গ্রন্থ পরিচিতি – এ সব আগামীকাল ঘটেছিল

রচনা  : অরুন্ধতী সিংহ রায়

অলঙ্করণ :

বইঃ এ সব আগামীকাল ঘটেছিল

সম্পাদকঃ বাল ফোণ্ডকে  

প্রচ্ছদঃ সুবীর রায় 

অনুবাদকঃ নবারুণ ভট্টাচার্য 

প্রকাশকঃ ন্যাশানাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া 

প্রথম সংস্করনঃ ১৯৯৬  

পরিচায়কঃ অরুন্ধতী সিনহা রয়  

সায়েন্স ফিক্‌শনের গল্প বলতে এখনও অধিকাংশ বাঙালি পাঠককুল বোঝে H.G.Wells, Edgar Allen Poe অথবা Jules Verne। বাংলা ভাষায় প্রথম সায়েন্স ফিক্‌শন গল্প লেখার সূত্রধর আচার্য জগদীশ চন্দ্র বোস হলেও বর্তমান বাংলা সাহিত্যের তথাকথিত mainstream-এর মধ্যে কল্পবিজ্ঞান এখনও পড়ে না। উৎসাহী পাঠকগণ সায়েন্স ফিক্‌শন বলতে অনেক ক্ষেত্রেই পাশ্চাত্যের অনুবাদ সাহিত্যগুলোকেই মনে করেন। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের উদ্যোগে ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ কল্পবিজ্ঞানের গল্পগুলির একত্রিত প্রকাশ, নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। বাল ফোণ্ডকের মত গুণী মানুষের নিপুণতা সম্পাদনায় “এ সব আগামীকাল ঘটেছিল” নামক উনিশটি সায়েন্স ফিক্‌শন গল্পের সঙ্কলনটি সত্যিই অনবদ্য। বইটিতে মারাঠি ভাষার বেশ কিছু বাছাই করা গল্প স্থান পেয়েছে। এছাড়াও অন্য প্রাদেশিক ভাষা কন্নড়, এমনকি বাংলা ভাষায় লেখাও আছে। তবে এই বইটি পড়ে একটি কথা নির্বিবাদে মেনে নেওয়া যায় – ভারতীয় ভাষাগুলির মধ্যে এখনও অবধি কল্পবিজ্ঞানের গল্পের সর্বাধিক পরিণতি ও বিকাশ ঘটেছে মারাঠি ভাষার লেখকদের হাত ধরেই। বই-এর শুরুতে একাধারে লেখক ও সম্পাদক বাল ফোণ্ডকের লেখা ভূমিকাটি অনন্যসাধারণ – কীভাবে কল্পবিজ্ঞান শাখাটির উৎপত্তি বিশ্বসাহিত্যের দরবারে, কীভাবে তার ধাপে ধাপে বিবর্তন ঘটেছে সবই জানা যায়। লেখকের মননশীল লেখনীর পরিধি থেকে বাদ পরেনি ভারতের সাহিত্য জগতে কল্পবিজ্ঞানের পথ চলা ও প্রসারের কথা। 

     বইটিতে বিভিন্ন গল্পগুলির মধ্যে পারম্পর্যও চোখে পড়ার মত। একটার পর একটা গল্প পড়ার মধ্যে দিয়ে যেন উন্মোচিত হয় ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানের জয়যাত্রার কথা। কিছু সায়েন্স ফিক্‌শন পড়লে এখনও কিঞ্চিত অবাস্তব বলে মনে হয়, আদৌ কি সম্ভব এসব? বর্তমানে বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি ঘটছে, দেশে বিদেশে রোবটিক্স-এর উন্নতি আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করায় যে এই হিউম্যানয়েডরা একদিন প্রকৃতভাবেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠবে। আমাদের সাথে কাজ করবে প্রতি ক্ষেত্রে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। নিরঞ্জন এস ঘাটে, অরুণ মাণ্ডে, দেবেন্দ্র মেওয়ারির গল্পে প্রতিফলিত হয়েছে এই ভাবধারার কথা এবং কোন সময়েই তাকে আজগুবি বা অদ্ভুত বলা চলে না। বরং অনুমান করা যায় এই দিন আর বেশি দেরি নেই।

     চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্ভবপর করেছে মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিস্থাপন। কিন্তু মানুষের স্মৃতিও কি সেই একই পথে চলে? এক মৃতপ্রায় জওয়ানের শেষ অভিযানের তথ্য খুব দরকার আর্মির। শরীরের কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গই কাজ করছে না তাঁর – কিন্তু এখনও brain death ঘটেনি। সেই সময়ে পরীক্ষামূলক ভাবেই আর্মির ডাক্তার কর্নেল জামখেদকার ওই জওয়ানের ব্রেনের স্মৃতিবাহী RNA প্রবেশ করান আর এক সুস্থ সবল জওয়ানের মস্তিষ্কে। এই পরীক্ষার প্রতিক্রিয়া কি হয় জানা যায় বাল ফোণ্ডকের “প্রতারক” গল্পের একদম শেষ পর্যায়ে। লক্ষণ লনধের “দ্বিতীয় আইনস্টাইন”, অরবিন্দ মিশ্রের “পোষ্যপুত্র” গল্প দুটি আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমনই অভাবনীয় দিগন্তের কথা বলে। অনেক ইংরেজি সায়েন্স ফিকশন গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ টাইম ট্রাভেল। বাংলা ও মারাঠি সাহিত্যেও উঠে এসেছে এই টাইম ট্রাভেল। “সময়” ও “লিফট” দুটি গল্পেই আছে কাল ভ্রমণের কথা। একটায় বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে গিয়ে অতীতকে বদলে দেবার প্রচেষ্টা; অন্যটায় অতীত ভ্রমণ করে বর্তমানের কার্যসিদ্ধির জন্য। একদিকে সমষ্টিগত উন্নতি অন্যদিকে ব্যক্তিগত স্বার্থ। 

     সবকিছুরই একটা খারাপ দিক থাকে। বিজ্ঞানের এই অগ্রগতিও তার কালো ছায়া ফেলে মানুষের জীবনে, এমনকি পরিবেশের ওপরও। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ক্ষতিকারক হয়। “তুষার যুগ আসছে”, “বৃষ্টি”, “অন্ধকারের বুক বেয়ে” ও “শুক্রগ্রহ লক্ষ্য করছে” গল্পগুলির প্রধান উপজীব্যই হল পরিবেশের সঙ্কট। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে বিজ্ঞানের অগ্রগতির অভিশাপের কথা। অন্ধকারের বুক বেয়ে গল্পটিতে খানিকটা অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডাইরির আদল পাওয়া যায়। 

     পরিশেষে আসি এই সঙ্কলনের সবচেয়ে ভিন্নধর্মী দুটি গল্পে – দেবব্রত দাসের “ঈশ্বরের মুখোমুখি” ও নিরঞ্জন সিংহের “উত্তরণ”। প্রথম গল্পটিতে বিজ্ঞানীপ্রবর কৃত্রিম ভাবে ল্যাবরেটারিতে জন্ম দেন এক রূপসী মেয়ের। বিরহী পুত্রের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে। কিন্তু কোথাও না কোথাও সেই মানবী, পুত্রের প্রেমিকা কবিতা হলেও ঠিক কবিতা হয়ে উঠতে পারল না। দ্বিতীয় গল্পে এইচ এলেভেন মডেল জানায় এক ভয়ংকর দাবী – রোবটকে মানুষ হিসেবে মেনে নিতে হবে। বিজ্ঞানী চ্যাটারজির বুদ্ধিমত্তার জোরে এড়ানো যায় বিদ্রোহের পরিস্থিতি। তবে দুটি ক্ষেত্রেই একটা জিনিস বোঝা যায় – স্রষ্টাকে সৃষ্টি কখনওই অতিক্রম করতে পারে না। তার পরিণাম হতে পারে বিধ্বংসী। 

     বর্তমানে গল্প, সিনেমা সবক্ষেত্রেই কল্পবিজ্ঞানের অবাধ গতি। Science fiction যেন এইটাই বলতে চায় “Truth is stranger than fiction” বিজ্ঞানের অগ্রগতি একদিন এই ফিক্‌শনকে বাস্তবে পরিণত করবে। বাংলা ভাষায় অনুদিত সাহিত্য মানেই ইংরেজি, রুশ ইত্যাদি ভাষার সাহিত্য। কিন্তু কেন বাদ পড়ে যায় ভারতের প্রাদেশিক ভাষাগুলি? বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা বিশেষত মারাঠি ভাষার কল্পবিজ্ঞানের গল্পগুলির অনুবাদ হলে বাংলা ভাষাও এক সমৃদ্ধ সাহিত্য ধারার স্বাদ গ্রহণ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!