চলচ্চিত্র সমালোচনা – দ্য ম্যান ফ্রম আর্থ (২০০৭)

রচনা  : সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

অলঙ্করণ :

The Man From Earth

Diretor – Richard Schenkman

Written By – Jerome Bixby

Music – Mark Hinton Stewart

কেমন হয়, যদি হঠাৎ আবিষ্কার করেন যে আপনার পুরোনো সহকর্মীটি আপনাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করাচ্ছেন তিনিই শ্রীমধুসূদন – বা অমর হনুমান? আপনি আজ জানতে পারলেন এতদিন যার সাথে বসে টিফিন খেয়েছেন, এক সাথে সুখ দুঃখ ভাগ করেছেন, তিনি আসলে সেই পরম “তিনি”- তখন অনুভুতিটা কিরকম চরম হবে? ব্যাপারটা হল আপনাকে যদি সরাসরি কেউ এরকম দাবি করে, তাকে তো তখনই আপনি “গাঁট্টা দিয়ে গালপাট্টা” উড়িয়ে দেবেন; কিন্তু যদি ঘটনার মোচড়ে আপনার প্রচলিত ধারনার গায়ে আঁচড় কাটতে কাটতে এগোতে থাকেন তিনি– পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো আপনার সমস্ত যুক্তিকে হেলায় কেটে ফেলতে ফেলতে আপনার মধ্যেকার পেলব বিশ্বাসের স্তরে যদি তিনি তাঁর যুক্তিকে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারেন– তাহলে কি আপনি মেনে নেবেন? নাকি সব শেষেও থেকে যাবে এক অন্তিম অনুভূতি– নাঃ, ইনি তিনি নন– হতে পারেন না– কারন তিনি যে সব ধরা ছোঁয়ার বাইরে, অনন্ত অসীম– এবং সবথেকে বড়, একটা “মিথ”।

     এই মিথিকাল মিথোস্ক্রিয়ায় বদ্ধ জীবনের অতি সাধারন ভাবনার স্তরকে প্রস্তরীভূত করে, এক অন্য সতেজ সজীব চিন্তা ভাবনায় আমরা কি চালিত হতে পারিনা? ভাবতে কি খুব কষ্ট হয় যে আমারা যেসব চরিত্রকে মিথ বানিয়েছি, তাঁরা আমাদের মতোই মানুষ? আর সেই মানুষ যদি আমাদের পাশে এসে বসেন, তাহলে কি মিথকে কাছে টেনে সেই আসল মানুষটিকে দূরে ঠেলে দেব? তাকে পাগলা গারদে ভর্তি হবার পরামর্শ দেব? নাকি তাঁর চিন্তাস্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে ধন্য হব? এই দোলাচলে আমাকে ফেলে দিয়েছিল যে সিনেমা, এই আলোচ্য বিষয় তাকে নিয়েই।

     যে সিনেমাটার গল্প বলতে বসেছি, তার তুল্য সিনেমা আমি এযাবৎ দেখিনি। সিনেমাটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব এই, যে সেটা সাধারন সায়েন্স ফিকশন গল্পের প্রচলিত ধ্যান ধারণার শান্ত জগতে এক সুনামি বিশেষ। সাই ফাই শুনলেই আমাদের মনের আয়নায় কিছু ক্লিশে ছবি ভেসে ওঠে– অন্য এক দুনিয়া, হাইপারস্পেস, অন্য গ্রহ, টাইম মেশিন, বিকটাকৃতি প্রাণী ইত্যাদি প্রভৃতি। কিন্তু চারপাশের সাধারন পটভূমিকাতেই যে হাড় হিম করা অবিশ্বাস্য সায়েন্স ফিকশন লুকিয়ে থাকতে পারে, সেটা এই সিনেমা না দেখলে বোঝা মুশকিল। আপনার সাধারন বস্তাপচা চিন্তা ভাবনার মূলে কুঠারাঘাত করে, তার গতিপথ অন্যদিকে চালিত করে দিতে পারে এই সিনেমার কনসেপ্ট।

     সিনেমাটি সাম্প্রতিক কালের নয় – প্রায় নয় নয় করে ন’ বছরের পুরানো, সেই ২০০৭ সালের। কিন্তু এর মূল গল্প লেখক জেরম বিক্সবি গল্পটিকে নাকি বহুদিন আগেই মনের মধ্যে খেলিয়ে ফেলেছিলেন– সেটাকে টেনে ডাঙায় তুলে আনতে যা বাকি ছিল। সেটা করে ফেলেছেন এই গল্পের পরিচালক শেংকমেন, যিনি বিক্সবির এই অসাধারণ গল্পকে শুধু ক্যামেরা প্যান করে ধরেছেন বলব। গল্প চলেছে নিজের গতিতে– এবং অবশ্যই বিক্সবির লেখা এক অদ্ভুত চিত্রনাট্যের বহুস্তরীয় স্রোতে নিরালম্ব ভাবে ভাসতে ভাসতে।

     এখানে জেরম বিক্সবির একটা ছোট পরিচয় দিয়ে রাখা মনে হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ইনি সায়েন্স ফিকশন জগতে খুব একটা অপরিচিত নাম নয়– বরং আমেরিকার জনপ্রিয় সাই ফাই লেখকদের মধ্যে একজন- তবে বহু পুরানো মানুষ। তাঁর জন্ম ১৯২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়াতে এবং মৃত্যু… ১৯৯৮ সালে। তাঁর প্রিয় সিনেমাটির স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ হবার পরেই। কি সেই সিনেমা? যা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে – হ্যাঁ, সেই “দ্য ম্যান ফ্রম আর্থ”। অর্থাৎ সিনেমার চিত্রনাট্য প্রস্তুত ছিল সেই ১৯৯৮ সালে, আর সিনেমাটা তৈরী হলো গিয়ে ২০০৭-এ। মনে হতে পারে, এ আর নতুন কি? জেমস ক্যামেরন “অবতার” ছবির কনসেপ্ট ভেবে রেখেছিলেন সেই নব্বই এর দশকে, কিন্তু তখন তো আর এত ফাটাফাটি ভি-এফ-এক্স বা ভিস্যুয়াল এফেক্টস ছিল না, তাই তিনি হা পিত্যেশ করে বসেছিলেন সেই ২০১০ সাল অবধি। কিন্তু আমাদের আলোচ্য গল্পের মধ্যে ভিস্যুয়াল এফেক্টের নাম গন্ধ নেই – স্টার ওয়ার্সের দর্শককুল এই সিনেমা দেখতে বসে হাই তুলতে পারেন– তাতে কিন্তু সিনেমার রস বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হয়না। যাইহোক, এবার আসি সিনেমার গল্পে–

     গল্প বলে দিলে কি সিনেমা দেখার ইচ্ছে চলে যায়? যেতে পারে, তবে সেই সব সিনেমার জন্য যেখানে সিনেমার অন্তে শাঁস হিসাবে সাসপেন্সটাই আসল– সেখানে এইসব “স্পয়লার” খুব ক্ষতিকারক। কিন্তু এই সিনেমাটা নাকি পরে মঞ্চস্থও হয়েছে– তারমানে এটা একটা ড্রামা সিনেমা– তাই এতে স্পয়লারের সম্ভবনা কম– বরং গল্পটা একটু ধরিয়ে দিলে, দেখার আগ্রহ বাড়তে পারে– আমার অন্তত সেটাই মনে হয়েছে।

     জন ওল্ডম্যান মোটেই বুড়ো নন– বরং দেখে পয়ত্রিশ বছরের জোয়ানই মনে হয় তাঁকে। একটি আমেরিকান কলেজের প্রফেসর জন, কোনো এক অজ্ঞাত কারনে সব কিছু ছেড়েছুড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন “অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে”। বিদায়বেলায়, এক ঘরোয়া সমাবেশে  সঙ্গী হতে ছুটে এসেছেন তাঁর অধুনা পূর্বতন কলেজের অধ্যাপক এবং অধ্যাপিকারা– সঙ্গে আছেন সুদর্শন জন ওল্ডম্যানের মানস প্রেমিকা অধ্যাপিকা স্যান্ডি।

     গল্পের সূচনা একটি গ্রামের বাড়ির সামনের অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্যপট দিয়ে। এই জন ভদ্রলোক বেশ রহস্যময়। তিনি সবার মতো শহরে থাকতে পছন্দ করেন না– তাঁর প্রিয় জায়গা নির্জন শহরতলী– আর সেজন্যই বাকিদের কষ্ট করে ছুটে আসতে হয় শহরের থেকে অনেক ভেতরে এক নির্জন কুটিরে– যেখানে জন কাটিয়েছেন এই কয়েক বছর। আর সেই ছোট্ট দু কামরার ঘরের আড্ডার মাঝেই জন্ম হয় এক টানটান উত্তেজনার– বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে ঘরে বসে থাকা মানুষ গুলোর মতো দর্শকও শিরদাঁড়া সোজা করে বসেন– ভাবতে থাকেন, তাহলে কোনটা সত্যি?

     আসর যখন সবে শুরু হয়েছে, সবাই মোটামুটি জমিয়ে বসেছেন সোফায়, কাউচে– খোলা হয়েছে জনি ওয়াকার গ্রিন লেভেলের বোতল; তখন জন দাবী করেন, তিনি কিছু বলতে চান, যা বলতে চান তা বিশ্বাস করার জন্য তিনি কাউকে জোর করছেন না, আবার তিনিও কাউকে বিশ্বাস করানোর জন্য বদ্ধপরিকর নন। প্রায় দশ বছর শিক্ষকতাজীবনে এনাদের সান্নিধ্যে এসে জনের মনে হয়েছিল, এই মানুষগুলো বুদ্ধিমান, যুক্তিবাদি– তাই শুধু মনের কথা বলে যেতে চান তিনি সবার সামনে।

     জন বলে চলেন, যদি এমনটা হয়, যে আপার প্লেলিয়োলিথিক থেকে কোনও গুহামানব এখনও বেঁচে আছে, তাহলে তাকে কিরকম দেখতে হবে? সেটা কি আদৌ সম্ভব? যুক্তবাদী উত্তর এলো, যদি সেই গুহামানব ১৪০০০ বছর বেঁচে থাকে, তাহলে তাকে আমাদের একজনের মতোই দেখতে হবার কথা– কারন তাঁর চারপাশের জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষের ক্রমবিবর্তিত মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তনের প্রভাব তাঁর উপর পড়তে বাধ্য, তাই সেই মানুষটি আমাদের মতোই দেখতে হওয়া পুরোপুরি সম্ভব। আর বেঁচে থাকার কথাই যদি ধরা যায়, তাহলে বলতে হয়, “বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি”– হতে পারে তাঁর মধ্যেকার কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি, এমন কিছু একটা তাঁর শরীরের মধ্যে ক্রিয়া করে চলেছে, যা তাঁকে বুড়িয়ে যাওয়া থেকে বাধা দিচ্ছে – তাই স্বাভাবিক মৃত্যুর পথ তাঁর কাছে রুদ্ধ। তাহলে এই মানুষটি এত বছর ধরে কি করল?

     জন দাবী করে বসেন, এই গল্পের নায়ক তিনিই – মানে জন নিজেই সেই গুহামানব। তাঁর বয়স এই বছর পঁয়ত্রিশেই আটকে আছে চৌদ্দ শতাব্দী ধরে। গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য তাঁকে কাজ করতে হয়, কিন্তু যখনই তিনি টের পান যে কাজের জায়গায় তাঁর এই বয়স না বাড়া ব্যাপারটা দৃষ্টি আকর্ষনের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, তিনি কোনো অজ্ঞাত স্থানে যাত্রা করেন – সেখানে আবার শুরু করেন জীবনের আর এক পর্ব – অন্য নামে, অন্য ছদ্মবেশে। তাঁর সহকর্মী শিক্ষকেরা পন্ডিত মানুষ – এই অসম্ভব দাবী তাঁরা মানবেনই বা কেন? তবে অশিক্ষিতের মতো ব্যাপারটিকে উড়িয়ে না দিয়ে তাঁরা যুক্তিজাল বিস্তার করতে শুরু করেন– কিন্তু অদ্ভুত ভাবে জন প্রতিটি যুক্তিকে পালটা বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে খন্ডন করতে থাকেন একের পর এক। কিছু উদাহরন দিলে ব্যাপারটা বেশ মনোগ্রাহী হবে –

     “জন, কবে তুমি জানতে পারলে যে তুমি ক্রো ম্যাগনন”

     “যেদিন ক্রো ম্যাগনন তার নিজের নাম পেল, সেদিন থেকেই আমি আমার নাম পেলাম”।

     “জন সেই জায়গাটা তুমি চিনতে পারবে যেখানে তোমার জন্ম হয়েছিল?”

     “সেটা কেউ পারে? ধরে নাও ছোটবেলায় তোমার মা তোমাকে নিয়ে যেতেন বাড়ির কিছুদূরে এক পার্কে – এতদিন পর যদি তুমি সেখানে যেতে চাও, পারবে সেই এক জায়গায় ফিরে যেতে? সেখানে এখন বড়বড় বাড়ি, অন্যরকম দৃশ্যপট, অন্য প্রতিবেশী – তাই নিজের পুরোনো জায়গায় মানুষ কখনো ফিরতে পারে না।“

     “জন, তুমি তো তাহলে অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী –  সর্বজ্ঞ টাইপ”

     “মোটেই না – একজন মানুষ কখনো তাঁর নিজের সময়ের থেকে এগিয়ে থাকতে পারে না। আমার কাছে একটা জিনিসই ছিল, সেটা হোলো সময় – আমি অনেক সময় পেয়েছি, পড়বার, জানবার – কিন্তু কোনোমতেই নিজের সময়ের থেকে বেশী জানতে পারিনি।“

     “জন, তোমাকে যদি কেউ গুলি করে দেয় – তুমি তো অমর, মরবে না?”

     “আমি বলেছি আমার বয়স বাড়ে না, আমার স্বাভাবিক মৃত্যু নেই, তাই বলে আমার অস্বাভাবিক মৃত্যু নেই সেটা তো আমি বলিনি। আমারও রোগ ভোগ হয়েছে, কিন্তু আমি সেসব থেকে রক্ষা পেয়েছি।“

     এরকমই টুকরো টুকরো যুক্তি পালটা যুক্তিতে সাজানো গল্পের প্লট। এভাবে চলতে গিয়ে যখন সব যুক্তি ফুরিয়ে যায়, তখন নৃতত্ত্বের শিক্ষক আর্ট ফোন করে ডেকে নেয় ডঃ উইল গ্রুবারকে, যিনি একজন মনোবিদ। তিনি এসে আলোচনাতে যোগ দেন এই ভেবে যে, জনের নির্ঘাত কোনও মানসিক রোগ হয়েছে, নাহলে খামোখা এরকম এক গল্প ফেঁদে বসে সবাইকে যুক্তিজালে আচ্ছন্নই বা করবে কেন? কিন্তু সব কিছু ভেসে যায়, জনের আপাত গম্ভীর, সাধারনের ছাঁচে অসাধারণ কথা বলার অনায়াস ভঙ্গিমা, গল্পচ্ছলে কিন্তু লৌহকাঠিন্যে নিজের যুক্তির মাপা বিস্তার এবং সর্বোপরি সর্ব্ববিষয়ে অসামান্য জ্ঞান। গল্পের মাত্রা অন্যদিকে মোড় নেয়, যখন জনকে জিজ্ঞেস করা হয়, সে ধর্ম মানে কিনা – তার উত্তরে প্রত্তুত্তরে ক্রমশ জানা যায় যে সে বাইবেলের এক বিশেষ চরিত্রের ভুমিকায় ছিল ।

     জনের জন্মের সময় পৃথিবী ছিল ভীষন শীতল। সেই শীতল পশ্চিম ছেড়ে উদীয়মান সূর্যের দিকে অর্থাৎ পুবের দিকে যাত্রা শুরু করে জন এবং তাঁর সেই সময়কার গোষ্ঠীবাসীরা। সেইদিকে চলতে চলতে বহুপথ পেরিয়ে জন চলে আসে ভারতে– সেখানে স্বয়ং বুদ্ধের পদতলে বসে শিক্ষালাভ করে সে। বুদ্ধের মৃত্যুর পর সে চলতে থাকে– এদিক সেদিক করে রোমে এসে হাজর হয়। রোমান সাম্রাজ্য তখন ত্রস্ত, বিদ্ধস্ত– রুধিরে, শোনিতে, রাজাদের অত্যাচারে চারদিকে বিশৃঙ্খলায় পরিপূর্ন– সেই সময় জন অনুভব করে বুদ্ধের বানীর মর্ম, সেই বানী প্রচার করা শুরু করে সে– এবং তার ‘জন’ নাম, পুরানো ইহুদী অপভ্রংশে নানা পথ পেরিয়ে পরিণত হয়, ‘জিসাস’-এ। ঘরে বসা সকলে তখন রোমাঞ্চিত হয়ে শোনে, সামনের ছেলেটি দাবি করছে, তিনিই ঈশা –তিনিই সেই মুক্তিপথের অগ্রদূত। জন বলে চলে, তাঁকে পেরেকে বিদ্ধ করা হয়নি, তাঁকে শুধু বেঁধে রাখা হয়েছিল। কিন্তু পুরানে, কথকতায়, রক্ত, যন্ত্রনা অনেক বেশী মর্মস্পর্শী হয়ে ওঠে; লোকে ‘খায়’ বেশী – তাই সেইসব মনগড়া বিবরণী লেখা হয়ে আছে ‘ওল্ড টেস্টামেন্টে’। জন বলে, “আমার কথা অনেক অনেক সোজা ছিল, কিন্তু আমার পরে আমার কথাকেই কবিত্বে, রূপকথায় পর্যবসিত করে আমার থেকে অনেক পণ্ডিত মানুষ– ভালত্বকে পরিণত করে মিথে, অলৌকিক তত্ত্বে ভরিয়ে তোলে বইয়ের পাতার পর পাতা। এটা আমি মোটেই চাইনি।”

     কি হয় এরপর– সেটা বরং তোলা থাক ভাবী দর্শকদের জন্য। তবে এইটুকু বলে দেওয়া অত্যুক্তি হবে না, যে জনের প্রতিটি কথার পেছনে যে ঐতিহাসিক যুক্তি আছে, তা আমরা সামান্য বই ঘাঁটলেই পেয়ে যাবো। এখন গবেষনায় প্রমানিত, যে যীশুর বানীর সাথে, বুদ্ধের বানীর অনেক মিল আছে– এবং এই নিয়ে বইও লেখা হয়েছে যে যীশু একসময় নাকি ভারতেও এসেছিলেন।

     তাহলে কোনটা ঠিক– এটা কি সম্ভব? যুক্তি বুদ্ধি কিরকম একটা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে না?

     এটা তো কল্পনাই– কিন্তু বড় বাস্তবঘেঁষা এই কল্পনার মালমশলা– মনে মনে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। এই দোলাচলে আমাদের টেনে নিয়ে যাবার জন্য জেরম বিক্সবি এবং অবশ্যই নির্মাতা রিচার্ড শেংকমেনকে অজস্র ধন্যবাদ জানাতে হয়। জনের ভূমিকায় ডেভিড লি স্মিথ অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। ড্যানের ভুমিকায় টনি টড খুব সুন্দর – জনের কথার প্রত্যকেটি দাবীকে তিনি ইতিহাস, বিজ্ঞানের যুক্তি সাজিয়ে গল্পকে আরও মনোগ্রাহী করে তুলেছেন। এবং সবশেষে যার কথা না বললে এই রিভিউ অসমাপ্ত থেকে যায়, তা হলো এর আবহ– বিঠোফেনের সিম্ফোনীর সাথে জিসাসের নিজের মুখের বানী-এক অনবদ্য শান্তির বাতাবরন তৈরী করে– মনে হয় বসে থাকি এভাবেই– শুনে যাই তাঁর কথা। তাছাড়া ছবির শেষে টাইটেল কার্ডে, “নাথিং লাস্টস ফর এভার” গানটি বড্ড মন ভালো করে দেয়।

     হলিউডে সাই ফাই অনেক তৈরী হয়েছে আর হবেও– কিন্তু এই গল্পটির জুড়ি আর মিলবে না। এরকম গল্প আমাদের কেন হয়না সেই সব ছেঁদো প্রাদেশিকতাতে না গিয়ে একে অনায়াসে এক অনন্য সৃষ্টির আখ্যা দেওয়া যায়। আমাদের মনে ধর্মের নামে যে মোহ বিস্তার লাভ করেছে, তাকে ধুলায় মেশাতে এরকম গল্প আরও জরুরি – ধর্ম মানুষকে মানুষ হতে শেখায়, এই অমর যীশু তাই বলে গেছেন, সমস্ত মহামানব তাই বলে গেছেন এবং যাচ্ছেন- কিন্তু শোনে কে? আমরা তো তাঁদের মিথ বানাতেই ব্যস্ত– ধরে বেঁধে এনে, শোকেসে সাজিয়ে রাখলেই আমাদের কাজ শেষ– সকাল বিকেল একটু প্রনাম ঠুকে গেলেই সাতখুন মাফ।

     কে জানে, প্রভু হয়ত আজও ঘুরে বেড়াচ্ছেন আমাদেরই আশে পাশে– মনে কষ্ট বুকে চেপে– আর মানুষের প্রতি তাঁর বুকভরা ভালোবাসা আর মানুষের ওপর তাঁর আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!