চলচ্চিত্র আলোচনা – Close Encounters of the Third Kind (1977)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে ১৯৪৫ সালে হারিয়ে যাওয়া ফ্লাইট ১৯ এর এক ঝাঁক প্লেন খুঁজে পাওয়া গেল প্রায় তিরিশ বছর বাদে মেক্সিকোর কাছাকাছি সোনোরান মরুভূমিতে। ইঞ্জিন সম্পূর্ণ অক্ষত। এমনকি ম্যাপ আর চার্টগুলোও একদম ঠিকঠাক রাখা আছে। যে বৃদ্ধ মেক্সিকান ভদ্রলোক এই প্লেনগুলো রাতের অন্ধকারে নেমে আসতে দেখেছিলেন তার কথায়, ‘আলো জ্বলে উঠল মধ্যরাত্রিতে, সূর্যদেব নেমে এলেন ওই স্বর্গীয় বিমান থেকে আর আমায় গান শোনালেন।’ — এভাবেই একটা রোমাঞ্চকর আবহে শুরু হয় স্টিভেন স্পিলবার্গের প্রখ্যাত কল্পবিজ্ঞান ছায়াছবি ‘ক্লোস্‌ এন্‌কাউন্টারস্‌ অফ্‌ দ্য থার্ড কাইন্ড’। সারা পৃথিবীর কল্পবিজ্ঞানপ্রেমী মানুষের মনে এই ছবিটা একটা বিশেষ জায়গা নিয়ে আছে।

ছবির পোস্টার

     ভিনগ্রহীদের সাথে মানুষের সাক্ষাৎ হলে তা কি আদৌ বন্ধুত্বপূর্ণ হবে নাকি সেই মোলাকাত সংঘাতেই শেষ হবে এই বিষয়টা নিয়ে কল্প বিজ্ঞান সাহিত্যে বহুকাল ধরে নানা চর্চা হয়েছে। হার্বার্ট জর্জ ওয়েলেস্‌ এর মতো কল্প বিজ্ঞান সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্বও কিন্তু তাঁর ক্লাসিক ‘ওয়র অফ্‌ দ্য ওয়ার্ল্ডস্‌’ উপন্যাসে মঙ্গল গ্রহের কাল্পনিক জীবদের সঙ্গে পৃথিবীর মানুষদের এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধের ছবি তুলে ধরেছিলেন। অরসন ওয়েলেস্‌ ১৯৩৮ সালের ৩০ শে অক্টোবর তাঁর বিখ্যাত এবং তেমনি কুখ্যাত রেডিও নাটকে স্থানীয় সংবাদ, বিশেষ ঘোষণা এরকম নানা অনুষঙ্গ যোগ করে এই গল্পের যে হাড় হিম করা রূপান্তর করেছিলেন; আমেরিকার বিশেষতঃ ন্যু–ইয়র্কের মানুষ সেটাকে প্রায় আক্ষরিক সত্যি ভেবে বসেছিল সেইদিন। এছাড়া হলিউড, পূর্ব ইউরোপ আর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অসংখ্য কল্পবিজ্ঞান ছবিতে ভিনগ্রহী এলিয়েনদের সাথে মানুষের সংঘাতের ছবিই বেশী করে তুলে ধরা হয়েছিল। এই বারবার উঠে আসা বিষয়টাকে একটা অন্য চেহারায় দেখান স্টিভেন স্পিলবার্গের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। এই ছবির জন্য নিজের গল্প অবলম্বনে লেখা তার স্বপ্নের চিত্রনাট্যকে নিয়ে শেষমেশ ১৯৭৩ সালের শেষদিকে কলম্বিয়া পিকচার্সের সাথে একটা চুক্তি করেছিলেন তিনি। আর ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাস নাগাদ এই ছবি মুক্তি পায়। ছবিতে ক্লদ লাকোম্ব নামে এক ফরাসী বৈজ্ঞানিকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন পৃথিবীবিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ফ্রাসোয়াঁ ত্রুফো।

ফরাসী বৈজ্ঞানিক ক্লদ ল্যাকোম্বের ভূমিকায় ফ্রাসোয়াঁ ত্রুফো

     গল্পের শুরুতেই নানা রকম আশ্চর্য ঘটনা ঘটে যায়। মেক্সিকোর ওই মরুভূমি ছাড়াও মঙ্গোলিয়ার গোবি মরু অঞ্চলে অনেককাল আগে হারিয়ে যাওয়া মালবাহী জাহাজ ‘এস এস কোটোপেক্সি’ কে খুঁজে পাওয়া যায়। আবার ভারতের ধর্মশালায় আকাশ থেকে ছটা বিভিন্ন কম্পাঙ্কের শব্দ শোনা যায় যাকে অসংখ্য ধার্মিক লোকেরা সাক্ষাৎ ভগবানের কণ্ঠস্বর ভেবে নেন। ইউনাইটেড নেশনস্‌ এর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অনেকের মতো বৈজ্ঞানিক ক্লদ ল্যাকোম্বও এই রহস্যের কিনারা করতে আসেন। অদ্ভুতভাবে নাসার একটা মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে অজানা এক পালসারের কাছ থেকে যে তরঙ্গগুলো পাওয়া যায় তার কম্পাঙ্কও এই ছটা স্বরের সঙ্গে একেবারে সমান। এগুলো কি কোন গুপ্ত সংকেত যা ভিনগ্রহী জীবেরা এই পৃথিবীর মানুষদের জন্য দিয়ে আসছে? যে কজন মানুষ অজানা কিছু আকাশ যান খুব কাছ থেকে দেখতে পান তারা একটা অজানা টিলার ছবি নিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন। কেউ বারবার ওই টিলার ছবি আঁকেন কেউ বা মাটি কাঠ পাথর দিয়ে তার একটা মডেল তৈরি করার চেষ্টা করেন। এতগুলো মানুষের মনের এই ছবিটা কি আসলে কোন সঙ্কেত যেটা দিয়ে ওই অজানা জীবেরা তাদের অস্তিত্ব জানাচ্ছে? এর মধ্যে অনেকে হারিয়ে যাবে রহস্যময়ভাবে যার মধ্যে ইন্ডিয়ানা স্টেটের অধিবাসী ৩ বছরের শিশু ব্যারি গাইলারও ছিল। এই সব কাণ্ডের মধ্যে পালসার থেকে পাওয়া সংখ্যাগুলো যার সাথে ওই শব্দের কম্পাঙ্ক মিলে গেছিল তার একটা মানে পাওয়া যাবে। ওই ছটা সংখ্যা আসলে একটা বিশেষ অঞ্চলের অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাকে প্রকাশ করছিল। ম্যুরক্রাফট্‌, ওয়ায়োমিং অঞ্চলের ওই জায়গায় আসলে ওই স্বপ্নের টিলার মতো একটা সত্যিকারের পাহাড় আছে যাকে স্থানীয় লোকেরা ডেভিলস্‌ টাওয়ার বলে। তাহলে কি ভিনগ্রহের ওই অজানা প্রাণীরা এই অজানা পাহাড়ের বুকেই নেমে আসবে? তারা কি আদৌ বন্ধুভাবাপন্ন হবে আমাদের?

ভিনগ্রহী যান নেমে আসছে ডেভিলস্‌ টাওয়ারের ওপর

     বাকীটা জানতে হলে অবশ্যই দেখতে হবে এই অসাধারণ কল্প বিজ্ঞান চলচ্চিত্র। পরতে পরতে অ্যাডভেঞ্চার রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে স্পিলবার্গ এই গল্পের এক অসামান্য চিত্রায়ন করেছিলেন। আর যেটা না বললেই নয় সেটা হল ঝাঁ চকচকে স্পেশাল এফেক্টে ভরা ফটোগ্রাফি আর ছবির আবহ সংগীত। ছবির ভিস্যুয়াল কন্ট্রোল সুপারভাইজার ডগলাস ট্রামবুল সেই সময়কার মোশন কন্ট্রোল ফটোগ্রাফি দিয়ে অজানা ইউ.এফ.ও যানের দুর্ধর্ষ সব ফ্রেম বানিয়েছিলেন। আর তার সাথে যথাযথ সঙ্গত করেছিলেন ক্যারল র‍্যামবল্ডি যিনি ভিনগ্রহী প্রাণীদের অনবদ্য সব মডেল তৈরি করেছিলেন। মনে রাখা দরকার সে সময় কিন্তু এখনকার মতো টেকনোলজি বিশেষ করে কম্পিউটার গ্রাফিক্সের সুবিধা ছিল না আর খরচ বেড়ে যাচ্ছে দেখে স্পিলবার্গ নিজেও সামান্য কিছু দৃশ্যেই মাত্র গ্রাফিক্সের কারসাজি রাখতে পেরেছিলেন। এছাড়া ছিল অনবদ্য ম্যাট পেইন্টিং সিকুয়েন্সগুলো যা দিয়ে স্বপ্নের মতো কিছু ফ্রেম বানানো হয়েছিল। এই ছবির সংগীতে জেমস হর্ণার গল্পের টানটান মেজাজটাকে যথাযথ ধরে রেখেছিলেন। এর আগেই ১৯৭৫ সালে তৈরি বিখ্যাত জস্‌ ছবির জন্য তিনি অস্কার পেয়েছিলেন। আর এই ছবির বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে উত্তেজনা, ভয়ের যে আভাসগুলো লুকিয়ে আছে তার সার্থক সাংগীতিক প্রকাশ ছিল হর্ণারের সুরের মূর্ছনা। ১৯৯৮ সালে এই ছবির ডিজিটাল রেস্টোরেশন্‌ হয়ে যে সংস্করণ বেরোয় সেখানে এই ছবির আবহকে সংগীতকেও ডিজিটালি পুনরুদ্ধার করা হয়।

এই ছায়াছবির চিত্রনাট্যের একটা অংশ

     বিখ্যাত চিত্র সমালোচকদের মতে শুধু কল্পবিজ্ঞান নয় এমনকি নানা ধর্মীয় আর দর্শনের চিহ্ন লুকিয়ে আছে এই ছবির গল্পের বয়ানে। যেমন অনেকে দাবী করেছেন যে ডেভিলস্‌ টাওয়ারের আদলে আসলে বাইবেলে বর্ণিত সিনাই পর্বতের কথাই বলা হয়েছিল যেখানে মোজেস্‌ ঈশ্বরের দশটা প্রত্যাদেশ পেয়েছিলেন। যাইহোক তারা ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এই ছবির গল্প বলার ধরণ বা ন্যারেটিভকে। এমনকি পৃথিবীর অন্যতম সেরা চলচ্চিত্রকার জঁ রেনোয়াঁ পর্যন্ত এই ছবি দেখে স্পিলবার্গের তুলনা করেছিলেন জুল ভার্ণে বা জর্জেস মেলিয়ের মতো দিকপালদের সাথে। বিখ্যাত কল্প বিজ্ঞান লেখক রে ব্র্যাডবেরীর মতে এই ছবি ছিল তখনও তাঁর দেখা শ্রেষ্ঠ কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্র।

ভিনগ্রহী যানের এক অসামান্য দৃশ্যায়ন

     মহৎ স্রষ্টাদের মধ্যে হয়তো চিরকাল একটা শিশু লুকিয়ে থাকে। এই ছবির চিত্রায়নেও আমরা স্পিলবার্গের মধ্যে সেই শিশু সুলভ অপার বিস্ময় লক্ষ্য করি। যে বিস্ময় নিয়ে চারিদিকের সব কিছু এমনকি অজানা জগতের মধ্যেও কল্পনার ডানা মেলে উড়ে যাওয়া যায়। আর এখানেই এই ছায়াছবি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের আসন নিয়ে আজও আমাদের মন জুড়ে আছে।   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!