কার্লোস সুচলওস্কি কন-এর সঙ্গে এক অমলিন সন্ধ্যা

রচনা  : সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায় ও দীপ ঘোষ

অলঙ্করণ : দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য (চিত্রচোর)

বরটা দিয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় শ্রী রণেন ঘোষ। গত ২রা জানুয়ারি, ২০১৭ তারিখ নাগাদ টাইমস্‌ অফ ইন্ডিয়ার ওই ছোট্ট খবরে উল্লেখ ছিল যে স্পেনীয় কল্পবিজ্ঞান লেখক কার্লোস সুচলওস্কি কন কলকাতায় বেড়াতে এসে ট্যাক্সিতে ফেলে আসা কিছু মালপত্র আবার ফিরে পেয়েছেন। রণেনবাবুর একান্ত ইচ্ছে ছিল যে আমরা কল্পবিশ্বের পক্ষ থেকে যেন ওঁর একটা সাক্ষাৎকার নিই। কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে তাঁকে? খোঁজ চলল খোদ কলকাতার স্প্যানিশ এম্ব্যাসিতে। শেষমেশ ইন্টারনেট ঘেঁটে পাওয়া ওঁর ফেসবুক পেজে হদিশ মিলল কার্লোসের নিজস্ব ব্লগ আর সেখানে সন্ধান পাওয়া গেল তাঁর মেইল অ্যাড্রেসের। একটা মেইল করা হল দুরুদুরু বক্ষে। জানানো হল কল্পবিশ্বের কথা আর বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞান নিয়ে আমাদের স্বপ্ন। কি আশ্চর্য তিনি উত্তর দিলেন সেই মেইলের আর আমাদের জন্য সময় দিলেন আধঘণ্টা সেইদিনই সন্ধেবেলায়। সেইমতো লিন্ডসে ষ্ট্রীটের একটা হোটেলে গিয়ে দেখা হল কার্লোস এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে। নিরিবিলিতে কথা বলার জন্য ওদের পছন্দের জায়গা হিসেবে যাওয়া হল কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘ফেয়ারলন হোটেল’ এর লনে। প্রখ্যাত নাট্যশিক্ষক এবং অভিনেতা জিওফ্রে কেন্ডালের স্মৃতি বিজড়িত সেই বিখ্যাত ‘ফেয়ারলন’। সেখানেই কফি সহযোগে সেই আধঘণ্টার আড্ডা কখন যে প্রায় দু’ঘণ্টা পেরিয়ে গেল তার হদিশ কেউ তখন রাখতে পারিনি তন্ময় অবস্থায়। আলোচনার ব্যাপ্তি তখন কল্পবিজ্ঞান পেরিয়ে সমাজ রাজনীতির একটা বিরাট দিগন্তরেখায় পৌঁছে গেছে। বিদায় নেওয়ার সময় চারজনেই বুঝলাম যে সূত্রপাত হয়েছে একটা নতুন বন্ধুত্বের। কল্পবিশ্বের পাতায় রইল সেই বন্ধুত্বের দলিল। 
 

কল্পবিশ্বঃ আমাদের মাতৃভাষা বাংলাতে স্প্যানিশ ভাষা এবং সাহিত্য নিয়ে চর্চার একটা বেশ পুরোনো ঐতিহ্য আছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেখানে যেখানে এই ভাষায় কথা বলা হয় সেখানকার নিজস্ব কৃষ্টিতে এই ভাষা একটা ছাপ রেখে গেছে। যেমন ধরা যাক, দক্ষিণ আমেরিকার স্প্যানিশ সাহিত্য বা পাবলো নেরুদার কবিতাগুলো …

কার্লোসঃ দক্ষিণ আমেরিকার স্প্যানিশ কৃষ্টি সেখানকার সমাজের প্রেক্ষাপটকে আমার মতে আরও ভালো ধরতে পেরেছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে চারিদিকের মানুষের মাটির দুনিয়াটা অনেক বেশী করে এসেছে স্প্যানিশ সাহিত্যে। তার আগে যেটা ছিল তাকে পুরাণ বা ইতিহাসের চর্বিত চর্বণ বলা যায়। ওই সময় থেকে সাধারণ মানুষের কথা অনেক বেশী করে উঠে এসেছে স্পেনীয় ভাষার আবর্তে কখনও কখনও বা হয়তো রূপকের আশ্রয়ে।

কল্পবিশ্বঃ আর কল্পবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে …

কার্লোসঃ এই ধারাটা যদিও স্প্যানিশ সাহিত্যে অতটা নামজাদা নয়। মানে বাজারচলতি পরিমাপে হয়ত অন্যান্য অনেকে ভাষার সাই-ফির মতো অতটা নাম ছড়ায় নি। কিছু সাহিত্যিক অবশ্যই ভালো লিখছেন। যদিও আমার নিজস্ব কিছু রুচি-বোধ আছে এ নিয়ে। স্টিরিও-টাইপ স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কল্পবিজ্ঞান বা ফ্যান্টাসি অথবা স্পেস-অপেরা আমার ঠিক পছন্দের নয়। বেশীরভাগ লোক যা লিখছেন তা স্পেস অপেরা বা হরর।

কল্পবিশ্বঃ তার মানে কি ভয়ঙ্কর ভিনগ্রহী বা যন্ত্রদানবের বিভীষিকা?

কার্লোসঃ ঠিক তা না অনেকসময় লজিক্যাল টেরর। আমার ক্ষেত্রে বলি। আমার জন্ম আর্জেন্টিনাতে, স্পেনে নয়। কিন্তু প্রায় গত ৪০ বছর ধরে স্পেনেই বাস করছি। মনে হয় আমার চিন্তাভাবনাগুলো বেশীরভাগ লেখকের থেকে একটু আলাদা। আমার লেখাগুলোর বিষয় যাকে বলা যায় মানুষের চিরকালীন কিছু সমস্যা নিয়ে রূপক। এই সমাজের কিছু কিছু প্রশ্নচিহ্ন তোমরা ভেবে দেখো মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতের সঙ্গে কতটা জড়িয়ে আছে যে সেগুলোকে আলাদা করা যায় না। আমার লেখাগুলোর সঙ্গে মিল পাবে যে ধরণটা সেটা হল উরসুলা কে লেগিন গোত্রীয় লেখা বা সত্তরের দশক থেকে যে নব-তরঙ্গের স্প্যানিশ সাহিত্য শুরু হয়েছে তার সঙ্গে। তোমরা কি ক্রিস্তোফার প্রিস্টের লেখা পড়েছ?

কল্পবিশ্বঃ মনে হচ্ছে নামটা শোনা …

কার্লোসঃ অত্যন্ত নামকরা ব্রিটিশ লেখক। অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছেন। ওর লেখা ‘দ্য ইনভার্টেড ওয়ার্ল্ড’ তো পৃথিবী-বিখ্যাত। খুব ভালো লেখক। ওর উপন্যাস থেকে করা ‘দ্য প্রেস্টিজ’ সিনেমার নাম হয়তো শুনেছ তোমরা বা ছবিটা দেখেও থাকতে পারো।

কল্পবিশ্বঃ হ্যাঁ সেটা তো জানি। দুজন ম্যাজিশিয়ানের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিয়ে …

কার্লোসঃ হ্যাঁ একদম ঠিক। এটা ঠিক প্রথাগত সাইন্স ফিকশন হয়তো নয়।

কল্পবিশ্বঃ হ্যাঁ এর মধ্যে টেসলার চরিত্র আছে।

কার্লোসঃ ঠিক হয়তো ধ্রুপদী কল্পবিজ্ঞানের মতো নয়। তবে আমার লেখাও এমন কিছুটা। কল্পবিজ্ঞানের কিছু কিছু উপাদান নিয়ে আমি উপন্যাস বা ছোটগল্প রচনা করি। আপাততঃ দুটো উপন্যাস বেরিয়েছে আমার। তবে সেই লেখাগুলোতে তথাকথিত কল্পবিজ্ঞানের কাঠামোটা কিছুটা পরোক্ষ ভাবে আছে, গল্পের মূল নির্যাস হিসেবে নয়।

[কফি আসে। এক আদর্শ হোস্টের মতো কার্লোস আমাদের পাত্রে কফি ঢেলে দেন।]

কল্পবিশ্বঃ আপনার কালকের অভিজ্ঞতাটা প্রাথমিক ভাবে হয়তো সুখকর নয়, তবে ওইজন্যই আপনার সঙ্গে পরিচয়টা হয়ে গেল আমাদের।

কার্লোসঃ হ্যাঁ, অনেকের সঙ্গে আলাপ হল গতকাল থেকে যার মধ্যে একজন স্প্যানিশ ভাষার শিক্ষক যিনি আবার কলকাতায় সার্ভান্টেস ইন্সটিট্যুটের অধ্যক্ষ।

কল্পবিশ্বঃ কিছু ঘটনাচক্রে হলেও আমাদের সৌভাগ্য যে আপনার সঙ্গে আলাপটা হয়ে গেল।

কার্লোসঃ তোমাদের কথা দিচ্ছি যে খুব তাড়াতাড়ি আমার লেখা কোন গল্প বাংলা অনুবাদে বেরোবে।

কল্পবিশ্বঃ এটা খুবই আনন্দের খবর আমাদের জন্য।

কার্লোসঃ আমার একজন বাঙালীর ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ আছে যিনি খুব ভালো স্প্যানিশ জানেন এবং তিনি বলেছেন অনুবাদের ব্যাপারটা দেখবেন।

কল্পবিশ্বঃ খুব ভালো। দরকার হলে আমরাও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব।

কার্লোসঃ আমার একটা ছোটগল্পই এখনও অবধি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। দু পাতার গল্প। সেটা ‘অ্যামেজিং স্টোরিজ’ এ বেরিয়েছিল।

কল্পবিশ্বঃ সেটা তো খুবই গৌরবের ব্যাপার।

কার্লোসঃ অন্য কিছু লেখা অনুবাদ হয়েছে ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান, জার্মান ভাষায়। জার্মান ভাষায় আপাতত দু একটা লেখা বেরিয়েছে তবে বছর-খানেকের মধ্যেই মনে হচ্ছে জার্মান ভাষায় একটা পুরো গল্পের সংকলন অনুবাদ হয়ে বেরোবে। এছাড়া ল্যাটিন আমেরিকার দু একটা দেশেও আমার লেখা বেরিয়েছে।

কল্পবিশ্বঃ ল্যাটিন আমেরিকা আর ইউরোপের কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পরিসরটা কি একই না আলাদা মনে হয় আপনার?

কার্লোসঃ অবশ্যই আলাদা। শেষ ইউরোকন অধিবেশনে এই পার্থক্যটা নিয়েই একটা বক্তৃতা দিয়েছি আমি। আমার নিজের একটা ধারণা আছে এটা নিয়ে। আধুনিক যন্ত্র সভ্যতার ওপর ভর করে ইউরোপেই প্রথম বড়ো বড়ো শিল্প গড়ে উঠেছিল। তাই তার ছায়ায় যাকে বলা যায় আধুনিক সভ্যতাও ইউরোপেই গড়ে উঠেছিল প্রথমে। পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় তা সে ল্যাটিন আমেরিকা বা ভারত যেখানেই হোক না কেন, প্রযুক্তিবিদ্যা এসেছে বাইরে থেকে। এটাই আমার মনে হয় এই পার্থক্যের মূল কারণ। ইউরোপের কল্পবিজ্ঞান লেখকেরা যেমন ধরো জুল ভের্ণ বা এইচ জি ওয়েলস্‌ যা নিয়ে লিখেছেন সেই টেকনোলজিগুলো ততদিনে ইউরোপে আসতে শুরু করে দিয়েছিল কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সেইগুলো এসেছে বাইরের দেশ থেকে যেটা একটা অন্য সামাজিক প্রেক্ষিত। হয়তো এটাই এই অমিলের কারণ।

কল্পবিশ্বঃ হ্যাঁ, এই পার্থক্যটা একটা ভেবে দেখার মতো কারণ হতে পারে। আমাকে এখানকার একজন কল্পবিজ্ঞান লেখক একবার বলেছিলেন যে রোজ সকালে ভিড় ট্রাফিক পেরিয়ে যে কর্মজীবন কাটাতে হয় সেখানে মানুষকে চাঁদে যাবার কথা সহজভাবে কি করে বোঝানো যাবে?

কার্লোসঃ এই সমস্যাটা আছে সত্যি। তাই আমি অনেক সময়ই রূপকের ছলে অনেক কিছু বলার চেষ্টা করি বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি না বলেও।

কল্পবিশ্বঃ আপনার লেখা সম্পর্কেও আমরা যা শুনেছি তাতে মনে হয়েছে দার্শনিক অন্তর্দ্বন্দ্বগুলোকে নানা রকম কল্পনার মোড়কে হাজির করেন আপনি, বাহ্যত কল্পবিজ্ঞানের আদলের মধ্যে দিয়ে।

কার্লোসঃ সেটা আমার চেষ্টা থাকে। ইদানীং আমি আরেকটা ধাঁচের লেখা লিখছি। তোমরা বোর্হেসের লেখা পড়েছ?

কল্পবিশ্বঃ হ্যাঁ হোহে লুই বোর্হেস। তিনিও তো আর্জেন্টিনার লোক।

সিনিওরা কার্লোসঃ খুব শক্তিশালী লেখক। আমার খুবই পছন্দের।

কার্লোসঃ আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক। বিশেষ করে ওর ছোটগল্পগুলো একটা আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে। খুব গভীর একটা কল্পনার জগত তৈরি করেছেন ওর সাহিত্যে। আমিও এমন একটা কল্পজগতের লেখা লিখি যেখানে বাস্তব আর কল্পনা প্রায় হাত ধরাধরি করে যায়। কখন যে কোনটা সামনে আসে তা সহজে বোঝা যাবে না।

কল্পবিশ্বঃম্যাজিক রিয়েলিজম’ এর কথা বলছেন কি?

কার্লোসঃ না তা ঠিক নয়। ধরো তোমাকে একটা এমন একটা জগতের কথা বলা হল যার অনেক কিছুই এই চেনা পৃথিবীর কিন্তু কিছু কিছু অচেনা পার্থক্যও প্রকট ভাবেই আছে।

কল্পবিশ্বঃ বিষয়-গত ভাবে মনে হচ্ছে কাফকার লেখার কাছাকাছি …

কার্লোস এবং সিনিওরা কার্লোস একসঙ্গেঃ একদম ঠিক কাফকা।

কার্লোসঃ ব্যক্তিগতভাবে আমার খুবই প্রিয় কাফকা বা বোর্হেসের লেখার ধাঁচটা।

কল্পবিশ্বঃ মুরাকামি?

কার্লোসঃ মুরাকামির লেখা মোটামুটি লাগে এদের তুলনায়।

কল্পবিশ্বঃ হোসে সারামাগোর কিছু লেখাও এসে যায় এই প্রসঙ্গে।

সিনিওরা কার্লোসঃ সারামাগোর লেখা ওঁর (কার্লোসের দিকে চেয়ে) বেশী ভালো লাগে নি তবে আমার ভালো লাগে।

কার্লোসঃ ওঁর লেখায় যেটা আছে সেটা কিছুটা প্রতীকীবাদ (symbolism)। রূপক (allegory) এর সঙ্গে তার পার্থক্যটা আগে ভালো করে বোঝা দরকার। যেমন ধরো দুধের জায়গায় একটা প্রতীক আনছি আমি …

কল্পবিশ্বঃ যেমন চাঁদ …

কার্লোসঃ না বাস্তব কিছু নয় বরং মানসিক ধারণা হিসেবে। ধরো দুধ হচ্ছে শুভ আর রক্ত হচ্ছে অশুভের প্রতীক। এই ধরণে প্রতীক ওঁর লেখায় এসেছে … এর সঙ্গে রূপকের একটা দুস্তর পার্থক্য রয়েছে। সেখানে গল্পের কোন একটা উপাদান যেটা বাস্তবের একটা অবস্থানকে তুলে ধরছে তার জায়গায় আমি একটা কল্পনার ছবি দিয়ে দিলাম। বোর্হেস, কাফকা এ ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত ছিলেন।  

কল্পবিশ্বঃ মাঝে মাঝে বাইরের গদ্যটা পেরিয়ে ভেতরের তল পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়বার পড়ার পর হয়তো পাঠক কিছুটা বুঝতে শুরু করে।  

কার্লোসঃ ঠিকই। আমার প্রথম উপন্যাসটাও হয়তো অনুবাদ করা অসম্ভবই ছিল। এটা অনুবাদের সময় আমার সঙ্গে অনুবাদক বারবার যোগাযোগ করেছে। গল্পটা একটা অন্য গ্রহের যেখানে কোন মানুষ নেই। সেখানকার ভাষার কাঠামোটাও একেবারে আলাদা যেটা মানুষের ভাষার মতো নয়। শুধু ওরাই বোঝে (হাসতে হাসতে)।  

কল্পবিশ্বঃ আর আপনি বুঝবেন অবশ্যই।

কার্লোসঃ না মাঝে মাঝে হয়তো আমিও বুঝব না। উরসুলা কে লেগিনের এমন লেখা আছে কয়েকটা। ওঁর ‘দ্য লেফট হ্যান্ড অফ্‌ ডার্কনেস’ এরকম একটা অনবদ্য লেখা। দূর কোন গ্রহের যার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য গুলো অন্যরকম এই পৃথিবী থেকে। আমার লেখাটা ঠিক এমন না হলেও কিছুটা কাছাকাছি। আমার দ্বিতীয় উপন্যাস হয়তো প্রথম লেখার থেকে কম দুর্বোধ্য।

কল্পবিশ্বঃ আমরা আপাতত জাপানী সায়েন্স ফিকশন্‌ নিয়ে একটা কাজ করছি। আসলে জাপানী ভাষার কল্পবিজ্ঞানের খুব কম সংখ্যক লেখাই ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে। আমরা অ্যামাজন ঘেঁটেও মোটে দু তিনটের বইয়ের সন্ধান পেয়েছি। আমাদের মধ্যে কেউ জাপানী ভাষাটা না জানার জন্য আমরা ইংরেজি থেকে অনুবাদ করব ঠিক করেছি। সেগুলো পড়ে দেখলাম আমাদের চেনা কল্পবিজ্ঞানের ধাঁচ থেকে একেবারে আলাদা এক ধরণের লেখা। আদৌ কল্পবিজ্ঞান বলা যায় নাকি সে নিয়েও একটা ধন্দে আছি। নাকি ফ্যান্টাসি অথবা সামাজিক আখ্যান এই নিয়েও আমরা একটু সন্দিহান। গল্পগুলো পড়তে অসামান্য লাগছে কিন্তু চেনা পরিধির মধ্যে একে বাঁধা যাচ্ছে না। আসলে কল্পবিজ্ঞানের সংজ্ঞা নিয়েও নানা মত আছে আমরাও আমাদের গ্রুপের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা করি।

কার্লোসঃ আলোচনার এই পরিসরটা থাকাই সমাজের  স্বাস্থ্যের লক্ষণ।  

কল্পবিশ্বঃ যেমন অনেক লেখা তাদের সময়কালীন সমাজের নানা ছবিকে তুলেছিল ব্যঙ্গাত্মক ভাবে বা কিছু কিছু নিয়মকে প্রশ্ন করেছিল তাদেরও কি এই দলে ফেলা যায়। টমাস মোরের ‘ইউটোপিয়া’কেও যেমন কল্পবিজ্ঞানের একটা মহৎ দৃষ্টান্ত বলে অনেকেই মনে করেন।  

কার্লোসঃ একদম ঠিক। আমিও এমন লেখাতেই বিশ্বাস করি। ঠিক এমনই একটা লেখার প্রস্তুতি চলছে এখন। তিনটে পর্ব থাকবে তাতে। নাম ‘সিক্সটিন হান্ড্রেড সেলসিয়াস’। আসলে সব মিলিয়ে একটাই আখ্যান। এই কাহিনীর মূল যে চরিত্র তার জীবনের একটা দিনের গল্প হবে এটা। সে থাকে একটা বড়ো দ্বীপের মধ্যে। ওখানকার বাসিন্দাদের পৃথিবীর অন্য কোন অঞ্চল নিয়ে কোন ধারণা নেই। কোন একদিন ওই দ্বীপের চারিদিকে কুয়াশা বা ধোঁয়ার একটা পুরু চাদরে ঢেকে যাবে। চারিদিকে প্রায় ৩০০০ কিমি পর্যন্ত ঢেকে দেবে ওই দ্বীপকে। এই গল্পটা শুরু হচ্ছে এই ঘটনার প্রায় সত্তর বছর পরে। ততদিনে এই ধোঁয়ার স্তরটা আরো ছড়িয়ে পড়েছে। বুঝতে পারছো এখানে দূষণের একটা ব্যাপার জড়িয়ে আছে আগামী পৃথিবীর জন্য সতর্কতা হিসেবে (হাসতে হাসতে)। ওখানকার বাসিন্দাদের জীবনে ততদিনে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। সমাজ জীবনে বা রাজনীতিতে অস্থিরতা আর অপরাধ প্রবণতা ও বেড়ে গেছে অনেকটা।

কল্পবিশ্বঃ আপনি একটা সামাজিক কাঠামোর কথা বলতে চলেছেন এই গল্পে। যেভাবে আস্তে আস্তে সব কিছু পরিবর্তন হয়।  

কার্লোসঃ চারিদিকের সমাজের অনেক কিছুর সঙ্গেই মিল পাবে। কোন কোন জায়গায় অনৈতিক যে কাজগুলো হচ্ছে যেমন ধরো হাসপাতাল থেকে মানব অঙ্গের চোরাকারবারের ব্যবসা এ সব কিছু নিয়েও লিখি আমি ওই কল্পনার আবহে। এই ঘটনাগুলো আসলে মাঝে মাঝে আমাকে পাগল করে দেয়।  

কল্পবিশ্বঃ আপনি কি ঈশ্বর বা কোন নিয়ন্তার অস্তিত্বে বিশ্বাসী?  

কার্লোসঃ না একেবারেই নয়। এমন কি বিজ্ঞানকেও শেষ উত্তর বলে ভাবতে রাজী নই। সৃষ্টির এই বিরাট ব্যাপ্তিকে মানুষ কিছু সূত্র দিয়ে মাত্র ব্যাখ্যা করতে পারবে সেটা আমি বিশ্বাস করি না।  

কল্পবিশ্বঃ আপনার এই দার্শনিক অবস্থানটা বেশ কৌতূহল জাগাচ্ছে আমাদের…

কার্লোসঃ আসলে তোমার আমার মতো সাধারণ মানুষের অস্তিত্বকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। আমি নিজেকে জানার জন্যই তোমাকে জানতে চাই। তোমাদের গ্যালিলিওর জীবনের একটা গল্প বলি এ ব্যাপারে যেটা হয়তো জানো না। মধ্যযুগে যাকে ‘স্কোলাস্টিক’ বলা হত তা আদতে চার্চ যার ক্ষমতা তখন অপরিসীম। কিছু কিছু শিক্ষিত মানুষ তখন প্রাচীন গ্রীক দর্শন ইত্যাদি অধ্যয়ন করে তারই আলোতে নতুন কিছু তত্ত্ব নিয়ে হাজির হচ্ছে। তাকে রেনেসাঁস বা যাই বল। ওই সময় ফ্লোরেন্স বা অন্য কিছু কিছু শহরে তর্কসভা বসত আর সবচেয়ে ভালো বক্তাকে পুরস্কার দেয়া হতো। সেখানে গ্যালিলিও গিয়ে চার্চের কর্তাদের সঙ্গে তর্ক করেন। তা বলে ভেবো না সেটা খুবই শিষ্টাচার ছিল বরং বেজায় ঝগড়া করা হতো সেই সভাগুলোতে। প্রায় মুরগীর লড়াই এর মতো (হেসে উঠে) … এরকম একটা সভায় গ্যালিলিও একবার বলেছিলেন যে দুটো ভিন্ন ওজনের জিনিস একপাত্র জলের মধ্যে রাখলে দুটো একসঙ্গেই ডুবে যাবে, সেটা কিন্তু বাস্তব নয়। উনি ডেমোক্রিটো (ডেমোক্রিটাস) এর পারমাণবিক মডেলের একটা সূত্র উল্লেখ করে এটা দেখালেন যা আর্কিমিডিসের মতবাদের উল্টো আর সেই সভাতে চার্চেরও মতের ঠিক বিপরীত। তিনি চার্চের বিরুদ্ধে মানে ভাববাদী দর্শনের বিরুদ্ধে একটা বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে গেছিলেন তা সত্যি। কিন্তু বুঝতেই পারছ, এটা ভুল ছিল। তার মানে গ্যালিলিও নিজে বিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও চার্চের স্রেফ বিরোধিতা করতে হবে বলে এক্ষেত্রে এমন একটা পক্ষ নিলেন যেটা আদৌ বিজ্ঞান সম্মত নয়। পল ফায়ারবেন্ড বলে একজন অস্ট্রিয়ান দার্শনিক লেখা একটা নামকরা বই আছে ‘এগেইনস্ট মেথড্‌’। আমি যদিও এর সবকিছু মানি না তবে উনি দেখিয়েছেন যে ধ্রুপদী পদ্ধতিতে তথাকথিত বিজ্ঞানের প্রমাণ বলতে আমরা যা বুঝি তার মধ্যে বেশ কিছু ফাঁক-ফোকর আছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগুলোর এমনভাবে করা হয় যাতে যে সূত্রটা প্রমাণ করতে চাইছি সেটা প্রমাণিত হয় (সবাই হাসতে হাসতে)।  

কল্পবিশ্বঃ আমরা নিজেরাও গবেষণার কাজে কিছুটা জড়িয়ে আছি। কোন সূত্র বা তত্ত্ব্ যে প্রস্তাব করা হচ্ছে বিজ্ঞানে সেটা কিন্তু অসংখ্য তথ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। আর যদি একটা তথ্যও সেটাকে অপ্রমাণ করে তবে সেই সূত্র বাতিল। 

কার্লোসঃ কিন্তু এই প্রমাণটা তুমি যে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সাপেক্ষে করছ সেটাই তো মাঝে মাঝে পরিবর্তন হয়ে যায়। আমার মনে হয় জ্ঞানের সীমার মধ্যে কোনদিনই সেই চূড়ান্ত সত্যি ধরা পড়বে না।  

কল্পবিশ্বঃ আপনি হয়তো কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শুনেছেন।  

কার্লোস এবং সিনিওরা কার্লোস একসঙ্গেঃ হ্যাঁ হ্যাঁ টেগোর, টেগোর …

কল্পবিশ্বঃ তাঁর একটা কবিতায় আছে “শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে।”

কার্লোসঃ খুবই সংক্ষিপ্ত ভাবে একটা বিরাট কথা বলেছেন। এক সহস্রাব্দ আগে বা পরে যখনই ভাবো না কেন সব সময়ই আপাত সত্যিটা সেই সময়কার প্রতিষ্ঠিত কতগুলো ধারণাকে নিয়ে চলে।  

কল্পবিশ্বঃ বিজ্ঞান সব সময় কতগুলো গাণিতিক মডেলের ওপর নির্ভর করে। এদিকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমেই কিন্তু কার্ট গোডেলের বিখ্যাত কাজে গণিতের সীমাবদ্ধতা প্রমাণিত হয়ে গেছে।  

কার্লোসঃ একদম আমার মত।  

কল্পবিশ্বঃ একটু প্রসঙ্গান্তরে যাচ্ছি। হার্ড সাই-ফাই বলতে আমরা যা বুঝি তার মধ্যে কেউ রাজনৈতিক কোন বক্তব্য বা কোন মতবাদ বা ধরুন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ হিসেবে যদি কেউ লিখতে চায়। আমি বলতে চাইছি যেমন ‘ডন কিহোতে’ আদতে প্রচন্ড রকম রাজনৈতিক বক্তব্য সমন্বিত একটা উপন্যাস। তেমন যদি এই সময় কেউ কল্পবিজ্ঞানের আবহে লিখতে চায় সে লেখার ভাষা কেমন হওয়া উচিৎ?

কার্লোসঃ দ্যাখো রাজনীতির ব্যাপারে আমার নিজের অবস্থানটা ঠিক ডান বা বাম কোনদিকেরই না। সে ধর্মের মানে প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের কাঠামো ভাবো বা রাজনীতি সর্বত্র একই অবস্থা। ক্যাথলিকদের ক্ষেত্রে যেমন পোপ সবার ওপরে আর তার নীচে প্যাপাল সাম্রাজ্য। একটা বড়ো বা ছোট কোম্পানিতে ভাবো ম্যানেজারের দল যেভাবে আছে। সবকিছুই এক ধরণের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো। আমলারা নিজেরাই সমাজের নিজস্ব একটা শ্রেণী বা একটা দল বলতে পারো যাদের সমাজের বিভিন্ন সমস্যাকে সমাধান করার জন্য রাখা হয়েছে। পুরোটা এক বিরাট আর জটিল কাঠামো যার একেবারে নিচে সাধারণ মানুষ আছে। এই বিশাল পিরামিডের যতো ওপরে উঠতে থাকবে তত মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকবে। মানুষের জীবন তখন স্রেফ তথ্য বা পরিসংখ্যান। তখন তুমি কেবল একটা যন্ত্র এই সিস্টেমের। আমরা স্বৈরাচার বলতে ওপরের একটা মানুষকে দেখি কিন্তু তার নিচের এই যন্ত্রগুলো কিন্তু সেই ব্যবস্থাটাকে চালিয়ে রাখে। খারাপ ভালো যাই বল না কেন তা এই বিরাট পিরামিডের অবদান। এর ভেতরের মানুষগুলো সবাই সব সময় লড়াই করছে ওপরে পৌঁছোবার জন্য মানে সবাইকে ডিঙ্গিয়ে। তুমি একটা ছোট ভুল করলে যা হয়তো ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না, কিন্তু তোমার এই অসংখ্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে কেউ একজন সেটাকেই তোমার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করবে তখন।

কল্পবিশ্বঃ এই কথায় কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’ মনে পড়ে গেল।

কার্লোসঃ কাফকা ছিলেন ক্রান্তদর্শী। ওঁর ‘জোসেফিন দ্য সিঙ্গার অর দ্য মাউস ফোক’ লেখাটার কথা ভাবো তো। এটা সম্ভবতঃ ওঁর শেষ লেখা গল্প। লেখাটার মধ্যে যা আছে সেটা আসলে সমাজের ভেতরে এই আমলাতন্ত্রের থাবা নিয়ে একটা প্রতিবাদ। আমরা কেউ কেউ চেষ্টা করি প্রতিবাদ করতে বা প্রতিবাদের নাম করে নিজেকে ভোলাতে, কেউ কেউ সত্যি সেটা পারে জোর গলায় না চেঁচিয়েও।

কল্পবিশ্বঃ সাহিত্যের তাহলে সেই ক্ষমতা আছে বলুন সমাজ পরিবর্তনের?

কার্লোসঃ আমি খুব নিশ্চিত নই এ ব্যাপারে যে আদৌ কোন বদল সত্যি সম্ভব কিনা সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে। আমি না লিখে পারি না মানে লিখতে হবেই বলে লিখি কিছু ভেতরের শক্তির প্রেরণায়, কিন্তু তা দিয়ে সমাজের সত্যি কোন উপকারে আসছি কি না জানি না  

কল্পবিশ্বঃ হয়তো আপনার জীবদ্দশায় নয় আগামীতে।

কার্লোসঃ জানি না সেটা। তবে আমি মাঝে মাঝে বেশ নিরাশাবাদী হয়ে যাই পৃথিবীর অবস্থা দেখে …

কল্পবিশ্বঃ কিন্তু যেমন ধরুন ফরাসী বিপ্লবের সময় ভলতেয়ার, রুশো এদের লেখা যাকে বলে অণুঘটকের কাজ করেছিল। তাতিয়ে দিয়েছিল লোককে।

কার্লোসঃ এই প্রসঙ্গটা ভালো তুলেছ আমার বোঝাতে সুবিধে হবে। যে লেখা সত্যি সাধারণ মানুষকে বোঝাতে সমর্থ হয় মানে ফরাসী বিপ্লব, রুশ বিপ্লব বা নাৎসি বিপ্লব (সবাই মিলে হাসতে হাসতে) সেটা আসলে স্লোগান। কোন জ্ঞানগর্ভ রচনা দিয়ে তুমি অনেক লোককে তাতাতে পারবে না কারণ সেই লেখাগুলোতে আসলে সব কিছুর অন্তঃসারশূণ্যতা নিয়ে বয়ান করা আছে। বরং তুমি যদি ছোট ছোট স্লোগান লেখো যেমন ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’, ‘বিপ্লবের শত্রুরা নিপাত যাক’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এসবের ভেতরে কিন্তু আদতে যা লুকিয়ে আছে তা হল এক ধরণের আমলাতন্ত্রকে বাদ দিয়ে অন্য ধরনের আমলাতন্ত্রে যাবার ছাড়পত্র। বাইরে ‘সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা’ কিন্তু পরে দেখো আবার সেই আমলাতন্ত্র, মানুষের ওপর অত্যাচার বা রোবস্পীয়র এসব। এগুলো খুব সহজ সাধারণ মানুষের বোঝবার জন্য। অমুক নেতার দশ সূত্র বা কমান্ডমেন্ড এসব মানুষকে সহজে বোঝাতে বা তাতাতে পারবে। অনেক সময় এভাবে অনেক ভুল মতবাদও মানুষের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া যায়। ভুল মানে সময়ের মাপে যেগুলো পরে একেবারে পরিত্যক্ত হয়েছে। এসব স্লোগানের মধ্যে দিয়ে কিন্তু তুমি বা আমি যে পৃথিবী বা ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখি সেখানে উত্তরণ ঘটানো যাবে না এই সমাজকে। স্বপ্নের ওই মুক্তমনা সমাজে পৌঁছনোর জন্য অনেকগুলো প্রায় দুস্তর বাধা আছে। আমি যে দ্বীপে থাকি সেখানে প্রায় ৩০,০০০ লোকের বাস। তাদের কিছু নিজস্ব নিয়ম কানুন আছে। হয়তো মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বলে কিছু কিছু তাদের কিছু ব্যবস্থা আমাদের অন্যরকম বা অদ্ভুত লাগতে পারে কিন্তু আদতে সেই একই আমলাতান্ত্রিক কাঠামো মানে অসংখ্য নিয়মের বেড়াজাল। আসলে সমস্যা মানুষের মধ্যেই। এখন যেমন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাহায্যে কৃত্রিম মানুষ তৈরি করার জন্য বিজ্ঞানীরা উঠে পড়ে লাগছেন। একদিন হয়তো এই পৃথিবী এই কৃত্রিম মানুষে ভরে যাবে আর আমরা মানে সত্যি মানুষেরা এখানকার পাট গুটিয়ে অন্য গ্রহে পাড়ি দেব। আমরা কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম দ্যাখো। তোমাদের প্রশ্নটা ছিল সাহিত্যের দ্বারা সত্যি পরিবর্তন সম্ভব কি না, আমার উত্তর হচ্ছে যে সাহিত্যের প্রভাব ছাড়াও সমাজ তার নিজস্ব নিয়মে চলে কিছু অদ্ভুত কার্য কারণের মাধ্যমে।   

কল্পবিশ্বঃ স্পেনে এখন পাঠকেরা কি কল্পবিজ্ঞান নিয়ে উৎসাহী?

কার্লোসঃ অনেকদিন ধরেই স্পেনের সাধারণ পাঠক হয়তো রোমাঞ্চকর গল্প বা হালকা সাই-ফির ধাঁচে স্পেস অপেরা এসব নিয়েই বেশী উৎসাহী ছিল। খুব আস্তে আস্তে একটু একটু করে তারা একটু নতুনত্বের স্বাদ চাইছে। আমার বেশ কিছু বড়ো আর ছোট গল্প বেরিয়েছে এর মধ্যে। তোমাদের যে গল্পটা বলেছি সেটা এক বছর পুরস্কার পেয়েছে সায়েন্স ফিকশন সোসাইটিতে, আর ওরা একটা সংকলনে রেখেছেন সেটাকে।

কল্পবিশ্বঃ এটা তো খুব ভালো খবর।

কার্লোসঃ এর মধ্যে একটা লেখা আদৌ প্রথাগত কল্পবিজ্ঞান নয়। আগামী কুড়ি বছর পরে সমাজের ছবিটা কেমন হবে তা নিয়ে একটা গল্প। সেটাও সাইন্স ফিকশন সোসাইটিতে মনোনীত হয়েছিল ২০০৭ সালে।

কল্পবিশ্বঃ আমাদের মাতৃভাষা মানে বাংলা সাহিত্যে যদি কল্পবিজ্ঞানের অবস্থা কথা বলি, তাহলে দেখব ঊন-বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষ দিক থেকেই কিছু বিজ্ঞানীরা নিজেই বিজ্ঞান ঘেঁষা গল্প লেখা শুরু করেন। পরে বিংশ শতাব্দীর প্রথম নাগাদ কিছু লেখক জুল ভের্ণ বা এইচ জি ওয়েলস্‌ বা অন্য বিখ্যাত লেখকদের গল্প থেকে অনুপ্রাণিত লেখা শুরু করেন। ওই শতাব্দীর মাঝামাঝি মানে পাঁচ আর ছয়ের দশক থেকে দুজন অগ্রগণ্য লেখক এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র আর সত্যজিৎ রায়। আপনি হয়তো সত্যজিৎ রায়ের নাম জানেন সিনেমা নির্মাতা হিসেবে।

সিনরিটা কার্লোসঃ হ্যাঁ রে’র নাম শুনেছি।

কল্পবিশ্বঃ ওঁর গদ্যটা খুব সাবলীল যদিও ছোটদের জন্য। এক সময় একটা গল্প লিখেছিলেন ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ বলে যেখানে এক সাধারণ গ্রামের লোকের সঙ্গে একজন ভিনগ্রহীর দেখা হয়। সেই এলিয়েন তাকে মানসিক তরঙ্গের মধ্যে দিয়ে তাঁদের সমাজের ছবি দেখায় যেখানে কোন হিংসা বা যুদ্ধ নেই। ‘ইটি’ সিনেমার সঙ্গে এর বেশ কিছু মিল আছে। একসময় এ নিয়ে নানা রকম কথাও রটেছিল যে ইটির চিত্রনাট্যে এই গল্প বা এই গল্প থেকে ওঁর করা চিত্রনাট্যের বিরাট প্রভাব আছে। যদিও দুঃখজনক ভাবে ওঁর নিজের চিত্রনাট্য থেকে ছবিটা হয়ে ওঠে নি। আপনি কি অপু ট্রিলোজির নাম শুনেছেন? তিনটে ছবিতে অপু নামে একটা ছেলের জীবনের নানা স্তর দেখানো হয়েছে তাঁর ছোটবেলা থেকে মধ্য যৌবন অবধি। সে এমন একজন মানুষ যে প্রকৃতিকে প্রায় নিজের জীবনের একটা অংশ বলেই ভাবে। আর ছোটবেলায় তাকে এই ধারনাগুলো গড়তে সাহায্য করেছিল ওঁর দিদি যে পরে মারা যায় চিকিৎসার অভাবে, কারণ ওরা বড়ো গরীব ছিল।

কার্লোসঃ আমার এটা শুনেই খুব কৌতূহল হচ্ছে। একটা মানবিক টেস্টামেন্ট বলে মনে হচ্ছে এই ছবিগুলো দাঁড়াও নামটা লিখে নিই। আমি তোমাদের শহরে এই নিয়ে তিনবার এলাম কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতাটা সত্যি অসামান্য।

কল্পবিশ্বঃ আমরাও ভাবছি যে গতকাল পর্যন্ত আমরা পরস্পরের অজানা ছিলাম মানে নামও জানতাম না কেউ কারো আর এই সন্ধেবেলা মনে হচ্ছে আমরা বন্ধু। এই অভিজ্ঞতাগুলোই হয়তো বুঝিয়ে দেয় যে আমরা আসলে পৃথিবী নামে একটা বিশাল দেশের নাগরিক।

কার্লোসঃ তোমরা এরপর যদি মাদ্রিদে আসো কোন সাই-ফাই কনফারেন্সে বা তা সে ইউরোপের অন্য কোন শহরেই হোক না কেন একবার জানাবে আমায় ঠিক পৌঁছে যাব। আমরা এখন রিটায়ার্ড আর পৃথিবীটাও অনেক ছোট হয়ে এসেছে। আমি যেটা করতে পারি তা হল আমার একটা লেখা মানে ইংরেজি অনুবাদে তোমাদের দিয়ে দেব যদি তোমরা বাংলায় লিখতে চাও সেটা। সেই লেখাটাও কিন্তু একটু নিরাশার।

কল্পবিশ্বঃ সেটা আমাদের সৌভাগ্য হবে। আমরা শুধু শিশুপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান নয় বরং পরিণতমনস্ক লেখা নিয়েই কাজ করতে চাই। আচ্ছা এত কিছু অবিশ্বাসের পরেও আপনি কি কিছুর ওপর আস্থা রাখেন?

কার্লোসঃ হ্যাঁ সব কিছুর পরেও আমার আস্থা কিছুটা হলেও আছে সাধারণ মানুষ আর মানবিকতার ওপরে।

কল্পবিশ্বঃ বাংলায় নতুন করে যারা কল্পবিজ্ঞান লিখতে চাইছেন তাদের জন্য কি পরামর্শ আছে আপনার?

কার্লোসঃ একটাই কথা বলব চারিদিকের পৃথিবীটাকে ভালো ভাবে অনুধাবন করো। লেখা নিজে থেকেই চলে আসবে।

কল্পবিশ্বঃ আমরা আশা রাখব আপনাদের দুজনের সঙ্গেই কল্পবিশ্বের যে বন্ধুত্বের সূচনা হল সেটা অটুট থাকবে।

কার্লোসঃ আমি অবশ্যই যোগাযোগ রাখব তোমাদের সঙ্গে …

সময়ের ফ্রেমে ধরা সেই অমলিন স্মৃতির মুহূর্তকে

পরের কথাঃ কার্লোস তাঁর দেয়া কথামতো এর পরে বেশ কিছু মেইলের মধ্যে দিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। আমেজিং স্টোরিজে তাঁর লেখা গল্পের যে অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে লেখা তার একটা নির্যাস তিনি পাঠিয়েছেন কল্পবিশ্বকে। এর সঙ্গে ফ্রিডরিশ নীৎসে (নীচে), মেরি ডগলাস, পল লিগেন্ডার প্রমুখ বিখ্যাত চিন্তাবিদের অসংখ্য বইয়ের তালিকা প্রস্তুত করে দিয়েছেন আমাদের জন্য যা কল্পবিশ্বকে আগামী রচনার দিশা জোগাবে। আমরা আশা রাখব যে এই পারস্পরিক চিন্তাস্রোতের আদানপ্রদান বাংলা সাহিত্যের কল্পবিজ্ঞানে একটা নতুন যুগের সূচনা করবে।

কার্লোস সুচলওস্কি কন – সংক্ষিপ্ত জীবনী

     আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞান এবং অধিবাস্তববাদী ধারায় একটা উজ্জ্বল নাম কার্লোস সুচলওস্কি কন। জন্ম ১৯৪৮ সালে আর্জেন্টিনায় কিন্তু কর্মসূত্রে ১৯৭৬ থেকেই স্পেনের বাসিন্দা কার্লোস। সেই সাতের দশক থেকেই ওঁর লেখা আর্জেন্টিনা এবং স্পেনের নানা সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়ে চলেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল অ্যাক্সন, আর্টিফেক্স, মাইক্রোরিলেটস্‌ ইত্যাদি। পরবর্তীকালে প্ল্যানেটাস প্রহিবিডোস্‌ এর মতো বিখ্যাত ওয়েব ম্যাগাজিনেও তার অনেক লেখা বেরিয়েছে। ওঁর নিজস্ব ভাবনাগুলো ব্লগ হিসেবেও প্রকাশ করে থাকেন কার্লোস। বেশ কিছু নামী কল্পবিজ্ঞান সংকলনে ওঁর লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ১৯৮৮  সালে ওঁর একটা গল্প এক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত স্তরে মনোনীত হয়েছিল। স্প্যানিশ সি এফ অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সংকলনে তিনবার মনোনীত হয়েছে কার্লোসের লেখা। এর মধ্যে ২০০৭ সালের সংকলিত লেখাটা সেই বছরের সেরা ছোটগল্প বলে মনোনীত হয়। ২০০৭ সালে প্রকাশনা সংস্থা মান্দ্রাগোরা এডিশন থেকে ওঁর প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় যার নাম ‘উনা ন্যুয়েভা কনসিয়েন্সিয়া’। ইউরোপ এবং ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে ওঁর লেখা অনূদিত এবং সমাদৃত হয়েছে বারবার। বুলগেরিয়ার সোফিয়ায় আয়োজিত বিখ্যাত সাহিত্য প্রতিযোগিতা ‘গোল্ডেন কান’ এর চূড়ান্ত স্তরে অন্ততঃ দুবার মনোনীত হয় ওঁর লেখা। আর্জেন্টিনার প্রকাশনা সংস্থা অ্যান্ড্রোমিডা থেকে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় ওঁর লেখা গল্পের সংকলন। ২০১৪ সালে প্রকাশিত ওঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ওয়ান্স টিয়েম্পস্‌ ডে ফ্যুতুরো’ ইতিমধ্যেই বহু প্রশংসা এবং সম্মান লাভ করেছে। আগামী দিনে কার্লোসের কলম থেকে আমরা আরো অনেক শক্তিশালী লেখার প্রত্যাশী। 

One thought on “কার্লোস সুচলওস্কি কন-এর সঙ্গে এক অমলিন সন্ধ্যা

  • August 20, 2017 at 8:47 am
    Permalink

    সাক্ষাৎকারটি খুবই মনোগ্রাহী

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *