আরোগ্য

সুদীপ্ত নস্কর

অলংকরণ:অঙ্কিতা

‘অর্পণের ব্যাপারটা শুনেছিস?’ চায়ের কাপে একটা সশব্দে চুমুক দিয়ে অন্যমনস্কভাবে জিজ্ঞেস করলো বিট্টু।

     ‘হ্যাঁ, ফোন করেছিল। ওর ঠাকুরদা’র ঘরের আলমারি থেকে কী নাকি একটা জিনিস পেয়েছে বলছিল। কাল সন্ধ্যায় ওদের নতুন ফ্ল্যাটে ডেকেছে।’

     ‘আমায়ও ফোন করে একই কথা বললো। আরও কত কী বলে গেল, ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারলাম না। শেষে বলল, এগুলোই নাকি তার জীবনে আরেকটা সুযোগ এনে দিতে পারে।’, পাশ থেকে বলে উঠলো নির্মল। কথাটা শুনে আশ্চর্য হলাম।

     ‘মানে?’

     ‘এর মানে আমিও কিছু বুঝলাম না।’ দুদিকে মাথা নেড়ে উত্তর দিলো সে।

     এই অর্পণের কথা উঠলেই এখন মনটা কেমন জানি ভারি হয়ে আসে। সত্যি এখনও ভাবলে অবাক লাগে, যে অর্পণ মাসখানেক আগে আমাদের সঙ্গে হেসেখেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল; সেই অর্পণ আজ মরণাপন্ন। বাড়িতে বসে মৃত্যুর দিন গুনছে। অদৃষ্টের সঙ্গে যুদ্ধ করা অসম্ভব, তা একপ্রকার সে’ও মেনে নিয়েছে। তাই শেষের গুটিকয়েক দিন হাসপাতালে ছুটোছুটি না করে, কাছের লোকের সান্নিধ্যে কাটাতে চায়। আজ সেই অর্পণ কী না এমন কথা ভাবছে! শুনলে বড়ই আশ্চর্য লাগে।

 

এখনও মনে আছে সেই দিনের কথা, যেদিন ও শেষবারের মতো কলেজে এসেছিল। সেই দিনই তার এই দূরারোগ্য রোগের কথা আমরা জানতে পারি। ঘটনাটা এমনই আকস্মিকভাবে ঘটেছিল যে, ঠিক মতো বুঝে ওঠার আগেই সব কিছু কেমন যেন ওলোটপালোট হয়ে গেল। আজকের মতো সেদিনেও ক্লাস শেষ করে, ক্যান্টিনের ঠিক এই বেঞ্চটাতে বসে চার বন্ধু মিলে গল্প করছিলাম। আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল সামনের সেমিস্টার। অর্পণ আগাগোড়াই সব কিছুতে সিরিয়াস। যেমন পড়াশোনা তেমনই খেলাধুলায়। ‘ইকোনমিকস’-এর কিছু ভালো নোট্‌স জোগাড় করেছিল অর্পণ পি.এস. ম্যামের কাছ থেকে; সেই বিষয়েই কথা হচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ শুরু হল তার মাথার যন্ত্রণা। মাঝেমধ্যেই অর্পণের এমনটা হতো। ওকে অনেকবার বলেছিলাম একটা চেকাপ করিয়ে নিতে। 

     আগাগোড়াই এ বিষয়ে ও খুব একটা আমল দেয়নি। বলতো, ‘ও কিছু না, স্ট্রেসের জন্য মাথাটা ধরেছে।  কিছুক্ষণে ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু এই আকস্মিক ক্ষণস্থায়ী যন্ত্রণা তার জীবনে এমন বিভীষিকা ডেকে আনবে তা কি সে জানত! 

     সেইদিন যন্ত্রণার তীব্রতা এতই প্রবল ছিল যে, তা সহ্য করা তার পক্ষে আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কিছুক্ষণ মাথা ধরে বসে থাকার পরই টেবিলে জ্ঞান হারায় অর্পণ। সেই মুহূর্তে আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই; এবং তার দিন দুয়েক পরেই সেই ভয়ানক খবরটা জানতে পারি। অর্পণের মস্তিষ্কের ভিতর একটা বড় টিউমার ধরা পড়েছে। টিউমারটা এমন বিপজ্জনক জায়গায় রয়েছে যে, অপারেশন করলে বিপদের সম্ভাবনা প্রবল। অর্থাৎ ডাক্তারী ভাষায়, অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক; অপারেশনেও ফেরার চান্স মাত্র দশ শতাংশ। এসময় ভাগ্যদেবীর উপর ভরসা রেখে সময় গুণে যাওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। যদিও তার বাড়ির লোকেরা হাল ছাড়েনি। কলকাতার নামকরা সব সার্জেনদের কড়া নেড়ে চলেছেন এখনও। 

     ‘আমার মনে হয়, সুযোগ বলতে অর্পণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার কথাই বলতে চেয়েছে।’- বিট্টুর কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম।

     ‘কী! তা কখনও হতে পারে! যেখানে ডাক্তারেরা জবাব দিয়ে দিয়েছেন।’

     ‘ডিপ্রেশনে ওর মানসিক অবস্থা ঠিক নেই। এসব দুর্বল মনের কল্পনা। এই পরিস্থিতিতে একটা অবলম্বনকে ভর করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসাতে চায় তার দুর্বল মন; এটা খুবই স্বাভাবিক। একেই বলে জীবন ভাই, মানুষ তার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচার আশা ছাড়ে না।’ সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে গুঁজে গম্ভীরভাবে বিজ্ঞের মতো কথাগুলো বলে গেলো নির্মল।

     ‘অর্পণ তার দাদুর আলমারি থেকে যে জিনিসটা পেয়েছে। সেটা কিন্তু কোনও সাধারণ জিনিস নয়।’, বিট্টু আবার বলল।

     ‘তা তুই কী করে জানলি শুনি!’ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি। 

     ‘অর্পণের সঙ্গে কাল রাতে অনেকক্ষণ কথা হয় এ বিষয়ে। তার সেই উত্তেজিত কন্ঠস্বর শুনে অনুমান করতে পারছি, যেমন তেমন জিনিসের কথা সে বলছে না।’

     ‘জিনিসটা যে কী তা স্পষ্ট করে কিছু বলেছে তোকে?’ ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করলো নির্মল। 

     ‘কিছু দরকারী কাগজপত্র আর একটা বোর্ড, তবে সেটা যে কী তা ঠিক মতো বুঝতে পারলাম না। অর্পণের অনুমান এগুলো তার ঠাকুরদার বাবা আদিত্যবর্মনের। স্টকহোমে থাকাকালীনই এগুলো তার হাতে আসে। এই আদিত্যবর্মন কেমন বিশাল ব্যক্তিত্ব ছিলেন! তা আর তোদের বলে দিতে হয় না। একই ধারে যেমন বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ছিলেন, ঠিক তেমনই একজন সফল নৃবিজ্ঞানীও ছিলেন তিনি। প্রায় বিশরকম ভাষা জানতেন। ইউরোপের প্রায় সমস্ত দেশ এক সময় চষে বেড়িয়েছিলেন মানুষটা।’

     ‘হুম! শুনেছি বই কী! স্টকহোম ইউনিভার্সিটি থেকে প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে পাশ করার পর, বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক এরিক পারশনসের কাছে বেশ কয়েকবছর কাজও করেছিলেন তিনি!’ বিট্টুর কথায় তাল মেলালো নির্মল।

     ‘অর্পণের ঠাকুরদা দেববর্মনের জ্যোতির্শাস্ত্রে এত নাম করার পিছনে এরই অবদান ছিল। তাই তিনি চাইতেন না তার গোপন প্রতিভার উৎস সকলের কাছে ধরা পড়ুক। সেই কারণেই জিনিসগুলো সকলের অজান্তে নিজের ঘরের আলমারির গোপন লকারে লুকিয়ে রাখা।’

     ‘তুই কীভাবে এত নিশ্চিতভাবে বলছিস?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। 

     ‘শেষের কথাগুলো আমার না, অর্পণের।’

     ‘ও বলল! আর তুই বিশ্বাস করে নিলি!’ 

     বিট্টু মাথা নাড়লো, ‘আমি যেমন পুরোটা বিশ্বাস করি না, তেমন সবটা অস্বীকারও করতে পারি না। তাছাড়া ওখানে গিয়ে ব্যাপারটা দেখতে ক্ষতি কী? কিছু হোক চাই না হোক অর্পণের সঙ্গে সময় কাটানো তো যাবে। এই সময় ওর সঙ্গে থাকলে আমাদেরও ভালো লাগবে।’

     ‘তুই যাই বলিস প্রবীর! ব্যাপারটা কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং লাগছে আমার। আই থিংক উই মাস্ট গো।’ নির্মলের গলায়ও উৎসাহের সুর স্পষ্ট। ‘ব্যাপারটা আসলে কী সেটা গিয়ে একবার দেখা দরকার।’

     ‘কিন্তু…’

     ‘আর কোনও কিন্তু নয়! প্রবীর, কাল তুইও আমাদের সঙ্গে আসছিস এটাই ফাইনাল’, নির্মল আমায় থামিয়ে দিল। 

     ‘অর্পণ কাল সন্ধ্যের আগে ওদের নিউটাউনের ফ্ল্যাটে চলে যাবে। আমরা পাঁচটার সময় তোকে নিতে আসছি। রেডি হয়ে থাকিস।’ আমি আর কথা বাড়ালাম না। চায়ের টাকা মিটিয়ে উঠে পড়লাম।

 

***

আমরা যখন নিউটাউনে অর্পণদের ফ্ল্যাটে পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এর আগেও এখানে এসেছি কয়েকবার, তাই জায়গাটা আমাদের কাছে অচেনা নয়। অর্পণদের ফ্ল্যাট ফোর্থ ফ্লোরে। ফোর্থ ফ্লোরের আর কোনও ফ্ল্যাট এখনও বিক্রি হয়নি। তার উপর সারা বিল্ডিং-এ হাতে গুণে কয়েকটা ফ্ল্যাটে লোক এসেছে। তাই সারা বিল্ডিংটায় এক থমথমে পরিবেশ ঘিরে থাকে সবসময়। বালিগঞ্জে অতো বড় বাড়ি থাকতে, এই নির্জন জায়গায় অর্পণরা বাড়ি কেন কিনতে গেল তার কারণ জানা নেই; যদিও এতে আমাদের অনেক উপকার হয়েছিল। মাঝের মধ্যেই আমরা চার বন্ধু এখানে এসে তরল নেশায় ডুবে থাকতাম। 

     কলকাতার মতো শহরে এসব জিনিস করার মতো জায়গার বড় অভাব। অর্পণের এই নিউটাউনের নির্জন ফ্ল্যাট আমাদের সেই অভাব পূরণ করতো।

     বেল বাজানোর প্রয়োজন হল না। দরজা খোলাই ছিল। আমরা ঢুকে পড়লাম। ভিতরে গিয়ে দেখলাম অর্পণ ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ল্যাপটপে মুখ গুঁজে গভীর মনোযোগে কী যেন একটা করছে। আমরা এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছি, তা সে লক্ষ্য করেনি। 

     ‘অর্পণ! কেমন আছিস ভাই এখন?’- নির্মলের ডাকে চমকে উঠছিল সে; পরক্ষণেই আমাদের দেখে মনের সংকোচ কাটিয়ে ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘বাঃ! সকলেই একসঙ্গে এসেছিস দেখছি। আয়, আয় বস্ এখানে।’  

     ‘আছি কোনও রকম। তোরা কেমন আছিস? কলেজ যাচ্ছিস?’ 

     ‘ভালো রে। হ্যাঁ যাচ্ছি।’, আমরা উত্তর দিলাম।

     আজ যেন বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে ওকে। এলোমেলো মাথার চুল, গাল ভর্তি দাড়ি। চোখের তলায়ও কালি পড়েছে; বুঝলাম অত্যাধিক দুঃশ্চিন্তায় রাত জাগার ফল এটা। শরীরও ভেঙেছে এ কয়েকদিনে। তবে, এসবের মধ্যেও তার চোখে একটা চাঞ্চল্যের ভাব লক্ষ্য করলাম। একটা প্রাপ্তির হাসি যেন লেগে আছে ঠোঁটের কোণে। তিনজনেই অর্পণের পাশে গিয়ে বসলাম। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ পড়তে বুঝলাম, কিসের একটা এনসাইক্লোপিডিয়া খুলে বসে রয়েছে ও।

     ‘কোডেক্স গিগাসের কথা শুনেছিস?’ এমন অদ্ভুত প্রশ্নের জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। ল্যাপটপে ভালো করে লক্ষ করলাম, হ্যাঁ! কোডেক্স গিগাসই বটে। 

     ‘কী এই কোডেস গিগাস?’- আমি প্রশ্ন করলাম।

     একটা রহস্যের হাসি খেলে গেল তার চোখে মুখে।

     ‘তোদের জন্য খাবার আনিয়ে রেখেছি। তোরা একটু বস আমি আনছি। কফি খাবি তো!’ – প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করলো অর্পণ । 

     ‘নানা তোর ব্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তুই বস এখানে।’ 

     ‘আরে সব কিছু রেডিই রয়েছে। কোনও অসুবিধা হবে না। তোরা বস একটু। আমি আসছি।’

     গরম কফি আর চিকেন প্যাটিস টেবিলে সাজিয়ে, আবার সে নিজের জায়গায় এসে বসলো। আর সময় নষ্ট না করে প্রধান প্রসঙ্গে এলাম আমি, 

     ‘আর রহস্য না করে, এবার সবকিছু পরিষ্কার করে বল।’

     ‘আগে কফিটা শেষ কর, তার পর বলছি সব।’ নিরুদ্বিগ্নভাবে বলল অর্পণ।

     অন্য সময় হলে এ কথা বলতে হত না, খাবার আসার সঙ্গে সঙ্গেই তার সদ্ব্যবহারে লেগে পড়তাম। কিন্তু আজ ব্যাপারটা অন্য, হাজার প্রশ্ন একসঙ্গে চক্রাকারে মস্তিষ্ক প্রদক্ষিণ করে চলেছে। তাই খাবারের দিকে বিশেষ আগ্রহ নেই কারোরই। তবু অর্পণের জোরাজুরিতে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা তার আনা কফি ও খাবার শেষ করলাম।

     অর্পণ তার কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সেটা ল্যাপটপের পাশে রেখে, একটা কিম্ভুতকিমাকার ছবির উপর ক্লিক করে বড় করলো।

     ‘এই ছবিটা ভালো করে দেখে রাখ সকলে। আমরা যখন রিচুয়ালসে বসবো তখন এই ছবিটাই একাগ্রচিত্তে মনে মনে স্মরণ করতে হবে।’

     এবার আমরা আকাশ থেকে পড়লাম।

     ‘রিচুয়ালস? কিসের রিচুয়ালস? এটা কিসের ছবি? আর কোডেক্স গিগাস’ই বা কী বস্তু?’ প্রায় একসঙ্গে প্রশ্নগুলো করে বসলাম সকলেই। 

     অর্পণ এবার একটু নড়েচড়ে বসলো। ল্যাপটপটা বন্ধ করে আমাদের দিকে ফিরে বলল,

     ‘মনে হয় তোদের এখন সমস্ত কিছু জানানোর সময় হয়েছে। যদিও এই রিচুয়ালস শুরু করার আগে তোদের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। তোরা সব শুনে সম্মতি দিলে, তবেই তোদের আমি এন্টিটি হিসেবে বসাতাম।’

     ‘এন্টিটি! রিচুয়ালস! তুই কী বলছিস! কিছুই মাথায় ঢুকছে না। কী বলতে চাইছিস? খোলসা করে বল ভাই।’  নির্মল শুধালো।

     ‘বলছি। সব বলছি। একটু সময় দে। এখন তোরাই ভরসা। তোদের ছাড়া এই কাজটা আমি করতে পারবো না।’, করুণভাবে বলল অর্পণ। 

     ওর মুখের দিকে ভালোও করে চাওয়া যায় না। বুকের মধ্যে চেপে রাখা কষ্টের তীব্রতা চোখে মুখে প্রকাশ পাচ্ছে। বড় অসহায় লাগছে ওকে। 

     ‘তুই যাই করিস না কেন, আমরা তোর পাশে আছি।’, বিট্টু আশ্বাস দিল। 

     ‘বেশ! তবে শোন। আমি এমন জিনিস পেয়েছি, সে জিনিসের গুরুত্ব বোঝাতে গেলে, আগে কিছু কথা বলে রাখা দরকার। কোডেক্স গিগাস কী সেটা আগে বলি! এই কোডেক্স গিগাসের একটা অদ্ভুত ইতিহাস আছে। যা শুনলে তোরাও ঠিক আমার মতোই আশ্চর্য হবি, যেমনটা আমি প্রথমে হয়েছিলাম।’ কিছুক্ষণ থেমে শুরু করলো অর্পণ।

 

‘কোডেক্স গিগাস হল প্রায় সাতশো বছর আগে লেখা একটি প্রাচীন ম্যানাস্ক্রিপ্ট। খ্রিষ্ট ধর্মে এটিই আদি বাইবেল। যা সব থেকে পবিত্র। একই ধারে এই বাইবেলকে ডেভিল বাইবেল এবং ভালোগেট বাইবেল বলা হত। লম্বায় প্রায় এক মিটার, চওড়ায় ২০ ইঞ্চি; আদ্যপান্ত ল্যাটিনে লেখা এই বইটি প্রায় ৯ ইঞ্চি মোটা। যার ওজন ৭৫ কেজিরও বেশি। প্রত্যেকটা পাতায় বিচিত্র সব ছবি, নক্সা এবং সোনারূপার জল রঙ করা ইনস্ক্রিপশন। প্রায় ১৬০টা গাধার চামড়া দিয়ে তৈরি হয়েছিল গোটা পান্ডুলিপির সমস্ত পাতা। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন। এই বিশালাকার ম্যানস্ক্রিপট হাতে লিখে শেষ করতে গেলে, একটা মানুষের সময় লাগতে পারে প্রায় পাঁচ বছর, তাও দিনে ২৪ ঘন্টা একভাবে লিখে যেতে পারলে তবে। অথচ পরবর্তীকালে এই বিজ্ঞানীরাই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, কোডেক্স গিগাস লেখা হয়েছে খুব কম সময়ে।’

     ‘হতেই পারে। অনেক লোক একসঙ্গে লিখে শেষ করেছে হবে।’, বিট্টু মন্তব্য করলো।

     ‘না, পুরোটাই একটিই মানুষের হাতের লেখা। স্বাভাবিকভাবে সময় ও বয়েসের সঙ্গে মানুষের হাতের লেখায় অক্ষরবিন্যাসে যে পরিবর্তন হয়। এক্ষেত্রে সেই সামান্য পরিবর্তনটুকুও চোখে পড়ে না। সমস্ত বইয়ে একই তুলিরটান, একই অক্ষর বিন্যাস এবং একই লেখার ধরন। একটা মানুষ কী ভাবে এত কম সময়ে এত বড় ম্যান্সক্রিপ্ট লিখে ফেললেন, তা নিয়ে বিজ্ঞানীমহলে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। তবে জনশ্রুতি আছে, এই ভালোগেট বাইবেল লেখা হয়েছে মধ্যরাত থেকে ভোর অব্দি সময়ের মধ্যে।’

     ‘ইম্পসিবল, তা কখনও হতে পারে!’, দৃঢ় স্বরে বলে উঠলো নির্মল।

     ‘সম্ভব বন্ধু। সবই সম্ভব। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে এমনই অনেক অশ্চর্য জিনিস চোখের সামনে উঠে আসে যা আমরা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি না। আমার কাছেই এমন ঝুড়ি ঝুড়ি উদাহরণ রয়েছে, এমন বিস্তর অসম্ভব অনায়াসেই সম্ভব হয়েছে শাস্ত্রকে কাজে লাগিয়ে। যাক সে সব কথা। আসল কথায় আসি। আজ থেকে প্রায় সাতশো বছর আগে, চেক্ রিপাব্লিকের একটি ছোট্ট শহর পোডলজিস্টের বেনেডিক্টাইন মোনাস্ট্রির এক সাধু, হারমান হকম্যান কোনও এক গর্হিত কাজ করে চার্চের ধর্মীয় আইনকানুন লংঘন করেন। এই পাপের শাস্তি স্বরূপ তাঁকে চার্চের একটি পরিত্যক্ত ঘরে বন্দী করে, দরজা পাথর দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ জীবন্ত সমাধি।

     ‘এত সব ইতিহাস জেনে আমরা কী করবো! এর সঙ্গে তোর কী সম্পর্ক?’ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে প্রশ্নটা করেই ফেললাম আমি।

     ‘স্টেডি মাই ফ্রেন্ড। এর সঙ্গে একদম সরাসরি সম্পর্ক আছে আমার পাওয়া জিনিসের। সেই প্রসঙ্গেই আসছি ধীরে ধীরে।’

     আবার শুরু করলো সে, ‘সেই অন্ধকূপসম আবদ্ধ ঘরে বসে অন্তিম মুহূর্ত গুণতে গুণতে তিনি ভাবেন, তাঁর এত দিনের পবিত্র সাধনা, অর্জিত তন্ত্রবিদ্যা ও মহাজাগতিক জ্ঞান সবকিছুই নষ্ট হয়ে যাবে তাঁর মৃত্যুর পর। তাই তিনি মনে করেন মৃত্যুর আগে এই সমস্ত কিছু লিখে যাওয়া উচিত। পরবর্তীকালে এই পান্ডুলিপি অনুসরণ করে মানুষ ভগবানের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারবে। পরক্ষণেই তিনি ভাবেন, এতকিছু লিখতে হলে যে সময়ের প্রয়োজন; সে সময় তাঁর কাছে নেই। তাছাড়া এমনভাবে এই বদ্ধ ঘরে পড়ে থাকলে প্রায় ২৪ ঘন্টার মধ্যেই জল ও বায়ুর অভাবে প্রাণ হারাতে হবে। তাহলে! উপায় কী! অনেক ভাবনাচিন্তা করে অবশেষে তিনি এই অসাধ্য সাধনের উপায় খুঁজে বের করেলেন। 

     অন্ধকারের দেবতা লুসিফারের দ্বারস্থ হলে, সে তাকে এ কাজে সাহায্য করতে পারে।

     তিনি গোপন তন্ত্র বিদ্যায় জাগিয়ে তুললেন সমস্ত অশুভ শক্তির আধার, নরকের আদিম দেবতা লুসিফারকে। এবং তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন এই মর্মে যে, তিনি তাঁর আত্মা তাঁকে উৎসর্গ করবেন এবং মৃত্যুর পরেও তাঁর দাসত্ব করবেন। হারমানের প্রস্তাবে লুসিফার রাজী হলেন, কিন্তু তাঁরও একটা শর্ত ছিল। এই বইয়ে ভগবানের পাশাপাশি শয়তানেরও জায়গা দিতে হবে। শয়তানের অপরিসীম শক্তি ও বাস্তব রূপ এই বইয়ে উল্লেখ করতে হবে।’

     ‘এই জন্যই কী এই বইয়ের নাম ডেভিল বাইবেল।’, অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো নির্মল।

     ‘হুম! তোদের যে ছবিটা একটু আগে দেখালাম, সেটিই হচ্ছে অন্ধকারের দেবতা লুসিফারের প্রকৃত রূপ। যে পোট্রেটটি তাঁকে স্বচক্ষে দেখে এঁকেছিলেন হকম্যান।’ আমরা তিনজনেই মন্ত্র মুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছি। 

     ‘ফিফটিনথ সেঞ্চুরির হসিটস রেভিলিউশন(হসিটস যুদ্ধ)-এ প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় সেই সময়ের বিভিন্ন মোনাস্ট্রি ও গির্জা, যার মধ্যে ছিল বেনেডিক্ট মোনাস্ট্রিও। কোনও এক সময় বেনেডিক্ট মঠের ধবংস স্তুপ থেকে উদ্ধার করে এই বই সেডেলেক মোনাসট্রিতে নিয়ে আনা হয়। পরে সেখান থেকে ব্রোনোভ মোনাস্ট্রি। প্রায় একশ বছর পর সম্রাট দ্বিতীয় রোডোল্ফ ব্রোনোভ মোনাস্ট্রি থেকে বইটি নিয়ে এনে প্রাগে নিজের সংগ্রহশালায় রাখেন। ১৬৪৮ সালে থার্টি ইয়ার্স ওফ ওয়ারের সমাপ্তির পর সুইডিস আর্মি এই প্রাগ আক্রমণ করে, এবং লুঠের সামগ্রীর সঙ্গে এই বইটিও সুইডেনে নিয়ে আসে। পরে ওই বই জায়গা পায় স্টকহোমের রয়াল কাসেল লাইব্রেরিতে। তোরা হয়তো জানিস, আমার দাদুর বাবা স্বর্গীয় আদিত্যবর্মন স্টকহোমেই পড়াশোনা করতেন।

     ১৬৯৭ সালের ৭ই মে ভয়াবহ ভাবে আগুন লেগে পুড়ে ছাই হয়ে যায় রয়াল কাসেল লাইব্রেরির প্রধান অংশ। যে অংশে এই বইটি ছিল। সেই বিপর্যয়ের মধ্যে কেউ একজন বইটি লাইব্রেরির জানালা থেকে বাইরে ফেলে আগুনের হাত থেকে রক্ষা করে। তারপর বইটি সুইডেনের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে স্থান পায়। এতটুকু ঘটনা, এন্সাইক্লোপিডিয়া বা দু-একটা বইপত্র ঘাঁটলেই জানা যায়। কিন্তু তারপরের ঘটনাগুলো হয়তো পৃথিবীর বেশিরভাগ লোকের কাছে অজানা।’

     আবার একটু দম নিয়ে নিল অর্পণ। হয়তো একভাবে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তার। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে কী যেন একটা ভেবে নিল সে; তারপরই উঠে পাশের ঘরে চলে গেল। 

     আমরা কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। 

     মিনিট দুয়েক পর একটা কালো চামড়ায় মোড়া ডায়েরি, এক তাড়া কাগজ ও একটা চারকোণা বোর্ড জাতীয় কিছু হাতে করে নিয়ে এলো পাশের ঘর থেকে। বোর্ডটার উপর লাল রঙ দিয়ে পাঁচ কোণা তারার একটি চিহ্ন আঁকা।  

     ‘এটা কিসের চিহ্ন কেউ বলতে পারবে?’, বোর্ডটা টেবিলের উপর রেখে প্রশ্ন করলো অর্পণ।

     ‘পেন্টাগ্রাম!’, বিট্টু উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলো।

     ‘এক্স্যাক্টলি। এটা কী কাজে লাগে জানিস।’

     ‘হ্যাঁ পড়েছিলাম… কোনও এক বইয়ে পড়েছিলাম। প্যারানরমাল এন্টিটিকে ডাকতে গেলে এই চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।’

     ‘ঠিক!’ 

     ব্যাপারটা আমার মাথায় এখনও ঢুকলো না। নির্মলেরও একই অবস্থা, অন্তত তার মুখের ভাব দেখে তাই মনে হয়। 

     অর্পণ আবার সোফায় এসে বসলো।

     ‘আমি কোথায় ছিলাম যেন…’

     ‘রয়্যাল কাসেল লাইব্রেরি আগুন ধরে গেল আর বইটা সুইডেনের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে নিয়ে আসা হল।’, আমি ধরিয়ে দিলাম।

     ‘হুম। সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কাসেলের সেকেন্ড ফ্লোর আগুনে পুড়ে যায়। এমন সময় কে বা কারা বইটা লাইব্রেরির জানালা থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলে আগুনের হাত থেকে রক্ষা করে। সেখান থেকে বইটা সুডেন ন্যশনাল লাইব্রেরিতে আনা হয়। এখানে নিয়ে আসার পর দেখা যায় যে, তার মধ্যের ১০টি পেজ মিসিং রয়েছে। গবেষকদের ধারণা এই ১০টি পাতাতেই নাকি শয়তানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার প্রক্রিয়া লেখা ছিল।’

     ‘দুর্ঘটনার কয়েকদিন পর জানা যায়, সেই অগ্নিকান্ডের দিন থেকেই রয়াল লাইব্রেরির দুজন কর্মচারী নিরুদ্দেশ হয়েছে। বেশ কিছুদিন অনেক খোঁজাখুঁজির পরও, তাদের কোনও হদিশ মেলেনি। স্থানীয় লোকেদের অনুমান সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়েছে ওই দুই কর্মচারী। কিন্তু পুলিশ তা মনে করে না, কারণ তাদের মৃতদেহের কোনও চিহ্ন ঘটনাস্থলে মেলেনি।

     এবার আসল ঘটনাটা বলি; সেই দিন রয়্যাল কাসেলে আগুন লাগানোর ব্যাপারটা নিছকই দুর্ঘটনা নয়। তা ছিল দুটি সুস্থ মস্তিষ্কের সুপরিকল্পিত প্ল্যানের অংশ। রয়্যাল কাসেলের দুই কর্মচারী গুস্তাফো এবং এমিলের এখানে কাজে লাগার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এই বইটি চুরি করা। তারা দুজনেই গোপন তন্ত্র সাধনায় লিপ্ত ছিল বহুবছর ধরে। আর সকলের মতো তারও জানত এই বইয়ে অশুভ শক্তির আধার লুসিফারকে আহ্বানের প্রক্রিয়ার নিয়ম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উল্লেখ করা আছে। অর্থাৎ বইটা সরাতে পারলে তাদের এত দিনের সাধনা সম্পূর্ণভাবে সাফল্য লাভ করবে। তবে এই বিশালাকার বই দুজনের পক্ষে সড়ানোটা মোটেই সহজ কাজ নয়। অনেক ভেবে অবশেষে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।’

     ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারলাম, বললাম, ‘তার মানে গুস্তাফো আর এমিলই বিপর্যয়ের দাপাদাপির মধ্যেই বইয়ের ঐ ১০টা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে বইটা জানলা থেকে নীচে ফেলে দেয়।’

     ‘ঠিক তাই। কারণ বইটা তখন কে জানালা দিয়ে নিচে ফেলেছিল! তা পরিস্কার করে কেউই বলতে পারেনি।’

     ‘তারপর! ‘ রোমাঞ্চিত স্বরে বলে উঠলো বিট্টু।

     ‘বাল্টিক সমুদ্রের দক্ষিণ পশ্চিমের অসংখ্য জনশূন্য ছোট ছোট দ্বীপ গুলির মধ্যে অন্যতম একটি দ্বীপ বুলেরন। এমিল আর গুস্তাফো এই নির্জন দ্বীপে পালিয়ে যায়, এবং সেখানে থেকেই গোপনে শুরু করে তাদের অসমাপ্ত সাধনা। যে সাধনার ফল খুব একটা শুভ হয়নি।’ 

     ‘কী হয়েছিল?’, জিজ্ঞেস করলাম আমি।

     ‘তা আমার জানা নেই। তবে ঠাকুরদার বাবা আদিত্যবর্মনের ডায়েরির শেষ অংশে বলা হয়েছে, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে এমিলের মৃত্যু হলে গুস্তাফো আবার স্টকহোমে ফিরে আসে।

     এই গুস্তাফো ছিলেন বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক এরিক পারশনসের বাবা। যার কাছে সেই ১০টি পেজের সমস্ত সংকেতের কপি ছিল। এরিক পার্শনের অ্যাসিস্ট্যান্ট হওয়ার সুবাদে সংকেতের কপির সম্বন্ধে তিনি জানতেন। এবং তিনিই পরবর্তী সময়ে সেই ল্যাটিন ভাষার ইংরেজি রূপ দিয়ে, তা নিজের কাছে রেখে দেন। দেশে ফেরার সময় সেই কাগজপত্র তাঁর কাছেই ছিল। যা কিছুদিন আগে দাদুর আলমারির হিডেন লকারে রাখা একটা কাঠের সিন্দুকের মধ্যে খুঁজে পাই আমি। এই ডায়েরি এবং পেন্টাগ্রাম আঁকা বোর্ডটাও সিন্ধুকের মধ্যেই ছিল। এই ডায়েরিতে এর ব্যবহার সহজভাবে লেখা রয়েছে। খুব সম্ভবত তিনিও এগুলোর সাহায্যে অশুভ শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন। হয়তো তিনি সফল হয়েছিলেন; যদিও এটা আমার অনুমান মাত্র।’- আমাদের সকলেরই চোখ টেবিলে রাখা ধূসর কাগজগুলির দিকে নিবদ্ধ হয়েছে। এতে কী লেখা আছে তা জানবার এক তীব্র কৌতূহল সকলেরই মনে ভর করেছে।

     ‘এই কাগজগুলোতেই কী সেই সংকেত দেওয়া আছে!’, বিট্টুর কম্পিত স্বর কানে এলো। অর্পণ কোনও উত্তর দিল না, একটা চাপা রহস্যময় হাসি খেলে গেল তার ঠোঁটের কোণে। 

     এতক্ষণে অর্পণের মতলবটা কী! তা আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে। এসব গল্পকথায় সে এতটা গুরুত্ব দেবে তা জানা ছিল না। এমন কাহিনীগুলোর সত্যতা যাচাই করা কঠিন। এই সব ইতিহাসের বেশিরভাগটাই জনশ্রুতি ও লোককথার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এগুলো করে বিশেষ কোনও ফল হবে বলে আমার মনে হয় না। তবু একটা পরীক্ষা করে দেখলে মন্দ হয় না। তাছাড়া অর্পণ যখন এই নিয়ে এতটা এগিয়েছে, তখন তাকে আর বাধা দেওয়ার কোনও মানে হয়না। 

     ‘এগুলোর সাহায্যে তুইও কী শয়তানের শরণাপন্ন হয়ে, এই দূরারোগ্য অসুখ থেকে…’ কথাটা শেষ করলো না বিট্টু। 

     ঘরের অল্প আলোয় অর্পণের কালো চোখের মণিদুটো যেন চিক চিক করে উঠলো, ঠোঁটের কোণে খেলে গেল সেই অদ্ভুত হাসি।

 

***

পাশের একটি ফাঁকা ফ্ল্যাটে এসে উপস্থিত হয়েছি আমরা। অর্পণ বাড়ির মালিকের কাছ থেকে আগেই চাবি নিয়ে রেখেছিল।

     ঘরের মধ্যিখানে একটা চারকোণা টেবিল ও তার চারপাশে চারটি চেয়ার জোগাড় করে রেখেছে অর্পণ। টেবিলের ওপর একটা বড়সড় মোমবাতিও রাখা হয়েছে দেখলাম।

     ইতিমধ্যে রিচুয়ালের সমস্ত নিয়ম অর্পণ আমাদের জানিয়ে দিয়েছে। প্রথমে আমার একটু আপত্তি থাকলেও পরে অর্পণের পরিস্থিতির কথা ভেবে আমিও রাজী হয়ে যাই। বন্ধুর জন্য নয় এটুকু কষ্ট সহ্য করলাম; এতে যদি তার মানসিক সন্তুষ্টি হয় তবে তাই হোক। যদিও আমি জানি এসব সেটানিক রিচুয়ালস করে মানুষকে শুধুই হতাশ হতে হয়; কাজের কাজ কিচ্ছুটি হয় না। কিন্তু এখন এসব তাকে বুঝিয়ে কোনও লাভ হবে না।

     টেবিলের চারপাশের চারটি চেয়ার আমরা দখল করে বসলাম। সেই পেন্টাগ্রাম আঁকা বোর্ডটি টেবিলের মধ্যিখানে রাখা হয়েছে। কাগজগুলো টেবিলের উপর রেখে একবার চোখ বুলিয়ে নিল অর্পণ। চারটে চেয়ারের সামনে টেবিলের উপর চারটে ছোট পাত্র রাখা হয়েছে; এর ব্যবহার আমাদের বলে দেওয়া হয়েছে। এই নির্দিষ্ট বিষয়েই আমার প্রধান আপত্তি। এসব বোকামির যে কী কারণ থাকতে পারে, তা ভেবে পেলাম না। এদিকে বিট্টু আর নির্মল নিরুদ্বিগ্ন। অর্পণের শোনানো গল্পে তারা এমন ভাবে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছে যে, ব্যাপারটার শেষ দেখার জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে আছে। এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামারবার কিঞ্চিৎ সময়টুকুও নেই তাদের। 

     অর্পণ বিট্টুকে নির্দেশ দিল, ঘরের একমাত্র লাইটটা বন্ধ করার। বিট্টু লাইটের সুইচ অফ করতেই আমার বুকের ভিতরটা যেন ছ্যাঁত করে উঠলো। এক অনিশ্চিত আশঙ্কায় শরীরের পেশীগুলো টান টান হয়ে গেল। 

     টেবিলে রাখা কাগজগুলো মুখের কাছে ধরে এক দুর্বোধ্য মন্ত্র আওড়াতে লাগলো অর্পণ। আমরা উৎকণ্ঠিত ভাবে তার দিকে চেয়ে বসে রইলাম। মোমবাতির মৃদু আলো টেবিলের চারপাশের অন্ধকার থেকে টেবিলটুকুকে রক্ষা করছে কোনও ক্রমে। সেই অল্প আলো ঘরের দেওয়ালে আমাদের যে অতিকায় ছায়াগুলো তৈরি করেছে, সেগুলো কম্পিত আলোর শিখার সঙ্গে কেঁপে কেঁপে উঠছে মাঝে মাঝে। ঘরের সমস্ত অন্ধকার যেন জমাট বেঁধে আমাদের পিছনে আশ্রয় নিচ্ছে। এক অদ্ভুত অস্বস্তিকর পরিবেশ ঘিরে রয়েছে আমাদের।

     অর্পণ হঠাৎ মন্ত্র পড়া শেষ করে পকেট থেকে ছোট্ট ধাতব ছুরিটা বের করলো। মোমবাতির আলোয় চক চক করে উঠলো তার ধারালো অংশ। সে নিজের হাতের তালুর উপর থেকে ছুরিটা চালিয়ে দিল। হাত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেড়িয়ে এলো। টেবিলের উপর রাখা ছোট্ট পাত্রে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়তে শুরু করেছে। কাঁপা আঙুলে রক্ত দিয়ে টেবিলের উপর একটা পেন্টাগ্রাম আঁকলো অর্পণ। আমাদের দিকে তাকাতেই আমরা তাকে অনুসরণ করলাম। একই ভাবে হাতের উপর দিয়ে ছুরি চালিয়ে দিলাম। রক্ত হাত চুঁইয়ে টেবিলে রাখা পাত্রে পড়তে লাগলো। অর্পণের মতোই রক্ত দিয়ে সামনে টেবিলের উপর একটা পেন্টাগ্রাম আঁকলাম। অর্পণের কথায়, রিচুয়ালের নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেকটা এন্টিটিকে তার রক্ত দিয়ে একটি করে পেন্টাগ্রাম আঁকতে হবে। যা সেই এন্টিটির উপস্থিতির সাক্ষী দেবে। বোর্ডের পেন্টাগ্রামটি শয়তানের উপস্থিতির পরিচয় দেয় ; অর্থাৎ রিচুয়ালে শয়তান নিজেও একটি এন্টিটি।

      শুরু হলো শয়তান আহ্বান পর্ব। আমাদের ডান হাতের তর্জনী দিয়ে নিজের রক্তে আঁকা পেন্টাগ্রাম স্পর্শ করে আমরা একাগ্রচিত্তে ছবির শয়তানকে স্মরণ করতে লাগলাম। অর্পণ এবার জোরে জোরে মন্ত্র পড়া শুরু করেছে। আমি গভীর মনোযোগে ল্যাপটপে দেখা শয়তানের ছবিটা স্মরণ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারলাম না। তার অবশ্য দুটো কারণ রয়েছে; এক, হাত থেকে রক্ত পড়া এখনও বন্ধ হয়নি, উত্তেজনার বশে ক্ষতটা একটু বেশিই গভীর হয়ে গেছে মনে হয়। তাই বার বার হাতের তালুর দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। রক্ত না বন্ধ হলে বিপদের সম্ভাবনাও রয়েছে। 

     দুই, বিল্ডিং-এর অন্য কোনও ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে একটা কুকুর ক্রমাগত ডেকে চলেছে। একটা মহিলা কণ্ঠস্বরের ধমক, কুকুরটাকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছে না। সে কোনও এক নিশ্চিত দুর্ঘটনার আভাস পেয়ে যেন সকলকে সাবধান করে দিতে চায়। প্রায় জোর করেই চোখ বন্ধ করে শয়তানকে অনুসরণ করার চেষ্টা করলাম।

     মিনিট কুড়ি একই ভাবে বসে রইলাম আমরা। এক মায়াময় থম থমে পরিবেশ ঘিরে রইলো মোমবাতির দোদুল্যমান আলোকবর্তিকা চারধারে। এখনও অর্পণ এক মনে সেই দুর্বোধ্য মন্ত্র আওড়ে চলেছে। ক্রমে আমার শরীর ভারী হয়ে আসছে তা বেশ বুঝতে পারছি। কতক্ষণে এই কল্পনাহীন প্রতীক্ষার অবসান হবে তা জানা নেই। এক একটা মিনিট এক একটা যুগের মতো লাগছে। 

     হঠাৎ একসময় জড় টেবিলটায় যেন প্রাণ সঞ্চার হল। থর থর করে কাঁপতে শুরু করলো মৃত কাঠের টেবিল। পঞ্চ ইন্দ্রিয় ঘরে বহিরাগত আগন্তুকের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। একটা চাপা বিষাক্ত নিশ্বাস অন্ধকার ঘরের মধ্যে জমাট বেঁধে উঠছে যেন। এক অজানা আতঙ্কে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। ভারী শীত করতে লাগলো। এক মূহুর্তে ঘরের তাপমাত্রা কয়েক পারদ নীচে নেমে গেছে। চোখের পাতাগুলো আপনা থেকেই খুলে গেল। ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম। 

     এতক্ষণে অর্পণের মন্ত্র পড়া শেষ হয়েছে।

     দেখলাম, আমার ডান এবং বামদিকে বসা নির্মল ও বিট্টুর মাথা টেবিলের উপর এলিয়ে পড়েছে।

     অর্পণের দিকে তাকাতেই, আমার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। অর্পণের নিষ্পলক চোখের মণিদুটো আমার দিকে চেয়ে স্থির হয়ে রয়েছে। তার রক্তশূন্য মুখের মধ্যে থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে এসে একটা ঘূর্ণেয়মান কুণ্ডলীর সৃষ্টি করেছে পেন্টাগ্রাম বোর্ডের উপর। তার ঠিক পিছনে গাঢ় অন্ধকার জমাট বেঁধে এক অদ্ভুত অবয়বের রূপ ধারণ করেছে। একপ্রকার উৎকট গন্ধে আমার দম বন্ধ হয়ে এলো। ফুসফুস প্রসারিত করে প্রশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলাম; না! শ্বাস রোধ হয়ে আসছে আমার। কেউ যেন কোনও এক আদিম মন্ত্রবলে বাতাসের সমস্ত অক্সিজেন শুষে নিয়ে, তাতে ছেড়ে দিয়েছে কোনও বিষাক্ত প্রাণনাশী গ্যাস।

     টেবিলের প্রবল ঝাঁকুনিতে টেবিলের উপরে রাখা মোমবাতিটা পড়ে নিভে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার গ্রাস করে নিল আমায়। মৃত্যু আশঙ্কায় বুকের মধ্যে চেপে থাকা ভয়, এক আর্তচিৎকার হয়ে বেরিয়ে এল আমার গলা থেকে। কোনও ক্রমে চেয়ার ঠেলে ফেলে উঠে ঘরের দরজা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কোথায় দরজা! সারা ঘরে চাপ চাপ অভেদ্য অন্ধকার, কিচ্ছুটি দেখার উপায় নেই। বোধ হল আমি অন্ধ হয়ে গেছি সারা জীবনের মতো। এই বিশ্বচরাচর আমার চোখে আর ধরা দেবে না। এভাবেই পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার আমায় ঘিরে থাকবে অনির্দিষ্টকাল।

     ভীষণ ভয়ে মরিয়া হয়ে দেওয়াল খুঁজতে লাগলাম। দেওয়াল পেলেই দেওয়াল হাতড়ে ঠিক পেয়ে যাব ঘরের দরজাটা। কিন্তু না! অনেক চেষ্টায়ও ঘরের দেওয়াল আমার হাতে ঠেকলো না। সারা ঘর এক গাঢ় অন্ধকার ঘেরা বিশাল মাঠে পরিণত হয়েছে। ঘন্টার পর ঘন্টা ছুটে গেলেও এই মাঠের বাইরে বেরবার উপায় নেই।

     ঘরের মধ্যে সেই উৎকট গন্ধটা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে এখন। একটা ভয়ংকর ক্রুর হাসির শব্দ কানে এলো। আমি প্রাণপণে দেওয়াল হাতড়াতে লাগলাম। সেই ভয়াবহ হিসহিসে হাসির শব্দ আরও জোরালো হচ্ছে। এ হাসি যার সে যেন আমার দিকেই এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। ভয়ে-বিস্ময়ে স্নায়ুর উপর সমস্ত কর্তৃত্ব হারিয়ে আতঙ্কে আমি কাঠ হয়ে রইলাম। সেই জানোয়ার এখন আমার খুব কাছে চলে এসেছে। তার বিষাক্ত নিশ্বাস আমার মুখের উপর পড়ছে। হৃদপিণ্ডের গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। মাথাটা কেমন যেন ভারী হয়ে এলো আমার। শরীরের সমস্ত দুর্বলতা আমায় অবসন্ন করে দিয়ে, নিস্তেজ শিথিল দেহ মাটিতে পড়ে গেল।

 

***

জ্ঞান ফিরতে দেখলাম, আমি বিছানায় শুয়ে আছি। সূর্যের উজ্জ্বল আলো জানালার স্বচ্ছ কাঁচ ভেদ করে ঘরে এসে পড়েছে। ঘরের চারদিকটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম, ঘরটা খুব চেনা চেনা লাগছে! আগেও যেন এসেছি এখানে। 

     হ্যাঁ! মনে পড়েছে। এটা তো অর্পণের বেড রুম। তবে এতো বালিগঞ্জের বাড়ি, আমি এখানে এলাম কী করে! অর্পণই বা কোথায় গেল। বিট্টু আর নির্মল… কাউকেই তো দেখছি না।

     উঠে বসার চেষ্টা করলাম। শরীরের ক্লান্তি এখনও যায়নি। মাথাটাও কেমন ঝিম ঝিম করছে। দেওয়াল ঘড়ির দিকে চোখ যেতে বুঝলাম সকাল দশটা। দিনের উজ্জ্বল আলোয় গত রাতের ঘটনা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। ডান হাতের দিকে চোখ যেতেই সে ধারণা এক নিমেশে মাথা থেকে চলে গেল। হাতের তালুর উপর মোটা ব্যান্ডেজ করা; হাতের ব্যাথাটাও আছে দেখলাম। 

     হঠাৎ ঘরের মধ্যে একজন প্রবেশ করলেন। তার হাতে দুধের গেলাস। এই মহিলাকে আমি চিনি, ইনি অর্পণের মা। 

     তিনি আমার কাছে এসে বসলেন। মাথায় স্বস্নেহে হাত বুলিয়ে ধরা গলায় বললেন, ‘এখন কেমন লাগছে !’ 

     মহিলার চোখ এখনও ভিজে, মনে হল অতিরিক্ত কান্নার ফলেই তার গলার এই অবস্থা।

     আমি একটু, স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করলাম, ‘ভালো, এখন অনেকটা সুস্থ বোধ করছি!’

     আঁচল দিয়ে চোখের কোণ মুছতে মুছতে তিনি বললেন।

     ‘কি সর্বনাশটা করতে চলেছিলি বল তোরা। এই জন্য তোকে একা ছাড়ছিলাম না। কিন্তু তোর জেদের কাছে আমি কবেই বা জিততে পেরেছি। রাতে যদি তোর বাবা ও বাড়িতে না যেত! 

     মহিলা আর তাঁর চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। আমায় জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন।

     ‘ডাক্তারকাকু বলেছেন সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই আবার সুস্থ হয়ে উঠবি আগের মতো। রোগের কাছে এভাবে হেরে গেলে চলে, লড়াই করতে হবে তো! আমরা তো তোর পাশে আছি। আমাদের উপর একটু ভরসা রাখ! সব ঠিক হয়ে যাবে।’

     ব্যাপারটা কিছুই আমার মাথায় ঢুকছে না। একটু ইতস্তত করে বললাম, ‘মানে! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’

     এর মধ্যে ঘরে আরেকজন ঢুকলেন। এই ব্যক্তিও আমার চেনা; ইনিই অর্পণের বাবা অমলদেব বর্মন।

     ‘তুমি আবার শুরু করলে! এখন ওকে বিরক্ত না করে, একটু রেস্ট নিতে দাও। ডাক্তার সরকার বলেছেন আর কোনও ভয় নেই। দিনকয়েকের মধ্যেই ও একদম সুস্থ হয়ে উঠবে। তারপর নয় অপারেশনেটা….

     তুমি আর ওর সামনে কান্নাকাটি করো না প্লিজ।’

     নাট্যমঞ্চের নির্বাক শ্রোতার মতো সমস্ত কিছু দেখে চলেছি আমি। এখনও পর্যন্ত কোনও কিছুই পরিস্কার করে বুঝে উঠতে পারছি না। আমার মাথাটা কি খারাপ হয়ে গেল! না, এঁরা পাগল হয়ে গেলেন! অর্পণের মা বাবা আমায় নিয়ে এমন করছেন কেন! 

     আমি অনেক কষ্টে বললাম, ‘আমি এখানে এলাম কী করে? নির্মল-বিট্টু ওরা সব গেল কোথায়? 

     ‘তুই এতো, ভাবিস না এখন! সব বলবো পরে। তুই দুধটুকু খেয়ে রেস্ট নে। তোর এখন কোনও রকম স্ট্রেস নেওয়া বারণ।’

     ব্যপারটা কেমন যেন ঠেকলো। অর্পণের বাবা তো আমাদের বরাবরই ‘তুমি’ সম্বোধন করে এসেছেন। তবে আজ কী হল! তার উপর তিনি আমার প্রশ্নগুলোও যেন এড়িয়ে যেতে চাইছেন। 

     আমি এবার একপ্রকার মরিয়া হয়ে উঠলাম, ‘ওরা সব কোথায় গেল? কী হয়েছিল আমার? আমি এখানে এলাম কী করে? আগে সব বলুন আমায়!’

     আমার কথাগুলো শুনে যেন তাঁরা খানিক অবাক হলেন। বিস্ময়ে অমলবাবুর চোখের উপরের ভুরু দুটো কুঁচকে গেল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর, ধীরে ধীরে আমার বিছানার ধারে এসে বসলেন।

     ‘নিউটাউনে তোরা চার বন্ধু মিলে যে ছেলেমানুষীটা করতে গেছিলি, তার ফল খুব একটা ভালো হয়নি! দু- দুটো তাজা প্রাণ চলে গেছে তোদের বোকামীর জন্য।’

     ‘মানে!’ 

     ‘এখনকার ছেলে হয়ে তোরা এতটা সুপারস্টিশাস কী করে হতে পারিস! এই সব অদ্ভুত চিন্তা তোদের মাথায় আসে কী করে। নেহাত তোর এই মেজর ডিজিস ছিল; তা নাহলে পুলিশি হাঙ্গামা থেকে আমরা কেউই রেহাই পেতাম না।

     টেবিলের উপর পড়ে থাকা মোমবাতি, ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রক্ত এবং রক্তে আঁকা ওসব চিহ্ন দেখেই বুঝেছি যে তোরা প্ল্যানচেট জাতীয় কিছু একটা করতে চলেছিলি। বিভিন্ন তন্ত্রমন্ত্রের বই পড়ে বা ইন্টারনেট ঘেঁটে প্লানচেটের নিয়ম ভেবে যেসব ছেলেমানুষী কাজকর্ম করেছিস; তার মূল্য দিতে হল বিট্টু আর নির্মলকে।’

     ‘বিট্টু আর নির্মলের কী হয়েছে!’ 

     ‘তারা আর বেঁচে নেই। হাতের কবজির উপর যে গভীর ক্ষতটা তারা করেছিল তার থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তোর ক্ষতটা ছিল হাতের তালুর উপর তাই হয়তো তোকে ফেরাতে পেরেছি। সম্ভবত হাতের রক্ত দেখেই তুই জ্ঞান হারিয়ে ছিল। তবুও, প্রবীর যদি ঠিক সময় খবর না দিত! তাহলে তোরও ভালো মন্দ কিছু একটা হয়ে যেত পারতো!’ 

     কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার মাথাটা ঘুরছিল। মনে হচ্ছিল যেকোনও মুহূর্তে আবার আমি জ্ঞান হারাবো! শেষের কথাটা শুনে মাথার মধ্যে সব কিছু তালগোল পকিয়ে গেল যেন। 

     ‘প্রবীর! মানে…!’

     ‘হ্যাঁ! প্রবীর।’ 

     তিনি বলে গেলেন, ‘সে ওই দিন রাত দশটা নাগাদ কল করে আমায়। ততক্ষণে তোরা হাত-টাত কেটে অচৈতন্য হয়ে পড়ে ছিলিস।

     একমাত্র প্রবীর তোদের গোপন তন্ত্র মন্ত্র মেনে নিতে পারেনি, তাই হয়তো সে তোদের মতো বোকামিটা করেনি। আমরা যখন ওখানে গিয়ে পৌঁছাই তখন অনেক দেরী হয়ে গেছিল। ভাগ্যক্রমে তোর দেহে প্রাণ ছিল। হাসপাতালে প্রাইমারি ট্রিটমেন্টে হওয়ার পর ডাক্তারকাকুর তত্ত্বাবধানে তোকে ঘরে আনা হয়। তিনদিন তুই একভাবে বিছানায় শুয়েছিলি। একেই শরীরের এ অবস্থা, তার উপর এসব!  

     যাক! যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন আর মাথার উপর বেশি জোর দিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। এই তুমি ওটা ধরে বসে রয়েছ কেন। দুধটুকু ওকে খাইয়ে কিছু ভারি খাবার দাবার দিয়ে যাও। নিশ্চয়ই ভীষণ খিদে পেয়েছে। আমি ডাক্তার সরকারকে খবরটা দিয়ে আসি।’

     ব্যাপারটা যেমন আশ্চর্যের ঠিক তেমনই গোলমেলে। আমি হতবাকের মতো চেয়ে চেয়ে সবকিছু শুনে গেলাম।

     কিছুক্ষণ পরে অর্পণের মা-ও ব্যস্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। 

     আর না! এখানে আর বেশিক্ষণ থাকলে সত্যি আমি পাগল হয়ে যাব। আমায় বাড়ি ফিরতে হবে। বিছানা থেকে নামতেই মাথাটা যেন ঘুরে গেল। টলে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিলাম। 

     ঘরের উত্তরদিকের দেওয়ালে রাখা বিশাল আয়নাটার দিকে চোখ পড়লো আমার। সঙ্গে সঙ্গে একটা হিমশীতল স্রোত আমার সারা শরীরে বয়ে গেল। পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। স্বচ্ছ আয়নার অপর দিকে যে মানুষটার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে; সে আমি নই। এত বড় বড় চুল, কোটরে ঢোকা চোখ, এই মরণরোগে বিদ্ধস্ত হয়ে শুকিয়ে যাওয়া দেহ আমার নয়। আয়নার অপর দিকে দাঁড়িয়ে থাকা পাতলা লম্বা ছেলেটাকে আমি চিনি। এ শরীর আমার নয়, এ শরীর অর্পণের। 

     সেই অর্পণ যে তার দূরারোগ্য রোগের সঙ্গে লড়াই করতেও ভুলে গিয়েছিল। যে অর্পণ নিজেকে প্রস্তুত করছিল, মৃত্যুর সম্মুখীন হবে বলে। যে অর্পণ ধীরে ধীরে সকল ব্যর্থতার সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য তৈরি হচ্ছিল। এ হাত, পা, মুখ, চোখ সেই, সেই রোগে আক্রান্ত অর্পণের। এ আমার কিছুতেই হতে পারে না!

     সেই রাতে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে শয়তানকে আহবান করার প্রধান কারণ ছিল অর্পণের আরোগ্যলাভ। তবে সে আরোগ্যলাভ ঠিক কী ভাবে আসবে; তা সে বলেনি আমাদের। তার মানে…..!

     অর্পণের বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানতে পেরে রাগে দুঃখে আমি স্তম্ভিত হয়ে রইলাম। এতক্ষণে সমস্ত ঘটনা আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়েছে।

     সাধারণ জীবনে ফিরে আসতে হলে অর্পণকে এই রোগ থেকে মুক্ত হতে হবে; আর এই রোগ থেকে মুক্ত হতে গেলে তাকে তার রোগাক্রান্ত শরীর ত্যাগ করতে হবে। এবং এমন কোনও সুস্থ শরীর খুঁজতে হবে যে শরীরে তার আত্মা আশ্রয় নিতে পারে। অতএব, তার প্রয়োজন ছিল একটি নীরোগ সুস্থ শরীর। 

     কিন্তু, নির্মল-বিট্টুকে প্রাণ হারাতে হল কেন; যখন আমাকে দিয়ে সে প্রয়োজন মিটে গেছিল। আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম তারা তাদের হাতের তালুর উপর দিয়েই ছুরিটা চালিয়েছিল। এবং ক্ষতটাও হয়ে ছিল হাতের উপর। হাতের কবজির শিরা তো তারা কাটেনি!

     ‘বাবু! তুই উঠেছিস কেন!’ একটা জোরালো কন্ঠস্বরে আমি সম্বিত ফিরে পেলাম। অর্পণের মা ঘরে ঢুকেছেন।

     ‘প্রবীর ফোন করেছে, তোর সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়। তুই কী পারবি! কথা বলতে। দেখ চেষ্টা করে…’

     ফোনটা আমি হাতে নিলাম!

     ‘ছেলেটা রোজ দু-বেলা ফোন করে তোর খবর নেয়। প্রবীর আজ না থাকলে, যে কী হত সেটা ভেবেই আমার বুক কেঁপে ওঠে। ভগবান ওর মঙ্গল করুন। গত জন্মে নিশ্চয়ই কোনও ভালো কাজ করেছিলি, তাই এ জন্মে এমন সব বন্ধু পেয়েছিস। নয়তো আজকালকার সময়ে এমনসব বন্ধু পাওয়া যায়…’

     তিনি বলে চলে গেলেন।

     আমি একটু ধাতস্থ হয়ে ফোনটা কানে ধরলাম। ওপার থেকে ভেসে এলো সেই পরিচিত হাড়হিম করা হিসহিসে হাসির শব্দ। 

     ‘গত জন্মে নিশ্চই কোনও ভালো কাজ করেছিলাম, নয়তো আজকাল তোদের মতো বন্ধু পাওয়া যায়! একজন বন্ধুর আরোগ্যলাভের জন্য নিজের নীরোগ সুস্থ শরীর উৎসর্গ করলো; আর দুজন নিজেদের প্রাণ।’

     ‘তার মানে বিট্টু আর নির্মল…!’ কথাটা শেষ করতে পারলাম না আমি।

     ‘হ্যাঁ বন্ধু। সে রাতে আমার ডাকে শয়তান এসেছিল ঠিকই তবে সে আমার প্রার্থনায় সাড়া দেয়নি সহজে। প্রতিবারের মতো এবারেও তার একটা শর্ত ছিল।’

     কাঁপা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করলাম আমি!

     ‘কী শর্ত!’

     ‘দুটি জীবন্ত প্রাণ!’ এক অপার্থিব অভিশপ্ত হাসিতে আমার কানে তালা ধরে গেল। মনে হল আমি বধির হয়ে যাব।

4 thoughts on “আরোগ্য

  • August 30, 2019 at 12:26 pm
    Permalink

    Dayal Aman er pentagram golpo ta YouTube e midnight horror station channel e achhe. Sobai ke sune dekhar onurosh roilo. Lekhok o Parle sune dekhun. Golpoti moulik ki na lekhok Janan Ni…

    Reply
    • September 2, 2019 at 2:35 am
      Permalink

      আমরা পত্রিকার তরফ থেকে অবশ্যই শুনে দেখছি।

      Reply
  • September 10, 2019 at 2:52 pm
    Permalink

    সায়াক আমানের ‘পেন্টাগ্রাম’ ও ‘মাকড়শার জাল’ দুটোর বিষয়বস্তু মিলিয়ে গল্পটি লেখা । প্লট , আরোগ্য হবার কামনা, রিচুয়াল বেশ মিল আছে । লেখক এন্ডিং ‘পেন্টাগ্রামে’র মতন না করে করেছেন ‘মাকড়শার জাল’ । গল্পের মৌলিকত্ব নিয়ে ঘোর সংশয় ।

    Reply
  • September 11, 2019 at 4:49 am
    Permalink

    যদিও কন্সেপ্ট পুরনো, সুপারনেচারাল সিরিজে এই ধরনের অনেক এপিসোড দেখা; তবে আমাকে অবাক করেছে লেখকের লেখার স্টাইল। অত্যন্ত গতিশীল, সাবলীল ঝরঝরে বাক্য ও ডায়ালগ। প্রতিটি ঘটনা যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম, এতোই জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। পড়তে একফোটা ক্লান্ত আসেনি, একটানে পড়ে ফেলা সম্ভব হয়েছে কেবল অসাধারণ বর্ননা ও ঝরঝরে লেখার কারণে। ঝানু লেখকের সবচেয়ে বড় গুণ। লেখার মান বেশ ভালো, লেখক যদি কেবল প্লটের নতুনত্বের দিকে নজর দেয় তবেই হবে।

    লেখকের কাছ থেকে মৌলিক আরও কল্পগল্প/ফ্যান্টাসি গল্প আশা করছি।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!