ঘর

সায়ক দত্ত চৌধুরী

অলংকরণ: ইন্টারনেট

পুরানো বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে নীরা উচ্ছসিত হয়ে উঠল, ‘দেখ শুভ, যেখানে আমি জন্মেছিলাম এ বাড়িটা এক্কেবারে সে রকম। সেইরকম গাড়িবারান্দা, বড় বড় জানলা, দরজা, এক্কেবারে সেই রকম।’

     নীরার স্বামী শুভ, নীরাকে সেই ছোটবেলা থেকে চেনে। সে জানে নীরাদের বাড়িটা মোটেই এমন ছিল না। কিন্তু সে প্রতিবাদ করল না। বরং বলল, ‘হ্যাঁ নীরা, বেশ মিল আছে বটে। চল ফেরা যাক।’ এরপরই কিচ্ছু না ভেবে এমন একটা কথা বলে বসল যে তার হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিল, ‘চল, সন্ধে হয়ে আসছে।’

     সত্যিই সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। কিন্তু সেটা শুধুমাত্র এখানেই। আর সেই জন্যেই যায়গাটা ছেড়ে যাওয়া নীরার পক্ষে আরও বেশি কষ্টদায়ক।

     ‘হ্যাঁ হচ্ছে তো।’ সে বলল, ‘কি সুন্দর না! দেখ রাস্তার আলোগুলো জ্বলে উঠছে। কি অপূর্ব ওদের এই আলতো আলো ছড়িয়ে দেওয়া। দেখ, দেখ, আমার বাড়িতেও একটা আলো আছে।’

     ‘আচ্ছা। এখন চল তো।’ বিরক্ত হয়ে শুভ বলল, ‘আমার পা ব্যাথা করছে।’

     ‘ওহো, দুঃখিত সোনা। আমরা প্রায় পুরো শহরটা জুড়ে টইটই করে বেড়িয়েছি, না গো? চলো সামনের পার্কটায় বসে একটু বিশ্রাম করি। সন্ধে নামা দেখতে আমার এতো ভালো লাগে।’

     ওরা গিয়ে একটা কাঠের বেঞ্চের ওপর বসল। ক্লান্ত শুভ বসল হেলান দিয়ে আরাম করে। অতি উৎসাহী নীরা কিন্তু প্রায় সোজা হয়ে বসে ঘাড় এদিক ওদিক ঘোরাচ্ছিল, আর কখনও কোনও গাছ, কোনও ঝোপ, রাস্তার পাশের একটা লাল ইটের বাড়ি কিংবা শহরের শেষ প্রান্তের মন্দির চুড়োটার দিকে তাকিয়ে উচ্ছসিত হয়ে উঠছিল। সমানে চলছিল তার মন্তব্য। এমন সময় হঠাৎই তার নজর গেল সামনের ফুটপাতে কাটা একটা ছকের দিকে।

     ‘আরে দেখ, চু-কিত-কিতের ছক। হ্যাঁ, তাইতো। কি মজার না? বাচ্চাগুলো কোথায় গেল বল তো?’

     ‘দেখ নীরা, তুমি জানো এখানে কোনও বাচ্চা নেই।’

     কথাটা শুনেই নীরার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠল। শুভর দিকে তাকিয়ে ক্ষেপে লাল হয়ে বলল, ‘কেন তুমি সবসময় আমার আনন্দগুলো মাটি করে দাও বলতো? এ কথাগুলো কি তোমার এখন মনে না করালেই চলছিল না? আমার কি নিজের কল্পনার জগতেও একটু থাকার অধিকার নেই?’

     ‘আমি চাইছি যাতে তুমি আরও কল্পনাপ্রবণ না হয়ে পড়। এরপর তুমি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারো, এই আর কি।’

     ‘হ্যাঁ বলে যাও, বলে যাও। এরপর আমার একটা নার্ভাস ব্রেকডাউন হবে। তারপর আমি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাব। আমার মতো একটা পাগলীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বলে তুমি খুব কষ্টে আছো, তাই না?’

     শুভ এবার একটু বোঝানোর চেষ্টা করল। ‘তোমার মাথায় কোনও গন্ডগোল নেই। তোমার কেবল বাড়ির জন্যে একটু মনকেমন করছে। এখানে এমন সবারই হয়। আমারও হয়। আমি শুধু চাইছি তুমি এসব দেখে বাড়াবাড়ি রকমের আবেগপ্রবণ না হয়ে পড়ো।’

     নীরা লাফিয়ে উঠল। ‘আবেগ? তুমি এখনও সত্যিকারের আবেগ দেখনি।’ সে তার ব্যাগ থেকে কিছু একটা বার করে চু-কিত-কিতের ছকের ওপর ছুড়ে ফেলল। ‘আমি তোমায় দেখাচ্ছি সত্যিকারের আবেগপ্রবণ হওয়া কাকে বলে।’

     নীরা খেলা শুরু করল। শুভ দেখল একটা অত্যন্ত দামী এআইসিডিকে ঘুঁটি বানিয়ে ও খেলে চলেছে। আরেকটি দম্পতি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা নীরার ছেলেমানুষী দেখে মুচকি হাসলেন। শুভ বেশ লজ্জায় পড়ে গেল। যতক্ষণ না তারা চোখের আড়াল হল ততক্ষণ সে অপেক্ষা করল। তারপর উঠে নীরার হাত চেপে ধরে একটু কড়া সুরেই বলল, ‘দেখ, আমি তোমাকে এসব কাণ্ড করতে দিতে পারি না। অনেক হয়েছে, এবার আমরা যাবো।’

     এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নীরা বলল, ‘তুমি যাও। যাও তোমার ঠান্ডা, দূষণহীন, জীবাণুমুক্ত রাজত্বে। যাও হে মানবসভ্যতার মহান বাহক। আমি এখানে থাকছি।’

     ‘তুমি পারবে না। বাস্তববাদী হও নীরা।’

     ‘মন্দিরের পাশে একটা হোটেল আছে। আমি দেখেছি। যতদিন না পর্যন্ত আমার পালা আসে আমি ওখানেই থাকব। কতদিন আর, মাসছয়েক বাকি আছে। হয়তো ওখানে মাসিক ভাড়ার বন্দোবস্তও আছে।’ সে হাঁটতে শুরু করল।

     ‘নীরা এটা বাস্তব নয়। সামনের ওই সিনেমা হল, বড় বাজার আর সাজানো সবকিছুর মতো হোটেলটাও মেকি।’

     ‘চুপ করো।’ নীরা থেমে গিয়ে তার দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখ অস্বাভাবিক রকমের বড় বড়। ‘আমার কাছ থেকে এগুলো কেড়ে নিয়ো না বলছি। আমি সবে আবার এগুলো খুঁজে পেয়েছি। একে আমি আর হারাবো না। না – কক্ষনো না।’

     সে কাঁদতে শুরু করল, হঠাৎ পাগলের মতো হেসে উঠল – আবার কাঁদল – তারপর অজ্ঞান হয়ে গেল। শুভ তাকে ধরে ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে ঘাসের ওপর শুইয়ে দিল। এক কৃত্রিম গাছের নিচে এক কৃত্রিম ঘাসের ওপর। নকল আকাশে তখন জ্বলজ্বল করছে নকল তারার সারি। কেউ নিশ্চয়ই খেয়াল রাখছিল, কারণ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লাল আলো জ্বালিয়ে, সাইরেন বাজাতে বাজাতে একটা অ্যাম্বুল্যান্স এসে হাজির। এদের ব্যাবস্থাপনা তারিফ করার মতো, এমনকি অ্যাম্বুল্যান্সটাও যেন একদম পৃথিবীর পুরানো দিন থেকে উঠে এসেছে। মাথার লাল আলো থেকে নাম্বার প্লেট অবধি নিখুঁত।

     দুজন লোক স্ট্রেচার নিয়ে লাফিয়ে নামল। স্ট্রেচারে নীরাকে তুলে নিয়ে একজন জিজ্ঞেস করল, ‘গুরুতর কিছু নাকি শুভ?’

     ‘না।’ শুভ বললো, ‘সাড়ে ছ’বছর টানা চন্দ্র উপনিবেশে কাটানোর ফল আর কি। একসঙ্গে এতকিছু দেখা ওর সহ্য হয়নি।’ সে অ্যাম্বুল্যান্সের পিছনে চড়ে বসল।

দরজাদুটো খুলে শুভ বেরিয়ে দেখল চাঁদের আদিগন্ত বিস্তৃত রুক্ষ পাথুরে জমিতে একটা ম্যাটমেটে আলো ছড়িয়ে রয়েছে। পিছনে পড়ে থাকা কৃত্রিম সন্ধ্যার অস্তিত্ব আর নেই। তার স্ত্রীকে একটা প্রথাগত অ্যাম্বুল্যান্সে তোলা হচ্ছে। সে পিছন ফিরে দেখল সিংহদ্বারের ওপর কয়েকটা লেখা জ্বলজ্বল করছে, ‘আপনালয় – বসুধা। প্রবেশমূল্য – ১০০০ টাকা।’

লেখক: রিচার্ড উইলসনের ‘হোমটাউন’ অবলম্বনে লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!