কল্পবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ? ভাবনায়, আঙ্গিকে

সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়

অলংকরণ: সুপ্রিয় দাস

“There are but two ways of forming an opinion in science. One is the scientific method; the other, the scholastic. One can judge from experiment, or one can blindly accept authority. To the scientific mind, experimental proof is all important and theory is merely a convenience in description, to be junked when it no longer fits. To the academic mind, authority is everything and facts are junked when they do not fit theory laid down by authority.”

— Lifeline, Robert A. Heinlein (First Published in August, 1939 Issue of the Astounding Stories of Super-Science)

 

সাহিত্যে এবং সমাজের অন্তর্নিহিত মিথোস্ক্রিয়া এক বহতা নদীর মতো চলমান। তার নানা বাঁকে সমাজ বীক্ষণের নতুন আঙ্গিক অপেক্ষা করে থাকে। এই জঙ্গম প্রক্রিয়ার কোনও একটা কালগত ইপক বা টাইম স্ট্যাম্পকে আলাদা করে ‘স্বর্ণযুগ’ বলে অভিহিত করার প্রবণতার স্বপক্ষে কোনও দার্শনিক ভিত্তি আছে কি? নাকি পুরোটাই বাজারের কোনও সমীকরণের ওপর গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে ‘কল্পবিজ্ঞান’ এর মতো তুলনামূলক স্বল্পপঠিত সাহিত্যের ধারায় এমন অভিধা কি আরোপিত যেখানে এই ধারা বা জঁর সংজ্ঞা নিয়ে এখনও নানা মতদ্বৈধ। বিজ্ঞান এবং কল্পনার কেমন অনুপাত সেই সাহিত্যের ভিত্তি হবে নাকি এইসব ছাপিয়ে আসলে হল লেখার মুন্সিয়ানায় রূপকার্থে সেই সমাজ বিশ্লেষণ যে রূপকের গহীনে কিছুটা লুকিয়ে থাকবে বিজ্ঞান। এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা এখনও ঘটেনি সম্পূর্ণ। আপাতত আমরা কল্পবিজ্ঞান বলতে পাশ্চাত্যের আবহে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ থেকেই যে ক্যানন গড়ে উঠেছে তাকেই ধরে নেব এই প্রবন্ধে। যদিও প্রাচীন এবং মধ্যযুগের অনেক সাহিত্য এবং পুরাণকেই এই আওতায় ফেলা যায়। উদাহরণস্বরূপ, দাইদালাস ইকারাসের আখ্যান (গ্রীস), গিলগামেশ মহাকাব্য (আক্কাদিয়ান লিপিতে লিখিত প্রাচীন মেসোপটেমিয়ান মহাকাব্য) ইত্যাদি।

অ্যাস্টাউন্ডিং ম্যাগাজিনের প্রথম সংখ্যার কভার

     ১৯৩৪ সালে ‘অ্যাস্টাউন্ডিং স্টোরিজ অব সুপার সায়েন্স’ ম্যাগাজিনে (১৯৬০ থেকে যার পরিবর্তিত নাম ‘অ্যানালগ সায়েন্স ফিকশন অ্যান্ড ফ্যাক্ট’) ‘টোয়াইলাইট’ নামে একটা গল্প প্রকাশিত হয়েছিল যার লেখক ছিলেন একদা এমআইটি অনুত্তীর্ণ এবং পরে ডিউক ইউনিভার্সিটি থেকে সায়েন্স গ্রাজুয়েট একজন যুবক, জন উড ক্যাম্পবেল জুনিয়র। ডন এ স্টুয়ার্ট ছদ্মনামেও তিনি কিছু বিজ্ঞানাশ্রয়ী গল্প লিখেছিলেন। ‘টোয়াইলাইট’ গল্পের কিছুটা ভিত্তি ছিল হাবার্ট জর্জ ওয়েলস এর লেখা প্রবন্ধ ‘দ্য ম্যান অব দি ইয়ার মিলিয়ন’। বিখ্যাত নেবুলা পুরস্কার শুরু হওয়ার আগে প্রকাশিত লেখার অন্যতম হিসেবে এই গল্পকে দ্য সায়েন্স ফিকশন হল অফ ফেম সংগ্রহের প্রথম খন্ডে (১৯২৯ – ১৯৬৪) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই গল্পটা প্রকাশিত হবার সময় অ্যাস্টাউন্ডিং এর সম্পাদক ছিলেন এফ. অর্লিন ট্রেমেইন। ট্রেমেইনের কিছু আগেই অবশ্য ১৯২৬ সালের এপ্রিল মাস নাগাদ হুগো গার্ন্সব্যাকের সম্পাদনায় শুরু হয় ‘অ্যামেইজিং স্টোরিজ’ পত্রিকা যাকে নির্দ্বিধায় প্রথম কল্পবিজ্ঞান ম্যাগাজিনের আখ্যা দেয়া যায়। গার্ন্সব্যাকের সম্পাদনায় কল্পবিজ্ঞান বা বলা যায় বিজ্ঞান প্রভাবিত গল্পের আখ্যান বা ন্যারেটিভে একটা বড় পরিবর্তন আসে। এর আগের পাল্প যুগের চটকদার ফ্যান্টাসি অ্যাডভেঞ্চার এবং সেইসব গল্পের প্রায় সুপারহিরো পর্যায়ের প্রোটাগনিস্টদের (বাক রজার্স, মুনম্যান ইত্যাদি) চূড়ান্ত অবাস্তব এবং রোম্যান্টিক কার্যকলাপ বাদ দিয়ে অ্যামেইজিং স্টোরিজে প্রকাশিত গল্পের প্লটে গ্যাজেট, গিজমো মানে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি এসেছিল কিছুটা হার্ড সায়েন্সের আবহেই। অর্থাৎ সেইসব প্রযুক্তি হয়ে গেল আগামী দিনের সভ্যতার নির্ণায়ক। বলা যায় যে সায়েন্স ফিকশন পাঠকদের প্রকৃত ফ্যানডম শুরু করেছিল অ্যামেইজিং স্টোরিজ ম্যাগাজিন। কিন্তু তিনের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ‘অ্যামেইজিং স্টোরিজ’ প্রকৃত কল্পবিজ্ঞানপ্রেমী পাঠকের কাছে কুলীন সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিনের মর্যাদা হারাতে শুরু করে। এখান থেকে পরের বাঁকটা নেয়ার আগে সেই সময়ের আধুনিক বিজ্ঞান এবং রাজনীতির আবহে সমাজের চালচিত্রটা দেখে নিই আমরা।

‘অ্যামেইজিং স্টোরিজ’ ম্যাগাজিনের প্রথম কভার এবং তার প্রখ্যাত সম্পাদক হুগো গার্ন্সব্যাক

     বিংশ শতাব্দীকে নির্দ্বিধায় বলা যায় পদার্থবিজ্ঞানের শতাব্দী কারণ আধুনিক পদার্থবিদ্যার দুই প্রধান তত্ত্ব আপেক্ষিকতাবাদ এবং কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠা প্রযুক্তিই মুখ্যত বিংশ শতাব্দীর মানব সভ্যতার চালিকাশক্তি অন্তত রাষ্ট্রগতভাবে তো বটেই। এদিকে ওই সময়টায় মানে বিশ আর ত্রিশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রথম বিশ্বের সমাজ-রাজনীতির মোড় পরিবর্তন করা ঘটনাপ্রবাহ ছিল এমন: জার্মানিতে ওয়াইমার রিপাবলিকের আমলে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সামাজিক আর আর্থিক পরিস্থিতি (যার কিছুটা রূপক ফুটে উঠেছিল বিখ্যাত জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট সায়েন্স ফিকশন সিনেমা ‘মেট্রোপলিস’ এর মধ্যে দিয়ে), লীগ অব নেশন্সের সামগ্রিক ব্যর্থতা এবং ধনতান্ত্রিক বিশ্বে আসন্ন আর্থিক সংকট। এই সময় পাঠকের রুচিরও একটা পরিবর্তন আসে। সামাজিক এই বিন্যাসের একটা ফিকশনাল ন্যারেটিভের প্রয়োজন এসেছিল ঐতিহাসিকভাবেই। এই সময়েই অ্যাস্টাউন্ডিং ম্যাগাজিনের উত্থান। যদিও ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এই জঁর প্রসারের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা খুব প্রকটভাবে অনুভূত হয়নি আমেরিকান সাহিত্যিক মহলে। এর মধ্যেই কতগুলো সমাপতন ঘটে যা সাই-ফি’র ইতিহাসে অধুনা বেঞ্চমার্কের পর্যায়ে স্বীকৃত।

অ্যাস্টাউন্ডিং সায়েন্স ফিকশনের এপ্রিল, ১৯৩৮ সংখ্যার কভার এবং তার সম্পাদক জন ক্যাম্পবেল জুনিয়র যিনি গোল্ডেন এজ সায়েন্স ফিকশনের অন্যতম স্থপতি

     ১৯৩৭ এর অক্টোবর ইস্যু থেকে ট্রেমেইনের উত্তরসূরী হিসেবে মনোনীত করা হয় জন ক্যাম্পবেল জুনিয়রকে, যদিও এই পদের পূর্ণ কর্তৃত্ব তিনি পান ১৯৩৮ এর মার্চ ইস্যু থেকে। এই সময় থেকেই একজন দক্ষ এডিটর এবং হার্ড টাস্কমাস্টার হিসেবে জন ক্যাম্পবেল কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর দর্শনকে রূপ দেওয়া শুরু করেন যে কাজে তিনি পেয়ে গেছিলেন নবীন কিছু লেখনীকে, যারা তাঁরই মতো নতুন দিনের ভাবনার স্পন্দনকে রূপদান করেছিলেন ফিকশন্যাল ন্যারেটিভে যার একটা আধার ছিল আধুনিক বিজ্ঞান। ১৯৩৮ এর এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয় লেস্টার ডেল রে’র লেখা গল্প ‘দ্য ফেইথফুল’ যার মধ্যে একটা নতুন ট্রেন্ড বা বাঁক এর ইঙ্গিত ছিল। এর ঠিক পরবর্তী বছর মানে ১৯৩৯ বেশ কিছু এমন লেখালেখি প্রকাশিত হয়েছিল অ্যাস্টাউন্ডিং ম্যাগাজিনে যাকে অধুনা সেই আগতপ্রায় স্বর্ণযুগের ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ ধরা হয়। ১৯৩৯ এর জুলাই ইস্যুতে প্রকাশিত হয় আলফ্রেড এলটন ভ্যান ভোড এর লেখা প্রথম গল্প ‘দ্য ব্ল্যাক ডেস্ট্রয়ার’। অন্যতম সাই-ফি ছায়াছবি এলিয়েন (১৯৭৯) সহ আরও বেশ কিছু সিনেমার মূল ভিত্তি ছিল এই গল্পের প্লট। অ্যাস্টাউন্ডিং ম্যাগাজিনের ওই একই ইস্যুতে বেরিয়েছিল আইজ্যাক আসিমভের সাহিত্যজীবনের একেবারে প্রথমদিকে লেখা গল্প ‘ট্রেন্ডস’। এরপর আগস্টে প্রকাশিত হয় রবার্ট এ হাইনলাইনের লেখা প্রথম গল্প ‘লাইফলাইন’ এবং সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় থিয়োডর স্টার্জনের লেখা প্রথম গল্প ‘ইথার ব্রিদার’। এই লেখকেরা প্রত্যেকেই কল্পবিজ্ঞানের এই নতুন পথচলার ক্ষেত্রে এক একজন স্থপতি হিসেবে স্বীকৃত।

গোল্ডেন এজ সায়েন্স ফিকশনের অন্যতম লেখকেরা। ওপরের সারিতে বাঁদিক থেকে যথাক্রমে আলফ্রেড এলটন ভ্যান ভোড, আইজ্যাক অ্যাসিমভ এবং রবার্ট হাইনলাইন। নীচের সারিতে ওই একই ক্রমে আর্থার সি ক্লার্ক, ই ই ডক স্মিথ এবং রে ব্র্যাডবেরী।

     এই ক্যাম্পেলেস্ক অধ্যায়ের লেখালেখির মূলগত দর্শনকে নিয়ে পরবর্তীকালে নানা গবেষণা হয়েছে। এমন নয় যে এই সময়ের কল্পবিজ্ঞান লেখালেখির মধ্যে যে বিজ্ঞানের ছায়া ছিল তা পুরোটাই সমকালীন বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির হার্ড রিয়্যালিটি যেখানে স্পেক্যুলেশন এবং নিরীক্ষার অবকাশ ছিল না। ক্যাম্পবেলের ঝোঁক ছিল কিছুটা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রিসিসন এর ওপর, সেই কারণে দেখা যায় যে এই সময়ের গল্পে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীদের কর্মজগতের যে ছবিটা উঠে আসছে তা প্রকৃত একজন বৈজ্ঞানিকের গবেষণা পরিমণ্ডলের খাঁটি চিত্র, যার সঙ্গে পাল্প যুগের ‘ম্যাড সায়েন্টিস্ট’ স্টিরিওটাইপের তফাত ছিল যোজনের। কিন্তু এর সঙ্গে অবশ্যই অধরা কোনও স্পেস-টাইমের স্থানাঙ্কে এক্সট্রাপোলেট করা স্পেক্যুলেশন অবশ্যই ছিল অনেক গল্পেরই আবহে। তবে বলাই যায় যে ত্রিশ এবং চল্লিশের দশকের বিজ্ঞান প্রযুক্তি ছিল ওই ক্যাননের মূল চাবিকাঠি। খুবই বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই সময়কার বিজ্ঞান গবেষণার একটা রিয়্যালিস্টিক ন্যারেটিভ উঠে এসেছিল এই গল্পগুলোতে, কিছু গল্পের ক্ষেত্রে তো এই বয়ান ছিল প্রায় প্রফেটিক। অ্যাস্টাউন্ডিং এর ১৯৪৪ সালের মার্চ ইস্যুতে প্রকাশিত হয় ক্লিফ কার্টমিলের গল্প ‘ডেডলাইন’ যার প্লট ছিল এক পারমাণবিক বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে। এই গল্পের আখ্যানের সঙ্গে এক আশ্চর্য মিল ছিল এর ঠিক পরের বছর মানে ১৯৪৫ সালের ১৬ই জুলাই ঘটে যাওয়া ‘ট্রিনিটি টেস্ট’ বা নিউ মেক্সিকোর হোর্নাডা ডেল মুয়ের্তো মরুভূমির বুকে পরীক্ষামূলকভাবে ঘটানো পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণের। এই গল্পটা প্রকাশিত হবার সময় কিন্তু পারমাণবিক বোমা নিয়ে গবেষণার যাবতীয় কর্মকাণ্ড বা ম্যানহাটন প্রজেক্টের কার্যকলাপ সম্পূর্ণ আড়াল করা ছিল সিভিলিয়ান লাইফ থেকে। কিন্তু এই গল্পে সেই গবেষণা এবং আসন্ন সেই পরীক্ষার কিছু চিত্র এতই বাস্তবতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয় যে এফ.বি.আই. এবং মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স প্রবল সন্দেহের বশে জন ক্যাম্পবেল এবং লেখক ক্লিফ কার্টমিলের ওপর নজরদারি চালিয়েছিল। এরও কয়েক বছর আগে ১৯৪০ সাল নাগাদ এই ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল রবার্ট এ হাইনলাইনের লেখা ‘ব্লোআপস হ্যাপেন’ যার মধ্যেও নিউক্লিয়ার ফিসান এবং অ্যাটমিক এনার্জি প্ল্যান্টের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কিছুটা ফুটে উঠেছিল।

     গল্পের আবহে এই হার্ড রিয়্যালিটির পাশাপাশি কিন্তু অবশ্যই ছিল পুরোনো পাল্প আমলের স্পেস অপেরার আবহে লেখা বেশ কিছু ইন্টারস্টেলার ন্যারেটিভ যার বেশ কিছু রেকারিং থিম তৈরি করে পাশ্চাত্য সাই-ফি ক্যাননে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ই. ই. ডক স্মিথের ‘স্কাইলার্ক’, ‘গ্যালাক্টিক পেট্রল’ এবং ‘লেন্সম্যান সিরিজ’, আইজ্যাক অ্যাসিমভের অনন্য ‘ফাউন্ডেশন’ সিরিজ বা হেইনলাইনের ‘স্টারশিপ ট্রুপার্স’। কিছুটা রোম্যান্টিক মেজাজে লেখা হলেও এই ধরণের লেখালেখির মেজাজ ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অধিগত দার্শনিক বোধ। এর একটা সুদূরপ্রাসারী প্রভাব পড়েছিল প্রকৃত বিজ্ঞানের অগ্রগতির ক্ষেত্রেও। এখানে স্মরণ করে নেওয়া ভালো প্রখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী কার্ল সেগ্যান এর প্রণিধানযোগ্য সেই উক্তি।

“Many scientists deeply involved in the exploration of the solar system (myself among them) were first turned in that direction by science fiction. And the fact that some of that science fiction was not of the highest quality is irrelevant. Ten year‐olds do not read the scientific literature.”

Carl Sagan, 1978

     অ্যাসিমভ নিজেও মনে করতেন যে এই চারের দশকের কল্পবিজ্ঞান পাঠককে ছয় এবং সাতের দশকের আগতপ্রায় প্রযুক্তির সঙ্গে পূর্বপরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছিল। এই আমলের সাহিত্যের মূলগত আবহ যেসব লেখালেখির মধ্যে প্রায় চিরস্থায়ী জায়গা নিয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ওঁর লেখা গল্প ‘নাইটফল’ যাকে ১৯৯০ সালে তিনি এবং রবার্ট সিলভারবার্গ মিলে একটা উপন্যাসের চেহারা দেন। ১৯৬৮ সালে ‘দ্য সায়েন্স ফিকশন অ্যান্ড ফ্যান্টাসি রাইটার্স অব আমেরিকা’ ভোটের মাধ্যমে এই লেখাকে ১৯৬৫ সালে নেবুলা পুরস্কার শুরু হওয়ার আগে প্রকাশিত কল্পবিজ্ঞান গল্পের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা দিয়েছেন। ওই একই সময়ে লেখালেখির মধ্যে সাই-ফি ক্যাননে আর এক চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার হল ওঁরই মস্তিষ্কজাত ‘থ্রি লজ অব রোবটিক্স’ যা শুরু হয় ১৯৪১ সালে লেখা এবং অ্যাস্টাউন্ডিং-এর মার্চ, ১৯৪২ সংখ্যায় প্রকাশিত গল্প ‘রানঅ্যারাউন্ড’ থেকে। এই থিম্যাটিক মোটিফ কিন্তু গোল্ডেন এজ এর স্পষ্ট একটা সাক্ষর বহন করেছে। গার্ন্সব্যাকের আমলে যা ছিল কেবলই প্রযুক্তি তা ক্যাম্পেবেলস্ক বীক্ষায় হয়ে গেল ওই প্রযুক্তি ব্যবহারকারী মানুষের মনের গভীরে একটা অন্বেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশিষ্ট যন্ত্রমানবের সঙ্গে তার আপাত নিয়ন্তা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। ভেবে দেখা দরকার যে গার্ন্সব্যাকীয় যুগে কল্পবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে থিমগুলো প্রায় অধরা ছিল সেগুলো নিয়েও অভিনিবেশ করা হয়েছিল গোল্ডেন এজের লেখালেখিতে যেমন রিলিজিয়াস এবং স্পিরিচ্যুয়াল নানা ধারা। এমন ন্যারেটিভের অন্যতম প্রতিনিধি স্থানীয় লেখাগুলো হল রে ব্র্যাডবেরির ‘দ্য মার্সিয়ান ক্রনিকলস্‌’, আর্থার সি ক্লার্কের ‘চাইল্ডহুডস্‌ এন্ড’, জেমস ব্লিস এর ‘এ কেস অব কন্স্যান্স’ অথবা ওয়াল্টার মিলার জুনিয়র এর ‘এ ক্যান্টিকল ফর লিবোভিৎস’। ফ্যান্টাসি জঁ’র নানা আবহ হার্ড বিজ্ঞানের পোষাকে এসেছে এসব লেখায় কিন্তু তার মেজাজ পাল্প লেখার থেকে একেবারে আলাদা। যাকে বলা যায় ‘থিংকিং ম্যানস্‌ সাই-ফি’ যার মধ্যে দিয়ে হয়তো সমাজবীক্ষণেরই একটা নতুন দৃষ্টিকোণ উঠে এসেছে স্পেক্যুলেটিভ বয়ানে।

     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষে সংঘটিত হওয়া পারমাণবিক বিস্ফোরণ একটা প্রবল শক ওয়েভ এনেছিল সাংস্কৃতিকভাবে। কিছুটা পরোক্ষভাবে হলেও কল্পবিজ্ঞান পাঠকের সংখ্যা হঠাৎ অনেকটা বেড়ে যায় এই ঘটনার প্রভাবে। যে অ্যাপোকিলিপ্টিক জগতের ছায়া কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যিকেরা এনেছিলেন তাদের আখ্যানের মধ্যে দিয়ে সেই জগতের এমন একটা ‘বাস্তবায়ন’ অনেককে কল্পবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। এই ঘটনা একটা বাণিজ্যিক অনুঘটনের কাজও করেছিল। মূল স্রোতের নানা সাহিত্য এজেন্সি গভীরভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে সাই-ফি ম্যাগাজিন এবং বই প্রকাশ করার জন্য। ফলে ধীরে ধীরে অ্যাস্টাউন্ডিং-এর অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয় ম্যাগাজিন জগতে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল গ্যালাক্সি সায়েন্স ফিকশন, দ্য ম্যাগাজিন অব ফ্যান্টাসি অ্যান্ড সায়েন্স ফিকশন প্রমুখ। এই নতুন ম্যাগাজিনগুলোতে মধ্যে নিরীক্ষামূলক এবং সাই-ফির আড়ালে সোশ্যাল স্যাটায়ার লেখার প্রবণতা বাড়ে, যেটা অনেকে এক্সটেন্ডেড গোল্ডেন এজ হিসেবেই ধরেন। গোল্ডেন এজের আর একটা পরোক্ষ প্রভাব দেখা গেছিল ছায়ার জগত চলচ্চিত্রেও। সিনেমাতে কল্পবিজ্ঞানের থিম সেই বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু হলেও রিয়্যালিস্টিক বা হার্ড সাইফির ছায়া এই চারের দশকের শেষ এবং পাঁচের দশকের শুরুতেই প্রথম লক্ষ করা যায়। এর একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিল ১৯৫০ সালে মুক্তি পাওয়া টেকনিকালার ছায়াছবি ‘ডেসটিনেশন মুন’ যার চিত্রনাট্যে একটা বড় ভূমিকা ছিল গোল্ডেন এজের অন্যতম লেখক রবার্ট হাইনলাইনের। চন্দ্রপৃষ্ঠে মহাকাশ অভিযানের এক অত্যন্ত বাস্তবিক ছবি তুলে ধরেছিল এই সিনেমা।

ডেস্টিনেশন মুন (১৯৫০) ছায়াছবিতে চন্দ্রপৃষ্ঠের দৃশ্য

বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল যে চাঁদের পৃষ্ঠদেশ বা টেরেইনের ফ্রেমগুলো তৈরি করা হয়েছিল শিল্পী চেসলি বোনেস্টেল এর নির্দেশ যিনি নিজে একজন গোল্ডেন এজ ইলাস্ট্রেটর ছিলেন। এই দৃশ্যগুলোর সঙ্গে ১৯৬৯ সালে মানুষের সত্যিকারের চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের এক অদ্ভুত সাদৃশ্য দেখা যায়, যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বোনেস্টলকে যুগ্মভাবে আধুনিক স্পেস আর্টের একজন পুরোধা মানা হয়। আমেরিকান স্পেস প্রোগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটা বড় কৃতিত্ব ওঁর স্পেস আর্টের। ইউরোপের প্রেক্ষিতে এই কৃতিত্বের আরেকজন দাবীদার হলেন ফরাসি শিল্পী এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী লুস্যিয়ঁ র‍্যুদ।

গ্যালাক্সি সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিনের জন্য আঁকা চেসলি বোনেস্টেল এর প্রথম কভার। ফেব্রুয়ারি, ১৯৫১ সংখ্যা

     এই পাঁচের দশকের আমেরিকান সাই-ফি ছায়াছবিকেও অনেকেই গোল্ডেন এজ এর একটা বিস্তৃত রূপ হিসেবে ধরেন। প্লট ছায়াও কারিগরি প্রকরণের মাধ্যমে যেভাবে একটা কল্পজগৎ উঠে এসেছিল তার ভিস্যুয়াল মোটিফে তাতে ওই স্বর্ণ যুগেরই প্রভাব ছিল স্পষ্ট। এই সময়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাই-ফি ছবির লেখা হয়েছিল গোল্ডেন এজ লেখকদের গল্প থেকে। যার মধ্যে অন্যতম ছিল জন ক্যাম্পবেল জুনিয়র এর কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ছায়াছবি ‘দ্য থিং ফ্রম এনাদার ওয়র্ল্ড’, যা মুক্তি পায় ১৯৫১ সালে। এই ছবিগুলোর সেট নির্মাণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে হার্ড সায়েন্স এর প্রভাব ছিল স্পষ্ট, যার সঙ্গে প্রথম যুগের সায়েন্স ফিকশন ছায়াছবির একটা বড় ফারাক। এই সময়ের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সাই-ফি সিনেমা ছিল ১৯৫৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছায়াছবি ‘ফরবিডেন প্ল্যানেট’, যার ন্যারেটিভে আবার স্পেস অপেরার সঙ্গে মিশেছিল উইলিয়াম শেক্সপিয়রের নাটক ‘টেম্পেস্ট’ এর ছায়া। এই ছায়াছবির সেট ডিজাইনেও গোল্ডেন এজ সাই-ফি ইলাস্ট্রেশনের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। আরেকটা খুব লক্ষণীয় বিষয় ছিল এই ছায়াছবির আবহ সংগীত যেখানে নানারকম পরীক্ষামূলক শব্দের মধ্যে দিয়ে স্পেস এজের একটা অডিয়ো মোটিফ তৈরি করা হয়েছিল।

ফরবিডেন প্ল্যানেট (১৯৫৬) ছায়ছবির এক অন্যতম ফ্রেম

     আসলে ‘গোল্ডেন এজ’ এমন একটা তকমার আড়ালে একটা কালচিহ্ন, একটা দার্শনিক প্রবণতা লুকিয়ে থাকে। তাই ঠিক কবে পর্যন্ত কল্পবিজ্ঞানের এই স্বর্ণযুগের স্থায়িত্ব সেটার স্পষ্ট উত্তর দেওয়া একটু অভিনিবেশের দাবী রাখে। যদিও ষাটের দশকের শুরু থেকে নতুন এক রাজনৈতিক আবহে নতুন কিছু দর্শন তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর বুকে। পোস্ট-মর্ডানিজম, মিশেল ফুকো, লাকাঁ, ভিয়েতনাম এই অভিঘাতের কিছুটা অবশ্যই ছায়া পড়েছিল সাই-ফির জগতেও। ওই সময় উঠে আসা কল্পবিজ্ঞান লেখকেরা মানে জেমস গ্রাহাম ব্যালার্ড, ব্রায়ান অ্যালডিস, জুডিথ মেরিল, হারলান এলিসন বা কিছু পরে মার্গারেট অ্যাটউড নতুন দিনের স্বরকে স্পষ্টভাবে চেনালেন তাদের নব-তরঙ্গের সাইফি সাহিত্যে। যদিও এদের কয়েকজন এর আগে থেকেই লেখালেখি করছিলেন কিন্তু ওই ইপকটা গুরুত্বপূর্ণ তাদের লেখালেখিতে এই নতুন প্রবণতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য। সময়ের নিয়মে কিছুই থেমে থাকে না। গোল্ডেন এজ এবং ম্যাগাজিন সায়েন্স ফিকশন থেকে নিউ ওয়েভ সায়েন্স ফিকশনের উদ্বর্তনও এমন একটা স্বাভাবিক অভিব্যক্তিতেই ঘটেছিল। সে এক অন্য ইতিহাসের পথচলা।

2 thoughts on “কল্পবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ? ভাবনায়, আঙ্গিকে

  • May 1, 2020 at 10:56 am
    Permalink

    কল্পবিশ্ব-র প্রচ্ছদকাহিনি এমনই হওয়া উচিত— যেমন তথ্যনিষ্ঠ, তেমনই চিন্তা-উদ্দীপক। গোটা সংখ্যাটি কেমন হতে চলেছে, তার একটা সামগ্রিক ছবি ফুটে উঠল এই লেখা থেকেই। দুরন্ত!

    Reply
  • May 2, 2020 at 7:02 am
    Permalink

    খুব তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। পড়ে ভালো লাগলো।

    Reply

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!