ছায়াশরীর

৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১, নিউ ইয়র্ক শহর। আবার একটা বড়ো লাইন সারি সারি মাথার। এই ধরনের সমারোহে অবশ্য এই শহরের নাড়ির যোগ হয়ে গেছে সেই দু-বছর আগে থেকে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে একের পর এক কলকারখানাগুলো বন্ধ। সরকারি উদ্যোগে রুটি বিতরণ চলেছে প্রায়ই, যার জন্য এই ধরনের লম্বা আর সর্পিল জন-অরণ্য! হয়তো সেই রকম কোনও এক লাইনই হবে এটা। আর একটু কাছে গিয়ে দেখে বোঝা যায় সারিবদ্ধ হয়ে হাঁটতে থাকা নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর মুখভঙ্গি অন্যরকম, একটু যেন অজানা কিছুর প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে চলেছে সামনে। লাইন এসে থামল দক্ষিণ ব্রঙ্কস্‌ অঞ্চলের গলি ঘুঁজি পেরিয়ে একটা ভাঙাচোরা দালানের সামনে। এটা একটা সিনেমা হাউস। এই অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষেরা নিজেদের উদ্যোগে কয়েক বছর ধরে একটা প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করেছে এই পুরোনো বাড়িটাতে। ম্যানহাটন বা ব্রুকলিনের বৈভব হয়তো নেই এই সিনেমাতে। সিটগুলো অবশ্যই নয় গদি আঁটা। তবু ওই অর্ধ-ক্ষুধার্থ মানুষেরা এরই রূপোলি পর্দায় তাদের ভাগের সুখটুকু খুঁজতে আসে। আজ তবে একটা অন্য রকমের প্রাপ্তির আশা ওদের। নিছক আনন্দ না, বরং ভয় পেতে এসেছে ওরা। যে ছবিটা দেখতে আসা সেটা দিন দুই আগে, মানে ১২ ফেব্রুয়ারি নাগাদ মুক্তিলাভ করেছে প্রসিদ্ধ রক্সি থিয়েটারে এবং এই দু-দিনের মধ্যেই তার জনপ্রিয়তার পারদ ঊর্ধ্বমুখী। এই ছবিটা হল ব্রাম স্টোকার সাহেবের ১৮৯৭ সালে রচিত প্রসিদ্ধ উপন্যাস অবলম্বনে সেই একই নামের চলচ্চিত্র ‘ড্রাকুলা’। 

ড্রাকুলা (১৯৩১) চলচ্চিত্রে ড্রাকুলারূপী বেলা লুগোসি

  

  ইতিহাস সাক্ষী যে সেই অস্থির সময়েও আমেরিকার খেটে খাওয়া মানুষেরা এই ছবি দেখেছে গভীর আগ্রহে। সত্যি ভাবতে অবাক লাগে যে সময় দারিদ্র্য নামের দৈত্যটা সারা দিন ধরে ভয় দেখাচ্ছে ওই মানুষগুলোকে, তখন আবার নিজেদের পয়সা খরচ করে ভয় পেতে এসেছে ওরা রাতের বেলা। ওই একই ছবি আবার স্প্যানিশ ভাষাতেও মুক্তিলাভ করেছিল সেই সময়। উল্লেখযোগ্য যে একই স্টুডিওর সেটে ইংরেজি ও স্প্যানিশ দুই ছবিরই শুটিং চলেছে। দিনেরবেলা ইংরেজি ছবিটার শুটিং চলছিল আর সেই স্টুডিও রাশপ্রিন্ট দেখে নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিত স্প্যানিশ ছবিটার কলা কুশলীরা। আজ অনেক সিনেমাপ্রেমীর মতে বেলা লুগোসি অভিনীত অতি বিখ্যাত ইংরেজি ছবিটার চেয়েও নাকি স্প্যানিশ সংস্করণটার গুরুত্ব বেশি! এই ছবিকে নিয়ে ওই উন্মাদনা হয়তো আন্দাজ করাই যাচ্ছিল কয়েক বছর আগে নিউ ইয়র্কের প্রসিদ্ধ থিয়েটার পাড়া ব্রডওয়েতে মূল উপন্যাসের ওপর নির্মিত নাট্যরূপের বিরাট জনপ্রিয়তা দেখে। উল্লেখ্য যে ওই নাটকেও মূল ভূমিকায় ছিলেন জন্মসূত্রে হাঙ্গেরিয়ান অভনেতা বেলা লুগোসি। পিছিয়ে যাওয়া যাক প্রায় দশ বছর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত জার্মানি। ভাইমার রিপাবলিকের আমল তখন। জার্মানির কৃষ্টিতে জন্ম নিল এক নতুন ধরনের দার্শনিক বীক্ষণের, সময় যাকে চিহ্নিত করেছে ‘জার্মান এক্সপ্রেশনিজম’ নামে। এই মতবাদের চিহ্ন সেই সময় ধরা পড়ছে অঙ্কনচিত্রে, নাটকে এমনকি নতুন মাধ্যম চলচ্চিত্রে। ১৯২০ সালেই এই ধারার বিখ্যাত ছায়াছবি ‘দ্য ক্যাবিনেট অফ ড. ক্যালিগোরি’ নির্মিত হয়ে একাধারে বিখ্যাত আর বিতর্কিত হয়েছে। তার পরের বছর মানে ১৯২১ সালে নবীন পরিচালক ফ্রিডরিশ ভিলহেল্ম মুর্নাও ড্রাকুলা উপন্যাস আর পূর্ব ইউরোপের কিছু প্রচলিত জনশ্রুতিকে কেন্দ্র করে এই ধারায় একটি ছবির পরিকল্পনা করলেন। লেখা হল চিত্রনাট্য। কিন্তু ব্রাম স্টোকারের উত্তরসূরিদের কাছ থেকে পাওয়া গেল না প্রয়োজনীয় অনুমতি। অগত্যা কাউন্ট ড্রাকুলা এই ছবিতে হলেন ‘কাউণ্ট ওরলক’। ছবির নাম হল ‘নসফেরাতু’। এই নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে মূলত রুমানিয়া দেশের প্রাচীন এক জনশ্রুতি যা অশুভের দ্যোতক। এই ছবিও যথারীতি অত্যন্ত সফল। শুধুমাত্র ব্যবসার নিরিখে নয়, বরং চিত্র-সমালোচকদের বিচারে ভয়ের মধ্যেও এক উত্তুঙ্গ নান্দনিকতা প্রকাশিত হয়েছে এর ফ্রেমে।

নসফেরাতু (১৯২২) চলচ্চিত্রের এক বিখ্যাত দৃশ্য

এরপর বারবার এই উপন্যাসের নানা রূপান্তর ঘটেছে। যার বেশ কিছু আজ ইতিহাস। এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধের পরিসরে আমরা শুধু ধরে নিচ্ছি মূল উপন্যাসটির ‘Canonical’ রূপান্তরকেই। কিন্তু এই ধারাবাহিক সফলতার উৎস সন্ধানে যাত্রা করতে গেলে আমাদের ছুঁয়ে দেখতে হবে মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপের এক সন্ধিক্ষণের ইতিহাস এবং রাজনীতিকে।

    ইতিহাস, সমাজবিদ, দার্শনিকদের মতে ড্রাকুলা উপন্যাসের মূল কাঠামো যাকে ঘিরে তিনি এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। রুমানিয়ার সুপ্রাচীন ‘বাসারাব’ বংশের একটি শাখা ‘ড্রাকুলেস্‌তি’ বা ‘ড্রাকুলিয়া’। এই বংশেরই উত্তরাধিকারী প্রিন্স তৃতীয় ভ্লাড (Vlad III, 1431–1477)। জীবিতকালেই যিনি একাধারে বিখ্যাত এবং অন্যদিকে অতি ঘৃণিত হয়েছিলেন। মৃত্যুর পরে তাঁর নামের সঙ্গে ৎসেপেশ (Tepes) শব্দ জুড়ে যায়। ইংরেজি পরিভাষায় যাকে Impaler বলা হয়। এই শব্দটা এসেছিল ভ্লাড ড্রাকুলিয়ার বিচিত্র আর নারকীয় শাস্তির পদ্ধতি থেকে। শত্রুদের শরীর অনেকটা আমাদের দেশের শূলে চড়ানোর মতো একটা বিশাল বর্শায় গেঁথে পথের ধারে উন্মুক্ত প্রদর্শনের আদেশ দিতেন তিনি। উদ্দেশ্য যে সাধারণ মানুষ কোনও বিদ্রোহের কল্পনামাত্রও করতে না পারে যেন। যদিও এই বিশেষণগুলোর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে চাঁদের অন্য দিক। ১৪৫৯ সাল, ক্যাথলিক খ্রিস্টান জগতের অধীশ্বর পোপ দ্বিতীয় পায়াস (Pius II) তুর্কি অটোমানদের বিরুদ্ধে  ডাক দিলেন এক নতুন ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের। এখনকার মতো মধ্যযুগের সেই সময়েও ধর্ম আর রাজনীতির মিলিত গাঁটছড়ায় নানা নেপথ্য নাটকের পালা চলত। যবনিকার এই ভেতরের পালাই নির্ধারণ করত সাম্রাজ্যের ভাঙা-গড়ার। যার বলি হত অতিঅবশ্যই সাধারণ মানুষ। এছাড়া পূর্ব ইউরোপে বয়্যার নামের সামন্ত শ্রেণিরাও তখন এই উত্থান পতনের এক উল্লেখযোগ্য ক্রীড়নক। যাদের ক্ষমতা মাঝে মাঝেই হয়ে যেত রাজন্যবর্গের চেয়েও বেশি। রাজনীতির এই দাবা খেলায় সেই সময় এগিয়ে এলেন তৃতীয় ভ্লাড। তিনি তখন হ্বালাচিয়ার (রুমানিয়ান উচ্চারণ ‘হ্বালাহিয়া) শাসনভার গ্রহণ করেছেন। সেই সময় অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ (Mehmed II) ইউরোপের দক্ষিণের এক বিস্তৃত অঞ্চল দখল করে নিয়েছিলেন। তাঁর চোখ তখন ট্রানসিলভ্যানিয়া, হ্বালাচিয়া সহ রুমানিয়া আর হাঙ্গেরির ওপর। তিনি ভ্লাডের কাছে দাবি করে বসলেন এক বিরাট অঙ্কের উপঢৌকন। যদিও গুপ্তচরদের কাছ থেকে সুলতান ঠিকই পাচ্ছিলেন দানিয়ুব নদীর তীর ঘেঁসে ভ্লাড ড্রাকুলিয়ার গোপন সাম্রাজ্য বিস্তারের খবর। এই খবরে উত্তেজিত হয়ে সুলতান পাঠালেন তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি হামজা বে-কে, উদ্দেশ্য ভ্লাডকে সমূলে ধ্বংস করা। এদিকে ভ্লাডও ছিলেন রাজনীতির খেলায় নিপুণ। হামজা বে যখন দানিয়ুবের বাম তীর ঘেঁষা শহর জোর্জোর উত্তরদিকে একটা সরু গিরিবর্ত পেরোচ্ছিলেন তখন ভ্লাডের বিশাল বাহিনী এক অতর্কিত আক্রমণ করে বসে। এই পরিকল্পনা এতই সাবধানতার সঙ্গে হয়েছিল যে দুর্দান্ত তুর্কি অটোমান গুপ্তচরেরাও কিছুই জানতে পারেনি আগে। হ্বালাচিয়ার সৈন্যরা চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে তুর্কিদের। প্রায় সমস্ত তুর্কি সেনারাই ধরা পড়ে, পরে যাদের ওই একই ভাবে — মানে বল্লমের মধ্যে গেঁথে হত্যা করা হয়। পদমর্যাদার গুরুত্বের জন্য হামজা বের শরীরকে গেঁথে ফেলা হয়েছিল সবচেয়ে লম্বা বল্লমের মধ্যে!   

তের্গোভিস্তে আক্রমণ নিয়ে রুমানিয়ান চিত্রকর থিওডর আমানের আঁকা বিখ্যাত ছবি

   

১৪৬২ সালের শীতকাল। তুর্কি সেপাইয়ের ছদ্মবেশে কিছু সংখ্যক অনুচর নিয়ে ভ্লাড আক্রমণ করে বসেন কৃষ্ণসাগর আর সার্বিয়ার মধ্যবর্তী বুলগেরিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল। যেখানে তখন অটোমান সৈন্যরা তাঁবু গেড়ে অবস্থান করছিল। আবার সেই কৌশল এবং প্রায় একই পরিণতি। নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল তুর্কি সৈন্যদের। এই আক্রমণের নেপথ্যে তুর্কি ভাষায় ভ্লাডের সাবলীল দক্ষতা একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল। এই ভাষা তিনি শিখেছিলেন কৈশোরে যখন তাঁকে তাঁর ভাই রাডুর সঙ্গে কাটাতে হয়েছিল অটোমান সুলতানের কাছে রাজনৈতিক পণবন্দি হিসেবে। বলা হয় তুর্কিদের বিরুদ্ধে তাঁর এই তীব্র বীতরাগ তৈরি হয় ওই ছোটবেলায় তুর্কি সেনাদের কাছ থেকে পাওয়া শারীরিক অত্যাচারের তীব্র স্মৃতি থেকে। যাইহোক, ভ্লাডের এই আক্রমণের প্রতিশোধ নেবার জন্য সেনাপতি মাহমুদ পাশার নেতৃত্বে এক বিরাট বাহিনী পাঠান সুলতান। আশ্চর্য ব্যাপার যে ভ্লাডের আপন ভাই রাডু ততদিনে তুর্কি অটোমানদের বিশ্বস্ত অনুচরে পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধে সেও ভ্লাডের বিরুদ্ধেই যোগ দেয়। হ্বালাচিয়ায় তাঁর সীমিত সৈন্য সম্ভার দিয়ে ভ্লাড কিছুতেই এই বাহিনীকে বাধা দিতে পারলেন না দানিয়ুব পেরোতে। সামনাসামনি যুদ্ধে এই বাহিনীকে পরাস্ত করা প্রায় অসম্ভব দেখে অনেক ছোট ছোট অতর্কিত আক্রমণের মাধ্যমে তুর্কি সেনাদের সংখ্যা আর মনোবল কমিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করলেন ভ্লাড। এই আক্রমণগুলোর মধ্যে বিখ্যাত বা কুখ্যাততম হল বর্তমান রুমানিয়ার তের্গোভিস্তে (Târgoviște) শহরে ১৭ ই জুন, ১৪৬২ সালের রাতের অন্ধকারে এক ঘুর্ণিঝড়ের মতো ভ্লাড ড্রাকুলিয়ার সেনাদের আক্রমণ। এই যুদ্ধ তুর্কী সেনাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিলেন এবং প্রায় ১৫,০০০ সৈন্যের মৃত্যু হয়।    

    শোনা যায়, এক বল্লমে নাকি অনেক সৈন্যদের গাঁথতে হয়েছিল যুদ্ধশেষে। এই যুদ্ধে অবশ্য খ্রিস্টান ইউরোপে ভ্লাডের প্রবল সুখ্যাতি হয়েছিল। পোপ এবং ট্রানসিলভ্যানিয়ার স্যাক্সন নেতৃত্ব ভ্লাডের ‘কৃতিত্বে’ প্রশংসায় মুখর হয়। যদিও এই জয় স্বল্পস্থায়ী হয়েছিল আর কিছুদিনের মধ্যেই ভ্লাডকে কোণঠাসা করে মল্ডাভিয়ায় পিছু হটতে বাধ্য করা হয়। ১৮৬২ সালে ভ্লাড যখন হাঙ্গেরির সাহায্যে হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য আবার হ্বালাচিয়ার দিকে রওনা হন তখন ২৬ নভেম্বর হ্বালাচিয়া সীমান্তের কাছে তাকে বন্দি করা হয়। ভ্লাডের সম্পূর্ণ অজান্তে হাঙ্গেরি এবং ক্রোয়েশিয়ার রাজা ম্যাথিয়াস কর্নিভাস এই গোপন পরিকল্পনা করেছিলেন। এরপর তাঁকে বন্দি করে রাখা হয় কুখ্যাত

    ওরেসিয়া দুর্গে। ম্যাথিয়াসের এই বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে তৎকালীন লেখকদের মতোই আধুনিক ঐতিহাসিকেরাও প্রবল ধন্দে আছেন। একেবারে আধুনিক মত হল যে হাঙ্গেরিরাজ সেই ১৪৬০ সাল থেকেই ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ আখ্যা পাবার জন্য লালায়িত ছিলেন আর প্রাথমিকভাবে চেষ্টাও করেন অটোমানদের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তোলার। কিন্তু তা করতে গিয়ে বেশ হঠকারীভাবেই তিনি মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে নিজের প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য ওই অঞ্চলের ছোট ছোট রাজবংশকেও ধ্বংস করেন। ভ্লাডকে ধরার পর যেমন তাঁর সাফাই ছিল যে ভ্লাড গোপনভাবে তুর্কি সম্রাটের সাথেই আঁতাত করেছে। এরপর ১৪৭৫-৭৬ নাগাদ ভ্লাড আবার চেষ্টা করেন তাঁর রাজত্ব পুনরুদ্ধারের। এবার তাঁর সহায় হয় ট্রানসিলভ্যানিয়া, হাঙ্গেরি, মল্ডাভিয়ার সেনাবাহিনী। আর তাদের সঙ্গে ছিল হ্বালাচিয়ার কিছু বিদ্রোহী সামন্তপ্রভু বা বয়্যার। সাফল্যের সঙ্গেই এই অভিযানের শেষে তিনি আবার তাঁর রাজপদ ফিরে পেলেন। যদিও এই ‘শেষ’ রাজত্বের আয়ু হয়েছিল মোটে দু-মাস। তাঁর রাজত্বপাট সামলে ওঠার আগেই এক বিরাট অটোমান সেনাদল আক্রমণ করে বসে হ্বালাচিয়া। এই যুদ্ধই ভ্লাড ড্রাকুলিয়ার শেষ যুদ্ধ। তার মৃত্যু নিয়েও অনেকগুলো ধারণা আছে। প্রাচীন কিছু পুঁথি থেকে পাওয়া যাচ্ছে যে তুর্কি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে যুদ্ধক্ষেত্রেই তিনি প্রাণ দেন আর তাঁর মৃতদেহ ঘিরে ছিল বিশ্বস্ত মল্ডাভিয়ান দেহরক্ষীদের শব। আবার কিছু ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী কিছু বিশ্বাসঘাতক বয়্যারই তাঁকে হত্যা করে। যাই হোক না কেন, ১৪৭৭ সালের ১০ জানুয়ারির আগেই তিনি মারা যান। মোটামুটিভাবে প্রামাণিক ধারণামতে ১৪৭৬ সালের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ তাঁকে হত্যা করা হয় বুখারেস্ট আর জোর্জোর মাঝামাঝি কোথাও। অটোমান ইতিহাস যদিও বলে যে তুর্কি সেনারাই তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ করে। সেই মাথা আবার মধুর মধ্যে সংরক্ষণ করে পাঠানো হয়েছিল কন্সট্যান্টিনোপোল বা এখনকার ইস্তাম্বুলে তাঁর মৃত্যুর সত্যতা প্রমাণ করার জন্য। মনে করা হয় কোনও আনুষ্ঠানিক রীতি ছাড়াই তাঁর দেহ সমাধিস্থ করা হয়েছিল কোমানা মঠে। এইভাবে প্রায় তিন দশকের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের প্রয়োজন হয়েছিল তাঁকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য।     


রুমানিয়ার অ্যামব্রাশ দুর্গ থেকে ভ্লাডের ১৫৬০ সালের এক এক প্রতিকৃতি। মনে করা হয় তার জীবদ্দশায় আঁকা কোন প্রতিকৃতিরই  অনুকৃতি এটা

     প্রশংসা আর ঘৃণার মিলিত আবহে ইউরোপ আর মধ্য-প্রাচ্যের কিংবদন্তিতে চিরকালের মতো স্থান পেয়েছেন ভ্লাড ড্রাকুলিয়া। এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে সত্যি–মিথ্যের যে কুয়াশা তৈরি হয়েছে তা শুরু হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর সামান্য পরে, মানে ১৪৮০-র দশক থেকে। প্রাচীন জার্মান পুস্তিকায় পাচ্ছি এই ধরনের বিবরণ যে ভ্লাড ড্রাকুলা শিশুদের শরীর সেদ্ধ করে খেতে দিয়েছিলেন তাদেরই মা’দের। তাঁর চরিত্রের এই দানবিক ছায়াগুলো পূর্বের চেয়ে পশ্চিম ইউরোপের কিংবদন্তিতেই বেশি পাওয়া যায়। পুস্তিকা আর প্রাচীন পুঁথি ছাড়াও জার্মান কবি মিশেল বেহাইম একটা কবিতা লিখেছিলেন ‘Von ainem wutrich der hies Trakle waida von der Walachei’ বা ইংরেজিতে ‘Story of a Hothead Named Dracula of Wallachia’ নামে। এই কবিতাতেও পাচ্ছি ড্রাকুলিয়ার আবহে এক নরপিশাচের। মোটামুটি ওই সময় থেকে ১৫৭০ পর্যন্ত মানে নব্বই বছর জুড়ে নানা পুঁথির ভাষায় পাওয়া যায় এই ছায়ার ইতস্তত বিচরণ। স্থানীয় লোককাহিনির প্রেক্ষিতে কখনও যা উজ্জ্বল আবার কখনও তীব্র কালিমালিপ্ত। রাশিয়ান বা স্লাভ সংস্কৃতিতে আবার এই বিবরণ পাওয়া যায় ‘Skazanie o Drakule voevode’ বা ইংরেজিতে ‘The Tale of Warlord Dracula’ নামে বইতে। মনে করা হয় এই বইতে সংকলিত বিবরণগুলো মোটামুটি ১৪৮১ থেকে ১৪৮৬ সালের মধ্যে লেখা হয়েছিল। জার্মান এবং রাশিয়ান বিবরণের মধ্যে তথ্যগত অনেক মিল থাকা সত্ত্বেও অমিলটাও প্রকট। তাঁর যাবতীয় ক্রুরতাকে স্বীকার করে নিয়েও রাশিয়ান জনশ্রুতি আর লোককাহিনিতে ভ্লাড ড্রাকুলিয়াকে এক দক্ষ শাসক এবং বিরাট যুদ্ধ-কুশলী নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। শত্রুদের নিষ্ঠুরতার প্রতিরোধে যাঁকে হতে হয়েছে ক্রুর, দেখাতে হয়েছে সমান বা আরও বেশি মাপের নিষ্ঠুরতা। রুমানিয়ার জনমানসে আবার সেই সময় থেকেই তিনি এক দেশপ্রেমিকের মর্যাদা পেয়ে আসছেন। এক সত্যিকারের নায়ক যিনি একাধারে তুর্কি আক্রমণ প্রতিহত করেছেন আবার অসৎ, ধনী বয়্যারদের সাম্রাজ্য বিস্তারের লোভ থেকে দেশকে বাঁচিয়েছেন নিশ্চিত গৃহযুদ্ধ থেকে। এই বিরোধী চরিত্র চিত্রণে চার্চের রাজনীতিও এক বিরাট ভূমিকা পালন করছে। মনে রাখা দরকার পূর্ব ইউরোপে যখন রাশিয়ান বা রুমানিয়ান অর্থোডক্স চার্চের রাজত্ব তখন পশ্চিম ইউরোপ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য। ১৭৮৫ নাগাদ রুমানিয়ার লেখক এবং বিখ্যাত ইতিহাসবিদ দেলেয়ানু ‘Țiganiada’ নামে এক মহাকাব্য রচনা করেন। এই কাব্যের ছত্রে ড্রাকুলিয়াকে এক বীর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। দুর্ধর্ষ তুর্কিদের হাত থেকে যে দেশকে বাঁচায়। এর প্রায় একশো বছর পর ১৮৮১ সালে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রুমানিয়ান কবি এমিনেস্কু  তাঁর স্বদেশ প্রেম নিয়ে রচিত অনেক কবিতায় ড্রাকুলিয়াকে গৌরবান্বিত করেন। ১৯৭৯ সালে ভ্লাডকে নিয়ে যে চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছিল রুমানিয়ায় সেখানেও তাঁর এই স্বদেশপ্রেমিক ছবি। এই চলচ্চিত্র আবার সেসেস্কুর সরাসরি আদেশে তৈরি হয়। মনে হয় যে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস লেখার উপাদান হিসেবে ব্রাম স্টোকার মূলত পশ্চিম ইউরোপের মানে জার্মান বা হাঙ্গেরিয়ান জনশ্রুতির ওপরেই নির্ভর করেছিলেন, যেখানে ভ্লাড ড্রাকুলিয়া প্রায় বাইবেল বর্ণিত ‘শয়তান’। আশ্চর্য এরই ঠিক বিপরীত ছবি পুবে। যেখানে সে এই খ্রিস্টান রাজত্বকেই ‘বর্বর’দের হাত থেকে বাঁচাচ্ছে। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এই ইতিহাস বা উপকথার চরিত্রকে নিয়ে আমাদের কৌতূহল এক তিলও কমেনি। চারিদিকের ধ্বংসলীলায় মাঝে মাঝে যখন মনে হয় যে এই ভাঙাচোরা সভ্যতার নোঙর হয়তো আর বেশিদিন বয়ে যাওয়া যাবে না তখন আমাদের বোধের ভেতর ঘরে উঁকি দেয় ‘ড্রাকুলিয়া’ বা পরিচিত শব্দ-বন্ধনীতে ‘ড্রাকুলা’ নামের এই ছায়াশরীর। শতাব্দীর প্রাচীন ধুলো-মাখা রূপক যাকে দিয়েছে অ-মৃত বা ‘Undead’ এর অবস্থান।  

তথ্যঋণঃ

  1. Dracula by Bram Stoker.
  2. The Historian by Elizabeth Kostova
  3. Dracula-the-Undead by Dacre Stoker.
  4. Dracula, Prince of Many Faces by Radu R Florescu (Author), Raymond T. McNally 
  5. Wikipedia
  6. DRACULA: Between Myth And Reality by Adrian Axinte (Stanford বিশ্ববিদ্যালয়ের website থেকে প্রাপ্ত)
  7. Encyclopædia Britannica Online

চিত্রঋণঃ Wikipedia

উৎসাহীদের জন্য এই নিম্নলিখিত ছায়াছবি আর টেলিভিশন রূপান্তরের তালিকা দেয়া হল যেখানে মূল উপন্যাসের মোটামুটি প্রামাণিক রূপ বজায় রাখা হয়েছেঃ

  1. Nosferatu (1922)
  2. Dracula (1931)
  3. Dracula (1931 Spanish Version)
  4. Count Dracula (1970)
  5. Count Dracula (1977) [BBC TV – সমালোচকদের মতে মূল উপন্যাসের সবচেয়ে কাছাকাছি রূপান্তর]
  6. Nosferatu (1979) (জার্মান ও ইংরেজি রূপান্তর)
  7. Dracula (1992)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!