তারামাছ

তারামাছ

লেখক – ত্রিদিবেন্দ্র নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

অলংকরণ – সৌরভ দে 

 

(১)

স্থানঃ মাদ্রাজ

সময়ঃ ১৯৬০ সালের ২১শে জানুয়ারি।

     “আপনার বিনয় দেখে আমি ভুলছি না স্যার। যাই বলুন আপনি স্যার একজন মহান বিজ্ঞানী।” মাধবন এই নিয়ে বোধহয় পনেরবারের মতো কথাটা বলল। বিক্রমের বিরক্তি ক্রমশঃ বাড়ছিল। এই লোকগুলো কী নির্লজ্জের মতো তোয়াজ করতে পারে। গত পরশু ও মাদ্রাজে এসেছে। মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটি আর টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের এই জয়েন্ট কোলাবোরেটিভ “অ্যাডভান্সমেন্ট অফ স্পেস সাইন্স ১৯৬০” সেমিনারে। নাসা থেকে একা এই বিক্রম সরকারই এসেছে। সেই দিন থেকেই মাধবন ওর পিছনে পড়ে গেছে। ওর দেড়গুণ বয়সি এই প্রফেসারটির একমাত্র স্বপ্ন একবার বিদেশভ্রমণ। বিক্রম যদি নাসার কোনও একটা প্রোগ্রামে ওকে ডাকে তাহলেই মাধবনের চোদ্দ দুগুনে আঠাশ পুরুষ উদ্ধার হয়ে যাবে। তার জন্য বিক্রমের চটিজুতো চিবাতেও মাধবন রাজি। এই লোকগুলো……

     আস্তে আস্তে বিক্রম সেমিনারের ঘরে ঢুকে পড়ল। পোষ্ট লাঞ্চ সেশান। সেশান চেয়ার করবেন প্রফেসার লোকনাদম রাও। আমন্ত্রিত বক্তা কে সেটা দেখতে হবে। হঠাৎ বিক্রমের চৈতন্যে একটা ছোট ঝাঁকুনি লাগে। এবার ওই রাশিয়ান মেয়েটা বলবে। কালই আলাপ হয়েছে। নামটা হল তানিয়া নিকোলায়েভনা। ওইই গেস্ট স্পীকার। গোটা হলের যাবতীয় মানুষ এখন উৎকর্ণ হয়ে বসে। প্রথম ট্রান্সপারেন্ট শিটটি প্রজেক্টারে পড়ল। “রেসাল্টস অফ লুনা টু এক্সপিডিশান”।

     উনিশশো ষাট সাল। ইউএস এ এবং সোভিয়েত রাশিয়ার ঠান্ডা লড়াই একেবারে তুঙ্গে। রাশিয়া মহাকাশ গবেষনার দৌড়ে ১৯৫৭ সালে প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণকারি রকেট স্পুতনিক-১ আর স্পুতনিক-২ পাঠানোর পর আমেরিকার বিজ্ঞানী মহলে হায় হায় পড়ে যায়। আমেরিকান সরকার নাসা আর জেট প্রপালশান ল্যাবরেটরির উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করল, হয় এক্ষুনি কোনও একটা স্পেস মিশান পাঠাও নয়তো তোমার থাকার দরকার নেই। এই চাপের একটা বড় অংশ যে বিক্রমের উপরও পড়েনি তা নয়। যাহোক অনেকগুলো গন্ডগোলের পর ১৯৫৮ গোড়ায় এক্সপ্লোরার-১ মিশান পাঠান হল। তাই নিয়েই বিক্রমের গতকালের বক্তৃতা ছিল। ইতিমধ্যে গতবছর অগাস্ট মাসে এক্সপ্লোরার-৬ পাঠানো হয়েছে। তাতে প্রথম মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে কেমন দেখায় তার ছবিও তোলা হয়েছে কিন্তু রাশিয়ানরা ইতিমধ্যে………?

     বিক্রম সামনেই দেখতে পাচ্ছে। লুনা-২ চাঁদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করে তার ছবি পাঠিয়েছে। সম্প্রতি লুনা-৩ নাকি চাঁদের উল্টোপিঠেরও ছবি তুলেছে। এখনো সেগুলি প্রসেস করা চলছে। রাশিয়ানরা আমেরিকানদের ঠিক উলটো। আমেরিকানরা ছোটখাট কিছু করলেই তার বিরাট পাবলিসিটি করবে। ওদিকে রাশিয়ানদের সব চুপচাপ। নাতাশা এখন একটা গ্রাফ দেখাচ্ছে। পৃথিবী থেকে আট আর্থ রেডিয়াস দূরে পসিটিভ আয়ন আর নেগেটিভ ইলেকট্রনরা কিভাবে ছড়িয়ে আছে। এই সেই বিখ্যাত ভ্যান-অ্যালেন বেল্ট। এক্সপ্লোরার-১ এর যন্ত্রে প্রথম ধরা পড়ে। তারপর আমেরিকানরা এ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময়ই যেন পায়নি। অথচ রাশিয়ানরা কি সুন্দর তার ম্যাপ বানিয়ে ফেলছে।

     নাতাশার বক্তৃতাটা আর শুনতে ভালো লাগছিল না বিক্রমের। হিংসায় বুক ফেটে যাচ্ছিল। নাসা যেন একটা সৈন্য শিবির! বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রেফারেন্স যেন সবার তলায়। সব সময় রব উঠছে নতুন কিছু করে দেখাও! চাঁদে রকেট পাঠাও। মঙ্গলে রকেট পাঠাও! আরে কেন পাঠাবো? তার বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য কী হবে? নাসায় এসব প্রশ্ন করাও পাপ!

     চটপট হাততালির মধ্যে নাতাশার বক্তৃতা শেষ হল। এবারে প্রশ্ন উত্তরের আসর। একটি ছেলে প্রশ্ন করল “পৃথিবীর চারপাশে এই ভ্যান অ্যালেন বেল্ট কেন আছে?” নাতাশা হেসে ফেললো। বিক্রম লক্ষ করল ফ্যাকাশে চেহারার এই মেয়েটাকে হাসলে সত্যিই দারুণ দেখায়। বলল “উত্তর খুব সোজা। আমরা জানি না!” এই উত্তরটা শুনে বিক্রমের আর একজনের কথা মনে পড়ে গেল। সত্যি কথা বলতে কী এঁর জন্যই বিক্রমের মহাকাশ বিদ্যায় আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কলকাতার রেডিও ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রফেসার এস কে মিত্র। উনিও খুব নির্বিকার মুখে বলতেন “জানা নেই।” অথচ এঁর লেখা বই ‘আপার অ্যাটমস্ফিয়ার’ এখনো মহাকাশ চর্চার বাইবেল।

     ঘরের বাইরে বেরিয়ে বিক্রম একটু ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরানোর উদ্যোগ নিচ্ছিল। এমন সময়ে দুজন মাঝবয়সি লোক এসে উপস্থিত হল। দুজনেরই বক্তব্য এই রাশিয়ানরা নিশ্চয়ই সব বাজে কথা বলছে। নাসার মতো অর্গানাইজেশান যা পারেনি তা রাশিয়ার ইজমেরনের মতো সংস্থা কী করে করবে? আর বিক্রমের মতো বিজ্ঞানী নাকি হয় না। “ইউ অর গ্রেট্টা সারর! সিমপল্লি গ্রেট্টা!”

     বিক্রমের কান্না পাচ্ছিল। এরা কি সবাই ওই মাধবনের কার্বন কপি? এই দুই হতভাগার দুগালে দুই চড় কষিয়ে দিতে পারলে তবে তার শান্তি হত। এরা পেয়েছে কী? তোষামোদের তো একটা সীমা থাকবে? গ্রেট সাইন্টিস্ট!! এরা জানে বিক্রম নাসায় কী করে? ওকে একের পর এক কন্ট্রোলের অঙ্ক কসতে দেয়া হয় আর ও পরের পর ফোরট্রানে প্রোগ্রাম লিখে সেগুলোর নিউম্যারিকাল সলিউশান করে। বিক্রম জানে পর্যন্ত না ওইসব অঙ্ক রকেটের কোনও কাজে লাগে। এক্সপ্লোরার ওয়ানের যন্ত্রপাতি থেকে যে ডেটা এসেছিল, তা ছোঁয়ার পর্যন্ত হক ওর ছিল না। ও শুধু অন্যের ছাপানো পেপারের রেজাল্ট নিয়ে এই কনফারেন্সে এসেছে। নাসায় যে কথাটা ওকে সবসময় শুনতে হয় সেটা হল “তাড়াতাড়ি কর! বি কুইক!! প্রজেক্ট ক্যান নট ওয়েট ফর ইউ!” নিজেকে এক এক সময় বন্ডেড লেবার মনে হয়। অথচ বছর সাতেক আগে যখন বিক্রম প্রফেসার মিত্রর ক্লাস করত সে সময় এই মহাকাশ বিদ্যাকে কী ভীষণ মোহময় মনে হত!

     প্রফেসার শিশির কুমার মিত্র! কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিও ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসার মিত্র! এঁর এমন কোনও ছাত্র নেই যার প্রফেসার মিত্র নামটা শুনলে মাথাটা একটু নিচু হবে না! চাল চলনে আর সময়নুবর্তিতায় পাক্কা সাহেব। ছাত্র-বৎসলতায় বাঙালী মায়েরও বেশী! আর জ্ঞান? নাসায় বিশ্ববিখ্যাত বহু বিজ্ঞানী দেখেছে বিক্রম। তাঁরা যে যার নিজের বিষয়ে বিরাট বিশেষজ্ঞ। কিন্তু সমগ্র মহাকাশ বিজ্ঞানে অমন পূর্ণ জ্ঞান আর কারো দেখেনি বিক্রম। স্যার বার বার একটা কথা বলতেন “যন্ত্রে রিসার্চ করে না বয়েজ। রিসার্চ করে মানুষে। উপযুক্ত লোক থাকলে টাকা, যন্ত্র এসব ঠিক চলে আসবে।” তাই একটা সময়ে নিজের রিসার্চের সময় সংক্ষেপ করেও ছাত্র তৈরি করার চেষ্টা করতেন স্যার। নিজের হাতে আয়নোস্ফিয়ারের গঠন মাপার যন্ত্র ‘আয়নোসন্ড’ তৈরি করে হরিণঘাটার ফিল্ড স্টেশনে বসিয়েছিলেন। পৃথিবীতে তখন বোধ হয় গোটা ছয়েক মাত্র আয়নোসন্ড কাজ করত। ওই রকম একটা বিশ্বমানের যন্ত্রের ডেটা উনি নির্দ্বিধায় ছাত্রদের হাতে তুলে দিতেন। বিক্রমরা তিনজন ছাত্র অবস্থায়ই সেই ডেটার উপর কাজ করে একটা পেপার লেখে। স্যার সমস্তটা দেখে দিয়েছিলেন, কিন্তু নিজের নাম সেই পেপারে দিতে দেন নি। সেই পেপার “অ্যানালস অফ স্পেস সাইন্সে” ছাপা হলে স্যারের সে কি আনন্দ! কেসি দাস থেকে রসগোল্লা আনিয়ে গোটা ডিপার্টমেন্টের যাবতীয় ছাত্রকে খাইয়েছিলেন মনে আছে। বার বার বলেছিলেন “তোমরা আজ আমার মুখ উজ্জ্বল করলে। শিক্ষক হিসাবে আজ আমি ধন্য।” অথচ সে সময়ে স্যারের নিজের পাবলিশ করা পেপারের সংখ্যা দেড়শোর উপরে! সত্যি কথা বলতে কি বিক্রমের নর্থ ক্যরোলিনা ইউনিভার্সিটিতে পিএচডি করার সুযোগ পাবার একটা বড় কারণ হল ওই পেপারটা। স্যারের রেকমেন্ডেশানটাও যথেষ্ট কাজ করেছিল। যখন ফুল স্কলারশিপের চিঠি এল তখনও স্যার কি খুশি হয়েছিলেন! পি এইচ ডি করে নাসায় যোগ দেবার সময়েও চিঠিতে স্যারের আশীর্বাদ পেয়েছিল বিক্রম। অথচ তখন যদি জানা থাকত যে কী গবেষণা নাসায় করতে হবে!

     অনেক কষ্টে দুই মূর্তির হাত থেকে নিস্তার লাভ করে বিক্রম। আজই কনফারেন্সের শেষ দিন। এইমাত্র খবর পাওয়া গেল ভ্যালিডিক্টারি সেশানে T.I.F.R এর ডিরেক্টর প্রফেসার হোমি ভাবা থাকবেন। ইনি কি বলেন সে বিষয়ে বিক্রমের কৌতুহল রয়েছে।

     প্রফেসার ভাবা সাহেবদের থেকেও বেশী সাহেব। শোনা যায় সাইন্টিস্টদের ইংরেজি ঠিক করার জন্য T.I.F.R এ এক ব্রিটিশ সাহেবকে চাকরি দিয়ে রাখা আছে। এদিকে সরকারি মন্ত্রী আমলাদের সঙ্গেও ওঁর খুবই ভালো যোগাযোগ আছে। অসাধারণ একজন বিজ্ঞান সংগঠক। ভারতে এই জিনিসটারই চিরকাল অভাব। এই ভ্যালিডিক্টারি সেশানে উনি যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে ‘ভারত সরকার সিরিয়াস স্পেস প্রোগ্রাম শুরু করতে চায়। বিদেশে যে সব ভারতীয় স্পেস সাইন্টিস্ট আছেন তারা যদি দেশে ফিরে আসেন তবেই এই প্রোগ্রাম পূর্ণতা পাবে। আর্থিক লাভালাভের কথা না ভেবে সবাই এই কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ুন’, ইত্যাদি ইত্যাদি!

     এই সব আদর্শবাদী কথাবার্তা বিক্রমের মনে দাগ কাটে না। নাসায় থাকাটাই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহলে একটা বিরাট ব্যাপার। যে কোনও কনফারেন্সে স্পেশাল খাতির পাওয়া যায়। তাছাড়া আজ শুধু প্রোগ্রাম লিখতে হচ্ছে, কিন্তু কাল নিশ্চয়ই আরো বড় দায়িত্ব পাওয়া যাবে। কর্তৃপক্ষ যখন বিক্রমের মূল্য বুঝতে পারবে তখনই বিক্রম উপযুক্ত কাজ পেতে পারবে। এদেশে ফিরে মাধবনদের সংখ্যা বাড়ানোর কোনও মানে হয়? তাছাড়া কাজ যাই করাক না কেন নাসা মাইনে দেয় মুক্ত-হস্তে। ওদেশের রোজগারের পঞ্চাশ ভাগের একভাগ রোজগারে দেশে ফিরবে কে? নট বিক্রম সরকার।

     কনফারেন্স হল থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল বিক্রম। ও দেখতে পেল যে দুজন লোক ওর দিকেই আসছে। একজন নিশ্চয়ই মাধবনের মতোই প্রফেসার। আর একটা মনে হয় স্টুডেন্ট। পালাতে পারলে ভালো হত কিন্তু সেটা বিক্রমের ভদ্রতায় বাঁধল। ওরা এসে পাশে দাঁড়াল। প্রফেসার মুখে বিগলিত হাসি ফুটিয়ে বললেন “আই অ্যাম সম্মুগম। এম সি পি সম্মুগম স্যার। আই হ্যাভ সাম ডাউটস স্যার”। এরপর শুরু হল সম্মুগমের প্রশ্ন। যদিও মাধবনের থেকে অনেকটাই ভালো, তাও আয়নস্ফিয়ার ঘটিত এত সহজ সহজ প্রশ্ন লোকটা কেন করছে? অবশ্য সবাই তো আর প্রফেসার মিত্রের কাছে আয়নস্ফিয়ার বোঝেনি।

     সম্মুগমের প্রশ্ন শেষ হলে বিক্রম যখন বিদায় নেবে তখন সঙ্গের ছাত্রটি খুব কড়া তামিল অ্যাকসেন্টে বলল “এক্সকিউস মি স্যার! হোয়াই ডোন্ট ইউ কাম ব্যাক টু ইন্ডিয়া? আওয়ার কান্ট্রি নিড ইউ পিপল”। সম্মুগম হাঁ হাঁ করে ছেলেটিকে ধমকাতে গেল। বিক্রম সম্মুগমকে থামিয়ে বলল -”আমি ওদেশে যে গবেষনার ফেসিলিটি পাই তা এদেশে কোথায়?” সম্মুগম খুব বোদ্ধার মতো বলল -”আপনারা তো ইচ্ছা করলে এখন স্পেসেও নিউক্লিয়ার বম্ব ফাটাতে পারেন! তাই না স্যার?”

     সম্মুগমের বৈজ্ঞানিক এষণায় বিক্রমের সশব্দে হেসে ওঠার ইচ্ছা হচ্ছিল, কিন্তু সম্মুগমের কথায় কান না দিয়ে ছেলেটি বিক্রমের উদ্দেশ্যে বলল -”ফেসিলিটি আগে না মানুষ আগে? আপনারা ফিরে আসুন। তারপর আপনারাই তো ফেসিলিটি তৈরি করবেন। প্রফেসার ভাবা বললেন না, ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট স্পেস সাইন্সের ব্যাপারে সিরিয়াস?” বিক্রমের এখনো মজা লাগছিল! হায় রে আদর্শবাদী বালক, কয়েক বছর এদেশে রিসার্চ করলেই তোমার জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাওয়া হয়ে যাবে। তখন তুমি আর একটি মাধবন হয়ে বিদেশে যাবার তদ্বির করবে। একটু ব্যাঙ্গের ভাবেই বিক্রম বলল “আমরা এখন চাঁদে রকেট পাঠানোর কথা ভাবছি। এখন ভারতে ফিরলে তো বেলুন পাঠিয়ে আবহাওয়ার খবর নেবার বেশী কিছু করতে পারব না।”

     ছেলেটি কিন্তু বিদ্রুপটা গায়েই মাখল না। বলল “আমরাও আকাশে রকেট পাঠাবো। ইউ পিপল কাম ব্যাক স্যার। আর দশ পনের বছরের মধ্যে আমরাও আর্টিফিসিয়াল স্যাটিলাইট বানাবো।”

     সম্মুগম ছেলেটিকে থামিয়ে দিয়ে বলে “একশো বছরেও হবে না। আমাদের মতো ব্যাকওয়ার্ড দেশে…।” ছেলেটির চোখ জ্বলে ওঠে। বলে “হোয়াই স্যার! আমরা মোটেও ব্যাকওয়ার্ড নই। লিমিটেড ফেসিলিটির মধ্যেও আমাদের সিভি রমন নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। উই আর কেপেবল স্যার। আমরা সত্যি সত্যি চেষ্টা করলে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে আমাদের রকেট দিয়ে অন্য দেশের স্যাটিলাইট পর্যন্ত লাঞ্চ করতে পারব। আমাদের হিউম্যান রিসোর্স যথেষ্ট ভালো। হোয়াই ইউ পিপল থিংক সো নেগেটিভ?”

     এই সরল গ্রাম্য দক্ষিণী ছেলেটির মধ্যে বিক্রম কোথাও একটা প্রফেসার মিত্রর ছায়া দেখতে পেল। সস্নেহে বলল “আই অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর স্পিরিট ইয়ং ম্যান। বাট মানি ম্যাটারস, ইউ নো? নাসা আমাকে যা মাইনে দেয় ভারত সরকার তো তার একটা ছোট ভগ্নাংশ ও দিতে পারবে না।” কিন্তু ছেলেটি অদম্য। বলল -”কিন্তু ভারত সরকার আপনাকে ভারতে ভালোভাবে থাকার মতো যথেষ্ট টাকাকড়িই তো দেবে! নাসা চাঁদে রকেট পাঠালে আপনার নাম কেউ করবে না। কিন্তু ভারতে ফিরে এলে একদিন হয়ত সবাই আপনাকে বলবে ফাদার অফ ইন্ডিয়ান স্পেস সাইন্স।”

     বিক্রম রণে ভঙ্গ দিল। সিড়িঙ্গে লম্বা, রোগা, কালো অগোছালো পোষাক পরা ছেলেটাকে দেখতেও বিচ্ছিরি। কিন্তু ছেলেটার কথাগুলো ভারি সুন্দর। বিশ্বাস মাখানো বলেই বোধহয় শুনলে হাসি পায় না। বিক্রম প্রশ্ন করল “তুমি কী পড়?”

     -“অ্যাভিয়েশান ইঞ্জিনিয়ারিং স্যার।” ওর পিঠে হাত রেখে বিক্রম বলল -”তাহলে বড় হয়ে তুমি ভারতীয় রকেট বানাবে?” ছেলেটি শিরদাঁড়া খাড়া করে বলল “ইয়েস স্যার।”

     -“ওকে। আমি যদি বেঁচে থাকি তাহলে নিশ্চয়ই দেখে যাব। নাম কী তোমার?”

     ছেলেটি এই প্রথম লজ্জা পেল মনে হয়। বলল “ভেরি লং নেম স্যার! কালাম! ‘আবুল পকির জৈয়নুল-আবেদিন আব্দুল কালাম’ স্যার।”

 

(২)

স্থানঃ জেট প্রপালশান ল্যাব (জেপিএল), বোল্ডার, কলোরাডো
সময়ঃ ১৯৬০ সালের ২রা জুলাই।

     ছোট ঘরটায় একা বসে বিক্রম। সামনে উপরেই সেন্ট্রাল এসির ডাক্টটা। বেশ ঠান্ডা লাগছে। সামনে টেবিলে বেশ কিছু হালকা ম্যাগাজিন পড়ে আছে। মনেই হচ্ছে না যে এটা অমেরিকার এক্কেবারে উপরের কয়েকটা ফেডারেল ল্যাবরেটরির অন্যতম জেপিএলের দুনম্বর মানুষটির ঘরের ওয়েটিং রুম, যার নাম ডক্টর অ্যান্থনি ফেদারপ্রাইস। নাসার জেপিএলের একনম্বর হলেন ডক্টর উইলিয়াম হেনরি পিকারিং। এঁকে বেশীর ভাগ সময়েই ওয়াশিংটনের বিভিন্ন অফিসে অফিসে নানা রকম কারণে ঘুরে বেড়াতে হয়। জেপিএলের বেশীর ভাগ সাইন্টিস্টেরই এঁর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। জেপিএলের দৃশ্যমান কর্তা হলেন এই অ্যান্থনি ফেদারপ্রাইস বা আমেরিকান কায়দায় ‘টনি’। আমেরিকার এই এক অদ্ভুত কালচার। সবাইকে একটা ডাকনাম দিয়ে সেই নামে ডাকা। এরা প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারকেও আইকি বলে ডাকে!

     আজ সকালে অফিসে বিক্রম নিজের ঘরে এসে দেখে টনির মেক্সিকান সেক্রেটারি হুয়ানা একটা নোট রেখে গেছে। বিক্রম যেন সাড়ে এগারোটা নাগাদ টনির ঘরে যায়। বিক্রম প্রবল নার্ভাস হয়ে পড়ে। তার মতো সাধারণ একজন সাইন্টিস্টকে নিয়ে টনির কি প্রয়োজন রে বাবা! নাসার অবস্থা খুব ভালো নয় এটা বিক্রমের জানা আছে। ওদের সেনেটে বার বার প্রশ্ন করা হয়েছে যে সাধারণ ট্যাক্সপেয়ারের টাকায় এত মূল্যবান মহাকাশ গবেষণা চালিয়ে কী লাভ? তবে কি ওকে নাসা থেকে ভাগিয়ে দেবে? আমেরিকানরা ছোটোখাটো কিছু পছন্দ করে না, মাঝামাঝি কিছুও না। হয় নাসার পিছনে বিলিয়ান বিলিয়ান ডলার খরচ কর আর না হলে নাসা তুলে দাও। এখন খরচা কমানোর চেষ্টায় প্রথম কোপটাই তো পড়বে নন রেসিডেন্ট জুনিয়ার সাইন্টিস্টদের উপর। মানে বিক্রমের চাকরি নট।

     চাকরি গেলে কোথায় কোথায় অ্যাপ্লাই করবে ভাবতে ভাবতেই বিক্রমের ডাক এসে গেল। কিন্তু ঘরে ঢুকে টনির পাশে যাকে বসে থাকতে দেখল বিক্রম তাকে দেখেই অন্য সব কথা ভুলে গেল। বুড়ো ও-কনর এখানে কি করছে? সম্বিৎ ফিরল টনির গমগমে গলায় -”হাই স্যারখর! ড্র এ চেয়ার, উইল ইউ?” টনির হাতে বিক্রমের সিভির ফাইল।

     -“ওয়েল স্যারখর, তোমার ডসিয়ের থেকে যা মনে হচ্ছে তুমি আপার অ্যাটমস্ফিয়ারের আয়ন ডিস্ট্রিবিউশানের উপর পিএইচ ডি করেছ। অকি-র (মানে ও-কনর) ও দেখছি তোমার সম্বন্ধে খুবই উঁচু ধারণা। হ্যাভ ইউ ব্রাইবড হিম এনিওয়ে? হা হা হা!”

     না চাকরিটা এযাত্রায় টিঁকেই গেল মনে হচ্ছে। একটা লাজুক লাজুক হাসি দিয়ে বসের প্রশংসা সামাল দিল বিক্রম। এবারে সামনে ঝুঁকে পড়ে টনি যা বলতে শুরু করল তার সারসংক্ষেপ করলে দাঁড়ায় এই…

     রকেট যদিও আলাবামার আর্মি ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিভিসান (সংক্ষেপে এ-বি-এম) বানায় কিন্তু সেই রকেটের কন্ট্রোল সিস্টেম থেকে শুরু করে রকেটের যে পে লোড (আসলে স্যাটিলাইট আর তার আনুষঙ্গিক) তার পুরোটাই বানায় জেপিএল। অথচ সেই স্যাটিলাইটের উপরে যে সব গবেষণার যন্ত্রপাতি বসে সে সব কিন্তু অন্যান্য জায়গা থেকে আসে। ফলে গবেষণার সিংহভাগ কৃতিত্ব চলে যায় এই অন্যান্য মহলে। জেপিএলে যখন যথেষ্ট সম্ভবনাময় সব বিজ্ঞানী আছে তখন জেপিএলের পছন্দমত যন্ত্র কেন বসানো হবে না?

     বিক্রম এখনো বুঝতে পারছিল না যে এ ব্যাপারে তার কী করার আছে? যন্ত্র বসানোটা তো আর বিক্রমের ইচ্ছানুযায়ী হবে না। কিন্তু বসের কথায় সায় দেয়া খুবই প্রয়োজন, তাই বিক্রম প্রবল উৎসাহে বলতে লাগল “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। এ তো একেবারেই অন্যায় কথা। রকেট বানাবে জেপিএল আর কৃতিত্ব নেবে অন্যরা তা কেন হবে?” ইত্যাদি।

     বিক্রমের উৎসাহি বক্তব্যে টনি খুশি হল বোঝা গেল। এবারে টনির বক্তব্য এই মহান কাজের জন্য বিক্রমকে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। নিজের যা কাজ আছে তার বাইরে একটা অভিনব প্রজেক্টের আইডিয়া লিখতে হবে। অর্থাৎ আকাশে রকেট পাঠিয়ে নতুন কী গবেষণা সম্ভব সেই সংক্রান্ত একটা শ খানেক পাতার রাইট-আপ বানাতে হবে। এবং এর জন্য চার মাসের মতো সময় পাওয়া যাবে।

     বিক্রমের ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছিল। ওর নিজের যা কাজ তাতে দিনের অন্তত দশ ঘন্টা সময় দিতে হয়। এবারে চার মাসে একটা পূর্ণ প্রোজেক্ট ভাবা, তার জন্য লেখাপড়া, অবশেষে সেটা লিখে ফেলা, এটা তো একটা ফুল টাইম কাজেরও বেশী। তাহলে বিক্রম দিনে কি কুড়ি ঘন্টা কাজ করবে?

     কিন্তু বিক্রমের ভিতরে প্রফেসার মিত্রের ছাত্র ডাক দিয়ে উঠল। এটাই তো সুযোগ বিক্রম! একা তোমার দেখিয়ে দেয়া পথে নাসার একটা পুরো স্পেস মিশন চালিত হতে যাচ্ছে। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর একজন মহাকাশ বিজ্ঞানীর জীবনে কী থাকতে পারে? আর মিশান শেষ হলেই বিক্রম একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী……।

     বিক্রম রাজি হয়ে গেল। বলল “আমাকে এই সুযোগটা দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ।”

     -“বরং অকিকে ধন্যবাদ দাও। ওই তোমার নাম প্রস্তাব করেছিল।”

     বেরিয়ে আসার আগে ও-কনর প্রথম কথা বললেন “তুমি কিন্তু আমার সাথে লাঞ্চ করবে। লাঞ্চটাইমে লবিতে থেকো।”

     বেরিয়ে আসতে আসতে বিক্রমের মনে হচ্ছিল আগামী চার মাস তার জীবনটা সম্পূর্ণ অন্য খাতে বইবে। আজ রাতেই লাইব্রেরিতে গিয়ে বসতে হবে। কিন্তু তার আগে প্রফেসার ও-কনরের সঙ্গে লাঞ্চ। নর্থ ক্যারোলিনায় যখন বিক্রম পিএইচডি করত তখন ওর গাইডের ভূতপূর্ব গাইড ছিলেন এই ও-কনর। প্রবীণ প্রফেসার। সে সময় এক্সটেনশানে ছিলেন। এমনিতে রাশভারি লোক কিন্তু প্রফেসার মিত্রর ছাত্র শুনে যেচে এসে আলাপ করেছিলেন। তারপর বিক্রমের সঙ্গে এই বৃদ্ধ প্রফেসারের বেশ ভালো একটা বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। শুধু ওঁকে অকি বলে ডাকতে বিক্রমের অনেকদিন অসুবিধা হয়েছিল। নাসায় চাকরি পাবার সময় ইনি খুব ভালো একটা রেকমেণ্ডেশানের চিঠি দিয়েছিলেন। দেখা যাক বুড়ো কি বলে!

     বৃদ্ধ প্রফেসার কিন্তু সেরকম কিছুই বললেন না। গাড়ি চালিয়ে বিক্রমকে শহরে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটা টার্কিশ রেস্টুরেন্টে গিয়ে একগাদা ভালোমন্দ খাবার অর্ডার দিলেন। তারপর একটু হাসি হাসি ভাবে বললেন -”তাহলে এবার তোমার কঠিন সময় এসে পড়ল।” বিক্রম কৃতজ্ঞতা জানানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু অকি হাত দিয়ে সব কিছু ওড়ানোর ভঙ্গি করে বললেন -”শোন। তুমি যতটা আনন্দিত হচ্ছ, ততটা আমি হচ্ছি না। আমার মনে হচ্ছে এটা একটা নতুন ঝামেলার ব্যাপার শুরু হতে চলেছে”

     -“কেন একথা কেন বলছেন”

     -“আরশোলা পাখি হতে চাইলে ফলাফল ভালো দাঁড়ায় না। এই টনি ফেদারপ্রাইস, অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এক্সপ্লোরার ওয়ান মিশানে ভ্যান অ্যালেনের এত নাম হতে দেখে ওরও শখ হয়েছে বিজ্ঞানী হবার। এক্সপ্লোরার ওয়ানেও ও ভ্যান অ্যালেনের কাজে প্রচুর বাধা দিয়েছিল। তুমি জান নিশ্চয়ই ওই মিশানে হাই এনার্জি পার্টিকলদের এনার্জি মাপার জন্য একটা গেগার কাউন্টার বসানো হয়েছিল। এখন ওটার অপারেটিং ভোল্টেজ যা থাকার কথা, পে লোডের ওজন বেড়ে যাবে বলে টনি সেটাকে অনেক কমিয়ে দেয়। ফলে স্পেসে গিয়ে যখন সত্যিই হাই এনার্জি পার্টিকলদের দেখা মিলল তখন ওই গেগার কাউন্টার স্যাচুরেট করে যায়। ফলে কী হল? আমরা শুধু জানতে পারলাম যে পৃথিবীর দেড় রেডিয়াস দূরে হাই এনার্জি পার্টিকলদের একটা বেল্ট আছে, কিন্তু তাদের এনার্জি মাপতে পারলাম না। মাপল কারা? রাশিয়ানরা! লুনা ওয়ান মিশানে। ভ্যান অ্যালেন ভীষণ হতাশ হয়েছিলেন।”

     বিক্রম উত্তরোত্তর অবাক হচ্ছিল। বাবা! ভিতরে ভিতরে এত পলিটিক্স! প্রশ্ন করলো -”কিন্তু এবারে টনির মতলবটা কী?”

     -“বুঝলে না? যদি একটা ঠিকঠাক সাইন্টিফিক অবজেকটিভ পাওয়া যায় তাহলে টনি, ভ্যান অ্যালেনকে পুরো বাদ দিয়ে দেবে। অবশ্য সেটা খুব সহজ হবে না। কারণ ইউএস ডিফেন্স লেভেলে ভ্যান অ্যালেন খুবই পরিচিত নাম। আর ওঁর যন্ত্রপাতি ডিজাইন করার ক্ষমতাও অসামান্য। কিন্তু টনি চাইছে এমন একটা প্রজেক্ট যেখানে ভ্যান অ্যালেনের কোনও স্থান নেই।”

     -“তা কি করে সম্ভব? মহাকাশ গবেষনায় এমন কী করা সম্ভব যেখানে ভ্যান অ্যালেনের মতো মহাকাশ বিজ্ঞানীর কোনও জায়গা থাকবে না?”

     -“সেটাই তো বলছি। আর সেই জন্যই আমি তোমার অ্যাসাইনমেন্টের ব্যাপারে খুব একটা উৎসাহিত হচ্ছি না। তবে তুমি তো আর এর বাইরে থাকতে পারবে না, তোমাকে তোমার বসের কথা তো শুনতেই হবে। তবে খুব বেশী সাইন্টিফিক প্রজেক্টের দিকে যেও না। বরং চমক দেয়া কিছু করতে পারলে ভালো হবে।”

     -“সে আবার কী কথা। চমক দেয়া প্রজেক্ট কী হতে পারে?”

     -“তা আমি বলতে পারব না। সারা জীবন ফিজিক্স নিয়েই মাথা ঘামিয়েছি। ভগবানকে ধন্যবাদ যে আমি টনির মতো বস পাইনি। তবে এক্ষেত্রে হতে হবে মহাকাশে উড়ন্ত চাকতির সন্ধান বা চাঁদের মাটিতে ভিনগ্রহীর বাসা আবিষ্কার। হলিউডের দুচারখানা সাই ফাই সিনেমা দেখে ফেলো, আন্দাজ পেয়ে যাবে।”

     বিক্রম হাসি চাপতে পারল না। প্রফেসার ও-কনরও হাসছিলেন। এমন সময় ওয়েটার এসে সামনে ভুরভুরে-সুগন্ধ-ছাড়া ধোঁয়া-ওঠা ল্যাম্ব সোরবার বোল বসিয়ে দিয়ে গেল। সোরবা হল টার্কিশ সুপ। তবে মোটেও সাহেবদের সুপের মতো নয়। অনেক বেশী ঘন এবং সুস্বাদু। খেতে খেতে অন্য কথা শুরু হল।

     খাওয়া যখন প্রায় শেষের দিকে তখন হঠাৎ ও-কনর বললেন -”এবারে ক্রিসমাসে কী করবে?” এদেশে ক্রিসমাসে লম্বা ছুটি থাকে। সবাই আত্মীয় স্বজনের বাড়ি যায়। সব কাজকর্ম বন্ধ। এই সময় একা থাকাটা খুব চাপের। কিন্তু বিক্রমের করার কিছু ছিল না। আগে ক্রিসমাসের সময় অন্যান্য ছুটি কুড়িয়ে বাড়িয়ে কলকাতায় যেত বিক্রম। কিন্তু নাসায় যোগ দেবার পর তা আর করা যাচ্ছিল না। বলল -”কিছুই না, কেন?”

     -“তোমার যদি কোনও প্রোগ্রাম না থাকে, তাহলে ইউ ক্যান জয়েন আস। কলিন এই ক্রিসমাসে আসছে।”

     বিক্রম জানে কলিন ও-কনরের একমাত্র মেয়ে। অনেক বেশী বয়সের মেয়ে। এখন বছর পঁচিশ বয়স হবে। এই মেয়ের অল্প বয়সে ও-কনরের স্ত্রীবিয়োগ হয়। বাবা মেয়ের সম্পর্ক খুব ভালো নয়।

     বিক্রম বলে -”এক্সকিউজ মি অকি, তোমাদের দুজনের মধ্যে আমি গিয়ে পড়লে তোমাদেরই তো অসুবিধা হবে। কলিন তো বহুদিন পরে আসছে?”

     অকি একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন -”তা যদি হত তাহলে আমি তোমাকে বলতাম না। কিন্তু আমাদের মধ্যে বলার মতো প্রায় কোনও কথাই নেই। ইনফ্যাক্ট ও আসবে শুনে থেকে আমি ভাবছি কী করা যায়! ক্রিসমাসের সন্ধ্যায় বাবা আর মেয়ে মুখোমুখি বসে আছি, কেউ কোনও কথা খুঁজে পাচ্ছি না! হাউ হরিবল!”

     কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে অকি নিজেকে সামলালেন। বললেন -”তোমরা প্রাচ্যের লোকেরা এটা ভাবতেই পারো না। তোমাদের পরিবারের বাঁধন অনেক শক্ত। কিন্তু আমরা সবাই ভীষণ লোনার। জন্ম থেকেই। তবে কলিন আর আমার রিলেশানটা একটু বেশীই অড। ও কি চায় আমি বুঝি না। ওর জন্য আমার ভীষণ চিন্তা হয়। কবে যে ওকে পুলিশে ধরবে!”

     বিক্রম ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে বলল -”কেন? ওকি ড্রাগ…”

     -“না না একেবারেই না” মাথা নাড়তে লাগলেন ও-কনর “ও স্মোক পর্যন্ত করে না। শি ইজ অ্যান আক্টিভিস্ট। গো গ্রীন না কী যেন। কিন্তু ওরা ফেডারেল গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে নানা রকম আন্দোলন করে। কোনও দিন যে কমিউনিষ্ট বলে গ্রেপ্তার হবে…।”

     -“কমিউনিষ্ট হলেই বা গ্রেপ্তার করবে কেন? এতো স্বাধীনতার দেশ!”

     ও-কনর হাসলেন। বললেন -”সবাই তাই বলে বটে। তবে এ দেশ স্বাধীনতার দেশ নয়, এ দেশ পয়সার দেশ। তুমি ভাবতেও পারবেনা বিক্রম, কিভাবে এফবিআই কমিউনিষ্টদের বিরুদ্ধে উইচ হান্টিং চালিয়ে যাচ্ছে। তাও তো কমিউনিষ্টদের পিছনে অনেক বড় বড় লোক, বড় বড় মিডিয়া গ্রুপ রয়েছে। কিন্তু এই বোকা গো গ্রীন গুলোর পিছনে তো কেউ নেই। এখন এরা যদি অ্যাটম বোমা ব্যান কর বলে হোয়াইট হাউসের সামনে বিক্ষোভ করে তো সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়া এদের অ্যান্টি ন্যাশনাল কমিউনিষ্ট বলে চিহ্নিত করে দেবে। না পাবে চাকরি না পাবে কোনও সোসাল সিকিউরিটি। আমার ভীষণ চিন্তা হয় বিক্রম। কিন্তু ও কোনও কথা শোনে না। কোথায় কাদের সঙ্গে থাকে তাও জানি না।” ও-কনরের গলা ভেঙে যায়।

     বিক্রম কয়েক সেকেণ্ড সামলানোর সময় দেয় ও-কনর কে। তারপর সান্ত্বনার সুরে বলে -“অত চিন্তা করো না অকি। তোমার মেয়ে তো অন্যায় কিছু করছে না।”

     ও-কনর হাসলেন। করুণ হাসি। বললেন -“রাষ্ট্রের কাছে অন্যায়ের থেকে প্রতিবাদ অনেক বেশী খারাপ কথা। আমরা জাতে আইরিশ মাই বয়! তার উপরে ক্যাথলিক। প্রতিবাদ আমাদের রক্তে। আর তাই প্রতিবাদের ফল কি হয় যুগ যুগ ধরে আমরা দেখে আসছি। যাকগে আমার পরিবারের সমস্যা নিয়ে তোমায় বিব্রত করে লাভ নেই। বরং তুমি যদি ক্রিসমাসের সময় আমাদের বাড়ি আসো তাহলে কৃতজ্ঞ থাকব।”

     ইতিমধ্যে শেষ পদ বাকলাভা পরিবেশিত হয়েছে। বড় গোল খাজার মতো দেখতে একটা মিষ্টি, কিন্তু খাজার চেয়ে অনেক বেশী পরত দেয়া আছে। পরতগুলো অনেক পাতলাও। প্রত্যেক পরতের ফাঁকে ক্রীম, মধু, দারচিনির গুঁড়ো। জিনিষটা একটু গরম বলে আরো স্বাদ খুলেছে। দুজনেই মন দিয়ে বাকলাভার সদ্ব্যবহার করতে থাকে।

 

(৩)

স্থানঃ জেট প্রপালশান ল্যাব (জেপিএল), বোল্ডার, কলোরাডো
সময়ঃ ১৯৬০ সালের ১০ই ডিসেম্বর।

     এসির ডাক্টটা থেকে এখন রীতিমত গরম হাওয়া বেরোচ্ছে, কারণ বাইরের তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রির কাছাকাছি। কাল সারারাত ধরে জোর হাওয়া দিয়েছে আর ঝিরঝিরে বরফ পড়েছে। ঘরের ভিতরের তাপমাত্রা যদিও আরামদায়ক তাও বিক্রমের একটু শীত শীত লাগছিল। সামনের ফোল্ডারটার উপর বিক্রম আর একবার হাত ঘসে নিল। এই ফোল্ডারের মধ্যে তার বিগত পাঁচ মাসের পরিশ্রমের ফলের কার্বন কপি।

     সেই ও-কনরের সঙ্গে লাঞ্চ করার পর বিক্রম সোজা লাইব্রেরির ভিতরে আশ্রয় নিয়েছিল। তারপর থেকে দিনে অফিস আর রাতে লাইব্রেরি এই বিক্রমের রুটিন। রবিবার সারা দিন লাইব্রেরি। এর মধ্যে ভোরের দিকে লাইব্রেরির বড় ডিভানটার উপর ঘন্টা দুয়েকের ঘুম। রাতের খাওয়া বলতে জেপিএলের ক্যান্টিন থেকে সংগ্রহ করা গোটা দুই ক্লাব স্যান্ডুইচ। আর লাইব্রেরির ইলেক্ট্রিক কেটলিতে বানানো অসংখ্য কাপ কফি। টয়লেটের আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেরই মাঝে মাঝে অচেনা মনে হত। এই সারা মুখে বলিরেখা পড়া লাল চোখের লোকটা কি সত্যিই বিক্রম সরকার? এত বিচ্ছিরি মাতাল ভবঘুরের মতো দেখতে হয়ে গেছে? শেষ দিকে ভোরের যে দুঘন্টা ঘুম, তাও হত না। শেষ পনেরো দিন টেবিলে একটু করে ঝিমিয়ে নিয়েছে মাত্র।

     কিন্তু এ তো শুধু শারীরিক কষ্টের হিসাব। প্রথম কয়েক দিন বিক্রম শুধু বসে বসে নাসার লেটেস্ট বুলেটিন গুলো দেখেছে আর পট পট করে মাথার চুল ছিঁড়েছে। সামনে কী বিশাল সমুদ্র, আর বিক্রম কিচ্ছু জানে না। তারপর আস্তে আস্তে প্রফেসার মিত্রর কাছে প্রোজেক্ট করার অভিজ্ঞতা মনে এল। স্যার বলতেন লেখার সময় প্রথমে আসবে কী করব, কেন করব আর তারপর কীভাবে করব? আর ভাবার সময় আগে আসবে কেন করব, তারপর কী করব, তারপর কীভাবে করব।

     কিসের কাজ করছি? স্পেস সাইন্স। স্পেস হল পৃথিবীর উপর ফাঁকা জায়গাটা। পৃথিবীর উপর আছে বায়ুমণ্ডল। সেটা ক্রমে ক্রমে হাল্কা হয়ে ১০০ কিলোমিটারের পর প্রায় নেই। তাহলে আছে কী? আছে আয়নস্ফিয়ার, অর্থাৎ ইলেকট্রন আর আয়নিত গ্যাসের পরমাণু। এই আয়নস্ফিয়ারের দরুণ পৃথিবী থেকে রেডিও ওয়েভ ছাড়লে তা প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই আয়নস্ফিয়ার তিনশো কিলোমিটারের পর পাতলা হয়ে আসতে থাকে। আটশো হাজার কিলোমিটারের পর আর নেই। কিন্তু আধুনিক স্পেস মিশান বিশেষ করে লুনা -২ আর পায়োনিয়ার-৫ মিশানে দেখা গেছে ২০০০ কিলো মিটার থেকে ৬০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উচ্চতায় প্রচুর হাই এনার্জি ইলেকট্রন (১০০ কিলো ইলেকট্রন ভোল্টের মতো) এবং ততোধিক হাই এনার্জি প্রোটন (কয়েক মেগা ইলেকট্রন ভোল্টের মতো) ছড়িয়ে আছে। কিন্তু শুধু তাইই নয় দেখা যাচ্ছে এরও উপরে ১৩০০০ কিলোমিটার থেকে ৬০,০০০ কিলোমিটার উচ্চতায় আরও একদল আরো হাই এনার্জি ইলেকট্রন (৫ থেকে ১০ মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট) ছড়িয়ে আছে। এরা কোথা থেকে আসছে? পায়োনিয়ার – ৬ মিশনের হিসাবমতো এরা সূর্য থেকে আসছে। এই দুটো ইলেকট্রন আর আয়নের যে বেল্ট, তারই নাম ইনার ভ্যান অ্যালেন বেল্ট আর আউটার ভ্যান অ্যালেন বেল্ট। আমেরিকার ভ্যান অ্যালেন আর রাশিয়ার অ্যালেক্সান্ডার কোরোলভ নানা রকম হিসাব করে দেখিয়েছেন যে পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ডের জন্য সূর্য থেকে আসা তেজস্ক্রিয় কণারা সব এই অঞ্চলটায় আটকে পড়ে। তা না হলে এই সব হাই এনার্জি কণার আঘাতে পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্বই থাকত না। এখন মহাকাশের এই দুটো বেল্ট সম্বন্ধে জানার এখনো অনেক বাকি।

     বিক্রমের প্রজেক্টে প্রস্তাব করা হল স্রেফ এই দুটো বেল্ট সম্বন্ধে বিস্তর খুঁটিয়ে সার্ভে করার জন্য একটা স্যাটেলেইট মিশন পাঠানো হোক। মহাকাশে পার্টিকলদের গড় এনার্জি না মেপে বরং এনার্জি ডিস্ট্রিবিউশান মাপা হোক। মানে এক্স থেকে ওয়াই এনার্জির মধ্যে কত পার্টিকল আছে তারপর ওয়াই থেকে জেড এনার্জির মধ্যে কতগুলি আছে এইভাবে সব রেঞ্জের এনার্জির পার্টিকলদের হিসাব হোক। এবং সেটা সব রকম উচ্চতায় নেয়া হোক। সেই সঙ্গে ম্যাগনেটিক ফিল্ডও মাপা হতে থাক। মিশন শেষ হলে ভ্যান অ্যালেন বেল্ট সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য জানা হয়ে যাবে।

     কিন্তু একই রকেট বিভিন্ন উচ্চতার পুরো সার্ভে কী করে করবে। সাধারণত মহাকাশগামী রকেট ব্যালিস্টিক ট্র্যাজেকটরি ধরে যায়। পৃথিবী থেকে কিছু ছুঁড়ে দিলে সেটা যে পথ দিয়ে যায় তার নাম হল ব্যালিস্টিক ট্র্যাজেকটরি। ঢিল, বন্দুকের গুলি, কামানের গোলা সব ব্যালিস্টিক ট্র্যাজেকটরি ধরে চলে। যদি একটা নির্দিষ্ট বেগের থেকে বেশী জোরে ছোঁড়া হয় তাহলে পৃথিবীর আকর্ষণের বাইরে চলে যাবে। এই গতিবেগকে মুক্তি বেগ বা এস্কেপ ভেলোসিটি বলে। যদি মুক্তিবেগের কম ভেলোসিটিতে ছোঁড়া হয় তাহলে পৃথিবীর টানে সেটা পৃথিবীর চারপাশে উপবৃত্তের পথে ঘুরবে। ঠিক মুক্তিবেগ দিয়ে ছাড়লে পথটি হবে অধিবৃত্ত বা প্যারাবোলা। আর মুক্তিবেগের বেশী ভেলসিটিতে ছাড়লে পথটি হবে পরাবৃত্ত বা হাইপারবোলা পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে বিভিন্ন রকম কোনে যদি মুক্তিবেগ দিয়ে ছোঁড়া হয় তো ছোঁড়া জিনিষটা বিভিন্ন আলাদা পথে চলে। কিন্তু নিয়মটা একই থাকে। এখন যদি মুক্তিবেগের খুব কাছাকাছি একটা বেগ দিয়ে ছাড়া যায় তাহলে যে উপবৃত্তের পথে ঘুরবে তার চেহারাটা খুব বেশী চ্যাপটা রকম হবে। মানে সেটা পৃথিবীর খুব কাছে আসবে আবার অনেক দূরে চলে যাবে। তাহলে এই রকম লম্বাটে একটা কক্ষপথে যদি একটা স্যাটিলাইট স্থাপনা করা যায় যেটা পৃথিবী থেকে ২০০০ কিলোমিটার থেকে ৬০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত তাহলে সেই স্যাটিলাইট পুরো ভ্যান অ্যালেন বেল্টের যাবতীয় খবরাখবর নিয়ে আসতে পারবে।

     কিন্তু ভালো কাজের বাধা অনেক। প্রথমতঃ যে ধরনের কক্ষপথের কথা বলা হচ্ছে তাতে স্থাপনের জন্য মুক্তিবেগের নিরানব্বই শতাংশ বেগ লাগবে। ফলে হিসাবটা হতে হবে নিখুঁত। ভুল করে যদি একশো ভাগের এক ভাগও কম বেগে ছাড়া হয় তাহলে স্যাটিলাইট অনেক ছোটো কক্ষপথে ঘুরবে আর যদি একশো ভাগের এক ভাগ বেশী বেগে ছাড়া হয় তাহলে একেবারে চিরতরে হাওয়া হয়ে যাবে। এত সঠিক গতিবেগে কোনও কিছু ছোঁড়া অসম্ভব। দ্বিতীয়ত পৃথিবীর উপর মুক্তিবেগ হল ১১.৩ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ডে। এই বেগে কিছু ছুঁড়লে হাওয়ার সঙ্গে ঘষা খেয়ে বস্তুটার বেগ কমে যাবে আর সেই ঘষার জন্য যে উত্তাপ তৈরি হবে তাতে বস্তুটা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। বস্তুত বেশীর ভাগ উল্কা-খন্ডরা এই কারণেই পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে না।

     কিন্তু রকেটের গল্পটা অন্য। রকেটের বেগ ক্রমে ক্রমে বাড়তে বাড়তে শেষে মুক্তিবেগে পৌঁছায়। তার ফলে যে বড় সুবিধাটা হয় সেটা হল রকেট যতক্ষণ বায়ুমন্ডলের ভিতরে থাকে ততক্ষণ তার বেগ কম রাখা হয়। বায়ুমণ্ডলের বাইরে গিয়ে তারপর তার বেগ বাড়ানো হয়। ফলে দুনম্বর অসুবিধাটা রকেটের ক্ষেত্রে নেই, থাকলেও অনেক কম। কিন্তু নিখুঁত সঠিক বেগ?

     এখানেই হল বিক্রমের কেরামতি। রকেটের বেগ প্রতি মুহুর্তে মাপার এবং নিয়ন্ত্রন করার একটা পদ্ধতি সে বার করেছে। এর মধ্যে প্রচুর জটিল ইলেকট্রনিক্স যেমন আছে, তেমনই আছে রকেট ইঞ্জিনের ডিজাইন। এই পদ্ধতি প্রচলিত পদ্ধতি থেকে একেবারেই অন্যরকম। এর খুঁটিনাটি সব কিছুই বিক্রম হিসেব করে ফেলেছে। এখন শুধু কতকগুলো টেস্ট ফ্লাইট পাঠিয়ে জিনিষটার বাস্তবায়ন করে ফেলতে হবে। সফল হলে রকেট সাইন্সের একখানা বিরাট কীর্তিস্থাপন হবে।

     দিন তিনেক আগে টনির দেখার জন্য প্রজেক্ট প্রোপোজালটা হুয়ানার কাছে জমা দিয়েছিল বিক্রম। আজ দেখা করার কথা। চোখ ধাঁধান বড় প্রজেক্ট দেবার কথা বলেছিলেন না ও-কনর? তাইই করেছে বিক্রম। এবারে দেখা যাক।

     ভাবতে ভাবতেই বিক্রম দেখল হুয়ানা বিক্রমকে ইশারায় টনির ঘরে ঢুকতে বলছে।

     ঘরে ঢুকে বিক্রম প্রথমে আমেরিকান কায়দায় “হাই টনি” বলেও দেখলো টনি মন দিয়ে কিছু পড়ছে। কয়েক সেকেণ্ড পরে চোখ না সরিয়েই হাত নেড়ে বিক্রমকে বসতে বলল টনি। তার পর আরো মিনিট খানেক পড়ায় ব্যস্ত রইলো টনি। তারপর আস্তে আস্তে চোখ তুলে বিক্রমকে দেখলো। বিক্রমের মনের মধ্যে কোথায় একটা অ্যালার্ম বেজে উঠল। কিছু কি গোলমাল হল?

     -“ব্রিলিয়ান্ট!” চিবিয়ে চিবিয়ে টনি বলতে শুরু করে। “অ্যাবসলিউটলি ব্রিলিয়ান্ট। নতুন টেকনোলজি। একেবারে ইনোভেটিভ স্যাটিলাইট অরবিট। সেইসঙ্গে অন্তত পাঁচটা টেস্ট ফ্লাইটের খরচ। সব মিলিয়ে এক বছরের ধাক্কা।” বিক্রম টনির তাল বুঝতে না পেরে বাঁয়া তবলা কোলে বসে রইল।

     টনি এবারে সামান্য গলা তুলে বলল “আর এসব আমরা কেন করব? সাইন্টিফিক অবজেকটিভটা কী? না ভ্যান অ্যালেন বেল্টের চরিত্র বুঝতে হবে! ব্ল্যাডি ভ্যান অ্যালেন বেল্ট!! আচ্ছা তোমরা কি মহাকাশে ওই হতভাগা ডাচটার আবিষ্কার ছাড়া কিছুই দেখতে পাও না? ভ্যান অ্যালেন- মাই ফুট!!”

     টনির সর্বাঙ্গ দিয়ে ঘেন্না ফুটে বেরচ্ছিল। বিক্রমকে এবার তো কিছু বলতেই হয়। বলল “এই দুটো আয়নের বেল্ট ছাড়া তো নিয়ার স্পেসে আর কিছু পাওয়া যায়নি। আর এ দুটোর ইম্পর্টেন্স……”

     কথা শেষ হবার আগেই টনি গর্জন করে উঠল “নিয়ার স্পেসে খানিকটা জায়গায় আয়ন আছে, ব্যাস। এইটুকু ঘটনাকে সবাই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তাল করছে। যত ফিজিসিস্ট সব কটা ইম্বেসাইল! অন্য কিছু ভাবতেই পারে না! আরে বাবা নিয়ার স্পেসে আর কিছু নেই নাকি? খোঁজা হোক!”

     বিক্রম টনির কথার মধ্যে খালি ভ্যান অ্যালেনের প্রতি বিদ্বেষ ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারছিল না। সান্ত্বনা দেবার মতো করে বলল “এই মিশনটা তো সেই জন্যই প্রয়োজন। হয়ত একটা তৃতীয় আয়নের লেয়ার আছে যার…”

     টনি বিক্রমের প্রোজেক্ট রিপোর্টটা সজোরে টেবিলের উপর আছড়ে ফেলল। “ইউ ফুল! আয়ন ছাড়া কি আর কিছুই তোমার ওই মোটা মাথায় ঢোকে না? যদি তৃতীয় আয়নের লেয়ার আবিষ্কার হয়ও, তার এক্সপ্লানেশানটা দেবে কে? ওই ডাচটা! আমরা কি খালি ওকেই গ্লোরিফাই করার জন্য মিশন চালাবো নাকি?”

     বিক্রমের সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। আত্মসমর্পণের ভঙ্গীতে বলল “তুমি ঠিক কী চাইছ আমি বুঝতে পারছি না!”

     -”আমি কী চাইছি? গস!! এমন একটা প্রোজেক্ট চাইছি যেটা ইনোভেটিভ! তোমরা ওই ভ্যান অ্যালেন আর আয়ন এর বাইরে গিয়ে কি কিছুই করতে পারো না? তোমাদের মাথায় কি ছারপোকা ভরা?”

     বিক্রম ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছে দেখে টনির উত্তেজনা কমে আসে। বলে -”লুক ম্যান! তুমি অনেক খেটেছ। কিন্তু সমস্ত কাজটাই একটা লস্ট কজের জন্য করা হচ্ছে। আমি তোমাকে আর তিন মাস সময় দেব। ফর হেভেনস সেক এর মধ্যে নতুন কিছু একটা দাঁড় করাও।”

     বিক্রমের চোখের সামনে রক্ত ফুটতে থাকে। এই হতভাগার বিচারে তার এত দিনের পরিশ্রম কিচ্ছু না? নতুন? রাতারাতি বিজ্ঞানের জগৎএ নতুন কী হতে পার? একি ছেলেখেলা নাকি? এই নাকি বিশ্বখ্যাত নাসার অন্দরমহল! আর এর সম্বন্ধে পৃথিবীর লোকের কি না কি ধারণা! হঠাৎ ওর সম্মুগমের মুখটা মনে পড়ে গেল। কি যেন বলেছিল লোকটা। নাসা সব পারে। স্পেসে নিউক্লিয়ার বোমা ফাটাতে পারে! মনের জ্বালায় মুখ বেঁকে গেল বিক্রমের। আর থাকতে না পেরে বিদ্রুপের টোনে বলেই ফেলল।

     -”নতুন বলতে কি রকম চাইছেন? স্পেসে হাইড্রোজেন বোমা ফাটানো?”

     টনি থমকে গেল। ভ্রু কুঁচকে বলল -”স্পেসে হাইড্রোজেন বোমা? ইন্টারেস্টিং! সাইন্টিফিক অবজেকটিভ?”

     বিক্রম থতমত খেয়ে গেল। টনি তাহলে বিদ্রুপটা বুঝতে পারেনি? কিন্তু এবারে তো কিছু বলতে হবে, ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল “একদিকে বোমার একটা কমপ্লিট অবজারভেশান, যেটা মাটিতে টেস্ট করলে হয় না। দ্বিতীয়ত হাই স্পেসে তেজস্ক্রিয় পার্টিকলদের স্টাডি করা আর তৃতীয়ত সারা পৃথিবীকে দেখানো হোয়াট ইউ-এস-এ ক্যান ডু।”

     অ্যান্থনি ফেদারপ্রাইস চোখ কুঁচকে ভাবে। আস্তে আস্তে ওর মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে ওঠে। বলে -”দিস সাউণ্ডস নাইস। ওকে ম্যান। গো উইদ ইয়োর নিউ আইডিয়া। তোমাকে চার মাস সময় দিলাম। ভালো করে একটা প্রোপোজাল লেখ। তা বলে কাল থেকেই লিখতে বসে পড়ো না যেন। ইউ লুক হরিবল! একটু রেস্ট নাও। ক্রিসমাসের ছুটি কাটিয়ে নতুন বছরে নতুন প্রপোজাল লেখা শুরু কর। আমি তোমাকে আজ থেকে ৪ঠা জানুয়ারি পর্যন্ত কোনও রুটিন কাজ দেব না। তুমি ইচ্ছামত পড়াশুনা কর। বাই”

     বিক্রম কোনওমতে একটা ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে পড়ল। মাথা এখনো কাজ করছে না। কি থেকে কি হয়ে গেল। এখন তাহলে কি নিউক্লিয়ার ফিজিক্স পড়তে হবে? অবাক অবস্থাতেও বিক্রমের মাথায় একটা কথা ঘুরতে লাগল। এর নাম নাসা? এইভাবে এখানে প্রজেক্ট নেয়া হয়? হে ভগবান। কয়েকটা লোকের ইগোর জন্য এত এত কোটি ডলার ঢালা হবে?

     কাফেটেরিয়ায় একটা বড় এক্সট্রা ক্রীম দেয়া ক্যাপুচিনো খেতে খেতে বিক্রমের মনে হঠাৎ একটা পরিবর্তন এলো। আচ্ছা ও যেমন হেলা ফেলা করে ভাবছে তা না হয়ে এই স্পেসে হাইড্রোজেন বোমা ফাটানোর তো বেশ কিছু সাইন্টিফিক অবজেকটিভও থাকতে পারে? ভাবা যাক। কফি খেতে খেতে বিক্রম আবার গভীর ভাবনায় ডুবে গেল।

 

(৪)

স্থানঃ শার্লট, নর্থ ক্যারোলিনা
সময়ঃ সন্ধ্যা, ২৪ শে ডিসেম্বর, ১৯৬০

     একটা বড় আরামদায়ক ঘরে বিক্রম আর ও-কনর মুখোমুখি বসে আছে। ও-কনরের মেয়ে কলিন রান্নাঘরে কিছু একটা ভাজা খাবার বানানোর চেষ্টা করছে। আজ এই ক্রিসমাস ইভের সন্ধ্যায় সবারই মেজাজ বেশ প্রসন্ন। কাল রাতের প্লেন ধরে আজ সকালে এখানে এসেছে বিক্রম। কলিন তারও কিছুক্ষণ আগে এসেছে।

     বিক্রম ভয়ে ভয়ে ছিল। আমেরিকান মেয়েদের সম্বন্ধে ওর ধারণা কখনই খুব একটা ভালো ছিল না। ইউনিভার্সিটির সহপাঠিনীরা বিক্রমের সঙ্গে বিশেষ মিশত না। সবারই যেন উদ্দেশ্য একটা শাঁসালো গোছের বয়ফ্রেণ্ড যোগাড় করা। কারো সঙ্গে আলাপ করা, গল্প করা এসবের যেন একটাই উদ্দেশ্য। অন্য সময় তারা যেন কিরকম ভ্যাচকা মুখ করে থাকে। স্বাভাবিক আড্ডা মারার প্রবণতা খুবই কম। তার মধ্যে যদি কেউ বিক্রমের সঙ্গে কথা বলতো, তখনও কয়েকটা কথার পরেই পৃথিবী সম্বন্ধে তাদের সীমাহীন অজ্ঞতা প্রকাশ পেত। যেমন ভারতবর্ষ তো আফ্রিকার পাশেই, খ্রীষ্টান ছাড়া সবাই মূর্তিপূজা করে, ভিয়েতনামের কমিউনিষ্টরা মানুষের বাচ্চার রোষ্ট খায়, ইত্যাদি। এছাড়া হলিউডের কমার্শিয়াল সিনেমা আর রক সঙ্গীত ছাড়া আর কোনও কিছুতে আগ্রহ নাস্তি। বিক্রম ভেবে পেতো না ইউনিভার্সিটিতে পড়া আমেরিকান মেয়েদের আউট নলেজ এত কম কিভাবে হয়? এছাড়া যারা নানা রকম অ্যাক্টিভিস্ট ছিল তারাও ভীষণ গোঁড়া। বিরুদ্ধ যুক্তি শুনলেই চটে-মটে একশেষ। কলিনও এই ধরনের কোনও একজন প্রাণী হবে এটাই বিক্রমের ধারণা ছিল।

     কিন্তু বিক্রম আসার পর যখন ও-কনর কলিনের সঙ্গে বিক্রমের পরিচয় করিয়ে দিলেন, তখন কলিনের প্রথম কথাই ছিল “উই আর সো লাকি” আর সেই সঙ্গে উজ্জ্বল প্রসন্ন হাসি। কথাটা শুনতে বিক্রমের ভালো লাগলেও সে প্রশ্ন করে –”এক্সকিউজ মি, আমি ঠিক বুঝলাম না। লাক কেন?”

     -”আমরা আইরিশ তো, আমাদের একটা সংস্কার হচ্ছে ক্রিসমাসের আগের সন্ধ্যায় যদি বাড়িতে কোনও প্রাচ্য দেশের লোক আসে তো সেটা বিরাট সৌভাগ্য।”

     ও-কনর হেসে বলেন “ওটা আসলে জিসাসের জন্মের সময় পুবদিক থেকে আসা ওয়াইজ মেনদের প্রতীক।”

     বিক্রমের ভিতরটা এক ধরনের ভালো-লাগায় ভরে যায়। কলিন বাচ্চাদের মতো খুব সরল আন্তরিক ভাবে বলে –”তুমি আমাদের জন্য কোনও গিফট আনোনি?” ও-কনর ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে বলেন –”এ সব কি বলছিস তুই?” কিন্তু বিক্রমের মজা লাগে। ব্যাগ খুলে ও একটা দেড় ইঞ্চির ছোট টেরাকোটার নটরাজ বার করল। দেশ থেকে আসার সময় একে ওকে গিফট দেবার জন্যই এই সব ছোটখাট টুকিটাকি নিয়ে আসে সে। নটরাজটা হাতে পেয়ে কলিনের সে কি আনন্দ! বার বার বলে “দেখেছ বাবা, গিফট ফ্রম আ ওয়াইজ ম্যান অন ক্রিসমাস ইভ। এটা অমূল্য!” তারপর টিকা হিসাবে বিক্রমকে বলে “জিসাসের জন্য ওয়াইজ মেন গিফট এনেছিলেন। এই আর্ট অবজেক্টটা আমাদের লাকি চার্ম হয়ে থাকবে।” তারপর খুঁটিয়ে দেখে বলল –”এটা লর্ড শিভা, তাই না? ক্যাটাস্ট্রফিক ড্যান্স?”

     বিক্রম যতদূর সম্ভব অবাক হল! এ মেয়ে নটরাজ মূর্তি দেখেই চিনতে পারে, তার উপরে আবার তাণ্ডবনৃত্যর ও খবর রাখে? কি আশ্চর্য। বিক্রমকে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যেতে দেখে কলিন আবার হেসে ফেলে। এত উজ্জ্বল হাসিটা যে কলিনের অন্যথায় সাদামাটা চেহারাটা যেন আলো হয়ে গেল। কয়েক সেকেণ্ডের মুগ্ধতায় বিক্রম আশপাশ ভুলে গেল। কলিন হাসতে হাসতে বলল –“কোনও আমেরিকান মেয়ে লর্ড শিভাকে চিনতে পেরেছে বলে আশ্চর্য হচ্ছ। তাই না? সত্যি আমাদের অবস্থা আজকাল এরকমই হয়েছে। অথচ বাবা যখন ওয়াইজ মেন ফ্রম দ্য ইস্টের কথা বলল- আমরা সবাই ধরে নিলাম যে এটা তুমি বুঝতে পারবে। কারন অ্যান ইন্ডিয়ান ইস সাপোজড টু নো খ্রিশ্চান মিথস। অথচ এই তোমরাই নাকি আণ্ডার-ডেভালাপড দেশের লোক!”

     ও-কনর কলিনকে আবার একটা ছোট বকুনি দিলেন –”বিক্রম ইস টায়ার্ড। ওকে ওর ঘরটা দেখিয়ে দাও।”

     ঘরে বসে বিক্রম ভাবছিল এত ভালো হাসিখুশি বুদ্ধিমতী মেয়েকে নিয়ে ও-কনরের কি এমন সমস্যা? আর বাবার কথা যে এ মেয়ে অবজ্ঞা করে তাও তো মনে হচ্ছে না। বাবা মেয়ের সম্পর্ক তো দিব্যি বাঙালীর ঘরের মতোই লাগছে। সম্পর্কের জটিলতা কি ভাবে তৈরি হয় কে জানে!

     বিক্রমের মন বর্তমানে ফিরে এল। দেখল কলিন ওদের সামনে বিভিন্ন শেপের একগাদা তেলেভাজার মতো খাদ্য এনে রাখল। ও-কনর লিকার ক্যাবিনেট থেকে একটা ওয়াইনের বোতল বার করলেন। বিক্রম লক্ষ করল কলিনের ভ্রূ কুঁচকে গেছে। তারপর ও-কনর যখন দুটি গ্লাসে ওয়াইন ঢাললেন তখন বিক্রম আরো অবাক হল। কলিন খাবে না? একটা গ্লাস ও-কনর যখন বিক্রমের দিকে এগিয়ে দিলেন তখন কলিন সরাসরি বিক্রমকে প্রশ্ন করল “তুমি তো ইণ্ডিয়ান! তুমি কি নিয়মিত ওয়াইন খেতে অভ্যস্ত?” বিক্রম “না” বলতেই কলিন ও-কনরকে বলল “তুমি ওকে ওয়াইন দেবে না।” ও-কনর একটু অসহায় ভাবেই বললেন “আজ ক্রিসমাস ইভ। আর এটা তো কোনও হার্ড লিকার নয়।” কিন্তু কলিনের কটমটে দৃষ্টির সামনে ও-কনর কিরকম চুপসে গেলেন। কলিন বলল “তোমাকে আমি খেতে বারণ করিনি বাবা।” বিক্রম অবস্থা সামাল দেবার জন্য বলল “তুমি ওয়াইন খাও না?”

     -”না”

     -”কেন”

     -”এটা মানুষের স্বাভাবিক খাদ্য নয় বলে।”

     বিক্রম তেলেভাজাগুলি দেখিয়ে বলল -”সেক্ষেত্রে এগুলোও তো মানুষের স্বাভাবিক খাদ্য নয়।”

     -”নয় তো। কিন্তু এগুলো খাওয়া ছাড়ার মতো অবস্থায় আমি এখনো আসিনি। চেষ্টা করি না তা নয়। কিন্তু পারছি না। আমাদের অনেকে যথা সম্ভব কম রান্না করা খাবার খায়। তবে আমি এখনো তা পারি না। তবে যে কোনওরকম অ্যালকোহল, তামাক বা অন্য নেশার জিনিস আমরা ছুঁই না। “

     -”তোমরা কারা?”

     -”আমরা ‘গো গ্রিন’ অ্যাকটিভিস্ট।”

     ও-কনর গলাটা কঠিন করার চেষ্টা করে বললেন -”প্লিজ কলিন। এই সময় তোমার ওই সব পাগলামির গল্প রাখো।”

     বিক্রম কলিনের দিক থেকে একটা কঠিন জবাব আশা করছিল। কিন্তু কলিন ভীষণ হাসিমুখেই বলল -”ইউ আর রাইট ড্যাড। বরং তুমি ক্রিসমাস ইভের উপযুক্ত একটা ভূতের গল্প বল।” বিক্রমের দিকে ফিরে বলল “সারা গ্রেট ব্রিটেনের প্রাচীন ঐতিহ্য হল ক্রিসমাস ইভে হাড়-কাঁপানো ভূতের গল্প শোনা।” ও-কনর ভয়ানক প্যাঁচে পড়ে গিয়ে বললেন -”সারা জীবন ফিজিক্সের পিছনে ছুটে ভূতের গল্প শেখার স্কোপ কোথায় পেলাম? বরং বিক্রম তুমি একটা ইণ্ডিয়ান ভূতের গল্প শোনাতে পারো।”

     বিক্রমের ক্রমেই এই পারিপার্শ্বিকটা আরো ভালো লাগছিল। এই নিস্তব্ধ শীতের সন্ধ্যায় ফায়ারপ্লেসের ধারে আলো আঁধারিতে দুটি সুন্দর মনের শ্রোতা তার কাছে গল্প শুনতে চাইছে। বিক্রমের মনে পড়ে গেল তার ছোটবেলায় হুগলির এক গ্রামে তার মামাবাড়িতে বর্ষার রাত্রিবেলা দিদিমা কী রোমাঞ্চকর সব ভূতের গল্প শোনাতো। একটা গল্প বিক্রমের মনে পড়ল। ‘গদখালির হাত’ এর গল্প। এ গল্প বিভিন্ন চেহারায় সব বাঙালীরই জানা। কলেরায় উজাড় হওয়া গ্রামে প্রবাসী ছেলে সন্ধ্যায় ফিরে এসে বউকে লেবুর সরবৎ করে দিতে বলায় বউ ঘর থেকে হাত লম্বা করে বাগানের গাছ থেকে লেবু ছিঁড়ে এনে দেয়।

     দিদিমাকে স্মরণ করে বাড়িয়ে গুছিয়ে যথা-সাধ্য রোমাঞ্চকর করে গল্পটা পেশ করে বিক্রম। কলিনের বড়বড় আগ্রহী চোখ বিক্রমকে আরো অনুপ্ররণা দেয়। গল্প শেষ হতে কলিন বাচ্চা মেয়ের মতো শিউরে ওঠে। ও-কনর বলে ওঠেন “এ গল্পটা যে কোনও ব্রিটিশ ঘোস্ট স্টোরির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। আনলাইক ইউরোপিয়ান স্টোরি, বীভৎসতা কম, কিন্তু হরর প্রচুর।”

     কলিন তখনো গল্পটার ঘোরে রয়েছে মনে হয়। বলল “কিন্তু ওদের প্রতিবেশীরা ছেলেটিকে খবর দেয় নি?”

     বিক্রম হাসল বলল -”মড়কের সময় গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। সৎকার করার লোক থাকত না। শেয়াল, কুকুরে…”

     -”প্লিজ স্টপ ইট! আমি ভাবতেও পারছি না!” বিক্রম অবাক হয়ে দেখল কলিনের দুই চোখে জল ছলছল করছে। কয়েক সেকেণ্ড পর চোখ মুছে কলিন বলল “সরি। আমি বড্ড ওভার-রিয়্যাক্ট করে ফেলেছি।”

     বিক্রমের মনে মনে বলল ‘কন্যা, তোমার ওভার রিয়্যাকশান বড় সুন্দর হে।’

     এবারে বিক্রম কলিনকে বলল “এবারে তুমি একটা গল্প বল। বেশ ভয়ংকর হওয়া চাই।”

     কলিন হাসল। কেমন যেন শক্ত হাসি। বলল “আমি একটা ভয়ংকর ভূতের গল্পই জানি। কিন্তু তার আগে তুমি বলতে পারবে এই কোটেশানটা কোথা থেকে নেয়া? ‘আ স্পেক্টা ইস হন্টিং ইউরোপ। দ্য স্পেক্টা অফ……’ ফিল ইন দি ব্ল্যাংক।”

     স্পেক্টা অর্থ ভূত।

     বিক্রম একটু হাসল। শিক্ষিত বাঙালির ছেলে এ কোটেশান জানে। বলল “দ্য স্পেক্টা অফ কমিউনিজম। এটা কমিউনিষ্ট ম্যানিফেস্টোর প্রথম লাইন।”

     সঠিক উত্তরের জন্য বিক্রম কলিনের কাছ থেকে প্রশংসা আশা করছিল। কিন্তু তার আগেই ও-কনর বলে উঠলেন “এ সব বন্ধ করো কলিন”। কলিন হাসি মুখেই বলল -”দেখলে বিক্রম! ইট ইস স্টিল হন্টিং।” তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল -”না বাবা। আমি ওসব কথা বলতে চাই না। আমি আরো ভয়ানক একটা ভূতের গল্প বলতে চাই। আ স্পেক্টা ইস নাউ হন্টিং দি হোল ওয়ার্ল্ড। এই ভূতটা অলরেডি আড়াই লক্ষ মানুষকে মেরেছে আর অন্তত দশ লক্ষ মানুষকে জীবন্মৃত করে রেখেছে। কিন্তু বর্তমানে এই ভূতটা যা করতে পারে তার তুলনায় ভূতটা আগে যা করেছে তা নেহাতই তুচ্ছ। এ স্পেক্টা অফ নিউক-ওয়েপন।” ও-কনর আবার বাধা দেবার চেষ্টা করলেন কিন্তু কলিন অস্বাভাবিক শক্ত গলায় বলল -”তোমরাই ভয়ংকর ভূতের গল্প শুনতে চেয়েছ। শুনতে হবে।”

     কলিন বলে চলল -”সাধারন বোমার এনার্জি বেরোয় ব্লাস্টে বা ধাক্কায় আর তাপশক্তিতে। কাজেই বোমাটা ফেটে যাবার সময় যদি কেউ আহত বা নিহত হয় তবেই বোমা থেকে তার ক্ষতি হবে, পরে আর কিছু হবে না। কিন্তু নিউক যখন ফাটে অবিশ্বাস্য ব্লাস্ট আর তাপ তো তৈরি হয়ই, কিন্তু তারপরও রয়ে যায় নিউক্লিয়ার রেডিয়েশানের বিপদ। একটা এক মেগাটন নিউক্লিয়ার বোমা থেকে একশো পিটা-রেম পরিমান রেডিয়েশান বেরোয়। মানে একের পিঠে সতেরোটা শূন্য দিলে যত রেম রেডিয়েশান হয় তত। এদিকে একটা মানুষের শরীরে যদি পাঁচ হাজার রেম রেডিয়েশান ঢোকে তাহলে দু মাসের মধ্যে তার মৃত্যু নিশ্চিত। ইন ফ্যাক্ট ১০০ রেম ঢুকলেই ক্যান্সার হবার সম্ভবনা যথেষ্ট বেড়ে যায়। এবারে পৃথিবীর মানুষের সংখ্যা যদি তিনশো কোটি হয় তাহলে বোমা পিছু মাথা পিছু রেডিয়েশানের ভাগ হল তিন কোটি রেম। ভয় লাগছে?”

     বিক্রম স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। এ হিসাবটা সে জানত না। এতটা ভয়ংকর? প্রশ্ন করল -”এক রেম মানে কী।”

     -”রন্টজেন ইকুইভ্যালেন্ট ম্যান। র্যাডিয়েশানের সি-জি-এস ইউনিট। ১০০ আর্গ/গ্রাম হল এক রেম।” [বর্তমানে অবশ্য এস-আই ইউনিট সিভার্ট ব্যবহৃত হয়]

     এবারে ও-কনর কথা বললেন। “এটা পুরোটাই ধাপ্পাবাজির হিসাব। বোমা ফাটা রেডিয়েশানের কতটুকু মানুষের কাছে পৌঁছায়? তিন রকম রেডিয়েশান হয়। আলফা রেডিয়েশান যায় ৫ সেন্টিমিটার, আর বিটা যায় ১৫ সেন্টিমিটার আর গামা তো আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ে।”

     কলিনের গলার শিরা ফুলে উঠল। বলল -”তোমাদের মতো সাইন্টিস্টরা যখন ইচ্ছে করে মানুষকে ভুল বোঝায় তখনই ভূতটা গায়ে জোর পায়। তুমি জানো আলফা রেডিয়েশান আর বিটা রেডিয়েশান কোথায় যায়। তারা অন্য সব পদার্থের মধ্যে ঢুকে তাদের রেডিও-অ্যাকটিভ আইসোটোপ তৈরি করে। তারা আবার সময় সুযোগ মতো রেডিয়েশান ঘটায়। এই বিষ ক্রমশঃ জমা হতে থাকে। একদিন আসবে যেদিন জলে বিষ, স্থলে বিষ, হাওয়ায় বিষ। সেদিন কি হবে বল তো? একটু জাপানের হসপিটালগুলো দেখে এসো। বুঝতে পারবে ভূতটা আমাদের কিভাবে শেষ করে দিতে চাইছে!”

     একবার দম নেয় কলিন। বলে -”১৯৪৫ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত সাড়ে তিনশো নিউক্লিয়ার বোমা টেস্ট হয়েছে। হ্যাঁ, বাবা বলবে সব প্রশান্ত মহাসাগরের বিজন দ্বীপে হয়েছে। কিন্তু মহাসাগরের জল, বাতাস আস্তে আস্তে রেডিও অ্যাকটিভ বিষ দিয়ে বিষাক্ত করে তোলার কী অধিকার রয়েছে আমাদের? আর এই সব বোমা যখন অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার হবে তখন?”

     কলিন চুপ করল। বলল “সরি! আমার গল্পটা বেশী বেশী ভয়ংকর হয়ে উঠল। কিন্তু বিশ্বাস করো বিক্রম, একটা গর্ভস্থ শিশুকে বিকলাঙ্গ করে দিতে মোটে পঞ্চাশ রেম রেডিয়েশান যথেষ্ট। আর আমরা নিউক টেস্টের নামে আকাশে বাতাসে এ পর্যন্ত কম বেশী যা রেডিয়েশান ছড়িয়েছি তা তিনশো মিলিয়ান বিলিয়ান! হ্যাঁ ঠিক বললাম, তিনশো মিলিয়ান বিলিয়ান, গর্ভস্থ প্রাণীকে বিকলাঙ্গ করার পক্ষে যথেষ্ট। এই পাপ ফিরে আসবে না মনে করছ? রেডিয়েশানের ফলে যে মাছের জিন নষ্ট হয়ে গেছে, সে মাছ খেলে তোমার কিছু ক্ষতি হবে না তুমি ঠিক জানো? ভগবান এই অন্যায় ক্ষমা করবেন?”

     কলিন হাঁফাতে থাকে। ও-কনর একদম গোঁজ হয় চুপ করে যান। বিক্রম কি বলবে ভেবে পায় না। কলিন মিনিটখানেক চুপ করে থাকে। তারপর উঠে ও-কনর কে জড়িয়ে ধরে। বলে “সরি বাবা। তোমাকে বাজে কথা বললাম। কিন্তু আমরা ভয়ানক বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে। আমি কিছুতেই ভাবতে পারি না তোমার ক্যান্সার হবে।”

     ও-কনর ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন “কলিন। তুই ছাড়া আমার কেউ নেই। এই অ্যাক্টিভিস্টদের সঙ্গ ছাড় মা। ওরা তোকে যদি জেলে আটকে রাখে আমায় কে দেখবে বল?”

     কলিন নিজের জায়গায় ফিরে গেল। বলল -”ন্যায়ের জন্য আমাদের পরিবার চিরকাল লড়াই করেছে বাবা। তুমি আয়ারল্যাণ্ড ছেড়ে আমেরিকা চলে এসেছিলে কেন? সে গল্প আমি জানি না ভাবছ? তুমি বল নি, কিন্তু আমি জানি তুমি সিন-ফিয়েন ছিলে। ডাবলিনে থাকলে তোমার নিশ্চিত ফাঁসি হত।”

     বিক্রমের আর অবাক হবার ক্ষমতা ছিল না। সিন-ফিয়েন হল আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে উগ্রপন্থী দল। এই বুড়ো প্রফেসার যৌবনে জীবন বাজী রেখে নিজের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে লড়াই করেছিলেন? তার জন্য দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল? বিক্রমের মাথা শ্রদ্ধায় নুয়ে এল।

     ও-কনর কিরকম একটা অদ্ভুত মুখ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখ জলে ভেসে যাচ্ছিল।

 

(৫)

স্থানঃ কলোরাডো, বোল্ডার
সময়ঃ ২০ জুন, ১৯৬১

     এই মাসের গোড়ার দিকে বিক্রম তার প্রোজেক্ট সাবমিট করেছে। এবারে ও আর অত খাটেনি। মোদ্দা কথাটা হল একটা দেড় মেগাটনের হাইড্রোজেন বোমা মোটামুটি হাজার কিলোমিটারের মতো উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে ফাটাতে হবে। এখন পর্যন্ত আমেরিকার তরফে যে কটা নিউক্লিয়ার টেস্ট হয়েছে তা সবই হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিন দিকের জনবিরল দ্বীপগুলোয়। মাটির উপর একটা ছোট লোহার খাঁচায় বোমাটা রেখে ফাটানো হয়। তারপর দূরে জাহাজ থেকে আর আকাশের প্লেন থেকে সমস্ত হিসাব নিকাশ করা হয়। যেমন কত শক্তি উৎপন্ন হল, কত রেডিয়েশান সৃষ্টি হল, কি ধরণের রেডিয়েশান কত পরিমানে তৈরি হল এইসব।

     এখন মাটির উপর টেস্টের প্রধান সমস্যা হল মোট রেডিয়েশানের অর্ধেক মাটিতে ঢুকে পড়ে এবং সেকেণ্ডারি রেডিয়েশান সৃষ্টি করে। ফলে এক ঠিকমতো রেডিয়েশানের হিসাব পাওয়া যায় না। দুনম্বর, প্রবল রেডিও-অ্যাক্টিভ বর্জ পদার্থের কারণে ওই দ্বীপটা মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এমনকি পরের বোমাটা টেস্ট করার জন্য ওই দ্বীপে যাওয়াটা পর্যন্ত অসম্ভব বিপদজনক হয়ে থাকে। এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে এত জনবিরল দ্বীপই বা কোথায় পাওয়া যায়?

     আকাশে হাজার মাইল উপরে বোমা ফাটালে এইসব সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে। আমেরিকার সমস্ত অ্যাটমিক রিসার্চ ল্যাব থেকে সরাসরি বোমাটা ফাটতে দেখা যাবে। অনেকগুলো ল্যাব এক সঙ্গে হিসাব নিকাশ করতে পারার ফলে অনেক নিখুঁত হিসাব পাওয়া যাবে। দশটা বোমা ফাটানোর তথ্য একটা বোমা থেকে পাওয়া যাবে। তাছাড়া নিউক্লিয়ার বর্জ্যগুলোও বহুদূরে রইল।

     কিন্তু এতো গেল খালি বোমা টেস্টিং সুবিধা অসুবিধা। নিয়ার স্পেসে হাই এনার্জি পার্টিকল ঢুকলে ঠিক কী হয়, নিজেদের ইচ্ছামত এনার্জি নিয়ার স্পেসে ছাড়লে তার কত অংশ কোনও কোনও সেক্টারে যায় সবই এই এক এক্সপেরিমেন্ট থেকে জানা যেতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি, সম্মুগম যখন স্পেসে নিউক্লিয়ার বোমা ফাটানোর কথা বলেছিল, তখন হাসি পেলেও এখন সব লেখালেখির পর বিক্রমের মনে হচ্ছে এটা একটা দারুণ ইন্টারেস্টিং প্রজেক্ট হতে চলেছে।

     কিন্তু টনির অফিস থেকে কোনও হ্যাঁ বা না, কিছুই বিক্রমকে জানানো হয়নি। বিক্রম আবার আগের সেই বিরক্তিকর প্রোগ্রাম লেখার কাজে ফিরে গেছে। তবে আগের মতো কাজের চাপ এখন নেই। একটু দেরি করেই আজ বিক্রম ল্যাবে ঢুকল। কিন্তু ঢুকেই শুনল হুয়ানা এখনি টনির ঘরে দেখা করতে বলছে। বিক্রম উর্ধশ্বাসে টনির ঘরে ছুটলো।

     টনির ঘরে অন্তত জনা সাতেক লোক বসে। টনিকে যেন কিরকম জুবুথুবু লাগছিল। ঘরে ঢোকা মাত্র টনি সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। এরা সব স্ট্র্যাটেজিক নিউক্লিয়ার ডিফেন্সের (এস-এন-ডি) লোক। বিক্রমের সঙ্গে কথা বলতে চায়।

     বিক্রমের আক্কেল গুড়ুম। যা বোঝা গেল তা হচ্ছে আকাশে নিউক্লিয়ার টেস্টের প্রস্তাব এদের পছন্দ হয়েছে। তবে নিউক্লিয়ার বোমার ব্যাপারটা যেহেতু সরাসরি স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্সের ব্যাপার তাই এই প্রোজেক্টটা অ্যালবামার আর্মি ব্যালিস্টিক মিসাইল এজেন্সি আর এস-এন-ডি মিলে করবে। এতে জেপিএল থাকছে না। কিন্তু বিক্রম যেহেতু প্রোজেক্টটা লিখেছে তাই আপততঃ এস-এন-ডি বিক্রমকে জেপিএলের কাছ থেকে ধার নিতে চায়। অবশ্য যদি জেপিএলের অনুমতি পাওয়া যায় তবেই।

     টনি হাঁ হাঁ করে উঠে বলে “আপত্তির কোনও জায়গাই নেই। কনগ্রাচুলেশান অ্যান্ড বেস্ট অফ লাক স্যারখার ফর ইওর নিউ অ্যাসাইনমেন্ট”। কিন্তু টনির চোখের গভীর হতাশা বিক্রম লক্ষ করল। ভ্যান অ্যালেনকে বাদ দিতে গিয়ে টনি নিজেই বাদ পড়ে গেল!

     ঠিক হল বিক্রমের নুতন আস্তানা হবে খোদ নিউইয়র্কে এস-এন-ডির অফিসে, যতদিন পর্যন্ত না এই প্রোজেক্ট শেষ হয়। সামনের সপ্তাহেই ডেরাডান্ডা বেঁধে নিউইয়র্ক রওনা হতে হবে।

     ল্যাবে ফিরেই শুনল কে যেন ফোন করে বিক্রম এসেছে কি না তার খোঁজ নিয়েছে। বিক্রম একটু আশ্চর্যই হয়েছিল। এখানে কে তার খোঁজ নেবে? কিন্তু ঘরে বসতে বসতেই আবার ফোন।

     ফোন ধরল বিক্রম। ওপাশে কি আশ্চর্য! কলিন!

     -”হাই বিক্রম! আমি এখন তোমার বোল্ডারে। আজ বিকেলে তুমি ফ্রি আছো?”

     -”হোয়াট এ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ! নিশ্চয়ই ফ্রি আছি। তুমি কোনও হোটেলে উঠেছো?”

     -”আমি এক পরিচিতর এখানে এসেছি। ডোন্ট ওয়ারি, বিকেলে আমি তোমাকে এখান থেকে পিক আপ করে নেব”।

     বিক্রমের একটু অদ্ভূত লাগল। এদেশে কেউ কারুর বাড়িতে সহজে থাকতে চায় না। হোটেলে থাকাই বেশি পছন্দ করে। তাছাড়া কলিন এখান থেকে বিক্রমকে পিক আপ করে নেবে এটাও ঠিক স্বাভাবিক নয়। বরং বিক্রম কলিনকে তার পরিচিতর বাড়ি থেকে গাড়িতে তুলবে, সেটাই যেন ঠিক ছিল।

     তিনটে নাগাদ কলিন এল একটা পুরোন স্টুডিবেকার গাড়ি নিয়ে। বিক্রম লক্ষ করল কলিন ভীষণ খুশি খুশি হয়ে আছে। ক্রিসমাসের সময় কিন্তু ঠিক এতটা লাগেনি। কলিন প্রশ্ন করল “এখানে তোমার জানা কোনও বেড়ানোর জায়গা আছে? আমি বোল্ডার শহরে নুতন”। বিক্রমের জানা একটাই জায়গা ছিল এল্ডোরাডো ন্যাশনাল পার্ক। গাড়ি চালিয়ে সেদিকেই যাওয়া হল। পুরো রাস্তাটাই কলিন বিক্রমের ছোটবেলা, ভারতবর্ষের সমাজ ইত্যাদি নিয়ে নানা প্রশ্ন করে গেল। দেখা গেল হিন্দুধর্ম নিয়েও কলিনের অনেক কিছু জানা আছে।

     এলডোরাডো ন্যাশন্যাল পার্ক বস্তুত কলোরাডো নদীর খোয়াই। রকি পর্বতমালার গোলকধাঁধার মধ্যে হারিয়ে যাবার আগে একটা ছোটখাট টিলাকে দুভাগ করে খরস্রোতা কলোরাডো এগিয়ে গেছে। জায়গাটা বেশ সুন্দরভাবে সাজানো। একটা ব্রিজ দিয়ে আবার নদীর ওপারেও যাওয়া যায়। বিভিন্ন রকম নারী পুরুষের জোড়া ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছে। কেউই একা নেই। খালি লাল রঙের টুপি পরা একটি মেয়ে একা উদাসভাবে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

     কলিন বলছিল বিক্রমের দেয়া নটরাজ মূর্তিটা সত্যিই লাকি। কারণ বহুদিন পরে ও-কনর নাকি আবার তাঁর স্বাভাবিক হাসিখুশি ভাব ফিরে পেয়েছেন। কলিনকেও আর বকাবকি করছেন না। এখন কলিনের প্রশ্ন নটরাজের এই তাণ্ডব নৃত্যের তাৎপর্য কি? এর জবাবে বিক্রমকে শুরু করতে হয় দক্ষরাজ প্রজাপতির কন্যা সতীর কাহিনী দিয়ে। পুরো গল্প শুনে কলিন মুগ্ধ। বলে “এরকম ভালোবাসা তোমাদের প্রাচ্য দেশেই বোধহয় সম্ভব”। গল্প করতে করতে ওরা কলোরাডোর ওপারে চলে এসেছিল। হঠাৎ বিক্রম ওপারে আবার সেই লাল টুপি পরা মেয়েটিকে লক্ষ করল। উদাস ভাবে হেঁটে চলেছে। এ মেয়েটার আবার গল্প কি কে জানে? ভগ্নহৃদয়? হতে পারে।

     কিছুক্ষণ পর কলিন ফিরে যেতে চাইল। পার্কের গেটের কাছে এসে বিক্রম আবার লক্ষ করল লাল টুপি ওদের সঙ্গেই বেরিয়ে আসছে। মেয়েটাকে বেশ গ্ল্যামারাস দেখতে। কিন্তু ভালো করে নজর করার আগেই কলিনের নজর পড়ে গেল।

     -”মেয়েটা খুব সুন্দরী না?” কলিনের গলায় একটু ঈর্ষার সুর লাগল মনে হয়!

     বিক্রম একটু থতমত খেয়ে বলল, “মানে বেশ আর কি…”

     কলিন একটু ঘাড় বেঁকিয়ে বলল “নেহাত পেত্নীর মতো থাকি তাই। সাজগোজ করলে আমাকেও বেশ ভালোই দেখাবে।”

     বিক্রমের মুখে ক্ষণিকের অবিশ্বাস ফুটে উঠেছিল মনে হয়। কলিন একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল “বিশ্বাস হল না? আচ্ছা দেখাচ্ছি।” বিক্রম এদিক ওদিক করে ‘না না সে কি কথা’ বলার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু কলিনের মুখে তখন একেবারে মোগলাই পরোটার মতো কঠিন প্রতিজ্ঞা ফুটে বেরোচ্ছে।

     শহরে পৌঁছে কলিন একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে সোজা জামাকাপড় সেকশানে চলে গেল। সেখান থেকে দেখে শুনে একটা দারুণ সুন্দর মভ রংএর ফ্রকের মতো পোষাক কিনল। এরপর আবার ড্রাইভ করে একটা বিউটি পার্লারের সামনে নামল। বিক্রমকে বলল “এখন বাজে ছটা। তুমি আটটার সময় গ্রান্টস-ইভনিং রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমার নামে বুক করা টেবিলে বসে থাকবে।” বিক্রমকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কলিন সোজা বিউটি পার্লারে ঢুকে গেল।

     বিক্রম খানিকটা বিপদেই পড়ল বলা যায়। এই দু ঘন্টা সে করে কি? এই মেয়েটা কি ভীষণ পাগলী টাইপের। কিন্তু বিক্রমের বুকের মধ্যে তিরতির করে ভালোলাগার স্রোত বইতে থাকে। কলিন তাকে, কেবল তাকেই দেখাতে চায় সে কত সুন্দর? কেন? তবে কী… আর বিক্রমের ভাবার সাহস হয় না। কলিনের চেহারাটা সাদামাটা হলে কি হয় বিক্রমের ওকে ভীষণ ভালো লাগতে শুরু করেছে।

     সব কিছুর মতো দুঘন্টা সময়ও স্বাভাবিক নিয়ম মতোই শেষ হল। বিক্রম এখন গ্রান্টস ইভিনিং এ একটা ছোট টেবিলে বসে। বোল্ডার ছোট শহর হলেও এই রেস্তরাঁটা বেশ কেতার। চারদিকে জোড়ায় জোড়ায় সব বসে আছে। পরিবার নিয়ে খেতে আসা লোকের সংখ্যা বেশী নয়। এটা আসলে প্রেমিক-প্রেমিকাদের জায়গা। কলিন ওকে এখানে নিয়ে এল কেন? বিক্রম কি আজ কলিনকে নিজের হৃদয়ের কথা বলে দেবে? কিন্তু কলিন যদি নাক শিঁটকায়? যদি বলে ‘এসব কি বলছ? তোমাকে শুধু বন্ধুর মতো দেখি।’ দূর বাবা! এ কি বিপদে পড়লাম! আসুক কলিন, তারপর দেখা যাবে! আর সেই বা আসে না কেন?

     ভাবতে ভাবতেই বিক্রমের নজর চলে গেল সদ্য ভিতরে আসা সুন্দরীটির দিকে। আর শুধু বিক্রম কেন গোটা রেস্তোরাঁই একযোগে সেইদিকে তাকালো। মনে হল একটা দীর্ঘশ্বাসের ঝড় বয়ে গেল। কিন্তু এই মেয়েটি একা কেন? এমন সুন্দরীকে অপেক্ষা করিয়ে রাখবে কার এমন স্পর্ধা! দেখতে দেখতে মেয়েটি বিক্রমের টেবিলে চলে এল।

     -”কি হল? এক্কেবারে মাথা ঘুরে গেছে মনে হয়?”

     কিমাশ্চর্যম-ইতঃপরম! কলিন!! সেই কলিন?? এতো শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হবার থেকেও বেশী!!

     পরনে সদ্য কেনা সেই মভ রঙের কাজ করা ফ্রক! মাথার চুল সম্পূর্ণ অন্য কায়দায় কাটা। চোখের চশমা গায়েব। আর কি কি হয়েছে অনভিজ্ঞ বিক্রমের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এই চেহারায় কলিন যে কোনও বিউটি কন্টেস্ট জিতে নেবে!

     বিক্রম তখনো মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে দেখে কলিন খিলখিল করে হেসে ফেলল। তারপর চেয়ারে বসে টেবিলের উপর ঝুঁকে একটু সময় নিয়ে বলল।

     -”সত্যি করে বলবে। আমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে?”

     ঠিক সেই সময়ে বোল্ডারের রাস্তার ধারে একটা ড্রাগ স্টোর থেকে লাল টুপি পরা মেয়েটা ফোন করল।

     -”হ্যালো! ভেরি সরি, কিন্তু আমি মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলেছি।”

     -”অ্যাবসার্ড! মেয়েটা বিউটি পার্লারে ঢুকেছিল বললে তো।”

     -”হ্যাঁ। কিন্তু বেরোয় নি।”

     -”তাহলে নিশ্চয়ই ভিতরে আছে।”

     -”না নেই। দেরি দেখে আমি ভিতরে ঢুকে দেখেছি। নেই”

     -”ওর গাড়িটা কোথায়?”

     -”ওটা তো রাস্তার ধারে পড়ে আছে। খুব সম্ভব কার রেন্টালের গাড়ি।”

     -”আবার ভিতরে যাও। গিয়ে চেহারার বর্ণনা দিয়ে জিজ্ঞাসা কর কোথায় গেল? বল ও তোমার হাসব্যাণ্ডের সঙ্গে প্রেম করার চেষ্টা করছে। তুমি আজ শেষ হেস্তনেস্ত করবে বলে এখানে এসেছ। তারপর খুঁজে পাচ্ছ না। একটু কান্নাকাটিও কোরো। দেখবে বিউটি পার্লারের মেয়েগুলো সব বলে দেবে”

     গ্রান্টস এভিনিং রেস্তোরাঁয় সেই সময় বিক্রম কলিনকে বলছিল আগামী বছরখানেক সে নিউইয়র্কে থাকবে।

     -“হ্যালো। মেয়েটা চলে গেছে।”

     -“পিছনে কোনও দরজা ছিল?”

     -“না। ড্রেস চেঞ্জ করেছে। প্রচুর মেক ওভার করেছে। বিউটি পার্লারের মেয়েগুলোই বলছিল মেক ওভারের পর অবিশ্বাস্য গ্ল্যামারাস দেখাচ্ছিল। আমার হাসব্যান্ডের নাকি খুব একটা দোষ নেই। সামনের দরজা দিয়েই বেরিয়েছে।”

     -“অথচ তুমি চিনতে পারো নি? অপদার্থ কোথাকার! যাহোক ফিরে এসো। এইটুকু শহরে যাবে কোথায়!”

     বিক্রমদের ডিনার যখন শেষের দিকে তখন এক দীর্ঘদেহি সুসজ্জিত পুরুষ এসে ওদের টেবিলের সামনে দাঁড়াল। বিক্রম একটু বিরক্ত হয়েই চোখ তুলে তার দিকে তাকালো। কিন্তু তার কোনও ভাবান্তর হল না। অকস্মাৎ কলিন লাফিয়ে উঠল। বলল -”আরে তুমি এখানে? কি খবর?” বিক্রম চমকিত হয়ে দেখল কলিন একেবারে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পুরুষটি ভারি গলায় বলল “বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। কিন্তু এখনি যেতে হবে।” কলিন একলাফে উঠে পড়ে বিক্রমকে বলল -”সরি! আমি আসছি। পরে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব। আর বিল আমি দিয়ে দিচ্ছি। প্লিজ ডোন্ট বদার।”

     বিক্রম কিছু বলার আগেই কলিন লোকটির সঙ্গে বেরিয়ে গেল। যাবার সময় ম্যানেজারকে কিছু একটা ইঙ্গিত করায় ম্যানেজার মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

     বিক্রম কয়েক মুহুর্ত হাবলার মতো বসে রইল। তারপরে যে অনুভূতিটা তাকে গ্রাস করল তা হল রাগ। প্রচণ্ড তীব্র যুক্তিহীন রাগ। রাগের উদ্দেশ্য কেবল কলিন বা ওই দীর্ঘদেহী পুরুষ নয়, এ ক্রোধ সমগ্র বিশ্বসংসারের উপর, সর্বোপরি নিজের উপর, হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কেউ যেন সম্রাটের সিংহাসন থেকে তাকে ধাক্কা মেরে সামনের রাজপথের ধুলোয় ফেলে দিয়ে গেল। কিন্তু বিক্রম কি করতে পারে?

     না কলিনের সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখা নয়। নিশ্চয়ই ওই লোকটা কলিনের বয়ফ্রেণ্ড। ওর জন্যই কলিন সাজগোজ করেছিল। মাঝখানে নিশ্চয়ই বিক্রমকে নিয়ে স্রেফ টাইমপাস করছিল। ওদিকে বিক্রম তো মনে মনে সুখের সপ্তম স্বর্গে উঠে বসে ছিল। কলিনের কি বিক্রমকে বলা উচিত ছিল না যে ও এনগেজড?

     কিন্তু বিক্রমের ষষ্ঠেন্দ্রিয় অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কলিনের হাসি, তাকানো, এগুলো মিথ্যা? কলিন যে বিক্রমের সঙ্গ উপভোগ করছিল এ বিষয়ে সন্দেহ থাকা উচিত না। তাহলে কলিন কি একেবারেই দুশ্চরিত্রা? বিক্রমের সবকিছু ক্রমশঃ গুলিয়ে যেতে থাকল। শুধু একটা কথা ও নিজের মনে বারবার আওড়াতে লাগল। কলিনকে আর পাত্তা দেওয়া নয়।

     হায় বিক্রম! তোমার যন্ত্রণার এই তো সবে শুরু।

 

(৬)

স্থানঃ নিউইয়র্ক
সময়ঃ ২৮ জুলাই ১৯৬১

     এস-এন-ডির অফিসে বিক্রমের প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলল। কাজ বলতে গেলে কিছুই নেই। খালি নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে পড়াশোনা করা। বিক্রমকে আপততঃ বলা হয়েছে হাই এনার্জি রেডিয়েশানের মাপ কি ভাবে নিতে হয় সেই সম্বন্ধে একটা ছোট রিপোর্ট তৈরি করতে। কোনও সময়সীমা দেয়া হয়নি। ফলে সে কাজ ঢিলে-ঢালা ভাবে চলছে।

     আজ রবিবার। ফলে বিক্রম আজ দেরি করে উঠেছে। সে এখন এস-এন-ডির দেয়া ফ্ল্যাটেই থাকে। গত মাসের ঘটনাহীন জীবনে একটি নুতন ঘটনা ঘটেছে। পরশু দিন কলিন অফিসে ফোন করেছিল। নিজের কাছে বহুবার বিক্রম শপথ নিয়েছিল যে কলিনকে আর পাত্তা দেবে না। কিন্তু ফোনের ওপারে কলিনের গলা পেয়ে বিক্রমের শ্বাসরোধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কলিনের সঙ্গে ও বেশ ঠান্ডা ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। অন্তত বিক্রমের তাই ধারণা। বিক্রম ব্যস্ত আছে শুনে বিক্রমের ফ্ল্যাটের ফোন নম্বর নিয়ে কলিন পরে আবার পরে ফোন করবে বলে ফোন রেখে দেয়।

     কলিন সম্বন্ধে বিক্রম ভয়ানক দ্বিধায় আছে। মেয়েদের সম্বন্ধে বিক্রমের ধারণা খুব পরিষ্কার ছিল না। বিক্রমের মা খুব শান্ত মহিলা ছিলেন। কিন্তু বিক্রমের বাবার স্বভাবও একই রকম বলে খুব একটা অসুবিধায় পড়েন নি। বিক্রমের বছর দশেক বয়সে মা মারা যান। বিক্রমের স্মৃতিতে মায়ের ছবি একটা কাজকর্ম করা রোবটের মতো। মা গত হবার পর আত্মীয়স্বজনের চাপে বিক্রমের বাবা আবার দারপরিগ্রহ করেন। এই সৎমা লোক খারাপ ছিলেন এমন নয়। বিক্রমের ব্যাপারে তিনি কর্তব্য পালন করতেন। কিন্তু মার ভালোবাসা বলতে যা বোঝায় বিক্রম তা সৎমার কাছে পায় নি। পড়াশোনা শেষ করার পর বাবা আর মা বিক্রমকে মোটামুটি বুঝিয়ে দেন যে তাঁদের কর্তব্য শেষ, এবারে বিক্রম যেন খুঁটে খায়। বিক্রম তখনই ইউ-এস-এ তে ফেলোশিপ পেয়ে যায়। ফলে বাড়ির টান বলে তেমন কিছু ওর ছিল না।

     বিএসসি পড়ার সময় বিক্রমের এক বন্ধুর বোনকে বিক্রমের খুব মনে ধরে ছিল। মেয়েটি বিক্রমকে বেশ খানিকটা নাচিয়ে মজা দেখে ঠিকই, কিন্তু একদিন কিছুটা রূঢ়ভাবেই জানিয়ে দিয়েছিল, চালচুলো-হীন বিক্রম যেন তাকে নিয়ে স্বপ্ন না দেখে। এই ঘটনায় বিক্রম খুবই আঘাত পেয়েছিল। মজার ব্যাপার এই যে বিক্রম যখন আমেরিকায় পি-এইচ-ডি করছে তখন একবার দেশে গিয়ে সেই মেয়ের সঙ্গে বিক্রমের দেখা হয়েছিল। তার তখন বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু তবুও সে পুরোন দিনের কথা পেড়ে প্রায় অশোভন ব্যগ্রতায় বিক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা করে। অনেক কষ্টে তাকে কাটাতে হয়।

     ওই বি-এস-সি পড়ার শেষ দিকেই এক দূর সম্পর্কের বৌদি যিনি বিক্রমকে খুব ভাই ভাই করতেন, হঠাৎ একদিন বিক্রমকে, আজকের ভাষায়, অ্যাবিউজ করেন। এর সমস্তটা বিক্রমকে নীরবে হজম করতে হয়। এই ইতিহাসটা আজও বিক্রমকে মানসিক গ্লানি এবং যন্ত্রণা দেয়।

     কলিন প্রবলভাবে বিক্রমের মনকে আকর্ষণ করছে। কিন্তু বিক্রমের পূর্ব অভিজ্ঞতা বিক্রমকে সোচ্চারে বলছে ‘ও জাতকে বিশ্বাস কোরো না’। এই মানসিক সংঘাত থেকে বিক্রমকে কে মুক্তি দেবে? দিনের বেশীর ভাগ সময়েই বিক্রমের মনের মধ্যে এই লড়াই চলছে।

     রবিবারের অলস মন্থর দিন। এর মাঝেই হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। কলিন? না। কোনও এক বার্টি উইলিয়াম। তার সঙ্গে কথা বলতে চায়। বিক্রম অবাক হলেও বার্টিকে আসতে বলে।

     বার্টি উইলিয়ামের বয়স পঞ্চাশ পঞ্চান্নর মতো হবে। খুব হাসিখুশি প্রসন্ন চেহারা। যেন হলিউডের সিনেমার আদর্শ বাবা। কিন্তু পরিচয় দেবার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রমের সমস্ত শরীরে অ্যাড্রিনালিন হরমোনের স্রোত বইতে থাকে। বার্টি আমেরিকান কেন্দ্রীয় পুলিশের গোয়েন্দা বাহিনী এফ-বি-আই এর লোক!!

     বার্টি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে বলে বিক্রমের বিরুদ্ধে তার কোনও অভিযোগ নেই। শুধু সে বিক্রমের কাছে কয়েকটা কথা জানতে চায়। বিক্রম চাইলে একটারও জবাব না দিতে পারে। টেনশানে বিক্রমের কথা বন্ধ হয়ে যাবার যোগাড়। সে কেবল মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়।

     বার্টি বলল -”তুমি বড্ড টেনশান করছো। এই নাও একটা সিগারেট। খেতে খেতে কথা হোক। তুমি ও-কনরের মেয়ে কলিনকে চেনো?”

     -”হ্যাঁ চিনি কিন্তু…”

     -”খাসা মেয়ে, তাই না?”

     -”মানে ঠিক কি বলতে চাইছো…”

     -”বুঝিয়ে বলছি। টু বি প্রিসাইজ, ইয়ং ম্যান, তোমার কি মনে হচ্ছে না যে কলিন ভীষণভাবে তোমার গায়ে পড়ার চেষ্টা করছে? অবাক হয়ো না। আমেরিকায় কারো প্রেমের ব্যাপারে কেউ মাথা ঘামায় না ঠিকই, কিন্তু আমরা কলিনের ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছি কারণ কলিন কেজিবির এজেন্ট।”

     ঘরের মধ্যে হাইড্রোজেন বোমা ফাটলেও বিক্রম এতটা অবাক হত না। সি-আই-এ, কেজিবি এসব নাম তো স্পাই থ্রিলারে থাকে! নিজের জীবনে এরা হানা দিলে তো জীবন মহানিশা!! বিক্রম গলগল করে ঘামতে থাকে। বার্টি সদয় হাসি হাসি মুখে বিক্রমের স্বাভাবিক হবার অপেক্ষা করতে থাকে।

     অবশেষে বার্টি বলে -”তুমি যতটা নার্ভাস হয়ে যাচ্ছ এতটা নার্ভাস হবার মতো কিছু ঘটে নি। এই মুহুর্তে ভুলে যাও আমি এফ-বি-আইয়ের কেউ, আমি প্রায় তোমার বাবার বয়সী একজন মানুষ। ম্যান টু ম্যান কথা হোক। তুমি বরং কলিনের সঙ্গে তোমার পরিচয় কি করে হল সেই গল্পটা বল।”

     বার্টির ব্যবহারে আস্তে আস্তে বিক্রমের আড়ষ্টতা কাটতে থাকে। ক্রমশ ও বলতে থাকে ক্রিসমাস ইভের দিন প্রথম আলাপের কথা, বোল্ডারের সেই সন্ধ্যার কথা আর কদিন আগে কলিনের ফোনের কথা, সব বলে বিক্রম। হাসিমুখে সমস্তটা শোনে বার্টি। মাঝখানে মন্তব্য না করলেও মুখের নানা ভঙ্গীতে এই

     গল্পটার ব্যাপারে নিজের উৎসাহ প্রকাশ করতে থাকে। কথা শেষ হলে চুপ করে থাকে বার্টি তারপর বলে, ”বোল্ডারের লোকটাকে তোমার মনে আছে? ছবি দেখালে চিনতে পারবে?”

     -”নিশ্চয়ই পারবো।”

     -”অত শিওর না হওয়াই ভালো। এরা চেহারা পাল্টাতে ওস্তাদ! সত্যি কথা বলতে কি, আমরা এলডোরাডো পার্কে কলিনকে ফলো করছিলাম। তারপর বিউটি পার্লারে ঢুকে কলিন নিজের চেহারা এতটাই পালটে ফেলে যে ওকে আমাদের লোক চিনতে পর্যন্ত পারে নি।”

     বিক্রমের চকিতে মনে হল সেই লালটুপি মেয়েটার কথা। কিন্তু ততক্ষণে বার্টি ব্যাগ থেকে একটা অ্যালবাম বার করে ফেলেছে। একে একে বারোটা ছবি দেখা হল, কিন্তু সেই লোকটাকে বিক্রম চিনতে পারল না। বার্টি বলল -”এটাই স্বাভাবিক। আচ্ছা তুমি দেখ হাইট হিসাবে এদের কে কে ওই লোকটার মতো। তারপর দেখ নাকের প্রোফাইল। এই দুটো জিনিষ পালটানো মুশকিল।” কিছুক্ষণের মধ্যে দুজন লোকের একটা শর্টলিস্ট করা হল। বার্টি এবারে ব্যাগ থেকে আর একটা অ্যালবাম বার করে এই দুজনের ক্লোজ আপ ছবি দেখাতে থাকে। এইবার বিক্রমের মনে হয় সে লোকটাকে চিনতে পেরেছে। বার্টিকে বলতে বার্টি বিনা বাক্য-ব্যয়ে সব ছবি ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে ফেলে। তার পর আরেকটা ছবি বার করে। এবারে যেন আরো ভালোভাবে লোকটাকে চেনা যাচ্ছে। বার্টি বলে -”ছবিটা উলটে নামটা দেখ।” বিক্রম দেখল নাম লেখা আছে পিটার ড্রাগোমিরফ!

     বার্টি বলল -”একটু আগেও আমার ধারণা ছিল না যে তোমার কলিন সুন্দরী কত বড় খেলোয়াড়! কিন্তু ড্রাগোমিরফ হল এই মুহুর্তে আমেরিকায় থাকা কেজিবির সবচেয়ে বড় এজেন্ট। যার সঙ্গে ড্রাগোমিরফ নিজে গিয়ে দেখা করে তার গুরুত্ব বুঝতে পারছ?”

     বিক্রম সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে বলে -”কিন্তু আমি কেন?”

     -”তুমি এই কারণেই যে তুমি নাসায় আছ। তোমাকে একটা গুরুত্বপুর্ণ প্রোজেক্টের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ইনফ্যাক্ট নতুন প্রোজেক্টের দায়িত্ব পাবার সঙ্গে সঙ্গেই কি তোমার সঙ্গে কলিনের আলাপ করানোর প্রস্তাব করা হয় নি? এখন আমরা বুঝতে পারছি যে প্রফেসর ও-কনর এই পুরো ব্যাপারটার মধ্যে আছে। ওই তো তোমার নাম টনির কাছে প্রস্তাব করে”।

     বিক্রমের চারদিকে সমস্ত পৃথিবী ঘুরতে থাকে। সব কিছুই চক্রান্তের অংশ? ক্রিসমাসে নিমন্ত্রণ থেকে শুরু করে ও-কনরের মেয়ের সাথে ভুল বোঝাবুঝি, কলিনের ‘গো গ্রিন’ অ্যাক্টিভিস্ট হওয়া, নিউক্লিয়ার বোমা বিরোধিতা, সব নাটক?

     বার্টি বলল -”তোমাকে বুঝিয়ে বলি। মার্কিন মহাকাশ চর্চা আর নিউক্লিয়ার বোমা নিয়ে রাশিয়া দুই দিক থেকে এগোচ্ছে। এক হল এই দুই প্রোগ্রাম সম্বন্ধে ডিটেল খবর নিচ্ছে। আর দুনম্বর হল নানা রকমের অ্যাকটিভিস্টদের লড়িয়ে দিচ্ছে। যেমন এই ‘গো গ্রিন’ দের মধ্যে নিরানব্বই ভাগই হল আদর্শবাদী ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী। এদের নানা রকম কথা বুঝিয়ে আমেরিকার নিউক্লিয়ার প্রোগ্রামের বিরুদ্ধে আন্দোলন করানো হচ্ছে। এদের মধ্যে দু একটি মাথা হল কেজিবির যোগসুত্র। আমরা তোমার কলিনকে তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু ড্রাগোমিরফের বান্ধবী! ওরে বাবা! সে নিজেও তাহলে কেজিবির ডিরেক্ট পে রোলে আছে।”

     বিক্রম বলল -”আপনারা যদি ড্রাগোমিরফের সব কথা জানেনই তাহলে ওকে গ্রেফতার করছেন না কেন?”

     বার্ট হাসল। বলল -”অত সহজ নয়। প্রথমত আমরা জানি না এই মুহুর্তে ড্রাগোমিরফ কোথায়। দ্বিতীয়ত গ্রেফতার না করে নজর রাখলে অনেক সময় বেশী সুবিধা পাওয়া যায়। এই যেমন তোমার কলিনের স্বরূপ আমরা বুঝতে পারলাম।”

     বিক্রম বলল -”আমার কাছে আপনারা কি চান?”

     বার্টি বলল -”যদি বলি কিছুই চাই না। স্রেফ তোমাকে একটু সতর্ক করে দিয়ে গেলাম!”

     -”সরি, বিশ্বাস করতে পারলাম না।”

     বার্টি আবার হাসল। বলল –“কোনও তৃতীয় বিশ্বের দেশের লোকের পক্ষে বিশ্বাস করা শক্ত, যে পুলিশ বন্ধু হতে পারে। তাছাড়া তোমরা নিরন্তর শোনো সি-আই-এ আর এফ-বি-আই ভয়ানক সংস্থা। সারা পৃথিবীতে তারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ছড়াচ্ছে। আরে কে সাম্রাজ্যবাদী নয় ভাই? রাশিয়া পূর্ব ইউরোপে কি গসপেল শোনাচ্ছে? সুবিধা পেলে চিন তোমাদের, ভারতীয়দের, ছেড়ে দেবে?”

     বিক্রমকে চুপ করে থাকতে দেখে বার্টি বলল “পলিটিক্সের কথা থাকুক। তুমি আমাকে বিশ্বাস না করলে আমার কিছু আসে যায় না। তবে কলিনের সঙ্গে বেশী মাখামাখি দেখলে তোমাকে দেশে ফিরিয়ে দেয়া হতেই পারে। এটাকে নিশ্চয়ই অবিচার বলবে না।”

     এতক্ষণে বিক্রম বুঝতে পারে সে কোনও সর্বনাশের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। দেশে ফিরিয়ে দেয়া মানে নাসার চাকরিটা ফুটকড়াই হয়ে যাচ্ছে! এরপর দেশে কে তাকে পাত্তা দেবে? সব ওই ডাইনি মেয়েটার জন্য! বিক্রমের দু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে।

     বার্টি আবার অপেক্ষা করে। তারপর সহানুভুতির সঙ্গে বলে -”আমাদের কি দোষ বলো! আমাদের টপ সিক্রেট প্রোজেক্টের একজনের বান্ধবী কেজিবি এজেন্ট, এটা কি আমাদের মেনে নেয়া উচিত হবে?”

     বিক্রম কথা খুঁজে পায় না। কিন্তু তার মন বলে এতবড় অবিচার কারো সঙ্গে সচরাচর হয় না। কিন্তু তার করারই বা আছে কি?

     বার্টি বলল “তুমি যদি আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করো তাহলে আমি একটা প্রস্তাব দিতে পারি। তাতে সাপও মরবে আবার লাঠিও ভাঙবে না। তুমি কলিনের সঙ্গে জমিয়ে প্রেম করতে শুরু করো।”

     বিক্রম অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বার্টির দিকে তাকায়। বার্টি বলতে থাকে “কলিন চাইছে তোমার কাছ থেকে তোমার লেটেস্ট প্রজেক্ট সম্বন্ধে জানতে। তুমি ওকে ভুলভাল ইনফরমেশান দাও। কি বলবে আমি শিখিয়ে দেবো। আর নিজে কায়দা করে ওদের ওই অ্যাকটিভিস্টদের দলে ভিড়ে ওরা কি করে না করে সেই ইনফোগুলি আমাদের দাও। কলিন তোমাকে ব্যবহার করে তোমার সর্বনাশ করতে চাইছিল না? তুমি ওর অস্ত্রেই ওকে বধ করো।”

     বিক্রম স্তম্ভিত হয়ে যায়। ভাগ্য তাকে এ কোনও ভয়ানক রাস্তায় নিয়ে যেতে চাইছে! শেষে ডবল এজেন্টের কাজ!

     বার্টি বলে -”আমার কথা ভেবে দেখো। জীবন সম্বন্ধে আমার অভিজ্ঞতা অনেক বেশী। কলিনের থেকে দূরে থাকার চেষ্টা বৃথা। কলিনের মতো মায়াবিনীর তোমাকে পেড়ে ফেলতে সামান্যই সময় লাগবে। নিরপেক্ষ থাকতে তুমি পারবে না। একবার যদি হানিট্র্যাপে জড়িয়ে যাও সারা জীবন ব্ল্যাকমেলের শিকার হয়ে থাকবে। তার চেয়ে আমাদের পক্ষে যদি থাকো, তোমার কাউকে ভয় করার থাকবে না। বরং তোমাকে কথা দিতে পারি যদি কেজিবির ছকটা ফাঁস করে দিতে পারো, এদেশের সিটিজেনশিপ পাক্কা, অ্যান্ড দ্যাটস এ ডিল।”

     এই শেষ কথাটায় বিক্রমের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙ্গে যায়। গ্রিন কার্ড নয়, একেবারে সরাসরি সিটিজেনশিপ! আর তার জন্য কিই বা এমন কঠিন কাজ করতে হবে! একটা স্পাই মেয়েকে মিথ্যে ইনফরমেশান দিতে হবে আর তার বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। বিক্রমের শরীরে রোমাঞ্চ খেলে যায়।
বিক্রম সরাসরি বার্টির চোখে তাকিয়ে বলল -”আমি রাজি।”

 

(৭)

স্থানঃ নিউইয়র্ক
সময়ঃ ২৯ আগস্ট ১৯৬১

     বার্টি চলে যাবার পর অনেক ভাবল বিক্রম। কিন্তু বার্টির প্রস্তাবে রাজি হওয়াটাই ঠিক হয়েছে মনে হল। নিজের মনে একটা বেশ জেমস বন্ড জেমস বন্ড ভাব আসছিল। কলিনকে ফোন করতে খুবই ইচ্ছা করছিল কিন্তু কলিনের ফোন নম্বর বিক্রমের কাছে ছিল না।

     ইতিমধ্যে বিক্রমের অফিসে একটা দরকারি মিটিং হয়েছে। সেটা হল এই স্পেসে-ফাটা নিউক্লিয়ার বোমাটি কোথা থেকে উৎক্ষেপন হবে সেটা ঠিক হয়েছে। ১৬ ডিগ্রি নর্থ আর ১৭০ ডিগ্রি ওয়েস্টে অর্থাৎ হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের খানিকটা দক্ষিণ পশ্চিম কোনে জনস্টন আইল্যান্ড বলে একটা জনহীন দ্বীপ আছে। সেখান থেকেই রকেট উৎক্ষেপন হবে। রকেটটি দক্ষিণমুখী করে ছাড়া হবে। রকেটটা হাজার কিলোমিটার উপরে উঠে যখন নেমে আসতে থাকবে তখন মোটামুটি পাঁচশো কিলোমিটার উপরে ডিটোনেশান বা বিস্ফোরণ হবে।

     বিক্রমের প্রধান ভয় ছিল যদি রকেটটা কোনও ভুল দিকে চলে যায় তখন কি হবে? কিন্তু নিউক্লিয়ার বোমা বিশেষজ্ঞরা ওকে আশ্বাস দিয়েছে সেরকম কিছু হলেও ভয় নেই। কারণ নিউক্লিয়ার বোমা দুম করে ফেটে যাবার কোনও সম্ভবনাই নেই। এই বোমা উত্তাপে বা চাপে বা আগুনে ফাটে না। হাইড্রোজেন বোমার যে মশলা অর্থাৎ হেভি হাইড্রোজেন, তা থেকে এনার্জি পেতে গেলে কয়েক লাখ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা লাগবে। যার জন্য একটা ছোট ইউরেনিয়াম বোমা ফাটাতে হবে। কাজেই প্রথমে সেই ছোট্ট ইউরেনিয়াম বোমাটা ফাটাতে হবে। তবেই বাকিটা বিস্ফোরিত হয়ে বিরাট এনার্জি বেরোবে। এখন ইউরেনিয়াম বোমা ফাটাতে গেলে তিন চারটে আলাদা কম্পার্টমেন্টের ইউরেনিয়াম এক জায়গায় করতে হয়। এর টেকনোলজি বেশ জটিল। কাজেই অ্যাক্সিডেন্টে ফেটে যাবার সম্ভবনা একেবারেই নেই।

     বিরাট রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন। বোমা ফাটার আগে পরে মোট বারোটা রকেট ছাড়া হবে। তার স্পেসের বিভিন্ন জায়গায় নানা রকম রেডিয়েশানের মাপজোক করবে। এছাড়া অনেকগুলো জাহাজে রেডিয়েশান মাপা যন্ত্র নিয়ে সারা প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে থাকবে। হাওয়াই, জাপান, সানফ্রান্সিসকো, পেরু, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, চিলি এই সব জায়গার ল্যাবোরেটরিতে রেডিয়েশান মাপা হবে। এছাড়া সম্ভব হলে একটা কৃত্রিম উপগ্রহও যন্ত্রপাতি দিয়ে ছাড়া হতে পারে। একটা বোমায় পুরো কাহিনী শেষ হবে না। মোট বিভিন্ন পাওয়ারের গোটা চারেক বোমা ফাটানো হবে। শোনা গেল এই পুরো প্রোজেক্টটার নাম রাখা হয়েছে ফিশবোল এক্সপেরিমেন্ট। হুলুস্থুলু কাণ্ড, বিক্রমের একবার মনে হল কত টাকার শ্রাদ্ধ হবে জিজ্ঞাসা করে। তারপর মনে হল থাক বাবা।
এই মিটিং এর পর বিক্রমের কাজ হল বিভিন্ন টেস্ট সেন্টার গুলিতে যারা রেডিয়েশানের মাপজোক করবে তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সন্দেহ নেই।

     কিন্তু এদিকে কলিন তো কোনওরকম যোগাযোগ করছে না। বিক্রমের বুদ্ধি বলতে থাকল ভালোই হচ্ছে, যদি কলিন ধারেকাছে নাই ঘেঁষে, তাহলে জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়। কিন্তু প্রতি মূহুর্তে বিক্রম কলিনের ফোনের জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকছিল। অবশেষে আজ সেই ফোন এলো।
বিক্রমের বুক এতই দুরদুর করছিল যে কথা বলতে পারছিল না। ওদিকে কলিন হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে। অবশেষে বিক্রমের মুখ কথা দিয়ে বেরোল।

     -”কলিন! এতদিন! এতদিন কোথায় ছিলে?”

     -”হসপিটালে।”

     -”সেকি? কি হয়ছে? তুমি এখন কি……”

     -”ও বিক্রম! কিচ্ছু না! নিউমোনিয়া, একটু বেশী মাত্রায়। এখন একদম ফিট।”

     -”কোনও হসপিটালে? আমি যাব।”

     ওদিকের রিসিভারে কলিনের খিলখিল হাসি ভেঙ্গে পড়ল। -”আমি এখন নিউইয়র্কে। আজ সন্ধ্যায় ফ্রি আছো?”

     -”হ্যাঁ, হ্যাঁ!”

     -”তাহলে ব্রডওয়ের এলভিস রেস্তোরাঁয় সাড়ে সাতটা নাগাদ চলে এসো, সিট বুক করা থাকবে।”

     -”তোমার কোনও চেহারাটা নিয়ে আসবে?”

     -”কোনটা পছন্দ?”

     -”পুরোনটা।”

     কলিন ওদিকে চুপ মেরে গেল। কী হল আবার! বিক্রম দুবার হ্যালো হ্যালো করতেই ওপাশ থেকে কলিনের গলা পাওয়া গেল। কিরকম ধরা ধরা। বলল “থ্যাংক গড! থ্যাংক গড!” মনে হল কান্না চাপছে। যাচ্চলে বিক্রম আবার কি গন্ডগোল করে ফেলল! ওপাশ থেকে কলিন বলল -”সি ইউ অ্যাট সেভেন থার্টি” তারপর রেখে দিল।

     বিক্রম প্রায় দশ মিনিট পর আবিষ্কার করল সে একই জায়গায় বসে আছে এবং শুধু একটাই কথা ভেবে গেছে, ‘আজ কলিনের সঙ্গে দেখা হবে’। বিক্রম তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। এসব কি হচ্ছে? কলিন না একটা বাজে মেয়ে? সে না স্পাই? বিক্রমের কাজ তো তার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করা! বিক্রম কেন নিজে হাবুডুবু খাবে? কি সর্বনাশ! না না বিক্রম জেগে ওঠ! সতর্ক হও।

     আচ্ছা কলিন নিউমোনিয়া হয়ে নিশ্চয়ই রোগা হয়ে গেছে। একেই ওরকম হালকা ফুলকা চেহারা। ইসস। কি অবস্থাই না দাঁড়াবে। আহারে!

     আবার? কলিন একটা নষ্ট মেয়ে!

     সাড়ে সাতটায় এলভিসে গিয়ে বিক্রম দেখল কলিন বসে আছে। সত্যিই কাঠির মতো রোগা হয়ে গেছে। সারা মুখের মধ্যে শুধু বড়বড় চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। বিক্রম ওই চোখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে গেল। টেবিলে বসেই সোজা কলিনের হাতদুটো নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল -”একি চেহারা হয়েছে তোমার!”

     কলিন কিরকম একটা মুখে হাসি চোখে জল মিশিয়ে বলল -”বিচ্ছিরি দেখতে হয়ে গেছি, তাই না?”

     -”একদম।”

     এবারে কলিন হেসে ফেলল। বলল -”তোমার ঘোস্ট স্টোরির হিরোইনের মতো একটা লম্বা হাত বাড়িয়ে দেবো? ইনফ্লুয়েঞ্জা কিন্তু একসময় প্লেগের মতো মহামারী ঘটিয়েছিল।”

     বিক্রম কিছু বলে না, খালি ওর হাতদুটো ধরে বসে থাকে। কলিন হাত সরায় না। খালি ওর চোখে জল চিকচিক করে। প্রায় মিনিট খানিক পরে বিক্রম প্রশ্ন করে -”তুমি কাঁদছো নাকি?” কলিন প্রথমে কিছু বলে না। তারপর হাত সরিয়ে চোখের জল মোছে। বলে -”মানুষ দুঃখেও কাঁদে, আবার আনন্দেও কাঁদে, তাই তো? বল তো ডিফারেন্সটা কোথায় হয়?”

     -”ডিফারেন্স আছে নাকি? দুটোই ইমোশানে হয়।”

     -”না গো সাইন্টিস্ট সাহেব, অত সোজা না। দুঃখের চোখের জল গড়ায় নাকের পাশ দিয়ে। আর আনন্দের চোখের জল গড়ায় কানের দিক দিয়ে।”

     বিক্রম এত জোরে হেসে ওঠে যে রেস্তোরাঁ-শুদ্ধ লোক ওদের দিকে তাকায়। কিন্তু ওরা পাত্তাও দেয় না। কলিন ঝগড়ার মুডে বলে -”বিশ্বাস হল না? তোমার ছোটবেলার গার্ল-ফ্রেন্ডরা কখনো আনন্দে কাঁদত না?”

     বিক্রম একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে -”আমার ছোটবেলা, তার আবার গার্লফ্রেণ্ডরা! কলমি শাকের আবার ক্যাশমেমো!”

     কলিন হৈ হৈ করে ওঠে -”কেন? কেন? হোয়াটস রঙ উইদ ইয়োর চাইল্ডহুড?”

     বিক্রম বলতে থাকে তার মার কথা, সৎ-মার কথা, আরো সবার কথা। কলিন চুপ করে শোনে। শেষ হলে বলে -”আমার ইতিহাসটাও কাছাকাছি, তবে বাবা আর বিয়ে না করায় একটা অদ্ভুত ধরনের ছোটবেলা কেটেছে। আমায় মানুষ করেছিল এক বেবিসিটার, কার্লা। কার্লা ছিল ব্ল্যাক। সেই আমি প্রথম বুঝি ব্ল্যাকরা ঠিক আমাদের মতোই মানুষ, বরং হিউম্যান কোয়ালিটি ক্লারার অনেক বেশী ছিল। ক্লারা আমাকে নানা রকম গল্প শোনাতো। বেশীর ভাগ আফ্রিকান মিথ। কিন্তু সেই সব গল্পে গাছ, পাহাড়, বন, নদী, সাগর সবারই প্রাণ থাকত। সবাই কথা বলতো। আমার কেন জানি না এখনো অবসেশান আছে যে নেচার জীবন্ত!”

     ইতিমধ্যে ওয়েটার এসে উপস্থিত। কলিন খাবার অর্ডার দিয়ে বলল -”এই সব আমেরিকান খাবার তোমার কেমন লাগে?”

     -”ভালো নয়। আমাদের ইণ্ডিয়ান খাবার, বিশেষ করে বাংলার খাবার অনেক হাই গ্রেড।”

     -”তুমি রান্না করতে পারো?”

     -”পারি, তবে ভালো নয়, তবে একদিন বাঙালী রান্না খাইয়ে দেখাবো।”

     -”আমিও একদিন তোমাকে আইরিশ ঘরোয়া রান্না খাওয়াবো। একেবারেই অন্যরকম।”

     ওরা খাওয়ায় মন দিল। খাওয়া যখন প্রায় শেষ তখন হঠাৎ বিক্রমের বার্টির কথা মনে পড়ল। প্রশ্ন করল, -”আচ্ছা কলিন, তুমি চাকরি বাকরি করো না? আজ নিউইয়র্ক, কাল বোল্ডার এভাবে ঘুরে বেড়াও কেন?”

     কলিন বলল -”আমাদের সংগঠনের কাজে আমায় সারা আমেরিকা ঘুরে বেড়াতে হয়। আমাদের গো-গ্রিন এর সঙ্গে আরো অনেকগুলো অর্গানাইজেশান মিলে এই মুহুর্তে উইমেন ফর পিস বলে একটা বড় আন্দোলন করার চেষ্টা করছি। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হল নিউক্লিয়ার টেস্ট ব্যান করা।”

     বিক্রম বলল -”তা আমেরিকা টেস্ট না করলে কি রাশিয়াও টেস্ট করবে না? তোমাদের আন্দোলনটা একপেশে হয়ে যাচ্ছে না?”

     কলিন হাসল। বলল -”এই মুহুর্তে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এমন যে একপক্ষ একতরফা টেস্ট ব্যান করলে অন্যপক্ষের উপর প্রবল চাপ আসবে। রাশিয়ার সঙ্গে এরকম চুক্তি করাই যায় যে কেউই নির্দিষ্ট কয়েক বছরের জন্য নিউক্লিয়ার টেস্ট করবো না। কিন্তু তার জন্য প্রথম আমেরিকা এগিয়ে আসুক এটাই আমরা চাই।”

     বিক্রমের উচিত ছিল ওদের আন্দোলনের খুঁটিনাটি কলিনের কাছ থেকে জেনে নেয়া। কিন্তু বিক্রম সম্পূর্ণ অন্য পথে চলে গেল।

     -”আচ্ছা সেদিন ডিনারের সময় যে লোকটি তোমাকে ডেকে নিয়ে গেল সে কে?”

     কলিন একটু ভ্রূভঙ্গ করল। ওর মুখটা বিক্রমের একেবারে মধুমাখা মনে হল। বলল -”কেন? তোমার কি হিংসা হচ্ছিল?”

     -”হ্যাঁ”

     কলিনের সমস্ত মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল -”সত্যি? সাইন্টিস্ট মশাইয়ের তাহলে হিংসাও হয়? আমি তো ভেবেছিলাম ইনি নির্লিপ্ত বুদ্ধ!”

     -”কিন্তু লোকটি কে?”

     -”গুপ্তচর!”

     -”মানে?”

     -”মানে পুলিশের মধ্যে থাকা আমাদের লোক। ও খবর এনেছিল আমাকে ফলো করা হচ্ছে। যাতে আমার পিছন পিছন উইমেন ফর পিসের লোকজনকে পুলিশ চিনে নিতে পারে।”

     বিক্রমের উচিত ছিল সুকৌশলে এই লোকটার নাম ধাম জেনে নেয়া। কিন্তু কলিনের মুখের দিকে চেয়ে বিক্রম সব ভুলে গেল। বলল -”এসব ছেড়ে দাও কলিন। এই ঝামেলার মধ্যে জড়িয়ে লাভ আছে?”

     কলিন সরাসরি বিক্রমের দিকে তাকাল বলল -”অন্য কেউ একথা বললে আমি কথা ঘুরিয়ে কাটিয়ে দিতাম। কিন্তু তোমার একটা কথা জেনে রাখা উচিত। এই সব কিছু নিয়েই আমি। যে আমাকে চাইবে এসব কিছু সমেতই আমায় নিতে হবে।”

     বিক্রমের সমস্ত শরীরে কোনও একটা আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। বলল -”আমি সবশুদ্ধই তোমাকে চাই।”

     কলিন চুপ করে রইল। স্পষ্টতই প্রবল আবেগে ওর সারা শরীর কাঁপছে। একটু চুপ করে থেকে বলল -”এবারে বাড়ি ফিরে যাব। আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমি এখনো ততটা ফিট হইনি।”

     বিল মিটিয়ে ওরা রাস্তায় বেরিয়ে আসে। বিক্রম একটা ক্যাব ডাকার তালে ছিল কিন্তু কলিন বলল ও কাছেই থাকে। অলিগলি দিয়ে যেতে মিনিট কুড়ি লাগবে। ওরা চলতে শুরু করলে কলিন বলল -”আমাকে একটু সাপোর্ট দিয়ে নিয়ে চলো। উইক লাগছে।”

     কলিনের হাতে হাত জড়িয়ে বিক্রম গলি পথে ঢুকল। কলিনের স্পর্শ ঠিক পালকের মতো হালকা লাগছে। রাস্তার নিয়ন ভেপার ল্যাম্পগুলোকে বিক্রমের মনে হল ভীষণ বেরসিক। এখন যদি সব অন্ধকার হত আর চারদিকে চাঁদের আলো ছড়িয়ে থাকত!

     কলিনক বিক্রম প্রশ্ন করল -”তুমি এখানে কোথায় থাকো?”

     -”উঁহু, তোমাকে ঘরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। সেনোরিত্তা জিওর্দানো ভীষণ কনজারভেটিভ। আমি নিউইয়র্কে এলে সাধারণত ওঁর ফ্যামিলির সঙ্গে থাকি।”

     -”আমি মোটেও তা মিন করিনি।”

     -”করোনি? কেনই বা করোনি? সেটাই তো স্বাভাবিক ছিল।”

     -”কি স্বাভাবিক ছিল কলিন? এখন তোমার সঙ্গে তোমার ঘরে যাওয়া, তারপর একসঙ্গে রাত কাটানো?”

     কলিন কয়েক মুহুর্তের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল। বলল -”যে কোনও আমেরিকান তরুণের এটাই ভাবা স্বাভাবিক বিক্রম। কিন্তু আমি তো তা করতে দিতে পারিনা। অন্তত কোনওদিন পারিনি।”

     -”তুমি বলতে চাও…”

     -”আমার জীবনে এখনো কোনও পুরুষ আসেনি। যদিও কোনও আমেরিকান তরুণীর মুখে একথা অবিশ্বাস্য।”

     বিক্রমের মনে মনে অট্টহাস্য করা উচিত ছিল। কিন্তু এই মুহুর্তের জন্য বিক্রম কথাটা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে ফেলল। বলল “তাহলে আমি?”

     আবার সেই খিলখিল করা হাসি, যেন একখানি মালা ছিঁড়ে অনেকগুলো মুক্তো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বিক্রম শুনল

     -”তুমিই বা কি করে হবে? এখনো তো তুমি আমায় চুমুই খাও নি।”

     বিক্রমের মাথার মধ্যে বিরাট বড় ঢেউ ভেঙ্গে জল উচ্ছলিত হয়ে উঠল। ও দুহাতে কলিনকে জড়িয়ে ধরে ওর অধরোষ্ঠের উপর নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল। কলিনকে মনে হল অশরীরীর মতো হালকা আর স্বচ্ছ। বিক্রমের কানের পাশ দিয়ে প্রবল রক্তোচ্ছাসে নিজের হার্টবিট শোনা যাচ্ছিল।

     অবশেষে কলিন একটা ভঙ্গুর হাসি হাসল। বলল -”যাক তাহলে, শেষ পর্যন্ত! তোমাকে দিয়ে একটা চুমু খাওয়ানো গেছে।”

     বিক্রমের একটা পুরোন কথা মনে পড়ে গেল। ও সশব্দে হেসে উঠল। কলিন আবার ভ্রূভঙ্গি করে বলল -”এতে এত মজার কথা কি পেলে?”

     বিক্রম বলল -”বংশের ধারা যাবে কোথায়? আমার গ্রেট গ্র্যান্ড মাদারের যখন বিয়ে হয় তখন তাঁর বয়স ছিল বারো, আর তাঁর স্বামীর বয়স ছিল ষোল। সেকালে আমাদের দেশে ওইরকমই হত। তা ফুলশয্যার রাত্রি দুজনেই স্রেফ ঘুমিয়েই পার করে দেন। সকালে যখন ঠাকুমা ঘুম থেকে উঠলেন তখন তাঁর কিশোর স্বামী অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। ঠাকুমা তাঁকে ডেকে তোলেন। ঈঙ্গিতে চুম্বন করতে বলেন। স্বামী নেহাতই ইনোসেন্ট। প্রশ্ন করেন ‘কেন?’ ঠাকুমা ভীষণ গম্ভীর ভাবে বলেন ‘ফুলশয্যার রাতে বৌকে চুমু না খেলে পরের জন্মে চামচিকে হতে হয়’।” কলিন হাসতে হাসতে প্রায় গড়িয়ে পড়ে আর কি।

     বিক্রম গম্ভীর ভাবে বলে -”সেই রক্ত তো আমার শরীরেও আছে। কাজেই …”

     কলিন হেসে লুটোপুটি খেতে খেতে বলে -”কিন্তু চামচিকে কাকে বলে?”

     -”এক ধরনের স্মল স্পিশিজ অফ ব্যাট। বিচ্ছিরি দেখতে!”

     হাসি শেষ করে কলিন সোজা হয়ে দাঁড়ায় বলে -”না, ব্যাট ইস টু ব্যাড। চান্স নেয়া যায় না। সো বিক্রম, আরেকবার…।”

     প্রায় একশো মিটার দূর থেকে তখন একটা লম্বা টেলিফটো লেন্স দিয়ে একজন এই চুম্বনরত যুগলকে ক্যামেরাবন্দি করছে।

     বিক্রম বাড়ি ফিরে যখন শুতে গেল তখন হঠাৎ ওর মনে হল, এর পর দিন থেকে কলিনের কাছে থেকে ইনফরমেশান সংগ্রহ করতে হবে।

 

(৮)

স্থানঃ নিউইয়র্ক
সময়ঃ ২০ মার্চ ১৯৬২

     বিক্রম কনফারেন্স রুমের বাইরে বসে আছে। আজ এখানে ফিস-বোলের অন্য পার্টনার আলবামার আর্মি ব্যালিস্টিক মিসাইল এজেন্সির ওয়ার্নার ভন ব্রাউন আসছেন। প্লেন লেট, সেই জন্য আসতে দেরি হচ্ছে। বিক্রম তাই একা বসে আকাশ পাতাল ভাবছে।

     কলিনের সঙ্গে সেই রাতে ছাড়াছাড়ি হবার পর, বিক্রম সাংঘাতিক মানসিক দোলাচলে আছে। একদিকে কলিন তার প্রেম দিয়ে বিক্রমকে ভাসিয়ে দিয়েছে। ভালোবাসার মাদকতা যে এত তীব্র, পরস্পরকে আবিষ্কার করার নেশা যে এত গভীর বিক্রমের কোনও ধারনাই ছিল না। কলিনের মাধুর্য, কলিনের বুদ্ধি, কলিনের রসবোধ আর সর্বোপরি কলিনের সরল ব্যবহার বিক্রমকে অভিভূত করে ফেলেছে। সংসারে বিক্রমের মতো সুখী কেউই হত না, যদি না অনেকগুলো সন্দেহ-পোকা বিক্রমকে কুরে কুরে খেত। এই সব কটা পোকা বিক্রমের মনে ছেড়ে দিয়ে গেছিল, বার্টি।

     এল্ভিসের সেই সন্ধ্যার পর যবে বার্টি আসে, বিক্রম ওকে সরাসরি বলে বার্টির কোথাও ভুল হচ্ছে। কলিন একটি নিষ্পাপ মেয়ে, অ্যাক্টিভিস্ট বটে, কিন্তু কেজিবি? অসম্ভব!

     বার্টি হাসতে থাকে, বলে “তুমি যখন কলিনকে চুমু খাচ্ছিলে তখন ওপরের জানালায় দাঁড়িয়ে ড্রাগোমিরফ সেটা দেখছিল।”

     বিক্রম হতভম্ব হয়ে থাকে। তারপর বলল -”আমি কিন্তু বিশেষ কিছুই জানতে পারি নি। শুধু নিউইয়র্কে কলিন যার কাছে থাকে তার নাম সেনোরিত্তা জিওর্দানো। আর ওরা সবাই মিলে পিস ফর উইমেন বলে একটা দল চালাচ্ছে। এই মাত্র।”

     বার্টি বলল -”প্রথম দিনের জন্য এইই যথেষ্ট। তুমি তো আর প্রফেশনাল স্পাই নও। আর কলিনের সঙ্গে প্রেমটা তুমি সিরিয়াসলিই করবে। না হলে ও ধরে ফেলবে। ওদের দলে ভিড়বার আগ্রহ দেখাও।”

     পরের দিন কলিনকে যখন বিক্রম ওদের দলে যোগ দেবার কথা বলে, তখন কলিনের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল -”তুমি বিদেশী। এখানকার পুলিশ এসব দলে দেখলেই কিন্তু রিপোর্ট করবে আর তোমার ভিসা নিয়ে ঝামেলা হবে।” কিন্তু তাওও বিক্রমের আগ্রহ দেখে ও দুচারবার ওদের সভায় বিক্রমকে নিয়ে গেছে। নেহাতই নিরীহ সব সভা। সাধারন সব গৃহবধূরা তার মেম্বার। এদের নিয়ে এফ-বি-আই এত কী ভাবছে কে জানে!

     কিন্তু ১৯৬১ সালের পয়লা নভেম্বর বিক্রমের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল। প্রায় পঞ্চাশ হাজার সাধারণ মহিলা র্যালি করে সারা আমেরিকা কাঁপিয়ে দিল। প্রায় তিন হাজার গৃহবধূ হোয়াইট হাউস অভিযান করল। তাদের যেখানে আটকে দেয়া হল সেখানেই তারা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসে পড়ল। মুখে একটাই কথা -”আমি মা। আমি চাই না আমার সন্তান নিউক্লিয়ার রেডিয়েশানের কবলে পড়ুক।” কাগজে, রেডিও টেলিভিশনে হুলুস্থুল। প্রেসিডেন্টকে রীতিমত বিবৃতি দিয়ে জানাতে হল আমেরিকান শিশুরা রেডিয়েশান থেকে নিরাপদ। বিক্রম বুঝল কেন এফ-বি-আই এদের নিয়ে চিন্তিত। বিক্রম এও বুঝল, কলিন যতই সরল সাধাসিধা ভাব করুক, এতবড় আন্দোলনের পান্ডা কোনও সহজ মহিলা নয়।

     কিন্তু কলিনের কাছে গেলে বিক্রম সব ভুলে যায়। কলিনকে মনে হয় ছোট্ট মিষ্টি নিষ্পাপ এক নারী, যে বিক্রমের ভালোবাসায় হারিয়ে গেছে, যার সমস্ত পৃথিবীই বিক্রম-ময়। মায়াবিনী কি একেই বলে? বার্টি নেহাত ভুল বলে না।

     একটা ব্যাপার কিন্তু বিক্রমের অবাক লাগে। কলিন কখনো বিক্রম এস-এন-ডি তে কী করে তা জানতে চায় না। স্পাই হলে তো সেই চেষ্টা করত? তবে বার্টি অবশ্য বলে বিক্রম কলিনের কাছে দীর্ঘমেয়াদী আমানত।

     আজ বিকেলে কলিনের সঙ্গে দেখা হবে। প্রায় দেড়মাস বাদে। ও নাকি ক্যালিফোর্নিয়ায় সংগঠনের কাজ করতে গিয়েছিল। কিন্তু আর কিছু ভাবার আগেই বিক্রম দেখল এস-এন-ডির ডিরেক্টার পল চ্যাপম্যান এক অচেনা লম্বা চওড়া প্রখর ব্যক্তিত্বময় ভদ্রলোককে নিয়ে কনফারেন্স রুমের দিকে চলে গেলেন। কয়েক সেকেন্ড পর ডিরেক্টারের সেক্রেটারি বিক্রমকে কনফারেন্স রুমের দিকে ডেকে নিয়ে গেল।

     এই অচেনা ভদ্রলোকই হলেন ওয়ার্নার ভন ব্রাউন, আর্মি ব্যালিস্টিক মিসাইল সংস্থার প্রধান। ডাক নাম অর্নি। রকেটগুলি এরাই বানাবেন। আর তার মাথায় নিউক্লিয়ার পে-লোডটি দেবে এস-এন-ডি।

     অর্নি কাজের মানুষ। সরাসরি কাজের কথায় চলে এলেন। জানতে চাইলেন বোমাটার ওজন কত হবে। আট টন শুনে বললেন, আমরা এখনো এত পে লোড দিয়ে কোনও রকেট ছাড়িনি। তবে ঠিক আছে। ঠিক হল থর ক্লাসের একটি মিসাইলের উপর এই বোমাটি বসানো হবে, যার নাম দেয়া হল ব্লু-গিল। মিটিং যখন শেষের দিকে বিক্রম প্রশ্ন করল “থর মিসাইলের কন্ট্রোল সিস্টেমটা কি ধরনের থাকছে?” অর্নি বললেন “যেমন হয়, তুমি কি ডিটেল ডিজাইন দেখতে চাও?” বিক্রম হ্যাঁ বলায় অর্নি তার সেক্রেটারিকে বললেন থরের কন্ট্রোল সেকশানটার ছবিগুলো বার করতে।

     রকেট যখন চলতে থাকে তখন রকেট তার নাক বরাবর এগোয়। এইবার যদি কোনও কারনে তার নাকের দিক সামান্যও পালটে যায় তাহলে সে সেই দিকে চলতে শুরু করে। ব্যাপারটা তক্ষুনি সামলে না নিতে পারলে রকেট বুধে যেতে বৃহস্পতিতে চলে যেতে পারে। রকেটের বেগ যদি সেকেন্ডে ৬ কিলোমিটার হয় আর তার নাক যদি মাত্র পাঁচ ডিগ্রিও ঘুরে যায় তাহলে এক মিনিট পর যেখানে রকেটের থাকার কথা তা থেকে সে ৩১ কিলোমিটার সরে যাবে। এই সামলানোর কাজটা যখন স্বয়ংক্রিয় ভাবে করা হয় তখন তাকে বলে কন্ট্রোল, আর যখন বাইরে থেকে করা হয় তাকে বলে ন্যাভিগেশান।

     রকেটের পিছনে, যেখান দিয়ে আগুন আর গ্যাস বের হয় সেইখানে বেরোবার রাস্তাটাকে বলা হয় নজল। এই বেরোবার রাস্তাটাকে খুব সামান্য বামদিকে হেলিয়ে দিলেই রকেট বাঁ দিকে ঘুরতে থাকবে। মুহুর্তের মধ্যে আবার নজলটা সোজা করে দিতে হবে, না হলে রকেট বেশী ঘুরে যাবে। এই পুরো ব্যাপারটার নাম গিম্বলিং। এখন এই কাজটা খুব বেশী স্বয়ংক্রিয় হলে বিপদ আছে। কারণ একবারে যদি বেশী কারেকশান হয়ে যায়, তাহলে আবার উল্টো দিকে কারেকশান করতে হয়। দু চারবার এরকম পর পর হলেই রকেট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে ছুঁচোবাজির মতো আচরণ করবে। ওদিকে ন্যাভিগেশান দিয়ে রকেটের গতি নিয়ন্ত্রন করতে অনেক বেশী সময় লাগে। কারণ রেডার দিয়ে রকেটের অবস্থান জেনে তারপর মানুষ এটা নিয়ন্ত্রণ করবে। কাজেই যে কোনও রকেট সিস্টেমে কতটা কন্টোল আর কতটা ন্যাভিগেশান এটা একটা কঠিন সমস্যা।

     বিক্রম দেখল থর রকেটের ডিজাইনে ন্যাভিগেশানের ভুমিকা বেশী। এর আগের প্রজেক্টের জন্য বিক্রম একটা দুই স্তর বিশিষ্ট কন্ট্রোল সিস্টেম ডিজাইন করেছিল। সেখানে প্রথম স্তর পুরোনো নিয়মে কাজ করলেও দ্বিতীয় স্তর প্রেডিক্টার-কারেক্টার অ্যালগরিদমে কাজ করবে। প্রথম স্তর যা ঠিক করেছে তার ফলাফল আন্দাজ করে দ্বিতীয় স্তর তার রাশ ধরে রাখবে। এই পদ্ধতি কার্যকর হলে ন্যাভিগেশানের উপর চাপ অনেক কমে যাবে।

     কিন্তু বিক্রম যখন তার বক্তব্য বলতে শুরু করল, অর্নির ভ্রু কুঁচকে গেল। বিক্রম যখন বক্তব্যের মাঝপথে তখন ওকে বাধা দিয়ে অর্নি বলল -”সাউন্ডস ইন্টারেস্টিং, কিন্তু অহেতুক জটিল। আমরা পুরোন পদ্ধতিতেই চলব। যন্ত্রকে বেশী বিশ্বাস করা উচিত নয়।” কিন্তু এস-এন-ডির প্রধান চ্যাপম্যান বললেন -”যাই হোক শুনতে তো দোষ নেই, তুমি পুরোটা বল বিক্রম।” বিক্রম সবটা বলে শেষ করল এইভাবে ‘যেহেতু রকেটের মাথায় একটি আস্ত নিউক্লিয়ার বোমা আছে তাই আমাদের আরো দায়ীত্বশীল হওয়া উচিত। অন্তত বার দুয়েক আট টন পে লোড দিয়ে দুটো প্রোটোটাইপ রকেট ছেড়ে ন্যাভিগেশান আর কন্ট্রোলের ব্যাপারটা ঠিক আছে কি না দেখে নেয়া উচিত।

     আর্নি গম্ভীর মুখে বলল “থ্যাংক ইউ ফর ইওর সাজেশান। তুমি এবারে আসতে পারো।”

     বিক্রম বেরিয়ে যেতেই অর্নি রাগত ভাবে চ্যাপম্যানকে বললেন, “এ ছেলেটা নিজেকে কী ভাবছে? এর এখনকার দায়িত্ব কী?”

     চ্যাপম্যান বললেন “মেজারমেন্ট স্টেশানগুলোর কো-অর্ডিনেশান।”

     -”ও তাহলে তাইই করুক। রকেট নিয়ে যেন কিছু বলতে না আসে। আর এত পাকা ছেলেকে এত বেশী দায়িত্ব দিও না চ্যাপ। বরং ওকে ছোটখাট কোনও দায়িত্বে বদলি করে দাও। এটা অবশ্য আমার সাজেশান।”

     চ্যাপম্যান গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন “আমারও একটা সাজেশান আছে অর্নি। এত ওভার কনফিডেন্ট হয়ো না।”

     বিক্রম খারাপ মেজাজেই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। কলিনের সঙ্গে দেখা করতে হবে।

     সিন্নোরিতা জিওর্দানো এতদিনে বিক্রমকে ভালোই চিনে গেছেন। মনে হয় বেশ পছন্দও করেন। বিক্রমকে দেখেই বললেন -”একটা সুখবর আছে।”

     -”কী?”

     -”কলিনকে আসতে দাও। ওই ওটা বলবে। ও একটু সুপার-মার্কেটে গেছে। ততক্ষন রাভিওলি বানিয়েছি খেয়ে দেখ। তোমার তো আবার মুখপোড়া ঝাল না হলে মন ওঠে না।”

     কলিনের ঘরে ঢোকে বিক্রম। দেখে খাটের উপর নানা কাগজপত্র ছত্রখান করে ছড়িয়ে রেখেছে কলিন। একটা লিস্টের দিকে ওর চোখ চলে যায়। প্রায় জনা তিরিশেক মহিলার নাম আর পোস্টাল অ্যাড্রেস। ওদের সংগঠনের চাঁইরা নাকি?

     স্কুল ফাইনাল পাশ করে শর্টহ্যান্ড শিখেছিল বিক্রম। একটা কাগজ আর পেন্সিল টেনে নেয়। এগুলো বার্টির কাজে লাগবে।

     একটু পরেই কলিন ফিরে এল। রোগা লাগছে, কিন্তু চেহারার লাবণ্য যেন আরো বেড়েছে। বিক্রম প্রশ্ন করল -”কি সব সুখবর আছে শুনলাম”। কলিন হঠাৎ টমেটোর মতো লাল হয়ে গেল বলল -”কে বলেছে?”

     -”সেনোরিত্তাই বলেছেন। তুমি এরকম ব্লাশ করছ কেন।”

     কলিন হাতের ব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে সোজা টয়লেটে ঢুকে যেতে যেতে বলল -”জানি না।”

     সিনোরিত্তা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বললেন -”ও লজ্জা পাচ্ছে বলতে, আমিই বলে দিচ্ছি। তুমি বাবা হতে চলেছ! প্রায় চারমাস চলছে”।

     মিনিট দশেক পর সমস্ত উচ্ছাস কেটে যাবার পর বিক্রম বলল -”তাহলে চল এবারে বিয়েটা করে ফেলি। আফটার অল পিতামাতার বিবাহে উপস্থিত থাকাটা শিশুদের কি উচিত হবে?”

     কলিন বলল -”করব, ইমিডিয়েটলিই করব। তবে ৬ই জুনের পরে।”

     -”কেন।”

     -”ওই দিন আমাদের সবচেয়ে বড় র্যালি টা হবে। বিশ্বাস কর, আমরা সেদিন পুরো বিশ্ব কাঁপিয়ে দেব। ওদের নিউক ব্যান করতেই হবে।”
বিক্রমের মনে পড়ল ব্লু গিল উৎক্ষেপনের দিন ঠিক হয়েছে ২জুন।

 

(৯)

স্থানঃ নিউইয়র্ক
সময়ঃ ৩ জুন ১৯৬২

     এস-এন-ডির অফিসে সবাই মন খারাপ করে বসে আছে। বিক্রমও। কাল রাতে খবর এসেছে। ব্লু-গিল উৎক্ষেপন ব্যর্থ হয়েছে।

     ব্যাপারটা বিক্রম যা ভেবেছিল তাইই হয়েছে। প্রথম কয়েক মিনিট উপরে ওঠার পর রেডার ব্লু-গিলকে খুঁজে পাচ্ছিল না। যেহেতু স্বয়ংক্রিয় কট্রোলের উপর তেমন জোর দেয়া হয়নি, ফলে দ্বিতীয় ন্যাভিগেশানাল কারেকশানের সময় ব্লুগিল কে রেডার খুঁজেই পায় নি। একটা আস্ত নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড লাগানো মিসাইল কোনপথে চলেছে কেউ জানে না! ভীষণ প্যানিক ছড়িয়ে পড়ে। মিশন অ্যাবর্ট করে দেয়া হয়। নিউক্লিয়ার বোমাটিকে ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেয়া হয়। পরে অবশ্য জানা গেল গোলমালটা রাডারেই ছিল। মিসাইল নিজের পথ থেকে খুব একটা সরে নি। একটু চেষ্টা করলেই ঠিক পথে ন্যাভিগেট করে আনা যেত। কিন্তু এসব কথা এখন বলা সহজ। কন্ট্রোলরুমে অত মাথা ঠান্ডা রাখা যায় না। বোমাটি সমুদ্রে হারিয়ে গেছে।

     বারোটা নাগাদ চ্যাপম্যান বিক্রমকে ডেকে পাঠালেন। বললেন -”আমি তো রকেট সাইন্সের ব্যাপারে একেবারে আনাড়ি, তা তুমি সেদিন কি বলছিলে সেটা আমাকে একটু সময় নিয়ে বোঝাও তো।”

     বিক্রম সবটা বলার পর চ্যাপম্যান বললেন -”আমি ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। মনে হয় না মানবে, তবে তুমি তোমার ডিজাইন অনুযায়ী সার্কিট বোর্ড বানাতে দিয়ে দাও এবং তার পর টেস্টিং ও শুরু করে দাও। শেষ মুহুর্তে লেগেও যেতে পারে।”

     চ্যাপম্যানকে ধন্যবাদ দিয়ে ঘরে এসে বসেছে বিক্রম। এমন সময় হঠাৎ ফোন। কে ফোন করল? সেনোরিত্তা জিওর্দানো! কড়া ইটালিয়ান অ্যাকসেন্টে হাঁউমাঁউ করে যা বললেন তার থেকে বোঝা গেল কলিনকে এফ-বি-আই অ্যারেষ্ট করে নিয়ে গেছে! বিক্রম যেন শিগগির আসে।

     প্রায় ছুটতে ছুটতেই বিক্রম সেনরিত্তা জিওর্দানোর ফ্ল্যাটে গিয়ে পৌঁছাল। যা জানা গেল তা হচ্ছে কাল শেষ রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত পুলিশ উইমেন ফর পিসের সমস্ত নেতাদের গ্রেফতার করেছে। এমন কোন লোক নেই যে ৬ তারিখের র্যালি পরিচালনা করে।

     র্যালি গোল্লায় যাক। বোঝাই যাচ্ছে বিক্রমের সেইদিনের সেই কাগজে লেখা নামধাম পুলিশ চমৎকার কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু কলিনকেও ওরা অ্যারেস্ট করল! বিক্রম নিজের অবস্থানটা আস্তে আস্তে বুঝতে পারল। কলিন কেজিবি হোক, শয়তানের ঠাকুমা হোক, কিন্তু বিক্রম ওকে ছাড়া বাঁচবে না। এ কথাটা বিক্রম এতদিন কেন বোঝেনি? গুপ্তচর, গুপ্তচর খেলার উত্তেজনায় আর নাগরিকত্বের লোভে নিজের সন্তানের মাকে পুলিশে ধরিয়ে দিল বিক্রম? বিক্রম এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে ওই রোগা পাতলা হাসি মুখের মেয়েটা ছাড়া দুনিয়ায় ওর আপন বলতে আর কেউ নেই। ভালোবাসাটা কোনও মজার খেলা না; এটা যখন খুশি শেষ করে হাত পা ধুয়ে বাড়ি চলে যাওয়া যায় না। কলিন পুলিশের হাতে, এটা বিক্রমের কাছে একটা অসম্ভব ব্যাপার মনে হচ্ছে। যে করেই হোক ওকে ছাড়িয়ে আনতেই হবে।

     কিন্তু প্রশ্ন হল কি ভাবে? মার্কিন উকিলদের কাউকেই তো বিক্রম চেনেনা। অবশেষে কলিনের বাবা কে ফোন করাই যুক্তিযুক্ত মনে করল বিক্রম।

     ও-কনর কে যতটা ভেঙ্গে পড়া অবস্থায় পাবে ভেবেছিল বিক্রম তা কিন্তু হল না। উনি প্রথমেই বললেন যে এটা যে কোনওদিনই ঘটতে পারত। উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে এফ-বি-আই উকিল ছাড়া কাউকে কলিনের সঙ্গে দেখা করতে দিচ্ছে না। ও-কনর বিক্রমকে সাবধান করে বললেন সে যেন এই চক্করের মধ্যে না যায়। কলিনের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলে বিক্রমকে একজন সন্দেহভাজন লোক বলেই ধরা হবে।

     কিন্তু বিক্রম এর মধ্যে না গিয়ে পারে কি করে? মাথা ঠান্ডা করে এবারে ও ঠিক করল বার্টিকে ফোন করবে। বার্টি আপদকালিন যোগাযোগের জন্য বিক্রমকে একটা নম্বর দিয়েছিল বটে। ফোন করার পর একজন ফোন ধরে বলল বার্টি ব্যস্ত আছে। ঘন্টা দুয়েক বাদে ফোন করতে। ঘন্টা দুয়েক বাদেও সেই একই কথা। বিক্রমের অস্থিরতা ক্রমে বাড়ছিল। ও কি সরাসরি এফ-বি-আইয়ের অফিসে চলে যাবে? কিন্তু সেখানে কেই বা ওকে পাত্তা দেবে? কি করা যায়। এতো স্বখাত সলিল! বিক্রমের চোখ ক্রমে জলে ভরে আসতে থাকল। মন শক্ত করে আর একবার ফোন করল বিক্রম। লোকটি আবার বলল বার্টি ব্যস্ত আছে। বিক্রম একটু কঠিন গলায় বলল। -”একটা খবর দেবার ছিল। খবরটা বার্টিরই দরকার। আমি আর ফোন করব না। বার্টি যেন তার সময় মতো আমার সঙ্গে পরে দেখা করে।”

     এতেই কাজ হল, লোকটা বলল -”একটু হোল্ড কর।” মিনিট দুয়েক পর বার্টির গলা পাওয়া গেল -”বিক্রম আয়াম অফুলি বিজি নাউ। কি বলবে চটপট বল।”
বিক্রম গম্ভীর গলায় বলল “এতো চটপট বলা যাবে না। তোমার সঙ্গে দেখা করতে হবে।”

     বার্টির হাসি হাসি গলা পাওয়া গেল -”কি ব্যাপারে? নিশ্চয়ই কেজিবির ব্যাপার?”

     -”যদি বলি তাইই?”

     ওপাশে বার্টির অট্টহাস্য শোনা গেল। -”বিক্রম! তুমি আমার ব্লাফ আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছ?”

     -”মানে?”

     -”মানে কোথায় কেজিবি! ওসব বাজে কথা। তোমার কাছ থেকে উইমেন ফর পিসের ইনফো নেবার জন্য ওসব পুলিশি ধাপ্পা?”

     -”তাহলে ড্রাগোমিরফ?”

     -”গল্পের বইয়ের চরিত্র। এসব নাটকীয়তা আমদানি না করলে তুমি কি আর আমার সঙ্গে স্পাই স্পাই খেলতে? নাকি নিজের প্রেমিকাকে ফাঁসিয়ে দিতে? তোমার মনে বেশ একটু হিংসা হিংসা ভাব না এলে কি আর তুমি আমাদের হয়ে কাজ করতে?”

     বিক্রম আর থাকতে পারে না। বাংলা ভাষায় বার্টির মায়ের চরিত্র সম্বন্ধে প্রচুর সন্দেহ প্রকাশ করে ফেলে সে। তাঁর বহুভর্তৃক স্বভাবের কথাও উচ্চস্বরে ঘোষণা করে। বার্টি হাসতে থাকে। বলে -”মাতৃভাষায় গালাগালি দিলে মনটা ঠান্ডা হয়। এনিওয়ে, ওই লিস্টটার জন্য ধন্যবাদ। আর তোমার কলিনকে আমরা মাস তিন চার পর ছেড়েই দেব, চিন্তা কোরো না। আসলে উইমেন ফর পিস বড্ড জ্বালাচ্ছিল। ওদের মেরুদণ্ড ভাঙ্গাটা খুব দরকার ছিল। থ্যাংক ইউ ফর ইওর হেল্প।” বার্টি ফোন কেটেও দেয়।

     বিক্রম ফোন বুথ থেকে বেরিয়ে চলতে থাকে। আজ সারা দিন খাওয়া হয় নি। কলিন থাকলে ঠিক চারটি খাইয়ে দিত। আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলো না বিক্রম। রাস্তার পাশে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল। কলকাতা হলে ভীড় জমে যেত। কিন্তু এখানে কেউ পাত্তা দিল না। দু একজন মহিলা একটু চোখ তুলে দেখলেন মাত্র। অবশেষে যখন চোখ মুছে বিক্রম রওনা দেবে ভাবছে, তখনই সে লক্ষ করল একটি নিগ্রো ছেলে অনেকক্ষণ ধরে তাকে লক্ষ করছিল। এবারে ছেলেটি প্রশ্ন করল “হুই ম্মে। নি প্রওলে?” (হাই মেট, এনি প্রবলেম)। বিক্রম তাকে ডাকল। তারপর দোকানের কাঁচে নিজের ছায়া দেখিয়ে বলল

     -”কাকে দেখছ?”

     -”কেন? তোমাকেই দেখছি!”

     -”না বন্ধু। তুমি একটা গাধাকে দেখছ।”
ছেলেটি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বিক্রম হঠাৎ খানিকটা হেসে চলতে শুরু করে। অবশেষে সে নিজেকে চিনতে পেরেছে।

 

(১০)

স্থানঃ হনলুলু
সময়ঃ ৫ জুলাই ১৯৬২

     সময় এখন ঘোড়ার বেগে দৌড়াচ্ছে। বিক্রম সময়ের সঙ্গে তাল রাখতে হিমসিম খাচ্ছে। যে রেটে ঘটনা ঘটছে তা সামলানো সত্যিই মুশকিল। কলিনের ব্যাপারে বিক্রমের মন খারাপ করে থাকারও অবকাশ হয় নি। তার ডিজাইন করা কন্ট্রোল সিস্টেমটা ওয়ার্কশপ থেকে তৈরি হয়ে আসার পর থেকে সেটার টেস্টিং নিয়ে বিক্রম চোখের পলক ফেলারও সময় পায় নি। নাসায় জয়েন করার পর প্রথম সত্যিকারের কাজের কাজ হচ্ছে এইটা। প্রাথমিক টেস্টিং সফল হবার পর এবারে রকেটে বসিয়ে টেস্ট করার কথা, কিন্তু কোথায় রকেট?

     ব্লু-গিলের পরবর্তী বোমাটার নাম স্টারফিস। এটাও সেই থর মিসাইলের মাথাতেই বসানো হবে,। কিন্তু গতবার ন্যাভিগেশানের উপর বেশী ভরসা করার পর এবার কন্ট্রোলের উপর সবটা ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বিক্রমের মতে এটা আরো বড় ভুল, কারণ রকেট ছাড়ার সময়ে যদি কোনও বড়সড় মিস-অ্যালাইনমেন্ট হয়, যেমন ধরা যাক হাওয়ার একটা বড় ঝাপটা, তখন স্বয়ংক্রিয় কন্ট্রোল গুলিয়ে ফেলবে। এইসব সময় ন্যাভিগেশান ধীরে সুস্থে কারেকশান করে নিতে পারতো।

     কন্ট্রোলের বোর্ডটা মোটামুটি ঠিকঠাক হতেই বিক্রম খবর পেলো ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটুট অফ টেকনোলজি সংক্ষেপে এম-আই-টি, একটা স্পেস-সাইন্স সেমিনার করছে। ১৪ জুন থেকে ১৬ জুন। এটা বিক্রম অনেক আগেই জানত। তাকে ওরা আমন্ত্রণও করেছিল। কিন্তু আগে যেটা জানত না সেটা হল কনক্লুডিং সেশানে ভ্যান অ্যালেন আসবেন। বিক্রম এতদিন এদেশে থেকেও ভ্যান অ্যালেনকে চাক্ষুষ দেখে নি। ভাবল এদিকে একদিন ম্যানেজ করে ১৫ তারিখ রাতে গিয়ে আবার ১৬ তারিখ বিকেলে ফিরে আসবে। অনুমতি পেতে অসুবিধা হল না।

     কিন্তু ১৬ তারিখে সেমিনার রুমের বাইরে বিক্রম একটা বিরাট চমক খেল। দেখল লবির বাইরে দুএকজন বয়স্ক প্রফেসারের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন বিক্রমের জীবনের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় লোকটি। প্রফেসার শিশির কুমার মিত্র! স্যার যে এম-আই-টি তে সেমিনারে আসবেন কে জানতো?

     দেখা হবার প্রাথমিক উচ্ছ্বাস কেটে যাবার পর প্রফেসার মিত্র বিক্রমকে নিয়ে এক পাশে সরে এলেন।

     -”বলো এখন কি করছ?” স্যার কাউকে তুই বলতেন না।

     কিন্তু বিক্রমের কাজটা যখন বিক্রম সবিস্তারে স্যারকে বোঝাতে লাগল, বিক্রম লক্ষ করে নি স্যারের ভ্রূ ক্রমশঃ কুঁচকে যাচ্ছে। মাঝখানে বাধা দিয়ে বললেন
     -”দাঁড়াও, দাঁড়াও, ইউ মিন টু সে, নাসা নিয়ার স্পেসে নিউক্লিয়ার বম্ব এক্সপ্লোড করবে?”

     -”হ্যাঁ স্যার?”

     -”কত হাইটে?”

     -”ধরুন পাঁচশো কিলোমিটার”।

     -”এই এক্সপেরিমেন্টের উদ্দেশ্য কী? এ তো ভয়ংকর কাণ্ড!”

     -”কেন স্যার? পৃথিবী থেকে অনেক দূরে ফাটানো হলে নিউক্লিয়ার ডেব্রিগুলোও পৃথিবী থেকে দূরে রইল আবার ক্ষতিকর রেডিয়েশানেরও বেশীর ভাগটা বেরিয়ে যাবে”।

     -”হ্যাভন্ট ইউ ফেলোজ হার্ড অফ ভ্যান অ্যালেন বেল্ট?”

     -”হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, কিন্তু স্যার……”

     -”ভ্যান অ্যালেন বেল্ট আমাদের কাছে এত ইম্পর্ট্যান্ট কেন জান?”

     -”এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল সমস্ত ফ্যাটাল রেডিয়েশানকে আটকে দেয়।”

     -”ইংরেজিতে একটা কথা আছে। হোয়াট ইস আ সস ফর গ্যান্ডার ইস আ সস ফর গুজ অ্যাজ ওয়েল। হংস যাহা ভালো খায় হংসীও তাহাই ভালো খায়। তোমরা কি এটা বুঝতে পারছ না, যে মেকানিজমে ওই ভ্যান অ্যালেন বেল্ট বাইরের রেডিয়েশানকে ঢুকতে দেয় না ঠিক সেই মেকানিজমেই ভিতরের রেডিয়েশানকেও বার হতে দেবে না! আর আমি যদিও নিউক্লিয়ার ফিজিক্স ভালো জানি না, কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যে বোমা ফাটালে রেডিয়েশানগুলোর সঙ্গে বাতাসের অনু-পরমাণুদের সংঘর্ষে একটা বিরাট তাপ আর ব্লাস্ট হয়, ফলে রেডিয়েশানের শক্তি অনেক, অনেক কমে যায়। কিন্তু নিয়ার স্পেসে সবটাই ফাঁকা, ফলে সমস্ত বোমার এনার্জি আলফা, বিটা আর গামা পার্টিকলদের মধ্যে সঞ্চারিত হবে। সবচেয়ে ভয়ানক কথা হল এটা একবারে পৃথিবীতে আসবে না। অনেকটা এনার্জি ওই ভিতরের ভ্যান অ্যালেন বেল্টে সঞ্চিত হয়ে থাকবে। একটু একটু করে রেডিয়েশানের বিষ সরাসরি আকাশ থেকে আমাদের গায়ে ঝরতে থাকবে। তোমরা কি পাগল নাকি বিক্রম? বিজ্ঞান চর্চার নামে সবাইকে সরাসরি বিষ দিতে চাও?”

     বিক্রম সম্পূর্ণ কনফিউজড হয়ে বলল -”আপনি কি বলছেন স্যার! এটা কেউ ধরতে পারলো না? এখন ১৯ তারিখেই তো স্টারফিস বোমাটার উৎক্ষেপন হবে!”

     -”আটকাও বিক্রম! যে কোনও মূল্যে আটকাও! নিজেদের গায়ের উপর পরমাণু বোমা ফাটিয়ে মজা দেখো না! ওঃ কি ভয়ংকর নির্বুদ্ধিতা!” বিড় বিড় করতে করতে বৃদ্ধ প্রফেসার সেমিনারের ঘরে ঢুকে গেলেন।

     চূড়ান্ত গুলিয়ে গিয়ে বিক্রম আর সেমিনারের ঘরে না ঢুকে সটান নিউইয়র্ক ফিরে এল। এর মধ্যে ও মনে মনে হিসাব করেছে একটা দেড় মেগাটন বোমার যদি সবটাই রেডিয়েশানে পর্যবসিত হয় এবং পৃথিবীতে ফিরে আসে তাহলে গোটা পৃথিবীর প্রত্যেক বর্গমিটারে ১২০০ রেম করে রেডিয়েশান পড়ে। যেখানে একটি গর্ভস্থ শিশুকে ভবিষ্যৎএ ক্যান্সারগ্রস্থ করতে লাগে পঞ্চাশ রেম মাত্র। এ কি সম্ভব নাকি? যাঃ স্যার অকারণে ভয় পাচ্ছেন।

     কিন্তু বিক্রম প্রফেসার মিত্রকে যতদূর চেনে তাতে উনি না বুঝে ফট করে একটা কথা বলার মানুষ একেবারেই নন। ফলে বিক্রমের মনে অস্বস্তিটা রয়েই গেল।

     কিন্তু ১৯ তারিখে স্টারফিশ উৎক্ষেপণের সময় যা হল তাকে ‘কেলেঙ্কারির বাবা’ বলা উচিত। এবারো বিক্রম যা ভেবেছিল তাইই ঘটল। রকেট ছাড়ার সময় একটা ঝোড়ো হাওয়ার দাপটা রকেটের নাক সামান্য অন্য দিকে হয়ে গিয়েছিল। স্বয়ংক্রিয় কন্ট্রোল তৎক্ষণাৎ নজল সরিয়ে গিম্বল কন্টোল করতে গেল। এই সরানোর পরিমান বেশী হবার দরুণ রকেটের নাক এবারে উল্টোদিকে চলে গেল। এবং আবার, আবার একই ঘটনা। এর মধ্যে ঝোড়ো হাওয়ারও অবদান ছিল। অতঃপর যা ঘটল কন্ট্রোলের ভাষায় তাকে বলে আনস্টেবল সিস্টেম। দশ কিলোমিটারের মতো উচ্চতায় ওঠার পরই রকেট ছুঁচোবাজির মতন এদিক ওদিক করতে লাগল। বোমা ডিঅ্যাক্টিভেট করতে করতেই রকেটের জ্বালানিতে আগুন ধরে যায়। তারপর রকেটটা টুকরো টুকরো হয়ে আকাশ থেকে পড়ে যেতে থাকে। বেশীর ভাগ অংশ সমুদ্রে পড়লেও কিছু টুকরো ভয়ার্ত মিসাইল কর্মীদের চোখের সামনে দ্বীপের উপরেও পড়ে। ভাগ্য খুবই ভালো বলতে হবে বোমার অংশটা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। সেটাও টুকরো টুকরো হয়ে যায় আর সমস্ত তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম সমুদ্রে মিশে যায়।

     এই ঘটনার সময় বিক্রম নিউইয়র্কেই ছিল। পরদিন একটা ইমারজেন্সি মিটিং ডাকা হয়। অপদস্থ ভন ওয়ার্নারকে যা তা বলা হয় এবং শেষ চেষ্টা হিসাবে তৃতীয় একটা বোমা যার নাম স্টারফিশ প্রাইম উৎক্ষেপন করা হবে ঠিক হয়। এবারে বিক্রমকে কন্ট্রোল সিস্টেমের পুরো দায়িত্ব দেয়া হল। বিক্রম প্রথমে বলে যেহেতু ওর সিস্টেমটা সম্পূর্ণ নুতন, তাই একটা আট টনের ডামি লোড দিয়ে একটা ডিমনস্ট্রেশান করা উচিত। কিছুটা তর্ক বিতর্কের পর বিক্রমের কথাটা মেনে নেয়া হল। এবারে বিক্রম বলতে থাকে ওর আশংকার কথা। এই এক্সপেরিমেন্টের ফল ভালো নাও হতে পারে। ভ্যান অ্যালেন বেল্ট যদি যাবতীয় রেডিয়েশান আটকে দেয় তাহলে তা পৃথিবীর পক্ষে বিপদজনক। কিন্তু এবারে সবাই হাঁউ মাউ করে বাধা দেয়। বলে ‘বুড়ি অ্যাক্টিভিস্টদের মতো কোরো না তো। কে বলেছে এরকম হতে পারে?’ প্রফেসার এস কে মিত্রর নাম শুনে সবাই হাসাহাসি করে। বলে কোথায় ইন্ডিয়ার কোনও অবস্কিওর বৃদ্ধ কি বলল তার উপরে নাসার কর্মসূচি নির্ভর করবে নাকি? মোটকথা বিক্রমের কোনও কথাকেই কেউ পাত্তা দিল না। বিক্রমও মনে মনে একটু ভরসা পেল। যাক এতগুলো লোকের কথা নিশ্চয়ই ভুল হবে না।

     ঠিক হল বিক্রম আর এখানে না থেকে হনলুলু চলে যাবে। সেখান থেকেই ওদের কিউকি লাঞ্চিং প্যাড থেকে বিক্রমের নিজের তত্ত্বাবধানে প্রোটোটাইপ রকেটটা ছাড়া হবে। তারপর বিক্রম গ্রিন সিগনাল দিলে তবেই ছাড়া হবে তিন নম্বর রকেট বোমা স্টারফিস-প্রাইম। ডি-ডে স্থির হয়েছে ৮ জুলাই রাত দশটায়। প্ল্যান মোতাবেক আজ বিক্রম হনলুলু পৌঁছেছে।

 

(১১)

     হনলুলু পৌঁছানোর পর বিক্রমের অবস্থা আরো খারাপ হল। একদিকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা এতগুলো ল্যাব, জাহাজগুলোর টেম্পোরারি ল্যাব সবকটায় কিরকম ভাবে রেডিয়েশান মাপা হবে তার যোগাড়যন্ত্র আর ওদিকে রকেটের কন্ট্রোলের দায়িত্ব সব তার। ইতিমধ্যে প্রোটোটাইপ রকেটটা পৌঁছে গেছে। ৩০ তারিখে সেটাকে ছাড়া হল। বিক্রম প্রচণ্ড আনন্দের সঙ্গে দেখল যে তার প্রোটোটাইপ রকেট নিখুঁত ব্যালিস্টিক ট্র্যাজেকটারি ধরে যেভাবে চলার কথা ছিল ঠিক সেইভাবেই লক্ষ্যে পৌঁছাল। মাঝখানে দুবার মাত্র ন্যাভিগেশনাল কারেকশান করতে হল। তাও প্রায় না করারই মতো।

     অবশেষে এল সেই ৮ জুলাইয়ের রাত। স্টারফিশ-প্রাইম ছাড়ার আগে একটা ছোট রকেটের মাথায় কিছু মাপজোকের যন্ত্রপাতি তুলে ছেড়ে দেয়া হল। রাত ঠিক দশটায় ছাড়া হল স্টারফিশ প্রাইম রকেট। নিখুঁত ব্যালিস্টিক পথ ধরে রকেট উঠে গেল ১১০০ কিলোমিটার। তারপর নামতে আরম্ভ করল। এর মধ্যে একটা মাত্র ন্যাভিগেশনাল কারেকশানের দরকার হয়েছিল। তারপর হিসাব মতো ঠিক দশটা বেজে তেরো মিনিট বেয়াল্লিশ সেকেন্ড পর, পৃথিবী থেকে আটশো কিলোমিটার উপরে বিস্ফোরিত হল ১.৪ মেগাটনের স্টারফিশ-প্রাইম!

     বিক্রম হনলুলুর ল্যাবে রেডিয়েশান মনিটারের কাজ দেখছিল। হঠাৎ একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট বলল –“ভিকি গামা রে মেসারিং ইন্সট্রুমেন্টটা এইমাত্র বিগড়ে গেল!”

     যাচ্চলে, এ হতভাগা বিগড়োবার আর সময় পেলো না? দৌড়ে গিয়ে বিক্রম দেখল ডিটেকটারের কাঁটা সম্পূর্ণ একদিকে ছটকে আছে। চার্ট রেকর্ডারের পেনটাও একদিকে সরে গেছে। মানে আউটপুট স্টেজে কোথাও গোলমাল হয়েছে। কিন্তু এমন সময় ফোন বেজে উঠল। এগুলো ইউএস আর্মির রেডিও ফোন। বিক্রম ধরতে ওপাশ থেকে উত্তেজিত আওয়াজ এল

     -”স্টারফিশ প্রাইম অস্ট্রেলিয়া স্টেশন বলছি। আমাদের সব কটা গামা রে ডিটেক্টার স্যাচুরেট করে গেছে”।

     স্যাচুরেট করে গেছে মানে এত গামা রে আসছে যে তা যন্ত্রটার মাপার ক্ষমতার বাইরে। বিক্রম চমকে উঠল! তাহলে এখানকার গামা রে ডিটেক্টারটাও খারাপ হয় নি, স্যাচুরেট করে একপাশে সরে গেছে!

     এক এক করে সব স্টেশান থেকে খবর আসতে থাকল। সবারই এক অবস্থা, শুধু পেরু থেকে খবর এল তারা অ্যাটিনুয়েশান বাড়িয়ে দিয়ে মাপ করেছে। অকল্পনীয় বেশী গামা রে আসছে, যা আসার কথা ছিল তার অন্তত দেড়শোগুন বেশী। কি সর্বনাশ।

     এদিকে জনস্টন আইল্যান্ড থেকে প্রচুর আনন্দ উচ্ছাস মিশ্রিত ফোন আসছে। নাসার হেডকোয়ার্টার থেকেও বিক্রমকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোন এল। কিন্তু বিক্রমের তখন সেসব শোনার সময় নেই।

     কারণ টিভিতে দেখাচ্ছে গোটা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জেই ইলেকট্রিক লাইন ট্রিপ করে গেছে। বিক্রম এবারে অন্য ব্যান্ডের রেডিও এনার্জির খবর নিল। সব কটাই অসম্ভব বেশী ভ্যালু দেখাচ্ছে।

     শেষ রাতের দিকে যখন বিক্রম সমস্ত খবর এক করতে পারল তখন বুঝলো এই স্টারফিশ প্রাইমের দেড়-মেগাটনের একটি বোমা সারা পৃথিবীর বুকে যে পরিমান রেডিয়েশান ছড়াতে চলেছে তার তুলনায় এত দিনের ফাটানো এতগুলো বোমার রেডিয়েশান নেহাতই নস্যি। কি ভয়ানক! স্যারের কথাগুলি মনে পড়ল বিক্রমের। একেবারে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। স্পেসে বোমার পুরো এনার্জিটাই রেডিয়েশানে পরিণত হয়েছে। আর ভ্যান অ্যালেন বেল্ট তার একটুও বাইরে যেতে দেয়নি।

     যন্ত্রপাতি লাগিয়ে যে কটা রকেট ছাড়া হয়েছিল। তাদের বেশীরভাগই এই প্রবল রেডিয়েশানে নষ্ট হয়ে গেছে। দুটো থেকে খবর মিলল হাজার কিলোমিটার উপরে অকল্পনীয় সংখক হাই এনার্জি ইলেকট্রন দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে।

     বিক্রম সকাল সাতটা নাগাদ প্রথম রিপোর্ট লিখে টেলিপ্রিন্টারে হেড অফিসে পাঠালো। সাড়ে সাতটায় চ্যাপম্যান ফোন করে বিক্রম কে জানালো সমস্ত মেজারমেন্ট বন্ধ করে দাও। সারা পৃথিবীর কোথাও যেন স্টারফিশ প্রাইমের কোনও মেজারমেন্ট না হয়। আর সমস্ত ডেটা প্যাক করে হেড অফিসে পাঠিয়ে দাও। বিক্রম হাঁ হয়ে বলল “এতবড় এক্সপেরিমেন্টের মেজারমেন্ট হবে না! এখনই তো আসল ডেটা পাবার সময়। ওই হাই এনার্জি ইলেকট্রনগুলো কিভাবে আপার অ্যাটমস্ফিয়ারের সঙ্গে ইন্টার-অ্যাক্ট করে, কিভাবে এনার্জি ট্রান্সফার হয়….”

     -”বিক্রম! এটা একটা ইন্টারন্যাশনাল ইস্যু হতে চলেছে। সবার সব আঙুল ইউ-এস গভর্নমেন্টের দিক উঠবে। তাই কোনও প্রমাণ রাখা চলবে না। সারা পৃথিবীর উপর গামা রে ছেড়ে এক্সপেরিমেন্ট করা অ্যাফোর্ড করা যায় না”।

     বিক্রম এবারে হেসে ফেলে। বলে –“গামা রে ছাড়ার কাজটা তো করেই ফেলেছি। এখন উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে গামা রে না মাপলে কি সুবিধে হবে?”

     -”ডোন্ট বি এ ফুল। আমরা প্রমাণ রাখব কেন? এনিওয়ে, তুমি সব জায়গায় খবর পাঠাও, এক্সপেরিমেন্ট প্যাক-আপ করতে।”

     বিক্রমের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে যায়। বলে -”বুঝেছি। পাকা চোরে মতো। কাজ সেরে কেটে পড়া আর কি!”

     -”বিক্রম, বিবেকের ভুমিকায় অভিনয় বন্ধ কর। এই প্রোজেক্টের প্রোপোজাল তোমার। এই ডিজাস্টারের দায়িত্ব তুমি অস্বীকার করতে পারো?”

     না, তা কি করে পারবে বিক্রম? তবে আর এদের সঙ্গে না। যথেষ্ট হয়েছে।

     -”ওকে স্যার। আমি প্যাক আপ করে দিচ্ছি।”

     সন্ধ্যার জাহাজে সানফ্রানসিসকো রওনা হয় বিক্রম। কাল টেলিপ্রিন্টারেই নিজের রেজিগনেশান নাসা হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়ে দিয়েছে সে।

     নিউইয়র্ক ফিরে সোজা এফ-বি-আই এর অফিসে চলে যায় বিক্রম। বার্টির সঙ্গে দেখা করতে চায়। সেই একই কথা, দেখা হবে না। এবারে বিক্রম একটা কাগজে লেখে
     -”আমি দেশে ফিরে যাচ্ছি। তুমি যদি দেখা না কর তো ফেরার আগে একটা টিভি ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরব। সেক্ষেত্রে তুমি এবং আইজেনহাওয়ার দুজনকেই অনুতাপ করতে হবে। এই মুহূর্তে আমার আর প্রাণের মায়াও নেই”।

     বার্টি এসে উপস্থিত হয়। মহা বিরক্ত। বলে -”দেখো তোমাকে আমি বারবার বলেছি, কলিনের সঙ্গে দেখা হবে না। তুমি কি বুঝতে পারছ না যে তুমি শুধু নিজের ক্ষতি ডেকে আনছ?”

     বিক্রম গম্ভীর ভাবে বলে -”বার্টি, তুমি স্টারফিশ প্রাইমের নাম শুনেছো?”

     -”ওরে বাবা! সে তো কিসব টপ সিক্রেট এক্সপেরিমেন্ট!”

     -”আগামীকালের মধ্যে যদি সমস্ত অভিযোগ তুলে কলিনকে ছেড়ে না দেয়া হয় তো কাল রাত্রে বিবিসি একটা টেলিকাস্ট করবে ‘স্টারফিশ, এ ডিসাস্টার’। তারপর আর যাই হোক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতেই হবে। না না, আমাকে গ্রেফতার করে লাভ নেই বাছা। সব কাগজ আমি আমার ল-ইয়ারকে দিয়ে বলেছি অলরেডি ইংল্যান্ডে তার অফিসে এয়ার মেল করে দিতে। আমি বারণ না করলে কাল লেট নাইটে বিবিসি প্রোগ্রামটা হচ্ছেই।”

     বার্টির মুখখানা দেখার মতো হল। বলল “তুমি যে সত্যি বলছ তার প্রমাণ কী।”

     -”তোমাদের এখানে নিশ্চয়ই ভি-আই-পি লক আপ আছে? আমি এখন সেখানেই থাকবখন। স্নান খাওয়া হয় নি, আরামসে করে নেব। তুমি নাসায় বিক্রম সরকারের ব্যাপারে খোঁজ নাও না।”

     বার্টি কয়েক সেকেণ্ড বিক্রমের হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ বিক্রমের দুই হাত জড়িয়ে ধরল। বলল -”প্লিজ তুমি হঠাৎ কিছু করে বোসো না। আমি পার্সোনালি কলিনকে ছাড়ার ব্যাপারটা দেখছি। কিন্তু দুটো দিন সময় দাও”।

     বিক্রম হাত ছাড়িয়ে নিল। স্থির দৃষ্টিতে বার্টির দিকে তাকিয়ে বলল -”কাল সন্ধ্যা ছটার মধ্যে। সিনোরিত্তা জিওর্দানোর ওখানে। ফুল অ্যান্ড ফাইনাল”।

     -”আচ্ছা বাবা আচ্ছা। তাইই হবে”।

     এখন রাত আটটা। বার্টি কথা রেখেছে। কলিনকে ঠিক সময়ের আগেই জায়গা মতো পৌঁছে দিয়ে গেছে।

     বিক্রম কলিনের সামনে মাথা নিচু করে বসে। একটু আগে সে কলিনকে সব খুলে বলেছে।

     কলিন ধরা গলায় প্রশ্ন করল -”এসব সত্যি বিক্রম? এটা কোনও দুঃস্বপ্ন নয়?”

     -”সব সত্যি কলিন। লোভ আমাকে পাগল করে দিয়েছিল। এদেশে থাকার লোভ, নাসায় আরো উঁচুতে ওঠার লোভ।”

     কলিন বহুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল “এবারে তুমি কি করবে বিক্রম?”

     -”প্রথমে তোমাকে বিয়ে করব। তারপর তোমাকে নিয়ে দেশে ফিরে যাব।”

     -”তা হয় না বিক্রম”।

     -”কেন হয় না কলিন? তুমি কি তোমাদের এই আন্দোলন চালিয়ে যেতে চাও? সেক্ষেত্রে আমিই এখানে থেকে যাব, কিছু ছোটখাট অডজব করব, আর আমেরিকার নাগরিকের বরকে তো আর এরা তাড়াতে পারবে না…. “

     কলিনের গলা খুব করুণ শোনালো -”কিন্তু আমি তোমাকে কিভাবে বিয়ে করি?”

     -”কলিন আমি বিরাট অন্যায় করেছি। কিন্তু তুমি তো খৃষ্টান, অনুতাপ করলে তো ঈশ্বরও পাপী কে ক্ষমা করেন। আমি যে সত্যি অনুতপ্ত, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?”

     -”হচ্ছে বিক্রম। আমি খুব ভালো করে জানি তুমি হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে অনুতপ্ত।”

     -”তাহলে?”

     -”ঈশ্বর তোমাকে নিশ্চয়ই ক্ষমা করবেন বিক্রম। কিন্তু আমি তুচ্ছ মানবী। আমি আমার গর্ভস্থ সন্তানকে কখনো সেই পুরুষের পদবি দিতে পারব না যে আমার পেটের উপর নিউক্লিয়ার বোমা মেরেছে। তুমি চলে যাও বিক্রম। আর দেখা না হলেই ভালো।”

     -”আর আমাদের সন্তান?”

     -”ভয় পেয়ো না। তাকে আমি সযত্নে মানুষ করব। এমন মানুষ যে নিউক্লিয়ার বোমা কে প্রতিরোধ করবে।”

     -”তার পরিচয় কি হবে কলিন?”

     -”কলিন ও-কনরের কুমারী সন্তান বা যদি বল জারজ সন্তান। বিক্রম সরকারের সন্তান পরিচয়ের থেকে তা অনেক সম্মানজনক, কি বলো? যাও বিক্রম, চলে যাও।”

     বিক্রমের সামনে সমস্ত পৃথিবীটা টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। কলিন যে তার শেষ কথা বলে দিয়েছে এটা দিনের মতো পরিষ্কার। সে অসহায় ভাবে বলল -”তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে?”

     কলিন হাসল, কান্নার মতো হাসি। বলল -”খুব কষ্ট হবে, চিৎকার করে কাঁদব, ডিপ্রেশানে ভুগব, দিনের মধ্যে দশবার আত্মহত্যার কথা ভাবব। কিন্তু তাও বেঁচে থাকব। যীসাস তো আমার থেকেও বেশী কষ্ট পেয়েছিলেন। এটা হবে আমার ক্রস। আমিই বইব”।

     বিক্রম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কলিন বলল -”তোমাকেও তোমার ক্রস বইতে হবে বিক্রম। যাও যতটা সম্ভব সাহসের সঙ্গে সেটা কর।”

     বিক্রম ঘর থেকে বেরিয়ে এল। রাস্তায় যখন শেষ বারের মতো তিনতলার জানালার দিকে তাকালো, সেখানে কেউ ছিল না।

     এর দিন পাঁচেক পর বিক্রম ভারতে ফিরে প্রফেসার হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার সঙ্গে দেখা করে। ভাবা তৎক্ষণাৎ বিক্রমকে সদ্য তৈরি হওয়া ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন বা ইসরোর উচ্চপদে নিয়োগ করেন।

     বাকিটা তো ইতিহাস। গুগল করলেই জানা যাবে।

লেখকের কথাঃ  এটি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ঐতিহাসিক উপন্যাস। কোনও কোনও বাস্তব ঘটনা ও বাস্তব চরিত্রের উল্লেখ থাকলেও মূলতঃ কল্পনা আশ্রিত লেখা।

14 thoughts on “তারামাছ

  • October 14, 2018 at 8:50 pm
    Permalink

    আকাশ-যুদ্ধ জিনিসটা এতদিন ইতিহাসের পাতায় একটা অপঠিত অধ্যায় হয়েই ছিল। এই প্রথম সেটার ভেতরটা জানলাম, বুঝলাম। একেবারে রুদ্ধশ্বাসে পড়তে হল।
    কল্পনার মিশ্রণ নিয়েও এই উপন্যাস সত্যি। ভীষণভাবে সত্যি।

    Reply
  • October 20, 2018 at 2:18 am
    Permalink

    মহাকাশে দ্বৈরথ সমরের ছায়া বাড়িয়ে তুলছে ঠাণ্ডা যুদ্ধের উত্তাপ। রহস্যের মুক্তিবেগ ছাপিয়ে সেই সময় জেগে উঠেছে গল্প যার মধ্যে মিশে আছে অনেকটা সত্যি। কলমের মুন্সিয়ানার অল্টারনেট হিস্ট্রির ছোঁয়া রয়ে গেল সেই গল্পের শরীরে। মুগ্ধ …

    Reply
  • October 20, 2018 at 11:10 pm
    Permalink

    কল্পনা হলেও মনে হলো যেন নাসার আসল রূপটাই দেখলাম।

    Reply
  • October 22, 2018 at 1:59 am
    Permalink

    বিষয়বস্তুতে সাদামাটা স্পাই-থ্রিলার। কিন্তু নির্মেদ, নির্ভরযোগ্য নির্মাণ। আর ত্রিদিবেন্দ্রবাবু, শেষ করার আগে দম নেবার রাস্তা রাখেননি। ওয়াও!

    Reply
  • October 23, 2018 at 9:01 am
    Permalink

    এইমাত্র পড়ে উঠলাম। নারায়ণ সান্যাল মশাইয়ের বিশ্বাসঘাতকের পর বহুদিন বাদে ওই জাতীয় একটা ভাল লেখা পড়লুম। এনার নামেও অবিশ্যি নারায়ণ রয়েছেন। লেখার স্বাদ-গন্ধের গুণমানও কোনও অংশে কম নয়। ফেলুদার ভাষায় এ লেখা হল আনপুটডাউনেবল। একবার ধরলে আর শেষ না করে থামা যায় না।

    অবিশ্যি এসব নিতান্তই একজন আনাড়ি পাঠকের ব্যক্তিগত মতামত মাত্র। সাহিত্যবিচারের ক্ষমতা বা বিদ্যে কোনটাই আমার নেই, করতেও চাই না। একটা ভালো রান্নার পিছনে রন্ধন-শিল্পীর যে বিপুল পরিশ্রম, শিল্পবোধ এবং সর্বোপরি পরিমিতিবোধ রয়েছে তার উপযুক্ত বিচার করার যোগ্যতা আমার নেই।

    শুধু একটাই আক্ষেপ রয়ে গেল। বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। ই-ম্যাগাজিন বলেই কিনা জানি না, লেখকদের মধ্যে লেখা সংক্ষেপ করার একটা প্রবণতা লক্ষ করছি। অথচ, এখানে তো পাতা বাঁচানোর ব্যাপার নেই। তবে এই প্রবণতা কেন? আরেকটু বিস্তৃত করে লিখলে ক্ষতি কি ছিল?

    Reply
    • October 23, 2018 at 9:44 am
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ। এই গল্পটা নিয়ে খুব কনফিউজড আছি। আপনার কথায় সত্যিই ভরসা পেলাম।
      বড় লেখার প্রধান সমস্যা কিন্তু পাঠক। আপনার মত পাঠক কিন্তু কমই আছে। কেউই খুব বড় লেখা পড়তে চায় না। আর এখানে কিন্তু শব্দসংখ্যার লিমিট আছে, যদিও সম্পাদকরা এ ব্যাপারে খুবই সহৃদয়।

      Reply
  • October 23, 2018 at 10:18 am
    Permalink

    যেহেতু এটা উপন্যাস সেজন্যই একথা লিখলাম। উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে সঠিক ফুটিয়ে তোলার জন্যই একটু বিস্তৃত হওয়া দরকার। যেমন ধরুন একদিন এক এফবিআইয়ের এজেন্ট বলল, আর নায়ক স্রেফ তার মুখের কথায় ভালবাসার জনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করে দিল, এটা বড্ড সংক্ষেপে সারা হয়েছে বলে কি আপনার মনে হয় না? একদিকে চাকরি বাঁচানোর ভয়, অন্যদিকে নিজের মনের মধ্যে অপরাধবোধ বা পাপবোধ এ দুয়ের মধ্যে টানাপোড়েনটা আরেকটু বিশদ দেখানোর প্রয়োজন ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। অবস্থার চাপে পড়ে মানুষের বদলে যাওয়া, যা করতে চাই না, তাই করে ফেলা এটা নিয়ে আরেকটু লেখার অবকাশ ছিল বোধহয়।

    এছাড়া বিক্রমের অফিস কলিগ এবং তাদের সাথে বিক্রমের সম্পর্ক কিরকম সেটা নিয়েও একটু লেখা যেত। উপন্যাসে বিক্রমের সাথে শুধুমাত্র তার বসদের কথোপকথনই দেখান হয়েছে।

    আর লেখার সময় একদম শব্দসংখ্যা নিয়ে ভাববেন না। দরকার হলে পরে সারসংক্ষেপ করে দেবেন বা কোনো অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিলেন। আগে আপনার ডানার জোর কতখানি, তার শেষ সীমা কতখানি সেটা যাচাই করে নিন। পরে ইচ্ছা হলে নিচু দিয়েও উড়তে পারবেন।

    Reply
  • October 23, 2018 at 10:19 am
    Permalink

    কে বলে লোকে বড় লেখা পড়ে না? তাহলে শীর্ষেন্দুর পার্থিব বা দূরবীন আর বিক্রি হত না।

    Reply
  • October 23, 2018 at 12:32 pm
    Permalink

    আসলে ফেসবুকে দেখলুম কে যেন বলেছেন শীর্ষেন্দুর প্রয়াণের পর সাহিত্যজগতে আর মহারথী কেউ থাকবেন না, যাঁরা থাকবেন সব রথী। বিশ্বাস করুন এ কথা আমি মনে প্রাণে অবিশ্বাস করতে চাই। তাই এত আবেগভরে আপনাদের উৎসাহিত করতে চাই। আপনাদের মধ্যে ক্ষমতা দেখতে পাই বলেই করি। আর সেই মহারথী কল্পবিশ্ব থেকেই বেরিয়ে আসুক সেটা কল্পবিশ্ব টিমও চাইবেন না কি? সেজন্য সম্পাদকদের সহৃদয় হওয়া তাঁদের নিজেদের জন্যই জরুরী। বড় লেখক হয়ে ওঠার পিছনে ভালো সম্পাদকদের ভূমিকা কিছু কম নয়। আমার বিশ্বাস সাগরময় ঘোষের মত সম্পাদক ছিলেন বলেই দেশ পত্রিকা থেকে সে যুগে বড় বড় সাহিত্যিকরা বেরিয়ে এসেছিলেন।

    Reply
  • October 26, 2018 at 1:32 am
    Permalink

    asadharan lekha……ek niswas e sesh korlam………aager comments gulo porlam.aamaio ekmot arektu bistarito hole valo hoto.sudhu ek jaigai khotka……..Bikram ke nijer paddhati byabohar korate hobe bole rocket er aager duto utkhepon i byartho holo.etota sahoj samadhan golpei samvob…….tabe hya “Truth is stranger than fiction” holeo hote paare……..ar eta bolte pari sabai chhoto lekhar bhokto emon noi……aamar moto aaro pathok achhe jara uponyash (min. 200 pata) i beshi valo base….
    antorik avinandan……..

    Reply
    • October 26, 2018 at 6:46 am
      Permalink

      Saswata Chaudhury. ঠিক বলেছেন। ট্রুথ ইস স্টেঞ্জার দ্যান ফিকশান। আপনি গুগলে ফিশবোল এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে সার্চ করুন। দেখবেন স্টারফিশ প্রথম দুবার এবং পরে অনেকবার ব্যর্থ হয়। এ গল্পের নায়ক নায়িকা কাল্পনিক। তাছাড়া আর সবই সত্যি। রেজাল্ট অবশ্য চেপে দেয়া হয়েছিল।

      Reply
  • October 26, 2018 at 11:49 pm
    Permalink

    গল্পটা পুরোটা পড়লাম। যদিও বলা হয়েছে যে কল্প বিজ্ঞানের গল্প, কিন্তু একজন মা হিসেবে আমিও স্টার ফিস ডিসাস্টারের শিকার। আমার দশ বছরের ছোট্ট মেয়েকে ক্যান্সারের যন্ত্রণা পেতে দেখেছি। আর তার সাথে আমিও পেয়েছি এই অসহ্য যন্ত্রণা।

    Reply
  • October 27, 2018 at 9:48 pm
    Permalink

    Lekhok ki uponnas likhechen na space science ar atom bomber class niyechen. Etake ekbar bola hocche science fiction abar ekobar bola hocche sotti ghatona. eta ar jai hok science foction er kono dharay pore na. choritro gulio abastob. tachara nasa ke etota kharap dekhano ki thik hoyeche?

    Reply
  • November 10, 2018 at 8:20 am
    Permalink

    Besh valo laglo. Onek jagay ektu besi science er class neyar jhok royechhe. tobe Prof S.K Mitra er mukhe bosano research podhoti niye bola kothagulo ekdom khati. Keno korbo? ki korbo? kibhabe korbo…. ar upponyas to 100 pages er oporei pore moja…. nahole to jome othar aggei ses hoye jai. Aro onek valo lekhar protyasay thaklam.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!