ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশন

সন্তু বাগ ও অঙ্কিতা

অলংকরণ:জটায়ু

‘ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশন’ শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঠোঁটে পাইপ মাথায় টুপি একটি রোবোট বা সাইবর্গের ছবি। কিন্তু সায়েন্স ফিকশনের এই ধারাতে শুধুই ভবিষ্যৎ কিংবা অন্য গ্রহে রহস্য আর ক্রাইমের সমাধান হয় না, এই ধরণের গল্প থেকে আমরা পাই মানুষ এবং টেকনোলোজির কিংবা অন্য জগতের প্রাণীদের ভিতরের সম্পর্কের খোঁজও।

     তাহলে, প্রথমেই আলোচনা করা যাক কাকে ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশন বলবো আমরা।

     অবশ্যই যে সমস্ত ডিটেকটিভ গল্পের পটভূমিতে রয়েছে ভবিষ্যৎ বা সমান্তরাল দুনিয়ার পৃথিবীর কিংবা অন্য কোনও গ্রহ কিংবা বাইরের জগতের কথা। অবশ্যই সেই গল্পের মূল উপজীব্য হতে হবে ক্রাইম। হতে পারে সেই ক্রাইম কোনও এলিয়েনকে হত্যা অথবা কোনও বিশেষ ধাতুখণ্ড বা স্পেসশিপ চুরি অথবা কোনও গ্রহের বা সমাজের নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি লঙ্ঘন। অথবা, বর্তমানে দাঁড়িয়েই সাধারণ মানুষ খুন, কিন্তু কোনও বিশেষ আবিষ্কারের সাহায্যে যার অস্তিত্ত্ব এখনও পৃথিবীতে বিদ্যমান নয়। এ ছাড়াও হতে পারে সেই ভবিষ্যৎ বা অজানা সমাজের কোনও জাতির গূঢ় মনস্তাত্ত্বিক অপরাধ। অপরাধীও হতে পারে যে কেউ – মানুষ, এলিয়েন, রোবোট, সাইবর্গ অথবা স্বয়ং সমাজের নিয়মনীতিই। অবশ্যই অপরাধ এবং অপরাধীর সঙ্গে সঙ্গে গল্পে থাকতে হবে একটি ডিটেকটিভও।

     ডিটেকটিভ ফিকশনের নিয়ম মেনে ডিটেকটিভকে হতে হবে পর্যবেক্ষণশীল, সন্দেহভাজনকে প্রশ্ন করে, তদন্ত করে, মূলত আইনের মধ্যে থেকে (হয়তো বা কখনও সখনও আইনের বাইরে গিয়েও), ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করা আর সমাজের বিভিন্ন দিকের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা। আসলে ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশনের মূল ভাবনা হল, যখন ডিটেকটিভ নিজে রহস্য সমাধানে ব্যস্ত, তখন ডিটেকটিভের চোখ দিয়েই পাঠক সেই ভবিষ্যতের সমাজ অথবা এলিয়েন সমাজটির সঙ্গে পরিচিতি লাভ করবে। ডিটেকটিভ গল্পের এই অংশটাতেই মিশে থাকে কল্পবিজ্ঞান।

     দিনে দিনে টেকনোলজির পরিবর্তন ঘটে চলেছে কিন্তু মানুষের স্বভাবপ্রকৃতির পরিবর্তন নেই। আজকের দিনে টেকনোলজির এত উন্নতি ঘটেছে, কিন্তু অপরাধ আজও আমাদের পৃথিবীর একটি অঙ্গ। শুধু আমাদের পৃথিবীতেই আমরা হাজারো রকমের ভয়ংকর অপরাধ খুঁজে পাব প্রায় প্রতিটি সমাজেই। চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ, বর্ণ বা জাতি ভিত্তিক অপরাধ, মানবজাতির বিরুদ্ধে অপরাধ, ব্যাবসায়িক অপরাধ, ড্রাগ, আন্তর্জাতিক অপরাধ, দাসত্ব, জেনোসাইড, পাইরেশি ইতাদি। আর এই সব অপরাধের লিস্টে রোজই নতুন নতুন নাম যোগ হচ্ছে। ভবিষ্যতের কথা লিখতে গেলেও আমরা বর্তমানকে ছেড়ে কিছুই ভাবতে পারি না।

     ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশন আমাদের মূলত ভাবতে সাহায্য করে কীভাবে ভবিষ্যতে অপরাধ ও অপরাধীর কার্যকলাপ বিবর্তিত হতে পারে! সেই বির্বতনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে পরিবর্তিত হবে গোয়েন্দার চিন্তাভাবনা।

     কী হতে পারে যদি একটা এলিয়েন সভ্যতায় আমরা আইনভঙ্গ করি? কী হতে পারে যদি একটা অ্যান্ড্রয়েড খুন করে বেড়ায়? একটা রোবট ডিটেকটিভ বা আন্ড্রয়েড রহস্য সমাধান করতে গিয়ে কীরকম বিপদের মুখে পড়তে পারে? ভবিষ্যতের অপরাধ কীরকম হতে পারে? ভবিষ্যতে খুনিকে কীভাবে ধরা যাবে? খুনির ফেলে যাওয়া পদচিহ্ন খুঁজে বের করে, নাকি শুধুমাত্র টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে, নাকি উভয়তঃই?

     ধরা যাক টেকনোলজি পরিবর্তন হল এমনভাবে যাতে আমরা মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনা পড়তে পারছি কিংবা মনোবিদ ভবিষ্যবাণী করছে কোন লোকটা অপরাধ করতে চলেছে। একটা নতুন গড়ে ওঠা সভ্যতায় কীরকম ধরণের অপরাধ হতে পারে?

     ফিলিপ কে ডিকের বিখ্যাত গল্প মাইনরিটি রিপোর্টে (যা পরে একই নামে স্পিলবার্গ রূপালি পর্দায় নিয়ে আসেন) এই ধরণের ভবিষ্যৎ আছে। সেখানে পুলিশ স্কোয়াড তিনজন বিশেষ ছেলেমেয়ে ও একটা মেশিনের সাহায্যে আগে থেকেই অবলীলায় জেনে যায় ক্ষণিকদূরের ভবিষ্যতে কী অপরাধ হতে চলেছে। কিন্তু সম্পূর্ণ টেকনোলজির উপরে নির্ভরশীল এই গোয়েন্দাগিরিই একজন পুলিশ ডিটেকটিভের জীবনে বয়ে আনে মারাত্মক সমস্যা।

     সাধারণত, ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশনে, ডিটেকটিভ মশাই একদিকে যেমন বিজ্ঞানীর মতো বিভিন্ন প্রশ্ন করে, বোঝার চেস্টা করে কীভাবে বিভিন্ন জিনিস কাজ করছে, অবশ্যই অপরাধ ক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ক্লু অনুসরণ করে। কিন্তু তারপরেও সেই ডিটেকটিভকে সত্য উদ্ঘাটন করতে হয়, প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করতে হয়। জানতে হয় সমাজের বিভিন্ন কোনায় থাকা গোষ্ঠী, বিভিন্ন গোষ্ঠীর আচার ব্যবহার, তাদের রাজনৈতিক পরিচয়। একটু একটু করে তাদের সব দিকই জেনে রাখতে হয় যাতে তারা বিভিন্ন ধরণের প্রশ্ন করে সত্য উদ্ঘাটন করতে পারে। এককথায় বলা যেতে পারে ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশন ভবিষ্যৎ সভ্যতার টেকনোলজি এবং সমকালীন সভ্যতার গাইড হিসেবে কাজ করে। যেহেতু টেকনোলজি এই ধরণের ফিকশনে একটা বড় ভূমিকা নেয়, তাই লেখকদের এই বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন থাকা দরকার।

     সাধারণভাবে বলা যায় একটা ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশনে থাকবে একটা সম্পূর্ণ নতুন ধরণের জগৎ। গল্পের ডিটেকটিভের সঙ্গে সেই জগতে মিশে অপরাধ সনাক্তকরণ এবং শেষমেশ গল্পটি একটা নৈতিক মেসেজ দেব সমাজকে।

     সাধারণত দু-রকমের ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশন হতে পারে। একটি হল অপরাধ নির্ণয় আর একটি হল থ্রিলার জাতীয়। প্রথমটি মূলত একটি সমস্যার সমাধান করা। আর দ্বিতীয়টি নাটকীয়ভাবে বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে দ্বন্ধ প্রদর্শন করে অপরাধীকে খুঁজে বের করা।

     ডিটেকটিভ গল্পে প্রয়োজন হয় খুব দক্ষ নির্মাণকৌশল। আর দরকার হয় কী ঘটতে পারে আর কী ঘটতে পারে না তার মধ্যে সূক্ষ্ম প্রভেদ। তাই কল্পবিজ্ঞান আর ডিটেকটিভ গল্পকে মেলানো বেশ কঠিন কাজ। কল্পবিজ্ঞান গল্পে থাকে সম্ভব আর অসম্ভবের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম সীমারেখা থাকে। তাই বলা যায় ভবিষ্য ডিটেকটিভ গল্প লেখা সম্ভব সেই সময়েই যখন গল্পে সম্ভব আর অসম্ভবের মধ্যে সীমানা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।

     উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আইজ্যাক আসিমভের রোবোট সম্পর্কিত বিভিন্ন গল্পগুলির কথা, এবং অবশ্যই ‘আই রোবট’ চলচ্চিত্রটিও একটি পূর্ণাঙ্গ ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশন। যে গল্পে জগৎটি তৈরি হয়েছে ভবিষ্যতের আন্ড্রয়েড ক্রাইমের উপর আর সীমানা টানা আছে আইজ্যাক আসিমভের সৃষ্ট বিখ্যাত তিন রোবোটিক্স-এর সূত্র দ্বারা।

     ফিলিপ কে ডিকের আরেক বিখ্যাত গল্প ‘ডু অ্যান্ড্রয়েড ড্রিম অব ইলেকট্রিক শিপ?’ যা পরবর্তীকালে সিনেমা হয়েছে ব্লেড রানার নামে। এরপরেও ডিকের তৈরি এই ভবিষ্যত সমাজ নিয়ে গল্প লেখেন আরও অনেকে। পোস্ট-অ্যাপক্যালিপ্টিক এই সমাজে দেখা যায় বিভিন্ন মডেলের অ্যান্ড্রয়েড। মডেল হিসাবে সেই অ্যান্ড্রয়েডদের আটকে রাখা হয় নির্দিষ্ট নিয়মের বেড়াজালে। এই বিখ্যাত গল্পটির গোয়েন্দাটি নিজে একজন বাউন্টি হান্টার, সাদা পোশাকের পুলিশ অফিসার যে তৎকালীন সমাজের আইন মেনেই বিভিন্ন ভায়োলেন্ট অ্যান্ড্রয়েডদের খুঁজে খুন করতে করতে ধীরে ধীরে অনুভব করবে সেই সব অ্যান্ড্রয়েডদের অনুভূতিকে।

     অপরাধ কিংবা অপরাধী নিয়ে লেখালিখি প্রায় সায়েন্স ফিকশনের শিশুকাল থেকেই হয়ে আসছে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে জুলস ভের্নের ‘টোয়েন্টি থাউসেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ গল্পটি। এই সায়েন্স ফিকশন গল্পতেই প্রথম গল্পের কথক খানিক ডিটেকটিভের মতো আচরণ করেছিলেন। পরে অবশ্য গল্পটি সম্পূর্ণ অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক হয়ে যায়। তাঁর আর একটি গল্প ‘দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড’তে দ্বীপের বাসিন্দারা বুঝতে পারছিল না তাঁদের ক্যাপ্টেন নিমো লুকিয়ে লুকিয়ে সাহায্য করে যাচ্ছিল সেই জনমানবহীন আইল্যান্ডে বেঁচে থাকতে। তাঁকে খুঁজে বের করতে দ্বীপের বাসিন্দারা কেউ কেউ ডিটেকটিভ হয়ে উঠেছিলেন।   

     প্রথমদিকের বিভিন্ন ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশনে কিছু সুপারক্রিমিনাল ভিলেন আবির্ভূত হয়েছিল, তার মধ্যে ম্যুরে ল্যানিস্টার লেখনীতে কিছু খুঁজে পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য কাজ ‘এ থাউজেন্ড ডিগ্রিজ বিলো জিরো’, ‘দ্য ডার্কনেস অন ফিফথ অ্যাভিনিউ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। জন ক্যাম্পবেলের লেখা ‘পাইরেসি প্রেফার্ড’ উপন্যাসে তিনি তাঁর গল্পে নায়কের পাশাপাশি খলনায়কের হাতেও তুলে দিয়েছেন মারাত্মক সব অস্ত্র।

     সেই সময়ের পাল্প সায়েন্স ফিকশন লেখকরা চিন্তা করেছিলেন যে সেই সময়ের ক্রাইমই ঘটবে তাদের ভবিষ্যতের গল্পেও। অনেকে সেই সব গল্পের অপরাধীকে সাজা দিয়েছেন আবার টাইমলুপের মতো গিমিক তৈরি করে। কোনও কোনও গল্পে দেখা গিয়েছে অপরাধীদের রাখা হয়েছে রোবটদের অধীনে, যেখানে তারা ধীরে ধীরে তাদের দোষ স্বীকার করছে।

     এরকমই গল্পে এসেছে এলিয়েন পুলিশম্যান। ভিনগ্রহী অপরাধীদের সাজা দেওয়া হয়েছে পৃথিবীবাসীর দেহে বন্দী করে। গল্পে এসেছে টাইম পুলিশের মতো পেশা, যাদের কাজ মূলত সময়নদীতে উজান বেয়ে ইতিহাসকে রক্ষা করা। বেশিরভাগ গল্পের টেকনোলজিতে এসেছে টেলিস্ক্রিন কিংবা পিএসাই মেশিন যা স্পেস টারমিনালে যাওয়া-আসা নিয়ন্ত্রণ করে অপরাধ নির্ণয়ে কাজে লাগত। এই ধরণের গল্পগুলি মূলত তৈরি হয় নিকট-ভবিষ্যতে। গল্পের ভবিষ্য বা অজানা টেকনোলজি আইনরক্ষক এবং অপরাধী দুজনকেই হেল্প করে।

     পরবর্তীকালে সাইবারপাঙ্ক ধারায় এসেছে আধা-মানুষ আধা-যন্ত্র সাইবর্গ পুলিশ রোবোট। ‘রোবোকপ’ আমাদের বেশ পরিচিত একটি নাম। অ্যাসিমভের প্রথম সায়েন্স ফিকশন ডিটেকটিভ গল্প ‘দ্য কেভস অব স্টীল’ উল্লেখযোগ্য যেখানে একটি মানব পুলিশের সঙ্গে দেখা যায় একটি রবো-পুলিশকে। পরে এই ধারায় আরও জটিল ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশন লেখা হয়, ‘দ্য ঘোস্ট ইন্‌ দ্য সেল’ সেইরকমই এক সাইবারপাঙ্ক ডিটেকটিভ ফিকশন। যেখানে কম্পিউটারের সাইবার নেট জগতের গোলকধাঁধায় ক্রমাগত হারিয়ে যায় অপরাধ ও লুকিয়ে পরে অপরাধী। যদিও সায়েন্স ফিকশন ডিটেকটিভ গল্পে পুরুষ গোয়েন্দাদেরই মূলত রমরমা। কিন্তু এই গল্পের মূলচরিত্র একজন নারী গোয়েন্দা। অবশ্য নারী গোয়েন্দার গল্পের মধ্যে রোসেল জর্জ ব্রাউনের লেখা ‘সিবিল সু ব্লু’-ও উল্লেখযোগ্য।

এবার আসি বাংলা কল্পবিজ্ঞানে। বাংলা কল্পবিজ্ঞানে ডিটেকটিভ গল্পে অপরাধ নির্ণয়-এর থেকে থ্রিলার বা অ্যাডভেঞ্চার গোত্রের গল্পই বেশি।

     অদ্রীশ বর্ধন সবুজ মানুষের নাট্যরূপ দেবার সময়ে সাংবাদিক অমল চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন। যে সম্পাদকের অনুরোধে গোয়েন্দাগিরি করে সমাধান করেছিলেন চার-চারটি সবুজ মানুষের ঘটনার যোগসূত্র।

     অনীশ দেব রচিত এক বিখ্যাত চরিত্র পুলিশ ডিটেকটিভ ‘ইনস্পেক্টর রনি’। এডওয়ার্ড নিউমেইরার আর মাইকেল মাইনার লেখা ‘রোবোকপ’ সিনেমার আদলে তৈরি চরিত্র ইনস্পেক্টর রনি অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক যন্ত্র। এক মারাত্মক দুর্ঘটনায় অর্ধমৃত ইনস্পেক্টর রনিকে জীবনদান করেছিলেন ডক্টর অভিজিৎ মজুমদার। শরীরে বিভিন্ন অংশে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় নানা ধরণের ব্যাটারি, মাইক্রোপ্রসেসর, আইস চিপ আর ধাতুর পাত। ফলে ইন্সপেক্টর রনির মধ্যে দেখা যায় কিছু যান্ত্রিক দক্ষতা। ‘ইন্সপেক্টর রনি’, ‘ইন্সপেক্টর রনি ও অলৌকিক সার্কাস’ উল্লেখযোগ্য রচনা।

     সুমিত বর্ধনের স্টিমপাঙ্ক থ্রিলারে আমরা পেয়েছি গোয়েন্দা ধূর্জটি আর তার সহকারী। যেখানে পুরানো কলকাতা শহরের বুকেই গড়ে উঠেছে এক অন্য জগৎ এবং সেই জগতের সমস্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই সার্থক উপন্যাসটি।

     সিদ্ধার্থ ঘোষ বাংলা কল্পবিজ্ঞানে নিঃসন্দেহে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর প্রথম গল্প ‘মন্ত্র মাহাত্য’তেই আমরা দেখতে পাই কীভাবে দেবাশিষ আর তার বন্ধু প্রদীপ মিলে গোয়েন্দাগিরি করে ভন্ড সাধুর মুখোশ খুলে দিয়েছিল। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘গ্যাবনে বিস্ফোরণ’তে আমরা দেখি কীভাবে পশ্চিম আফ্রিকার গ্যাবনের গহীন অরণ্যে ঘটে এক পারমাণবিক বিস্ফোরণ। রহস্য সমাধানে জড়িয়ে পড়েন সুজন, ডক্টর সেনশর্মা আর পিয়ের এবং শেষে খুঁজে বের করেন এক অভাবনীয় বৈজ্ঞানিক সত্য। তাঁর সৃষ্ট ঝন্টুমামার অনেকগুলো গল্পেই আমরা ঝন্টুমামাকে পাই রহস্যসন্ধানী হিসেবে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভৌতিক কামানের রহস্য উদ্ধার কিংবা অনুসন্ধানী ঝন্টুমামা গল্পে বৃদ্ধ হরিনারায়ণের বাড়িতে জন্মদিন অনুষ্ঠানে গিয়ে চুরির রহস্য ভেদ করা উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখা বিখ্যাত গল্প ‘মহাশূন্যের মণিমুক্তো’তে মূল চরিত্র রাহুল যেভাবে ভেদ করল একশো সতেরো জন ছাত্রীসহ ডি-সেভেন রকেটের দুর্ঘটনার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পিছনের চক্রান্ত, সেটিকেও গোত্রে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। 

     সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের সৃষ্ট গোয়েন্দা কর্নেল নিলাদ্রী সরকার আর তাঁর সহকারী জয়ন্তের সঙ্গে বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তের মিলে অনেকগুলো রহস্যের সমাধান করেছেন যেগুলোকে কল্পবিজ্ঞান গোত্রে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। অনেকগুলি গল্পেই তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন হালদার ডিটেকটিভ এজেন্সির সুখ্যাত গোয়েন্দা কে কে হালদার। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় ‘সবুজ সঙ্কেত’, ‘ওজরাকের পাঞ্জা’, ‘সবুজ বনের ভয়ঙ্কর’ কিংবা ‘ইয়াজ্‌দার্গিদের হিরে’-র কথা।

     ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যের অনেক লেখাতেই আমরা পেয়েছি বিজ্ঞানী কিংবা বিজ্ঞান অনুরাগী ব্যাক্তিদের যারা নিজেরা কিংবা তাঁদের বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন রহস্যের সমাধান করেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখ করব ‘বনঝাউয়ের রহস্য’ কিংবা ‘চৌহান গুম্ফার দেবতা’ এর কথা। 

     এছাড়াও ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়-এর লেখা বিজ্ঞানী জগুমামা, অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর অনিলিখা আর স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর লেখা স্যার সত্যপ্রকাশ সিরিজের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

     তবে এখনও বাংলায় সার্থক ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশন গল্প সেভাবে লেখা হয়নি। বেশিরভাগ গল্পের মূল উপজীব্যই হয়ে উঠেছে অ্যাডভেঞ্চার। গোয়েন্দাসুলভ প্রশ্নোত্তরের পালা অথবা অপরাধস্থলে পরে থাকা সুত্রের মধ্যে দিয়ে এক অন্য জগতের বা সমাজের মাঝ থেকে অপরাধীকে ছেঁকে তুলে আনা বাংলা সায়েন্স ফিকশনে নেই বললেই চলে।

     কল্পবিজ্ঞানের এইধারাটিতে অবশ্যই চিন্তাভাবনা করার বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র পড়ে আছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই আমরা বাংলা কল্পবিজ্ঞানের দুনিয়ায় ব্যোমকেশ, ফেলুদা অথবা কিরীটির মতোই এক অনন্য গোয়েন্দা চরিত্র পেয়ে যাব।

One thought on “ডিটেকটিভ সায়েন্স ফিকশন

  • August 17, 2019 at 11:29 pm
    Permalink

    অনেকদিন আগে কিনেছিলাম বৈজ্ঞানিক চন্দ্রকান্তের সব অভিযান , শৈব্যা থেকে মনে হয়। বইটা আর বাজারে দেখিনি। কল্পবিশ্ব কিছু করতে পারে ?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!