আলজরননের জন্যে কিছু ফুল

ড্যানিয়েল কেয়েস, বাংলা অনুবাদ - দীপ ঘোষ

অলংকরণ:ইন্টারনেট

পোরগেস রিপুট ১

মাচ ৫, ১৯৬৫

ডাকটার শটরাউস আজ আময় বলেছে সব লিকে রাকতে। আজ তেকে জা জা হবে যা আমার মনে আসবে শব লিকে রাকতে হবে। এর তেকে নাকি ওরা বুচতে পারভে আমি অদের কাজে লাগব কিনা। ওরা আমায় নিলে আমার কুব ভাল লাগবে। কিনিয়ান দিদি বলেচে আমার বুদ্দি নাকি অনেক বেরে জাবে। আমিও চাই অনেক বুদ্দি পেতে অদের মত চালাক হতে। আমার নাম চারলি গোরদোন। আমার বয়স সাইতিশ। দুই হপতা আগে আমার জনমদিন ছিল। একন আর লেকার মত কিচু মনে আসচে না একন গুমতে জাব।

 

পোরগেস রিপুট ২

মারচ ৬

আজ আমার পরিক্কা ছিল। আমি বোদয় পাস করিনি। ওরা কি তবে আমায় কাজে নেবে না আর। একতা কমবয়সি লোক আমাকে একতা গরে নিয়ে গেল। সেকানে অনেক শাদা কাগজে কালো কালি ঢালা ছিল। লোকটা বলল চারলি কারডে কি দেকচ। আমি খুব ভয় খাচ্চিলাম। ইসকুলে আমি সব পরিক্কায় ফেল করতাম আর খাতায় কালি ফেলে চলে আচতাম।

     আমি লোকটাকে বললাম আমি কালির দাগ দেকচি। লোকটা আমায় বলল আমি টিক বলেচি। আমার কুব আননদ হল আর আমি বাইরে চলে জাচচিলাম। কিনতু লোক টা বলল চারলি বসো। ও আমায় কালিতে কি আচে জিগাসা করল। কালিতে কিচু ছিল না কিন্তু ও বলচিল সবাই নাকি কালিতে ছবি দেকে। আমি অনেক চেসটা করলাম কিচু দেকতে পেলামনা। কাচে দুরে কিচুতেই কিচু দেকতে পেলাম না। তকন আমার মনে হল হয়ত চসমা ছারা কিচু দেকতে পাচ্চি না। আমি আলমারি তেকে চসমা নিয়ে এলাম আর তাও কিচু দেকতে পেলাম না।

     আমি লোকটাকে বললাম আমার নুতুন চসমা লাগবে। লোকটা কাগজে কি সব লিকচিল আমার মনে হল আমি বোদয় ফেল করেচি। আমার কুব ভয় হল। আমি লোকটাকে বললাম কালি গুলো কুব ভাল আর কালির ফোতা গুলো কুব সুনদর করে চরিয়েচে। লোকটাকে দেকে মনে হল অর কুব মোন খারাপ হয়েচে। আমি বললাম আমায় আর একবার চানস দিন। আর পাচ মিনিট দিলে আমি নিসচই ছবিটা কুজে পাব মাজে মাজে আমার একটু সময় লাগে। কিনিয়ান দিদির বড়দের পড়াসুনার কেলাসে আমার একনো পরতে সময় লাগে আমি কুব চেসটা করি কিনতু।

     লোকটা আবার আমায় কারড দিল লাল আর নিল রঙ ছিল। লোকটা ভাল ছিল কিনিয়ান দিদির মত ভাল। আমায় বলল এই কারড কে রো সোক বলে। এই কারডে নাকি লোকে ছবি দেকতে পায়। আমি বললাম কই ছবি দেকাও। ও বলল তুমি ভেবে বল। আমি বললাম কালির ছবি কিনতু ও বলল সেতাও ভুল। ও বলল কারড দেকে তোমার কিসের কতা মনে পরে। আমি অনেক্কন চোক বনদ করে বসে তাকলাম কিচু মনে এলনা। আমি বললাম কলম তেকে কালি পরচে পাতায় তার চবি। লোকটা তারপর চলে গেল। আমি বদয় রোস ক পরিককায় পাস করতে পারিনি। 

 

পোরগেস রিপুট ৩

মারচ ৭

ডাকটার সটরাউস আর ডাকটার নিমুর বলেচেন কালি লাগানো কাজগটা খারাপ খেলা। আমি বার বার বললাম আমি কাগজে কালি ফেলিনি কাগজে কোন চবি ছিল না। কিনিয়ান দিদি আমায় সুদু পরতে আর বানান সিকতে বলে। ওরা বলচিল কিনিয়ান দিদি ওদের বলেচে আমি বরদের রাতের ইস্কুলের সব তেকে ভাল ছাত্র আমি সব সময় চেসটা করি মন দিয়ে সব সুনতে। ওরা বলল চারলি তুমি কিনিয়ান দিদির ইস্কুলের কতা জানলে কি করে। আমি সবাইকে জিগাসা করেচি কোতায় আমি পরতে সিকতে পারি ওরা বলল পরা সিকে কি করবে। আমি বলেচি আমি চালাক হতে চাই আমায় সবাই বোকা বলে। কিনতু চালাক হবা কুব কোতিন। কিনিয়ান দিদি বলেচে হয়ত আমি কয়েকদিনের জন্ন্য চালাক হতে পারব। আমি তাতেই খুসি।

     আজ আমায় আরো পরিক্কা দিতে হল। একজন সুনদর দিদিমনি আমায় আমার পরিক্কা নিলেন। আমি ওকে দিয়ে পরিক্কার নামটা লিকে নিয়েচি যাতে আমার রিপুটে লিকতে পারি বিষয়ভিত্তিক চেতনার পরীক্ষা। আমি সবদগুলোর মানে জানিনা তবে এটা সহজ পরিক্কা। আমায় চবি দিয়ে বলেচে সেই লোকগুলো দিয়ে গলপ বলতে।

     আমি দিদিমনিকে বললাম আমি তো লোকগুলোকে দেকিনি গল্প বলব কি করে। উনি বললে বানিয়ে বানিয়ে বল। আমি মিচে কতা বলি না আমার মিচে কতা সবাই দরে ফেলে যে।

     দিদিমনি আমায় বলল এইটা আর রো সক পরিক্কা তেকে ওরা আমার কতা জানতে চায়। আমি কুব হেসেচি এটা সুনে কালি আর লোকের চবি তেকে আমার কতা জানবে কি করে। দিদিমনি কুব রেগে গিয়ে উটে চলে গেল আমি এই পরিক্কাতেও ফেল করেচি বদয়।

     বিকেলে সাদা জামা পরা দুটো লোক আমায় নিয়ে হাসপাতালের একটা গরে গেল। সেকানে আমায় একটা খেলা খেলতে হল একটা ইদুর ছিল। ইদুরের নাম আলজরনন। ইদুর টা একটা বড় বাকসে ছিল বাকসে অনেক দেওয়াল আর রাসতা ছিল। ওরা আমায় একটা পেনসিল আর কাগজ দিল যার মদ্দে অনেক দেওয়াল আর রাসতা আকা ছিল। একদিকে রাসতায় লেকা ছিল সুরু অন্যদিকে সেস। ওরা বলল এটা ধাদা আর আলজরনন আর চারলিকে একই ধাদা দেওয়া হয়েচে। আমার মনে হয় ওরা সতি বলেনি আমায় তো বাকস দেয়নি আমি কিছু বলিনি।

     লোকগুলো খালি গড়ি দেকচিল আর আমার কুব ভয় করচিল। ওরা দশ বার খেলাটা করল আলাদা ঢাদা দিয়ে আর আলজরনন সব বার জিতল। ইদুর এত চালাক হয় আমি জানতামনা। হয়ত সাদা ইদুর চালাক হয়। হয়ত আলজরনন কুব চালাক ইদুর।

 

পোরগেস রিপুট ৪

মারচ ৮

   ওরা আমায় কাজে নেবে! কিমজা আমার কুব অননদ হচেচ আমি ঠিক করে লিকতেও পারচি না। দাকতার সটরাউস আর ডাকতার নিমুর পথমে অনেক ঝগরা করল তারপর সটরাউস বলল কিনিয়ান দিদি বলেচে আমি তার চাত্রদের মদ্দে সবথেকে ভাল। দিদি আমায় বলেচে চারলি তুমি জিবনে আরেকবার সুজোগ পাবে। দিদি বলেচে আমি যদি এই পরিক্কায় জোগদি তাহলে আমায় ওরা চালাক করে দেবে। তবে সেটা কিচুদিনের জন্নেও হতে পারে। আমার অপারেসনে কুব ভয়। দিদি বলেচে ভয় না পেতে বলেচে চারলি তুমি এত কস্টের মদ্দেও এত চেসটা করচ, বগবান তোমার খতি করবে না।

       আজো ডাকটার সটরাউস আর নিমুর ঝগরা করছিল আমার ভয় হয়। সটরাউস বলচিল চারলির মদ্দ্যে একটা দামি জিনিস আচে পেরনা। আমি অনেক ভেবেও সেটা কোতায় বুচতে পারলাম না। আরো বললেন সব আটসট্টি আই কুর লোকের মদ্দ্যে নাকি এটা তাকেনা। আলগরনানের মদ্দেও নাকি আছে এতা। আলগরনানের পেরনা নাকি ওর বাকসের চিজের তেকে আসে, তবে আমি তো চিজ খাইনি, তবু আমারো পেরনা আচে। তারপর উনি নিমুরকি কিজেন বললেন আমি বুজতে পারিনি তাই লিকে রেকেছি।

       সটরাউস বললেন চারলি অতিধিশকতির নতুন অতিমানব হবার যন্যে উপজুকত হয়ত নয়, কিনতু ওর মত অপরিনত মসটিসকের বেসির ভাগ লোকই আমাদের সাথে কাজ করার পক্কে বদড উদাসিন। চারলি কিনতু চেসটা করে আর সহজোগিতা করে। নিমুর বললেন চারলিই পরথম মানুস হবে যার বুদ্দি অপারেসান করে বারান হবে। দাকতার সটরাউস বললেন চারলি কিনতু বেস লিকতে আর পরতে শিকেছে। তুমি যদি ওর মনের বয়স এর কতা ভাবও তাহলে এতা কিনতু আমাদের কাছে আইনটাইনের থিওরি অব রিলেট** শেকার মতই কটিন। এর থেকে বোজা যায় ওর মদ্দ্যে সেখার আর নতুন কিচু করার জন্ন্যে পেরনা আছে।

     বাকি কতা আমি বুজিনি ওরা কুব তারাতারি কতা বলচিল কিনতু শেসে নিমুর রাজি হলেন। আমরা চারলিকে ব্যাবহার করব। আমার এত আনন্দ হল যে আমি নিমুরের হাত দরে বললাম অনেক অনেক দন্যবাদ সার আমি কুব কুব চেস্টা করব দেকবেন। আমায় আরেকবার সুজোগ দিয়ে আপনি কোন ভুল করেননি। অপারেসানের পরে আমার অনেক বুদ্দি হবে।

 

পোরগেস রিপুট ৫

মাচ ১০

আজ অপারেসান ভয় করচে আমার। কাল থেকে অনেক লোক এসে আমায় ফুল আর ক্যানডি দিয়ে যাচ্চে। আমি সাথে করে আমার লাকি পেনি আর ঘোরার নালটা নিয়ে এসেচি। আসপাতালে আসার সময় আমি একতা কাল বেরাল দেখেচি। ডাকতার সটরাউস বলেছেন চারলি কুসংকারে বিসশাস করতে নেই বিগগানে বিসশাস রাকো। আমি তাও আমার লাকি পেনিটা আমার খাটের নিচে রেকেছি।

     আমি ডাকতারকে জিগাসা করলাম অপারাসানের পরে আমি কি আলগারনানকে হারাতে পারব। উনি বললেন আমি হয়ত আরগারনানের থেকেও বেসি বুদ্দিমান হয়ে জাব। আমি ঠিক করে লিকতে আর পরতেও পারব। আমি বাকি সবার মত বুদ্দিমান হয়ে জাব। জদি আমার অপারাসান ঠিক অয় তবে দুনিয়ার সবাই অপারাসান করে বুদ্দিমান হতে পারবে।

     ওরা আমায় সকালে খেতে দেয়নি। আমার খুব খিদে পেয়েচে নিমুর আমার ক্যানডি গুলো নিয়ে গেচে। নিমুর খুব খিটকিটে বুরো। সটরাউস বলেচে অপারাসানের পরে ওগুলো আমায় দেওয়া হবে। অপারাসানের আগে নাকি খেতে নেই…

 

প্রোগ্রেস রিপোর্ট ৬

মাচ ১৫

অপারাসনে আমার ব্যথা লাগেনি আমি তখন ঘুমাচিলাম। আজ ওরা আমার মাথার আর চোকের ব্যানডেজ খুলে দিয়েচে। নিমুর বলেচে আমি প্রোগ্রেস রিপোর্ট বানান ভুল লিকচি। আমার বানান কিচুতেই মনে থাকে না, এইবার আমি খুব চেস্টা করব জাতে ভুল না হয়।

     ডাকতার সটরাউস বলেচেন আমি জেন এখন থেকে যা ভাবচি তাই লিখে রাখি। কিনতু আমি কি চিনতা করব তাই তো জানি না। আমি অনেক চিনতা করলাম কিনতু কিছুই মনে এলোনা। ডাকতার যদি আমায় বলে দেয় কি চিনতা করতে হবে তাওলে খুব ভাল হয়। আমার তো একন অনেক বুদ্দি হয়েছে। বুদ্দি হলে মানুস কি ভাবে। নিশচই ভাল কথা ভাবে অনেক। আমিও জদি অনেক ভাল কথা ভাবতে পারতাম।

 

প্রোগ্রেস রিপোর্ট ৭

মারচ ১৯

গত কদিন ধরে কিছুই হচ্ছে না। সুধু তেসট দিয়ে যাচ্ছি আর আলজারননের সাথে রেস করতে বলচে ওরা। ইদুরটাকে আমি সহ্য করতে পারিনা খালি জিতে জায়। স্টরাউস বলছেন আমায় এই খেলা গুলো রোজ খেলতে হবে। সেই কালি লাগানো কাগজ আর ছবির খেলা। আমি অচেনা মানুসজনের ব্যাপারে মিথ্যে বলতে চাইনা। আজকাল ভাবতে গেলে আমার মাথা ব্যাতা করে। কিনিয়ান দিদি আমায় দেকতে আসেনা। দাকতার স্টরাউস ও আমায় বলেন না আমার কি ভাবা উচিত। এই বোকা বোকা রিপোট লিকতে আমার ভাল লাগে না।

 

প্রোগ্রেস রিপোর্ট ৮

মারচ ২৩

আমি আবার কারখানায় ফিরে এসেছি। ওরা বলেচে অপারেসানের কথা কাউকে না বলতে। তবে রোজ রাতে আমায় একনো হাসপাতালে যেতে হবে ওরা টাকা দেবে। আমার বন্দুরা আমায় দেখে খুব খুসি। আমারো মজা লাগচে ফিরে এসে।

     স্টারউস বলেচেন আমায় রোজ লেকার দরকার নেই সুদু কিছু নতুন হলে তবেই লিকতে হবে। আমার বুদ্দি একনো বাড়েনি বলে চিন্তা করার কিছু নেই অনেক সময় লাগে কেউ জানেনা। আলজারননেরো বুদ্দি বারতে অনেক সময় লেগেচিল ওরও নাকি অপারেসান হয়েচিল। তাই জন্নে ও এত তাড়াতারি জিততে পারে। একদিন ওই ইদুরটাকে আমিও হারিয়ে দেব ঠিক। সবাই বলে ওর বুদ্দি আর কমবে না।

 

মারচ ২৫

নেমুর বলেচে আমায় রোজ রোজ প্রোগ্রেস রিপোর্ট লিকতে হবে না। সুদু জেদিন রিপোর্ট জমা দেব সেদিন প্রতম পাতায় লিকলেই হবে।

     আজ কারখানায় খুব মজা হল। জো কারপ বলেচে দেখো ওরা চারলিকে অপারেসান করে অনেক বুদ্দি দিয়ে দিয়েছে। আমি ভেবেচিলাম সত্তি কথাটা বলেদি তারপর ভাবলাম ডাকতার বারন করেছে। ফ্রানক রেফলি বলল চরলি দরজার চাবি ভুলে গেচিল তাই মাথা দিয়ে গুতো মেরে দরজা খুলেচে। আমরা সবাই খুব হাসলাম। আমার বনদুরা খুব ভালো।

     মাজেমাজে ওরা বলে দেখ দেখ ওই ব্যাটা একটা আস্ত চারলি গরডনের মত কাজ করচে। আজ সকালে কারখানার ফোরমান আমোস বর্গ আমার নাম করে আরনিকে গালি দিচ্চিল। আরনি একটা দরকারি কাগজ হারিয়ে দিয়েচে। সবাই খুব হাসচিল। কিনতু আমিতো কাগজ হারাইনি। আমাকে কেউ কাগজ রাকতে দেয়না।

 

মারচ ২৮

আজ রাতে স্টারউস আমার ঘরে এসেচিলেন। আমি কেন হাসপাতালে যাই না জানতে চাইলেন। আমার ভালো লাগে না আলজারননের সাথে পরিক্কা দিতে রোজ রোজ। ডাকতার আমায় বলল এখন কয়েকদিন আমি ছুতি নিয়ে ঘরেই থাকতে পারি। উনি আমায় একটা টিভি দিয়েচেন কিন্তু ওটা ঠিক টিভি না। ডাকতার বলেচেন ঘুমাবার সময় ওটা চালিয়ে সুলে নাকি আমার বুদ্দি বেড়ে যাবে। আমি বললাম ডাকতার আমার মনে হয় আমি চালাক হতে পারব না। উনি বললেন চারলি তোমার বুদ্দি আসতে আসতে বাড়চে তুমি বুজতে পারচো না। আমার মনে হয় উনি আমায় ভোলাবার জন্নে বলচেন।

     আমি কিনিয়ান দিদির ইশকুলে যেতে চাই আবার। কিন্তু ডাকতার বললেন কিনিয়ান দিদি হাসপাতালে এসে আমাকে একা পরাবেন। আমার কিনিয়ান দিদির উপর খুব রাগ হয়েচে অপারেসানের পরে আমায় দেকতে আসেনি একবারো।

 

মারচ ২৯

উফ এই টিভিটার জন্নে আমার ঘুম বনধ হয়ে গেচে। সারারাত যত অদভুত সবদ আর বিদঘুটে ছবি। জেগে থেকেই কিচু বুজতে পারচিনা তো ঘুমিয়ে কি বুঝব। ডাকতার বলচে আমার মাথা নাকি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সব শিকচে ওই টিভি থেকে। আমার মনে হয় ডাকতার পাগল। লোকে জদি ঘুমিয়েই সব শিখে জায় তবে আর ইসকুলে যাবে কেন। আমিতো রাতে অনেকদিন ধরেই টিভি দেখি তাহলে এতদিন আমার অনেক বুদ্দি হয়ে যেত।

 

প্রোগ্রেস রিপোর্ট ৯

এপ্রিল ৩

স্টারউস আজ আমায় দেকিয়েচেন কি করে টিভির সব্দটা কমিয়ে রাখা যায় আর আমি ঘুমতে পারি। আমি একনো বুজতে পারিনা টিভিতে কি বলচে। সকালে উঠে বেস কয়েকবার চালিয়ে দেকেছি। কি জোরে সব কথা বলে কিছু বোঝা যায় না। আমার ক্লাস সিকসের দিদিমনি মিসেস গোলডের থেকেও তারাতারি কথা বলে এরা। কিনিয়ান দিদি বলেচেন এরা হয়ত অন্য ভাসায় কথা বলে কিনতু আমার তো আমেরিকান বলেই মনে হয়।

     আমি ডাকতারকে বললাম দিনের বেলাতেও আমায় টিভি দিন তাহলে আমি দিনে আর রাতে সবসময়েই বুদ্দি বারাতে পারব। ডাকতার বললেন আমার নাকি দুটো মন আছে সচেতন আর অবচেতন। দুটো মন দিয়েই আমি দিনে আর রাতে শিকচি। আর এরা নাকি একে অপরের সাথে কথাও বলেনা। বাপরে এত কিচু তো আমি জানতামি না। এর জন্নেই নাকি আমি সপ্ন দেখি। রাতে ওই টিভিটা চালানোর পর থেকে আমি খুব সপ্ন দেকছি সারা রাত।

     ডাকতারের দেওয়া ডিকসনারিতে আমি অবচেতন সব্দটা খুজলাম। অবচেতন–বিণ. স্পষ্ট জ্ঞানের অন্তরালে অবস্হিত অস্পষ্ট চেতনাযুক্ত। কিচুই মানে বুজলাম না। আমার মত বোকাদের জন্নে ওরা একটা নতুন ডিকসনারি বানালেই তো পারে।

     কালকের পারটি থেকে আমার খুব মাথা ধরেচে। জো আর ফ্রানক আমায় কাল ওদের সাথে মাগসিসদের সরাইখানায় নিয়ে গেচিল। আমার মদ খেতে ভালো লাগেনা কিনতু ওরা বলল খেলে আমার ভালো লাগবে। পারটি আমার খুব ভালো লেগেচে। জো বলল চরলি সবাইকে দেখাও তুমি কি সুনদর বাথরুম পরিস্কার করতে পারো। আমি ওদের সব বাথরুম পরিস্কার করে দিয়েচি। সবাই খুব খুসি হয়ে অনেক হাসাহাসি করেছে। আমিও হেসেছি। কিনিয়ান দিদি বলেছে চারলি তুমি যাই কর খুব ভালো করে করবে আর সেই কাজকে ভালবাসবে। সব মেয়েরা আমাদের সাথে হাসছিল আর আমরা খুব মজা করচিলাম। তারপরে জো আর ফ্রানক আমায় কফি কিনে আনতে পাঠালো। আমি ফিরে এসে দেখলাম কেউ আর নেই আমি ওদের অনেকখন খুজেচিলাম। তারপর কি হয়েচে আমার মনে নেই। আমার মাথায় খুব বেথা আর মাথা ফুলে গেচে অনেকটা। বাড়িওলি বলেচে পুলিস আমায় বাড়ি দিয়ে গেচে গত রাতে। জো বললে পুলিস নাকি মাতালদের মারে কিনতু আমার মনে হয় আমি পরে গেচিলাম। কিনিয়ান দিদি বলে পুলিসরা সবার ভালো করে ওরা আমায় মারেনি। আমার সারা গায়ে খুব বেথা আর কোনদিন আমি মদ খাব না।

                                          

এপ্রিল ৬

আজ আমি আলজারননকে হারিয়ে দিয়েচি! পরীক্কার শেসে বার্ট এসে আমায় যখন বলল আমি বিস্বাসই করতে পারিনি। আমার এতো আনন্দ হয়েছিল যে পরের বার মন দিয়ে খেলতেই পারিনি আর হেরে গেলাম। কিনতু তার পরে আমি আরো আট বার ওকে হারিয়ে দিয়েচি। আমার আরো খেলার ইচ্ছে ছিল কিনতু ওরা আর আমায় খেলতে দিল না। ঘর থেকে বেরোনোর আগে আমি আলজারননকে ধরে আদর করলাম। কি সুন্দর নরম তুলতুলে একেবারে তুলোর মতো কালো পুতির মতো ছোট ছোট চোখ।

     আমার খুব খারাপ লাগচিল আমি ওকে হারিয়ে দিয়েচি বলে। আমি বার্টকে বললাম আমি ওকে খাওয়াতে চাই ওর সাথে বন্দুত্ত করতে চাই। বার্ট বলল আলজারনন প্রথম ইদুর যে অপারেসানের এতদিন পরেও এত বুদ্দি রাখচে তাই ওকে এমনি খেতে দেওয়া হয়না। আলজারনন রোজ একটা করে দরজার ধাধার উত্তর বের করে তারপর ওকে খেতে দেওয়া হয়। রোজ অন্যরকম ধাধা দেওয়া হয়।

     আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল বেচারা নতুন ধাধার উত্তর না দিতে পারলে খেতে পায়না। এমন কারো সাথে করা উচিত না। ডাকতার নেমুরকে যদি রোজ খেতে বসার আগে পরীক্কা দিতে হয় তবে কেমন লাগবে। আমি আলজারনানের বনধু হতে চাই।

 

এপ্রিল ৯

আজ হাসপাতালে মিস কিনিয়ান এসেচিলেন। আমায় দেখে খুসি হয়েছেন কিন্তু মনে হল উনি আমার জন্নে খুব চিন্তিত। আমি বললাম চিন্তা করবেন না আমি এখনো সেই বোকা চার্লিই আচি। উনি বললেন চার্লি আমি তোমায় ভরসা করি তুমি অনেক কস্ট করেচ সারা জীবন। অনেক কস্ট করে লিখতে পড়তে শিখচ। তুমি বিজ্ঞানের জন্নে অনেক কিছু করচো।

     আমরা খুব কঠিন একটা বই পরচি। একটা লোক একটা দিপে একা আটকে আছে বইটার নাম রবিনসন ক্রুসো। লোকটার খুব বুদ্ধি ও কত্রকম জিনিস তৈরি করবে একটা বাড়ী তৈরি করবে। কিন্তু দিপে ওর কোন বন্ধু নেই। আমার মনে হয় অন্য লোক আছে একটা ছবিতে দেখলাম লোকটা একটা পায়ের ছাপের দিকে তাকিয়ে আচে। লোকটা একটা বন্দু খুজে পেলে খুব ভাল হয় আমি চাইনা কেউ একা একা থাকুক।                   

       

এপ্রিল ১০

মিস কিনিয়ান আমায় কয়েকদিন ধরে বানান শেখাচ্চেন। উনি বলেচেন চার্লি চোখ বুজে একটা বানান বার বার চিন্তা করতে থাকো যতক্ষণ না সেটা ঠিক করে লিখতে পারো। আমি ঠিক বুঝতে পারিনা উনি কি বলচেন তবে উনি বলেচেন বানানের নাকি সেরকম নিয়ম নেই।

 

প্রোগ্রেস রিপোর্ট ১০

এপ্রিল ১৪

রবিনসন ক্রুসো শেষ করলাম। আমি আরো জানতে চাই এরপর কি হল লোকটার কিন্তু মিস কিনিয়ান বলছেন ওর গল্প ওখানেই শেষ। কেনো আর জানতে পারবো না?

 

এপ্রিল ১৫

মিস কিনিয়ান আজ বলেছেন আমি খুব তাড়াতাড়ি শিকছি। উনি আমার পুরোনো রিপোর্টগুলো দেখছিলেন আর ওনার চোখে জল দেখলাম। উনি বললেন চার্লি তুমি খুব ভালো মানুষ একদিন তুমি সবাইকে দেখিয়ে দেবে তুমিও কত কিছু করতে পারো। আমি জানতে চাইলাম আপনি কাদছেন কেন। উনি বললেন ওনার চোখে কিছু পরেছে। আমি যেন সবাইকে আমার মতো ভালো না ভাবি। মিস কিনিয়ান বললেন ভগবান আমাকে অনেক কিছুই দেননি কিন্তু যেটুকু দিয়েছেন আমি তা অনেকের থেকে অনেক ভালো করে ব্যবহার করতে পারি। আমি বললাম আমার বন্ধুরা খুব ভালো ওদের অনেক বুদ্ধি ওরা আমার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি। মিস কিনিয়ান চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে চলে গেলেন।

 

এপ্রিল ১৬

আজ, আমি কমা দিতে, শিখেছি। কমাটা, (,) একদম পিরিয়ডের (.) মত দেখতে, কিন্তু, একটা লেজ আছে, মিস কিনিয়ান, বলেছেন, কমা খুব দরকারি, লেখার জন্যে, ভুল জায়গায়, কমা দিলে, কারো চাকরি, চলে যেতে পারে, অনেকের টাকা লোকসান, হয়ে যেতে পারে, আমার কোন টাকা, নেই, ভুল কমা, দিলে আমার টাকা, হারাবে কি করে,

     যাই হোক, সবাই কমা দেয়, তাই আমিও, কমা দেব,

 

এপ্রিল ১৭

এহ, আমি কমার ব্যবহার একেবারেই বুঝতে পারিনি। যতিচিহ্নের ব্যবহার শিখতে গেলে আমাকে আরো পড়তে হবে। মিস কিনিয়ান বলেছেন আমাকে আরো বড় বড় শব্দ ডিকশনারি থেকে খুঁজে মুখস্ত করতে হবে। লেখার মধ্যে এই অচেনা শব্দগুলি আরো বেশি করে আনতে হবে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরে মনে হচ্ছে আমি শব্দগুলো মনে রাখতে পারছি। আজকে দু একবার দেখলেই শব্দগুলো মনে থেকে যাচ্ছে। কমাটাও একটা যতিচিহ্ন, ঠিক যেমন একটা পিরিয়ড। মিস কিনিয়ান বলেছেন এরকম আরো অনেক চিহ্ন আছে আর তার ব্যবহার সব আলাদা।

     সবগুলো যতিচিহ্ন একসাথে মিশিয়ে” লিখতে হবে! মিস কিনিয়ানকে বলেছেন, এটাতো খুব সহজ ব্যাপার; আমি এখনই লিখতে পারছি! নিয়মটাও শিখে যাব এরকমভাবেঃ মিস কিনিয়ান, খুব ভালো! আমায় সব কিছু’ কি সুন্দর শিখিয়ে দেন? ওনার খু’ব বুদ্ধি! (যতিচিহ্নের, ব্যবহার; খুব মজার!) 

 

এপ্রিল ১৮

আমি একটা আস্ত গাধা! আমি ব্যাকরণ কিছুই বুঝিনি। কালরাতে একটা ব্যাকরণের বই পেয়েছি। ওখানে সব লেখা আছে কোথায় কিভাবে কোন যতিচিহ্ন লিখতে হয়। এবার বুঝেছি মিস কিনিয়ান আমায় কি বলছিলেন। আমি মাঝরাতে উঠে, পুরো বইটা পড়ে শেষ করেছি।

     বইটা পড়ার পরে আমি পুরোনো রিপোর্টগুলো আবার পড়ে দেখলাম। কি যাচ্ছেতাই লিখেছি আমি। যেমন বাজে বানান আর তেমন ভুল ভাষার ব্যাবহার! আমি মিস কিনিয়ানকে বললাম রিপোর্টগুলো ঠিক করে লেখা দরকার। কিন্তু ডক্টর নেমুর বলেছেন এগুলো দেখে আমি বুঝতে পারবো আমার বুদ্ধি কতটা বেড়েছে। মিস কিনিয়ান বলেছেন আমি খুব তাড়াতাড়ি সব শিখে ফেলছি।

     এখন মিস কিনিয়ানের ক্লাসের পরে আমি রোজ আলজারননের সাথে খেলতে যাই। এখন আর আমাদের পরীক্ষা দিতে হয়না।

 

এপ্রিল ২০

আমার অসুস্থ লাগছে। নাহ শরীর খারাপ হয়নি, কিন্তু আমার পেটের মধ্যে যেন কেউ একটা ঘুষি মেরেছে আর বুকের মধ্যেটা জ্বলে যাচ্ছে। ঘটনাটা লিখে রাখা উচিত হবে কিনা বুঝতে পারছিলামনা, কিন্তু বিষয়টা জরুরী তাই অনেক ভেবে লিখে ফেলছি।

     গত রাতে জো কার্প আর ফ্র্যাঙ্ক রেইলি আমাকে আবার একটা পার্টিতে ডেকেছিল। পার্টিতে কারখানার অনেক চেনা লোক আর শহরের মেয়েরা ছিল। আগেরবারে মদ খেয়ে ফেলে একদম সামলাতে পারিনি, তাই জো-কে আগেই বলেছিলাম আমি মদ খাবো না। ওরা আমায় একটা সোডা দিয়েছিল শুধু, খেতে কেমন যেন লেগেছিল কিন্তু আমি কিছু মনে করিনি।

     আমরা খুব মজা করছিলাম। জো আমায় বলল এলিন নামের মেয়েটা আমার সাথে নাচতে চায়, ও আমাকে কয়েকটা নাচের স্টেপও দেখিয়ে দেবে। আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নাচছিল না, কিন্তু তবুও কারো না কারো পায়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে আমি বারবার পড়ে যাচ্ছিলাম।

     জো-এর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ও প্রাণপণে হাসি চাপার চেষ্টা করে যাচ্ছে। “লোকটা পুরো জোকার”, একটা মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলছিল। ফ্র্যাঙ্ক আরেকটি মেয়েকে বলল, “আগেরবারে ওকে কফি আনতে পাঠানোর থেকেও বেশি মজা হল এবার!”

     “দেখ দেখ, কথাগুলো শুনে ওর মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে!”

     “আরে চার্লি নাকি লজ্জা পাচ্ছে!! হাআহাআ ই কান্ড!”

     “এই এলিন, চার্লিকে তুমি কি যাদু করলে? ওকে আমাদের কথায় লজ্জা পেতে কেউ কোনদিন দেখিনি!”

     সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল আর মজা করছিল! আমার নিজেকে নগন মনে হচ্ছিল ওদের ছুরির মত ধারালো কথাগুলোর মাঝে, আমি পালানোর পথ খুঁজছিলাম। আমি কোনরকমে ঘরটা থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমেই বমি করে ফেললাম! আমি কখনো ভাবতেই পারিনি ফ্র্যাঙ্ক আর জো আমাকে নিয়ে মজা করার জন্যেই শুধু আমার সাথে কথা বলে!

     এখন আমি বুঝতে পারছি, “তুই একটা চার্লি গর্ডন!”, কথাটার মানে কি।

     আমি লজ্জায় মাথা তুলতে পারছি না।

 

প্রোগ্রেস রিপোর্ট ১১

এপ্রিল ২১

আমি এখনো কারখানায় যাচ্ছি না। আমার বাড়িওলি মিসেস ফ্লিনকে দিয়ে ফোন করিয়ে মিস্টার ডোনোগানকে বলেছি আমার খুব শরীর খারাপ। মিসেস ফ্লিন আজকাল আমার দিকে কেমন ভয়ে ভয়ে তাকায়, যান কোন অচেনা মানুষকে দেখছে।

     একদিক থেকে এটা ভালোই হয়েছে, আমি বুঝতে পেরেছি লোকে এতদিন আমায় নিয়ে ঠাট্টা তামাশাই করতো। আসলে আমি এতোই বোকা ছিলাম যে আমার বোকামো গুলোও আমি ধরতে পারতাম না। আর লোকে সেটাকেই খুব পছন্দ করে, একটা বোকা লোক যে কুব সাধারণ ব্যাপারগুলোও যে তাদের মত করতে পারেনা, এটাই খুব মজার ব্যাপার।

     যাইহোক আমি আর বোকা নেই। আমি এখন বানান আর ব্যাকরণ সব ঠিক লিখতে পারি। ডিকশনারির শক্ত শব্দগুলোও এখন আমার মনে থাকে। মিস কিনিয়ান বলেছেন আমি খুব তাড়াতাড়ি পড়ি, আর পড়ার সাথে সাথেই সেই সবকিছুই আমার মনের মধ্যেও থেকে যায়। আমি চোখ বুঝলে ওই পাতাগুলোর ছবি যেন চোখের সামনে দেখতে পাই।

     ইতিহাস, ভূগোল আর অংকের পাশাপাশি এখন আমি বিদেশী ভাষাও শেখা শুরু করেছি। ডাক্তার স্ট্রাউস আমায় ঘুমের মধ্যে শোনার জন্যে আরো নতুন কয়েকটা টেপ দিয়েছেন। আমি সচেতন আর অবচেতন মনের ব্যাপারে আরো জানতে চাই। স্ট্রাউস বলেছেন পরের সপ্তাহ থেকে আমি কলেজের বই পড়তে পারব। তখন উনি আমাকে মনোবিজ্ঞানের উপর একটা বই পড়তে দেবেন।

     আমি এখনো সেই রাতের ঘটনাটার জন্যে সবার উপরে রেগে আছি। স্ট্রাউস বলেছেন আমি যখন বুদ্ধিমান হব তখন আমার আই কিউ ৬৮ এর তিনগুণ হয়ে যাবে। তখন আর কেউ আমায় নিয়ে হাসবে না আর আমি সবার বন্ধু হতে পারব।

     আই কিউ জিনিসটা কি সেটা আমায় কেউ ঠিক করে বলতে পারল না। নেমুর বলে ওটা দিয়ে নাকি মাপা যায় যে আমার কতটা বুদ্ধি। কিন্তু স্ট্রাউস বলেন আই কিউ বলে তোমার বুদ্ধি কতটা বাড়ানো সম্ভব, ঠিক যেমন ল্যাবরোটারির মাপার পাত্রের গায়ে দাগ দেওয়া থাকে। কিন্তু এর পরেও পাত্রটা তোমাকেই ভরতে হবে।

     কিন্তু বার্ট বলে ওরা দুজনেই ভুল, “চার্লি, আই কিউ দিয়ে তুমি এতোদিন যা শিখেছ, সেইটুকুই মাপতে পারবে, ওছাড়া ওটা আদৌ কোন কাজের নয়। গোল্লায় যাক আই কিউ, আমি শুধু জানি আর কয়েকদিন পরে আমার আই কিউ নাকি ২০০ এর থেকেও বেশি হবে। তবে আই কিউ কি তাই যদি ওরা না জানে তবে কি করে সেটা ওরা মাপতে পারে?

 

 এপ্রিল ২২

       আজ আমার রোরশ্যাক টেস্ট হল। কি আশ্চর্য ব্যাপার, এটা তো সেই কালির দাগ দেওয়া কাগজের পরীক্ষা। আমি আগের বারও কিছুই বলতে পারিনি! কি ছবি যে লুকিয়ে আছে এর মধ্যে কে জানে। এবারো না পারলে সবাই আমাকে বোকা বলবে।

     “চার্লি, আগেরবার এই পরীক্ষাটা দিয়েছিলে, মনে আছে?” – এই লোকটাই আগের পরীক্ষা নিয়েছিল।

     “তা আর থাকবে না?”, আমি চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম।

     লোকটা একটু অবাক হল। “চার্লি, এই কালির দাগের মধ্যে লোকে অনেক রকম ছবি দেখতে পায়। তুমি বল দেখি কি দেখতে পাচ্ছো বলে  মনে হচ্ছে?”

     কিন্তু, আগের বারে তো এরকম কথা বলেনি লোকটা! “তার মানে এই কালির দাগের মধ্যে কোন ছবি লুকিয়ে নেই? আগেরবার আপনি বলেছিলেন এর মধ্যে একটা ছবি লুকানো আছে আর সবাই সেটা দেখতে পায়।”

     আমি ভুল বুঝেছিলাম, লোকটা আমায় আবার পুরোটা বুঝিয়ে বলল, আর শেষ পর্যন্ত আমি বুঝতে পারলাম যে আমি এতোই বোকা ছিলাম পরীক্ষাটা বুঝতেই পারিনি।

     লোকটা এক এক করে কার্ডগুলো দেখাচ্ছিল। একটা দেখতে একজোড়া বাদুড়ের মতো, মাঝে একটা ফলকে ঠোকরাচ্ছে, অন্য একটা দেখে মনে হচ্ছে একটা দুটো লোক তরোয়াল নিয়ে লড়ছে। আমি অনেক মজার মজার ছবি দেখতে পাচ্ছিলাম আর বলে যাচ্ছিলাম। লোকটা গম্ভীর মুখে একটা কাগজে কি যেন সব লিখে যাচ্ছিল। আমি একঝলক দেখতে পেলাম লেখা আছে,

     “WF+A DdF-Ad orig. WF-A SF+obj”

     এই পরীক্ষাটার কোন অর্থই হয়না! আমি তো ইচ্ছে করলেই সবটাই বানিয়ে বানিয়ে বলতে পারতাম, লোকটা ধরতেই পারতনা কিছু। নাহ, পরের দিন স্ট্রাউসের থেকে মনোবিজ্ঞানের বইটা নিতেই হবে।

 

এপ্রিল ২৫

আজ আমি মিস্টার ডোনোগানকে বলেছি, কারখানার মেশিনগুলো নতুনভাবে সাজালে কাজ অনেক তাড়াতাড়ি হবে। পরে শুনলাম এই নতুন নক্সাটায় নাকি ডোনোগানের হাজার হাজার ডলার লাভ হবে প্রতি বছর। ডোনোগান খুব খুশি হয়ে আমায় একশো ডলার বোনাস দিয়েছে। আমি জো আর ফ্র্যাঙ্কিকে আমার সাথে লাঞ্চ খেতে ডাকলাম। ওরা কেউ যেতে চাইলো না। নতুন চার্লিকে মেনে নিতে সবারই একটু সময় লাগবে। কারখানায় আজকাল সবাই আমায় এড়িয়ে চলে। আমার খুব একা লাগে।

 

 এপ্রিল ২৭

আজ আমি মিস কিনিয়ানকে আগামীকাল আমার সাথে ডিনার খাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। প্রথমে মিস কিনিয়ান রাজী হচ্ছিলেন না। তারপর আমি ডাক্তার স্ট্রাউসের থেকে অনুমতি নেবার পরে আর না করেননি। আজকাল নেমুর আর স্ট্রাউস খুব ঝগড়া করেন। নেমুর বলে এক্সপেরিমেন্ট আর আইডিয়া সব নেমুরের আর স্ট্রাউস বলে অপারেশানের উপায় আর অপারেশন দুটোই স্ট্রাউস করেছে, তাই এই আবিষ্কারে কৃতিত্ব দুজনেরই সমান। স্ট্রাউস বলে একদিন হাজার হাজার নিউরোসার্জন এই উপায়েই সবার চিকিৎসা করবে।

     ডাক্তার নেমুর এই মাসের শেষেই সব পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে দিতে চান। কিন্তু স্ট্রাউস বলছেন আরো অপেক্ষা করে তারপরেই ফলাফল প্রকাশ করা উচিত। স্ট্রাউস বলছিলেন নেমুর নাকি প্রিন্সটোনের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হবার জন্যে তাড়াহুড়ো করে সব ফল প্রকাশ করতে চাইছেন। নেমুর বললেন স্ট্রাউস নাকি তার আবিষ্কার চুরি করে নিজের নামে চালানোর চেষ্টা করছেন।

     আমি দরজার আড়াল থেকে এসব শুনেছিলাম। আমি যেন এই প্রথমবার দুজনকে চিনতে পারলাম। বার্ট একবার আমায় বলেছিল নেমুরের বউ নাকি ওনাকে সবসময় খোঁটা দেয় উনি এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে খুব বিখ্যাত হতে পারেনি বলে।

     স্ট্রাউস কি সত্যি নেমুরের গবেষণায় ভাগ বসাতে চাইছে?

 

এপ্রিল ২৮

মিস কিনিয়ান যে এতো সুন্দরী এটা আগে কেন আমার চোখে পড়েনি? ওনার বাদামী টানা টানা চোখ আর ঢেউ খেলানো ঘাড় অবধি বাদামী চুলের থেকে আমি চোখ ফেরাতে পারিনা। মিস কিনিয়ানের বয়স নাকি মাত্র চৌত্রিশ বছর! আগে আমার মনে হত উনি বোধহয় অসম্ভব জ্ঞানী এক মধ্যবয়স্ক মহিলা। এখন যত দিন যাচ্ছে কিনিয়ানের যেন বয়স কমে যাচ্ছে আর উনি আরো সুন্দরী হচ্ছেন।

     ডিনারে আমারা অনেক কথা বললাম। কিনিয়ান বললেন আমি আর কিছুদিনের মধ্যেই ওনার থেকে অনেক বেশি জেনে যাব। “চার্লি তোমার বুদ্ধি আমার থেকে অনেক বেশি। আমি যতক্ষণে দু-তিনটে লাইন পড়ি তখন তুমি পুরো পাতাটা মুখস্ত করে ফেলো। তোমার গল্পের প্রতিটা লাইন মনে থাকে।“

     আমি হাসছিলাম, “আমার এখনো নিজেকে বুদ্ধিমান লাগে না। এখনো অনেক কিছু আমি পড়ে বুঝতে পারিনা।“

     কিনিয়ান একটা সিগারেট বের করলেন আর আমি সেটায় অগ্নিসংযোগ করলাম। “চার্লি, ধৈর্য ধরো। লোকে সারা জীবনে যা শেখে তা তুমি একটা সপ্তাহে শিখছো এখন। তুমি একটা বিরাট স্পঞ্জের মতো তোমার চারপাশ থেকে জ্ঞান আহোরণ করছো। এরপর তুমি সেই জ্ঞানবিন্দুগুলির মধ্যে সম্পর্কস্থাপন করতে পারবে। তুমি দেখবে কিভাবে বিভিন্ন বিষয়গুলো একে অন্যের সাথে যুক্ত। চার্লি, তুমি একটা সুউচ্চ মইএ চড়া শুরু করেছ, যত উপরে উঠবে তত আরো দূর পর্যন্ত দেখতে পাবে।“

     “আমার সিড়িতে চড়া শেষ হয়ে গেছে চার্লি। আমি আর নতুন কিছু শিখতে পারব না। কিন্তু তুমি সবে শুরু করেছ, তুমি এখনো অনেক অনেক উপরে উঠবে, কত নতুন অজানা জগত খুলে যাবে তোমার চোখের সামনে।“, কিনিয়ান শুকনো হাসলেন, “শুধু… শুধু আশা করি… ভগবান যেন না করেন –“

     “কি?”

     “নাহ, কিছু না চার্লি, আমি আশা করি তোমাকে অপারেশনটা করতে বলে আমি ভুল করিনি।“

     আমি হেসে ফেললাম, “ভুল কেন হবে? দেখুন আমি সত্যিই বুদ্ধিমান হয়ে গেছি। আর আলজারননও এখনো বুদ্ধিমান আছে। কিছুই হবে না।“

     আমরা বাকি সময়টা চুপ করে বসে রইলাম। বৃদ্ধ মানুষেরা যেমন মৃত্যুর কথা ভাবতে চায়না সেরকমই আমিও এই সম্ভাবনাটির কথা মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছিলাম। তবে আমি আগেই জানতাম কিনিয়ানের ক্লাস আর আমায় করতে হবে না। ওর সাথে আর দেখা হবে না ভাবলেই আমার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

     আমি কিনিয়ানকে ভালবেসে ফেলেছি যে।

 

 প্রোগ্রেস রিপোর্ট ১২

এপ্রিল ৩০

ডোনোগানের প্লাস্টিকের বাক্স তৈরির কোম্পানির কাজ আমায় ছেড়ে দিতে হল। মিস্টার ডোনোগান বলেছেন আমি কাজ ছেড়ে দিলেই সবথেকে ভালো হবে সবার। সবাই আমাকে এতো ঘেন্না করছে কেন? কি করেছি আমি?

     ডোনোগান আমায় একটা পিটিশান দেখালেন। কারখানার আটশো একচল্লিশ জনের মধ্যে একজন বাদে সবাই সই করেছে। একবার চোখ বুলিয়েই বুঝলাম ফ্যানি গিডিয়ান বাদে সবাই চায় যেন আমায় চাকরি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

     জো আর ফ্র্যাঙ্ক আমার সাথে কথা বলছে না। ফ্যানির কাছে গিয়ে কথা বললাম ওর সাথে। ওকে অনেক চাপ দেওয়ার পরেও ও পিটিশানে সই করেনি। “দেখো চার্লি, আমার মনে হয়েছিল তোমাকে চাকরি থেকে তাড়ানোটা অন্যায় তাই আমি সই করিনি। কিন্তু এটাও বলি, তুমি সেই পুরোনো সিধেসাধা সবার প্রিয় চার্লি নও। তুমি অনেক পালটে গেছ, অনেক চালাক হয়ে গেছ হঠাত। আর এইভাবে চালাক হওয়া ভগবানের চোখে ঠিক নয় চার্লি।“

     “কিন্তু কেন ফ্যানি? আমি তো শুধু আরো বুদ্ধিমান হতে চেয়েছি, আর অনেক কিছু জানতে আর শিখতে চেয়েছি। জ্ঞান আহরণে পাপ হবে কেন আমার?”

     হাতের কাজ সারতে সারতে ফ্যানি বলল, “স্বর্গের বাগানে ইভ কিন্তু শয়তান সাপের কথা শুনেই জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়েছিল। সে যে নগ্ন এই চিন্তাটাই তার সর্বনাশ করে, আর সেই অভিশাপ আজও আমরা বয়ে নিয়ে চলেছি।“

     আবার আমি আজ লজ্জায় মাথা নিচু করে কারখানা থেকে বেড়িয়ে গেলাম। আমি যখন বোকা ছিলাম ওরা আমাকে নিয়ে হাসত, আমার পিছনে লাগত আমার বোকামির জন্যে। আর এখন ওরা আমার বুদ্ধির জন্যে আমার জ্ঞানের জন্যে আমায় ঘেন্না করে! কি চায় ওরা আমার থেকে!

     আমি এখন একেবারেই একা, কোন বন্ধু নেই আমার।

 

মে ১৫

ডাক্তার স্ট্রাউস আমার উপর খুব রেগে গেছেন। গত দু সপ্তাহ আমি কোন রিপোর্ট লিখিনি। আমি বলেছি পড়াশুনো নিয়ে এই কদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম। এছাড়াও অতো আস্তে আস্তে লেখালেখি আমার সময়ের অপচয় বলেই মনে হয়। স্ট্রাউস বললেন হাসপাতাল যখন আমাকে মাস মাইনে দিয়ে রেখেছে তখন এইটুকু আমার করাই উচিত। উনি আমার জন্যে একটা টাইপ রাইটার কিনে দিয়েছেন। এতে আমার সুবিধেই হয়েছে, আমি এখন মিনিটে প্রায় নব্বইটা শব্দ টাইপ করতে পারি। অতিরিক্ত সময়ে অনেক বেশি পড়াশুনা আর চিন্তা করতে পারছি।

     যাই হোক, গত দুই সপ্তাহের সব ঘটনা লেখার চেষ্টা করছি। আমি আর আলজারনন আমেরিকার মনোগবেষনা কেন্দ্রের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর গবেষকদের সামনে দাড়িয়েছিলাম। নেমুর আর স্ট্রাউস আমাদের উপর করা সব পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরলেন সবার সামনে। গবেষক মহলে চাঞ্চল্য পড়ে গেছে, নেমুর আর স্ট্রাউস আমাদের উপর খুব খুশি।

     নেমুরের বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি। লোকটিকে আমি প্রতিভাবান ভাবতাম, কিন্তু এখন দেখছি মোটেও তা নয়। হ্যাঁ বুদ্ধিমান তো বটেই, কিন্তু ও চায় লোকে ওকে জিনিয়াস ভাবুক। নেমুর সেই জন্যেই আর দেরী হবার আগেই সব ফল প্রকাশ করতে চাইছিল, পাছে অন্য কেউ আরো ভালো কোন এক্সপেরিমেন্ট করে বসে।

     স্ট্রাউস নেমুরের থেকে প্রায় দশ বছরের ছোট, আর ওকে সত্যিই জিনিয়াস বলা যায়। কিন্তু উনি বড্ড কম জানেন, একজন নিউরোসার্জেনের পক্ষেও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে আরো বেশি জানা উচিত। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম যখন দেখলাম স্ট্রাউস শুধুমাত্র ল্যাটিন, গ্রিক আর হিব্রু জানেন ইংরেজি ছাড়া! এছাড়া অংকের ব্যাপারে ক্যালকুলাসের থেকে বেশি জটিল উনি কিছুই জানেন না। এখন কেন যেন মনে হচ্ছে উনি একটা মুখোস পড়ে আমায় ঠাকাচ্ছিলেন এতোদিন। যাদেরই আমি চিনি সবাই যেন তাদের চরিত্রের এক একটা দিক লুকিয়ে রেখেছিল আমার কাছ থেকে।

     নেমুরের সাথে আমি কিছু আলোচনা করতে গেলেই উনি সরে যান সেখান থেকে। স্ট্রাউস বলে নেমুর আমাকে ভয় পায়, এটা ওর হীনমন্যতা একধরনের। আমি আগে এতে রেগে যেতাম আর ভাবতাম নেমুর আমাকে পাত্তা দেন না। আমি কি করে জানবো যে নেমুরের মতো এতো অভিজ্ঞ মনোবিদ হিন্দুস্থানি আর চাইনিজদের কাজ নিয়ে কিছুই জানেন না! ওনার কাজের জগতে আজ ইন্ডিয়া আর চায়না সবথেকে এগিয়ে আছে!

     আমি স্ট্রাউসকে জিজ্ঞাসা করলাম, নেমুর যদি রাজামূর্তির কাজের কথা নাই জানে তাহলে সে কি করে রাজামূর্তির দাবীর সামনে নিজের এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল তুলে ধরবে? ডাক্তার স্ট্রাউসের মুখভঙ্গী দেখে আমার দুটো কথা মনে হল – হয় উনি নেমুরকে ইন্ডিয়ায় আমাদের কাজের যে সমালোচনা হচ্ছে সেব্যাপারে কিছু বলতে চান না অথবা উনি নিজেও সে ব্যাপারটা জানেন না! আমাকে ভবিষ্যতে খুব ভেবে চিন্তে এদের সাথে কথা বলতে হবে।

 

মে ১৮

আজ আমার খুব বিরক্ত লাগছে! আমি অনেকদিন পরে কাল রাতে কিনিয়ানের সাথে দেখা করলাম। আমি খুব সচেতন ভাবে আমাদের কথাবার্তা থেকে কোনরকম বৌদ্ধিক আলোচনাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম, যাতে আমার কথা বুঝতে কিনিয়ানের কোন অসুবিধা না হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে সে বোকার মত প্রশ্ন করে বসল যে ডরবারম্যানের ফিফথ কন্সার্টোর সমতূল্য গাণিতিক বৈপরীত্য বলতে আমি কি বোঝাতে চাইছি। যতবার আমি সেটা কিনিয়ানকে বোঝাতে যাচ্ছিলাম ও খালি হাসছিল। আমার বেশ রাগ হচ্ছিল প্রথমে, তারপর দেখলাম আমি যা কথাই বলতে যাই কিনিয়ান কোনটাই বুঝতে পারছেনা। আমি সাধারণ মানুষের সাথে কথা কি করে বলতে হয় সেটাই ভুলে গেছি! আমাকে এই ব্যাপারে ভ্রোস্টাডের ভাষার অগ্রগতির স্তরের সমীকরণগুলো আবার পড়ে দেখতে হবে। ভগবানের অসীম দয়া যে আমায় সঙ্গ দেবার জন্যে আমার বই আর গানের রেকর্ডগুলো আছে। আমি ঘর থেকে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছি।

 

মে ২০

আমার পাড়ার যে রেস্তোরায় আমি রোজ রাতে খাই, সেখানে একটা নতুন ছেলে বাসন ধোয়ার কাজ নিয়েছে। ছোকরার বয়স বছর ষোল হবে, না খেতে পাওয়া বুদ্ধিহীন চেহারা, দোকানের কাজটা পেয়ে বর্তে গেছে বোঝাই যায়। আমার নজর ছেলেটার উপর গেল ঝনঝন কাঁচের প্লেট ভাঙ্গার শব্দে। ছেলেটা ভয়ে কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে, সামনে ভাঙ্গা প্লেটের টুকরো ছড়িয়ে চারদিকে। খাবারের বেঞ্চিগুলো থেকে লোকজনের সরস মন্তব্য ভেসে আসছিল, “গেঁয়ো ভুত কোথাকার!”, “কোথাথেকে জোটে এরা!”, “এইবার বুঝবে মজাটা, চাকরি করতে আশা বেরিয়ে যাবে!”, ইত্যাদি। এইসব কথার মাঝে দোকানের মালিককে দৌড়ে আসতে দেখে ছেলেটা একেবারে ঘাবড়ে গেল। ভয়ের চোটে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে থরথর করে কাঁপতে লাগলো ছেলেটা, এই বুঝি মালিক ঝাঁপিয়ে পড়লো তার উপর।

     “অনেক হয়েছে! এবার দয়া করে কাঁচগুলো পরিষ্কার করে বাকি প্লেটগুলো ধোয়া শুরু করো। ঝ্যাঁটাটা রান্নাঘরের পাশে রাখা আছে।“

     একগাল হেসে ছেলেটা ঝ্যাঁটা নিয়ে এসে মহানন্দে ঝাড় দেওয়া শুরু করলো।

     “এই খোকা, তোর পিছনে একটা টুকরো থেকে গেলও যে!”

     “আরেকবার কিছু প্লেট ভাঙ দেখি, বেশ মজা হলো।“

     “ব্যাটা এতোই বোকা যে ওর পক্ষে প্লেট ধোয়ার থেকে প্লেট ভাঙ্গা অনেক সহজ।“

     ছেলেটির বোধহীন চোখদুটো পরপর আমাদের উপর ঘুরে চলেছিল। তারপর আস্তে আস্তে আয়নার মত সে আমাদের ব্যাঙ্গের হাসিটা শুষে নিয়ে আমাদের সাথে গলা মিলিয়ে বোকার মতো হাসতে শুরু করলো, বুঝতেই পারছিলাম মজাটা যে তাকে নিয়েই হচ্ছে সেটা তার মোটা মাথায় ঢোকেনি। ছেলেটার বড় বড় চোখের বুদ্ধিহীন চাহনিই বুঝিয়ে দিচ্ছিল সে মানসিকভাবে বেশ কিছুটা পিছিয়ে আছে বাকিদের থেকে।

     আমিও কখন যেন সবার সাথে গলা মিলিয়ে হাসতে শুরু করেছিলাম।

     হঠাত আমার খুব রাগ ধরলো নিজের উপর। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “বাচ্চাটার পিছনে লাগা বন্ধ করো! ও যে তোমাদের মজা বুঝতে পারছে না এতে ওর কোন দোষ নেই। কিন্তু ভগবানের দোহাই, ও তো আমাদের মতোই একটা মানুষ!”

     সবাই চুপ করে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। আমি খাবারের থালাটা সরিয়ে দিয়ে দাম চুকিয়ে রেস্তোরাঁটা থেকে বেড়িয়ে গেলাম। এরকমভাবে সবার সামনে চিৎকার করার জন্যে মনে মনে নিজেকেই গালি দিচ্ছিলাম। কেনো জানিনা আমার নিজের আর ছেলেটার, দুজনের উপরেই খুব রাগ আর লজ্জা হচ্ছিল।

     কি করে একজন সৎ কর্তব্যপরায়ন মানুষ এটা করতে পারে? যে জন্ম থেকেই কম বুদ্ধি নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে, তাতে তার কি দোষ আছে অথচ মানুষ তাকেই এভাবে অপমান কেন করে? আমিই বা একটু আগে কি করে ছেলেটাকে অপমান করলাম?

     আমার  মনে পড়ল, আমার নিজের একটা পুরোনো ছবি আমি দেওয়াল থেকে সরিয়ে আলমারিতে লুকিয়ে রেখেছি। আমি ভুলেই গেছিলাম আমিও একদিন এরকম বোকা ছিলাম, ছেলেটা আজ আবার আমায় মনে করিয়ে দিল। এর থেকে কষ্টের কি আর কিছু হয়?

     আমি তবে এরকমই ছিলাম, আমি কোনদিন বুঝতে পারিনি। এমনকি এত বুদ্ধিমান আর এতো পড়াশুনো করার পরেও আমি বুঝিনি, ভাবিনি আমি এরকমই ছিলাম।

     এখন আমি আমার অতীতটাকে চিনিতে পারছি। এই শিক্ষাটা আমার দরকার ছিল। আমি ঠিক করেছি আমার এই বুদ্ধিমত্তা, এই জ্ঞান, সমস্তই নিয়জিত করবো কৃত্তিমভাবে মানুষের বুদ্ধি বাড়ানোর জন্যে। আমি ছাড়া কেই বা এই কাজের জন্যে সবথেকে উপযুক্ত? আমিই একমাত্র এই দুই পৃথিবীর সন্তান। ওই ছেলেটিতো আমার মতোই একজন মানুষ। আমার বুদ্ধিমত্তার উপহার আমি ছড়িয়ে দেব সবার মধ্যে।

     আমার মাথার মধ্যে এখনি অনেক নতুন অপারেশনের পদ্ধতির চিন্তা ঘুরছে, আমি কালকেই স্ট্রাউসের সাথে কথা বলব। মনোজগতের অনেক দরজা এখনো খোলা বাকি, এখুনি কাজ শুরু করতে হবে।

 

প্রোগ্রেস রিপোর্ট ১৩

মে ২৩

আলজারনন আজ আমাকে কামড়ে দিয়েছে। তাহলে শেষ পর্যন্ত সময় এসেই গেল। আমি মাঝে মাঝে ওর সাথে খেলার জন্যে ল্যাবে যাই। ওকে হাতে তুলে নিতেই ও আমায় কামড় বসালো। ওকে অস্বাভাবিক হিংস্র মনে হচ্ছিল।

 

মে ২৪

বার্ট আজ আমায় বলেছে আলজারনন পালটে যাচ্ছে। সে আগের মতো সবার কথা শোনেনা। গোলকধাঁধা পরীক্ষাতেও সে খেলতে চায় না। কোন কিছু শেখার সব ইচ্ছেই তার চলে গেছে। খাওয়াও সে বন্ধ করে দিয়েছে। সবাই খুব চিন্তায় আছে আলজারননকে নিয়ে।

 

মে ২৫

আলজারননকে জোর করে খাওয়াতে হচ্ছে। ল্যাবের সবাই আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি মুখে না বললেও সবাই আমার জন্যেও চিন্তিত। আমি আর আলজারনন – আমরা দুজনে প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমান প্রানী, আলজারননের কিছু হলে সেটা আমার জন্যেও সমান বিপদজনক।

     স্ট্রাউস আর নেমুর আমায় ল্যাবে আসতে বারণ করে দিয়েছেন। ওরা ভাবছেন আমি ভেঙ্গে পড়বো। কিন্তু আমায় নিজের কাজ করে যেতে হবে। আমার হাতে আর বেশি সময় নেই। নেমুর আর স্ট্রাউসের রিসার্চ আমাকে শেষ করতেই হবে।

                                          

মে ২৯

আমাকে নিজের কাজ আর এক্সপেরিমেন্ট করার জন্যে ল্যাব দেওয়া হয়েছে। আমি সারাদিন রাত ল্যাবেই থাকছি। এখানেই একটা খাটের ব্যাবস্থা করে নিয়েছি। আমার মনে হচ্ছে আমি খুব তাড়াতাড়ি কিছু বের করতে পারব।

      

মে ৩১

ডাক্তার স্ট্রাউস বলছেন আমি বড্ড বেশি কাজ করছি। লোকে সারা জীনবনে যত কাজ করে আমি কয়েক সপ্তাহে তা শেষ করার চেষ্টা করছি। আলজারনানের এই রোগের কারণ আমায় বের করতে হবে। আমার হাতে সময় নেই, আমাকে জানতে হবে কখন আমার আলজারননের মতো অবস্থা হবে।

                                   

জুন ৪

ডক্টর স্ট্রাউসের উদ্দেশ্যে চিঠির প্রতিলিপি

প্রিয় ডঃ স্ট্রাউস,

     এই চিঠির সাথে আমি আমার গবেষণার সমস্ত ফলাফল একটি আলাদা রিপোর্টে করে জানালাম। আমার রিপোর্টের নাম – “আলজারনন-গর্ডন প্রতিক্রিয়াঃ কৃত্রিমভাবে বর্ধিত বুদ্ধিমত্তার গঠন ও কার্যপ্রণালীর উপর গবেষণা।“ আমি চাই আপনি এই রিপোর্টটি পড়ুন এবং এটি প্রকাশের বন্দোবস্ত করুন।

     আমার সমস্ত এক্সপেরিমেন্ট সমাপ্ত হয়েছে। আমি রিপোর্টে আমার সব ফর্মূলা ব্যাখ্যা করেছি, দয়া করে সেগুলিও ঠিক আছে কিনা দেখে নেবেন।

     আমি জানি এই রিপোর্ট আপনার আর নেমুরের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ( আমার কাছেও কি নয়?)। তাই আমি বার বার কোন ভুল করেছি কিনা তা খুঁজে দেখেছি। অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাই আমার কাজে কোন ভুল নেই। তাও বিজ্ঞানের স্বার্থে মানবজাতির মনোজগতের গঠন ও তাকে অংকের সাহায্যে ব্যাখ্যার মাধ্যমে বর্ধিত বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ নিয়ে আমার এই গবেষনাকে আমি সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।

     আপনি অনেকদিন আগে আমায় বলেছিলেন, কোন অসফল এক্সপেরিমেন্ট বা ভুল প্রমাণিত তত্ত্বও মানবজাতির অগ্রগতিকে সাহায্য করে। আমি এখন বুঝতে পারছি কথাটা কতটা সত্যি। আমি দুঃখিত, আমার এই গবেষণা আপনাদের মত দুজন সম্মানীয় বৈজ্ঞানিকের কাজকে ভুল প্রমাণ করবে।

     আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী,

     চার্লস গর্ডন

জুন ৫

আমার আবেগপ্রবণ হলে চলবে না। আমার গবেষণার ফলাফল খুব পরিষ্কার, তিনগুণ বুদ্ধিমত্তা বাড়ানোর সাথে আলজারননের বুদ্ধির ক্রমান্বয়ে পতনের সরাসরি যোগসূত্র আছে। নেমুর আর স্ট্রাউসের তৈরি অপারেশনের পদ্ধতির কোন রকম বাস্তবিক ব্যাবহার এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সম্ভব নয়।

     আমি আজ আলজারননের সমস্ত রিপোর্ট আবার মিলিয়ে দেখেছি। যদিও শারীরিক ভাবে ওর বয়স এমন কিছু নয়, কিন্তু ওর মস্তিষ্কের বয়স অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে হাঁটাচলা থেকে শুরু করে হরমোন আর বিভিন্ন গ্ল্যান্ডের ক্ষরণও কমে গেছে। আর দ্রুত দেখা দিয়েছে অ্যামনেশিয়া। আমার গবেষণা অনুযায়ী এরপরে আরো সব বয়সজনিত রোগের লক্ষণ দেখা দেবে।

     অপারেশনের মধ্যে দিয়ে আমাদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছিল তিনগুণ, আর সেই সাথে আলজারনন-গর্ডন এফেক্ট অনুযায়ী আমাদের মস্তিষ্ক সেই বৃধির সমানুপাতে তার কার্ক্ষমতা হারাচ্ছে।

     যতদিন আমার লেখার ক্ষমতা থাকবে আমি এই রিপোর্ট লিখে যাব। আমার জীবনে আর বেশি কোন উদ্দেশ্য নেই। তবে গণনা অনুযায়ী খুব তাড়াতাড়ি আমি ভাবনা চিন্তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলব।

     আজকেই মনে হচ্ছে আমি বড্ড আবেগপ্রবণ হয়ে জরুরী কথা ভুলে যাচ্ছি। এটাই রোগের প্রথম চিহ্ন।

 

জুন ১০

মস্তিষ্কের ক্ষয় আরো বেড়েছে। দুদিন আগে আলজারনন মারা গেছে। ল্যাবে ওর মৃতদেহের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে আমি ঠিকই বলেছিলাম। বেচারার মস্তিষ্কের ওজন কমে গেছিল ক্ষয়ের চোটে। আমার সাথেও এটাই হতে চলেছে।

     আলজারননের মৃতদেহটা আমি একটা বাক্সে পুরে বাড়ির পিছনে কবর দিয়ে এসেছি। আমি সারাদিন খুব কেঁদেছি।

 

জুন ১৫

স্ট্রাউস আজ দেখা করতে এসেছিলেন। আমি দরজা খুলিনি। এপার থেকেই ওনাকে চলে যেতে বলেছি। আমি কারো সাথে ভালো করে কথা বলতে পারছিনা। সারাক্ষণ রাগ আর বিরক্তি ঘিরে ধরছে আমায়। মাঝে মাঝে আত্মহত্যা করার কথাও ভাবছি। কিন্তু না, আমায় লিখে যেতে হবে শেষ দিন পর্যন্ত।

     এখন কোন চেনা বই হাতে নিয়েও আমি মনে করতে পারছি না কেন বইটা কয়েক মাস আগে আমার এতো ভালো লেগেছিল! জন মিলটন আমার খুব প্রিয় কবি, কিন্তু এখন প্যারাডাইস লস্ট পড়ে কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। রাগের চোটে বইটা ছুড়ে ফেলে দিলাম।

     আমি যা শিখেছি কিছুটা অন্তত আমায় মনে রাখতেই হবে। হে ভগবান, এইভাবে সবটা আমার থেকে কেড়ে নিওনা।

 

জুন ১৯

মাঝে মাঝে রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, আমি হাটতে বেড়োই। কাল আমি রাতে বাড়ি ফেরার রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলাম। একজন পুলিশ আমায় বাড়ি দিয়ে যায়। আমার কেন জানিনা মনে হচ্ছে এরকম আগেও আমার সাথে হত – বহুদিন আগে।

 

জুন ২১

আমি অনেক চেষ্টা করেও কিছু মনে করতে পারছিনা। এমনকি মাঝে মাঝে আমি কোথায় আছি তাও ভুলে যাই। আবার বিদ্যুৎচমকের মতো মনে আসে কিছু কথা, অ্যামনেশিয়ার লক্ষণ। ভীমরতির চিহ্ন – দ্বিতীয় সৈসবে ফিরে যাচ্ছি আমি। যত তাড়াতাড়ি আমি এতকিছু শিখেছিলাম, তার থেকেও তাড়াতাড়ি সব ভুলে যাচ্ছি। কিন্তু আমি এতো সহজে হার মানবো না। শেষ দেখে তবেই ছাড়বো। আজকাল রেস্তোরার ওই ছেলেটার কথা প্রায়ই মনে পড়ে। বোকা বোকা মুখ, সবাই হাসছে ওকে দেখে। নাহ, আমি পারবো না আবার ওই অবস্থায় ফিরে যেতে।

 

জুন ২২

আমি নতুন করে যা শেখার চেষ্টা করছি তাই ভুলে যাচ্ছি। কোথায় যেন পরেছিলাম এই অবস্থায় শেষ যা শেখা হয় সেটাই মানুষ প্রথমে ভুলে যায়। কি যেন বলে একে, আমায় খুঁজে দেখতে হবে, মনে পড়ছেনা।

     আলজারনন-গর্ডন এফেক্টের আমার গবেষণাপত্রটা আবার পড়ছিলাম। কিচ্ছু চিনতে পারছি না। মনে হয় অন্য কেউ যেন এটা লিখেছে। আমার হাঁটাচলায় অসুবিধা হচ্ছে। মস্তিষ্কের মোটর নিউরনগুলো কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে মনে হয়। টাইপ করছি খুব কস্ট করে।

জুন ২৩

টাইপরাইটার আর ব্যাবহার করতে পারিনা। আজ ক্রুগারের একটা বই পড়তে গেছিলাম। ভাবলাম এটা থেকে আমার রিসার্চটা বুঝতে যদি সুবিধা হয়। বইটা খুলে বুঝতে পারলাম আমি জার্মান ভাষাটা কিছুই বুঝতে পারছি না। বাকি ভাষার বইগুলো খুলে দেখলাম। কিছুই নেই, সব হারিয়ে গেছে।

 

জুন ৩০

গত সপ্তাহে আমি আর কিছু লেখার সাহস পাইনি। আমার বেশির ভাগ বই এখন আমি আর পড়তে পারিনা। অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেও আমি এগুলো পড়েছি!

     তবু আমায় লিখে যেতেই হবে। কেউ কোনদিন এই লেখা পরে বুঝতে পারবে আমার কি হয়েছিল। কিন্তু এইভাবে লেখা খুব কঠিন। আমায় বারবার ডিকশনারি দেখে বানান আর শব্দ মনে করতে হচ্ছে।

     স্ট্রাউস রোজ আমায় দেখতে আসে। কিন্তু আমি ওর সাথে কথা বলতে চাইনা। আমি জানি ও নিজেকে দায়ী করছে আমার এই অবস্থার জন্যে, ওরা সবাই নিজেদের দায়ী করছে। কিন্তু আমি কাউকে দোষ দিই না। আমি জানতাম এটাই হতে পারে। কিন্তু এতো কষ্ট! হায় ভগবান।

 

জুলাই ৭

দিনগুলো কোথা দিয়ে চলে যাচ্ছে আমি জানিনা। লোকে চার্চে যাচ্ছে দেখে বুঝলাম আজ রবিবার। আমি সারা সপ্তাহ বিছানায় শুয়েছিলাম। মাঝে মাঝে মিসেস ফ্লিন কিছু খাবার এনে দেন, তখন খাই। আমার যেন কি করার কথা ছিল, কিছুই মনে পড়েনা। মনে করার থেকে এইভাবে বিছানায় শুয়ে থাকা হয়ত অনেক সহজ।                       

     আজকাল বাবা মার কথা খুব মনে পড়ে। আমার কাছে একটা ছবি আছে ওদের। সমুদ্রের সামনে আমি বাবা আর মা। কিন্তু চোখ বুঝে ভাবলে খালি মনে পড়ে বাবা খুব মদ খেত আর মায়ের থেকে টাকা নিয়ে যেত। বাবার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ছিল। আমায় আদর করলে আমার সুড়সুড়ি লাগত। তারপর একদিন মা বলল বাবা নাকি মরে গেছে। কিন্তু মিল্টি কাকা বলেছিল বাবা অন্য একটা মেয়ের সাথে চলে গেছে মা কে ছেড়ে। আমি যেদিন মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম সেটা সত্যি কিনা, মা আমায় চর মেরেছিল। যাই হোক কোনটা সত্যি আমি আর জানতে পারবো না। তাছাড়া আমার খুব একটা জানার ইচ্ছেও নেই। বাবা বলেছিল আমায় গ্রামের খামারবাড়িতে নিয়ে যাবে, কথা রাখেনি, কোনদিন কথা রাখেনি…

 

জুলাই ১০

বাড়িওলি মিসেস ফ্লিন আমাকে নিয়ে খুব চিন্তায় পড়েচেন। আমায় দেখলে ওর নাকি নিজের নিষ্কর্মা ছেলের কথা মনে পড়ে। সেও নাকি আমার মতো দিনের পরদিন বিছানায় শুয়ে থাকত। আমি ওনাকে বলেচি আমার বোধহয় ফ্লু হয়েছে।

     আমি রোজ একটু করে গল্পের বই পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এক পাতা আমায় অনেকবার পরতে হয়, তারপরেও ভালো করে বুঝতে পারি না। লেখাটা আরো কথিন হয়ে উঠছে। ডিকশনারিও আর দেখতে ইচ্ছে করেনা। আমি তাই এখন থেকে সহজ করে সব কিছু লিখব।

     আলজারননের কবরে আমি প্রতি সপ্তাহে একবার করে ফুল দিতে যাই। মিসেস ফ্লিন বলে আমি পাগল, নইলে কি কেউ ইদুরের কবরে ফুল দেয়?

 

জুলাই ১৪

আবার রবিবার এসেছে। টিভিতা ভেঙ্গে যাবার পর থেকে আমার আর কিছু করার নেই। টিভি সারাবার টাকাও আমার নেই। এই মাসের ল্যাব থেকে পাওয়া চেকটা আমি বাসেই কোথাও হারিয়ে ফেলেচি।

     মাঝে মাঝেই খুব মাথা ব্যাথা করে, ওষুধে কাজ দিচ্ছেনা। মিস ফ্লিন এবার বিস্বাস করেছে যে আমি সত্যিই অসুস্ত আর আমার সেবা করার চেষ্টা করচেন। উনি খুব ভালো মানুষ।

 

জুলাই ২২

মিসেস ফ্লিন একটা ডাকটার ধরে এনেচিল কোথা থেকে। উনি ভেবেচিলেন আমি মরেই যাব এবার। আমি ডাকতারকে বললামামার শরির খুব একটা খারাপ নয় কিন্তু আমি মাঝে মাঝে সব ভুলে যাই। ওরা আমায় জিগাসা করল আমার কোন বন্ধু বা আত্তিয় আছে কিনা। আমি বলেছি আমার একটাই বন্ধু ছিল আলজারনান সে ছিল ইদুর। আমরা একসাথে পরিক্ষা দিতাম। আমি আরো বললাম যে আমি একসময় জিনিয়াস ছিলাম। লোকটা আমার সাথে এমন করে কথা বলচিল যেন আমি একটা বাচ্চা। আমার খুব রাগ হল, ও নিসচই আমাকে নিয়ে মজা করছে। আমি ওকে গালি দিয়ে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিলাম।

 

জুলাই ২৪

আমার কাছে আর কোন টাকা নেই। মিসেস ফ্লিন বলেচেন আমি গত দুমাসের ঘরভাড়া না দিতে পারলে আমায় ঘর ছেড়ে দিতে হবে। ডোনোভান সাহেবের প্লাসটিকের কোমপানি ছাড়া আমি তো আর কোন কাজ জানি না। আমি জানি ওরা আমায় নিয়ে হাসাহাসি করবে, কিন্তু আর কোথা থেকে আমি টাকা পাবো।

 

জুলাই ২৫

আমি আজ সকালে পুরোনো কিছু প্রোগেস রিপোরট দেখেছিলাম। মজা লাগল যে আমি নিজেই কি লিকেছি আর পরতে পারছিনা।

     মিস কিনিয়ান আজ আমায় দেকতে এসেছিলেন কিনতু আমি বলেছি তমায় দেখতে চাইনা। উনি অনেকখন দরজার বাইরে দারিয়ে কাদচিলেন। কিন্তু আমি দরজা খুলিনি যদি আমায় দেখে উনি হাসেন। আমি বলেচি আমার আর বুদ্ধির দরকার নেই। ওটা মিথ্যে কতা আমি মিস কিনিয়ানকে ভালোবাসি আর এখনো চাই বুদ্ধিমান হতে। কিন্তু ওর সামনে আমি যেতে পারব না এইভাবে। কিনিয়ান যাবার সময় মিসেস ফ্লিনকে ঘরভারা দিয়ে গেচেন।

     ভগবান, আমি যেন লেখা পড়া ভুলে না যাই।

 

জুলাই ২৭

মিস্তার ডোনোগান খুব ভালো মানুস। উনি আমার সব কতা মন দিয়ে সুনলেন তারপর বললেন চারলি তুমি খুব সাহসি মানুস। উনি খুব দুঃখ পেয়েচেন মনে হল।

     আমি নিচের তলায় গিয়ে ঘর ঝার দেওয়া সুরু করলাম। সবাই আমায় দেকচিল। ওরা হাসবে হয়ত কিন্তু এই কাজটা আমার দরকার। তাছাড়া আমি কয়েকদিন আগেও ওদের থেকে বেসি বুদ্দি রাখতাম হাসুক ওরা।

     একটা নতুন লোক এসে আমায় বলল চারলি তোমার নাকি অনেক বুদ্দি একটা বুদ্দির কথা বল দেখি। আমার খুব খারাপ লাগচিল। কিনতু তারপর জো এসে লোকটার জামা ধরে ওকে বলল চারলিকে আবার বিরকত করবি তো তোর ঘার ভেঙ্গে দেব। পরে ফ্রানক এসে বলল চারলি কেউ তোমায় বিরকত করলে আমাদের বলবে। আমি প্রায় কেদে ফেলেছিলাম। পরে সাপলাই রুমে গিয়ে একা একা অনেকখন কাদলাম। আমার বনধুরা খুব ভালো।

 

জুলাই ২৮

আমি একটা গাধা। আমি ভুলেই গেছি কিনিয়ান দিদিমনির ইশকুলে আমি আর পরতে যাই না আগের মত। আমি রাতে ইশকুলে গিয়ে আমার পুরোনো চেয়ারে বসেচিলাম। কিনিয়ান দিদিমনি আমায় দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে চারলস বলে ডাকল। আমার মনে পরেনা কবে কিনিয়ান দিদিমনি আমায় চারলস বলেচিলেন তাই আমি বললাম দিদিমনি আজকে আমার পরার বইটা হারিয়ে গেচে তাও আমি পরতে এসেচি। দিদিমনি কাদতে কাদতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আর সবাই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল।

     আর তারপরেই আমার অপারেসান আর বুদ্দি বারার কথা মনে পরে গেল। ইস এইবার আমি একদম চারলি গরডনের মত কাজ করেচি। দিদিমনি ফিরে আসার আগেই আমি ঘর থেকে চলে এলাম।

     তাই ঠিক করেচি আমি নিউ ইয়রক থেকে চলে যাব। আমি চাই না মিস কিনিয়ান আমার জন্নে কস্ট পাক। কারখানায় সবাই আমার জন্নে দুঃখ পাচ্চে আমি সেটাও চাই না তাই আমি এমন কোতাও চলে যাব জেকানে চারলি গরডনকে কেউ চেনেনা। কেউ জানবেনা সে একদিন খুব বুদ্দিমান ছিল আর একন সে একটা বইও পরতে পারেনা।

     আমি সাথে কিছু বই নিয়ে যাচ্ছি। আমি খুব চেস্টা করব বইগুলো পরে জদি কিছু কথাও আমার মনে পরে। আমার ঘোরার নাল আর লাকি পেনিটাও সাথে নিলাম। খুব কস্ট করব জদি একটুও বুদ্দি বারাতে পারি।

     মিস কিনিয়ান আমার জন্নে দুঃখ কর না সবাই জিবনে দুবার সুজোগ পায়না। আমি পেয়েচিলাম আর অনেক কিছু সিকেছি অনেক কিছু দুনিয়ায় আচে তাই জানতাম না সেগুলো কিছুদিনের জন্নে দেকেচি। সেই যে মলাট ছেরা নিল বইটা ছিল সেটা পরে কি ভালোই না লেগেচিল। আমি চাই আবার ওই ভালো লাগাটা পেতে। কর কিছু জানতে পারার ভালো লাগা বুদ্দিমান হবার ভালো লাগা। আমি জদি পারতাম এখুনি আবার বইগুলো নিয়ে সব এক এক করে পরে ফেলতাম। যাইহোক আমি বোদহয় পিথিবির প্রথম বোকা লোক যে বিগানের জন্যে দরকারি একটা আবিস্কার করেচিল। কি করেচিলাম সেটা মনে নেই তবে আমার মত সব বোকা মানুসদের জন্নেই সেটা করেচিলাম।

     বিদায় মিস কিনিয়ান দাকতার স্টারউস আর হাসপাতালের বাকি সবাই। দাকতার নিমুরকে বলবেন চারলি বলেচে লোকে হাসলেই সবসময় অত গমবির হয়ে না থাকতে। তাহলেই দেকবেন আপনার অনেক বন্দু হবে। মানুস আপনাকে নিয়ে হাসলেই আপনার বনদু বেরে যাবে। আমি জেকানে জাচ্চি আমারো অনেক বন্দু হবে।

     বলতে ভুলেই গেচিলাম মিস কিনিয়ান আমার বারির পিছনে বন্দু আলজারননের কবরে সময় পেলে কটা ফুল দিয়ে যাবেন…   

সমাপ্ত

 

সম্পাদক: গল্পটি প্রথমে প্রকাশিত হয়েছিল অনুবাদ পত্রিকায় ২০১৮ সালে।  

লেখক – ড্যানিয়েল কিসের জন্ম ১৯২৭ সালে আমেরিকার এক ইহুদি পরিবারে। ১৯৫০ সালে মার্ভেল সায়েন্স স্টোরিস ম্যাগাজিনে সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সময় থেকে গল্প লেখা শুরু। ফ্লাওয়ার ফর আলজারনন, ১৯৫৯ সালে প্রথমে ছোট গল্প হিসেবে প্রকাশিত হয় ম্যাগাজিন অফ ফ্যান্টাসি এন্ড সায়েন্স ফিকশনে। ১৯৬০ সালে এই গল্পটির জন্যে কল্পবিজ্ঞানের সবথেকে বিখ্যাত পুরস্কার হুগো এওয়ার্ড পান তিনি। এরপর ১৯৬৬ সালে গল্পটির উপন্যাস রূপদানের জন্যেও তাকে নেবুলা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ১৯৬৮ সালে এই গল্পের উপর নির্মিত হলিউডের ছায়াছবি চার্লি উচ্চ প্রশংসিত হয়। কিসের অন্যান্য কিছু বই হল, দ্যা টাচ, দ্যা ফিফথ স্যালি, দ্যা মাইন্ডস অফ বিলি মিলিগান ইত্যাদি। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কিস ২০১৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। 

4 thoughts on “আলজরননের জন্যে কিছু ফুল

  • September 2, 2019 at 9:57 am
    Permalink

    অনুবাদক দীপ ঘোষের মুকুটে আরেকটি পালক। আর কি বলব? জীবনেও এত ভাল কাজ দেখিনি। এই গল্পের অনুবাদ তো খুবই কঠিন কাজ। সেটাও এত ভাল আর সাবলীলভাবে করা হয়েছে যে মন ভরে গেল পড়ে।

    তবু এও বলি এ গল্প ছাপার অক্ষরে বেরোনোরও হ্যাপা অনেক। প্রুফরিডারের পক্ষে গল্পটার বানান শুধরোনো সম্ভব নয়। কারণ তাঁকে গল্পটা পুঙ্খানুপঙ্খ শুধু পড়লেই হবে না, চার্লির মনস্তত্ত্বকেও বুঝতে হবে। কোন বানান শুধরোতে হবে আর কোনটা নয় সেটা বুঝতে হবে। সেটা করা তো ভীষণই চাপের ব্যাপার।
    আবার সেটা লেখকের পক্ষেও করা খুব মুশকিল। তিনি নিজের গল্প এতবার পড়েন, যে ভুল বানান সহজেই তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়।
    যেমন, যতদূর আমার আই কিউ তা দিয়ে এই লেখারই দুয়েকটা বানান ভুল মনে হল, সেগুলোর মধ্যে একটা হলঃ
    প্রোগ্রেস রিপোর্ট ১৩ – মে ৩১ “জীনবনে”
    এখন এই বানান শুধরোন উচিত কি উচিত নয়, সেটা লেখকের অনুমতি না নিয়ে বলা খুবই মুশকিল।

    Reply
    • September 2, 2019 at 10:04 am
      Permalink

      গল্পের সাথে যে ছবিটি রয়েছে সেটির স্রষ্টা কে সেটা জানতে পারলে আরো ভালো লাগত। আলঙ্কারিকের ছবিটির জন্য একটি কুর্নিশ পাওনা হয়।

      Reply
  • September 2, 2019 at 10:00 am
    Permalink

    তলায় লেখক ও গল্প পরিচিতিটা উপরি পাওনা। সিনেমাটা নামাতে দিলুম। দেখব। ধন্যবাদ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!