ক্লাই-ফাই সিনেমা – রূপোলী আলোয় শেষের সেদিন

সয়লেন্ট গ্রিন ছায়াছবির এক আইকনিক ফ্রেম

Det. Thorn: Ocean’s dying, plankton’s dying… it’s people. *Soylent Green is made out of people.* They’re making our food out of people. Next thing they’ll be breeding us like cattle for food. You’ve gotta tell them. You’ve gotta tell them!

Hatcher: I promise, Tiger. I promise. I’ll tell the Exchange.

Det. Thorn: You tell everybody. Listen to me, Hatcher. You’ve gotta tell them! Soylent Green is people! We’ve gotta stop them somehow!  

                                                                                  — Soylent Green (1973)    

০২২ এর পৃথিবী যেখানে প্রযুক্তির নখরাঘাতে বিপর্যস্ত জৈববৈচিত্র্য। দূষণের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে ভেঙে পড়ছে প্রাকৃতিক বিন্যাস। টান পড়ছে মানুষের অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালে। শস্যের ফলন কমে গেছে বিপদজনকভাবে। অত্যধিক জনসংখ্যার চাপে থাকার জায়গার আর সংকুলান হচ্ছে না পৃথিবীতে। রাস্তায় রাস্তায় ভবঘুরে মানুষের ভিড় যারা ‘অনিকেত’। এইসময় ‘সয়লেন্ট কর্পোরেশন’ নামে এক বহুজাতিক সংস্থা খাদ্যাভাবের এই প্রবল সমস্যা মেটাতে শুরু করল এক অভূতপূর্ব উপায়ে। সমুদ্রে উৎপন্ন এক ‘হাই এনার্জি প্যাঙ্কটন’ থেকে তারা তৈরী করা শুরু করে এক সবুজ রঙের ছোট ওয়েফার, যা পৃথিবীর এই বিপুল খাদ্য সমস্যার সমাধান করবে।… এই আপাত মানব-হিতৈষী কাজের পেছনে কিন্তু লুকিয়ে আছে এক ঘৃণ্য সত্যি, যেখানে স্রেফ মুনাফাই হল একমাত্র চাবিকাঠি যার অবিরাম যোগান বজায় রাখার জন্য আসলে মৃত মানুষের অবশেষ দিয়েই মানুষের জন্য তৈরী করা হবে খাদ্য।

     কিছু সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে কী আশ্চর্য সত্যি মনে হচ্ছে না ১৯৭৩ এর কাল্ট এই কল্পবিজ্ঞান ছায়াছবির প্লটলাইন!! কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে ক-টা সাব-জঁর নিয়ে ছায়াছবির গল্প তৈরী হয়েছে তা থেকে এই ছবি আখ্যান বেশ কিছুটা অন্যরকম ছিল। চারের দশকের শেষ থেকেই ওই আয়রন কার্টেনের জুজু আর ঠাণ্ডা যুদ্ধের অলিন্দে বসে ইংরেজী বলা পৃথিবীতে যে ধরণের সাই-ফি সিনেমা বানানো হচ্ছিল, তাতে মোটামুটি মেলভোলেন্ট ভিনগ্রহীদের দাপট। ভালো করে দেখব যে ওই ভিনগ্রহীরা আসলে ‘রেড টেরর’ এর দ্যোতক মানে ম্যাকার্থিয়ান ওই সময়ে আসলে কম্যুনিস্টদের অলটার ইগোই আসলে ভয়ঙ্কর ভিনগ্রহী হয়ে আসছে সিনেমার পর্দায়, ১৯৫১ সালের বিখ্যাত ছায়াছবি ‘দ্য ডে দ্য আর্থ স্টূড স্টিল’ এর মতো সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। ওই নিউক্লিয়ার অ্যাপোক্যালিপস নিয়ে ঘোরের যুগে এই ছায়াছবিতে যে সত্যি উঠে এসেছিল তা হল কোনঅ ইন্টারগ্যালাকটিক শত্রু না, বরং আমাদের ভঙ্গুর সভ্যতার গভীরে টাইমবম্ব আমরা নিজেরাই ফিট করেছি প্রযুক্তিকে আমাদের আকাশচুম্বী লোভের ক্রীড়ানক বানিয়ে। মনে রাখা উচিত ‘ক্লাই-ফাই’, কল্পবিজ্ঞানের এই সাব-জঁর নিতান্তই একবিংশ শতাব্দীতে পদচারণা করেছে পপুলার কালচারে যখন আবহাওয়ার বিরাট খামখেয়ালীপনা আর বৈজ্ঞানিকদের নিছক ‘স্পেক্যুলেশন’ নয়, বরং সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিদিনের অস্তিত্বে রীতিমতো টের পাচ্ছে এর বিষময় ফল।

     এই অতি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধের পরিসরে আমরা শুধু দেখে নেব কয়েকটা মাত্র ইংরেজী কল্পবিজ্ঞান ছায়াছবির প্রসঙ্গ যেখানে আবহাওয়ার ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে, তার ভিস্যুয়াল ন্যারেটিভের আবরণে কখনও মূল কাহিনির বিন্যাসে কখনও বা তার এক সাব-থিমের মোটিভ হিসেবে।

ব্লেড রানার (১৯৮২) :

     আইকনিক লেখক ফিলিপ কে ডিকের পোস্ট অ্যাপোক্যালিপ্টিক কাল্ট উপন্যাস ‘ডু অ্যানড্রয়েডস ড্রিম অফ ইলেকট্রিক   শিপ’ এর কিছুটা ছায়া ছিল এই ছবির গল্পে। যেখানে নিউক্লিয়ার যুদ্ধের ধাক্কায় বিপর্যস্ত আগামী পৃথিবীতে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে নিতে মরিয়া অ্যানড্রেয়েডের দল। কিছুটা সাব-থিম হিসেবে গ্রিন হাউস এফেক্টের পরিণামে আবহাওয়া ধ্বংসের ছবিও জুড়ে ছিল গল্পের চলনে। ২০১৯ সালের লস অ্যাঞ্জেলস শহরের ছবি উঠে এসেছে এতে। তাতে অত্যধিক প্রাকৃতিক দূষণের প্রভাবে সোঁদা সোঁদা আবহাওয়ার আড়ালে আগামী ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি উঁকি দেয় ফ্রেম থেকে। 

ওয়াটারওয়র্ল্ড (১৯৯৫) :

     আগামী পৃথিবীর ডিস্টোপিয়ান ছবি। মেরু প্রদেশের বরফ গলে গিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রায় ৭৬০০ মিটার ওপরে উঠে এসেছে। সারা পৃথিবী তখন জলের ওপর ভাসতে থাকা কতকগুলো কলোনির সমষ্টি মাত্র। গল্পের প্রোটাগনিস্ট তার ‘ট্রিমারান’ জলযানে চেপে ঘুরে বেড়ায় ওই পৃথিবীতে।

 

দ্য অ্যারাইভ্যাল (১৯৯৬) :

     একদল ভিনগ্রহীরা এই পৃথিবীর আবহাওয়া তাদের গ্রহের মতো বানিয়ে দিতে চায়। তার জন্য তারা সজ্ঞানে গ্লোবাল  ওয়ার্মিং এর মাধ্যমে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে।


আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (২০০১):

     ২২ শতকের পৃথিবী যার আবহাওয়ার একটা আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। নিউইয়র্ক শহরে প্রায় বন্যার মতো পরিস্থিতি। এই সার্বিক জৈব বৈচিত্র্যে ঘটে গেছে এক বিরাট পরির্বতন যার জায়গা নিতে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বা।

দ্য ডে আফটার টুমরো (২০০৪) :

     ইংরেজী ক্লাই-ফাই ছায়াছবির ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থেই একটা ইপক বা দিকচিহ্ন হয়ে আছে এই চলচ্চিত্র। এক আকস্মিক ‘থার্মোহেলাইন সার্কুলেশন’ এর ফলে বিরাট পরিবর্তন আসে পৃথিবীর আবহমণ্ডলে। এক নতুন ‘তুষার যুগ’  শুরু হয় আগামী পৃথিবীতে, যেখানে মানুষ এবং সামগ্রিক জীব জগতের অস্তিত্ব ভয়ঙ্করভাবে বিপন্ন। 

চিলড্রেন অফ মেন (২০০৬) :

প্রখ্যাত ব্রিটিশ থ্রিলার লেখিকা পি ডি জেমসের উপন্যাস অবলম্বনে এই সিনেমার গল্প আগামী এক ডিস্টোপিক ছবি। পরিবেশের সামগ্রিক অবনমনের ফল যখন বিষময় হয়ে মানুষের শরীরে ঢুকে গেছে। মিউটেশনের ফলে মানুষ আর প্রজননক্ষম নেই। গল্পের নায়ক আপ্রাণ চেষ্টা করে বাঁচাতে চায় মানব প্রজাতির শেষ নারীকে যে প্রায় আশ্চর্যজনক ভাবে সেই সময়েও সন্তানের জন্ম দিতে সক্ষম।  

স্নোপিয়ার্সার (২০১৪) :

     আগামী পৃথিবীর এক ভয়াবহ ছবি যখন আবহাওয়া পরিবর্তনের উদ্দ্যেশে করা এক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বিফল হয়ে অধিকাংশ মানুষের প্রাণহানি ঘটায়। মুষ্টিমেয় শেষ কজন মানুষ তখন স্নোপিয়ার্সার নামে এক ট্রেনের যাত্রী যা শুধু সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায় দিশাহীনভাবে। ওই মানব প্রজাতির শেষ বংশধরদের মধ্যেও নতুন করে জন্ম নেয় শ্রেণী বৈষম্য।

     নিকোলোডিয়ানের সময় থেকেই চলচ্চিত্র এক সস্তা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে সাধারণ মানুষকে আনন্দ দিয়ে এসেছে হয়তো জীবনের জটিলতা থেকে কিছুটা দূরে এক মায়া দর্পণের ছবি দেখিয়ে। কিন্তু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন বহু উল্লেখ্য সৃষ্টি হয়েছে যা মানবাত্মার জাগ্রত বিবেক হয়ে প্রশ্ন তুলেছে এই সমাজের নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে। একবিংশ শতকের কাছাকাছি সময় থেকেই সেই দায়িত্ব কিছুটা পালন করেছে এই ধরণের ক্লাই-ফাই সিনেমা। অনিয়ন্ত্রিত লোভের সামগ্রী হিসেবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পরিবেশের যে সামগ্রিক ধ্বংস চালিয়েছি আমরা, এই তথাকথিত শ্রেষ্ঠ জীবের দল, তার আয়না হয়ে সে দেখাতে চেয়েছে আসন্ন হনন কালের প্রতিচ্ছবি যা থেকে আমরা যেন দিশা খুঁজে ঘুরে দাঁড়াই এক ‘অনন্ত আগামী’-র দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!