ডে-ভি

ঋজু গাঙ্গুলী

অলংকরণ:তৃষা আঢ্য

কিউব, হাভেন, এখন

“আগে আমাদের পরিচয়গুলো দিই?” নরম, একটু স্নেহময় গলাটা বলে উঠল, “আমি ডক্টর আলতাফ হোসেন, চিফ অ্যানালিস্ট। আমার ডান পাশে রয়েছেন…”

“দরকার নেই।”

“মানে?”

“কারও পরিচয় দেওয়ার দরকার নেই ডক্টর। এই চেম্বারে ঢোকার আগে, ইনফ্যাক্ট কিউব-এ ঢোকার পর থেকে আপনার, আমার, সবার সবকিছু রেকর্ডেড হয়েছে। নতুন করে এ-সব বলার কোনো দরকার নেই।”

কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে রইল ঘরটা। যন্ত্রগুলো নিজেদের কাজ চালিয়ে গেল। তারপর একটা ধারালো নারীকণ্ঠ বলে উঠল, “তাহলে আর ফর্ম্যালিটির কী দরকার? তুমি শুরু করো ট্যান। অনেক হয়েছে। এবার ব্যাপারটা শেষ করা দরকার।”

“কিন্তু কাউন্সিলর, প্রোটোকল ব্যাপারটা…” জ্বলন্ত দৃষ্টির সামনে ঘ্যানঘেনে গলা বাকি শব্দগুলো গিলে ফেলে।

“আপনার তো রিপোর্ট পাওয়া নিয়ে কথা।” ধারালো গলাটা এবার বিপজ্জনক শোনাল, “সেটার জন্য ওর স্টেটমেন্টই যথেষ্ট, তাই না ডাইরেক্টর?”

কিউবহাভেন মিলিশিয়ার সদর দফতর। কালো কাচে ঘেরা এই ঘরগুলো কখনও ইন্টারোগেশন রুম হিসেবে কাজে লাগে। কখনও আরও মোটা দাগের ব্যাপারের জন্য। আপাতত সেগুলো হচ্ছে না। মাথার ওপর থেকে বিন্দু-বিন্দু করে জল ফেলছে না কেউ। পেছনদিকে ইলেকট্রিক তার বেঁধে তাতে কারেন্টের মাত্রা তিলতিল করে বাড়ানোও হচ্ছে না। শুধু একটা নিষ্প্রাণ, ফ্যাকফেকে সাদা আলোর ঝরনায় ডুবে আছে ঘরটা।

“তিন দিন আগে আমাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল।” একটা নিস্তেজ, খসখসে গলা বলতে থাকে, রোবটের মতো। “স্কোয়াড কম্যান্ডার ডেকেছিলেন। সিকিওর লাইনে নির্দেশ এসেছিল, তাই ডিসপ্যাচে কোনো রেকর্ড ছিল না। আমি ওঁর ঘরে ঢোকার পর…”

“ওঁর ঘরে?” ঘ্যানঘেনে গলাটা এবার কিঞ্চিৎ উজ্জীবিত হয়েছে, বোঝা যায়। “আপনাদের ব্রিফিং-এর জন্য আলাদা চেম্বার আছে না?”

“আছেই তো। কিন্তু আমাকে যা বলা হয়েছিল আমি তাই করেছিলাম।”

“তোমার সঙ্গে আর কেউ ছিল সেদিন ওই ঘরে? মানে, কম্যান্ডার ছাড়া?”

“না কাউন্সিলর। শুধু তাই নয়। আমি ঘরে ঢোকার পর কম্যান্ডার আমাকে আলাদাভাবে স্ক্রিনিং করিয়েছিলেন। আমার সঙ্গে কিছুই নেই, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে তবেই উনি মুখ খুলেছিলেন।”

“একজন স্কোয়াড কম্যান্ডারের এমন আচরণ কি খুব স্বাভাবিক?”

“না ডক্টর।” নিস্তেজ গলাটা যে এই কথাটা আগেও বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে সেটা বিরক্তি আর ক্লান্তি থেকে স্পষ্ট হয়। “তবে কারণটা ওঁর কথা শুনেই বুঝেছিলাম। কেন উনি ব্যাপারটা গোপন রাখতে চাইছেন, কেন উনি এত… ভয় পাচ্ছেন!”

ঘরটা চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর নিস্তেজ গলাটা আবার সরব হয়।

“আমি মাঝে বেশ কিছুদিন মিসিং পার্সনস্‌-এ ছিলাম। একটা বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টের পর আমি আবার অ্যান্টি-টেররিস্ট ইউনিটে ফিরে আসি। তবে পুরোনো সোর্সগুলোর সঙ্গে অল্পসল্প যোগাযোগ রাখতামই। হয়তো সেজন্যই কম্যান্ডার আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন এই কাজটার জন্য।”

“কোন্‌ কাজ?”

“ওঁর মেয়েকে খুঁজে বের করা।”

একটা মিশ্র শব্দ শোনা যায় এবার। তাতে বেশ কয়েকটা ভাষার গালি মিশে ছিল, তবে সেগুলো সবই বিস্ময়সূচক।

“ওঁর মেয়ে? কিন্তু রেকর্ডে তো বলা আছে…!”

“ঠিক সেজন্যই এটা গোপন অ্যাসাইনমেন্ট ছিল ডাইরেক্টর।”

“হুঁ।” এমনিতে কনকনে ঠান্ডা গলাটাও যে ধাক্কা পুরোপুরি সামলাতে পারেনি সেটা বোঝা যায়। “এইবার বুঝতে পারছি। তুমি বলো।”

“তিন দিন আগে এক সন্ধেবেলায় আমি…”

“এক মিনিট।” নরম গলাটা সরব হয়, “ওভাবে আপনি আগেও স্টেটমেন্ট দিয়েছেন। ওভাবে নয়। বরং ঘটনাটা আপনার যেভাবে মনে আছে, সেইভাবে আমাদের বলুন।”

ট্যান, কোথাও, দু’দিন আগের রাত

 

ব্যথা। অসহ্য, গা-হাত-পা কেটে নেওয়ার মতো ব্যথা। বুকে, পিঠে, কোমরে, দুই পায়ের ফাঁকে…! ঘাড়ের কাছে একটা চিনচিনে জ্বালা থাকলেও মাথাটা বোধহয় এখনও অক্ষত।তবে যেভাবে এদিক থেকে ওদিকে গড়াচ্ছি তাতে সেটাও না এবার ফেটে যায়।

গড়াচ্ছি?!?

আমি এখন কোথায়?

ঠিক কী করছি আমি? ইন ফ্যাক্ট… আমি কে??

রক্ত আর ধুলো লাগলেও বোঝা যাচ্ছে, আমি ছিন্নভিন্ন সাদা স্কার্ট, সাদা শার্ট, সাদা স্টকিংস পড়ে আছি। এটা কি কোনো নার্সের ইউনিফর্ম? আমি কি নার্স?

তখনই শরীরের নীচে হয়ে চলা কাঁপুনিটা বদলাচ্ছে বলে মনে হল। চোখ খুললাম। সারা শরীর বিদ্রোহ করল। তবু মাথা তুলে বোঝার চেষ্টা করলাম, আমি এখন কোথায়।

গাড়িতে। একটা বড়ো গাড়ির মধ্যে রয়েছি আমি। কোনো হেভি-ডিউটি ট্রাক মনে হচ্ছে। একটা টিমটিমে লালচে আলো জ্বলছে এক কোণে।  তাতেই দেখতে পাচ্ছি, আমি রয়েছি মাল রাখার কন্টেইনারের এক কোণে। দরজাটা দূরে। আমার পেছনে দেওয়াল। তার পেছনেই ড্রাইভারের কেবিন।

আমি এখানে একা নই। আরও কয়েকটা মেয়ে আমার কাছেই মাটিতে পড়ে আছে। নিস্পন্দ। শুধু ভারী চাকাগুলোর এদিকে-ওদিকে যাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছেঁড়া পুতুলের মতো গড়াচ্ছে তাদের শরীর। আমিও গড়াচ্ছিলাম, তবে এবার নিজেকে সামলাতে পারছি। কিন্তু কী হচ্ছে এ-সব? এই মেয়েগুলো কারা? আমিই বা এখানে এলাম কীভাবে?

ঘসসস্‌! মেঝেটা কেঁপে উঠে জানান দিল, গাড়িটা থামছে। আমি আবার দেওয়ালে ভর দিয়ে কাত হয়ে গেলাম। জানি না ঠিক কী হচ্ছে এখানে। তবে যারা আমাকে আর এই মেয়েগুলোকে এমন গরু-ছাগলের মতো করে নিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে আরেকটু স্টাডি করা দরকার।

বড়ো বড়ো কয়েকটা শ্বাস নিলাম। চোখ বন্ধ করে ব্যথার অনুভূতিগুলোকে একটু-একটু করে পেছনে ঠেলার চেষ্টা করলাম। ততক্ষণে গাড়িটা… ট্রাকটা থেমে গেল। শুয়ে-শুয়ে শুনলাম, সামনে ড্রাইভারের কেবিনটা খুলে দু’জন নামল।

“তুমি হালকা হয়ে নাও ওস্তাদ।” একটা কর্কশ গলা বলে উঠল, “আমি আর মালেক একটু ফুর্তি করে নিই।”

“যা খুশি করো।” দূরে সরে যাওয়া একটা ভারী গলা শুনতে পেলাম। গলার মালিক ওখান থেকেই বলল, “আমরা আর আধঘণ্টায় স্টেশনে পৌঁছব। ততক্ষণ তোমরা তাহলে ওখানেই থাকো।”

“আরে আধঘণ্টা মানে অনেক সময়!” এবার অন্য একটা গলা পেলাম। মালেকের? “ততক্ষণ আমি আর হিউ এই হুর-পরিদের খিদমত করি তাহলে।”

হ্যাঁ, এটা মালেক। অন্যজন হিউ। কিন্তু আমি কে?

পেছনের দরজাটা দমাস্‌ করে খুলে গেল। দু’জন লোক উঠে এল গাড়িতে। তারপর ঠিক মাল দেখার মতো করে একটা-একটা করে মেয়েকে ঠেলে, নেড়ে, লাথি মেরে পরখ করতে-করতে আমার দিকে এগিয়ে এল। আমি দেওয়ালে কাত হয়ে থাকলেও চোখটা এক চিলতে খুলে রেখেছিলাম। তাতেই দেখলাম, ওরা মেয়েগুলোকে খুঁচিয়ে, চড়-থাপ্পড় মেরে বোঝার চেষ্টা করছে, কার কী অবস্থা।

দারুণ রাগ হচ্ছিল। রাগের চোটে নিজের গায়ের ব্যথাও ভুলে গেছিলাম। তবে দুটো ব্যাপার তার মধ্যেও মাথায় ছিল।

প্রথমত, দুটো লোকই সশস্ত্র। সামনের লোকটার চুলের রঙ ময়লা সোনালি। এই বোধহয় হিউ। ওর কোমরে একটা ব্লাস্টার আছে। পেছনের জনের চুল কালো। মালেক? হবে হয়তো। তার কাছে আগ্নেয়াস্ত্র নেই, তবে একটা বড়ো ছুরি ঝিকিয়ে উঠছিল হাতের পাশ থেকে। হিউয়ের হাতে একটা ব্যাটন ছিল। সেটা দিয়েই ও শরীরগুলো খোঁচাচ্ছিল। আমরাও ওইরকম ব্যাটন ব্যবহার করি।

আমরা? আমরা মানে?

দ্বিতীয়ত, ট্রাকটা চলতে শুরু না করা অবধি কিছু করা নিরাপদ নয়। চালক কিছু সন্দেহ করলে মুশকিল। কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, এখানে ক্যামেরা থাকলেও চালক হয়তো কেবিনে বসে সেটাকে প্রাইভেট চ্যানেল হিসেবে ব্যবহার করবে না। সে জানে, মাইক আর মালেক এখানে এলে কী হয়।

ট্রাকটা চলতে শুরু করল। খোঁচাখুঁচি আর হঠাৎ ঝাঁকুনিতে একটা মেয়ে জ্ঞান ফিরে পেয়েছিল। সে ওদের দেখে হাউমাউ করে কিছু একটা অনুনয় করে উঠল। হিউয়ের ভাবান্তর হল না। কিন্তু মালেকের মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। হিংস্রতা, লালসা, আর ঘেন্না মেশানো সেই হাসিটা দেখে আমার লোম খাড়া হয়ে উঠল।

মালেক কোমরের বেল্টটা খুলতে শুরু করল। একটা বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে হিউ আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমার পাঁজরের কাছে হালকা একটা লাথি মারল। আমি কাতরে উঠলাম।

“তোমাকে দিয়েই তাহলে শুরু করি সেক্সি?”

সেক্সি!

কথাটা শোনামাত্র মাথার ভেতরে যেন একটা বাঁধের গেট খুলে দেওয়ার মতো করে ঝাঁপিয়ে পড়ল স্মৃতির দল। ছোটোবেলায় স্কুলে কয়েকটা বড়ো ছেলে আমাকে এটাই বলেছিল না? হ্যাঁ।(,) বলেছিল। আমি প্রতিবাদ করতে গিয়ে ওদের চড় খেয়েছিলাম। ওরা আমাকে আরও অজস্র গালাগাল দিয়েছিল। আমার ছবি মর্ফ করে পোস্ট করেছিল কোথায় যেন। তারপর ওদেরই বাবা-মা স্কুলে এসে প্রিন্সিপালকে বলেছিলেন, আমার মতো একটা ‘খারাপ’ মেয়েকে যেন বের করে দেওয়া হয়।

তারপর… তারপর যেন কী হয়েছিল?

আমার বাবা-মা ততদিনে মারা গেছিলেন। আমি পিসির হাতটা ধরে, প্রিন্সিপালের চেম্বারে দাঁড়িয়ে হাউ-হাউ করে কাঁদছিলাম। পিসি একটা কথাও বলেননি। কিন্তু প্রিন্সিপাল বোধহয় কিছু বুঝেছিলেন। আমার মাথায় হাত দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “অংকটা ওদের শিখিয়ে দাও। বুঝিয়ে দাও, তুমি সেক-সি নও। তুমি…”

“ট্যান ডি!” আমার মুখ থেকে শব্দদুটো ঠিকরে বেরোয়। বাঁ পা-টাও অব্যর্থ লক্ষ্যে ছুটে যায় হিউ-এর পৌরুষের একমাত্র প্রকাশস্থলের দিকে। কাতরে ওঠে হিউ। ও নীচু হওয়ামাত্র আমি ডান হাত চালাই। হাতে সময় কম, তাই এদের নিয়ে বেশি কিছু করা যাবে না। এটা মাথায় ছিল বলে আমি কণ্ঠার হাড়টা টার্গেট করেছিলাম। সেটা ভেঙে যায়। দেখি, লোকটার দু’চোখ নরকের জন্য প্রহর গোনা শুরু করে দিয়েছে।

মালেক পেছনে ঘোরে। ওর জিন্সটা হাঁটুর কাছে নামানো ছিল। এক হাত মেয়েটার চুল মুঠো করে নিয়ে এসেছিল নিজের ‘আসল জায়গা’-র কাছে। অন্য হাতে ছিল ছুরি। ও যদি মেয়েটাকে হোস্টেজ করে রাখত, আমাকে একটু ভাবতে হত। কিন্তু অত দ্রুত ট্যাকটিকাল সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি লোকটা। মেয়েটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মালেক ছুরি বাগিয়ে আমার দিকে এগোনো চেষ্টা করেছিল।

প্যান্ট খোলা অবস্থায় মারামারি করা বড়ো কঠিন কাজ। মালেক কি সেটা জানত না? কে জানে। এগোতে গিয়ে ও হোঁচট খেয়ে সামনে ঝুকে আসে। আমার থেকে ও তখনও দূরে ছিল। তবে হিউ-এর ব্যাটনটা ততক্ষণে আমার হাতে এসে গেছে। সেটা ছুড়ে দিই ওর মুখ লক্ষ্য করে। একটা আর্তনাদ করে ও পেছন দিকে ছিটকে যায়। গুটোনো অবস্থা থেকে ছাড়া পাওয়া স্প্রিং-এর মতো লাফিয়ে উঠি আমি। দু’ সেকেন্ড লেগেছিল বোধহয় ওর কাছে পৌঁছতে। তবে আমাকে কিছু করতে হয়নি।

যে মেয়েটাকে কাজে লাগিয়ে মালেক স্বর্গের স্বাদ পেতে চেয়েছিল, সেই ওর হাত থেকে ছুরিটা তুলে সোজা বসিয়ে দেয় ওর গলার নীচে। গার্গল করার মতো একটা আওয়াজ তুলে চুপ করে যায় মালেক। শুধু ওর রক্তে কালো হয়ে যেতে কন্টেইনারের ময়লা মেঝেটা।

মেয়েটা উদ্‌ভ্রান্তের মতো আমার দিকে তাকায়। আমি ওর পাশেই বসে পড়ি। এতক্ষণ অ্যাড্রিনালিন ব্যাপারটা বুঝতে দেয়নি। কিন্তু সাময়িক শান্তি ফিরতেই শরীরের ব্যথাগুলো মার্‌-মার্‌ করে ফিরে আসছিল। আশেপাশে আওয়াজ শুনে বুঝলাম, মেয়েগুলোর জ্ঞান ফিরছে। তারাও উঠে বসছে।

“বাব্বা!” একটা কচি গলা শুনে চোখ মেলে সামনে তাকাই। “তোমাকে সেক্সি বললে এইরকম হয় নাকি?”

মেয়েটা টিন এজার। আশেপাশে যারা আছে তাদের বয়স ওর চেয়ে বেশি। তাদেরই একজন বলল, “তোমার বয়ফ্রেন্ডকেও এরকম ধোলাই দাও নাকি?”

“তুমি কে গো?” আরেকটা গলা পাই। “কী একটা যেন বললে তখন লোকটাকে?”

“তনয়া দত্ত। ক্যাপ্টেন তনয়া দত্ত।” উত্তরটা মাথায় ঝলসে ওঠার পাশাপাশি মুখ থেকেও বেরিয়ে আসে, “হাভেন মিলিশিয়া। আমি… নিজাম হাইটস্‌-এ গেছিলাম, তাই না? কিন্তু তারপর ঠিক কী হয়েছিল?”

“তুমিও ম্যাডহাউসে ছিলে?”

ম্যাডহাউস! এতক্ষণে আমার মাথার ভেতরের জটটা ছাড়ে। মনে পড়েছে!

ইদানীং লেটেস্ট ফ্যাশন হল ইমপ্ল্যান্ট লাগানো অবস্থায় নাচ, গান, হুল্লোড়, এবং অতি অবশ্যই সেক্স। এতে নাকি শরীরী আনন্দের সঙ্গে একজন ‘তৃতীয়’ ব্যক্তি হিসেবে সবটা দেখা-শোনার আমেজও পাওয়া যায়! নিজাম হাইটস্‌-এর সবচেয়ে ওপরের ফ্লোরে একটা ডিস্কোথেক আছে। ‘ম্যাডহাউস’ নামের সেই ডিস্কোথেকের এক্সক্লুসিভ কিছু ইমপ্ল্যান্ট আছে। কিন্তু ওখানে ইনভিটেশন ছাড়া ঢোকা প্রায় অসম্ভব।

অসম্ভব শব্দটা অবশ্য সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। যেমন, লিয়া বাতিস্তুতা। লেটেস্ট রিয়্যালিটি শো-র বিজেতা। রূপে আর গানে সমান পারদর্শী। মিডিয়ার ডার্লিং। অন্তত তিনটে বিশাল প্রোডাক্ট তথা হাউজের মুখ।

নিষ্ঠুর। পরশ্রীকাতর। উচ্ছৃঙ্খল। শরীরের বিনিময়ে সবকিছু আদায়ে বিশ্বাসী।

কম্যান্ডার পাতিলের মেয়ে!

 

কিউব, হাভেন, এখন

 

“আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী পাতিলের কোনো সন্তান নেই। তবে রেকর্ড তো…”

“একজ্যাক্টলি কাউন্সিলর। আচ্ছা তনয়া, পাতিল আপনাকে নিজের হিস্ট্রি কিছু বলেছিলেন? মানে এই… সন্তানের বিষয়ে?”

“বলেছিলেন ডক্টর। এগুলো পাতিল চাকরিতে ঢোকার ঠিক পরের কথা। ওঁর সঙ্গে তখনকার ইউনিফায়েড কম্যান্ডের কোনো সিনিয়র অফিসারের আলাপ হয়। পাতিল তাঁর প্রোটোকল ডিউটি করতেন বোধহয়। আলাপটা গভীরতর হয়। পাতিল প্রেগন্যান্ট হন। সেই অফিসার বিবাহিত ছিলেন। পাতিল নিজেও ব্যাপারটা সামনে আনতে চাননি। অ্যাবরশন সহজ রাস্তা ছিল, কিন্তু সেটা নেননি পাতিল। তিনি, সেই অফিসারের ব্যবস্থা করে দেওয়া নার্সিং হোমে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন।মেয়েটি একটি অনাথ আশ্রমে জায়গা পায়। তারপর এক নিঃসন্তান দম্পতি তাকে দত্তক নেয়। সেই মেয়েটিই লিয়া বাতিস্তুতা।”

“কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে লিয়া তো এখনও সাবালক হয়নি।”

“হয়নি। কিন্তু ওর মতো সেলিব্রিটি-র পক্ষে সেই রাতে ‘ম্যাডহাউস’-এ ঢোকা কোনো ব্যাপারই ছিল না। আরতারপর থেকেইলিয়া-র কোনো হদিস নেই।”

“একজন সেলিব্রিটি উধাও হল, অথচ মিলিশিয়া বা ইনভেস্টিগেশন কিছু জানল না? ব্যাপারটা কি বিশ্বাসযোগ্য অফিসার?”

“আপনি লিয়া-র পরিবারের, মানে পাতিল নয়, বাতিস্তুতা পরিবারের কথাটা ভাবছেন না কেন ডাইরেক্টর? মিস্টার বাতিস্তুতা দৌড়োদৌড়ি করেছেন নানা জায়গায়। কিন্তু খুব বেশি হইচই করতে পারেননি মিডিয়ার ভয়ে। যাদের প্রোডাক্ট লিয়া এনডর্স করে, তারাও ওঁদের মুখ বন্ধই রাখতে বলেছিলেন।”

“পাতিল কীভাবে জানতে পারলেন?”

”লিয়া-র শরীরে একটা ট্যাটুর মাধ্যমে ট্র্যাকার বসানো ছিল। ওর অজান্তে। পাতিলই বসিয়েছিলেন। সেটা দিয়েই এতদিন পাতিল মেয়ের গতিবিধি অনুসরণ করতেন। কিন্তু ম্যাডহাউস-এ যে ইমপ্ল্যান্টটা ওর শরীরে লাগানো হয়েছে সেটার কিছু বিশেষত্ব আছে। লিয়া ওখানে পৌঁছনোর কিছুক্ষণ পর থেকেই ট্র্যাকার নীরব। টনক নড়ার পর পাতিল গোপনে কিছু খোঁজখবর নিয়ে এটুকু জানতে পারেন যে লিয়াউধাও হয়েছে।”

“উধাও হয়েছে মানে? ও ওখান থেকে আর বাড়ি ফেরেনি?”

“না। শুধু তাই নয়। ‘ম্যাডহাউস’ থেকে অনেক রাতে কয়েকজন হাই প্রোফাইল লোক বেরিয়ে গেছিল। সম্ভবত লিয়া তাদের সঙ্গে ছিল। তারা কোথায় গেছে এটা জানতে গিয়েই দেখা যায় যে কেউ কিছু বলছে না। ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না। মানে স্ট্যান্ডার্ড রুটিন মেনে দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে আর কি।”

“সরকারিভাবে পাতিলের পক্ষে কিছু করা অসম্ভব, এটা বুঝলাম। কিন্তু তোমাকে কেন? কথাটা অন্যভাবে নিও না ট্যান। তোমার যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু স্কোয়াডের আর কেউ নয় কেন?”

“দু’দিন আগে ওখানে কসপ্লে ইভেন্ট ছিল। কসপ্লে মানে এক্ষেত্রে কোনো সুপারহিরো বা স্টার কি সেলিব্রিটির পোশাক পরা নয়। নিজাম হাইটস্‌-এ প্রতি বছর অগস্টের মাঝামাঝি সময়টা দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা লোকেদের কিছু একটা উৎসব হয়। ওইসময় ধনীরা সমাজের নানা শ্রেণির লোক সেজে আসে। পাতিল আমার জন্য একটা জাল পরিচয়ের ব্যবস্থা করেন। আমি জন্মসূত্রে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ। গায়ের রং আর চেহারার বিচারে, অত শর্ট নোটিশে শুধু আমিই ওই ইভেন্টেঢুকতে পারতাম। তাই,সেই রাতে আমিই নার্স সেজে ‘ম্যাডহাউস’-এ যাই।”

“কসপ্লে-তে যোগ দিলেও কি…?” নরম গলাটা দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে বলে ওঠে। উত্তরে একটা ফাঁকা হাসি ঘুরপাক খায় দেওয়ালগুলোর মধ্যে। তারপর ঈষৎ খসখসে গলাটা বলে ওঠে,

“হ্যাঁ ডক্টর। ম্যাডহাউসে আপনি যেভাবেই ঢুকুন, প্যাকেজ একটাই। পেমেন্ট, ইমপ্ল্যান্ট, তারপর শরীরে ঝড়, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড… যা বলবেন।”

“ইমপ্ল্যান্ট করার পর কী হয়েছিল তোমার মনে আছে?”

“না কাউন্সিলর। তবে ইমপ্ল্যান্ট-টা করার আগে আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছিলাম। জিনিসটা করা হয় একটা পাঞ্চ গান দিয়ে, ঘাড় আর মাথার সংযোগস্থলে। একটা সামান্য চিনচিনে ব্যথা ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতি হয় না। তারপর, একটু-একটু করে মনে হয়, যেন শরীর ছেড়ে বেরিয়ে আসছি। সে যাক, ইমপ্ল্যান্ট করার পর কী হয় সেটা ডকুমেন্টেড। কিন্তু আমার আগেই যে মেয়েটি ছিল, তার বোধহয় কিছু সমস্যা হয়েছিল পাঞ্চের পর। সে হাত-পা ছুড়ছিল। তাকে নিয়ে যখন সবাই ব্যস্ত, তখন আমি পাঞ্চ গানটা তুলে রাখার ফাঁকে একবার খুলে কার্ট্রিজগুলো দেখে নিয়েছিলাম।”

“কী দেখেছিলে?”

“সেগুলোতে একটা লাঠিকে পেঁচিয়ে ওঠা মুখোমুখি দুটো সাপের চিহ্ন ছিল। প্রায় সব কার্ট্রিজের ক্ষেত্রে ওই চিহ্নটার রঙ ছিল সাদা বা হলুদ। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে যেটা পাঞ্চড হওয়ার জন্য তখন গান-এর মুখে এসে গেছিল, সেটায় চিহ্নের রঙ ছিল সবুজ।”

“কী?!”

“অ্যাবসার্ড! কাউন্সিলর, এই মেয়েটি তখন ওই পরিবেশে কী দেখেছে তার ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়াই যায় না। তাছাড়া ওই রঙের কোডিং সিভিলিয়ান ইমপ্ল্যান্ট-এ থাকাই সম্ভব নয়। ওটা জাল!”

“আপনার প্রতিক্রিয়া থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ট্যান ভুল দেখেনি। এও বুঝতে পারছি, কেন এই ঘটনাটা নিয়ে আপনাদের এত মাথাব্যথা।”

“আর কিছু মনে আছে আপনার?”

“না ডক্টর।”

“আপনাকে তো কেউ চিনেও ফেলতে পারত? একসময় মিডিয়া আপনাকে ভিলেন বানিয়েছে। পরে তারাই আপনাকে হিরোর সম্মান দিয়েছে। ওখানে আপনাকে চেনার মতো কেউ ছিল না?”

“নিজের বায়োচিপটা সরিয়ে পাতিলের জোগাড় করে দেওয়া চিপ বসিয়ে নিয়েছিলাম চোখে। আমার মুখটা তাও হয়তো কেউ চিনে ফেলতে পারত। তবে আমার শেষ অ্যাসাইনমেন্টের পর নানা সার্জারিতে মুখটা প্রায় বদলেই গেছে। তাই সেই আশঙ্কা খুব একটা ছিল না।”

“তোমার… কোনো ব্যবস্থা নেওয়া ছিল?”

“যাতে ইনফেকশন বা … অন্য কিছু না হয়, সেজন্য কিছু ব্যবস্থা নিয়ে গেছিলাম কাউন্সিলর। তার চেয়ে বেশি আর কিছু করার সাহস দেখাইনি। ওরা সন্দেহ করলে বিপদ ছিল।”

“তারপর কী হল?”

“সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড়ো রহস্য ছিল, জানেন। এমনকি গাড়ির মধ্যে মেয়েগুলোকে যথাসাধ্য জিজ্ঞেস করেও তেমন কিছু জানতে পারিনি। সেই রাতে ম্যাডহাউস-এ যা হওয়ার তাই হচ্ছিল। অন্য সব মেয়েদের সঙ্গে আমিও কোনো একটা ঘরে, বা সোফায়, বা মেঝেতে… যাকগে! সব ব্ল্যাংক। জ্ঞান ফিরল ওই গাড়ির মধ্যে। তবে একটি মেয়ে, অন্যরা তাকে ‘কেস’ বললেও আসল নাম ‘কস্তুরী’, একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল। কথাটা বিশ্বাস হয়নি তখন। পরে বুঝেছিলাম, ও ঠিকই দেখেছিল।”

“কী কথা?”

“রাতের কোনো একটা সময় ম্যাডহাউসে নাকি একটা রেইড হয়েছিল। সেটা নতুন কিছু না। ডিস্কোথেক আর রেভ পার্টিতে রেইড না হলে তাদের মানহানি হয়। কিন্তু এই রেইডটা মিলিশিয়া বা নিজাম হাইটস্‌-এর সিকিউরিটি চালায়নি। এটা চালিয়েছিল কালো আর সবুজ আর্মার পরা একদল লোক। তারপরেই নাকি ঘর থেকে সবাইকে বের করা হয়। ইমপ্ল্যান্ট বসানো সবাইকে আলাদা করা হয়। তারপর তাদের কীসব পরীক্ষা করা হয়। আমার মতো কয়েকজনকে আলাদা করা হয়। তারপর তাদের এই গাড়িতে লোড করা হয়।”

“কোস্‌… নামটা বড্ড কঠিন লাগছে। কেস্‌-ই ভালো। তা সেই কেস্‌ এগুলো কীভাবে জানল?”

“রেইড হওয়ার ঠিক আগেই কেস্‌-এর সঙ্গে তার পার্টনার-এর বিশাল মারামারি হয়। ভাঙা কাচে হাত কেটে গেছিল বলে বাধ্য হয়ে ওকে ট্রিট করা হচ্ছিল। তাই ইমপ্ল্যান্ট থাকা অবস্থাতেও ওর হুঁশ ফিরে আসে। কিন্তু শরীরের ওপর ওর তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। রেইড শুরু হওয়ার পর ও ভয়ে কোনো কথা বলেনি। চুপচাপ যা করতে বলা হয়েছিল, তাই করেছিল, একটু ঘুম-ঘুম ভঙ্গিতে।”

“ভয়ে?” ঘ্যানঘেনে গলা এবার ব্যঙ্গে কুঁকড়ে ওঠে। “ভয় পেয়েছিল কেন?”

“মেয়েটা আন্ডার-এজ। টিন-এজার। মিলিশিয়া রেইড করলে তারা সব রেকর্ড রাখে, কিন্তু বাড়ির লোকজনকে কিছু বলে না। এই রেইডটা যারা চালিয়েছিল তারা বলে দিতে পারত।”

“কারা চালিয়েছিল রেইডটা?”

“এক মিনিট! ডক্টর হোসেন, আপনি কি নিশ্চিত যে অফিসার তনয়া-র কথাগুলোর ক্রেডিবিলিটি আছে? মানে গত দু’দিন ধরে ওঁর ওপর যা গেছে তাতে উনি কী দেখেছেন, কী শুনেছেন তা কোর্টে…”

“আপনাকে কি ঘর থেকে বের করে দেব ডাইরেক্টর?”

“কী?!”

“এটা কিউব। আপনার অফিস নয়। আপনাদের পোষা লোকে ভরা সেনেট হল বা সিটি কাউন্সিল নয়। এখানে একটা সেশনে কে থাকবে বা থাকবে-না, সেটা ঠিক করায় আমার পেশাদারি মতামতের একটা গুরুত্ব আছে। আমি কি তাহলে রেকমেন্ড করব যে আপনি অসুস্থ বোধ করছেন? এখানে হওয়া কথাগুলোর একটা রেকর্ড আপনার কাছে পৌঁছে দিলেই হবে পরে।”

“কাউন্সিলর? আপনিও কি…?”

“তুমি বলো ট্যান। কেস্‌ কী দেখেছিল? কারা চালিয়েছিল রেইডটা?”

“সিটিকর্প সেক ইউনিট।”

ঘরটা চুপ করে থাকে। মনে হয় যেন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে আছে শুধু কিছু যন্ত্র, আর তাদের মৃদু গুঞ্জন গায়ে মেখে কালো কাচের গায়ে মুখ লেপটে থাকা সাদা আলো। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম গলাটা বলে ওঠে, “তারপর কী হয়েছিল? মানে ট্রাকটা তো আবার আপনাদের নিয়ে চলতে শুরু করল। তারপর?”

“কিছুটা যাওয়ার পর ট্রাকটা থেমে গেল। কথাবার্তা শুনলাম। মনে হল গাড়ি খারাপ হয়েছে বলে কেউ সাহায্য চাইছে। ড্রাইভার পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার মুডে ছিল। কিন্তু কথা শুনে বুঝলাম, অন্য গাড়িটা খারাপ হওয়ার সময় রাস্তায় টাল খেয়ে থেমেছে। ওটাকে সরাতে না পারলে যাওয়া মুশকিল। রাস্তার পাশে বালিয়াড়িতে নামলে যদি গাড়ির চাকা বসে যায়, তাহলে আরও দেরি হয়ে যাবে। বিরক্ত হয়ে ড্রাইভার ট্রাক থেকে নামল বুঝলাম, কারণ দরজাটা সে দমাস্‌ করে বন্ধ করল।”

“তারপর?”

“কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। ইতিমধ্যে আমরা হিউ আর মালেকের শরীরদুটো কোণের দিকে, বিশ্রাম নেওয়ার ভঙ্গিতে বসা আর শোয়ার মাঝামাঝি অবস্থায় রেখে দিয়েছিলাম। নিজেরাও আবার হাত-পা বেঁকিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। তারপর দরজাটা খুলে গেল।”

“কে খুলল? ড্রাইভার?”

“না। জন।”

“কে?”

জন, স্টেশন থার্টিন থেকে কুড়ি মিনিট দূরে, দু’দিন আগের রাত

 

“জন থ্যান্ড্রো। রিকভারি ডিভিশন। গাড়িটা খারাপ হয়ে বড়ো বিপদে পড়েছি ভাই। এদিকে গাড়ি আসে না। আবার খবরও পাঠানো যায় না, আপনি নিশ্চয় জানেন। একটু যদি স্টেশন অবধি লিফট দ্যান…”

ড্রাইভারের হাতটা কোমরের কাছে গোঁজা ব্লাস্টারের খুব কাছে ঘোরাঘুরি করছিল। আমি জানতাম, ও এখনও ফায়ার করেনি স্রেফ দুটো কারণে। প্রথমত, ধু-ধু মরুভূমির মধ্যে আমার মতো একটা বুড়ো একা রাস্তায়, বেঁকে যাওয়া গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে, গায়ে কোনো অস্ত্র নেই। আমাকে খুব একটা বড়ো বিপদ বলে ও ভাবতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, ম্যাপ অনুযায়ী এই রাস্তাটা শেষ হয়েছে মরুভূমির মধ্যে একটা স্ল্যাগ ডাম্পে। গায়ে বড়ো-বড়ো করে কেমিক্যাল হ্যাজার্ডের চিহ্ন লাগিয়ে একটা গাড়ি এদিকে ঘুরলে কেউ অবাক হবে না। কিন্তু আমার আইডি-টাকে ও উপেক্ষা করতে পারছিল না।

“স্টেশনে আপনার কী কাজ?”

অনেক দিন ধরে চুরুটের ধোঁয়া আর সস্তা মদের আদরে ড্রাইভারের গলাটা চেহারার মতোই রুক্ষ হয়ে গেছিল। সহজ প্রশ্নটাও গালির মতো বেরোল। মাথা ঠান্ডা রেখে বললাম, “সেটা আপনাকে বোঝানো তো মুশকিল। আমি নিরস্ত্র। স্টেশনে আমাকে পৌঁছে দিলে তারাই আপনাকে বুঝিয়ে দিতে পারবে, ওখানে আমার কী কাজ। তবে আমার যে অথরাইজেশন আছে, সেটা আপনি এই আইডি থেকেই বুঝবেন।”

লোকটা ইতস্তত করছিল। ওকে উৎসাহ দিতে বললাম, “আপনি চাইলে আমি কার্গোর সঙ্গেই যেতে পারি। আপনি না হয় বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেবেন।”

ড্রাইভারের চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমি বুঝতে পারলাম, ধারণাটা ঠিক ছিল। এরা কখনোই একা চলে না। ওর সঙ্গী বা সঙ্গীরা নিশ্চয় পেছনের কন্টেইনারে আছে। কে জানে, সেখানকার হতভাগিনীদের কী অবস্থা করেছে তারা। তবে আমার এখন সে-সব নিয়ে ভাবলে চলবে না। স্টেশন থার্টিন পৌঁছেও হাতে কতটা সময় থাকবে, সন্দেহ আছে। আপাতত গাড়িটা কবজায় নেওয়াই জরুরি।

“ওখানে আমার লোকেরা আছে।… কার্গোও আছে।”

“তাদের নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।” আমি বলি, “আপনি আমাকে স্টেশন থার্টিনে পৌঁছে দিন শুধু।”

স্টেশনের সংখ্যাটা শুনে লোকটারদ্বিধা আরও কমে গেল। ও আমাকে গাড়ির পেছনদিকে যেতে বলল। আমি পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথে কম আলোয় হোঁচট খাওয়ার ভঙ্গিতে সামান্য নীচু হয়ে গেলাম। তারপর গোড়ালিতে ভর দিয়ে পুতুলের মতো ঘুরে গেলাম পেছনে, বিদ্যুদ্বেগে । হিসেবটা ঠিক ছিল। ড্রাইভার নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে সবে হাঁটা দিয়েছিল। আমার থেকে তখন ওর দূরত্ব খুব বেশি হলে দু’ফুট। ও ব্লাস্টারটা বের করল। তবে ততক্ষণে আমি স্লিভে লুকোনো ধারালো সেরামিকের প্লেটটা দিয়ে ওর গলা ফাঁক করে দিয়েছি। যন্ত্রণাহীন, তাৎক্ষণিক মৃত্যু। জানি না লোকটার অন্য কিছু প্রাপ্য ছিল কি না। হলেও, আর কিছু করার নেই।

দরজা খুলে ড্রাইভারের সঙ্গীদের যে, মিডিয়ায় ভাষায় ‘অস্বস্তিকর’ অবস্থায় দেখব না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। গাড়িটা থেমেছে বুঝেই হয়তো ওরা তৈরি হতে শুরু করেছে। তাই আমাকে কিছু একটা বোঝাতে হবে ওদের। কী বোঝাব সেটা ভাবতে-ভাবতেই দরজাটা খুললাম। খুলেই মনে হল, ভুল করলাম। আমার মতো একটা বুড়োর এই ভারী দরজা একটানে খোলা অস্বাভাবিক। কিন্তু এখন…

আরে! ওটা কে? এই মেয়ে এখানে কী করছে?

কিউব, হাভেন, এখন

 

“লোকটাকে দেখে আমার অবাক হওয়া উচিত ছিল। আনন্দ… হ্যাঁ, সেটাও হতে পারত। কারণ শেষবার যখন আমাদের মোলাকাত হয়েছিল তখন লোকটা আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। তবু আমার স্রেফ পিত্তি জ্বলে গেছিল লোকটাকে দেখে।”

একটা গলা-খাকড়ানির(?) শব্দ পাওয়া যায়। তারপর নরম গলাটা বলে, “ঠিক এই জায়গাটা থেকেই আপনার রিপোর্ট নিয়ে একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে তনয়া। সমস্যার কারণটা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন?”

“পারছি।” খসখসে গলায় উত্তর আর তার সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস যান্ত্রিক টেপ আর চিপেও নিঃসীম ক্লান্তি ফুটিয়ে তোলে। গলাটা বলে, “গতবার তো পুরো জিনিসটা শক, ট্রমা এ-সব বলে দেওয়া হয়েছিল। এবারও তেমন কিছু হয়েছে, এটাই বলতে চান?”

“তোমার বা তোমার বক্তব্যের ইন্টিগ্রিটি নিয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই ট্যান। কারও ধান্দাবাজ মগজ যদি সেটা মানতে না পারে তাহলে সেটা তার সমস্যা। তবে তুমিও নিশ্চয় এটা মানবে, এই সুপারহিরো কোত্থেকে উদয় হয়, কোথায় হারিয়ে যায়, এটা একটা রহস্য। তাই না?”

“হ্যাঁ কাউন্সিলর। আমি একদিন এই রহস্যের সমাধান করে ছাড়ব। তবে তখন…”

“ঠিক। আসল কথায় ফিরে আসি। তখন কী হল?”

জন, স্টেশন থার্টিন থেকে কুড়ি মিনিট দূরে, দু’দিন আগের রাত

 

“ঘাবড়াবেন না।” আমি আগেই হাত তুলে বলি, “আমি ছাড়া কেউ আপনাকে চিনবে না ট্যান। কিন্তু আপনি এখানে কী করছেন?”

“সেটা আগে আপনি বলুন।” চিবিয়ে-চিবিয়ে বলা কথাটা শুনে বুঝি, মেয়েটা বেশ কষ্ট করে নিজেকে সামলাচ্ছে। ট্রাকের বাকি মেয়েগুলোও জুলজুল করে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। শুধু দুটো শরীর নড়ছে না মনে হচ্ছে। ওরাই কি…? যাক্‌, আপদ গেছে। অবশ্য ট্যানের সঙ্গে থাকা আর জাগুয়ারের সঙ্গে একই খাঁচায় ঘুমোনো একই ব্যাপার। লোকগুলো জানত না।

“এই ট্রাক একটা বিশেষ জায়গায় যাচ্ছে। আমিও সেখানেই যাচ্ছি, তবে অন্য উদ্দেশ্যে। ব্যাপারটা গোপন রাখতে হচ্ছে বলে এই মাঝপথে ওঠা। আর কিছু না।” আমি যথাসাধ্য শান্ত গলায় বলি।

“মিথ্যে কথা।” খর গলায় বলে ওঠে মেয়েটা, “শুধু হিচ-হাইক করতে হলে আপনি ড্রাইভারকে মারতেন না। আমি ওর পড়ে যাওয়ার শব্দ পেয়েছি।”

আবছা আলো আর অন্ধকারেও বুঝি, অন্য মেয়েগুলোর চোখ গোল হয়ে উঠেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, “গাড়িটা কবজায় না নিলে আমরা ওখানে ঢুকতে পারব না। আপনাদের বাঁচানোও যাবে না। ওর দুই সঙ্গীর… ব্যবস্থা তো আপনারাই করে ফেলেছেন। ড্রাইভারকে মারা ছাড়া উপায় ছিল না।”

“ওখানে মানে? কোথায় ঢোকার কথা বলছেন?”

“আমরা এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারি না?” “কিছুতেই যাব না আমরা!” “এই লোকগুলো নির্ঘাত আমাদের মারতে নিয়ে যাচ্ছিল।” এমন প্রশ্নের ঢেউ আমাকে টলিয়ে দেয় এবার। হাত তুলেও ওদের থামানো যেত না। তবে এবার হাতে ড্রাইভারের ব্লাস্টারটা ছিল বলে সবাই চুপ করে যায়।

“এখান থেকে মোটামুটি কুড়ি মিনিট গেলেই আমরা একটা স্টেশনে পৌঁছব। স্টেশন মানে ট্রেন বা ফ্রি-ওয়ের এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট নয়। পরমাণু বোমা পড়লেও যাতে কিছু-কিছু যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখা যায়, সেজন্য দেশজুড়ে বানানো হয়েছিল বহু গোপন সেন্টার। সেগুলোকেই কম-স্টেশন, সংক্ষেপে স্টেশন বলা হয়। তাদের একটা, স্টেশন থার্টিন, আপাতত আমাদের গন্তব্য। ওখানেই আপনাদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।”

“কেন?” একটা বিদ্রোহী, টিন-এজ গলা ভেসে আসে গাড়ির ভেতর থেকে। আমি ভাবি, এদের কতটা বলা যেতে পারে। তবে এই অপারেশনে ট্যান-কে পাশে পাওয়া মানে বড়ো ব্যাপার। সেটা তখনই হবে, যখন এই মেয়েগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।

“আপনারা গাড়ি থেকে আগে নেমে আসুন।”

ট্যান সবচেয়ে আগে নামে। ও মাথা ঝাঁকিয়ে ‘অল ক্লিয়ার’ বোঝানোর পর বাকিরা একে-একে নেমে আসে। আমার অবাক লাগে একটা জিনিস দেখে। গায়ে রক্ত, ঘাম, কালসিটে, আর ক্ষেত্রবিশেষে কান্নার শুকনো দাগ নিয়েও মেয়েগুলো নেমে আকাশের দিকে তাকায়। লোকে বলে মরুভূমিতে তারাভরা রাতের আকাশ দেখার অনুভূতি নাকি অনন্য। মেয়েগুলোও কি সেজন্যই আকাশ দেখছিল? কী জানি। আমি ও রসে বঞ্চিত। ওদের নজর আবার মাটির কাছাকাছি ফেরাতে চেষ্টা করি।

“ট্রাকের গায়ের এই চিহ্নটা আপনারা চেনেন?”

মাথা নাড়া, আর চোখগুলো বড়ো হয়ে ওঠা থেকে বুঝি, অন্তত কয়েকজন চিহ্নটা চিনতে পেরেছে। আমি বলি, “এটা সিটিকর্পের একটা ইউনিটের চিহ্ন। তাদেরই গাড়ি এটা। ড্রাইভারের কাছে যে কাগজ আছে তাতে দেখানো আছে, গাড়িতে কিছু আবর্জনা চালান করা হচ্ছে শহরের বাইরে, একটা ডাম্পে। আসলে আপনাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ওই স্টেশনে। বেশ কয়েক বছর ধরেই ওটার মালিক সিটিকর্প।”

“কিন্তু সেখানে আমরা কেন যাব?” ট্যান জানতে চায়।

“কারণ” আমি যথাসম্ভব ধৈর্য দেখিয়ে উত্তর দিই, “একটা বিশেষ ধরনের ইমপ্ল্যান্ট আপনাদের ঘাড়ে বসানো রয়েছে। ম্যাডহাউসে এমনিতে যেটা লাগানো হয় সেটার নাম ‘ফ্ল্যাশ’। কিন্তু যেটা আপনাদের ঘাড়ে এই মুহূর্তে দপদপ করছে সেটার নাম ডেল্টা ভিশন, সংক্ষেপে ডে-ভি। ওই স্টেশনে গিয়ে ওগুলো আগে নিষ্ক্রিয় করতে হবে। নইলে আপনাদের, এবং আরও অনেকের বড়ো বিপদ।”

কিছুক্ষণ সব চুপচাপ থাকে। মরুভূমি থেকে বয়ে আসা হাওয়ায় সামান্য, ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক পরে থাকা মেয়েগুলো কেঁপে ওঠে। তারপর আরেকজন মুখ খোলে। গলাটা ভারী। একটু ব্যঙ্গ-মেশানোও।

“আমাদের ওই স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল কি ইমপ্ল্যান্ট সরিয়ে নেওয়ার জন্য?”

“না।” মিথ্যে বলে লাভ নেই। তার ওপর ট্যানের সাহায্য আমার দরকার। তাই সত্যিই বলি, “ওরা এগুলো করতে চায়নি। ব্যাপারটা দুর্ঘটনার মতো করেই শুরু হয়। কিন্তু তার ফলাফল দেখেসিটিকর্পচমকে উঠেছিল।ওরা আজ আর একটা ট্রায়াল রান চালিয়েছে, বলতে পারেন। আপনাদের তুলে আনা হয়েছে তার ফলাফল দেখার জন্য। তারপর ওরা আর কোনো প্রমাণ রাখত না। আপনাদের মগজ অক্ষত থাকলেই ওদের কাজ হয়ে যেত। সেজন্যই বোধহয়…”

তুলে আনা মেয়েগুলোর ওপর ওই লোকগুলোকে লেলিয়ে দেওয়া নিয়ে আর ব্যাখ্যা দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ওরাও কেউ আর কোনো প্রশ্ন করেনি। তবে ট্যান আমাকে এত সহজে ছাড়ল না।

“আপনি এ-সবে কীভাবে ঢুকছেন? মানে আপনি কী করেন?”

“ওই ইমপ্ল্যান্টগুলো আসলে আমাদের জন্য বানানো হয়েছিল।”

কিউব, হাভেন, এখন

 

“অ্যাঁ?!”

“আপনি তো ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন ডাইরেক্টর। জল খান।”

“জল! হ্যাঁ। ধন্যবাদ। কিন্তু তার মানে তো…!”

“কিছু মনে করবেন না তনয়া।” নরম গলাটা বলে, “আপনার সঙ্গে এই লোকটির, এই মিথিক্যাল ‘জন’-এর তো আগেও দেখা হয়েছে। এমনিই জানতে চাইছি, লোকটা কে? আপনার কী মনে হয়?”

“আমার ধারণা, ও কোভার্ট অপারেশনের কেউ। ওই বুড়ো চেহারা, সাদা চুল, মুখময় বলিরেখা… এগুলো হয়তো সত্যিই। কিন্তু তার সঙ্গে লোকটার শারীরিক সক্ষমতার কোনো সম্পর্ক নেই। ও আমার চেয়েও ফিট। আর ‘রিকভারি ডিভিশন’ নামে যে আদতে মিলিটারির গোপন প্রোজেক্ট চালানো হয়, এটা আমরা জানি। কথাটা কেউ অস্বীকার করতেই পারে। সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার।”

“আপনি কিছু বলবেন ডাইরেক্টর?”

“আপনাদের যা ইচ্ছে করুন। আমি এই প্রোসিডিংস নিয়ে আর কথা বলতেই রাজি নই। তাছাড়া যদি আমরা এমন কিছু করেও থাকি, তাহলে সেটা মিলিটারির ক্লাসিফায়েড প্রোজেক্টের অংশ। আপনারা সেগুলো নিয়ে কথা বলছেন। এটাই কত বড়ো অফেন্স জানেন?”

“আমাদের ভয় দেখাবেন না ডাইরেক্টর।” ঠান্ডা গলাটা হিসহিসিয়ে ওঠে। ঘরের কাচে বাষ্প জমে উঠে জলের দানা হয়ে গড়িয়ে পড়ে যেন তার সম্মানেই। “হাভেনের নাগরিকদের ভালোমন্দ দেখার দায় আমার মতো কাউন্সিলর আর হাভেন মিলিশিয়ার। তাদের মান-ইজ্জতধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে এখন ক্লাসিফায়েড-এর গপ্পো শোনাচ্ছেন? বরং পুরোটা শুনুন। তাহলে বুঝবেন কোন্‌ গর্তে হাত দিয়েছেন এবার।”

পৃথিবী, সূর্য, মায় ছায়াপথ নিজের মতো ঘুরে চলে। শুধু চারটে মানুষ বসে থাকে এই কাচের ঘরে। চুপচাপ। তারপর খসখসে গলাটা আবার সরব হয়। সেটা আগের চেয়ে একটু সতেজ শোনায়। মেশিনের ভুল? হতে পারে।

জন, স্টেশন থার্টিন থেকে কুড়ি মিনিট দূরে, দু’দিন আগের রাত

 

“গত যুদ্ধের পর আরও অনেক স্টেশনের মতো এটাকেও সরকার বিক্রি করে দিয়েছিল। অন্য সংস্থার নামের আড়ালে স্টেশন থার্টিন কিনেছিল সিটিকর্প।”

খুব কম সময়ের মধ্যেই দু’বার দাঁড়িয়েছে গাড়িটা। স্টেশনের নজরদার লোকেরা এতক্ষণে নিশ্চয় কিছু আশঙ্কা করেছে। স্যাটেলাইট ছাড়া অবশ্য আমাদের দেখার কেউ নেই। ড্রোন এখানে উড়বে না। সেই সুযোগে মেয়েগুলোকে অবস্থাটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম।

“স্টেশন থার্টিন একটা ডাম্প-ই বটে। ওখানে বেশ কিছু বে-আইনি ইমপ্ল্যান্টের প্রোটোটাইপ রাখা ছিল। অবশ্যই গোপনে। ডেল্টা ভিশনও সেগুলোর মধ্যে ছিল। তবে ওগুলো খনির শ্রমিকদের ‘উৎসাহিত’ করার জন্য, বা ফ্ল্যাশ-এর মতো করে কাজে লাগানোর জন্য বানানো হয়নি। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার একটা প্রোজেক্টের জন্য ওগুলো বানানো হয়।”

“সৈন্যদের বেশি সহিষ্ণু করে তোলার জন্য ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার হয় বলে শুনেছি।” কথাটা বলে একটি শ্যামলা, লম্বা মেয়ে। কোঁকড়া চুলের আড়ালে তার বড়ো-বড়ো চোখগুলো তারার আলোতেও যেন জ্বলে ওঠে।

“সেগুলো আলাদা।” আমি বলি, “ডেল্টা ভিশন অন্যভাবে কাজ করে। ক’দিন আগে সিটিকর্প-এর এক বিশাল কর্তাব্যক্তির ছেলে ওই স্টেশনে গিয়ে কয়েকটা প্রোটোটাইপ নিজের খেয়ালে তুলে নিয়েছিল। সেই রাতে নিজের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ‘ম্যাডহাউস’-এ পার্টি করতে যায় সে। ওখানে রাখা নানা পিল আর প্যাকেজের সঙ্গে কয়েকটা ডে-ভি মিশে যায়।”

“তারপর?”

“ছেলেটি আর তার বন্ধুরা সেই রাতে সঙ্গিনী হিসেবে যাদের বেছেছিল, তারাই ডে-ভি-র ফিল্ড ট্রায়ালে গিনিপিগ হয়ে যায়। তাদের শরীরে ওগুলোই পাঞ্চ করা হয়। তারপরেও কয়েকটা থেকে গেছিল। সেগুলো এখন আপনাদের শরীরে রয়েছে।”

“রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় লাগে এমন ইমপ্ল্যান্ট নিয়ে ফুর্তি?” ভারী গলার মেয়েটা আবার ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে সরব হল, “নাকি আমরা ম্যাডহাউস-এ যা করছিলাম সেটাই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অঙ্গ?”

“বলব। সব বলব।” আমি ওদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি, “কিন্তু এখনই রওনা না হলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। আমাদের আর মিনিট পনেরোর মধ্যে স্টেশনে পৌঁছতে হবে।”

মানুষগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মরুভূমির কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ওদের কাঁপিয়ে দেয়, তবু ওরা নড়ে না।

“আচ্ছা, আমি তাহলে একটা প্রস্তাব দিই?” আমি মরিয়া হয়ে বলি, “ট্যান, আর আপনি…”

ভারী গলা আর ঈষৎ পৃথুল শরীরের মালিক মেয়েটা বলে ওঠে, “আমি দিয়ারা।”

“রাইট। দিয়ারা। আপনারা দু’জন আমার সঙ্গে গাড়ির সামনের অংশে বসুন। লাশগুলো ফেলে দিন। বাকিরা আবার কন্টেইনারে ঢুকে যান। শুয়ে থাকুন। ঘুমোন। মোদ্দা কথা, বোঝা যেন না যায় যে আপনারা সচেতন আছেন।”

“কতক্ষণ?”

“যতক্ষণ না আমরা কেউ আপনাদের কিছু করতে বলি।”

মৃদু ওজর-আপত্তি তুললেও ওরা সবাই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারছিল। তাই আর দেরি হল না। আমরা গাড়িতে বসলাম। কিন্তু চালু করতে গিয়ে বুঝলাম…

কিউব, হাভেন, এখন

 

“তুমি কি কিছু বুঝতে পারছিলে? মানে… অন্যরকম কিছু?”

“না কাউন্সিলর। আসলে শরীরের ব্যথাগুলো তখনও জিনিসটাকে চাপা দিয়ে রেখেছিল।”

“এক মিনিট!” ঘ্যানঘেনে গলাটা সরব হয়, “অফিসার, আপনি বলছেন যে ওই ইমপ্ল্যান্টের কোনো প্রভাব আপনারা বুঝতে পারেননি? তাহলে তো এরপর যা হয়েছে সেটা পুরোপুরি ওই ‘জন’-এর সাজেশন আর আপনার অনুমানের ফলও হতে পারে।”

“আমি ‘আমাদের’ কথা বলিনি ডাইরেক্টর। আমার, তখনও অবধি মনে হওয়া অবস্থার কথা বলেছি।”

“আরে ওই হল! আপনার মতো একজন… স্কিলড অফিসার যদি না বোঝেন, তাহলে ওই মেয়েগুলো আর কী বুঝবে? আপনি ওদের যা বোঝাবেন, ওরা তাই বুঝবে।”

“সত্যিটা কিন্তু এর ঠিক উলটো ডাইরেক্টর। ’বোঝা’ ব্যাপারটা তাদের দ্বারাই হয়, যাদের মাথা সাফ থাকে। আগের কোনো ভাবনা সেখানে থাকে না। যেগুলো আমি ছোটোবেলা থেকে তৈরি হওয়া প্রবৃত্তি বা অভ্যাস ভাবছিলাম, সেগুলো যে আসলে অন্য কিছু, সেটা ওদের আচরণেই স্পষ্ট হয়ে গেছিল।”

“কীরকম আচরণ?”

“মালেকের গলার ঠিক নীচে ছুরি গেঁথে দিয়েছিল একটা মেয়ে। সেই মেয়েটার চেহারা, গ্রুমিং, চুলের কাট্‌, এ-সব থেকে বোঝাই যাচ্ছিল, খুনখারাপি থেকে ও বহু দূরের বাসিন্দা। তেমন কেউ যদি এইভাবে কাউকে মারে, এমনকি চরম অবস্থাতেও, তার আচরণ কেমন হবে? উত্তরটা ভেবেচিন্তে দিন ডক্টর।”

“শক। হিস্টিরিয়া। অথবা একেবারে পাথরের মতো হয়ে যাওয়া।”

“সে-সব কিচ্ছু করেনি মেয়েটি। বরং কিছুক্ষণের মধ্যেই সে একটি মৃতদেহ থেকে, খুব রুটিন কাজের মতো করে, পোশাক খুলে নিজে পরে নিয়েছিল, শীতের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য। এটা কি স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে পড়বে?”

“না!”

“বা, সেইরকমই কোনো ফুর্তিবাজ মেয়ে যদি একজনের…”

জন, স্টেশন থার্টিন থেকে কুড়ি মিনিট দূরে, দু’দিন আগের রাত

 

“মাথা খাটাতে হয় বুঝলেন!”

চমকে ওঠা ব্যাপারটা আমার আচরণে ফোটে না। তবে ট্যান যে একইসঙ্গে ভয় আর ঘৃণায় কুঁকড়ে উঠেছে সেটা ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ‘ইঁ-ইঁ-ইয়াক!’ শব্দে বোঝা গেল। কারণটা ওর সামনেই ছিল। দিয়ারা-র হাতে।

গাড়িতে উঠে আমি বুঝেছিলাম, এগুলো ইউজার-লকড। ড্রাইভারের গলাটা আমি ভালোভাবেই নকল করতে পারব। কিন্তু ওর বায়োমেট্রিক্স? এদিক-ওদিক তাকানোর ফাঁকেই দিয়ারা আমার প্রায় নাকের সামনে ঝুলিয়ে ধরেছিল ড্রাইভারের কাটা মুন্ডুটা। একটা ধারালো  ছুরি সিটের পেছনে মুছে, সগর্বে বলেছিল দিয়ারা, “বুদ্ধি করে মাথাটা কেটে না নিলে গাড়িটা চালাতে পারতেন?”

আমি মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিলাম। ড্রাইভারের চোখটা খুলিয়ে সেটা ড্যাশবোর্ডের ছোট্ট লেন্সে প্রায় চেপে ধরেছিলাম। থ্রম্‌ম্‌ম্‌ করে সচল হয়েছিল গাড়িটা। মুন্ডুটা আমার সিটের পেছনে, টুলবক্সের পাশে রেখে আমরা রওনা হয়েছিলাম স্টেশন থার্টিনের দিকে। ট্যান কিছুক্ষণ চুপচাপ ছিল। বোধহয় ধাক্কাটা সামলাচ্ছিল। তবে বেশিক্ষণ ছাড় পাইনি। ও আবার প্রশ্নমালা খুলে বসল।

“কী করে এই ডে-ভি?”

“এটা নারীদেহের কথা ভেবেই বানানো। সেখানে মস্তিষ্কের ডোপামিনার্জিক মেসোলিম্বিক পাথওয়ে বেশ কিছুক্ষণের জন্য অতিমাত্রায় সক্রিয় করে দেয় ডে-ভি।”

“কাকে সক্রিয় করে দেয়??”

“ডোপা…”

“তাতে কী হয়?” নিতান্ত অভদ্রের মতো আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে দু’জনেই জিজ্ঞেস করে।

“মগজে একটা বিশেষ চাহিদা তৈরি হয়। তার টানে শরীর চলতে থাকে।”

“কীসের চাহিদা?”

“সেক্সের।”

গাড়িটা অল্পসল্প লাফিয়ে এগোয় রাস্তা ধরে। বাইরে রাত বাড়ে। আমি স্টেশন সেভেন্টিন-এর লে-আউটটা মাথায় ফুটিয়ে তুলি। প্ল্যানটা সবে ছকা শুরু করেছি, তখনই আবার প্রশ্ন আসে। এবার প্রশ্নকর্ত্রী দিয়ারা।

“এমন একটা ইমপ্ল্যান্ট রেভ পার্টিতে খুবই কার্যকরী। কিন্তু মিলিটারি এটা চাইবে কেন?”

“নিম্ফোম্যানিয়াক এজেন্ট বানিয়ে কি কিছু…?”

“হাইপারসেক্সুয়াল।” এবার আমিই ট্যান-এর কথার মধ্যে বলি।

“ওই হল।” বিরক্ত কণ্ঠে বলে ট্যান, “ওই বানানো ছাড়া এই ইমপ্ল্যান্ট কি আরও কিছু কাজ করে?”

“করে। ওই… প্রথম ব্যাপারটাকে সাইড এফেক্ট বলতে পারেন। ডে-ভি বসানো মেয়েদের মধ্যে ক্রমে ডিপিডি ট্রিগার্ড হয়। তারপর দেখা দেয় এপিলেপটিক ভার্টিগো। যে-কোনো ইমপ্ল্যান্ট লাগানো অবস্থায় এই ‘লিম্বো’, মানে শরীরে থেকেও না থাকা গোছের একটা অনুভূতি হয়। ডে-ভি সেই অনুভূতিগুলোই কাজে লাগায়।”

“ডিপিডি মানে কী?”

“ডিসোসিয়েটিভ পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার।”

“আর ওই এপি…?”

“এপিলেপটিক ভার্টিগো।”

“এগুলোতে কী হয়?”

“হোমিসাইডাল ম্যানিয়া।”

আমার গলার স্বরে খুব একটা ওঠানামা হয় না। কথাগুলো নীচু স্বরেই বলছিলাম। তবু মনে হল, মেয়েগুলো এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে, ঠিক কী হতে চলেছে ওদের মধ্যে। আমি ব্যাপারটা আরও সহজ করার জন্য কথা চালিয়ে যাই।

“ডিপিডি-র প্রথম লক্ষণ হল এমপ্যাথির অভাব। সাবজেক্ট… মানে যার শরীরে এক্ষেত্রে ইমপ্ল্যান্ট বসানো রয়েছে সে আর অন্যদের ঠিক ‘মানুষ’ বলে ভাবতে পারে না। তারপর তার শরীরের চাহিদাটা ক্রমেই অন্যরকম চেহারা নেয়। তখন একটু-একটু করে বদল আসে। শরীরে নয়, ভাবনায়। আপনারা কি নিজেদের ভেতরে কিছু পরিবর্তন টের পাচ্ছেন?”

কিউব, হাভেন, এখন

 

“পাচ্ছিলাম।” খসখসে গলাটা ক্লান্ত শোনায়। “অন্যদের মধ্যে জিনিসটা আগেই ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ততক্ষণে আমিও টের পাচ্ছিলাম, মাথার ভেতর একটা রক্তপাগল সত্তা জেগে উঠছে। দিয়ারা-র বদলে তখন অন্য কোনো পুরুষ পাশে থাকলে আমি কীভাবে রিঅ্যাক্ট করতাম, সত্যিই জানি না। আবার, খুব শীতও করছিল। আমি ঠিক বোঝাতে পারব না…!”

“ছিল তো।”

“কিছু বললেন ডক্টর?”

“বললাম, আপনার পাশে একটি পুরুষ ছিল তো। ওই ‘জন’। আপনার তাকে নিয়ে কিছু মনে হয়নি?”

“না তো।”

“এই ‘জন’ বুড়ো বলেই কি তোমার তেমন কিছু মনে হয়নি ট্যান?”

“আসলে আপনার এগুলো সব ভুলভাল ভাবনা অফিসার। আপনি ইমপ্ল্যান্ট লাগিয়েছিলেন। ম্যাডহাউস-এ যে ইমপ্ল্যান্ট লাগানো হয়, সেই ফ্ল্যাশ লোকজনের লিবিডো বাড়িয়ে দেয়। তারা কিছুটা হিংস্র আচরণও করে। এগুলো ডকুমেন্টেড। এর মধ্যে আপনি এইসব মনগড়া গল্প, এই ‘কনস্পিরেসি থিওরি’ জুড়ছেন কেন?”

“মনগড়া গল্প ডাইরেক্টর? আমার শরীর থেকে ইমপ্ল্যান্ট বের করার পর সেটার পরীক্ষা হয়েছে এখানেই। তার ফলাফল থেকেও কি এটাই মনে হয় যে আমি এই ‘গল্প’-টা বানিয়েছি?”

“এখানে একটা ব্যাপার আছে তনয়া। যে ইমপ্ল্যান্টটা আপনার শরীর থেকে বের করা হয়েছিল সেটা থেকে প্রায় কিছুই জানা যায়নি। জিনিসটা ম্যাডহাউসের নিজস্ব লট থেকে আলাদা, এটা ঠিক। কিন্তু ওটা কী করতে পারত বা না-পারত, সেটা বোঝা যাচ্ছে না।”

“কিন্তু ডক্টর…”

“না ট্যান। খুব দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, তোমার মুখের কথা ছাড়া ওই ইমপ্ল্যান্ট দিয়ে ঠিক কী হয়, সেটা বোঝার কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই।”

“আমার মুখের কথা ছাড়াও প্রমাণ আছে কাউন্সিলর। জন আমাকে এগুলো বলেছিল। এগুলো নিশ্চয় মিলিটারির রেকর্ডে আছে। ওদের কাছ থেকে…”

খসখসে গলাটা চুপ করে যায়। মিলিটারি যে এই ধরনের অনুরোধ, এমনকি দাবিকে পাত্তাও দেবে না, সেটা বক্তার মাথায় ঢোকে।

“তাই বুঝতেই পারছেন অফিসার।” ঘ্যানঘেনে গলায় এবার আত্মপ্রসাদ চুঁইয়ে পড়ে, “আপনি কী দেখতে কী দেখেছেন, তার ভিত্তিতে কিচ্ছু করা যাবে না। আপনি বরং পুরো ব্যাপারটা হ্যালুসিনেজনিক ট্র্যান্স বলে স্টেটমেন্ট দিন। আমরা আপনার রিহ্যাবের ব্যবস্থা করব। ফুল পে। পুরো প্যাকেজ। এটাই আপনার পক্ষে সম্মানের হবে।”

“তারপর কী হবে ডাইরেক্টর?”

“কী আবার হবে? আপনি সসম্মানে নিজের কাজে ফিরে আসবেন।”

“স্টেশন থার্টিনের মতো যে স্টেশনগুলো আপনাদের হাতে আছে তাতে এরপর আর কী কী বানানো হবে?”

ট্যান, স্টেশন থার্টিন থেকে পাঁচ মিনিট দূরে, দু’দিন আগের রাত

 

“সেক্স পিস্তলস্‌!”

“কিছু বললে?”

“একটা বহু পুরোনো ব্রিটিশ পাংক রক ব্যান্ড।” মাথা দুলিয়ে বলে দিয়ারা, “মাত্র কয়েকটা গান, আর একটা অ্যালবাম। শুধু এই দিয়েই ওরা গানের জগত দুলিয়ে দিয়েছিল।”

“তো?”

“মিলিটারি আমাদের মতো মেয়েদের কিলিং মেশিন বানাতে চেয়েছিল। শরীর নিয়ে কোনো ভাবনা নেই, কোনো ভয় নেই, কোনো অনুভূতি নেই। আর তারপর…!”

ধারালো ছুরিটা ড্যাশবোর্ডের ধারের শক্ত পলিমারে বসিয়ে দেয় দিয়ারা। জনের হাত কাঁপে না, তবে আমি শিউরে উঠি। সামনের কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করি। হেডলাইটের বাইরে অন্ধকারের সমুদ্র। সেখানে বালির নীচে তলিয়ে আছে বাগান, শহর, মানুষ, যন্ত্রপাতি, একটা আস্ত সভ্যতার কঙ্কাল। মাঝেমধ্যে বালি সরে যায়। সেই হাড়গুলো বেরিয়ে আসে। কখনও রি-ইনফোর্সড কংক্রিটে গড়া কোনো বাড়ি। কখনও কোনো শিশুর পাঁজরার খাঁচা।

এই মর্বিড ভাবনা কতক্ষণ চালাতাম, জানি না। জনই মুখ খুলল এবার।

“মিলিটারির আরও অনেক গোপন প্রোজেক্টের মতো এটাও সবাই ভুলে গেছিল। কিন্তু সেই রাতের ঘটনার পর এটা আর চাপা নেই।”

“সেই রাতে ঠিক কী হয়েছিল?” দিয়ারা জানতে চায়। ওর গলাটা কি ঈষৎ জড়ানো? হতে পারে। আমার শরীরেও কী যেন একটা হচ্ছে!

“ছেলেটি তার সঙ্গিনীকে নিয়ে ম্যাডহাউস থেকে বেরিয়ে আসে। তার বন্ধুরাও ওর আশেপাশেই বেরিয়ে যায়। ছেলেটি নিজের পেন্টহাউসে ঢোকে। কিছুক্ষণ পর সেখানে একটা অ্যালার্ম বেজে ওঠে। ছেলেটি স্যাডিস্টিক। মেয়েটি সাহায্য চাইছে ভেবে, ধীরেসুস্থে, সিকিউরিটি সেখানে পৌঁছয়। দরজার কাছে গিয়ে তারা কিছু অস্ফুট আর্তনাদ শুনতে পায়। পুরুষকণ্ঠের।”

“তারপর?” আমারও গলাটা ভারী হয়ে আসছিল। সেখান থেকে মন সরানোর মরিয়া চেষ্টা করি আমি।

“সিকিউরিটি দরজা ভাঙে। ছেলেটাকে বাঁচানো যায়নি। মেয়েটা ভাঙা আয়নার কাচ দিয়ে ওর পিঠটাকে প্রায় রিবন করে দিয়েছিল। আরও কয়েকটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবস্থাও একইরকম ছিল।”

“আর মেয়েটা?”

“সিকিউরিটি অন-দ্য-স্পট মেয়েটাকে গুলি করলে ব্যাপারটা এই অবধি গড়াত না। কিন্তু ওরা মেয়েটাকে চিনে ফেলে। একটু ভয়ও পেয়ে যায়।”

“কে ছিল মেয়েটা?”

“লিয়া বাতিস্তুতা।”

কনকনে ঠান্ডা জলের শাওয়ারের তলায় ঘুমন্ত শরীরটা নিয়ে গেলে কেমন লাগে? আমার ঠিক তেমন লেগেছিল তখন। সারা শরীর কেঁপে উঠেছিল। এও মনে পড়েছিল, আমি কেন আর কীভাবে এই গোটা চক্করে জড়িয়ে পড়েছি।

“মেয়েটা কীসের যেন বিজ্ঞাপন দেয়?” দিয়ারা জানতে চাইল, “ও তো সম্প্রতি একটা রিয়্যালিটি শো-ও জিতল। বাব্বা, সে মেয়ের এই কীর্তি?”

“মেয়েটার নয়।” ঠান্ডা গলায় বলে জন, “কীর্তিটা ডে-ভি-র। একজন সিকিউরিটি গার্ড বুদ্ধি করে স্টানার দিয়ে লিয়া-কে অজ্ঞান করে দেয়। পেন্টহাউসের মালিক সিটিকর্প। খবরও তারাই আগে পায়। ক্যামেরার ফুটেজ দেখে, লিয়া-র একটা প্রাথমিক পরীক্ষা করেই সিটিকর্প দুয়ে-দুয়ে চার করে ফেলে। তারপর লিয়া-কে দ্রুত সরানো হয় স্টেশন থার্টিনে। ছেলেটার বডি ফ্রিজারে ঢোকে। তবে এ-সব যতক্ষণে জানা গেছে ততক্ষণে ছেলেটার তিন বন্ধুর অবস্থাও একই হয়েছিল।”

“সেগুলোও কি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল?”

“মিলিশিয়া আসার আগেই স্থানীয় সিকিউরিটি, বা ছেলেগুলোর সঙ্গে যারা ছিল তারা মেয়েগুলোকে মেরে ফেলে। মদ, ড্রাগস, বা ইমপ্ল্যান্ট নেওয়ার আফটার-এফেক্ট হিসেবে এই জিনিস হাভেনে আখছার ঘটে। ওই কেসগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়।”

“মেয়েগুলোর শরীরে কি এখনও ডে-ভি লাগানো আছে?”

“আছে। তবে শরীরে ডিকম্পোজিশন শুরু হয়ে মস্তিষ্কে বিশুদ্ধ রক্তের সরবরাহ বন্ধ হলে চিপগুলো ডিগ্রেড করতে থাকে। তাই পোস্ট-মর্টেমের সময় ওগুলো বের করেও কিছু জানা যাবে না।”

গাড়িটা লাফিয়ে-লাফিয়ে এগোয়। আমি ভাবতে থাকি, স্টেশন থার্টিনের দরজায় পৌঁছনোর পর আমাদের কী করা উচিত? দিয়ারাই আগে মুখ খোলে।

“আমাদের দু’জনের এবার পেছনে চলে যাওয়া উচিত। আপনি একা তাও প্রশ্নের উত্তর-টুত্তর দিতে পারবেন। আমরা তো…!”

আমিও একমত হলাম। জন-কে কিছু বলতে হল না। ও গাড়িটা থামাল। আমরা লাফিয়ে পেছনের কন্টেইনারে চলে গেলাম। ঠান্ডা মাথায় ভাবতে লাগলাম, আমাদের যখন কন্টেইনার থেকে টেনে নামানো হবে, তখন কী করব। তখনই আমার মাথায় সেই প্রশ্নটা এল, যেটা আরও আগে আসা উচিত ছিল।

কিউব, হাভেন, এখন

 

“কী প্রশ্ন?”

“জন যদি মিলিটারই লোক হয়ে থাকে তাহলে ওকে ওই স্টেশনে গোপনে কেন যেতে হচ্ছে? তাও আবার এই গাড়িটা দখল করে?”

“হুঁহ্‌!”

“কী ব্যাপার ডাইরেক্টর? আপনাকে বেশ খুশি-খুশি দেখাচ্ছে যে।”

“আরে এটা খুশি হওয়ার ব্যাপার নয়। কয়েকটা ট্র্যাজিক মৃত্যুর সঙ্গে কনস্পিরেসি থিওরি মিশিয়ে অফিসার এমন একটা গল্প বানিয়েছেন, যার মধ্যে ফাঁকগুলো এবার তিনি নিজেই উপেক্ষা করতে পারছেন না।”

“উত্তরটা কি তুমি পেয়েছিলে ট্যান?”

“হ্যাঁ কাউন্সিলর। ইনফ্যাক্ট কারণটা হাভেন মিলিশিয়ার সদর দফতরে ঢোকার মুখে লাগানো চার্টারেই দেওয়া আছে।”

“বলেন কী?”

“আপনি কি চার্টারটা কখনও পড়েছেন ডক্টর?”

“নিশ্চয়। ওটা মেনেই তো হাভেন আর তার আশপাশের এলাকায় সরকারের বিভিন্ন শাখা কাজ করে। ওটা না পড়লে কীভাবে চলবে?”

“তুমি কি বলতে চাইছ ট্যান?”

“কাউন্সিলর, ওই চার্টারটা খুব স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, হাভেন বা তার আশেপাশে মিলিটারি বা তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কোনো সংস্থা নাগরিকদের ওপর ট্রায়াল চালাতে পারবে না। ট্রায়াল তো দূরের কথা, তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই করতে পারবে না। যা করার করতে হবে কাউন্সিল আর মিলিশিয়ার মাধ্যমে। যদি কোনোভাবে এই আদেশ লঙ্ঘিত হয়, তাহলে মিলিটারি-র সেই শাখাকে শাস্তি পেতে হবে। শাস্তি মানে ফান্ডিং বন্ধ হয়ে যাওয়া। রিকভারি ডিভিশনের যে উইং এই ডে-ভির অর্ডার দিয়েছিল, তারা এরপর স্রেফ বসে যেত।”

“যদি ব্যাপারটা আদৌ জানাজানি হত।”

“এগুলো জানাজানি হয়েই যায়। এমনকি পোস্ট-মর্টেম করে পাওয়া, বা আমার গা থেকে বের করা ইমপ্ল্যান্টেও এটুকু বোঝা যাবে যে এটা ফ্ল্যাশ নয়। একবার মিলিটারি এক্সপেরিমেন্টেশনের গন্ধ পেলে আমরা, মানে হাভেন মিলিশিয়াই এটা নিয়ে কী করব বুঝতে পারছেন?”

ঘরটা আবার চুপ হয়ে যায়। ঘ্যানঘেনে গলাটাই আবার সরব হয়, তবে এবার আর তাতে ব্যঙ্গের লেশমাত্র ছিল না।

“তাহলে আপনি বলতে চাইছেন… ওই ‘জন’-এর লক্ষ্য ছিল, প্রমাণ লোপাট  করা?”

“হ্যাঁ ডাইরেক্টর।”

“কিন্তু তনয়া, আপনি, বা আপনার সঙ্গীরা তো বেঁচে আছেন। তার মানে, প্রমাণ লোপ হয়নি। আপনি চাইলে হাভেন মিলিশিয়া এই নিয়ে এখনও অনেক কিছু করতে পারে।”

“প্রমাণ লোপ মানে আমাদের মারা নয় ডক্টর। জন-এর লক্ষ্য ছিল এটা নিশ্চিত করা, যাতে স্টেশন থার্টিনের সঙ্গে রিকভারি ডিভিশনের কোনো সম্পর্ক কেউ কখনও খুঁজে না পায়।”

“সেটা সে কীভাবে করতে চেয়েছিল?”

জন, স্টেশন থার্টিন-এর গেট, দু’দিন আগের রাত

 

“ওখানেই অপেক্ষা করতে হবে তোমাকে। ক্লিয়ারেন্স না পেলে গাড়ি ঢুকবে না।” কমবয়সী গলাটা চেঁচিয়ে ওঠে। উজ্জ্বল আলোটা গাড়ির সামনের দিকের ওপর একেবারে ফোকাস ধরে রাখে। অন্য কেউ এতে চোখ বন্ধ রেখেও সর্ষেফুল দেখত। আমি অবশ্য তার মধ্যেও বুঝে নিতে থাকি অবস্থাটা।

স্টেশন থার্টিন মানে মোটামুটি আটশো স্কোয়্যার ফুটের একটা একতলা বাড়ি। এর ঠিক নীচেই আর একটা ফ্লোর আছে। ডেল্টা ভিশন এবং আরও বেশ কিছু ইমপ্ল্যান্ট সেখানেই রাখা আছে। এই স্টেশনে লোক খুব বেশি নেই। সশস্ত্র রক্ষী আছে দশজন। জনা পাঁচেক সিভিলিয়ান ছড়িয়ে আছে দু’টো ফ্লোরে।

“বুড়ো মানুষটাকে আর কত ভোগাবে? গেটটা খোলো। নইলে গাড়ি-ফাড়ি এখানেই রইল। আমার হাভেনে ফেরার একটা ব্যবস্থা করে দাও।” আমি গলাটা কর্কশ করে চেঁচাই। তিনজন রক্ষী এগিয়ে আসে। দু’জন গাড়িটাকে নিশানায় রাখে। একজন একটা কুকুর নিয়ে এগিয়ে আসে।

“গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াও।” ঠান্ডা গলাটা শুনে আমি দেরি করি না। ঝটপট নেমে আসি। তবে একেবারে সুবোধ বালক হলে সন্দেহ করবে। তাই আমি তেরিয়া মেজাজ দেখিয়ে গাড়ির নিজস্ব ট্যাবলেট আর নিজের আইডি নিয়ে এগিয়ে যাই।

“এগুলো দেখে আমাকে উদ্ধার করো হে। আমি তোমাদের বাপের চাকর নই।”

কুকুরটা কৌতূহলী চোখে আমাকে একবার দেখে শুধু। আর কিছু করে না। আমি মনে-মনে নোট করি, পরে যাই হোক না কেন, কুকুরটার যেন ক্ষতি না হয়।

“কন্টেইনারটা খোলো।” ঠান্ডা গলায় আদেশ আসে। আমি মনে-মনে আশ্বস্ত হই। এদের কাছে আমি বা এই গাড়ি বয়ে আনার লোকেরা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভালো। ওরা এই নিয়ে এখন রিপোর্ট চালাচালি করবে না।মুখে কষ্টর ভাব ফুটিয়ে কন্টেনারের দরজাটা, খুলে ধরি। কুকুরটাকে নিয়ে লাফিয়ে ওঠে রক্ষীটি। ইতিমধ্যে মেয়েগুলো মৃদু আওয়াজ তুলে নড়াচড়া করছিল। কুকুরটা তাদের একবার করে শুঁকেই পিছিয়ে গেল।

রক্ষীটি হাতের ট্যাবে মোট পাঁচটা বিন্দুর সঙ্গে পাঁচজনকে মিলিয়ে নেমে আসে। তবে আমার মনে হয়, লোকটা যা বোঝেনি সেটা কুকুরটা বুঝে গেছে। গাড়ির মধ্যে পাঁচটা মানুষ নয়, পাঁচটা অস্ত্র একেবারে ‘প্রাইমড’ হয়ে উঠছে একটু-একটু করে। দিয়ারা-র ভাষায় বলা চলে, পাঁচটা ‘সেক্স পিস্তল’ এখন ট্রিগারে চাপ পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

“তোমার সঙ্গে আরও দু’জন ছিল না?” লোকটা জিজ্ঞেস করে।

“ছিল তো।” আমি তেতো গলায় সাজিয়ে রাখা উত্তরটা দিই, “কিন্তু মিলিশিয়ার একটা গাড়ি ওদের তুলে নিয়েছে। আমাকেও স্টেটমেন্ট দিতে হবে ফিরতি পথে। কী-সব করেছে নাকি ওরা শহরে।”

“হুঁ।” লোকটার দুই সঙ্গী ততক্ষণে গাড়ির কাছে চলে এসেছিল। চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া আলোটা নিভিয়ে কম্পাউন্ড লাইটটাই শুধু জ্বলছিল। লোকটা ওই দু’জনের সঙ্গে চোখে-চোখে কথা সেরে নেয়। আমি বুঝি, ওরা “সাক্ষীর শেষ রাখতে নেই” নীতিটা এবার অনুসরণ করবে।

“মেয়েগুলো কি জেগেই থাকবে?” আমি কিছুটা দাঁত খিঁচিয়ে বলি।

লোকগুলো থমকে যায়। ম্যাডহাউস থেকে বেরোনোর আগে পুশ করা সিডেটিভের এফেক্ট কতক্ষণ থাকবে সেটা ওদের জানার কথা নয়।

“আপাতত স্টানার দিয়ে ওদের আরও কিছুক্ষণ অজ্ঞান করে রাখতে হবে মনে হচ্ছে।” পেছনে দাঁড়ানো একজন বলে ওঠে। আমি আভূমিনত হওয়ার ভঙ্গি করে ওদের উঠে যেতে বলি। প্রথমজনের সঙ্গে আরও একজন কন্টেইনারে ঢোকে। তার কোমর থেকে স্টানারটা বেরোনোমাত্র আমি চেঁচিয়ে উঠি।

“কুকুরটাকে নামিয়ে নাও! ওর যদি শক্‌ লাগে?”

আমার পাশে যে রক্ষীটি ছিল সে মাথা নেড়ে সায় দেয়, তারপর আমার দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকায়। ডগ-লাভার। একে কষ্ট দেওয়া যাবে না।

কুকুরটা গাড়ি থেকে নামে। আমি দেখে নিই, স্টেশন থার্টিন থেকে আমাদের সরাসরি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝে গাড়িটা রয়েছে। পেছনের রক্ষীটির হাতে ধরা স্টানার জ্‌জ্‌জ্‌ করে একটা আওয়াজ তুলে মৃদু নীলাভ আলো ছড়িয়ে দেয়।

আমি শক্ত গলায় বলে উঠি, “এবার!”

পুরোনো রেকর্ডিং আর ফুটেজে দেখেছি, বিষাক্ত সাপ ভালোভাবে দেখতে পাওয়ার আগেই ছোবল মারে। দুই রক্ষীর পায়ের কাছে নানা অবস্থায় থাকা মেয়েগুলো ঠিক সেভাবেই মেঝে থেকে ঠিকরে ওঠে।

কমবয়সি মেয়েটা, যাকে ওরা কেস্‌ বলছিল, সে এক রক্ষীর গলা ধরে ঝুলে পড়ে। নীচ থেকে দিয়ারা সেই নেমে আসা গলায় ছুরিটা ঢুকিয়ে দেয়।

লম্বা, কোঁকড়া চুলের মেয়েটা পা চালায় আরেকজনের হাঁটু লক্ষ করে। মেয়েটার মনে হয় মারামারি করার অভ্যাস আছে। ও অদ্ভুত নিপুণতায় আঘাত হানে দুটো জয়েন্টের মাঝে। আরেকটা মেয়ে তার অন্য পা ধরে হামলে পড়ে। লোকটা শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে। ওর পিঠের ওপর উঠে হাতের ভাঁজে লোকটার গলাটা চেপে ধরে ট্যান, তারপর সেই একই টানে মাথাটা ঘুরিয়ে দেয়।

আমি ডান দিকে দাঁড়ানো রক্ষীটির কানের ঠিক নীচে ডান হাতের আঙুলটা চালিয়ে দিই। যন্ত্রণাহীন মৃত্যু।

দশ সেকেন্ড। তিনজন। তবে এখনও এই স্টেশনে সাতটি রক্ষী আছে। তাদের অন্তত তিনজন রয়েছে গেটেই। তাদের কী ভাবে নিউট্রালাইজ করব?

ট্যান কি আর আমাকে সাহায্য করতে পারবে?

কিউব, হাভেন, এখন

 

“জানি না।”

“মানে?”

“প্রথমত, জন আমাকে ওর প্ল্যান নিয়ে কিছু বলেনি। সেটা খুবই স্বাভাবিক। ওর জায়গায় থাকলে আমিও বলতাম না। তাই এরপর যা ঘটছিল সেগুলোতে আমি, বা আমরা কেউই আগে থেকে ভেবেচিন্তে অংশ নিইনি। দ্বিতীয়ত, শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক-একটা ব্ল্যাংক স্পট তৈরি হচ্ছিল, যখন কী করছি কিছুই মনে থাকছিল না। কেমন একটা … ঝোঁকে চলছিলাম।”

“দেখেছেন? আমি আগেই বলছিলাম, অফিসার যা বলছেন সেটা মেডিকো-লিগাল গ্রাউন্ডেই বাতিল হয়ে যাবে। এই গল্পগুলো শুনে কি আদৌ কোনো লাভ আছে?”

“আপনাকে তো অফার দেওয়াই আছে ডাইরেক্টর। ইচ্ছে করলেই আপনি বেরিয়ে যেতে পারেন।”

“তুমি বলো ট্যান।”

“এক মিনিট কাউন্সিলর। দেখুন অফিসার, মিলিশিয়ার কোনো অপারেশনে আপনি অনেক স্বাধীনতা পান, স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু একটা… বেসরকারি ব্যাপারে জড়িয়ে আপনি মানুষ মেরেছেন। সেটা রেকর্ড করাও হয়েছে। এরপর কী হবে ভেবে দেখেছেন?”

“আমার চাকরি যাবে। কম্যান্ডার আমাকে এই কাজে পাঠানোর কোনো রেকর্ড রাখেননি। তাঁকে এর মধ্যে আমি জড়াতে চাইও না। মিলিটারি হয়তো আমাকে খুঁজছে শিক্ষা দেওয়ার জন্যই। এমনকি আপনারাও, কিছু মানুন বা না-মানুন, আমার সঙ্গে হিসেব বরাবর করার সুযোগ খুঁজবেন।”

“আপনি যা বলছেন তাতে তো আপনার ভেঙে পড়া উচিত তনয়া। কিন্তু…”

“ঠিক ধরেছেন ডক্টর। আমি একটা জিনিস বুঝে গেছি।”

“কী?”

জন, স্টেশন থার্টিন-এর গেট, দু’দিন আগের রাত

 

“আমার হিসেব মতো এখনও সাতজন সশস্ত্র রক্ষী আছে এই ফেসিলিটিতে। তবে ওরা আপনাদের চেনে না।” মেয়েগুলো আমার ইশারা বুঝে অতি দ্রুত রক্ষীদের শরীর থেকে জ্যাকেট আর আর্মার খুলে নিচ্ছিল। আমি থেমে-থেমে কথা বলে ওদের সংযত রাখার চেষ্টা করছিলাম, “অর্থাৎ আপনারা যে কী করতে পারেন সে সম্বন্ধে ওদের কোনো ধারণা নেই। আমাদের সেই সুযোগটাই নিতে হবে।”

“আমরা তিনজন কিছুক্ষণের জন্য ওদের ঠকাতে পারব। কিন্তু তারপর?” ট্যানের গলাটা ঘন শোনায়। কিন্তু ওর চোখ অন্ধকার কন্টেইনারের মধ্যেও জ্বলে ওঠে। আমি ডানদিকে মাটিতে বসে থাকা কুকুরটার দিকে তাকাই। বুদ্ধিমান প্রাণী। কুকুরটাও আমার দিকে কৌতূহলী হয়ে তাকায়। আমি অতি সংক্ষেপে ব্যাপারটা মেয়েগুলোকে বুঝিয়ে দিই।

ট্যান, দিয়ারা, আর ওই লম্বা মেয়েটার শরীর সাময়িকভাবে আর্মারের আড়ালে ঢাকা পড়ে। ওরা নেমে আসে। একজন ব্লাস্টার তুলে একটা ফায়ার করে। আমি ধপাস্‌ করে পড়ে যাই। পড়াটা এমনই হয় যাতে সেটা স্টেশনের রক্ষীরা দেখতে পায়।

ট্যান হাত নেড়ে ভেতর থেকে আরও রক্ষী পাঠানোর ইঙ্গিত করে। স্বাভাবিক আচরণ। পাঁচটা জীবন্ত শরীরের ভার পাঁচজন নিলে তাদের ভেতরে নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ হয়। স্টেশনের দরজা খুলে যায়। আরও দু’জন রক্ষী বেরিয়ে গাড়িটার দিকে আসে।

আমি বুঝি, কেন ওরা এখনও তেমন কিছু বুঝতে পারেনি। কুকুরটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছে! একটা প্রশিক্ষিত কুকুরের পক্ষে এই আচরণ অস্বাভাবিক। তবে ওরা তো দূরের কথা, কুকুরটাও জানে না, একটা বিশেষ সাবসনিক ওয়েভ বেরিয়ে আসছে আমার কোমরে লুকোনো একটা যন্ত্র থেকে। এই শান্ত ভাব ওই যন্ত্রেরই কামাল। মেয়েগুলোর ওপর এটা চালানো যাবে না। ডে-ভি-র সঙ্গে কোনোরকম ইন্টারফিয়ারেন্স ঘটলেই সেটা ওরা বুঝতে পারবে। তাছাড়া মেয়েগুলোকে আমার এখন দরকার। এই অবস্থাতেই।

দু’জন রক্ষী কাছে এগিয়ে আসে। ইতিমধ্যে দিয়ারা একটা লাথি মেরে আমার শরীরটা কিছুটা সরিয়ে দেওয়ার ভাব করে। আমি গড়িয়ে গাড়ির তলায় ঢুকে যাই। তারপর খুব কম সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাই ড্রাইভারের সিটের ঠিক নীচে। এককালে এই ট্রাকগুলোর সঙ্গে ভালোই আলাপ-পরিচয় ছিল। জানতাম, ড্রাইভারের সিট নীচ থেকে ঠেলে সরানো যায়। সেটা করে আমি উঠে আসার ঠিক আগের অবস্থায় ঝুলে থাকি।

প্রথম শট্‌ নেয় নতুন আসা একটি রক্ষী। সে নিশ্চয় ‘নকল’ রক্ষীদের ছদ্মবেশ দেখে খুশি হয়নি। এত কাছ থেকে ব্লাস্টারটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ট্যান কোত্থেকে জানি একটা মিলিশিয়া টাইপের ব্যাটন জোগাড় করেছিল। সেটা ও ইতিমধ্যেই ছুড়ে দিয়েছিল রক্ষীটির মাথা তাক করে। ফলে ব্লাস্টারটা সরে গেছিল।

আমি কুকুরটার আর্তনাদ শুনতে পাই।

বিশ্বাস করুন, আমার মধ্যে রক্ততৃষ্ণা ব্যাপারটা নেই। মানে থাকা সম্ভবই নয়। কিন্তু সেই আমার মাথাতেও শর্ট সার্কিট হয়ে গেল ওই আর্তনাদ শুনে। পঞ্চকন্যার কী অবস্থা হয়েছিল তা সহজবোধ্য।

সেকেন্ডের ভগ্নাংশে আমি ওপরে উঠে ড্রাইভারের সিটে বসে পড়ি। এখানে আসার পথটুকু গাড়ির কম্পিউটারের সঙ্গে আলাপ-বিলাপে কাটিয়েছিলাম। তাই এবার সে বায়োমেট্রিক্স ইত্যাদি নিয়ে হাঙ্গামা করল না। ইঞ্জিন গর্জে উঠল।

দেখে নিয়েছিলাম, দুই রক্ষীর শরীরেই গর্ত করে দিয়েছে ব্লাস্টার। গাড়ি চালু হয়েছে শুনেই নিশ্চয় মেয়েগুলো বুঝেছিল কী ঘটতে চলেছে। ওরা ঝাঁপিয়ে উঠে পড়েছিল গাড়িতে।

সামনের স্টেশন থার্টিন থেকে ততক্ষণে ব্লাস্টারের শিখা আছড়ে পড়ছে ট্রাকে। আমার সামনের কাচটা উড়ে গেল। পাশের ফাঁকা সিটটাও গলে গেল। আমি এক ঝলকে পেছনটা দেখলাম বাঁদিকের ভিউ-ফাইন্ডারে। রক্ষীদের শরীর নয়, আমার নজর চলে গেল কংক্রিট দিয়ে বানানো চাতালের দিকে, যেখানে কুকুরটার ছিন্ন শরীরটা পড়ে ছিল। ব্লাস্টারের তোয়াক্কা না করে ডানদিকে ঝুঁকে পড়লাম। বেল্ট থেকে কয়েকটা ছোটোখাটো জিনিস বের করে গাড়ির সামনে পলি অ্যাডেসিভ দিয়ে আটকে দিলাম। তারপর দরজা খুলে ঝাঁপ দিলাম বাইরে।

ট্রাকটা স্টেশন থার্টিনের গেটের ওপর আছড়ে পড়ল। পরমুহূর্তেই উড়ে গেল স্টেশনের গেট আর ট্রাকের সামনের অংশটা।

ট্যান, স্টেশন থার্টিন, দু’দিন আগের রাত

 

শরীরের ভেতরে দুটো ঝড় একসঙ্গে চলছিল। একটা মারাত্মক রক্ততৃষ্ণা আমার চোখের সামনে একটা লাল পর্দা নামিয়ে আনতে চাইছিল। আবার আগুন, ব্লাস্টারের ঝলক, শেষে একটা মারাত্মক বিস্ফোরণে ট্রাক প্রায় উলটে যাওয়া… এ-সবে অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াডে কাজ করার ট্রেইনিং ফিরে আসছিল। মনে পড়ে গেল, জন বলেছিল “ওরা আপনাদের চেনে না।”

এটা কাজে লাগানো যাক।

আমার সঙ্গীদের অবস্থা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি। যারা আমার মতো আর্মারের আড়ালে ছিল তারা খুব একটা টসকায়নি। কিন্তু অন্য দু’জন অক্ষত নয়। কেস্‌… না কস্তুরীর মাথা ফেটে রক্ত পড়ছে। অন্য মেয়েটা বিকৃত মুখে পা দেখিয়ে বলল, “বোধহয় ভেঙেছে। ওই নিয়ে ভেবো না। তোমরা যাও।”

কোথায় যাব?

কন্টেইনারের আশেপাশে ধোঁয়া আর আগুনের একটা বলয় তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে বেরিয়ে দেওয়ালের কাছে চলে যেতে পারলে আমাদের তিনজনকে অন্তত চট্‌ করে আলাদা করা যাবে না। তাহলে সেটাই করা যাক। আশেপাশের চিৎকার আর এলোপাথাড়ি আওয়াজ শুনে বুঝলাম, ঠিক কী ঘটছে সেটা ওরা কেউ বুঝতে পারছে না। বিশৃঙ্খলার সুযোগটা নিয়ে কদ্দূর এগোনো যাবে?

আমিই আগে গাড়ি থেকে নেমে গড়িয়ে গাড়ির নীচে ঢুকে গেলাম। সামনের দিকটা জ্বলছে। আগুন পেছনেও এসে যাবে খুব তাড়াতাড়ি। আপাতত সে-সব ভাবার উপায় নেই। পাশের উইঙে একটা ঘরের মাথার ওপর একটা ছোট্ট কিন্তু শক্তিশালী ডিশ ছিল। মাথার মধ্যে হিসেবটা মিলে যায়। মাটির নীচ থেকে আমাদের ইমপ্ল্যান্ট মনিটর করা সম্ভব নয়। তার জন্য মাটির ওপরে একটা অবজার্ভেশন পয়েন্ট চাই। তাহলে ঐ ঘরটাই…

পুরো ফোর্স দিয়ে ব্লাস্টার ফায়ার করি ঘরের দরজা নিশানা করে। জন যা বলেছিল সেই অনুযায়ী এই স্টেশনের নীচের ফ্লোরটা হয়তো শক্তপোক্ত করে বানানো। কিন্তু ওপরের অংশটা তেমন টেকসই নয়। আমার প্রথম শটেই দরজাটা উড়ে যায়। ভেতরে লোকজন আর্তনাদ করার আগেই আরও দু’বার ফায়ার করি। বিকট আওয়াজ পাই। বেশ কয়েকটা স্ক্রিন আর প্যানেলে লাফিয়ে ওঠে হলদেটে কমলা শিখা। আমি গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি।

দু’জন রক্ষী আমার দিকে ব্লাস্টার তুলেছিল। কিন্তু আমাদের তরফ থেকে দু’টো শট তাদের শুইয়ে দেয়। মাথার মধ্যে, যেন কোনো অদৃশ্য কাউন্টারে সংখ্যাগুলো জ্বলে ওঠে। সাতজন খতম। তিনজন বাকি।

একটা শিখা আমার হাত ছুঁয়ে যায়। এমনিতে তাতেই হাতটা জ্বলে বা কেটে যাওয়ার কথা। তবে আর্মার ছিল বলে শুধু একটা পোড়া দাগ হয়। আমি অবশ্য ব্যথা বা জ্বালা অনুভব করার সময়টাও দিইনি। না তাকিয়েও বুঝে গেছিলাম কোথায় রয়েছে রক্ষীটি। সেদিকে আরও দু’বার ফায়ার করি। ফাঁকা হয়ে যাওয়া ব্লাস্টারটা এক দিকে ছুড়ে দিই। ভারী আর্মার খুলে ছড়িয়ে দিই এদিকে-ওদিকে। তারপর করিডর ধরে প্রাণপণে ছুট লাগাই তার শেষ প্রান্তের দিকে। নীচে নামার রাস্তা ওদিকেই থাকবে।

দরজা খোলার জন্য নিশ্চয় পাসওয়ার্ড বা কোড লাগবে। সেগুলো কোত্থেকে পাব? জানি না। অন্য দু’জন রক্ষীর মোকাবিলাও ক্ষিপ্রতা আর বুদ্ধি দিয়েই করতে হবে। কিন্তু…

জন কোথায়?

 

কিউব, হাভেন, এখন

 

“প্রশ্নটা নিয়ে মাথা ঘামাবার উপায় ছিল না। বেশ বুঝতে পারছিলাম, আমার এই নড়াচড়ার সময়টার মধ্যেই ছোটো ছোটো বেশ কিছু ব্ল্যাংক স্পট তৈরি হয়েছে যখন আমি পিওর রিফ্লেক্সে যা করার করছি।”

“শুধু কি রিফ্লেক্স?”

“কী?”

“আপনার কথা শুনে একটা অদ্ভুত জিনিস বুঝতে পারছি তনয়া। আপনার সঙ্গীরা কোনোভাবে, পূর্বপরিচয় ছাড়া, ইয়ারপিসের মাধ্যমে যোগাযোগ না রেখেও আপনার কাজের সঙ্গে কো-অর্ডিনেট করছিল। তাই না?”

ঘরটা বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকে। তারপর খসখসে গলা বলে ওঠে, “হ্যাঁ। কিন্তু তাতে কী?”

“আর আপনিও তো ওই মেয়েগুলো আপনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রেসপন্ড করছে কি না, এই নিয়ে ভাবেনইনি। তাই না?”

“হ্যাঁ।”

“এটা কি অস্বাভাবিক নয়? আপনার একটা ট্রেইনিং আছে। অভিজ্ঞতা আছে। বিশেষ অবস্থায় আপনার মাথা কাজ না করলেও আপনার শরীর আপনাকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেবে। কিন্তু ওই মেয়েগুলো তো পাক্কা সিভিলিয়ান ছিল। একেবারে আনট্রেইনড। তাদের সঙ্গে আপনার এই নিঃশব্দ যোগাযোগ কীভাবে হচ্ছিল?”

“আপনি কী বলতে চাইছেন ডক্টর?”

“আপনিই বলুন না কাউন্সিলর। কীভাবে তনয়ার সঙ্গে বাকি মেয়েগুলো এমন অদ্ভুত ‘ছন্দ’ বজায় রাখছিল?”

“কয়েক মিনিটের অ্যাকশনের ভিত্তিতে কিছু বলা যায় না। তখন গাড়িটা জ্বলছে। ওদের উদ্দেশেই ব্লাস্টার ফায়ার করা হচ্ছে। এই অবস্থায় যা করার সেটা তো একসঙ্গেই করা হতে পারে। তার জন্য তো ভাবনাচিন্তাও করতে হয় না।”

“শুধু কি ওই ক’টা মুহূর্ত?”

“মানে?”

“আপনি কি কিছু জানেন ডক্টর?”

“আপনি ভুলে যাচ্ছেন তনয়া, আমি চিফ অ্যানালিস্ট। ডিফেন্স। এই ধরনের কাস্টমাইজড চিপ বা ইমপ্ল্যান্ট দিয়ে, অন্তত থিওরিটিক্যালি কী করা যায়, সেটা আমি জানি। যাকে আপনি ডে-ভি বলছেন সেটা নিয়ে আমার জ্ঞান কম। তবে আপনারা পাঁচজন বোধহয় একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা হয়ে গেছিলেন তখন। আমি কি ভুল বললাম?”

“না। কিন্তু…”

“আপনি বলুন। তারপর কী হল?”

জন, স্টেশন থার্টিন, দু’দিন আগের রাত

 

ট্রাকে কী হচ্ছে, সেই নিয়ে ভাবার উপায় আমার ছিল না। খুব দুঃখের সঙ্গেই স্বীকার করি, লিয়া বা অন্য মেয়েদের নিয়ে আমি ভাবিনি। আমার লক্ষ্য ছিল স্টেশন থার্টিনকে যথাসাধ্য তুবড়ে দেওয়া। বিরাট বিস্ফোরণে যখন গেট উড়ে যাচ্ছে, তখন আমি শুধুই একটা ফাটল খুঁজছিলাম ওদের ডিফেন্সে। কিন্তু ট্যান সেটা আমার চেয়েও তাড়াতাড়ি পেয়ে গেল। মনিটরিং রুম আয়ত্তে নিয়ে আমি নীচে নামার দরজাটা খোলার কথা ভাবছিলাম। আমার সামনেই সেটা ট্যানের ব্লাস্টারের দাপটে পিন্ডি হয়ে গেল!

আমি প্ল্যান বি চালু করলাম।

ডানদিকের উইং-এ দু’জন, আর মনিটরিং রুমের বাইরে একজন। এই তিনজন রক্ষীকে আমার সামনেই ট্যান আর ওর সঙ্গীরা পেড়ে ফেলল। তারপর আর্মার পরা দু’জন ট্যানের পেছন-পেছন ছুটল।

আমার কাজের মানুষ অবশ্য হাতের কাছেই ছিল।

কেস্‌।

ওর মাথা ফেটেছিল। অন্যজনের পা ভেঙেছিল। জ্বলন্ত গাড়ি থেকে আমি দু’জনকেই টেনে-হিঁচড়ে নামালাম। তারপর ডানদিকের উইঙে একটা ঘরে ঢুকলাম। স্কিমাটিক্স অনুযায়ী এই ঘরটার ঠিক নীচেই মনিটর আর নানা ইনস্ট্রুমেন্টের সঙ্গে তারের বাঁধনে যুক্ত হয়ে আছে একটা জীবন্ত কিন্তু অজ্ঞান শরীর।

লিয়া বাতিস্তুতা! যার সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় আমি জানি।

ট্যান বোঝেনি। কিন্তু ডেল্টা ভিশন ইমপ্ল্যান্ট যদি শুধুই খুনের নেশা ধরাত, তাহলে তাই নিয়ে মিলিটারি কী করবে? মিলিটারি এমন জিনিস চায় যাতে একঝাঁক সাইকোপ্যাথ পারফেক্ট টিম হিসেবে কাজ করবে। সুদূর অতীতের প্রোজেক্ট এম.কে. আলট্রা থেকে আরও অজস্ব গোপন প্রোজেক্ট মানবমনের এই দেহাতীত সংযোগ পদ্ধতির নাগাল পেতে চেয়েছে। সেই জিনিসটা পেরেছে শুধু ডে-ভি! শর্ত একটাই। খুনের নেশা জেগে উঠেছে এমন মেয়েদের মোটামুটি কাছাকাছি থাকতে হবে। তাহলে হাওয়ায় ভেসে যাওয়া নানা রাসায়নিকের কাঁধে চেপে, স্মৃতির ট্রিগার কাজে লাগিয়ে ডে-ভি একটা নিজস্ব নিউর‍্যাল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে।

লিয়া টিন-এজার। তার শরীর ইচ্ছেয়-অনিচ্ছেয় প্রতিনিয়ত তৈরি করে চলেছে অজস্র ভাবনা আর আবেগের ছটা। আমার সঙ্গে আছে আরেক টিন-এজার। রক্তমাংসের শরীরে তারা কথাই বলবে না হয়তো। মারামারিও করতে পারে। কিন্তু তাদের শরীরের আর অনুভূতির সংকেত কথা বলবে এক ছন্দে, এক তালে। আমি কেস্‌-এর মাথার যথাসাধ্য পরিচর্যা করি। তারপর ওকে পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলি, “লিয়া-কে ডাকুন। বলুন, ওর সাহায্য দরকার আমাদের। নইলে দরজা খোলা যাবে না।”

এক বাক্যে রাজি হয় মেয়েটা। ও মনঃসংযোগ করে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে। আমি শান্ত হয়ে অপেক্ষা করি নীচে নামার সিঁড়ির মুখের দরজাটা খুলে যাওয়ার।

ট্যান, স্টেশন থার্টিন, দু’দিন আগের রাত

 

দরজাটা পুরু স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি, তাই ভাঙা যাবে না। বিপদের খবর নিঃসন্দেহে পেয়ে গেছে নীচের রক্ষীরাও। তবু আমাদের কাছে রাস্তা একটাই। কোনোভাবে নীচের লোকেদের বাধ্য করতে হবে ওপরে উঠে আসতে।

“আগুন লাগানো যাবে?”

লম্বা মেয়েটা বলে উঠল। আমি দ্রুত ভাবতে চেষ্টা করি, কীভাবে সেটা করা সম্ভব। নীচটা এমনিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তবে…

“এয়ার-ডাক্ট! ওগুলো দিয়ে আমরা নীচে ঢুকতে পারব না। তবে অন্য কিছু কি করা যাবে?” দিয়ারার কথা শোনামাত্র আমার মাথায় একটা প্ল্যান তৈরি হয়। মেঝেতে আঙুল বুলিয়ে ব্যাপারটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিই।

এয়ার-ডাক্ট মূল বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে, মাটি থেকে উঠে থাকে। মরুভূমিতে সেটা ক্যামোফ্লাজ করার মতো জিনিস খুব বেশি নেই। তার ওপর দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলছিল বলে তখন আশেপাশে অনেকদূর অবধি দেখা যাচ্ছিল। জানতাম ওরা সেটা খুঁজে পাবে।

“তারপর?”

“এয়ার-ডাক্টে যাতে বালি না ঢোকে সেজন্য তার মুখে একটা জাল থাকে। তার পেছনে থাকে বড়ো-বড়ো ব্লেডওয়ালা একটা বা একাধিক ব্লোয়ার। যদি সেগুলো কোনোভাবে জ্যাম করে দেওয়া যায়, নীচের ঘরগুলোয় যারা আছে তারা চাপে পড়বে। ওগুলো কি তোমরা থামিয়ে দিতে পারবে?”

আমার দুই সঙ্গী মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বুঝিয়ে পেছনদিকে ছোটে। আমি অপেক্ষা করি দরজাটার পাশে। তবে একটা প্রশ্ন তার মধ্যেও মাথায় ধাক্কা মারে।

জন কোথায়? কী করছে ও?

জন, স্টেশন থার্টিন, দু’দিন আগের রাত

 

আমার হাত খালি ছিল না। রক্ষীদের শরীর থেকে ব্লাস্টার এবং অন্য যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র জোগাড় করছিলাম আমি। এর মধ্যেই হঠাৎ দেখলাম, দুদ্দাড় করে করিডর থেকে বেরিয়ে এল ট্যান-এর দুই সঙ্গী। তারপর, আমাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দু’জন দু’দিকে দৌড়ল। আমি কৌতূহলী চোখে তাকালাম পায়ে চোট পেয়ে বসে যাওয়া মেয়েটার দিকে। জানতাম, ও জানে এই দৌড়ঝাঁপের কারণ।

“ওরা এয়ার-ডাক্ট জ্যাম করতে চাইছে।”

মনে-মনে তারিফ করি আইডিয়াটার। এটা খেটে গেলে আমি যেটা করতে চাইছি সেটা আরও ভালোভাবে করা যাবে। কেস্‌ নিজের মতো লড়ে যাক। আমি বরং এই মেয়েটাকেই কাজে লাগাই।

“তোমাকে ওদের সাহায্য করতে হবে।”

মেয়েটা কোনো তর্ক-বিতর্ক না করে নিজের পায়ের দিকে তাকায়। আমি ডাক্তার নই, তবে এতদিন ধরে ফিল্ডে থাকার সুবাদে কিছু জ্ঞান তো হয়েছে। যে সেরামিকের প্লেটটা দিয়ে ড্রাইভারের ব্যবস্থা করেছিলাম, সেটাই বের করি। বেল্টের নীচ থেকে বের করা একটা কর্ড দিয়ে সেটা টাইট করে বেঁধে দিই মেয়েটার পায়ে। ডে-ভি মেয়েটার ব্যথার অনুভূতি কিছুক্ষণের জন্য চাপা দিয়ে দিয়েছিল। ও সাবধানে উঠে দাঁড়ায়।

“ওদের কাছে রয়েছে দুটো ব্লাস্টার। ওই দিয়ে হবে না। তাছাড়া ডাক্ট খুঁজতে ওদের সময় লাগবে। আমি আপনাকে লোকেশন বুঝিয়ে দিচ্ছি। আপনি ওদের কাছে যান। সম্ভব হলে ওদের খবর পাঠান। বলুন বাইরে পড়ে থাকা রক্ষীদের লাশগুলো ছেঁচড়ে বা বয়ে ওই ডাক্টের কাছে নিয়ে যেতে।”

“লাশগুলো দিয়ে কী হবে?”

আমি সংক্ষেপে ডাক্টের লোকেশন বুঝিয়ে দিই। তারপর ওর হাতে তুলে দিই কয়েকটা জিনিস। আবার বলি, “খুব সাবধান। সরাসরি এগুলো ছুড়ে দিলে ইমপ্যাক্ট জায়গা-মতো নাও হতে পারে। সেজন্যই রক্ষীদের কোমরে এগুলো গুঁজে বডিগুলো ফেলতে হবে।”

“নইলে?” মেয়েটার চোখ দেখে বুঝি, স্বাভাবিক ভয়, উদ্বেগ, সংশয়ের বদলে ওর মধ্যে ইতিমধ্যেই জেগে উঠেছে একেবারে অন্যরকম কেউ।

ডে-ভি!

“যদি এই এক্সপ্লোসিভ ব্লেডের ফাঁক দিয়ে নীচে চলে যায়, তাহলে নীচে আগুন ছড়িয়ে যেতে পারে। সেটা হলে লিয়া-র ক্ষতি হবে। কিন্তু বডিতে গুঁজে ফেললে সেগুলো প্রথমে জালে, তারপর ব্লেডে আটকাবে। তারপর সেগুলোই উড়বে।”

মেয়েটা ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে বেরিয়ে যায়। আমি তাকিয়ে দেখি, কেস্‌-এর কপালে জমে উঠেছে বিন্দু-বিন্দু ঘাম। তবে ওর মুখে একটা অদ্ভুত হাসি খেলা করছে। যেন… যেন ও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে। যেন ও তার সঙ্গে কথা বলছে।

লিয়া বাতিস্তুতা!

কিউব, হাভেন, এখন

 

“আপনার মোটিভ কী ছিল তনয়া?”

“মোটিভ! মানে?”

“ওই ‘জন’ স্টেশন থার্টিনে সাবোটাজ করার চেষ্টা করছিল। বাকি মেয়েগুলো সিভিলিয়ান, তার ওপর তখন ইমপ্ল্যান্ট-লাগানো অবস্থায় ছিল। ওরা সাজেশনে রেসপন্ড করছিল মাত্র। কিন্তু এইভাবে একটা ফেসিলিটিতে ঢোকা, তারপর সেখানে খুনখারাপি চালানো… এবং পুরোটাই অফিসিয়াল ম্যান্ডেটের বাইরে! আপনি এগুলো কেন করছিলেন?”

“যদি বলি, মুক্তির আশায়?”

“ননসেন্স! যদি ধরেও নিই যে আপনাদের কেউ অপহরণ করেছিল, তাহলেও তো ব্যাপারটা জাস্টিফায়েড হয় না। যখন গাড়ি থামল, তখন আপনি মেয়েগুলোকে নিয়ে হাভেনে ফিরে এলেন না কেন?”

“আহ্‌! ওই ‘জন’ ওকে বলল, শোনেননি? যদি ইমপ্ল্যান্ট ওখানে গিয়ে বের না করা হয়, তাহলে গোলমাল হতে পারে?”

“কাউন্সিলর, ওটা যে ভুলভাল কথা ছিল, সেটা তখনও বুঝেছিলাম। তবে সেই মুহূর্তে মাথায় আগুন জ্বলছিল বলে রাজি হয়েছিলাম স্টেশন থার্টিন যেতে। ভেবেছিলাম, অজ্ঞানের ভান করে ভেতরে ঢুকে যাব। তারপর আমাদের যারা তুলে এনেছে, তাদের একটু শিক্ষা দেব।”

“আর তারপর?”

“তারপর লিয়া-র ব্যাপারটা মনে পড়ল। খেয়াল হল, ওকে উদ্ধার না করলে আমার অ্যাসাইনমেন্ট পুরো হবে না।”

“আর…?”

“তখন পিছিয়ে আসার কথা ভাবতে পারছিলাম না ডক্টর। ভাবনাগুলো… কেমন যেন… অন্যরকম হয়ে গেছিল। ট্যাক্টিকাল ভাবনা যেটুকু মাথায় আসছিল, তার শেষেও ছিল একটাই লক্ষ্য।”

“আত্মরক্ষা?”

“কর্তব্য?”

“রাগ?”

“আপনার উত্তরটাই ঠিক ডাইরেক্টর। একটা অদ্ভুত রাগ আমার শরীরটাকে শিথিল হতে দিচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, যতক্ষণ না…”

জন, স্টেশন থার্টিন, দু’দিন আগের রাত

 

যতক্ষণ না দরজা খুলছে, ততক্ষণ আমরা অসহায়। এই ডেড জোনেও স্যাটেলাইট মারফৎ নজরদারি চলে। যদি আসল জায়গায় খবরটা পৌঁছয়, তাহলে এক-আধটা আর্মার্ড ডিভিশন এদিকে চলে আসতে পারে। কিন্তু কীই বা করা যায়?

তখনই বিস্ফোরণের শব্দ কানে ভেসে আসে কিছুটা দূর থেকে। একটা, তারপর একের-পর-এক। পায়ের তলায় কাঁপুনি টের পাই আমি।

পেরেছে! ওরা পেরেছে মনে হচ্ছে।

“নীচে কিছু একটা হচ্ছে।” হঠাৎ কেস্‌ কথা বলে ওঠে, “লিয়া বলছে, ও আমাদের সাহায্য করতে চায়।”

“এক্সেলেন্ট!” আমি ঝটপট নিজের সঙ্গে থাকা বাকি বিস্ফোরক আর অন্য অস্ত্র গুছিয়ে নিই, “ওকে বলো, কোনোভাবে ভান করতে হবে, যেন ও মারা যাচ্ছে। এয়ার-ডাক্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নীচে বাতাস চলাচল করতে পারছে না। সবাই ভাববে, তার ফলেই এটা ঘটছে। ওরা মনিটর আর প্যানেল থেকে ওকে আলাদা করে নিলে তবে বাকি কাজ।”

জটিল নির্দেশ কি এই ‘পদ্ধতিতে’ দেওয়া যায়? জানি না। তবে কেস্‌ আমার কাজটা করে দেয়। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “এবার আমরা কী করব?”

আমি গেটের দিক থেকে পায়ের শব্দ পাই। আর্মার পরা মেয়েদুটো, আর তাদের কাঁধে ভর দেওয়া তৃতীয়জন আবার ঢোকে। ওরা আমার দিকে তাকায় না, বরং এগিয়ে যায় করিডর ধরে সিঁড়ির দিকে। টের পাই, উঠে ওদের দিকেই ছুটে গেছে কেস্‌।

ডে-ভি নেটওয়ার্ক কাজ করছে! ওই পঞ্চকন্যা আর লিয়া এবার নিজেদের মতো করে অপারেট করবে। আমাকে ওরা উপেক্ষা করবে। তবে তার দরকারও নেই। আমিও নীচে নামব এখন, অন্য পথে।

ট্যান, স্টেশন থার্টিন, দু’দিন আগের রাত

মাথার মধ্যে কয়েকটা ছবি তৈরি হচ্ছিল। ক্যামেরায় দেখা বা ক্যানভাসে আঁকা জমাট ছবি নয়। বরং কয়েকটা দাগ, কিছু শব্দ, লাল-কালো-নীল রঙের দলা দিয়ে তৈরি কয়েকটা দৃশ্যের আভাস বলা চলে ওদের। তাতেই দেখতে পাচ্ছিলাম, নীচে কী হচ্ছে।

তীব্র আওয়াজ তুলেছিল লিয়া-র শরীরে লাগানো একটা যন্ত্র। তারপর স্ক্রিনে ওঠানামা করা ধারালো রেখাটা হঠাৎ সরলরেখার আকার নিয়েছিল। বুঝতে পারছিলাম, নীচে ছোটাছুটি হচ্ছে।

লিয়া-কে কি সরিয়ে একটা অন্য টেবিলে তোলা হল? হ্যাঁ, ওরা এবার ইমপ্ল্যান্টটা বের করবে ওর শরীর থেকে। কিন্তু তাহলে তো…

দুম্‌!

হলুদ একটা ঝলক দেখি আমি। না, শুধু আমি নই, আমরা সবাই। কখন যে আমার পেছনে বাকি চারজন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালও করিনি! কিন্তু আমরা সবাই পিছিয়ে যাই মনের চোখে ওই ঝলক দেখে।

“আগুন লাগল মনে হচ্ছে!” লম্বা মেয়েটা, পরে নাম জেনেছিলাম ‘পুশকিন’, রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠল, “না কি কিছু ফেটে গেল?”

“মাল্টিপল কেবল বক্স শর্ট হয়েছে!” যে মেয়েটার পা ভেঙেছিল সে বলে এবার। আমরা সবাই ওর দিকে তাকাই। মেয়েটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, “আমি কনপাও-এ কাজ করি। এগুলো আমার জানা।”

কনপাও! কনসলিডেটেড পাওয়ার। লিয়া-র বাবা, মানে মিস্টার বাতিস্তুতাও ওখানে কাজ করেন। লিয়া নিশ্চয় এই বিষয়ে কিছু খোঁজখবর রাখে। ও কিছু একটা করেছে। কিন্তু কী করেছে ও?

সামনের ভারী স্টিলের পাতটা সরে যেতে থাকে তখনই।

চাপ-চাপ ধোঁয়া, আগুনের হলকা, চিৎকার… এ-সবের মধ্যেই কেউ আমাদের দিকে ব্লাস্টার ফায়ার করে। আমরা তৈরি ছিলাম। দিয়ারা আর পুশকিন গুঁড়ি মেরে ভেতর দিকে পরপর ফায়ার করে। থেমে-থেমে। আমি লাফিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকেই একদিকে গড়িয়ে যাই। তারপর ছুটতে শুরু করি একটা বিশেষ দিক লক্ষ্য করে, যেখানে তখনও টেবিলে শুয়ে আছে লিয়া। মনের দিক দিয়ে মেয়েটা কীভাবে এগুলো করতে পারল জানি না। তবে শরীরের দিক দিয়ে ও বোধহয় নড়াচড়া করার অবস্থায় নেই। তবে হ্যাঁ, মনিটরের স্ক্রিনে রেখাটা স্থির হয়ে গেলেও আমরা সবাই জানতাম, ও বেঁচেই আছে।

হঠাৎ একটা তীব্র ঝাঁকুনি খাই আমি। পড়ে যেতে-যেতে নিজেকে সামলাই। মাথা কেমন একটা অন্যরকম পদ্ধতিতে কাজ করছিল তখন, জানেন! আমি সেকেন্ডের ভগ্নাংশে বুঝে ফেলি কী হয়েছে। কেউ আমাকে শক্‌ দিয়েছে। হাই ভোল্টেজের, তবে সেটা প্রাণঘাতী লেভেলে পৌঁছয়নি। তাতেও আমার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমি জ্ঞান হারাইনি। বরং একদম সাদা চোখে দেখলাম, অ্যাপ্রন পরা একটা লোক আমার দিকে ছুটে আসছে। লোকটার হাতে গরু-মোষ দাগানোর মতো একটা রড, যার সামনের দিকে তখন কাঁটাগাছের মতো ঝলসাচ্ছে নীল বিদ্যুৎ।

আমি কিছুই ভাবিনি। ভাবতে হয়ইনি। কখন যে পাশের টেবিলে রাখা একটা ফ্লাস্ক আমার নজরে পড়ল, কীভাবে যে সেটা আমি তুলে নিলাম, আর কখন সেটা ছুড়ে দিলাম লোকটার দিকে… এ-সব কিচ্ছু আমার খেয়াল নেই। কয়েকটা ঝলক, কয়েকটা বিন্দুর মতো দৃশ্য শুধু মনে আছে। লোকটা পড়ে গেছিল। আমি অনেকদিন নাচিনি। তবে সেই মুহূর্তে বোধহয় নাচের পোজেই আমি সোজা হয়ে ওই রডটা লুফে নিয়েছিলাম। তারপর ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম ওর এক চোখে। খুব একটা কষ্ট পাওয়ার কথা নয়। ওইরকম ভোল্টেজ ওর মাথার ভেতরটা ফ্রাই করতে কয়েক সেকেন্ড নিয়েছিল বড়োজোর।

যন্ত্রণার একটা তীব্র অনুভূতি হয় কাঁধের জায়গায়। আমি তাকিয়ে দেখি, সেখানে কিছু হয়নি। শব্দটা এরপর কানে আসে।

“পুশ!” চিৎকার করে ওঠে দিয়ারা। আমি বুঝতে পারি, আমার বুকের ভেতরটা খালি হয়ে যাচ্ছে কোনোভাবে। আমাদের মধ্যে কেউ কি তাহলে…? অব্যক্ত কষ্টে ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। পরক্ষণেই একটা গর্জনে আমার গায়ের রোম খাড়া হয়ে ওঠে! শুধু আমি নই। ওই ফ্লোরের যেখানে যে ছিল সবাই ফ্রিজ করে যায় আওয়াজটা শুনে। আমি দেখি, টেবিলে সোজা হয়ে বসেছে লিয়া।

লিয়া?!

একটা টিন-এজার মেয়ের মুখে কীভাবে আসবে এত রাগ, হিংস্রতা, আর শক্তি?এটা কি অন্য কেউ? তাই বা কী করে হয়?

একটা প্যান্থার, বা বাঘের মতো মসৃণভাবে টেবিল থেকে নেমে আসে লিয়া। ওর নড়াচড়ায় কোনো শব্দ ছিল না। কিন্তু ওর শরীর ছুঁয়ে যাওয়া হাওয়াতেও যেন ফুটে উঠছিল একটা অন্যরকম কম্পন। খুব শক্তিশালী কোনো ফোর্স ফিল্ডের কাছে যেমন হয়, মনে হচ্ছিল সেভাবেই যেন আলোর ঢেউ খেলছে ওর কাছের বাতাসে।

লিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল সার্জেনের মাস্ক পরা, হাতে স্ক্যালপেল ধরা একটা লোকের ওপর। ও কী করেছিল জানি না, তবে লোকটার আর্তনাদ আমি শুনেছিলাম। সেটা মাঝপথে, গার্গলের মতো একটা শব্দ তুলে থেমে গেল!

লিয়া-র কী হয়েছে বা হচ্ছে বুঝিনি। তবে ও যে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম, সেটা নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। এই স্টেশনে মোট পাঁচজন সিভিলিয়ান আছে, এমনটাই জন বলেছিল। মনিটরিং রুমে একজন গেছে। এখানে দু’জন। বাকিদের নিয়ে না ভেবে এখান থেকে বেরোতে হবে!

“লিয়া!” আমি চিৎকার করে ডাকি ওকে। মেয়েটা আমার দিকে ঘোরে। ওর মুখে… আমি বোধহয় ভুল দেখছিলাম, কিন্তু মুখ থেকে কি কিছু গড়াচ্ছিল? কী গড়াচ্ছিল? দরকার নেই ও-সব নিয়ে মাথা ঘামানোর। আমি আবার চেঁচাই, “আমাদের বেরোতে হবে। এক্ষুনি।”

মেয়েটা মাথা ঝাঁকায়। তারপর আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। আমার খেয়াল হয়, শরীরের যেখানে ওই প্রড-টা দিয়ে লোকটা খুঁচিয়েছিল, সেই জায়গাটা পুড়ে গেছে। ব্যথাও ক্রমশ বাড়ছে। লিয়া-র হাত ধরে আমি উঠে দাঁড়াই। তারপর যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে যাই দরজার দিকে।

জানতাম, অন্তত একজন রক্ষী তখনও বেঁচে আছে হয়তো। তার ব্লাস্টারেই নিশ্চয় পুশকিন আহত বা… কিন্তু সে কোথায় থাকতে পারে? ধোঁয়া আর আগুনের মধ্যেই আমি লোকটাকে খোঁজার চেষ্টা করি। হঠাৎ মাথার মধ্যে একটা আদেশ আসে।

শুয়ে পড়ো! এক্ষুনি।

আমরা দু’জনেই শুয়ে পড়ি। মাথার ওপর দিয়ে খেলা করে যায় ব্লাস্টারের শিখা।

ওই রক্ষী কি দরজার বাইরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে? তাহলে কি বাকি মেয়েরাও এতক্ষণে…? আমার ভীষণ হতাশ লাগে। মনে হয় যেন আমার নিজের বোনেদের হারিয়েছি আমি। কিন্তু লিয়া আমার হাত চেপে ধরে তখনই। ওর দিকে তাকিয়ে দেখি, এক আশ্চর্য দ্যূতিতে ভরে আছে ওর চোখ। ও যেন আমাকে সাহস রাখতে বলছে। আমি আবার সামনের দিকে তাকাই। পুশকিনের শরীরটা পড়ে আছে মাটিতে। পাশে কি আরও শরীর রয়েছে? হ্যাঁ! আরও দু’জন বোধহয় পড়ে আছে ওখানেই। আমার গলার কাছটা ব্যথা করতে থাকে। তবে শোক পরে। আপাতত লিয়ার আঙুল অনুসরণ করে বুঝি, দরজার ওপাশে জীবন্ত অবস্থাতেও কেউ আছে। তার জুতোর ডগাটা তখনও দেখা যাচ্ছে।

আহ্‌! একটা ছুরিও যদি এখন হাতে থাকত!

“হাভেন মিলিশিয়া!” আমি চিৎকার করে বলি, “আমি লিয়া বাতিস্তুতা-কে উদ্ধার করতে এসেছি। ইতিমধ্যেই তোমাদের ওপর অনেকগুলো চার্জ জমে গেছে। যদি ভালো চাও তাহলে…”

কথা শেষ হবার আগেই পরপর আগুনের শিখা ধেয়ে আসে আমাদের দিকে। কুকুরকুণ্ডলী হয়ে আমরা নিজেদের তার থেকে দূরে রাখি। কিন্তু কতক্ষণ এভাবে থাকা যাবে? লোকটা সরাসরি আক্রমণ করেনি একটাই কারণে। ও ভাবছে, আমাদের কাছে ব্লাস্টার রয়েছে। কিন্তু এই ব্লাফ ধরা পড়ে যাবে খুব শিগগিরি।

তখনই ধপাস্‌ করে একটা আওয়াজ পাই। অবশ হাত থেকে ব্লাস্টার পড়ে গেলে যে শব্দটা হয়, তেমনই কিছু কি?

লিয়া লাফিয়ে ওঠে। আমিও সোজা হয়ে দরজার কাছে পৌঁছই। কিছু বলতে হয়নি আমাদের। কীভাবে যেন বুঝে গেছি, কী হয়েছে দরজার বাইরে। বেরিয়ে এসে দেখি, মালেক্‌-এর ছুরি দিয়েই আজ রাতে দ্বিতীয় শিকার করে ফেলেছে মেয়েটা। লোকটা যখন দরজার পাশে পজিশন নিয়ে ভেতরদিকে ফায়ার করছিল, তখন মৃতের ভান করে পড়ে থাকা মেয়েটা উঠে বসেছে, আর ছুরি চালিয়েছে! দিয়ারাও উঠে বসেছে তখন। আড়াল থেকে উঁকি মেরে আমাদের দেখছে কেস্‌।

হঠাৎ পায়ের নীচটা কাঁপতে থাকে। আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করি, তারপর সবাই বাইরের দিকে দৌড়ই। তখন খেয়ালও করিনি, জানেন! কিন্তু লিয়া আমাদের সঙ্গে আসেনি। ও পুশকিনের পাশেই বসে ছিল। তবে আমরাও বেশি দূর যেতে পারিনি। করিডর থেকে বাইরে বেরিয়েই আমাদের থেমে যেতে হয়েছিল।

স্টেশন থার্টিন একটা লোহার বাক্সের মতো ততক্ষণে চারদিক দিয়ে বন্ধ হয়ে গেছিল। এমনকি ভাঙা গেটের তলা থেকে উঠে এসেছিল একটা লোহার পাত।

নীচের আওয়াজটা বাড়ছিল। বুঝতে পারছিলাম, সেলফ-ডেস্ট্রাক্ট মেকানিজম চালু হয়েছে। আহত, ক্লান্ত, এবং ক্রমেই নেতিয়ে পড়া শরীর নিয়ে ওখান থেকে বেরোনোর মতো কিছু আমার মাথায় আসছিল না। বসে পড়েছিলাম মাটিতে। বাকিরাও বোধহয়…

কিউব, হাভেন, এখন

 

“আপনি কীভাবে বুঝলেন যে ওটা সেলফ-ডেস্ট্রাক্ট মেকানিজম?”

“ওই স্টেশনে আগে না গেলেও এই জায়গাগুলো সম্বন্ধে আমাদের ট্রেইন করা হয়েছিল। অনেক সময় টেররিস্টরা এইরকম জায়গায় ঘাঁটি বানায়। সিকিউরিটি ব্রিচ হলেই একটা-একটা করে ডমিনো পড়ার মতো করে অ্যালার্ম লেভেল বাড়তে থাকে। তারপর, একটা সময় এগুলো হয়। সব দরজা বন্ধ হয়। তারপর অনেক নীচ থেকে একটা সুপার-হেভি কনভেনশনাল বোমা, বা একটা নিউক্লিয়ার অস্ত্র উঠে আসে। তারপর ‘দ্য এন্ড’ হয়ে যায়।”

“কিন্তু এত কিছু হল। দরজা উড়ল। লোক মরল। লিয়া উদ্ধার হল। তখন কিছু না হলেও ঠিক ওই সময় ওটা হল কেন অফিসার?”

“আমি নিশ্চিত নই ডাইরেক্টর। তবে আন্দাজ করতে পারি।”

“তাই শুনি।”

“স্টেশন থার্টিন একটা গুদাম, বা ডাম্প। সেখানে স্টোরেজ-ই নির্ঘাত সবচেয়ে সেনসিটিভ জায়গা ছিল। ডেল্টা ভিশন আর অন্য ইমপ্ল্যান্ট সেখানেই রাখা ছিল। সেই লেভেলটা তখন কেউ ব্রিচ করেছিল। তাতেই ওই মেকানিজম চালু হয়ে যায়।”

“কে আবার ওই লেভেলে গেল ট্যান? তোমাদের মধ্যে কেউ…?”

“না কাউন্সিলর। আমরা একসঙ্গেই ছিলাম। লিয়া-কে নিয়ে বেরোনো ছাড়া আর কিছু করার চেষ্টাই করিনি আমরা।”

“তাহলে কে? আর সে নীচে গেল কোন রাস্তায়?”

“তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন তনয়া। আপনারা বাঁচলেন কীভাবে?”

জন, স্টেশন থার্টিন, দু’দিন আগের রাত

 

পাভেলের পুরোনো বইপত্র পড়ার নেশা আছে। ট্যাবলেট, চিপ, ফাইল, এমনকি আদ্যিকালের কাগুজে আকারেও ও বই পড়তে চায়। তেমন কোনো একটা লেখায় পড়া এক চোরের কথা ও আমাকে একবার বলেছিল। সেই চোর নাকি যেকোনো জানলা, এমনকি গর্ত দিয়েও শরীর ঢুকিয়ে দিতে পারত। আমার অতটা ক্ষমতা না থাকলেও কিছুটা তো আছেই। তাই পোড়া শরীরের ছিন্নভিন্ন টুকরো লেগে থাকা এয়ার-ডাক্ট ধরেই আমি নীচে নেমেছিলাম। ভারী ব্লেডগুলোকে তখনকার মতো একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিলাম। একটা শরীরকে ঠেকনা হিসেবে ব্যবহার করেছিলাম, যাতে ওটা আবার সরে এসে ডাক্ট বন্ধ না করে দেয়।

স্টোরেজ। এদিক থেকে ওটাকে ঢোকার রাস্তাটা ফসকে গেলে চলবে না!

যখন মেয়েগুলোর সঙ্গে স্টেশন থার্টিনের অবশিষ্ট লোকেদের খণ্ডযুদ্ধ চলছে, ততক্ষণে আমি পৌঁছে গেছি সেখানে। শরীরটা বেঁকিয়ে-চুরিয়ে নিয়ে হঠাৎ করে সোজা করলাম। দু’পায়ের পুরো জোর আছড়ে পড়ল ডাক্টের গায়ের একটা পাতলা অংশে। সেটা ভেঙে যেতেই আমি অ্যালার্মের শব্দ পেলাম।

বুঝতে পারলাম, টাইমার চালু হয়ে গেছে।

ডাক্ট থেকে বেরিয়ে আসতেই এক সিভিলিয়ানের সামনে পড়লাম। সে সশস্ত্র ছিল। আমার দিকে ফায়ার করল লোকটা। আমি ততক্ষণে সরে গেছি। লোকটা দ্বিতীয়বার আমাকে নিশানায় ধরার আগে ওর কাছে পৌঁছেও গেছি। ওর বুকে একটা মোক্ষম পাঞ্চ করতেই লোকটা বর্তমান থেকে অতীত হয়ে গেল।

আমি বাঁদিকে এগোলাম। একটা সাদামাটা চেহারার বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়াতে হল। হাত বুলিয়ে দরজাটা পরীক্ষা করলাম। বুঝলাম, দরজাটার সবক’টা গুরুত্বপূর্ণ বিন্দুতে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হচ্ছে। সঙ্গে থাকা শেষ দু’টো বিস্ফোরকের একটা দরজায় চেপে দিই। তারপর মৃত লোকটার ব্লাস্টার তুলে সেখানে ফায়ার করি।

দরজাটা উড়ে যায়।

সঙ্গে-সঙ্গে ভেতর থেকে এলোপাথাড়ি ব্লাস্টার ফায়ার করা হয়। আমি এর জন্য তৈরিই ছিলাম। আমিও ফায়ার করি, তবে বুঝে, অনেক-অনেক বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে। এই স্টেশনের শেষ সিভিলিয়ানটি আমার সামনে টিকতে পারেনি। আমি ঘরের ভেতরে ঢুকে দ্রুত টেম্পারেচর কনট্রোল ইউনিটগুলো খুঁজে বের করি। তারপর সেগুলো শর্ট করে দিই। কার্ট্রিজ আর চিপ দিয়ে ঠাসা অংশটায় আগুন ধরে যায়। পায়ের নীচে গুরুগম্ভীর আওয়াজও বাড়তে থাকে।

আর এখানে নয়। এবার আমাকে স্টেশন থার্টিনের মধ্য দিয়েই ওপরে উঠতে হবে। মেয়েগুলোকে বাঁচাতে হবে তো!

কিউব, হাভেন, এখন

 

“জন। ও না থাকলে সেদিন আমরা বাঁচতাম না।”

“ও হ্যাঁ। আপনার জন। কিন্তু সে ততক্ষণ কোথায় ছিল?”

“জানি না ডক্টর। তবে হঠাৎ মনে হল, যেন আমাদের কেউ চার্জ করে দিচ্ছে দূর থেকেই।”

“সেটা কি ওই জন-এর জন্য হচ্ছিল?”

“না কাউন্সিলর। আমার অন্তত মনে হয়েছিল, যেন ভেতরে-ভেতরে আমার জোর বেড়ে উঠছে। তারপরেই করিডর থেকে বেরিয়ে এসেছিল জন। তবে ও একা ছিল না।”

“মানে?”

“লিয়া ওর সঙ্গে ছিল। ওরা দু’জন পুশকিন-কে বয়ে আনছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, পুশকিন বেঁচে আছে। সেজন্যই আমাদের সবার ভেতরে জোর বেড়ে উঠেছে।”

“কথাটা বুঝতে পারলাম না তনয়া। বেঁচে আছে মানে? তাহলে ও কি বেঁচেই ছিল?”

“না ডক্টর। আমি ঘর থেকে বেরিয়েই দেখেছিলাম। ওর পালস ছিল না।”

“তাহলে?”

“লিয়া পরে বলেছিল, জন নাকি পুশকিনের শরীরের কয়েকটা বিশেষ জায়গায় শক্‌ দিয়েছিল। তারপর পুশকিন কাশতে-কাশতে উঠে বসে।”

“এটা কি আদৌ সম্ভব ডক্টর? না অফিসার আরও অনেক কিছুর মতো এখানেও ভুল দেখেছেন বা ভেবেছেন?”

“আমার ধারণা পুশকিন মরেনি। ব্লাস্টারের ঘায়ে সে অজ্ঞান, বা কোমাটোজ হয়ে গেছিল। মাথায় রাখতে হবে, মেয়েটি কিন্তু আর্মার পড়েছিল। এবার, মানুষের শরীরের কয়েকটা জায়গা বিশেষভাবে সেনসিটিভ হয়। এগুলোকে কেউ-কেউ প্রেশার পয়েন্ট বলে। তাতে চাপ দিয়ে, বা স্টিমুলাস দিলে যদি রক্তচলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসে তাহলে মনে হতেই পারে যে মেয়েটি ‘বেঁচে’ উঠেছে।”

“আরে সে-সব না হয় হল। কিন্তু তোমরা ওখান থেকে বেরোলে কী করে?”

জন, স্টেশন থার্টিন, দু’দিন আগের রাত

 

“এখান দিয়ে বেরোনো যাবে না।” আমি ওদের বলি, “আমাদের কাছে যা আছে তাই দিয়ে এই স্টিলের পাত, বা কংক্রিটের দেওয়ালে ফাটল ধরানো যাবে না।”

“তাহলে?” ট্যান প্রশ্ন করে।

“আমি এখানে ঢুকেছিলাম এয়ার-ডাক্ট দিয়ে। আপনাদের সেখান দিয়েই বেরোতে হবে। এমনিতে ওটাও সিল্‌ হয়ে যাওয়ার কথা। তবে আমি ওটার কয়েকটা জায়গা ভেঙে রেখেছি। তার মধ্যে দিয়েই যেতে হবে। সময় খুব কম। শিগগিরি চলুন।”

ওরা আমার পিছু নেয়। শরীরগুলো ডিঙিয়ে আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নীচের ফ্লোরে পৌঁছই। আগে আমি এয়ার-ডাক্টে ঢুকি। ওরাও হাঁটুতে, বুকে, হাত-পায়ে ভর দিয়ে পিছু নেয়। বেশ কিছুটা এগিয়েই আমি বুঝতে পারি, এবার মুশকিল।

“সামনে ওটা কী?” কাঁপা গলায় বলে একটা মেয়ে। আমার বেঁধে দেওয়া পাত সত্বেও ওর পায়ের ব্যথা নিশ্চয় বেড়ে উঠেছে এতক্ষণে। তবে ওর গলার কাঁপুনিটা ব্যথার ছিল না। ছিল হতাশার।

সামনে ডাক্ট জ্যাম করে দিয়েছিল বিশাল ব্লোয়ারের কয়েকটা ব্লেড। বুঝেছিলাম, আমার ফিট করা ‘ঠেকনা’ কেটে বা থেঁতলে গড়িয়ে এসেছে ওগুলো।

“আমরা কি ওটা সরাতে পারব?”

ট্যান এই অবস্থাতেও মাথাটা ঠান্ডা রেখেছে দেখে ভালো লাগল। আমি বললাম, “না। ডাক্ট এদিকে কাত হয়ে গেছে। তাই ওদিকে সরানোর চেষ্টা করলেও ওটা গড়িয়ে আসবে। আমি একটা… কিছু দিয়ে ওটা আটকে রেখেছিলাম। তাতে কাজ হয়নি।”

“তাহলে?”

আমি এই প্রথম লিয়া-র গলা শুনি। তবে গলা নয়। আমাকে আকৃষ্ট করছিল মেয়েটার চোখজোড়া। একটা সামান্য ফ্রক গোছের জিনিস পরেছিল মেয়েটা। কিন্তু ওর শরীর নয়, মনে হচ্ছিল আলো-ঝিলমিল ওই চোখ ছাড়া কোনোদিকে তাকানোই সম্ভব নয়।

“একটা কাজই করা যেতে পারে। আমি ব্লেডটা, ইনফ্যাক্ট ব্লোয়ারটাকে ঠেলে একদিকে ধরে রাখছি। আপনারা আমার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যান। জলদি!”

ট্যান আপত্তি করবে ভেবেছিলাম। কিন্তু ডে-ভি ওদের অন্যরকম করে রেখেছিল বলে, বা সময় কম বলে ও কথা বাড়ায়নি। কোনো মেয়েই কথা বলেনি। আমি প্রায় যুদ্ধ করে ব্লোয়ারটাকে একপাশে সরিয়ে রাখলাম। মেয়েগুলো আমার পেছন দিয়ে বেরিয়ে গেল।

“তনয়া!” আমি ডাকলাম। কষ্ট হচ্ছিল, তাতেও মুখ ফিরিয়ে দেখলাম মেয়েটা পেছন ফিরে তাকিয়েছে।

“আমার কোমরে একটা সিগনাল বম্ব আছে। ওটা বের করে নিন। ওটা কাজে লাগবে।”

“আর আপনি?”

“আমি আসছি। আপনারা এগোন।”

ওরা দাঁড়ায় না। কাঁপতে থাকা ডাক্টের মধ্য দিয়ে ওদের শরীরগুলো ছোটো হতে-হতে মিলিয়ে যায়।

দু’মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরণে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় স্টেশন থার্টিন। ডাক্ট দিয়ে বাইরে লাফিয়ে ওঠে আগুনের স্রোত।

কিউব, হাভেন, এখন

 

“তাহলে জন?”

“জানি না।” খসখসে গলাটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে, “বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, ও কোনোভাবে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু আমরা সত্যিটা জানি। ওই আগুনের স্রোতের হাত থেকে পালানোর মতো সময় ও পায়নি।”

“আর আপনাদের কী হল?”

“বাড়িটার আলো আর আগুন থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে আমি সিগনাল বম্ব ফায়ার করি। তার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মিলিশিয়ার একটা মোবাইল ইউনিট আমাদের তুলে নেয়। লিয়া এবং বাকিদের নিজের-নিজের বাড়িও ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে তার আগে এখানে এসে ডে-ভি বের করিয়ে নিয়েছিলাম আমি। সবার শরীর থেকেই।”

সব চুপ হয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। তারপর ধারালো, ঠান্ডা গলাটা বলে ওঠে, “তাহলে আমরা কী রেকমেন্ড করব?”

“দেখুন, আমি তো আগেই বলেছি।” ঘ্যানঘেনে গলাটা নীচু স্বরে বলে ওঠে, “সিটিকর্পকে যদি এর মধ্যে না টানেন, তাহলে আমরা স্টেশন থার্টিন নিয়ে কোনো চার্জ প্রেস করব না। বরং, সচেতন সংস্থা হিসেবে অফিসার ট্যান-এর রিহ্যাবের পুরো খরচ আমরাই দেব।”

“ডক্টর?”

“এই মামলায় হার্ড এভিডেন্স বলতে আমাদের কাছে কী আছে? ম্যাডহাউস-এ তনয়া দত্তের ইনগ্রেস-ইগ্রেসের কোনো রেকর্ড নেই। ফুটেজ আমি দেখেছি, তাতে উনি নেই।

ট্রাক আর স্টেশন থার্টিন, যাতে ওঁর ডি.এন.এ পাওয়া যেতে পারত, দুটোর কোনোটাই আর নেই। এমনকি যে ভেহিকল ওঁদের উদ্ধার করেছিল, সেটাও তো শুনলাম কাল কী একটা দুর্ঘটনায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই অবস্থায় পুরো কেসে একমাত্র সলিড জিনিস হল এই স্টেটমেন্ট। আমি বলব, এটা নিয়ে আর টানাহ্যাঁচড়া করে লাভ নেই। স্টেটমেন্টটার কী গতি করা যায় কাউন্সিলর?”

“সরি ট্যান। তোমাকে এখনই কাজে জয়েন করাতে পারছি না। এই স্টেটমেন্ট আর রেকর্ডিং আমরা সরিয়ে দিচ্ছি। রিহ্যাবের পর নতুন পোস্টে যোগ দিও তুমি।”

“নতুন পোস্ট?” ক্লান্ত গলায় মৃদু হাসির আভাস ফুটে ওঠে, “এবার কোথায় পাঠাচ্ছেন আমাকে? ট্র্যাফিক?”

“আমাদের সম্বন্ধে তোমার এমন ধারণা দেখে বড়োই কষ্ট পেলাম ট্যান। তাহলে ডাইরেক্টর, সে কথাই রইল?”

“হ্যাঁ। আশা করি মেজর হিসেবে আপনি আমাদের কাজকর্ম আরেকটু কাছ থেকে দেখবেন। তখন বুঝবেন, আমরা অতটা খারাপ নই যতটা আপনি ভাবেন।”

“হুঁহ্‌! আপনারা যে কী জিনিস তা… এক মিনিট! কী হিসেবে বললেন? আমি কী…?”

“প্রোমোশনটা রিহ্যাবের পর পাবেন তনয়া। আপাতত এই সেশন থামানো যাক।”

জন, কোথাও, একদিন আগের রাত

 

“আমাদের কেউ দেখে ফেলবে না তো?”

“দেখলে কী হবে কাউন্সিলর? বড়োজোর ভাববে, এক বুড়ো আর এক…”

“এই! তুমি জন্মের বুড়ো। আমি মোটেই বুড়ি নই।”

শরীরের সঙ্গে লেপটে থাকা কালো পোশাকের আড়ালে কাউন্সিলর হুয়ানের চেহারা দেখে আমি একমত হই। সত্যিই মহিলাকে বুড়ি বলা চলে না। ঠান্ডা গলা আর বিষাক্ত মেজাজের জন্য হুয়ান ড্রাগন লেডি নামে খ্যাত। তবে এখন তিনি প্রজাপতি হতেই ব্যস্ত।

“কাল সিলেক্ট হিয়ারিং।” হুয়ানের কণ্ঠস্বরে নার্ভাস ভাব স্পষ্ট হয়, “ট্যান-এর কিছু হবে না। আমি তো আগেই বলে দিয়েছি।”

“রিল্যাক্স কাউন্সিলর। আমি জানি, আপনাদের কাছে ইতিমধ্যেই নির্দেশ এসে গেছে। কাল নাটকটা ঠিকঠাক হবে। পাতিল অফিসিয়ালি কিচ্ছু বলবেন না। তবে লিয়া-র বাবা ট্যানের কাছে কৃতজ্ঞ। তাই ওকে নিয়ে আমি ভাবছি না। ”

“কিন্তু জন” উত্তেজিত গলায় বলেন হুয়ান, “তুমি এর মধ্যে ঢুকলে কেন?”

“লিয়া-র সঙ্গে আরও তিনটে মেয়েকে ডে-ভি দেওয়া হয়েছিল।” আমি থেমে-থেমে বলি, “তাদের মধ্যে একজন ছিল আমাদের। ও ম্যাডহাউসে গেছিল সিটিকর্পের একজনকে সিডিউস করে তার কাছ থেকে কয়েকটা খবর বের করার জন্য। মেয়েটা সিকিউরিটির গুলিতে মারা যায়। খবর পেয়ে আমরা নিজেদের মতো করে তদন্ত শুরু করি। তাতেই বেরিয়ে আসে ডে-ভি আর স্টেশন থার্টিনের কথা। অন্যরা গেলে একটা ইউনিট পাঠাতে হত। আমি গেলে একাই…”

হুয়ান আর কিছু বলেন না। প্লাজার এই দিকটা খোলা। মরুভূমি থেকে হু-হু করে ভেসে আসে ঠান্ডা হাওয়া। সেটা গায়ে মেখে আমি মনে করি, কীভাবে আমি এখনও টিকে আছি।

কাঁপুনি থেকেই বুঝে গেছিলাম। আমার হাতে বড়োজোর এক মিনিট আছে। তাতে ডাক্ট বেয়ে ওপরে উঠে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যেতে পারতাম না। তাই আমি ফিরে যাই স্টেশন থার্টিনের নীচে ওই ঘরটায়।

তারপর, ঠান্ডা মাথায়, আইসোটোপ রাখার টাইটেনিয়াম অ্যালয় দিয়ে বানানো, লেড লাইনিং দেওয়া বড়ো ভল্টের দরজাটা খুলি। সেখানে ঢুকে পড়ি। দরজাটা ভেতর থেকে নব ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিই। ওগুলো পরমাণু বোমার হামলা সহ্য করার মতো করে বানানো হয়েছিল। বেশ কয়েকটা কনভেনশনাল বোমার ধাক্কা ওটা সামলে নিয়েছিল। কোনো মানুষ অবশ্য গরমেই রোস্ট হয়ে যেত তার মধ্যে। আমি…

“তুমি আমাকে সত্যিটা বলনি জন।” হুয়ান একটু বিষণ্ণ ভঙ্গিতে বলেন, “ডে-ভি নিয়ে তুমি কেন মাথা ঘামিয়েছিলে?”

আমি মাথা নাড়ি। হুয়ান বুঝবেন না। ডেল্টা ভিশন শুধু গতরাতেই নয়, আগেও বড়ো অদ্ভুত-অদ্ভুত কাজ করেছে। যুদ্ধের আগে ওই স্টেশন থার্টিন থেকেই ডে-ভি পাঠানো হত বিশেষ বিশেষ জায়গায়।

“তেরো সংখ্যাটা খুব ইন্টারেস্টিং।” আমি নীচু গলায় বলি, “সেক্রেড ফেমিনিনের সঙ্গে জড়িত বলেই সেটাকে অপয়া বলে চালানো হত একসময়। ডেল্টা ভিশন ওই স্টেশন থার্টিনেই থাকত বরাবর।”

“তো?” হুয়ান আমার দিকে বড়ো-বড়ো চোখে তাকান।

“ডেল্টা আর ভি, এই দুটো চিহ্নকে কখনও একসঙ্গে বসিয়েছেন কাউন্সিলর?”

“হুঁ…” বাতাসে কাটাকুটি খেলেন হুয়ান। তারপর বলেন, “একটা ফাইভ-পয়েন্টেড স্টারের মতো নকশা হচ্ছে। কিন্তু তাতে কী?”

“আমার এক সহযোদ্ধা আছে। সে প্রচুর পড়ে-টরে। সেই বলেছিল, ওটা একটা প্রচলিত, সম্মানিত নকশা। খুব পুরোনো কোনো একটা বিশ্বাসে দেবীর প্রকাশ বোঝানো হত ওই চিহ্ন দিয়ে। এমনকি ডে-ভি শব্দটাও ‘দেবী’ কথাটা মনে করিয়ে দেয়।”

“আমি…” হুয়ানের মুখে অস্বস্তি ফুটে ওঠে, “তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না জন। তুমি কী বলতে চাইছ?”

আমি উত্তর দিই না। হাত নেড়ে হুয়ান-কে বিদায় জানিয়ে দ্রুত প্লাজার দেওয়াল বেয়ে নীচে নামি। তারপর অন্ধকারে মিলিয়ে যাই।

আজ থেকে অনেক-অনেক বছর আগে এক জাপানি গেইশা ডে-ভি নামের ইমপ্ল্যান্ট লাগিয়ে এক এলিট সৈন্যকে মারার চেষ্টা করেছিল। সৈন্যটির সম্বন্ধে সে অনেক কিছুই জানত। কিন্তু একটা জিনিস মেয়েটি জানত না।

সেই রাতে ডে-ভি লাগানো নাওকো আমাকে মারেনি। বরং আমার এই পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া জীবনে স্বর্গ নেমে এসেছিল সেই একটি রাতে। জানি না কীভাবে, কিন্তু নাওকো-র গর্ভে আমার এক মেয়ে হয়েছিল! সে কি দেবীর কৃপা? জানি না। তবে আমার সেই মেয়েকে আমি আজও খুঁজে বেড়াই। এক না একদিন আমি ওকে খুঁজে পাবই।

দেবী কি ‘জন দ্য অ্যান্ড্রয়েডের’ ওপর আর একবার কৃপা করবেন না?

*********************************************************************************************

2 thoughts on “ডে-ভি

  • January 25, 2019 at 9:33 pm
    Permalink

    খাসা! জমাটি!

    Reply
  • January 25, 2019 at 11:12 pm
    Permalink

    এই উপন্যাস সম্বন্ধে মতামত দিতে গেলে বলতে হয় ঋজু গাঙ্গুলী অ্যাট হিস বেস্ট। কিন্তু তাতে সবার বোঝার সুবিধা হবে না। একেবারে অন্য ধরনের একটা ভবিষ্যৎ সমাজ। কিন্তু তাকে নিয়ে বেশী ভাববার সুযোগ লেখক দেননি। চলে গেছেন সোজা অ্যাকশানে। আর সে অ্যাকশানের স্বাদ একনম্বরি হলিউডি ফিল্মের।
    সহজ ভাষা, কিন্তু নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভের যুগলবন্দি এই উপন্যাসকে আর পাঁচটা বাংলা সাইন্স ফিকসান থেকে এমনিই আলাদা করে রাখবে। আর প্লটের তো কথাই নেই।

    অসাধারণ কথাটা নেহাত ক্লিশে হয়ে গেছে।

    Reply

Leave a Reply to ত্রিদিবেন্দ্র নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!