আগন্তুক

আগন্তুক

লেখক – অনির্বাণ সরকার

অলংকরণ – অনির্বাণ সরকার

৩ মে, সাল ২০৪০, রাত ১২ : ৪০ এ.এম। হয়তো আজই আমার শেষ দিন। কাকতালীয়ভাবে আজ আমার জন্মদিনও। দু’বছর আগে পৃথিবী থেকে আমরা তিনজন নভশ্চর ইসরোর এই অত্যাধুনিক মহাকাশযানে রওনা হয়েছিলাম। এখন আমাদের মহাকাশযানটি বৃহস্পতির কাছে এক অজ্ঞাত ভয়ঙ্কর বিপদের সম্মুখীন। সৌরঝড় ও তা প্রতিহত করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আরও ভালোভাবে গবেষণা করাই আমাদের এই মহাকাশযাত্রার মুখ্য উদ্দেশ্য। সূর্য বা অন্য কোনও উৎস থেকে আগত সৌরঝড়গুলির বা মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাব থেকে পৃথিবী অনেকাংশে বেঁচে যায় বৃহস্পতির উপস্থিতির জন্য। এছাড়াও সৌরজগৎ-এর এই বৃহত্তম গ্রহটি পৃথিবীর বহু বিপন্মুক্তির কারণ। অসংখ্য অ্যাস্টরয়েড, উল্কা, ধূমকেতু– যাদের যে কোনও একটির আঘাতে পৃথিবীর পুরো জীবকুল নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারত (ডাইনোসররা এইরকম একটার আঘাতেই বিলুপ্ত হয়েছে বলে মনে করা হয়), বৃহস্পতির বিপুল মহাকর্ষে সব পৃথিবীর পরিবর্তে বৃহস্পতির বুকে আছড়ে পড়ে। আমরাও তাই গবেষণার জন্য বৃহস্পতির থেকে মোটামুটি .২৫ A.U. বা ৩.৭৪ কোটি কি.মি. দূরবর্তী অবস্থানটিই বেছে নিয়েছি। কারণ বেশিরভাগ সৌরঝড় বৃহস্পতির দিকেই ধেয়ে আসবে। আমাদের মহাকাশযানটিতে সৌরঝড় প্রতিহত করার অতীব উন্নত প্রযুক্তি আছে। এছাড়াও প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমাদের এই মহাকাশযানটির, যাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় স্পেস-শাট্‌ল বলে, বেশ কিছু অত্যাধুনিক বৈশিষ্ট্য আছে। আমাদের মহাকাশযানটি প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন, তাই দু’বছরেই পৃথিবী থেকে বৃহস্পতির কাছাকাছি চলে এসেছি। প্রচণ্ড গতি অর্জন করার সময় স্থিতি জাড্য বল গতিমুখের বিপরীত অভিমুখে দুঃসহ পরিমাণে চাপ সৃষ্টি করে, যা কোনও জীবিত প্রাণীর পক্ষেই সহ্য করা অসম্ভব। আমাদের মহাকাশযানটিতে এই জাড্য বল প্রশমিত করার উন্নত প্রযুক্তি আছে। আর আছে কৃত্তিম অভিকর্ষ বজায় রাখার সর্বাপেক্ষা উন্নত প্রযুক্তি। এছাড়া স্পেস-শাটল স্বয়ংক্রিয় ভাবে অবতরণে সক্ষম, তাও আপৎকালীন বিপদের কথা ভেবে একটি অত্যাধুনিক ক্যাপসুলও আছে যার ভেতরে তিনজন অনায়াসে বসতে পারে এবং এটির অবতরণের জায়গা আগে থেকে প্রোগ্রাম করা একটি সফটওয়্যার দ্বারা নির্ধারিত করা আছে। আর এখন মহাকাশযানে অতি উৎকৃষ্ট জ্বালানীর ব্যবহার হয়। রকেট ইঞ্জিন প্রযুক্তিতেও প্রচুর উন্নতি হয়েছে বিগত কয়েক বছরে। খুবই কম জ্বালানিতে এখন প্রচুর দূরত্ব অতিক্রম করা যায়।

     যাইহোক, আমাদের মহাকাশযান মঙ্গল গ্রহ পার করে এসে যখন বৃহস্পতির কাছে, ঠিক তখনই বিপদটা এল অন্যভাবে, যার কল্পনাও আমরা করিনি। আমাদের মহাকাশযানটি তখন মহাশূন্যে স্তিমিত অবস্থায় ছিল। কক্‌পিটে আমার দুই সঙ্গী বরিস আর বিজয় যানটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।  বরিস রুশ মহাকাশচারী, আর আমি ও বিজয় ভারতীয়। এটি একটি ইন্দো-রুশ মিলিত প্রয়াস। আমার চোখ সৌরঝড় পর্যবেক্ষণকারী যন্ত্রপাতির মনিটরে। তখনই একটি মনিটরে একটি সৌরঝড়ের পূর্বাভাস দেখতে পেলাম যা কিনা আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের ওপর দিয়ে বয়ে যাবে। আমিও পর্যবেক্ষণকারী যন্ত্রপাতিগুলির শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সেরে রাখতে রাখতে দেখলাম মনিটরে আরও একটি সঙ্কেত, একটি আলফা কণার ঝড় অন্য আর একটি অজানা উৎস থেকে ধেয়ে আসছে। যন্ত্রের হিসেব ঠিকঠাক থাকলে এই দুই মহাজাগতিক রশ্মির সংঘাত আমাদের মহাকাশযানের থেকে মোটামুটি ৭৫২ কোটি কি.মি. দূরে হবে।

     এবার খালি এক অসামান্য মহাজাগতিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করার রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা। আর দশ সেকেন্ড।– তারপর আট-সাত—তিন-দুই-এক… ব্যাস, সৌরঝড় আছড়ে পড়ল আমাদের স্পেস-শাটলে এবং অতিক্রম করে চলে গেল বৃহস্পতির দিকে। হঠাৎ প্রবল ঝাঁকুনি, আমি আমার বসার জায়গা থেকে ছিটকে পড়লাম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ এক অজানা তীব্র মহাকর্ষ বল অনুভব করলাম যেটাতে আমাদের মহাকাশযানটি স্তিমিত অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে সেই মহাকর্ষ বলের প্রভাবে দিগ্‌ভ্রান্তের মত প্রচণ্ড বেগে ধাবিত হল। ইতিমধ্যে ওই প্রবল মহাকর্ষের টানে বৃষ্টির মতো অ্যাস্টরয়েড ছুটে আসতে থাকল। তাদের অনেকগুলোর সঙ্গেই আমাদের যানটির প্রবল সংঘর্ষ হতে থাকল। অত্যাধুনিক এবং অত্যন্ত শক্তিশালী বলেই আমাদের যানটি ওই ক্রমাগত সংঘর্ষের সঙ্গে যুঝে চলেছে। কিন্তু আর কতক্ষণ যে টিকে থাকতে পারবে কে জানে! হঠাৎ একটি বেশ বড়সড় অ্যাস্টরয়েডের ধাক্কায় আমাদের যানটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হল এবং একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। কক্‌পিটে বসে আমার দুই সঙ্গী  চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু বেশ কিছু যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে গেছে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে আমরা লাটিমের মতো পাক খেতে খেতে মহাকাশের কোন অতলে ছুটে চলেছি! আমরা তিনজন নভশ্চর অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর প্রহর গুনতে লাগলাম।

     মানুষের অন্তিম প্রহর যখন আসন্ন হয়, হয়তো সব মানুষই তার সারাজীবনের ফেলে আসা সব মুহূর্তগুলি হাতড়ে কৃতকর্মের হিসাব করে নেয়। বাবা-মা’র মুখটা সবার আগে ভেসে এল মনে। ওঁদের ক্রমাগত উৎসাহ দান, প্রচুর আত্মত্যাগ আর অফুরান ভালোবাসা ছাড়া আমার জীবনে এই উত্তরণ  সম্ভব ছিলই না। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের ছোটো একটি গ্রামশহর বীরপাড়া, আমার বাড়ি। আমার ছোটবেলার জায়গা- আমার বেড়ে ওঠার জায়গা। চা বাগান ঘেরা ছোট জায়গাটিতে  আমার বন্ধু পরিবৃত শৈশব ছিল অনাবিল আনন্দময়। দূষণবর্জিত খোলামেলা জায়গায় বড় হওয়ায় দামাল ছিলাম, তাই স্বভাবতই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। খেলাধুলার পাশাপাশি শিক্ষার জগতেও পারদর্শিতার ছাপ রাখছিলাম। রকেট ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করে বহুধাপ পেরিয়ে আজ আমি নভশ্চর ও মহাকাশবিজ্ঞানী। কিন্তু মহাকাশের প্রতি এই টান এবং নভশ্চর হওয়ার স্বপ্ন দেখার শুরু ছোটবেলার বীরপাড়াতেই- এক বিশেষ ব্যাক্তির প্রভাবে, সে এক রহস্যময় আগন্তুক। ভাগ্যের পরিহাসে আজ আমার জন্মদিন বলেই হয়তো বেশি করে সেই সাত বছর বয়সের জন্মদিনটার কথা মনে পড়ছে। আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য জন্মদিন ছিল সেটা। মনে পড়ছে সেই রহস্যময় আগন্তুক কাকুর কথা, যিনি সেদিন খুব ভোরবেলায় আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। কাকু খুবই ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিলেন। উনি খুব বেশীক্ষণ আমাদের বাড়িতে ছিলেন না। আমি ওই কাকুকে ওই দিনের আগে বা পরে আর কখনও দেখিনি। তাই কাকুর চেহারা স্মৃতির চাদরে চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু ওঁর ওই উপস্থিতি স্পষ্ট মনে আছে। আমার এখনও মনে পড়ে কাকুকে দেখে আমার বাবা-মা প্রথমে খুব অবাক হলেও উনি চলে যাওয়ার সময় খুব কান্নাকাটি করেছিলেন। ওই কাকুর কথা আগে কখনওই বাবা মা-র মুখে শুনিওনি। তবে যাইহোক, আজ আমার নভশ্চর হওয়ার পেছনে সেদিনের ওই কাকুর উপস্থিতিই অনুঘটকের কাজ করেছিলো। কারণ পড়ে শুনেছিলাম ওই কাকু ছিলেন নভশ্চর। কেনই বা তিনি সেদিন ওই ক্লান্ত বিধ্বস্ত অবস্থায় হঠাৎ উদয় হয়েছিলেন আর কেনই বা চলে গেলেন, তা আজও আমার কাছে রহস্যই থেকে গেছে। কিন্তু ওঁকে দেখে ও ওনার কথা শুনেই সেদিনের পর থেকে আমার মহাকাশ ও মহাকাশবিজ্ঞানের প্রতি প্রবল অনুসন্ধিৎসা ও অনুরাগের শুরু। আর বাবা মা-ও তারপর থেকে আমাকে মহাকাশবিজ্ঞানে উৎসাহদানে কোন খামতি রাখেনি। যেন সেদিনই আমার নিয়তি ঠিক হয়ে গিয়েছিল যে আমি মহাকাশবিজ্ঞানী ও নভশ্চর হবো।  কাকু আমার কোন সম্পর্কের কাকু হয়, তা সেদিনের শৈশবের স্বভাব বাৎসল্যে জিজ্ঞাসা করা হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে বাবা- মা’কে বহুবার জিজ্ঞাসা করেও এর উত্তর পাইনি। রহস্যজনক ভাবে প্রতিবারই তারা বলে গেছেন যে আমি বড় হয়ে মহাকাশবিজ্ঞানী ও নভশ্চর হব এবং আমি যথাসময়ে নিজে থেকেই সেই কাকুর পরিচয় জানতে পারব। আর কবে কাকুর পরিচয় জানব? আর কিছুক্ষণ পরেই তো সব শেষ। আগন্তুক কাকু রহস্যই থেকে গেলেন!

     ছোটবেলার বীরপাড়া, ডুয়ার্সের পাহাড় জঙ্গল রাস্তাঘাট, বড় হয়ে ওঠার পথে বন্ধু বান্ধব, নিকট আত্মীয়, আমার শিক্ষক জেঠু, ভাই, বাবা, মা- সবাই মনে ভিড় করে আসছে। আর হয়তো কোনওদিনই এদের দেখতে পাব না। শরীরে অস্বস্তি বেড়ে চলেছে। মহাকাশযানের বিক্ষিপ্ত প্রচণ্ড গতি সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছ। শরীর মনে হচ্ছে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে যাবে, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবে! তখনই বিশাল একটি অ্যাস্টরয়েডের সঙ্গে আমাদের মহাকাশযানটির প্রবল সংঘর্ষ ঘটল। মহাকাশযানের ধাতব দেওয়ালে মাথা ঠুকে গেল। তারপর আর কিছু মনে নেই।

     কতক্ষণ পর যে ধীরে ধীরে চোখ মেললাম, বলতে পারব না! আমার জ্ঞান ফিরে এসেছে। দেওয়ালে মাথা ঠুকে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। জ্ঞান ফেরার পর প্রথম যে অপার্থিব অদ্ভুত অনুভুতি হলো, তা হল, আমি জীবিত! অবিশ্বাস্য লাগছিল। ভগবানকে অসংখ্য ধন্যবাদ। হঠাৎ মনটা উৎকণ্ঠায় ভরে উঠল। আমার বাকি দুই সঙ্গী কেমন আছে? কক্‌পিটে গিয়েই মনটা যন্ত্রণায় হাহাকার করে উঠল! দু’জনেই মৃত! শেষ অ্যাস্টরয়েডটি ছিলো বিশাল। সংঘর্ষটি ছিল মারাত্মক। আর হয়েছিল যানটির সামনের ভাগের সঙ্গেই। দুই দুর্ভাগা ওই আঘাত সহ্য করতে পারেনি। মনটা কেঁদে উঠল। এতদিন একসঙ্গে ছিলাম আমরা! কিন্তু এখন আমি এই অসীম মহাকাশে একা! একেবারে একা! মনের ভেতরের প্রবল শিহরণ ও বেদনা মিশ্রিত অনুভূতি গ্রাস করছিল আমায়। ওই অবসাদ থেকে কিছুটা ধাতস্ত হয়ে সংবিৎ ফিরে পেতেই লক্ষ করলাম, বিস্ময়কর ভাবে আমাদের মহাকাশযানটি সুস্থিত অবস্থায়! সেই প্রবল মহাকর্ষ বলটি আর নেই।

     আমি সন্দিহান হয়ে উঠলাম। আমাদের মহাকাশযানটির নিয়ন্ত্রণহীন অশান্ত বিক্ষিপ্ত গতি  এভাবে স্তিমিত হল কেমন করে? কক্‌পিটের জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিতেই প্রবল বিস্ময়ে লক্ষ করলাম যে আমাদের মহাকাশযানটি একেবারে পৃথিবীর সামনে! আমাদের কালান্তক দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল বৃহস্পতির সামনে, যেখানে পৌঁছতে আমাদের প্রায় দু’বছর লেগেছিল। আর এখন আমি আবার পৃথিবীর সামনে! তাহলে কতবছর আমি অজ্ঞান হয়ে ছিলাম! আর কী করেই বা পৃথিবীর কাছে চলে এলাম? মনের ভেতর একটা অজানা আশঙ্কার চোরাস্রোত বয়ে গেল!

     আবার প্রবল ঝাঁকুনি। আমি এবার পৃথিবীর অভিকর্ষ অনুভব করলাম। মহাকাশযানটি এবার পৃথিবীর দিকে ধাবিত হল। কক্‌পিটে বসে মূল ইঞ্জিন চালু করার চেষ্টা করলাম, যদি কোনওভাবে যানটি নিয়ন্ত্রণ করে এই অবাধ পতন রোধ করা যায়। হায়, বৃথা চেষ্টা! সমস্ত যন্ত্রপাতি বিকল। অ্যাস্টরয়েডের সঙ্গে সংঘর্ষে মহাকাশযানটির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন। মহাকাশযানটি প্রবল গতি অর্জন করতে করতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করল। ঘটনাগুলি এতটাই আকস্মিক দ্রুততায় ঘটছিল যে আমি সাধারণ বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলাম। এখন বাঁচার শেষ উপায় আপৎকালীন ক্যাপসুলে ঢুকে পড়া, অবশ্য যদি সেটাও বিকল না হয়ে গিয়ে থাকে। দুই মৃত সঙ্গীর মৃতদেহ নিয়ে ক্যাপসুলে ঢুকে পড়ার আগে কক্‌পিটের জানলা দিয়ে দেখলাম যে আমাদের মহাকাশযানটির সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে আগুনের বলয় তৈরি হয়েছে। ক্যাপসুলে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। আমাদের অবতরণ করার কথা ছিল বঙ্গোপসাগরে। ক্যাপসুলে ঢুকে দেখি অবতরণের প্রোগ্রামিং সফটওয়্যার কাজ করানোর যন্ত্রটিই বিকল। এখন ভগবান ভরসা। ইজেক্টের বোতাম টিপে দিলাম। মহাকাশযান থেকে আমাদের ক্যাপসুল ছিটকে বেরিয়ে এল। বিকল যন্ত্রাংশ নিয়ে যে এখন পৃথিবীর কোথায় আছড়ে পড়ব ভগবানই জানেন। আমি আবার মৃত্যুর অশনি সংকেত দেখতে পাচ্ছি। প্যারাস্যুট ঠিকঠাক সময়ে স্বয়ংক্রিয় ভাবে খুলে গেলে ভালো, না হলে ম্যানুয়াল বোতাম টিপেই খুলতে হবে। কোনও জলভাগে অবতরণ করলে বেঁচে যাবো, না হলে বাঁচার সম্ভাবনা বড়ই ক্ষীণ। আমাদের ক্যাপসুলের চারপাশে অগ্নিকুণ্ড। জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে নীচে নামতে থাকলাম প্রবল বেগে। প্যারাস্যুট ঠিক সময়েই খুলল।  আবার শরীরে প্রবল চাপের অস্বস্তিকর অনুভুতি হচ্ছে। এবার ভগবানের কৃপায় যেন জলে অবতরণ হয়। উত্তেজনায় স্নায়ুকে ধরে রাখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। আমার অবিশ্বাস্য সৌভাগ্য আবার আমাকে চমৎকৃত করল। রাখে হরি তো মারে কে! আমাদের ক্যাপসুল কোনও জলভাগেই আছড়ে পড়ল। অবশেষে আমি জীবিত অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরতে পারলাম।

     ঊফ! অবশেষে পৃথিবী! আমি জীবিত! আবার পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ আস্বাদন করতে পারব! পরম প্রশান্তিতে মনটা ভরে উঠলো।

     ক্যাপসুলের দরজা খুলে বাইরে চেয়ে দেখি অন্ধকার। মাঝরাত মনে হচ্ছে। ক্যাপসুল কোন এক নদীতে মৃদুমন্দ গতিতে ভেসে চলেছে। অন্ধকারে চোখ সয়ে এলে জায়গাটা ঠাহর করার চেষ্টা করলাম। নদীটার দু’পাশে পাহাড়। কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা! আরও একটু ভেসে ভেসে এগিয়ে যেতে ঠাহর করতেই দেখি, দু’পাশের পাহাড়-জঙ্গল একটু সমতলে যেখানে মিশেছে সেখানে নদীর এপার ওপার যোগ করেছে একটি রেলওয়ে ব্রিজ। জায়গাটা খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আরে এটা তো তিস্তা নদী, জায়গাটি সেভক। মুহূর্তে চিনে গেলাম, অন্ধকারে প্রথমে ঠাহর করতে পারিনি। বঙ্গোপসাগরের পরিবর্তে আমি শিলিগুড়ির পাশে সেভকে অবতরণ করেছি। হায়রে, ভাগ্য বোধহয় এভাবেই সুপ্রসন্ন হলে এইরকম অবাক করার মতো ঘটনা একটার পর একটা ঘটতে থাকে! উৎসাহের আতিশয্যে চিৎকার করে উঠেছিলাম। বাড়ির এত সামনে অবতরণ করেছি! বীরপাড়া এখান থেকে গাড়িতে প্রায় তিনঘণ্টার রাস্তা। নদী কিছুটা সাঁতরেই পাড়ে উঠে সেভক বাজারে এলাম। রাস্তাঘাট একদম শুনশান। আমি এখন কী করব, কোনদিকে যাব সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না।

     অনেক কাজ আছে। ইসরোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, দুই সঙ্গীর মৃতদেহের যথাযথ সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে। তার জন্য আগে বাড়ি পৌঁছতে হবে। এই মুহূর্তে আমি কপর্দকশূন্য। সেভক বাজার থেকে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হেঁটে করোনেশন ব্রিজের দিকে এগোলাম। এখান থেকে রাস্তা ধরে আরও একটু এগোলে তরাই ও ডুয়ার্সের সংযোগরক্ষাকারী বহু পুরনো দ্রষ্টব্য এই করোনেশন ব্রিজ। ওখান পৌঁছতে রাতভোর হয়ে গেল। এখন ডুয়ার্সগামী যে গাড়ি পাব চরে বসতে হবে। ওই রাতভোরেও সৌভাগ্যবশত সিকিম থেকে আসা ভুটানগামী একটি লাইন ট্রাক পেয়ে গেলাম। গাড়িতে বসেই ভীষণ ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পরেছিলাম। ভোরের দিকে যখন বীরপাড়া ঢুকছি, ট্রাকের ড্রাইভার আমাকে ডেকে দিল। কতদিন পর বাড়িতে আসছি! বাবা মা-কে আশ্চর্য একটা সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে। ভাবতেই আনন্দ হচ্ছিল।

     হঠাৎ মনের মধ্যে সেই আশঙ্কাময় প্রশ্নটা ভেসে এল। এখনও বুঝে উঠতে পারছি না আমি বৃহস্পতি থেকে পৃথিবীর সামনে কীভাবে এলাম বা আসা পর্যন্ত কতটা সময় অজ্ঞান হয়ে ছিলাম! মহাকাশযানটির স্বাভাবিক গতিতে এলেও কমপক্ষে আমি দু’বছর অজ্ঞান হয়ে ছিলাম। কিন্তু অতটা সময় অজ্ঞান থাকা কি সম্ভব?

     চোখ মেলে দেখি, বীরপাড়ার চৌপথীতে এসে পৌঁছেছি। এখনও সেই বরাবরের মতোই ভাঙাচোরা রাস্তা। গত পঁচিশ-তিরিশ বছরেও বীরপাড়ার আর তেমন পরিবর্তন হল না! কিন্তু বীরপাড়ার ভেতরে যত ঢুকছি, চারপাশ দেখে আমার মনের মধ্যে একটা খটকা লাগা শুরু হল। কর্মসূত্রে বাইরে থাকলেও বীরপাড়াতে তো মাঝেমধ্যেই আসি, যেহেতু বাবা-মা এখনও এখানে থাকে। বিগত বেশ কয়েক বছরে বীরপাড়ার তেমন পরিবর্তন হয়নি ঠিকই, কিন্তু শেষবারও যে কয়েকটি বাড়িতে দালান উঠে যেতে দেখেছি, সেগুলো বেমালুম গায়েব! তার জায়গায় পুরনো বাড়িগুলোই আছে, যেগুলো ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছিলাম। অজানা আশঙ্কায় মনে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি ভুল দেখছি না তো? বিশেষত বিগত কয়েক ঘণ্টায় আমার যা যা অভিজ্ঞতা হয়েছে, স্নায়ুবিভ্রাট হওয়া অস্বাভাবিক নয় মোটেই।তার মধ্যে আমি কতটা সময় যে অজ্ঞান ছিলাম সেটাই তো আমার কাছে অস্পষ্ট! ড্রাইভারকে আজকের তারিখ জিজ্ঞেস করলাম এক রাশ চিন্তা আর সন্দেহ নিয়ে।

     “২৩ মে বাবু। ”- ড্রাইভার আমার দিকে অবাক চোখে উত্তর দিল।

     “২৩ মে!”- মনের মধ্যে অজস্র প্রশ্ন ভিড় করে এল– “মহাকাশযানটির দুর্ঘটনাটি ঘটে ২৩ মে-তেই! আজও ২৩ মে! তাজ্জব!’’

     “সাল কৌন সা হ্যায় ভাইয়া ?” এটা জিজ্ঞেস করে ভাবলাম কতটা সময় অজ্ঞান ছিলাম এবারই মালুম হয়ে যাবে।

     “কৌন সা দুনিয়া সে আয়ে হো বাবু? সাল ভি পতা নেহি! ”-ড্রাইভার আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।

     –ও ভাবছে আমি পাগল নাকি নেশাগ্রস্ত ? সত্যিই তো, এরকম প্রশ্ন করলে যে কেউ তাই-ই ভাববে। ও তো আর জানে না, আমার ভেতরে কী চলছে। আমি আর কথা বাড়ালাম না। বাড়িতে গেলেই তো খটকা দূর হয়ে যাবে। বাড়ি আমার বীরপাড়ার বুক চিরে যাওয়া মুল সড়ক মহাত্মা গান্ধি সড়ক লাগোয়া হরিমন্দিরের সামনে। গলি দিয়ে ঢুকেই বাঁদিকের তিন নম্বর বাড়িটা আমাদের, মূল সড়ক থেকেই দেখা যায়। ট্রাক হরিমন্দিরের সামনে দাঁড়াতে আমি ট্রাক থেকে নেমে দু’ মিনিট সময় চাইলাম টাকাটা  বাড়ির থেকে এনে দেওয়ার জন্য। দৌড়ে গলিতে ঢুকলাম। পাড়ায় ঢুকেই চমকে উঠলাম। পাড়ার গলিটা যেন আমার সেই ছোটবেলার গলি। ২-৩টি বাড়ির পরবর্তীতে তৈরি নতুন দালান বেমালুম গায়েব। আমার মাথাটা বোধহয় খারাপই হয়ে গেল। আর ভাবতে পারছি না। ভীষণ ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত লাগছে, একটু বিশ্রাম দরকার। অবধারিত সুদীর্ঘ সময় চেতনালোপের কারণে ভুলভাল দেখছি, অজ্ঞান হওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বড্ড বেশি ছোটবেলার কথা মনে করার জন্যই হয়তো হ্যালুসিনেশন হচ্ছে।

     সদর দরজায় কড়া নাড়লাম। অজস্র প্রশ্ন আর আশঙ্কা নাগাড়ে বিব্রত করে চলেছে আমাকে, কিন্তু বাবা-মা’কে অনেক দিন পর দেখব ভেবে সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ উৎফুল্লও বোধ করলাম। দরজা খুলল, আর দরজা খুলে যারা বেরিয়ে এল তাদের দেখে ভীষণ চমকে উঠলাম। এ কি দেখছি আমি?! দরজা খুলে ঘুম জড়ানো চোখে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমার পঁচিশ বছর আগের তরুণ বাবা, তরুণী মা! আর তাদের পেছন থেকে যে ছোটো শরীরটা আত্মপ্রকাশ করল তাকে দেখতে, হুবহু আমার সাত বছর বয়সের আমি। আমি আমার স্নায়ুকে আর বশে রাখতে পারলাম না, উত্তেজনায় কাঁপতে থাকলাম।

     আস্তে আস্তে আমি সব বুঝতে পারলাম। সকল খটকাই দূর হল। কোনও হ্যালুসিনেশন নয়, যা দেখছি সব সত্যি। আমাদের মহাকাশযানটি বৃহস্পতির সামনে যখন সৌরঝড়ের মধ্যে পড়েছিল তখন আর এক দিক থেকে প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে আসা আলফা কণার স্রোতের সঙ্গে সৌরঝড়ের আলফা কণার সংঘাতে অদূরেই প্রোটন-প্রোটন সংঘর্ষে কিছু এক্সোটিক ম্যাটার তৈরি হয়ে গিয়ে থাকবে। ফলত সেখানে একটি তাৎক্ষনিক কিন্তু শক্তিশালী ওয়ার্মহোল তৈরি হয়েছিল নিশ্চয়ই। আমাদের মহাকাশযানটি এবং অ্যাস্টরয়েডগুলি ওই শক্তিশালী ওয়ার্মহোলের গুরুতর আকর্ষণেই তার মধ্যে ধাবিত হয়েছিল। ওয়ার্মহোলে সময় ও স্থান দুমড়ে মুচড়ে যায়। ওয়ার্মহোলের একটি প্রান্ত দিয়ে ঢুকে অপর প্রান্ত দিয়ে বের হতে পারলে অন্য কাল ও স্থানে নিমেষে পৌঁছে যাওয়া যায়। শেষ অ্যাস্টরয়েডটির ধাক্কায় জ্ঞান হারিয়েছিলাম। আমাদের যানটি হয়তো ওইসময় কোন অসামান্য ব্যাখ্যাতীত উপায়ে ওই প্রান্ত দিয়ে ঢুকে অপর প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে পঁচিশ বছর আগের পৃথিবীর সামনে এসে পড়ে।  আমার সামনে যে বাচ্চা ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে, সে আসলে সেই সাত বছর বয়সের আমিই। আজ ২৩ মে, আমার জন্মদিন। আর সেদিনকার সেই আগন্তুক কাকু আর কেউ নয়- আমি নিজেই!

     এতদিনের অপেক্ষার পরে আমার বত্রিশ বছর বয়সের জন্মদিনে অবশেষে সেই আগন্তুক কাকুর পরিচয় নিজেই পেয়ে গেলাম।

One thought on “আগন্তুক

  • October 17, 2018 at 7:40 pm
    Permalink

    খুব সুন্দর হয়েছে৷অভিনন্দন৷

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!