গ্রন্থ সমালোচনা – থ্রি-বডি সিরিজ-সিক্সিন লিউ

লেখক – গোপাল কৃষ্ণ বর্মণ

উপন্যাসদ্য থ্রি বডি প্রবলেম 

লেখক – সিক্সিন লিউ

জঁরসায়েন্স ফিকশন 

উপন্যাসটি ২০১৫ সালে হিউগো পুরষ্কার পেয়েছিল। 

 

উপন্যাসদ্য ডার্ক ফরেস্ট

লেখক – সিক্সিন লিউ

জঁরসায়েন্স ফিকশন 

 

উপন্যাসডেথ’স এন্ড

লেখক – সিক্সিন লিউ

জঁরসায়েন্স ফিকশন 

ঠাৎ করেই হাতে পেলাম এই থ্রি-বডি সিরিজ। সময় লাগলো পড়তে। তিনটে বই – তিনটেরই আয়তন বেশ ভালো।

     সাধারণ ভাবে দেখা যায় যে কল্পবিজ্ঞান মানে, হয় পৃথিবীর বুকে ভয়ংকর ভিনগ্রহী বা এলিয়েন আক্রমণ, নয় মহাকাশ অভিযানে আচম্বিতে বিপদ, মুখোমুখি কদাকার এলিয়েন, আর তার থেকে মুক্তি। আবার এর মধ্যেই আমরা পেয়েছি বিজ্ঞান-প্রসাদের পূর্বাভাস – প্রকৃত আবির্ভাবের বহু পূর্বেই – সাবমেরিন, রকেট প্রপালসন ইত্যাদি, ইত্যাদি। পেয়েছি রোবটিক্সের “ধ্রবক–তিন সূত্র” – আসিমভের মাধ্যমে।

     তা সত্বেও কল্পবিজ্ঞান কিন্তু গল্পই – বিজ্ঞান নয় পুরোপুরি। কল্পনাই বেশি। যদিও সেই কল্পনা সাধারণত দাঁড়িয়ে থাকে মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সর্বশেষ ফলাফল বা তার ভিত্তির উপর।

     সমকালীন পদার্থবিজ্ঞান অত্যন্ত জটিল। শুধুমাত্র জটিল নয়, এর তত্ত্বগুলো গড়-ব্যক্তির দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। যখন একটা সঠিক ব্যাখ্যা আর উদাহরণ দেওয়া হয়, এমনকি একজন সাধারণ-শিক্ষিত ব্যক্তিও নিউটনের গতি-সূত্রের তিনটি নিয়মই বুঝতে পারে অনায়াসে, কিন্তু বিশেষ আপেক্ষিকতা বুঝতে হলে অন্ততঃ মাঝারি মানের গণিত শিক্ষার প্রয়োজন। আর সমকালীন পদার্থবিজ্ঞানের অগ্রগতির তত্ত্বগুলো বোঝা সাধারণ ব্যক্তির পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

     আমার কল্পবিজ্ঞান পড়া শুরু সেই কোন ছোটবেলায় আনন্দমেলার পাতায় প্রোফেসর শঙ্কুর হাত ধরে। তারপর অদ্রীশ বর্ধন, জুল ভের্ণ, প্রেমেন্দ্র মিত্র হয়ে আইজাক আসিমভ, আর্থার সি ক্লার্ক পর্যন্ত। এ পথে এতদিন আমার সেরা ছিল আসিমভের ‘ফাউন্ডেশন’ সিরিজ।

     ফাউন্ডেশন সিরিজে মানুষ পৃথিবী ত্যাগ করে ছড়িয়ে পড়ছে গ্যালাক্সিতে, বানিয়ে নিচ্ছে গ্যালাকটিক সাম্রাজ্য। তবে গোটা সৌরমন্ডল, বা তা ছাড়িয়ে গোটা মহাবিশ্বে (Universe) অন্য প্রাণের কিন্তু দেখা নেই। সিরিজ শেষ হচ্ছে পুনরায় মানুষের পৃথিবী আবিষ্কারের মধ্যে – মানবতার পুনর্জীবন-এই শেষ ফাউন্ডেশন সিরিজ।

     Three Body Problem, Dark Forest and Death’s End – এই তিনটে বই মিলিয়ে একটা সিরিজ। লেখক সিক্সিন লিউ (Cixin Liu)। ইতিহাসে এর আগে হিউয়েন সাং পড়েছিলাম, মানে ওঁর সম্বন্ধে, ওঁর ভারত ভ্রমণ আর ওঁর দেখা তৎকালীন ভারতবর্ষের সম্বন্ধে পড়েছিলাম। তারপর এই প্রথম কোনও চৈনিকের লেখা পড়লাম, এবারও, যদিও অনুবাদই মাধ্যম রইল।

     আসিমভের ‘ফাউন্ডেশন’ সিরিজ যেমন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখায় মানব সমাজের অন্তর্নিহিত লড়াই আর সেই লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে মানবতার এগিয়ে যাওয়া এবং জয়, যেভাবে ইতিহাস এগিয়ে গিয়েছে প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত, ঠিক সেভাবেই ভবিষ্যত যুগেও মানবসমাজ তার ভিতর এবং বাইরে দুদিকের লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে মানবতাকে জয়ী করবে এবং আমাদের এই সৌরজগত আর তার বাইরে বিস্তারিত এই গোটা মহাবিশ্ব, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বাঁচিয়ে রাখবে।

     ‘Three-Body’ সিরিজে আমরা দেখি মানবতার প্রধান লড়াই বহির্জগতের সঙ্গে। ‘ফাউন্ডেশন’ সিরিজের বিপরীতে এই ‘Three-Body’ সিরিজে আমরা জানতে পারি, এই গোটা মহাবিশ্বে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে, গিজগিজ করছে অসংখ্য প্রাণী-প্রজাতি। আর মানুষকে লড়তে হচ্ছে তাদের‌ই বিরুদ্ধে যাতে এই মানবপ্রজাতিকে টিকিয়ে রাখা যায়।

     শেষ পর্যন্ত এই লড়াইয়ে কে এবং কী টিকবে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের, এই মহাবিশ্বেরই বা কী হবে, তা জানা যাবে না এই সিরিজের শেষ ব‌ই ‘Death’s End’-এর শেষ অনুচ্ছেদের আগে।

     সিরিজের প্রথম বই ‘থ্রিবডি প্রবলেম’ শুরু হয় চৈনিক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সমকালীন সময়ের সুতো ধরে, যা গল্পের প্রয়োজনীয় ব্যাকগ্রাউন্ড প্রদান করে। সিক্সিন লিউ বলতে শুরু করেন তার কাহিনি এমন একজন নায়ককে নিয়ে যিনি মানবতার এবং মানবপ্রকৃতির সব আশা ছেড়ে দিয়েছেন। ‘থ্রি-বডি প্রবলেম’ এর আখ্যানে বেশ অনেকগুলো উপাদান রয়েছে যা চীন দেশের সমাজের অংশ এবং গল্পের অধিকাংশ মানুষ চীনা।

     সিক্সিন লিউ তাঁর 2006 Hugo Award-জেতা ব‌ই ‘The Three-Body Problem’-এ জানালেন এক প্রথম সংযোগের ঘটনা যেখানে এক চৈনিক মহাকাশ বিজ্ঞানী (radio astronomer) ইয়ে ওয়েনজি (Ye Wenjie) আবিষ্কার করলেন এক নতুন প্রজাতি – Trisolarians, যাদের নিজস্ব বাসগ্রহ পরিভ্রমণ আর আবর্তন করছে এক অসংস্থিত কক্ষে একসঙ্গে তিনটি নক্ষত্রকে। ইয়ে ওয়েনজির এই যোগাযোগ পৃথিবীকে এগিয়ে দেবে এক ভয়ংকর বিপদের দিকে।

     শুরুতে ট্রাইসোলারানরা পৃথিবীকে সাবধান করে ওই সংযোগ এর ফলাফল নিয়ে, কিন্তু ইয়ে ওয়েনজি তা মানে না।

     ইয়ে ওয়েনজির স্মৃতিতে দগদগ করছে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় বিপ্লবীদের হাতে তাঁর পিতার মৃত্যু। প্রতিশোধ স্পৃহা কি কাজ করছিল ইয়ে ওয়েনজির মনে? যদিও ইয়ে ওয়েনজী স্বয়ং নিজেও ধারণা করতে পারেননি যে এই ট্রাইসোলারান সংযোগ পৃথিবীকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে ভবিষ্যতে!

     এরপর গল্পের ধারা এগিয়ে চলে ট্রাইসোলারানদের পৃথিবী আক্রমণের জন্য মহাকাশযান-বহর পাঠানোর মধ্যে দিয়ে আর এর মূল উদ্দেশ্য থাকে পৃথিবী অধিকার করে মানবতার নিশ্চিহ্নকরণ। এরই বিরুদ্ধে ক্রমে শুরু হয় মানবসমাজের লড়াই। একদিকে তৈরী হয় ETO (Earth Trisolaris Organization), এক অভূতপূর্ব কম্পিউটার গেমের মধ্যে দিয়ে চলে ETO-র বিস্তার, যা আমাদের মনে করিয়ে দেবে এই সময়ের ‘Blue Whale’ নামের কম্পিউটার গেমের। অন্য দিকে গড়ে ওঠে পৃথিবী-রক্ষা বাহিনী (‘PDC’ – Planetary Defense Council)।  ইয়ে ওয়েনজীকে ফিরে যেতে হয় তার জীবনের পীঠস্থান – রেড কোষ্টের ধ্বংসাবশেষের কাছে, যেখানে শুরু হয়েছিল তার বিদ্রোহ মানবতার বিরুদ্ধে। ঠিক সেইখানেই দাঁড়িয়ে শেষ মুহূর্তে তিনি অনুভব করেন নিজের এবং মানবতার শেষ সূর্যাস্ত।

     এরপর সিক্সিন লিউ আমাদের নিয়ে যান এই লড়াইয়ের দ্বিতীয় পর্ব – ‘The Dark Forest’-এ।

     সিরিজের দ্বিতীয় ব‌ই ডার্ক ফরেস্ট (Dark Forest)। এখানে লিউ সাধারণ ভাবে মহাবিশ্বকে চিহ্নিত করেছেন এক অন্ধকার অরণ্য হিসেবে। এক এমন অন্ধকার অরণ্য, যেখানে প্রচুর ‘শিকারী’ প্রজাতি গিজগিজ করছে অন্ধকারের আড়ালে। যারা অপেক্ষা করছে, সন্ধান করছে ‘শিকারের’ – এখানে শিকার আর শিকারীর পার্থক্য ক্ষীণ সুতোর মতো, যারাই অপেক্ষাকৃত দূর্বল, তারাই হবে শিকার। শিকারী প্রথম সুযোগেই তার খুঁজে পাওয়া শিকারকে মুছে দেবে এই মহাবিশ্বের বুক থেকে।

     সিক্সিন লিউ জানাচ্ছেন যে এই যুদ্ধে বুদ্ধিমানের তাই লুকিয়ে থাকাই শ্রেয়। এই ঘন অন্ধকার মহাবিশ্ব নামক অরণ্যে প্রকৃত বুদ্ধিমান প্রাণী নিজেকে রেখেছে লুকিয়ে।

     শুধু মানুষ, এক নির্বোধ শিশুর মতো লুকোচুরি খেলার এই আড়াল ছাড়িয়ে হঠাৎ একদিন চীৎকার শুরু করে ‘অহং ভো!’ আর ইয়ে ওয়েনজীর সেই যোগাযোগ পৃথিবীকে এগিয়ে দিয়েছে এক ভয়ংকর বিপদের মধ্যে।

     সিরিজের তিনটি ব‌ই জুড়ে মানব সমাজকে লিউ সাধারণ ভাবে দেখিয়েছেন রক্ষণাত্মক হিসেবে, তবে তার‌ই মধ্যে কয়েকজন – যারা কাহিনির নায়ক এবং প্রতিনায়ক – স্থির এবং দৃঢ়, যেভাবেই হোক রক্ষা করতে হবে মানব সভ্যতা।

     লুও জী (Luo Ji), এই কাহিনির প্রধান চরিত্র, যিনি তৈরী করেন এক নতুন মহাজাগতিক সমাজবিজ্ঞান (কসমিক সোসিওলজি)। যখন সবাই নিশ্চিত যে ট্রাইসোলারানরা পৃথিবী দখল করবে, যুদ্ধ হবে এবং সে যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত, তখন তিনিই সকলের সামনে জানান দেন এক নতুন পদ্ধতি।

     ডিটারান্স (deterrence), যা ভয় পাইয়ে দেয় ট্রাইসোলারানদের‌ও। এ হচ্ছে এমন এক রাস্তা যার শেষে কিছু নেই, শুধুমাত্র নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া, তবে এক্ষেত্রে শিকার আর শিকারী দুতরফেই। তাই ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায় ট্রাইসোলারানরা। আর দুপক্ষের তরফেই চালু হয় নজরদারি – এক অন্তহীন নজরদারি।

     এ যেন আণবিক বোমা। তোমার আছে, আমারও, রেখেছি নজর, তুমি মারলে আমিও মারব, বাঁচবেনা কেউ।

     শুরু হয় ঠান্ডা যুদ্ধের শান্তি পর্ব।

     Death’s End এই সিরিজের সেরা কাহিনি।

     গোটা উপন্যাস বয়ে চলেছে সময়ের এক বিশাল সরণি ধরে, এক অন্তহীন সরণি। সময় যে একটা মাত্রা, সাধারণ চতুর্থ মাত্রার একটা, গোটা উপন্যাস জুড়ে লেখক তা পরতে পরতে অনুভবে মিশিয়ে দিয়েছেন, পড়তে পড়তে আপনি যেন সেই সময়চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকবেন।

     আর তারপর হঠাৎই চমকে উঠে দেখবেন যে আপনার এতদিনের জানা ‘সময়’, একেবারেই অপরিচিত! অন্তহীন সময়-এর ধারণাটাই নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে!

     গোটা উপন্যাস জুড়ে আছে আরও যে দুটো জিনিস, যা আপনাকে অভিভূত করে রাখবে সারাক্ষণ, তার প্রথমটা হচ্ছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞান আর তার অগ্রগতি আপনাকে একের পর এক চমক দেবে, আপনি শ্বাস নেওয়ার জায়গা খুঁজবেন।

     দ্বিতীয়টা হল প্রেম। রোমান্টিক যে প্রেমের ধারা, সিক্সিন লিউ বহতা নদীর মতো এই উপন্যাসে ব‌ইয়ে দিয়েছেন তা সম্ভবত এর নিজস্বতায় একমেবাদ্বিতীয়ম্। শুধুমাত্র প্রেমের উপন্যাস হিসেবেই এটি আপনি পড়ে শুধু মুগ্ধ নয়, অবাক হয়ে ভাবতে থাকবেন যে প্রেমের এই রূপ তো আগে কখনও দেখিনি!

     সিক্সিন লিউ তার এই সিরিজের এই শেষ ব‌ইয়ে একেবারে সর্বাত্মক করে ছেড়েছেন।

     উপন্যাসের পরিধির সুযোগ নিয়ে লিউ সুতো ছড়িয়েছেন সমস্ত দিকেই। কল্পবিজ্ঞান এর যতগুলো ধারা ছিল আর যতগুলো হতে পারে, কোনও একটিও ছাড়েননি। হাইবারনেশন টেকনোলজির প্রভাব, আলোর গতি এবং মাধ‍্যাকর্ষণ বল ও তরঙ্গ – তাদের নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের প্রভাব, অ্যান্টিম্যাটার, ত্রিমাত্রিক জগৎ থেকে বেরিয়ে দ্বিমাত্রা, চৌমাত্রা, ইত্যাদি জগৎ পেরিয়ে চলে গেছেন দশ-মাত্রা বা তার‌ও বাইরে, কৃত্রিমভাবে বানিয়েছেন সমান্তরাল মহাবিশ্ব যা সসীম এবং আয়তনে নিয়ন্ত্রিত, কল্পনা করেছেন এমন শত্রু যে প্রায় – ক্রটিহীন এক ক্ষমতাধর।

     লিউ তার এই উপন্যাসে কাঠামোগত‌ও এক নতুনত্ব এনেছেন। সিরিজের আগের দুটো ব‌ইয়ের কাহিনি সমান্তরাল ভাবে চলছে। এখানে যেন হঠাৎই দ্বিঘাত সমীকরণের মতো দ্বিতীয় বীজ রোপন করলেন। ডার্ক ফরেস্টের লুও জী (Luo Ji) এবং Crisis Era যা জানিয়েছিল, ডেথস্‌ এন্ড-এ সেটাই আবার আমরা নতুন চোখে দেখতে পাই। এবার দেখি চেং জিন (Cheng Xin)-এর চোখে।

     চেং জিন পেশায় একজন বিমান-প্রকৌশলী (aerospace engineer) আর চরিত্রে এক মানবতাবাদী। সিক্সিন লিউ এর কলমে তিনি এমন এক নারী চরিত্র যার প্রেমে আপনি পড়তেই পারেন। চেং পড়াশোনা শেষে কর্মসূত্রে একসময় পৌঁছে যায় UN-এ তে। Crisis Era-র ট্রাইসোলারানদের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্যে তৈরি এক Staircase Project-এ যুক্ত হয়ে পড়ে।

     এই সেই প্রজেক্ট যা আগামী দিনে পৃথিবী, সৌরমন্ডল, ব্রহ্মান্ড – সমস্ত কিছুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

     ইতিমধ্যে ইউন তিয়ানমিং (Yun Tianming), আমাদের গল্পের নায়ক, কর্কট রোগে আক্রান্ত, ইচ্ছামৃত‍্যুর ঠিক আগে, হঠাৎই পাওয়া ৩০ বিলিয়ন ইউয়ানের বিনিময়ে প্রেমিকা চেং জিনের জন্যে কিনে নেয় ২৮৬.৫ আলোকবর্ষ দূরের এক তারা।

     DX3906, বহু আলোকবর্ষ দূরের এই তারার একটি গ্রহে, বহু আলোকবর্ষ পরে, আমাদের নায়ক নায়িকার সম্ভাব্য মিলন রজনীতে যে নাটক অনুষ্ঠিত হবে, তার বীজ বপন হয় স্টেয়ারকেস প্রজেক্টের আরেক নাটকীয় বাঁকে।

     টমাস ওয়েড (Thomas Wade), এক উপন্যাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স অফিসার, চেং জিনের বস্, গোটা উপন্যাস জুড়ে যার সঙ্গে আমাদের নায়িকার চলে এক নৈতিক যুদ্ধ, অথচ যার এক গোপন ধংসাত্মক পদক্ষেপ ছাড়া এই উপন্যাস তার নায়িকাকে নিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারত না। তিনি এক চকিত সিদ্ধান্তে প্রান্তিক রোগী ইউন তিয়নমিং-এর ইচ্ছামৃত্যু ত্বরান্বিত করেন, স্টেয়ারকেস প্রজেক্টের লক্ষ্যপূরণে। এর মধ্যে এই প্রজেক্টের লক্ষ্য বদলে গিয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে যে কোনও ভাবে অন্তত ট্রাইসোলারানদের মধ্যে মানবতার বীজ বপন করা।

     ইতিমধ্যে চেং জেনেছে তার প্রতি ইউনের ভালোবাসা, জেনেছে DX3906 আসলে ইউনের প্রেম-উপহার, যাকে সে কলেজের একজন কাছের সহপাঠীর বেশি কিছু বলে আগে কখনও ভাবেনি। উদভ্রান্ত চেং কোনও সুযোগ পাওয়ার আগেই বের করে নেওয়া হয় ইউয়ান তিয়নমিং-এর সম্পূর্ণ ‘ব্রেন’, হতাশ সর্বশান্ত চেং দেখে তার প্রেমিকের ‘ব্রেন’, তার‌ই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য পূরণের উদ্দেশ্যে চলে যাচ্ছে মহাবিশ্বের মহাশূন্যে, এক অনির্দিষ্ট লক্ষ্যে।

     যদিও তখন সেই ‘ব্রেন’ প্রকরণগত ভাবে ‘মৃত’, কিন্তু প্রজেক্টের আশা, কয়েকশ বছর পরে ট্রাইসোলারানরা হস্তগত করবে পৃথিবীর পাঠান ওই ‘বস্তু’, এবং তাদের উচ্চতর বিজ্ঞানের সাহায্যে পুনর্গঠিত করবে প্রেমিক-পুরুষ ইউন তিয়নমিং কে। এবং এই শেষ পর্যন্ত ট্রাইসোলারানদের মধ্যে রোপিত হবে মানবতার বীজ।

     চেং জিন শেষ আশা হিসেবে আকড়ে ধরে এইটুকু, আর একমাত্র উপহার হিসেবে প্রেমিকের ‘ব্রেন’-এর সঙ্গে পাঠায় ইউনের পছন্দের সমস্ত খাদ‍্যশস্যের বীজ। যা বহু আলোকবর্ষ পরে অন্য এক ভুবনে ইউন ফিরিয়ে দেবে তার প্রেমিকাকে, জীবনধারণের পাথেয় হিসেবে।

     চেং সিদ্ধান্ত নেয় সে অপেক্ষা করবে ততদিন, ট্রাইসোলারানরা যতদিনে ইউনের পুনর্গঠন করবে, আর ডুবে যায় দীর্ঘকালীন হাইবারনেশনে।

     এইভাবে উপন্যাসের ক‍্যানভাসে নাটকীয়ভাবে বিভিন্ন রং এর পরত ছড়িয়ে পড়ে ক্রমাগত বিজ্ঞান আর ঘটনার সংঘাতে, ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাবিশ্বের দূরগত কৌণিক বিন্দুতে। সিক্সিন লিউ ওই রঙিন ক‍্যানভাসে এবার একের পর এক রামধনু মেলাতে থাকেন। কখনও অ্যালিয়েন, কখনও বিজ্ঞান, কখনও খেলতে থাকেন বহুমাত্রিক মহাবিশ্বের মাত্রার পরিবর্তন নিয়ে। কখনও পলাতক মহাকাশযান দেখা পায় চতুর্মাত্রিক বিশ্বের অ্যালিয়েনদের চার-মাত্রার বস্তুর।

     তবে সিক্সিন মহাবিশ্বের অগণিত এলিয়েনদের রূপ বা প্রকৃতির চেয়ে বেশি ভাবিত ছিলেন মানব সভ্যতার ওপর তাদের উপস্থিতির প্রভাব নিয়ে।

     যদিও ডার‌উইনের সময় থেকেই মানবসভ্যতা ‘যোগ‍্যতমের উদ্বর্তন’ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল, তবুও প্রকৃত অর্থে মানবসভ্যতা তার শান্তি আর সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিসর্জন দেয় উদ্বর্তনের।

     লিউ কিন্তু জানাচ্ছেন মহাশূন্যের বহির্বিশ্বে প্রকৃতপক্ষেই ভয়ংকর বিপদজনক শিকারি প্রাণী প্রজাতি ছড়িয়ে আছে আর আমাদের বিশ্বব‍্যাপী সামাজিক-কল‍্যাণ-কামী রাষ্ট্র ভাবনা মানবসভ্যতাকে তাদের আক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে উপযুক্ত নয়।

     তবুও সব শেষে সিক্সিন লিউ, একজন মানুষ হিসেবে, টিকিয়ে রাখেন মানবতার শেষ চিহ্ন মানুষকেই, অন্য এক মহাবিশ্বের মানবসভ্যতার বীজ হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!