কবর

রচনা  :

অলঙ্করণ :

যে বন্দী দশায় বসে আছি তাতে এই অদ্ভুত কাহিনী লিখতে আমার বেশ ভয় লাগছে। জানি এ লেখা পড়ার পর আমার মানসিক সুস্থতা নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠবে। মানুষের দুর্ভাগ্য এই যে তার পক্ষে জাগতিক দুনিয়ার বেশি কিছু প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয়, আর আমার দুর্ভাগ্য হল আমার পক্ষে সেটা প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হলেও বাকিদের তার সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। আমার মতে বাস্তব আর অতিবাস্তবের মধ্যে ফারাক শুধু দৃষ্টিভঙ্গির। যে দেখছে সে কতটা দেখতে পারে তার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সমস্যা হল যারা এই অতিবাস্তবকে সত্যিকারের অনুভব করতে পারে তাদেরকে একঘরে করতে বড় ভালোবাসে মানুষ।

    আমার নাম জেরভাস ডাডলি। ছোটবেলা থেকে আমার নেশা হল স্বপ্ন দেখা। কোনরকম কাজকর্ম না করে জীবন কাটিয়ে দেবার মত টাকাপয়সা আমার আছে। এখন যে অবস্থায় আছি তাতে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া বা লোকজনের সাথে মেলামেশা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব অতিপ্রাকৃতের জগত আমার চারণভূমি। কিছু প্রাচীন আর অজানা পুঁথিপত্র পড়ে আমার সময় কাটে। আমার পূর্বপুরুষের জন্ম ভিটেটা বেশ বড়, তার লাগোয়া মাঠে আর জঙ্গলে অবসর সময়ে ঘুরে বেরাই। ওই বইগুলোতে, মাঠে, জঙ্গলে আমি যা দেখেছি সেটা হয়ত আর কেউ দেখেনি। কিন্তু এসব নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাইনা আমি। কারণ তার বিশদ বর্ণনা দিলে হয়ত আমার এই বন্দী দশা আরও কঠিন হবে, গারদের ওপাশ থেকে রক্ষীদের যে ফিসফাস আমি শুনতে পাই সেগুলো আরও ভয়ঙ্কর আর নির্মম কৌতুকে এসে আঘাত করবে আমাকে।

    আমাদের বাড়ির কাছেই একটা ভাঙা সমাধিঘর আছে। প্রতিদিন গোধূলির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি সেখানেই কাটাই। কখন পড়ি, কখনও ভাবি, আবার কখনও শুয়ে শুয়ে স্বপ্নের জগতে হারিয়ে যাই। এর সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে আমি একসময় দৌড়ে বেড়াতাম। আমার কৈশোরের বেড়ে ওঠার দিন গুলো এই সমাধিঘরের আশেপাশেই কেটেছে। এমনকি চারপাশের গাছগুলোকেও ধীরে ধীরে চিনে গেছিলাম। চাঁদের আলোয় তাদের মাথা গুলো যেন কিসের ইশারায় দুলতো, যাই হোক এসব কথা আমি বলতে চাইনা, আমি খালি ওই সমাধিঘরটার কথা বলব। হাইড ফ্যামিলির পারিবারিক কবরস্থান। তাদের শেষ বংশধরকে আমার জন্মের বহুকাল আগে ওই সমাধির অন্ধকারে কবর দেওয়া হয়ছে।

    সমাধিটা প্রাচীন গ্রানাইট পাথরের তৈরি। বহু প্রজন্মের অবহেলায় আর ঝড়ঝাপটায় রঙ উঠে ধুলো পড়ে গেছে। পাহাড়ের দিকের অংশটা প্রায় ভেঙ্গে পড়েছে, সামনের দিকটা খানিকটা আস্ত আছে। ঢোকার ঠিক মুখেই একটা বড় পাথরের দরজা ভিতরের নিষিদ্ধ এলাকা আগলে দাঁড়িয়ে আছে। জং পড়ে প্রায় দেওয়ালের সাথে মিশে গেছে দরজারা, তার উপর আবার তার গা বেয়ে ঝুলছে একগাদা সাপের মত লোহার চেন আর একটা বড় ভারী তালা। এই হাইড ফ্যামিলির আবার একটা ইতিহাস আছে, আমার জন্মের বহুবছর আগে কোন এক সন্ধ্যায় খুব ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিল। হাইড ম্যানসনে তখন একটা পার্টি চলছিল, অনেক লোকজনের সমাগম, হুল্লোড়, পার্টিতে যেমনটা হয় আর কি। এমন সময় বাড়ির উপর বাজ পড়ে, তাতে সম্ভবত একজন মারা যায়। বাজ পড়ে বাড়িটার খানিকটা ক্ষতি হলেও সেটা সারিয়ে নেওয়া হাইড ফ্যামিলির কাছে তেমন বড় কোন ব্যাপার ছিল না। কিন্তু তার পর থেকেই দেশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাইডদের উপর মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে এলো, বংশধরেরা একে একে মারা যেতে লাগল। পরিবারের শেষ সদস্যও কোন উত্তরাধিকারী না রেখে মারা যায়। তার কবরে ফুল দেবার মত লোকও জীবিত ছিল না। 

    কোনো এক গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে আমি আধপোড়া, ভৌতিক হাইড ম্যানসনে প্রথম প্রবেশ করেছিলাম। সমস্ত বাড়িটায় কিরকম একটা পোড়া গন্ধ, যেন ঝলসানো অতীতের প্রতিধ্বনি আজও তার জানলায় ফাঁকে, দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে হানা দিয়ে যায়। সারাদিন ওই বাড়িটায়, মাঠে, জঙ্গলে আর কবরস্থানটায় ঘুরে বেড়াতাম। এমন কিছু খেয়াল আমার মাথায় এসে ভর করত যার কথা এখানে বলা উচিত নয়। এমন অনেকের সাথে কথা বলেছি যাদের নাম আমি এখানে বলতে চাই না। মাত্র দশ বছর বয়সে এখানে আমি যা দেখেছি আর শুনেছি তাতে নিজের অজান্তেই আমার চেনাশোনা জগতটা পালটে গেছে। একদিন এর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে আবিষ্কার করলাম, বিরাট পাথরের কবরস্থানটার ঠিক পিছনেই সেটার ভিতরে ঢোকার একটা রাস্তা আছে। কতগুলো গ্রানাইটের ব্লক সরালেই সেখানে পৌঁছানো যায়। ভিতরে সারি সারি পাথরের স্তূপ হয়ে আছে, ঝুলে ভরা দেওয়াল গুলো অন্ধকারে স্থবির দানবের মত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা ঠাণ্ডা স্যাঁতস্যাঁতে ভাব। অথচ এতো কিছুর মধ্যেও আমার ভয় লাগেনি সেদিন। শুধু বারবার ইচ্ছা করছিল যে বিরাট লোহার জং লাগা দরজাটা আমার পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে সেটা খুলে ফেলতে। ওই বড় তালা আর চেন গুলোকে যদি কোনোভাবে সরিয়ে ফেলা যেত… বারবার মনে হত সেই বন্ধ দরজার আড়াল থেকে কেউ যেন আমাকে ডাকছে। ব্যাপারটা যাদের কাছে বলেছি তারাই আমাকে নিষেধ করেছে ওই সমাধিটা নিয়ে বেশি ভাবতে। কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। যেভাবেই হোক ওর ভিতরে আমি ঢুকবই। যেভাবেই হোক…

    গায়ের জোরে যে তালাটা খোলা যাবে না তা বেশ বুঝতে পারছিলাম, আমি বইয়ের জগতে ফিরে গেলাম, কয়েকমাস ধরে শুধু প্রাচীন সমাধি নিয়ে পড়াশোনা করতে লাগলাম। কিভাবে তৈরি হয় সেগুলো? বাইরে থেকে কোনোভাবে খোলা যায় কিনা, যে খোলে তারই বা পরিণাম কি? বইগুলো পড়ে কিন্তু কোন লাভ হল না। সেগুলোতে যে সমাধি সম্পর্কে লেখা হয়েছে তাদের থেকে এই ভল্টটা সম্পূর্ণ আলাদা, যেন অন্য সময়ের কারিগরের হাতে তৈরি, অন্য কিছু আছে তার ভিতর, শুধু কয়েকটা কফিনবন্দি মৃতদেহ নয়, আরও অন্যকিছু। দিনের পর দিন আমি সেই পাথরের সমাধির পাশে বসে থাকতাম। সকালের আলো ক্রমশ বিকেলে পৌঁছাত, তারপর ধীরে ধীরে রাত নামত। আমি পাথরের উপর শুয়ে তাকিয়ে থাকতাম কালো আকাশের বুকে অজস্র জ্বলন্ত নক্ষত্রের দিকে। একবার কি খেয়ালে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে দরজার ঠিক নিচটায় ধরে ভিতরে যতটা সম্ভব দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু একটা কালো পাথরের সিঁড়ির নিচের ধাপ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। সেই সাথে নাকে এলো একটা আশ্চর্য গন্ধ। আমার চেনা কিছুর, অথচ আমার সব সৃতি, এমনকি আমার শরীরের থেকেও পুরনো।

    কয়েকবছর পরে আমার বাড়ির স্তূপীকৃত বইয়ের পাহাড় ঘাঁটতে গিয়ে একটা বই এলো আমার হাতে। প্লুটার্কের লাইভস। থিসিয়াসের জীবনী লেখা আছে তাতে। একটা প্যাসেজে আমার চোখ আটকে গেল। তাতে লেখা আছে যে একটা বিরাট পাথরের নিচে রাখা আছে পৃথিবীর সমস্ত রহস্যের চাবিকাঠি। পাথরটা না সরালে সেটা হাতে পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ যতদিন না পাথরটা সরিয়ে ফেলার মত শারীরিক ক্ষমতা থিসিয়াসের হচ্ছে ততদিন তার পক্ষে চাবিটা পাওয়াও সম্ভব নয়। আমার মনে সমাধিটা সম্পর্কে যেটুকু হতাশা জমা হয়েছিল, প্যাসেজটা পড়ে সেটা এক নিমেষে মুছে গেলো। হয়ত আমার সময় হয়নি এখনও। নিজেকে বোঝালাম যে আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। সময় হলে হয়ত নিজে থেকেই দরজা খোলার চাবিকাঠি এসে ধরা দেবে আমার হাতে। আমি আবার প্রতি রাতে ওই সমাধিটার পাশে শুতে শুরু করলাম। কখনও বা হেঁটে বেড়াতাম তার চারপাশে। হাইডদের সমাধি থেকে খানিকটা দুরেই আমাদের পারিবারিক কবরস্থান। আমাদেরটা অবশ্য এতো প্রাচীন নয়। বাবার কাছে শুনেছি কোন এককালে হাইডদের সাথে আমাদের পারিবারিক যোগ ছিল, তেমনটা হলে আমিই হাইডদের শেষ উত্তরপুরুষ, অবশ্য এসবে আমার তেমন আগ্রহ নেই বলে আর কিছু জানার চেষ্টা করিনি। সমাধির পাশে শুয়ে থাকতে থাকতে একেক সময় মনে হত হয়ত সমাধিটা আমারই। জানিনা কেন বারবার আমার মনের গভীর কোন অন্ধকার থেকে কেউ যেন ফিসফিস করে বলত ওই সমাধিঘরের ভিতরের কোনও কফিনে আমিই শুয়ে আছি। কখনও দরজায় কান লাগিয়ে ভিতরের শব্দ শোনার চেষ্টা করতাম। চারপাশে ঘাসের জমির খানিকটা ফাঁকা করে শোয়ার মত জায়গা বানিয়ে নিয়েছিলাম। সেখানে শুলেই ভয়ঙ্কর সব খেয়াল আর স্বপ্ন মনে আসত।

    একদিন রাতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ক্লান্তিতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠতেই বুঝলাম রাত আরও গভীর হয়েছে, কোথা থেকে কার যেন ফিসফিসে গলা ভেসে আসছে। সে কথাগুলোর অর্থ কি ছিল তা আমি সেদিন বুঝতে পারিনি। আজ বোঝার চেষ্টাও করিনা। জানিনা কেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি এসে আমায় চেপে ধরল। মনে হল এই মাত্র একটা নীলচে আলো সমাধিটা থেকে বেরিয়ে মহাশূন্যের দিকে ধেয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে আমি ভয় পাইনি, অবাকও হয়নি। কিন্তু সেই অজানা আলোটাই আমার জীবন চিরকালের মত পালটে দিল। অজান্তেই কিছু জানতে পারলাম আমি। বাড়ি ফিরে ধীরে ধীরে উঠে এলাম আমার পুরনো চিলেকোঠার ঘরে। খুঁজে পেলাম একটা চাবি। আমার মন বলছিল ঠিক পথেই চলেছি আমি, এই চাবিটাই খুলে দেবে ওই সমাধির দরজা।

    দুপুরের হালকা আলো গায়ে মেখে আমি সেই সমাধিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চারপাশ নির্জন। অর্থাৎ আমার কাজে বাধা দেবার কেউ নেই। মন্ত্রমুগ্ধের মত চলছিল আমার হাত। তালার ভিতর চাবিটা ঢুকিয়ে ডানদিকে ঘোরাতেই তালাটা খুলে গেলো। আমি ভিতরে ঢুকে এলাম। সিঁড়ির সেই ধাপ গুলো। মোমের আলোয় তার নিচের দিকটা দেখা যাচ্ছে। মনে হল পথ যেন আমি আগে থেকেই চিনি। এতদিনের বদ্ধ বাতাস আমার শরীরে ঢুকতে আমার সেই পুরনো ভাবনাটা মাথায় এলো। এই সমাধি ঘরেই কোথাও শুয়ে আছি আমি। চারিদিক পাথরের স্ল্যাব ছড়িয়ে আছে। তার ভিতরে রাখা আছে কাঠের কফিন। তার কতোগুলো আস্ত আছে, কয়েকটা ভেঙ্গে গিয়ে ভিতর থেকে ধুলো আর ঝুল বাইরে বেরিয়ে এসেছে। একটা কফিনের উপর ঝুঁকে পড়ে আমি নামটা লক্ষ্য করলাম, “ স্যার জিওফ্রে হাইড”। হঠাৎ চোখে পড়ল একটু দুরেই পড়ে আছে একটা ফাঁকা কফিন। অন্যগুলোর মত পুরনো নয়। যেন কারর অপেক্ষায় খোলা রয়ছে তার ডালাটা। কি মনে হল জানিনা। আমি মাটিতে ঝুঁকে পড়ে আস্তে আস্তে তার কাছে এগিয়ে গেলাম, তারপর শুয়ে পরলাম ফাঁকা কফিনটার ভিতরে, ঠিক যেমন ভাবে শোয়ানো থাকে মৃতদেহগুলো। 

    কিছুক্ষণ সেভাবে শুয়ে থেকে আমি উঠে পরলাম। সমাধি থেকে বেরিয়ে এসে চাবি দিয়ে আবার আগের মতই বন্ধ করে দিলাম তালাটা। মনে হল আমি আর ২১ বছরের যুবক নই। এই কয়েকটা ঘণ্টায় আমার বয়স অনেকটা বেড়ে গেছে। বাড়ি ফেরার পথে লক্ষ্য করলাম রাস্তা ঘাটে সবাই তাকিয়ে আছে আমার দিকে। যেন তারা চেনেই না আমাকে। এখনও মনে আছে, সেদিন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষন অনেকক্ষন ঘুমিয়েছিলাম আমি।

    এরপর থেকে রোজ রাতে আমি ওই ফাঁকা কফিনের ভিতর গিয়ে শুয়ে থাকতাম। যা দেখতাম, শুনতাম, অনুভব করতাম তা এখানে বলতে পারব না। আস্তে আস্তে আমার কথা বলার ভঙ্গি বদলে গেলো। চিরকালই আমি লাজুক প্রকৃতির, বিশেষ কথা বলি না। কেউ আমায় কোন কারণে উত্তেজিত হতে দেখেনি কোনোদিন। সেই আমিই নিজেকে চিনতে পারলাম না। খুব ছোট্ট কারণে মাথা গরম হয়ে যায়, চিৎকার করি। সব কিছুতে অসন্তুষ্ট, বিরক্ত। আরও নতুন একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। বাজ পড়লে আমার ভীষণ ভয় করে। অথচ এটা আগে কোনোদিন হত না। ব্যাপারটা বেশ আশ্চর্যের! ঝড়বৃষ্টি হলেও আমি ঘরের এককোণে গিয়ে কানে হাত চাপা দিয়ে বসে থাকি। বেশিরভাগ সময় হাইড ক্যাসেলে গিয়ে বসে থাকি। সব কিছু আমার চেনা লাগে। বাড়িতে থাকতে চাইনা, খেতে ইচ্ছা করে না, ঘুম আসে না, খালি ওই সমাধিটার ভিতর শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে, ব্যাপারটা এমন বেড়ে উঠল যে বাড়ির লোকজন আমাকে আর সমাধির কাছে আসতে দিত না। আমাকে ডাক্তার দেখান হল, কিন্তু সেও কোন সমাধান দিতে পারল না। উল্টে আমার উপর সবসময় নজরদারি শুরু হল। বাড়ির বাইরে বেরলেই সাথে কেউ না কেউ থাকত। তবুও এতো কিছুর মধ্যেই আমি কিন্তু হাল ছাড়িনি। সেই লোহার চাবিটা গলায় চেন করে ঝুলিয়ে রাখতাম। কখনও ফাঁক পেলেই বাড়ি ছেড়ে পালাতাম। সবার নজর বাঁচিয়ে পৌঁছে যেতাম সেই সমাধিঘরটার কাছে। তার বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকত আমার বাবার ভাড়াটে প্রহরী। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল সে কোনোদিন দেখতে পেত না আমায়। এমন কি আমি তার সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও না। প্রথম দিন খুব ভয় লেগেছিল, ভেবেছিলাম এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম, কিন্তু না, দেখলাম আমার দিকে তাকিয়েও চোখ ফিরিয়ে নিল সে। তবে কি এখানে আমাকে আড়াল করছে কেউ? নিশ্চিত ধরা পড়ার হাত থেকে বারবার বাঁচিয়ে দিচ্ছে? আমার খুব মজা লাগল। আর কোন ভয় নেই, আমি আবার শুতে পারব ওই কফিনটার ভিতরে। প্রতি রাতে আমি বাড়ির পাঁচিল টপকে এখানে চলে আসতাম। সারারাত শুয়ে থাকতাম কফিনের অন্ধকারে। এভাবে কিছুদিন চলার পর একটা অবর্ণনীয় ঘটনা ঘটেছিল। তার জেরেই আমি আজ এই গারদে বন্দি। সেই ঘটনার কথাই এবার লিখতে চলেছি।

    প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির একটা রাত। সেদিনও আমি আমার বাড়ির সীমানা পেরিয়ে চলে এসেছিলাম সমাধির সেই ফাঁকা কফিনটার কাছে, শুয়েছিলাম তার নিস্তব্ধ অন্ধকারে। হঠাৎ কেন জানিনা মনে হল কোথা থেকে কাদের যেন হট্টগোলের আওয়াজ আসছে, খুব ক্ষীণ, তবু শোনা যায়। বাইরে তখন ক্রমাগত বাজ পড়ছে। মুষলধারে বৃষ্টির আওয়াজ হিংস্র দানবের মত সমাধির দরজায় হানা দিয়ে যাচ্ছে। আমার কেমন যেন কৌতূহল হল। এমনিতে আমার বাজ পরলে ভয় লাগে কিন্তু আজ যেন আমার কৌতূহলটা সেই ভয়টাকেও ছাড়িয়ে গেলো। আমি কফিন ছেড়ে উঠে পরলাম। শব্দগুলো আসছে কোথা থেকে? সমাধির দরজা খুলে বাইরে আসতেই আমার জামাকাপড় ভিজে গেলো। কাদামাখা রাস্তার উপর দিয়ে আমি পা বাড়ালাম। খানিকটা দূর আসতেই বুঝলাম বাজ পড়ে জ্বলে যাওয়া হাইড ম্যানশন থেকে আসছে শব্দগুলো। কিন্তু তাই বা কি করে হয়? সেখানে তো লোক প্রায় থাকে না বললেই চলে। তাছাড়া মানুষের গলার সাথে সাথে অর্কেস্ট্রার সুর ও ভেসে আসছে, সেটা তো সম্ভব নয়। দ্রুত পায়ে আমি হাইড ম্যানসনের বাইরে এসে দাঁড়ালাম, আর দাঁড়াতেই অবাক বিশ্বয়ে আমার শরীর অবশ হয়ে এলো। একি দেখছি চোখের সামনে? এতো আমার ছোট থেকে দেখে আসা ভাঙ্গাচোরা অন্ধকার ভৌতিক বাড়িটা নয়, চারিদিকে রীতিমতো আলো জ্বলছে। ভিতরে অনেক লোকজনের গলা পাওয়া যাচ্ছে। সম্ভবত কোন পার্টি চলছে। আমি আর বেশি ভাবলাম না। মানসিক ভাবে যে আমি সুস্থ নই সেটা মাঝেমধ্যে নিজেও আন্দাজ করতে পারি। ভিতরে ঢুকে এলাম। দেয়ালে দামী কাঁচের সাজসজ্জা ঝলমল করছে। হলঘর ভর্তি অনেক লোক। কেউ কেউ আমাকে দেখে হাসল। আমিও প্রত্যুত্তরে হাসলাম। কয়েকজনের সাথে কথাও হল। আশ্চর্য! একটু আগে যেটা আমার চরম অবাস্তব মনে হচ্ছিল সেটা এখন স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। চারপাশে কত মানুষ হাসছে, কেউ গান গাইছে কেউ আবার চুমুক দিচ্ছে মদের গ্লাসে। তবু আমার মনে হত লাগল এরা যেন কেউ জীবিত নয়। বহুকাল আগে কফিনের ভিতর নষ্ট হয়ে গেছে এদের দেহ। শুধু আমারটা হয়নি। ঠিক এইসময় আমার চারপাশে সব কিছু আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল। মনে হল আমার শরীরটা আর নেই, সেটা যেন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। অথচ কোন যন্ত্রণা হচ্ছে না আমার। লক্ষ্য করলাম আমার পোড়া শরীরের ছাই গুলো ছড়িয়ে পড়ছে ঘরের চারিদিকে, তবে কি আমার মৃতদেহ বলে কিছু থাকবে না? হাইডদের সমাধিঘরে আমার জন্য যে ফাঁকা কফিনটা পড়ে আছে সেটাতে শান্ত হয়ে শুয়ে থাকতে পারবনা আমি? একটা ঝিমঝিমে অস্বস্তি আমাকে ক্রমশ গ্রাস করছে। না কিছুতেই হতে পারে না, আমার এতদিনের যত্নের শরীর আমি ছাই হতে দেব না, আমি ফিরে আসব… আমি ফিরে আসব…

    জ্ঞান ফিরতে দেখলাম দুটো শক্তসমর্থ লোক আমার হাতপা চেপে ধরে আছে। এদের মধ্যে একজনকে আমি চিনি। আমার সেই ভাড়াটে পাহারাদারটা, দরজার চৌকাঠে বৃষ্টি পড়ছে। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম দূরে দিগন্ত রেখার কাছে বিদ্যুতের আলো চমকাচ্ছে। একটু দূরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন আমার বাবা। আমি চিৎকার করে বললাম আমাকে কফিনে শুইয়ে দিতে, এখানে থাকতে চাইনা আমি। কিন্তু কেউ শুনল না আমার কথা। উল্টে বলল আমি নাকি কোনোদিন সমাধির ভিতরে ঢুকিনি। বাইরের সেই মস্ত তালাটা নাকি আগের মতই বন্ধ আছে। আমি মানতে চাইলাম না, আমি যে সব দেখেছি নিজের চোখে। ওই সমাধির ভিতর কফিনগুলো, ওই ফাঁকা বাক্সটা, সেটা যেন টানছে আমায়, আমি ছাড়া পেলেই জোর করে বেরিয়ে যেতাম ঘর ছেড়ে। সমাধির কাছে গিয়েই মনে পড়ত চাবিটা আমার কাছে আর নেই। সেই ভয়ঙ্কর রাতে কোথাও পড়ে হারিয়ে গেছে সেটা।

    এতদিন যারা আমাকে সহানুভূতি দেখাত তারা আমাকে পাগল বলতে শুরু করল। অথচ আমি জানি আমি যা দেখেছি সেগুলো অবাস্তব হলেও মিথ্যে নয়। বারবার ছুটে যেতাম সমাধিটার কাছে, তালাটা খোলার চেষ্টা করতাম। কিন্তু কেউ না কেউ এসে ধরে ফেলত আমাকে। তারপর একসময় সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল আমাকে এখানে রাখা আর ঠিক নয়। দিনদিন কফিনটার প্রতি টান বাড়ছে আমার। এর মাস ছয়েক পড়ে আমাকে নিয়ে আসা হল এই পাগলাগারদে। এখনও সেখানেই আছি। হয়ত এখান থেকে কোনোদিন ছাড়বে না আমাকে। কিন্তু তাতে আর আমার কিছু যায় আসে না। কেন যায় আসে না শুধু সেটাই বলা বাকি আছে।

    এক সপ্তাহ আগে আমাদের পুরনো বাটলার হিরাম এসেছিল আমার সাথে দেখা করতে। ছোট থেকে তার কাছেই মানুষ হয়েছি আমি। আমার কথা মত এক গভীর রাত্রে সবাই নজর এড়িয়ে সমাধির সেই তালাটা ভেঙ্গে ফেলেছিল হিরাম। একটা মোমবাতি হাতে ভিতরে ঢুকেছিল সে। একটা পাথরের স্ল্যাবের উপরে সেখানে সত্যি একটা ফাঁকা কফিন আছে। তার উপরে লেখা আছে আমার নাম, জেরভাস। হিরাম আমাকে কথা দিয়েছে আমার মৃত্যু হলে ওখানে শুইয়ে কবর দেওয়া হবে আমাকে।


[ সম্পাদক – এইচ পি লাভক্রাফটের জন্ম হয়েছিল ২০ শে আগস্ট, ১৮৮০ সালে অ্যামেরিকার রোহডস আইল্যান্ডে। ছোটবেলা থেকেই ভগ্ন স্বাস্থ্য লাভক্রফটের সময় কাটত বই পড়ে। এই সময় তার হাতে এসে বিখ্যাত লেখক এডগার এল্যান পোর লেখা বই। তার সাথে সাথে  তিনি মেতে উঠলেন জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে।  ১৯২৩ সালে হরর ম্যাগাজিন ‘উইরড টেলস’ লাভক্রফটের কিছু গল্প প্রকাশ করতে শুরু করে। ১৯২৮ সালে বেরোল ‘দি কল অফ কাথুলু’, লাভক্রাফটের অন্যতম সেরা হরর গল্প। ১৯৩৭ সালে মারা যাবার আগে তিনি লিখে যান ৬০ খানি ছোট গল্প ও বেশ কিছু নভেল, যাদের মধ্যে অন্যতম, ‘দি কেস অফ চার্লস ডেক্সটার ওয়ার্ড’। লাভক্রফটকে পাঠক বিংশ শতাব্দীর সেরা হরর গল্প বলিয়ে হিসেবে চিরকাল মনে রাখবেন।  ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!