চোখের আলোয় – আইজাক আসিমভ

বাংলা অনুবাদ - প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত

অলংকরণ:তৃষা আঢ্য

অ্যাডাম ওর বিগত ট্রিলিয়ন বছর ধরে সঞ্চিত স্মৃতিকে একটু একটু করে মনে করার চেষ্টা করছিল। কাজটা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। অসাধারণ একটা পরিকল্পনা খেলা করছে মাথায়। যদি… যদি নতুন কিছু করা যায়! একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন এক চেতনার স্রোত নিরন্তর ছড়িয়ে দিচ্ছিল মহাশূন্যের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। আইভি এখনও সাড়া দিচ্ছে না কেন?

‘হ্যাঁ, অ্যাডাম বল। তুমি কি প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছ?’

‘আইভি, আইভি এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি?’ অ্যাডাম নামক চেতনাপুঞ্জ যেন আনন্দে ঝলমল করে উঠল! ‘জানো আমি এই আন্ত-মহাজাগতিক প্রতিযোগিতার জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক শিল্প সৃষ্টির কথা ভেবেছি।’

‘সম্পূর্ণ নতুন?’ বহু অযুত আলোকবর্ষ দূর থেকে ভেসে আসা চেতনার স্রোত দপদপ করে উঠল। ‘কিন্তু এটা কি সম্ভব অ্যাডাম? শেষ দুশো মিলিয়ন বছরে নতুন কিছুই আবিষ্কৃত হয়নি যে! সভ্যতার শেষ সীমায় আমরা। নশ্বর দেহের অনেক ঊর্ধ্বে উঠে শুধুই কিছু চেতনা বেঁচে আছে এই মহাবিশ্বে। যার কোনও মৃত্যু নেই, ক্ষয় নেই। এই চেতনা মহাবিশ্বব্যাপী শক্তির অংশ হয়ে গেছে। যা শুধু পরিবর্তিত হয় অলঙ্ঘনীয় নিত্যতা সূত্র মেনে। তোমার সত্যিই কি মনে হয় আর নতুন কিছু আবিষ্কার হওয়ার বাকি আছে?’

‘আছে আইভি, আছে। আচ্ছা কেমন হয় আমরা যদি আবার সেই নশ্বর দেহেই ফিরে যাই? এটাই আমার পরিকল্পনা বলতে পারো। আমরা সকলেই তো রক্তমাংসেরই পদার্থ ছিলাম এক সময়, সেই কত লক্ষ কোটি বছর আগে। একে অপরকে দেখতে পেতাম আমরা, ধরা যেত—ছোঁয়া যেত। এখন আমরা পদার্থ দিয়ে বিভিন্ন বিমূর্ত বস্তুও তো সৃষ্টি করি, শিল্পের খাতিরেই। তাহলে কেমন হয় যদি আমরা নিজেদের প্রতিকৃতি তৈরি করি? তোমার ইচ্ছা করে না আইভি তুমি একসময় কেমন দেখতে ছিলে জানতে?’

‘আমার মনে নেই আমরা কেমন ছিলাম। কারোরই মনে থাকার কথা নয়।’

‘স্মৃতি তো নষ্ট হয় না আইভি। আমি কিছু কিছু মনে করতে পারছি। আমাকে একটু সাহায্য করো। আমাদের চেষ্টা যদি সফল হয় তাহলে শক্তিসত্ত্বাদের সম্মেলনে আমরা নতুন কিছু দেখাতে পারবো যা ওরা বহু অনন্তকাল ধরে দেখেননি।’

বহু আলোকবর্ষ বিস্তৃত ছড়িয়ে থাকা পদার্থের একটা হালকা স্তর নিয়ে অ্যাডাম কাজ শুরু করল। ধীরে ধীরে কিছু আণবিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পদার্থের স্তরটি একটা ডিমের আকার ধারণ করল। খুশিতে অ্যাডামের মধ্যে ছোট ছোট কম্পন সৃষ্টি হচ্ছিল। ‘এটাকে ওরা কী বলত জান? মাথা!’

কিন্তু প্রাণচঞ্চল আইভির তরঙ্গে যেন একটু বিষণ্ণতার ছোঁয়া লেগেছে। স্মৃতির সরণীতে যতই সে পিছিয়ে যাচ্ছে ততই যেন তার চেতনায় বিষাদের গাঢ় মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। কিছুতেই সে পুরোনো কথা মনে করতে চায় না। কিছুতেই না!

‘মাথার মাঝামাঝি লম্বালম্বি ওই জিনিসটাকে নাক বলে।’ আইভি বলল।

‘হ্যাঁ, একে সেইসময় নাকই বলত। আর মাথার দু’পাশে একে কী বলত মনে আছে? এই অঙ্গ দিয়ে শব্দ শুনতাম আমরা। একে… একে কান বলে!’ অ্যাডাম এর চেতনা তরঙ্গে খুশির ছোঁয়া লাগছিল। আসতে আসতে একটা অবয়ব যেন তার সামনে ফুটে উঠছে। ‘এটা কণ্ঠা, এটা গাল, এটা মুখ! কিন্তু তবু তবু… কী যেন একটা নেই?’

‘আমার মনে পড়ছে অ্যাডাম। বহু লক্ষ কোটি বছর আগের কথা! কিন্তু কেন তুমি আমাকে মনে করালে? আমার মনে পড়ছে আমার এরকমই একটা ঠোঁট ছিল। অভিমানে কেঁপে কেঁপে উঠত কখনও!’ আইভির চিন্তাতরঙ্গ যেন হাহাকারের মতো শোনাল।

অ্যাডাম একটু থমকে গেল। ‘কিন্তু মনে করতে অসুবিধাই বা কোথায়?’

‘কারণ তুমি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছ যে আমি একসময় একটি মেয়ে ছিলাম। আমি ভালোবাসতে জানতাম। আর যেটা তুমি মনে করতে পারছিলে না সেটা হল চোখ। হ্যাঁ, আমারও দুটো চোখ ছিল, আর সেটা দিয়ে শুধু আমরা দেখতাম না অ্যাডাম… সেটা শুধুই ইন্দ্রিয়মাত্র ছিল না! মনের বিষাদের ছায়া যেমন পড়ত সেই চোখে, আবার খুশিতেও ঝলমল করে উঠত। চোখেরও একটা ভাষা ছিল, যা এখন আর আমি অনুভব করতে পারি না।’ বলতেই বলতেই গভীর আক্রোশে সে পদার্থের অবয়বটায় চক্ষুদান করল। তারপর নিমেষে মিলিয়ে গেল মহাবিশ্বের অন্ধকারে।

অ্যাডাম স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে ছিল অবয়বটার দিকে। সেও মনে করতে পারল সে একসময় মানুষ ছিল। বহু যুগের ওপার থেকে সেই স্মৃতির মূর্ছনা তার চেতনায় অবিরাম ঝরে পড়তে লাগল। এই অভিঘাত সে সহ্য করতে পারল না। অনন্ত এই জীবনের অভিশাপে তার চেতনাও ভেসে গেল নক্ষত্রপুঞ্জে।

ওদিকে সেই অবয়বটার চোখ দুটো যেন ছলছল করছিল, হয়তো বা আইভিরই ফেলে যাওয়া বিষাদের স্পর্শে। সে আসলে কাঁদছিল। কাঁদছিল সেই ফেলে আসা নশ্বর জীবনের জন্য। সেই অচিরস্থায়ী মানবতার জন্য। যা আর কখনও ফিরে আসবে না। কোনওদিন না!

মূল গল্প: আইজ ডু মোর দ্যান সি

লেখক: আইজাক আসিমভ

5 thoughts on “চোখের আলোয় – আইজাক আসিমভ

  • May 3, 2020 at 4:25 am
    Permalink

    ছোট্ট গল্প, কিন্তু জীবন চেতনায় সম্পৃক্।

    Reply
  • May 3, 2020 at 2:54 pm
    Permalink

    অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের মাঝে এক অদ্ভুত আখ্যান। অনুবাদও চমৎকার।

    Reply
  • May 4, 2020 at 1:53 am
    Permalink

    আহ! আসিমভ! তাঁর চিন্তার ধরনটাই অন্যরকম ছিলো। নশ্বর জীবনের একটা ভিন্ন রকমের আনন্দ আছে। কী চমৎকার করে লেখক এটি ফুটিয়ে তুলেছেন!

    অনুবাদের ব্যাপারে আর কী বলব! এককথায় খুবই চমৎকার।

    Reply
    • May 6, 2020 at 8:25 pm
      Permalink

      অনুবাদ চমৎকার। অলঙ্করণও অনবদ্য।

      Reply
  • May 7, 2020 at 10:32 am
    Permalink

    ছোট্ট লেখা, কিন্তু তাৎপর্যের দিক দিয়ে বিশাল। অনুবাদ ভারি স্বচ্ছন্দ। ভালো লাগল।

    Reply

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!