গ্রন্থ পরিচিতি – বনদেবী ও পাঁচটি পায়রা

রচনা  : অরুন্ধতী সিনহা রয়

অলঙ্করণ :

বইঃ বনদেবী ও পাঁচটি পায়রা

লেখকঃ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

প্রচ্ছদঃ সমীর সরকার 

প্রকাশকঃ আনন্দ

প্রথম সংস্করনঃ জানুয়ারী ২০১৩ 

পরিচায়কঃ অরুন্ধতী সিনহা রয়  

বর্তমান মানব সভ্যতা ধীরে ধীরে অনেকটাই যন্ত্রনির্ভর হয়ে উঠেছে। জীবনের প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমবর্ধমান। যেভাবে যান্ত্রিকতা ধীরে ধীরে আমাদের গ্রাস করছে, কি হবে আমাদের অবস্থা আজ থেকে প্রায় তিনশ বছর পরে? এমনই এক যুগের কথা উঠে এসেছে “বনদেবী ও পাঁচটি পায়রা” উপন্যাসে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞ লেখনী ধরে।

     ২৩১৭ সাল। পৃথিবী দুটি সমাজে বিভক্ত: নব নির্মাণ ও নিচা নগর। নব নির্মাণ এক অতি উন্নত শহর। সেখানকার বাসিন্দাদের জীবন ধারণের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের উপস্থিতি। মানুষের জীবন ব্যতীত অধিকাংশ জিনিসই কৃত্রিম সেখানে। প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি মানুষের মাথার ওপর আছে “গোয়েন্দা পোকা”-র নিশ্ছিদ্র পাহারা। জীবনের প্রতিমুহূর্তের গতিবিধি পর্যবেক্ষিত হচ্ছে। তার সাথে আছে জীবনে ধারণের সবকিছুরই অত্যাধুনিক ব্যবস্থা। আর একদিকে আছে – নিচা নগর। সেখানে এখনও পুরনো পৃথিবী বেঁচে আছে … মানুষে মানুষে যোগাযোগ আছে, বনভূমি আছে, একজন কপালগুনে ভুতেরও দেখা পায়। নব নির্মাণ ও নিচা নগরের পার্থক্যটা বৈভবের নয়, বুদ্ধিমত্তার।   

     উনিশ বছরের এক নারী, রিক্তা বাস করে নব নির্মাণে। সে চাকরি ও করে সেখানে। আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধায় লালিত। অন্যদিকে আছে প্রণাম, যে নব নির্মাণের মেন অবজারভেটরি কাজ করলেও থাকার জন্য বেছে নেয় নিচা নগরকে। এমনকি সে আই এম ভ্যাকসিন নিতেও রাজি নয়। সে ছবি আঁকতে ভালবাসে, কিন্তু কারুর জন্য নয় সেই ছবিগুলো, নিজের জন্য। সারাদিনে সে যা আঁকে দিনের শেষে একটা মপ দিয়ে সেটা আবার মুছে দেয়। অনেকটাই বিপরীত ধর্মী দুই ব্যক্তি। নিচা নগরে আরও দুজন অদ্ভুত ধরনের লোক আছে, তাদের একজন হল জাগ্রত আর একজন হল ভাঁড়ু দত্ত। নিচা নগরের দক্ষিণে যে বনভূমি আছে, তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জাগ্রতের। আর নিচা নগরের বাজারে আছে ভাঁড়ু দত্তের পুরনো জিনিসের দোকান। ভাঁড়ু এক আজব লোক, সে আগে থাকত নব নির্মাণে, পরে সে সব ছেড়ে এসে থাকে নিচা নগরে। এই দুজনের সাথেই আলাপ রয়েছে প্রণামের। জাগ্রত ও ভাঁড়ু দত্তের অদ্ভুত স্বভাবই তাকে আকৃষ্ট করে।

     এহেন রিক্তার সাথে একদিন হাই-স্কাইতে দেখা হয়ে যায় জবার। কিন্তু জবা রিক্তাকে বলে সে জবা নয় পূর্ণা। সে সব মনে করতে পারে যে তার নাম পূর্ণা, পূর্ণার ঠিকানা সবকিছু। কিন্তু পঞ্চকের অফিসও তাকে বলে যে সে জবা, পূর্ণা নয়। এই আত্মপরিচয়ের সমস্যা তার ছ’মাস ধরে। এই সমস্যার শুরু এক প্রেমের গল্প দিয়ে। রিক্তা শুনে অবাক হয়ে যায়, প্রেম তো অনেক পুরনো দিনের ব্যাপার! সেসব এখন আর হয় নাকি? কিন্তু পূর্ণা প্রথমে প্রেম নিবেদন করেছিল তার যন্ত্রমানবকে। তারপর তার সাথে পরিচয় হয় এক সবুজ মানুষের। সবুজ মানুষেরা থাকে এই নব নির্মাণ ও নিচা নগর থেকে অনেক দূরে,  নিচের জঙ্গলে, তাদের আলাদা শহরে। প্রথমে সেই হি-ম্যানকে যখন পূর্ণা প্রেম নিবেদন করে তখন সে ভয় পেয়ে যায়, হি-ম্যান ভাবে তার কাজে বোধহয় কোনও ভুল হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে পূর্ণার ভালবাসার তরঙ্গ আচ্ছন্ন করে তার যন্ত্রমস্তিষ্ককে, বিকল হয়ে পড়ে তার কোডেড প্রোগ্রাম। সে-ই সাহায্য করে পূর্ণাকে সবুজ মানুষ টংকার-এর সাথে যোগাযোগ করতে। কি হবে পূর্ণার আর বিজ্ঞান বিরোধী, রগচটা টংকার-এর ভালবাসার পরিণতি? নিচা নগরের সরকারি লঙ্গরখানায় চাকরি করে মেয়ে-রোবট পৃথা। যন্ত্রমানবী হলেও সে একটু আলাদা রকমের, নিজের রুটিন মাফিক চলতে চলতে একদিন বাঁধন ছেঁড়ে সে, প্রেম নিবেদন করে বসে প্রণামকে। সেও হকচকিয়ে যায়। যন্ত্রমানবীরও অনুভূতি আছে? কয়েকদিন বাদে আবার যখন প্রণাম লঙ্গরখানায় যায় তখন আর পৃথাকে দেখতে পায় না! কোথায়ে গেল সে? প্রণাম কি আর কখন খুঁজে পাবে পৃথাকে?

     এতসব যান্ত্রিকতার মধ্যেও রিক্তা নিজের মনের মত একটা ছোট বাগান বানিয়েছে তার বাড়ীর বারান্দায়ে। আর আছে তার প্রিয় পায়রার খোপ। চারটে পোষা পায়রার জন্য। একদিন হটাৎ পাঁচ নম্বর একটি পায়রা আসে তার কাছে। তার পায়ে বাঁধা আছে একটা চিঠি। চিঠি প্রেরক অনুরোধ করেছে এই চিঠি যেন পূর্ণাকে পৌঁছে দেওয়া হয়। সাথে লেখা আছে “কিন্তু খুব সাবধান”। সেদিন রিক্তা এও জানতে পারে যেহেতু সে নারী হয়েও নারীত্ব অনুভাব করে না, তাই তার মত দেখতে অনেক যন্ত্রমানবী ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক নিরাপত্তাহীনতা ঘিরে ধরে তাকে। সে জানতে পারে পৃথার কথা যাকে নাকি হুবহু তার মত দেখতে। পূর্ণাকে চিঠি পৌছতে গিয়ে রিক্তার দেখা হয় জাগ্রতের সাথে। সে বলে রিক্তা নাকি বনদেবী। তাহলে আসলে কে এই রিক্তা? রিক্তা, জাগ্রত, পূর্ণা কি কোনও ভাবে একে অপরের সাথে জড়িত? কি সেই যোগসূত্র?  জাগ্রত গোপনে এক ভূর্জপত্র দেয় প্রণামকে। কিসের জন্য এই গোপনীয়তা? সে কাগজে আছে দুশ বছর আগের এক বিজ্ঞানী কাহ্নর কথা, যার মূর্তি এখন দিকে দিকে প্রতিষ্ঠিত। কি জানাতে চায় জাগ্রত প্রণামকে কাহ্ন চরিতের সূত্র দিয়ে?

     আপাতভাবে এই উপন্যাস কল্পবিজ্ঞানের গল্প হলেও মানুষের কিছু চিরাচারিত প্রকৃতি বারবার উঠে এসেছে। যান্ত্রিকতার মাঝে থেকেও প্রণাম একাত্মবোধ করে বনভূমির সাথে, মনের শান্তির জন্য ছবি আঁকে। রিক্তাও বনভুমিতে ঘুরতে ঘুরতে স্বস্তি ফিরে পায়। ভাঁড়ু দত্ত নিজে আজীবন নব নির্মাণের কৃত্রিমতার মধ্যে থেকেও প্রেম-ভালবাসার একনিষ্ঠ সমর্থক।

     বিজ্ঞান ও তার প্রসার একান্ত প্রয়োজন মানব সভ্যতার অগ্রগতির জন্য। কিন্তু এটা কখনই কাম্য নয় যে সেই বিজ্ঞানই মানবজীবনকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে। বিজ্ঞান মানুষের দাস হোক, এটাই উচিত, মানুষ বিজ্ঞানের দাস হয়ে পড়লে তার পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে। বিজ্ঞান যখন অতিবিজ্ঞানে পরিণত হয়, তখন কিছু শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ, যারা মানব সমাজের ভাল চায়, তারাই হয়ে ওঠে সবুজ মানুষ।         

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *