দেবযন্ত্র

দেবী কল্যাণময়ীর কথা

    সিপাই বিদ্রোহের তিন বছর পর, অর্থাৎ ১৮৬০ খৃস্টাব্দের এই ঘটনা। সেদিন ছিল মহাষষ্ঠী, দেবী দুর্গার বোধন। হুগলী জেলার অবিনাশপুর গ্রামের জমিদার রামকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সকালবেলা গঙ্গাস্নান সেরে বাড়ি ফিরছিলেন। পাকা রাস্তা তখনও তৈরি হয়নি, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ। যেতে যেতে হঠাৎ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য রামকিঙ্কর বিস্ময়ে স্তব্ধ করে দেয়। আকাশ থেকে নেমে এলো এক অদ্ভুত যান, ঠিক যেন পুরাণে বর্ণিত দেব-দেবীর রথ। কি তার আলোর দ্যুতি ! কি তার বজ্রগম্ভীর শব্দ ! মেদিনী কাঁপিয়ে সেই রথ ধরাধামে অবতীর্ণ হল। সেখান থেকে নেমে এলেন এক অপরূপ সুন্দরী দেবী। কি স্নিগ্ধ তাঁর রূপ ! দেখলে দু’চোখ জুড়িয়ে যায়। সেই দেবীর হাতে এক অদ্ভুত ধাতুর বিগ্রহ। দেবী সেই বিগ্রহ জঙ্গলের মধ্যে এক ফাঁকা জায়গা দেখে নামিয়ে রাখলেন। সেই রথ আবার আলোর ঝলকানি দিয়ে এবং রণহুঙ্কার ছেড়ে আকাশে উড়ে গেল। দেবী এগিয়ে চললেন সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে।

    বিজয়া দশমীর দিনের ঘটনা। রামকিঙ্করের বাড়ির দুর্গা ঠাকুর এই একটু আগেই বিসর্জন গেল। রামকিঙ্কর গঙ্গাস্নান সেরে উঠতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ দেখলেন তাঁর অনতিদূরে জলে ভেসে যাচ্ছে সেই ষষ্ঠীর দিনে দর্শন পাওয়া দেবী, ঠিক যেমন কিছুক্ষণ আগে ভেসে গেছে তাঁদের বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা । ধর্মপরায়ণ ব্রাহ্মণসন্তান রামকিঙ্করের আর কোনও সন্দেহই রইল না যে ইনিই দেবী দুর্গা। দৌড়ে গেলেন তিনি সেই জঙ্গলে, দেখতে পেলেন সেই অদ্ভুত বিগ্রহ এখনও সেখানে বিরাজমান। দেবী দুর্গা নিজে এসে তাঁরই বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে গেলেন তাহলে !

    রামকিঙ্কর সেই স্থানেই সেই বিগ্রহকে ঘিরে এক মন্দির স্থাপন করলেন। লোকমুখে রামকিঙ্করের সেই দৈবিক ঘটনার বর্ণনা আরও ফুলে ফেঁপে উঠল। দেবীর নাম হয়ে গেলো মা কল্যাণময়ী। অবিনাশপুরের গ্রামবাসীদের বিশ্বাস – দেবী কল্যাণময়ী এমনই জাগ্রত যে সেই মন্দিরে গিয়ে মনে মনে কারও কথা ভেবে দেবীকে প্রার্থনা জানালে বহু দূরে বসে সেই মানুষটি – যার মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা জানানো হচ্ছে, সে মনে মনে শুনতে পায়। দেবীর কাছে প্রার্থনা জানালে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়।

(২)

    দেবী কল্যাণময়ীর মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড়শ বছরের কিছু বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে জমিদারি গেলেও বাঁড়ুজ্জ্যে বংশের প্রতিপত্তি কমেনি একটুও। রামকিঙ্করের সুযোগ্য বংশধর আদিনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এখন এই অবিনাশপুরেই বসবাস করেন। আদিনাথবাবুর স্ত্রী বেশ কয়েকবছর হল গত হয়েছেন, ওনার নিজেরও বয়স পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই। পৈতৃক বসতবাটিতে এখন উনি একাই থাকেন। তাঁর আর সব ভাইরা চাকরি বা ব্যবসার কারণে ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে বসবাস করেন, কালেভদ্রে অবিনাশপুরে ছুটি কাটাতে আসেন। শুধু আদিনাথবাবুই এখনও পর্যন্ত শিকড় আঁকড়ে পড়ে আছেন।

    আদিনাথবাবুর একমাত্র সন্তান নীলাঞ্জন খুব ছোট বয়স থেকেই কলকাতায় বোর্ডিং স্কুলে, তারপর ইউনিভার্সিটি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছে। নীলাঞ্জন ইংল্যান্ডে গিয়ে এমএসসি করে পিএইচডি করছে। সেখানে এমিলি নামে এক ব্রিটিশ মেয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং আদিনাথবাবুর অমতে সে তাকে বিয়ে করে। দেশ ছেড়ে যাওয়ার প্রায় বিশ বছর পর নীলাঞ্জন তার স্ত্রী এমিলিকে নিয়ে অবিনাশপুরে দুর্গাপুজো কাটাতে এসেছে।

    অবিনাশপুরে এসেই নীলাঞ্জন ছুটেছে দেবী কল্যাণময়ীর মন্দির দেখতে। এই দেবীকে নিয়ে লোকমুখে ফেরা নানান কিংবদন্তি বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র নীলাঞ্জনের কাছে গুরুপাক হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমত, সে নিজে মূর্তিপুজো ব্যাপারটা একদমই মেনে নিতে পারে না। তার ওপর ওর বিশ্বাস, নানান ধর্মীয় কুসংস্কার ভারতীয়দের বাকি জগতের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রেখেছে। এই নিয়ে আদিনাথবাবুর সঙ্গে তার ঘোর মতভেদ। সমস্ত কিছুকেই নীলাঞ্জন বিজ্ঞানের চোখে যাচাই করে নিতে চায়, সে যদি ভগবানও হয়, তাকেও ধরা পড়তে হবে বিজ্ঞানীর ল্যাবরেটরিতে। বিয়ের সামাজিক রীতিনীতিও নীলাঞ্জনরা মানেনি। আদিনাথবাবুর দৃঢ় বিশ্বাস যে অবিনাশপুরের ধর্মপরায়ণ বাঁড়ুজ্জ্যে বংশের সন্তান হয়েও নীলাঞ্জন এতটা নাস্তিক হয়ে উঠেছে শুধুমাত্র এমিলির সংসর্গে। একজন ব্রিটিশ মেয়ে কি করে বুঝবে ভক্তির মহিমা? সারাটা জীবন তো তারা শুধু ভোগ বিলাসেই কাটিয়ে দেয় ! এই কারণেই তিনি এই বিয়ের ঘোর বিরোধী ছিলেন। এমিলি যথাসাধ্য চেষ্টা করছে আদিনাথবাবুকে আপন করে নিতে, কিন্তু আদিনাথবাবুর তরফ থেকে দূরত্ব কিছুতেই ঘোচে না।

(৩)

    অবিনাশপুরে পৌঁছেই নীলাঞ্জন ছুটেছে দেবী কল্যাণময়ীর মন্দির দেখতে। মন্দির নীলাঞ্জনদের বাড়ি থেকে প্রায় দশ মিনিটের হাঁটা পথ। মন্দিরের বয়স যে প্রায় দেড়শো বছর, দেখলে তা বোঝার উপায় নেই। আদিনাথবাবু বা ওনার পূর্বপুরুষেরা এই মন্দিরের যত্নে কোনোরকম ত্রুটি রাখেননি কোনদিনও। মন্দিরের গায়ে অজস্র দেবদেবীর মূর্তির টেরাকোটার সূক্ষ্ম কাজ। প্রধান দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা দালান। সেখানে বেশ কিছু গ্রামের লোকজন বসে ভক্তিভরে দেবীর পুজো দেখছে। দালান পেরিয়ে গর্ভগৃহ। সেখানে শ্বেতপাথরের বেদিতে প্রতিষ্ঠিত দেবী কল্যাণময়ীর বিগ্রহ। সাধারণত দেবদেবীদের বিগ্রহ যেমন দেখতে হয় এ তেমন নয়। কালচে বাদামি রং, ত্রিভুজাকার। পুরোহিত মশাই দেবীর নিত্যপূজায় ব্যস্ত। বিগ্রহের কাছেই একজন মহিলা হত্যে দিয়ে পড়ে আছে। শোনা গেল তার ছোট ছেলের খুব জ্বর, তাই ওই মহিলা দেবী কল্যাণময়ীর পায়ে ছেলেকে সমর্পণ করে আজ দু’দিন ধরে এইভাবেই পড়ে আছে। সেই গ্রামেরই আরেকজন বয়স্ক রুগ্ন লোক গর্ভগৃহের ঠিক বাইরে বসে। অত্যধিক বিড়ি খেয়ে খেয়ে লোকটা ক্যানসার বাঁধিয়েছে। চিকিৎসা করার মতো পয়সা নেই, তাই দেবী কল্যাণময়ীর শরণাপন্ন হয়েছে। কেন যে লোকে ধূমপান করে করে নিজের অকালমৃত্যু ডেকে আনে ! এমিলিরও তো এই একই স্বভাব। সে দিনে প্রায় পাঁচটা করে সিগারেট খায়। এমনিতেই আদিনাথবাবু এমিলিকে পছন্দ করেন না, তার ওপর উনি যদি কোনওসময় পুত্রবধূকে সিগারেট খেতে দেখে ফেলেন তাহলে… অযথা অশান্তি সৃষ্টি করে নিজেদের পুজোর ছুটি মাটি করার কোনও মানেই হয় না। তাই নীলাঞ্জন এমিলির সিগারেটের প্যাকেট লুকিয়ে রেখে দিয়েছে নিজের ব্যাগে। ব্যাগটা সিক্রেট নাম্বার দিয়ে লক করা আর সেই নাম্বারটা এমিলি জানে না। নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সিগারেট ছাড়া সে খায় না। বিদেশি ব্র্যান্ড, এই অজ পাড়াগাঁয়ে কোথায় পাবে ? এমিলি আন্দাজ করতে পেরেছে যে নীলাঞ্জন নিজের ব্যাগে প্যাকেটটা লুকিয়ে রেখেছে, কিন্তু ব্যাগ আনলক করার সিক্রেট নাম্বারটা এমন কায়দা করে দিয়ে রেখেছে যে এমিলির পক্ষে সেই নাম্বার মিলিয়ে ব্যাগ খোলা অসম্ভব।

    মন্দির থেকে বাড়িতে ফিরে নীলাঞ্জন অবাক ! এমিলি সেই সিগারেটের প্যাকেটটা বার করে ফেলেছে ব্যাগ খুলে। নীলাঞ্জনের জেরার সামনে পরে সে যা বলল তা আরো আশ্চর্যজনক। সে বলে যে হঠাৎ ওর যেন মনে হল কেউ ওকে বলে দিচ্ছে যে সিগারেটের প্যাকেট কোথায় লুকোনো আছে আর সেই ব্যাগ আনলক করার নাম্বারটা কি ।

    যা রটে তার কিছুটা তো বটে ! তাহলে কি সত্যিই কিছু অলৌকিক ব্যাপার ঘটছে ওই মন্দিরে ? সিগারেটের প্যাকেটের কথাটা তো নীলাঞ্জন মন্দিরে দাঁড়িয়ে ভাবছিল। তাহলে তার মনের কথা এমিলির কাছে পৌঁছোয় কীভাবে ?

    ইতিমধ্যে এমিলিকে নিয়ে শুরু হয়েছে এক সমস্যা। এমিলি মাঝে মাঝেই এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে – কে যেন তাকে আকুল হয়ে ডাকছে আর যে সে যেন কোন অদ্ভুত জগতে তলিয়ে যাচ্ছে। খুব চেনা চেনা মনে হয় এমিলির সেই জগতটাকে। ওকে মাঝে মাঝেই অন্যমনস্ক দেখা যাচ্ছে, ওর চালচলনেও কেমন যেন এক অদ্ভুত অসংলগ্নতা ফুটে উঠছে দিনে দিনে। গ্রামগঞ্জে কোনও খবরই চাপা থাকে না। আদিনাথবাবুর বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে সোনালি, তার মুখে এই খবর সারা অবিনাশপুরে রটে গেল । আদিনাথবাবুর বিরক্তি দশগুণ বাড়িয়ে তুলল এই ঘটনা।

(৪)

    হঠাৎ নীলাঞ্জনের সঙ্গে রঞ্জিতের দেখা। রঞ্জিত আর নীলাঞ্জন স্কুলের সহপাঠী ছিল। আজ বহু বছর পরে তাদের দেখা এই অবিনাশপুরে। রঞ্জিত একটা মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডার কম্পানিতে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার। তারা কোম্পানি থেকে অবিনাশপুরে মোবাইলের টাওয়ার লাগাতে এসেছিল, কিন্তু বিফল হয়ে ফিরে যাচ্ছে। এই এলাকায় কোনও মোবাইল সিগন্যাল ধরে না। রঞ্জিতের মতে এখানে মোবাইলের সিগন্যাল না পাওয়ার কারণ এই গোটা চত্বর জুড়ে এক অতীব শক্তিশালী তড়িৎ-চুম্বক সিগন্যালের উপস্থিতি, যা মোবাইলের সিগন্যাল আটকে দেয়। এর উৎস দেবী কল্যাণময়ীর মন্দির।

    ব্যাপারটা নীলাঞ্জনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। মন্দির চত্বরে কোনও শক্তিশালী তড়িৎ-চুম্বক সিগন্যালের উপস্থিতি কি করে সম্ভব? সেখানে তো কোনও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নেই! এই সিগন্যাল তাহলে কোথা থেকে আসছে? তাহলে কি…

নীলাঞ্জন আদিনাথবাবুকে তার সন্দেহের কথা জানায় এবং দেবী কল্যাণময়ীর বিগ্রহ গবেষণার জন্য শহরে পাঠানোর অনুমতি চায়। আদিনাথবাবু কিছুক্ষণ নিরুত্তর থেকে বলেন, ‘তোমরা কবে ফিরে যাচ্ছ তোমাদের নিজেদের জায়গায়? দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভালো।’

    নীলাঞ্জনের রোখ চেপে গেছে। গ্রামের লোকজনদের সে তার কথা বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বৃথাই অরণ্যে রোদন। অন্ধ বিশ্বাসী গ্রামবাসীর পক্ষে নীলাঞ্জনের কথার সারমর্ম বোঝা অসম্ভব। অন্ধ ভক্তি যাদের তমসাচ্ছন্ন করে রেখেছে তারা অন্ধকারে আলো দেখলেও তাকে আলেয়া বলে ভয় পায়। তারা শুধু এটাই বুঝল যে ধর্মপরায়ণ বাঁড়ুজ্জ্যে বংশে এক কুলাঙ্গারের জন্ম হয়েছে যে তাদের পরিবারের কুলদেবী মা কল্যাণময়ীকে অগ্রাহ্য করে। নীলাঞ্জনকে নিয়ে গ্রামে একটা চাপা ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল।

    আদিনাথের বাড়ির এক বহু পুরাতন বৃদ্ধ চাকর সনাতন। ছোটবেলায় যে কদিন নীলাঞ্জন অবিনাশপুরে ছিল, এই সনাতনই সারাক্ষণ তার দেখাশোনা করত। এমন সহজ সরল এবং সৎ মানুষ নীলাঞ্জন খুব কমই দেখেছে । কিন্তু এত বছর পরে অবিনাশপুরে এসে নীলাঞ্জন যেন এক অন্য সনাতনকে দেখছে। এই সনাতন খুবই রহস্যময়। তার প্রতিটা কথাই যেন নীলাঞ্জনের কাছে এক জটিল ধাঁধা। গোপনে সনাতন নীলাঞ্জনকে এসে বলে, ‘দাদাবাবু, তোমরা এখান থেকে চলে যাও। এই দেবীর বিগ্রহ নিয়ে বেশী মাতামাতি কোরো না। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে পড়তে পারে।’

    নীলাঞ্জন এর অর্থ বোঝেনি । আরও একটা ব্যাপারের কোনও অর্থ নীলাঞ্জন বোঝেনি। যেদিন তারা প্রথম বাড়িতে আসে, সনাতন তাদের দেখে যেন প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। এর কি কারণ থাকতে পারে ?

(৫)

    নীলাঞ্জন কলকাতায় আসে এবং প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের কিছু লোকজন নিয়ে অবিনাশপুরে ফেরে সেই মন্দিরের খননকার্য শুরু করতে। কিন্তু মন্দিরের সামনে বহু মানুষ তাদের আটকাতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের এলাকার জাগ্রত দেবীর কোনও রকমের অপমান তারা প্রাণ থাকতে সইবে না। সেই দলের নেতা গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান গণেশ পাকড়াশী।

    গণেশ বহুবার আদিনাথবাবুকে নানারকমের প্রলোভন দেখিয়েছে যাতে মা কল্যাণময়ীর মন্দিরকে আরও বড় করে, আরও জাঁকজমকের সঙ্গে গড়ে তোলা যায়। কিন্তু আদিনাথবাবু বুঝতে পেরেছিলেন যে গণেশের আসল উদ্দেশ্য মা কল্যাণময়ীর নামে তার পার্টি ফান্ডের জন্য বেশ ভালো রকমের আমদানির ব্যবস্থা করা। মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষার্থে আদিনাথবাবু সেটা কখনওই হতে দিতে চাননি। এর জন্যে গণেশ মনে মনে বেশ চটে ছিল। আজ সুযোগ পেয়েই সে আদিনাথবাবুর ছেলের বিরুদ্ধে লোক জড়ো করতে লেগেছে।

    ইতিমধ্যে এমিলির পাগলামো দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাকে অবিনাশপুরে নানান জায়গায় অসংলগ্ন বস্ত্রে অদ্ভুতভাবে প্রায়ই ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। তার চোখমুখের ভাব দেখে গ্রামের লোকজন রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সবার সন্দেহ এমিলিকে ভূতে পেয়েছে। হবেই তো ! স্বামী যে ঘোর নাস্তিক ! তারই শাস্তি দিচ্ছেন দেবী কল্যাণময়ী।

    আদিনাথবাবু নীলাঞ্জনকে অবিলম্বে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলেন। কিন্তু নীলাঞ্জন এই মন্দিরের রহস্য উদ্‌ঘাটন না করে অবিনাশপুর ছেড়ে যাবে না। কিন্তু পাশাপাশি এমিলির এই অদ্ভুত আচরণও তাকে ভাবিয়ে তোলে। সে ঠিক করে এমিলির ব্যাপারে কলকাতায় গিয়ে তার এক সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করবে।

    বৃদ্ধ চাকর সনাতন নীলাঞ্জনকে ক্রমাগত বলে চলে, ‘দাদাবাবু, বউদিদিমণিকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাও ! নাহলে সর্বনাশ হবে! বাঁড়ুজ্জ্যে বংশের সর্বনাশ আর কেউ আটকাতে পারবে না, দেবী তার অপমানের শাস্তি দেবেই !”

    যেন কোন গভীর রহস্যের নির্যাস ফুটে ওঠে সনাতনের কণ্ঠে। কীসের অপমান ? আজ সনাতনকে তার মনের কথা খুলে বলতেই হবে, নীলাঞ্জন নাছোড়বান্দা।

(৬)

    সনাতনের পূর্বপুরুষেরা বংশানুক্রমে এই পরিবারে চাকরের কাজ করে এসেছে। ১৮৬০ খৃস্টাব্দের মহাষষ্ঠীর দিন রামকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় একা দেবী কল্যাণময়ীকে দেখেননি। সনাতনের পূর্বপুরুষ অবিরামও সেই দেবীকে দেখেছিল। অবিরাম ছিল রামকিঙ্করদের বাড়ির চাকর। বিজয়া দশমীর দিন রামকিঙ্করের ছোট ভাই কালীকিঙ্কর ভাঙ, গাঁজা ইত্যাদির নেশায় বুঁদ হয়ে বাড়ির ঠাকুর বিসর্জন দিতে যাচ্ছিলেন । তাঁর সঙ্গে ছিল চাকর অবিরাম। হঠাৎ রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কালিকিঙ্কর দেখতে পান এক অতীব সুন্দরী নারী নিজের ঘোরে একা একা কোথায় যেন চলেছে। ওনাদের বাড়িতে পুজো উপলক্ষে পালাগান গাইতে দল এসেছিল, এই মেয়ে কি সেই দলেরই কেউ ? সাজপোশাক দেখে কালীকিঙ্করের তাই ধারণা হয়েছিল। কালীকিঙ্কর ছিলেন অত্যন্ত কুচরিত্রের লোক। সেই মেয়েটিকে দেখে তাঁর বিকৃত বাসনা জেগে উঠেছিল। কালীকিঙ্কর মেয়েটিকে পাল্কিতে তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। অবিরাম বারণ করতে চেয়েছিল, সে দেখেছিল এই মেয়েটিকে মহাষষ্ঠীর দিন, কিন্তু কালীকিঙ্কর তার কোনও কথা না শুনে মেয়েটিকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। মেয়েটির রূপ কালীকিঙ্করের নেশা যেন শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এক আর্টিস্ট বন্ধুকে দিয়ে মেয়েটির ছবি আঁকানো হয়েছিল। মেয়েটি এতই সরল যে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না যে তাকে নিয়ে এ কি হচ্ছে। কালীকিঙ্কর মেয়েটিকে নিয়ে তার ঘরে গিয়েছিলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আর্তনাদ করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। কালীকিঙ্কর প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলেন। অবিরাম ঘরে ঢুকে দেখেছিল সেই মেয়েটিকে – যাকে ষষ্ঠীর দিন সেই অদ্ভুত রথে করে রামকিঙ্কর আর অবিরাম নামতে দেখেছিলেন জঙ্গলে। অবিরাম দেখল যে মেয়েটিকে বিবস্ত্র করতে গিয়ে তার শরীরের অদ্ভুত গঠন দেখে আতঙ্কের বশে কালীকিঙ্কর তাকে খুন করে ফেলেছেন।

    সেই লাশকে নদীর জলে চুপিচুপি ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিমা নিরঞ্জনের কিছুক্ষণ পরেই সেই লাশ কালীকিঙ্করের দাদা রামকিঙ্কর দেখতে পেয়ে ধারণা করেছিলেন যে ইনি নিঃসন্দেহে দেবী। অবিরাম এই কথা তার সন্তানদের জানিয়ে বলেছিল, ‘দেবী এই ঘোর পাপের শাস্তি দিতে একদিন না একদিন ঠিক আসবেন! তোরা দেখে নিস ! কেউ রেহাই পাবে না !’

    সনাতনের পূর্বপুরুষরা বাদে এই খবর আর কেউ জানত না। এখন সনাতন বুঝতে পেরেছে যে দেবী নিজে এসেছেন সেই পাপের শাস্তি দিতে। কালীকিঙ্করের বন্ধুর আঁকা সেই দেবীর ছবিখানা অবিরাম নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখেছিল এবং সেটার পুজো করত। সেই ছবি সনাতন বংশানুক্রমে পেয়েছিল। ছবিটা সে নীলাঞ্জনকে দেখায়।

(৭)

    নীলাঞ্জনকে এই মন্দিরের রহস্য উদ্‌ঘাটন করতেই হবে। কিন্তু গ্রামের মানুষ বাধ সাধলে নীলাঞ্জন কখনও তার উদ্দেশ্যে সফল হবে না। এই ব্যাপারে তাকে সাহায্য করতে পারে গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান গণেশ পাকড়াশী। নীলাঞ্জন গণেশ পাকড়াশীর সঙ্গে দেখা করে এবং পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে। নীলাঞ্জনের মতে এই বিগ্রহটিকে গবেষণার জন্য অবিলম্বে পাঠানো উচিত। গণেশ নীলাঞ্জনকে প্রতিশ্রুতি দেয় সে তাকে সাহায্য করবে। কিন্তু জনমত নীলাঞ্জনের বিরুদ্ধে, তাই কাজটা গোপনে করতে হবে।

    নীলাঞ্জনের দৃঢ় বিশ্বাস যে দেবী কল্যাণময়ীর বিগ্রহটি আসলে কোনও শক্তিশালী সিগন্যাল রিসিভার-ট্রান্সমিটার, যাকে বলে মোডেম। মানুষের চিন্তাও তো একধরনের তরঙ্গ। মুনি-ঋষিরা শোনা যায় যোগাভ্যাসের মাধ্যমে মানুষের মনের কথা জানতে পারেন, ঠিক যেন চিন্তার বেতার সম্প্রচার। তাহলে কি এই বিগ্রহ এমনই শক্তিশালী একটি মোডেম, যা মানুষের মনের চিন্তাকে পড়তে পারে এবং সেটাকে অন্য কারও কাছে পাঠাতেও পারে? সেই কারণেই কি এমিলি সেদিন নীলাঞ্জনের ব্যাগ আনলক করার নাম্বারটা জানতে পেরেছিল? তাই যদি হয় তাহলে তো এই বিগ্রহ বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়! আজ পর্যন্ত কারও নজরে সেটা পড়ল না? যুগযুগ ধরে অন্ধবিশ্বাসী লোকজন একে স্রেফ দেবতা বলে ফুলচন্দন চড়িয়ে গেল!

    নীলাঞ্জন সেই রাতে একা বিগ্রহের কাছে গিয়ে যেন প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে। তার মনে একটাই জিজ্ঞাসা চলে – এই মহান শক্তির পিছনে কে ? সে ক্রমশ যেন একটা অদ্ভুত জগতে প্রবেশ করে আর শুনতে পায় যেন কার কথা –

    ‘আমি এক ভিন গ্রহের বিজ্ঞানী। আমাদের গ্রহ তোমাদের গ্রহ থেকে অনেক উন্নত। আমাদের গ্রহে আমরা নিজেদের মধ্যে মস্তিষ্কের চিন্তার আদান-প্রদানে কথা বলি, আমাদের বাহ্যিক কোনও ভাষা নেই। তাহলে তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ কি ভাবে? তুমি আমার চিন্তার তরঙ্গ অনুভব করতে পারছ, ঠিক যেমন আমি তোমার চিন্তার তরঙ্গ অনুভব করতে পারছি। আমরা পৃথিবী নামে একটি গ্রহের সন্ধান পাই, যে গ্রহে নাকি প্রায় আমাদেরই মতো জৈবিক গুণের প্রাণীরা বসবাস করে। তোমাদের পৃথিবীর হিসেবে ১৮৬০ সালে আমি আমার মহাকাশযানে আমার সঙ্গিনীকে তোমাদের গ্রহে পাঠাই তথ্য সংগ্রহ করতে। আমার সঙ্গিনী তোমাদের গ্রহে একটা ট্রান্সমিটার লাগাতে গিয়েছিল, যার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর প্রাণীর মনের কথা বুঝতে পারব। আমার সঙ্গিনী সেখানে নামার পর কিছুক্ষণ ওকে আমি এই যন্ত্রের মাধ্যমে খুঁজে পাচ্ছিলাম, কিন্তু তারপর থেকে ওকে আমি কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এই এতগুলো বছর ধরে আমি ওর অপেক্ষায় বসে আছি। ইতিমধ্যে এই ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে তোমাদের পৃথিবীর মানুষের মনের কথা আমি অনুভব করতে পারতাম । সবাই এসে আমার কাছে কিছু না কিছু চাইত। আমি তাদের ইচ্ছার তরঙ্গকে বহুগুণ প্রসারিত করে দিতাম, যাতে তাদের প্রার্থনা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ইচ্ছাশক্তি প্রবল হলে অনেক কিছুই সম্ভব হয়ে ওঠে। তাই তাদের অনেক প্রার্থনা হয়তো ফলেও যায়। কিন্তু তার পরেই তারা আর কেউ আমার কাছে আসে না। আবার নতুন বিপদে পড়ে আমার কাছে নতুন প্রার্থনা নিয়ে তারা আসে। আমার কথা তারা কেউ জানতেই চায় না। তোমাদের গ্রহের মানুষের কোনও জিজ্ঞাসা নেই। এমন একটা যন্ত্র এসে পড়ল তোমাদের গ্রহে, অথচ কেউ তোমারা তার বিষয়ে বিন্দুমাত্র কৌতূহল প্রকাশ করলে না ! এতদিন বাদে এই তুমিই প্রথম যে আমার পরিচয় জানতে চেয়েছ। তাই তোমায় বলি যে এতদিন বাদে আমি আমার সঙ্গিনীকে আবার খুঁজে পেয়েছি এই ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে। তার সঙ্গে আমি যোগাযোগও করছি, কিন্তু সে কিছুতেই আমার মনের কথা বুঝতে পারছে না। তাকে আমি বহুবার বহুভাবে আমার কথা মনে করানোর চেষ্টা করেছি। সে কি আমায় ভুলে গেল? তার যদি ফিরে আসার আগ্রহ না জন্মায় আমি তো তাকে ফিরিয়ে আনতে পারব না পৃথিবী থেকে !’

    নীলাঞ্জনের কাছে পুরো ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ১৮৬০ সালে উড়োজাহাজেরই আবিষ্কার হয়নি। মানুষ যে উড়তে পারে সেই সময় তা ধারণার বাইরে। এদিকে আমাদের পুরাণের গল্পে শোনা যায় যে দেবদেবীরা আকাশ থেকে অদ্ভুত রথে করে নামেন । তাই সেই সময়কার মানুষের সংস্কারে মহাকাশযান নামার ঘটনাকে দৈবিক ঘটনা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।তাহলে সত্যিই এই পৃথিবীর বাইরে বাসযোগ্য গ্রহ আছে ! শুধু তাই নয়, সেই গ্রহের প্রাণীরা পৃথিবীর তুলনায় প্রযুক্তিগত দিক থেকে কতটা এগিয়ে ! কিন্তু যখন সেই বিজ্ঞানী জানবে যে তার সঙ্গিনীকে এই পৃথিবীর এক যৌনবিকারগ্রস্ত মানুষ খুন করেছে, পৃথিবীর মানুষ সম্পর্কে সেই বিজ্ঞানীর কি ধারণা হবে ? কিন্তু সত্যিটাও যে বলা দরকার, মিথ্যে আশায় এই বিজ্ঞানী আর কতদিন তার সঙ্গিনীর জন্য অপেক্ষা করবে ?

নীলাঞ্জনকে কিছু বলতে হয় না, ওর মনের কথা বিজ্ঞানী বুঝতে পারে। কারও প্রাণ নেওয়া তো তাদের গ্রহের নিয়ম নয় ! তার সঙ্গিনীর প্রাণ নেওয়ার অধিকার পৃথিবীর মানুষকে কে দিল?

(৮)

    পরের দিন সকালে অবিনাশপুরে নানান বাড়িতে এক অদ্ভুত ধরনের রোগ দেখা যায় যা কয়েকদিনের মধ্যে এক মহামারির আকার নেয়। নীলাঞ্জন শহর থেকে তার এক ডাক্তার বন্ধুকে নিয়ে আসে। সেই ডাক্তার পরীক্ষা করে বলে যে এই রোগ খুব শক্তিশালী কোনও তড়িৎ-চুম্বক সিগন্যালের প্রভাবে ঘটছে যা আমাদের শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। কিন্তু এই গ্রামে অমন শক্তিশালী সিগন্যাল কোথা থেকে আসতে পারে ?

    নীলাঞ্জন জানে কোথা থেকে আসছে। ভিনগ্রহের বিজ্ঞানী তার প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করেছে এই পৃথিবীর মানুষের ওপর।

    ইতিমধ্যে সেই বিষাক্ত সিগন্যালের প্রভাবে কিছু মানুষের মৃতপ্রায় অবস্থা। জনমত তৈরি হয় যে দেবী কল্যাণময়ী ওই নাস্তিক নীলাঞ্জনের ব্যবহারে ভয়ানক রুষ্ট হয়েছেন এবং তারই শাস্তি দিচ্ছেন গ্রামবাসীকে। নীলাঞ্জন কাউকে এর কারণ বলে উঠতে পারে না, কেউ ওর কথা বিশ্বাস করবে না।

    এমিলিকে নিয়ে চুপিসারে রাতের অন্ধকারে নীলাঞ্জন অবিনাশপুর থেকে চলে যেতে চায়। তারা গাড়িতে করে যেতে যেতে হঠাৎ দেখতে পায় মন্দিরের মধ্যে কিছু গুণ্ডা জাতীয় লোকের ভিড়। নীলাঞ্জন আর এমিলি মন্দিরে এসে দেখে পঞ্চায়েত প্রধান গণেশ পাকড়াশী ওই বিগ্রহ চুরি করতে এসেছে। নীলাঞ্জনের সঙ্গে কথা বলে গণেশ বুঝতে পেরেছিল যে চোরবাজারে এই বিগ্রহের কি দাম হতে পারে। গোপনে সে এই বিগ্রহ চুরি করে বিদেশিদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করার পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু গণেশ কিছুতেই সেই বিগ্রহকে উপড়ে তুলে ফেলতে পারছে না। তারা হন্যে হয়ে খুঁড়েই চলেছে। কিন্তু সেই বিগ্রহের তল তারা এখনও খুঁজে পায়নি। নীলাঞ্জন বাধা দিতে গেলে হিতে বিপরীত হয়। মন্দিরে কোলাহল শুনে লোকজন জড় হয়ে যায়। গণেশ তাদের বোঝায় যে নীলাঞ্জন ওই মূর্তি চুরি করতে এসেছিল। উপরন্তু এমিলির অদ্ভুত ব্যবহারের নমুনা দিয়ে এবং তার আগমনের পরেই গ্রামে নতুন অসুখের দোহাই দিয়ে গণেশ এমিলিকে ডাইনি সাব্যস্ত করে। গ্রামের লোকজন আগে থেকেই নীলাঞ্জনের ওপর চটে আছে, তাই এই কথা বারুদে স্ফুলিঙ্গের কাজটুকু করে। গ্রামসুদ্ধ লোক এমিলিকে আর নীলাঞ্জনকে আক্রমণ করে।

    বৃদ্ধ চাকর সনাতন রুখে দাঁড়ায়। সে গ্রামের লোকজনদের বিরত হতে বলে, “আর পাপ বাড়িও না তোমরা ! নরকেও যে স্থান হবে না তোমাদের ! দেবী নিজে এসেছেন অতীতের পাপের শাস্তি দিতে, আর সেই দেবীকেই তোমরা ডাইনি বলছ ?”

    জনরোষ ঝলসে ওঠে সনাতনের কথায়। ডাইনি এমিলিকে দেবী কল্যাণময়ী বলা! মদমত্ত জনতার উদ্যত লাঠির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সনাতন। নীলাঞ্জনের উদ্দেশে তার শেষ কথা শোনা যায়, “দাদাবাবু, তোমরা পালিয়ে যাও, পালিয়ে যাও !”

(৯)

    নীলাঞ্জন আর এমিলিকে জনতা মন্দিরের পাশে সনাতনের ঘরে বন্দি করে রেখেছে। পরের দিন মহাষষ্ঠী। গণেশের প্ররোচনায় ঠিক হয় যে সেদিন ভোরবেলা এমিলি আর নীলাঞ্জনকে মায়ের নামে উৎসর্গ করা হবে। দেবী রুষ্ট, তাই দেবীকে শান্ত করতে হবে এই ডাইনিকে এবং এই নাস্তিককে পুড়িয়ে মেরে। উত্তেজিত জনতা যে যার বাড়ি ফিরে রাত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে।

    নীলাঞ্জন হতাশ হয়ে বসে থাকে সেই ঘরে। সারা অবিনাশপুরে যে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে তার জেরে কয়েকজন মানুষের প্রাণসংশয় দেখা দিয়েছে। মন্দির থেকে সেই বিষাক্ত সিগন্যালের শক্তি যেন দিনদিন বেড়েই চলেছে। ভিনগ্রহের সেই বিজ্ঞানী তার প্রেয়সীর নির্মম হত্যার প্রতিশোধ নিতে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। এই বিপুল শক্তির হাত থেকে এই গ্রামের মানুষদের এবং এমিলিকে বাঁচানোর উপায় একমাত্র নীলাঞ্জন নিজেই জানে। কিন্তু তা কি সে পারবে? না পারলে যে এই অসংখ্য প্রাণহানির জন্য সে নিজেই দায়ী হবে। সেটাই বা সে কি করে মেনে নেয়? নীলাঞ্জন মন স্থির করে ফেলে।

    নিজের ঘরে দেবী কল্যাণময়ীর সেই ছবি লুকিয়ে রেখে সনাতন পুজো করত। নীলাঞ্জন এমিলিকে সেই ছবির সামনে নিয়ে যায়। অবাক হয়ে এমিলি তাকিয়ে দেখে সেই ছবি। সে যেন আবার তার সেই স্বপ্নলোকে প্রবেশ করছে, কিন্তু সেই স্বপ্নলোক তার কাছে আর অজানা নয়। তার সব মনে পড়ছে ধীরেধীরে। তার সাথীর কথা। কি সুন্দর ছিল তাদের গ্রহটা! কত আনন্দঘন মুহূর্ত তারা একসঙ্গে কাটিয়েছে। সেই গ্রহে তারা কেমন সুন্দর বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারত, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যে সেখানে খুবই কম। সেখানে রাত বলে কিছুই নেই, সবসময় দিন। তার সাথীর সঙ্গে কাটানো কত অমূল্য স্মৃতি আজ এমিলির মন আচ্ছন্ন করেছে। সে উচ্ছ্বসিত হয়ে সেইসব গল্প বলতে শুরু করে নীলাঞ্জনকে। নির্বাক শ্রোতার ভূমিকায় দাঁড়িয়ে থাকে নীলাঞ্জন।

    ধীরে ধীরে সেই বিজ্ঞানীর প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে এমিলি আর নীলাঞ্জনের সামনে। বিজ্ঞানীর অপেক্ষা সার্থক। এতদিনে সব কিছু মনে পড়েছে তার প্রেয়সীর।

    আদিনাথবাবু বলেন যে একই অবিনশ্বর আত্মা মৃত্যুর পর এক শরীর ছেড়ে আরেক শরীর ধারণ করে। নাস্তিক নীলাঞ্জন এইসব কথা এতদিন পাত্তা দিতো না। কিন্তু আজ আর তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। উপরন্তু নীলাঞ্জনের আরও এক উপলব্ধি – পুনর্জন্ম যে একই গ্রহে হতে হবে, তার কোনও মানে নেই। সত্যিই তো, এই অসীম ক্রমবর্ধমান বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে অগণিত প্রাণের বীজ ছড়িয়ে আছে, তার কতটুকুর নাগাল পেয়েছে আমাদের বিজ্ঞান ? ভিনগ্রহের বিজ্ঞানীর অসামান্য যন্ত্রে এমিলির আত্মার তরঙ্গ ধরা পড়েছিল, যা বিজ্ঞানীর সঙ্গিনীরই আত্মা।

    বিজ্ঞানের সাধক নীলাঞ্জনের সামনে যেন দর্শন আর বিজ্ঞানের চরম নিদর্শনস্বরূপ এক অপেরা মঞ্চস্থ হচ্ছে। কিন্তু এমনই নিয়তির পরিহাস যে এর রসাস্বাদনের মানসিকতা নীলাঞ্জনের এখন আর নেই। বৃহত্তর দার্শনিক তত্ত্ব ছেড়ে নীলাঞ্জনের মন বারবার পার্থিব টানে ফিরে আসছে। এমিলির পূর্বজন্মটাই সত্যি হয়ে দাঁড়াল! এই জন্মের স্মৃতি কি চিরতরে মুছে গেল ? তাদের প্রথম আলাপ, ইউনিভার্সিটিতে থিসিস নিয়ে তর্ক-ঝগড়া, সেই থেকে প্রেম, বিভিন্ন ছোটখাটো ব্যাপারে মান-অভিমান, একসঙ্গে দু’জনের প্রথম সূর্যোদয় দেখা, প্রথম অন্তরঙ্গ মুহূর্তের আবেশ, দুজনেরই বাড়ির অমতে বিয়ে, দু’জনে মিলে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন–এই সবই কি এমিলির কাছে আজ বিস্মৃত অতীত! বিজ্ঞানী তার প্রেয়সীকে নিজের গ্রহে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। এমিলি কি শেষ বিদায় জানাতেও নীলাঞ্জনের দিকে ফিরে চাইবে ?

    এমিলির চিন্তার তরঙ্গ অনুভব করে নীলাঞ্জন । এমিলি তার পূর্বজন্মের সাথীকে উদ্দেশ্য করে বলছে, ‘আমি ফিরে যাব তোমার কাছে। কিন্তু এক্ষুনি না। তোমাকে আর এক বছর অপেক্ষা করতে হবে।’

    মোটে এক বছর? নীলাঞ্জন অস্থির হয়ে ওঠে। এমিলি যখন চলেই যাবে, শুধু শুধু এক বছর সেই বিজ্ঞানীকে আর তাকে কষ্ট দেওয়ার কি মানে হয় ? এখনই কেন সে চলে যাচ্ছে না ?

    আবার এমিলির চিন্তার তরঙ্গ অনুভব করে নীলাঞ্জন । এমিলি বলে, ‘আমার পক্ষে তো এক্ষুনি সেই গ্রহে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। পৃথিবীর মানুষের দেহ নিয়ে তো সেই গ্রহে যাওয়া যায় না, সেই গ্রহের আবহাওয়া যে মানুষের শরীর সহ্য করতে পারে না। সেই গ্রহের উপযুক্ত শরীর তো আমি আমার আগের জন্মেই ফেলে এসেছি আমার মৃত্যুর সাথে।’

    সত্যি তো ! বিজ্ঞানী তো এই কথাটা ভেবেই দেখেনি ! তাহলে উপায় ? সে কি আর কোনদিনও তার সঙ্গিনীকে ফিরে পাবে না ?

    নীলাঞ্জন বুঝতে পারে না যে আর মোটে এক বছর বাদে এমিলি কি করে সেই গ্রহে ফিরে যেতে পারবে ?

    নীলাঞ্জনের জিজ্ঞাসার উত্তর দেয় এমিলি। এমিলি বলে, ‘আমাদের মহাকাশযান পৃথিবীতে এসে নামার পর থেকে এর মধ্যে প্রায় দেড়শো বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের সেই গ্রহে সময়ের গতি অনেক কম। পৃথিবীর পঞ্চাশ বছর হচ্ছে সেই গ্রহের এক বছর। আমার সাথী সেই গ্রহের হিসেবে প্রায় তিন বছর ধরে আমায় খুঁজে যাচ্ছে। আমার এখন বয়স তিরিশ, আর ক’বছরই বা আমি বাঁচব? যদি আশি বছর বয়সেও আমার মৃত্যু হয় তাহলে দাঁড়ায় আরও পঞ্চাশ বছর। তার মানে সেই গ্রহের হিসেবে আর মোটে এক বছর। আমার সাথী আমার জন্য তিন বছর অপেক্ষা করেছে, আর একটা বছর পারবে না? ও যেমন আমার গত জন্মের সাথী, তুমিও তো আমার এই জন্মের সাথী।’ বিজ্ঞানীকে উদ্দেশ্য করে এমিলি বলে, ‘যে মানুষটা একাধিক নিরপরাধ মানুষ আর তার নিজের স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে এত বড় বিচ্ছেদ সহ্য করার সাহস দেখায়, তাকে বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে স্বার্থপরের মতো আমি কীভাবে চলে যেতে পারি? এই জীবনে আমার ভাগ্য নীলাঞ্জনের সঙ্গে বাঁধা পড়েছে। ভালো-মন্দ যাই হোক, দু’জনকে সেটা সমানভাবে ভাগ করে নিতে হবে।’

    এমিলি এগিয়ে এসে নীলাঞ্জনের হাতদুটো শক্ত করে ধরে। এই এত বছরে প্রথম সে নীলাঞ্জনের চোখ ছলছলে দেখছে। নীলাঞ্জন জাপটে ধরে এমিলিকে নিজের বুকের মধ্যে ।

    ভোরের আলো ফুটে উঠছে। কাতারে কাতারে গ্রামবাসীরা নাস্তিক আর ডাইনিকে পোড়াতে মশাল, লাঠিসোটা নিয়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে আসছে।

    বিজ্ঞানীর প্রতিচ্ছবি ক্রমশ অস্পষ্ট হতে থাকে। তার কথা অনুভব করা যায়। সে বলছে, ‘আর এক বছর অনায়াসে আমি অপেক্ষা করতে পারি। পৃথিবীর জীবের তুলনায় আমরা যে উন্নততর, এই নিয়ে আমার বেশ গর্ব ছিল। সেই গর্ব আজ আমার চূর্ণ হয়েছে। কীসের উন্নততর জীব আমরা? একটা হত্যার প্রতিশোধ নিতে আমি কতগুলো প্রাণীহত্যা করতে বসেছিলাম! আর এই পৃথিবীর এক প্রাণী এতগুলো প্রাণীহত্যা আটকাতে তার নিজের মনের হত্যা করতে বসেছিল। কই, এই মূল্যবোধ তো আমাদের গ্রহের জীবদের জানা নেই ! আমাদের গ্রহে আমরা সবাই নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়েই বাঁচি । জীবনটা শুধু যে নিজের জন্য নয়, অপরের জন্যেও – এই অমূল্য শিক্ষা নিয়ে এই গ্রহ থেকে আমি চলে যাচ্ছি। আর হ্যাঁ, আর একটা জিনিস আমি নিয়ে যাব, যার সাহায্যে এই আগামী একবছর আমি অপেক্ষা করব।’

    গ্রামের লোকজন মন্দিরের দরজার সামনে প্রায় এসে পড়েছে। আদিনাথবাবু দেবী কল্যাণময়ীর বিগ্রহের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছেন। এমন সময় সহসা শেষ রাতের আকাশের অন্ধকার চিড়ে এক সুতীব্র আলোর ঝলকানি দেখা যায় । আকাশে এক মহাকাশযান -যাকেই হয়তো রামকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৬০ সালে দেবীর রথ ভেবেছিলেন । সেই যানের আলোয় সারা অবিনাশপুর আলোকিত। হঠাৎ সবাইকে বাকরুদ্ধ করে দেখা গেল দেবী কল্যাণময়ীর বিগ্রহ মন্দির ছেড়ে সোজা সেই মহাকাশযানের দিকে উঠে যাচ্ছে। তার গায়ে উত্তরীয়র মতো ঝুলছে কালীকিঙ্করের আর্টিস্ট বন্ধুর আঁকা দেবী কল্যাণময়ীর সেই ছবি। গ্রামের সকল মানুষ পরম বিস্ময়ে দেখছে যে সেই ছবি যেন সাক্ষাত এমিলির- যে এমিলিকে তারা সবাই পুড়িয়ে মারতে চলেছে । সেই বিগ্রহ মহাকাশযানের সঙ্গে গিয়ে জুড়ে গেল, তারপর সেই মহাকাশযান মহা সমারোহে আকাশের বুকে বিলীন হয়ে গেল। পড়ে রইল শুধু আকাশ জোড়া দেবী কল্যাণময়ী-রূপী এমিলির ছবির রেশ। মদমত্ত জনতা উষ্মা ভুলে ভক্তিভরে আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করতে থাকে। তারা ভাবে, কি ভুলটাই না তারা করতে চলেছিল! স্বয়ং দেবী কল্যাণময়ী তাদের সেই ভুলের থেকে রক্ষা করেছেন। আদিনাথবাবু ছুটতে ছুটতে এসে তাঁর পুত্র এবং পুত্রবধূকে জড়িয়ে ধরেন।

    ইতিমধ্যে গণেশ পাকড়াশী তার দলবল নিয়ে ডাইনি এমিলিকে মারতে এসেছে। ভক্তিভাবে গদগদ জনতার সামনে গণেশ এসে চিৎকার করে বলে, ‘আজ ডাইনিকে মেরেই ফেলব!’ 

    সাক্ষাৎ দেবী কল্যাণময়ীকে ডাইনি সাব্যস্ত করা ? জনতা আক্রমণ করে গণেশের দলবলকে। উত্তেজিত জনতা যতক্ষনে ক্ষান্ত হল, ততক্ষনে গনেশের দলবল ছত্রভঙ্গ। তাদের কিছু আহত ও অচৈতন্য, কিছু পালিয়ে বেঁচেছে। যারা এর কিছুই পারে নি, তাদের সকলের মধ্যে পাওয়া গেল নিষ্প্রাণ গনেশকেও।

    আদিনাথবাবু তাঁর ছেলে-বউকে নিয়ে বাড়ি চলে গেলেন। ভোরের আলো ফুটে উঠেছে, এইমাত্র ঢাকির দল এসে পড়েছে অবিনাশপুরে, ঢাকের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠছে গোটা অবিনাশপুর। আজ সত্যিই দেবীর বোধন। এই বোধনের শুধুমাত্র একজন সাক্ষী আজ আর রইল না – সেই সৎ, নির্ভীক বৃদ্ধ চাকর সনাতন ।

(১০)

    এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। মহাকাশযান ফিরে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই গ্রামের অসুস্থ মানুষজন সুস্থ হয়ে উঠেছিল। অবিনাশপুরের মন্দিরটা এখন একটা Science Museum-এ পরিণত হয়েছে। আদিনাথবাবু এখনও অবিনাশপুরেই থাকেন। তাঁর সঙ্গে থাকে নীলাঞ্জন আর এমিলি, যারা অবিনাশপুরে Extra-terrestrial beings-দের নিয়ে গবেষণার কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইদানীং আদিনাথবাবু পুরাণের গল্পকে যুক্তির বিচারে বিশ্লেষণ করা শুরু করেছেন। কালকূটের ‘শাম্ব’ পড়ে আদিনাথবাবুর মনে কিছু নতুন চিন্তা জন্ম নিয়েছে। ইন্দ্রের বজ্রদধীচির হাড় দিয়ে তৈরি হয়েছিল বলে পুরাণে বলা আছে, সেই দধীচির যা বর্ণনা দেওয়া তাতে করে কি ধরে নেওয়া যায় যে ইন্দ্রের বজ্র ডাইনোসরের হাড় দিয়ে তৈরি এক শক্তিশালী আগ্নেয়াস্ত্র? ভগীরথ, যিনি পুরাণ মতে গঙ্গাকে আবাহন করে নিয়ে আসেন, তিনি কি একজন খুব বড় Irrigation Engineer ছিলেন? এই নিয়ে আদিনাথ বাবু তাঁর ছেলে-বউয়ের সঙ্গে জোর তর্কে মেতেছেন। রোজ সকালে ব্রেকফাস্টের সময় এমিলির কাজ হচ্ছে আদিনাথবাবুকে সারা পৃথিবীর কিছু বৈজ্ঞানিক বিস্ময়ের গল্প বলা। আদিনাথবাবু এখন আরও ঘোরতর আস্তিক, এবং সঙ্গে সঙ্গে আরও ঘোরতর তার্কিক।এমিলি আর নীলাঞ্জনের উপনিষদ আর গীতার প্রতি ঝোঁক দেখা দিয়েছে। গীতার একটি শ্লোকের অর্থ তো নীলাঞ্জন নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছে–

“বাসাংসি জীর্ণা নি যথা বিহায়

নবনী গৃহ্নাতিনরোহপরাণি।

তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা

ন্যন্যানি সংযাতিন বানি দেহী।“

ব্যখ্যা: মানুষ যেমন জীর্ণ-শীর্ণ পুরোনো বস্ত্রগুলি ত্যাগ করে অন্য নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ জীবাত্মা পুরোনো শরীর ত্যাগ করে অন্য নতুন শরীর গ্রহণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!