভীষণ চেনা সে মুখ, কিন্তু কোথায় দেখেছে সে মনে করতে পারে না। তবে তার এখন ভাবার সময় নেই। ডোবারম্যানগুলোর ভয়ংকর ঘেউ ঘেউ ডাক এখনও তাকে তাড়া করে আসছে। ঠান্ডা মাথায় তাকে এখন স্কুটি চালিয়ে কুকুরগুলোর নাগাল পেরিয়ে ডায়মন্ড হারবার রোডে উঠতে হবে। তারপর একটা লোককে ফোন করতে হবে। যাকে সে একমাত্র ভরসা করতে পারে।

     এখন পৌনে সাতটা বাজে, সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে কুকুরগুলোর ডাক ফিকে হয়ে আসছে।

     ক্যামেলিয়া ডায়মন্ড হারবার রোডে উঠে স্কুটি চালিয়ে গোলাপ বাজারের কাছে চলে এসেছে। এখনও উত্তেজনায় সে কাঁপছে। লোকটা কি সাংঘাতিক, তাকে প্রায় ধরে ফেলেছিল! কথোপকথনের যেটুকু স্পাইক্যামে রেকর্ড হয়েছে তাও যথেষ্ট চাঞ্চল্যকর! ক্যামেলিয়া তার স্কুটিটা রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে দাঁড় করিয়েছে। মোবাইলের ফোনবুক থেকে একটা নম্বর খুঁজে সে বার করে রিং করল। ওপাশে রিং হয়ে যাচ্ছে। একবার, দুবার, তিনবার। লোকটা ফোনটা ধরছে না, নিশ্চয়ই কাজে ব্যস্ত। দ্বিতীয়বার রিং করে ফোনটা কানে ধরে ক্যামেলিয়া স্কুটিতে ফের স্টার্ট দিয়ে এগোয়।

     ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে ফলতার দিক থেকে ছুটে আসছে একটা তিরিশ টনের ষোলো চাকার ট্যাঙ্কার ট্রেলার। ড্রাইভার এখন জোকা, ঠাকুরপুকুর হয়ে চৌরাস্তা যাবে। তাকে অনেকগুলো পেট্রল পাম্পে রিফিলিং করতে হবে। রাস্তার ধার ঘেঁষে জমাট অন্ধকার। ড্রাইভার দেখল রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে একটা স্কুটি যাচ্ছে, নীল স্কুটির আরোহীর কানে মোবাইল। অন্ধকার রাস্তাটাও এখন বেশ নির্জন।

     কানে মোবাইল ক্যামেলিয়া তখন ফোনের ওপাশে একটানা রিংটোন শুনছিল আর মনে মনে বলছিল, “প্লিজ পিক আপ দ্য ফোন”।

     পিছন থেকে দ্রুত এগিয়ে আসা ট্রেলারের শব্দ তার কানে পৌঁছয় না। চালকটি কি তবে হর্ন বাজায়নি! শেষ মুহূর্তে ক্যামেলিয়া একবার পিছনে ঘাড় ঘোরায়, গাড়ির জোরালো হেডলাইটের আলোয় তার চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

     তারপরই ট্রেলারের সংঘর্ষে ছিটকে পড়ে ক্যামেলিয়ার স্কুটিটা। সেই অভিঘাতে স্কুটি থেকে সজোরে মাটিতে আছড়ে পরে সাংবাদিক মেয়েটি। মুহূর্তের মধ্যে স্কুটিসহ ক্যামেলিয়ার নিম্নাঙ্গ ট্রেলারের বাঁদিকের ষোলোটি চাকার তলায় পর্যায়ক্রমে পিষ্ট হয়ে এক রক্তমাংসের পিন্ডে পরিণত হয়। চাকার তলায় ঘষটে চলা স্কুটারের ধাতব শব্দে শিরশিরিয়ে কেঁপে ওঠে সাঁঝবেলার অন্ধকারের পর্দা। আর্তচিৎকার করে ঝটপটিয়ে উড়ে যায় গাছের পাখিরা।

     নির্জন রাস্তায় এক তালগোল পাকানো দ্বিচক্রযানের পাশে শুয়ে থাকে একটি তরুণী সাংবাদিকের রক্তাক্ত শরীর।

     মৃত্যুকে জড়িয়ে ধরার মুহূর্তে ক্যামেলিয়া চেয়ে দেখে ট্রেলারটা একটু এগিয়ে থেমে গেছে। তার দরজা খুলে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে আসছে গাড়ির চালক। চালকটি তার সামনে এসে নির্লিপ্ত চোখে তাকায়। সামনে ঝুঁকে পড়ে তার মুখখানি দেখে। তারপর হাত বাড়িয়ে তার কান থেকে দুল দুটো খুলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে যায় ট্রেলারটার চালকের আসনে।

     সেদিকে তাকিয়ে রাস্তার ওপর পড়ে থাকা ক্যামেলিয়ার রক্তাক্ত শরীরটা বারদুয়েক ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। অস্থির চোখদুটো দুবার কেঁপে উঠে চিরতরে নিস্পন্দ হয়ে যায়।

 

(৫)

     নবান্নের তেরো তলায় কনফারেন্স রুমের মিটিংটা শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্র সচিবের এই ল’ অ্যান্ড অর্ডারের মিটিংটা শুরু হয়েছে পাঁচটা নাগাদ। মূলত কমিশনার সাহেব আর জয়েন্ট কমিশনাররা এই মিটিংটায় আসেন। আজ ডিসিপি মনন শীলেরও ডাক পড়েছে। কনফারেন্স রুমে মনন চুপচাপ বসে আছে, কাচজানলার বাইরে হুগলী নদীর ওপর ভাসমান জলযানের সংখ্যা গুনছে। কান অবশ্য তার হোম সেক্রেটারির কথায়। সে জানে এই সব মিটিংয়ে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে যাওয়ার অর্থ হল— ব্রিংগিং ক্রোকোডাইল বাই কাটিং ক্যানাল! তেমন কোনও বাসনা তার নেই। তাকে পাগল কুকুরেও কামড়ায়নি যে সে বাঘের খাঁচায় ঢুকে বাঘের লেজে মোচড় দেওয়ার মতো কান্ডজ্ঞানহীন কাজ করবে! তার চেয়ে বরং বিষয়টা বাঘের খাদ্যরুচির ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো। বাঘ তাকে খাবে নাকি থাবায় নাড়াচাড়া করে ছেড়ে দেবে সেটা বাঘই ঠিক করুক। মনন বরং ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুক!

     “শিল্পপতি সত্যবান চ্যাটার্জির নাতির অ্যাটেম্পট টু মার্ডার কেসটা কতদূর এগিয়েছে, মনন?” হোম সেক্রেটারি যেন অনেকক্ষণ পর মিটিংয়ে মননের উপস্থিতি টের পেয়ে বলতে শুরু করলেন, “বিক্রমশীল স্কুল থেকে কোনও লিড পাওয়া গেল? আমার তো দৃঢ় বিশ্বাস সিকিউরিটি অফিসারকে কেউ হায়ার করেছিল। কোনও টেররিস্ট আউটফিট কিংবা আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাজও হতে পারে। দার্জিলিংয়ে মিঃ চ্যাটার্জিদের গ্রুপের অনেকগুলো হোটেল আছে, পাহাড়ের কোনও জঙ্গি রাজনৈতিক সংগঠনের কাজ নয়তো?”

     মনন সামনে তাকাল। বুঝতে পারল বাঘ থাবায় নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেছে। তবে পাহাড়ের অ্যাঙ্গেলটা যে সে আগে ভাবেনি তা নয়, কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেরকম লিড সে পায়নি।

     “ওই মাট্টু না কি নাম যেন কিলারটার…ও বেঁচে থাকলে কেসটা সলভ হয়ে যেত কিন্তু লোকটা হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়ে মরে যাওয়ায় সব জট পাকিয়ে গেল।” হোম সেক্রেটারি আক্ষেপ করলেন।

     মনন জানে লোকটা সাধারণ হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়নি। অটোপসি রিপোর্ট নিয়ে সে যে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে জেনেছে বিক্রম মাট্টুর মৃত্যুটা রহস্যজনক সে কথা বাঘের সামনে বলার কোনও অর্থ হয় না।

     “স্যার এখনও কোনও লিড পাইনি, তবে পাহাড়ের কানেকশনটা আমরা তদন্ত করে খারিজ করেছি। তবে শিগগির কোনও ব্রেক থ্রু আমরা ঠিক পাবই, স্যার।”

     “অ বুঝলাম”, তোম্বা মুখ করে স্বরাষ্ট্রসচিব বলেন, “তবে আই ওয়ান্ট কুইক রেজাল্ট। আমি সিএমের কাজে আনসারেবল থাকছি।”

     মনন আর কথা বাড়াল না। তারপরেও ঘন্টাখানেক চলল মিটিংটা। আটটা নাগাদ শেষ হওয়ার মুখে স্বরাষ্ট্রসচিবের চেম্বারের দেওয়ালে লাগানো বিশাল টিভিটা উনি রিমোট টিপে চালিয়ে দিলেন। এখানে সারাদিন নিউজ চ্যানেলগুলোই চলে। হঠাৎ টিভির পর্দায় একটা বড় নিউজ চ্যানেলের খবর শুনে মননের কানদুটো উৎকর্ণ হয়ে উঠল।

     নিউজ চ্যানেলের সংবাদ পাঠিকা বলছে, “জোকা ও আমতলার মধ্যে ডায়মন্ড হারবার রোডের ওপর পথ দুর্ঘটনায় এক সাংবাদিকের মৃত্যু হয়েছে। মৃতার নাম ক্যামেলিয়া দত্ত। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ রাস্তার ধারে ক্যামেলিয়ার রক্তাক্ত শরীর পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার ভাঙাচোরা স্কুটিটিও রাস্তার ধারে নয়ানজুলিতে পড়েছিল। তবে এখনও ঘাতক যানটির খোঁজ পাওয়া যায়নি। বছর তিরিশের ক্যামেলিয়া বিগত আট বছর ধরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন….”

     মনন চমকে তাকায়। তার শিরা উপশিরায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে এসে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল। মিটিংয়ের জন্য ফোনটা অনেকক্ষণ সাইলেন্ট মোডে রাখা ছিল। এখন সেদিকে তাকিয়ে চমকে উঠল মনন। আটটা মিসড কল জমে গেছে। মিনিট দশেক আগে জাভেদ আলির পাঁচটা মিসড কল আর বাকি তিনটে অন্য নম্বর থেকে! মিসড কলের সেভ করা নম্বরটা দেখে প্রথমে সে বুঝতে পারল না, পরক্ষণেই সে যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল! ক্যামেলিয়া…মানে ক্যামেলিয়া দত্তর মিসড কল! ছ’টা পঞ্চাশ নাগাদ! মননের কপালের ভাঁজ গভীর হল। জার্নালিস্ট ক্যামেলিয়া দত্ত তাকে কোনওদিনও ফোন করেনি…আজই প্রথম করল… তাও তার মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে! এটা কি কোনও সমাপতন নাকি আরও গভীর কিছু!

     মননের হাতের ফোনটা তখনই বেজে উঠল। জাভেদের ফোন।

     “স্যার, খবরটা দেখলেন? সেই মেয়েটা যে আঁখিশ্রী-র অনুষ্ঠানের দিন আপনাকে ফোন করবে বলেছিল…”

     “জানি। কিন্তু আরও উত্তেজক খবর হল এই ক্যামেলিয়া আজ দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুর ঠিক আগে আমাকে ফোন করেছিল! আমার ফোন মিটিংয়ের জন্য সাইলেন্ট করে রাখা ছিল, মিসড কল লিস্ট দেখে বুঝলাম ওর ফোনের টাইমিংটা, বুঝতে পারছি না এটা নিছক দুর্ঘটনা কিনা।”

     “ইয়া আল্লা!” ফোনের ওপাশে জাভেদের দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল।

     “জাভেদ, একবার অ্যাক্সিডেন্টের স্পটে যাব। তুমি তৈরি থাকো, গাড়িতে তুলে নেব।”

     পৌনে এক ঘন্টার মধ্যে মনন তার সঙ্গী জাভেদকে নিয়ে দুর্ঘটনার স্পটে চলে এসেছে। জোকার আইআইএম পেরিয়ে গোলাপ বাজারের কাছে জায়গাটা, ঠাকুরপুকুর থানার মধ্যেই পড়ে। মননদের পৌঁছনোর মিনিট দশেক আগেই পুলিশ ক্যামেলিয়া দত্তর মৃতদেহ সরিয়ে নিয়ে গেছে।

     এখানে আসার পর ঠাকুরপুকুর থানার আইসি খবর পেয়ে মননকে ফোন করে বলেছিল, “স্যার, আমি যাব কি? এতক্ষণ ওখানেই ছিলাম, আপনি আসার জাস্ট কিছুক্ষণ আগে ফিরেছি। আসলে স্যার বডি পোস্ট মর্টেমে পাঠানোর ছিল, তাছাড়া ওর নিউজপেপারের লোকজন আর পরিচিত অনেকে এখন থানায় এসেছে, ওদের সামলাচ্ছি, বুঝতেই পারছেন…”

     “না না তোমার আসার দরকার নেই। আই’ল ম্যানেজ, তাছাড়া আমিও স্পটে বেশিক্ষণ থাকব না।”

     জায়গাটা এখনও বেশ অন্ধকার আর নির্জন। রাস্তার পাশের ঝোপঝাড় থেকে ঝিঁঝিঁর ডাক ভেসে আসছে। নয়ানজুলির জমাটবাঁধা অন্ধকারে জোনাকি জ্বলছে। রাত প্রায় ন’টা বাজে, ওরা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। সাঁইসাঁই করে দুদিকেই গাড়ি যাচ্ছে।

     তিনটে ফাঁকা ড্রাম আর টেপ দিয়ে পুলিশ দুর্ঘটনার জায়গাটা ছোট করে ঘিরে দিয়েছে। রাস্তার গাড়িগুলো জায়গাটা সাবধানে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।

     “স্যার”, জাভেদ ফিসফিস করে বলল, “ওই দেখুন ওখানে অন্ধকারে একটা মোটরবাইক দাঁড় করিয়ে রেখেছে কেউ!”

     জায়গাটা আপাতত ফাঁকা। হয়তো আধঘন্টা আগেও এখানে প্রচুর লোক ছিল কিন্তু পুলিশ ডেডবডি সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর লোকজন ফিরে গেছে। আবার গাড়ি চলাচলে স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে। কিন্তু এতক্ষণ তো এখানে লোক থাকার কথা নয়, তাছাড়া রাতও হয়েছে। অন্ধকারে চোখদুটো কচলে নিয়ে মনন এদিক ওদিক তাকাল। চোখে পড়ল নিচে নয়ানজুলির কাছে একটা সরু টর্চের আলো ঘোরাফেরা করছে।

     “জাভেদ, কুইক”, মনন তরতর করে ঢালু জমিটা বেয়ে নয়ানজুলির দিকে নেমে গেল।

     অন্ধকারে মোবাইলের টর্চের আলো ফেলে একটা লোক নিচু হয়ে কি যেন খুঁজছে। লোকটা কিছু টের পাওয়ার আগেই জাভেদ ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার হাতদুটো পিছনে পেঁচিয়ে ধরল।

     লোকটা কোনও প্রতিরোধ করল না। নির্বিকারভাবে বলল, “স্যার, ছোড় দিজিয়ে। আমি কিছু করিনি।”

     সে গলার স্বর শুনে ইন্সপেক্টর জাভেদ আলি অন্ধকারে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, “মুসাভাই তু ইধার?”

     মনন জিজ্ঞাসু চোখে জাভেদের দিকে তাকাতে সে বলল, “স্যার, এ মুসাভাই, ফ্যান্সিমার্কেটের বিদেশী মালের বড় চোরাকারবারি। আমি ওয়াটগঞ্জ থানায় থাকার সময় অনেকবার মোলাকাত হয়েছে।”

     “তুমি এত রাতে এখানে কী করছ? জানো না এখানে একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেছে?”

     “হাঁ স্যার, জানি তো”, মুসাভাই মননের দিকে ফিরে বলে, “ক্যামেলিয়া ম্যাডামের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। ইসলিয়েই তো ইধার আয়ে হ্যায়!”

     “মানে? ক্যামেলিয়াকে তুমি কিভাবে চেনো?”

     “ক্যামেলিয়া আমার মালের রেগুলার ক্লায়েন্ট ছিল। পরশু রোজ আমার থেকে একটা স্পাইক্যাম কিনেছিল। মেয়েদের কানের দুলে ফিট করা ক্যামেরা।”

     “হোয়াট?”

     “হাঁ স্যার বলেছিল আজ ও দুল পহেনকর কোই স্টিং অপারেশন করতে বেরোবে।”

     মনন আর জাভেদ নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।

     “কোথায় যাবে কিছু বলেছিল?” মনন বলে।

     “নেহি স্যার, ও বাতায়া নেহি। লেকিন স্যার আমাকে সাতটার সময় ফোন করেছিল। রিং হচ্ছিল কিন্তু আমি ফোন ধরার আগেই কেটে গিয়েছিল। তারপর যতবার রিং করেছি, ফোন সুইচড অফ বলেছে। এখন মালুম হচ্ছে কি তখনই ওর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।”

     মনন চমকে ওঠে, তার মানে ক্যামেলিয়া তাকে ফোনে না পেয়ে মুসাভাই নামে এই লোকটাকে ফোন করেছিল!

     “কিন্তু তুমি এখানে কি খুঁজছ এখন?”

     “স্যার, ওর ফোনটা কেটে যাওয়ার আধঘন্টা পরে আমি টিভির এক্সক্লুসিভ নিউজে দেখতে পাই ক্যামেলিয়া দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে মোটরবাইক নিয়ে এখানে চলে আসি। তখন এখানে অনেক ভিড় ছিল। পুলিশ ঘিরে রেখেছিল জায়গাটা। আমি, স্যার, ক্যামেলিয়ার ডেডবডি দেখেছি। তখন ওর কানে কোনও দুল ছিল না। পুলিশ যখন ডেডবডি সরিয়ে নিয়ে গেল তখন কাছ থেকে ভি দেখেছি। কান বিলকুল ফাঁকা ছিল। তাই সবাই চলে যাওয়ার পর এই স্পটটা ভালো করে খুঁজে দেখছি, যদি খুঁজে পাই।”

     “মুসা, সম্ভবত ওই দুলটা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না”, মনন গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “তোমাকে ফোন করার ঠিক আগে ক্যামেলিয়া আমাকেও দুবার রিং করেছিল, ফোন সাইলেন্ট থাকায় আমি বুঝতে পারিনি, কথাও হয়নি। সম্ভবত শেষমুহূর্তে ক্যামেলিয়া আমাকে বা তোমাকে কিছু বলতে চেয়েছিল, হয়তো ও বিপদে পড়েছিল। তাই এখন আর এটাকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যাচ্ছে না।”

 

(৬)

টোকিও, ১৩ মে ২০১৬

     টোকিও স্টেশনের মারুনুচি সেন্ট্রাল এক্সিটের বাইরে ডানদিকে কয়েক পা হাঁটলে এই সুশি রেস্তোরাঁটা পড়ে। তেমন নামীদামী না হলেও এখানে ভালো সুশি বানায়। ‘প্রিওন ২০১৬’-তে যোগ দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় চারশ জন বৈজ্ঞানিক এসে হাজির হয়েছে টোকিওয়। ডঃ তানাকা তাদের মধ্যে অন্যতম। আজ সেই সম্মেলনের শেষদিন ছিল। তানাকা উঠেছেন শিনাগাওয়ার ম্যারিয়ট হোটেলে। সেখান থেকে বিকেলে ট্রেন ধরে এসেছেন তার প্রিয় বন্ধু ‘ইনু’-র সঙ্গে দেখা করতে। জাপানীতে ইনু মানে কুকুর! অবশ্য বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে মজা করে এসব কুকুর-বেড়াল নামে ডাকা চলেই। তানাকা আর ইনু একসঙ্গে কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে প্রিওন নিয়ে গবেষণা করেছে। পিএইচডি আর পোস্টডক শেষ করে ২০১১তে ওরা ফিরে এসেছে যে যার দেশে। তানাকা জাপানে আর ইনু ভারতে।

     দুই বন্ধুর সামনের টেবিলে সুস্বাদু মাগুরো নিগিরি সুশির ডিশ। এই ডিশের টুনাটা থেকে দারুণ সুগন্ধ বেরোচ্ছে। সঙ্গে পানপাত্রে পোর্ট ওয়াইন। তার ওয়াইনের গ্লাসটা তুলে ইনু টোস্ট করে তানাকার দিকে তাকিয়ে বলল, “ইন মেমরি অফ ডঃ ড্যানিয়েল কার্লটন গাইডুসেক।”

     বছর পাঁচেক পর দুই বন্ধুর দেখা। ২০০৮ সালে কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত অবস্থায় ওরা দুজনে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল। সেদিন ডঃ কার্লটন গাইডুসেক মারা যান। ওদের কাছে ঈশ্বরপ্রতিম ছিলেন নোবেলজয়ী বৈজ্ঞানিক গাইডুসেক। শুধু নিউরোসায়েন্স নয়, মেডিক্যাল অ্যানথ্রোপলজির এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন গাইডুসেক। তিনিই প্রমাণ করে দিয়েছিলেন পাপুয়া নিউ গিনির মতো অস্ট্রেলিয় মহাদেশের দ্বীপরাষ্ট্রের ফোর উপজাতির মানুষদের স্নায়ুঘটিত মারণরোগ কুরুর কারণ হল নরখাদক ধর্মানুষ্ঠানের রীতি। শুধু তার জন্যই আজ পৃথিবী থেকে মারণরোগ কুরু নিশ্চিহ্ন হয়েছে। এজন্য তিনি নোবেল পুরষ্কারেও ভূষিত হন। পরবর্তীকালে ডঃ স্ট্যানলি প্রুসিনার হয়তো সংক্রামক বস্তুটির নামকরণ করেছিলেন কিন্তু ডঃ গাইডুসেকের অবদান তার থেকে অনেক অনেক বেশি। তিনি নিউ গিনি থেকে বহু শিশুদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এনে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তাদের অন্ধ কুসংস্কার থেকে বের করে এনে আলোর দিশা দিয়েছিলেন। তার বাড়িতে থেকে আলোকপ্রাপ্ত বহু ফোর উপজাতির শিশু পরবর্তীকালে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সেদিক থেকে মূল্যায়ণ করলে ডঃ গাইডুসেক শুধু বৈজ্ঞানিক নন, একজন ফিলানথ্রপিস্টও।

     ২০০৮ সালের গাইডুসেকের সেই মৃত্যুদিনে তানাকা ইনুকে বলেছিল, “আমরা প্রতিশোধ নেবই একদিন। যে সমাজ ঈশ্বরপ্রতিম ডঃ কার্লটন গাইডুসেককে অপমানের আঁধারে ছুঁড়ে ফেলে আমরা তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবই।”

     ২০০৮ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত জীবনের শেষ বারো বছর ডঃ গাইডুসেক এক কলঙ্কের বোঝা নিয়ে বেঁচেছিলেন। এই অকৃতজ্ঞ সমাজ তাকে এক নিমেষে ঈশ্বর থেকে দানব বানিয়ে দিয়েছিল। তিনি মার্কিনদেশ ছেড়ে নরওয়ের ট্রমসো-তে চলে গিয়েছিলেন। অভিযোগ উঠেছিল পাপুয়া নিউ গিনি থেকে সঙ্গে করে আনা ফোর ট্রাইব নাবালক কিশোরদের সঙ্গে তিনি যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। ড্যানিয়েল কার্লটন গাইডুসেকের মতো মানুষের মাথার ওপর পিডোফিলির অভিযোগ চাপিয়ে দেওয়াটা মেনে নিতে পারেনি তানাকা আর ইনু।

     ডঃ তানাকা আর ইনুর ডিনারের মধ্যেই সুশি রেস্তোরাঁর কাচদরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ডঃ লারসেন এবং ডঃ স্নাইডার। তারা দুজনেই কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনু এবং তানাকার সহগবেষক ছিলেন। গাইডুসেকের জীবনের শেষের দিনগুলোয় লারসেন ট্রমসোতে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে এসেছিলেন। আজ ডঃ লারসেনের হাতে একটা বই।

     তানাকা আর ইনু দুজনেই আবেগে জড়িয়ে ধরল লারসেন আর স্নাইডারকে। আজ কতদিন পর টোকিওয় ‘প্রিওন ২০১৬’-এর সুবাদে চার বন্ধুর পুনর্মিলন হল। ২০১১ সালের পর বিগত পাঁচ বছরে তারা প্রিওন রিসার্চে অনেকদূর এগিয়ে গেছে।

     ওয়েটারকে নতুন অর্ডার করা চারটে ওয়াইনের গ্লাস ফের টেবিলে চলে এসেছে। ডঃ লারসেন ওয়াইনের গ্লাস তুলে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “টু ডঃ গাইডুসেক অ্যান্ড টু আওয়ার নিউ প্রজেক্ট!”

     চারজন বৈজ্ঞানিকই ওয়াইনের গ্লাস তুলে তাকে সমর্থন জানালেন।

     “এই বইটা দেখো”, ডঃ লারসেনের কন্ঠস্বর বিষণ্ণ হয়ে এলো, “আজ ডঃ গাইডুসেকের মৃত্যুর আট বছর পরও গোটা পৃথিবী তার যৌনকেচ্ছার গল্প শোনাচ্ছে।”

     সবাই বইটার দিকে তাকাল। বইটার মলাটে বড় বড় করে লেখা আছে তার নাম—‘দি পিপল ইন দ্য ট্রিস’। লেখিকার নাম হানিয়া ইয়ানাগিহারা।

     “২০১৩ সালের এই বইটার উপন্যাসে ডঃ গাইডুসেকের নাম বদলে ডঃ নর্টন লিখে সেই একই গল্পের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস দুটি চরিত্রের সাদৃশ্য টেনে বলছে, ডঃ গাইডুসেক ওয়াজ আ ফলেন হিরো!” আক্ষেপভরা গলায় লারসেন বলে।

     “এই বইয়ের সব কপি কিনে জ্বালিয়ে ফেলো”, ডঃ স্নাইডার বললেন।

     তানাক বললেন, “তাহলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? ডঃ গাইডুসেক কি তার হৃত সম্মান ফিরে পাবেন?”

     “আসলে সাধারণ মানুষের কোনও ধারণা নেই”, ইনু শান্ত অথচ দৃঢ় কন্ঠে বলতে শুরু করে, “ডঃ গাইডুসেকের আবিষ্কার কত মাহাত্ম্যপূর্ণ। নৃতত্ববিদেরা হয়তো বোঝেন যে তার আবিষ্কারের জন্যেই আজ পাপুয়া নিউ গিনির ফোর প্রজাতির মানুষ পৃথিবীর বুক থেকে লুপ্ত হয়ে যায়নি।

     ফোর উপজাতির মানুষদের কুরু রোগের কারণ আবিষ্কার না হলে আজ তারাও পাপুয়া নিউ গিনি থেকে লুপ্ত হয়ে যেত, ঠিক যেভাবে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ হাজার বছর আগে জার্মানির নিয়ানডার্থাল ম্যান এবং সার্বিয়ার ডেনিসোভান ম্যান বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।”

     “যে মানবসমাজ একদিন আমাদের আইডল গাইডুসেককে মাথায় তুলে নেচেছিল, নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করেছিল, তারাই পরে হীন অপবাদ দিয়ে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল তাকে। এই সমাজের মুরুব্বিদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে।” ইনুর গলা চাপা ক্রোধে কেঁপে ওঠে।

     “সারা দুনিয়াকে আমরা বুঝিয়ে দেব ডঃ গাইডুসেকের শিষ্যরা এখনও বেঁচে আছে। তাদের আবিষ্কার যে কত শক্তিশালী তা বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে”, ডঃ তানাকা তার হাতটা টেবিলের ওপর রেখে বলেন, “তোমরা কে কে আমার সঙ্গে আছ?”

     ইনু একমুহূর্ত না ভেবে তার হাতটা ডঃ তানাকার হাতের তালুর ওপর রাখে। তারপর একে একে ডঃ লারসেন আর ডঃ স্নাইডার তাদের হাতগুলো এনে রাখে ইনুর হাতের ওপর। চারহাত এক হয়ে ডঃ তানাকার আবেদনে সাড়া দিয়ে বলে ওঠে, “লেটস টিচ দেম আ গুড লেসন!”

 

(৭)

     কৈখালির ফ্ল্যাটবাড়িটার তিনতলার দক্ষিণের ফ্ল্যাটটার দরজার সামনে মনন যখন এসে দাঁড়াল তখন তার ভেতরে অস্বস্তি শুরু হয়েছে। দ্বিধাগ্রস্ত হাতটা কলিংবেলের ওপর রেখেও ফিরিয়ে নিল। খুব চেনা পরিচয় না থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে বহুবার ক্যামেলিয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছে। সত্যিকথা বলতে দুজনের কাজই তো সত্যান্বেষণ। ক্যামেলিয়া মেয়েটাও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ছেড়ে প্রিন্ট মিডিয়ায় ফিরে এসেছিল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের নেশায়।

     কলিংবেল টেপার পর যে প্রৌঢ়া দরজা খুলে দিলেন তাকে দেখলেই বোঝা যায় গত চারদিনে তার ওপর দিয়ে কি মানসিক ধকলটাই না গেছে। উশকোখুশকো মাথার চুল, হেয়ার ডাই উঠে মাথার সাদা চুলগুলো যেন হু হু কান্নায় অবিন্যস্ত হয়ে পড়েছে।

     “আমি মনন শীল, কলকাতা পুলিশের ডিসিপি। আপনাকে অসময়ে একটু বিরক্ত করতে এলাম। আসলে ক্যামেলিয়া আমার পরিচিত ছিল। তবে আমি বেশিক্ষণ…”

     “ভেতরে আসুন”, এখানেই বসুন। ড্রইংরুমে একটা সোফা দেখিয়ে বললেন, “আসলে ওর বাবা খুব অসুস্থ, ওই ঘটনার পর থেকেই। ভেতরের ঘরে ঘুমোচ্ছেন।”

     সোফায় বসে মনন বলল, “আমি সময় বেশি নেব না। আচ্ছা আপনারা তো শিলিগুড়ি থাকেন, ক্যামেলিয়া কি এই ফ্ল্যাটে একাই থাকত?”

     “হ্যাঁ গত আট বছর ধরে ও কলকাতায় একাই থাকত। আগে অন্য ভাড়ার ফ্ল্যাটে থাকত, এখানে ছিল বছর দেড়েক। এখান থেকে ওর পত্রিকার অফিসটা কাছে হয়।” ভদ্রমহিলা অভিব্যক্তিহীন মুখে বলে যান কথাগুলো।

     জাভেদ আলি মননের পাশেই বসেছে একটা ছোট নোটবই নিয়ে।

     মনন তাকায় মহিলার বিমর্ষ মুখের দিকে, “ফোনে তো কথা হত আপনাদের, কখনও ক্যামেলিয়া তার কাজের ব্যাপারে কিছু আলোচনা করত? কারো নাম উল্লেখ করত কিংবা কোনও বিষয়ে?”

     “মেয়েটা খুব কাজপাগল ছিল, জানেন। সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। যখন যেখানে সেনসেশনাল নিউজের গন্ধ পেত স্কুটি নিয়ে চলে যেত। ছোটবেলা থেকেই বেশ ডাকাবুকো ছিল। আমি শিক্ষকতা করতাম, দুবছর আগে অবসর নিয়েছি। মেয়ের স্বাধীনতায় কখনও হস্তক্ষেপ করিনি, কিন্তু ও এভাবে চলে যাবে…”, ভদ্রমহিলা কথা শেষ করতে পারে না, কান্নায় ভেঙে পড়ে।

     মননের খুব খারাপ লাগছে, এরকম মানসিকভাবে বিধ্বস্ত কোনও প্রৌঢ়ার কাছ থেকে তার সদ্য মৃত কন্যার সম্পর্কে কিছু জানতে চাওয়াটাই যথেষ্ট অস্বস্তিকর। তবুও এটা করতেই হবে কারণ তার বারবার মনে হচ্ছে ক্যামেলিয়ার মৃত্যুটা কোনও সাধারণ দুর্ঘটনাজনিত নয়। অথচ এখনই বিষয়টা তার বাবা-মায়ের কাছে প্রকাশ করাও সম্ভব নয়।

     “ক্যামেলিয়া ইদানীং তার কাজের জগতের ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলতো? মানে কারো নামটাম?”

     “না নিজের কাজ নিয়ে তেমন কোনও কথা আমায় বলত না। এমনিতে খুব চাপা স্বভাবের মেয়ে। তবে…তবে…ওর দুর্ঘটনার দিন সকালে আমার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। আমি শিলিগুড়িতেই ছিলাম। ফোনে আচমকা জিজ্ঞেস করল— আচ্ছা মা, তুমি তো ইংলিশ পড়াও। ক্লাসে প্রবচন মানে ইডিয়মসও তো পড়াও, আমাকে বলতো ‘রটেন অ্যাপল স্পয়েলস দ্য ব্যারেল’ এই ইডিয়মসটার মানে কী? এর সঠিক প্রয়োগ কোথায় কোথায় হতে পারে?’—আমি ওর প্রশ্নের উত্তর দিতেই যাচ্ছিলাম হঠাৎ ও বলল,‘থাক মা, আমি জানি’ বলে লাইনটা কেটে দিল।”

     “মিসেস দত্ত, ক্যামেলিয়ার ঘরটা একটু দেখা যায় মানে যদি আপনি অনুমতি দেন”, দ্বিধাগ্রস্ত গলায় মনন বলে।

     “আসুন” বলে মিসেস দত্ত ড্রইংরুম থেকে দক্ষিণ দিকের বেডরুমটায় ঢোকে। মনন আর জাভেদও তার পিছন পিছন এগোয়।

     একটা মেয়েলি ঘর যেমন হয় ঠিক তেমন। একটা সিঙ্গল বেড, ড্রেসিং টেবিল, আয়না, ওয়ার্ডরোব, কম্পিউটার টেবিল, টেবিলে একটা ল্যাপটপও আছে। মিসেস দত্ত ওদের সামনে ওয়ার্ডরোবের পাল্লাটা খুলে দিলেন। মনন একটু থমকাল। একটা নীল টপ ঝুলছে, এই টপটাই ক্যামেলিয়া আঁখিশ্রী-র বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানের দিন পরেছিল।

     ওয়ার্ডরোবটার কাছ থেকে সরে এসে মনন বলল, “ল্যাপটপটা একটু দেখা যায়? এটার পাসওয়ার্ডটা…”

     “আমি জানি, খুলে দিচ্ছি। তবে একটা প্রশ্ন ছিল আপনাকে”, ক্যামেলিয়ার মা মননের দিকে স্থিরচোখে তাকিয়ে বলে, “আমার মেয়ে তো একটা পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছে, তবু আপনারা ওর জিনিসপত্রগুলো দেখতে চাইছেন কেন?”

     মনন জানত এ প্রশ্নটা উঠবেই। যে কোনও শোকসন্তপ্ত বাবা-মায়ের মনে প্রশ্নটা উঁকি দেবেই। পাশে দাঁড়ানো জাভেদ আলি একটা বানানো উত্তর দিতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে থামিয়ে মনন বলে, “ওর পথ দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগে একটা কিছু ঘটেছিল, আমরা এখনও জানি না কি সেটা। তবে জোর দিয়ে বলতে পারি অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটেছিল, কারণ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিনিট পনের আগে ক্যামেলিয়া আমাকে ফোন করেছিল। আমার ফোন সাইলেন্ট থাকায় আমি বুঝতে পারিনি। আমাদের ব্যক্তিগত আলাপ ছিল না, বিভিন্ন জায়গায় খবর সংগ্রহের কাজে গিয়ে কয়েকবার দেখা হয়েছে দুজনের। ও আমাকে কোনওদিনও ফোন করেনি, সেদিনই প্রথম ফোন করেছিল। আমার ধারণা সেদিন আমাকে ফোন করার অর্থ হল ক্যামেলিয়া পুলিশকে কিছু জানাতে চেয়েছিল। আমি খবর পেয়েছি সেদিন ও একটা স্টিং অপারেশনে গিয়েছিল।”

     “হায় ভগবান”, শাড়ির আঁচলটা মুখে চেপে ভদ্রমহিলা কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নার দমকে কেঁপে ওঠে তার শরীর।

     টেবিলে ল্যাপটপটার পাশেই একটা রাইটিং প্যাড পড়ে আছে। অন্যমনস্কভাবে মনন তার পাতাগুলো ওল্টাতে শুরু করেছিল, হঠাৎ চোখে পড়ল নীল কালিতে লেখা কয়েকটা ইংরেজি শব্দ।

     প্রথমে লেখা—‘অ্যান আই ফর অ্যান আই’।

     একটু ফাঁক রেখে তলায় লেখা—‘অ্যান অ্যাপল স্পয়েলস দ্য ব্যারেল।’

     লেখাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে মনন মিসেস দত্তর দিকে তাকাল। ভদ্রমহিলা ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছেন। মননের নির্দেশিত শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু মাথা নাড়লেন। তারপর পাসওয়ার্ড টাইপ করে ল্যাপটপটা খুলে দিলেন।

     ডেস্কটপে রাখা ফোল্ডার আর ফাইলগুলো ওপেন করে মনন দেখতে শুরু করল। বেশিরভাগই ক্যামেলিয়ার বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্টের স্টোরি, যার অনেকগুলো ইতিমধ্যে তার নিউজপেপারে প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর কয়েকটা মনন আগে পড়েছে। এই যেমন মুর্শিদাবাদে মেয়ে পাচারচক্রের খবরটা, তারপর উত্তরবঙ্গের নার্সিংহোম থেকে শিশু বিক্রির খবরটাও সে আগে পড়েছে। পড়তে পড়তে হঠাৎ মননের চোখ আটকে গেল একটা নিউজ স্টোরিতে—‘আঁখিশ্রী, আ রিয়েল আই ওপেনার’। তারপর এই খবরটা—‘ভিশন ২০২০ অ্যান্ড দ্য বিডিং প্রসেস’। তারপর এই খবরটায় এসে মননের চোখ স্থির হয়ে দাঁড়াল— ‘সন্দীপ চ্যাটার্জি, দ্য রাইজ অফ আ মিসটেরিয়াস আন্ত্রেপ্রেনো।’

     মনন ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে জাভেদ আলির দিকে তাকাল। এই তাকানোর অর্থটা জাভেদ বোঝে, সে পকেট থেকে একটা ৩২ জিবির পেনড্রাইভ বের করে বলল, “স্যার এখুনি এগুলো কপি করে নিচ্ছি।

 

(৮)

     অজানা জ্বরে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছে। মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া আর পশ্চিম মেদিনীপুর নিয়ে সংখ্যাটা এই সপ্তাহে এসে ৩৬-এ দাঁড়িয়েছে। কলকাতার আশেপাশে এই অজানা জ্বর তেমনভাবে এখনও হানা না দিলেও পার্কসার্কাস ও টিটাগড় মিলে তিনটে কেস রিপোর্টেড হয়েছে। মনন টিভির দিকে তাকিয়েছিল। তার স্কুলের বন্ধু ধর্মরাজ সেনগুপ্ত সেদিন বিক্রমশীল স্কুলের সিকিউরিটি অফিসার মৃত মাট্টুর মস্তিষ্কের ছবি দেখে বলেছিল ভ্যারিয়ান্ট ক্রুজফেল্ড জ্যাকব ডিজিজ হতে পারে। টিভির খবরটা দেখতে দেখতে সেই সম্ভাবনাটা ফের মননের মনে উঁকি দিয়ে গেল। দিনকয়েক ধরে তার মনপ্রাসাদের জানলা-দরজা যেন ঠিক খুলছে না। চিন্তাভাবনাগুলো ঠিক আলো-বাতাস পাচ্ছে না, ডালপালা মেলতে পাচ্ছে না। সাংবাদিক ক্যামেলিয়ার মৃত্যুটা ওকে ভেতর থেকে বেশ নড়িয়ে দিয়ে গেছে। বারবার মনে হচ্ছে সেদিন ক্যামেলিয়ার ফোনটা ধরতে পারলে কি মেয়েটা প্রাণে বেঁচে যেত!

     “স্যার, শিল্পপতি সন্দীপ চ্যাটার্জীর ব্যাপারে খবর যোগাড় করেছি”, ঘরে ঢুকে জাভেদ বলল, “রামজী অ্যান্ড লক্ষ্মণজী অডিট ফার্মের থেকে খবরটা পেয়েছি। এই ফাইলটায় সব আছে, দেখুন স্যার।”

     রামজী অ্যান্ড লক্ষ্মণজী অডিট ফার্ম হলেও ওদের আসল কাজ কর্পোরেট সার্ভিল্যান্স। কর্পোরেট জগতের বিভিন্ন গোপন খবরাখবর তারা টাকার বিনিময়ে ক্লায়েন্টদের হাতে তুলে দেয়। সন্দীপ চ্যাটার্জীর কোম্পানির সম্পর্কে জানার জন্য মনন কাজটা রামজী অ্যান্ড লক্ষ্মণজীদের দিয়েছিল।

     এখন ডিটেল রিপোর্টটা টেবিলে রেখে মন দিয়ে দেখতে শুরু করল।

     ‘চ্যাটার্জি গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ’ ২০০০ সালে তৈরি হয়। সত্যবান চ্যাটার্জিদের মূল কোম্পানি ‘চ্যাটার্জী ইউনিটেক’ থেকে বেরিয়ে এসে তার জেঠতুতো দাদা সত্যকাম চ্যাটার্জি এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১০ সালে তার মৃত্যুর পর তার পুত্র সন্দীপ চ্যাটার্জি কোম্পানির কর্ণধার হয়ে ব্যবসা আরো বাড়ান। চ্যাটার্জি গ্রুপ অফ হোটেলস, টেক্সটাইল ব্যবসা, বল-বিয়ারিং তৈরির ব্যবসা এবং এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা তো আগেই ছিল, তার সঙ্গে সন্দীপের পরিচালনায় সফটওয়্যার, বায়োটেকের মতো নতুন একগুচ্ছ ব্যবসাও যুক্ত হয়। বিগত পাঁচ-ছ’ বছর ধরে বিদেশেও ওদের ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। ২০১৬ সালের শেষদিকে নরওয়ের একটা অখ্যাত বায়োটেক ফার্মকে হঠাৎ চ্যাটার্জি বায়োটেক টেকওভার করে নেয়। ২০১৩ সালে সংসদে পাস হওয়া নতুন কোম্পানি অ্যাক্ট, ২০১৩-র ধারা নং ২৩২ অনুযায়ী দুটি কোম্পানির মার্জার হয়েছিল।

     কিন্তু চ্যাটার্জি বায়োটেক হঠাৎ নরওয়ের একটা অখ্যাত কোম্পানিকে টেকওভার করতে গেল কেন? সাধারণত বিদেশী কোম্পানিগুলোই ভারতীয় ছোট কোম্পানিকে টেকওভার করে, এক্ষেত্রে ঘটনা উল্টো ঘটল কেন? মননের কপালে ঈষৎ ভ্রূকুঞ্চন। নতুন কোম্পানি অ্যাক্ট অনুযায়ী রিভার্স মার্জার আইনসম্মত। একটা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি টেকওভার করতে পারে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিকে। কিন্তু এই নরওয়ের কোম্পানিটার সম্পর্কে রিপোর্টে তেমন কিছু নেই।

     “জাভেদ এই নরওয়ের কোম্পানিটা সম্পর্কে কিছু জানো?”

     “না স্যার।”

     “তুমি রামজী অ্যান্ড লক্ষ্মণজীকে ফোন করে বল এই নরওয়ের কোম্পানিটা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে সব তথ্য যেন আমাকে মেইল করে।”

     মনন রিপোর্টটার দিকে ফের তাকায়। এখানে লেখা আছে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাস নাগাদ যখন দিল্লিতে ভিশন ২০২০ প্রজেক্টের গ্লোবাল টেন্ডার হয় তখন আরও দুটো কোম্পানির সঙ্গে চ্যাটার্জি বায়োটেক যৌথভাবে এল ওয়ান হয়েছিল। কিন্তু বিহারে পাইলট প্রজেক্টে ব্যবসা করার পর যখন পশ্চিমবঙ্গে ওই প্রকল্পের অন্তর্গত ‘আঁখিশ্রী’ শুরু হয় তখন এল ওয়ান হওয়া সত্ত্বেও তাদের কাজ দেওয়া হয়নি। এখন থেকে আঠারো মাস আগে কাজটা দেওয়া হয় লোয়েস্ট কোট করা অন্য কোম্পানি ‘আইকিওর’-কে।

     মননের বারবার মনে হচ্ছে রিপোর্টে এমন কোনও হিন্ট আছে যেটা সে মিস করে যাচ্ছে। হঠাৎ ফোনটা তুলে সে কমিশনারসাহেবের নম্বরটায় রিং করে।

     ওপাশ থেকে গম্ভীর গলা ভেসে আসে, “বলো মনন, কিসের পারমিশন চাই?”

     ফোনের এপাশে মননের ঠোঁটে হাসি, লোকটা যে সবকিছু কিভাবে বুঝে যায়!

     “স্যার, ডুরান চ্যাটার্জিকে অ্যাটেম্পট টু মার্ডার কেসটায় চ্যাটার্জি গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের সন্দীপ চ্যাটার্জিকে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই।”

     “কিন্তু”, ফোনের ওপাশে কমিশনারসাহেব এক মুহূর্ত কি যেন ভেবে নিয়ে বলেন, “সন্দীপ চ্যাটার্জি ওই বাচ্চা ছেলেটা ডুরান চ্যাটার্জির দুঃসম্পর্কের কাকা হন না? তুমি কি ওদের পরিবারে কোনও অন্তর্ঘাতের গন্ধ পাচ্ছ?”

     “বলা মুশকিল, স্যার। তবে এক্ষুণি বলা যাচ্ছে না”, আসল কারণটা চেপে গেল মনন, “স্যার, পারমিশনটা?”

     “গো অ্যাহেড। তবে মনে রেখো সত্যবান চ্যাটার্জী, সন্দীপ চ্যাটার্জী— দে আর বিগ নেম! কোনও গন্ডগোল করলে হোম সেক্রেটারি মানে বাঘকে তুমি সামলাবে। আমি কিন্তু তখন হাত তুলে নেব।”

     কমিশনারসাহেবের ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। তবু মননকে রিস্কটা নিতেই হবে। সে ফোনটা রেখে মননের দিকে তাকিয়ে বলে, “জাভেদ তুমি পিৎজার ওপর কিসের টপিংস পছন্দ করো?”

     জাভেদ ভ্যাবলার মতো তাকায় মননের দিকে। তার পাগলাটে, খাদ্যরসিক উর্দ্ধতন অফিসারটির বিদঘুটে প্রশ্নে সে মাঝেমধ্যেই চমকে ওঠে। বলে, “স্যার আমি তেমন খাই না, আমার ছেলে পিৎজা খেতে খুব ভালোবাসে।”

     “আরে খাও খাও। পিৎজা হল ব্রেন-ফুড। মাঝেমধ্যে পিৎজা খেলে বুদ্ধি খোলে। আপাতত তোমার মোবাইলের ওই ‘ভোজন’ অ্যাপ থেকে দুটো মিডিয়াম সাইজের পিৎজা অর্ডার করো তো। বার-বি-কিউ চিকেন টপিংস উইথ এক্সট্রা মোজারেল্লা চিজ। আর হ্যাঁ, ওদের ফোন করে বলবে আধঘন্টার মধ্যে ডেলিভারি দিতে। তারপর আমরা বেরোব।”

     “কোথায় যাব স্যার?”

     “জোকা যাব, সন্দীপ চ্যাটার্জির বাড়ি। তার আগে একবার সল্টলেকে স্বাস্থ্যভবন যাব। অবশ্য তারও আগে আমাদের পিৎজা খ্যাটন” বলে হাসতে হাসতে চোখ টিপল ডিসিপি মনন শীল।

 

(৯)

     ইনস্পেকটর জাভেদ আলি যেখানে বসে আছে তার উল্টোদিকে টেবিলের পিছনে যে ভদ্রলোক বসে আছেন তাকে সে আগেও দেখেছে বেশ কয়েকবার। ঈষৎ স্থুলকায় ভদ্রলোক স্বাস্থ্যদপ্তরের জয়েন্ট ডিরেক্টর পদে আছেন। বয়স আন্দাজ সাতান্ন আটান্ন। জাভেদ তার সাহেব মনন শীলের অফিসঘরেও ভদ্রলোককে আগে দেখেছে। তবে দুজনের সম্পর্কটা এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না হলে কেউ ‘কাকা’ সম্বোধন করে না।

     “ভুটুকাকা, তোমার কাছে যে ইনফরমেশনগুলো চেয়েছিলাম সেগুলো যোগাড় করেছ?” জাভেদের পাশে বসা মনন শীল বেশ শিশুসুলভ কন্ঠে বলে ওঠে।

     “করেছি। কিন্তু তোকে আর কত ফেভার করব বল তো! এসব তথ্য বের করা কত ঝক্কির জানিস, তোর জন্য বুড়ো বয়সে আমার চাকরিটা না যায়! এমনিতে এই অজানা জ্বর এনকেফেলাইটিস কিনা বোঝা যাচ্ছে না, স্বাস্থ্যদপ্তর থেকে এখনও জ্বর সম্বন্ধে কিংবা মৃতের সংখ্যা নিয়ে অফিসিয়ালি কিছু জানানো হচ্ছে না।”

     “ভুটুকাকা, প্লিজ বলো, দিস ইজ লাস্ট ফেভার। আর কখখনও তোমায় জ্বালাব না।”

     “দেখ একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছি, সেও এখন আমেরিকায় সেটলড। এরপর এই বুড়ো বয়সে চাকরি চলে গেলে সোজা তোর বাড়ি গিয়ে উঠব, তখন তুই খেতে দিবি, বুঝলি”, বলতে বলতে হেসে ফেলেন তিনি। মননও সেই হাসিতে যোগ দেন।

     “এই নে তোর রিপোর্ট। এখানে এক্সেল শিটে সব আছে, যেমন বলেছিলি তুই। অজানা জ্বরে মৃতদের নাম, ধাম, রক্তের গ্রুপ, পুরোনো অসুখ আর পুরোনো অস্ত্রোপচারের ইতিহাস— সব আছে। এত সহজে কি পাওয়া যায়! জেলার সিএমওএইচ-রা এসব তথ্য চট করে দিতেই চায় না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এগুলো যোগাড় করতে হয়েছে।”

     সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত অজানা জ্বরে মৃতের মোট সংখ্যা ৩৮

     মুর্শিদাবাদ ১৪

     বাঁকুড়া ৮

     পুরুলিয়া ৬

     পশ্চিম মেদিনীপুর ৩

     হাওড়া ২

     দক্ষিণ ২৪ পরগনা ২

     কলকাতা (পার্শ্ববর্তী এলাকাসহ) ৩

     এক্সেল শিটে বানানো রিপোর্টটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল মনন। পাশ থেকে জাভেদও উঁকি দিয়ে পড়ছিল। শুকনো পরিসংখ্যান, তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নজরে পড়ল না।

     তবু রিপোর্টটার ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত অন্তত বারচারেক গম্ভীরমুখে চোখ বোলালো মনন। জাভেদ এই সময়গুলোয় মানুষটাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। এই নীরস তথ্যের মধ্যে কি লুকিয়ে আছে!

     “ভুটুকাকা এই রিপোর্টটা থেকে কিছু বুঝতে পারছ? যা সর্বনাশ ঘটার ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। আমি জানি না এই সর্বনাশ আমরা কতটা আটকাতে পারব!” মনন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।

     “কি যাতা বলছিস মনন”, স্বাস্থ্যদপ্তরের জয়েন্ট ডিরেক্টর ভুটুকাকা শিরদাঁড়া সোজা করে বসলেন।

জাভেদও পাশ থেকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল।

     “রিপোর্টটা একবার ভালো করে দেখ, বুঝতে পারবে। কোন বিষয়টা প্রত্যেক কেসে কমন আছে দেখ”, ভুটুকাকার দিকে তাকিয়ে বলল মনন।

     তিনজনেই টেবিলে রাখা এক্সেল শিটের হার্ড কপিটার ওপর ঝুঁকে পড়ল।

     “স্যার, এদের সবার বয়স ষাটের ওপর।” জাভেদ বলল।

     “আর?”

     “সবাই বিপিএল মানে দারিদ্র্যসীমার নিচে।”

     “আর? আর কিছু চোখে পড়ছে না?”

     “আর…আর… স্যার এদের সবার ক্যাটারাক্ট সার্জারি হয়েছে!” শেষ কথাটা বলার সময় জাভেদের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

     “যাক, জাভেদ, পুলিশে চাকরি করে তোমার বুদ্ধিটা একেবারে ভোঁতা হয়ে যায়নি দেখছি”, মনন জাভেদকে কথাটা বলে জয়েন্ট ডিরেক্টরের দিকে ফিরল, “ভুটুকাকা, এদের সবার ছানি অপারেশনের সময় কোনও গন্ডগোল হতে পারে, চোখের লেন্সেও গন্ডগোল থাকতে পারে।”

     “কিন্তু তা কি করে হবে! এটা হায়দরাবাদের রেপুটেড কোম্পানি ‘আইকিওর’ সাপ্লাই করে। ওরা রীতিমতো বৈধ পথেই কাজটা পেয়েছে। গতবছর জানুয়ারি মাসে গ্লোবাল টেন্ডারে ওরা কোটেশন ফেলে এল ওয়ান হয়ে তবে ‘ভিশন ২০২০’-তে ঢুকেছে। ওদের সঙ্গে আরো দুটো কোম্পানি একদর হেঁকে এল ওয়ান হিসেবে লিস্টেড আছে।”

     “আমি জানি ভুটুকাকা। বাকি দুটো কোম্পানির মধ্যে একটা আমদাবাদের ‘স্মার্টলেন্স’ আর অন্যটা আমাদের পশ্চিমবঙ্গের ‘চ্যাটার্জী বায়োটেক’। এরা সবাই হাইড্রোফোবিক, অ্যাসফেরিক ইন্ট্রাঅকুলার লেন্স বানায়।”

     “ওরা ইতিমধ্যে পাইলট প্রজেক্টে ভারতের আরো কয়েকটা রাজ্যে কাজ করেছে, কোথাও কোনও গন্ডগোল হয়নি তো! সব জায়গায় রিপোর্ট ভালো। আমাদের এখানেও এক বছর আগে মাত্র সাতটা জেলায় ‘আঁখিশ্রী’-র পাইলট প্রজেক্টে ওরা কাজ শুরু করেছে। কোথাও কোনও কমপ্লেন শুনিনি তো!” বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলো বললেও মনন দেখল ভুটুকাকার আত্মবিশ্বাস নিভে আসছে।

     “তাহলে এই রিপোর্টটাকে তুমি কি বলবে ভুটুকাকা! আমিও শুনেছি আঁখিশ্রীর প্রথম বছরে পাইলট প্রজেক্টে শুধু বিপিএল তালিকাভূক্ত এবং ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ছানি অপারেশনের সুযোগ পাওয়া যাবে। আচ্ছা প্রথম বছরের লক্ষ্যমাত্রা কত ভুটুকাকা?”

     “অ্যাঁ”, জয়েন্ট ডিরেক্টর চমকে তাকান, উদ্বিগ্ন গলায় বলেন, “দাঁড়াও আঁখিশ্রীর অনলাইন পোর্টালটা দেখতে হবে। সাতটা জেলার সিএমওএইচ-রা প্রতিমাসে ওটা আপডেট করে।”

     টেবিলে রাখা ডেস্কটপটা থেকে জয়েন্ট ডিরেক্টর তড়িঘড়ি আঁখিশ্রীর পোর্টালটা খুললেন। কম্পিউটার মনিটরকে এমনভাবে ঘুরিয়ে দিলেন যাতে টেবিলের উল্টোদিকে বসা মনন এবং জাভেদও দেখতে পায়। আঁখিশ্রীর পাইলট প্রজেক্টের তথ্যগুলো প্রতিমাসের শুরুতে এন্ট্রি করা হয়। তাই আগের মাস পর্যন্ত আপডেট পাওয়া যায়। একবছরের ডেডলাইন শেষ হয়ে গেছে গতমাসে। সারা বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০০০ টা ক্যাটারাক্ট অপারেশন, কিন্তু এক বছরের শেষে ৩৭৫৪ টা অপারেশন শেষ হয়েছে। এই অপারেশনগুলো মূলত জেলা হাসপাতাল আর মহকুমা হাসপাতালেই করা হচ্ছিল, তবে যে জেলাগুলোয় সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি হয়েছে সেখানেও ইদানীং আঁখিশ্রীর অপারেশন শুরু হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলো পোর্টালের ড্যাশবোর্ডে মন্তব্যের ঘরে নানা কারণ লিখেছে। যেমন গরম আর বর্ষার সময়টায় ম্যালেরিয়া বা আন্ত্রিকের প্রকোপ বাড়ায় ছানি অপারেশনের মতো পরিকল্পিত শল্যচিকিৎসাকে পিছিয়ে দিতে হয়েছে, সুপার স্পেশালিটিতে অপথ্যালমিক সার্জেনদের অভাবের কারণও লেখা হয়েছে।

     “ভুটুকাকা”, মননের গলাটা বিমর্ষ লাগে, “যেভাবেই হোক এই মৃত্যু মিছিল বন্ধ করতে হবে। তুমি এই ক্যাটারাক্ট অপারেশন বন্ধ কর।”

     “কিভাবে সম্ভব মনন। আমাদের হাতে কোনও প্রমাণ নেই। মাত্র ৩৮ জনের স্যাম্পেল সাইজ দিয়ে আমরা বলতে পারি না যে ছানি অপারেশনটার মধ্যেই অজানা জ্বরের মৃত্যুর কারণ লুকিয়ে আছে। তাছাড়া আঁখিশ্রী আমাদের রাজ্য সরকারের একটা গৌরবের প্রকল্প। এটা শুধু স্বাস্থ্য দপ্তরের সামাজিক প্রকল্পই নয় এটা এখন পলিটিক্যাল ইস্যু। আঁখিশ্রীর সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারের সাফল্য। তাছাড়া এখন আঁখিশ্রী যদি সাময়িকভাবে বন্ধও করে দেওয়া হয় তাহলে আইকিওর কোম্পানির তৈরি ইন্ট্রাঅকুলার লেন্সগুলো কলকাতায় সি অ্যান্ড এফের ঘরে পড়ে থাকবে। ইনডেন্ট অনুযায়ী মাল সব সি অ্যান্ড এফের ঘরে ঢুকে গেছে। ফলে সরকারকে চুক্তির পেমেন্ট শিডিউল অনুযায়ী আইকিওর-কে যেমন পণ্যের মূল্যবাবদ টাকা দিয়ে দিতে হবে, তেমনই হায়দরাবাদ থেকে পণ্য পরিবহন করে কলকাতা আনতে এবং ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্টের সেন্ট্রাল গোডাউন থেকে মাল জেলাতে পাঠাতে যে লজিস্টিক সাপোর্ট দিচ্ছে তার ক্ষতিপূরণ বাবদও সরকারকে বাড়তি পয়সা গুনতে হবে।”

     “ভুটুকাকা, তুমি যেভাবে বলছ তাতে মনে হচ্ছে সাড়ে তিনহাজার মানুষ যারা ছানি অপারেশনের পর আসন্ন মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাদের চেয়ে যেন সি অ্যান্ড এফের স্বার্থটা বড়! সত্যি বলবে ভুটুকাকা, আইকিওরের কলকাতার সি অ্যান্ড এফ কে?” মনন যেন মরীয়া হয়ে উঠেছে।

     “তুমি জানো না মনন তুমি কি বলছ! এরা অনেক বড় লোক, এদের ক্ষমতার কাছে তুমি-আমি তুচ্ছ। আমি সি অ্যান্ড এফ কোম্পানির মালিকের বিষয়ে কিছু প্রকাশ করলে আমার চাকরি থাকবে না মনন!” নিভে আসা অপ্রতিভ গলায় জয়েন্ট ডিরেক্টর বলেন।

     “আর মাত্র দু বছর চাকরি আছে তোমার, ভুটুকাকা”, উত্তেজিত মনন টেবিলে চাপড় মেরে বলে, “এখনও ভয় পাচ্ছ! আর যে আটত্রিশজন প্রৌঢ়ের প্রাণ চলে গেল তাদের কথা ভাবছ না? আমার আশংকা সত্যি হলে এখনও সাড়ে তিনহাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে, তাদের কথা ভাববে না একবারও?”

     মননের কথায় তার ভুটুকাকা দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে থাকেন কিছুক্ষণ। ধীরে ধীরে মাথা তুলে ক্ষীণ গলায় বলেন, “রাজা চক্রবর্তীর নাম শুনেছ?”

     “বিজনেসম্যান রাজা চক্রবর্তী? যিনি পার্টির এগজিকিটিভ কমিটির মেম্বার?”

     জয়েন্ট ডিরেক্টর ভুটুকাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “ওর আরেকটা পরিচয় আছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চয়নিকা ভট্টাচার্যের ভাই!”

 

(১০)

     গাড়িতে করে বেহালা চৌরাস্তা থেকে জোকা যাওয়ার সময় মননের স্মার্টফোনে টুং করে একটা হোয়াটস্যাপ মেসেজ ঢুকল। রামজী অ্যান্ড লক্ষ্মণজীর মেসেজ। লিখেছে—‘স্যার, প্লিজ চেক দ্য মেসেজ। ডিটেইলস অফ নরওয়েজিয়ান কোম্পানি সেন্ট থ্রু ইমেল।”

     “জাভেদ, তোমার সেই নরওয়ের কোম্পানির ডিটেইল চলে এসেছে।”

     পাশ থেকে জাভেদ আলি মননের মোবাইল স্ক্রিনের ওপর ঝুঁকে পড়ল। মনন তার জিমেইল অ্যাকাউন্ট থেকে মেইলটা খুলল। কোম্পানির প্রোফাইলটার পিডিএফ অ্যাটাচমেন্ট করে পাঠিয়েছে ওরা। পড়তে পড়তে মননের মুখে আরো অনেক প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে গেল? কপালের ভাঁজটাও আরও গভীর হল।

     চারজন বিজ্ঞানী মিলে এই কোম্পানিটা তৈরি করেছিল ২০১৬ সালের আগস্ট মাস নাগাদ। কোম্পানির রেজিস্টার্ড ঠিকানা দেখাচ্ছে— ট্রমসো, নর্ড-ট্রমস, নরওয়ে। যদিও নরওয়েবাসী ডঃ লারসেন তার দেশে নিউরো বায়োকেমিস্ট্রির ক্লিনিক্যাল রিসার্চ এবং ক্লিনিক্যাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত এই কোম্পানিটা তৈরি করেন কিন্তু তার সঙ্গে এই উদ্যোগে যোগ দেন আরও তিনজন বিজ্ঞানী যাদের একজন জাপানী, একজন ভারতীয় এবং তৃতীয়জন জার্মান। পিডিএফ ফাইলটায় ডঃ লারসেন সম্পর্কেই বিস্তারিত লেখা আছে। উনি কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি এবং পোস্টডক করেছেন। ডঃ লারসেন নিজে একজন চিকিৎসকও কিন্তু চিকিৎসার পেশায় না থেকে তিনি গবেষণার কাজে নিজের জীবন নিয়োজিত করেছেন। বেশ কয়েকবছর কাজের সূত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন। তার জীবনের আদর্শ হল নোবেলজয়ী ডঃ ড্যানিয়েল কার্লটন গাইডুসেক। জীবনের শেষ দিনগুলোয় যখন ডঃ গাইডুসেক ট্রমসোয় ছিলেন তখন লারসেন তার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তার পথপ্রদর্শক গাইডুসেকের মৃত্যুর পর তার স্মৃতিতে এই কোম্পানি তৈরি করেন। অথচ মাত্র ছ’ মাস পর তার কোম্পানি চ্যাটার্জী বায়োটেক নামে একটি ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে মার্জার করে নেয়। এই নতুন ভারতীয় কোম্পানিকে তিনি নিজের কোম্পানির সত্ব দিয়ে দেন। ভারতীয় কোম্পানির নতুন বোর্ড অফ ডিরেক্টরসে তিনি ছাড়া সবাই চ্যাটার্জি গ্রুপের ভারতীয় ডিরেক্টর।

     কিন্তু এইরকম একটা নতুন বিদেশী কোম্পানিকে চ্যাটার্জী গ্রুপ চিনল কিভাবে? চ্যাটার্জী গ্রুপও বায়োটেক ব্যবসায় নতুন। তবে এই মার্জারটা কে বা কারা চেয়েছিল? মননের কপালের ভাঁজটা আরো গভীর হয়ে উঠল। একটা কিছু ধাঁধা আছে যা সে বুঝতে পারছে না!

     মনন অন্যমনস্কভাবে ইমেলে পাঠানো পিডিএফ ফাইলটার দিকে তাকিয়েছিল। হঠাৎ তার মাথায় অদ্ভুত এক শিহরণ জাগল। নরওয়ের কোম্পানিটার নামের পাশে কোম্পানির লোগোটা ছোট করে দেওয়া ছিল। মনন স্ক্রিনে ট্যাপ করে বড় করে তুলল।

     “জাভেদ, দেখো, একটা ধাঁধা অবশেষে উদ্ধার হল!”

     জাভেদ স্ক্রিনের দিকেই তাকিয়েছিল, বলল, “কী স্যার?”

     “এটা দেখো, মোবাইল স্ক্রিনে কোম্পানির লোগোটা দেখো।”

     জাভেদ লোগোটার দিকে তাকাল। লেখা আছে—

                              I 4 I

     “স্যার এটা তো ইংরেজিতে ‘চার’ লেখা!”, জাভেদ সেদিকে তাকিয়ে বলল।

     “আর কিছু লেখা নেই? তোমার চোখে আর কিছু পড়ছে না!”

     “হ্যাঁ স্যার, চার-এর সামনে পেছনে দুটো দাগকাটা!”

     “উফ্ জাভেদ, মাথা খাটাও, বুদ্ধিগুলো কি সব হাঁটুতে চলে গেছে!” বিরক্তস্বরে মনন বলে ওঠে, “ওগুলো এমনি দাগ বা কোনও ডিজাইন নয়, তবে কম্পিউটারের ক্যাপচা-র মতো করে লিখেছে! দাগদুটো আসলে ইংরেজির বড় হাতের ‘আই’!”

     “কিন্তু স্যার অমন কেন লিখেছে?”

     “এখনও বুঝতে পারছ না! কিছু মনে পড়ছে না? ক্যামেলিয়া দত্ত তার প্যাডে কি লিখে গিয়েছিল?”

     “কী স্যার?” জাভেদ ঘাড় চুলকোয়।

     “অ্যান আই ফর অ্যান আই! সেটাকেই এভাবে লোগোর আকারে লেখা!”

     “ইয়া খুদা”, বিস্মিত চোখে তাকায় জাভেদ আলি।

     “অ্যান আই ফর অ্যান আই! অর্থাৎ প্রতিশোধ। হয়তো এই কোম্পানির আসল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিশোধ নেওয়া। কিন্তু কার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ সেটা এখনও আমরা জানিনা। তোমার মনে আছে ক্যামেলিয়ার প্যাডে আরও একটা ইডিয়ম লেখা ছিল যেটা নিয়ে ক্যামেলিয়া ওর মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিল।”

     “হ্যাঁ স্যার, এটা মনে পড়েছে— রটেন অ্যাপল স্পয়েলস দ্য ব্যারেল!”

     “হ্যাঁ, এই ধাঁধাটার অর্থ আমরা এখনও জানিনা। হয়তো এটা জানতে পারলে অনেক বড় কোনও সমস্যা বা ষড়যন্ত্রের কথাও জানা যাবে”, বলতে বলতে মনন চলন্ত গাড়ির জানলার বাইরে তাকায়, “জানিনা ক্যামেলিয়া এই ধাঁধার সমাধান করতে পেরেছিল কিনা, তবে সে তদন্তে সঠিক দিকেই এগোচ্ছিল। বুঝলে জাভেদ, ক্যামেলিয়া কিন্তু আমাদের অনেক সাহায্য করে গেছে।”

     এই ভরদুপুরে আকাশটা হঠাৎ মেঘলা আর বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। ওদের গাড়িটা এখন যেখানে সে জায়গাটা জোকা ছাড়িয়ে। ক্যামেলিয়া যেখানে অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায় তার থেকে বড়জোর দেড় কিলোমিটার দূরত্বে। ডানদিকে যে জায়গাটা রসপুঞ্জ পোস্টঅফিসের দিকে গেছে তার কাছাকাছি। চারপাশে সবুজের ছড়াছড়ি। একটা পুকুরের ধার দিয়ে বাঁক নিয়ে রাস্তাটা একটা বড় লোহার গেটের সামনে গিয়ে থমকেছে। চারপাশে প্রায় দশফুট উঁচু পাঁচিল ঘেরা বিশ একর জমির ওপর বাগানবাড়িটা, চট করে দেখলে কোনও রিসর্ট মনে হবে।

     গেটের বাইরে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে মনন আর জাভেদ আলি গাড়িটা থেকে নামল। দুজনেই সিভিল ড্রেসে থাকলেও আর্মস নিয়ে এসেছে। মননের ওয়েস্টব্যান্ড হোলস্টারে নাইন এমএম সেমিঅটোম্যাটিক গ্লক ফর্টিথ্রি গোঁজা আছে। পরনে একটা নীল ডেনিমের প্যান্ট, সাদা টি-শার্ট। জাভেদের কোমরে সাঁটানো গ্লক নাইন্টিন।

     বড় গেটটার সামনে দাঁড়িয়ে মনন একবার ডানদিকে উঁচুতে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার দিকে তাকাল।

     এই ক্যামেরার ফিড নিশ্চয়ই ভিতরের কোনও মনিটরে কেউ দেখছে। মনন পকেট থেকে তার আইডেন্টিটি কার্ড বের করে ক্যামেরার দিকে ধরল।

     কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল। একজন সিকিউরিটি গার্ড ওদের দেখে বলল, “স্যার, বাড়িতে নেই। আপনি কার সঙ্গে দেখা করবেন?”

     “আমি তোমার সঙ্গেই তো দেখা করতে এসেছি?” মনন বলল।

     লোকটা ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “মা… মানে?”

     পাশ থেকে জাভেদ বলল, “এক সপ্তাহ আগে এখানে স্কুটি চেপে কোনও মেয়ে এসেছিল?”

     “কত লোকই তো আসে, সব মনে থাকে না”, সিকিউরিটির লোকটা স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করে।

     “ভালো করে মনে করো।”

     “বললাম তো। তবে মনে হচ্ছে আসেনি, সেরকম কোনও মেয়ে এলে আমার মনে থাকত”, লোকটার গলার স্বরে একধরণের উপেক্ষা ফুটে উঠছে।

     বিরক্ত হল মনন। এর পেছনে ফালতু সময় নষ্ট করার কোনও মানে নেই, সামনে অনেক বড় কাজ পড়ে আছে। সে কোমরে গোঁজা গ্লকটা বের করে সরাসরি লোকটার মাথায় ধরে বলে, “জানো তো, ডাক্তার, উকিল আর পুলিশের সামনে মিথ্যে বলতে নেই। ওই যে বাইরের সিসিটিভিটা আছে ওটার পুরোনো ফুটেজ দেখলেই একমিনিটে তোমার মিথ্যে কথাটা ধরা পড়ে যাবে। তারপর সোজা থানায় চালান হয়ে যাবে।”

     গ্লক পিস্তলটা দেখেই লোকটার চোখ কপালে উঠেছে। ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে, নেতিয়ে পড়া গলায় বলে, “হ্যাঁ স্যার সেই জার্নালিস্ট মেয়েটা এখানে এসেছিল। ফেরার সময় তাড়াহুড়ো করে গেল, মনে হল পালাচ্ছিল। আমাদের দুটো ডোবারম্যান আছে, যাওয়ার সময় ওরা মেয়েটাকে তাড়া করেছিল তবে মেয়েটা পালিয়ে গেছিল। তারপর তো রাত্তিরবেলা টিভির খবরে শুনলাম মেয়েটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। তবে স্যার, মেয়েটার এখানে আসার খবর কাউকে জানানো বারণ আছে।”

     “সন্দীপ চ্যাটার্জী বাড়িতে আছে? থাকলে বলো, লালবাজার থেকে ডিসিপি মনন শীল এসেছে, দেখা করতে চায়।”

     লোকটা গেটের পাশের সিকিউরিটি রুমে গেল ফোন করতে, মিনিটখানেক বাদে ফিরে এসে বলল, “স্যার, ভেতরে যান। সোজা দোতলায় উঠে যাবেন, সন্দীপ স্যার আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।”

     সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে ডানদিকের প্রথম ঘরের দরজা খুলতেই চোখে পড়ল বিশাল মেহগনি কাঠের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পিছনে বসে আছেন এক সুপুরুষ চেহারার ভদ্রলোক। বয়স আটত্রিশ-চল্লিশ, চোখে রিমলেশ চশমা, ব্যাকব্রাশ করা চুল।

     “বসুন ডিসিপি মনন। বলুন আপনার জন্য কী করতে পারি? কী নেবেন সফট অর হার্ড”, অমায়িক সৌজন্যমূলক গলায় সন্দীপ চ্যাটার্জী বলেন।

     “থ্যাঙ্কস, কিন্তু লাগবে না”, মনন চেয়ারে বসে বলে, “বেশিক্ষণ সময় নেব না, কয়েকটা প্রশ্ন করব আপনাকে, উত্তর পেলে চলে যাব।”

     “বেশ করুন”, ভীষণ আত্মবিশ্বাসী দেখায় ভদ্রলোককে।

     “সাংবাদিক ক্যামেলিয়া দত্ত আপনার এখানে এসেছিল?”

     “হ্যাঁ একদিন মেয়েটি এসেছিল। পরে শুনলাম পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছে। ভেরি স্যাড।”

     “আপনার গেটের সিকিউরিটি বলল, মেয়েটি সেদিন এখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, আপনার কুকুরগুলো ওকে তাড়াও করেছিল।”

     “তাই নাকি!” সন্দীপ চ্যাটার্জীর চোখেমুখে বিস্ময় ঝরে পড়ে, “কিন্তু পালাবে কেন? অবশ্য মেয়েটা একটু তাড়ায় ছিল। তবে বুঝতেই পারছেন কুকুর পোষা হলেও হিংস্র জন্তু তো সবসময় কন্ট্রোলে থাকে না। যাইহোক আয়াম সরি ফর দ্যাট।”

     “এবার আসল প্রশ্নে আসি“, মনন বলে, “২০১৭ সালের প্রথমে হঠাৎ নরওয়ের কোম্পানি I 4 I-কে টেকওভার করলেন কেন?”

     “দেখুন ডিসিপি শীল এটা আমার একার সিদ্ধান্ত নয়, আমাদের বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের সিদ্ধান্ত। আমরা ওই নরওয়ের কোম্পানিটার কাছ থেকে বায়োটেক ব্যবসার অনেক পরামর্শ নিতাম, টেকনিক্যাল সাজেশন নিতাম। তাছাড়া আমরা রিসেন্টলি বিভিন্ন কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটির কাজ করছি সেই ক্ষেত্রটাতেও ওদের অভিজ্ঞতা অনেক। ওদের বিজ্ঞানীরা মেডিক্যাল অ্যানথ্রোপলজি নিয়েও অনেক কাজ করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অ্যাবোরিজিনসদের নিয়ে কাজ করেছে। আমাদের দেশের উপজাতিদের মধ্যেও নানারকমের মেডিক্যাল প্রবলেম আছে তাই কোম্পানির বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ওই কোম্পানিটাকে টেকওভার করার।”

     “আপনার উইকিপিডিয়ার তথ্যগুলো আমি দেখেছি। আপনার উচ্চশিক্ষা কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। I 4 I -এর মালিক ডঃ লারসেনও ওখানে গবেষণা করতেন। আপনি নিশ্চয়ই ওকে আগে থেকে চিনতেন?”

     “একদম”, হাসতে হাসতে সন্দীপ বলেন, “মননবাবু আপনার সোর্স অফ ইনফরমেশনের তারিফ না করে পারছি না। ইনফ্যাক্ট, লারসেনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ দীর্ঘদিনের তাই আমিই আমাদের কোম্পানির পরিচালকমন্ডলীর কাছে ওর কোম্পানিকে টেকওভার করার প্রস্তাব দিই।”

     মনন লোকটার দিকে তাকায়। কি দৃঢ়সংকল্প আর অবিচলভাবে বসে আছে লোকটা। ভাবছে প্রশ্ন করে ওকে টলানো যাবে না।

     “আপনি রাজা চক্রবর্তীকে কিভাবে চেনেন?”

     এবারও লোকটাকে টলানো গেল না। বলল, “সে তো খুব বিখ্যাত মানুষ, পার্টির ওপরের স্তরের নেতা। আর বিখ্যাত মানুষদের কে না চেনে? আমি তো নরেন্দ্র মোদীকেও চিনি কিন্তু উনি তো আর আমাকে চেনেন না।”

     “সেইটুকু পরিচয়ে আপনি গত এক বছরে রাজা চক্রবর্তীর সঙ্গে প্রায় পনেরো ষোলোবার ফোনে কথা বলেছেন? আপনার মোবাইল ফোনের কল হিস্ট্রি রিপোর্ট আমাদের কাছে আছে?”

     “ওহ্ এই কথা!” পাকা অভিনেতার মতো সন্দীপবাবু তার হতাশা লুকিয়ে মুহূর্তের মধ্যে আত্মবিশ্বাসী গলায় বলে উঠলেন, “আমাদের রাজারহাটের কর্পোরেট অফিস আর ল্যাবের এক্সটেনশনের জন্য বছরখানেক ধরে জমি সমস্যায় আটকে গিয়েছিলাম, মিউনিসিপ্যালিটির নির্মাণসংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়েও ফেঁসে গিয়েছিলাম। রাজাবাবু নেতা মানুষ, তাই ভাবলাম ওকেই ধরি।”

     “আচ্ছা, সন্দীপবাবু, আপনারা ভিশন ২০২০-র গ্লোবাল টেন্ডারে আইকিওর এবং স্মার্টলেন্সের সঙ্গে একই রকমের কম দর হেঁকে এল ওয়ান হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে আঁখিশ্রী-র পাইলট প্রজেক্টের কাজটা পেলেন না কেন?”

     “দেখুন, ভিশন ২০২০-র কাজ পশ্চিমবঙ্গের আগে বিহারে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছিল। ওখানে পাইলট প্রজেক্টে আমরা ভালোই কাজ করছিলাম। প্রায় পঁচিশ হাজার লেন্স সাপ্লাই করার কথা ছিল প্রথম বছরে। প্রায় আঠারো হাজার লেন্স স্মুদলি সাপ্লাই করেছিলাম। তারপর হঠাৎ মার্কেটে অ্যাসফেরিক লেন্সের কাঁচামাল অপটিক্যাল গ্লাসের অভাব দেখা দিল, সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেল, ফলে কনসাইনমেন্টটার বাকি মালগুলো সময় মতো ডেলিভারি করতে পারলাম না। তাই ওখানকার সরকার পাইলট প্রজেক্টের পর আর আমাদের সঙ্গে চুক্তিটা রিনিউ করল না।”

     “মিঃ চ্যাটার্জী, আমাদের এখানে আঁখিশ্রী প্রজেক্টে কাজটা আইকিওর পেয়েছে। মনে করুন, যদি কোনও কারণে আইকিওরের চুক্তিটা বাতিল হয়ে যায় তাহলে সবচেয়ে লাভবান কে বা কারা হবেন? আপনারাই তো? আপনারই তো তখন ডাক আসবে?”

     “দেখুন, আইকিওর অনেক ছোট কোম্পানি। মালিক সুব্বারাওকে আমি চিনি, ও খুব নিচু থেকে কষ্ট করে ওপরে উঠে এসেছে। আমি ওদের শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি। আমাদের চ্যাটার্জি গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ অনেক বড়ো কোম্পানি, আমাদের হাতে কাজও অনেক বেশি। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, কাজ করে যাও ফলের আশা কোরো না।”

     লোকটা যেন মননের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। পণ করেছে ভাঙবেও না মচকাবেও না। মননের পাশ থেকে জাভেদ ফিসফিসিয়ে বলল, “স্যার লোকটার গাটস আছে বলতে হবে। আপনাকেও ঘোল খাওয়াচ্ছে! কি ডেঞ্জারাস!”

     মনন হাসল, “সন্দীপবাবু আপনার এই বাগানবাড়িটা কিন্তু বেশ। প্রায় বিশ একর জায়গা তো হবেই?”

     “হ্যাঁ, বাইশ একর একজাক্টলি”, মননকে নাকানিচোবানি খাইয়ে লোকটার মুখে একটা কুটিল হাসি ফুটে উঠেছে।

     “আপনার কোম্পানির একটা ডিপো এখানেই আছে না?”

     “হ্যাঁ, তবে এই কম্পাউন্ডের মধ্যে নয় সেটা। এখান থেকে এক দেড় কিলোমিটার দূরে।”

     “চলুন সেটা একবার ঘুরে দেখে আসি”, হঠাৎ মনন ভদ্রলোককে প্রস্তাব দিল।

     জাভেদের মনে হল তার বস অবশেষে বুঝি সন্দীপবাবুর কাছে হার স্বীকার করে রণে ভঙ্গ দিচ্ছে!

     সন্দীপ চ্যাটার্জী তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, “নিশ্চয়ই। চলুন ডিসিপি সাহেব আপনাকে আমাদের ডিপোটা ঘুরিয়ে আনি।”

     ভদ্রলোকের চোখ আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল। পরনে গোলগলা টি-শার্ট আর ট্রাউজার। পায়ে স্নিকার।

     ভদ্রলোকের পিছন পিছন মনন আর জাভেদও ঘর থেকে বেরিয়ে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। তিনজনে যখন বাড়ির সামনের পোর্টিকোতে নেমে এল তখন মনন উৎকর্ণ হয়ে শুনতে পেল বাগানের দিক থেকে কুকুরের গম্ভীর ডাক ভেসে আসছে। বাড়ির সামনের লোহার ফটকটার দিকে এগোতে এগোতে মনন বলল, “চলুন, সন্দীপবাবু, আমাদের গাড়িটা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ওতেই ঘুরে আসা যাক আপনার ডিপো। তারপর আপনাকে ড্রপ করে আমরা ফিরে যাব।”

     “স্বচ্ছন্দে চলুন মননবাবু”, সেই আত্মবিশ্বাসের হাসি ঠোঁটে টেনে ভদ্রলোক বললেন, “আমি জানি ওয়ারেন্ট ছাড়া আমাকে আপনারা অ্যারেস্ট করতে পারবেন না, কি তাই তো, হা হা!”

     ভদ্রলোকের হাসির ধরনে জাভেদের গা জ্বালা করে উঠল। সে তার বসের নিশ্চিত পরাজয় দেখল।

     তিনজন ওদের লাল স্করপিও গাড়িটায় উঠতেই ড্রাইভার মাধবদা গাড়ি চালাল বড় রাস্তার দিকে। মনন আর জাভেদের মাঝখানে বসেছেন সন্দীপ চ্যাটার্জী।

     ডায়মন্ড হারবার রোডে উঠে গাড়ি চলল জোকার দিকে। হঠাৎ গোলাপ বাজারের কাছে এসে গাড়িটা রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল। ড্রাইভার ইঞ্জিনটা বন্ধ করে দিল। সন্দীপবাবু কিছু বুঝে ওঠার আগেই মনন তার কোমরবন্ধনী থেকে গ্লক ফর্টিথ্রি বের করে ভদ্রলোকের কপালে ঠেকাল, “সন্দীপবাবু এখানে নামুন। চিনতে পারছেন জায়গাটা? এখানেই আপনার ভাড়া করা ঘাতক রাস্তার ওপর গাড়িচাপা দিয়ে জার্নালিস্ট ক্যামেলিয়া দত্তকে খুন করেছিল!”

     জাভেদ এতক্ষণে মননের নিরুচ্চারিত নির্দেশ বুঝতে পেরে একটা দড়ি দিয়ে ভদ্রলোকের হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধতে শুরু করেছে। বাঁধা হলে ভদ্রলোককে টেনে গাড়ি থেকে নামাল সে।

     “একি! আপনারা আমার সঙ্গে কি করছেন!” ভদ্রলোকের গলায় আত্মবিশ্বাস সরে গিয়ে উদ্বেগ ফিরে এসেছে। বিহ্বল চোখে তার সঙ্গের মানুষ দুটোর দিকে তাকাচ্ছে। যে দুজন পুলিশ অফিসারকে তার এতক্ষণ আপাতনিরীহ বলে মনে হচ্ছিল হঠাৎ তারা একি ভয়ংকর খেলা শুরু করেছে!

     জাভেদ আচমকা পকেট থেকে একটা কালো কাপড় বের করে সন্দীপ চ্যাটার্জীর চোখদুটো বেঁধে ফেলল। ভদ্রলোকের হাতদুটো বাঁধা থাকার জন্য কোনও প্রতিরোধ করতে পারলেন না।

     সন্দীপবাবুর কাঁধে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে তাকে মধ্যদুপুরের ডায়মন্ড হারবার রোডের ওপর ঠেলে দিয়ে মনন বলে উঠল, “সন্দীপবাবু, আপনি এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক সেখানটায় ক্যামেলিয়া রান ওভার হয়েছিল। এখন ফলতার দিক থেকে একটা ফুল পাঞ্জাব লরি এদিকে এগিয়ে আসছে। গাড়ির গতি আশি কিলোমিটার প্রতিঘন্টা। লরিটা এখন যেখানে দেখা যাচ্ছে সেটা এখান থেকে আনুমানিক ৭০০ মিটার দূরত্বে। তার মানে আপনি ঠিক বত্রিশ সেকেন্ড পর রানওভার হবেন…ইওর টাইম স্টার্টস নাউ…এখন বলুন সেদিন কিভাবে ক্যামেলিয়াকে খুন করেছিলেন?”

     “বিশ্বাস করুন আমি…আমি ক্যামেলিয়াকে খুন করিনি”, গলার স্বর কেঁপে বিকৃত হয়ে আসে সন্দীপ চ্যাটার্জীর।

     “২৮…২৭…২৬”

     “আমি…আমি সত্যি বলছি…”

     “২৪…২৩…২২”

     “ক্যামেলিয়াকে…কেন…আ…আমি…”

     “১৯…১৮…১৭”

     “বিশ্বাস করুন…আমি …আমি…আমাকে ক্ষমা করুন…”, সন্দীপবাবুর গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে আসছে, টিশার্ট ঘামে জবজব করছে, যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে তার।

     “১০…৯…৮”

     “আমাকে বাঁ-চা-ন…আ…আমি…সব…স-ব বলছি…আ..

     আমি ক্যামেলিয়াকে খুন…ক..করেছি…”

 

(১১)

     প্রিওন! পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ও সংক্রামক প্রোটিন খন্ড যা এক মৃত্যুদূত! এইডস, ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু, বার্ড ফ্লু, জিকার মতো ভয়ংকর ভাইরাস না হলেও প্রিওন কিন্তু কুরু, ক্রুজফেল্ড জ্যাকব, ভ্যারিয়ান্ট ক্রুজফেল্ড জ্যাকব কিংবা ম্যাড কাউ ডিজিজের মতো প্রাণঘাতী রোগের বীজ রোপন করে!

     যে আপাতনিরীহ প্রিওন প্রত্যেক মানবদেহে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি করে PRNP জিন, তার মিউটেশনের ফলেই কিন্তু তৈরি হয় অস্বাভাবিক, বদখত এবং সংক্রামক মিসফোল্ডেড প্রিওন প্রোটিন। তখন সে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে আর শরীরের অন্য সুস্থ প্রোটিনগুলোকেও ধীরে ধীরে নষ্ট করে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়।

     লারসেন, স্নাইডার, তানাকা আর ইনু জানে প্রিওনের কথা। তবে এদের মধ্যে ইনু প্রথম মজা করে প্রবচনটা বলেছিল— ‘রটেন অ্যাপল স্পয়েলস দ্য ব্যারেল’!

     ওর কথা শুনে দু বছর আগে ১৩ মে-র সেই দিনটায় ওরা চারজনই হাসিতে ফেটে পড়েছিল। টোকিওর সেই রেস্তোরাঁয় ওরা সেদিন ওয়াইনের গ্লাস তুলে টোস্ট করেছিল। সেটা ছিল ‘প্রিওন ২০১৬’ বিশ্বসম্মেলনের শেষ দিন। ইতিমধ্যে ওরা চারজন মিলে দারুণ একটা জিনিস আবিষ্কার করেছিল। মূলত আবিষ্কারের গবেষণার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিল ডঃ তানাকা। সহজ পদ্ধতিতে কম খরচে সংক্রামক প্রিওনের ডি নোভো সিনথেসিস করেছিল ওরা। মানে প্রোটিন তৈরির কাঁচামাল অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে প্রিওন সংশ্লেষ করেছিল। তানাকার বানিয়ে দেওয়া ম্যানুয়াল অনুযায়ী চারজনের প্রত্যেকে ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নিজের দেশে গিয়ে গোপন ল্যাবে প্রিওন তৈরি করেছিল। পাঁচ বছরের নিরন্তর পরিশ্রমে ওরা প্রত্যেকেই প্রিওন তৈরিতে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছিল। যেসব প্রিওনঘটিত রোগের ইনকিউবেশন পিরিয়ড বড়, মানে যেগুলো শরীরে বিস্তারলাভ করে রোগের উপসর্গ তৈরি করতে পাঁচ, দশ, পনেরো কিংবা বিশ বছর লাগে সেগুলোকে তারা আরো শক্তিশালী করে রোগের প্রাদুর্ভাবের সময়টাকে আরো কমিয়ে এনেছিল। ফলে ওদের মডিফায়েড প্রিওনগুলো আরো ভিরুলেন্ট হয়ে উঠেছিল। ওরা আসলে তাদের পিতৃসম নোবেলজয়ী বৈজ্ঞানিক ডঃ ড্যানিয়েল কার্লটন গাইডুসেকের হৃত সম্মান ফিরিয়ে আনতে এই কাজটা করছিল। তাই গবেষণার কাজে মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছিল।

     ওদের পাঁচ বছরের ডেডলাইন শেষ হয়েছিল ১৩ মে, ২০১৬। আর সেদিনই তাদের ভেতর জমানো ঘৃণা নিয়ে এই অকৃতজ্ঞ সমাজের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। টোকিওর রেস্তোরাঁয় জন্ম নিয়েছিল কুখ্যাত সংগঠন I 4 I , দেশে ফিরে ডঃ লারসেন কোম্পানির নামটা রেজিস্ট্রেশন করেছিল। তাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল— প্রিওন নামক ধ্বংসের গোপন বীজ ছড়িয়ে দাও গোটা বিশ্বজুড়ে!

     আর তারা বসে বসে দেখতে চেয়েছিল এই মিথ্যাচারে ভরা অকৃতজ্ঞ মানবসমাজের অ্যাপোক্যালিপ্স্!

     তাদের গুপ্ত সংগঠন এবং কোম্পানি তৈরির ছ’ মাসের মাথায় ইনুই কোম্পানির জন্য প্রথম কাজটা নিয়ে এসেছিল ভারত থেকে। ওর পরিকল্পনা শুনতে শুনতে সবার রক্ত গরম হয়ে উঠেছিল। ভারত ১২০ কোটি জনসংখ্যার দেশ! ওদের চোখের সামনে ভাসছিল অ্যাপোক্যালিপ্সের ছবিটা! ওরা দ্বিধা করেনি, চ্যাটার্জী বায়োটেকের সঙ্গে মার্জারের প্রস্তাব দিয়েছিল। বিষয়টা আরো সুবিধার হয়েছিল কারণ চ্যাটার্জী বায়োটেকের কর্ণধার সন্দীপ চ্যাটার্জী ওদের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ছিল। কিন্তু ‘অ্যান আই ফর অ্যান আই’ সংগঠনের মোটিভটা সন্দীপেরও জানা ছিল না! আজও জানা নেই! সে শুধু জানে তার বন্ধু ইনু আর অন্যরা তাকে সাহায্য করছে, যাতে আইকিওরের ইন্ট্রাঅকুলার লেন্সগুলো বাতিল হয়ে যাবে এবং তখন শুধু পশ্চিমবঙ্গের আঁখিশ্রী নয় গোটা ভারতের ভিশন ২০২০ প্রজেক্টের লেন্স সাপ্লাইয়ের অর্ডারটা তার হাতে আসবে। ভিশন ২০২০-তে আই সার্জারির সংখ্যাটা যে কম নয়? ১৮ কোটি! ভারতের জনসংখ্যার পনের শতাংশ!

     রাত ২ টো বাজে। রাজারহাটের এই বিশাল দশ হাজার স্কোয়্যার ফিটের স্টেট-অফ-দ্য-আর্ট ল্যাবোরেটরি বানিয়ে দিয়েছে চ্যাটার্জী বায়োটেকের সন্দীপ চ্যাটার্জী। কোম্পানির কর্পোরেট অফিস থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে এই ল্যাব। ল্যাবের ভেতর মাত্র তিনজন মানুষ— লারসেন, তানাকা আর ইনু। স্নাইডার দিনদুয়েক আগে এখান থেকে ইন্দোনেশিয়া উড়ে গেছে। সেখানে নতুন কাজের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নতুন কাজ মানে নতুন ধ্বংসলীলা!

     একটু পরে রাত আড়াইটে নাগাদ আইকিওরের সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট রাজা চক্রবর্তীর গোডাউন থেকে আইকিওরের তৈরি অ্যাসফেরিক লেন্সের বাক্সবোঝাই ট্রাক আসবে। তখন ইনুর বন্ধুদের কাজ শুরু হবে। এই অন্তর্ঘাতের জন্য সন্দীপ চ্যাটার্জীকে নেতা রাজা চক্রবর্তীর পেছনে ১ কোটি টাকা ঢালতে হয়েছে। রাজার অবশ্য পোয়াবারো! তার দিদি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দৌলতে আইকিওরের সি অ্যান্ড এফের দায়িত্ব পাওয়া আবার সন্দীপ চ্যাটার্জীর কাছ থেকে সামান্য কাজের জন্য ১ কোটি টাকা লাভ!

     এখন গোটা বিল্ডিংটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে ল্যাব ম্যানেজার অমিত চোখানি ছাড়া এই মুহূর্তে ছ’ জন সিকিউরিটি গার্ড আর চারজন ফ্লোর বয় আছে। ট্রাক ঢুকে আনলোড করলে ওই চারজন ফ্লোর বয় প্যাকেটগুলো ফিফথ ফ্লোরের ল্যাবে তুলে আনবে। বাইরের কোনও লোক তখন এখানে ঢুকতে পারবে না। বায়োমেট্রিক লকের ল্যাবের দরজা ল্যাব ম্যানেজার চোখানি ছাড়া বাইরে থেকে কেউ খুলতে পারে না। ওর ফিঙ্গার প্রিন্ট প্রিসেট করা আছে। চোখানি ছাড়া আর মাত্র পাঁচজন বায়োমেট্রিক লক খোলার জন্য অথেনটিকেটেড। ওরা চারজন বিজ্ঞানী আর কোম্পানির চেয়ারম্যান সন্দীপ চ্যাটার্জী।

     তানাকা বিশাল ল্যামিনার এয়ার ফ্লো মেশিনটার ভেতর এক মিনিটের জন্য অতিবেগনী রশ্মির কাউন্টারটা চালিয়ে দিল। ওটাকে জীবানুমুক্ত করে তৈরি করতে হবে। ওটার ভেতরই সূক্ষ্ম ডেলিভারি ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে প্রত্যেকটা ইন্ট্রাঅকুলার অ্যাসফেরিক লেন্সের মধ্যে একটা একটা করে প্রিওনের প্রলেপ দিতে হবে।

     ইনুর কাজটা ফ্রিজারের পাশে। ফ্রিজারের মধ্যে -৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পাইরেক্স গ্লাসের টেস্টটিউবে প্রিওনগুলো স্টোর করা আছে। সেগুলোর ওপর মাইক্রোগ্রামে প্রিওনের পরিমান আর বানানোর তারিখ লেখা আছে। ইন্ট্রাঅকুলার লেন্সগুলো ঢুকলে সেগুলোর ব্যাচ নম্বর আর কোন ব্যাচের কত নম্বর লেন্সের সঙ্গে কোন তারিখের কতটা প্রিওন লোড হবে সেটার একটা সিনপসিস বানিয়ে কম্পিউটারে আপলোড করতে হবে।

     লারসেনের কাজটা একদম শেষে মানে লেন্সগুলোয় তানাকার প্রিওন লোডের পর। প্রিওনসহ লেন্সগুলোর ওপর একটা বায়ুনিরোধী স্বচ্ছ আবরণ দেওয়ার। এই প্রযুক্তিটা লারসেনেরই আবিষ্কার। এই প্রযুক্তিতে লেন্সের ওপর লোড করা প্রিওন ছ’ মাস পর্যন্ত তার তীব্র সংক্রামক ধর্ম বজায় রাখে।

     রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে পৌনে তিনটে নাগাদ একটা গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল। ঘুম তাড়ানোর জন্য লারসেন, তানাকা আর ইনু তখন কফি খাচ্ছিল। ইনু কফির কাপটা টেবিলে রেখে চোখ টিপে বলল, “গেট আপ বয়েজ, ইটস শো টাইম!”

 

(১২)

     রাত পৌনে তিনটের সময় গোটা বিল্ডিংটাই প্রায় অন্ধকার। শুধু গ্রাউন্ড ফ্লোর আর ছ’ তলায় আলো জ্বলছে। মনন সেদিকে তাকিয়ে জাভেদকে বলল, “গেট রেডি বয়, ইটস শো টাইম।”

     মনন আর জাভেদের সামনে স্খলিত পায়ে এগিয়ে চলেছে বিধ্বস্ত চেহারার সন্দীপ চ্যাটার্জী। মননের গ্লক ফর্টিথ্রির নলটা সন্দীপের কোমরে ঠেকানো। বাকী বারো জনের পুলিশের টিমটা গাড়ি নিয়ে বিল্ডিং থেকে একশ মিটার দূরত্বে অপেক্ষা করছে।

     “মিঃ চ্যাটার্জী, বিহেভ নর্মালি টু ইওর সিকিউরিটি স্টাফ”, কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল মনন। বিল্ডিংয়ের গেট আর লবিতে যে তিনজন সিকিউরিটি স্টাফ আছে তারা সন্দীপকে দেখে সমীহ দেখিয়ে সরে গেল।

     মনন আর জাভেদ ওদের সঙ্গে সন্দীপ চ্যাটার্জীকে নিয়ে লিফটে উঠে এল। আপাতত সন্দীপ চ্যাটার্জীকে দিয়ে ফোন করিয়ে আজ রাতে রাজা চক্রবর্তীর সি অ্যান্ড এফের গোডাউন থেকে ট্রাকে লেন্সের লোডিংটা বন্ধ করা গেছে। কাল সকালে রাজাবাবুকে তার প্রজাসমেত ধরবে মনন।

     লিফটটা ছ’ তলায় এসে দাঁড়াল। তিনজনে লিফট থেকে বেরিয়ে ল্যাবের দিকে এগিয়ে গেল। সন্দীপ চ্যাটার্জী সামনে। বায়োমেট্রিক লক খোলার জন্য ওর পাঁচ আঙুলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট লাগবে। লোকটা এই মুহূর্তে অসহায়, মননের কথা শোনা ছাড়া তার কোনও উপায় নেই।

     বায়োমেট্রিক লক খোলার আগে ল্যাবের স্লাইডিং ডোরের দুপাশে হাতে গ্লক পিস্তলটা নিয়ে মনন আর জাভেদ পজিশন নিয়ে নিল। বলা যায় না ল্যাবের ভেতর কেউ আর্মড থাকতে পারে। তাই প্ল্যান হল আগে সন্দীপ চ্যাটার্জী ঢুকবে তারপরে মনন আর জাভেদ আর্মস হাতে পিছনে ঢুকবে। মনন আগে থাকবে আর জাভেদ ব্যাক-আপ দেবে।

     ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ হতেই বায়োমেট্রিক লক খুলে গেল। স্লাইডিং ডোর দুপাশে সরে যেতে সন্দীপ ল্যাবের ভেতর পা রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে একটা পরিচিত কন্ঠ ভেসে এল, “আরে মিঃ চ্যাটার্জী আপনি! হোয়াট আ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ!”

     সেই গলার স্বর শুনে মনন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত ছিটকে ল্যাবের ভেতর ঢুকে পড়ল। তার সামনে এই মুহূর্তে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। একজন জাপানী মঙ্গোলয়েড চেহারার। দ্বিতীয়জন দৈত্যাকৃতি ফ্যাটফ্যাটে ফরসা এক সাহেব। তৃতীয় পরিচিত মানুষটিকে দেখে মননের অবিশ্বাসী মন কিছুতেই সত্যটা মেনে নিতে পারছিল না। তার স্কুলের সহপাঠী বিখ্যাত বাঙালি নিউরোসার্জন ডঃ ধর্মরাজ সেনগুপ্ত। মনন কর্পোরেট সার্ভিল্যান্স কোম্পানি রামজী অ্যান্ড লক্ষণজীর পাঠানো রিপোর্টে নরওয়ের কোম্পানি ‘অ্যান আই ফর অ্যান আই’-এর বোর্ড অফ ডিরেক্টরসে ডঃ ইনু এস নামটা আগে দেখেছিল, কিন্তু সেই ইনু যে তার বন্ধু ধর্মরাজ হবে তা সে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। তার পাশে দাঁড়ানো জাভেদও একেবারে বাকরহিত।

     “বেশ রাজ, তুইই এবার সবটা খুলে বল। কিভাবে ধর্মরাজ নাম নিয়ে তুই এমন অধর্মের কাজে জড়ালি?” মনন একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ডঃ ইনু এসের সামনে গিয়ে বসল।

     “আমার ইনু নামটার উৎপত্তির গল্পটাই আগে বলি”, ডঃ ধর্মরাজ সেনগুপ্ত মননের দিকে তাকিয়ে শান্তস্বরে বলতে শুরু করল, “নামটা ডঃ তানাকার দেওয়া। তানাকা, লারসেন আর স্নাইডার তিনজনই আমার সঙ্গে কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করত। তানাকা বরাবর বিজ্ঞানের পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়েও খুব উৎসাহী ছিল। ও মহাভারত পড়েছিল জাপানীতে। তোর মনে পড়ে পান্ডবদের মহাপ্রস্থানের সময় স্বয়ং ধর্মরাজ একটা সারমেয় রূপ ধরে পান্ডবদের সঙ্গে সঙ্গে গিয়েছিল। জাপানী ভাষায় ‘ইনু’ শব্দের অর্থ কুকুর! তানাকা আমার নামের সঙ্গে মিলিয়ে তাই নাম দিয়েছিল ইনু। তারপর আমরা যখন আমাদের কোম্পানি ‘অ্যান আই ফর অ্যান আই’-এর উদ্দেশ্য সফল করে তোলার জন্য একসঙ্গে কাজ করা শুরু করি তখন যৌথভাবে কাজ করার জন্য আমাকে বারবার জাপান যেতে হত। তখন আমি বুদ্ধি করে ডঃ ইনু এস নাম নিয়ে একটি জাপানী মেয়েকে বিয়ে করে জাপান আর ভারতের ডুয়াল সিটিজেনশিপ নিলাম।”

     “কিন্তু ধর্মরাজ কেন অধর্মরাজ হল সেটা বুঝলাম না”, মনন মাঝপথে বলে উঠল।

     “বিজ্ঞানীরা কি চায়? অথবা বিজ্ঞান সাধনা করে তারা কি পায়?”

     “বলে যা। আমি শুধু শুনব।”

     “বিজ্ঞানীরা অর্থ চায় না। কামিনীকাঞ্চনের মোহ তাদের নেই। তারা সম্মান চায়, যশ চায়। কারণ তারা নিজেদের মনে করে ‘নেক্সট টু গড’! আর ভাববে নাই বা কেন! তাদের মেধা বেশি, তাদের ত্যাগও বেশি। তারা যে যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো করে সেগুলোর সুফল ভোগ করে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানবসমাজ। যাদের জন্য তারা এত কিছু করে তাদের কাছ থেকে তারা প্রাপ্য সম্মানটা দাবী করতেই পারে। তুই বল ডঃ গাইডুসেক যে মানবসমাজের এত উপকার করেছিল সেই সমাজ সামান্য একটা কারণে…”

     ডঃ ধর্মরাজ সেনগুপ্তকে মাঝপথে থামিয়ে মনন বলে, “অ্যান্ড…ব্লা ব্লা ব্লা… মিঃ ডগ সেনগুপ্ত তোর কথাগুলোর শেষে আমার একটা কথাই বলার…ক্রাইম নেভার পে’স সে ভগবান হোক কি বৈজ্ঞানিক পাপ কাউকে ছাড়ে না!”

     বাইরে তখন একটু একটু করে ভোর হচ্ছে। মনন একটা হাই তুলে জাভেদের দিকে তাকিয়ে বলে, “জাভেদ, এখন একটা ফোন করব।”

     “কাকে স্যার?”

     “বাঘকে…মানে তোমরা যাকে হোম সেক্রেটারি বলো”, মনন হেসে বলে, “বাঘকে ফোন করে বলি একটা কুকুর ধরেছি। যদি আপনি কয়েকটা অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু করার অনুমতি দেন তাহলে এই কুকুর, ভাম, খটাশগুলোকে ধরে আপনার খাঁচায় দিয়ে আসি।”

15 thoughts on “আঁখিশ্রী

  • October 14, 2018 at 10:52 pm
    Permalink

    ফাটাফাটি থ্রিলার, আন্তর্জাতি মানের লেখা.. পার্থ দা র আগের গল্পের মতোই টানটান..
    Frederick Forsyth এর লেখার কথা মনে পড়লো

    Reply
    • October 19, 2018 at 1:23 pm
      Permalink

      অনেক অনেক ধন্যবাদ সুদীপ তোমার সুন্দর পাঠ প্রতিক্রিয়ার জন্য। ভাল থেকো। শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা ও ভালবাসা।

      Reply
  • October 16, 2018 at 10:12 am
    Permalink

    রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার। পার্থবাবু’র আগের গল্পের লিঙ্ক টা পাওয়া যাবে?

    Reply
  • October 18, 2018 at 4:36 am
    Permalink

    Awesome storyline,, Hats off to Partha dada,, carry on

    Reply
    • October 19, 2018 at 1:15 pm
      Permalink

      Thanks a lot bro…Bijoya greetings for you.

      Reply
  • October 18, 2018 at 10:05 pm
    Permalink

    হ্যাঁ, এই হল সত্যিকারের আন্তর্জাতিক স্তরের বায়োথ্রিলার। এ আমাদের সবার কাছে গর্বের বিষয় যে এমন জিনিস বাংলায় লেখা হল, আর তারপর আমাদের সবার প্রিয় কল্পবিশ্ব-তেই স্থান পেয়ে সামনে এল। আরেকটু বড়ো হলে আরেকটু খেলানো যেত, বিশেষত শেষটায়। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়াও গেল না শেষ অবধি। তবু বলব, উদয় শতপথীর ‘ব্রুটাল’-এর তুলনায় এটি অনেক পরিচ্ছন্ন ও সুলিখিত থ্রিলার।
    মনন শীলের পরবর্তী ব্রেইনি ও ব্রনি অ্যাডভেঞ্চারের অপেক্ষায় রইলাম।

    Reply
  • October 19, 2018 at 8:33 am
    Permalink

    Khub bhalo laglo. Onek ovinondon lekhok ke.

    Reply
    • October 19, 2018 at 1:21 pm
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ গিরিধরবাবু আপনার পাঠ প্রতিক্রিয়ার জন্য। শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা।

      Reply
  • October 19, 2018 at 1:13 pm
    Permalink

    অনেক অনেক ধন্যবাদ ঋজুবাবু। আপনার মতো সুলেখক ও সমালোচকের কাছ থেকে এমন সদর্থক ও সুচিন্তিত পাঠ প্রতিক্রিয়ার জন্য। আপনার ও অন্য পাঠকদের ভাল লেগেছে এর চেয়ে স্বস্তিদায়ক আমার পক্ষে আর কি হয়তে পারে। ভবিষ্যতে মনন শীলের আরো কাহিনী আপনাদের সামনে আনার চেষ্টা করব। শুভ বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা নেবেন।

    Reply
  • October 20, 2018 at 8:44 am
    Permalink

    ভাই লেখাটা খুব সুন্দর হয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টান টান উত্তেজনা!

    Reply
  • October 21, 2018 at 11:01 am
    Permalink

    টানটান, এক্সাইটিং, এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মত একটা গল্প। কি দুর্দান্ত রিসার্চওয়র্ক! স্মার্ট ন্যারেশন! এককথায় দুর্ধর্ষ।

    Reply
  • October 26, 2018 at 7:30 am
    Permalink

    অসাধারণ ভালো বায়োথ্রিলার হয়েছে। টানটান সাসপেন্স। বিজ্ঞানের তথ্যগুলিও নির্ভুল।

    Reply
  • October 26, 2018 at 9:52 am
    Permalink

    টানটান মননশীল একটি থ্রিলার। আগেরটির মতোই জমজমাট। শেষটা একটু হুট করে হল যেন। বাকিটা দারুণ। পার্থদার কাছে প্রত্যাশার পারদ ক্রমশই চড়ছে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!