একটি মথের মৃত্যু

রনিন

অলংকরণ: সুপ্রিয় দাস

১. ‘Don’t clap too hard- It’s a very old building.’

‘সভ্যতা যখন ঘুমিয়ে ছিল, আমরা প্রকৃতিকে মায়ের রূপে পুজো করতাম। পশু থেকে মানুষ হবার তাড়নায় এক সময় আমরা মাকে ভুললাম। যে সবুজে আমাদের শান্তি ছিল তাকেই দু-হাতে ছিঁড়েখুঁড়ে একসময় এই হৃদয়হীন ধূসর শহরের জন্ম দিলাম আমরা। সেই শহর আজ নখ-দাঁতে গিলে নিচ্ছে আমাদের। আমরা বিপন্ন। চারিদিকে শুধু মৃত্যুর সুর বাজছে। মরুভুমি এগিয়ে আসছে, বরফ গলছে, সমুদ্রের তলায় প্রলয় গজরাচ্ছে–যে কোনও মুহূর্তে আমরা ইতিহাস হয়ে যাব–এই চিন্তাতেই অযুত-নিযুত কোটি টাকার গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। অথচ সমাধান আমাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে উপেক্ষিত মূর্তি সেজে–প্রকৃতি। তাঁর কাছেই মিলবে এই শাপমুক্তির ফর্মুলা, প্রলয়কে জয় করার গোপন সূত্র। তাই চলুন আরেকবার তাঁর কোলে ঠাঁই নিই আমরা, শহর ভেঙে আবার বানাই জঙ্গল। ফিরে যাই আদিম দুনিয়ায়। আসুন আমরা বাঁচি আবার। মুক্ত হই রোজ রোজ এই মরার ভয় থেকে–’

     গোটা অডিটোরিয়ামের দর্শকরা হাততালি দিয়ে উঠলেন কর্নেলের আহ্বানে। আমি তো আবেগের আতিশয্যে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘কি দিলেন কর্নেল—‘, ফলস্বরূপ বাম দিক থেকে হালদারবাবুর ধারালো কনুইয়ের খোঁচা এবং ডান দিক থেকে আনা-র মোলায়েম হাতের জবরদস্ত ঘুসি খেয়ে আমার উত্তেজনা খেই হারিয়ে ফেললো।

     ওদিকে তখন আবার কর্নেল মঞ্চ মাত করতে শুরু করেছেন।

     ‘হাতে আর মিনিটদুয়েক আছে, ভারী কথা বলে আপনাদের সময় নষ্ট করব না আর, তার বদলে একটা মজার ভিডিয়ো দেখাই। এই দেখুন–‘

     কর্নেলের আঙুলের চাপে সাদা পর্দাটায় চলচ্চিত্র চালু হতেই আমার চোয়াল ঝুলে পড়ল। গোটা হলে হাসির হুল্লোড়। কি ছিল পর্দায় যাতে এমন হাসির রোল?

     উত্তরটা হল, পঁয়ত্রিশ মিলিমিটার পর্দা জুড়ে একটা মানুষের মুখ। তার মাথায় হেলমেট আর তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে একদল কাক। লোকটা ছুটছে, হাঁপাচ্ছে আর হাহাকার করছে, ‘কর্নেল, আর কতক্ষণ সময় লাগবে বলুন তো–‘, ক্যামেরাম্যান এমন হাসছে যে তার হাত কাঁপছে। আর ওদিকে কোনাকুনি শটে দেখা যাচ্ছে কর্নেলকে। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন একটি কাঠের ফোল্ডিং সিঁড়িতে। গাছের ডালে একটা খড়ের বাসা বসাচ্ছেন ধীরে সুস্থে। ‘আহা, সময় লাগবে, তুমি আরও একটু ছোট দেখি–‘ বুড়ো বলছেন।

     নিশ্চয় বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না ভিডিয়োর ছুটন্ত শিকারের পরিচয়? হ্যাঁ, ওটা আমি। আর আমার বিধ্বস্ত মুখের বিচিত্র ভাব দেখেই দেশ বিদেশের মানুষ হেসে কুটোপাটি খাচ্ছেন।

     আসলে এই ভিডিয়োটা কয়েকদিন আগেই হালদারবাবু তুলেছিলেন নিজের ক্যামেরায়। বুড়ো ঘুঘু একটি কাকদম্পতির বাসা মেরামত করছিলেন আর আমি ওই খেঁকুরে কাকগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করে হেলমেট মাথায় দৌড়োচ্ছিলাম দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে। সেই বিচ্ছিরি ছবিটাই এখন, এই মুহূর্তে চলছে একদঙ্গল শিক্ষিত প্রকৃতিবিদদের মাঝখানে। আমার অবস্থাটা বুঝুন একবার। ভাগ্যিস এক মিনিট তেইশ সেকেন্ডের মধ্যেই আমার দুর্দশা শেষ হল। হাসিতে ফেটে পড়া অডিটোরিয়ামে কর্নেল শেষ করলেন তাঁর বক্তব্য–

     ‘প্রকৃতি শুধু দেখা, শোনা আর শেখার বিদ্যালয় নয়, একটু অনুভূতি খরচ করলে প্রকৃতি আমাদের জীবন যাপনেরও অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে অবলীলায়। বন্ধুরা ‘বিদায়’ কথাটা উচ্চারণ করার আগে আমার এই হতভাগ্য যুবক সহকারীর জন্য একটু হাততালি জানাতে ভুলবেন না–‘

     আবার হাততালি। আনা আমার পিঠ চাপড়াচ্ছে আনন্দের চোটে। হালদারবাবুকে দেখলাম মুখে আঙুল ঢুকিয়ে শিস দিতে গিয়েও নিজেকে সামলালেন। কর্নেল আলোকিত মঞ্চের ওপর থেকে বিজয়ীর মতো চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন তার সামনে বসে থাকা আপামর ভক্তকুলকে। সভা শেষ হল।

 

২. ইতালির বিখ্যাত মানুষটি

আগের দৃশ্যটার ল্যাজামুড়ো যারা কিচ্ছুটি বুঝলেন না তাদের এবার একটু বুঝিয়ে বলি ব্যাপারটা।

     আসলে হয়েছে কি, মাল্টা দ্বীপের রহস্য নিয়ে বেদম গোপনীয়তা থাকা সত্বেও আনার কল্যানে কর্নেলের নাম আন্তর্জাতিক মহলে ছড়িয়ে পড়েছে হু হু করে। যেমন বোশেখ মাসের দুপুরে গেরস্তের বাড়িতে কাঁঠাল ভাঙলে গোটা পাড়ায় মিষ্টি ফলের সুবাস ছড়ায়, ঠিক তেমনি করে কর্নেলের নাম ও বিচিত্র কর্মজীবনের গল্প এখন লোকের মুখে মুখে ঘুরছে। সেই সুবাদে ইতালির এই ‘ছোট্ট‘ শহরে আমন্ত্রণ জুটেছিল প্রকৃতি নিয়ে দু’চারটে কথা বলার জন্য। কর্নেল গেলে আমরাই বা বাদ যাই কেন? তাই অফিস থেকে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে আমি এবং হালদারবাবুও পৌঁছে গেছি রোমে। ‘রোম’- ভাবা যায়? অন্তত আমার মাথায় ঝিম ধরে গেছিল আনা যখন কর্নেলকে আমন্ত্রণপত্র হাতে দিয়ে মিষ্টি হেসে বলেছিল, ‘ওঁরা আপনার কথা শুনতে চায়, ওল্ড ম্যান–‘

     আমি বুড়ো ঘুঘুর হাত থেকে ছোঁ মেরে খামটাকে হস্তগত করে চোখ বুলিয়ে নিয়েছিলাম ‘ভেন্যু‘-র নামের ওপর। অডিটোরিয়ামের নাম পার্ক ডেলা মিউজিকা, রোম। আমার হাত থেকে খাম চলে গেছিল হালদারবাবুর হাতে আর তারপরেই একখানা পেল্লাই হাঁ-মুখ। একটাই শব্দ উচ্চারণ করে থেমে গেছিলেন প্রৌঢ় গোয়েন্দা কে. কে. হালদার। ‘খাইসে-‘ !!

     সেই থেকে চলছে প্রস্তুতি। আনা আমাকে সঙ্গে নিয়ে কর্নেলের জন্য উপযুক্ত সাজগোজের জোগাড় করতে কলকাতা জুড়ে বিস্তর ঘোরাঘুরি করে অবশেষে একখানা কালো ব্লেজার কিনেছিল, তার গায়ে সূক্ষ্ম রুপোলি সাদার রুপটান। একজোড়া চেরি রঙের জুতো, সাদা-কালোয় জড়াজড়ি করা সরু উইন্ডসর টাই। পকেটে একটা চেরি রঙের মখমলি রুমাল। কর্নেল প্রশ্রয় মেশানো হাসিমুখে আমাদের ‘দাবিদাওয়া’ মেনে নিয়েছিলেন। ফল হয়েছে জবরদস্ত। স্টেজ থেকে নামতেই একগুচ্ছ নামি-অনামি খবরের কাগজের রিপোর্টাররা কর্নেলকে নিয়ে একদম মেতে উঠলেন, বাকিরা উষ্ণ আপ্যায়নে আমাদের পুরোদস্তুর আত্মীয় বানিয়ে নিলেন। আমরাও দু’হাতে লুটে নিলাম পড়ে পাওয়া ষোলো আনা আতিথেয়তার উপহার।

     আসল ঘটনাটা ঘটল সেমিনার শেষ হবার পর ডিনার পার্টিতে। আমি তখন এক প্লেট রিবলিতা আর তার সঙ্গে খানিক পোলেনতা নিয়ে ভাবছিলাম কোনটা আগে চেখে দেখবো। আনা হঠাৎ আমার কনুই ধরে টেনে নিয়ে গেল পাশের টেবিলে। হালদারমশায় ভ্রূ কুঁচকে তখন চামচ দিয়ে খাবার তুলে মুখের সামনে ঝুলিয়ে কী যেন ভাবছিলেন। ওঁর পাশটাতে আমাকে বসিয়ে আনা ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে বলল, ‘আজ কর্নেলের সঙ্গে একজন দেখা করতে চান। ইতালিয়ান সেলেব্রিটি ভদ্রলোক। তাই তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া শেষ করে নাও—’। তারপর হালদার মশাইয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ মেরে বলল, ‘ওটা টুনা মাছের ডিম, এখানকার ক্যাভিয়ার-ও বলতে পারেন। গোল্ডেন রংটা দেখছেন, ওই জন্যই এই জিনিসটাকে ‘সার্ডিনিয়ার সোনা’ বলে মানুষ। বেশ দুর্মূল্য জিনিস কিন্তু!’

     ‘মাছের ডিম, ওহ আই লাভ মাছের ডিম—’ কথাটা বলেই চামচের ডগাটা মুখে পুরে চোখ বড় বড় করলেন দুঁদে গোয়েন্দা। তাঁর মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে জিনিসটা তার পছন্দ হয়েছে কি না।

     আমি আড়চোখে কর্নেলকে দেখছিলাম, এক দঙ্গল ‘স্যুটেড বুটেড’ বয়স্ক মানুষের সঙ্গে বেশ আলাপ জমিয়ে ফেলছেন তিনি, যদিও দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি শুধু উত্তর দিচ্ছিলেন। বিচিত্র সব প্রশ্নের। সেখান থেকেই আমার দিকে তাকিয়ে একটা লাচার হাসি ভাসালেন। বুঝলাম, তিনি মোটেও ব্যাপারটা উপভোগ করছেন না। আনা আইসক্রিম শেষ করে মাথা নাড়লো, ‘যাও, ওঁকে নিয়ে এসো–’

     আমি ভেবলে গেলাম। কর্নেলকে অমন ভিড় থেকে টেনে বার করে আনা চাট্টিখানি কথা নয়। আনা ভ্রূ বেঁকিয়ে রাগ দেখাতেই আমি টেবিল ছেড়ে ছুটলাম কর্নেলের দিকে। ‘ও মশাই, ইন্ডিয়া থেকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ফোনে চাইছেন–’ ভিড় ঠেলে কর্নেলের দিকে তেড়ে যেতেই চারপাশের লোকগুলো স্বসম্ভ্রমে সরে গেলেন। একরকম টানাটানি করেই কর্নেলকে মুক্ত করে নিয়ে গেলাম আমাদের টেবিলে।

     ‘প্রধানমন্ত্রী?’ কর্নেল নিচু গলায় তড়পালেন। আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসলাম, ‘আপনি জানেন ‘দুর্জনের ছলের অভাব হয় না’, আর আমি তো সাক্ষাৎ রিপোর্টার!’

     কর্নেলের হাসিটা গোঁফদাড়ির আড়ালে ঢাকা পড়লেও বেশ বুঝলাম তিনি পালিয়ে বেঁচেছেন। যদিও ভ্রূ কুঁচকে আমায় প্রশ্ন করতে ভুললেন না, ‘হোয়াট আ সারপ্রাইজ, ইউ আর এক্টিং ইন্টেলিজেন্ট!! কিছু হয়েছে নাকি?’

     আমরা ততক্ষণে প্রশস্ত ডাইনিং রুমের একপ্রান্তে আমাদের টেবিলটার কাছে এসে পৌঁছেছি। আনা আমাকে উত্তর দেবার সুযোগ না দিয়ে পকেট থেকে একটা ছবি বার করে কর্নেলের সামনে ধরল, মুখের ভাবখানা এমন–‘ছেলেটাকে চিনতে পারছেন?’

     কর্নেলের সঙ্গে সঙ্গে আমি এবং হালদারমশাই উপুড় হয়ে পড়লাম ছবিটার ওপর। বাকিদের অবস্থা জানি না, তবে আমি যে ‘স্টারস্ট্রাক’ হয়ে পড়েছিলাম, সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

     ছবির মানুষটা কে? তাকে কীভাবে চিনলাম? সে এক গল্প বটে!

     আসলে ঘটনাটা ঘটেছিল মাত্র বছরখানেক আগে। দৈনিক সত্যসেবকের পাঠক লিস্টি বাড়াতে একটা নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিখ্যাত নানা মানুষের চিত্র-বিচিত্র খবরাখবর কচিকাঁচাদের কাছে পৌঁছে দেবার ধারণাটা এসেছিল আমাদের চিফের ‘উর্বর’ মস্তিস্ক থেকে। একগাদা নামি খবরের কাগজের উদাহরণ টেনে তিনি আমাদের ‘সাজেশন’ দিয়েছিলেন, যেন এই ‘রকমারি’ বিভাগটাকে অবহেলা না করি। বাঘের ভয় আর সন্ধ্যা নিয়ে যে প্রবাদটা বাজারে চালু আছে সেটার মর্মার্থ সেদিনই টের পেয়েছিলাম। কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে চিফ বলেছিলেন, ‘তুমি তো ওসবে বেশ পটু, রকমারি-র দায়িত্ব তুমিই সামলিও—’

     ওসব বলতে ইন্টারনেট। আমি মাথা চাপড়ে কাজে নেমে পড়েছিলাম, বসকে খুশি করতে কে না চায়? তার ওপর যদি কাজে অকাজে বেশ কয়েকদিনের জন্য গায়েব হতে হয় তাহলে তো বসের ‘বিশেষ’ নেক নজরে থাকার চেষ্টা করাই উচিত। করেও ছিলাম। ফল ভালো হয়েছিল। এক মাসের মধ্যে প্রায় হাজার দুয়েক সাবস্ক্রিপশন বেড়ে ছিল। প্রথম খবরটাই আপামর পাঠককুলকে কাত করে দিয়েছিল বেমালুম।

     খবরের বিষয়–একজন ত্রিশ বছরের ইতালিয়ান যুবক। নাম লুকা বুগাটি। পেশায় সাইক্লিস্ট। উচ্চতা ছ’ফুট পাঁচ ইঞ্চি। গালে এলোমেলো দাড়ি, মাথায় লম্বা চুল। দেহ সৌষ্ঠবে আশ্চর্য রকমের ক্রীড়াবিদ সুলভ ক্ষিপ্রতা। তবে চেহারা নয়, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ভালোবেসেছিল তাঁর দুর্জয় সাহসকে। একখানা মাত্র বাই-সাইকেল নিয়ে সে যেমন বহুতল বাড়ির ছাদে উঠে যায় তরতরিয়ে, তেমনি চরম স্বাচ্ছন্দ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এরোপ্লেনের ছাদের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায় ভাবলেশহীন মুখে। কখনও সে রাস্তার ধারে লোহার রেলিঙের ওপর, তো কখনও তাকে দেখা যাচ্ছে চল্লিশ ফুট উঁচু ঝুলন্ত ব্রিজের পিছল তোরণ-এর ওপরে। কখনও সে ঢালু পথের খাড়াই ধরে এগিয়ে চলেছে খেয়ালি হাওয়ার মতো, সাইকেলের সামনের চাকায় উজান লাগিয়ে, আবার কখনও সমুদ্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্যাঁচালো পথের পাথুরে দেওয়াল বেয়ে নেমে আসছে হাসতে হাসতে। এমন ডাকাবুকো মানুষকে ইন্টারনেটের সুধী সমাজ এক ঝটকায় তারকা বানিয়ে ফেলেছিল। শুনেছিলাম, বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানি তার এক-একটা ভিডিয়োর জন্য কোটি কোটি টাকার যোগান দিচ্ছে। তার ভিডিয়ো দেখানো হচ্ছে দেশ বিদেশের নানা টিভি শো-তেও। আমিও একটা আর্টিকেল লিখেছিলাম ‘লুকা’কে নিয়ে। মাস তিন-চারেক আগে যদিও একটা খবর বেরিয়েছিল তাকে নিয়ে–লুকা নাকি ইতালির ভয়ানক ড্রাগ ডিলারদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। অবাক হয়েছিলাম। আবার অবাক হইনি। এমন প্রতিভার অকালপ্রয়াণ অপ্রত্যাশিত বটে, তবে কিনা ভূমধ্যসাগরের ধারে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন দেশটার আধুনিক ইতিহাস তো ড্রাগের কলঙ্কে কালিমালিপ্ত। তাই লোকটাকে স্রেফ ভুলে গিয়েছিলাম।

     কিন্তু এই মুহূর্তে আবার লুকা আমার মানসপটে জেগে উঠল। একটা ভয়ানক সম্ভাবনা মস্তিষ্কের কোনও গোপন কুঠুরিতে নড়ে চড়ে উঠেই থেমে গেল আবার।

     ‘কি কারণে দেখা করতে চায়, কিছু বলেছে?’ কর্নেল ভাবিত হয়ে পড়েছেন বোঝা গেল। হালদারমশাই তখনও বিরস মুখে ‘সার্ডিনিয়ার সোনা’ গিলছিলেন।

     ‘স্যরি কর্নেল, খবরটা ঘোড়ার মুখ থেকেই শুনুন প্লিজ? আমি নিশ্চিত আপনি হতাশ হবেন না–’ গ্লাসের সবুজ মকটেল এক চুমুকে শেষ করে আনা ডিনার শেষ করল। তারপর ব্যাগ গুছিয়ে আমাদের বগলদাবা করে ট্যাক্সিতে উঠে পড়ল।

     ‘হোটেল এস্ট্রিড রোমা–’ আনা ড্রাইভারকে নির্দেশ দিতেই হোটেলের উদ্দেশে গাড়ি ছুটলো সাইঁ সাইঁ করে।

 

৩. দুঃখী আজ সাঁঝের তারা

এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ। এই সংখ্যাটা আসলে লুকা-র ভিডিয়োগুলোর গড় দর্শক সংখ্যা। আর সেই ‘বিখ্যাত’ মানুষটি বসে আছে আমাদের ঠিক হাততিনেক দূরত্বের মধ্যে। ঘরে আমরা পাঁচ জন ছাড়া আর কেউ নেই।

     কালো হুডি, কালো সানগ্লাস, কালো স্নিকার্স–বিখ্যাত সাইক্লিস্ট ক্লিষ্ট মুখে বসে আছে সোফার মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়ালো আমাদের অতিথি। আনা এগিয়ে গিয়ে করমর্দন করতেই ব্যাজার মুখে হাসি খেললো লুকা-র।

     ‘থাঙ্কস এ তন, আই নেভার এক্সপেকতেদ ইউ গাইস উইল শো আপ–’ লম্বা টানে খানিক গানের সুরে লোকটা বলে উঠলো। কিংবা বলা ভালো চিৎকার করে উঠলো। সেই সঙ্গে ভালুকে আলিঙ্গন। আমাদের মনটা হঠাৎ করে ভালো হয়ে উঠলো।

     কিন্তু এমন দিলদার মানুষের হাসিতে এমন বিপন্ন অসহায়তা কেন?

     ‘লুকা, এরকম হাল হয়েছে কেন তোমার?‘ আনা ঝড়কে উঠলো। বুঝলাম দুজনের আলাপ পরিচয় বেশ পুরোনো। লোকটা আমাদের বসার ইশারা করে নিজেও ধপ করে বসে পড়লো সোফায়।

     ‘মানসিক চাপ–’ মাথা থেকে হুডির আবরণ সরিয়ে দুঃখিত গলায় লুকা খানিক বিড়বিড়িয়ে ওঠে। কিছু না জেনেও এমন সুদর্শন ভদ্রলোকের জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে পড়ে। ভিডিয়োগুলোতে যেটা চোখে পড়ে না, সেটাই এখন চোখে পড়ছে বেশি করে। লোকটার চোখের মণিদুটো–ক্ষমাসুন্দর নীল। সামান্য ক্লান্তি যদিও মুখের ভূগোলে আঁচড় কেটেছে, কিন্তু আশ্চর্য একটা দৈব সারল্য এখনও উছলে পড়ছে যেন।

     ‘চিন্তা নেই, কর্নেল আছেন আমাদের সঙ্গে। ওঁকেই সরাসরি বল তোমার দুর্বিপাকের কথা,’ আনা কর্নেলের দিকে এমন ভাবে হাত দেখায় যেন একদল দর্শকের সামনে আলাদিনের জিনিকে পেশ করছে। গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে। হালদার মশাই-ও বেশ একটা কেউকেটা গোছের মুখ করে চুলে বিলি কাটতে থাকেন।

     ‘একটাই প্রশ্ন, এত মানুষ থাকতে আমি কেন?’ কর্নেল মুখ খুললেন অবশেষে, হাতে পাইপ।

     লুকা নামের মানুষটি হঠাৎ কর্নেলের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো। হাতদুটো জোড় করা। প্রার্থনার ভঙ্গি।

     ‘কর্নেল, বড় বিপদ চারদিকে… দুঃখের ব্যাপার, সাহায্য চাইবার মতো বন্ধুর সংখ্যাও খুব কম… আমার কথাটা শুনলে আশা করি বুঝবেন কেন সবার কাছে সাহায্যের হাত পাততে পারছি না… আপনার মতো একজন বিজ্ঞানী–’

     কর্নেল নীলাদ্রি সরকার সোফা ছেড়ে লুকাকে দু’হাতে দাঁড় করালেন, তাঁকে সোফায় বসিয়ে চিন্তাগ্রস্ত মুখে বললেন, ‘আমি বিজ্ঞানের একজন একনিষ্ঠ ছাত্র, লুকা… তবে বিজ্ঞানী নই… আমার বিজ্ঞানসাধনা প্রকৃতিকে ঘিরে… আমি একজন অর্নিথোলজিস্ট–পাখ-পাখালি নিয়ে আমার আগ্রহ–’

     ‘আমি জানি আপনার কথা, আনার মুখে আপনার প্রশস্তি শুনেই আমি থেমে থাকিনি… লুকিয়ে লুকিয়ে যতটা সম্ভব খবর নিয়েছি আপনার সম্পর্কে… আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনিই বাঁচাতে পারবেন রোম শহরটাকে–’

     শুধু কর্নেল নয় আমাদের বাকি সবারই চোখ হঠাৎ আটকে গেল লোকটার মুখের দিকে।

     ‘আমি তো ভেবেছিলাম বিপদ শুধু তোমার একার?‘ কর্নেল আমাদের সবার হয়ে প্রশ্নটা করলেন।

     আনা উত্তর দিল লুকার পরিবর্তে, ‘না কর্নেল, লুকার ভয় যদি সত্যি হয়, তাহলে বিপদ শুধু ওর একার নয়, রোমের নয়। বিপদ আমাদের সবার–’

     কর্নেল সোফায় বসেলন। দাড়িতে হাত বুলিয়ে সামান্য ভাবলেন। তারপর লুকার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার বক্তব্য শুনে ঠিক করা যাবে আমার কর্তব্য কী।’

     আমাদের অতিথি যেন ধড়ে প্রাণ পেল। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে একটা গল্প শোনাতে শুরু করল সে। আমরা অবাক হয়ে শুনলাম ইউরোপের এই সুপ্রাচীন দেশের একটি অজানা অধ্যায়। শুনলাম এবং বিস্মিত হলাম। সভ্য মানুষের ইতিহাসের আড়ালে লুকোনো অসভ্যতার কাহিনি শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল যেন এক অচেনা অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা সবাই।

 

৪. ঘুম পাড়ানী মাসি পিসি মোদের বাড়ি এসো…

উত্তরে ইউরোপের নামী এবং ধনী দেশগুলোকে মাথায় নিয়ে এবং দক্ষিণে সুদীর্ঘ ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলকে সীমানা বানিয়ে ইতালি দাঁড়িয়ে আছে স্থাপত্য, ভাস্কর্য, শিল্প এবং প্রাচুর্যের ভান্ডার বুকে আগলে। একদিকে সবুজের সমারোহ, অন্যদিকে সুনীলের দিগন্ত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন উপচে পড়ছে ইতালির ভূখন্ড থেকে। পাহাড় আর সমুদ্র হাত ধরাধরি করে যেন দেশটাকে বানিয়েছে। দেদার সূর্য, ঝুরঝুরে অনাবিল বাতাস, সোনাঝরা বালিয়াড়ি, দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা সুপ্রাচীন দূর্গ, দেবত্বের সাজে সেজে থাকা মহামানবদের স্থাপত্য, অলিগলিতে ঝোলানো সুদৃশ্য বাগান কিংবা দিগন্তজোড়া চাষের জমি–ইতালিতে ‘সুন্দর’ সত্যি বড় অতিপ্রাকৃতিক। এসব ছাড়াও আরেকটা আকর্ষণ আছে এই দেশটার। আমাদের গল্পের সঙ্গে এই বিশেষ জিনিসটির সম্পর্ক খুব গভীর। তবে এই জিনিস চাক্ষুস করতে গেলে আপনাকে যেতে হবে মধ্যে ইতালিতে। জায়গাটার নাম উমব্রায়া, গ্রামের নাম কাস্তেলাসিও– সেখানে প্রতি বসন্তে যদি কোনওদিন আসেন সময় করে, দেখতে পাবেন আদিগন্ত ফুলের সাজ। যেন আগুন লেগেছে সেখানে। লালচে-কমলা রঙের ওই ছোট ছোট ফুলগুলো মাথা দুলিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাবে, প্রকৃতির রূপে মাথা ঝিমঝিম করে উঠবে আপনার। কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখবেন–ওই নিরীহ আগুন রঙা ফুলগুলো থেকেই তৈরি হয় সব থেকে ক্ষমতাসম্পন্ন নেশার উপকরণ। ওদের নাম ‘পপি’–বাংলা নামটা খুব পরিচিত আমাদের সবার—‘পোস্ত’।

     নামে ভুলবেন না। ওই ফুলের বীজটাকে আড়াআড়ি কাটলে বেরোবে ঘন সাদা রঙের রস। ওই রস থেকে যেমন ওষুধ তৈরি হয় তেমনি তৈরি হয় মরফিন–আর ওই মরফিন থেকে তৈরি হয় আফিম এবং হেরোইন–নেশা আর মৃত্যু। সত্যি কথা বলতে কি, ইতালির সুপ্রাচীন ঐতিহ্যও এই ফুলের রক্তরঙে মজেছিল বহুযুগ আগে। গল্পটা শোনাই?

     প্রাণপ্রিয়া কন্যা পার্সিফোনে-কে হারিয়ে রোমান শস্যদেবী সেরেস তখন বিষণ্ণ, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। এদিকে তার ক্লান্তির সুযোগ নিয়ে দেশ জুড়ে ক্ষুধার প্রাবল্য বাড়ছে। করুণাময়ী সেরেস নিজের হাতে ক্ষেত ভরিয়ে তুলবেন সোনালী ফসলে তবেই না মানুষের পেট ভরবে? বিপদে পড়লেন দেবকুল। তখন উপায় বাতলালেন দেবতা সোমনাস, শুধুমাত্র সেরেস-কে ঘুম পাড়াতেই তৈরি করলেন এই রক্তাভ ফুলগুলির। দেবী সেই ফুলের গুণে ক্লান্তি সরিয়ে ফিরলেন পূর্ণশক্তিতে, মাটি ভোরে উঠল ফসলে। মানুষ ক্ষুধাকে জয় করল। বিপদ কাটল।

     সেই থেকে ‘পপি’ নিদ্রা এবং মৃত্যুর প্রতীক।

     ফুলের যে নির্যাস দেবদেবীদের ঘুমপাড়াতে সক্ষম সেই ফুল থেকেই জন্মায় আফিমের ফল। তার বীজে লুকিয়ে থাকে বিশ্বজোড়া ঘুমের সাম্রাজ্য। বিনবিনে নেশার মতো সে ঘুম। মৃত্যুর মতো তার অমোঘ আকর্ষণ। আর সেই ‘ঘুম’ বিক্রি করে বড়লোক হচ্ছেন অজস্র মানুষ। খারাপ মানুষ। আফগানিস্তান, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, রাশিয়া, ইতালি, রোমানিয়া, ফ্রান্স– বেশ কয়েকটি দেশের নাম ঘুরেফিরে আসে এই বিষাক্ত ঘুমের ব্যবসা নিয়ে নাড়াঘাঁটা করলে। যদিও এই ভয়ানক নেশার কবলে জড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশ-ই, তবুও ইতালির এই আপাত শান্ত সুন্দর জনপদে যেন মৃত্যুর এই খেলাটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। বসেছে তার কারণ দারিদ্র, হতাশা, উদ্দেশ্যহীনতা, ক্ষোভ–এমন আরও অনেক কিছু। সেই সুযোগে অন্ধকার ছিনিয়ে নিয়েছে তরুণ-তরুণীদের জীবন, বাপ-মায়ের ভালোবাসা, দেশের নেতামন্ত্রীদের ঘুম। স্বাভাবিকভাবেই গজিয়ে উঠেছে ছোট-বড় নানা দল, পরিবার, গোষ্ঠী–যারা এই ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ‘মাফিয়া’, ‘ফ্যামিলি’, ‘কার্টেল’ কথাগুলো এখন মানুষের মুখে মুখে ঘরে। ওদিকে নেশার হাতে বিক্রি হয়ে যাওয়া তাজা যুবক-যুবতীদের লাশের পাহাড় জমে সবার অজান্তে।

     লুকা, নিজেকে অশিক্ষিত বলে। কারণ ছোটবেলা থেকেই ওর বই জিনিসটা বেহদ না-পসন্দের তালিকায়। ওভাবে ঘরের কোনে মুখ ডুবিয়ে থাকার পাত্র সে ছিল না। তার বদলে ভবঘুরে-বৃত্তিতে তার চিরকালের টান ছিল। সাইকেল তার প্রাণ ছিল, গিটার তার ঘুমোনোর সঙ্গী ছিল, বন্ধুরা তার বেঁচে থাকার তাগিদ ছিল। সেই তাগিদ থেকেই জন্ম নিয়েছিল ওদের ইউটিউব চ্যানেল খোলার পরিকল্পনা। বন্ধুরা সবাই মিলে হুজুগে মেতেছিল কয়েকদিন। সস্তা ফোনের ক্যামেরায় ওরা ভিডিয়ো তুলেছিল লুকার। সে সাইকেলে চেপে শাসন করছিল রোমের রাস্তাঘাট-মিনার-বাগান-স্কাইস্ক্রেপার, সবকিছুই। প্রথম দর্শনেই সে ভিডিয়ো সবার ফোনে ফোনে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারপর আর কি? বিজ্ঞাপনের টাকায় কেনা গেল দামী ক্যামেরা, এডিটিং সফ্টওয়ার। সেই সূত্রেই আনার সঙ্গে আলাপ লুকার। শুধু আনার অনুরোধেই লুকা একটা ন্যাশনাল পার্কের চারপাশে তার ‘খেলা’ দেখিয়েছিল। রেকর্ড পরিমান মানুষ এসেছিলেন সেই কাণ্ড দেখতে। টিকিট বিক্রি হয়েছিল কোটি টাকার কাছাকাছি, যেখানে সারাবছর হয়তো মাত্র কয়েকশো মানুষের পায়ের ছাপ পড়ত এককালে। পার্কটা বেঁচে গিয়েছিল। ওদের সম্পর্কটাও মজবুত হয়েছিল। সেই সম্পর্কের সুবাদেই আনা জানতে পেরেছিল লুকার জীবনে দিকে ধেয়ে আসা বিপর্যয়ের কাহিনি।

     লুকার ক্যামেরাম্যান, পেদ্রো-র মারা যাবার গল্প ছেপেছিল ইতালির সমস্ত দৈনিকগুলো। মৃত্যুর কারণ ‘ড্রাগ ওভারডোজ’। এতদিন লুকার চোখে একটা স্বপ্নের মায়াজাল ছিল। বন্ধু পেদ্রোর মৃত্যুতে সেটা এক ধাক্কায় ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার হয়ে গেল। সে চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল তার চারপাশের মানুষগুলোর দিকে। শহর এবং শহরতলীর অলিগলিতে নেচে বেড়ানো মৃত্যুর ভীষণ রূপ দেখে সে শিউরে উঠলো। সে যদি বুদ্ধিমান হত, তাহলে বোধয় সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারত। কিন্তু সহজ সরল লুকা নিজের ভালো বুঝতে পারেনি। তাই একদিন খুঁজতে খুঁজতে সে পেয়ে গেল সেই লোকটাকে যে কি না পেদ্রোকে নিয়মিত হেরোইনের প্যাকেট জোগাড় করে দিত। লোকটা পালিয়ে বেঁচেছিল, কিন্তু লুকা তার সূত্র ধরে ধরে আবিষ্কার করে ফেলেছিল এই ভয়ানক সাম্রাজ্যের অনেকখানি জায়গা। তাকে পিছু হটাতেই একদিন একটা অন্ধগলির মধ্যে পাঁচজন মিলে চড়াও হল তারা। তাকে মাটিতে ফেলে পিটিয়ে তার হাত আর পা ভেঙে দিয়েছিল লোকগুলো। সে ভিডিয়ো তারা তুলে দিয়েছিল আপামর বিশ্ববাসীর কাছে। মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিয়ে লুকার সুনামকে ধ্বংস করেছিল ওরা। চার মাস ধরে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকার ছেলে সে ছিল না, তাই সবার বারণ সত্বেও সে আবার আঁকড়ে ধরেছিল ওর সাইকেলটাকে। মহাসংগ্রাম তারপর। মাত্র দু’মাসের মাথায় আবার পথে নামলো সে। এবার অন্যভাবে। মুখ ঢেকে, পরিচয় পাল্টে সে নেমে পড়ল পুলিশের খবরী হিসেবে। দারুণ সাফল্য তার। সাহায্য করলো তার বন্ধুরাও। পুলিশ খুব খুশি। তারা এবার লুকাকে টোপ দিল। ছোটখাটো ‘মাছ’ ধরে জেলে পুরলে হয়তো শয়তানদের গতি কমবে কিন্তু থামবে না কোনওদিন। প্রাণ হারাবে আরও অনেক পেদ্রো। লুকা সবার আপত্তি সত্বেও নেমে পড়লো বড় খেলায়।

     খেলার আনন্দে মশগুল লুকা তখন অপারেজের। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে সে ততদিনে অজস্র অপরাধীর নাম জোগাড় করে ফেলছে। কিন্তু যেসব সূত্র জোগাড় হচ্ছে তাদের সবার শেষ প্রান্ত গিয়ে থামছে একটি মাত্র জায়গায়। ‘কুই বোনাস’- ভালো মানুষটি। তা সেই ‘ভালো’ মানুষটির আসল নাম, ফ্রাঙ্ক এনা। সিসিলিয়ান মাফিয়ার নীল রক্ত।

     ফ্রাঙ্ককে ধরা সহজ কাজ নয়। তার ওপর দেশজুড়ে তাঁর ‘পরিবার’ ছড়িয়ে আছে। আছে ভয়ানক একঝাঁক বডিগার্ডের দল। সেসব যদিও পেরোনো যায়, তাহলেও তাকে ঘিরে থাকে ফ্রাঙ্কের চার তুতো ভাই। রক্তলোভী, উন্মাদ এবং নৃশংস। পুলিশের ভাষায়, ওরা চারজনই ‘সিরিয়াল কিলার’। সত্তর, একানব্বই, বাহান্ন, একশো এগারো–ওদের প্রত্যেকের হাতে খুন হওয়া মানুষের সংখ্যা। এপোক্যালপিসের চার ঘোড়া। বিলি, আন্তোনিও, সিলভিও এবং নিকোলা।

     ইতালির পুলিশ এবং গোয়েন্দা দপ্তর চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখেনি। লুকাকে সমস্ত রকমভাবে সাহায্য করেছিল তারা। ফল পাওয়া গেল হাতে নাতে। নবীন সাইক্লিস্টের নিদারুণ পরিশ্রমে খোঁজ পাওয়া গেল একটা মোটেলের। ‘রেড সি ইন’- সেখানেই কয়েক ঘণ্টার জন্য দলবল নিয়ে থাকবেন ইতালির মৃত্যুদেবতা ফ্রাঙ্ক। গভীর রাতে যখন পুলিশ হানা দিল সেখানে, বুলেটের যুদ্ধে সাতজন সহযোদ্ধা হারালেও পুলিশের হাতে নিহত হল চোদ্দোজন ‘যোদ্ধা’, চারজন ক্যাপো বা নেতা, ফ্রাঙ্কের তিন ভাই এবং গোটা দলের ‘আন্ডার বস’ বা সেনাপতি। ধরা পড়ল অগুনতি যোদ্ধা। কিন্তু আসল ‘বস’ পালিয়ে গেলেন তাঁর মন্ত্রণাদাতা বা কনসিগ্লিয়েরি-কে সঙ্গে নিয়ে।

     লুকাকে গোপনে বীরের সম্মান জানিয়েছে ইতালি। প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাতে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সরকারি নথিতে তাঁকে ‘মাফিয়া হান্টার’ নামে উল্লেখ করে তাঁর সমস্ত জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নতুন চরদের মধ্যে। ওদিকে শুরু হয়ে গিয়েছে পলাতক ফ্রাঙ্ককে খোঁজার কাজ। দেশে শান্তি ফিরে এসেছে কিছুটা হলেও।

     কিন্তু শান্তি নেই লুকার মনে। কেন?

 

৫. ‘…না না না, রবে না গোপনে..’

আসল ঘটনাটা ঘটেছিল দিন পনেরো আগে। নতুন একটা প্রজেক্টে হাত দিয়েছিল লুকা। এবার সে রোমের একটা জনবহুল বস্তির একতলা বাড়িগুলোর ছাদ দিয়ে সে উড়ে যাবে সাইকেল নিয়ে। দুনিয়া দেখবে সে অসম্ভবকে সম্ভব হতে। রোমের হতদরিদ্র যুবসমাজের সামনে সে একটা আলোর রেখা তুলে ধরবে–অর্থ নয়, ইচ্ছেটাই সব অসম্ভবকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়– এটাই সে সবাইকে বোঝাতে চেয়েছিল। তাই খুব মন দিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে নিজেকে লুকিয়ে দেখে নিচ্ছিল বাড়িগুলোর চালচিত্র। এমনিতেই সে বিখ্যাত মানুষ, তার ওপর তাঁকে নিয়ে এতদিনে একটা ভয়ানক রহস্য গড়ে উঠেছে। তাই এত গোপনীয়তা।

     তা, সে যখন নোটবুকে একটা ছবির খসড়া করছিল ঠিক তখনি ঘটনাটা ঘটল। গলির মুখে একজন পাদ্রিকে দেখা গেল আসতে। তিনি বোধহয় চার্চের প্রার্থনা সেরে ফিরছিলেন। এমন সময় তার পিছন পিছন ধীর গতিতে আসতে দেখা গেল দুজনকে। পাদ্রী তাদের ভয়েই যেন দৌড়ে অপর প্রান্তে পৌঁছোবার চেষ্টা করলেন। লুকা ততক্ষণে একটা নোংরা ফেলার আস্তাকুঁড়ের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তবুও চোখদুটো ঠিক ন্যস্ত রেখেছে ঘটনাপ্রবাহের দিকে। বুড়ো যখন পালাতে ব্যস্ত ঠিক তখনিই গলির শেষ প্রান্তেও দেখা গেল দুজন অতিথিকে। পাদ্রী বুঝলেন তিনি ফাঁদে পড়েছেন।

     ঠিক এমন সময়, কোথা থেকে যেন উদয় হল আরেকজন মানুষ। কালো কোট, সুগন্ধি জেল দিয়ে চুলগুলো পরিপাটি করে সাজানো। লাল টাই, কালো ছুঁচোলো জুতো। লোকটা পাদ্রিকে জড়িয়ে ধরে নিচু স্বরে কিছু বলছিল বোধহয়। ভয়ার্ত পাদ্রিকে বেশ কয়েকবার ‘ডিয়াস’ কথাটা উচ্চারণ করতে শুনেছিল লুকা। কথাটার মানে ‘ভগবান’ ফ্রাঙ্কের চার ভাইয়ের মধ্যে একমাত্র জীবিত ভাই নিকোলা-র ডাকনাম ওটাই।

     ‘ঈশ্বর কখনও ভোলে না পাদ্রী, কখনও না… ঈশ্বর ক্ষমাহীন… মৃত্যুর মতো…’ নিকোলার কথাগুলো শুনতে পেয়েছিল লুকা। অসহায় রাগে সে দেওয়ালে ঘুসি মারছিল। পাদ্রীর কথাগুলো শুনতে পায়নি লুকা, তবে নিকোলার গজরানির মধ্যেই মাঝে মাঝে উঠে আসছিল বিশ্বাসঘাতকতার কথা। বোধহয় কোনও কারণে পাদ্রীকে ওরা সন্দেহ করেছিল ওদের ওপর নেমে আসা সর্বনাশের কারণ হিসেবে। লুকার হাতের মুঠো দুটো শক্ত হয়ে আঁকড়ে ধরেছিল পাঁচিলের লোহার গ্রিলটাকে। ওরা তাহলে ফিরে আসছে আবার। আর তার প্রথম শিকার হবে একজন নিরীহ মানুষ! এরকম কত মৃতদেহ জমবে তার চারদিকে, কতগুলো লাশের আড়ালে সে লুকোবে?

     আর তারপরেই চিৎকার। পাদ্রীর চিৎকার। কান্নার মতো। গোঙানির মতো।

     লুকা থাকতে না পেরে উঁকি মেরেছিল। যা দেখেছিল তাতে তার চোখের মণিদুটো স্থির হয়ে গেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য।

     নিকোলা দু’চোয়ালের মাঝখানে চেপে ধরেছে বুড়ো পাদ্রীর গলাটা। শব্দন্তের চাপে ভলকে ভলকে রক্ত বেরিয়ে আসছে। নিকোলার মুখ সেই রক্তের ছোপে ছোপান। পাদ্রী একসময় নিথর হয়ে পড়লেন।

     ‘ড্রাকুলা?’

     ‘ভ্যাম্পায়ার?’

     আমি এবং হালদারমশায় যুগপৎ আমাদের জ্ঞানের ভান্ডার খুলে বসলাম এবং কর্নেলের কাছ থেকে একটা রাগী চাহনি তিরস্কার হিসাবে পেয়ে চুপ করে গেলাম।

     এরপরের ঘটনা আরও ভয়ানক। মৃত পাদ্রিকে ঘাড়ে করে নিয়ে যাবার আগে ওদের একজন সঙ্গী মৃতদেহের শরীরে একটা সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে কিসব করছিল।

     ‘লোকটা যে নিকোলা তার কোনও প্রমাণ কি আছে তোমার কাছে?’ কর্নেল গল্প থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।

     ‘খবরের কাগজে নিকোলার যতটুকু ছবি দেখেছিলাম সেটুকুই যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে। সব থেকে বড় পরিচয় ওর হাতের তালুতে আঁকা মেডুসা আর তাঁকে ঘিরে আঁকা তিনমাথা তারা–’

     ‘কিন্তু ওই চিহ্ন তো সবার হাতেই থাকতে পারে–’

     লুকা হাসলো, ‘চিহ্নটা বিখ্যাত, সিনেমায় হামেশাই দেখা যায় অমন উল্কা। কিন্তু সত্যিকারের মাফিয়া দুনিয়ায় একমাত্র বস অথবা বসের রক্ত-সম্পর্কের কেউ না হলে অমন উল্কি হাতে ধারণের সাহস করবে এমন মানুষ মেলা ভার–’

     কর্নেল মাথা নাড়লেন। তিনি বুঝেছেন। আমি বোঝার ভান করলাম। হালদার মশায় অন্যমনস্কভাবে কান চুলকোলেন। একসঙ্গে অনেককিছু জিজ্ঞাসা করার আছে তাঁর, এটা সেটারই প্রতিফলন। লুকা গল্প জারি রাখলো।

     অন্ধকার গলিতে সেদিন যে দৃশ্যটা দেখে সে পালিয়ে এসেছিল সেটাকেই মাথা থেকে সরাতে লুকা গির্জায় গেছিল। প্রার্থনা সেরে মনকে শান্ত করবে–এমনটাই তার ইচ্ছে ছিল।

     হোলি কমুনিয়ান শেষ হবার পর ‘সার্ভিস অব দ্য ওয়ার্ড’ শোনাতে পাদ্রী ঢুকলেন হলঘরে। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানালেও লুকা তখন নিজের সিটে বসে ছিল জড়ভরতের মতো। এই পাদ্রী সেই পাদ্রী নন?

     নিজের চোখকে লুকা বিশ্বাস করতে পারেনি। তাই এক ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল সে। তারপর কয়েকদিন ধরে অনেক ভাবনাচিন্তা করে সে ঠিক করেছিল এমন একজন মানুষকে সে তার অভিজ্ঞতার কথা শোনাবে যে কিনা ‘এহ, লুকা নিতান্তই ছেলেমানুষ–’ বলে তাকে ভাগিয়ে না দিয়ে অন্তত তার কথাটা মন দিয়ে শুনবে এবং এরকম একটা ঘটনাকে একটু বিজ্ঞানের আলোয় বোঝার চেষ্টা করবেন।

     ‘তুমি ছেলেমানুষই বটে লুকা–’ কর্নেল মাথা নেড়ে হাসলেন। আমাদের সবার দৃষ্টি তাঁর দিকেই নিবদ্ধ।

     ‘বিশ্বাস করুন কর্নেল, আমি সত্যি বলছি–’ লুকা কাতরে উঠলো।

     ‘বিশ্বাস করতে চাইছি কিন্তু পারছি কোথায়? তোমার হাতের পাঞ্জায় ঝুলছে রোসারি, তুমি ধর্মভীরু মানুষ। তুমি বিপদে পড়ে বিজ্ঞানীর খোঁজ করছো কেন? সেখানেই আমার দ্বিতীয় খটকা–’

     আমার দৃষ্টি দ্রুত লুকার হাতের দিকে গেল, ক্রশসুদ্ধ জপমালাটা চোখে পড়ল বটে।

     ‘আমি ধর্মভীরু কিন্তু বোকা নই। আমার মায়ের যখন ক্যান্সার হয় তখন প্রার্থনায় কিছুই হয়নি, ওষুধ আর চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে। আমি একটা জিনিস বুঝি, ঈশ্বরের সব থেকে বড় দানগুলোর মধ্যে একটা হল জ্ঞান এবং বিজ্ঞান। আর তা ছাড়া সত্যি কথা বলতে আমার কাছে মাত্র দুটো জায়গায় যাবার ঠিকানা ছিল। পুলিশ আগেই আমাকে ভাগিয়ে দিয়েছে, ওদের ধারণা আমি খুব বেশি ভয় পেয়েছি বলেই এমন ভুলভ্রান্ত খবর ছড়াচ্ছি। তাই এরপর শুধু একজনই আমাকে বাঁচাতে পারতো–’

     ‘গোপনীয়তা তোমার নিরাপত্তার জন্য খুব দরকারি বুঝলাম কিন্তু এখানেই ধাক্কা খাচ্ছি তৃতীয় খটকায়। এত রাতে তুমি কীভাবে নিকোলার জামাকাপড় এমনকি তার হাতের উল্কিটাও পরিষ্কার দেখতে পেলে?’

     ‘সেদিন পূর্ণিমা ছিল, আকাশে গোল থালার মতো চাঁদও ছিল কর্নেল। ওরা অপারেশন চালাবে বলে আগে থেকেই রাস্তার আলোগুলো ভেঙে রেখেছিল বোধহয়, বস্তি অন্ধকার থাকলেও পাহাড়ের গায়ে যে ছোট্ট শহরতলি আছে সেখান থেকে আলো ছিটকে পড়ছিল গলিতে–’

     ‘ধরে নিলাম তোমার সব কথা সত্যি, কিন্তু এক্ষেত্রে বিপদের কি আছে? নিকোলাকে জেলে পুরে ফাঁসি দেবার দায়িত্ব পুলিশের তাই না?’

     লুকা এবার নিঃশব্দে জ্যাকেটের ভিতরে হাত চালান করে একদিস্তে খবরের কাগজ বার করল। কর্নেল সংবাদপত্র খুলতেই আমরাও মাথা বাড়িয়ে ধরলাম।

     লাল রঙে দাগানো বিভিন্ন খবরের কাগজে ছোট্ট ছোট্ট সংবাদ।

     ‘মিলানের ব্যস্ত পাবে দেখা মিললো ফ্রাঙ্কোর ভাই বিলির: পুলিশের আক্রমণ কি তবে মিথ্যে?’, ‘ফ্লোরেন্সের ব্যবসায়ীর বাড়িতে দুষ্কৃতীদের আক্রমণ: সিলভিও কি এখনও জীবিত?’

     আমাদের চোখ ছানাবড়া। খবরটা দেখিয়ে লুকাকে কর্নেল প্রশ্ন করলেন, ‘পুলিশকে দেখিয়েছ? ওদের কি মত?’

     ‘ওরা অবিশ্বাস করেছে আমায়। আসলে আমিও বিশ্বাস করতে পারছি না, ওদের মৃতদেহ নিজের চোখে শনাক্ত করেছি কিনা–’

     ‘তোমার ধারণা, কোনও আশ্চর্য উপায়ে ফ্রাঙ্কো এবং তার বাহিনী মৃত মানুষদের বাঁচানোর উপায় বার করছে? রোমের বিপদ বলতে তুমি সে কথাই বোঝাতে চেয়েছ?’

     লুকা আবার হাত চালালো ওর জ্যাকেটের ভিতরে, দুটো পাতা বের করে অন্য আবার। কর্নেল উদ্ভ্রান্ত চোখে সেগুলোকে নিয়ে বসলেন। আমিও মাথা বাড়ালাম।

     লাল রঙের বৃত্তে ঘেরা আরও কয়েকটা টুকরো খবর।

     ‘দক্ষিণ ইতালির হিমঘরে মিললো মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ–’, ‘নেপলসে পাওয়া গেল কুখ্যাত অপরাধীর খুবলে খাওয়া শরীর–’

     লুকা সব ক-টা খবরের কাগজ একসঙ্গে টেনে এনে টেবিলের ওপর রেখে আমাদের দিকে চোখ চালিয়ে বললো, ‘খবরের কাগজগুলোর তারিখ খেয়াল করে দেখেছেন কর্নেল?’

     ‘সব ক-টা তো বিচ্ছিন্ন সংখ্যা?’ কর্নেল দাড়ি চুলকে বললেন। লুকা হাসলো।

     ‘বাইশে জুন, একুশে এপ্রিল, বারই মে–’ লুকা থামলো, ‘আর আমি যে রাতে পাদ্রিকে মরতে দেখেছিলাম সেটার তারিখ হল তেইশে মার্চ–’

     ‘তাতে কি কিছু প্রমাণ হয় লুকা?’ কর্নেল অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন। বুড়ো ঘুঘু যেন হিসেবে মেলাতে পারছেন না কিছুতেই। লুকা স্বভাবতই হতাশ হয়ে পড়ল এবার।

     ‘আমি নিজেও জানি না আমি কি বলতে চাইছি, তবে আমি যা ভাবছি তা যদি হয় তবে ভয়ানক বিপদ লুকিয়ে আছে আমাদের সবার জন্য–’ দশাসই নওজোয়ান সাইক্লিস্ট উঠে পড়লো সোফা ছেড়ে, ‘ধন্যবাদ কর্নেল, আমার কথা সময় করে শোনার জন্য–’

     কর্নেল সোফা ছাড়লেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তোমার কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে বটে তবে একবারও বলিনি যে ব্যাপারটা তলিয়ে দেখা যায় না। ভ্যাম্পায়ার, ড্রাকুলা নয়–এবার দেখছি জম্বিদের পাল্লায় পড়লাম–’

     কথা শেষ হবার আগেই আনা এবং লুকা হৈ হৈ করে উঠলো। আমি আর হালদার মশাই পো ধরলাম।

     আমাদের থামিয়ে কর্নেল জানালেন যে এই ব্যাপারটা নিয়ে তিনি একটু ভাবনাচিন্তা করতে চান, সুতরাং লুকাকে যেন আমাদের সঙ্গে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।

     কিন্তু রাতের খাবার? লুকা দাঁত বার করে চোখ বুজে ঘোষণা করল, ‘পিজ্জা–হোয়াত এলস!’

 

৬. ‘..Come with me …and …you will see…’

রাতভোর লুকার মুখে মুখে শুনে নেওয়া গেল ইতালির রাজকীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি বেড়ে ওঠা অপরাধ আর দারিদ্র্যের সমান্তরাল ইতিহাস। আমি দেড়টার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নির্ঘাত। আনা ওর ঘরে দোর দিয়েছিল বারোটার পর। হালদার মশায় জেগে ঘুমিয়েছিলেন। মুখটা খোলা ছিল কিন্তু চোখ দুটো বন্ধ। তবে কর্নেলের খিঁচুনি খাবার ভয়ে মাঝে মধ্যে মাথা নাড়াচ্ছিলেন অকারণেই। একমাত্র কর্নেল হাসিমুখে লুকার গল্প শুনে গেছেন এবং খাতায় নোট নিয়েছেন। অবশেষে সব গল্প উগরে লুকা ঘুমিয়ে পড়েছে ভোর সকালে।

     ‘উফ কর্নেল, ভাবতে পারবেন না, কি নিশ্চিন্তে আজ রাতে ঘুমোতে যাবো–পাখির মতো হালকা লাগছে আজ নিজেকে–’ দু-হাত ছড়িয়ে পরম শান্তিতে সোফায় দেহ রেখেছে আমাদের বকিয়ে অতিথি। আর আমরা সবাই ঘুমটুম সেরে দুপুরে এসে জড় হয়েছি কর্নেলের ঘরে। পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে।

     ইতালির পরিবেশ দপ্তর অতিথি আপ্যায়নে কার্পণ্য করেনি। সেমিনার শেষ হবার পরেও বিলাস বহুল হোটেলে আরও চারদিন থাকা এবং খাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে গাইডসহ ঘুরতে যাবার আমন্ত্রণ। সেও নিখরচায়। কিন্তু ঠিক কতদিন লাগতে পারে ইতালির অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা সত্যির হদিস পেতে? সে সম্পর্কে আমরা সকলেই সন্দিহান। তাই একটা প্ল্যান ‘বি’ থাকা দরকার। সেটা আনার বরাভয়ে আমরা বুঝে গেছি ভিসা এক্সটেন্ড করার দায়িত্ব সে নেবে। কর্নেল যেন শুধু লুকাকে এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করে দেন–এইটুকুই তার অনুরোধ। আর সাইট-সিয়িং? সেটাও চালু রাখতে হবে, নাহলে সন্দেহ দেখা দিতে পারে সরকারি মহলে।

     ‘গাইদ? নো গাইদ, আ’য়াম ইওর গাইদ মাই ফ্রেন্দ’ ঘুম থেকে উঠেই লুকা আমাদের জানিয়েছে, তারপর আরেকটা বড় হাই ফেলে সে জানিয়েছে, ‘ইতালি ইজ মাই বেলভেদ মাদার, নো ওয়ান নোজ মাই মাদার মোর দ্যান মি!’

     আমরা তার দেশভক্তির সামনে মাথা নুইঁয়ে গাইডকে খারিজ করে দিয়েছি। কিন্তু এত দর্শনীয় জায়গা চারদিনে দেখে শেষ করবো কীভাবে? সাইক্লিস্ট দু-হাত তুলে আমাদের আশ্বস্ত করেছে, ‘আমি তোমাদের ইতালির আত্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাবো–’

     বোঝো ঠ্যালা! উচ্চবাচ্য না করে আমরা রাজি হয়ে গেলাম তার দাবীমতো। রীতিমতো শোরগোল করে সে আমাদের নিয়ে সবে রাস্তায় বেরোবে এমন সময় কর্নেল দরজা আগলে দাঁড়ালেন, তার হাতের দিকে তাকিয়ে আমার চক্ষুস্থির।

     ‘আপনি কি এখন হারু নাপিতের পেটে লাথি মারবেন নাকি?‘ হালদার মশায় জিজ্ঞাসা না করে পারলেন না। বুড়ো ঘুঘু কিন্তু মিটিমিটি হাসছেন। তার চোখ লুকাকে জরিপ করছে ক্রমাগত। আনা কি বুঝলো কে জানে, সে তাড়াতাড়ি সাইক্লিস্টকে টেনে নিয়ে গেল পাশের ঘরে, সঙ্গে কর্নেলও। বন্ধ দরজার ওধার থেকে ভেসে এলো আর্ত চিৎকার, লুকার। একটু পরে দরজা খুলে যে লোকটি বেরিয়ে এলো তার চেহারার সঙ্গে আগের লুকার কোনও মিল নেই।

     ‘আরে চুল-দাড়ি কেটে দিলে আমাদের পার্ক স্ট্রিটের সাহেবসুবোদের সঙ্গে তোমার তো কোনও কোনও ফারাক-ই নেই!’ আমি চেঁচিয়ে উঠি। বিশ্ববিখ্যাত সাইক্লিস্ট এখন ভদ্র কলমপেষা সাহেবে পরিণত হয়েছে। সে একটা নাজেহাল হাসি হেসে কাঁধ ঝাঁকালো।

     ‘এবার আমরা তাহলে কোথায় যেন যাচ্ছি?’ কর্নেল আনাকে প্রশ্ন করতেই আনা লুকার দিকে হাতের ইশারা করলো, শেখানো তোতাপাখির মতো আউড়ে উঠলো, ‘আ’য়াম ইওর নিউ গাইদ, মার্কো, নো মাই ফ্রেন্দ–নট মার্কো পোলো। দিস ওয়ান ইজ মার্কো রুশো আন্দ ইউ আর গোয়িং তু ভিজিত দ্য হারত অফ ইতালি–উমব্রিয়া–দ্য ব্রেডবাস্কেট অফ মাই মাদার–’

     আমরা সোল্লাসে হুঙ্কার জানালাম, যাত্রা শুরু হল।

     আড়াই ঘণ্টার মোটর-যাত্রা শেষে আমরা যখন রোম থেকে উমব্রিয়া পৌঁছলাম তখন সদ্য সদ্য সূর্য সমস্ত লজ্জা সংকোচ ত্যাগ করে গোটা আকাশটাকে কুক্ষিগত করার উচ্চাকাঙ্খা প্রকাশ করে ফেলেছে। আঙুর বনে শিশির সোনা রঙে চমকাচ্ছে, অলিভ পাতায় সবুজের প্রাচুর্য ছলকে পড়ছে, পাহাড়ের কোলে অবহেলায় পড়ে থাকা প্রাসাদের সারি আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপি চুপি দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। পুরানো দিনের গৌরবময় স্মৃতি ভুলতে চাইছে বোধহয়। আমরা কিন্তু এই দেদার আলোর সৌন্দর্যে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। যদিও লুকার মুখ থেকে কথার খৈ ফুঁটছে।

     ফুটুক। ওর লাতিন উচ্চারণে ইংরেজি উবাচ যেন গানের মতোই শোনাচ্ছিল। বেশ একটা আমেজের আবহ তৈরি হচ্ছিল, এমন সময় কর্নেল ড্রাইভারকে থামতে বললেন হঠাৎ।

     ‘পাখি নাকি?’ আনা ত্রস্তহাতে বাইনোকুলার চোখে লাগাতে যাবার আগেই হালদারমশাই তেরছা উত্তর দিলেন, ‘অথবা প্রজাপতি!’

     কর্নেল কিন্তু আমাদের চমকে দিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন না, মুক্তকচ্ছ হয়ে কোনও দিকে দৌড়েও গেলেন না। শুধু কড়া চোখে লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করতেই একটা নীল রঙের ফিয়াট পান্ডা গাড়িকে দেখতে পেলাম আমাদের অনেকটা পিছনে। ওরা বোধহয় আমাদের থমকে যাওয়া খেয়াল করেনি। পাহাড়ি মোড়টা ঘুরতেই ওরা প্রথম বুঝলো যে আমরা ওদের এগিয়ে যাবার অনুমতি দিয়ে সাইড দিয়েছি। খানিক হকচকিয়ে গিয়েই বোধহয় ওরা একটু জোরে গাড়ি চালিয়ে আমাদের পাশ দিয়ে উড়ে গেল।

     ‘ক’জন?’ আনা সচকিত প্রশ্ন করতেই লুকা উত্তর দিল, ‘পাঁচজন।’

     ‘কাউকে চেন?’ কর্নেলের প্রশ্ন লুকাকে।

     ‘কালো কাচ ছিল কর্নেল, কাউকে পরিষ্কার দেখতে পাইনি। তা ছাড়া ওরা এমন কাউকে পাঠাবে না যাদের আমি চিনতে পারি’ লুকা গম্ভীর গলায় বললো।

     ‘কালো কাচ মানেই মাফিয়া–’ আনা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

     ‘কথাটা সত্যি বটে, তবে কিনা এমন কালো কাচ ওরা ব্যবহার করবে না যাতে ওদের গাড়ির ভিতরটা আমরা সবাই দেখতে পাই–’ লুকা মাথা নাড়লো।

     ‘ঠিক আছে, ওদের এড়িয়ে গেলেই হল–’ কর্নেলের আঙুলের ইশারায় আবার আমাদের গাড়ির ইঞ্জিন বেজে উঠলো।

     পেরুজিয়া এই অঞ্চলের এক বিখ্যাত শহর। ইউনিভার্সিটি, কাচের গায়ে রঙিন ছবি আঁকার পাঁচশো বছরের পুরানো স্টুডিয়ো, হস্তচালিত তন্তুবায়, ছাগলের দুধে তৈরি চিজ–এসব দেখে মোহিত হবার পর যখন আমরা যখন পেরুজিনা চকলেট চাখছিলাম ঠিক তখনই একজন টাকমাথা লম্বা মানুষ আমাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় লুকার কানে কানে কিছু বলে গেল। ওদের দেশোয়ালি ভাষা। ভঙ্গির মধ্যে গুপ্তবার্তা পাঠাবার প্রয়াস। লুকার দেহভঙ্গিতে ক্ষিপ্র খরগোশের চাঞ্চল্য লক্ষ করা গেল। আমাদের উদ্দেশে দাঁড়িয়ে থাকার একটা ইঙ্গিত ছুঁড়ে সে ভিড়ের মধ্যে গা ভাসালো।

     আমরা যখন তার এবং আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছি ঠিক তখনই সাইক্লিস্টের আগমন আবার।

     ‘পুলিশের লোকেরা আমাকে নিরাপত্তা দিতে সর্বদাই সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে, ওরা জানালো একদল দেশোয়ালি আমাদের পিছু নিয়েছে–’ তার গলায় উদ্বেগ।

     ‘এবার তাহলে পালাতে হবে?’ আমি কাতরে উঠলাম।

     ‘নো মাই ফ্রেন্দ, যতক্ষণ ঘোরা শেষ হচ্ছে না ততক্ষণ আমরা কোত্থাও যাচ্ছি না’, এবার তার মুখে একটা চতুর হাসি ফুটলো, ‘তবে গাড়িটা পাল্টে নিচ্ছি, সেই সঙ্গে চলার পথটাও। এমন পথ ধরবো যে ওরা চাইলেও আমাদের কিচ্ছুটি করতে পারবে না। বলেছি না, ইতালি আমার মা–’ তার এই অতিরিক্ত মাতৃপ্রেম আমাদের বাংলা সিনেমার নায়কদের মাতৃপ্রেমের সঙ্গে কিছুটা মিলে যায়। তাই প্রিয় প্রাণের জন্য কিছুটা চিন্তা বুকের কোনায় সামান্য খোঁচা মারে।

     কিন্তু লুকা অসাধারণ। গলির মধ্যে দিয়ে, বাগানের ওপর দিয়ে, মানুষের বাড়ির ভিতর দিয়ে সে যে কিভাবে ড্রাইভারকে ক্রমাগত তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ালো তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। অবশেষে একটা পাহাড়ি উপত্যকার সামনে এসে সে নাটকীয় ভঙ্গিতে দু’হাত ছড়িয়ে বলে উঠলো, ‘দিজ ইজ মাই ফ্রেন্দ–দ্য ব্রেদবাসকেত অফ মাই মাদার–’

     সত্যিই রুদ্ধবাক হয়ে যাবার জোগাড়। সামনে ফুলের পাপড়িতে মোড়া একটা আস্ত উপত্যকা। লাল, বেগুনি, নীল ফুলের সমুদ্র হাওয়ার তালে দুলছে। ফলেছে ভুট্টা, ফলেছে আরও নানা ফসল। চোখ বুজে আমি তখন ঝুরঝুরে হাওয়া বুকে টেনে নিচ্ছিলাম। মাথা ঘুরিয়ে কর্নেলকে খুঁজতে গিয়ে চমকে উঠলাম। কারণ আমাদের সমবেত জটলাকে লক্ষ্য করে একদল কুঁদো চেহারার জোয়ান ছুটে আসছে। তাদের উদ্দেশ্য যে ভালো নয় সেটা তাদের চোখেমুখে পরিষ্কার লেখা আছে।

     আমিও পাঁজর তোলপাড় করে চেঁচালাম, ‘সাবধান সবাই’, তারপর চোখ বন্ধ করে ফেললাম ভয়ে। তারপর কি হল?

     ‘হাত ওপরে, চালিয়াতি করলেই এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবো-“’ একখানা মুশকো টাকমাথা গুন্ডা আমাদের উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠলো। তার মতোই দলের বাকিদের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র। দেখে শুনে মনে হল রেমিংটন শট গান এবং ওদের নলগুলো আমাদের দিকে তাক করা। পিলে চমকে আমার একদম বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। আমি যখন কথা হাতড়াচ্ছি ঠিক তক্ষুনি কর্নেলের ভারী গলা শোনা গেল, ‘আজকাল দেখছি ভদ্রতা দেখাতেই ভুলে যাচ্ছে মানুষ।’

     তার হাতে একখানা পিস্তল এবং সেটার নলখানা টাকমাথার কানের পিছনে গোঁজা। টাকমাথার সঙ্গী রোগাপানা ঝাঁকড়া চুল নেতার উদ্দেশে হতাশ হয়ে খিঁচিয়ে উঠলো, ‘দু’খানা বন্দুক নিয়ে ঘোরার কি দরকার যখন দ্বিতীয়টা সামলাতে পারো না?’ টাকমাথা বিরক্ত হয়, ‘দেখছো তো, শটগানটা ধরতে দুটো হাত লাগে!’ ঝাঁকড়ামাথা মাথা দুলিয়ে বন্দুক নামিয়ে নেয়, টাকমাথাও। কর্নেল ওদের পিছন থেকে সামনে এসে দাঁড়ান, পিস্তলটা খুঁটিয়ে দেখে প্রশ্ন করেন, ‘মাকারোভ পিস্তল? রাশিয়ার সরকারি অফিসারদের অস্ত্র তোমাদের হাতে কি করছে? ওহ, আসল কথা তো জানাই হল না, তোমাদের পরিচয়?’

     ‘আমরা রবের্তো বেলুচিনির লোক। তোমাদের সঙ্গে ওই যে লোকটা আছে, ওর সঙ্গে আমাদের একটু দরকার আছে’ টাকমাথা গম্ভীরভাবে লুকাকে চোখের দৃষ্টিতে মেপে নিয়ে নিজের দাবি জানালো।

     ‘আমাদের কাউকে দিয়ে চলবে না? ঠিক ওই লোকটাকেই চাই? ওর কি দোষ?’ কর্নেল হাসলেন।

     কর্নেলকে কড়া দৃষ্টিতে ভস্ম করে দিয়ে টাকমাথা ঘোষণা করলো, ‘ওর নাম, মার্কো রুসো, রবের্তোর মাল ঝেঁপে দিয়েছে–পাঁচ হাজারের মাল–’

     আমরা একে অপরের দিকে বোকার মতো চাইলাম। নাম তো ঠিক, কিন্তু লুকা কখন এমন কাজ করলো? ছদ্মবেশী নামেও গন্ডগোল?

     ‘তোমাদের ভুল হচ্ছে, আমার নাম মার্কো রুসো বটে–তবে কিনা আমি আজই প্রথম ক্লায়েন্ট নিয়ে বেরোলাম। বাপের জন্মে কোনওদিন কারও কোনও ‘মাল’ চুরি করিনি—’ লুকা দু-হাত তুলে সাফাই গাইলো।

     ‘ওর নাম আর পরিচয় তোমাদের হাতে গেল কি করে?’ কর্নেল ধমকালেন। ‘হোটেল থেকে নিশ্চয়, ওদের লোক সব জায়গাতেই আছে’ উত্তর দিল আনা। টাকমাথা নড়লো।

     ‘ওহ, আমাদের হোটেলে আরেকজন মার্কো রুসো আছে কিন্তু। যদিও মাসখানেক ধরে সে বেপাত্তা—’ লুকা এবার হেসে ওঠে। ঝাঁকড়ামাথা রোগা লোকটা এবার বিরক্ত হয়ে বন্ধুর উদ্দেশে খেঁকিয়ে ওঠে, ‘ওহ, কাজে বেরোবার আগে একটু আসল-নকল যাচাই করবে তো?’ টাকমাথা উত্তরে একবার কর্নেলকে এবং তারপর নিজের অনুচরকে নিঃশব্দে দেখে নিয়ে পকেটে হাত ঢোকায়। তার হাতে একটা পোস্টকার্ড মাপের ছবি। আমরা সবাই সেদিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, একজন স্কুল শিক্ষকের মতো নিরীহ দেখতে মধ্যবয়সী মানুষের হাস্যময় মুখের ছবি সেখানে। ভুল মার্কো রুসো।

     বেচারা। এই লোকটাকেই একদল সশস্ত্র লোক খুঁজে বেড়াচ্ছে? ভাবতেই লোকটার প্রতি একটা দরদ অনুভব করলাম। ওঁকে পেলে রবের্তোর লোকেরা যে জামাই আদর করবে না সেটা নিশ্চয় আর আলাদা করে বলে দিতে হবে না।

     ‘দুঃখিত, ভুল হয়ে গেছে মশাইরা। আমাদের ছেলেরা আর আপনাদের বিরক্ত করবে না, ইতালিতে আপনাদের ভ্রমণ সুখকর হোক–’ টাকমাথা তার বন্ধুকে নিয়ে পিছু ফেরে।

     ‘ওহে, চুরি করা বন্দুকটা তো ফেলে যাচ্ছ—’ কর্নেল মিছরির ছুরির মতো হাসলেন। লোকটার হোলস্টারে পিস্তলটা ঢুকিয়ে একটা জবরদস্ত হ্যান্ডশেক করে গুন্ডাদের বিদায় জানালেন তিনি। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

     আনা মাথা নাড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো, ‘সব আমার ভুল, হোটেলের গাইডের লিস্ট থেকে নাম বাছার সময় কেন যে এই লোকটার নাম ধার করেছিলাম!’

     ‘কাকতালীয় ব্যাপার, ও নিয়ে মন খারাপ করো না’ কর্নেল আনাকে স্বান্তনা দিয়েই লুকার দিকে ফেরে, ‘তুমি কি সত্যিকারের মার্কোকে চিনতে নাকি?’

     লুকা হাসে, ‘ওই ব্যাপারটা আমার উর্বর কল্পনাশক্তির ফসল–’

     তার ভাবভঙ্গি দেখে আমরা হেসে উঠি। যদিও উমব্রিয়া ছাড়ার পর বাকি পথটা লুকার এই কল্পনাশক্তির নানা গল্প শুনে রীতিমতো কান্না পাচ্ছিল। তবে একটা কথা পরিষ্কার কথা বোঝা যাচ্ছিল, ড্রাগ ব্যবসার গোপন অন্ধিসন্ধি খুঁজতে সত্যিই ছেলেটাকে অজস্র বিপদের সামনে পড়তে হয়েছে। বিরক্তির সঙ্গে বেশ খানিকটা সম্ভ্রম জাগছিল এই ছটফটে ছেলেটার প্রতি।

 

৭. ‘…মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার…’

হোটেলে ফিরতে ফিরতে ঘড়িতে বেজে গেল রাত দশটা। ডিনার সেরেই এসেছিলাম পথে। প্লেট ভর্তি করে পাস্তা আর ভেড়ার মাংসের ঝোল খেয়ে পেটটা আইঢাই করছিল বলে হোটেলের বাগানে একটু হাত পা ছুঁড়ছিলাম, চারদিকে তখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ব্যস্ততা। কেউ ম্যাগাজিন পড়ছেন গার্ডেন চেয়ারে শুয়ে, কেউ পানীয় গ্লাসে ঢেলে একলা একলাই সময় কাটাচ্ছেন, কারও চোখে বাইনোকুলার, কারও হাতের ক্যামেরায় খালি কুটুস কুটুস শব্দ। আমি চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওদের চোখেই ইতালির সৌন্দর্য চেখে দেখছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম। একটা গার্ডেন চেয়ার ফাঁকা হতেই ঠান্ডা পানীয়ের গ্লাস হাতে বসে পড়লাম হাত-পা ছড়িয়ে। পাশেই খবরের কাগজে মুখ ঢেকে এক বৃদ্ধ বসে ছিলেন আয়েস করে।

     ‘ভারতীয়?’ খবরের কাগজের পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে যখন বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে প্রশ্নটা কে করলেন তখন কাঁধে একটা হাতের স্পর্শ পেলাম। মাথা ঘুরিয়ে আরেকজন বৃদ্ধকে আবিষ্কার করলাম। তার মুখে হাসি, প্রশ্নটা তাঁর।

     ‘হ্যাঁ, আর আপনি?‘

     ‘নাম গুস্তাভো, ধাম ফ্রান্স। তোমার ঠিক পাশে বসে খবর গিলছে আমার ভাই চার্লস’ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আগের দেখা বুড়োর পরিচয় করিয়ে দিলেন। কাগজ সরিয়ে যে মুখটা বেরিয়ে এসে ‘হাই’ বললো তাঁকে দেখে আমার পিলে চমকে যাবার জোগাড়। আমাকে অবাক হতে দেখে গুস্তাভো হাসলেন, ‘আমরা যমজ’ আমি হেসে ‘হেলো’ বলে কাজ সারলাম। কিন্তু একদমই কথা না বলে আলাপচারিতা শেষ করাটা বেমানান বলেই গুস্তাভোকে প্রশ্ন করে বসলাম, ‘কেমন লাগছে ইতালি?’

     বুড়ো আমার পাশের খালি চেয়ারে ধপ করে বসে ভ্রূ কোঁচকালেন, ‘আজকের খবর পড়েননি মনে হয়?’

     অশনি সংকেত। মাথা নাড়িয়ে না বলতেই গুস্তাভ একটু হাই তুলে বললেন, ‘রোম এখন বিপজ্জনক ভাইটি, অ্যাঙ্গলিকান চার্চে তিনখানা লাশ পাওয়া গেছে। নৃশংস, নারকীয়। স্বয়ং ঈশ্বরের ঘরে এমন পাপ!’

     কথাগুলো শুনতে শুনতে আনমনে কখন যেন চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছি, কখন বাগান ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে রিসেপশন পেরিয়ে এলিভেটরের কথা ভুলে আবার সিঁড়ি ধরেছি উদ্ভ্রান্তের মতো।

     চার্চের নামটা ভীষণ চেনা। লুকার মুখে ওই চার্চের পাদ্রীকেই আক্রান্ত হতে শুনেছিলাম সেদিন। তাই আজকের ঘটনাটা এতটাই তাৎপর্যবহুল। আমি দৌড়ে কর্নেলের ঘরে বেল বাজাতেই আনা দরজা খুলে দাঁড়ালো। তার মুখ গম্ভীর। মাথা বাড়িয়ে ঘরের ভিতর উঁকি দিতেই চোখে পড়লো হালদারমশায়, কর্নেল এবং লুকার সংকিত চেহারাগুলো। লুকা মাথায় হাত দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। ঘরের দেয়ালে টিভি চলছে সশব্দে। স্ক্রিন জুড়ে রক্তাক্ত খুবলে খাওয়া মৃতদেহের চালচিত্র। সেই সঙ্গে রিপোর্টারের আবেগঘন প্রতিবেদন।

     ‘ভিতরে এসে বস–’ আনার আহ্বানে ঘরে ঢুকে লুকার কাছে দাঁড়ালাম। বেচারা ভেঙে পড়েছে একদম।

     ‘দুঃখিত’ আমি সান্ত্বনা জানাতে চাইছিলাম, লুকা আমার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠলো, ‘আমি বলেছিলাম’ তার চোখের মণিদুটো একে একে আমাদের সকলের চোখ ছুঁয়ে যায়। আমরা মাথা নিচু করি।

     ‘এর মূলে আঘাত না করে আমি এবার বাড়ি যাচ্ছি না। কি বল জয়ন্ত?’ কর্নেল গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলেন। আমরা সবাই নীরবে সায় দিলাম। লুকার মুখে একটা বিষণ্ণ হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।

     ‘বাবা-মায়ের জন্য মনটা কেমন করছে। আমার জন্য ওদেরও বিপদ কিছু কম নয়’ লুকা ঘর ছাড়ার আগে ঘোষণা করে গেল। হোটেল ছেড়ে আজকের রাতটা ও বোধহয় নিজের বাড়িতেই কাটাবে। দরজাটা যখন বন্ধ করতে যাবো আবার লুকার মুখখানা উঁকি মারলো।

     ‘কাল সকাল আটটায় বেরোবো কিন্তু, সবাই তৈরি থাকবেন প্লিজ’ আবার সে উধাও।

     কর্নেলের বরাভয়েও লুকা নির্লিপ্ত। সে বোধহয় ধরেই নিয়েছে এমন বিপদ থেকে রোমকে বাঁচানো কর্নেলের কর্ম নয়। কথাটা ভাবতেই কানদুটো লাল হয়ে উঠলো আমার। আমি করুন চোখে বুড়ো ঘুঘুর দিকে চোরা চাহনি ছুঁড়লাম। প্রশান্তি। তাঁর চেহারায় বিরাজ করছে একটা শান্ত কঠিন দৃঢ়তা। আমি খুশি হলাম। মনের মধ্যে একটা আশার আলো জ্বলে উঠলো দপ করে।

     সেই সঙ্গে একটা প্রশ্ন মাথার মধ্যে গঙ্গাফড়িঙের মতো লাফালাফি শুরু করল–কর্নেলের মাথায় এখন ঠিক কী চিন্তাভাবনা চলছে?

     সেদিন রাতে ঘুম হল না। বারবার ঘুমের মধ্যেই মনের আয়নায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন চেহারাগুলো উঁকি মেরে যাচ্ছিল। অন্ধকারে ছটফট করতে করতেই হঠাৎ বুঝতে পারলাম যে পূর্ব আকাশে আলো জেগে উঠেছে। কোনও রকমে চোখেমুখে জল ছিটিয়ে ছুটে গেলাম কর্নেলের ঘরে। আসলে জানতে চাইছিলাম বুড়ো ঘুঘুর মাথায় কোনও ‘একশন প্ল্যান’ খেলছে কিনা।

     সবে দরজায় লাগানো বেলটা চাপতে যাবো এমন সময় ঘরের মধ্যে থেকে একটা অচেনা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। তবে কি বুড়ো মানুষটা টিভি চালিয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন? আবার কান খাঁড়া করে শুনতে চেষ্টা করলাম গলাটা। বয়স্ক মানুষ। ভাষাটা বাংলা। ‘পরে আসবো আবার, অনেক কাজ বাকি’, এইটুকু পরিষ্কার শুনতে পেলাম। তবে কি ইতালির টিভিতে বাংলা চ্যানেলগুলোও আসে!

     ‘জয়ন্ত, এসব বদভ্যাসগুলো আবার কোত্থেকে শিখলে?’ মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম আনা আর হালদারমশাই আমার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে ভ্রূ বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দুজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে রুম সার্ভিসের সুন্দরী যুবতীও। লজ্জায় জিব কেটে ধরণীকে দ্বিধা যেতে অনুরোধ করতে যাবো, এমন সময় কর্নেলের দরজা খুলে গেল সশব্দে। বুড়ো মুখ বাড়িয়ে বললেন, ‘এইভাবেই সবার গুপ্ত খবরগুলো বের করে আনো বুঝি?’

     কর্নেল ঘরে বসেই বুঝে গেলেন আমি দরজায় আড়ি পারছিলাম? এ লজ্জা কোথায় রাখবো?

     ‘আহা, বেচারাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হোক’ হালদার মশায় আমাকে বাঁচাতে চাইলেন। কর্নেল হাসলেন, ‘ও আমার কাছে চিরকালের অপরাধী’ আনা আর হালদার মশাই সেই সুরে সুর মিলিয়ে বিচ্ছিরিভাবে হাসতে শুরু করলেন। ভাগ্যিস লুকা এসে পৌঁছল।

     ‘স্যালভে!‘ সাইক্লিস্টের মুখটা আজ ভোরের আলোয় একটু উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। আমরাও সোল্লাসে নিজেদের ভাষায় সুপ্রভাত জানালাম তাকে। পাউরুটি, মাখন আর ওমলেটের ট্রলি নিয়ে রুম সার্ভিসের মেয়েটাও হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো ঘরে। একসঙ্গে জলযোগ করার এই অভিনব ধারণাটা আনার। ডাইনিং রুমে যে পাত পেড়ে ভোজনের ব্যবস্থা আছে তাতে আমাদের যোগ দেবার অধিকার নেই। কারণটা লুকার পরিচয় গোপন রাখার দায়বদ্ধতা। তাই এই সমবেত জলযোগের ব্যবস্থা।

     মাখনের পুরু আস্তরণে পাউরুটিরকে মুড়ে মুখে চালান করে দেবার অবসরে আমাদের আলোচনা জমে উঠলো অবিলম্বে।

     ইতালির সৌন্দর্য নিয়ে নিয়ে যতই মন ভুলিয়ে রাখতে চাই নিজেদের অজান্তে ততই দুঃসংবাদের বিষণ্ণতা আমাদের চেপে ধরতে চায়। সবার মনেই একটু একটু করে লুকার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রতিশোধ নেবার জন্য মাফিয়ারা যে কোন পথ ধরতে পারে। আর সে পথে শুধু রক্ত আর মৃতদেহের স্তূপ জমবে থরে থরে। আমাদের সহজ সরল পরোপকারী বন্ধুটির কাঁধে কখন সেই রক্তাক্ত থাবা এসে পৌঁছবে সেটা শুধু সময় বলতে পারে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা দম বন্ধ করা ভয় গুমরে গুমরে উঠতে শুরু করেছিল।

     ‘ধুর ধুর, অত ভেবে লাভ নেই,’ হঠাৎ লুকা ফুকরে উঠলো, ‘চলুন তো রোমের রাস্তায় একটু ইতিহাস ছুঁয়ে দেখবেন এবার–’

     উপায় নেই। ঘরে বসে শত্রুর ভয়ে সিঁটিয়ে থাকার চেয়ে বরং রাস্তায় নেমে জীবনের রঙে একটু নিজেদের ভিজিয়ে নেওয়া যাক। সেই ভাবনাতেই ভর করে আমাদের ছোট্ট দলটা বেরিয়ে পড়লো রাস্তায়।

     সকাল সাড়ে আটটায় কোলোসিয়ামের টিকিট কাটতে গিয়ে দেখলাম লাইনের দৈর্ঘ্য এক্সপ্রেস ট্রেনের রূপ ধারণ করছে। আনা ব্যাগ থেকে মুঠো বার করে কতগুলো কাগজের তাড়া আমাদের চোখের সামনে নাচালো ট্রফির মতো। টিকিট! আমাদের আমন্ত্রণকর্তারা কোন কিছুতেই কোন খুঁত রাখেননি। একগাল হাসি নিয়ে আমরা ঢুকলাম কোলোসিয়ামের ঘেরাটোপে। গাইড দরকার নেই, লুকা একাই বকে বকে আমাদের কানের পর্দা দখল করে বসে আছে। ফোরাম, অল্টার দেলা প্যাট্রিয়া, প্যান্থিওন, ট্রেভি ফাউন্টেন, স্প্যানিশ স্টেপস, ভ্যাটিকান মিউজিয়াম, সিস্টিন চ্যাপেল, সেন্ট পিটার’স ব্যাসিলিকা–রোমে যে দেখার জিনিসের প্রাচুর্য আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মানুষের সৃষ্টিতে দেবত্বের ছোঁয়া দেখে ততক্ষণে মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করেছিল। পেটের মধ্যেও খিদের দামামা। দুপুরে কয়েকটা শুকনো স্যান্ডউইচ ছাড়া আনা আমাদের আর কিছুই খাবার অনুমতি দেয়নি। দুপুরে একথালা ভাত খেয়ে যাদের পেট ভরে তাদের কাছে ওইটুকু খাবারের কোনও মান আছে? কিন্তু সেকথা ওই বিলিতি মেয়েটাকে কে বোঝায়!

     সন্ধ্যা সাতটায় যখন একপ্লেট পাস্তা, রগরগে চিকেন জাফিরানো, ব্রূসত্তা সাফ করে পিজ্জা খাবার দাবি জানালাম দেখলাম লুকার মুখ হাঁ হয়ে গেছে আর কর্নেল মিটিমিটি হাসছেন। সাদা শনের মতো দাড়িগুলোতে বিলি কাটতে কাটতে বেশ মজা করে আমার বিশ্বগ্রাসী খিদে মাপছিলেন তিনি।

     পিঁপ… পিঁপ… পিঁপ…

     লুকার ফোন বেজে উঠলো। পকেট হাতড়ে ফোন বার করে কিছু একটা মন দিয়ে দেখছিলো সে। দেখছিল এবং কাঁপছিলো। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চাটছিল। ওর আমন্ত্রণের অপেক্ষা না করেই আমাদের মাথাগুলো ঝুঁকে পড়েছিল ওর ফোনের স্ক্রিনে। আমরাও কাঁপতে শুরু করেছিলাম। ভিডিয়োটা দেখে।

     অন্ধকার কেবিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে কতগুলো রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত মানুষ। দরজায় ধাক্কা মেরে ভাঙছে, পাহারাদার পুলিশের টুঁটি কামড়ে ধরছে, তারপর কাঁপতে কাঁপতে দুলতে দুলতে এগিয়ে চলেছে। আবার ভাঙছে দরজা। কয়েকটা গুলির শব্দ হল। ওরা মাটিতে পড়ে গেল। আবার উঠে দাঁড়ালো। টলতে টলতে সামনের দিকে এগিয়ে গেল ওরা। সিসিটিভি-র ক্যামেরায় তোলা। এর পরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না, শুধু আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। করুন, মর্মভেদী। রক্ষক নিজেই এখন খাদ্য। ভিডিয়োটা লুকাকে পাঠিয়েছে পুলিশ দপ্তরে কর্মরত এক ‘বন্ধু’।

     ‘আমি আজ সকালে ওকে অনুরোধ করেছিলাম চার্চের খুনের কেসটা নিয়ে আমাকে একটু ডিটেলস পাঠাতে’ লুকার চোখে দুঃস্বপ্নের অন্ধকার। আমরাও দিশাহারা।

     ‘এরা কি চার্চে নিহত মানুষ?‘ কর্নেল প্রশ্ন করলেন।

     ‘হুম, ও লিখেছে, ‘মর্গ থেকে চুরি গেছে আরও তিনটে লাশ’’ লুকা উত্তর দিল।

     ‘কোন তিনটে লাশ?‘ আনার প্রশ্ন।

     লুকা স্ক্রল করে নামালো মেসেঞ্জারের বার্তা, সেখানে লেখা নামগুলো, ‘বিলি, আন্তেনিও ও সিলভিও’

     ইতালির মাফিয়া সাম্রাজ্যের তিন যুবরাজ। পুলিশের হামলায় মৃত তিন জন্যেই। তবুও তাদের দেহ চুরি খোদ পুলিশের নাকের ডগা থেকেই? কিন্তু কী কারণে এমন চুরি?

     আমার খাওয়া লাটে উঠলো।

 

৮. ‘Moths that fly by day..’

সেদিন রাতে আমাদের দলটায় শুধুই শ্মশানের নিস্তব্ধতা। মূক যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে লুকা আবার লুকিয়ে বাড়ির পথ ধরেছিল। আমিও মন খারাপ নিয়ে ঘুমোতে যাবার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আর ঠিক তখনই শব্দটা শুনতে পেলাম। যেন একসঙ্গে অনেকগুলো বোমারু বিমান রোমের আকাশে এসে উদয় হয়েছে। কান খাঁড়া করে শব্দের উৎস অনুসন্ধান করতে যাব এমন সময় ব্যালকনির কাচের দরজায় শব্দ হল, ‘ঠকাস-’, চমকে উঠে দ্রুত সেদিকেই পা বাড়িয়েছিলাম আমি। দরজা সরিয়ে চারদিকে চোখ চালিয়েছিলাম ব্যতিবস্ত হয়ে। কিছুই নজরে এলো না বলে হতাশ হয়েই দরজা বন্ধ করতে যাবো এমন সময় দেখতে পেলাম ‘তাকে’ একটা এক আঙুল লম্বা পাখি। বেচারি মেঝের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। শরীরটা হঠাৎ হঠাৎ খিঁচিয়ে উঠছে, বেঁকেচুরে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। ডানা ঝাপটাবার শব্দটাই একটু আগে শুনেছিলাম, জেটের কান কাঁপানো গুঞ্জন। মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। হাতের তালুতে প্রাণীটাকে সাবধানে তুলে দেখলাম। আজবদর্শন পাখিটা যখন হাতের তালুয় ছটফট করছে তখন ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা লম্বা শুঁড়টাকে লক্ষ করলাম। এ কেমন পাখি? ঠোঁটের বদলে শুঁড়? এদিকে পাখিটা মৃত্যুর সঙ্গে যুঝছে, নিরুপায় হয়ে আমি দরজা খুলে ঘর ছাড়লাম। লক্ষ্য কর্নেলের ঘরটা। দরজা ধাক্কিয়ে যখন তাঁকে ঘুম থেকে তোলা গেল তিনি আমার অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন।

     ‘কি হল জয়ন্ত?’ কর্নেলের চোখের সামনে হাতের তালুটা মেলে ধরলাম।

     ‘পাখিটা অসুস্থ, ওকে বাঁচিয়ে তুলুন’ কোনওক্রমে কথাটা শেষ করতে পারলাম।

     কর্নেল সাবধানী হাতে প্রাণীটাকে নিজের হাতে নিয়ে টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দুঃখিত জয়ন্ত, প্রাণীটা মৃত’।

     ‘ইশ, নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে’ আমি হতাশ হয়ে বলে উঠলাম। কর্নেল মাথা নাড়ালেন, ‘তুমি চেষ্টা করেছিলে এটাই যথেষ্ট। আর তা ছাড়া এটা ‘সত্যিকারের’ পাখি নয়। হামিংবার্ড হক মথ- এটার নাম। হুবহু হামিংবার্ড পাখির মতো হাবভাব, কিন্তু আসলে ও একটা মথ। ওর সামনের শুঁড়টা দিয়ে ও ফুলের মধু চুষে নেয়। নিশ্চয় কোনও বিষাক্ত ফুলের মধু’ কর্নেল থেমে গেলেন তারপর তড়িঘড়ি ছুটে গেলেন নিজের ট্রলিব্যাগটার কাছে। একটু পরে এসে উদয় হলেন হাতে আতস কাচ নিয়ে। গম্ভীর ভাবে প্রাণীটাকে নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে একটাই কথা বললেন শুধু, ‘ঘুমোতে যাও জয়ন্ত, মন খারাপ কমাতে ঘুমের মতো ওষুধ আর হয় না।’

     কড়া নির্দেশ। তাই পরীক্ষানিরীক্ষা নিজের চোখে দেখার ইচ্ছে লুকিয়ে আবার নিজের ঘরে রওনা দিলাম। একটা অস্বস্তি শরীর জুড়ে দাপাদাপি শুরু করল এবার। নেহাতই নিরীহ একটা সায়েন্স কনফারেন্স এমন করে দুঃস্বপ্নে বদলে যাবে কে জানতো? আর এবারের ‘কেসে’ সবকিছুই কেমন যেন দিশাহীনভাবে হাতড়ে বেড়াচ্ছি সবাই, কোথাও কোনও খেই নেই। এদিকে সময় শেষ হয়ে আসছে দ্রুত। চরম বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে বালিশ আঁকড়ে ধরে চোখ বুজলাম। পান্থেওনের উঁচু ছাদটার কথা ভাবতে শুরু করেছিলাম কখন যেন। তারপর দেখলাম একটা দ্বীপের ছবি। আর তারপরেই একটা শান্ত সমাহিত দাড়িগোঁফে ঢাকা মুখের ছবি। দু-চোখে তার ক্ষমা এবং বেদনা। ভদ্রলোক কে? আমাদের গল্পের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কি?

     নিজেও বুঝতে পারিনি কখন যেন আমার নাক ডাকতে শুরু করেছিল ঘর কাঁপিয়ে।

     পরদিন আমাদের লম্বা ভ্রমণ। রোম ছেড়ে আমরা যাবো সান ফ্রাত্তুসো, কেন এবং কি দেখতে সেটা লুকা মোটেও ভেঙে বলেনি। ‘ওয়েত অন্দ সি!’ বাকিটা বলেই সে মুখে কুলুপ এঁটেছে। আনাও মিটিমিটি হেসে আমাদের হাতের ফোন কেড়ে নিজের ব্যাগে পুরে নিয়েছে, নচেৎ গুগল বাবাজির কল্যাণে রহস্য ফাঁস হয়ে যাবার উপক্রম হতে পারে।

     পাঁচ ঘণ্টার লম্বা যাত্রা শুরু হয়েছে সকাল ছ’টায়। গাড়িতে উঠে ইস্তক আমি হাঁসফাঁস করে মরছিলাম কর্নেলকে গতকাল রাতের মৃত মথটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবো বলে, কিন্তু একবার তার চোখাচুখি হতেই তিনি কড়া চোখে কড়কালেন আমায়। ওটা বুড়োর ইশারা, যার মানে হল, ‘বাজে প্রশ্ন করবে না!’ আমি অগত্যা ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে প্রকৃতির শোভা দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

     গাড়িটা যখন ঠিক মাঝ রাস্তায় পৌঁছেছে ঠিক তখনই নিঃসঙ্গ পিচ রাস্তার ধারে একখানা নিঝুম সরাইখানায় গাড়ি দাঁড় করালো লুকা। উদ্দেশ্য ভোজন। সরাইখানার নাম, গুস্টাসো। মালিক এবং একমাত্র রাঁধুনি পেটমোটা টাকমাথা মধ্যবয়স্ক লুইগির অভ্যর্থনায় মন ভরলেও চোখ জুড়িয়ে গেল সরাইখানার পিছনে গড়ে ওঠা ফুলের বাগান দেখে। লুইগি আমাদের বিখ্যাত সাইক্লিস্টের পূর্বপরিচিত, তাই খাতির আর আদর আপ্যায়নের কোনও খামতি নেই। তবুও লুকা প্রশ্নটা করল, ‘রাঁধুনি ভাইটি, তোমার মুখের হাসি উধাও কেন?’

     লুইগি আমাদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে লুকাকে হাতের ইশারা করলো, ভাবখানা এমন যেন সে আমাদের সামনে তার মনোকষ্টের কথা বলতে চায় না। এককাঁড়ি খাবারের অর্ডার দিয়ে আমি যখন একটা বাজখাঁই হাই লুকোতে ব্যস্ত ঠিক তখনই চোখ গেল সরাইখানার জানালায়। একটা কাচের পাত্র ঝুলছে সেখানে, একরকম লাল তরল ভাসছে পাত্রের ফোলা পেটে। জিনিসটা কি?

     ‘ওটা মধুর পাত্র, পাখি এবং প্রজাপতিরা ওখানে মধুর স্বাদ নিতে আসে বন্ধু’ গলাটা কর্নেলের। লুকার চোখেমুখে চমৎকৃত হবার আভাস। আনা হেসে উত্তর দিল, ‘বুড়ো মানুষটি ম্যাজিক জানেন, আগেই বলেছিলাম কিনা?’ কর্নেল বিনয় দেখালেন, ‘ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এরকম একটা সংস্কৃতি আছে সে কে না জানে?’ আমি গলা খাঁকারি দিলাম। কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, ‘তোমার অজ্ঞতা নিয়ে অবশ্য আমার কিছুই বলার নেই জয়ন্ত।’

     সবার হাসির মধ্যেই লুইগি খাবারের ট্রলি নিয়ে হাজির। আবার পাস্তা আর তার খুশবুতে আমার পেটে লুকিয়ে থাকা দৈত্যটা আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো। লুকা যদিও মালিককে নিয়ে একধারে গিয়ে কানাঘুঁষোয় রত হল। ওদের আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে কৌতূহল থাকলেও খাবারের গন্ধে আমি তখন সম্পূর্ণ নিমগ্ন।

     লুকা চিন্তিত মুখে টেবিলে ফেরত এলে কর্নেলের প্রশ্ন ধেয়ে এল তার দিকে, ‘ব্যাপার কি বলতো, তখন থেকে ফিসফাস করে চলেছ লুইগির সঙ্গে?’

     সাইক্লিস্টের মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল অবস্থা গুরুতর। পিজ্জার একটা ছোট্ট টুকরো মুখে দিয়ে সে মাথা নাড়লো, ‘ব্যাড ওমেন কর্নেল, ভেরি ব্যাড’ সামান্য থেমেই সে যোগ করল, ‘আই’ল শো ইউ লেতার’ আমরা নির্বাক ভাবনায় উদরপূর্তি সারলাম। লুইগি আর লুকাকে বগলদাবা করে কর্নেল গেলেন সরাইখানার পিছনে বাগানটায়। আমি আর হালদারমশায় আনাকে পটিয়ে জানার চেষ্টা করছিলাম গন্তব্যের দর্শনীয় বস্তুর নাম। এমন সময় শুনলাম কর্নেলের নির্দেশ, ‘একবার এদিকটায় এসো তো আনা’, মেয়েটা ছুটলো। আমরাও দৌড় মারলাম তার পেছন পেছন।

     জেসমিন, ভায়োলেট, ডেইজি ফুলের সমারোহে চোখ ধাঁধিয়ে যাবার জোগাড়। কিন্তু ফুলের সুগন্ধে মাতোয়ারা হবার আগেই একটা মর্মান্তিক দৃশ্য চোখে পড়লো। সবুজ-খয়েরি পাতার গালিচায় পড়ে আছে মৃতদেহ। একটি নয়, দুটি নয়। কয়েকশো। মৃতদেহগুলো গত রাতের দেখা ‘মথ’ পোকার।

     আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম লুইগির মুখের দিকে।

     ‘এমনিতে ওরা আসে কম, কিন্তু বছরতিনেক ধরে ওদের ঝাঁক এসে আমার বাগানটাকে একদম ব্যস্ত করে রেখেছিল। এবারও দিনভর ওদের গুনগুন শুনছিলাম। তারপর কি যে হল, প্রতিদিনিই বাগানে ওদের লাশ মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখলাম। এখন সংখ্যাটা আরও বাড়ছে। এসব দেখে কারই বা মন ভালো থাকে বলুন তো?’

     লুইগি হাঁড়িমুখে উত্তর দিল। আমরাও সমবেতভাবে সম্মতি জানালাম। কথাটা সত্যি বটে। এতগুলো নিরীহ প্রাণীর এমন ‘গণমৃত্যু’ মনকে ভারাক্রান্ত করে তুলতে বাধ্য।

     ‘কর্নেল, ফুলের মধুতে কি কোনও বিষক্রিয়া ঘটতে পারে?‘ আনা বিষণ্ণ মুখে প্রশ্ন করে। কর্নেল ভাবেন কিছুক্ষণ, তারপর ধীরেসুস্থে উত্তর দেন, ‘তোমার সন্দেহ অমূলক নয়। কিন্তু এতগুলো ফুলের রেণুতে বিষ পাওয়ার সম্ভাবনাটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের কম নয় কি?’

     ‘তাহলে কি জলবায়ুর পরিবর্তন?’ আনা তবুও চেষ্টা করে একটা উত্তর খোঁজার। কর্নেল লুইগিকে প্রশ্ন করেন, ‘মথগুলো কোন দিক থেকে আসে জানো?’

     রেস্তোরাঁর মালিক মাথা চুলকে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটু বিভ্রান্তভাবে উত্তর দেয়, ‘দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকেই ওদের আসতে দেখেছি। সমুদ্রের ওধারে কোথাও বাস ওদের–’

     কর্নেল তাকান লুকার দিকে, ‘ফ্রান্স?’

     সে মাথা নাড়ায়, ‘ফ্রান্স থেকে আসতে পারে ওরা, তা ছাড়া মোনাকো-ও হতে পারে–’

     ‘পতঙ্গদের পক্ষে কি এতটা রাস্তা উড়ে আসা সম্ভব কর্নেল?’ আনার প্রশ্ন শুনে বুড়ো ঘুঘু একটু থমকে যান, যেন মনের আয়নায় কিছু দেখার চেষ্টা করছেন।

     ‘তাহলে কাছাকাছি কোনও দ্বীপে ওদের বাস?‘ আমিও সেটাই ভাবছিলাম। লুকা মাথা চুলকে বলে উঠল, ‘সমুদ্রের মাঝখানে ‘এলবা’ বলে একখানা দ্বীপ আছে বটে তবে সেখানে মানুষের বসতি বেশ ভালোই। আচ্ছা লুইগি, তোমার শ্যালকের বাড়ি ওইখানেই না?’

     লুইগি ইতিবাচক মাথা নাড়লো। তারপর ফোন বার করে কার সঙ্গে কথা বললো কিছুক্ষণ। তার হাত-পা নাড়ানো আর সুরেলা কথোপকথন শুনলাম মনোযোগ দিয়ে। রাগ হোক অথবা ভালোবাসা–ইতালির মানুষগুলো ভাব প্রকাশে বড়ই অনাবিল। দেখতে বেশ মজা লাগে।

     ‘দিমিত্রি বললো ওদের ওখানে কোনও মথ নেই, তবে ঝাঁকে ঝাঁকে ‘হক মথ’ উড়ে যেতে দেখেছে ওরা দক্ষিণ দিক থেকে–’

     ফোন পকেটে রেখে রেস্তোরাঁর মালিক জানাল। লুকার চোয়াল ঝুলে পড়লো।

     ‘সার্দিনিয়া তাহলে?’ তার উচ্চকিত প্রশ্নে আনা কাঁধ ঝাঁকাল। উত্তর, ‘খুব সম্ভব!’

     কর্নেলের মুখের ভাবে কিন্তু একটা প্রশ্নচিহ্ন আঁকা ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম বুড়ো ঘুঘু ঠিক উত্তরটা পাচ্ছেন না।

     ‘চলুন আবার যাত্রা শুরু করি, মথগুলোর জন্য সমবেদনা রইল’ তাকে অনুসরণ করে আবার এসে জুটলাম গাড়ির কাছে। লুইগিকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠবার সময় হঠাৎ করে সে আমাকে বেশ কেতা মেরে প্রশ্ন করে বসল, ‘হাউ ওয়াজ আওয়ার ফুদ, স্যার?’

     ভাষা খুঁজে না পেয়ে আমি হেসে উত্তর দিয়েছিলাম ওদের ভাষাতেই, ‘গুস্তাসো, এমিকাস–’

     লুইগি খুশির চোটে হাতটাত ঘষে আমাকে দু’চারবার আলিঙ্গন করে তবে ছাড়ল। ওর রেস্তোরাঁর নামের মানেটাই কায়দা করে জেনে নিয়েছিলাম লুকার কাছ থেকে, সেটাকেই কাজে লাগালাম। ‘সুস্বাদু’- গুস্টাসো কথাটার মানে আর এমিকাস মানে ‘বন্ধু’- আর তাতেই লুইগি কুপোকাৎ।

     হাসিঠাট্টার মধ্যে দিয়ে লুইগিকে বিদায় জানিয়ে আবার গাড়ি ছুটলো সান ফ্রাত্তুসো লক্ষ্য করে।

 

৯. হে ঈশ্বর, হে মানুষের ঈশ্বর..’

সূর্য তখন মধ্য গগনে। আগুনে পোড়া সর্বগ্রাসী রূপ তার নয়। কেমন এক স্মৃতিমেদুর মিষ্টি আলো চারদিকে। সান ফ্রাত্তুসো পৌঁছতে না পৌঁছতেই লুকার সে কি হাঁকডাক দৌড়াদৌড়ি। উত্তেজিত হয়ে সে প্রথমে আমাদের টেনে নিয়ে গেল একটা ছোটখাটো দোকানে। সেখানে আমাদের নামধাম আর পাসপোর্ট দেখিয়ে একখানা স্পিডবোটের হদিস দিয়ে দেওয়া হল। বুনো জেসমিনের সুবাসে ভাসতে ভাসতে সবুজ গালিচায় ঘেরা নির্জন পাথুরে রাস্তাটা পেরোতেই নীল সাগরের ঢেউ চোখে পড়লো। ভূমধ্যসাগর। আমাদের কাছে সে অপরিচিত নয় বটে তবে তার রূপ এবারেও অনন্য। কয়েকটা বোটের সারি চোখে পড়লো। তাদের মধ্যেই দুলছে আমাদেরটাও। লুকা একটা উন্মত্ত ছুটে আমাদের নিয়ে গেল বেলাভূমিতে।

     বোটে চাপার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝলাম আমি ফাঁদে পড়েছি। কেমন ফাঁদ? ডাইভিংয়ের ফাঁদ। জলের তলায় ঝাঁপানোর ভয় তখন আমায় কাবু করে ফেলেছে কারণ বোটের মালিকের হাতে ডাইভিংয়ের সরঞ্জাম। একটা ঢোক গিলে ফাঁসির দড়ি গলায় বাঁধার মতো মুখ করে মাস্ক পরে নিলাম। হালদার মশায়ের অবস্থাও তথৈবচ। তারপর একটা জায়গায় আসতেই লুকা চেঁচিয়ে উঠলো আনন্দে। হাততালি দিয়ে বলে উঠলো, ‘ওয়ান্না মিত মাই গদ?’

     ওর ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা করতে চাই? আমরা স্কুলের ছাত্রের মতো মাথা নাড়লাম। সে তর্জনী সমুদ্রের গভীরে ঝুঁকিয়ে হাসল, ‘হি লিভস দেয়ার!’

     টপ টপ করে সবাই জলে ঝাঁপালাম। অবশ্যই আমি সবার শেষে। একটা দমকা ঠান্ডা শিহরণ আমার মেরুদন্ড বেয়ে হিলহিলে করে ছড়িয়ে পড়লো গোটা শরীর জুড়ে। নিচের দিকে তাকিয়ে যদিও মনটা কেমন দার্শনিকের মতো শান্ত হয়ে গেল। লুকা আর আনা তখন জল কেটে চলেছে আরও নিচে। কর্নেল আবার আমাদের হীনমন্যতায় ভোগাতেই বোধহয় পোক্ত ডুবুরির মত এদিক ওদিক ঘুরছেন অনায়াসে। জলজ মাছগুলোকে ছুঁয়ে দেখেছেন, এলজিগুলোর কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন তাদের।

     আর ঠিক সেই সময়েই দেখতে পেলাম তাঁকে!

     উন্নত মস্তক। ছড়ানো দু-হাত আকাশের দিকে। একখানা আলখাল্লা তার পরনে। দু-চোখে শান্তির আশ্বাস, ক্ষমার আমন্ত্রণ। দাড়িগোঁফের আড়ালে ঢাকা একজন যুগাবতার।

     যীশু স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছেন প্রায় আট ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জ মূর্তি হয়ে। অন্ধকার পাতালের প্রহরী হয়ে। বিপন্ন যাত্রীদের বরাভয় দিতে। অতলে তলিয়ে যাওয়া মানুষকে আশ্বাস দিতে। আর তাঁকে ঘিরে চক্রাকারে ঘুরছে রুপোলি মাছের দল। নানা বিভঙ্গে তারা খোদ ভগবানের চারপাশে তৈরি করছে আলোর বলয়।

     একটা হ্যাঁচকা টানে আমি জেগে উঠলাম। আনা হাত ধরে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মূর্তির কাছে। বুঝলাম এমন অপার্থিব সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে আমি ভাবনাচিন্তার চোরাপথে হারিয়ে গিয়েছিলাম।

     ওদিকে লুকা তখন মূর্তির সামনে হাঁটু মুড়ে নিঃশব্দে প্রার্থনা সারছে। কর্নেল মাছগুলোর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যেন তাদের বন্ধু হতে চান। তারাও তখন বৃদ্ধ প্রকৃতিপ্রেমিককে ঘিরে খেলায় ব্যস্ত। আমি আর হালদার মশায় বিস্ময়ে বিমুগ্ধ।

     ‘স্কুবা ডাইভিংয়ের প্রবাদ প্রতিম কিংবদন্তি ডালিও মারকান্টের স্মৃতিতে বিখ্যাত শিল্পী গাইডো গালিত্তি বানিয়েছিলেন যীশুর এই মূর্তিখানা। ১৯৫৪ সালে স্থাপন করা হয় তাঁকে জলতল থেকে ছাপ্পান্ন ফুট নিচে পাথরের বেদিতে। এর আরও দুটো প্রতিরূপ আছে। একটা গ্রেনাডাতে আরেকটা আমেরিকার ফ্লোরিডায়। অবশ্য ওগুলো আসলে থেকে আকারে অনেক ছোট।’

     লুকার ধারাবিবরণী শুনতে শুনতে আমরা আবার ফিরছিলাম রোমে। আনা জল প্রতিরোধক ক্যামেরায় আমাদের অতল অভিযানের ভিডিয়ো তুলেছিল, সেটাই দেখছিলাম মনোযোগ দিয়ে। মাছেদের ঝাঁক নিয়ে কর্নেলের খেলাটা দেখে হালদার মশায় বিড়বিড় করে বললেন, ‘একদম ইউটিউব ম্যাটেরিয়াল মশাই–’

     ‘বলছেন?’ কর্নেল অট্টহাস্য করে উঠলেন।

     ‘আচ্ছা আমরা কেন রোমের পুলিশের সঙ্গে দেখা করছি না? ওরাই তো আমাদের মৃতদের ফরেনসিক রিপোর্ট দেখাতে পারে তাই না?‘ গাড়ি রোমে ঢুকতে না ঢুকতেই হালদার মশাই প্রশ্ন করে বসলেন।

     ‘একদম পুলিশের ঘাগু গোয়েন্দার মতন কথা হালদারমশাই। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, ওদের পুলিশ আমাদের শুধুই পর্যটক হিসাবে দেখছে। আর তা ছাড়া আমরা যদি বেশি জলঘোলা করি তাহলে কার্যকারণে কোনওভাবে মাফিয়াদের কাছে লুকার কর্মকাণ্ড ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তাই একটু লুকিয়ে চুরিয়েই কাজটা করা উচিত বলে আমার মনে হয়েছে–’

     কর্নেল বোঝালেন আমাদের।

     ‘আমার কয়েকজন শুভাকাঙ্খী আছে ডিপার্টমেন্টে, ওদের কাছ থেকেই গোপনে খবর পাচ্ছি এই দুর্ঘটনাগুলো নিয়ে। জীবনের বাজি রেখে আগে ওদের সাহায্য করেছিলাম বলেই বোধহয় ওরা আমাকে বিশ্বাস করে। তবে জানি না এভাবে কতটা আপনাদের কাজে লাগতে পারি,’ লুকাকে একটু বিমর্ষ দেখালেও সে একটা গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে সামলে নেয়, ‘এবার আসি ফরেনসিক রিপোর্টের কথায়। সব কটি শরীরে একটা বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া গেছে যাকে শনাক্ত করা যায়নি। জিনিসটার নাম হল–’

     সে তাড়াতাড়ি ফোন খুলে চ্যাট হিস্ট্রি ঘেঁটে বার করলো নামটা, ‘নামটা হল গিয়ে–’

     কর্নেলের চটজলদি উত্তর এল, ‘নোরিপাইনফ্রীন?’

     ‘ঠিক, ঠিক, উফঃ, কী শক্ত নাম–’ লুকা একটু অপ্রস্তুত হেসে মাথা নাড়ালো, তারপর একটু চমকে গিয়ে থেমে থেমে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি কি করে জানলেন? যদ্দূর মনে পড়ছে আপনাকে তো–’

     কর্নেল হাসলেন। তবে এবার আর অট্টহাসি নয়। আত্মবিশ্বাসী এবং আত্মগত হাসি।

     ‘আমি বিজ্ঞানী নই, বিজ্ঞানসাধক। আর সেই সাধনায় বিজ্ঞানের নানা ঘোর-প্যাঁচের সঙ্গে যেমন পরিচয় হয়েছে তেমনি পরিচয় হয়েছে বেশ কয়েকজন প্রকৃত বিজ্ঞানীর সঙ্গেও। তাঁরাই আমাকে সাহায্য করেন ভয়ানক অন্ধকারের মধ্যেও।’

     কর্নেলের কথাগুলো হঠাৎ যেন লুকার চোয়াল শক্ত করে দিল। সে চেঁচিয়ে উঠলো, ‘আনার কথায় বিশ্বাস করে তবে ভুল করিনি। হে ঈশ্বর–’ সে বুকের চারধারে অদৃশ্য ক্রশ আঁকলো হাতের ইশারায়।

     হালদার মশায় বিড়বিড় করলেন, ‘হক কথার এক কথা।’

     গাড়ি রাতের রোমে গতিময় হল।

 

১০. ‘ We are off to see the wizard…’

ভোর সকালে ঘুম থেকে উঠেই হোটেলে চরতে বেরিয়েছিলাম। একজন সুদর্শনা রুম সার্ভিস ঘাড় বেঁকিয়ে মিষ্টি হেসে ‘গুড মর্নিং’ বলতেই মনটা একেবারে চনমনে হয়ে উঠলো। লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচের বাগানটায় যাবো বলে পা বাড়াবো এমন সময় হঠাৎ একটা রিনরিনে গলা শুনতে পেলাম ঠিক পেছন দিক থেকে।

     ‘হেলো, মিস্টার।’

     মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম একটু আগেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া ভদ্রমহিলাকে।

     ‘ইয়ে… কি ব্যাপার বলুন তো?’

     ‘আজ্ঞে, আপনাদের বন্ধুটিকে তো দেখছি না?’

     ‘কোনজন?’

     ‘নীলাদ্রি সরকার? রুম নাম্বার ৩১৮’ হাতের রিসিটটায় চোখ বুলিয়ে ভদ্রমহিলা জানালেন।

     ‘উনি একটু ঘুরতে বেরিয়েছেন, কেন বলুন তো?’

     ‘আজ্ঞে, কাল রাতে উনি দু’কাপ কফি খেয়েছিলেন কিনা। সেটার রিসিটটা–’

     ‘ওহ, কখন অর্ডার দিয়েছিলেন বলুন তো?’

     ‘রাতে, সম্ভবত তিনটের দিকে–’

     ঠিক আছে আমাকে দিয়ে দিন, পকেট থেকে নোট বার করে বিল মিটিয়ে দিলাম। ভদ্রমহিলা হেসে নিজের কাজে ফিরলেন। এদিকে কর্নেলের গোপন কফি বিলাসের হালহকিকত নিয়ে আমি সন্দিহান হয়ে উঠলাম। রাত তিনটেয় গোয়েন্দাপ্রবরের কফি খেতে ইচ্ছে হওয়ায় কোনও অস্বাভাবিকত্ব না থাকতে পারে, তবে একসঙ্গে দু’কাপ? তবে কি কোনও অতিথি এসেছিল তার ঘরে? অতিথি কে?

     ‘ও জয়ন্ত, তুমি দেখছি আজকাল কথায় কথায় স্টিল ফটোগ্রাফ হয়ে যাচ্ছ। বলি ব্যাপারটা কি?’ কৃতান্তবাবুর কথায় হুঁশ ফিরল।

     ‘হালদারমশাই, আপনি কি কাল রাতে কর্নেলের ঘরে গেছিলেন?’

     ‘গেছিলাম তো। ফোনের নেটওয়ার্ক কাজ করছিল না। ওদিকে গিন্নি ইলিশ-ভাপা করেছে সেটাই ভিডিয়ো কলে দেখাবে বলে অতিষ্ঠ করছিল—’

     ‘ক’টায় গেছিলেন?’

     ‘এই ধরে নাও, সাড়ে দশটা নাগাদ–’

     আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। উত্তর মিললো না। তবে কি আনা? না কি অন্য কেউ?

     টিভিতে ভয়ানক সব খবর ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে।

     শহরের সমস্ত এক্সিটগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসন দারুণ ব্যস্ত। কথায় কথায় মিটিং বসছে। মানুষ ঘরবন্দি হয়ে বসে আছে ভয়ে। অলিগলি আর অন্ধিসন্ধি একদম বেমালুম ফাঁকা। পর্যটকদের অবস্থা খারাপ, নাগরিকদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। কিন্তু কেন?

     আসলে বিগত কয়েকদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে পথচলতি মানুষের উপর কেউ বা কারা নৃশংস আক্রমণ চালাচ্ছিল। ঠিক অ্যাঙ্গলিকান চার্চের মতোই। আক্রান্তদের অনেকেই নিহত। যারা আহত তারাও আশ্চর্যজনকভাবে পাল্টে যাচ্ছে। শরীরে বিপজ্জনক খিঁচুনি, চলাফেরায় অস্বাভাবিক দিশাহীনতা, ব্যাবহারে হিংস্রতা। মৃতরাও কোন অদৃশ্য কু-মন্ত্রে জেগে উঠছে। আক্রমণ করছে সুস্থ মানুষদের। গুলি কাঁদানে গ্যাসেও কিচ্ছু হচ্ছে না। রাস্তাঘাটে ওদের বিচ্ছিন্ন দলবদ্ধ আক্রমন হামলে পড়ছে একাকী পথযাত্রী কিংবা নিঃসঙ্গ দোকানপাটের ওপর।

     ‘রোমে শেষ পর্যন্ত ‘জম্বি’দের আক্রমণ?‘ আমি টিভির সংবাদ শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যেন।

     ‘মানুষখেকো লোকগুলোকে নিয়ে আগে সিনেমা দেখেছিলাম, এখন তো দেখছি মিথ্যে নয় ব্যাপারটা–’ হালদার মশায় বিড়বিড় করে উঠলেন।

     গাড়িতে বাবা আর মা-কে চাপিয়ে লুকা রোমা এস্ট্রিড-এর একটা ঘরে এনে হাজির করেছে। তার চোখে ভয়, অনুতাপ আর যন্ত্রণা। আনা দেশ বিদেশের পরিচিত বিজ্ঞানীদের কাছে ফোন করে জানতে চাইছে এমন মারণব্যাধির হাল হকিকত। কিন্তু নেটওয়ার্ক আর ইন্টারনেট দুইই বিশ্বাসঘাতকতা করছে। সরকার বোধহয় এমন দুঃসংবাদকে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে চান না।

     এক কথায় অবস্থা ভয়াবহ।

     এ সবের মধ্যেও কর্নেলের ঘরের দরজা বন্ধ। বাইরে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ বোর্ড ঝোলানো। সবার নাকের সামনে দিয়েই দু’বার কফি আর স্যান্ডউইচের ট্রে হাতে রুম সার্ভিসকে ঢুকতে এবং বেরোতে দেখেছি। প্রতিবারেই কাপের সংখ্যা দুই। কর্নেলের ঘরের দিকে পা বাড়ালেই আনা আমাদের ধমক দিচ্ছে। এদিকে লুকা নিজেও ফোনে ব্যস্ত। একটা সোফায় শরীর এলিয়ে একমনে সে চ্যাট করে যাচ্ছে। কার সঙ্গে কে জানে!

     এমন অসহনীয় অবস্থায় আমি আর হালদারবাবু হোটেলের মধ্যে বসে এবং শুয়ে নিতান্তই বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম। বুড়ো গোয়েন্দার মাথায় যে কি চলছে সেটা জানার জন্য যেমন মনটা উসখুস করছিল ঠিক তেমনই হোটেলের নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে দুনিয়াটা যেন দু-হাত বাড়িয়ে আমায় ডাকছিল।

     বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে যখন বেশ জোরে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করলো ঠিক তখনই কিছু দূরের সোফা থেকে লুকা চেঁচিয়ে উঠলো। হালদারবাবু ঘুমোচ্ছিলেন, তিনিও তড়াক করে উঠে বসে চোখ কচলালনে, ‘হুমুন্দির পো-’ একটাই কথা বেরোলো তার মুখ থেকে।

     ‘দ্য ওল্দ ম্যান ইজ এ ফ্রিকিং উইজর্দ!’

     লুকা আমাদের দিকে তাকিয়ে সোল্লাসে ঘোষণা করলো। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে উপায় ছিল না। কর্নেলকে বুদ্ধিমান, সাহসী এবং বিজ্ঞান সচেতন বলেই জানতাম। অন্যরাও তেমনটাই বলতেন ওঁর সম্পর্কে। কিন্তু বুড়ো যে ওদিকে তলে তলে মন্ত্রতন্ত্রের চর্চা করছেন সেটা মানতে মন চাইলো না।

     ‘একটু পরিষ্কার করে বলো ভায়া’ আমি করুন কাকুতি জানালেও সাইক্লিস্ট আমাকে পেরিয়ে কর্নেলের ঘরের দিকে দৌড় মারলো। আমি দু-হাতে পথ আগলে দাঁড়ালাম, ‘কর্নেলের ঘরে যাওয়া বারণ তো–’

     লুকা সবকটা দাঁত বের করে জানালো, ‘এখন থেকে আর নয়’ একটা ছোট্ট ডজে আমাকে কাটিয়ে সে ছুটে গেল বুড়ো গোয়েন্দার ঘরে। আমি গালে হাত দিয়ে বসে পড়লাম। এতদিন কর্নেলের সমস্ত কর্মযজ্ঞের একনিষ্ঠ সঙ্গী ছিলাম আমি আর হালদারমশাই, কিন্তু এবার আমরাই তার বিশ্বস্ত বৃত্তের মধ্যে পড়ছি না। এই ব্যাপারটাই আমাকে বিড়ম্বনায় ফেলেছে সব থেকে বেশি।

     দেশে ফিরলে এই নিয়ে বুড়োকে বেশ কিছু কটু কথা শোনাবো বলে যখন মনস্থির করে ফেলেছি ঠিক তখনই শুনলাম গানটা।

     …when I find myself in times of trouble…Mother Mary comes to me…..Speaking words of wisdom, let it be……

     জন লেননের সুর। আমার রিংটোন। বুড়ো ডাকছেন আমায়।

     ‘কি হচ্ছে বলুন তো কর্নেল?’ আমি ফোন তুলেই হতাশা ঝেড়ে ফেললাম।

     ‘এই মুহূর্তেই সব্বাইকে নিয়ে আমার ঘরে এসো।’

     ‘লুকা আপনার ঘরেই গেছে তো?’

     ‘অযৌক্তিক প্রশ্ন না করে কাজটা কর–’

     অন্য সময় হলে অভিমান করতাম। কিন্তু এসময় অভিমানের নয়, নির্দেশ মান্য করার। তাই আনা আর হালদারবাবুকে নিয়ে ছুটলাম ৩১৮ নাম্বার ঘরে।

     একমাত্র ঈশ্বরই জানেন বন্ধ দরজার আড়ালে কি এমন গোপন সূত্র আবিষ্কার করে ফেললেন বুড়ো ঘুঘু যে এমন জরুরি তলব?

     বুঝলাম রক্তচাপ বাড়ছে।

 

১১. আরেকটা মানুষ কোথায়?

‘দরজা বন্ধ করে দাও জয়ন্ত—’ সবাই মিলে ৩১৮ নম্বর ঘরে ঢুকে হৈ হৈ করে উঠতেই কর্নেল নিজের সোফায় বসে নিচু গলায় নির্দেশ দিলেন আমাকে। আমি নির্দেশ তামিল করার সঙ্গে সঙ্গে সবাই একটা করে সুবিধামতো জায়গায় বসে পড়লো।

     আমাদের উদগ্রীব মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে বুড়ো ঘুঘু একটু বিষণ্ণ হাসলেন।

     ‘রোম আক্রান্ত’, এইটুকু বলেই কর্নেল পাইপে আগুন দিলেন। পরিচিত তামাকের গন্ধে ঘরটা ভরে উঠলো, কর্নেল বলে চললেন মেঘমন্দ্র স্বরে, আমরা শুনলাম ছাত্রদের মনোযোগ নিয়ে।

     ‘১৬৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ একটা ভয়ানক প্লেগ দেখা দিয়েছিল ইতালির এই স্বনামধন্য রাজধানীতে। প্রায় পনেরো বছর ধরে লক্ষাধিক মানুষের জীবন নিয়েছিল সেই মহামারী। ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। একটা রেকারিং ড্রিম-এর মতো। এবারেও ঠিক সে রকম কিছু হয়েছে বলে আমার ধারণা। ধারণা ঠিক কিংবা ভুল সেটা যাচাই করার সুযোগ আসবে খুব শিগগিরই। তবে তার আগে এই বারের মরণ রোগটা নিয়ে তোমাদের একটু আলোকিত করার সময় এসেছে–’

     কর্নেলের কথা মাঝপথে থামিয়ে আনা হাত তুললো। একটু দ্বিধা নিয়েই সে প্রশ্নটা ছুঁড়লো, ‘জম্বিদের এই আক্রমণের সঙ্গে মাফিয়াদের সম্পর্ক নেই তাহলে?’

     ‘আছে কি নেই সেটা নির্দিষ্ট করে বলার সময় এখনও আসেনি। তবে তার আগে আমার একটা পর্যবেক্ষণ তোমাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে চাই। আপত্তি নেই তো?’

     আমরা ঝটপট মাথা নাড়লাম। কর্নেল নিজের ‘থিয়োরি’ উপস্থাপনে ব্যস্ত হলেন।

     ‘প্রকৃতি বড্ড রসিক। মানুষকে যেমন সে রক্ষা করে তেমনি কারণে অকারণে তাকে শাসনও করেন। তবে চরম কোনও শিক্ষা দেবার আগে মজার ছলেই কিছু ইঙ্গিত দিয়ে রাখে। মা বলে কথা। সন্তানকে সাবধান করার অধিকার তাঁর আছে। তাই রোগ ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেখা হল হক মথদের সঙ্গে। ওরা হামিং বার্ডের মতোই ঘুরে ঘুরে ফুলের মধু পান করে। জয়ন্ত প্রথম এ রকমই এক মথের মৃতদেহ এনে হাজির করে আমার ঘরে। একটা সন্দেহ মনে জন্ম নিয়েছিল, কিন্তু লুইগির রেস্তোরাঁয় যে শ’য়ে শ’য়ে মৃত মথের সাক্ষাৎ পেলাম, তাতেই পরিষ্কার হল প্রকৃতির ইঙ্গিতটা। রোগ ছড়াচ্ছে। মানুষ শক্তিশালী জীব তাই সে রূপান্তরিত হচ্ছে, বেচারি মথ দুর্বল প্রাণী তাই সে মরছে। কিন্তু কি এমন বিষ তাদের শরীরে ঢুকছে যাতে এমন করুন পরিণতি হচ্ছে তাদের দুজনেরই-‘

     লুকা এবার হাত তুললো, ‘আমি দুঃখিত কর্নেল, তবে কিছুতেই মথ আর মানুষের এহেন বিপর্যয়ের কারণ যে এক সেটা মানতে পারছি না-‘

     ‘নোরিপাইনফ্রীন?’ আমাদের চমকে ওঠা চোখগুলো সব হালদারমশাইয়ের দিকে ঘুরে গেল।

     ‘এক্সাক্টলি-‘ কর্নেল সোফায় চাপড় মেরে হাসলেন শিশুর মতন, ‘আপনি একেবারে গোড়ায় পৌঁছে গেছেন কৃতান্তবাবু। অসাধারণ-’

     ‘নামটা ঠিক বলেছি?’ হালদারমশাই লাজুকভাবে আমাদের মুখের দিকে চোখ বোলাতে বোলাতে প্রশ্ন করলেন।

     ‘ঠিক, একদম ঠিক। আর ওই রাসায়নিক পদার্থটি পাওয়া গেল রোমের আক্রান্ত মানুষের শরীরে। খবরটা আমাদের লুকা জানালো রোমে ফেরার পথে। আর ঠিক ওই একই রাসায়নিক জিনিসটাই পাওয়া গেল হতভাগ্য মথগুলোর পৌষ্টিকতন্ত্রে।’

     ‘সেই জন্য আপনি আমার আগেই নামটা বলে দিয়েছিলেন গাড়িতে?’ লুকা মাথা চুলকে অবাক গলায় স্মৃতি হাতড়াতে লাগলো।

     ‘দুয়ে দুয়ে চার। আসলে আমি এত নার্ভাস ছিলাম যে নামটা মুখ ফস্কে বলে ফেলেছিলাম। যেন বিশ্বাস করতেই শুরু করেছিলাম ওই একটি রাসায়নিক পদার্থই দুজনের বিপর্যয়ের কারণ। যদি দুটো আলাদা নাম পেতাম তাহলে জানি না ঠিক কি করতাম। তবে ঈশ্বর করুণাময়—’

     তাঁর চোখ লুকার দিকে নিবদ্ধ, আমাদের সাইক্লিস্ট বন্ধু নীরবে ঠোঁট নাড়িয়ে প্রার্থনা সারলো, বুকে ক্রস আঁকলো বিশ্বাসী হাতে।

     ‘প্রশ্নটা একদম নাছোড়বান্দা ছাত্রের মতো শোনাচ্ছে তবুও একটা কথা বুঝতে পারছি না, মথের পৌষ্টিকতন্ত্রে ঠিক কি আছে সেটার পরীক্ষাটা সারলেন কীভাবে?’ আনার ছানাবড়া চোখদুটো দেখে কর্নেল মিটিমিটি হাসলেন। তারপর মাথা ঝাঁকালেন, ‘পরীক্ষাটা করার সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু যে ভদ্রলোক সে কাজে আমাকে সাহায্য করেছেন তাঁর নাম বলা বারণ। সঠিক সময়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব, কেমন?‘

     আমরা মাথা নাড়লাম। ওটাই আমার কাজ। সেটাই দায়িত্ব নিয়ে সারলাম।

     ‘কিন্তু একটা কথা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না, এই রাসায়নিক পদার্থ কীভাবে এদের শরীরে ঢুকছে এবং কীভাবে ওদের এরকম পরিবর্তন ঘটাচ্ছে? আমি যতদূর জানি নোরিপাইনফ্রীন একটা হরমোনের নাম? তাই না?‘ আনার প্রশ্ন।

     ‘ক্যাটেকোলামাইন হরমোন। মানুষ যখন উত্তেজিত হয় তখন ডোপামাইন, এড্রেনালিন এবং নোরিপাইনফ্রীন হরমোন গ্রন্থি থেকে রক্তের স্রোতে মেশে। এই তিনটে হরমোনকে একসঙ্গে বলে ক্যাটাকোলামাইন। এদের নির্দেশেই আমাদের স্নায়ু উত্তেজিত হয় এবং শারীরিক ও মনস্তাত্বিক যে কোনও বিপদের সঙ্গে মোকাবিলায় শরীরকে প্রস্তুত করে। এককথায় এরা মানুষকে ‘জাগিয়ে’ তোলে। আচ্ছা বলতো এই রাসায়নিক জিনিসটা কোন জিনিসের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায়?‘

     কর্নেল যেন কুইজ মাস্টার।

     আমরা সবাই চুপচাপ।

     ‘একজন বিখ্যাত অভিনেতার মৃত্যুর কেস হ্যান্ডল করেছিলাম কর্নেল। ভদ্রলোক মারা গেছিলেন ড্রাগ ওভারডোজে। তাঁর ফরেনসিক রিপোর্টে এই নামটা দেখেছিলাম–’ গোয়েন্দা কেকে হালদার আমাদের চমকে দিয়ে বলে উঠলেন।

     ‘আপনি ঠিক পথে যাচ্ছেন হালদারমশাই’ কর্নেল মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানালেন প্রৌঢ় গোয়েন্দাকে, তারপর আমাদের দিকে নজর দিলেন, ‘এসবের মূলে আছে একটা লবণ। হাইড্রোক্লোরাইড লবণ। নাম কোকেন হাইড্রোক্লোরাইড!’

     ‘কোকেন?’

     ‘লবন?’

     ‘বুঝিয়ে বলুন প্লিজ–’

     আমাদের সমবেত কলকাকলি শুনে কর্নেল দাড়ি চুলকোলেন।

     ‘কোকেন। ওটা আমাদের শরীরে ওই ডোপামাইন, নোরিপ্রাইনফ্রিন এবং এড্রিনালিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়। আর ওর প্রভাবেই আমাদের শরীর অত্যধিক চনমনে হয়ে যায়, খানিকটা উন্মাদনার পর্যায়ে চলে যায় মানসিক এবং শারীরিক স্থিতি। হেরোইনের সঙ্গে ওর এটাই পার্থক্য। হেরোইন শরীরকে অবশ করে দেয়, একটা সাময়িক অবসাদ আমাদের মানসিক অবস্থাকে গিলে নেয়। আমরা ধীরে ধীরে একটা অজানা ঘুমে ঢুলে পড়ি। হেরোইনের উৎপত্তি মরফিন থেকে- যা কিনা তৈরি হয়–’

     ‘পপি ফুলের বীজ থেকে–’ লুকা বাক্যটাকে সম্পূর্ণ করে। কর্নেল ইতিবাচক মাথা নাড়েন।

     ‘কিন্তু শুধু কি কোকেনের বিষেই এতবড় বিপর্যয়? তাহলে রোমের মানুষ শুধু একটু নেশাগ্রস্ত হয়ে লাফালাফি করেই থেমে যেত তাই না? শহরটা শুধু একবেলার জন্য বিশাল কোনও একটা সাইকোডেলিক নাইট ক্লাবে পরিণত হত হয়তো? তার বদলে এমন একটা রক্তক্ষয়ী খেলা কীভাবে শুরু হল? আর তা ছাড়া কোকেন তৈরির প্রাকৃতিক উৎস তো পপি ফুলের বীজ নয়, তাহলে রোমের মানুষের রক্তে কীভাবে এল এমন ভয়ানক রাসায়নিক পদার্থ?’

     কর্নেল আমাদের প্রশ্ন করলেন অথবা বলা ভালো স্বগতোক্তি করলেন।

     ‘কোকেন তৈরি হয় কোকা গাছের পাতা থেকে, তাই না?’ লুকা বলে উঠলো।

     ‘ঠিক, তবে সে গাছের সংখ্যা এখানে বড়ই কম। ঠিক তো?’ কর্নেল লুকার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলেন। সে নেতিবাচক মাথা নাড়িয়ে জানান দিল যে কর্নেল ঠিক।

     ‘আবার দেখো এসবের মধ্যে একখানা খুব সূক্ষ্ম কিন্তু দারুণ রকমের দরকারি ভুল লুকিয়ে আছে।’

     আমরা সবাই একে অপরের দিকে তাকালাম নির্বাক প্রশ্নচিহ্ন মুখে ঝুলিয়ে। কর্নেল আবার ব্যাখ্যান জারি রাখলেন।

     ‘যে বিজ্ঞানী বন্ধু মৃত মথের শরীরে অতিরিক্ত নোরিপ্রাইনফ্রিন পেয়েছেন তিনি ওদের শরীরে পেয়েছেন হাইড্রোক্লোরাইড লবণের চিহ্নও। কিন্তু সেটা কোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড নয়। বরং তারই তুতো ভাই। এমন মিল তাদের যে প্রথম দর্শনে তাকে আলাদা করা মুশকিল। যেখানে কোকেনে মুক্ত অক্সিজেন মৌল আছে দু’খানা সেখানে এই লবণে আছে তিনখানা অক্সিজেন। ত্রিশুলের মতো। সম্পূর্ণ নতুন যৌগ। অচেনা, অজানা এবং ভয়ানক। লুকা তুমি তোমার পুলিশ বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করে দেখো তো তাদের রিপোর্টেও এমন অজানা যৌগের হদিস পাওয়া গেছে কিনা? আমি নিশ্চিত আমার তত্বের সঙ্গে মিলে যাবে ওদের ফরেনসিক রিপোর্টও -‘

     কর্নেল থামলেন।

     ‘তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো এইরকম, রোমের কাছাকাছি কোথাও এমন কোন জায়গা আছে যেখানে এই বিষের প্রাকৃতিক উৎস আছে। এই হক মথগুলো সেখান থেকেই বহন করে নিয়ে আসছে এই রাসায়নিক যৌগকে। সেখান থেকেই এই মরা মানুষের জ্যান্ত হয়ে রোমের রাস্তাঘাটে তোলপাড় করার সূত্রপাত?‘ আমি পুরো ঘটনাপ্রবাহকে সরলীকৃত করতে সচেষ্ট হলাম।

     ‘ভুল,‘ কর্নেল হাসলেন, ‘অতি সরলীকরণ করতে গিয়ে একটা জিনিস ভুলে যাচ্ছ জয়ন্ত, এই যৌগ মানুষের শরীর অব্দি পৌঁছতে পারবেই না। কারণ হক মথ অন্যান্য পোকা মাকড়ের মতো আমাদের কামড়ায় না। তারা মধু পান করে আর ফড়ফড়িয়ে উড়ে বেড়ায়। নিরীহ প্রাণীটা তাই সন্দেহের তালিকায় রইলো না। এবার ভেবে দেখো, চার্চের পাদ্রী, মর্গের লাশ, কিংবা মাফিয়া ডনের ভাইদের তাহলে গল্পের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটানো যাচ্ছে না। অথচ লোকগুলোর হস্তক্ষেপ আমরা নিজেদের চোখেই দেখেছি। আর যেখানেই কিছু মানুষকে একটা খারাপ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে দেখি তখনই একটা শয়তানি ‘অমানুষিক’ পরিকল্পনার সম্ভাবনা মনের মধ্যে গজিয়ে ওঠে।‘

     ‘আচ্ছা, এই বিষাক্ত যৌগ তাহলে মানুষকে কীভাবে এমন অমর করে তোলে? এর ব্যবহারে কি তবে–‘ আনা উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

     ‘তোমার চিন্তাভাবনা এখন বিজ্ঞানের পথ ধরেছে ঠিকই কিন্তু তুমি যে দুরাশার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছো তা বোধহয় এখনও সম্ভব নয়। আসলে এই রাসায়নিক যৌগ আমাদের স্নায়ুতে এমন অভিঘাত তৈরি করতে পারে যে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া হৃদপিন্ডকেও সচল করে তুলতে পারে সে। রক্ত সঞ্চালনের বেগ বাড়ে, ক্ষুধা বাড়ে, শরীরে একটা আশ্চর্য ছটফটানি তৈরি হয়- একটা প্রচন্ড প্রতিক্রিয়াশীল শরীর কিন্তু তাতে কোনও আত্মা নেই, বিবেক নেই। জীবন্ত মৃত। সিনেমার ভাষায় জম্বি। একটা মিথ যা কিনা সম্পূর্ণরূপেও মিথ নয় আসলে।‘

     কর্নেল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

     ‘সব বুঝলাম, কিন্তু এর হাত থেকে বেরোবার উপায় কি? এত শক্ত কথা নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করুন আমি শুধু চাই একটা নিরাপদ রোম, আমার প্রিয় বাসস্থান। কর্নেল–‘ লুকা আবার ভাবুক হয়ে পড়েছে। তীব্র আবেগে কাঁপছে তার শরীরটা। চোখ দুটো সজল।

     ‘বিষের উৎসটাকে নষ্ট করে দেওয়া–‘ কর্নেল বললেন।

     ‘কিন্তু যারা ইতিমধ্যেই’ আনা সোফা থেকে উঠে পড়লো, কর্নেল তাকে বসার ইঙ্গিত দিলেন, ‘ওরা মৃত, সেটা ভেবে নেওয়াটাই আমাদের মঙ্গল। কারণ তাদের বিনাশ না হলে রোমের বিপদ কাটবে না।‘

     ‘কিন্তু তাদের বিনাশ কিভাবে সম্ভব?’ হালদার মশায়ের প্রশ্ন।

     ‘এই অজানা রাসায়নিক যৌগকে ধ্বংস করার জন্য দরকার বিশেষ প্রতিষেধক। সে প্রতিষেধক তৈরির কাজ চলছে আমাদের অগোচরে। যিনি করছেন তিনিই আমার অনামী বিজ্ঞানী বন্ধু। তাঁর কিছুটা সময় প্রয়োজন, আর সেই সময়ের মধ্যে আমাদের খুঁজে বের করতে হবে বিষের উৎস এবং–‘

     ‘তাকে ধ্বংস করতে হবে,‘ হালদার মশাই বলে উঠলেন। দেখলাম শুধু তাঁর একারই নয় চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে আমাদের সবারই।

     ‘কিন্তু তার আগে জায়গাটা খুঁজে বার করতে হবে, তাই না?‘ কর্নেল এবার তাকালেন লুকার দিকে।

     লুকা যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল, কর্নেলের কথায় সে ধড়ফড় করে জেগে উঠলো।

     ‘সেই কথাটাই বলতে তখন কর্নেলের ঘরে দৌড়ে গেছিলাম আর কি। বেশ কয়েকজনকে ফোনাফুনি করে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারলাম। ইতালির দক্ষিণে দুটো সাগর আছে- লিগুরিয়ান সাগর আর ঠিক তার পাশেই টাইরানিয়ান সাগর। সব মিলিয়ে সাতখানা জানা দ্বীপ আছে দুটো সাগরে। এদের মধ্যে সবথেকে দক্ষিণ পশ্চিমে গরগানা বলে একটা দ্বীপ আছে, কিন্তু তার ঠিক বাইশ মাইল দূরে সমুদ্রের গভীরে আরেকটা দ্বীপ আছে যার উৎপত্তি মাত্র বছর সাতেক আগে। কোনও ম্যাপে এর অস্তিত্ব নেই, কারণ জোয়ার সে ডুবে যায় আবার ভাঁটায় জেগে ওঠে। একেবারে অস্থায়ী ভূখন্ড। সেটা এতটাই নগন্য যে ইতালির সরকারও তাকে নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামান না। গত দু-বছরে সেখান থেকেই মথের উড়ন্ত স্রোতকে মূল ভূখণ্ডে ছুটে যেতে দেখেছে মাছ ধরা জেলেদের দল। খুব সম্ভবত এই দ্বীপটাই আমাদের আসল গন্তব্য’ লুকা একটা বড় করে শ্বাস নেয়।

     ‘তা জেলেদের কেউ কিছু অস্বাভাবিক কিছু দেখেনি সেখানে? মানে ওরা কোনওদিন ওখানে পা রাখেনি?’ আনা প্রশ্ন করে।

     ‘আমিও সেটাই জানতে চেয়েছিলাম বন্ধুটির কাছে। কিন্তু তার দাবি, বছরদেড়েক আগে আলাদা আলাদা করে চারবার মানুষ হারিয়ে যাবার ঘটনা ঘটেছে দ্বীপটাতে। সেই কারণেই কেউ আর ওখানে যেতে সাহস করে না আজকাল। আর তা ছাড়া ওর চারদিকে একটা ঝড়বৃষ্টির বলয় আছে। দিনভর সেখানে প্রাকৃতিক বিপর্যয় চলছে। কে আর যেচে বিপদ মাথায় নিয়ে উধাও হতে চায়?’

     কথাটা ঠিক বটে। বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করে উঠলো, এমন জায়গায় পৌঁছবো কীভাবে? কর্নেলের কাছে সেখানে পৌঁছোবার নিশ্চয় কোনও উপায় থাকবে। এমন ভয়ানক বিপদেরও নিশ্চয় কোনও সমাপ্তি থাকবে।

     আমি নিজেকে আশ্বাস দিই।

     আমার প্রশ্নটাই সবার চোখেমুখে প্রতিফলিত হতে দেখলাম। কর্নেল সোফা ছেড়ে দরজায়। রুম সার্ভিসের হাত থেকে কফির কাপ ভর্তি ট্রে নিতে ব্যস্ত।

     ‘মাই গ্র্যাটিচ্যুড ম্যাডাম’, কর্নেল এমন অবস্থাতেও ভদ্রতা দেখতে ছাড়ছেন না। এমন অবস্থাতেও সামান্যতম বিহ্বলতা দেখতে পাচ্ছিলাম না তাঁর চলাফেরায়। এখানেই কি আমাদের সঙ্গে বুড়ো মানুষটার পার্থক্য?

     ‘মুখ ভার না করে নিজেদের চাঙ্গা করে নাও,‘ এমন আহ্বানে সাড়া না দিয়ে উপায় নেই। একে একে কফির কাপ হাতে নিয়ে আমরা ফিরলাম নিজেদের জায়গায়। কর্নেল কফির কাপে চুমুক দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চিনির পরিমাণ নিয়ে রোজ ষষ্ঠীদার সঙ্গে ঝগড়া করেন। আজ হয়তো চিনি কম কালো কফির স্বাদ তাঁকে পুরাতন ভৃত্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে হঠাৎ করে।

     ওদিকে আমার চোখ চলে গেছে ট্রে-র দিকে। ওটাতে এখনও একখানা ধোঁয়া ওঠা কাপ পড়ে আছে কারোর অপেক্ষায়। কর্নেলের হিসেবে কিছু ভুল হল নাকি? পাঁচজনের জন্য ছ’কাপ কফি?

     তবে কি গত কয়েকদিনের এই বেহিসাবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে রহস্য সমাধানের উপায়?

 

১২. কমলাকান্ত

‘এরপর?’ লুকার উত্তেজিত জিজ্ঞাসা।

     কর্নেল কফির কাপে চুমুক দিয়ে হাসলেন, মুখে বললেন, ‘ম্যাজিক–’

     আমাদের চঞ্চল উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিগুলো আবার একে অপরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি খেল। ম্যাজিক? মানে জাদু? বুড়োর মাথায় কি এবার ভীমরতি বাসা বেঁধেছে?

     কর্নেলের কফি খাওয়া শেষ। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। নীল সাদা ড্রেসিং গাউনের ঝোলা পকেটে হাত ঢুকিয়ে একখানা কিম্ভূত যন্ত্র বার করে আমাদের টেবিলটার ওপরে রাখলেন। আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। কুচকুচে কালো রঙের একটা বাক্স। চারপাশে উজ্জ্বল কমলা রঙের আয়তক্ষেত্র। মোবাইল ফোন? এমন ফোন তো কর্নেলকে কোনওদিন ব্যবহার দেখিনি?

     ‘জাদু দেখাবার আগে সব্বাইকে একটা মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিতে হবে’, বুড়োর মুখে তখন একটা কঠিন শৈত্য জেগে উঠেছিল, ‘এ ঘরে এরপর যা ঘটবে সেটা নিয়ে যেন গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়। সবার মনে থাকবে কথাটা?’

     আমরা মাথা নাড়লাম। লুকা বিস্ফারিত চোখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো।

     ‘জিআরডি-র সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দাও কমলাকান্ত–’ কর্নেল সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে ঘোষণা করলেন।

     ‘উনি এখন ল্যাবে আছেন। এক মিনিট অপেক্ষা করুন নীলাদ্রীবাবু–’ আমাদের বিলকুল চমকে দিয়ে টেবিলে রাখা যন্ত্রটা বলে উঠলো।

     ‘ধুস, এত তাড়াহুড়ো করে কি আর কাজ করা যায়?’

     একজন বয়স্ক মানুষের গলা শুনে আমরা ঘরের চারদিকে দ্রুত চোখ বুলিয়েছিলাম। কই, কেউ নেই তো? ঘরে উপস্থিত আমরা পাঁচজনই তো আছি! কিন্তু গলাটা এত পরিষ্কার শুনলাম কীভাবে?

     ‘তাহলে কি-‘ কর্নেল একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলেন বোধহয়।

     ‘বিজ্ঞানে ভরসা নেই?‘ অদৃশ্য মানুষের গলা শুনতে পেলাম আবার।

     ‘ধন্যবাদ ডঃ দাস, এবার আপনার শ্রীবদনটি দেখিয়ে আমাদের কৃতার্থ করুন দয়া করে-‘ কর্নেল ঠাট্টার গলায় আবদার জুড়লেন। বুড়ো মানুষকে এমন ছেলেমানুষি করতে দেখেলে অন্য সময় কি বলতাম জানি না তবে সেই মুহূর্তে মনটা ভালো হয়ে গেছিল হঠাৎ। বিপদের ভয় পাচ্ছিলাম না আর।

     ‘আসছি, বাবা আসছি, দূরত্বটা তো আর কম নয়-‘

     ‘এখানে প্রত্যেকটা সেকেন্ড দুর্মূল্য-‘

     ‘কমলাকান্ত সেটা জানে-‘

     এমন সময় হঠাৎ যন্ত্রটা একটু নড়ে উঠলো। আমাদের অবাক চোখের সামনে ওকে টেবিল ছেড়ে হাওয়ায় ভাসতে দেখলাম। তারপর একটা ‘খুট’ করে শব্দ হবার পর, ওর চারদিকের উজ্জ্বল কমলা আয়তক্ষেত্রেটাকে স্ক্রিন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। এরপর জানি না কোন জাদুতে ওটা নব্বই ডিগ্রি ঘুরে গেল। একটা আয়তক্ষেত্র থেকে জন্ম নিলো আরও অজস্র আয়তক্ষেত্র। সেগুলো তার আগেরটাকে বেড় দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একখানা কমলা রঙের পর্দা যেন ঘরের মাঝখানে জেগে উঠলো। ম্যাজিকই বটে।

     ‘এই যে আমি-‘

     পর্দার মধ্যে থেকে প্রথমে বের হল একটা হাতের পাঞ্জা, তারপর ঘাড়, মাথা।

     টাকমাথা, সাদা দাঁড়িগোঁফে ঢাকা ঝোলা রেনকোট পরা একটা জলজ্যান্ত মানুষ। ভদ্রলোক কি হামাগুড়ি দিচ্ছিলেন? মানুষটা এরপর বললেন, ‘কমলাকান্ত, দরজা বন্ধ কর-‘

     আয়তক্ষেত্রগুলো মিলিয়ে গেল। যন্ত্রটা আবার টেবিলের ওপরে এসে বসলো দুলতে দুলতে।

     আগন্তুক ভেজা রেনকোটটাকে খুলে রেখে আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে হাসলেন, ‘নমস্কার’ তারপর কর্নেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন, ‘কেমন আছো বন্ধুবর?’

     কর্নেল ততক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন অতিথির উপর। নিজের বিশাল বুকে টেনে একটা ‘বেয়ার হাগ’ উপহার দিলেন বেশ হই চই করে। তারপর বললেন, ‘চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখতেই পাচ্ছ গঙ্গারাম, তোমার ভানুমতির খেল দেখে সবাই কেমন ভেবলে গেছে?‘

     ডঃ গঙ্গারাম দাস কর্নেলের পূর্বপরিচিত বন্ধু। এককালে জ্যোর্তিপদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন, তারপর সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে শিক্ষকতা করেন কয়েকদিন। সেটাতেও মন টেঁকেনি বেশিদিন। সবশেষে কোদন্ডে একখানা ল্যাবেরটরি বানিয়ে দিনরাত নতুন আবিষ্কারে বুঁদ হয়ে আছেন আজকাল। যে কোনও পদার্থকে ভরহীন ফোটনে রূপান্তরিত করে দেবার আবিষ্কারও গঙ্গারামের একক কৃতিত্ব।

     এই মুহূর্তে তাঁর চোখদুটো লুকার দিকে স্থির হয়ে আছে। আমরাও সেদিকে আমাদের কৌতূহলী দৃষ্টি ফিরিয়েছিলাম।

     ‘Holy Mary, Mother of God, pray for us sinners, now and at the hour of our death…’ সে তখন চোখ বন্ধ করে বুকের কাছে হাত জড় করে বিড়বিড় করে প্রার্থনা সারছিল।

     আগন্তুক এই প্রথম একটু দুঃখী মুখ করে বিষণ্ণ হাসলেন। ‘আ মোলো যা-‘ ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন।

     ‘তা ডঃ দাস, সময় নষ্ট না করে এবার আসল কাজে আসা যাক?‘ কর্নেল বললেন। আগন্তুক, যিনি কিনা দেখতে শুনতে প্রায় অনেকটাই কর্নেলের মতোই, একবার কর্নেলকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললেন, ‘তা এই বেশেই কি যুদ্ধে যাবে নাকি?‘ বুড়ো ঘুঘু ঘর কাঁপিয়ে হাসলেন, ‘আরে না না, তোমরা যদি আরেক কাপ কফি খাওয়ার জন্য বাইরের হলঘরটায় যাও তাহলে আমি একটু আমার ধড়াচুড়োটা পাল্টাতে পারি-‘

     আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে টেবিল ঘিরে বসলাম।

     ‘এবার শুরু হোক আমাদের অভিযান-‘ মিনিট দশেকের মাথাতেই কর্নেল দরজা খুলে আমাদের হাতের ইশারায় ভিতরে ডাকতে ডাকতে ঘোষণা করলেন। তাঁর পরনে খাঁকি জামা, ক্যামোফ্লাজ খাঁকি প্যান্ট, বুটজুতো আর মাথায় একখানা ক্যাপ। দেহভঙ্গিতে সেই সোফা আলোকিত করে বসে থাকা জ্ঞানী বৃদ্ধের হাবভাব লোপাট হয়ে গেছে, এখন তিনি একজন ঋজুদেহী সামরিক ব্যক্তিত্ব।

     ‘কিন্তু কীভাবে কী হবে কিছুই তো বুঝতে পারছি না যে-‘ আমি এবার কঁকিয়ে উঠলাম। কর্নেল এবং ‘আবিষ্কারক’ একে ওপরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করলেন নিঃশব্দে।

     ‘আমরা সকলেই যাবো সেই দ্বীপে যেখান থেকে হক মথ উড়ে আসছে ইতালির মূল ভূখণ্ডে। সেখানকার ভূগোল ঘেঁটে বের করতে হবে সমস্ত বিপর্যয়ের মূল উপাদানকে। তাই লোকবল জরুরি-‘ তিনি এবার লুকার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ?‘

     ‘স্যার, ৪২.৮৬৩৭৩৪, ১০. ১৬১৩১২-‘

     ‘কমলাকান্ত, ওই জায়গার আবহাওয়া কেমন?‘ কর্নেল গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করলেন।

     ‘ভয়ানক। উষ্ণতা চুয়াল্লিশ ডিগ্রি, বাতাসে আর্দ্রতা পঁচাশি শতাংশ, ঝড় বৃষ্টি অব্যাহত। আপনাদের সঙ্গে ছাতা রাখা আবশ্যক-‘ যন্ত্র ঠাট্টার গলায় শেষের বাক্যটা বলে থেমে গেল।

     ‘দ্বীপে মানুষের বাস?‘ কর্নেল যেন ছাত্রের পরীক্ষা নিচ্ছেন।

     ‘মাটির ওপরে শুধুই জঙ্গল এবং জলাশয়-‘ কমলাকান্তের সক্ষিপ্ত উত্তর।

     ‘আহা কমলাকান্ত, কি আশ্চর্য, ওখানে কেউ নেই বললেই তো চলে। মাটির ওপরে এবং মাটির নিচে- এমনভাবে উত্তর দেবার কি আছে বুঝি না-‘ এবার আবিষ্কারক একটু বিরক্ত হলেন।

     ‘আজ্ঞে আপনিই বলেছেন, ‘ডিটেলস দেওয়া জরুরি, তাই আমি একটু বিশদে বলতে চাইছিলাম আর কি–’ আমরা অবাক হলাম, যন্ত্রের গলায় সামান্য অভিমানের ছোঁয়া পেয়ে। অতিথি সুর পাল্টালেন।

     ‘আচ্ছা ঠিক আছে কমলাকান্ত, তুমি এবার ঠিক করে বল তো, ওখানে কারও বাস আছে কি?’

     ‘মাটির ঠিক ত্রিশ ফুট নিচে কংক্রিটের কাঠামো আছে। তার মধ্যে সব মিলিয়ে ঊননব্বই জন পুরুষের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে।’

     ‘ঊননব্বই? ওরা কি সশস্ত্র?’

     ‘অস্ত্রের ডিটেলস লিস্ট করে বলতে গেলে মিনিট বারো লাগতে পারে। বলবো?‘

     ‘বুঝেছি, তোমাকে আর ভনিতা করতে হবে না-‘

     ‘ওখানে সব থেকে নিরাপদ জায়গাটায় আমাদের নিয়ে যেতে পারবে কমলা?‘

     অতিথির মুখে এমন স্নেহ সম্ভাষণ শুনে আমি অনেক কষ্টে হাসি চাপলাম।

     ‘এক চুটকিতে ডঃ দাস-‘

     ‘শুভস্য শীঘ্রম-‘

 

১৩. ‘..শিকল নাড়া উদাসী হাওয়ার ডাক…’

কর্নেল আমাদের ইশারা করলেন। আমি, হালদার মশাই, আনা, লুকা এবং কর্নেল হাত ধরাধরি করে কমলাকান্তের চারদিকে একটা বৃত্ত তৈরি করলাম, আমাদের কেন্দ্রে ডঃ দাস। আবার উজ্জ্বল আয়তক্ষেত্রের খেলা। আবার একটা পর্দা। তারপর পর্দাটা এগিয়ে এলো আমাদের দিকে। চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করলাম আমরা। একটা সামান্য ঝাঁকুনি। চোখ খুললাম এবং বুঝলাম চারদিকটা ভেঙেচুরে বদলে যাচ্ছে। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম সেটাও আশ্চর্য সব জ্যামিতিক আকার নিতে নিতে রংবদল করছে। ভয়ে চোখ বুজলাম আবার। আর তখনিই সেই সামান্য ঝাঁকুনি।

     চোখ বন্ধ করেই টের পেলাম দামাল হাওয়ার ঝাপ্টা, সঙ্গে তীক্ষ্ণ বৃষ্টির ধার। মাথা ঘুরছিল। পিছল মাটিতে পা পড়তেই আমি গড়িয়ে পড়েছিলাম। আমরা সবাই। একমাত্র ডঃ দাস দাঁড়িয়ে ছিলেন।

     ‘আহ, বলতে ভুলে গেছিলাম, এমনভাবে যাতায়াত করলে মাথাটা প্রথমে দুলে ওঠে। শরীরের আণবিক গঠন সম্পূর্ণভাবে পাল্টে যায় তো-‘ বৃষ্টির মধ্যে গলা উঁচিয়ে আগন্তুক বলে উঠলেন।

     ‘ডঃ দাস আপনি এবং আপনার আবিষ্কারের চক্করে জীবনটাই না আজ ফুড়ুৎ হয়ে যায়-‘ আমি হাত দিয়ে বোধহয় ঘুরন্ত মাথাটাকে থামাতে চাইছিলাম।

     ‘জম্বিদের কামড়টা বেশি নিরাপদ ভাবছো?‘ ডঃ দাস আমার দিকে হাত বাড়িয়ে মুচকি হাসলেন। বুড়ো বিজ্ঞানীর হাত ধরে উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকে চোখ বোলালাম। আনা, কর্নেল এবং কৃতান্তবাবুকে কাছেই দেখতে পেলাম। লুকা কাদামাখা অবস্থায় উদ্ভ্রান্ত নাবিকের মতো বসে আছে একটা পাথরের চাঙড়ের গায়ে হেলান দিয়ে। ঠোঁটদুটো নড়ছে, চোখ বন্ধ। বোধহয় মাতা মেরির কাছে ব্যাখ্যা চাইছে এমন মায়াময় রহস্যের। ওদিকে কর্নেল একটা পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে হাতের তালুতে চোখ ঢেকে দূরে চেয়ে আছেন।

     ‘এদিকে এসো-‘ কর্নেলের বাম হাতের ইশারা তেমনটাই বলছে। বৃষ্টির কামড় কাটিয়ে সেদিকেই দৌড় মারলাম।

     সামনে একখানা উপত্যকা। গাছগাছালির চাঁদোয়ায় ঢাকা। সবুজ। সেটা পেরোলেই একটা অতিকায় সমতল। সেটা লাল রঙের। বলা ভালো রক্তলাল। ঝড় আর বৃষ্টির প্রাবল্যে পরিষ্কার করে বোঝা যাচ্ছে না সমতলের এমন রং রূপের রহস্য।

     ‘কর্নেল, একটা কথা ভুললে চলবে না, আলিবাবার গুপ্তগুহায় আবার চল্লিশ চোরের আস্তানা আছে। আমাদের কাছে কিন্তু কোনও অস্ত্র নেই-‘ আমি চারদিকে চোখ বুলিয়ে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বললাম।

     ‘ভয় নেই জয়ন্ত, আমাদের সঙ্গে ডঃ দাস আছেন।‘ কর্নেল দৃপ্ত ভঙ্গিতে বুড়ো বিজ্ঞানীর দিকে তাকালেন।

     ‘মানে-‘ ভদ্রলোক কাঁচুমাচু মুখে কাঁধ ঝাঁকালেন।

     ‘আপনার যন্ত্রটা ডঃ দাস, যেটা দিয়ে-‘

     ‘ধুস, ‘ওই যন্ত্রটা’ দিয়ে একটা বিশ্বযুদ্ধ জেতা যায়, মাত্র ঊননব্বই জনকে কুপোকাত করতে ওটাকে ব্যবহার করলে কি ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা হয় না?’

     ‘আহা, ডঃ দাস আপনি নিশ্চয় ভুলে গেছেন-‘

     ‘কিচ্ছুটি ভুলিনি। তুমি আমায় শুধু রোগের প্রতিকার আর রোগের উৎস ধ্বংস করার সমাধান করতে বলেছিলে। এটা তো বলনি যে তোমাদের জন্য একখানা আস্ত বন্দুক ফ্যাক্টরি পকেটে করে আনতে হবে-‘ বিজ্ঞানী মুখ ফোলালেন।

     ‘কর্নেল, আপনার কাছে তো রিভলভার থাকে, তাই না?‘ আনা বোধহয় আশ্বাস খুঁজছিল। আমরাও।

     ঘুঘুর মুখে তখন আষাঢ়ের মেঘ। তিনি কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘এক দেশ থেকে অন্য দেশে বন্দুক নিয়ে যাবার ঝক্কি জানো? আর তা ছাড়া এসেছিলাম তো একটা নিরীহ কনফারেন্সে লেকচার দিতে। কেমন করে জানবো যে এমন বিপদে পড়বো-‘ তাঁর যুক্তিও ফ্যালনা নয়। এবার তবে কি করণীয়?

     ‘বন্দুকের গুলিতে ঝাঁঝরা হতে না চাইলে হাত উপর তোলো-‘

     আমরা যখন ভেবে আকুল ঠিক তখনই আমাদের পিছন থেকে এল সতর্কবাণী।

 

১৪. মা ভৈ… মা ভৈ… মা ভৈ

আমরা মাথা ঘোরালাম। পাঁচজন সশস্ত্র গুন্ডা। তাদের হাতে ভয়ানক সব আগ্নেয়াস্ত্র। কর্নেল বোধকরি তাদের নাম জানবেন। আমি সে ব্যাপারে অশিক্ষিত। কিন্তু একটা জিনিস বুঝলাম, ওগুলো প্রাণঘাতী।

     অন্য সময় হলে হয়তো ভয় পেতাম। কিন্তু আজ পেলাম না। কারণ একটা গোটা শহরের দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে।

     সবাই নিঃশব্দে একবার চোখাচুখি করে, চিৎকার করে উঠলাম, ‘আক্রমণ-‘

     হাতে বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গুন্ডাগুলো চোখ মেলে দেখলো একদল নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ উল্টে তাদের দিকেই তেড়ে আসছে। অবাক ভাবটা কাটিয়ে ওরা যখন ট্রিগারে আঙুল ঠেকালো ততক্ষণে কর্নেলের বজ্রমুষ্টি আঘাত হেনেছে একজনের চোয়ালে, আনা জুডোর কেরামতিতে দুজনকে নিরস্ত্র করে তাদের বন্দুক কেড়ে নিয়েছে। এমনকি হালদার মশাই নিজেও একজনের গলা টিপে ধরে কাদায় গড়াগড়ি খাচ্ছেন। আমিও থেমে রইলাম না, ভীতুদের বোধহয় ভয়ের অনুভূতি চলে গেলে তারা সাহসী হয়ে ওঠে।

     ‘বাকিদের আসার আগে উৎস খুঁজতে হবে। আরেকটা কথা আমরা একে অপরের থেকে একটু দূরত্ব রাখবো, আসলে এত অল্প সময়ে পুরো জায়গায় চিরুনি তল্লাশি করা তা নাহলে সম্ভব হবে না’ কর্নেল হাঁক পাড়লেন। আমরাও দেরি না করে সবুজ প্রান্তরের দিকে দৌড়লাম। দূরের আকাশে কোথাও বৃষ্টির অঝোর ধারার মধ্যে বিদ্যুতের ঝলক চোখে পড়লো।

     পথটা পিচ্ছিল। এখানে প্রতিনিয়ত বৃষ্টি হয় বলেই বোধহয় সর্বত্র শ্যাওলার আধিক্য। কয়েকবার পিছলে যেতে যেতেও নিজেকে বাঁচালাম। এই আধো অন্ধকারে ‘বিপর্যয়ের উৎস‘ খুঁজতে রীতিমতো অসুবিধা হচ্ছিল তো বটেই। তার ওপর এটাও জানা ছিল না সে উৎসের চেহারা কেমন হতে পারে।

     ঘন জঙ্গলের মধ্যেও দু’একবার ঝলকানি দেখতে পেলাম। বোধহয় গেরিলা আক্রমণ চলছে বিক্ষিপ্তভাবেই। ডঃ দাস আছেন কর্নেলের সঙ্গেই। সুতরাং তিনি নিরাপদ। কিন্তু আনা এবং লুকা-র জন্য মনটা উচাটন হয়ে রইল। এমন সময় হুমড়ি খেয়ে পড়লাম একখানা নালায়। ভয়ানক রাসায়নিক গন্ধ, আমি কোনওরকমে হাতড়ে হাতড়ে সে জলের স্রোত কাটিয়ে উঠে এলাম পাথুরে জমিতে। প্রকৃতির আড়াল নিয়ে গোপনে কেউ দুষ্কর্ম করছে এই দ্বীপে। আমি নিশ্চিন্ত হলাম। কর্নেলের তত্ব একদম ঠিক।

     ‘পেয়ে গেছি-‘

     চিৎকারটা শুনলাম। কর্নেলের গলা ওটা। শব্দের উৎস অনুসরণ করে দিগ্বিদিক হারিয়ে দৌড় শুরু করলাম। কয়েকটা গাছের গুঁড়ি আর তার ওপাশেই বাকিদের ছায়া শরীর। সব থেকে আশ্চর্য ওদের দেহ ভঙ্গিমা। কেমন স্থিরভাবে তারা তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। কী আছে ওখানে? কৌতূহলের চোটে হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি কানে এসে ধাক্কা মারছিল।

     ‘দাঁড়া হতভাগা!‘ বৃষ্টির ধোঁয়াশা পেরিয়ে দুটো লোককে আমার দিকে ছুটে আসতে দেখলাম। একজনের হাতে ধরা ডান্ডাটা পায়ের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল। পড়লাম মুখ থুবড়ে। একটা পাহাড় এসে দাঁড়ালো সামনে। আসলে মানুষ। কিন্তু গতরখানা বিশাল, পেশিগুলোর ওপর থেকে অন্ধকার পিছলে যাচ্ছে সাপের মতো।

     বেমক্কা ঘুসি ছুঁড়লাম।

     ‘ঠকাস’ শব্দটা ঠিকরে বেরিয়ে এল। লোকটা এক পা-ও পিছু হটলো না। আমি অবাক হলাম। এদিকে আমার হাতে রক্ত। আমার নিজেরই। লোকটার মুখ সামান্য কেঁপে উঠেছিল শুধু।

     একটা শীতল স্রোত নিজের মেরুদণ্ডে অনুভব করলাম। আরেকটা ঘুসি চালালাম। লোকটা তার ডান হাতের মুঠোয় আমার ঘুসিটাকে গিলে নিল, তারপর তীব্র শক্তিতে কব্জিটা মুচড়ে ধরলো। একটু একটু করে আমার বিদ্রোহী শরীরটাকে সে মাটির সঙ্গে চেপে ধরলো। তার সঙ্গী বুট জুতোর এক লাথি কষালো মুখে। তারপর মাথায় একটা ডান্ডার আঘাত। তবে অন্ধকারে নিজেকে হারাবার আগে একবার জঙ্গল চিরে চিৎকার ছুঁড়লাম, ‘কর্নেল বিপদ-‘

     তারপর বৃষ্টির শব্দটাও মিলিয়ে গেল আমার চেতনা থেকে একসময়।

 

১৫. ‘..Evil is a point of view..’

বাতাসে কটু রাসায়নিক গন্ধ। নির্জন দমবন্ধ করা পরিবেশ।

     চোখ খুলে খানিক বোবার মতো পড়েছিলাম। লোকটা আমার দিকে চেয়ে ছিল মৃত মাছের চোখ নিয়ে। সেই লোকটা। যার নাম দিয়েছিলাম ‘পাহাড়’।

     ‘আম্বো-‘ মাথাটা ত্যারচা করে লোকটা কাউকে ডাকলো। ভারী গলায় সমীহ।

     বন্ধ ঘরের দরজা খুলে যিনি ঢুকলেন তার চেহারার বিবরণ দিতে আমি এক দিস্তে কাগজ খরচ করতে রাজি ছিলাম। কিন্তু তাতেও বোধহয় লোকটার সম্পূর্ণ বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে।

     ধারালো লম্বা মুখ, কানদুটো দুপাশে খোঁচা মেরে বেরিয়ে আছে, কাঁধদুটো উঁচিয়ে আছে, মেরুদন্ড অতিরিক্ত লম্বা হওয়ার কারণে সামান্য বঙ্কিম। চুলের রাশি সযত্নে ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো। কপালের ওপরে এক চিলতে চুল এসে পড়েছে, যেমন ষাটের দশকের সিনেমায় নায়কদের এমন বাহারি চুলে দেখা যেত। বা হাতের কব্জিতে জড়িয়ে রয়েছে জপের মালা, ক্রশ সুদ্ধ। ধার্মিক? কিন্তু লোকটার তীক্ষ্ণ চোখদুটো তো অন্য কথা বলছে। লম্বা এবং পাতলা ঠোঁটের হাসিও অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে।

     হাড় হিম হয়ে গেল। লুকা অন্ধকার গলিতে পাদ্রীর জীবন নিতে দেখেছিল। হত্যাকারীর বর্ণনার সঙ্গে এই লোকটার চেহারার বিবরণ মিলে যাচ্ছে হুবহু।

     ‘লুক, লুক…আওয়ার গেস্ত ওক আপ,‘ লোকটা আমার প্রহরীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো, ‘নাউ তেল মি মাই ফ্রেন্দ, হোআত দু ইউ ওয়ান্ত ফ্রম দিস ওল্ড ম্যান-‘

     হাসিটা অমায়িক কিন্তু উন্মাদ হিংস্রতায় মাখানো। আমি অবশ্য তখন ভদ্রলোকের শ্বদন্ত খুঁজছিলাম মন দিয়ে।

     ‘ভাই নিকোলা, অতিথি আপ্যায়ন কি এভাবে হয় নাকি? হাত পায়ের বাঁধনটা একটু আলগা করলে তবেই না বন্ধুত্বের কিছু নজরানা পেশ করতে পারি!‘ আমি রাগে হিসহিস করতে করতে উত্তর দিয়েছিলাম। নাটকীয় বটে তবে সে মুহূর্তে আর কিছুই মাথায় আসছিল না।

     লোকটা হাতের মুঠো আমার মুখের সামনে তুলে ধরলো। উল্কিটা আমার নজরে এলো। তিনমুখী তারার মাঝখানে মেডুসার মাথাটা চেয়ে আছে আমার দিকে।

     ‘গোটা ইতালির মানুষ এই চিহ্নকে শ্রদ্ধা করে, কীসের চিহ্ন যেন এটা?’ লোকটা প্রশ্ন করলো আমাকে।

     ‘সিসিলিয়ান মাফিয়া।’

     ‘একদম ঠিক,‘ নিকোলার চোখেমুখে আত্মপ্রসাদের গরিমা উপচে উঠলো যেন, ‘এই চিহ্ন শরীরে ধারণ করতে গেলে একটা গোপন অনুষ্ঠান পালন করতে হয়। কাকপক্ষীতেও টের পাবে না এমন গোপন বুঝলে? চোখে ঠুলি বেঁধে একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে তোমাকে। তারপর সেখানে হাঁটু মুড়ে বসিয়ে দেওয়া হবে তোমাকে। হাত ধরে টেনে সোজা করে ধরা হবে জ্বলন্ত মোমবাতির শিখার ওপর। ছুরি দিয়ে বুড়ো আঙুল থেকে নেওয়া হবে রক্ত, আগুনকে সেই রক্তের আহুতি দেবার পরেই মিলবে এমন একখানা সর্বশক্তিমান উল্কা। এমন চিহ্ন যা দেখলে সব্বাই তোমাকে ভয় পাবে, ভক্তি করবে, মাথায় তুলে রাখবে সম্মানে।‘ নিকোলা বলে লোকটা এবার একটু থামলো, একটা গ্লাস থেকে ঢকঢক করে জল খেয়ে গলাটা পরিষ্কার করলো, তারপর তার একমাত্রিক স্বগতোক্তি চালু রাখলো, ‘এই চিহ্নটার মর্যাদা রাখতে জীবনের বাজি রাখতে হয়। মারতে এবং মরতে ভয় পেলে চলে না, বুঝলে খোকা?’

     ‘তোমাদের সবাই তো ধরা পড়েছে, এমনকি তোমার দাদাও তো পলাতক। তাহলে তুমি একলা এখানে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে কি রাজকার্য করছো শুনি?’

     লোকটা অট্টহাসিতে ছোট্ট ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিল।

     ‘রোমে আগুন লাগাচ্ছি। রোগের আগুন, মৃত্যুর আগুন। প্রথমে রোম তারপর সেখান থেকে দাবানল ছড়িয়ে পড়বে গোটা ইতালিতে। সেখান থেকে বাকি দুনিয়ায়।’

     ‘তাতে তোমার লাভ?’

     ‘প্রতিশোধ। রক্তের বদলা। অবশ্য প্রথমে পরিকল্পনাটা ছিল অন্য কিছুর–’

     আমার কান খাঁড়া হয়ে ওঠে।

     ‘এই দ্বীপটায় আজব একরকমের ফুল ফোটে জানোতো সেকথা? পদ্মফুল। রক্তরঙের। শুধুমাত্র রাতের বেলায় ফোটে ওরা। দলে দলে। ঝাঁকে ঝাঁকে। মনে হয় একটা গোটা উপত্যকা জুড়ে শুধু লাল রঙের গালিচা পাতা আছে। তবে ওর রূপে ভুললে চলবে না, ওর গন্ধটা বেজায় খারাপ। যেমন ঝাঁঝালো তেমনি নেশাধরানো। অবশ্য ওর আসল গুণ লুকিয়ে আছে ওর ফুলের রেণুতে। মাদক। ভয়ানক মাদক। দারুণ মাদক। এমন তার ঝাঁকুনি যে মরা মানুষও জেগে ওঠে। বলতে পারো অমর হয়ে ওঠে-‘

     ‘তা এই ফুলের রেনু বিক্রি করে কোটি টাকার ব্যবসা হাঁকাতে পারতে তো?’

     ‘সরকার তাই দিয়ে ওষুধ বানিয়ে জনসেবা করুক তাই না? উঁহু, দাদার মাথায় অন্য পরিকল্পনা ঘুরছিল। মধুটাকে বিজ্ঞানীদের দিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে ওর আসল রাসায়নিক যৌগটাকে বার করে এনেছিল। সেটাকে কোকেনের মতো করে বাণিজ্যিক ভাবে বাজারে ছাড়তে চেয়েছিল। মৃতরা বেঁচে ওঠে এমন জিনিস জীবিতরা ব্যবহার করলে কেমন ফল হবে ভাবতে পারছো?‘ লোকটা লম্বা মুখখানা আমার মুখের সামনে এনে ধরলো। বিষাক্ত চোখদুটো তখন আমার চোখের দিকে চেয়ে আছে নিস্পলক।

     ‘ঠিক তখনই তোমাদের দলটা ধরা পড়লো?’

     ‘বাব্বা, তোমার তো দেখছি দারুণ বুদ্ধি! হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমাদের মধ্যেই কেউ বোধহয় নেমকের দাম মিটিয়েছিল পুলিশের দালালির পয়সায়। ধরপাকড়ের মধ্যেও আমি ঠিক পালিয়েছিলাম। দাদাও। আমাকে বলেছিল এই দ্বীপটার দায়িত্ব নিতে। কারণ এরপর এই দ্বীপ থেকেই মারণ রোগ ছড়াবো মূল ভূখণ্ডে। তারপর সবকটা সরকার যখন ভয়ে উন্মাদ হয়ে অন্ধের মতো সাহায্য খুঁজবে তখন তার সমাধান তুলে দেব অযুত নিযুত কোটি টাকার বিনিময়ে।’

     ‘পরিকল্পনা ভালোই ছিল–’

     ‘ছিল? এখন নেই?’

     ‘উঁহু, কর্নেল এসে পড়েছেন। সুতরাং-‘

     ‘আহা, ভয়ে আমার হাঁটু কাঁপছে’ লোকটা এবার আরেকবার উন্মাদের মতো হাসলো।

     ‘বেশি জোরে হাসবেন না দয়া করে, শব্দটা বাইরে পর্যন্ত পৌঁছলে কর্নেলের হাতে ধরা পড়তে পারেন।’

     ‘এটা একটা বাঙ্কার, এখানে আসতে গেলে অনেকগুলো বাধা পেরোতে হয়। সে যাকগে, বিদায় দেবার আগে তোমার হাত আর পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়াটা দরকার তুমি অতিথি বলে কথা-‘ নিকোলা হাসলো। ওর দাঁত দুটো দেখতে পেলাম এবার। চকচকে।

     ‘হঠাৎ সুবুদ্ধি চাপলো মাথায়?‘

     ‘রক্ত, গন্ধ পাচ্ছি। শিকারের আদিম আনন্দ টের পাচ্ছি শরীরে-‘

     ‘তুমিও এই রোগে ভুগছো? কিন্তু তোমার অবস্থা তো বাকিদের মতন না-‘

     ‘প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে গিয়ে একটা নতুন জিনিস আবিষ্কার হয়েছে। দেখবে?‘ লোকটা পকেট থেকে বার করলো কাচের ছোট্ট পিপেটখানা। সবুজ রঙের তরল ভাসছে সেখানে।

     ‘এটা অমূল্য, এক ফোঁটায় দারুণ নেশা হয়। শরীর জুড়ে আকুলি বিকুলি পাগল করা শক্তি। আর সেই সঙ্গে দারুণ তৃষ্ণা। যেটা মেটে একমাত্র রক্তের নোনতা স্বাদে।’

     আমার চোখের সামনেই লোকটা জিবে ফেললো সবুজ তরলের দু’ফোঁটা। আমি বন্ধ দরজার দিকে তাকালাম। চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম ‘পাহাড়’-কেও। পাহাড়ের দৃষ্টিপথও নিঃশব্দে অনুসরণ করলো আমার চাহনিকে, সে নীরবে মাথা নাড়ালো।

     ‘আঃ-‘

     নিকোলা আমার গলায় হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠলো। ওর শরীরটাকে বেঁকেচুরে যেতে দেখলাম। এক ঝটকায় লোকটাকে সরিয়ে দরজার দিকে দৌড়ে যেতে গিয়ে বুঝলাম পাহাড় আমাকে মাটিতে চেপে ধরেছে আবার। ওর হাতের মুঠোয় আমার গলা।

     ‘ছেড়ে দাও ওকে ব্রিন-‘ লোকটা এগিয়ে আসছে ক্রমাগত আমার দিকে। আমি ভয়ে চোখ বুঝলাম।

     হিলহিলে সাপের মতো আঙুলগুলো আমার গলাটা চেপে ধরলো সাঁড়াশির মতো। শীতল রক্তের স্রোত অনুভব করলাম নিকোলার হাতের শিরায়। বুঝলাম এই আমার কাহিনি একটা চরম ট্রাজিক রূপ পেতে চলেছে। ঈশ্বরে বিশ্বাস ছিল না কোনওদিন। কিন্তু সেদিনের ওই চরম মুহূর্তে একটা মুখ খুঁজছিলাম নিজের চেতনায় ডুব দিয়ে।

     তিনি দেখা দিলেন।

     নির্বাক সমাহিত ক্ষমাহীন চোখদুটো মনে পড়লো। অতলে হারিয়ে যাওয়া যাত্রীদের পরিত্রাতা মানুষটি। অতলের যীশু।

     ‘ধড়াম-‘

     শব্দটায় চমকে উঠে চোখ খুললাম।

     ‘নিকোলা-‘

     এমন সিংহনাদ যে কর্নেলের গলা থেকে বেরোতে পারে সেটা নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাস করতাম না। তাঁর সঙ্গে ঢুকলো আমাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বাকি দলটা।

     ‘এই তো,‘ নিকোলা আমাকে ব্রিন নামের কালোপাহাড়ির হাতে ছেড়ে দিয়ে কর্নেলের সামনে ঘুরে দাঁড়ালো, ‘কান টানলেই মাথা আসে। বলি, এভাবে কি কেউ দরজা ভেঙে ভদ্রলোকের বাড়িতে ঢোকে?‘

     ‘জয়ন্তকে ছাড়ো, এক্ষুনি-‘

     ‘না ছাড়লে?‘

     কর্নেল কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘না ছাড়লে তুমি প্রাণে মরবে-‘

     ‘তোমার দলের বাকিরা সবাই আহত এবং বন্দি -‘ আনা চেঁচিয়ে উঠলো। লুকাকে দেখতে পেলাম না কেন?

     ‘পদ্মফুলের রেণুতে যে কি জাদু আছে কর্নেল তার পরিচয় আপনি পাননি। পেলে পেলে এমন কথা বলতেন না-‘

     ‘তাহলে তোমাকে একটা কথা বলি নিকোলা,‘ কর্নেল এবার নিজের টুপিটা খুলে আনার হাতে দিলেন, তারপর বেশ গম্ভীরভাবে বললেন, ‘তোমার ওষুধের জোর অনেক হতে পারে নিকোলা, কিন্তু জয়ন্তর গায়ে বিপদের একটু আঁচড় পড়লে আমি স্বয়ং দেবতার সঙ্গেও খালি হাতে লড়তে রাজি আছি, বুঝলে?‘

     কর্নেল তেড়ে এলেন নিকোলার দিকে। নিকোলাও ছুটে গেল আক্রমকারীর দিকে। ওর হাতের দিকে তাকিয়ে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। একটা লুকোনো ছোরা না?

     কর্নেলের একটা ঘুসিতে নিকোলা অনেকখানি দূরে ছিটকে পড়লো। নিকোলার হাত থেকে ঠিকরে পড়লো ছুরিটা। পাহাড়ি এতক্ষণ এক কোনে রাগে ফুঁসছিল। প্রভুর এহেন পেটানি দেখে সে তেড়ে গেল কর্নেলের দিকে। আমি প্রমাদ গুনলাম। অজান্তে হাতের রক্তাক্ত গাঁটের দিকে চোখ চলে গেল।

     ওদিকে তীব্র গতিতে ছুটে আসা কালোপাহাড়ির চেহারাটা হঠাৎ করে গতি পরিবর্তন করলো। কারণ কর্নেলের একটা উড়ো লাথি আছড়ে পড়েছে লোকটার পাঁজরে। সেই সুযোগে পিছন থেকে দুর্বৃত্তের গলাটা চেপে ধরে ঘাড়টাকে নিচের দিকে চাপ মারলেন কর্নেল। লোকটা ছাড়া পাবার চেষ্টায় ছটফট করতে শুরু করলে বুড়ো ঘুঘু চাপা স্বরে গর্জন করলেন, ‘স্থির থাকলে মিনিটপাঁচেকের জন্য অজ্ঞান হবে, লড়াই করলে শ্বাস আটকে মরতে পারো-‘

     আমাদের অবাক চোখের সামনে কালো পাহাড়ির বিশাল শরীরটা হঠাৎ ঝুলে পড়লো সামনের দিকে। তাকে মেঝেতে সাবধানে শুইয়ে দিতে দিতে কর্নেল বললেন, ‘মাথায় অক্সিজেনের সাপ্লাই কমে গেছে বলে ও জ্ঞান হারিয়েছে, সুতরাং ভয়ের কিছু নেই-‘

     ‘কর্নেল, নিকোলা-‘ আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।

     কর্নেল চোখ তুললেন এবং দেখলেন নিকোলার হাতে ধরা ছোট্ট রিভলভারটাকে। কয়েক মাইক্রো সেকেন্ডের এদিক ওদিকে কি যে হল বুঝলাম না। তবে আমার বিবেক এবং আমার প্রতিবর্তক্রিয়া একসঙ্গে আমাকে ছুঁড়ে দিল বাতাসে।

     ‘দুম-‘

     শব্দটা আগে শুনেছিলাম নাকি যন্ত্রণাটা আগে অনুভব করেছিলাম সেটা এখন ঠিক মনে নেই। তবে মাটিতে পড়ে গিয়ে বুঝলাম গুলিটা আমারই লেগেছে।

     ওদিকে তখন নিকোলার বন্দুক গর্জে উঠেছে কর্নেলকে লক্ষ্য করে।

     আনা, হালদার মশাই ছুটে এলেন আমার দিকে। আমি তখন রক্তাক্ত পাঁজরের দিকে ভয়ার্ত চোখে আছি। আসলে ঘাবড়ে গেছিলাম। রোজ রোজ গুলি খাবার অভিজ্ঞতা কজন সাংবাদিকের হয়?

     ‘নিকোলা, আমি এখন চাইলেও তোমার প্রতি দয়া দেখতে পারবো না-‘

     ঘুসির শব্দ যে এমন হতে পারে সেটা আমার জানা ছিল না। নিকোলার লম্বা শরীরটাকে উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়তে দেখলাম উল্টোদিকের দেয়ালে। তারপর লোকটার আর উঠে দাঁড়ানো হল না।

     এর মধ্যেই আবার ‘ঠকাস’ করে আরেকটা শব্দ, আমাদের সবার চোখ গেল কালোপাহাড়ির দিকে। সে আগের মতই শুয়ে আছে, যদিও তার মাথার খুব কাছে হাতে একটা ফুলদানি নিয়ে হালদার মশাই মিটমিট হাসছেন।

     ‘কর্নেল, হালার পো ফের উইঠ্যা পড়ছিল,‘ তারপর যোগ করলেন, ‘আমি তো আর আপনার লগে প্যাঁচ পয়জার জানিনা, তাই হেইডাই কাম আইলো- ‘ তার ইঙ্গিত নিরীহ ফুলদানির দিকে।

     দেরি না করে নিকোলা আর কালোপাহাড়িকে বেঁধে কর্নেল হাতঘড়ির দিকে তাকালেন।

     ‘এতক্ষণে নিশ্চয় লুকার ডাকে ইতালির পুলিশ যাত্রা শুরু করেছে দ্বীপের উদ্দেশে-‘ কর্নেল বললেন। আমি বুঝলাম লুকার অনুপস্থিতির কারণ।

     ‘এবার তাহলে প্রতিষেধকটা রোমে-‘ আমি কথাটা শেষ করার আগেই কর্নেল আমাকে এক ঝটকায় তাঁর ঘাড়ে চাপিয়ে নিলেন, ‘গুলি তোমার জামার ধার ঘেঁষে গেছে জয়ন্ত। এমন নির্বোধ বাহাদুরির কাজ আরেকবার করলে নিকোলার বদলে ঘুষিটা তুমি খাবে, বুঝলে?‘ কর্নেল এক ঝটকায় আমাকে কাঁধে ফেলে উঠে দাঁড়ালেন।

     ‘ইয়ে, মানে, একটু ফুলগুলো দেখে চোখ সার্থক করতাম-‘ আমি কঁকিয়ে উঠে বললাম।

     ‘সেই আর কি, বেতালের মতো কাঁধে চেপে দুনিয়া ভ্রমণের শখ হয়েছে তোমার-‘ কর্নেলের গজগজানি শুনে সবার মধ্যে হাসির হিড়িক পড়ে গেলেও কর্নেল দিব্যি আমাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন সমতলের সেই লাল গালিচার দিকে।

 

১৬. ‘..যেতে নাহি দিব..’

আমি জানালার দিয়ে রোমের সব চাইতে উঁচু বিল্ডিংটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ‘টোরে ইউরোস্কাই’- পাঁচশো ফুটের বেশি উচ্চতা। ওখান থেকেই জিআরডি-র আবিষ্কৃত প্রতিষেধক বেলুনের মাধ্যমে আকাশে উড়বে। অনেকগুলো বেলুন। সব লাল রঙের। প্রতিটার মধ্যে থাকবে অতি অল্প পরিমানে ‘রক্তশুদ্ধি’ ভাইরাস। বেলুনগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে, বাতাসের চাপে ওরা একসময় ফাটবে এবং তরল প্রতিষেধক বাতাসে মিশবে। সেখান থেকে রোমের মানুষদের ফুসফুসে। প্রতিষেধকের কাজ শুরু হতে সময় লাগবে অল্প কিছু সময়। জম্বিরা সব মিশে যাবে হাওয়ায়, পরলোকের অন্ধকারে ঠাঁই হবে তাদের। আর যাদের শরীরে সংক্রমণ শুরু হয়েছে তারা বেঁচে যাবেন। তাদের ক্ষতের চিকিৎসা করবে সরকার।

     হোটেলের ঘরটায় বসে সেই বেলুন ওড়ার অপেক্ষাই করছিলাম।

     ওদিকে টিভিতে লুকার বদন দেখাচ্ছে। সে হাসিমুখে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে রোমের ফাঁকা রাস্তায়। কচ্চিৎ কদাচিৎ তার সাইকেলের পিছন পিছন ছুটে যাচ্ছে হতভাগ্য জীবন্ত মৃতের দল। দুঃখী শঙ্কিত নগরীতে সে জীবনের খেলা দেখাচ্ছে। আসলে সবার দৃষ্টি নিজের দিকে টেনে নিয়েছে, সেই ফাঁকে কর্নেলের নেতৃত্বে আমাদের ছোট্ট দলটা নিজেদের কাজ সেরে নেবে। অবশ্য কর্নেল লুকার এমন পাগলামিতে প্রথমে রাজি হননি। হবার কথাও নয়। কমলাকান্তের সাহায্যে এমনিতেই টাওয়ারের টঙে চাপতে ওদের অসুবিধা হবার কথা নয় বিশেষ। তবুও জন্ম রোমান্টিক লুকা কাজটা করতে চেয়েছিল। নেশার কবল থেকে শহর বাঁচান কর্নেল, ক্যামেরা তাক করে থাকুক লুকার দিকে। এমনটাই পরিকল্পনা ছিল তার।

     বেলুন উড়তে দেখলাম। খুশি হলাম।

     আকাশ ভরে গেছে অজস্র লাল বিন্দুতে। টিভিতে হঠাৎ করে লুকার ছবি মুছে গিয়ে ফুঁটে উঠলো বেলুনগুলোর ছবি। তাদের ভেসে যাবার উৎসব। যাক রোম বাঁচলো ভয়ানক এক নেশার হাত থেকে।

     ‘স্যার, কফি’ দরজাটা খোলাই ছিল বোধহয়। রুম সার্ভিসের মেয়েটি হাসিমুখে ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। কয়েকটা নধর স্যান্ডউইচ আছে কফির সঙ্গে। ওদিকে তখন টিভির অন্য একটা চ্যানেলে ‘ঝঞ্ঝাদ্বীপের’ গোপন বাঙ্কার থেকে মাফিয়াদের গুষ্টিসুদ্ধ সব্বাইকে গ্রেফতারের ফুটেজ। মেয়েটি কাপে কফি ঢেলে আমার হাতে দিয়ে বললো, ‘দন্ত ওরি, লর্ড উইল হেল্প আস অল-‘

     ভগবান না বিজ্ঞান? মুদ্রার এপিঠ না ওপিঠ? কোনটায় মুক্তি আমাদের?

     ‘ওহ, বেহায়া কাকটা একদম আমার কাঁধে কম্ম করে গেছে’ বিজ্ঞানীর গলা। বিস্ফারিত চোখে দেখলাম ঘরের মধ্যে কমলাকান্তের কারসাজি। আয়তক্ষত্রের পর্দার মধ্যে থেকে প্রথমে ডঃ দাস এবং তারপরে বাকিরা প্রবেশ করলেন। আমার চোখ গেল কফি হাতে ভদ্রমহিলার দিকে।

     ‘ওহ, লর্ড-‘ মহিলা লর্ডের কাছে আবেদন জানিয়ে ভুলুন্ঠিত হয়ে পড়ছেন ততক্ষণে।

     ‘আনা, ওকে এক্ষুনি ট্রলিসুদ্ধ পাশের ঘরে চালান করে দাও। অবশ্য কফি আর স্যান্ডউইচগুলো রেখে-‘ হালদার মশাই আর আনা কর্নেলের নির্দেশ মানতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

     কর্নেল কফি কাপে চুমুক মেরে ‘আঃ-‘ শব্দ করে সোফায় শরীর এলালেন।

     গঙ্গারাম তখনও গজগজ করছেন কাকটার বেয়াদবি নিয়ে।

     ‘ধন্যবাদ ডঃ দাস, আপনি না থাকলে আমরা সত্যি বিপদে পড়তাম-‘ আনা ফিরে এসেছে।

     ‘তুমি কি আমাকে এক্ষুনি বিদেয় করছো নাকি?‘ ডঃ দাস হাসলেন, ‘অবশ্য হাতে অনেক কাজ, তাই এবার সত্যি আমাকে পালাতে হবে-‘

     ‘দুগ্গা দুগ্গা,‘ কর্নেল ঠাট্টা করলেন, ‘অনেকখানি পথ তো-‘

     ‘কর্নেল, তোমার বাড়িতে একবার ষষ্ঠীর হাতের কফি খেয়ে এসব একবার। তুমিও পারলে একবার এসো আমার পাগলামির কারখানায়।‘

     ‘ধুস, ষষ্ঠী আবার কফি বানাতে শিখলো কবে থেকে-‘ কর্নেল ব্যাজার মুখে বললেন। চমকে উঠলাম। সেই সঙ্গে হাসিও পেলো। আমি জানি ষষ্ঠীদাকে রোজ কফি নিয়ে খোটা দিলেও কর্নেল ওই একটা লোকের হাতে বানানো কফি খাবার জন্য মুখিয়ে থাকেন।

     ‘তুমি মানুষ চিনলে না হে। যেমন জয়ন্ত, ওকেও তুমি চিনলে না। যেমনি সাহস তেমনি-‘

     ‘ঢের দেখেছি অমন সাহসী বোকা বোকা ছেলে। দেখলে কেমন অকারণে মরতে চলেছিল, নেহাত সিড়িঙে শয়তানটার হাতের টিপ খারাপ তাই তো বেঁচে গেল এই যাত্রায়। আর তুমি ওকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে নিজের দলে টানার চেষ্টা কোরো না- ‘ কর্নেল দাড়িতে আঙুল বুলিয়ে উকুন বাছতে বাছতে খিঁচিয়ে উঠলেন।

     ‘ধন্যবাদ ডঃ দাস, আপনি না থাকলে এবারে যে কি হত-‘ আমি হাত বাড়িয়ে গবেষকের হাতটা ধরলাম। ‘না হে, কিচ্ছু হত না। ওই বুড়োটা ঠিক কিছু একটা পরিকল্পনা ফেঁদে ফেলতো নিশ্চয়। ওর মাথায় বদবুদ্ধির অভাব নেই-‘ ভদ্রলোক চোখ মটকে আমার হাতটাকে ঝাঁকালেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল। এমন লোকের সঙ্গে যদি প্রতিটি অভিযানে অংশ নেওয়া যেত তাহলে কি মজাই না হত। অবশ্য দুটো খিটখিটে বুড়োকে একসঙ্গে ম্যানেজ করাটাও যে চাট্টিখানি কথা নয় সেটা ভেবেই মুখ শুকিয়ে গেল।

     ‘কমলাকান্ত, ডেরায় যাবার ব্যবস্থা কর-‘ কালো যন্ত্রটা থেকে আবার আলোকিত পর্দার উৎপত্তি হল। তার মধ্যে শরীরটাকে সেঁধিয়ে দিয়ে উধাও হলেন বুড়ো মানুষটি। শুধু একটা বাক্য শুনতে পেলাম পর্দার ওপার থেকে।

     ‘বিদায় বন্ধুরা, আবার দেখা হবে?‘

     প্রশ্নটা হাওয়ায় ভাসতে রইলো কফির গন্ধের সঙ্গে মিলে মিশে।

 

১৭. ‘….We dare be brave…’

রবিবারের খাবার টেবিলে তখন শুধুই চুকুম চাকুম শব্দ।

     টিভিতে সংবাদ চলছে মৃদুস্বরে। সাম্প্রতিক বিপদের হাত থেকে ইতালির উদ্ধার পাওয়া আর তার পিছনে গুপ্ত কার্যকারণ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন ওখানকার রাজনীতিবিদরা। সাংবাদিক একজন পথচলতি ভদ্রমহিলাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কারা রোমকে রক্ষা করলো বলুন তো?‘

     ‘দেবদূতরা।’ ভদ্রমহিলা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। ছবিটা ফ্রিজ হয়ে গেল। শেষ কথাটাও জমে গেল স্মৃতির খাতায়। শুধু চোখদুটো ঝাপসা হয়ে এলো।

     আমি আড়চোখে তাকালাম কর্নেলের দিকে। তিনি তখন ষষ্ঠীদার হাতের জাদুতে মজেছেন। কৃতান্তবাবু রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন উদগ্রীব হয়ে। ষষ্ঠীদাকে নাকি এবার কেড়ে নিয়ে যাবেন নিজের বাড়িতে। সেই ভয়েই কিনা সরল মানুষটা আর রান্নাঘর থেকে বের হতেই চাইছে না।

     খুব মনে পড়লো আনার কথা। ও না থাকলে কর্নেলের সঙ্গে যোগাযোগ হত না লুকা-র। লুকা না থাকলে আমরা জানতেই পারতাম না রোমের অমন বিপজ্জনক ঘটনাপ্রবাহের কথা। আর ডঃ দাস? যাঁর ‘আবিষ্কার’ রোমের আকাশে জমে থাকা দুর্যোগকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিল? তিনি কি করছেন এখন?

     এরা ‘দেবদূত’ কিনা জানি না তবে ওরা আমার বন্ধু, পরিবার। ওরা সবাই আমার ভালোবাসার মানুষ। ভালোবাসা- ওটাই বোধহয় এই গোটা পৃথিবীর একমাত্র বিশল্যকরণী। বিজ্ঞান এবং ধর্ম শুধু পথ মাত্র।

     চিক-চিক-চিইইক্ক –

     ‘ও মাই গড-‘ কর্নেলের মুখে ঈশ্বরের নাম শুনে জানালার দিকে চোখ ফেরালাম। কর্নেল ততক্ষনে দৌড় মেরেছেন বাগানের দিকে। কৃতান্তবাবু হাঁ-মুখে শুধু উচ্চারণ করলেন শব্দটা, ‘কুলফি?‘

     কর্নেলের পোষ্যপুত্র, অনাথ ময়নাটা ফিরে এসেছে! ভালোবাসার টানে? আমিও সেদিকে ছুট লাগাতে গিয়ে থমকে গেলাম।

     সংবাদের চ্যানেলে চোখ আটকে গেল। সুন্দরী ঘোষিকা একটু গম্ভীরভাবে তার পরবর্তী সংবাদ পরিবেশন করলেন-

     ‘একটি বিচিত্র ঘটনা পরিবেশবিদদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে সম্প্রতি। ভারত মহাসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের নৌকার খোলে পাওয়া গেছে একরকম কিম্ভূত প্রাণীর মৃতদেহ। হামিং বার্ডের মতো দেখতে হলেও এদের কিন্তু পাখি বলে ভুল করবেন না। এরা হল হক মথ- এরা একরকমের মধুলোভী পতঙ্গ। কিছু কিছু মৎসজীবীর দাবি, সম্প্রতি আকাশে ওদের ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসতে দেখা যাচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশ লক্ষ্য করে। তাদের গতিপথের এমন পরিবর্তনে অবাক হয়েছেন অনেকেই-‘

     ঘোষিকা আরও অনেক কিছুই বলেছিলেন। আমি শুনছিলাম না। ধপাস করে বসে পড়েছিলাম সোফায়। চোখের সামনে শুধু ঘুরছিল সেই বিকৃত যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষগুলোর চেহারা। বুঝলাম, প্রলয় আসছে। ভয়ানক, দুর্ভাগ্যজনক। এবারে কারা বাঁচাবে গোটা মহাদেশটাকে?

     ‘দেবদূতরা-‘, রোমের পথিকের মুখটা মনে পড়ে গেল। কি অসাধারণ বিশ্বাসের জোর! চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

     ‘কর্নেল-‘ একটা বিকট চিৎকার ছুঁড়ে বাগানের দিকে দৌড়ে গেলাম ভগ্নদূতের বেশে। ঘরের বাতাস থম মেরে রইলো আসন্ন বিপদের দুর্ভাবনা বুকে নিয়ে।

4 thoughts on “একটি মথের মৃত্যু

  • October 4, 2019 at 8:53 am
    Permalink

    Zombies! Omnipotent A. I. device! Holy-! Truly an amazing adventure of the বুড়ো ঘুঘু!

    Reply
    • October 5, 2019 at 3:54 am
      Permalink

      ধন্যবাদ অর্চি!

      Reply
  • October 11, 2019 at 8:30 am
    Permalink

    apnar lekha borabor e bhalo lage,ebar o khub bhalo laglo
    prosenjit

    Reply
    • October 12, 2019 at 12:20 am
      Permalink

      ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম, ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন ।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!