কল্পবিজ্ঞানের আড্ডায় – অনীশ দেব ও সৈকত মুখোপাধ্যায়ের মুখোমুখি

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের এক নিরিবিলি দুপুরে কল্পবিশ্বের তিন সদস্য দীপ ঘোষ, বিশ্বদীপ দে ও সুপ্রিয় দাস মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলা কল্পবিজ্ঞানের দুই প্রথিতযশা সাহিত্যিক অনীশ দেব ও সৈকত মুখোপাধ্যায়ের। সঙ্গে ছিলেন কল্পবিজ্ঞানের আরেক মনোযোগী পাঠক শৌভিক চক্রবর্তী। আড্ডার মধ্যে দিয়ে কোথা দিয়ে যে কেটে গেল অনেকটা সময়, বোঝাই গেল না। কেমন করে নতুনরা কল্পবিজ্ঞান লিখবেন সে আলোচনার পাশাপাশি উঠে এল বিশ্বশ্রেষ্ঠ কল্পবিজ্ঞান লেখকদের কথা। উঠে এল হারিয়ে যাওয়া ‘আশ্চর্য’ ম্যাগাজিনের প্রসঙ্গ, অধুনাবিস্মৃত সিদ্ধার্থ ঘোষ, দিলীপ রায়চৌধুরী থেকে হাল আমলের সাহিত্যিকদের নামও। সেই মনোজ্ঞ আলোচনা রইল ‘কল্পবিশ্ব’-র পাঠকদের জন্য।     

বিশ্বদীপঃ প্রথমেই জানতে চাইব, একজন তরুণ লেখক কীভাবে নিজেকে তৈরি করবে এক কল্পবিজ্ঞান লেখক হিসেবে?

অনীশঃ সবার আগে তাকে ভালো পাঠক হতে হবে। অনেক অনেক সায়েন্স ফিকশন পড়া উচিত তার। বাংলা তো পড়তেই হবে, এর সঙ্গে ইংরেজিও পড়তে হবে। অন্য কোনও ভাষা থেকে ইংরেজিতে খুব ভালো অনুবাদ পেলে সেটাও পড়ে নিতে হবে। পড়তে পড়তে সে নিজেই বুঝতে পারবে কী করে একটা ভালো লেখা লিখতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজকালকার অনেক লেখককেই দেখি তারা নিজের লেখা নিয়ে বলতেই বেশি ব্যস্ত। অথচ অন্যের লেখা পড়ার অভ্যেস তাদের একেবারেই নেই। হয়তো বাংলা সাহিত্যের কিছু ক্লাসিক রচনা পড়েছে, ব্যাস ওইটুকুই। অথচ পড়াটা একজন লেখকের খুব দরকার।

এরপর যেটার কথা বলব সেটা হল কল্পনাপ্রবণতা। যে লেখক যত বেশি কল্পনা করতে পারবেন, তিনি তত শক্তিশালী লেখক হয়ে উঠতে পারবেন।

আর সবশেষে বলব ভাষা অর্থাৎ সরস্বতীর কথা। ভাষাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বই পড়তেই হয়। পড়তে পড়তে শেখা যায়। কিন্তু আসল অনুশীলন হয় লিখতে লিখতে। লিখতে লিখতে ভাষা গ্রো করে। আমার নিজের কত পুরোনো লেখা এখন আর আমার একদম পছন্দ হয় না। চাইলে সেগুলো থেকেও বই হতে পারে, কিন্তু আমি চাই না সেই লেখাগুলো আর পাঠক পড়ুক। তাই বই হতে দিইনি।

বিশ্বদীপঃ কিন্তু যিনি প্রতিষ্ঠিত লেখক, কিন্তু কখনও কল্পবিজ্ঞান লেখেননি তিনি কী করে প্রস্তুত হবেন? তাঁর তো কল্পনা, ভাষা ইত্যাদি তৈরিই আছে। এর সঙ্গে আর কী লাগবে?

অনীশঃ আইজ্যাক আসিমভ একটা কথা বলেছিলেন, ‘ইউ ক্যান নেভার রাইট এ গুড সায়েন্স ফিকশন উইথ ব্যাড সায়েন্স’। কাজেই তাঁকে প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানকে ভালো করে জানতে হবে। এ প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি। বিখ্যাত সাহিত্যিক বিমল করের সঙ্গে আমার খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল। প্রায়ই তাঁর বাড়িতে যেতাম আড্ডা মারতে। তো তিনি একদিন একটা লেখা পড়ে শোনালেন। গল্পটার নাম ছিল ‘একদিন এক গোলাপ বাগানে’। দেখলাম, গল্পটায় মরীচিকার কারণ হিসেবে যা লেখা আছে, সেটা সঠিক কারণের একদম উলটো! সেকথা ওনাকে বলতেই উনি বললেন, ‘কিন্তু অনীশ, আমি তো বইতেই পেয়েছি।’ তারপর যে বইতে এটা পেয়েছেন সেটা এনে দেখালেন। দেখি বইতেই আসলে উলটো কথা লেখা আছে! কাজেই বিমলদার কোনও দোষ ছিল না। উনি বিজ্ঞানকে লেখায় আনলে বই থেকেই সেটা পড়ে জেনে নিতেন। খুব নিবিড় পড়াশোনা ছিল তাঁর।

সুপ্রিয়ঃ একটা অন্য কথা বলি। সম্প্রতি পড়া একটি গল্পে দেখলাম, লেখক বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন প্যারাগ্রাফের পর প্যারাগ্রাফ জুড়ে। এটা কি পাঠককে ক্লান্ত করে তোলে না?  

অনীশঃ লেখায় ভুল বিজ্ঞান যাতে না ঢোকে সেটা যেমন খেয়াল রাখতে হবে, পাশাপাশি এটাও মাথায় রাখতে হবে, লেখায় বিজ্ঞানের ওভারডোজ কিন্তু পাঠক মোটেই পছন্দ করে না। স্টিফেন হকিং-এর ‘ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইমস’-এর ভূমিকাতে একটা মজার ব্যাপারের উল্লেখ আছে। লেখক প্রথমে বইতে অনেক ইকুয়েশন রেখেছিলেন। কিন্তু পরে বইটির এডিটরের পরামর্শ মেনে তিনি কেবল E=mC2 সমীকরণটিই রেখেছিলেন। খোদ স্টিফেন হকিং-এর মতো বিজ্ঞানীকেও যখন পাঠকের কথা ভেবে একাজ করতে হয়েছে, তখন আমাদেরও সেটা মাথায় রাখতে হবে বইকি। সৈকত আপনি কিছু বলুন।  

সৈকতঃ লিখতে বসে চাঁদে বা মঙ্গলে মানুষ আছে সেটা আমরা এখন আর লিখব না। কারণ এটা প্রমাণিত, সেখানে প্রাণ নেই। কিন্তু আমরা প্যারালাল ইউনিভার্স দেখাতে পারি, যেহেতু সেটার বিপক্ষে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এটা কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে। তাছাড়া কল্পনার ব্যাপারটা তো আছেই। সেটাকে ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে হবে। এই যেমন রে ব্র্যাডবেরির ‘মার্স ক্রনিকলস’-এর লেখাগুলো। তিনি মঙ্গলকে যেভাবে দেখিয়েছেন… পুরোটাই ভুল। কিন্তু তিনি যা বলতে চেয়েছেন সেটা কিন্তু বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না।  

অনীশঃ হ্যাঁ, ঠিকই। উনি খুব মজা করেছিলেন মঙ্গল নিয়ে। দেখা গেল, পৃথিবী থেকে মঙ্গলে গিয়ে একটা বাড়িতে নক করছে, এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এসে বলছে, কী ব্যপার? উত্তরে ‘পৃথিবী থেকে আসছি’ শুনে তিনি ভাবলেশহীন হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, তো কী হয়েছে?’ এমন একটা ব্যাপার যেন, ভিখারি ভিক্ষা করতে এসেছে, আর তাকে বলা হচ্ছে, ‘মাফ করো ভাই।’ (হাসি) এটা কিন্তু উনি মজা করে লিখেছিলেন। বইটা অসম্ভব ভালো বই। এ প্রসঙ্গে বলতে পারি, এইচ জি ওয়েলসের ‘ইনভিজিবল ম্যান’-এও কিন্তু একটা সমস্যা আছে। একজন লোক অদৃশ্য হলে তার রেটিনায় কোনও প্রতিফলন হবে না। ফলে সে অন্ধ হয়ে যাবে। এটা কি ওয়েলস জানতেন না? ভালো করেই জানতেন। কিন্তু লেখার সময় তিনি বুঝেছিলেন, এটা দেখালে প্লটের মজাটা নষ্ট হবে। সুতরাং তিনি সেটাকে সযত্নে পরিহার করেছিলেন। যদিও ভুলে গেলে চলবে না এটা তিনি যখন লিখছেন, তখন তিনি বিখ্যাত লেখক। কাজেই তাঁকে যেটা মানায় সেটা অন্যদের মানায় না। আমাদের কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, যেন বিজ্ঞানটাকে আমরা ভুল না লিখি।

দীপঃ একটা অন্য প্রসঙ্গে আসি। অদ্রীশ বর্ধন সম্পাদিত ‘আশ্চর্য’ পত্রিকার প্রকাশের মধ্যে দিয়ে বাংলায় কল্পবিজ্ঞানের একটা নতুন যুগ শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভালো কল্পবিজ্ঞান পত্রিকার খুব অভাব দেখা দিল। বাংলা সায়েন্স ফিকশনের ধারা যে আস্তে আস্তে কিছুটা ম্লান হয়ে গেল, সেটার পিছনে কি এটা একটা বড় কারণ নয়?

অনীশঃ নিশ্চয়ই। অদ্রীশদা একটা দৈত্যের মতো কাজ করে গেছেন। নিজে লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, অন্যের লেখা ঠিক করে দিয়েছেন, প্রুফ দেখেছেন, প্রেস সামলেছেন। অর্থাৎ, একটা পত্রিকার একেবারে শুরু থেকে শেষ, সবটা উনি সামলেছেন। এই কাজটা পরবর্তী সময়ে আর কোনও সম্পাদকের পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। এমনকী অদ্রীশদাও পরের দিকে সেভাবে… আমায় মার্জনা করবেন, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, আশ্চর্য-র যতদূর যাওয়ার কথা ছিল, ততদূর কিন্তু পৌঁছোতে পারেনি। (সামান্য থেমে) রণেন ঘোষও ছিলেন। কিন্তু তারপর… এই যে ভালো সায়েন্স ফিকশন পত্রিকা না থাকাটা, এটা খুব বড় একটা ফ্যাক্টর। ম্যাগাজিন একটা এমন জিনিস, লোকে না কিনলেও স্টলে উলটে অন্তত দেখে। সেই অভিজ্ঞতাটুকুই না হয় হোক। আর সায়েন্স ফিকশন সম্পর্কে আগ্রহী এমন সম্পাদকও অবশ্যই দরকার।     

সৈকতঃ হ্যাঁ, সম্পাদকের চাহিদা খুব ইমপর্ট্যান্ট বিষয়। একজন মেইন স্ট্রিম লেখক, তিনি নানারকম লেখাই লেখেন। সম্পাদক যদি তাঁর কাছে একটা সায়েন্স ফিকশন চান, তিনি সেটাও লিখতে চেষ্টা করতে পারেন। আসলে লেখকের মনে তো নানারকম প্লট আসে… তিনি চাইলে একই প্লটকে সামান্য বদলে অন্যরকম রূপ দিতে পারেন। একটা গল্পের কথা বলি। গল্পটা এইরকম, একজন অন্ধ সাধক, তিনি দুচোখেই দেখতে পান না। অথচ তাঁর হাঁটতে চলতে কোনও অসুবিধে হয় না। তিনি ওইভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এরপর গল্পে এলিয়েনের আগমন ঘটে। তারা যে কোনও প্রাণীর মতো আকার নিয়ে নিতে পারে। ঘটনাচক্রে তারা ওই অন্ধের শরীরটা নকল করল। ফলে তারাও অন্ধ হয়েই চলাফেরা করতে লাগল। এতে যেটা হল, তাদের ধরে ফেলতে খুব একটা সমস্যা হল না। গল্পটাকে হয়তো অনায়াসে ফ্যান্টাসি গল্প করা যেত। ইন ফ্যাক্ট, অন্য অনেক দিকেই নিয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু গল্পটা সায়েন্স ফিকশন হিসেবেই লেখা হল। এইভাবেই অনেক লেখার মধ্যেই বীজ থাকে সায়েন্স ফিকশন হয়ে ওঠার। কিন্তু সম্পাদকের চাহিদা না থাকলে সেটা অন্যদিকে মোড় নিয়ে নেয়। কাজেই সম্পাদকের ভূমিকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন লেখক সাধারণত বহু বিষয়েই উৎসাহী হন। নানারকম বিষয়েই তাদের পড়াশুনো থাকে। পড়তে পড়তে নানা রকম আইডিয়া তাদের মাথায় ভিড় করে আসে। আমার প্রথম সায়েন্স ফিকশন লেখাটাও এভাবেই লেখা হয়েছিল। কিন্তু সেটাকে অনায়াসেই অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া যেত। যেহেতু, আমি কল্পবিজ্ঞান ভালোবাসি তাই ওইদিকেই গল্পটাকে নিয়ে গেলাম। কিন্তু সব সময় সেটা সম্ভব না-ও হতে পারে। ধরা যাক, আমার মাথায় একটা বীজ আছে। সেটা থেকে সায়েন্স ফিকশন হতে পারে। কিন্তু সেই সময় আমার কাছ থেকে একটা হাসির গল্প চাওয়া হল। কিংবা একটা গোয়েন্দা গল্প লিখতে বলা হল। তখন আমি সেটাকে সেইদিকে চালিত করতে বাধ্য হব। গল্পটাও বদলে যাবে। কাজেই সম্পাদকের চাহিদাটা থাকা খুব দরকার। কিন্তু ঘটনা হল, সায়েন্স ফিকশন কি সব সময় এখানে খুব পপুলার হয়? ধরুন, প্রফেসর শঙ্কু এত জনপ্রিয়। লীলা মজুমদারের বাতাসবাড়ি দারুণ পপুলার। আমি নিজেও এগুলোর খুব ভক্ত। কিন্তু ঘটনা হল, এগুলো কি সায়েন্স ফিকশন?

দীপঃ না, তা নয়।

বিশ্বদীপঃ আর একটা ব্যাপার, বাংলায় যা সায়েন্স ফিকশন লেখা হয় তার অধিকাংশই ছোটোদের জন্য। প্রাপ্তমনস্কদের জন্য সায়েন্স ফিকশন খুবই দুর্লভ।   

শৌভিকঃ অথচ বিদেশি সায়েন্স ফিকশনের ক্ষেত্রে এমনটা অনায়াসে দেখা যায়। ফারেনহাইট ৪৫১-এ একটি সতেরো বছরের মেয়ের যে বর্ণনা আছে, তা পড়ে বোঝা মুশকিল, এটা একটা সায়েন্স ফিকশন। সেখানে বিজ্ঞান আর সাহিত্যের এমন চমৎকার মিশেল…

সৈকতঃ সেটা কিন্তু আমি বিদেশি অনেক ডিটেকটিভ কাহিনিতেও লক্ষ করেছি। সেখানে এমন সব বর্ণনা আছে, যা রীতিমতো প্রাপ্তমনস্ক সাহিত্যের উপাদান। ওপার বাংলাতে অবশ্য হুমায়ুন আহমেদের লেখাতে এমনটা দেখেছি। কিন্তু এপার বাংলাতে সেটা সত্যিই দেখা যায় না। আর ভাষার ব্যাপারেও এখানে অনেক সময়ই দেখি, দ্রুত প্লটটাকে নামিয়ে দেওয়াটা যেন উদ্দেশ্য। অথচ ভাষার সৌন্দর্য একটা লেখাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে! খুব স্নিগ্ধ ভাষায় কেউ যদি সায়েন্স ফিকশন লেখেন তাহলে সেটা কিন্তু একটা দারুণ ব্যাপার হতে পারে। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো দরকার। তবে উৎসাহ দেওয়াটাও খুব দরকার। ঠিকমতো উৎসাহ দিলে কিন্তু লেখকরাও চেষ্টা করে দেখবেন। এই ধরুন, শিশু কিশোর অ্যাকাডেমি থেকে অনীশদার সম্পাদনায় যে সংকলনটা বেরোল সায়েন্স ফিকশনের, সেখানে কিন্তু অনীশদা ডেকে ডেকে রীতিমতো পরামর্শ দিয়ে লিখিয়েছেন। এগুলো খুব দরকার। ওই সংকলনেই যশোধরা রায়চৌধুরী কী ভালো একটা গল্প লিখেছেন! এই যে উনি এত ভালো একটা সায়েন্স ফিকশন লিখলেন, তাগাদা না দিলে কি…

বিশ্বদীপঃ প্রসঙ্গত বলি, যশোধরাদি কিন্তু সায়েন্স ফিকশন খুব পছন্দ করেন। ওনার বাবা দিলীপ রায়চৌধুরী দারুণ কল্পবিজ্ঞান কাহিনি লিখতেন। 

অনীশঃ হ্যাঁ হ্যাঁ…

বিশ্বদীপঃ ওনার মধ্যেও সেটা আছে। ওনার প্রথম উপন্যাস ‘ছায়া শরীরিণী’-তেও সায়েন্স ফিকশনের উপাদান আছে।

সৈকতঃ বাহ্‌! খুব ভালো ব্যাপার। আসলে নতুন নতুন আরও অনেকে লিখতে এলে খুব ভালো হয়। কিন্তু তা আর হচ্ছে কই? আমি কিছুদিন আগে একটি পত্রিকার জন্য আমাকে শ-চারেক গল্প দেখতে হল। সবই কিশোরোপযোগী গল্প। সেই চারশো গল্পের মধ্যে সায়েন্স ফিকশন ক’টা ছিল জানেন? মাত্র তিনটে!

অনীশঃ একবার মালদাতে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের উদ্যোগে অনূর্ধ্ব কুড়ি কল্পবিজ্ঞান গল্প প্রতিযোগিতা হয়েছিল। আমি গল্পগুলো পড়ে ফার্স্ট সেকেন্ড সিলেক্ট করে দিয়েছিলাম। মনে আছে, অনেকেই ভালো লিখেছিলেন। বিশেষ করে প্রথম দুটো গল্প তো খুবই ভালো ছিল। এরকম প্রয়াসও আর চোখে পড়ে না। অথচ এগুলো খুব দরকার।

সুপ্রিয়ঃ আপনাকে সেভাবে সম্পাদক হিসেবে পেলাম না কেন? অনেকদিন আগে একটা পত্রিকা আপনি সম্পাদনা করতেন…

অনীশঃ হ্যাঁ, ‘কিশোর বিস্ময়’। সেটা খুব অল্প সময় চলেছিল। তারপর বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। মূল সমস্যা ছিল অর্থের অভাব। এই বয়সে এসেও ইচ্ছে হয় একটা পত্রিকা করি। তারপর মনে হয়, কী করে চালাব… কীভাবে নিয়মিত বিজ্ঞাপন জোগাড় করব… এসব ভেবে আর এগোতে পারি না। তবে নতুনদের উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টাটা সবসময় করি। নতুনদের লেখার সমালোচনাটাও খুব দরকার। এই যেমন বছরখানেক আগে একটা লেখা পড়েছিলাম, একজন লেখক লিখছেন বাড়িগুলো সব শূন্যে ভাসছে… পড়ে তেমন ভালো লাগেনি। কেবল ওয়াইল্ড আইডিয়া দিয়ে তো আর সায়েন্স ফিকশন তৈরি হবে না। কাজেই একটা পারস্পরিক আলোচনা সবসময়ই দরকার। আমার কোনও লেখা কারও ভালো না লাগে, তাহলে সেটাও আমি বলতে বলি। এই যেমন সৈকত আমার লেখা ‘গোলাপি, নরম এবং ঠান্ডা’ পড়ে বলেছিল এখানে ‘উচ্চিংড়ে’ শব্দটা ওর ভালো লাগেনি। আমি ওর কথা শুনে ভেবে দেখলাম, ও ঠিকই বলছে। বই বেরোনোর সময়ে শব্দটা পালটে দিলাম। লেখকদের পারস্পরিক এই আলোচনা চালিয়ে যাওয়াটা খুব দরকার। এই যে অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী… এই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কল্পবিজ্ঞান লেখক অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী… ও আরও অনেকদিন লিখবে এবং আরও ভালো লিখবে… কিন্তু তা বলে আমরা যদি কেবল ওকে প্রশংসার ফুল দিয়ে ভরিয়ে দিই, তাহলে ও যখন বাড়িতে একলা বসে লিখবে, তখন সেই ফুলগুলো কি ওর লেখায় কাঁটা হয়ে ঢুকবে না? একটা স্বাস্থ্যকর আলোচনা সবার ক্ষেত্রেই করা দরকার। তবেই কল্পবিজ্ঞান লেখার ক্ষেত্রে আমরা আরও ভালো ভালো লেখা পেতে পারি।  

সৈকতঃ আপনার কি মনে হয় হাওয়া ঘোরার কোনও চান্স আছে?

বিশ্বদীপঃ গত দু-তিন বছরে কিন্তু বাংলা সায়েন্স ফিকশনকে কেন্দ্র করে আগ্রহটা ক্রমশ বাড়তে দেখা যাচ্ছে।       

দীপঃ আমার মনে হয় এখানে ফেসবুকের একটা ভূমিকা আছে। একটা নতুন লেখা পড়েই সেটা নিয়ে কেউ হয়তো পোস্ট করল। তখন সেটা নিয়ে একটা আলোচনা হল। অন্যরাও লেখাটা সম্পর্কে জানতে পারল। এভাবে ব্যাপারটা দ্রুত অনেকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।  

অনীশঃ পাশাপাশি পুরোনো লেখাগুলোরও চর্চা দরকার।

সুপ্রিয়ঃ হ্যাঁ, আমরা চেষ্টা করছি আমাদের পত্রিকাতেও সেই ধরনের লেখা রাখতে। এই সংখ্যায় যেমন দিলীপ রায়চৌধুরীর পুরোনো লেখা আর তাঁকে নিয়ে তাঁর কন্যা যশোধরা রায়চৌধুরীর একটি লেখা রাখা হয়েছে। আমাদের প্রথম সংখ্যায় আমাদের আরেক বন্ধু সন্তু বাগ সিদ্ধার্থ ঘোষকে নিয়ে দারুণ কাজ করেছে।

অনীশঃ বাহ্‌! খুব ভালো… সিদ্ধার্থর একটা গল্প সমগ্রও যদি কেউ বের করত খুব ভালো হত… কোনও প্রকাশক যদি এ নিয়ে ভাবেন…

শৌভিকঃ সত্যিই খুব ভালো হয়। ওনার লেখা পড়ে দেখেছি… কী ভাষার ব্যবহার! মুগ্ধ করে দেয়…

অনীশঃ তবে আপনাদের একটা অন্য কথা বলি, সম্পাদক হিসেবে খুব রাগী মাস্টারমশাই না হওয়াই ভালো (হাসি)। দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে একবার বলেছিলেন, ‘যদি সায়েন্স ফিকশন লেখা পাই, তবে সে লেখা একশোতে চল্লিশ পাওয়ার মতো হলেও আমি ছাপি।’ এটা মাথায় রাখবেন। তবেই নতুনরা লেখার উৎসাহ পাবে।

শৌভিকঃ এ ব্যাপারে আমি স্যারকে (অনীশ দেব) অনেকবার বলেছি, কী দরকার স্যার। (হাসি) যে শিশু অসুস্থ তার নাকের নলটা খুলে দিলেই তো হয়। দুর্বল লেখকরা…

অনীশঃ দ্যাখো, তুমি যে আইডিয়া দিচ্ছ, সেটা একেবারেই ডেস্ট্রাক্টিভ সলিউশন। ওইভাবে ভাবার কোনও মানে হয় না। বরং নতুনদের উৎসাহ না দিলে নতুন লেখকরা আর সায়েন্স ফিকশন লিখতে চাইবেন না। কাজেই তারা যেমন লিখছে, লিখুক। লিখতেই লিখতেই…

বিশ্বদীপঃ এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি। লেখায় বিজ্ঞান আর সাহিত্যের অনুপাতটা কীরকম হওয়া উচিত?

অনীশঃ খুব বেশি বিজ্ঞান নয়, বরং কল্পনা বেশি থাকা দরকার। ওই যে বললাম, বিজ্ঞানের ওভারডোজ না থাকাই ভালো। যদি আমাকে অঙ্কের ভাষায় বলতে বলেন আমি বলব কল্পনা সত্তর আর বিজ্ঞান তিরিশ, এই অনুপাতের কথা। তবে ভুল বিজ্ঞান যেন না থাকে, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।

বিশ্বদীপঃ আশা করব আমাদের পত্রিকায় এই আলোচনা পড়ে নবীন লেখকেরা আরও উৎসাহ নিয়ে সায়েন্স ফিকশন লেখার চর্চা করবেন।

অনীশঃ আপনারা ই-ম্যাগাজিন করছেন খুব ভালো ব্যাপার। আমার শুভ কামনা রইল। শুধু অনুরোধ করব ভবিষ্যতে যদি পি ম্যাগাজিন, মানে প্রিন্টেড ম্যাগাজিন হয় (হাসি) তাহলে আরও ভালো হবে। আর একটা অনুরোধ, যদি ‘আশ্চর্য’-র পুরোনো সংখ্যাগুলো নতুন করে বের করা যায়… আপনারা একসঙ্গে মিলে এরকম একটা কাজ করছেন, চেষ্টা করে দেখুন না যদি এটাও করা যায়।

দীপঃ আমরা নিশ্চয়ই চেষ্টা করব।               

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!