কল্পবিজ্ঞান বিষয়ে সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার

রচনা  : ভূমিকা এবং মূল রেডিও সাক্ষ্যাৎকার থেকে অনুলিখন - ঋদ্ধি গোস্বামী

অলঙ্করণ : সুদীপ দেব

প্রাক কথন: ঋদ্ধি গোস্বামী

কল্পবিজ্ঞান বিষয়ে সত্যজিৎ রায় বরাবরই গভীর আগ্রহী ছিলেন। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি ও অন্যান্য লেখালিখির মধ্যে তার অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। ৬০এর দশকের মাঝামাঝি অদ্রীশ বর্ধনের সম্পাদনায় যখন ‘আশ্চর্য!’ পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে, তিনি ছিলেন তার প্রধান পৃষ্ঠষ্পোষক। তার পরবর্তীকালে Sci-Fi Cine Club-এর প্রদর্শনীর জন্য ছবি বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সত্যজিতের অন্যতম প্রধান ভূমিকা ছিল। প্রোফেসর শঙ্কু ও অন্যান্য কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক গল্পের মধ্যে দিয়ে তিনি কিশোর পাঠকের মনের ভিতর বিজ্ঞানচেতনার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়বোধ ও কল্পনাপ্রবণতা সঞ্চারিত করে দিয়েছেন। কিন্তু সত্যজিতের চলচ্চিত্র বা গোয়েন্দা কাহিনী নিয়ে যে পরিমাণ লেখালেখি হয়ে থাকে সে তুলনায় কল্পবিজ্ঞান বিষয়ে আলোচনা খুবই নগন্য। এই বেতার সাক্ষাৎকারে কল্পবিজ্ঞানের মত অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত একটি বিষয় নিয়ে সত্যজিৎ নিজের ভাবনাচিন্তা অকপটে প্রকাশ করেছেন। খোলামেলা আড্ডার মেজাজে দেওয়া এই ব্যতিক্রমী সাক্ষাৎকারটি তাই আমরা অপরিবর্তিত ভাবে পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম। সাক্ষাৎকারটি রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৮২ তে। আকাশবাণীর পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ডঃ অমিত চক্রবর্তী ও সাহিত্যিক সঙ্কর্ষণ রায়। 

সঙ্কর্ষণ: সাহিত্যে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্য… এই নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, এবং আজকাল একটা বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা বা science fiction এসবও বিশেষভাবে লেখা হচ্ছে। কিন্তু আমার নিজের একটা ধারণা যে সাহিত্য বিজ্ঞানভিত্তিক না হলে সেটা সার্থক হয়না। আচ্ছা সত্যজিৎবাবু, এ বিষয়ে আপনার কি মনে হয়?

সত্যজিৎ: হ্যাঁ, মানে একটা তো গেল যাকে কল্পবিজ্ঞানের গল্প বলা হয়। যেটা science fiction-ই বলুন বা science fantasy-ই বলুন, সেটা তো আলাদা একটা জাতের মধ্যেই পড়ে যাচ্ছে। তবে হ্যাঁ, সাধারণ গল্পে আপনি যদি মানুষদের নিয়ে, মানুষদের কথা লেখেন, সেখানেও একটা বিজ্ঞানের দিক তো সবসময়েই এসে যাচ্ছে যেটা মনস্তত্ব বলা যেতে পারে। যে মানুষের মন, বিশেষ করে আমার ছবি-টবিতে, আমার গল্প-টল্পতে সবসময় মানুষের মন একটা বড় ভূমিকা গ্রহণ করে। মানুষে মানুষে সম্পর্ক, তাদের ব্যবহারের কথাবার্তা…সবকিছুর মধ্যে যে একটা সত্য যেটাকে বলে, বা যে truth টার দিকে আমরা যেতে চেষ্টা করি..

সঙ্কর্ষণ: সত্য সবসময় বিজ্ঞানসম্মত হবে…

সত্যজিৎ: দৈনন্দিন জীবনে যে অভিজ্ঞতা বা মানুষ চেনা জানা, এমনকি দেশবিদেশ সম্বন্ধেও যে সমস্ত কথা লেখা হয়, বা শহর সম্বন্ধে, বা আরেকটা দিক যে বিভিন্ন স্তরের মানুষের সম্পর্কে যে লেখা, গ্রাম সম্পর্কে লেখা… সবসময়েই একটা বিজ্ঞানের দিক সেরকমভাবে দেখতে গেলে তো থেকে যাবেই। প্রথম কথা যেটা বললাম, মনস্তত্বর দিকটা তো থাকবেই, সেটা তো একটা বড় ব্যাপার। সেখানে সে বিজ্ঞানটা নিয়ে পড়াশোনা করা না থাকলেও চলে। মানুষের observation এর ওপরেই, মানুষের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা… সত্যটাকে চিনে নেওয়া..এ ক্ষমতাটা তো সাহিত্যিকের থাকতেই হবে। 

অমিত: একটা কথা বলি, আপনি যে একটা observation এর কথা বললেন, সেটাও তো একটা scientific method, মানে বিজ্ঞানেরই সেটা একটা method তো? 

সত্যজিৎ: হ্যাঁ, method বটে…

অমিত: সেখানেও বিজ্ঞানটাই থাকছে তার মধ্যে…

সত্যজিৎ: হ্যাঁ থাকছে, কিন্তু সেটা সম্বন্ধে সবসময় আমরা যে খুব সচেতন, তা নই। সেটাকে আলাদা করে একটা বিজ্ঞান নাম দিয়ে তাই নিয়ে বই লেখা…তাও হয়, ভাষা নিয়েই হয়, ভাষারও বিজ্ঞান রয়েছে। মানুষের কথাবার্তা..বিভিন্ন স্তরের মানুষের, বিভিন্ন জাতের মানুষের, বিভিন্ন অবস্থার মানুষের, বিভিন্ন class-এর মানুষের…তাদের কথাবার্তার মধ্যে যে তফাৎ রয়েছে, সেটাও তো আজকাল বিজ্ঞানের মধ্যে পড়ে গেছে। linguistics-এর মধ্যে চলে যায়। কাজেই, সেরকম ধরতে গেলে আপনার গপ্পের যে কোন উপাদানকেই সেটার একটা দিক যে বৈজ্ঞানিক দিক সেটা দেখিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এবং সেটার প্রতি আমাদের আনুগত্য, বা সেটাকে মেনে চলা, বা সেটা যাতে ভুল না হয়, সেখানে যাতে ত্রুটি না থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখা মানেই বিজ্ঞানটাকে বাঁচিয়ে চলা। 

অমিত: তাহলে কি মনে হয় সব লেখকেরই বিজ্ঞান সচেতন হওয়া দরকার? কি বলেন? বা বস্তুজ্ঞান বা যেগুলো প্রয়োজন… মানে আজকের পৃথিবীটাকে যদি ঠিকমত আমরা বিজ্ঞানসম্মতভাবে না জানি, তাহলে এমনি যারা বিজ্ঞানভিত্তিক লেখক নন বা বিজ্ঞানসাহিত্য সৃষ্টি যারা করছেন না, তারাও বোধহয় সার্থক লেখক হতে পারেন না। 

সত্যজিৎ: মোটামুটিভাবে তো সেটা বলতেই হবে। তবে তার মানে এই নয় যে বিজ্ঞানের একেবারে আধুনিকতম যে সমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষা বা চর্চা হচ্ছে, সেই সম্বন্ধেও যে জানতে হবে, সেটা নাহলেও হয়ত চলে। কেননা সেতো আজকাল তো সব সায়েন্সই ধরুন, সে Astronomy বলুন, Biology বলুন, Microbiology বলুন, সব এমন ভাবে বেড়ে যাচ্ছে, মানে এমন ভাবে তার পরিধিটা বেড়ে যাচ্ছে, এবং সেটা নিয়ে এত গভীরভাবে আলোচনা হচ্ছে যে তার হদিশ রাখা সকলের পক্ষে, সকল সাহিত্যিকের পক্ষেই…

অমিত: সকল সাহিত্যিক আপনি বলছেন, ধরুন আজ অন্য একটা বিষয়ের বিজ্ঞানী, তার পক্ষেও অন্য আরেকটা বিষয়ের বিজ্ঞানে কি ধরণের গবেষণা হচ্ছে সে খোঁজখবর রাখাও খুব মুশকিল এখন… 

সত্যজিৎ: খুবই মুশকিল… 

অমিত: এত specific এবং এত বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছে…

সত্যজিৎ: ভয়ানক বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছে…

অমিত: আমি বলছি সাধারণভাবে, মোটামুটি তো আমাদের থাকা উচিত, এবং না থাকলেও তো চলে না… 

সত্যজিৎ: সেটুকু তো খবরের কাগজ পড়লেও অনেকে জানতে পারে, তার জন্য যে মোটা মোটা বই পড়তে হবে সবসময়, বা সবচেয়ে একেবারে latest পত্রিকাগুলো পড়তে হবে এমনও কথা নেই। কাজেই মোটামুটিভাবে শিক্ষিত মানুষ, বা যাদের আমরা সাহিত্যিক বলব, তাদের হয় জানা উচিত, নয় তারা জানে, অনেক ক্ষেত্রেই জানে। আর যদি না জানে, জানলে তাদের লেখা আরও সমৃদ্ধ হবে।

অমিত: একটু আগে সত্যজিৎবাবু বললেন যে science fiction বা science fantasy, উনি দুটোকেই কল্পবিজ্ঞানের গল্প বললেন, যেটা এখন বলা হয় আর কি, কিন্তু এই দুটোর মধ্যেও তো একটা তফাত করা হয়ে থাকে? এটা আপনি যদি একটু বুঝিয়ে বলেন… 

সত্যজিৎ: না… বুঝিয়ে বলার মধ্যে এটা হচ্ছে কি… এক ধরণের গল্প… যেমন আমি উদাহরণ দিচ্ছি… যদি একটা গপ্প লিখতে হয় যে মানুষ… যেমন বহুকাল আগে Jules Verne লিখেছিলেন “Journey To The Moon” বা ইত্যাদি ইত্যাদি, চাঁদে যাওয়া নিয়ে, বা অন্য কোন গ্রহে যাওয়া নিয়ে, মানুষে যাচ্ছে, যদি একটা গপ্প লিখতে হয় তাহলে স্বভাবতই, আমরা ফিল্মেও এটা দেখেছি, ‘2001’ ছবির কথা আমার মনে পড়ছে বিশেষ করে… ‘Space Odyssey’… যে তাতে যে সমস্ত বিজ্ঞানের তথ্য থাকবে, সেগুলো একজন বৈজ্ঞানিক-ও নিশ্চয়ই, যাতে তার চোখে ভুল না ঠেকে, সেটা করতেই হবে। যেখানে মানুষে কি করছে না করছে  সেটা আজকাল সকলেরই জানা, বা কোন জিনিসটা সম্ভাব্য, বা কোন জিনিসটা সম্ভব নয়, সেটা সকলেরই জানা। কাজেই সেই বিষয়ে নিয়ে লিখতে গেলে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতেই হবে, এবং বিজ্ঞানটা যথাযথ হতে হবে, তাতে বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলোতে কোন ভুল থাকলে চলবে না। কিন্তু আবার আরেক ধরণের গল্প হয়… যেমন আমিই লিখেছিলাম, যেটা একবার ছবি হওয়ার কথা হয়েছিল কিন্তু হয়নি… যাইহোক, ‘Alien’ বলে একটা চিত্রনাট্য আমি লিখেছিলাম যাতে ব্যপারটা ছিল অন্য গ্রহ থেকে একটি প্রানী পৃথিবীতে আসছে। এখন তার যে মহাকাশযান, বা তার যে বিজ্ঞান, বা তার যে technology, সেটা সম্মন্ধে তো মানুষে এখনো কেউ জানেনা। সেখানে আমাকে অনেকখানি কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। এবং সেখানে কেউ যাচাই করে দেখতে যাবে না, এটা হয় কি না হয়…  কেননা কি যে হয় না হয় এটা আমরা এখনো জানি না। অন্য গ্রহ, যে গ্রহ আমাদের থেকে অনেক বেশি technologically এগিয়ে রয়েছে, তারা যে কোথায় পৌঁছেছে, তাদের পক্ষে কি সম্ভব না সম্ভব, সেটা আমরা জানি না। এখন সেখানে অনেকটা কল্পনার আশ্রয় আমরা নিতে পারি। সেখানে আমরা কাব্যের জগতে চলে যেতে পারি, আমরা দর্শনের জগতে চলে যেতে পারি। কিন্তু মানুষ যখন কিছু করছে দেখানো হচ্ছে, বা এমনকি যদি আজ থেকে ৫০ বছর পরে সে কি করছে তাও দেখান হয়, তাহলেও আজকের দিনে technology যে অবস্থায় রয়েছে সেটার কথা চিন্তা করে আমাদের এগোতে হবে।

অমিত: আচ্ছা এ প্রসঙ্গে আমার সত্যজিৎবাবুর লেখাই মনে পড়ছে একটা, বেশ কিছুদিন আগে উনি science fiction বা science fantasy সম্বন্ধে একজায়গায় লিখেছিলেন, আমি আপনার লেখায় পড়েছি… তাতে আপনি H.G. Wells এর লেখার তুলনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে… টাইম মেশিনের উনি বর্ণনা দিয়েছেন, বোতাম টিপলাম, চলে গেলাম। এখন যে Alien ছবির কথা আপনি বললেন সেখানও একটা বিশ্বাসযোগ্যতা আনার জন্য যেটুকু বিজ্ঞান আনার দরকার সেটা তো আনতেই হবে?

সত্যজিৎ: হ্যাঁ তা তো আনতেই হবে, কেননা এমন তো কিছু হতে পারেনা যে একেবারে পৃথিবীর সঙ্গে কোন যোগ নেই, এরকম গ্রহ বা এরকম প্রাণী কল্পনা করা কঠিন। কেননা কতকগুলো খুব basic level এ, amino acid বলুন, এ বলুন ও বলুন, যার থেকে প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে, সেটাতো দেখা যাচ্ছে সব জায়গায় এক। প্রথমত পৃথিবীর মধ্যে সমস্ত প্রাণীর মধ্যে এক। এবং এখনো যেটা অনুমান করা হয়, যে অন্য গ্রহে যদি প্রাণী থাকেও, তাহলেও তাদের প্রাণের মৌল উপাদানটা বোধহয় একই হবে।

সঙ্কর্ষণ: আচ্ছা একটা কথা এ সম্বন্ধে আমি বলি যে, অনেক ক্ষেত্রেই এরকম দেখা যায় যে সাহিত্যিকের কল্পনা বিজ্ঞানীর কল্পনাকে ছাপিয়ে গেছে। কারণ Jules Verne এর কল্পনা যেখানে গিয়েছিল তৎকালীন বিজ্ঞানীদের কল্পনা সেখানে পৌঁছয়নি। আর অনেক ক্ষেত্রেই আমার মনে হয় যে যারা বিজ্ঞানভিত্তিক লেখক, যারা বিজ্ঞানসাহিত্যিক, তাদের বৈজ্ঞানিকরা অনুসরণ করেছেন। এরকমও তো হয়েছে অনেক? তাই না?

সত্যজিৎ: তাদের বৈজ্ঞানিকরা অনুসরণ করেছেন। এখন এটা তো বটেই, সত্যি কথাই যে আজকাল যারা নামকরা বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প লেখক তাদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু নিজেও বৈজ্ঞানিক। যেমন Arthur Clarke এর উদাহরণ রয়েছে। এবং Arthur Clarke এখন যে ‘INSAT’ যে satellite ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা ৩০ বছর আগে তার গল্পে ভবিষ্যৎবাণী করে গেছিলেন। 

অমিত: বা ধরুন যে Asimov- দের সময়ে ১৯৪০এ তখন atom bomb সম্বন্ধে ‘Manhattan Project’ কেউ জানতই না সাধারণ লোক, তখন ওরা গল্পে এনেছেন। তখন সে সময় science এবং science fiction যে পত্রিকাগুলো বেরোচ্ছে তাতে এ ধরনের গল্প ছিল যে atom bomb ফেলা হলো বা এ ধরনের concept..

সত্যজিৎ: নিশ্চয়ই। সে তো দেখতে গেলে আপনি যদি ৫০০ বছর পিছিয়ে যান বা ৪০০ বছর পিছিয়ে যান , সেখানে তো Leonardo da Vinci কি না করেছেন বলুন। তিনি তো কতো কি যে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন তখনকার যুগে বসে, যখন বিজ্ঞানের যুগ সবে শুরু হচ্ছে বলা যেতে পারে। তখন বসে বসে সেই এরোপ্লেন, হেলিকপ্টার, হ্যানো ত্যানো, গ্রামোফোন কি না তার কল্পনার মধ্যে এসেছে। কাজেই মানুষের কল্পনা যে কতদূর যেতে পারে, এবং বিজ্ঞানটা পিছিয়ে থাকলেও ক্রমে ক্রমে চেষ্টা করে সেই কল্পনা… যদি তার মধ্যে সেই সম্ভাবনা এতটুকু থাকে, বা সেটা যদি technologically তার possibility সামান্যতমও থাকে তাহলে একদিন না একদিন সে গিয়ে ধরে ফেলবে, এবং সেটা বাস্তবে পরিণত হয়ে যাবে। 

সঙ্কর্ষণ: আমাদের পুরাণ কাব্যের কল্পনাও তো এরকম রয়েছে যে… 

সত্যজিৎ: ওরে বাবা, সে তো আছেই। আমি শুনেছি যে, সে তো আমাদের ইয়েই রয়েছে …… আমাদের শাস্ত্র নিয়ে….  যেমন একটা শোনা যায়, খুব সম্ভবত সত্যি… হিটলার-দের war office এ জার্মানিতে সমরঙ্গন বা ওই নিয়ে যুদ্ধ সংক্রান্ত কিছু পূঁথি ছিল, সংস্কৃত পূঁথি। জার্মানিতে তো বহু indologist আছেন, বহু সংস্কৃত পণ্ডিত আছেন, এবং তার মধ্যে থেকেই নাকি প্রথম ওই যে ওদের সেই missile এর ধারণা নাকি তার থেকেই আসে, এরকমও শোনা গেছে (হাসি)।

সঙ্কর্ষণ: আচ্ছা এবারে একটু আপনার কথায় আমরা একটু আসতে চাই। সেটা হচ্ছে এই যে আপনি এই বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা বা কল্পবিজ্ঞানমূলক যে কাহিনি বা উপন্যাস যা লিখছেন, এই লেখার মধ্যে আপনি কি করে এলেন?

অমিত: ধরুন আমরা দেখেছি উনিশশো বিশ বা উনিশশো ত্রিশের দশকে প্রেমেন্দ্র মিত্র বা অনেকেই লিখেছেন বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প বা কল্পবিজ্ঞানের গল্প। কিন্তু প্রোফেসর শঙ্কুর মতো একটা বিজ্ঞানীর চরিত্র নিয়ে গল্প লেখা, কল্পবিজ্ঞান বা science fantasy, এই প্রথম আমরা পেলাম ষাটের দশকে। এইরকম অসাধারণ একটা চরিত্র আপনি introduce করলেন, সেটা কি করে হলো সেটা একটু জানতে চাই। 

সত্যজিৎ: হলো মানে, আমার তো এমনি লেখার কোনো প্রশ্নই ছিল না, আমি তো কোনোদিন যে লিখবো, বা সাহিত্যিক হবো, বা গপ্পো ভাবতে হবে আমাকে বসে, লিখতে হবে, এ আমি কোনোদিন ভাবিনি। আমি বিজ্ঞাপনের আপিসে কাজ করতাম, তারপর সেটা ছেড়ে ফিল্মে ঢুকলাম। ফিল্মের কাজ করছি, তখন একদিন আমার বন্ধু কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় হঠাৎ বললেন যে সন্দেশ-টাকে আবার বের করলে কেমন হয়। তা সেটা মনে ধরল ব্যাপারটা, এবং তার ৬ মাসের মধ্যেই ১৯৬১ তে সন্দেশ আমরা আবার নতুন করে বার করি। সুভাষ এবং আমি সম্পাদক ছিলাম, এবং সন্দেশ বেরোনোর পর, স্বভাবতই আমার মনে হলো যে এবার একটু লেখা… লিখতেই হয়ত হবে.. আর কিছু না হোক সন্দেশ-কে feed করার জন্যে। তা প্রথম গল্পই কিন্তু আমার বলতে পারেন বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প, যদিও সেটা প্রোফেসর শঙ্কুর গল্প না, সেটা হচ্ছে ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’। এটা আমার জীবনে প্রথম বাংলা গল্প। এবং পরে এই গপ্পোটা.. পরে যদি সেটার প্রসঙ্গে আসা যায় আসা যাবে, সেটা হচ্ছে এই গপ্পোই ভিত্তি ছিল পরে যখন আমি ফিল্মের চিত্রনাট্য করি। যাই হোক, বঙ্কুবাবুর বন্ধু লেখার পর আমি দু একটা ভুতের গল্প এ গল্প সে গল্প লিখে, তারপর আমার মনে হলো যে এই শঙ্কু ধরনের একটা চরিত্র… ডায়েরি form-টার কথা মনে হলো যে এটা হতে পারে… এবং এটা বোধহয় subconsciously আমার খানিকটা কাজ করেছিল হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়রি… আমার বাবার লেখা, সেটা আমার ভয়ানক একটি প্রিয় লেখা… সেটাতেই উনি Conan Doyle এর Lost World বা অজ্ঞাত জগতকে নিয়ে একটু ঠাট্টা করেছিলেন। সেখানে বাবা যেগুলো তৈরি করেছিলেন একেবারেই কাল্পনিক কিছু প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ার, তাদের নাম ধাম স্বভাব চরিত্র সবই তার সঙ্গে এমনি কোনো বই খুলে সেসব জানোয়ারকে পাওয়া যাবে না। 

অমিত: যেন পুরোটাই মজা করার জন্যে….. 

সত্যজিৎ: পুরোটাই মজা করার জন্য, পুরোটাই ঠাট্টা করার জন্যে, leg pull করার জন্যে। বলা যেতে পারে, ওইটা নিয়ে একটা রসিকতা, রঙ্গ রসিকতা। তা আমারও প্রথম যেটা শঙ্কু, যেটা ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়রি’, তার মধ্যে এই মেজাজটা বর্তমান। শঙ্কু যদিও ডায়রি লিখছে এবং আপাত দৃষ্টিতে তাকে সিরিয়াস বলে মনে হবে, কিন্তু তার প্রথম যে invention, যে নস্যাস্ত্র.. snuff gun… নস্যির বন্দুক, সেটা মারলে মানুষকে কতবার যেন… ছাপান্নবার হাঁচতে হবে…. এই ধরনের কতকগুলো ব্যাপার ছিল। তা সেইটা লেখার পরে কিন্তু ক্রমে ক্রমে শঙ্কু সিরিয়াস হয়ে গেছে। শঙ্কু সিরিয়াস হয়ে গেছে, কেননা ওইটা লেখার পরে আমি ভীষণভাবে বিজ্ঞান সংক্রান্ত কাগজপত্র বইপত্র পড়তে আরম্ভ করলাম… এবং আরও অন্যান্য বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা… তখন একটা ভীষণ নেশা চাপল, Asimov বলুন, Arther Clarke বলুন, Bradbury, তারপর Theodore Sturgeon ইত্যাদি বিদেশের যারা নামকরা লেখক তাদের লেখাও ভীষণ পড়তে আরম্ভ করলাম। এবং তারপরে কতকগুলো science fiction এর একেবারে প্রধান মুল কতকগুলো বিষয়বস্তু বা theme কতকগুলো আছে , সেগুলো  একটার  পর একটা ধরে ধরে আমি শঙ্কুর মধ্যে দিয়ে  সেগুলো ব্যবহার  করতে  লাগলাম। সে invisibility -ই  বলুন, বা longevity -র ব্যাপার বলুন, brain-র ব্যাপার বলুন, বাইরের  থেকে  প্রাণী  আসার  ব্যাপার বলুন, বা এখান থেকে বাইরের কোনো  গ্রহে  যাওয়ার  ব্যাপার বলুন.. কতকগুলো staple যাকে বলে… কতকগুলো একেবারে মূল theme, science fiction এর রয়েছে যেগুলো প্রত্যেক science fiction লেখক-ই একবার না একবার ব্যবহার করেছেন, সেই theme গুলো নিয়ে নিয়ে.. আর কতকগুলো জায়গা সম্বন্ধে তো আমাদের ভয়ানক fascination থাকে… নিশ্চয় আপনারও আছে সঙ্কর্ষণবাবুর নিজের… যেমন Egypt, Africa -র কিছু  অংশ, মরু অঞ্চল… এই ধরণের কতকগুলো প্রাচীন সভ্যতা… কিন্তু তার মধ্যেও  যে কতকগুলো অদ্ভুত, বা আজকের  দিনেও আমাদের কাছে  যেগুলো খুব  অবাক  বলে… এমনকি  পিরামিড  তৈরির  ব্যাপারটাই  এত  একটা অদ্ভুত জিনিস। এইসবগুলো, প্রাচীন সভ্যতার  প্রতি  আমার  ভয়ানক একটা টান  রয়েছে.. সেগুলো আধুনিক আজকের দিনের বুদ্ধিতে..

অমিত: আধুনিক বুদ্ধিতে ব্যাখ্যা করা যায় না এরকম অনেক জিনিস আছে..

সত্যজিৎ: অনেক, অনেক জিনিস আছে. আজকাল  তো ক্রমে ক্রমে আরো কত  বেরোচ্ছে। আমি  নিজে  সম্প্রতি  সন্দেশ-এ একটা লিখেছি , সেই  Nazka-র লাইন  সম্বন্ধে আপনারা  জানেন  কিনা  জানি  না। দক্ষিণ  আমেরিকায়  Nazka বলে একটি  ছোট্ট  জায়গা আছে, পেরু -র ঐদিকে, যেখানে  প্রথম বোধহয়  বছর  চল্লিশেক আগে  এরোপ্লেনে  ওর  ওপর  দিয়ে যেতে  যেতে দেখলো  জমিতে  একেবারে বিশা–ল  বিস্তৃত  সমস্ত  Geometric  নকশা। পাখি, মাকড়সা, জানোয়ার.. এত বড়, যে আপনি  জমিতে বসে  কিন্তু সেগুলো বুঝতেই  পারবেন  না। শুধু  ওপর থেকে, একটা elevation থেকে, অন্তত  পাঁচ-ছশো  ফুট হাজার ফুট উঠে  গেলে…..

অমিত: Daniken এর বই -তে এর উল্লেখ আছে..

সত্যজিৎ: Daniken এর বইতে উল্লেখ আছে, এবং এ নিয়ে National Geographic-এর একজন  জার্মান  ভদ্রমহিলা  সেখানে  আজ  দশ  বছর ধরে থেকে এটা বোঝবার  চেষ্টা  করছেন  কেন করা হয়েছে। Daniken  তো সোজা  বলে দিয়েছে  বাইরের থেকে spaceship আসবার  সুবিধা  হবে বলে ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন  এগুলো  নিয়ে, এগুলো প্রত্যেকটাই  কিন্তু আমার গল্পে  ক্রমে ক্রমে… শঙ্কু, শঙ্কুর সঙ্গে  সঙ্গে অন্যান্য চরিত্র -ও এসেছে, তার বন্ধুবান্ধব… এবং শঙ্কুর ধর্ম-টা হচ্ছে  কি, শঙ্কু প্রথমে  গিরিডি-তেই থাকতো  মোটামুটি, তারপর ফেলু  যখন  এলো, ফেলু চরিত্র… ফেলু-কে  আমি ভারতবর্ষের  মধ্যেই  মোটামুটি রেখে,  ভারতবর্ষের  অনেকগুলো  জায়গায়  তাঁর নানারকম  adventure এর  কাহিনী  বলতে  লাগলাম আর  শঙ্কু-কে সারা  পৃথিবী  চষে বেড়াতে  লাগালাম (হাসি)।

অমিত: আচ্ছা  এই সূত্রে আমি একটু  বলে নি। আপনি  বলছিলেন  শঙ্কু এখন  অনেক বেশি  সিরিয়াস | তাছাড়া  আমরা  একটা জিনিস লক্ষ্য  করছি  যে আপনার  গল্পে যেটা  আগে ছিলনা, এখন ক্রমশ  বেশি পাচ্ছি, যেমন একটা laboratory-র একটা experiment -এর একটু detail ..

সত্যজিৎ: হুঁ হুঁ…

অমিত: এইগুলো কিন্তু বেশি করে করে এখন আসছে। তার মানে আপনি আরো বেশি বিজ্ঞাননির্ভর হয়ে আরো বেশি করে বিজ্ঞানের details-গুলোকে আনছেন আর কি…

সত্যজিৎ: হ্যাঁ, সেটার  জন্য  আমাকে  পড়াশোনাও  করতে হচ্ছে একটু বেশি। আমি প্রথম যখন শঙ্কু আরম্ভ করি  তখন আমার সে পড়াশোনার  দৌড়-টা অনেক কম  ছিল. তারপর  আমি কতকগুলো পত্রিকা  রাখতে  আরম্ভ করি, বইটই ভালো  পেলেই  আমি তৎক্ষণাৎ  কিনি, সেগুলো পড়ি, এবং এখন তো একটা বই রাখলে  তো চলেনা। আবার  দু  বছর তিন  বছরের  মধ্যে নতুন  নতুন বেরোচ্ছে, এত  দ্রুত  অগ্রসর  হচ্ছে সে  কল্পনার  বাইরে। কল্পনার  বাইরে এখন যা  চলছে… কাজেই  যথাসম্ভব  তার সঙ্গে সঙ্গে পা  মিলিয়ে  চলার  চেষ্টা করি এবং তার মধ্যে যেগুলো শঙ্কু-তে কাজে  লাগানো  যায় সেগুলো কাজে লাগিয়ে  দিই। তবে  শঙ্কুর মধ্যেও এবং ফেলুদা-তেও এর আগেও  একটা জিনিস যেটা এনেছি  সেটা একেবারে এখনো  সেটা… কি বলবো… সেটা parascience এর পর্যায়ে এখনো যেটা রয়েছে.. Parapsychology বলুন, paranormal এর পর্যায়ে যেটা রয়েছে, সেটাতেও আমার কম উৎসাহ নেই, কম কৌতুহল নেই।

অমিত: আচ্ছা এটা সম্বন্ধে আপনার নিজের মতামত কি একটু বলুন।

সত্যজিৎ: আমার নিজের মতামত… যাকে বলে আমার মনটা এ ব্যাপারে খোলা। আমার বিশ্বাস যে এই ধরণের ঘটনা ঘটে, আমি নিজে দেখেছি, আমার পরিবারে  ঘটেছে।  প্রত্যক্ষ  না হলেও  এত কাছের  লোকের  ঘটেছে যে তাকে প্রায় প্রত্যক্ষই  বলা  চলে, এবং সেটা না মানবার  কোনো কারণ  নেই। এবং আমার একটা ধারণা  রয়েছে এগুলো বছর তিরিশ-চল্লিশের  মধ্যে সব  বিজ্ঞানের আওতার  মধ্যে এসে  যাবে। এগুলো এখনো  হয়তো  সেই কারণ-টা পাওয়া  যাচ্ছেনা  কিন্তু আস্তে  আস্তে তা particle physics এর মধ্যেই হোক, যার  মধ্যেই হোক, একটা এসে যাবে।

অমিত: … এবং আমরা জানি অনেক বিজ্ঞানী এখন এ বিষয়ে কাজও করছেন..

সত্যজিৎ: অনেক জায়গায়… সোভিয়েত রাশিয়ায় কাজ হচ্ছে, বিশেষভাবে কাজ হচ্ছে। এই যে Kirlian photography…

অমিত: আচ্ছা একটা কথা এবার বলি। আমরা শুনছিলাম প্রোফেসর শঙ্কুর ব্যাপারটা নিয়ে। আমার মনে হয় একটা দিকে যদি আসি আমরা, এই ধরুন এই science fiction বা science fantasy লেখার যে একটা তাগিদ যেটা, এটা লেখার দরকারটা বেশি করে আছে কিনা, বা প্রয়োজনটা কোথায়, এটা নিয়ে কিছু বলুন। ধরুন আজকে একটা বড় কথা যে বিজ্ঞানের লেখালেখি, বিজ্ঞান communication, একটা লোককে বিজ্ঞানের সত্যগুলোকে জানানো, সেটা science fiction এর মধ্য দিয়েও হচ্ছে, science fantasy বা বিজ্ঞান ভিত্তিক গল্পের মধ্য দিয়েও হচ্ছে…

সঙ্কর্ষণ: আসল হচ্ছে যে এটা নিয়ে লোকের মনে একটা বিজ্ঞানের আগ্রহ জন্মানো, একটা চেতনা, এই বিজ্ঞান কাহিনীর মধ্যে দিয়ে এটা কি সম্ভব? কতখানি সম্ভব?

সত্যজিৎ: সম্ভব মানে কি, ধরুন আমার গল্প যদি লোকের ভালো না লাগতো, বা যাদের জন্য লেখা, কিশোর কিশোরীদের যদি ভালো না লাগতো, তাহলে হয়তো আর আমি ওটা নিয়ে আর লেখার উৎসাহ পেতাম না।

সঙ্কর্ষণ: এরকম কি জানতে পেরেছেন যে আপনার এই লেখার প্রেরণায় সে হয়তো বিজ্ঞান চর্চায় নেমেছে, এরকমও তো হতে পারে?

অমিত: এ প্রসঙ্গে আমি একটু বলে নিই, Arthur C Clarke যখন কলিঙ্গ পুরস্কার নিতে এসেছিলেন, তখন উনি কিন্তু একবার বলেছিলেন এ কথা যে আমরা হিসেব রাখিনি science fiction পড়ে কত লোক বিজ্ঞান কে profession হিসেবে বেছে নিয়েছে, বিজ্ঞানকে ভালোবেসেছে। এটা আপনি মনে করেন যে এটাও একটা দিক আছে এটার?

সত্যজিৎ: দেখুন, science fiction পড়ে আমি অন্তত science fiction লেখায় নেমেছি (হাসি)। আমার একটা তো উপকার হয়েছে। সে প্রেরণাটা তো আমি পেয়েছি, এবং সেটা লিখছি এবং তার ফলে আরো পাঁচজন যে সেরকম কোনও প্রেরণা পাবেনা, সেটা যে সবসময় লেখার বা সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে দিয়েই প্রকাশ পাবে, সেটা নাও হতে পারে।  সে নিজে সে career হিসেবে বেছে নিতে পারে। তার যদি জিনিসটা সম্বন্ধে একটা যথেষ্ট আগ্রহ জাগে, তাহলে সেটা নিয়ে সে আরো চর্চা করতে চাইবেনা কেন? সেতো শুধু আমার গল্প পড়ে সব জানবে না। সেটা  তেমনই যদি কৌতুহল বা আগ্রহ হয়, তাহলে তাকে নিজে থেকে চাড় করে আরো পাঁচরকম জিনিস পড়তে হবে। শেষকালে সেটাকে সে academic discipline-এর মধ্যে নিয়ে নিতে পারে। কেননা text বই হয়তো কিশোর কিশোরীদের পড়বার আগ্রহ ততো নাও থাকতে পারে। কিন্তু তারা প্রথম জানছে গল্পের মধ্য দিয়ে। এবং সেখানে গপ্পোটা খুব বড়ো জিনিস। গপ্পের প্লট অত্যন্ত বড়ো জিনিস, এবং তার সাথে সেটা তথ্য ভারাক্রান্ত না হয়ে পড়ে… কখনো মনে হবে না যে আমি এইসব তথ্যগুলো পরিবেশন করবার জন্য গপ্পোটা লিখছি। প্রধান হচ্ছে গপ্পো, গপ্পের রস। এবং তার সঙ্গে সঙ্গে তার মারফত সে কতকগুলো জিনিস জেনে যাচ্ছে, কতকগুলো দিকে তার উৎসাহ জাগ্রত হচ্ছে। তারপর  সেটা সে পরে কাজে লাগাতে পারে।

অমিত: এছাড়া কি আপনি মনে করেননা যে ভবিষ্যৎ কে আমরা জানিনা চিনিনা, মানে science fiction এর বেশীরভাগ লেখকই futurelogy-র দিকটা নিয়ে চর্চা করেন। ভবিষ্যতে কি হতে পারে না পারে…তা সেটা একটা ধরুন আজকে….রকেট যখন ছিলনা, রকেটের কথা পড়েছি, একটা মন তৈরি হয়েছে। বা atom bomb ছিলোনা atom bomb এর কথা পড়েছি, মন তৈরি হয়েছে। আজকেও দু হাজার সালে বা দু হাজার বিশ সালে কি হতে পারে পৃথিবীর চেহারা, তা নিয়ে যখন বিজ্ঞান গল্পকাররা বলছেন, আমরা একটা ধারণা নিচ্ছি তার থেকে। তা এটা কি আমাদের সাহায্য করবে না অনাগত ভবিষ্যতের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে? একটা প্রস্তুতি…

সত্যজিৎ: আমরা তো আর সে ভবিষ্যতের সময় থাকবো না (হাসি)। সে এই generation-টা তখন তো…. generationটা তো বদলে বদলে বদলে বদলে যাচ্ছে… নিশ্চয়ই আখেরে…

অমিত: না, কিন্তু আপনার যারা মূলত পাঠক, তারা তো কিশোর কিশোরী…

সত্যজিৎ: হ্যাঁ, তা তো বটেই, তারা একদিন বড় হবে…

সঙ্কর্ষণ: তাদের কল্পনার মধ্যে যেটা রয়ে গেল, পরে হয়তো সেটা একটা বাস্তব রূপ নিতেও পারে..

সত্যজিৎ: নিতেও পারে, কিছুই আশ্চর্য নয়। তবে আমরা তো নিজেদের অত বড় বলে মনে করিনা। যারা সত্যি করে বড় বড় লেখক যেমন Asimov বা Clarke, তাদের যে বিজ্ঞানের ভিত্তিটা রয়েছে সেটা তো আমাদের নেই। কাজেই আমাদের অনেকটা নির্ভর করতে হয় কল্পনার ওপর। কল্পনা এবং প্লট… এবং গল্পের মজাটার ওপর। তার সঙ্গে সঙ্গে যতটুকু পারি, সেটা খুব একটা absurd যাতে কিছু  না হয়, বা সেটা অবিশ্বাস্য বা অবাস্তব না হয় তার জন্য আমাদের খানিকটা পড়াশোনা করে নিতে হয়। 

সঙ্কর্ষণ: আচ্ছা এবারে আমরা একটু বিজ্ঞানভিত্তিক ছবির প্রসঙ্গে আসি। মানে বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনীর ওপরেই তো ছবিগুলো দাঁড়িয়ে আছে। এখন তো বিদেশী অনেক ছবি আসছে, তার অধিকাংশই বিজ্ঞানভিত্তিক দেখা যাচ্ছে..

অমিত: এবং সত্যজিৎ বাবু নিজেও একসময় বলেছেন..কিছুদিন আগে আমার মনে পড়ছে, যে ওনারো একটা পরিকল্পনা আছে এই ধরণের একটা science fiction ফিল্ম করার। এবং সেটা হয়তো ওই Space Odyssey ধরণের অত বড়, অত চমকদার না হলেও, ওনার মনে হয় একটা পরিকল্পনা আছে। তা এই ব্যাপারটা নিয়ে আপনি এখন কি ভাবছেন? 

সত্যজিৎ: হ্যাঁ, ওটার পরিকল্পনা আজকের নয়। ওটা আমার চিত্রনাট্য লেখা হয় ১৯৬৭ তে, পনেরো বছর আগে। ওটা in fact আমি একবার London গিয়েছিলাম, তখন Stanley Kubrick ‘Space Odessy’ তুলছেন। Arthur Clarke এর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তার আগেই বঙ্কুবাবুর বন্ধুর ওপর ভিত্তি করে একটা, ওই গপ্পো না, কিন্তু ওই বাইরে থেকে spaceship আসার ব্যাপারটা রয়েছে, একটা idea, একটা কল্পনা, আমার মাথায় ছিল। তা আমি Arthur Clarke কে বলাতে বলল “বাঃ, এ তো বেশ লাগছে, তুমি গিয়ে লেখো”। তারপর আমি কলকাতায় ফিরে এসে পুরো চিত্রনাট্য লিখেছিলাম, সেটা অনেকদূর এগিয়েছিল। Columbia company সেটা… আমি Hollywood এ পাঠিয়েছিলাম ছ সপ্তাহ। তবে আমার হয়ে যিনি মধ্যস্থতা করেছিলেন তার কতকগুলো গোলমালের ফলে শেষ পর্যন্ত ছবিটা হয়নি। কিন্তু তার বহু idea.. Columbia company ছবিটি করবে বলে আমার চিত্রনাট্যের বহু cyclostyled mimeographed copy…অন্তত শ খানেক…সেই ওদের আপিসে ছিল। তার মধ্যে থেকে চার আনা, পাঁচ আনা, দশ আনা করে idea দুটি ছবিতে লেগে গেছে। এক হচ্ছে ‘Close Encounters Of The Third Kind’, আর একটি সেই Spielberg এরই নতুন একটি ছবি হয়েছে ‘Extra Terrestrial’ বলে, ‘ET’ নাম দিয়ে ছবি হয়েছে। এখন এমন অবস্থা এসেছে যে আমার Alien যে আর করা সম্ভব না। করলে বলবে যে আমি ওর থেকে নিয়েছি। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে উল্টো। 

অমিত: এ ঘটনাটা আমাদের একদমই জানা ছিল না।

সঙ্কর্ষণ: এ ছবিটা কি আপনি ইংরেজিতে করবেন ভেবেছিলেন?

সত্যজিৎ: না ওটা bilingual ছবি ছিল। আমার একেবারে বাংলাদেশের গল্প, একটি গ্রামে একটি পদ্মপুকুরে এসে একটি spaceship ঝপাং করে পড়ে, তার মধ্যে একটিমাত্র Alien চরিত্র রয়েছে। সে বোধহয় মেশিনটা বিকল হয়েছে এবং চরিত্রটিও বোধহয় একটুখানি বিকল, কিন্তু পরদিন port-hole-এর মধ্যে দিয়ে ভোরে যখন সূর্যটা ওঠে…এটা মাঝরাত্রে ঘটনাটা ঘটে…এবং যেই পড়ল জলের মধ্যে অমনি দেখা যায় চোখের সামনে যে সমস্ত পদ্মগুলো ফুটে উঠল। It’s a benevolent force, এইটে বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু তারপরে সে port-hole-এর মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো এসে এই Alien creature-টির… এই প্রাণীটির গায়ে পড়তে সে আবার সজীব হয়ে উঠল l সূর্যের আলোতে তার প্রাণ পেল এবং তারপর সে রাত্রিবেলা মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসে এবং তাকে ঘিরে নানারকম প্রতিক্রিয়া। গ্রামে চাষাভুষো আছে, একটি journalist ছেলে আছে, সে গ্রাম সম্বন্ধে একটা সমীক্ষা করতে এসেছে, তার স্ত্রী আছে, তার নতুন বিয়ে হয়েছে। সে মেয়েটি আবার গ্রামের মেয়েদের family planning tanning ইত্যাদি নিয়ে নানারকম research করছে, সে দুজনেই একসঙ্গে research করে। একটি মাড়োয়ারি আছেন, তিনি একটি……drought area ওটা… সে একজন আমেরিকানকে দিয়ে খুব আধুনিক একটা drilling machine বসিয়েছে… সে জলের জন্য… এখন মজা হচ্ছে কি, সেই পুকুরের ওপর দিয়ে সেই spaceship-টির একটি চুড়ো বেরিয়ে রয়েছে, সোনালি রঙ তার। সেই মাড়োয়ারিটি মনে করেন এটি একটি মন্দির….এর blasting হয়েছে, তারজন্য ভেতর থেকে বেরোচ্ছে, অর্থাৎ জল এর থেকে তুলে বার করে নিয়ে এই মন্দিরকে সে আবার প্রতিষ্ঠা করবে, এই ধরনের সব ব্যাপার। একমাত্র আমাদের বাঙালি journalist-টির সন্দেহ হয়, কেননা কতকগুলো ঘটনা ঘটছে। এই যে প্রাণীটি, সে অতি একটি ক্ষুদ্র, দেখলে মনে হবে একটি দুর্ভিক্ষে না খেতে পাওয়া একটি বাচ্চা ছেলে বুঝি……এইরকম। তার চোখ নেই, sockets আছে, এবং তার মধ্যে নানা রকম দৃষ্টি আছে, সে x-ray  vision আছে, সে microscopic vision আছে, telescopic vision  আছে। তার একটা রঙ, রশ্মির রঙ আলাদা। এমনকি সে মরা মানুষকে বাঁচিয়ে দিতে পারে! বৃদ্ধতম যে গ্রামের অধিবাসী সে মারা যাচ্ছে, তার শ্মশানে একটি দৃশ্য আছে, এই রকম অনেক ব্যাপার আছে জানেন, খুব মজার.. Ultimately, সে আমেরিকানটিকে গিয়ে সেই আমাদের বাঙালি journalist বলে যে আমার মনে হচ্ছে এখানে spaceship একটা রয়েছে। ও বললে তোমার মাথা খারাপ? এই পোড়া দেশে spaceship আসতে যাবে কেন? আমাদের এত বড় বড় সব শহর রয়েছে পশ্চিমে, এখানে সে কি করছে? তার কি দরকারটা কি আসার? তারপর শেষে যখন নিজেরও সন্দেহ হয়, সে বন্দুক টন্দুক নিয়ে একটা ব্যাপার করতে যায়।কিন্তু তার আগে আমাদের যে alien creature-টি, যে প্রাণীটি, সে এসেছিল কিছু specimen সংগ্রহ করতে। দুটো ব্যাঙ, একটা সাপ, কিছু গাছ, কিছু ফুল এবং একটি খুব গরীব ছেলে হাবা বলে। সে একটি orphan ছেলে, সে ভিক্ষে করে বেড়ায়। তাকেও নিয়ে যাচ্ছে, কেন না সে ধরে ফেলেছে এর এখানে কোনও ভবিষ্যৎ নেই। ও যখন সেই বন্দুক চালাতে যাচ্ছে, বন্দুক চালানোর সঙ্গে সঙ্গে ওদিকে ওর কিন্তু যন্ত্র এখন তৈরি হয়ে গেছে, সে যন্ত্রকে নিয়ে উঠে চলে গেল। গ্রামের লোকেরা ভাবল বাহ্ ! আমেরিকান সাহেব আমাদের জন্য কি সাংঘাতিক একটি অদ্ভুত কাজ করল। আমেরিকান নিজে বুঝতে পারছে আমি কিছুই করিনি (হাসি)।

সঙ্কর্ষণ: তা এইটা করুন না……

সত্যজিৎ: এটা জানি। এটা এখন সম্ভব। আগে খুব অদ্ভুত কঠিন ছিল কতগুলো ব্যাপার, এখন জলের মতো সহজ হয়ে গেছে।

সঙ্কর্ষণ: করুন না…

সত্যজিৎ: দেখি, ঐ আমার একটা ভয়… কতকগুলো পরিবর্তন করতে হবে, কেন না কতকগুলো idea ও মেরে নিয়েছে… এই আমেরিকান ছবিটিতে কিছু idea মেরে নিয়েছে।

অমিত: তা হোক, তাহলেও এটা আপনি যেভাবে বললেন যে কাহিনীটা, এটা অপূর্ব হবে… 

সত্যজিৎ: এবং তারপর আমি ওইটা দেখিয়েছি ওর চোখের মধ্যে দিয়ে … সেখানেও আমাদের একটা ইয়ে হবে … একটা object … একটা পাতা … কিংবা একটা পোকা ….. পোকার দিকে দেখতে দেখতে সেই microscopic দৃষ্টি নিয়ে গিয়ে গিয়ে গিয়ে গিয়ে সমস্ত screen এ তার internal system, তার blood, তার ধমনী, সমস্ত … তার রক্ত, সমস্ত দেখা যাচ্ছে… 

অমিত: ফিল্মের দিক থেকেও কিন্তু প্রচুর scope রয়েছে … 

সত্যজিৎ: এখানের মজাটা হচ্ছে এখানে আমার বিজ্ঞানটা, পার্থিব বিজ্ঞানটা যেটুকু দেখানো হবে সেটা ঠিকই থাকবে, কিন্তু ছেলেটার spaceship এর ভেতরটা, তার মধ্যে ওসব কোনো যন্ত্রপাতি বা বোতাম টোতাম নেই , সমস্তটাই veins and arteries এর মতো চেহারা। সেটাও যেন একটা ….

অমিত: একটা living being..

সত্যজিৎ: একটা living being, এবং তার কতকগুলো জিনিসে ওইখানে ইয়ে করলে সেগুলো তবে জ্যান্ত হয়। সবসময়ই সেটার মধ্যে একটা প্রাণ রয়েছে, দপ দপ দপ দপ করে জ্বলছে … এবং এ বহুদিনের আগের ভাবা জিনিস এটা আমার … এখনও করলে .. এখনও আবার revive হবার চেষ্টা হচ্ছে, আমেরিকা থেকে এখনও চিঠি আসছে, কিন্তু আমার এমন একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল যে ওটায় ফিরে যেতে মনটা চায় না আর কি… যদি আরেক… আর আজকাল তো বহু আকছার space fiction হচ্ছে… এবং সত্যি কথা বলতে কি technically অসাধারণ একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে ওরা… 

সঙ্কর্ষণ: আচ্ছা আপনি ওদের studio facilities পাবেন না? পেতে পারেন নিশ্চয়ই…

সত্যজিৎ:  হ্যাঁ, এ ছবি করতে হলে এমনিও আমাকে co-production ছাড়া সম্ভব নয়। আমাকে বাইরের টাকা নিতেই হবে, কারণ এটা খরচ…. খরচের ব্যাপার… ওই যে প্রাণীটি, তার চলাফেরা, সে ভারি অদ্ভুত। এমনকি সে একটা গাছের পাতার ওপরেও দাঁড়াতে পারে, তার এত ওজন কম… প্রায় একেবারে weightless বলা যেতে পারে, সেইরকম আদ্দেক উড়ে, আদ্দেক লাফিয়ে এরকম চলে। একদিন সে আমেরিকানটা কোত্থেকে একটু.. সাঁওতাল আছে কাছে … সাঁওতালের ওখানে গিয়ে একটু হাঁড়িয়া ফাড়িয়া খেয়েছে… সাঁওতাল নাচ হচ্ছে… সে একটু মত্ত অবস্হায় ফিরছে একটা বাঁশবনের মধ্যে দিয়ে… তার পেছন পেছন আসছে সেই creature টি… তা ও হঠাৎ পেছন ফিরে দেখে কে রে বাবা! এখন ও ভেবেছি বুঝি দুর্ভিক্ষের কেউ…. ও পকেট থেকে একটা আধুলি বের করে ছুড়ে দেয় ওর দিকে… এবং শেষে যখন Alien চলে যাচ্ছে তখন দেখছে কপালে তার আধুলিটা লাগানো রয়েছে (হাসি)। 

অমিত: যাক সত্যজিৎবাবু আজকে অনেকক্ষণ সময় দিয়েছেন আমাদের। সঙ্কর্ষণবাবু আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আমাদের এই আলোচনাটা আমার ধারণা আমাদের শ্রোতাদের অত্যন্ত ভালো লাগবে ।

কল্পবিশ্ব সম্পাদকঃ সাক্ষাৎকারটি রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৮২ তে। আকাশবাণীর পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ডঃ অমিত চক্রবর্তী ও সাহিত্যিক সঙ্কর্ষণ রায়। এটি মগজাস্ত্র ওয়েব-ম্যাগাজিনের দ্বিতীয় সংখ্যায় ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *