চিত্রক – ভ্যাচেস্লাভ রিব্যাকভ

দিগন্ত বিস্তৃত বনানী।

     ঘন অন্ধকারের স্তর স্বচ্ছ কিন্তু নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রেখেছে তার দেহকে। ঐ যেন কার চোখ, আগুনের মত ঝলসে উঠল। একটা জানোয়ার? নাকি কোনো অশরীরী? ভয়ে সে জমে গেল, চেপে রাখল শ্বাসপ্রশ্বাস।

     দুবার চিত্রক হেঁটে গেল জঙ্গল মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান দিয়ে। গাঢ় নীল শান্ত আকাশে তারারা জ্বল জ্বল করছে, এই ভয়ংকর জঙ্গল থেকে অনেক উঁচুতে। কিন্তু তারপরেই তাকে ঢুকতে হল প্রাচীন গাছগুলোর মাটির গা ঘেঁষা বিস্তীর্ণ শাখাপ্রশাখার জালের তলায়, গুল্মময় ঝোপের মিঠে আলিঙ্গনে। জঙ্গলটা হঠাৎ চিক্কুর ছেড়ে গর্জে ওঠে, মাঝেমাঝেই অদ্ভুত প্রতিকূল নিঃশ্বাস ছাড়ে। সময় থেকে সময়ান্তরে – কারা যেন পা টিপে টিপে হেঁটে যায়। জানোয়ার? নাকি কোনো বিদেহী? 

     চিত্রক আশা করেছিল সে কু-য়ু পাখির ডাক শুনতে পাবে, তার পিতৃপুরুষদের প্রাণপাখি। এর মানে সে ঠিক পথেই এগোচ্ছে, কিন্তু সমস্ত জঙ্গলটা অন্য স্বরে চিৎকার করে উঠছে। চিত্রক ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তার খোঁড়া পা তাকে অসম্ভব কষ্ট দিচ্ছে। তার শুকনো ঠোঁট জুড়ে যাচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে, সে ঠোঁট চাটল, ঠোঁট ভিজল না। তার জিভটাও একইরকম শুকনো হয়ে গেছে। জঙ্গল মধ্যবর্তী আরেকটা ফাঁকা জায়গা আসতে চিত্রক থামল। তার আহত মাথাটা হেলিয়ে উপরের দিকে তাকাল একবার। মাথার উপরে মহীরুহের অন্ধকার, আর তার থেকেও গাঢ়তর শাখা প্রশাখার বিমূর্ত কাঠামোর পিছনে ঝিলমিল করছে তারকারাজী, গড়িয়ে যাচ্ছে ঘূর্ণায়মান কৃষ্ণনীল উলটানো কড়াইয়ের গা বেয়ে।

     নক্ষত্রপুঞ্জ সবসময় চিত্রককে সাহায্য করে। শুধু একবার নক্ষত্র দর্শনান্তে সবথেকে জটিল চিত্রও পরিষ্কার ভাবে ধরা দেয় চিত্রকের তুলিতে। হায়, কেন অন্যেরা দেখেনা তারকামন্ডলীর এই অপূর্ব শিল্প?

     সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ভিজে মাটিতে, কাতরভাবে চাপা আর্তনাদ করে উঠল। কু-য়ু! সাহায্য কর!

     শুধু একটা সংকেত। আর কিছু চাই না, শুধু একটা সংকেত। বাকিটা তার উপরেই ছেড়ে দাও। সে বাতাসের মতই অবিশ্রাম বয়ে যাবে। আজীবন হাঁটতে থাকবে সামান্যতম যন্ত্রণাও বোধ না করে। যদি সে সঠিকপথে থাকে, এই কষ্ট যেন বিফলে না যায়।

     কিন্তু কোন সংকেত এল না…

(২)

     ভাল্লুকের ছবিটা অবশেষে সে শেষ করল। ক্রিয়াকর্ম অনুসারে এবারে এটাকে সরু সরু বর্শাকৃতির তীরে বিদ্ধ করতে হবে সমস্ত তথাকথিত স্থানে।  

     যূথটি ক্রমে বড় হচ্ছিল। একটা বড় গুহার প্রয়োজনীয়তা উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু যে একমাত্র গুহাটা তারা খুঁজে পেয়েছিল সেটা ছিল একটা বিশাল ভল্লুকের দখলে। ভল্লুকটাকে মারা প্রয়োজন কিন্তু তারা জানত না কিভাবে। যূথের সামনে এরকম ঘোরতর বিপদ বহুদিন আসেনি। যূথের সবথেকে বৃদ্ধ ব্যক্তিরাই একমাত্র জানতেন কিভাবে একটা ভাল্লুককে মারা যায়, কিন্তু তাদের প্রত্যেকের গল্পই আলাদা আলাদা ছিল।

     দেওয়ালে একটা ছায়া পড়ল। চিত্রক একটা পরিচিত নিঃশ্বাসের শব্দ শুনল তার পিছনে। সে ঘুরে দাঁড়াল। যূথপতি ছবিটা দেখল কিছুক্ষণ তারপরে বলল,

     “ভালোই।” কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে যোগ করল, “এতেই চলবে।”

     “এতেই চলবে?” চিত্রক অবাক হল।

     “অনেক এঁকে ফেলেছ।”

     “আমি তো এখনো বর্শাগুলোই আঁকিনি। ওগুলো বাকি আছে।”

     “না। আঁকতে হবে না।”

     “আঁকব না?”

     “না। এই ছবির চারিদিকে আমরা আর নাচব না।”

     চিত্রক তার রঙ ভর্তি হাতদুটো নামিয়ে নিল, “আমরা ভালুকটাকে মারতে যাব না?”

     যূথপতি অন্যত্র দৃষ্টিনিক্ষেপ করল।

     “আমরা ভালুকবধে যাব।” সে বলল, “কিন্তু এখন থেকে আমরা আর ছবির পাশে নাচব না। তুমি বর্শা আঁকবে না। তুমি আর কিছুই আঁকবে না!”

     চিত্রক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার সহযোগী শিষ্য, যে তৎপরভাবে মাটি গুলছিল, সেও উঠে দাঁড়াল।

     “কিভাবে আমরা বর্শাগুলো না এঁকে থাকব?” হতবুদ্ধি হয়ে প্রশ্ন করল চিত্রক, “আর কিভাবে কিছু না এঁকে থাকব?”

     “আমরা ঠিক করেছি যে এবার থেকে তুমি দলের অন্য সবার মতই শিকারে যাবে।” যূথপতির গলার স্বর হঠাৎ অত্যন্ত দৃঢ় হয়ে উঠল। “তুমি আর তোমার চ্যালা, দুজনেই। আর ছবি আঁকার দরকার নেই। তোমরা দুজনে যেটার পিছনে সময় নষ্ট করছ তা যেকোন বুড়িই করতে পারে। এটা বোকামো।”

     সে কিছুক্ষণের জন্যে থামল।

     “আর ছবিটবির দরকার নেই। আমরা সব মুছে দেব।” আর সে চওড়াভাবে হাত ঘোরাল সম্পূর্ণ দেওয়ালটার উপরে যেখানে চিত্রক ছবি আঁকত।

     চিত্রক যূথপতির দিকে তাকাল, তারপরে তার ছবিগুলো দেখল। যত ধরনের জীবজন্তু মানুষ দেখেছে এবং মানুষও; সব আঁকা আছে সেখানে। অনন্ত আকাশের এক টুকরো তাদের সবার বুকের মধ্যে আছে, আর তারারা ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যেক শিরা উপশিরা বেয়ে। চিত্রক বাঁচতে পারবে না আঁকা ছাড়া।

     “আমি তোমাকে মুছতে দেব না।” কঠিন গলায় বলল চিত্রক, ঘুরে দাঁড়াল যূথপতির দিকে আবার। “এগুলো থাকবে।”

     কথার জোর বোঝাতে সে দাঁত দেখাল আর হিস হিস শব্দও করল হিংস্রভাবে। যদিও সে জানতো, তারা যদি সিদ্ধান্ত নেয় মুছে ফেলবে তাহলে মুছে ফেলবেই। কিন্তু কেন?

     “সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে।” যূথপতি বলল চিত্রকের চোখে চোখ রেখে। “এগুলোর কোন দরকার নেই। এগুলো শুধু আমাদের সর্বনাশই করছে।”

     “কি সর্বনাশ করছে? কার সর্বনাশ করছে?” চিত্রক জিজ্ঞেস করল।

     যূথপতি হঠাৎ হাত মুঠো করল। তার একেকটা মুষ্টি চিত্রকের মাথার সমান। চিত্রক ওগুলো না দেখার চেষ্টা করল।

     “কি সর্বনাশ করে?” সে দাঁত খিঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, তার শিষ্যও হাত মুঠো করে দাঁড়িয়েছে তার পাশে। যূথপতি রাগী চোখে এক ঝলক দেখল শিষ্যকে তারপরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে মাটিতে বসল, অজস্র কাটাছেঁড়া দাগে ভর্তি শক্তিশালী পা দুটোকে ভাঁজ করে।

     “বসো” মাটিতে বাড়ি মেরে সে নির্দেশ দিল। “তুমি কথা বলতে চাও। ঠিক আছে আমরা কথা বলব। আর তুমি, যে মাটি মেখে রাখ, তুমিও বস। কিন্তু এখানে নয়, ওখানে। আমি চাইনা তুমি কিছু শোন।”

     “কেন ও শুনবে না?” চিত্রক প্রশ্ন করল। “ও আমার জন্যে মাটি মাখে, আমি বলছি ও থাকবে।”

     “তোমার আদেশ দেওয়ার কোন ক্ষমতা নেই।” যূথপতি বলল, “আমি চাইনা ও কোন কথা শুনুক।”

     “আমাকে যা বলবে তা ওকেও বলতে হবে।” চিত্রক গোঁয়ারের মত বলল। যূথপতি শিষ্যের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে নিজের লোমশ বুকে আঘাত করল। শিষ্য দূরে সরে গেল। যূথপতি চিত্রকের দিকে ফিরে তাকাল।

     “তুমি ছবিতে বর্শা দিয়ে ভাল্লুককে এফোঁড় ওফোঁড় কর।” সে বলল, “সবাই ছবির সামনে নাচে, বুড়োরা পূর্বপুরুষদের আত্মার কাছে সৌভাগ্য কামনা করে, আর তারপরে সত্যিকারের বর্শারা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।”

     “তো আমাদের আরও বর্শা আঁকতে হবে…” চিত্রক রাগে ফেটে পড়ল, কিন্তু যূথপতি তাকে কথা শেষ করতে দিল না।

     “তুমি ছবি আঁকো আর আমরা শিকার করি। তুমি গুহায় বসে থাকো আর আমাদের শিকারে ভাগ বসাও। যখন আমরা বাইরে রোদে পুড়ে জলে ভিজে বুনো জন্তুর নখে আহত হয়ে মাংস নিয়ে আসি, তখন তোমার শিষ্য এই গুহার নিরাপত্তায় বসে তোমার জন্যে মাটি মাখে। আমি বলছি না যে এগুলো তোমার দোষ, এর জন্যে আমরা তোমাকে মেরেও ফেলব না। কিন্তু আমাদের দলের মানুষদের বিশ্বাস কমে যাচ্ছে। আগে ওরা ভাবত ‘জয়ের ছবি’ আমাদেরকে জঙ্গলের যুদ্ধেও জয় এনে দেবে। কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি ছবি কোন সাহায্যই করে না! ছবি পুরো ব্যাপারটাকে আরও খারাপ করে তুলেছে, কারণ তুমি আর তোমার শিষ্য আমাদের সঙ্গে শিকারে যাওনা। দলের অন্যেরা এই ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখছে না।”

     চিত্রক হতবাক্‌ হয়ে বসে রইল। অনেকক্ষণ বাদে সে বলল, “আমি আঁকব।”

     “না। তুমি আঁকবে না।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে যূথপতি বলল, “তুমি শিকারে যাবে।”

     “আমি সুন্দর করে আঁকব।” চিত্রক ঘাবড়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা আঙ্গুলে হাত জড়ো করল। “বুড়োদের আত্মা ডাকতে বেশী কষ্ট করতে হবে না।”

     যূথপতি উঠে দাঁড়াল। দূর থেকে দেখে চিত্রকের শিষ্যও উঠে দাঁড়াল যদিও সে জানে না যূথপতি কি বলেছে।

     “দলের লোকেরা তাও ভেবেছে।” যূথপতি বলল, “তারা ভাবে, ‘লোকটা ভালোই আঁকে তা সবাই জানে। কেউ জানে না বুড়োরা কতটা কঠোরভাবে প্রার্থনা করে, তাই তাদেরকে আরও চেষ্টা করতে বলা যায় না।’ এটাই দলের লোকদের সবথেকে বাজে চিন্তা।”

     “আচ্ছা আমি শিকারে যাব আর তারপরে আমি আঁকব। ওদেরকে শুধু মুছতে বারণ কর।” চিত্রক উঠে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করল।

     যূথপতি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তার কপালে ভাঁজ পড়ল গভীর চিন্তায়। কিছুক্ষণ পরে সে বলল, “বেশ। আমি তোমাকে ভাল্লুক আঁকতে দেব আর বর্শাও। যত ইচ্ছা বর্শা তুমি আঁকতে পারো। তবে বুড়োরা প্রার্থনা করবে না। আর আমরাও ভাল্লুকটাকে আক্রমণ করব না। তুমি আর তোমার শিষ্য সুন্দর করে আঁকবে। এবং তারপরে তোমরা দুজনে গিয়ে ওটাকে মারবে! আর তুমি যদি ওটাকে মারতে না পারো তাহলেই বোঝা যাবে তোমার ছবির ক্ষমতা নেই, তাহলে আর ছবি আঁকার কোন প্রয়োজনও থাকবে না।”

     “শুধু আমরা দুজন?”

     “হ্যাঁ।” যূথপতি তার সিদ্ধান্ত জানাল, “সেই জন্যে ভালো করে আঁকো।”

(৩)

     শিষ্যটি মারা গেছে। কু-য়ু পাখিটাও নিশ্চুপ। চিত্রক আর হাঁটতে পারছে না।

     ভালুকটার কিচ্ছু হয়নি। এবার ওরা সমস্ত ছবি মুছে দেবে।

     এই চিন্তাটা চিত্রককে টলিয়ে দিল। সে জলকাদার মধ্যে নড়তে শুরু করল, উঠে দাঁড়ানোর জন্যে। যদি তাকে কেউ একটু সাহায্য করত… কিন্তু কেউ করবে না। হাওয়া খিমচে ধরেই চিত্রক ওঠার চেষ্টা করল, দাঁতে দাঁত চেপে রেখে যাতে তার মুখ থেকে কাতরধ্বনি না বেরোয়।

     সে আর্তনাদও করতে পারবে না, জঙ্গল সবসময় কান পেতে থাকে আর্তনাদের খোঁজে। কাতরধ্বনি মানেই সহজ শিকার। সাহায্যের প্রার্থনা সবার আগে সাড়া দেয় ঘাতকরা।

     তাকে উঠে দাঁড়াতেই হবে। তাকে দলের কাছে পৌঁছতেই হবে। একমাত্র তারাই তাকে সাহায্য করবে। তারাও তো মানুষ..!! যদি যূথপতি আজ্ঞা দেয়… যদি বুড়োরা অনুমতি দেয়…

     নিজেকে কোনরকমে টেনে তুলল সে। টলতে টলতে হাঁটতে শুরু করল ঘন বনানীর দিকে।

(৪)

     সে শুয়েছিল মাটির উপরে, ঘন ঘন শ্বাস পড়ছিল তার। একজন বুড়ি উবু হয়ে বসে আছে তার পাশে। গাছগাছড়ার ওষধি মেশানো জলে ধুইয়ে দিচ্ছে তার ক্ষত। বুড়িটা অবোধ্য কিসব শব্দ বিড় বিড় করছিল আর সরু সরু খরখরে আঙ্গুলে ছুঁয়ে দিচ্ছিল ক্ষতস্থান। তার চামড়া কেটে ঝুলে পড়েছে আর ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে পিচ্ছিল মাংস। যূথপতি তাদের উপরে একটা পাথরের মত ঝুঁকে এল, তার মুখ গম্ভীর।

     “আমরা ভালুকটাকে মারতে পারিনি।” চিত্রক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমাদের সঙ্গে আরও লোক দেওয়া উচিত ছিল।”

     “আগেকার দিনে একটা লোকই যথেষ্ট ছিল একটা ভালুক মারার জন্যে।”

     “তারা উপায় জানত।”

     “কিন্তু তুমি তো জানো কিভাবে আঁকতে হয়!” অবাক হওয়ার ভান করে, যূথপতি বলে উঠল। “তাহলে তোমার কি দরকার জানার যে কিভাবে মারতে হয়?”

     চিত্রক কোন উত্তর দিতে পারল না। যূথপতি অপেক্ষা করল, তারপরে বলল, “এখন তুমি শুধু শিকড় জোগাড় করার যোগ্যই আছ।”

     এটা রীতিমতো অপমান।

     ভাল্লুক শিকারে যাওয়াটা তার দোষ ছিল না।

     পঙ্গু হয়ে যাওয়াটাও না।

     এটাও তার দোষ নয়, যে সারাজীবন তাকে মেয়েদের কাজ করতে হবে আর ফাঁকা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

     “আমি শিকড় জোগাড় করতে পারব না, আমার হাঁটার ক্ষমতা নেই।” তার ফোলা ঠোঁট দুটো কোনরকমে খুলে সে বলল, “আমি আঁকব।”

     যূথপতি দাঁত খিঁচাল।

     “ঠিক আছে। আরও হাজার কাজ আছে গুহার মধ্যে। তুমি শিকড় কাটবে, শিকারগুলোর চামড়া ছাড়িয়ে মাংস আলাদা করে রাখবে। কাউকে না কাউকে নোংরা কাজগুলো তো করতেই হবে। তুমি এমনিতেই ছবি বানানোর জন্যে কাদামাটি ইত্যাদি নোংরা ঘাঁটতে অভ্যস্ত। এটা তোমার জন্যে খুব একটা কষ্টদায়ক হবে না।”

     “আমি নোংরা কাজগুলো করব। তারপরে আমি আকঁব।” চিত্রক শান্তভাবে যূথপতির বিরোধিতা করল।

     যূথপতির দেহের পেশীগুলো বিস্ফারিত হল, সে জোরে চেঁচিয়ে উঠে দিয়ে নিজের বুকে আঘাত করল মুষ্টিবদ্ধ দু হাত দিয়ে। বুড়িটা ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠল। তার শক্ত শুকনো হাঁটু এসে গুঁতো মারল চিত্রকের আহতস্থানে। অসম্ভব যন্ত্রণা চিরে দিল তাকে, তার মনে হল আকাশ থেকে মহান আগুন নেমে এসে তাকে ঝলসে দিচ্ছে। চিত্রক পাগলের মত ছটফট করতে লাগল নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত পশুর চামড়াটার উপরে।

     যূথপতি শান্ত হল। সে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল আর দয়াপরবশতঃ চিত্রকের দেহের তলার চামড়াটা সোজা করে দিতে দিতে বলল, “ছবিগুলো মুছে ফেলাটা জরুরী।”

     চিত্রক চোখ বুজে ফেলল।

(৫)

     শিকড় কাটা, মাছের আঁশ ছাড়ান আর পশু চামড়া পরিষ্কার করার কাজে সে এখন নিযুক্ত। সবাই তার দিকে তাকিয়ে হাসে। কখনো কখনো সে বেরিয়ে আসে গুহার বাইরে। চুপচাপ বসে থাকে ফাঁকা জায়গায়। পরিষ্কার খোলা বাতাসে ফুসফুস ভরে শ্বাস নেয় আর তাকিয়ে থাকে নিবিড় অরণ্যের দিকে। হাঁটতে তার কষ্ট হয়, কিন্তু যখন সে বসে থাকে, সূর্যের তপ্ত রশ্মি ছুঁয়ে যায় তার বাঁকাচোরা দেহটাকে, চিত্রক তখন আধবোজা চোখে স্বপ্ন দেখে।

     কদাচিৎ যখন প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়া বুড়িগুলো বাচ্চাদের নিয়ে গুহার বাইরে যায়, সে একলা থাকে গুহা পাহারা দেওয়ার জন্যে, তখন সে হেঁটে হেঁটে সেই দেওয়ালটার কাছে যায়। ছবিগুলোকে মুছে দেওয়া হয়েছে বহুদিন হল, কিন্তু চিত্রক দেওয়ালটা স্পর্শ করে, সেখানে এখনো শুকনো মাটি লেগে আছে, থাকবেও। সে শীতল কঠিন পাথরের গায়ে আঙ্গুল বোলায়, মনে মনে ছবি আঁকে।

     একদিন হঠাৎ, পুরনো দিনের মতই, সে একটা রেখা এঁকে ফেলল, তারপর আরও একটা। যদি ওটা দৃশ্যমান হত তাহলে সবাই দেখত, একটা হরিণ তার অবাক কটাক্ষে তাকিয়ে আছে দেওয়ালের গা থেকে…

     ইতিমধ্যে, বুড়োরা মনে করার চেষ্টা করতে লাগল কিভাবে ঐ ভাল্লুকটার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। যদিও তাদের প্রত্যেকেই দাবি করতে লাগল যে সেইসময়ে অন্যেরা খুবই ছোট ছিল ঘটনাটা ঠিকভাবে মনে করার জন্যে। এই কারণে যূথপতি আরেকবার আক্রমণের ঝুঁকি নিতে ভরসা পেল না।

     একদিন চিত্রক গুহার বাইরে বেরল, একটা শক্ত লাঠিতে ভর দিয়ে। সে হেঁটে হেঁটে গেল সেই জায়গাটায় যেখান থেকে সে আর তার শিষ্য মাটি নিয়ে আসত।

     বেশ খানিকটা সময় লাগল তার জায়গাটায় গিয়ে পৌঁছাতে। যতটা পারা যায় মাটি বয়ে আনার চেষ্টা করল সে, টেনে হিঁচড়ে, ঘষটে ঘষটে, থেমে, শ্বাস নিয়ে। এক জায়গায় সে বসল তার পঙ্গু পা টাকে রেহাই দিয়ে। লাঠির গিঁটে চিবুকটা রেখে একটু হাঁপিয়ে নিল। সে দেখতে পেল একটা পাথর, তাদের গুহার থেকে বেশীদূরে নয়। সে মাটিটা ঘাঁটতে শুরু করল, খানিকটা অপটুভাবে কিন্তু গভীর ভালবাসা আর যত্ন নিয়ে। সে অনুভব করল ধীরে ধীরে একটা ছবি তৈরি হচ্ছে অনেকদিন পরে।

     তারপরে সে শুয়ে পড়ল, অবসন্ন দেহটা বিছিয়ে দিল নরম ঘাসে। পরিষ্কার আকাশ। চিত্রকের মনে পড়ল সে বহুকাল নক্ষত্রখচিত আকাশ দেখেনি। সে উঠে বসল, আর আঁকাটা শুরু করল।

     আবার একবার সে দেখতে পেল সেই বিশাল ধূসর রাক্ষসটা নিঃশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তাদের উপরে। তার সহকারী চিৎকার করে উঠল, তারপরেই বুক কাঁপানো গর্জন করে উঠল ভাল্লুকটা, রক্তের গন্ধে। বিশাল ভাল্লুকটা যখন তার লোকটিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তার বিশাল লোমশ শরীরের তলা থেকে বেরিয়ে থাকা দুটো অসহায় পা কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ভাল্লুকটার নাক লাল। চিত্রক পিছিয়ে এসেছিল ভয়ের চোটে, বোকার মত আঁকড়ে ধরে রেখেছিল হাতের বর্শাটা। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিল সে। সবকিছু ঘটে যাচ্ছিল পলক ফেলারও আগে। তার সহকারী তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। সে চিত্রকের দুর্বল দেহটাকে সরিয়ে এনেছিল শক্ত হাতে আর এগিয়ে গিয়েছিল।

     ভাল্লুকটা মাথা তুলল, চাপা গরগরানি শোনা গেল শ্বদন্তের আড়ালে। চিত্রক পিছাতে গিয়ে উলটে পড়ে গেল মাটির উপরে চিৎপাত হয়ে, তবু সে সামলে রেখেছিল বর্শাটা। ভাল্লুকটা তাদের আক্রমণ করল। চিত্রক বর্শাটা ছুঁড়ল ভাল্লুকের দিকে, কিন্তু জন্তুটা গরগরানি তাতে শুধু বেড়েই গেল। চিত্রক ছিলা ছেঁড়া ধনুকের মতই লাফিয়ে উঠেছিল মাটি থেকে, ভাল্লুকটাও ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়াতে লাগল, গুমগুম করে বাজ পড়ার মতন পাথর আর নুড়ির একটা বিশাল সম্প্রপাত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল, ধূলোর মেঘ উড়িয়ে।

     সে ছবি আঁকছিল। সে গল্প বলছিল, কাঁদছিল, মিনতি করছিল, “দয়া করে হেসো না! যা ঘটেছে তাতে হাসির কিচ্ছু নেই।”

     সে একটা আঁকা শেষ করল, তারপরে দ্বিতীয়টা, তারপরে তৃতীয়টা, চতুর্থটাও… স্মৃতি থেকে টেনে এনে সমস্ত দৃশ্যগুলোকে সে ফুটিয়ে তুলল, ঠিক যেমন যেমন সে দেখেছিল। প্রতিটা ছবিতে সে রঙ লেপে দিল। তার হাত কাঁপছে, কাঁপছে সারা শরীর। সে প্রার্থনা করল, শুধু এক মুহুর্তের জন্যে সবাই যেন অনুভব করে তার যন্ত্রণা, তার কষ্ট, ওরা বুঝবে তাহলে! তাকে নিয়ে উপহাস করা বন্ধ করবে। এবার সে নিজেকে আঁকল, পঙ্গু, বাঁকাচোরা, একটা শুকনো ঘাষের শিষের মত, শুয়ে আছে পশুচামড়ার উপরে আর… আর … পাশে একটা শুন্য দেওয়াল।

(৬)

     অনেকরাত্রে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে তখন সে গুহায় ফিরল। ক্লান্ত শরীর, তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। শ্রান্তির নিবিড় আলিঙ্গন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। বহুদিন পরে গভীর আরামে সে শুতে না শুতেই ঘুমিয়ে পড়ল। সেই রাত্রিতে সে একবারও যূথপতি আর ভালুকের দুঃস্বপ্নগুলো দেখল না।

     দুপুর গড়ানোর আগেই যূথপতি এল তার কাছে। তার নাসারন্ধ্র ফুলে ফুলে উঠছে, রাগে তার ঠোঁট বেঁকে দাঁত দেখা যাচ্ছে। সে আচমকা জিজ্ঞেস করল। “তুমি আবার এঁকেছ?”

     চিত্রক তার হাতের মাছটা সরিয়ে রাখল। “হ্যাঁ, আমি এঁকেছি।” সে উত্তর দিল। “আমি চিত্রক। মানুষ আর জন্তুদের আঁকি।”

     “কেন এঁকেছ? আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম না আঁকার।”

     “আমি আঁকতে ভালবাসি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমার বিরোধিতা সত্ত্বেও আমি আঁকব, কারন আমি আঁকতে ভালবাসি।”

     যূথপতি নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, “আর তুমি ওটা ঐভাবে এঁকেছ?” সে বলল। “তুমি যা এঁকেছ তা সবথেকে ভয়ানক!”

     “আমি যা দেখেছি তাই এঁকেছি। যা ভেবেছি তাই এঁকেছি।”

     “তুমি এঁকেছ কিভাবে ভাল্লুকটা তোমায় খেয়ে ফেলছে!”

     “হ্যাঁ।”

     “কিছু লোক ওটা এর মধ্যেই দেখে ফেলেছে। আরও লোক দেখবে। অবশ্যই আমরা ওটা মুছে ফেলব, কিন্তু আরও লোক তার আগেই দেখে ফেলবে। কেউ আর ভালুকটাকে আক্রমণ করার সাহস পাবে না। ওটা ভয়ঙ্কর!”

     “হ্যাঁ।” চিত্রক বলল, “ওটা ভয়ঙ্কর।”

     “তাই কি তুমি ওটাকে ঐভাবে এঁকেছ?”

     “না।”

     “তাহলে?”

     “আমি না এঁকে থাকতে পারিনি তাই।”

     চিন্তায় যূথপতির কপালে ভাঁজ পড়ল। “তুমি পুরো গোষ্ঠীকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ।”

     “আমি সেসব ভাবিনি।”

     “তাহলে কি ভেবেছিলে তুমি?”

     চিত্রক অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল, “আমি শুধু আমার কথাই ভাবছিলাম। যখন আমি আঁকছিলাম আমি ভাবছিলাম আমি কি চেয়েছিলাম। আমি কি ভালবাসি। আমার কষ্ট… যন্ত্রণা… আমি তার কথাও ভেবেছিলাম যে আমার মাটি মেখে দিত।”

     যূথপতি একবার চট করে চারিদিক দেখে নিল, কেউ তাদের কথা শুনছে কি না, তারপর সে আচমকা গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ভালুকটাকে আমার মত দেখতে কেন?”

     চিত্রক কোন উত্তর দিল না। সে এর উত্তর জানেনা।

     “আমি জানি।” যূথপতি বলল, “তুমি আমাকে দোষী সাব্যস্ত করতে চাইছ।”

     “না।” চিত্রক হতাশভাবে বলল, “আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না। আমি চাই সবার ভালো করতে।”

     “তাহলে যাও আর ওটা মুছে ফেল।” আদেশ দিল যূথপতি, “আর সম্পূর্ণ অন্যভাবে আঁকবে পুরোটা। তুমি যেভাবে এঁকেছ তাতে পুরো ব্যাপারটাই খুব ভয়ানক লাগছে। তোমার ভাল্লুকটাও বড়োই ভয়ংকর।”

     “ওটা আমার ভাল্লুক নয়। ওটাই আসল ভাল্লুক! ওটা ওরকমই।”      

     “তাহলে তুমি অন্য একটা আঁকবে। তুমি একটা ছোট্ট ভাল্লুক আঁকবে আর বড় বড় শিকারী আঁকবে, বড় বড় বর্শা হাতে। কেউ তাহলে ভয় পাবে না। আমি নিজে গোষ্ঠীর শিকারীদের নিয়ে যাব তোমার ছবি দেখাতে। আর তারপরে, আমি তাদের ভাল্লুকটাকে মারতে পাঠাব।”

     “না।” চিত্রক বলে উঠল, “ভাল্লুক ওমন নয়। আমি পারব না অন্য কিছু আঁকতে… ওটা বাদ দিয়ে…”

     “তাহলে তোমাকে গোষ্ঠী থেকে খেদিয়ে দেওয়া হবে।” যূথপতি জানাল, “তুমি ঐ জঙ্গলের মধ্যে একলা একলা মরবে।”

     সহসা ব্যাথা অনুভব করল চিত্রক, তার সদ্য সেরে ওঠা ক্ষতে। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

     “যখন তোমার আঁকা পুঁচকে ভাল্লুক দেখে সবার সাহস ফিরে আসবে তখন ওরা যাবে আর ভাল্লুকটাকে মারবে আর আমরা একটা বড় গুহা পাব!”

     “আর যখন তারা দেখবে যে আসল ভাল্লুক বিশাল, তখন ওরা আরও ভয় পেয়ে যাবে কারণ ওরা ভেবে রেখেছিল যে ওটা একটা ছোট ভাল্লুক।”

     “তো কি হয়েছে?” যূথপতি শান্তভাবে বলল, “যখন ভাল্লুকটা ওদেরকে আক্রমণ করবে তখন ওরা অবশ্যই লড়াই করবে। কারন ওটা তাদেরকে বাধ্য করবে।”

     “ওটা অনেককে মেরে ফেলবে।”

     “হ্যাঁ। কিন্তু আমরা একটা বড় গুহা পাব।”

     “অনেকে মরে গেলে, বড় গুহা দিয়ে কি হবে?”

     যূথপতি এই কথাটায় আবার চিন্তায় পড়ল। “একটা বড় গুহা সবসময়ই ভালো।” সে বলল, “ভাল্লুকটাকে আমাদের মারতেই হবে, আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি ওটাকে আমরা মারবই। আমরা পারব না এটা বলা আর আমাদের মানায় না।”

     চিত্রকের কিছুই বলার ছিল না। সে মাথা নিচু করে বসে রইল।

     “আমি তোমাকে আবার আঁকতে দেব। নতুন গুহার নতুন দেওয়ালে। আমি তোমাকে একজন সহকারীও দেব।” যূথপতি নরমভাবে বলল, “এবার যাও। যা বললাম কর।”

     চিত্রক উঠে পড়ল, গুহামুখের দিকে চলতে লাগল। যূথপতিও তার সঙ্গে হাঁটতে লাগল, তার শক্তিশালী হাতে চিত্রককে ধরে রেখে। যূথপতির অবলম্বন এতটাই দৃঢ় যে কয়েক মূহুর্তের জন্যে চিত্রকের মনে হল সে আগের মতই শক্তিশালী হয়ে গেছে, কোনদিনও সে আহত হয়নি। কিন্তু যূথপতি গুহার বাইরে এসেই তাকে ছেড়ে দিল। চিত্রককে বাকি রাস্তাটা একাই যেতে হবে।

(৭)

     দুই তরুণ দাঁড়িয়ে আছে তার পাথরটার কাছে। তারা তাদের বর্শায় ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ছে পাথরের উপরে আর শান্তভাবে আলোচনা করছে নিজেদের মধ্যে। চিত্রক একটা ঝোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওদের চওড়া পেশীবহুল কাঁধ, পিঠ দেখতে দেখতে চিত্রক বিশ্রাম নিচ্ছিল নিজের লাঠিটাকে ধরে।

     “এই দেখ।” একজন শিকারী বলল আরেকজনকে। “এইখানেই ভাল্লুকটা আসলে লুকিয়ে থাকে।”

     “হ্যাঁ।” দ্বিতীয় শিকারী উত্তর দিল। “দেখ এটা কিভাবে ঝাঁপাচ্ছে। সামনের পা দুটো এগিয়ে আসছে কিন্তু পেটটা খোলা। যদি ঐসময়ে ওর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বর্শাটা তাক করে ধরা যায় তাহলে যেই এটা আমাদের উপরে ঝাঁপাবে ওমনি বর্শাটা গেঁথে দেওয়া যাবে ওর পেটে।”

     “কিন্তু এই লোকগুলো তা জানে না। আর এদিকে দেখ। ওটাকে ধোঁকা দিয়ে দুদিক থেকেও আক্রমন করা যায়!”

     “একদম। তোর মনে আছে আমাদের কায়দাটা? আমরা অবশ্যই ওটা ব্যবহার করব এখানে।”

     “এহে খুবই খারাপ, ওরা আমাদের কায়দাটা জানত না।”

     “আর বাজে ব্যাপার এই যে, ওরা এটাও জানত না যে কিভাবে ভাল্লুকটা লাফ দেয়”  

     “তার চেয়েও খারাপ হল ওরা জানত না যে ওটা কোথায় লুকিয়ে থাকে।”

     একটা অস্বস্তিকর নীরবতায় ছেয়ে গেল চারধার, তরুণ দুটি চুপচাপ পাথরটা দেখতে লাগল।

     “কিন্তু এখন আমরা জানি। তাই না?” একজন বলে উঠল। অপরজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বর্শাটা এহাত ওহাত ছুঁড়ে পরখ করে নিল।

     “হ্যাঁ।” সে বলল, “আমরা জানি।”

     তার আর কোন কথা বলল না। দৃঢ় মুষ্টিতে বর্শা দুটো ধরে একে অপরের দিকে তাকাল একবার তারপরে চলে গেল, ছায়ামূর্তির মতন, ঘন ঝোপের মধ্যে দিয়ে একদম নিঃশব্দে।

     চিত্রক মাটিতে বসে পড়ল। হঠাৎ তার খুবই দুর্বল লাগছে। তার খুব খারাপ লাগছে, সে যেতে পারছে না ঐ দুজনের সঙ্গে। আর যদি সে যেতে নাই পারে তাহলে নড়াচড়া করে কি হবে! তার জন্যে শুধু অনন্ত অপেক্ষা।

     হাল্কা কুয়াশা ভেসে বেড়াতে লাগল বাতাসে। জঙ্গলের ঝাঁজালো গন্ধ আরও তীব্র হয়ে তার নাকে জ্বালা ধরিয়ে দিল। আকাশ ক্রমে ধূসর হয়ে উঠল। নিরীহ বৃষ্টিধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল পাতার ফাঁক দিয়ে। বৃষ্টির জলে ছবিটা ধীরে ধীরে ধুয়ে যাচ্ছিল, মুছে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ বাদে ওটার কোন চিহ্নই থাকল না আর, শুধু কালো খসখসে পাথরটা পরে রইল। কিন্তু চিত্রক এসব কিছুই দেখল না। সে চেয়েছিল সেইদিকেই, যেদিকে তরুণ দুটি চলে গেছে। ওরা কাঁদতে শেখেনি, ওরা শক্তিশালী; তার মত নয়। ওরা এইমাত্র চলে গেল।

     “আমি ওদেরকে আঁকব।” চিত্রক ভাবল, “আমি নিশ্চয়ই ওদের আঁকব। শুধু ওরা ফিরে আসুক।”

অনুবাদ প্রসঙ্গেঃ

ভ্যাচেস্লাভ রীবাকোভ (Вячеслав Михайлович Рыбаков) (Vyacheslav Mikhailovich Rybakov) জন্ম ১৯ জানুয়ারি ১৯৫৪ লেনিনগ্রাদ, ইতিহাস বিজ্ঞানের ডক্টরেট, রাশিয়ার বিজ্ঞান অ্যাকাদেমির ইন্সটিট্যুট অব ওরিয়েন্টাল ম্যানাসক্রিপ্টস বিভাগে কর্মরত অসংখ্য পুরস্কারে সম্মানিত ও বর্তমানে রাশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় কল্পকাহিনি কথাকার। ১৯৭৯ তে প্রথম কল্পবিজ্ঞান গল্প প্রকাশ। দুটি কল্পবিজ্ঞান সিনেমার চিত্রনাট্যও লিখেছেন। তিনি সংস্কৃতির সাম্যে বিশ্বাস করেন, মনে করেন, নানান বিধিনিষেধের ফলে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য গণতন্ত্রবিরোধী হঠকারীতায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিভিন্ন সভ্যতার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলি বাঁচিয়ে রাখা দরকার। পাশ্চাত্যর আগ্রাসনে একীভূত সভ্যতা গড়ে উঠতে থাকলে তা আসলে সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা ডেকে আনবে যা ধ্বংসের নামান্তর।

বর্তমান গল্পটি  প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮১ সালের “Knowledge is Strength” পত্রিকার ৩য় সংখ্যায়। এটি ইংরেজিতে হোলি স্মিথ [রাদুগা প্রকাশন-এর ‘টাওয়ার অব বার্ডস সংকলন, ১৯৮৯], ইভ ম্যানিং [‘সোভিয়েত লিটারেচার পত্রিকা’, ১৯৮৪ #2(431) সংখ্যা] এবং Ralitsa Raitcheva [ডেভিড ডি কম্বস সম্পাদিত কম্বস প্রেস প্রকাশিত ‘দ্য আল্টিমেট আননোন’ পত্রিকা, শীত সংখ্যা, বসন্ত সংখ্যা ১৯৯৭] ও অনুবাদ করেছেন। বর্তমান অনুবাদটি ১৯৯৭ সালে Ilia Avroutine কৃত ইংরেজি অনুবাদের ভিত্তিতে করা হয়েছে।

কৃতজ্ঞতা: ভ্যাচেস্লাভ রীবাকোভ, Ilia Avroutine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!