গোল্ডেন এজ সায়েন্স ফিকশন – আইজাক আসিমভ

অনুবাদ - সন্তু বাগ

অলংকরণ:ইন্টারনেট

১৯৩৮ সালটা সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। ১৯২৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল কল্পবিজ্ঞান ম্যাগাজিন গার্নসব্যাকের অ্যামেজিং। তারপর থেকে এত ভালো সময় আর আসেনি।

     ১৯৩৭ সালে অ্যাস্টাউন্ডিং স্টোরিজের পুরোনো সম্পাদক মিস্টার ওরলিন ম্যাগাজিনের দায়িত্ব ছাড়লেন। সম্পাদক হলেন জন ক্যাম্পবেল জুনিয়র। এতদিনে পাঠককুল কল্পবিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত আবিষ্কার করল।  যে ধরণের গল্প জন ক্যাম্পবেল মনোনীত করতেন আর ছাপতেন সেগুলো এক বিশাল পার্থক্য তৈরি করল কল্পবিজ্ঞানের জগতে। ক্যাম্পবেলিয় গল্প নামে এক ঘরানাই তৈরি হয়ে গেল ।

     আগে যারা কল্পবিজ্ঞান লিখতেন, তাঁরা মূলত ছিলেন পাল্প রাইটার, অথবা সেইরকম ধ্যানধারণা থেকেই তাঁরা লিখতেন। হ্যাঁ, কথাগুলো হয়তো একটু অপমানজনকই শোনাচ্ছে, কিন্তু এটা তো সত্যিই যে একদল লেখক যাঁরা পাল্প ম্যাগাজিনে লিখতেন, তাঁরা হেন বিষয় নেই যাতে লিখতেন না। ওয়েস্টার্ন রোমান্স, ডিটেকটিভ গল্প, জঙ্গলের গল্প, অ্যাডভেঞ্চার গল্প, সমুদ্রের গল্প, যুদ্ধের গল্প আর সেইসঙ্গে কল্পবিজ্ঞানও।

     হ্যাঁ, জীবনধারণের জন্য ওঁরা ওই উপরোক্ত বিষয়গুলোয় গল্প রচনা করতেন, এবং অজস্র গল্প লিখতেন। আর যাতে করে আরও অজস্র গল্প লেখা যায়, তাই তাঁরা বিভিন্ন জঁরের গল্প লিখতেন। যথারীতি কল্পবিজ্ঞানও লিখেতেন। এর ফলেই কল্পবিজ্ঞান এত অ্যাডভেঞ্চারপ্রবণ হয়ে উঠেছিল। অবশ্যই সেইসব লেখকরা বিজ্ঞান খুব একটা জানতেন না। তাঁদের জ্ঞান বিজ্ঞানের চৌহদ্দী ছিল ওই সানডে সাপ্লিমেন্টেস-এর পাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ক্যাম্পবেল এই পুরো ব্যাপারটাকেই পরিবর্তন করেছিলেন। ক্যাম্পবেল নিজে ছিলেন MIT-র ছাত্র। ডিউক ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পাশ করেছিলেন, এবং চিন্তাভাবনায় ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ারের মতোই।    

     তিনি চাইতেন, যাঁরা কল্পবিজ্ঞান লিখবে তাঁরা যেন তাঁদের গল্পে বিজ্ঞানটাকে একেবারে গাছে না তুলে দিয়ে, খানিকটা অন্তত বাস্তব প্রয়োগ করেন। গাছে তুলে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তাঁরা কল্পনায় মহাকাশ ভ্রমণে যেতে পারবেন না, অথবা অনাবিষ্কৃত কিছু আবিষ্কার করে ফেলবেন না। এখানে বাস্তব প্রয়োগের মানে হচ্ছে যারা বিজ্ঞান নিয়ে সামান্য পড়াশুনা করেছেন বা বিজ্ঞান জগতে কাজ করেন, তারাও যেন সেই গল্পের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করতে পারেন। গল্পের বিজ্ঞানীরা যেন বাস্তবের বিজ্ঞানীর মতোই খানিক আচার ব্যবহার করেন। একটা ইঞ্জিনিয়ার চরিত্র যেন সত্যিকারের ইঞ্জিনিয়ারের মতোই হয় — ছোট করে বলতে গেলে গল্পের মাধ্যমে বিজ্ঞানের অন্দরমহলটাকে সঠিক রূপে ফুটিয়ে তোলা।

     ক্যাম্পবেল যা করলেন, তিনি সবাইকে একসঙ্গে করে একটা বিশাল কল্পবিজ্ঞানের পৃথিবী তৈরি করলেন। অবশ্যই সবাই ক্যাম্পবেলের পৃথিবীর গল্প লেখেননি। যাঁরা লেখেননি তাঁদের গল্পগুলোও এমন কিছু আহামরি হয়ে ওঠেনি। কিন্তু যাঁরা লিখেছিলেন, তাঁরা একসঙ্গে তৈরি করেছিলেন এক নতুন সভ্যতার। কম্পিউটারের সভ্যতা, মহাকাশ ভ্রমণের সংস্কৃতি, মিসাইল ইত্যাদির মিশ্রিত এক বিশাল কল্পবিজ্ঞান জগৎ; যে জগতের সংস্কৃতির জন্যে অবশ্যই বিজ্ঞানটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মধ্যে যাঁরা ওই স্বর্ণালী সময়টাকে তৈরি করেছে, তাঁদের জন্যে আজও আমরা কল্পবিজ্ঞানের এই মায়াবী জগতে থাকতে পারি। এই একটা ব্যাপার ক্যাম্পবেলের সায়েন্স ফিকশন অত্যন্ত ভালোভাবে তৈরি করে দিয়ে গেছেন।

     ৪০ দশকের শেষের দিকে এবং ৫০-এর দশকের শুরুর দিকে, প্রকাশকরা ক্রমে কল্পবিজ্ঞানের উপন্যাস প্রকাশে আগ্রহী হলেন। ম্যাগাজিন আর পেপারব্যাকের নরম বাঁধাই ছেড়ে কল্পবিজ্ঞান উঠে এল বইয়ের শক্ত মোড়কে। অবশ্য অনেক নতুন ম্যাগাজিনও উঠে এল। এরকমই একটা ম্যাগাজিন হল, ‘ফ্যান্টাসি এবং সায়েন্স ফিকশন’। শুরু হয়েছিল ১৯৪৯। অন্য একটা হল ‘গ্যালাক্সি সায়েন্স ফিকশন’, এটা শুরু হয়েছিল ১৯৫০ সাল নাগাদ। প্রথমটার সম্পাদক ছিলেন অ্যান্থনি বাউচার আর জে ফ্রান্সিস ম্যাককোমা। আর দ্বিতীয়টি ছিল এইচ এল গোল্ডের সম্পাদিত। এই দুটোই ক্যাম্পবেলের অ্যাস্টাউন্ডিং-এর থেকে আলাদা পথে হাঁটা শুরু করেছিল। ফ্যান্টাসি আর সাইফাই ম্যাগাজিনগুলো অবশ্যই সাহিত্যের গুণমান আর ভাষাশৈলীর উপরে যথেষ্ট জোর দিত। অবশ্য নামকরণের মধ্যে ফ্যান্টাসি কথাটার ব্যবহার বুঝিয়ে দিত যে তাঁরা হার্ড সায়েন্স ফিকশনে একটু কমই আগ্রহী।  

     এরপরে আবারও একবার বিজ্ঞানীদের থেকে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু সরে গেল সমাজের দিকে। না, অ্যাডভেঞ্চারাস হিরোদের দিকে ফিরে যায়নি—এবার সরে এল সামাজিক মানবিক দিকে। কল্পবিজ্ঞান গল্পগুলো ক্রমে আরও বেশি সামাজিকতা পূর্ণ হয়ে উঠল। তাই ক্যাম্পবেলের অ্যাস্টাউন্ডিং, ওই সময় কল্পবিজ্ঞান গল্প প্রকাশে যার ধারেকাছে কেউ যেতে পারত না, আর মোটেই বিরোধীবিহীন থাকতে পারল না।

     একটা কল্পবিজ্ঞানের পত্রিকা শুধুই যে কল্পগল্পের খনি তাই নয়, এটা নতুন নতুন চিন্তাভাবনার কল্পবিজ্ঞান লেখকদের চড়ে বেড়াবার একটা স্থানও বটে। একটা মাসিক পত্রিকা, যাতে অন্তত চার-পাঁচটা ছোট গল্প থাকে প্রতি সংখ্যায়। এরকম পত্রিকা যে শুধু নতুন লেখকদের চিন্তাভাবনাকে প্রকাশ করার ক্ষেত্র দেয় তা নয়, এর সঙ্গে অনুশীলন করে করে নিজের পথটাকে খুঁজে নেওয়ারও সুযোগ দেয়।

     এর সঙ্গে আরও একটা কথা বলা যায়। ১৯৬০-এর পর থেকে বিভিন্ন প্রকাশনী কল্পবিজ্ঞানের ম্যাগাজিন আর বই বার করছে। সংখ্যাটা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি টিভিতেও কল্পবিজ্ঞান জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ওগুলোর মধ্যে বেস্ট কোনটা জিজ্ঞেস করলে আমি বলব অবশ্যই স্টার ট্রেক। তিন তিনটে সিজন ধরে জনপ্রিয়তা শুধু বেড়েইছে, কমেনি। অবশ্য তাঁদের অনন্তকালের জন্য ধরে রাখা যাবে না। কিন্তু পত্রিকার পাঠকের তুলনায় সংখ্যাটা যথেষ্ট বেশি। অবশ্য এই ব্যাপারটা ম্যাগাজিনগুলোকে শক্ত প্রতিযোগীতার সামনে আসতে বাধ্য করেছে।  এখন হার্ড কভার কিংবা সফট কভারে বিভিন্ন মৌলিক সায়েন্স ফিকশন সংকলনও প্রচুর প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। এগুলোও এইসব কল্পবিজ্ঞান ম্যাগাজিনগুলির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।  উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ডেমন নাইট সম্পাদিত ‘অরবিট’ সায়েন্স ফিকশন সংকলনের কথা, এখানে নতুন নতুন মৌলিক সায়েন্স ফিকশন গল্প বই আকারে প্রকাশিত হয়। অবশ্য যাই হোক না কেন, কল্পবিজ্ঞান লেখকদের শিক্ষার জন্য এগুলি খুবই দরকারি ছিল। 

 

তথ্যসূত্র – ১৯৭২ সালে আইজাক আসিমভের সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া তথ্য অনুসারে লিখিত। 

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!