জিরো

ঋজু গাঙ্গুলী

অলংকরণ: সুপ্রিয় দাস

প্রাককথন

 “এই কাহিনি শ’দুয়েক বছর পরের এক পৃথিবীর।

     ক্রমশ কমে আসা সবুজ আর নীলের প্রায় সবটাই তখন মুছে গেছে বিশ্বযুদ্ধের তাপ আর বিকীরণে। সেই সঙ্গেই পৃথিবীর এক মস্ত অংশ থেকে হারিয়ে গেছে জীবন। কিন্তু সর্বনাশা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে সেনাবাহিনীর একাংশ বুঝতে পারল, অন্য রাষ্ট্র বা ধর্ম-জাতি-ভাষার মানুষ নয়, এই যুদ্ধ চাইছে অতিবৃহৎ বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সরিয়ে একদা উঠে এসেছিল আধুনিক রাষ্ট্র। তার পরের ধাপ হয়ে এবার ক্ষমতা নিতে চাইছে ওই সংস্থাগুলো। সেনাবাহিনীর একাংশ বিদ্রোহী হয়ে উঠল। তারা গোপনে মিলিটারি রিসোর্স সরিয়ে নিতে লাগল। তাই দিয়ে তারা আঘাত হানতে শুরু করল এই বৃহৎ সংস্থাগুলোর ওপর। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত পৃথিবীতে গড়ে উঠল এক বিচিত্র ব্যবস্থা। প্রধান শহর বা মেগাপলিসগুলোতে প্রশাসনের দায়িত্বে রইল সিটিবোর্ড বা কাউন্সিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পেল মিলিশিয়া। শহরের বাইরের বিস্তীর্ণ মরুভূমি, সমুদ্র, আর অন্যান্য প্রায় বর্বর হয়ে যাওয়া এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখল মিলিটারি বা সেনাবাহিনী। অর্থনীতির প্রতিটি ধাপ নিজের মুঠোয় নিয়ে সর্বশক্তিমান হয়ে রইল অতিবৃহৎ সংস্থাগুলো। তবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তারা পেল না। সিটিবোর্ড বা কাউন্সিল-এর, ক্ষেত্রবিশেষে মিলিটারির নিঃশব্দ সমর্থনে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেল বিদ্রোহীরা।

     আমাদের এই গল্পগুলো যেখানে বা যার আশেপাশে ঘটছে, সেই হাভেন এমনই এক মেগাপলিস। মরুভূমির মধ্যে গড়ে ওঠা সেই শহরের প্রশাসন চালায় কাউন্সিল। টহল দেয় মিলিশিয়া। কিন্তু তার আর্থিক ভাগ্যনিয়ন্তা হল মেগাকর্প। হাভেন মিলিশিয়ার একজন ডাকাবুকো অফিসার হলেন ট্যান, ওরফে তনয়া দত্ত।
প্রশান্ত মহাসাগরের এক কোণে শেষ লড়াইয়ের সময় মিলিটারি এক সুপার-সোলজার মহাযোদ্ধাকে পাঠিয়েছিল। তার নাম সেন। রেকর্ড বলছে, সেন আর তার স্ত্রী নাওকো মারা গেছিল ওই যুদ্ধেই। রেকর্ড এও বলছে যে মিলিটারির এক বহুমূল্য অ্যাসেট সেই সময়েই হারিয়ে গেছিল। সে ছিল পৃথিবীর শেষ অ্যান্ড্রয়েড, যাকে তৈরি করা হয়েছিল মূলত নজরদারির জন্য।

     এই কাহিনি ‘জন’ নাম বয়ে বেড়ানো সেই অ্যান্ড্রয়েডের। এই কাহিনি সেন-এর। এবং, এই কাহিনি তনয়া’র।”

 

দশ

তোয়োহারা (শাখালিন), কুড়ি বছর আগে

কান-ফাটানো আওয়াজ তুলে সিলিন্ডারটা উড়ে গেল দরজার পাশ থেকে। ওপাশ থেকে ভেসে আসা অনেকগুলো আর্তনাদ বুঝিয়ে দিল, স্ট্র্যাটেজিটা খেটে গেছে। উলটোদিকের বারান্দায় আধশোয়া অবস্থায় থাকা স্নাইপারটির ক্ষতবিক্ষত মুখে ফুটে ওঠা ক্ষুধার্ত হাসিটা মুছে গিয়ে উদ্বেগের ছায়া ঘনাল একটু পরেই।

     “সেন!” চিৎকার করে ডাকল কেউ, “কম্যান্ড শেষ চপারটা তোলার ক্লিয়ারেন্স পেয়েছে। তুমি এসো শিগগিরি।”

     অবাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে হাতের সরু ব্লাস্টারের স্কোপে চোখ বসাল সেন। ওর প্রাণের চেয়েও অনেক বেশি জরুরি হল এই ওয়ার্ডটাকে বাঁচানো। নাওকো আছে ওখানে। আর আছে ওর অন্ধকার পৃথিবীর একমাত্র সূর্য, খুন করতে-করতে ফাঁপা হয়ে যাওয়া এই চেহারায় মনুষ্যত্বের শেষ চিহ্ন – সাকুরা! ওদের বাঁচাতে হবেই।

     “আপনি চলে যান কম্যান্ডার!” সেন চিৎকার করে বলল, “ওকামি-র পাঁচটা ইউনিট কমপ্লেক্সে ঢুকেছে। আমি ছাড়া ওদের ঠেকানোর কেউ নেই।”

     “পাগলামো কোরো না সেন!” কম্যান্ডারের গলাটা আর্তনাদের মতো শোনায়, “তোমাকে আমাদের দরকার। উরাল ডিভিশন সাড়া দিচ্ছে না। তুমি ছাড়া আমাদের ইউনিটকে ভ্লাদিভস্তক অবধি কে নিয়ে যাবে এই বরফ আর জলের মধ্য দিয়ে?”

     সেন সাড়া দিল না। অনেক অভিশাপ কুড়িয়েছে ও এতদিন ধরে। হাতে লাগা রক্তের দাগ জমতে-জমতে কালো হয়ে গেছে। একটার পর একটা ক্যাম্প, বেস, এমনকি লোকালয় শেষ হয়ে গেছে ওর হাতে। কিন্তু এবার শেষ নয়, সেন আজ কিছু একটা শুরু করবে। হয়তো… জীবনে শেষবারের মতো।

     কিছুক্ষণ পর চপারটা ছাদ থেকে উঠতে থাকে। সেনের নজরে পড়ে, নীচ থেকে শোল্ডার ক্যানন নিয়ে ওটার ওপর হামলা চালানোর জন্য তৈরি হয়েছে ওকামি-র বেশ কয়েকজন। অন্য কোনো মানুষের পক্ষে এইসময় অস্ত্র ধরে রাখা সম্ভব ছিল না, তবে ওকে ‘ইনসেন’ সেন এমনি-এমনি বলা হয় না। নিজের বিশেষ অস্ত্রটা সরিয়ে করিডরের এক প্রান্তে গড়িয়ে গিয়ে ব্লক পিস্তলটা বের করে ও। তার সামনে একটা সরু রিং লাগিয়ে তাতে একটা কনকাশন গ্রেনেড আটকে নেয় সেন। গ্রেনেডের পিনটা বের করে, সেটা নীচে ওকামি সৈন্যদের দিকে তাক করে ও ট্রিগার টেপে।

     নীচ থেকে শব্দ, ছিন্নভিন্ন শরীরের টুকরো, আর রক্ত ছিটকে ওঠে। চপারটা উড়ে যায় নিরাপদ দূরত্বে।

     “সেন এখনও ডিউটি করছে কম্যান্ডার।” মনে-মনে কথাটা বলে ও নিজের পোস্টে ফিরে আসতে চেষ্টা করে। তখনই যন্ত্রণার একটা ঢেউ ওকে ভাসিয়ে দেয়। সেন বুঝতে পারে, ও আর পারবে না উঠতে। যন্ত্রের মতো ও বুঝে নিতে চেষ্টা করে, শরীরের কোন-কোন অঙ্গ এখনও সচল আছে। ডান হাত, দু’চোখ, মাথায় বসানো যাবতীয় ইমপ্ল্যান্ট, কেভলারের আড়ালে ধুকধুক করতে থাকা হৃৎপিণ্ড-ফুসফুস, আর কয়েকটা অদরকারি অঙ্গ – এরা এখনও কাজ করছে। তবে এই দিয়ে, একটা ব্লাস্টার, কয়েকটা কার্ট্রিজ আর কিছু শেল নিয়ে ও কতক্ষণ ঝুঝতে পারবে?

     বিশেষত সেনাবাহিনী যখন এই এলাকাটাকে নেকড়েদের হাতে ছেড়ে দিয়ে উরালের দিকে এগোচ্ছে!

     “সেন! শুনতে পাচ্ছ, সেন?” আলট্রা হাই ফ্রিকোয়েন্সি রিসিভারটা কড়কড় করে ওঠে। বাঁ হাত বাড়িয়ে সুইচটা টিপতে গিয়েই সেন বোঝে, অবস্থা ও যা ভেবেছিল তার চেয়েও খারাপ। শরীরের পেশিগুলো জবাব দিতে শুরু করেছে, মানে ভেতরে কোথাও একটা খুব বড়ো কিছু হয়েছে। ঠান্ডা মাথায় ভাবলে সেন সমস্যার কারণ আর সমাধান – দুটোই হয়তো পাবে। কিন্তু এখন…?

     “পাচ্ছি।” অত কষ্টে সুইচ টিপে সাড়া দেয় সেন, “আর একটা ইউনিট পাঠান এখানে। ওকামি-র লোক অনেক। আমি একা মহিলা আর শিশুদের বাঁচাতে পারব না।”

     “ঠান্ডা মাথায় আমার কথা শোনো সেন।” ওপাশ থেকে ভেসে আসা গলাটা শুনে সেনের রক্তে একটা হিমেল স্রোত বয়ে যায়, “ওখানে আমরা কোনো টিম পাঠাতে পারব না। আমাদের কোনো অস্তিত্ব আর নেই ওখানে। এই চপার ওখানে আর একটা রান করতে পারে। তুমি কি তাতে চাপার অবস্থায় আছ?”

     “না, সেনসেই।” গলা থেকে ঘেন্নাকে সথাসম্ভব সরিয়ে বলে সেন, “কিন্তু আপনি কি ওতে আমার স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে যেতে পারবেন?”

     “তোমার স্ত্রী!” গলাটা থেকে বিষ ঝরে পড়ে, “তোমাকে সিডিউস করে মারতে আসা এক খুনিকে তুমি স্ত্রী’র মর্যাদা দিয়েছ দেখেই আমি বুঝেছিলাম, লোহায় জং ধরে গেছে। না, আমি তাদের তোলার ব্যবস্থা করতে পারব না। তোমাকে বাঁচাতে চাইছি, কারণ তুমি এই ইউনিটকে পশ্চিমে নিয়ে যেতে পারবে। ব্যস।”

     সুইচ অফ করে দেয় সেন। তারপর ক্রনোমিটারের নীচে রাখা দুটো চিপ বের করে ঘাড়ের ক্ষতস্থানের মধ্যে গুঁজে দেয়। স্টোরেজ ডিভিশনের আদ্যন্ত বে-আইনি প্রোজেক্টের ফসল এই পেইন রিলিভার। শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে এটা, কিন্তু ব্যথা কমিয়েও শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখায় এর জুড়ি নেই। চোখ বন্ধ করে নিজের অপশনগুলো বোঝার চেষ্টা করতে গিয়েই সেন একটা নতুন শব্দ পায়।

     হিস্‌-হিস্‌ করে ভেসে আসা শব্দটা কি গাসের? নাকি… আগুন!

     সেন বুঝতে পারে, ওর নেস্ট থেকে উড়ে আসা প্রাণঘাতী অস্ত্রদের এড়িয়ে কোনোভাবেই ওপরের ঘরগুলোর নাগাল না পেয়ে মরিয়া ওকামি বাড়িটাতেই আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।

     বড্ড অসহায় লাগে ওর। জীবনে এই একবার ও চেষ্টা করেছিল, ‘ঠিক’ কাজটা করার। আর সেটা করতে গিয়েই এই অবস্থা হল!

 

এই বাড়ির নীচটা কাফেটেরিয়া, রিসেপশন, কনসালটেন্সি – এমন সব হাবিজাবি জিনিসের জায়গা। দোতলা কিন্তু নারী ও শিশুদের চিকিৎসা তথা রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই। একে তো দীর্ঘদিন এই বরফ আর পাথরের মাঝে আটকা ওকামি-র লোকেরা এখন সত্যিই নেকড়ের মতো নারীমাংসলোলুপ হয়ে আছে। তার ওপর এই ফ্লোরেই আছে ওষুধ আর খাবারের অবশিষ্ট স্টক।

     কিন্তু এখন ও কী করবে?

     অসহায় মুখে সেন দেখে, উলটোদিকের বারান্দার পেছনের ঘরের দরজাগুলো খুলে যাচ্ছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে একের পর এক মহিলা। তাদের মধ্যে কারও কোলে সদ্যোজাত শিশু, কারও কোলে আরেকটু বড়ো সন্তান। কেউ বা একা, আবার কারও হাত ধরে রেখেছে পাশের অশক্ত মানুষটিকে।

     হাজার-হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী সুপার সোলজার সেন অসহায়ভাবে দেখে, নীলচে সাদা অ্যাপ্রন পরা মহিলা ও শিশুদের সেই ভিড়ে রয়েছে নাওকো আর সাকুরাও। ও বারণ করার চেষ্টা করে, চিৎকার করে ওদের ঘরে ফিরে যেতে বলতে চায় – কিন্তু ওর গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোয় না। প্রতি মুহূর্তে সেন অপেক্ষা করে অভিশাপ আর হাহাকার শোনার, যা ও শুনে এসেছে বছরের-পর-বছর, দশকের-পর-দশক।

     কিন্তু সে-সব কিচ্ছু বলে না কেউ। সেন দেখে, ওর সামনে দাঁড়ানো মানুষদের চোখে অনেক কষ্ট আছে, আছে আক্ষেপ, আর আছে… ওর জন্য করুণা!

     ধোঁয়ার স্পর্শে স্প্রিংকলারগুলো আপনা-আপনি সচল হয়ে উঠে জলের ধারায় ভিজিয়ে দিতে থাকে ওদের সব্বাইকে। তখনই নীচ থেকে কর্কশ গলায় চিৎকার ভেসে আসে। সেন শুনতে পায়, ওদের আত্মসমর্পণ করতে বলা হচ্ছে। বিশেষ করে বলা হচ্ছে, সেন যেন অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া বেরিয়ে আসে – একা। সেন সামনে তাকায়। ও ঠিক করে ফেলে, এমনিতেই ওর আয়ু আর খুব বেশি নয়। যদি এই মহিলারা মুক্তি পাওয়ার মিথ্যে আশাতেও সাড়া দিয়ে ওকে ওকামি-র হাতে তুলে দিতে চান, তাহলে ও আপত্তি করবে না।

     “আমার ওপর ওরা আর কী করতে পারবে?” তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে সেনের মুখে।

     কিন্তু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন ওই মহিলারা। সেন কী করবে বুঝে পায় না। ঠিক তখনই ওরা আরেকটা শব্দ পায়। এটা বাড়ির ভেতর থেকে আসেনি, এমনকি আশপাশ থেকেও আসেনি।

     এটা এসেছে দূর আকাশ থেকে।

     চপার! সেনসেই ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ওটাকে পাঠিয়েছে। ও কি ওটাতে কয়েকজনকে অন্তত পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে নিরাপদ কোথাও?

     কিন্তু সেনাবাহিনীর কাছেও কি এই নারী আর শিশুরা আদৌ নিরাপদ? তাছাড়া বাকিদের কী হবে? সেনের মনে হয়, গোটা পৃথিবী যেন থমকে আছে ওর এই একটা সিদ্ধান্তের জন্য।

     ইনসেন সেন নিজের সিদ্ধান্ত নেয়। রিসিভার তুলে ও সেটা চালু করে।

     চপারের পাইলটের ভাঙাচোরা কথাগুলো ভেসে আসে স্ট্যাটিকের মধ্য দিয়ে। থেমে-থেমে নিজের নির্দেশটা দেয় সেন। ও ভেবেছিল, ওর কথা শুনে উলটোদিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে হয়তো চাঞ্চল্য দেখা দেবে। কিন্তু কিচ্ছু হয়নি। ওরা সব্বাই অপেক্ষা করছিলেন ভবিতব্যের জন্য। শুধু সুইচ অফ করে ও যখন মুখ তুলে তাকাল ওদিকে, তখন একজন মহিলা এগিয়ে এলেন সামনে।

     নাওকো!

     কী সুন্দর লাগছিল ওকে! দু’চোখ ভরে সেন দেখে ওর স্ত্রীকে, আর তার কোলে থাকা পুঁটুলির মতো মানুষটাকে।

     মেডিকেল বোর্ড বলেছিল, সাকুরা নাকি কথা বলতে বা শুনতে পারে না। সেনের একসময় মনে হয়েছিল, ও আর নাওকো নিজেদের শরীরে এতদিন যা-যা পরিবর্তন করেছে, তার ফলেই হয়তো এমনটা হয়েছে। নিজের কৃতকর্মের শাস্তি হিসেবেই হোক, বা ওর মরুভূমির মতো জীবনে একটুকরো ছায়া – এই ক’দিনেই সাকুরাকে ছাড়া বেঁচে থাকার কথা ও ভাবতেও পারে না।

     “সাধ মিটল না গো!” স্পষ্ট, সুরেলা গলায় বলল নাওকো, “আরও একবার তোমাকে পেতে চাই – আমরা দু’জনেই। আসবে তো?”

     “আসব।” অস্ফূটে বলে সেন, “তোমাদের আমি ফিরিয়ে আনবই।”

     চপার থেকে বেরিয়ে আসা হিট-সিকিং মিসাইলদুটো একসঙ্গে আছড়ে পড়ে বাড়িটায়। সাদা আলো আর শব্দের একটা বিরাট বলয় তুলে ধ্বংস হয়ে যায় শাখালিন হেলথ স্টেশন।

 

নয়

মোরিয়া কমপাউন্ড, ট্যান, এখন

“মাথা নিচু করো ডাক্‌!” দাঁতে দাঁত চিপে বলি আমি, “ওরা তোমাকে ট্র্যাক করেই এগোচ্ছে। তাই ঠিক তোমার পেছনেই ওদের পাব আমি। কিন্তু তোমাকে এখনই মারার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।”

     “জানতাম।” একটা নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলার চেষ্টা করেও থেমে যায় রডরিগেজ। ওর মুখ থেকে রক্ত উঠছে দেখে বুঝি, শার্পনেলগুলো ওর শরীরকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে প্রায়। ওই অবস্থাতেও ও বলে, “গত মাসে তোমার থেকে ধার নেওয়া টাকাটা ফেরত না পাওয়া অবধি তুমি আমাকে মারতেই পার না!”

     আমার চোখটা হঠাৎ ঝাপসা হয়ে আসে। এই মোটাসোটা, বন্ধুবৎসল মানুষটাকেও কি চোখের সামনে হারাতে হবে? আর কত জন সঙ্গীর মৃতদেহ দিয়ে বানানো সিঁড়িতে হেঁটে বেঁচে থাকবে ট্যান ডি? মনে পড়ে কাউন্সিলরের বলা একটা কথা। দুঃখ একটা অন্ধকার কুয়ো, যাতে মাঝেমধ্যে তলিয়ে যেতে ভালোই লাগে, কিন্তু যার থেকে উঠেও আসতে হয়। অথচ আমার জীবনে তো…

     একটা রুপোলি শিখা ঝলসে ওঠে অন্ধকার টানেলের দিকে। চমকে উঠেও বুঝতে পারি, আমার ব্লাস্টারটাই মৃত্যু ছুড়ে দিয়েছে ওদিকে। সচেতন মন যাই ভাবুক না কেন, মিলিশিয়ার নির্দয় প্রশিক্ষণ আমার চোখ আর হাতকে চিনিয়ে দিয়েছিল ঠিক কোত্থেকে উঠে আসছিল আমাদের শত্রুরা। কিঁচকিঁচ শব্দ করে পিছিয়ে যায় কারা যেন। ধপ্‌ করে কিছু একটা জিনিসের পড়ে যাওয়ার শব্দ পাই।

     ওরা ওদিকের পোর্টহোলটা বন্ধ করে দিয়েছে আবার।

     রডরিগেজের রক্তক্ষরণের অবস্থা দেখে বুঝি, আরও কিছুক্ষণ আমরা দু’জনেই টিকে থাকতে পারব। কিন্তু যা অস্ত্রশস্ত্র আছে তাই দিয়ে সেটা কতদূর টানা যাবে, জানি না। চিন্তিত মুখে একপাশে তাকাতেই কমলা রঙের বায়োহ্যাজার্ড স্যুটের আড়ালে অনড় হয়ে বসে থাকা শরীরটার দিকে নজর যায়।

     এই মেয়েটার জন্যই মনে হচ্ছে মোরিয়া-র ভয়ানক কয়েদিদের খাদ্য হতে হবে আমাদের দু’জনকে। সেটা আমাদের জীবদ্দশাতেই হবে না মৃত্যুর পরে – এটাই প্রশ্ন। অথচ এ-সবের কোনো কথাই ছিল না!

 

ঘণ্টাদুয়েক আগে আমাকে আর রডরিগেজকে বলা হয়েছিল, মোরিয়া কমপ্লেক্স থেকে একজন রোগীকে নিয়ে আসতে হবে কিউব হসপিটালে। মোরিয়া কমপ্লেক্স-এর মালিক মেগাকর্প। তাই এই কাজটা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি দেখা দুই হতভাগ্যের কাঁধেই চাপে। এখন অবশ্য আমার মনে হচ্ছে, পুরোটাই একটা সাজানো ব্যাপার ছিল। সচরাচর এমন কাজ যাদের দেওয়া হয় তারা কিউবে ডেস্ক সামলায়। আমরা এসে, সইসাবুদ সেরে, কমলা রঙের পুতুলের মতো এই মেয়েটার দায়িত্ব নেওয়া অবধি সবকিছু মসৃণভাবে চলছিল। পরিবেশটা গোলমেলে ঠেকছিল। কিন্তু মোরিয়া হল নরকের আধুনিক সংস্করণ, তাই সেখানে কিছু দেখেই আমরা ততটা অবাক হইনি। কিন্তু তারপর এখানে যা হল তাতে অন্য যেকোনো টিমের সদস্যদের পরিণতি ভয়ানক হওয়া প্রায় গ্যারান্টিড ছিল।

     তবে যারা প্ল্যানটা করেছিল, তারা বোধহয় আমাদের কথা হিসেবে রাখেনি।

     জেলার… থুড়ি ইনচার্জের ঘরে বসেই আমরা হলোভিডে দেখতে পেয়েছিলাম, কমপ্লেক্সের মধ্যে দাঙ্গা বেঁধেছে। কেন, বা কারা এর মধ্যে জড়িয়ে আছে – সেই নিয়ে আমাদের পক্ষে মাথা ঘামানো সম্ভব ছিল না। ওখান থেকে আমাদের তিনজনকে দ্রুত বের করে আনার জন্য ল্যাব এরিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা হয়।

     ওখানেই আমাদের চারপাশে ফাঁদের দরজাটা নেমে আসে।

 

মোরিয়া এক সময় খনি হিসেবেই ব্যবহৃত হত। এখান থেকে ঠিক কী তোলা হত, সেটা মিলিটারি ক্লাসিফায়েড করে রেখেছে। অজস্র গুজব আছে একে নিয়ে, যার অনেকগুলোই অবিশ্বাস্য। কিন্তু হাভেনের বাসিন্দা হিসেবে আমরা একটা কথা জানি। এই দুনিয়ায় এমন অনেক কিছুই ঘটে যার ব্যাখ্যা হাভেনের লিভিং ম্যানুয়ালে পাওয়া যায় না।

     যুদ্ধের পর মেগাকর্প মিলিটারি-র কাছ থেকে অনেক কিছুর মতো এই খনিটাকেও কিনে নেয়। উইপোকার বাসার মতো মাটির মধ্যে তৈরি হওয়া অজস্র ঘর আর সুড়ঙ্গকে তারা জেল তথা ল্যাবরেটরিতে পরিণত করে। এই ল্যাবরেটরিতে নাকি জীবনদায়ী ওশুধপত্রের ট্রায়াল হত। তার পাশাপাশি আরও অনেক রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষাও নাকি হয় এখানে। এগুলো নিয়ে এতদিন মাথা ঘামাইনি আমি। কিন্তু…

     আমরা যখন করিডর দিয়ে যথাসম্ভব দ্রুত এগোচ্ছি, তখন হঠাৎই পাশের দরজাটা খুলে যায়। আমাদের একজন রক্ষী তার ঠিক সামনেই ছিল। দরজা খুলে একটা বিশাল শরীর তাকে স্রেফ টেনে নেয়, আর আমাদের সামনেই তার ঘাড়ে কামড় বসায়! রক্ষীটির আর্তনাদ থেমে গিয়ে গার্গল করার মতো একটা শব্দ ওঠে। অন্য একজন রক্ষী সঙ্গে-সঙ্গে ব্লাস্টার ফায়ার করে। ওই… মানুষের মতো দেখতে হলেও অমানুষটি, আর তার শিকার হওয়া রক্ষী – দু’জনেই পড়ে যায় সেই শিখার সামনে।

     “দৌড়োও!” চিৎকার করে উঠেছিল রডরিগেজ, “অন্য দরজাগুলোও খুলে যেতে পারে যেকোনো সময়ে।”

     পার্টনারের কথা আর ভাবনায় ভরসা আছে আমার। স্যুটের মধ্যে থাকা শরীরটাকে দু’জনে দু’দিক থেকে ধরে ছুটতে শুরু করেছিলাম। ভেতরে থাকা বছর বিশেকের মেয়েটা কী বুঝেছিল কে জানে, তবে প্রায় ক্যাটাটনিক হয়ে থাকা শরীরটায় প্রাণের সাড়া জেগেছিল সেই মুহূর্তেই। ওকে টানতে হলে আমরা সময়মতো করিডর থেকে বেরোতে পারতাম না। ওই সরু জায়গায় দু’পাশ থেকে খুলে যাওয়া দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসা দুঃস্বপ্নদের সঙ্গে লড়তেও পারতাম না!

     করিডর আর সামনের দরজার মাঝের কিছুটা খোলা জায়গায় এসে পৌঁছেছিলাম আমরা।

     “ট্যান!” চেঁচিয়ে উঠেছিল রডরিগেজ, “আমাদের কাছে যা হাতিয়ার আছে তাই দিয়ে এখানে বেশিক্ষণ টিকতে পারব না। আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে এক্ষুনি।”

     “কিন্তু কোথায় পিছোব?” মাথা আর হাত স্থির রেখে আমি একটার পর একটা কাতা, মানে অবস্থান নিয়ে ফায়ার করছিলাম। তবে হাতলের কাউন্টারটার দিকে নজর ছিল বলে বুঝতে পারছিলাম, আমার পুঁজি কমে আসছে দ্রুত। এদিকে আড়চোখে দেখেই বুঝতে পারছিলাম, টি-র মতো আকৃতির যে জায়গায় আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি তার দু’পাশের করিডরের একদিকে দেওয়াল, আর অন্যদিকে সারি-সারি দরজা – যেগুলো খুলে যাচ্ছে!

     দুম্‌! দুম্‌! দুম্‌! পরপর তিনটে ভারী শেল আছড়ে পড়েছিল আমাদের পেছনের দেওয়ালে। কানে তালা লেগে গেছিল আমার। ধুলো আর প্লাস্টারের গুঁড়ো গোটা জায়গায় কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। তার মধ্য দিয়েও দেখতে পেয়েছিলাম, রডরিগেজের অতি-বিশ্বস্ত অস্ত্র ‘শেলা’ মুখ খুলেছে বলে আমাদের পেছনে একটা রাস্তা তৈরি হয়েছে।

     “ওপাশে মেইনটেন্যান্স ডাক্ট!” চেঁচিয়ে বলে রডরিগেজ, “আমাদের ওখানেই ঢুকতে হবে। তারপর সাহায্য চাইতে হবে – যে-ভাবে হোক।”

     মাথা নেড়ে সায় দিই আমি। প্রথমে মেয়েটাকে নিয়ে আমি ঢুকি, পেছনে রডরিগেজ একটা ব্লাস্টার তুলে তিন দিক থেকে ধেয়ে আসা ভয়ানক প্রাণীদের ঠেকাতে চেষ্টা করে।

     দাঁত, নখ, পেশি দিয়ে ওরা আমাদের নাগাল পেত না। কিন্তু এরা তো একসময় বুদ্ধিমান মানুষই ছিল। তাই বায়োমেট্রিক লক থাকা সত্বেও একটা অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটা ওরা বুঝে ফেলেছিল।

     আমি মেয়েটাকে নিয়ে পেছনের সুড়ঙ্গে বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর রডরিগেজের আর্তনাদ শুনি। পেছনে ঘুরে ছুটতে গেছিলাম, কিন্তু রডরিগেজ রক্তাক্ত অবস্থাতেও ওখানে ঢুকে আমাকে হাত নেড়ে এগোতে বারণ করল। একটু সরে এসে ও ‘শেলা’-কে ওপরদিকে তুলে ফায়ার করল। কংক্রিটের বড়ো-বড়ো কয়েকটা চাবড়া ওপর থেকে পড়ে গর্তটা আবার ঢাকা পড়ে গেল।

     মেয়েটা এখান থেকে কোথাও পালাতে পারবে না জেনেই ছুটে গিয়ে রডরিগেজকে ধরলাম। দেখতে পাচ্ছিলাম ওর কী অবস্থা। তাও প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম, “তুমি ঠিক আছ ডাক্‌?”

     “আছি।” কাশতে-কাশতে বলল রডরিগেজ। ওর বুক আর পিঠ জুড়ে অজস্র ক্ষতচিহ্ন দেখতে পাচ্ছিলাম। শার্পনেল গান! এই জিনিস কে চালাল?

     “একজন রক্ষীর হাতটা ছিঁড়ে নিয়ে, তার আঙুল দিয়েই ট্রিগারটা টিপেছিল একটা বজ্জাত!” কোনো রকমে বলল রডরিগেজ, “ওরা এই ডাক্টেও ঢুকে পড়তে বেশি সময় নেবে না। এগোও।”

     অতঃপর শুরু হয়েছিল পেছন থেকে ভেসে আসা রক্ত-জল-করা চিৎকার আর আশপাশ থেকে নানা আর্তনাদ শুনতে-শুনতে আমাদের এগিয়ে চলা। মোরিয়া-র প্ল্যান আমার মনে না থাকলেও রডরিগেজই কিছুটা জানত। তার ভিত্তিতে, আর কিছুটা আন্দাজে আমরা একটা মেইনটেন্যান্স চেম্বারের দরজা উড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পজিশন নিই। হিসেব বলছিল যে এই জায়গাটা মাটির কাছাকাছি, তাই আলট্রা হাই ফ্রিকোয়েন্সিতে ডিসট্রেস কল পাঠালে, হয়তো, ওপরের কোনো মোবাইল ইউনিট আমাদের সাহায্য করতে পারবে।

     রডরিগেজের যথাসাধ্য শুশ্রূষা করেছিলাম ওই চেম্বারে রাখা এমার্জেন্সি কিট দিয়ে। তবে এটা বুঝতে পারছিলাম, ওকে ক্লিনিকে নিয়ে যেতে হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। এও জানতাম যে রক্তের গন্ধ ওই নরপশুদের এখান অবধি নিয়েই আসবে। তাদের মধ্যে যারা বড়ো তাদের কীভাবে ঠেকাব জানি না, তবে ছোটোখাটোদের মোকাবিলা করার জন্য যথাসাধ্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। তারপর শুরু হয়েছিল ট্র্যান্সমিটার ফিট করে ক্রমাগত ডিসট্রেস সিগনাল পাঠানো।

     “একটা কথা বলুন মেজর।” রডরিগেজের ক্লিষ্ট গলাটা যথেষ্ট সিরিয়াস শোনাল, “এটা কি দুর্ঘটনা, না ঠান্ডা মাথার প্ল্যান?”

     “দুটোই হতে পারে।” পাশের মেয়েটার দিকে একনজর তাকিয়ে আমি দেওয়ালে হেলান দিলাম, “তবে দ্বিতীয়টার সম্ভাবনা বেশি মনে হচ্ছে। জেলে দাঙ্গা হতেই পারে। কিন্তু ল্যাবের ভেতর দিয়ে আমাদের নিয়ে যাওয়ার এই রুটটা বেছেছে ওই জেলার, মানে ভানুস্কা। এই দরজাগুলো একসঙ্গে খুলে যাওয়াও প্রায় অসম্ভব, কারণ এগুলো ঠিক সুইচবোর্ডের মতো করে চালিত হয় না। তাই, এটা পরিকল্পিত বলেই মনে হচ্ছে।”

     “তাহলে প্রশ্ন,” প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে যন্ত্রণাটাকে কমাতে চাইছিল বোধহয় রডরিগেজ, “আমাদের মতো দুই সামান্য মিলিশিয়াকে মারার জন্য এত বন্দোবস্ত, নাকি…?”

     আমাদের দু’জনের নজর সরে যায় পাশে বসা, কমলা স্যুটের আড়ালে থাকা রোগাপাতলা চেহারাটার দিকে।

     কে এই মেয়েটা, যাকে মারার জন্য মেগাকর্পকে এত বড়ো একটা জিনিস ঘটাতে হল?

 

আট

হোক্কাইডো, কুড়ি বছর আগে

“ওকে কি বাঁচানো সম্ভব, ডক্টর?”

     প্রশ্নকর্তা মানুষটি শীর্ণকায়। তাঁর উচ্চতাও বড়োজোর পাঁচ ফুট। কিন্তু তাঁর নিচু গলা আর ধারালো দৃষ্টির সামনে কেঁপে ওঠেন সাদা কোট পরা মানুষটি।

     “বিশ্বাস করুন কম্যান্ডার।” ভাঙা গলায় বলেন মানুষটি, একসময় যাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্যেও রোগীদের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হত। এখন সে-সব দিন গেছে। পূর্ব গোলার্ধের এই যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে সরে গেছে মিলিটারি। বড়ো কর্পোরেশনগুলো এখনও এদিকে আসতে সাহস পাচ্ছে না নৈরাজ্যের জন্য। বেঁচে থাকার জন্য দুনিয়ার সেরা নিউরোসার্জেন থেকে প্লাম্বার – সবাইকেই নির্ভর করতে হচ্ছে বিদ্রোহীদের ওপরে। আত্মপক্ষ সমর্থনে কথা চালিয়ে যান সার্জেন।

     “আমাদের হাতে যা কিছু আছে, সব দিয়ে আমরা চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই শরীরটা বড্ড বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একে আর বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব। সত্যি বলতে কি, কীভাবে ও এতদিন বেঁচে ছিল – সেটাই আমরা ভেবে পাচ্ছি না।”

     “তাহলে?” কম্যান্ডারের ঠোঁট ব্যঙ্গে বঙ্কিম হয়ে ওঠে, “এককালে তো মরা মানুষ বাঁচানোর নামে অনেকের থেকে অনেক কামিয়েছেন। সেগুলো সবই মিথ্যে ছিল?”

     “না!” পেশাদারি ঔদ্ধত্য মাথা তোলে এবার সার্জেনের গলায়, “আমি সত্যিই মরা মানুষ বাঁচাতে পারি। কিন্তু ‘মানুষ’ হিসেবে নয়।”

     “জানি।” কম্যান্ডারের গলা বরফের চেয়েও ঠান্ডা শোনায় সার্জেনের কানে, “একটা পুতুলের মতো শরীরের ভেতরে আপনারা এই মানুষটির স্মৃতি ভরে দেবেন। অসহায়, শোকার্ত পরিজনেরা সেই পুতুলটির দেখভাল করে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে – এটাই করেন আপনারা। তাই তো?”

     “যে মানুষটিকে আমাদের হাতে আপনি তুলে দিয়েছেন, সে মরেই গেছে কম্যান্ডার।” নিচু গলায় বলেন সার্জেন, “নেহাত, অমানুষিক মনের জোর আছে বলে, আর কিছু একটা জিনিস ভয়ংকরভাবে চেয়েছিল বলে তাঁর মস্তিষ্ক কোনোভাবে মৃত্যুর নাগালের বাইরে রয়েছে এখনও। কিন্তু সেই মস্তিষ্কে রয়েছে অজস্র যন্ত্রণার স্মৃতি। অন্য কারও শরীরে তাকে প্রতিস্থাপিত করলে তার ক্যাটাটনিক হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো পরিণতি নেই। এই অভিঘাত অন্য কারও পক্ষে সহ্য করা প্রায় অসম্ভব!”

     কম্যান্ডারের বুকের ভেতরটা একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়।

 

গতকাল একটা মোবাইল ইউনিট ওকামি-দের পিছু নিয়ে শাখালিনের কেন্দ্রে পৌঁছোয়। ওখানে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আলাদা করে কিছু চেনা সম্ভব ছিল না। তবু, তোয়োহারা মেডিকেল কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ওকামি-রা লুকিয়ে আছে কি না, সেটা বোঝার জন্য থার্মাল স্ক্যান করছিল বিদ্রোহী চপার। তখনই বেশ কয়েকটা প্রাণের চিহ্ন পাওয়া যায়।

     চপারের বদলে ড্রোন হলে আরও গোটা দুয়েক মিসাইল ওদিকে ধেয়ে যেত এর পরেই। কিন্তু চপারের চালকের মেডিকেল ট্রেইনিং ছিল। সে কিছু চিহ্ন দেখে বুঝে নেয়, চিহ্নগুলো যাদের তারা গুরুতর আহত অবস্থায় আছে। যে ওকামি-দের পিছু নিয়েছিল এই ইউনিট, তারা কেউ এখানে নেই। তার রিপোর্টের ভিত্তিতে আরও দুটো ইউনিট ওখানে পৌঁছোয়। ড্রোনের নজরদারির আড়ালে ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে বেশ কয়েকটা শরীর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে একজন শারীরিকভাবে প্রায় মৃত হলেও তার মাথা তখনও কোনোভাবে কাজ করছিল। আর একটি শিশু তার মায়ের শরীরের আড়ালে আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে ছিল।

     দু’জনকেই এখানে উড়িয়ে আনা হয়। শিশুটিকে বিশেষজ্ঞদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রথম মানুষটিকে দেখতে গিয়ে ডাক্তাররা চমকে ওঠেন।

     এ শুধু মিলিটারির একজন নয়। কথায়-কথায় প্রায় কিংবদন্তি হয়ে ওঠা, হাজারও ভয়ের গল্পের কেন্দ্রে থাকা এক সুপার-সোলজার হল এই মানুষটি। ওর আসল নাম, জাতি, মায় মাতৃভাষা হারিয়ে গেছে গালগল্পের কুয়াশায়। অজস্র ইমপ্ল্যান্ট আর আঘাত মানুষটির চেহারা বদলে দিয়েছে এতটাই যে পুরোনো ডসিয়ার খুঁজে পেলেও সেখানে নথিভুক্ত মানুষটির সঙ্গে একে আর মেলানো যাবে না।

     সেন!

     কথাটা শোনামাত্র ব্যাপারটার দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়েছিলেন কম্যান্ডার। যাবতীয় প্রযুক্তি, ওষুধ আর চিপ দিয়ে, সবক’জন ডাক্তার আর সার্জেনকে কাজে লাগিয়ে সেনকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু একটা পুতুল নিয়ে তিনি কী করবেন?

     “কম্যান্ডার!”

     চমকে ওঠেন কম্যান্ডার। আপনমনে হাঁটতে-হাঁটতে তিনি যে ল্যাবে ঢুকে পড়েছেন, এটা টেরও পাননি। এখন মাথা তুলে, শরীরটা যথাসাধ্য টানটান করে তিনি বলেন, “বলো হেনরি।”

     “মানে…” হেনরি তুতলে ওঠে, “আপনি যে কাজটা দিয়েছিলেন, সেটা হয়েছে। তবে এই জিনিস দিয়ে আমরা এখন কী করব?”

     কম্যান্ডারের মনে পড়ে, বুসানের মিলিটারি বেস থেকে একটা অত্যন্ত গোপন জিনিস শাখালিনে আনা হচ্ছে – এই খবর পেয়ে তিনি হেনরিকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল, মিলিটারির আগেই জিনিসটা বিদ্রোহীদের দখলে নেওয়া। সেই অপারেশন সফল হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। তাহলে হেনরি কী বলতে চাইছে?

     কম্যান্ডারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে হেনরি আবার কুঁকড়ে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কম্যান্ডার নিজের মুখ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলেন, “আমাকে ছোট্ট করে ব্রিফ করো তো।”

     ল্যাবের ভেতরে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ব্রিফিং তাদের পক্ষে অতি সহজ কাজ। তার বদলে কম্যান্ডারের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া মানে তো প্রায় ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি হওয়া!

     “আমাদের সবার আইডি এখনও চালু আছে।” থেমে-থেমে বলতে থাকে হেনরি, “তাই রেকর্ডে কিছু এদিক-ওদিক করে জিনিসটা বাগাতে আমাদের সমস্যা হয়নি। ভয় ছিল, যদি মিলিটারি ইউনিটটাও তখনই ওখানে পৌঁছোয়। কিন্তু পুরো ইস্টার্ন কম্যান্ড একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে বলে কেউই বুসান অবধি পৌঁছোতে পারেনি। জিনিসটা একটা কফিন… মানে বডি-কেস। ওটা নিয়ে সোজা এখানে আসি, কিন্তু খুলে দেখি…”

     “কী দেখলে?”

     “ভেতরে একটা অ্যান্ড্রয়েড আছে। তার চেহারাটা ভারি অদ্ভুত। ওইরকম অ্যান্ড্রয়েড আমরা কেউ আগে দেখিনি!”

     “তার মানে?” কম্যান্ডার বিরক্ত হন, “হেঁয়ালি না করে স্পষ্ট করে বলো, ঠিক কী হয়েছে।”

     “অ্যান্ড্রয়েডের চেহারাটা একটা বুড়োর মতো দেখতে।” এক নিঃশ্বাসে বলে হেনরি।

     “বুড়ো? কীরকম বুড়ো?”

     “সেটাই তো! ও যে কেউ হতে পারে। মিলিটারিতে হোক বা মিলিশিয়ায়, এমনকি আমাদের মধ্যেও যারা আপনার বয়সী…” হেনরি আবার তোতলাতে থাকে।

     “এটা একটা আন্ডারকভার ইউনিট, কম্যান্ডার।” আর থাকতে না পেরে মুখ খোলে অন্য একটা ছেলে। কম্যান্ডার একে চিনতে পারেন। এর নাম পাভেল। মিলিটারির কম্পিউটারগুলোকে নিজের মুঠোয় ভরে রেখেছে এই ছোকরা। উনি ওর দিকে মনোযোগী হন এবার। বুলেট পয়েন্টে প্রেজেন্টেশন সাজানোর মতো করে বলতে থাকে পাভেল।

     “প্রায় যে কোনো পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষের মতো দেখতে এই মডেল। গায়ের রং খয়েরি আর সাদার মাঝামাঝি। মুখমণ্ডল অতি সাধারণ, তাতে সামান্য বয়সের ছাপ। সাদা চুল, তবে ছোটো করে ছাঁটা – মিলিটারি স্টাইলে। খুব সামান্য গোঁফ আর দাড়ি – সেও মিলিটারির অপারেটিভ লোকেদের সঙ্গে মানানসই। শরীরটা ছিপছিপে, তবে ভেতরটা অ্যালয় আর ন্যানোফাইবার হনিকোম্ব করে এমনভাবে বানানো যে একে প্রায় অক্ষয় বলা চলে। তবে এই মুহূর্তে এ সম্পূর্ণ অকেজো।”

     “কেন?” কম্যান্ডার কৌতূহলী হন, “মিলিটারি তো অনেক অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহার করেছে আগে। এখন ওদের সব ফেসিলিটি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একে-একে, তাই পারছে না। এটাই হয়তো শেষ কার্যকরী ইউনিট। তাহলে একে কেন কাজে লাগানো যাবে না?”

     “কারণ…” একটু ইতস্তত করে পাভেল বলে, “একে বাঁচিয়ে রাখতে পারে এমন মন পাওয়া যাবে না।”

     “মানে?!” কম্যান্ডারের মুখ হাঁ হয়ে যায়।

     “মিলিটারির শেষ কয়েকটা অ্যান্ড্রয়েড মডেল কাজ করেনি ঠিক এই জন্যই।” এবার কথা বলে ওঠে স্বেতলানা। এই মেয়েটির বয়স কম হলেও মাথা এত ধারালো যে কম্যান্ডারও একে কিঞ্চিৎ সমঝে চলেন। তাই উনি চুপ করে থাকেন। পনি টেইল দুলিয়ে স্বেতলানা বলতে থাকে।

     “কোনো মডেলের যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা আর সেই মডেলের কাজের মধ্যে সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠ হয়েছে, ততই সেই অ্যান্ড্রয়েড মানুষ হওয়ার দিকে এগিয়ে গেছে। আবার এটাও সত্যি যে বেঁচে থাকার কারণ থাকলে তবেই মানুষ বেঁচে থাকে। যেহেতু খাবার, জল, অক্সিজেন – এগুলোও মানুষের দরকার, তাই ওগুলো জোগাড়ের তাগিদেও কোনো মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। কোল্ড ফিউশনে চালিত একটা অ্যান্ড্রয়েডের ওসব দরকার হয় না। সে বাঁচার উদ্দেশ্য না পেলে স্রেফ বন্ধ হয়ে যায়। এবার, এই বিশেষ অ্যান্ড্রয়েডের স্পেক্স, মানে বৈশিষ্ট্য হিসেবে যা-যা পেয়েছি তাতে একে চালিয়ে রাখার জন্য অমানুষিক মনের জোর আছে এমন কারও চেতনা চাই।”

     কম্যান্ডারের আশেপাশে পৃথিবী খুব দ্রুত ঘুরপাক খাচ্ছিল। এ-সব কী অদ্ভুত কথা? মানুষ বেঁচে থাকবে, আর অ্যান্ড্রয়েড অচল হয়ে যাবে! এই ভেঙেচুরে যাওয়া দুনিয়ায় এমন কাউকে উনি কোত্থেকে পাবেন যার মধ্যে আছে অমানুষিক মনের জোর?

     কী??!!

     কম্যান্ডার এত দ্রুত পেছনে ফেরেন যে ঘরের প্রত্যেকটি মানুষ কুঁকড়ে যায়। তাঁর দু’চোখ ধক্‌-ধক্‌ করে জ্বলে উঠেছিল একটা অসম্ভবের আশায়। পাভেল আর স্বেতলানাকে সংক্ষেপে “আমার সঙ্গে এসো।” আদেশ দিয়ে তিনি এগিয়ে যান সার্জারি সেকশনের দিকে।

     আন্ডারকভার অ্যাসাইনমেন্টের জন্য তৈরি হওয়া নিষ্প্রাণ যন্ত্রশরীরটা মিলিটারির স্টোরেজ ডিভিশনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর বুকে নিয়ে অপেক্ষা করে। অন্যদিকে, নিভে আসা শরীরের মধ্যে অনির্বাণ শিখার মতো জ্বলতে থাকা আকুল একটা মস্তিষ্ক নিউরোনে-অণুতে-পরমাণুতে ছড়িয়ে রাখে একটা আকুল চাহিদা।

     “তোমাদের আমি ফিরিয়ে আনবই!”

 

সাত

কালাহান, জন, এখন

“ওই ড্রোনটাকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ কেন জন? ওটা তো আমাদের দিকে নেই।”

     “সেটাই তো প্রশ্ন হেনরি।”

     “মানে?”

     আমি মাথা ঝাঁকাই। হেনরি’র বুদ্ধি যথেষ্ট হলেও কিছু-কিছু জিনিস ও বোঝে না। আমার কাজ যেহেতু আন্ডারকভার সার্ভেইল্যান্স, তাই আমি আবার ওগুলোই খেয়াল করি। এই যেমন, মরুভূমিতে এখন আমাদের এই লজঝড়ে স্যান্ডরোভার ছাড়া আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সেটা মিলিটারি ডিসপোজাল থেকে জোগাড় করা বটে, কিন্তু তবু ড্রোনটা সেদিকে একবারও চক্কর লাগাবে না? তার বদলে ওটা ওই টিলার ওপর ঘোরাঘুরি করছে। তাহলে কি নজরদারির বদলে ওটা…

     “জ্যামার।” দাঁতে দাঁত ঘষে বলল হেনরি, “বালিয়াড়ির ওপাশে কী আছে সেটা দেখার জন্য আমাদের ওয়েভগুলো ওদিকে যেতে দিচ্ছে না ওটা। অথচ ওপাশে তো কিছুই থাকার কথা নয়।”

     “সেটা কে বলেছে?” আমি জানতে চাই, “মেগাকর্প স্যাটেলাইট?”

     “হ্যাঁ।” মাথা চুলকোয় হেনরি, “মিলিটারি ন্যাভস্যাটগুলো হ্যাক করতে ভরসা পাইনি। তাই…”

     বাকিটা বুঝে ফেলি।

     মরুভূমির এই অংশের নীচে নাকি এককালে অনেক রকম ধাতু পাওয়া যেত। যুদ্ধের সময় দু’পক্ষই পোড়ামাটি নীতি নেওয়ায় সে-সব আর খুঁড়ে বের করা সম্ভব নয়। তবু, মিলিটারির হাতে যা আছে তাই দিয়ে খুঁড়লে কিছু ভালো জিনিস পাওয়া যায়। এখান থেকে অনেকটা দূরে মোরিয়া কমপাউন্ড – যেটা এককালে খনি ছিল। তা বাদেও নাকি এখানে একসময় খোঁড়াখুঁড়ি হত, অন্তত এখানকার যাযাবরেরা তাই বলেছে আমাদের। মিলিটারি ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করার মতো দক্ষতা আর আইডি আমার আর হেনরি’র আছে। তাই আমাদের এই নিরীহ অভিযান, যাতে বালির নীচে কোনো খনির মুখ চাপা পড়ে থাকলে সেটা বের করা যায়।

     “এক কাজ করো তো।” আমি বলি, “ওই বালিয়াড়ির গায়ে গাড়িটাকে গোত্তা খাওয়াও। তারপর আমি নিজেই নেমে দেখছি ব্যাপারটা।”

     “বল কী!” হেনরি চেঁচাল, “ড্রোন যদি ফায়ার করে?”

     “করবে না।” আমি নিশ্চিত হয়েই বলি, “এখানে কোনো নোটিস-বোর্ড দেখতে পাচ্ছি না। প্রোটোকল অনুযায়ী ওর কাজ আমাদের চ্যালেঞ্জ করে অনেক কিছু জিজ্ঞেস-টিজ্ঞেস করা। সেখানেও আমরা অনেকক্ষণ তর্ক করতে পারব, কারণ এটা মেগাকর্পের জমি নয়। যদি হয়ও, তাহলেও আমাদের আটকানো কঠিন। মোদ্দা কথা, যতক্ষণ সময় এতে লাগবে, তাতে আমরা বুঝে নিতে পারব ওখানে বালির নীচে কী আছে।”

     হেনরি হাতের তেলোয়  থুতু ফেলে ঘষল। এতেই বুঝলাম, আমার কথাটা ওর পছন্দ হয়েছে। তারপর ও স্যান্ডরোভার চালু করে সোজা এগোতে-এগোতে হঠাৎ কাত করে ফেলল গাড়িটাকে। দারুণ বেগে, ওই অবস্থাতেই গাড়িটা এগিয়ে গেল। ড্রোনটা নীচে নেমে সবক’টা ফ্রিকোয়েন্সিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার মধ্যেই আমাদের গাড়ি বালির গায়ে আছড়ে পড়ল। আমরা কোনোক্রমে বেরিয়ে এলাম।

 

একটা বিষাক্ত পোকার মতো শুঁড় নাচিয়ে আমাদের সামনে এসে স্ক্যানিং চালু করল ড্রোনটা। হেনরিও তুমুল তর্ক আর গালিগালাজ জুড়ে দিল ওটার সঙ্গে। আমি মনে-মনে ভাবলাম, ড্রোনের ক্যামেরা দিয়ে মরুভূমির এই অংশটাকে যে টেকনিশিয়ান দেখছে, তার এখন কী অবস্থা হচ্ছে। বুড়ো বলে আমাকে প্রায় কেউই পাত্তা দেয় না, এবার দেখলাম ড্রোনটাও আমাকে এড়িয়ে পুরো মনোযোগ দিয়েছে হেনরি’র ওপর। আমি চুপচাপ বালিয়াড়ির ওপর কিছুটা উঠে ওপাশে তাকালাম।

     কিচ্ছু নেই। ডুবতে থাকা সূর্যের আলোয় ধূ-ধূ মরুভূমি দেখে মনে হচ্ছে যেন লালচে কমলা একটা সমুদ্র পড়ে আছে আমার সামনে।

     তাহলে ড্রোনটা এখানে কী করছে?

     পরক্ষণেই একটা আঘাত পেলাম পেছন থেকে। হুমড়ি খেয়ে পড়লাম বালির ওপর। হেনরি’র গালাগাল শুনে বুঝলাম, ড্রোনটা আমাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চেষ্টা করেছিল।

     ভাগ্যিস করেছিল! নইলে বালির সঙ্গে চোখ প্রায় এক রেখায় আসত না, আর আমিও বালির সঙ্গে প্রায় মিশিয়ে রাখা প্যানেল আর ডাক্টগুলো দেখতে পেতাম না।

     উঠে দাঁড়িয়ে পোশাক ঝাড়তে-ঝাড়তে আশেপাশে নজর বোলালাম। বালি আর পাথর ছাড়া পুরো এলাকায় শুধু মোরিয়া কম্পাউন্ডের টাওয়ারগুলো দেখা যাচ্ছিল। অর্থাৎ, ওই কম্পাউন্ড পায়ের নীচ দিয়ে এদিকেও এসেছে।

 

আমাদের ওখান থেকে চলে যাওয়া উচিত ছিল। মেগাকর্প যেখানে খুঁড়ছে, সেখানে আমাদের হস্তক্ষেপ করার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ড্রোনটা পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছিল বলেই হঠাৎ মনে হল, একটা জেলের চারপাশে জ্যামার থাকলে সেটা আরও সুসংগঠিতভাবে থাকবে। এখানে ড্রোনটা যেভাবে আছে, তাতে মনে হয় বিশেষ এই জায়গাটা যাতে কারও নজরে না পড়ে – সেটা নিশ্চিত করাই ওর কাজ।

     কেন?

     হেনরিকে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলাম, আমি আরেকটু গভীরে যেতে চাইছি। তারপরেই টলমল করে বালিয়াড়ির ওপাশে গড়িয়ে পড়ে গেলাম। হেনরি আর্তনাদ করে উঠে এদিকে এগোতে গেল।

     ড্রোনটা, বা তার পেছনে নজরদারি করা লোকটা বিপদে পড়ে গেল। কাগজে-কলমে এটা কোনো অনুপ্রবেশ নয়। দু’জন লোক একটা গাড়ি নিয়ে এদিকে এসেছিল। তাদের একজনকে ড্রোনটা গুঁতিয়ে দিয়েছিল। তারপরেই সে অজ্ঞান হয়ে গেছে। ব্যাপারটা ওই অপারেটরের পক্ষে ক্রমেই জটিল হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। এইরকম অবস্থায় যা করতে হয়, ড্রোনটা তাই করল – বেশ কিছুটা ওপরে উঠে গেল আরেকটু ছড়ানো ভিউ পাওয়ার জন্য। এটা করতে হয়, যাতে বুঝে নেওয়া যায় কাছাকাছির মধ্যে কোনো পেট্রল আছে কি না। কিন্তু তাতে আমার কাজ হয়ে গেল।

     সেই সামান্য সময়ের জন্য ওটা আশেপাশে সুইপ চালু করামাত্র আমার কাছে এসে পৌঁছোল একটা মরিয়া ডিসট্রেস কল, যেটা এতক্ষণ ওই জ্যামারের জন্য বেরোতে পারছিল না।

 

কলটা আসছিল নীচ থেকেই। তাতে যে কল-সাইন আর আইডি ব্যবহার করা হয়েছে সেটা আমার ভীষণ চেনা। হাভেন মিলিশিয়ার মেজর তনয়া দত্ত’র কাছ থেকে আসছে সাহায্য চেয়ে ওই আকুল আর্তি।

     তার পাশাপাশি আরও একটা কিছু আছে। ওই সিগনালের সঙ্গেই মিশে আছে একটা অন্যরকম কম্পাঙ্ক। মিলিটারির হাই-ভ্যালু অ্যাসেটদের মধ্যে যেমন ট্র্যাকার থাকে, তেমন কিছুও আছে ওখানে! সেটা… সেটা আমার এত চেনা লাগছে কেন?

     সিদ্ধান্ত নিতে সেকেন্ডের ভগ্নাংশও লাগল না।

     ড্রোনটা আবার আমার কাছে এসে গেছিল। হেনরি’র চোখগুলো গোল-গোল করে দিয়ে আমি হাতের কাজ দেখালাম একটু। আমার এক ঘুষিতে ড্রোনটার মাথার সামনের দিকের সেন্সরি প্যানেলটা ভেঙে গেল। ওটা ধপাস্‌ করে বালিতে পড়ামাত্র আমি ওটার কান-বরাবর হাত চালিয়ে কি-প্যাডের দখল নিলাম। পাভেলের কাছ থেকে বছরের-পর-বছর ট্রেনিং নিয়েছি আমি, তাই একটা জ্যামার ড্রোন খুলে ফেলতে আমার খুবই অল্প সময় লাগল। ওটার চোখ দিয়ে মাটিটা দেখলাম। ডিসট্রেস কল কোত্থেকে আসছে সেটা বুঝে, তার সবচেয়ে কাছের ডাক্ট আর প্যানেলগুলো খুলে নীচে নামার রাস্তা পেলাম খুব সহজেই।

     হেনরি এতক্ষণ বোবা আর কালা হয়ে আমার কাজকর্ম দেখছিল। কিন্তু নীচে নামার উদ্যোগ করতে ও প্রায় ছুটে এসে চেঁচাল, “তুমি কি পাগল হয়েছ? মোরিয়া কম্পাউন্ডে ঢুকে আমাদের কী লাভ?”

     “আমাদের নয়, হেনরি।” সোজাসুজি বললাম, “আমার লাভ হবে। তুমি এখান থেকে পালাও। একটু পরেই ড্রোনের মালিক আরও লোকলশকর পাঠাবে। মিলিটারিতে আমাদের একটা সেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে আপাতত সেখানেই আশ্রয় নাও।”

     “আর তুমি?” হেনরি’র অবাক প্রশ্ন এল আমার পেছন থেকে। নীচে নামতে-নামতে বললাম, “দুনিয়াটা গোল হেনরি। আমাদের আবার দেখা হবে।”

     নীচে নামার জন্য হাতল ছিল। তাতে হাত আর পায়ের ভর দিয়ে আমি এক মিনিটেরও কম সময়ে নীচের একটা লেভেলে পৌঁছোলাম। বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, সাহায্য চেয়ে ওই ডাক ঠিক কোত্থেকে এসেছিল। পরক্ষণেই একটা অদ্ভুত জান্তব গর্জন ভেসে এল আমার পেছন থেকে।

 

ছয়

মোরিয়া কম্পাউন্ড, রডরিগেজ, এখন

আধশোয়া হয়ে নিজের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম।

     নেহাত চর্বি আর কেভলারের একটা আবরণ ছিল বলে আমার প্রাণটা তখনও ধুক্‌পুক্‌ করছিল। তবু, ব্যথাবেদনা উপেক্ষা করলেও যেভাবে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তাতে এখান থেকে বেরোতে না পারলে আমার গল্প শেষ হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। অথচ যে চক্রব্যূহে ঢুকে পড়েছি, তার থেকে বেরোনোর কোনো রাস্তা কি আদৌ আছে?

     “ডাক্‌!” চোখের সামনেটা কালচে হয়ে আসছিল। ট্যানের ডাক শুনে মাথা ঝাঁকিয়ে সজাগ হলাম আবার। কমলা রঙের স্যুটের আড়ালে বসে থাকা মেয়েটার দিকেও নজর গেল তখনই।

     “আমাদের ওপর হামলাটা হয়েছিল আসলে এই মেয়েটাকে মেরে ফেলার জন্য – এটা আমার কাছে পরিষ্কার।” থেমে-থেমে বলে ট্যান, “এখান থেকে বেরোনোর ব্যাপারে কি ওর কাছ থেকে কিছু জানা যেতে পারে?”

     “কীভাবে?” আমি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করি, “মেয়েটা এখন নড়াচড়া করতে পারলেও ওকে তো প্রায় জড়বস্তুর মতোই লাগছিল প্রথমদিকে। আমাদের যে রিপোর্টগুলো দেখানো হয়েছিল, তাতেও তো বলা হয়েছিল যে একটা বিশেষ ধরনের সংক্রমণের ফলে ওর বেশিরভাগ অঙ্গ অচল হয়ে পড়েছে। সেজন্যই তো ওকে ওই স্যুটে মুড়ে রাখা। ওর সঙ্গে কথা বলবে কী করে?”

     “আমার কিন্তু মনে হচ্ছে…” বলে ট্যান এমন একটা কাজ করে, যা একমাত্র ওর পক্ষেই সম্ভব। মানে হাভেন মিলিশিয়ার আর কেউ এই ঝুঁকি নিত বলে আমার অন্তত জানা নেই। ও মেয়েটার ঘাড়ের কাছের প্রেশার-ভালভটা টিপে দেয়। প্রেশার বেরিয়ে আসতেই ওই অংশটা আলগা হয়ে পেছনে পড়ে যায়।

     কৈশোর আর যৌবনের সীমায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের মুখ দেখি আমি। পূর্ব এশীয় ধাঁচের চোখের সঙ্গে পাতলা ঠোঁট আর ধারালো নাকের মিশ্রণে সেই মুখে একটা অদ্ভুত দীপ্তি খেলা করছিল যেন। অথবা ঘরের আলোটা ওর মুখে জমা অল্প ঘামে প্রতিফলিত হচ্ছিল। যাইহোক, আসল ব্যাপার হল, কিছুটা দূরত্বে থেকেও মেয়েটার মুখে রোগের কোনো চিহ্ন দেখতে পেলাম না আমি। ট্যানও বোধহয় একই কথা ভাবছিল, তাই ও সন্তর্পণে মেয়েটার দু’হাতকেও স্যুটের বাঁধনের বাইরে বের করে এনে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করে। তাতেও ফল একই হয়।

     সাদা চোখে মেয়েটার মধ্যে আমরা কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছিলাম না।

 

“তোমার নাম কী?” থেমে-থেমে জিজ্ঞেস করে ট্যান। মেয়েটা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বোধহয় কথাটা বোঝার চেষ্টা করছিল। তার মধ্যেই আমার নজরে পড়ে, ঘরের ছাদ আর দেওয়ালের সংযোগস্থলে একটা প্যানেল খুলে যাচ্ছে।

     ট্যান আমার চোখ দেখে কী বুঝেছিল কে জানে, কিন্তু ও ছিটকে ওই জায়গাটা থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছিল। শুঁড়ের মতো চেহারার একটা কিছু ওখান থেকে নেমে এসে ওর একটা হাত ধরে পেছনদিকে মুচড়ে ধরে। আর্তনাদ করে ওঠে ট্যান। আমি ব্লাস্টারটা তুলে নিয়ে গুলি চালানোর আগেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে।

     মেয়েটার স্যুটের ধারে ধাতব লাইনিং দেওয়া ছিল। এই দৌড়ঝাঁপে কখন তার একটা অংশ ছিঁড়ে গিয়ে তারের কিছুটা অংশ বেরিয়ে এসেছে, তা আমরা খেয়ালও করিনি এতক্ষণ। এবার দেখলাম, ওই একটা তার দিয়ে কী হতে পারে।

     বিষাক্ত সাপের মতো ছোবল মারল মেয়েটার একটা হাত। লাইনিং থেকে কাপড়সহ তারের কিছুটা অংশ ছিড়ে এল। তৎক্ষণাৎ সেই তারটা দিয়ে শুঁড়ের ওপর দিয়ে পেঁচিয়ে নেয় মেয়েটা, তারপর সবটুকু শক্তি দিয়ে তারটার দু’প্রান্ত ধরে দু’দিকে টানে।

     শুঁড়টা কেটে যায়! বন্ধনমুক্ত হয়ে ছিটকে পড়া ট্যান ওর ব্লাস্টারটা ছাদের দিকে তোলে, তারপর ফায়ার করে থেমে-থেমে। বুঝতে পারছিলাম, অ্যাড্রিনালিন চাইছে ওকে দিয়ে কার্ট্রিজটা ওইদিকেই শেষ করাতে। কিন্তু নিজেকে সামলে, স্রেফ প্রয়োজনীয় ক’টা শট নিয়েই রিলোড করে ট্যান।

     পোড়া শুঁড়টা নীচে ফেলে তার মালিক আর তার সঙ্গীরা ওখান থেকে সরে যায়।

 

“আমরা এখানে নিরাপদ নই!” চিৎকার করে ওঠে ট্যান, “এই প্যানেলগুলো ওপাশ থেকে চাপ দিয়ে খুলে দেলা যায়। আমরা এখানে লড়তে পারব না। কিন্তু বুঝতে পারছি না, ওপরদিক থেকেও এই… প্রাণীগুলো কীভাবে আমাদের কাছে আসছে! ওদিকে তো কংক্রিট, আর তার ওপরে বালি।”

     মেয়েটা সিগনালিং ডিভাইসটার দিকে ইঙ্গিত করে। আমি বুঝতে পারি ও কী বলতে চাইছে। বলি, “চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ তো এল না এখনও।”

     অধৈর্য হয়ে মাথা নাড়ে মেয়েটা, তারপর ডিভাইসের দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটাকে অফ করে দেয়। আমি আর ট্যান হাঁ করে ব্যাপারটা দেখি, পরমুহূর্তে আমরা দু’জনেই বুঝতে পারি মেয়েটা কী বলতে চাইছে। ওই ডিভাইসে কেউ সাড়া দিক বা না-দিক, আমাদের শত্রুরা ওটা দিয়েই বুঝে নিয়েছে আমরা কোথায় আছি। তাই এখন আমাদের ওপর আরও আক্রমণ হবেই!

     ভাবনাটার ভিত্তিতে কী করণীয় তা বোঝার আগেই দরজা থেকে কিছুটা দূরের পোর্টহোলটা খুলে যায়। সেখান থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে দুটো অদ্ভুত জীব।

     অল্প আলোতেও বুঝতে পারছিলাম, প্রাণীগুলো একসময় মানুষ ছিল। কিন্তু এখন তাদের সর্বাঙ্গে আঁশের মতো কিছু চকচক করে ওঠে আলোয়। বুঝতে পারি, তাদের চোখে সবজেটে আভা। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে মেঝে বরাবর তারা আমাদের দিকে ধেয়ে আসে।

     ট্যান ঠান্ডা মাথায় দু’জনের দিকে পালা করে ট্রিগার টেপে – কিন্তু কিচ্ছু হয় না! দেখতে পাই, ব্লাস্টারের তীব্র ইমপালস ওই শরীরগুলোর আঁশে ধাক্কা খেয়ে পিছলে যাচ্ছে। ওরা এগিয়ে আসছে আরও কাছে। দু’জনেরই জিভের চেরা চেহারা আর ‘হিস্‌…স্‌’ শব্দটা আমরা শুনতে পাই।

     যা-থাকে কপালে ভেবে আমি শেলা-কে তুলে নিই, তারপর একজনের মাথা লক্ষ্য করে ট্রিগার টিপি। আগুন, ধোঁয়া, শব্দ, রক্ত আর মাংসের টুকরো ছড়িয়ে শরীরটা বিস্ফোরিত হয়। কিন্তু অন্যটা আমার নাগাল পেয়ে যায়। তবে আমার পায়ের ওপর ওটার ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে ভাবটা ভালোমতো টের পাওয়ার আগেই একটা ভোঁতা আওয়াজ হয়। পরক্ষণেই পিচকিরিরি মতো একটা স্রোত আমার জামা, এমনকি বন্ধ চোখ আর মুখ ভিজিয়ে দেয়।

     সাবধানে চোখ খুলে দেখি, একটা ধাতব টুলের ঘায়ে ওই সর্পমানবের মাথাটা দু’ফাঁক করে দিয়েছে মেয়েটা। আপনা থেকেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, “লক্ষ্মী মেয়ে!” কথাটা।

     “ঠান্ডা রক্ত।” বিড়বিড় করে ট্যান, “এই ব্লাস্টারগুলো ইমপালসে চলে। তাই ওদের কিছু হয়নি। কিন্তু এরকম আরও কত…?”

     উত্তেজনার ধাক্কা কেটে যাওয়া মাত্র যন্ত্রণা আমার শরীরেও স্রোতের মতো ফিরে আসে। ব্যথায় মনে হয় আমি অজ্ঞানই হয়ে যাব। ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করে দিয়ে নিজেকে সচেতন রাখার চেষ্টা করি আমি। তক্ষুনি আমি বুঝতে পারি, মেয়েটা কে।

     “মিলিটারি একটা সময় সুপার-সোলজার বানাতে খুব চেষ্টা করেছিল। মনে আছে?” আমি ট্যানকে জিজ্ঞেস করি।

     “সে তো কবে থেকেই ওরা করে যাচ্ছে। বানিয়েওছে হয়তো।” ক্লান্ত গলায় বলে ট্যান।

     “হয়তো নয়।” পেইনকিলার চিপের ফুরিয়ে আসা ভাঁড়ার থেকে দুটো নিয়ে জিভের তলায় রাখি আমি, “বানিয়েছিল। কিন্তু আর বানানো যায়নি। যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, কোনো কারণে তাদের শরীর সেই ‘উন্নতি’-গুলোকে বাজে জিনিস, এমনকি ক্যান্সারাস বলে ধরছিল। লোকে হাল ছেড়ে দিয়েছিল।”

     “তাহলে?” ট্যান যে কৌতূহলী হয়েছে, বেশ বুঝতে পারি। করিডর, ছাদ, দেওয়াল – সর্বত্র চোখ বোলাতে-বোলাতে মেয়েটাও আমার কথা শুনছে বলেই মনে হয়।

     “যুদ্ধের শেষ দিকে বেশ কয়েকটা বিদ্রোহী বেস মিলিটারির হাতে এসে পড়ে। বিদ্রোহীরা সরাসরি মিলিটারির সঙ্গে সংঘাতে যেত না। বিভিন্ন কর্পোরেশন আর তাদের পোষা মাফিয়াদের সঙ্গেই তাদের লড়াই চলত। তাই মিলিটারি ওই বেসগুলোতে যাদের পেয়েছিল, তাদের ওপর অত্যাচার করেনি। তখন একটি মূক ও বধির মেয়েকে পায় তারা। আমাদের কোডে তাকে একটাই নামে ডাকা হত।”

     “তোমাদের কোডে?” ট্যান জিজ্ঞেস করে, “মানে সিগনাল কোরে? কী নামে ডাকা হত?”

     “জিরো।” ব্যথাটা কমে আসছে বুঝে চোখ বুজে বলি আমি।

     “জিরো? মানে শূন্য?”

     “হ্যাঁ। তার পেছনে যুক্তি ছিল, সংখ্যার বাঁদিকে শূন্য বসালে তার যেমন অর্থ হয় না, ওই মেয়েটিকেও তেমনই অর্থহীন বলে দেখানো হয়েছিল মেডিকেল রিপোর্টে। কিন্তু বিদ্রোহীদের সিগনাল শুনে আমরা বুঝেছিলাম, মেয়েটাকে ছোট্টবেলা থেকে বিশেষভাবে বড়ো করা হয়েছে। ওকে পরীক্ষা করতে গিয়ে কিছু অপ্রত্যাশিত জিনিস পেয়েছিল কিউ ডিভিশন। আমাদের কম্যান্ডার বলেছিলেন, সময় হলে এই মেয়ে বাঁদিকে না বসে সংখ্যার ডানদিকে বসে সব হিসেব পাল্টে দেবে। কিন্তু…”

     “কিন্তু?”

     “কিচ্ছু হয়নি।” যুদ্ধ-শেষের সেই মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়তেই আমার মন হতাশায় নুয়ে যায়, “ওর মতো বহু অ্যাসেট শেষ অবধি কোথায় হারিয়ে গেছিল – আমরা আর জানতে পারিনি। তবে আজ বুঝলাম, জিরো মেগাকর্পের হাতে পড়েছিল। কয়েদি সাজিয়ে ওর ওপর মেগাকর্পের টিম আরও অজস্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিল নির্ঘাত। কিন্তু তাহলে ওরা এখন ওকে মারতে চাইছে কেন?”

 

মেয়েটা আমার কথা শুনতে পায়নি। পাওয়া সম্ভব নয়। ও যে জন্ম থেকে বধির – এটা আমি জানি। তবে ও বোধহয় আমার ঠোঁটের ওঠাপড়া অনুসরণ করে বুঝে ফেলেছিল, আমি কী বলছি। নিজের স্যুটের একটা পকেট থেকে সেলোফেনে মোড়া একটা কাগজ বের করে ট্যানের দিকে বাড়িয়ে ধরে ও। কম আলোতেও সেটা পড়ে ট্যানের ভ্রূ কুঁচকে ওঠে, তারপর ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

     “কী লেখা আছে ওতে?”

     “ইনমেট নম্বর ৪০৯-কে অবিলম্বে হাভেন মিলিশিয়ার কাছে হস্তান্তরিত করতে হবে। যথাযথ পরীক্ষার পর ওকে পোলার ফেডারেশনের হাতে তুলে দেওয়া হবে।”

     “পোলার ফেডারেশন?” আমার চোখ কপালে ওঠে, “কেন?”

     “এই মেয়েটি নাকি জন্মসূত্রে ওখানকার নাগরিক। যুদ্ধের পর বিনিময় হওয়া ডিক্লাসিফায়েড রেকর্ড থেকে এই কথা জানা গেছে। তাই…”

     “এইবার বুঝলাম।” আমিও দীর্ঘশ্বাস ফেলি, “আসল কলকাঠি নেড়েছে পোলার ফেডারেশনের বড়ো কর্পোরেশন তথা মাফিয়ারা। মেগাকর্পের সবচেয়ে বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বী তো ওরাই। এমন একটা অ্যাসেট ওদের হাতে চলে যাওয়ার আগেই যদি জেলে একটা দাঙ্গা হয়, আর তাতে ও মারা যায়, তাহলেই ভালো।”

     আমরা দু’জনেই তাকাই মেয়েটার দিকে। শান্তভাবে চেয়ারটা তুলে তাতে বসে চারপাশ দেখতে-দেখতে কী যেন বোঝার চেষ্টা করে মেয়েটা। তারপর ও হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যাতে আমার গলা শুকিয়ে যায়। টের পাই, ঘরের বাইরে করিডরে, যেখানে ছায়ারা ঘন হয়ে আছে, সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কিছু একটা… বা কাউকে খুঁজছে মেয়েটা।

     “কিন্তু এখন কী উপায়?” মাটির দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলে ট্যান, “সুপার-সোলজার না হলেও ও আমাদের দু’জনকেই বাঁচিয়েছে। তবে ওর ভরসায় কি আমরা এই নরক থেকে বেরোতে পারব? তাছাড়া মেয়েটা-মেয়েটা কতক্ষণ বলব ওকে আমরা? ইনমেট ৪০৯ বলেই কি ডাকা হবে ওকে?”

     “সাকুরা।” পুরুষকণ্ঠ শুনে দারুণ চমকে উঠি আমরা দু’জনেই। মেয়েটা, মানে ইনমেট ৪০৯ কিন্তু চমকায় না। বুঝি, ও আগেই এই কণ্ঠের অধিকারীর উপস্থিতি অনুভব করেছিল। ট্যান ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়ায়, তবে এবার ওর হাতে ব্লাস্টার ছিল না।

     লম্বা আর পাতলা চেহারার, রুপোলি বডিস্যুট পরা একটা বুড়ো ঘরে ঢোকে। তার পোশাকে আর হাতের মাশেটে রক্তের দাগ পুরু হয়ে লেগেছিল। মুখে, হাতে, শরীরে অজস্র আঁচড় বুঝিয়ে দিচ্ছিল – সে অক্ষত নয়। তবু, আমাদের দিকে তাকিয়ে এক আশ্চর্য নরম গলায় সে বলে ওঠে, “ওর নাম সাকুরা। নাওকো আর সেন-এর চেরি ব্লসম।”

 

পাঁচ

মোরিয়া কম্পাউন্ড, জন, একটু আগে

মোরিয়া কম্পাউন্ড কারও কাছে একটা ফুরিয়ে যাওয়া খনি, কারও কাছে জেলখানা, কারও কাছে মানবদেহ নিয়ে কদর্যতম পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গা। তবে প্রায় সবার কাছেই এটা একটা কিংবদন্তিসম জায়গাও বটে। রঙ-চড়ানো গল্পের ভিড়ে বা ক্লাবের রঙিন ধোঁয়ায় ভরা সন্ধ্যায় এই জায়গাটার নাম একবার হলেও ওঠে। এই এলাকায় আসার পর আমিও জায়গাটার কথা ওভাবেই শুনেছিলাম।

     মিলিটারি হেডকোয়ার্টারের উলটোদিকে একটা গাড়ি সারাইয়ের দোকানের নীচে ছিল আমাদের বেস। সেখানেই একদিন ধুলোর বুকে আঁচড় কেটে এলাকাটা সম্বন্ধে নানা কথা বলা হচ্ছিল। আমার হ্যান্ডলার হিসেবে হেনরি’র সবসময় আশঙ্কা হত, ঠিকমতো ব্রিফ না করা হলে আমি ভুলভাল কোথাও চলে যাব। হাতে গ্লাস নিয়ে ওই বলেছিল, “হিয়ার দেয়ার বি ড্রাগনজ!”

     আওয়াজটা পাওয়ামাত্র আমার ঠিক ওই কথাটাই মনে পড়ে গেছিল। ভাগ্যিস পড়েছিল। ড্রাগনের মুখ থেকে বেরোনো আগুন যাতে আমাকে ঝলসে না দেয় সেজন্য আমি একপাশে সরে গেছিলাম নিজের অজান্তেই। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে সেখানে এসে পড়েছিল শার্পনেলের একটা ঝাঁক। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটা আমাকে আঁচড়ে দিয়েছিল ঠিকই, তবে তার বেশি কিছু হয়নি।

     আমার মাথায় প্রশ্নটা জেগেছিল তখনই। গর্জনটা জান্তব ছিল। আশপাশ থেকে আসা গন্ধদের মধ্যেও জন্তু-জানোয়ারের ভাবটা স্পষ্ট ছিল। কিন্তু শার্পনেল গান ফায়ার করে কোন জন্তু?

     ভারী পায়ের এগিয়ে আসার শব্দ শুনে বুঝতে পারি, যে প্রাণীটি এগিয়ে আসছে সে দু’পেয়ে, সম্ভবত মানুষই। কিন্তু তার গলা থেকে যে আওয়াজটা বেরিয়ে আসছিল সেটা মানুষের গলায় আমি শুনিনি। একটা বড়ো জংশন বক্সের পাশে নিচু হয়ে অপেক্ষা করি আমি। প্রাণীটি কাছে আসামাত্র আমি তার ঘাড় বরাবর একটা রদ্দা মারি। বুঝতে পেরেছিলাম, শার্পনেল দিয়ে স্বাগত জানানো এই প্রাণীটিকে অজ্ঞান করে আমার লাভ হবে না, বরং পরে ভোগান্তি হবে। তাই ওকে আহত করার জন্য হাত চালাইনি।

     প্রাণীটি ধপাস্‌ করে সামনে পড়ে যায়। চেহারায় মানুষের মতো, এমনকি একটা গাউন গোছের জিনিস পরা থাকলেও এর চেহারায় বেশ কয়েকটা পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, যেন কোনো মানুষকে একটা খুনি গোরিলার আকার দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তবে ওকে নিয়ে বেশি ভাবার সময় ছিল না। আঘাতটা করার জন্য করিডরের দিকে ঝোঁকার ফাঁকেও দু’দিক দেখে নিয়েছিলাম। দেখতে পেয়েছিলাম, এই ভারী প্রাণীটির তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক শত্রুরা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। এরা ছোটো, অনেক বেশি দ্রুতগামী, এবং দেওয়াল বেয়ে এগোতে পারে!

 

কে জানে ক’টা হতভাগ্য বাচ্চা ছেলেকে কেটেছিঁড়ে এই চেহারা দেওয়া হয়েছে। আক্ষেপে মাথা নেড়ে আমি কাজ শুরু করি। নীচের শরীরটার পিঠে ভর দিয়ে আমি লাফিয়ে উঠি ওপরের ঘন ছায়ার দিকে। ওদিক দিয়ে এগিয়ে আসা প্রাণীটির মুখ থেকে একটা হিস্‌…স্‌ আওয়াজ শুনতে পাই। তবে আমার এই চলনটা তার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। আমার গলা লক্ষ করে ও ঝাঁপ দেওয়ার আগেই আমি তৈরি হয়ে গেছিলাম।

     মট্‌ করে একটা শব্দ তুলে প্রাণীটির গলার কাছের হাড় ভেঙে দেয় আমার হাতের মুঠো। তবে তারপরেও আমি থামি না। ছিটকে যেতে থাকা শরীরটায়, প্রায় উড়ন্ত অবস্থাতেই একটা লাথি মেরে আমি নিজেকে তুলে আনি আরও ওপরে, আর তারপর ধরে ফেলি ছাদ থেকে বেরিয়ে আসা একটা বিম-কে।

     ততক্ষণে বাকিরা আমার দিকে এগোতে শুরু করেছিল। কিন্তু মানুষী মারামারির সময় আমাকে যে-সব কথা মাথায় রাখতে হয়, সেগুলো ভোলার স্বাধীনতা পেয়ে গেছিলাম মোরিয়ার ভেতরে নামার সঙ্গে-সঙ্গে। তাই ওই প্রাণীগুলোর কারও গলা, কারও বুক, কারও মুখ থেঁতলে দেয় আমার হাত। ওরা আমাকে আঁচড়াতে পেরেছিল। অন্য কারও ক্ষেত্রে সেগুলো মারাত্মক হতে পারত। আমার… কিছু হয়নি।

 

শরীরগুলো নীচে আছড়ে পড়ার আগেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমাকে কোথায় যেতে হবে। এই জেল-কাম-হাসপাতালের নানা জায়গা থেকে ভেসে আসছিল আর্তনাদ। বুঝতে পারছিলাম, মোরিয়া-র নানা পরীক্ষার ফসলেরা কোনোভাবে রক্ষীদের পেরিয়ে হয়তো অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্লকে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তার মধ্যেও হাওয়ার চলাচল, জান্তব গন্ধের ঢেউ থেকে আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম। এখান থেকে কিছুটা দূরেই কোনো একটা জায়গায় জমা হয়েছে অনেকগুলো এমন প্রাণী।

     কিন্তু সেখানে পৌঁছোতে গেলে আমাকে অন্তত দুশো মিটার পেরোতে হবে। সেই রাস্তাটা আমি মোটেই একা থাকব না।

     মাথার মধ্যে কোথা থেকে যেন একটা অদ্ভুত আগুন জ্বলে ওঠে আমার। বুঝতে পারি, মাঝেমধ্যে আমাদের গোটা বেস আমার দিকে কেন ভয়ে-ভয়ে তাকাত।

     আন্ডারকভার অপারেশনে বিশেষজ্ঞ এই নিরীহ এজেন্টটির মাথার মধ্যে আরও কেউ আছে। সে কে, তা আমি গত কয়েকবছরে একটু-একটু করে জানতে পেরেছি। নিজের ভেতরে তার এগিয়ে আসার শব্দ শুনি এখন। টের পাই একটা অন্যরকম কাঁপুনি। চোখ দ্রুতগতিতে খুঁজে নিতে থাকে এমন অনেক কিছু যা এতদিন আমার ‘অন্যরকম’ চোখেও ধরা পড়ত না। একপাশের ঝাঁঝরির মতো ফুটো-ফুটো মেঝে দিয়ে তাকিয়ে সেই চোখেই একটা জিনিস দেখতে পাই।

     নীচের লেভেলে কয়েদিদের সঙ্গে রক্ষীদের একটা লড়াইয়ের স্পষ্ট চিহ্ন ছড়িয়ে ছিল। তবে সেই লড়াইয়ে বিজয়ীদের কপালে খুবই খারাপ ছিল। তাদের এরপর অন্য ‘প্রাণী’দের সঙ্গে লড়তে হয়। তার ফলাফল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ছিন্নভিন্ন শরীরগুলো যথেষ্ট ছিল। তাদের মধ্যেই, ছিঁড়ে বা কামড়ে আলাদা করে দেওয়া একটা হাতে তখনও ধরা ছিল একটা মাশেট!

     এক ঘুঁসিতে ঝাঁঝরির মতো অংশটা ভেঙে দিই আমি। বুঝতে পারি, ওই আওয়াজে আকৃষ্ট হয়ে আশপাশ থেকে এগিয়ে আসছে আরও অনেক শরীর। তাদের তোয়াক্কা না করে, ভাঙা পাতটা টেনে আলাদা করে দিয়ে আমি কোমর দুলিয়ে নীচে ঝুলে পড়ি। তারপর একবার দেওয়ালে ভর দিয়ে, শেষে শবদেহের ভগ্নাবশেষগুলোকে কুশন হিসেবে ব্যবহার করে আমি নেমে পড়ি। তারপর মাশেটটা তুলে নিই।

     প্রথম আক্রমণটা হয় প্রায় তৎক্ষণাৎ।

     মেঝেতে গা মিশিয়ে থাকা একটা লম্বাটে মাথা, আর মানুষের মতো ধড়ের প্রাণী আমার পা কামড়ে ধরার জন্য ঝাঁপিয়ে আসে। অন্য কারও ক্ষেত্রে পা বাঁচানো মুশকিল হত। এমনকি জন থ্যান্ড্রো’র পক্ষেও ব্যাপারটা একটু শক্ত হত। কিন্তু…

     সেনের পক্ষে নয়!

     কিছু ভাবার আগেই আমার মাশেটটা একটা বৃত্তাকার ঝলক তোলে ঘরের বাতাসে। প্রাণীটার মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে যায় সেকেন্ডের ভগ্নাংশে।

     তারপর আর খেয়াল থাকে না। আমার সামনে-পেছনে-ওপরে, এমনকি নীচ থেকে একের পর এক আক্রমণের ঢেউ আছড়ে পড়তে চায় আমার ওপর। নখ, দাঁত, অস্ত্র – সবকিছু দিয়ে তারা ডুবিয়ে দিতে চায় আমাকে। লাল আর কালো রঙের সেই স্রোতে একটু-একটু করে তলিয়ে যাই আমি।

     হারিয়ে যায় নামহীন এক সার্ভেইল্যান্স স্পেশালিস্ট অ্যান্ড্রয়েড। হারিয়ে যায় জন থ্যান্ড্রো।

 

মিলিটারির হাই র‍্যাংকিং অফিসারদের সন্তানের জন্মের সঙ্গে-সঙ্গে তাদের শরীরে একটা চিপ এমবেড করা হয়। তার সংকেত আর পাঁচটা যন্ত্রে ধরা পড়ে না, কারণ সেগুলো জেনেটিক প্রিন্ট মেনে কাজ করে না। কিন্তু এই নামহীন অ্যান্ড্রয়েডের বুড়োটে চেহারার আড়ালে যে স্মৃতি রয়েছে, তাতে ধরা আছে সেই প্রিন্ট! আর এই শরীর নিঃশব্দে, অন্য অনেক কিছুর মতো শুষে নিচ্ছে সেই বিশেষ ট্র্যাকার থেকে বেরিয়ে আসা স্পন্দন।

     সেন খুঁজে পেয়েছে তার মেয়েকে!

     রক্ত আর মৃত্যুর নকশা আঁকতে-আঁকতে এগিয়ে যাই আমি।

 

চার

মোরিয়া কম্পাউন্ড, ট্যান, এখন

“আপনি!” আমার গলা থেকে কোনোক্রমে কথাটা বেরিয়ে আসে।

     আমার বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যেটা রডরিগেজকে একেবারে সজাগ করে দেয়। কিছুটা উঠে বসে, যন্ত্রণাকাতর মুখেও ও আমার সামনে দাঁড়ানো বুড়োটার আপাদমস্তক দেখে। তারপর সবিস্ময়ে বলে, “আপনিই… কি… জন? স্টোরেজ ডিভিশন?”

     মেয়েটা শুধু তাকিয়ে থাকে বুড়োর দিকে। সেই দৃষ্টির অর্থ আমি তখন বুঝিনি। তবে মনে হয়েছিল, না বলেও অনেক কথা বলছে ও – সেগুলো সব শুনতে পাচ্ছে জন থ্যান্ড্রো।

     মাথা অল্প নড করে রডরিগেজের কথায় সায় দেয় জন। তারপর একটা মেডিকেল কিট বের করে এগিয়ে এসে রডরিগেজের শরীরটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিকে আমার মাথার মধ্যে প্রশ্নরা এমন করে ভিড় জমাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল যে মাথাটা ফেটেই যাবে। তাদের মধ্যে যেটা সবচেয়ে নিরীহ, সেটাই করলাম।

     “আমাদের খুঁজে পেলেন কীভাবে?”

     রডরিগেজের জামাটা ছিঁড়ে ফেলেছিল জন। সেটা, আর অন্য কয়েকটা কাপড় দিয়ে পাঁজরা আর পেশিগুলোকে টাইট করে বেঁধেছিল ও। ক্ষতস্থানের মুখগুলো পুড়িয়ে দিয়েছিল একটা ছোট্ট ব্লো-টর্চ দিয়ে। চুপচাপ এই কাজগুলো করার ফাঁকে ও আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল।

     “এই এলাকার ওপরেই একটা জ্যামার ড্রোন ভেসে ছিল। সেটা একটু ব্যস্ত হয়েছিল বলে আমি ডিসট্রেস সিগনালটা ধরতে পারি। ওটাই বলে দেয়, আপনারা মাটির নীচে আছেন। তারপর… বেশ কিছু সমস্যায় পড়লেও আমি এই কম্পাউন্ডের একটা স্কিমাটিক্স পেয়ে যাই। সেখান থেকে বুঝতে পারি আপনারা ঠিক কোথায় আছেন। তাছাড়া, আপনাদের সেবাযত্ন করার জন্য এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল। শেষ অবধি ওপরের ডাক্ট দিয়ে আসার মতো রাস্তা পাই।”

     “আপনি ওদের মধ্য দিয়ে আসতে পারলেন!” রডরিগেজের চোখ বিস্ফারিত হয়, “কী করে?”

     নাগালের মধ্যেই শুইয়ে রাখা মাশেটটা দেখিয়ে দেয় জন।

 

তখনই অধৈর্য ভঙ্গিতে দরজার কাছে এগিয়ে যায় ওই মেয়েটা – ইনমেট ৪০৯, থুড়ি সাকুরা! ওপরে-নীচে ঘুরতে থাকে ওর দৃষ্টি। বুঝতে পারি, বিপদ এগিয়ে আসছে আবার। জন ওর দিকে না তাকিয়েও কিছু বুঝেছিল বোধহয়। রডরিগেজের প্রায় পুরো ভারটা নিজের ওপর নিয়ে খুব সাবধানে উঠে দাঁড়ায় ও।

     একটা আর্তনাদ করে সোজা হওয়ার চেষ্টা করে রডরিগেজ, তারপর হাঁফাতে থাকে। আমার দিকে ঘুরে ও বলে, “ভালো কথা বলছি। আমাকে নিয়ে তোমরা কেউই এগোতে পারবে না। আমাকে এখানে রেখে যাও। মিস্টার জন আমাকে কিছুটা জোড়াতাপ্পি দিতে পেরেছেন। আমি ওদের আটকাই যতক্ষণ পারি।”

     “প্রশ্নই ওঠে না।” আমি আর থাকতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠি, “বেরোলে আমরা সবাই বেরোব। নইলে… কেউ না!”

     সাকুরা কি কিছু বুঝতে পারল? মেয়েটা কি লিপ রিড করতে পারে? নিশ্চয় পারে, কারণ ও আমার কথায় সায় দিচ্ছে – এটা তো দেখতেই পাচ্ছিলাম। অত্যন্ত দ্রুত নিজের বায়োহ্যাজার্ড স্যুটটা খুলে ফেলল মেয়েটা।

     শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকা বডিস্যুটের আড়ালে ছিপছিপে চেহারাটা দেখে আমার, কেন যেন, একটা চাবুকের কথা মনে হল।

     রডরিগেজকে দরজার পাশে হেলান দিয়ে বসিয়ে নিজে হাঁটু মুড়ে বসল জন। তারপর মেঝেতে অতি দ্রুত একটা স্কিমাটিক এঁকে বলতে শুরু করল।

     “এই লেভেল থেকে ওপরে যাওয়ার সবক’টা রাস্তা এখন… বিপদসঙ্কুল। আপনাদের মতো আমারও ধারণা ছিল, এখানে জেলখানাই মুখ্য। কিন্তু আজ বুঝতে পেরেছি, সেই কয়েদিদের ওপর পরীক্ষার নামে অনেক কিছু করে মেগাকর্প তাদের এমন জিনিসে পরিণত করেছে, যাদের মধ্যে মানুষের শয়তানি বুদ্ধি আছে, আর আছে শ্বাপদের প্রবৃত্তি। এদের সংখ্যা এত বেশি যে আমাদের এইক’টা অস্ত্র নিয়ে তাদের সঙ্গে লড়া যাবে না। তাই আমাদের এমন কিছু করতে হবে, যেটা ওরা কেউই আশা করবে না।”

     “সেটা কী?” প্রশ্নটা করতে গিয়েও আশঙ্কায় আমার পেটের ভেতরটা খালি হয়ে আসে। আসলে জনের কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে এতদিনে কিছুটা হলেও আন্দাজ হয়ে গেছিল তো। তাই মনে হচ্ছিল…

     “আমাদের নীচে নেমে কম্পাউন্ডের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এরিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।”

     “নীচে?” জনের ঠান্ডা গলায় বলা কথাগুলো শুনে চেঁচিয়ে ওঠে রডরিগেজ, “আপনি কি উন্মাদ? ওখানে তো এই জেলের রক্ষীরা আছে। আপনি যা বললেন তাতে এটা স্পষ্ট যে ওরা আমাদের মারতে চাইবে। সেখানে আমরা এই ক’জন কী করব?”

     “কেউ নেই।” মাথা নেড়ে বলে জন, “ওখানে রক্ষীরা আত্মরক্ষা করতে না পেরে শেষে গ্যাস ব্যবহার করেছিল। ওটা সাধারণ গ্যাস নয় বলেই মনে হচ্ছে, কারণ নীচে আমি বিশেষ কারও বেঁচে থাকার মতো চিহ্ন পাইনি। তাই চলুন। দেরি করে লাভ নেই।”

 

আগে মাশেট হাতে জন, ওর কাঁধে প্রায় ভর দিয়ে রডরিগেজ, তার পেছনে ‘শেলা’-কে হাতে নিয়ে আমি, একদম শেষে ব্লাস্টার হাতে সাকুরা – এভাবে বেরিয়ে আসি আমরা। মেয়েটার নাম জন কীভাবে জানল, এটা পরে জিজ্ঞেস করব ভেবেছিলাম। কিন্তু যে প্রশ্নটা নিজেকেও করিনি সেটা হল, আমি কেন সাকুরাকে এত বিশ্বাস করছি?

     আসলে কে ও?

     বেয়াড়া প্রশ্নগুলো নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবার সুযোগ পেলাম না, কারণ প্রথম আক্রমণটা এল আমরা ঘর থেকে করিডরে বেরিয়ে আসার পরেই।

 

বাঁদর আর কুকুরের মাঝামাঝি আকারের একটা কিছু জীব এতক্ষণ আমাদের কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে অন্ধকারে ছাদের কাছে পাইপ আর হুক ধরে খুব কাছে এগিয়ে এসেছিল। ওটা সোজা রডরিগেজের গলা লক্ষ করে ঝাঁপ দেয়। দৃশ্যটা আমি দেখতে পেয়েছিলাম। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পরে জন-ও ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। তবে আমরা নড়াচড়া করারও আগে একটা রুপোলি ঝলক অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে গেছিল ওই প্রাণীটির দিকে।

     একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ তুলে অন্ধকারের মধ্যেই ঠিকরে গেছিল ওটা!

     আমি ঘুরে দেখার আগেই সাকুরা’র হাতের ব্লাস্টার ঝলসে উঠেছিল আরও বারতিনেক। ধুপ্‌ ধাপ্‌ করে ভোঁতা আওয়াজ তুলে কাছে-দূরে কোথাও আছড়ে পড়েছিল আরও কয়েকটা শরীর। সেগুলো কাদের, বা সাকুরা কীভাবে তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে এই অন্ধকারে এমন করে ফায়ার করছে – এই নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করিনি। করে কোনো লাভও তো ছিল না!

     আমরা এগোতে থাকি। একটা দরজার পাশে এসে হঠাৎ হাতের মাশেটটা দিয়ে অস্বাভাবিক দ্রুত বেগে হাওয়ায় কয়েকটা ঘা দেয় জন। আমি কিছুই দেখিনি তখনও অবধি, কিন্তু হাওয়ার বুকে হালকা রুপোলি আভা ছড়িয়ে দেওয়া মাশেটটা স্থির হওয়ার পর মাটিতে আছড়ে পড়েও ছটফট করতে কয়েকটা শুঁড় – যেমন একটা আমাকে ঘরের মধ্যেও আক্রমণ করেছিল!

     এবারও কেউ কিছু বলে না। নিঃশব্দে এগিয়ে যাই আমরা। ডানপাশের দেওয়ালে, বেশ কিছুটা দূরে একটা ফাঁক দিয়ে কমলা আলো জ্বলছিল। মরুভূমির বুকে একটুকরো মরুদ্যানের মতো ওটা আমাদের সবাইকে আকৃষ্ট করে। আলোটায় কী ছিল জানি না, তবে আমার মনে একেবারে সিগনালের মতো করে ভেসে আসছিল একটা নির্দেশ – আমাদের ওদিকেই যাওয়া উচিত। ঠিক তখনই ফিসফিস করে উঠেছিল রডরিগেজ, “আলোটার ঠিক নীচে, অন্ধকারে। আর তার চেয়ে পনেরো ডিগ্রি ডানদিকে।”

     চিপের প্রভাবে আর যন্ত্রণায় ওর মাথাটা বোধহয় আমার চেয়ে সাফ ছিল। তাই আমি তখনও যা দেখিনি, সেটা ও দেখেছিল। আর একমুহূর্তও না ভেবে আমি ‘শেলা’-কে তুলে ফায়ার করি পরপর দু’বার – ঠিক যে-যে জায়গায় ও টার্গেট করতে বলেছিল, সেখানেই। আগুন আর আলোর দুটো বিরাট বলয় তৈরি করে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সর্বাঙ্গে শক্ত আঁশওয়ালা, অথচ শরীরের নিম্নাঙ্গের দিক দিয়ে মানুষের মতো দেখতে দুটো প্রাণী। ওখান থেকে লাফিয়ে ওঠা আগুন ছাদ-বরাবর ঝুলে থাকা আরও কয়েকটা প্রাণীর নাগাল পেয়েছিল। তাদের সবার আর্তনাদে জায়গাটা অবর্ণনীয় হয়ে ওঠে।

 

হঠাৎ বাঁদিকের পোর্টহোলটা খুলে যায়! রডরিগেজকে ডানদিকে একটা ধাক্কা দিতে সরিয়ে দিয়েছিল জন, নইলে ওখান থেকে বেরিয়ে আসা বিশাল শরীরটা একবারে ওর নাগাল পেয়ে যেত। হাওয়ায় হাতড়ে শরীরটা এক সেকেন্ডের মতো সময় নিয়েছিল সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো অবস্থান নিতে। জনের মাশেটের কাছে সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। কালচে তরলের ফোয়ারা ছড়িয়ে প্রাণীটার মাথা শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়।

     ওটার পেছনেই আরও কেউ ছিল। সে মুখ বের করার আগেই সাকুরা’র ব্লাস্টার মৃত্যুবৃষ্টি করে।

     রডরিগেজের ভারী শরীরটা কোনোক্রমে ধরে রেখেছিলাম আমি। সেই অবস্থাতেই দেখি, আলোর নীচে দেওয়ালের একটা প্যানেল সরে গেছে। সেখান থেকে বেরিয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুতবেগে আমাদের দিকে ছুটে আসছে একটা প্রাণী। সেটার চেহারায় মানুষের আদল থাকলেও ঘন কালো চোখজোড়া দেখে বুঝতে পারছিলাম, খিদে আর ঘেন্না ছাড়া ওটার মাথায় আর কোনো অনুভূতি নেই।

     জন পোর্টহোল দিয়ে বেরোতে চাওয়া প্রাণীগুলোর বন্দোবস্ত করছিল মাশেট দিয়ে। সাকুরা পেছনে ঘুরে করিডরের অন্যদিক থেকে ছুটে আসা প্রাণীদের দিকে ব্লাস্টার ফায়ার করছিল থেমে-থেমে, অভ্রান্ত লক্ষ্যে। আমি ‘শেলা’-কে তুলে তাক করার আগেই প্রাণীটা আমাদের কাছে এসে পড়ে।

     শান্তভাবে আমার হাত থেকে অস্ত্রটা নিয়ে ঠিক ওটার মাথার দিকে নিশানা করে ফায়ার করে রডরিগেজ। ছিন্নভিন্ন শরীরটার রক্ত-মাংস ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, এমনকি আমাদের নাকে-মুখেও।

     এপাশ-ওপাশ দেখে নিই আমরা। না, আর কেউ নেই। হয়তো আছে, কিন্তু আমাদের কাছে এগোতে ঠিক ভরসা পাচ্ছে না তারা। পোর্টহোলটা বন্ধ করে দেয় জন। তারপর তার একপাশে হাত দিয়ে একটা প্যানেল খুলে সেটাকে ভেঙে দেয়। আমাদের দিকে তাকায় ও।

     একটা কথাও না বাড়িয়ে আমরা এগিয়ে যাই সামনে। তবে অভ্যাশবশত আমি কোমরে হাত দিয়ে গুণে নেওয়ার চেষ্টা করি, হাতে ক’টা কার্ট্রিজ আছে আমাদের। চোখের ভাষাও কি পড়তে পারে সাকুরা? তাই হবে। আঙুল গুণে ও বুঝিয়ে দেয়, ওর ব্লাস্টারে আর একটা কার্ট্রিজ আছে স্রেফ। আমার কাছে আছে আর তিনটে, ব্যস।

     রডরিগেজ বন্দুকটা আবার আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলে, “এতেও আর তিনটে আছে স্রেফ। তারপর কাউকে পেলে পিটিয়ে মারার চেষ্টা কোরো। জিনিসটা ভারী তো!”

     জন কিছু বলে না, তবে ওর শরীরের ভাষা বুঝে নিতে সমস্যা হয় না। আমাদের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে!

 

তিন

লেক বুলন্দি, হেনরি, এখন

কী বিপদে পড়লাম রে ভাই!

     কম্যান্ডান্টের কথা মেনে আজ থেকে পাক্কা কুড়ি বছর আগে এই কাজের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। বিয়ে-শাদিও করিনি যে ছেলে-মেয়ে বড়ো হয়ে আলাদা হয়ে গেলে কেমন লাগে, তা বুঝব। কিন্তু ওকে ‘জন’ বলে ডাকা থেকে শুরু করে সবকিছু শেখানো – এগুলো তো আমাকেই করতে হয়েছিল। মানে এক অর্থে আমিই তো ওর বাপ। আর এখন হঠাৎ করে রোবোটা বলে কি না, ‘ওর’ কাজ আছে মোরিয়ায়, আমি যেন কেটে পড়ি!

     ড্রোনটা মেগাকর্পের, মোরিয়া কম্পাউন্ডের মালিকও তারাই। ওদের সঙ্গে ঝামেলা পাকানোর ইচ্ছে বা ক্ষমতা আমার ছিল না। তাই স্যান্ডহোভারটাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটিয়ে এনেছি এখানে। যুদ্ধের আগে এখানে সত্যিকারের লেক ছিল। এখনও আছে, তবে লেকটার জল এখন পুরোপুরি অ্যাসিডিক। মাটির নীচ থেকে উঠে আসা ধাতু, আর বাতাসের নানা জিনিস থিতিয়ে ওটাকে যা বানিয়েছে তাই দিয়েই গাড়ির ব্যাটারি চার্জ হয়ে যাবে। তবে আসল কথা হল, ডাম্পের নামে এখানে মিলিটারির একটা গোপন বেস বানানো আছে। ওখানে সবাই আমাদের লোক, তাই লুকিয়ে থাকার পক্ষে এটা বেশ ভালো জায়গা। খুব বেশি জবাবদিহিও করতে হয়নি আমাকে হঠাৎ উদয় হওয়া নিয়ে।

     কিন্তু আমার বড্ড ভাবনা হচ্ছে। আজ অবধি কখনও এই জিনিস হয়নি। তবে কী একটা প্রোটোকল যেন ছিল এই নিয়ে। স্বেতলানা বলেছিল। আচ্ছা, মেয়েটার এখন কী খবর? পাভেল মাঝেমধ্যে ওর হলোগ্রাম বের করে লম্বা-লম্বা শ্বাস ফেলে দেখি। তাহলে কি ও…?

     দুত্তোর, আমি এ-সব কী ভাবছি? আসল জিনিস হল, ওই রোবো-কে চালু রাখার জন্য যে মস্তিষ্ক তথা স্মৃতির ইমপ্রিন্ট কাজে লেগেছিল, তার কিছু একটা চাহিদা ছিল। পুরোনো আমলের গল্পে পড়া সেই ‘অতৃপ্ত আত্মা’-র মতো কেস আর কি! তাহলে কি সেটাই জনের দখল নিয়েছে এখন?

     কিন্তু আমি এখন কী করব? কম্যান্ডান্টের সঙ্গে কথা বলব? এই কুড়ি বছরে লোকটা বেঁচে আছে কি না তাই জানি না।

 

“এই যে গুণধর!” পেছন থেকে চিৎকার শুনে ঘুরে তাকাই। এই বেসের ইনচার্জ আক্রম এককালে আমার সঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছিল। ভাগ্যের ফেরে ব্যাটা প্রোমোশন পেতে-পেতে এখানে, আর আমি টানেলের নীচে থাকা ছেলেমেয়েদের স্কিল বাড়ানোর ক্লাস নিই! তবে সেটাও খারাপ নয়। অ্যাসিড শোঁকার চেয়ে বাচ্চাদের প্রশ্ন শোনা অনেকগুণে ভালো কাজ।

     “তোমরা মোরিয়ায় কী করে এসেছ বল দেখি।” বলে আক্রম, “ভয়ানক সব মেসেজ আসছে তো কমকনে।”

     আমি ঢোঁক গিলি। কমকন তথা কম্যান্ড কন্ট্রোল হল একটি বিশেষ নেটওয়ার্ক। সেটা এমন কয়েকটি কেন্দ্রকে জুড়ে রাখে যারা এই এলাকার প্রায় সবার ভাগ্য নির্ধারণ করে। এর মধ্যে আছে কিউব, মেগাকর্প হেডকোয়ার্টার, আর মিলিটারি হেডকোয়ার্টার। ওই নেটওয়ার্কের আসল ডিজাইন আমার করা। পরে তাতে যা কিছু কারিকুরি হয়েছে, তাও করেছে আমার হাতেই প্রশিক্ষিত লোকজন। তাই ওটা ক্র্যাক করে জনগণের বিনোদনের ব্যবস্থা করে দেওয়া আমার কাছে কঠিন হয়নি। কিন্তু তাতে এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে মানে তো ব্যাপারটা সিরিয়াস। হতচ্ছাড়া জন-কে ওখানেই যেতে হল!

     “আমি কিচ্ছু করিনি।” মিনমিন করি, “বিশ্বাস করো। এমনকি জন-ও কিছু করেনি। তোমাকে তো বললাম! কিন্তু কী এমন মেসেজ আসছে ওতে?”

     “মোরিয়া থেকে নাকি কী এক মহামূল্যবান সম্পদ নিয়ে কিউবে পৌঁছোনোর কথা ছিল দু’জন মিলিশিয়ার। তারা সেখানে থাকার সময় ওখানে দাঙ্গা হয়। তারপর ওখানকার কয়েদিরা নাকি ছাড়া পেয়ে গোটা কম্পাউন্ডে একেবারে গণহত্যা চালিয়েছে।”

     “মানে?” আমি হাঁ হয়ে যাই, “আরে ওখানকার রক্ষীরা সব পেশাদার খুনি, তার ওপর সশস্ত্র। তাদের মেরে ফেলল নিরস্ত্র কয়েদিরা! এটা কীভাবে হয়?”

     “এই কয়েদিরা নাকি ‘নিরস্ত্র’ ছিল না।” মুখের হাসিতে রহস্য মাখিয়ে বলে আক্রম, “ওরা নাকি সব ‘কাইমেরা’ ছিল। তাই, কী হয়েছে বুঝতেই পারছ।”

     ঘেন্নায় আমার নাক কুঁচকে যায়। তাও আমি বলি, “মানুষের চেহারায় পশুর বৈশিষ্ট্য আনার চেষ্টা নেহাত কম দিন তো হয়নি। কিন্তু শরীর এগুলো নেয় না। আমি নিজেও দেখেছি।”

     “সেটাই তো ব্যাপার।” নিচু গলায় বলে আক্রম, “ওই যে মহামূল্যবান সম্পদের কথা বললাম, সেও ছিল এক কয়েদি বা ইনমেট। তার শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি কাজে লাগিয়ে নাকি এই কয়েদিদের শরীরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য চাপা দিয়ে সেখানে অন্য জিনিস আরোপ করা গেছিল। এখন সেই অ্যাসেটকেই তুলে দিতে হবে পোলার ফেডারেশনের হাতে। এদিকে কম্পাউন্ডের সঙ্গে নাকি যোগাযোগ করাই যাচ্ছে না। অ্যাসেট এবং লোকেশন – দুইই হাতের বাইরে চলে গেছে বলে ‘টেক্স’ প্রোটোকল ফলো করার আদেশ দিয়েছে মিলিটারি। জন-কে কীভাবে বের করা যায়, সেটা বলো ঝটপট।”

     “টেক্স প্রোটোকল!” আমার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়, “তার মানে মিসাইল স্ট্রাইক করে সব উড়িয়ে দেওয়া হবে, তাই তো? মিসাইল কে ফায়ার…”

     আক্রমের ব্যথিত মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা শেষ করা অদরকারি হয়ে পড়ে। গোপন হলেও মোরিয়া-র সবচেয়ে কাছের মিসাইল বেস এটাই! দাঁতে-দাঁত ঘষে আমি জিজ্ঞেস করি, “আমাদের হাতে কতক্ষণ সময় আছে?”

     “দশ মিনিট।” আক্রম চিন্তিত মুখে বলে, “চপারে তিন মিনিট লাগবে ওখানে পৌঁছোতেই। আরও তিন মিনিট ফিরতে। মাঝে চার মিনিট মাত্র হাতে পাবে তুমি। যাবে?”

     “যেতেই হবে।” আমি লাফিয়ে উঠি, “হতচ্ছাড়া কোনোভাবে নিজের উপস্থিতি একবার বুঝিয়ে দিক শুধু। তাহলেই ওকে তুলে নিতে পারব। নইলে তোমরা আমাকেও ওখানে ফেলে পালিয়ে এসো।”

     চপারের দিকে ছুটতে-ছুটতে শুধু ভাবার চেষ্টা করি, কোথায় আছে এখন জন। ও যেখান দিয়ে ঢুকেছিল, সেখান দিয়ে বেরোতে পারে। আবার ওদিকটা যদি শত্রুদের হাতে চলে যায়, তাহলে ও নীচে নামবে। তারপর সেখান থেকে ওপরে ওঠার স্বীকৃত রাস্তাগুলোর কোনোটা ধরতে চাইবে, যাতে দ্রুত ওপরে ওঠা যায়। জানি, পরিকল্পনাটা শুনতে যত সহজ, বাস্তবে সেটার রূপায়ন ততটাই কঠিন। তবে জন…

     “একটা কথা বলো হেনরি।” রোটরের আওয়াজ ঢাকা পুরু ইয়ারমাফের মধ্য দিয়েও আক্রমের চিৎকার শুনতে পাই, “জন এখনও… মানে… ওই কাইমেরার দল নাকি বড়োই মারাত্মক! ওর কিছু হবে না তো?”

     “কিচ্ছু হবে না।” ঢোঁক গিলে বলি আমি, “কে জানে, ও হয়তো এখনই বেরিয়ে আসার রাস্তায় অনেকদূর এগিয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি চলো।”

 

দুই

মোরিয়া কম্পাউন্ড, জন, এখন

একটা লেভেল নামব। শেলা থেকে একটা শেল আর ব্লাস্টারের একটা কার্ট্রিজ খরচ হবে। বাকিটা মাশেট আর হাতে যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে সামলাতে হবে। এই ছিল আমাদের পরিকল্পনা। মুশকিল হল, সব পরিকল্পনার মতো এটারও বারোটা বেজে গেল এক ধাপ নীচে নামতেই, ইনফ্যাক্ট নামার পথেই।

     “শ্যাফট দিয়ে নামা মানে আত্মহত্যা করা।” আমি বলেছিলাম, “একে তো অফিসারকে আমরা ধরে নামাতে গেলেই ওঁর ক্ষতস্থানগুলো আবার এক্সপোজড হয়ে যাবে। তার ওপর অন্তত দু’জনের একটা করে হাত ওতেই ব্যস্ত থাকবে। তাই আমাদের সিঁড়ি দিয়েই নামতে হবে।”

     সবাই সায় দিয়েছিল। এবার নামার সময় সামনে ছিল সাকুরা। পেছনে রডরিগেজ-কে ধরে ট্যান। শেষে আমি। ফাঁকা করিডরের একপ্রান্তের দরজাটা খুলে পায়ের কাছটা দেখে নিয়েছিল সাকুরা, তারপর নামতে শুরু করেছিল।

     একসঙ্গে অন্তত পাঁচটা প্রাণী সামনে, পেছনে, ওপরে, এমনকি নীচ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর দিকে।

     ধন্যি মেয়ের ক্ষমতা! আমার চোখেও ছবিগুলো ঠিকমতো ধরা পড়ার আগেই মেয়েটা ব্যালেরিনার মতো করে আঙুলে ভর দিয়ে শরীরটা অর্ধচন্দ্রাকারে ধুরিয়ে, ঠিক পাঁচবার ফায়ার করেছিল। পাঁচটা শরীর ছিটকে গেছিল তৎক্ষণাৎ। আমার মাথার ভেতর চলতে থাকা পুঁজির কাউন্টারটা গড়গড়িয়ে নেমে এসেছিল কিছুটা। তবে এর বেশি ভাবার সুযোগ পাইনি। সাকুরা নীচে নামতে শুরু করেছিল খুব তাড়াতাড়ি।

 

ঘোরানো সিঁড়িটা একটা লেভেলে গিয়ে থেমেছে। সেখান থেকে স্কাইওয়াকের মতো করে বেশ কয়েকটা সিঁড়ি এদিক-ওদিক ছড়িয়ে গেছে। আমরা সবাই জানতাম, ওখানে পৌঁছোনোর পর নখ, দাঁত, হয়তো অস্ত্র নিয়ে এই নরপশুদের একটা বিরাট ঢেউ আমাদের ওপর আছড়ে পড়বে। ব্লাস্টার দিয়ে তাদের মোকাবিলা করতে হলে আমাদের পুঁজি এখানেই শেষ হয়ে যাবে। অথচ ওখানে পৌঁছে, আমার হ্যাক করা স্কিমাটিক্সের ভিত্তিতে একটা রাস্তা বেছে না এগোলে আমরা এখান থেকে বেরোতে পারব না। ছবিটা বলছে, ওখান থেকে ঠিক নীচেই রয়েছে ল্যান্ডিং বে – যেখানে মোরিয়া-র প্রশাসককদের জরুরি ভিত্তিতে বাইরে নিয়ে আসার জন্য একটা ক্যাপসুল বসানো আছে। সেটা নিয়ে এখানকার ইনচার্জ পালানোর চেষ্টা করেছিল নির্ঘাত, কিন্তু সে বোধহয় বেরোতে পারেনি। বেরোলে সেলফ-ডেসট্রাক্ট গোছের শুরু হয়ে যেত এতক্ষণে। তাই পালাবার রাস্তা ওটাই।

     পুরো জিনিসটা ভাবতে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ লেগেছিল। তবে আমার দিকে নজর রেখেছিল বলে ট্যান হয়তো ভাবনাগুলোর আঁচ পায়। ও চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে, “পেছনের দরজাটা বন্ধ করা যাবে?”

     “না।” আমি মাথা নাড়ি, “এটায় কিপ্যাড নেই। গায়ের জোরে ওরা দরজাটা ভেঙে ফেলবেই।”

     “ভাঙুক না।” রডরিগেজ বলে ওঠে, “আমরা না হয় তাদের জন্য একটা উপহার রেখে যাই।”

     সত্যিই তো! আমাদের কাছে এখনও ‘শেলা’-র তিনটে কার্ট্রিজ আছে। তাদের একটা বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিল ট্যান। ওটা নিয়ে দরজার কাছে এগিয়ে গিয়েই আমি দেখতে পাই, দূরে ছায়ার মধ্যে জমাট অন্ধকারের অনেকগুলো টুকরো চলফেরা করছে। আর মাত্র কিছুক্ষণ, তারপরেই ওই ঢেউটাও আমাদের ওপর নেমে আসবে।

     আমি দরজাটা বন্ধ করে তার এক-ধার বরাবর একটা শেল লাগিয়ে প্রেশার-পয়েন্টটা খুলে নিয়েই সেটাকে দরজার ফাঁকে চেপে দিই গায়ের জোরে। এবার দরজাটা খোলামাত্র চাপটা সরে গিয়ে শেলটা ওই ফাঁক থেকে গড়িয়ে নেমে আসবে আর ফাটবে – দরজার ওপাশে!

     এই কারিগরিটুকু করেই আমি বাকিদের পাশ কাটিয়ে নেমে আসি। সাকুরা’র চোখে চোখ রেখে বুঝিয়ে দিই, ও যেন ভীষণ জরুরি দরকার না হলে ব্লাস্টার ফায়ার না করে। তারপর এক লাফে সিঁড়ির অন্য প্রান্তের লেভেলটায় পৌঁছোই আমি। স্কাইওয়াক বরাবর, খাবারের সন্ধান পাওয়া ড্রাইভার অ্যান্ট বা সলডাডো-র মতো করে আমার দিকে ধেয়ে আসে বিভীষিকার দল।

     আবার সেই অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটে।

 

জন থ্যান্ড্রো’র সব অস্তিত্ব কোথায় যেন তলিয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে। আমি থাকি, কিন্তু স্রেফ দর্শকের মতো। মাশেট দিয়ে, পার্টিতে কনফেটির মতো করে রক্ত-মাংস ছড়িয়ে দিতে থাকে অন্য এক সত্তা। তার আসল পরিচয় মিলিটারির ক্লাসিফায়েড রেকর্ডের এতটাই গভীরে তলিয়ে আছে যে আজ কারও পক্ষে ইচ্ছে থাকলেও সে-সব আর জানা সম্ভব নয়। শুধু আমার মাথায় আছে তারা – টুকরো-টুকরো কষ্ট, রাগ, অভিমান, আর একচিলতে সুখ হয়ে।

     না। এক অদম্য সুপার-সোলজার হওয়া নিয়ে সুখের কোনো অনুভূতি নেই তার। সেটা আছে দু’জনের কথার সঙ্গে মিশে। তাদের মধ্যে একজন হারিয়ে গেছে। আরেকজন রয়েছে একটু পেছনে।

     আর তাকে হারাবে না সেন!

     মাশেট চলতে থাকে যন্ত্রের মতো। অনুভব করি, যখন আমার যান্ত্রিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোও থেমে যেতে চাইছে, তখনও পজিট্রনিক ব্রেনের গভীর থেকে ভেসে আসছে এক রহস্যময় সঙ্কেত।

     “বাবা!”

     কেউ কি ডাকছে আমাকে? কে ডাকছে আমাকে?

     “বাবা! আমি আছি। আমি থাকব। তুমি রাস্তা দেখাও।”

     সাকুরাই কি বলছে কথাগুলো? চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পাই, ও অব্যর্থ লক্ষ্যে পাঁচটি সশস্ত্র প্রাণীকে অনন্তশয্যায় শুইয়ে দিয়ে শান্তভাবে রিলোড করছে। আমার দিকে তো ও তাকিয়েও নেই। তাছাড়া সাকুরা তো কথা বলতে পারত না। তাহলে কি শরীরী চেতনার অন্তরালে, নিঃশব্দ এক পৃথিবীতে বন্দি থাকা মেয়েটা তার ওপর চলা অজস্র কেমিক্যাল, চিপ আর যন্ত্রণা আত্তীকরণ করে এক অন্য ভাষার সন্ধান পেয়েছে?

     জানি না। তবে বুঝি, আর সেই ডাকে সাড়া দিই। যন্ত্রের সহ্যশক্তি অতিক্রম করেও নড়তে থাকে জন থ্যান্ড্রো।

     লেভেলের পাশের দেওয়ালে মিশে থাকা দরজাটার নাগাল পাই। কি-প্যাড হ্যাক করা আমার কাছে কোনো ব্যাপার ছিল না, তবে তার জন্য দু’টো হাতই কিছুক্ষণের জন্য দরকার ছিল। দরজার ওপর ঝুঁকে পড়তে-পড়তেই পেছনে হাওয়ার নড়াচড়া থেকে বুঝি, একটা বিশাল শরীর আমার খুব কাছে এসে গেছে।

     কামানের মতো গর্জে ওঠে ‘শেলা’। পেছনের শরীরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। প্রায় একইসঙ্গে একটা বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে বুবি-ট্র্যাপ করে রাখা দরজাটার পেছনেও। মাথার মধ্যে কাউন্টারটা গড়িয়ে নামে আরও কিছুটা। আর মাত্র একটা শেল আছে আমাদের সঙ্গে।

     আমি দরজাটা খুলে ফেলি।

 

ওপাশে একটা দুধসাদা করিডর দেখতে পাই আমি। এখানে কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। সাধারণ কিউবিকলের মতো দেখতে হলেও আসলে এটা ব্যবহার করার অধিকার ছিল মুষ্টিমেয় কয়েকজনের। ফলে দু’দিক দিয়েই এটা বন্ধ ছিল। তাই ওই নরপশুরাও এটার সন্ধান পায়নি।

একপাশে সরে দাঁড়াই আমি। এক হাতে স্টেলাকে আঁকড়ে থাকা রডরিগেজকে প্রায় টেনেহিঁচড়ে ওপাশে নিয়ে যায় ট্যান। মানুষ আর কুমিরের মাঝামাঝি ঊর্ধ্বাঙ্গ নিয়ে আমার কাছে পৌঁছে গেছিল আরেকটা প্রাণী। শূন্যে ভল্ট খাওয়ার মতো করে নিজের জায়গা থেকে আকাশে উঠে যায় সাকুরা, তারপর বাতাসেই নিজের পায়ে সবটুকু জোর নিয়ে এসে লাথিটা নামিয়ে আনে প্রাণীটার মাথা আর ঘাড়ের সংযোগস্থলে।

     মট্‌ করে একটা শব্দ হয়। প্রাণীটা মাটিতে আছড়ে পড়ার আগেই একলাফে ওপাশের করিডরে ঢুকে যায় সাকুরা। ওর পেছনে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দ্রুত কি-প্যাডে একটা ইউনিভার্সাল প্রাইম টাইপ করে সেটাকে একেবারে সিল্‌ করে দিই।

     চারজন এগিয়ে যাই করিডর ধরে।

     হঠাৎ থমকে যায় সাকুরা। প্রায় একইসঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ি আমি। আমার কানে ধাক্কা মেরেছে একটা অতি পরিচিত কম্পাঙ্ক! তবে তাতে কোডেড বক্তব্যের বদলে ভেসে আসছে পরিচিত গলায় সুবচন।

     “হতচ্ছাড়া বুড়ো!” হেনরি’র আর্তনাদ শুনতে পাই আমি, “যদি এখনও বেঁচে থাকো, তাহলে আর তিন মিনিটের মধ্যে মোরিয়া-র এক নম্বর গেটের সামনে পৌঁছোও। মিসাইল হিট হতে আর ছ’ মিনিট বাকি আছে!”

     মিসাইল হিট! সাকুরা কীভাবে ওটা শুনতে পেয়েছিল জানি না, তবে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ট্যান বুঝে ফেলে যে আমাদের হাতে আর সময় নেই।

     “আমাকে ছাড়ো ট্যান।” বিকৃতমুখে বলে রডরিগেজ। বুঝতে পারি, আমার সাময়িক শুশ্রূষার মেয়াদ ফুরিয়ে ও একটু-একটু করে, শরীরী ভাষায় ‘কোল্ড জোনে’ চলে যাচ্ছে।

     “তোমরা এগিয়ে যাও।” বলে ট্যানকে ছেড়ে দিয়ে ধপাস্ করে মেঝেতে বসে পড়ে।

     “ডাক্‌!” অসহায়ের মতো চেঁচিয়ে ওঠে ট্যান, “আমি তোমাকে অর্ডার দিচ্ছি! তুমি এরকম কোরো না। আমি পারব তোমাকে নিয়ে এগোতে। আর তো একটু…”

     রডরিগেজ মাথা নাড়ে। বুঝি, ওর দম ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু এও বুঝি যে সেন সরে গেছে পজিট্রনিক পথঘাটগুলো থেকে। তার জায়গায় এগিয়ে এসেছে বুড়োটে জন, যে মারার চেয়ে বাঁচানোয় বেশি আগ্রহী। নিচু হয়ে ভারী শরীরটাকে দু’হাতে পাঁজাকোলা করে তুলে নিই আমি। ট্যানের চোখে প্রথমে বিস্ময়, তারপর কৃতজ্ঞতা, শেষে কেমন একটা অন্যরকম অনুভূতি খেলা করে যায়।

     মামুলি যন্ত্রমানব এ-সবের কী বুঝবে বলুন? মোদ্দা কথা হল, এবার আমরা তিন প্লাস এক – মোট চারজনেই ছুটতে শুরু করি প্রাণপণে।

 

এক

এক নম্বর গেট, ট্যান, এখন

করিডর থেকে একটা নিউম্যাটিক টিউবে ঢুকে শরীর ছেড়ে দিয়েছিলাম আমরা। দারুণ বেগে দুলতে-দুলতে নামার সময়ে আশপাশ থেকে ভেসে আসা ব্লাস্টারের শব্দ, গর্জন আর আর্তনাদ শুনে বুঝতে পারছিলাম – কয়েকটা জায়গায় এখনও প্রতিরোধ চলছে। মনে হয়েছিল, তাহলে এদের পাহারায় মোরিয়ার প্রশাসকেরা পালাতে পেরেছে কি?

     নীচের ছোট্ট মনোরেলের পাশে নামতেই উত্তরটা পেয়ে গেছিলাম। ছিন্নভিন্ন মানুষ আর নরপশুদের মধ্যেই ছড়িয়ে ছিল চকচকে ইউনিফর্ম পরা শরীরগুলো।

     হ্যাঁ, ভানুস্কার প্রায় ছিঁড়ে দু’-ফাঁক করা শরীরটাও ছিল ওই স্তূপে। দূরের বেশ কিছু নরপশুর শরীর মোটামুটি অক্ষত অথচ স্থির হয়ে ছিল। বুঝে ফেলেছিলাম, কেন লাফ দিয়ে নীচে নামার আগে আমাদের দু’জনকে মাস্ক পরিয়েছিল জন। ও আর সাকুরা কিছু পরেনি, ওদের নাকি অন্যভাবে চিপড্‌ করে দেওয়া হয়েছে।

     মিলিটারি এক সময় ভি-সারিন নামের একটা মৃত্যুবাহী গ্যাস ব্যবহার করত গর্তে ঢুকে থাকা বিদ্রোহীদের নিকেশ করার জন্য। এখানে সেটাই কাজে লাগানো হয়েছে। তবে ওসব নিয়ে ভাবার সময় ছিল না। সামনে দাঁড়ানো ছোট্ট দুটো ক্যাপসুলের চেহারা দেখে বুঝি, বিস্তর ঝড়-ঝাপটা গেছে ওদুটোর ওপরে। গ্যাসের উপস্থিতি টের পেয়ে কাছে থাকা রক্ষী আর ওই নরপশুরা নিশ্চয় এগুলোর ভেতরে ঢুকতে চেয়েছিল। তবু ওগুলো খোলা যায়নি।

     কেন? উত্তরটা মাথায় ঝলসায়। ভানুস্কার শরীরটা দেখিয়ে আমি চেঁচিয়ে বলি, “ওর প্রিন্ট ম্যাচ করলে ক্যাপসুল খুলবে।”

     জনের মাশেটটা সাকুরা’র হাতে ছিল। এক কোপে ভানুস্কা’র মাথাটা আলাদা করে সেটা, আর মাশেট – দুটোই বাড়িয়ে ধরে সাকুরা। চোখটা খুলিয়ে সেটা ক্যাপসুলের ধারে প্রায় অদৃশ্য একটা স্ক্যানারের ওপর চেপে ধরে জন। মসৃণভাবে সরে যায় ওপরের ঢাকনাটা।

 

একজন যাত্রী আর একজন চালক – স্রেফ এদের বসানোর মতো জায়গা থাকে একটা ক্যাপসুলে। কে কোথায় বসবে সেই নিয়ে ভাবতে-ভাবতেই পেছন থেকে একটা হুঙ্কার ভেসে আসে। সাকুরা প্রায় না তাকিয়েই সেদিকে একবার ব্লাস্টার ফায়ার করে। ধপ্‌ করে একটা শব্দ হয়। তখনই টার্মিনালের অন্য দিক থেকে পর-পর ব্লাস্টার ফায়ার হয়। ক্যাপসুলের এপাশে থাকায় আমরা নিরাপদ ছিলাম, কিন্তু প্রথম ক্যাপসুলের ঢাকনাটা খসে পড়ে। মসৃণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে পরপর চারবার ফায়ার করে সাকুরা।

     ওপাশটা চুপচাপ হয়ে যায়। আমি আর রডরিগেজ তখনও বোঝার চেষ্টা করছিলাম, এবার কী করণীয়। জন কিন্তু থেমে ছিল না। ভানুস্কা’র চোখের সাহায্য নিয়ে ও পরের ক্যাপসুলটাও খুলে ফেলে। তারপর বলে, “এটাতে আপনারা বসুন। নইলে কেভলার পরেও হাওয়ার ধাক্কা সামলানো যায় না। আমরা সামলে নিতে পারব। তাছাড়া, আমাদের হাতে অস্ত্র থাকবে। খোলা জায়গায় থাকলে আমাদের সুবিধেই হবে।”

     নীরবে আদেশ পালন করি আমরা। দুটো ক্যাপসুলকে দ্রুত জুড়ে দেয় জন। তারপর চলতে শুরু করি আমরা। এতক্ষণ আমরা কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না। ক্যাপসুলের লাগোয়া স্পিকার চালু হতেই আমাদের কানেও আছড়ে পড়ে আলট্রা হাই ফ্রিকোয়েন্সিতে একটা বিশেষ বার্তা।

     “আর এক মিনিটের মধ্যে এক নম্বর গেটের সামনে এসো জন। মিসাইল স্ট্রাইক হতে চার মিনিট বাকি আছে!”

     ঝড়ের বেগে অন্ধকার টানেল বেয়ে ওপরের দিকে ছুটে যায় আমাদের ক্যাপসুল। মাথার ওপর আলোগুলো এত দ্রুত সরে যায় যে মনে হয় যেন আলোর একটাই রেখা ওপর দিয়ে কেউ টেনে দিয়েছে। সরু টানেলের মতো অংশটা থেকে একটা বাঁক নিয়ে আমরা এবার বেরিয়ে আসি।

     সামনের ক্যাপসুল থেকে ঝলক দেখি – একটা, দুটো,… পাঁচটা! অন্ধকার, পাথর আর কংক্রিটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাই আমরা। আবার মৃত্যু ঝলসে ওঠে সামনের ক্যাপসুলে, সাকুরা’র হাতে ধরা ব্লাস্টার থেকে। বারবার!

     একবার দুলে ওঠে আমাদের দুটো ক্যাপসুলই। ওই ভয়ঙ্কর বেগে ছুটে যাওয়া জিনিসেও কীভাবে প্রাণীটা লাফিয়ে উঠেছিল, আমি জানি না। প্লেক্সিগ্লাসের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকেও ভয়ে কুঁকড়ে উঠেছিলাম আমরা দু’জন। রক্তলাল চোখ আর ধারালো দাঁতে ভরা ফেনিল মুখ নিয়ে প্রাণীটা আমাদের দিকে ঘুরে কিছু করার আগেই ওটার মাথা, আর তারপর শরীর খসে পড়েছিল সামনে থেকে।

     জন থ্যান্ড্রো’র রোগা শরীরটা আবার নিচু হয়ে ক্যাপসুলের ভেতরে নেমে এসেছিল। শুধু ওর হাতে ধরা রক্তমাখা মাশেটটা ঝিকিয়ে উঠেছিল টানেলের আলোয়।

 

মাত্র এক মিনিটে ফুরিয়ে গেছিল আমাদের সফর। গেটের সামনে টার্মিনালে ক্যাপসুলটা থামার সঙ্গে-সঙ্গে লাফিয়ে নেমে পড়েছিল সাকুরা আর জন। টার্মিনাল থেকে কিছুটা দূরেই ছিল কম্পাউন্ড থেকে বেরোনোর এমারজেন্সি গেট। সেখানে যে রক্ষিরা ছিল তারা বোধহয় তখনও খবর পায়নি যে এই ক্যাপসুলে যাদের আসার কথা, তাদের বদলে অন্য কেউ আসছে। তারা আমাদের দেখে কিছু বলার বা করার আগেই সাকুরা’র ব্লাস্টার ঝলসে উঠেছিল আবার।

     দ্বিতীয় ক্যাপসুলের ঢাকনাটা সরিয়ে ওরা প্রায় ছেঁচড়ে বের করেছিল আমাদের দু’জনকে, তারপর সেভাবেই টেনে নিয়ে গেছিল গেটের সামনে। গেটের লকটা দেখে জন মাথা নেড়েছিল। বুঝতে পেরেছিলাম, এটা খোলার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। এদিকে ঠিক কার বায়োমেট্রিক্সে এটা খুলবে তাও বুঝতে পারছিলাম না।

     মাটিতে পড়ে থাকা একটা ট্র্যান্সমিটার তুলে জনের দিকে বাড়িয়ে ধরে সাকুরা। জন সেটাকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বলে ওঠে, “তোমার সঙ্গে যদি অস্ত্রশস্ত্র থাকে তাহলে গেটটা ওড়াও হেনরি। আমি এপাশে আছি।”

     হাত-পা ছুঁড়ে ও আমাদের সরে যেতে বলে। নিজেও সরে যায় কিছুটা দূরে। রিসিভারে কোনো বার্তা আসে না, তার বদলে একটা প্রবল গর্জন তুলে আগুন আর ইস্পাতের বৃষ্টি নেমে আসে দরজাটার ওপাশে। উড়ে যায় ওটা!

     প্রথমে জন, ওর পেছনে রডরিগেজকে ধরে আমি, শেষে সাকুরা – এভাবেই আমরা বেরিয়ে আসি। সামনেই মাটিতে নেমেছিল একটা মিলিটারি চপার। সেটার পাশে, বালিতে দাঁড়িয়েছিল কম্ব্যাট ফেটিগ পরা দু’জন মানুষ। তাদের একজন ছুটে এসে জনকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলে, “এত সহজে তুমি ছুটি পাবে না বুড়ো! এবার ওঠো চপারে।”

     তার পাশের সৈন্যটি আমাদের দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনারাই কি হাভেন মিলিশিয়া-র এজেন্ট?”

     আমি বলি, “আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু আমার পার্টনারকে এক্ষুনি একটা ক্লিনিকে না নিলে ও…”

     চোখের কোণে একটা নড়াচড়া খেয়াল করেছিলাম বলে কথাটা শেষ করতে পারিনি। সেদিকে চোখ ঘোরাতেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখি। চপারের চালক তার পাশের দরজা খুলে সামনে ঝুঁকে হাতের অস্ত্রটা নিঃশব্দে তুলে আনছে সাকুরা’র দিকে।

     তারপর একসঙ্গে অনেককিছু হয়।

     একলাফে, প্রায় উড়ে গিয়ে নিজেকে সাকুরা আর পাইলটের অস্ত্রের মাঝে নিয়ে আসে জন। পাইলট তখনই ফায়ার করে। সরু শিখার ধাক্কায় একদিকে ছিটকে পড়ে জন। সাকুরা’র ব্লাস্টার পাইলটের মাথাটা উড়িয়ে দেয় সেই মুহূর্তেই।

 

কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে ছিলাম আমরা সবাই। তারপর সবাই জনের দিকে ছুটে যাই দৌড়ে। কিন্তু ও ওই অবস্থাতেও আধশোয়া হয়ে গর্জে ওঠে, “না!”

     চিৎকারটার মধ্যে এমন কিছু ছিল যেটা আমাদের পক্ষে অমান্য করা সম্ভব ছিল না।

     “না।” আমার চোখে চোখ রেখে মৃদু গলায় বলে জন, “আর সময় নেই। এই চপারেও ব্লাস্ট রেডিয়াসের বাইরে যেতে অন্তত মিনিট দুয়েক লাগবেই আপনাদের। চলে যান আপনারা। হেনরি চপার চালাতে পারে। ও আপনাদের নিয়ে যেতে পারবে।”

     অন্য সৈন্যটি বলে ওঠে, “ওই মেয়েটিই কি সেই অ্যাসেট, যাকে পোলার ফেডারেশনের হাতে তুলে দিতে হবে?”

     আমি সেকেন্ডের ভগ্নাংশে বুঝতে পারি ব্যাপারটা। এই পাইলট হেনরি আর তার সঙ্গীর হয়ে নয়, অন্য কারও নির্দেশে কাজ করছিল। হয়তো মেগাকর্পের কথাতেই সে সাকুরাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, যাতে ‘অ্যাসেট’ অন্য কারও হাতে না পড়ে। কিন্তু এখন…?

     চপারের রোটরগুলো ঘুরতে শুরু করে। সেই আওয়াজে চমকে উঠি আমরা সবাই। দেখি ভাবলেশহীন মুখে চালকের আসনে বসে হেনরি আমাদের উঠে পড়তে বলছে। জনের শেষ কথাগুলো ওর কাছে আদেশ হয়েই এসেছে।

     সাকুরা জনের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে। আমার, কেন যেন, লজ্জা হয়। মনে হয় একটা দুর্জ্ঞেয় রহস্য আর কিছু খুব গোপন কথার বিনিময় হচ্ছে দু’জনের মধ্যে। জন বিড়বিড় করে যে কথাটা বলে, সেটা আমি আমৃত্যু মনে রাখব, যদিও তার অর্থ আমি বুঝিনি।

     “ফিরিয়ে এনেছি তোকে।” ফিসফিস করে জন বলেছিল, “এবার আমার ছুটি।”

     পরক্ষণেই আমার দিকে তাকিয়ে ও বলে উঠেছিল, “আপনি ওকে নিরাপদে রাখবেন তনয়া। সাকুরা’র হদিশ যেন আর কেউ না পায়। আমার হয়ে এই কাজটা করতে পারবেন তো?”

     একটা অসহ্য কষ্ট আমার গলার কাছে ডেলা পাকিয়ে যায়। তবু আমি মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলি। তারপর সাকুরা’র… আসলে আমার ব্লাস্টার আর রডরিগেজের শেলা-কে ওর হাতের নাগালে রেখে আমি উঠে পড়ি চপারে। মাশেটটা সযত্নে শুইয়ে রাখে সাকুরা।

     ধূ-ধূ বালির বুকে মুখ হাঁ করা একটা বিকট জন্তুর মতো পড়ে থাকে মোরিয়া কম্পাউন্ড। তার থেকে একটু দূরে পড়ে থাকে রুপোলি বডিস্যুট পরা একটা বুড়ো।

     দ্রুত ওপরে উঠে একটা বিশেষ দিকে এগিয়ে চলে চপার। অনেক দূর থেকে একটা ঝলক দেখি আমরা। বুঝতে পারি, রওনা দিয়েছে মৃত্যু।

 

বেশ কিছুক্ষণ পর আমাদের চপারকে টলিয়ে দেয় পেছন থেকে আসা আলো, শব্দ আর শকওয়েভ। ঝাপসা চোখ ঘষে পেছনে তাকিয়ে দেখি, মাটির বুকে কুৎসিত ঘা-র মতো একটা খাদ ছাড়া আর কিচ্ছু নেই ওখানে!

     নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে মোরিয়া, আর জন থ্যান্ড্রো।

 

শূন্য

কিউব, রডরিগেজ, তিন সপ্তাহ পরে

চিফের চেম্বারের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল ট্যান। দূরে, হাভেনের উঁচু প্রাসাদ থেকে নিচু বস্তির ঘর – সবকিছুকে লালচে কমলা রঙে স্নান করিয়ে সূর্য ডুবছিল। হাজারটা রঙিন আলোর রোশনাইয়ে চরাচর ভাসিয়ে দেওয়ার আগের এই মুহূর্তটা আমারও খুব ভালো লাগে। তবে ট্যান যে আদৌ ও-সব ভাবছে না, তা আমি আর চিফ দু’জনেই জানতাম। ঘুরে দেখি, নিঃশব্দে ঢুকে টেবিলের ওপাশে বসে পড়েছেন চিফ।

     ট্যান যে তাঁর দিকে তাকায়ওনি, সেটা চিফ দেখেছিলেন। তবে তাতে তিনি রাগেননি, বরং উদ্বিগ্ন চোখে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমি হাত তুলে ওঁকে ধৈর্য ধরতে বলেছিলাম।

 

চপারে চেপে হাভেনে ফেরার পর গত তিন সপ্তাহ ধরে যা চলেছে, তা এককথায় সাংঘাতিক। এর মধ্যে এক সপ্তাহ আবার আমাকে প্রায় অজ্ঞান হয়ে নানারকম কাটাছেঁড়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। তবু নানা সাইটে চোরাগোপ্তা সফর চালিয়ে একটা কথা বুঝেছি।

     মিলিটারি, মেগাকর্প, আর মিলিশিয়ার নানা জায়গায় ঠান্ডা মাথায় অপারেশন চালিয়ে অনেক গোলমেলে লোককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকেই নিখোঁজ হয়ে গেছে। আমার আর ট্যানের বয়ান, ওই সাইটের সঙ্গে লাগানো ড্রোনগুলোর লগ আর রেকর্ড, সর্বোপরি মোরিয়া-র অফিসারদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক – এগুলোর প্রত্যেকটাই এক্ষেত্রে ভূমিকা নিয়েছিল।

     আমাদের টেস্টামেন্টের ভিত্তিতে আরেকটা কাজ হয়েছিল। ভেবেছিলাম, ওকে হয় মিলিটারি ল্যাবে নয় কোনো সেন্টারে রাখা হবে। কিন্তু ট্যান সেটা হতে দেয়নি। ব্লাস্টের পর যে সময়টুকু আমরা লেক বুলন্দি-র পাশের বেসে ছিলাম, তাতে ও হেনরি আর আক্রমের কাছ থেকে বড়োই বিপজ্জনক কিছু তথ্য বের করে নিয়েছিল। সেগুলো শুনে মিলিটারি সাকুরা’র সঙ্গে জড়িত যাবতীয় রেকর্ড সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

 

“ট্যান?” চিফের প্রশ্ন শুনে শুধু ট্যান নয়, আমিও অন্যমনস্ক ভাব কাটিয়ে ওঁর দিকে ফিরি।

     “দুঃখিত চিফ।” একটু ক্লিষ্ট হাসি মুখে ফুটিয়ে ট্যান বলে, “এক টিন-এজারের সঙ্গে জীবন কাটানো যে কী কঠিন, তা যদি জানতেন!”

     আমরা সবাই মুখে সাজানো হাসি ফুটিয়ে তুলি। সাকুরা’র অভিভাবকত্ব ট্যানকেই দেওয়া হয়েছিল। মেগাকর্প এত চাপে পড়ে গেছিল এই ঘটনার পর যে ওরা সব ডকুমেন্টেশনের সঙ্গে এই অধিকারটাও ট্যানকে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এতদিনে মেয়েটা প্রথম স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছে, তাই সুপার-সোলজারের সুপার মুড-সুইঙের সঙ্গে মোলাকাত হচ্ছে ট্যানের, ওর পিসি’র, আর আমাদেরও। তবে তাতে আমরা কেউই অখুশি নই।

     মেজর তনয়া দত্তের অন্তরে ব্যথার আসল কারণটা আমি বুঝে ফেলেছিলাম। আমার কাছ থেকেই জেনেছিলেন চিফ। সচরাচর এ-সব কেউ করে না। কিন্তু না-জেনেও আমাদের কার্যত মরতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বলে চিফ ভেতরে-ভেতরে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। আমার কথা শুনে গত ক’দিন ধরে উনি মিলিটারি আর পুরোনো ইউনিফায়েড কম্যান্ডে যোগাযোগ করেছিলেন স্রেফ ট্যানের খাতিরে।

     হাতের ডসিয়ারটা টেবিলে রেখে সোজা কাজের কথায় আসেন চিফ।

 

“আমি তিন সপ্তাহ আগে ওই এলাকার ওপর যত মিলিটারি স্যাটেলাইট ছিল, তাদের সবার পাঠানো ছবি বিশ্লেষণ করিয়েছি। সেখান থেকে যা জানা গেছে, একে-একে বলি।

     প্রথমত, ভাগ্যের এক বিচিত্র ফেরে, মোরিয়ার গেট খোলা পেয়ে মিসাইলটা ওখান দিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। শুধু তাই নয়, যে মনোরেল ধরে তোমরা ওপরে উঠেছিলে, ওটা তার টানেলের মধ্যে ঢুকে তবেই ফাটে। থার্মোবেরিক বিস্ফোরণ হলে যা হয় তাই হয়েছিল। ওই বিশাল কম্পাউন্ডের মাটির নীচে যা কিছু ছিল, সব একেবারে ডিপ-ফ্রাই হয়ে যায়। কিন্তু ওপরে তেমন কিছুই হয়নি।

     দ্বিতীয়ত, মরুভূমির প্রায় আরেক প্রান্তে একটা পরিত্যক্ত স্টোরবক্স ভাঙচুর হয়েছে। ওটার মুখ শেল দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর ওটার ভেতর থেকে বেশ কিছু আইসি, ভাল্ভ, আর ডাইলিথিয়াম বের করে নেওয়া হয়। মিলিটারি একে ভ্যান্ডালিজম ছাড়া অন্য কিছু বলতে পারছে না। আসলে যে জিনিসগুলো নেওয়া হয়েছে সেগুলো মিলিটারির নিজস্ব যন্ত্রপাতি ছাড়া আর কোথাও লাগবে না। এদিকে ওই জিনিসগুলো প্রায় কুড়ি বছর পুরোনো। ওই সময়ের কোনো প্রযুক্তি এখন আর মিলিটারি বা মিলিশিয়া, এমনকি বিদ্রোহীরাও ব্যবহার করে না।

     তৃতীয়ত, মোরিয়া থেকে বেশ কিছুটা দূরে, তবে ওই স্টোরবক্সের কাছাকাছি লোমার নামে মরুদস্যুদের একটা দলের সবক’টি সদস্যের মৃতদেহ পাওয়া গেছে । কিন্তু ওদের গাড়িটা পাওয়া যায়নি। অনুমান করা হচ্ছে, ওই দস্যুরা কারও ওপর চড়াও হয়েছিল। তার কাছে যে ব্লাস্টারও ছিল, সেটা লোমাররা জানত না। ওদের প্রথমে ব্লাস্টার দিয়ে কাবু করা হয়। তারপর মাশেট…”

     চিফ আর কিছু বলার আগেই ট্যান সামনে ঝুঁকে পড়ে। এতক্ষণ ওর নিস্তেজ চোখের পেছনে একটা আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল। সেটা যে এবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে, এ আমরা সবাই বুঝি।

     “শেল?” ট্যানের গলা কাঁপতে থাকে, “ব্লাস্টার? মাশেট? এ আপনি কী বলছেন চিফ? তাহলে কি…?”

     “বুড়োটা বেঁচে আছে কি না, তা বলা কঠিন।” আমি বলতে বাধ্য হই, “ওর বাঁচার কথা নয়। কিন্তু কপালের নাম গোপাল – এইরকম কী একটা যেন বলে লোকে। তেমন কিছুই হয়েছে দেখছি। ও এখন কোথায় চিফ?”

     “জানা নেই।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিফ বলেন, “এমনকি এ স্টোরেজ ডিভিশনের জন থ্যান্ড্রো কি না – সেটাও তো মিলিটারি বলছে না। তবে এই মানুষটি যেই হোক না কেন, সে এখন হাভেন থেকে অনেক দূরে আছে। হয়তো ক্রমেই আরও দূরে সরে যাচ্ছে সে।”

     ডসিয়ারটা ট্যানের দিকে ঠেলে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়েন চিফ। আবার বরাভয় দেখিয়ে আমি ট্যানের কনুইটা ধরে টান দিই। ওখানে বসেই ডসিয়ারের ডুব দেওয়ার ইচ্ছে ছিল ট্যানের। আমার ইঙ্গিত বুঝে ও সোজা হয়ে একটা ছোট্ট স্যালুট ঠোকে চিফের উদ্দেশে, তারপর বেরিয়ে যায়। আমিও পেছন-পেছন যাই।

 

ট্যান ডসিয়ারটা বগলদাবা করে গাড়িতে ওঠে। আমি চুপচাপ গাড়ি চালাই। বেশ কিছুটা দূরে যাওয়ার পর আমি বলি, “জন থ্যান্ড্রো আসলে কে, মেজর?”

     “জানি না।” হতাশ গলায় ট্যান বলে, “শুনলে না তখন! চিফের খোঁচাখুঁচিতেও মিলিটারি ওইরকম কারও অস্তিত্ব স্বীকার বা অস্বীকার – কোনোটাই করেনি। আমি ওকে কোনো ডেটাবেসে পাইনি আজ অবধি। ও কে… আমি কী করে বলব?”

     মোরিয়ার সেই ছোট্ট ঘরের ভেতরে একটা দৃশ্য মনে পড়ে আমার। অন্ধকার থেকে, মাশেট হাতে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতের মতো বেরিয়ে এসেছিল লোকটা। তারপর অদ্ভুত নরম গলায় সে বলেছিল, “ওর নাম সাকুরা। নাওকো আর সেন-এর চেরি ব্লসম।”

     সেন! নাওকো!! আমার হাত, গাড়ি, মায় গোটা দুনিয়া একসঙ্গে দুলে ওঠে।

     “কী হল?” উদ্বিগ্ন হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কন্ট্রোলের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় ট্যান, “শরীর খারাপ লাগছে?”

     “মাথা খারাপ হয়েছে।” আমি বিড়বিড় করে মনোযোগ দিই সামনে। ট্যানের বাড়ির সামনে পৌঁছে ওকে নামিয়ে দিয়ে আমি যখন গাড়ি ঘোরাচ্ছি তখন সাকুরা বাড়ি থেকে মুখ বের করে আমার দিকে তাকায়। মেয়েটার মুখের অনাবিল হাসিটা দেখে বুকের পাথরটা একটু হলেও ওঠে। কী খেয়াল হয়, পেছনদিকে ঘুরে ট্যানকে এমন একটা প্রশ্ন করি, যেটা আর কেউ করতে সাহস পাবে না। বা করলেও অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে করবে।

     “বুড়োটার জন্য কতদিন অপেক্ষা করবে কন্যে?”

     ‘আহত সাপের মতো’ উপমাটা আমার ছেলের পাঠ্য বইপত্রে মাঝেমধ্যে দেখেছি। যেভাবে ট্যান ঘুরে আমার দিকে তাকাল সেটা দেখে ঠিক সেই উপমাটাই মনে পড়ল। ওর চোখটা এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠে আবার শান্ত হল। আকাশের শেষ আলোটুকুতে দেখলাম, ওর গালে একটা আশ্চর্য রঙ ফুটে উঠল।

     “অনন্তকাল।” গাঢ়স্বরে কথাটা বলে ও বাড়িতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

 

নীলচে বেগুনি থেকে কালো হয়ে উঠছিল হাভেনের মাথার ওপরের ধোঁয়াটে আকাশ। আমি চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছিলাম। কুড়ি বছর আগের ক্লাসিফায়েড আর রিড্যাক্টেড রিপোর্টের অংশগুলো মাথায় ভেসে উঠছিল। যান্ত্রিকভাবে সেগুলো জুড়ে-জুড়ে একটা ছবি তৈরি করছিলাম আমি।

     সেন হারিয়ে গেছিল পোলার ফেডারেশনের মধ্যে কোনো একটা জায়গায়। ওকে মারার জন্য বিদ্রোহীরা এক সাংঘাতিক খুনিকে পাঠিয়েছিল। সেই ছিল নাওকো! তার কোনো খবরও আর পাওয়া যায়নি। সাকুরা যদি সেন আর নাওকো’র সন্তান হয়, তাহলে তাকে সুপার-সোলজার বানানো অবশ্যই সম্ভব। কিন্তু জন থ্যান্ড্রো সে কথা জানবে কীভাবে?

     তাহলে কি জন থ্যান্ড্রো’র সঙ্গে সেনের কোনো সম্পর্ক আছে?

     আজ থেকে কুড়ি বছর আগে মিলিটারির কাস্টডি থেকেই হারিয়ে গেছিল এই দুনিয়ার শেষ এলিট অ্যান্ড্রয়েড। ওই প্রযুক্তি এখন হারিয়ে গেছে। তার মেইনটেন্যান্সে লাগে এমন জিনিস পাওয়া যেতে পারে শুধু বাতিল জিনিসের স্তূপে, নয়তো… মান্ধাতার আমলের একটা জংশন বক্সে! সেখান থেকে যে জিনিসগুলো বের করে নেওয়া হয়েছে সেগুলো দিয়ে একটা অ্যান্ড্রয়েডের পুড়ে যাওয়া অংশগুলো বদলানো সম্ভব।

     পুড়ে যাওয়া, বা ব্লাস্টারের ঘায়ে জ্বলে যাওয়া অংশ!

     “ফিরিয়ে এনেছি তোকে।” বলেছিল জন থ্যান্ড্রো। সে কি নিজের… সেনের মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল বলেই নেমেছিল মোরিয়া’র নরকে? তাহলে এখন সে কোথায় যাচ্ছে?

 

চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা অদ্ভুত দৃশ্য।

     আদিগন্ত প্রান্তরের মধ্য দিয়ে টলতে-টলতে এগিয়ে চলেছে চোট-আঘাতে জীর্ণ একটা রোগাটে বুড়ো। সূর্যের আলো, নাগরিক দ্যূতি, বা তারার ছটায় চকচক করছে তার রুপোলি চুল। মাথার ওপর অনন্ত আকাশ আর পায়ের নীচে অনিঃশেষ মৃত্যু নিয়ে সে এগিয়ে চলেছে হয়তো অন্য কারও সন্ধানে। তার ভেতরটা একটা প্রকান্ড জিরো-র মতো ফাঁকা, কিন্তু জিরো-র মতোই তার কোনো শেষ নেই। এক কাজ থেকে ছুটি পেয়ে এবার সে চলেছে অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।

     আমি কি ট্যানকে বলব কথাটা?

     নাকি আমার জীবন যে বাঁচিয়েছে, তাকে এমনই একটা রহস্যের কুয়াশায় মুড়ে রেখে দেব আমি?

     “এনি প্রবলেম অফিসার?” মিলিশিয়ার একটা কমবয়সী ছেলে আমার গাড়ির কাচে আওয়াজ তোলে। চমকে উঠে আবিষ্কার করি, হাভেনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে পড়েছি আমি। এরপরেই কালাহান মরুভূমি, তার ওপাশে সমুদ্র।

     “নো প্রবলেম।” কাষ্ঠহাসি হেসে বলি, “আমি একজনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”

     “এখানে?” চিন্তিত হয় ছেলেটি, “কিছু মনে করবেন না স্যার। মেগাকর্প নিয়ে গোলমাল শুরু হওয়ার পর থেকে এই এলাকায় লুটপাট বড্ড বেড়েছে। আপনি একা… কতক্ষণ থাকবেন?”

     মাথা নেড়ে গাড়ি ঘুরিয়ে শহরের দিকে এগোই আবার। মনে-মনে বলি, “অনন্তকাল।”

13 thoughts on “জিরো

  • October 3, 2019 at 3:08 pm
    Permalink

    ওফ! এপিক ঋজুদা!! আর সব সেরা হলো চ্যাপ্টার নাম্বারিং – অনন্তকাল মনে থাকবে|

    Reply
  • October 3, 2019 at 8:16 pm
    Permalink

    একটা রুদ্ধশ্বাস সাইফাই মুভি দেখলাম মনে হল। হরফের মাধ্যমে সিনেমা দেখার নুতন অভিজ্ঞতা হল। তবে বড় বেশী দ্রুতগতির সিনেমা।

    Reply
  • October 4, 2019 at 3:42 am
    Permalink

    Most probably Rjubabu first introduced cyberpunk scifi thriller in Bengali. For this, we, Bengali readers, owe him. ‘Zero’ is a mind blowing novella which takes us to the amazing world of android, humanoid, age of multinational corps and lots of future gadgetry.

    I wanted to comment in Bengali but I find some problem writing in Bangla in this comment box.

    Reply
  • October 4, 2019 at 5:18 am
    Permalink

    কী পড়লাম দাদা। গোটা একটা মুভি লিখে ফেলেছ তো!

    Reply
  • October 4, 2019 at 8:14 am
    Permalink

    অসম্ভব ভাল। কল্প বিজ্ঞান আর থ্রিলার একসঙ্গে।

    Reply
  • October 4, 2019 at 2:29 pm
    Permalink

    অসাধারণ। লাখো সেলাম লেখককে।

    Reply
  • October 4, 2019 at 9:41 pm
    Permalink

    সাইবারপাংক ডিস্টপিয়ার রুদ্ধশ্বাস পাঠ। ভালো লাগলো খুব।

    Reply
  • October 5, 2019 at 10:11 am
    Permalink

    ঝকঝকে, স্মার্ট, ডিস্টোপিয়ান থ্রিলার। শুরু করলে শেষ না করে ছাড়া যায় না। চূড়ান্ত লেভেলের ভালো লেখা।

    Reply
  • October 6, 2019 at 5:46 am
    Permalink

    Ektukhani jotil kintu opurbo Golper mochor.. …..eidharoner lekhar vetor agami jooger Bangla Kolpobigganer sonket.

    Accha egulo kobe cinema hobe bolun to ? Srijit muklherjee Kimba komoleswar ke egulo porano dorkar.

    Reply
  • October 6, 2019 at 5:47 pm
    Permalink

    উপন্যাসের শরীরে এই মানব সভ্যতার অস্তিত্বের সাথে প্রযুক্তির মিথোস্ক্রিয়ার এক জটিল পাঠ উঠে এসেছে দ্রুত ফেড-ইন, ফেড-আউট ন্যারেটিভের পরতে পরতে। ডিস্টোপিয়ার রোলার-কোস্টার রাইড। এমন ক্যানভাসকে শব্দে আঁকা মুন্সিয়ানার দাবী রাখে।

    Reply
  • October 7, 2019 at 2:14 pm
    Permalink

    মারমার কাটকাট একটা সাইফাই মুভি দেখলাম।

    কখনও হাসলাম, কখনও ভ্রু কুচকে উঠেছে আবার কখনও রুদ্ধশ্বাস পড়ে গেছি।

    লেখার মাধ্যমে এমন দৃশ্যপট ফুটিয়ে তুলা কেবল ঝানু লেখকের পক্ষেই সম্ভব। আপনি জাত লেখক, ভাই। চালিয়ে যান। শুভকামনা রইল।

    Reply
  • October 14, 2019 at 10:50 pm
    Permalink

    Speechless

    Reply
  • October 28, 2019 at 3:07 am
    Permalink

    অসাধার, অসাধার, অসাধারণ।
    আর কিছু বলার ভাষা নেই।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!