নক্ষত্রলোকে দস্তখত

নক্ষত্রলোকে দস্তখত

মূল লেখক – লী প্রিসলি

বাংলা অনুবাদ – শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

অলংকরণ – তৃষা আঢ্য

 

আগন্তুক

মাইক আর মলি কার্সন উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের দরজায় অপেক্ষা করছিল। অধ্যাপক গ্লীম তাদের ওই মস্ত দূরবীনে চোখ রেখে দেখতে দেবেন তো? গতবার তো ওই লাল দাড়িওয়ালা বিজ্ঞানীর কথাবার্তা মোটেই আশ্বাসব্যঞ্জক লাগেনি।

     রোদে পোড়া হলদে অবিন্যস্ত চুলের আড়াল থেকে বাদামি দুই চোখে অপার কৌতূহল নিয়ে দুই ভাই-বোন অধ্যাপক মশাইকে দেখতে লাগল। তবে তাদের আইরিশ টেরিয়ার কেরির বিশেষ হেলদোল নেই। দিব্যি নিজের চৌকো লোমশ থুতনি থাবায় রেখে দিবানিদ্রা দিচ্ছে।

     মাইক ও মলির বাবা ক্যাপ্টেন রিচার্ড কার্সন অন্তরীক্ষ গবেষণাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। ছেলেমেয়েদের হয়ে এবার তিনি মুখ খুললেন, “ওদের ভেতরে আসতে দিলে আপনার কোনও বিপদ নেই গ্লীম। ওরা জানে ওদের কতটা সাবধানে থাকতে হবে।”

     প্রফেসর গ্লীম মাথা নাড়তে তাঁর লম্বা লাল দাড়িও দু’পাশে দুলে উঠল। ছেলেমেয়ে দুটো খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।

     “বেশ বেশ, তোমরা এসো, তবে কুকুরটাকে বাইরে রেখে।” অধ্যাপক অনুমতি দিলেন।

     মাইক আর মলি সাবধানে পা ফেলে অবাক চোখে প্রফেসর আর বাবাকে অনুসরণ করে যন্ত্রপাতি ঠাসা ঘরটায় ঢুকল। প্রফেসর গ্লীমের গলায় তখনও সংশয়। “এই টিনএজারগুলোর অক্টোপাসের চেয়ে বেশি হাত আর কেন্নোর চেয়ে বেশি পা হয়!” হাত-পা নেড়ে ছোটদের ছটফটানির নমুনা দেখাতে গিয়ে অধ্যাপক নিজে একটা বাতিদানকে ধাক্কা দিয়ে ফেললেন।

     “ওরা কি আপনার চেয়েও বেশি অনর্থ করবে বলে মনে হয়?” ক্যাপ্টেন কার্সন ঠোঁট টিপে মৃদু স্বরে বললেন।

     লাল দাড়ির মানুষটা প্রথমে খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তারপর জোরে হেসে উঠলেন। “ভালোটাই আশা করা যাক। আমি ওদেরকে টেলিস্কোপে চোখ রেখে তোমার গত সপ্তাহে লঞ্চ করা স্যাটেলাইটটা দেখতে দেব। দাঁড়াও, দূরবীনের মধ্যে আগে আকাশে ওটার অবস্থানটা ধরে ফেলি। জাস্ট কয়েক মিনিট।”

     মলি ও মাইক উত্তেজনায় টানটান। এই অন্তরীক্ষ গবেষণাগারে ঠিক কি হয়েছে সেটা জানা মোটেই সহজ নয়। বেশির ভাগ প্রকল্পই গোপন, কোনও-কোনওটা বিপজ্জনক এবং সবকটাই বোঝার পক্ষে বেশ দুরূহ। এই মানমন্দিরে শুধু কৃত্রিম উপগ্রহগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয় ও ছবি তোলা হয়। দুই ভাই-বোন বিস্ফারিত চোখে ক্যামেরা, ঘড়ি ও অন্যান্য আলোকি য় যন্ত্রগুলো দেখতে লাগল – সবকটার নামও জানা নেই।

     প্রফেসর গ্লীম মানমন্দিরের গম্বুজাকার ছাদের একটা অংশ খুলে ফেললেন। তারপর প্রকাণ্ড দূরবীনটির নল উঁচিয়ে রাতের তারা ঝলমল আকাশের দিকে তাক করলেন।

     “টেলিস্কোপটা ঠিক কামানের মতো দেখতে।” মলি মাইকের কানে ফিসফিস করল।

     “তারা শিকারের বন্দুক!” মাইকও ফিসফিসিয়ে জবাব দিল।

     অধ্যাপক গ্লীম একটা ঘড়ি পরখ করে দেখলেন। তারপর মলি আর মাইককে দূরবীনের নীচে বসানো একটা চামড়া মোড়া আসনে বসতে ইঙ্গিত করলেন। মাইককে বললেন, “এখানে বসো। এই আই-পিসটা দিয়ে তাকাও। কয়েক মিনিটের মধ্যে স্যাটেলাইটটা দেখা যাবে। চটপট দেখেই সরে যাও। তারপর আবার এর পজিশন ঠিক করতে হবে যাতে মলিও দেখতে পায়।”

     মাইক আসনটায় চড়ে বসল। নিজের মুখ ঠাণ্ডা ধাতব নিরীক্ষণ রন্ধ্রে চেপে ধরল। উত্তেজনায় দম পড়ছে না। লক্ষ কোটি তারা যেন ঝাঁপিয়ে কাছে চলে এসেছে। তারাগুলো আর আলোকবিন্দু নয়, যেন এক একটা জ্বলন্ত বিশ্ব।

     প্রফেসর গ্লীম ঘড়ির দিকে লক্ষ রাখছিলেন। “তুমি স্যাটেলাইটটাকে পশ্চিম-দক্ষিণ-পশ্চিমে ধরতে পারবে মাইক। সেখান থেকে ওটা পূর্ব-উত্তর-পূর্ব দিকে সরবে। অনেকটা খসে যাওয়া তারার মতো, একই বেগে ঘূর্ণ্যমান। তারপর আমি বসব যতক্ষণ না ওটা টেলিস্কোপের মাঝামাঝি আসছে। আমি হাঁক দিলেই তুমি স্টপ ওয়াচটা চালু করবে। তারপর আমি টেলিপ্রিন্টারে দেখার ডিরেকশন, হাইট আর সময় তুলে রাখার পর মলি দেখতে পারে। সবকটা স্টেশন থেকে দেখার এই সাইটিং রেকর্ড মেইন স্পেস অবজারভেটরিতে পাঠানো হয় যাতে করে উপগ্রহটার কক্ষপথ নির্ধারণ করা যায়। নাও গেট রেডি।”

     “এই তো! এই তো এসেছে!” মাইক চেঁচিয়ে উঠল।

     একটা উজ্জ্বল আলোর বিন্দু দূরবীনের লেন্স বরাবর সরে গেল। অনেকটা লাল ক্রেয়নের আঁচড়ের মতো। উপগ্রহটা দূরবীনের মাঝ বরাবর আসতেই চেঁচিয়ে উঠল, “দেখুন দেখুন!” ঝট করে স্টপ ওয়াচখানা টিপে দিল। তারপর মাইক আসন থেকে গড়িয়ে উঠে পড়ল।

     প্রফেসর দেখেশুনে চামড়ার সীট থেকে উঠে দাঁড়াতে তাঁর জায়গায় মলি বসল। মলির মনে হল একটা উজ্জ্বল আগুনের গোলা আঁচড় কেটে দূরবীন থেকে সরে গেল। বিশ্বাস হচ্ছে না দুরন্ত গতিবেগে ছোটা টন টন ওজনের ধাতব উপগ্রহটা সত্যিই সে দেখে ফেলল।

     টেলিপ্রিন্টারে অধ্যাপক গ্লীম উপগ্রহ নিরীক্ষণের দিক, উচ্চতা, সময় – যাবতীয় খুঁটিনাটি টাইপ করে ফেলেছেন। ক্যাপ্টেন কার্সন উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “দুর্দান্ত ট্রিপল প্লে হল। মাইকের পর গ্লীম, তার থেকে মলি।”

     “আমরা স্যাটেলাইটটা কিন্তু মার্ক করেছি। মানে হোম টীমের এক পয়েন্ট হল।” মাইক বেশ গর্বিতভাবে বলল।

     “ডিক, তুমি একবার চোখ লাগিয়ে দেখবে নাকি?” অধ্যাপক তাঁর বন্ধু ক্যাপ্টেন কার্সনকে প্রশ্ন করলেন। “আর কোনও স্যাটেলাইট প্রমিস করতে পারছি না, তবে অন্য কিছু ইন্টারেস্টিং চোখে পড়তেই পারে।”

     ক্যাপ্টেন ভ্রু কপালে তুলে বললেন, “মানে?”

     “দ্যাখো আমার একটা থিওরি আছে। আমরা স্পেস সম্পর্কে খুব কম জানি। কারণ যত ওপরে ওঠা যায় বাতাস ততই পাতলা হয়ে যায়। অর্থাৎ মনে করা যায় অন্তরীক্ষে আদৌ বাতাস নেই। কিন্তু সত্যিটা কি  আমরা জানি না। কিছুই কি নেই? এদিকে এসো, আমার তত্ত্বটা ডেমনস্ট্রেট করি।”

     বিজ্ঞানী গ্লীম সবাইকে তাঁকে অনুসরণের ইশারা করে স্নানঘরের দিকে গেলেন। তারপর বেসিনের ছিদ্র এঁটে কল খুলে দিয়ে এক খণ্ড সাবান হাতে নিলেন। সাবানটা জলে ফেলে দিতে জলের ওপরের তলে ছোট ছোট তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল। পাছে জলের ছিটে লাগে, তাই মলি একটু পিছিয়ে গেল।

     গ্লীম বললেন, “এই দ্যাখো।”

     কার্সন বললেন, “আমরা সবাই জানি পুকুরে পাথর ছুঁড়লে একটা প্রতিক্রিয়া হয় যাতে প্রতিটা জলবিন্দুর স্থানান্তর ঘটে।”

     “এজ্যাক্টলি। তার মানে যখন আমরা একটা বড়ো উপগ্রহ আকাশে ছুঁড়ছি তখন হয়তো কোনও তরঙ্গ কোনও শক ওয়েভ স্পেসে ছড়াচ্ছে। এর ফলে হয়তো ধরা যাক অন্য কোনও জগতের পাঠানো স্পেস শিপ মনে করো চাঁদের উল্টোদিকে রয়েছে, সেটা ভেঙে যেতেই পারে।”

     সবাই পরস্পরের দিকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকাল। তাই তো! অধ্যাপক গ্লীম নিজের লাল দাড়ি নেড়ে বললেন, “স্বাভাবিকভাবেই এটা আমি প্রমাণ করতে পারব না। কিন্তু স্যাটেলাইটটা সরে যাওয়ার পরেও এক্সাইটিং কোনও কিছু চোখে পড়তে পারে বলতে আমি কি বলতে চেয়েছি সেটা নিশ্চয়ই বোঝাতে পারলাম।”

     “আমার পালা, যাই দেখে আসি।” কার্সন বললেন।

     দূরবীনের আই-পিস দিয়ে তাকালেন। রোদে পোড়া মুখে একাগ্রতা। অনেকক্ষণ বিশেষ কিছু চোখে পড়ল না। তারপর হঠাৎ বিস্ময়ের দমক। আই-পিস থেকে চোখ না সরিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে ক্যাপ্টেন বললেন, “কিছু একটা দেখতে পাচ্ছি, একসঙ্গে কিছু সরে সরে যাচ্ছে। এক ঝাঁক আলোর ফুটকি পরস্পরের খুব কাছাকাছি নড়াচড়া করছে, অনেকটা একাধিক জেট প্লেন একসঙ্গে দল বেঁধে স্টান্ট দেখালে যেমন লাগে। দ্যাখো গ্লীম –”

     প্রফেসর গ্লীম সীটটায় তড়াক্‌ করে বসে দূরবীনে চোখ রাখলেন, “এটা সত্যি হতে পারে না। ওই আলোগুলো স্যাটেলাইটের চেয়ে বেশি দ্রুত নড়াচড়া করছে।” বিজ্ঞানী চামড়া মোড়া আসনটায় বসে দুলতে লাগলেন। লাল দাড়ির ওপর মুখের চামড়াখানা উত্তেজনায় সাদা হয়ে গেছে। “ওগুলো ফ্লাইং সসার না হয়ে যায় না। পুরো এক ঝাঁক।”

     ক্যাপ্টেন কার্সন হাত তুলে সবাইকে চুপ করতে ইশারা করলেন। পরক্ষণেই সবাই অ্যালার্ম শুনতে পেল। অন্তরীক্ষ গবেষণাগারের চেতাবনি ব্যবস্থা কেন্দ্র থেকে সতর্কতা ঘণ্টি, সাইরেন বাঁশি, বুল হর্ন সব একসাথে গর্জন শুরু করল।

     “ব্যাটেল স্টেশন…ব্যাটেল স্টেশন…ইমার্জেন্সি প্ল্যান এক্স…ইমার্জেন্সি প্ল্যান এক্স…”

     ক্যাপ্টেন কার্সন মাইক আর মলিকে দরজার দিকে ঠেলে নিয়ে গেলেন। “বাড়ি চলে যাও। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছোট। ইমার্জেন্সি প্ল্যান এক্স তখনই ঘোষণা করা হয় যখন বহির্জগত থেকে আক্রমণ আশঙ্কা করা হয়।”

     মলি বাবার দিকে তাকাল। প্রতিবাদ করতে গিয়ে দেখে বাবার মুখেই একই রকম অভিব্যক্তি। কিন্তু বাড়ি চলে যাবে? জেনে যাবে না ওই রহস্যময় আলোর ফুটকিগুলো মহাকাশযান না অন্য কিছু? কিন্তু মুখে ভাষা যোগাল না।

     প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাড়ির দিকে রওনা হতে হল। মাইকও ছুটল পাশাপাশি। কিন্তু তাদের মন তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই কোথায় ধাওয়া করল যেন…

     ক্রমশ দুই ভাইবোনের ভাবা বন্ধ হয়ে গেল। নিজেদের অজ্ঞাতেই তারা বাড়ির দিকে হেঁটে চলল।

 

ক্যাটারফ্লাই

     পরের দিন সকালে মাইক আর মলি তড়িঘড়ি রান্নাঘরে পৌঁছল। মা প্যানকেক তৈরি করছিলেন। তাঁর মুখ যথারীতি হাসিখুশি। সকালের রোদে রান্নাঘরটাও অন্যান্য দিনের মতোই লাগছিল।

     “গুড মর্নিং। গরম কেকের ওপর কি নিবি সিরাপ না মধু?”

     “ও মা, এখন খাবার কথা কে ভাবে? কাল রাতে কি হল জানো? ধুর! কেন যে আমাদের বাড়ি ফিরে ঘুমোতে হল?”

     মাইক বলল, “আমাদের কি যে হল? ওই এক্সাইটমেন্টের মধ্যে আমি নিশ্চয়ই বাড়ি ফিরে নাক ডাকাতে চাইনি। কিন্তু হঠাৎ ওয়ার্নিং সিস্টেম এমন করে বাজতে লাগল….। মা, বাবা কোথায় গো? আমাদের উপর কি ভিনজাগতিক আক্রমণ শুরু হয়েছে? কিছু কি জানো?”

     “না তো!।” শ্রীমতী কার্সন শেষ প্রশ্নটার জবাব প্রথমে দিলেন। “তোমার বাবা কাজে গেছে। আজ একটা ইম্পরট্যান্ট রিসার্চ রকেট পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে। আমার মনে হয় না স্পেস ওয়ার্নিং সিস্টেম কেন বেজে উঠল সেটা কারোরই জানা আছে।”

     মাইক নিজের জায়গায় বসে পড়ল। “আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। কাল রাতে কি হয়েছিল তোর কিছু মনে আছে মলি?”

     মলি একটু ভেবে বলল, “আমরা বাবা আর প্রফেসর গ্লীমের সঙ্গে অবজারভেটরিতে ছিলাম –”

     “আমার প্রশ্ন সেটা নয়। স্পেস ওয়ার্নিং সিস্টেমে ধরা পড়ল পৃথিবীর দিকে ইউএফও মানে অজানা উড়ন্ত কিছু ধেয়ে আসছে। এই মেসেজ পেয়ে আমরা কি  করেছিলাম?”

     “ইমার্জেন্সি প্ল্যান এক্স ডিক্লেয়ারড হল, মনে আছে। আমরা বাড়ি ছুটে এলাম। তারপর আজ সকাল!”

     “কিন্তু এই উত্তেজনার মধ্যে আমরা ঘুমোলাম কি করে? আমার তো বালিশে মাথা ঠেকানোর কথাও মনে নেই।”

     শ্রীমতী কারসন প্লেটে গরম কেক আর বেকন নিয়ে ঢুকলেন। ওদের কথাবার্তা শুনে ভদ্রমহিলার মুখে যেন এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মাইক তাঁর অ্যাপ্রনের ফিতে টেনে ধরল। “মা ঠিক করে বলো। অবজারভেটরি ছেড়ে আমাদের হঠাৎ দৌড়ে বাড়ি চলে আসতে হল কেন?”

     প্যানকেকে মধু ঢালতে ঢালতে বললেন, “ইমারর্জেন্সির সময় একটা হিপনো-রে পড়ে বাড়ির বাইরে থাকা সমস্ত বাচ্চাদের ওপর। এই সম্মোহক রশ্মিটাই তোমাদের মনের গভীরে গিয়ে বলে বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে। খুব বিচক্ষণ প্ল্যান এটা। ছোটরা চটপট বাড়ি ফিরে আসে, মানে যেখানে তারা নিরাপদ, আবার যেখান থেকে দরকারে অন্যত্র সরানোও যাবে। নইলে বাড়ির লোকেরা চিন্তা করবে না?”

     “ও, তার মানে ইমার্জেন্সি প্ল্যান এক্সের কলকাঠিতেই আমরা বাড়ি চলে এসেছি? আচ্ছা, এই হিপনো-রে কি সবার ওপর কাজ করে?” মাইক প্রশ্ন করল।

     “না এই হিপনোটিক বীম শুধু ছোটদের আই মীন মাইনরদের ওপর পড়ে। আর একটা রশ্মি আছে যেটা জন্তু জানোয়ারদের চুপ করিয়ে রাখে।”

     “কেলি!” মাইক ও মলি একসাথে চমকে উঠল। “কেলি কোথায়? ও তো আমাদের সঙ্গেই বেরিয়েছিল।”

     কেলিকে পেছনের গাড়ি বারান্দায় তার ছোটছোট ছানাগুলোর কাছেও পাওয়া গেল না। দেরি না করে মলি আর মাইক দুজনেই তাদের পোষ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল।

     মরুভূমির মধ্যে দিয়ে বালিয়াড়ি পেরিয়ে তারা চ্যাপ্টা পাহাড়টার দিকে এগোতে থাকল। মানমন্দিরখানা সেখানেই। কেলি সেখানেও নেই, প্রফেসর গ্লীম তাকে আদৌ দেখননি। শুনে তিনি নিজের রৌদ্র শিরস্ত্রাণ আর টঙে রাখা রোদ চশমা পরে নিলেন। “চলো, আমিও তোমাদের হেল্প করি। যদি আগে পশ্চিমে যাই তাহলে তোমাদের বাবা রিসার্চ রকেটটা থেকে রেয়ারিফায়েড বাতাস উদ্ধার করতে পারল কিনা দেখে নিতে পারব।”

     বিজ্ঞানীর লম্বা লম্বা পদক্ষেপের সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে মলিকে প্রায় ছুটতে হচ্ছে। “আচ্ছা এরোবি রকেট পাঠানোর সময় বাবা কি এটারই খোঁজ করছিল?”

     “ঠিক খোঁজ নয়, ট্র্যাপ বলা যায়। রকেটের নাকের শঙ্কুর মতো ডগায় একটা স্পেশাল বোতল থাকে, রকেটটা পঁচাত্তর মাইল মানে নিজের সর্বাধিক উচ্চতায় পৌঁছে গেলে সেটা খুলে যায়। ওই বোতলটায় আকাশের পাতলা রেয়ারিফায়েড বাতাস ঢুকে পড়ার পর নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। তারপর ওই নোজ কোন থেকে একটা প্যারাশ্যুট ছিটকে বেরিয়ে এসে সেটাকে মরুভূমিতে আবার ফিরিয়ে আনে।”

     ক্যাপ্টেন মাইক আর মলির দিকে হাত নেড়ে নিজের অধীনস্থ দলকে ডাকলেন, “ওটাকে গুলি করো।”

     বিকট আওয়াজ করে একটা ভাঙা প্লাস্টিকের ক্যাপস্যুলের ভেতর থেকে একটা ডানাওয়ালা বেড়ালের মতো জীব ঠিকরে বেরিয়ে এল। বেড়াল ও প্রজাপতির মাঝামাঝি। বিজ্ঞানী চিৎপটাং। প্রাণীটা গ্লীমের ওপর দিয়ে ছুটতে গিয়ে তাঁর লাল দাড়িতে নিজের রাগত থাবা জড়িয়ে ফেলল। তারপর খানিক দৌড়ে খানিক উড়ে ঊর্ধ্বমুখী। ক্যাপ্টেন কার্সনের মাথার ওপর দিয়ে গর্জন করে গিয়ে মলির কাঁধে গিয়ে বসে শক্ত করে গলা পেঁচিয়ে ধরল।

     মলি একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। এতটা ভয় পেয়েছে যে মনে হচ্ছে প্রায় গলার কাছে উঠে আসা হৃদপিণ্ডের ধুকপুকুনি শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু যা শুনছে তা হৃৎস্পন্দন নাকি অন্য কিছু? শব্দটা শুনতে শুনতে মলি একটা হাত আস্তে আস্তে সাহস করে কোনও মতে তুলে কমলা লোমশ প্রাণীটাকে আঘাত করল। আবার ধাক্কা দিল। যে আওয়াজটা নিজের গলার কাছ থেকে উঠে আসছে সেটা এই মহাকাশ থেকে আগত প্রাণীটির।

     অন্যরা হাঁ করে দেখছে। মলি প্রাণীটার নরম ফিকে ডোরাকাটা মাথায় ক্রমাগত চাপড় মেরে চলেছে। মাথার ওপর খাড়া অ্যান্টেনার মতো অঙ্গটিকে আলতো আঁচড়েও দিল। শেষে মারা বন্ধ করলেও হাতটা ছুঁইয়ে রাখল। প্রাণীটা মলির আঙুলের মধ্যে মাথা গুঁজে দিয়েছে, যেন আরও আদর চাইছে। আরাম পাওয়ার শব্দটা তীব্রতর হল।

     মলি হেসে ফেলল, “জানি না এটাকে ক্যাটারফ্লাই বলব কিনা, তবে নিশ্চিত এটা কারও পুষ্যি।”

 

অজানা উড়ুক্কু যান

     বাড়ির পথে প্রায় অর্ধেক পৌঁছে মাইক আর মলির পোষ্য কেলির কথা খেয়াল হল। কিন্তু এখন আর ফিরে গিয়ে খোঁজার উপায় নেই। ক্যাটারফ্লাইটা কিছুতেই মলিকে ছাড়বে না। তাকে বাড়ি নিয়ে যেতেই হবে।

     মাইক ক্যাটারফ্লাইটার দিকে তাকিয়ে দেখল সেটা মলির গলা জড়িয়ে লেজ নাড়ছে। বলল, “যদি কেলি বাড়ি থাকে ওর কিন্তু এই জিনিস বাড়ি নিয়ে আসাটা মোটেই পছন্দ হবে না।”

     মলি মাথা ঘুরিয়ে শুনে বলল, “মনে হচ্ছে আবার নিজের হার্টবিট শুনছি -–.”

     “ইমার্জেন্সি প্ল্যান এক্স…ইমার্জেন্সি প্ল্যান এক্স…” বুল হর্নটা আবার হাঁকডাক শুরু করেছে। অন্তরীক্ষসতর্কবানী কেন্দ্রের সাইরেনটা বাজছে তীব্র স্বরে।

     মাইক রাগত গলায় বলল, “আমি কিছুতেই বাড়ি গিয়ে ঘুমোব না। বাড়ি তো যেতেই হবে যেহেতু রাস্তায় থাকা যায় না। কিন্তু কি হচ্ছে সেটা জানব না? ওই হিপনো-রে থেকে নিজেদের কি ভাবে বাঁচানো যায় তার একটা উপায় বার করতে হবে, বুঝলি?”

     “অন্য কিছু ভাব মাইক। হতে পারে অন্য কিছু ডেসপারেটলি ভাবলে ওই রে-টাকে আটকাতে পারব।” বলল মলি।

     “কি ভাবব রে?”

     “মাল্টিপ্লিকেশন টেবল। যেমন নয়ের ঘরের।” মাথায় যা এল তাই বলে দিল মলি।

     দুই ভাইবোনে শুরু করল, “নাইন ওয়ানস আর নাইন, নাইন টুস আর এইটীন, নাইন থ্রীস আর…”

     নয় সাত্তে তেষট্টি হতে না হতে ওই সম্মোহক রশ্মির শব্দ তাদের কানে পৌঁছনো বন্ধ হয়ে গেল। মা যাতে চিন্তা না করেন সে জন্য তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এল ঠিকই, কিন্তু দুজনের কারোরই ঘুম পাচ্ছে না।

     ক্যাটারফ্লাইটাকে মাইকের ঘরে নিয়ে গেল ওরা। যতক্ষণ না এটাকে নিয়ে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করছেন ততক্ষণ তাকে নিরাপদে রাখতে হবে। ঘরের দরজা খুলতেই চোখে পড়ল বিছানায় কিছু একটা নড়াচড়া করছে। নিজের সবচেয়ে পছন্দের বিছানা থেকে কেলি গুঁড়ি মেরে বেরিয়ে এল। পশু প্রভাবকারী রশ্মি তাকে অনুমতি দেওয়া মাত্র বুদ্ধিমতী কুকুরটি ঠিক নিজের ডেরায় ফিরে এসেছে। যাক, নিশ্চিন্ত!

     কেলি হাঁই তুলে আড়মোড়া ভাঙল। তারপর চোখ গেল ক্যাটারফ্লাইটার দিকে। শিরদাঁড়ায় ভর করে উঠে দাঁড়াল। ওর কান দুটো খাড়া হয়ে উঠল আর লেজখানা ঝুলে পড়ল। একটা ভয় পাওয়া আওয়াজ করে সোজা খাটের তলায় গিয়ে লুকোল কেলি।

     ক্যাটারফ্লাইটাও বেশ গরগর করে উঠে মলির গলা আরও জোরে আঁকড়ে ধরল। দুই ভাইবোন এবার মলির ঘরে দৌড়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। একটু বাদেই প্রাণীটা মলির ঘাড় থেকে নেমে নতুন জায়গাটা পরখ করতে লাগল।

     মলি বলল, “তোর কি মনে হয় এর খিদে পেয়েছে? কি দিই বল তো?”

     মাইক একটু ভেবে বলল, “উম্‌ম্‌, বেড়াল দুধ খায় আর প্রজাপতি ফুলের মধু। এক কাজ করলে হয় না? গরম দুধে একটু মধু মিশিয়ে দিয়ে দেখি খায় কিনা।”

     ক্যাটারফ্লাইটা পাত্র ফাঁকা না হ‌ওয়া পর্যন্ত গোগ্রাসে গিলে চলল। খাওয়া শেষ করে মলির বিছানার পায়ার কাছে তড়াক করে লাফিয়ে গিয়ে বসল। তারপর একটা মামুলি বেড়ালের মতোই থাবায় মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ল। ওরা পা টিপে টিপে বেরিয়ে এসে দরজা ভেজিয়ে দিল।

     মলি আর মাইক ছাদে এল। ওদের বাড়িটা যেহেতু পাহাড়ের গায়ে মাঝামাঝি উচ্চতায়, পাদদেশের অনেকটা ছাদ থেকে দেখা যায়। সৈন্য ও ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা সবাই প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ থেকে আক্রমণ রোখার একটা যৌথ পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মরত। জ্বালানির ট্যাঙ্ক, গোলা-গুলি জন্য তৈরি ফায়ারিং ট্রাক, র‍্যাডার ও টেলিভিশন ভ্যানগুলো নিজের নিজের জায়গায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থাৎ যদি ওই অজানা উড়ন্ত বস্তু বা ইউএফও-গুলো ধেয়ে আসে, মহাকাশ গবেষণার এই ঘাঁটি তার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।

     ফোনের শব্দে মলি দৌড়ে ধরতে গেল। ফোনের সঙ্গে একটা পর্দা আছে যাতে যে কল করছে তার চলমান ছবি ভেসে ওঠে। নতুন উদ্ভাবিত এই ভিসি-ফোন মলির অপার বিস্ময় জাগায়। ট্রান্সমিটারের পেছনের ছোট পর্দায় বাবার ছবি ভেসে উঠল। ক্যাপ্টেন কার্সন হাসলেন মলিকে দেখে।

     “হ্যাঁ রে, তোরা ক্যাটারফ্লাইটাকে নিয়ে ঠিকঠাক বাড়ি পৌঁছেছিস তো? পৌঁছেছিস? গুড। এবার তোর মাকে দে, একটু কথা আছে।”

     শ্রীমতী কার্সন ভিসি-ফোনের কাছে বসলেন। মলি তার মা বাবার কথোপকথনের শেষটা শুনতে পেল।

     “তুমি ঠিক আছো তো ডিক? বাচ্চারা একটা সৃষ্টিছাড়া জীবকে বাড়ি নিয়ে এসেছে –” মা বললেন।

     “কি  হতে চলেছে সেটার যদি আঁচ পেতাম –। যাই হোক চেষ্টা করছি চিন্তা না করতে। খুব সাবধানে থেকো কিন্তু তোমরা।”

     শ্রীমতী কার্সন ছাদে যেতে মলি প্রশ্ন করল, “বাবা কি জানত ওয়ার্নিং কেন বেজেছিল?”

     “বাবা শুধু বলেছে র‍্যাডার স্ক্রিনে প্রচুর ইউএফও ধরা পড়েছে। প্রায় এক দল সার্চিং পার্টি যেন। আকাশের একটা ছোট অংশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। পৃথিবী থেকে অনেকটাই দূরে যদিও।”

     “ওরা ওদের ক্যাটারফ্লাইটা খুঁজছে হয়তো।” বলল মলি।

     “বোকার মতো কথা বলিস না।” মাইক বড় দাদাসুলভ ধমক দিয়েই নিজের মতো বদলে বলল, “কথাটা ফিরিয়ে নিচ্ছি। ধরা যাক ক্যাটারফ্লাইটা কোনও একটা ইউএফও থেকে পড়ে গেছে। ওরা জানে না বাবার রিচার্স রকেটে সেটা এসে পড়েছে। মানে অনেক কিছু ধরে নিতে হবে আর কি ।” মাইক শিশ বাজাতে বাজাতে কথা শেষ করল।

     মলি নীচে পাহাড়ের পাদদেশে তাকিয়ে বলল, “ওখানে কিছু একটা হচ্ছে।”

     তলায় অনেকগুলো উৎক্ষপক জড়ো হয়েছে। সবকটা লঞ্চারই আকাশের একই দিকে রকেট তাক করে রয়েছে। র‍্যাডারের পর্দাও আকাশের নির্দিষ্ট অংশে ঘোরাফেরা করছে। লোকে সেদিকে আঙুল দেখিয়ে অস্থির হয়ে ছুটোছুটি করছে।

     মলি উত্তেজনায় ছটফট করছে, “এ আবার কি ?”

     “আমি দেখতে পেয়েছি; আমার আঙুল বরাবর তাকা।” মাইক বলল।

     মলি দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু দেখে চোখ সরাল না। মাইক তার মাকে দেখানোর চেষ্টা করল উজ্জ্বলতার মধ্যে একটা দাগ দেখা যাচ্ছে। ক্রমশ ওই দাগটা নড়াচড়া শুরু করল, অনেকটা বাউন্স করার মতো। গতির ফলে এবার ওগুলো সহজে চোখে পড়ল।

     মলি উত্তেজনায় ফিসফিসিয়ে বলল, “ওগুলো কি স্পেসক্রাফট্? বাবা কি ওদের গুলি করে নামানোর হুকুম দেবে?”

     “অত জলদি কিছু ভেবে নিস না। আগে তো যোগাযোগ করে জানুক ওরা বন্ধু না শত্রু।”

     মলি বেশ ভয় পেয়েছে। “কিন্তু যদি স্পেস শীপটা অপেক্ষা না করে? যদি আমাদের দিকে রকেট জ্বালিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসে?”

     প্রফেসর গ্লীম কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। মলির কথা কানে যেতে বললেন, “ব্যস্ ব্যস্! তুমি না সৈনিকের মেয়ে? তৈরি থাকো কিন্তু ভয় পেয়ো না। বেশির ভাগ যুদ্ধ হয় মানুষ খুব তাড়াহুড়ো করে গুলি চালায় এবং সেটাও ভুল নিশানায়।” তিনি ওদের কৌতূহলী ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে ফের বললেন, “কিসের দিকে পয়েন্ট করছ মাইক? আমি নামার পর অবজারভেটরিতে কিছু হল নাকি? কারও কাছে দূরবীন নেই?”

     মাইকের নিজের বাইনোকুলারের কথা মনে পড়ল। তার রকেট দেখার যন্ত্র। ছুটে গিয়ে সে সেটা নিয়ে এল। প্রফেসর সেটায় চোখ রেখে দ্রুত সেট করতে লাগলেন। নিজের লাল দাড়ি নাড়িয়ে বলে উঠলেন, “নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। আমরা কেন যে শুধু আকাশ যানের কথা ভাবি কে জানে? এই দেখুন।” বাইনোকুলারটা শ্রীমতী কার্সনের হাতে ধরিয়ে দিলেন।

     ভদ্রমহিলা দ্রুত চোখ বুলিয়ে অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। তারপর মাইক আর মলিকে দূরবীনটা ধরিয়ে দিলেন। অধ্যাপক গ্লীম নিজের সাধ্যমতো বোঝানোর চেষ্টা করলেন অন্যদের সঙ্গে নিজেকেও। “আমার মনে হয় এটাকে আকাশে ভাসার নৌকো বলা যায়। দেখে মনে হচ্ছে অনেকটা ডিশের মতো আকৃতি… ওই বিশাল খোলটা তৈরি খুব সম্ভব প্লাসটিকের ওপর অ্যালুমিনিয়ামের কোটিং দিয়ে…”

     এবার আর নৌকোগুলো দেখার জন্য লেন্সের প্রয়োজন হল না। ওগুলো আস্তে আস্তে নীচে নামছে। তারপরেই অভিমুখ বদলে ওপরে ওঠা শুরু করল। কিছুক্ষণ পরে আবার নেমে এল। আবার ঠিকরে ওপরে। যেন নামা ওঠার খেলা চলছে।

     “ঠিক যেন বাতাসে শ্বাস নিতে নিতে আসছে।” অদ্ভূত যানগুলোর দিকে চোখ রেখে বলল মাইক।

     “মনে হয় তুমি ধরে ফেলেছ। এই ভাবে স্পেসক্র্যাফ্‌টের স্পীড গ্র্যাজুয়ালি কমিয়ে নিরাপদে বায়ুমণ্ডলে ঢোকার এটা কিন্তু একটা ভালো পদ্ধতি। শুধু আমরাই জানি না কি ভাবে এটা করতে হয়। আরে! দ্যাখো দ্যাখো!”

     মহাকাশ যানটা শেষবারের মতো লাফিয়ে উঠে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ল। এবার শুধু পড়ে চলেছে। বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণে গরম হয়ে বিশাল যানটায় আগুন ধরে গেল। ডিশ বা সসার আকৃতির ভাস্বর নৌকো। ক্রমশ উজ্জ্বল হতে হতে লাল বর্ণ ধারণ করল।

     মহাকাশ নৌকোটা অনেকটা ধূমকেতুর মতো বায়ুমণ্ডলে ডুব দিল যেন, পেছনে একটা আগুনের লেজ। তারপর মিলিয়ে গেল। আকাশ আবার আগের মতোই শান্ত নীল।

 

ক্যাবেজা পাহাড়ে ধ্বংসাবশেষ

     বাইরের ঠাণ্ডা নীল আভা বলছে ভোর হয়েছে। মলির ভালো ঘুম হয়নি। যখনই চোখ বোজে মহাকাশযানটার জ্বলন্ত ছবি চোখে ভেসে ওঠে।

     কাছাকাছি একটা শব্দ হচ্ছে। বিছানার ধারে বসে কান খাড়া করে শুনল। বুঝতে পারল বাবা আসছেন জলখাবার খেতে আর নাইট ডিউটির পোশাক বদলাতে। মলি ঝটপট মুখ হাত ধুয়ে সেরে রান্নাঘরের দিকে গেল।

     ক্যাপ্টেন কার্সন তৈরি হতে হতে মলির বেকন, ডিম ও কফি দিয়ে প্রাতরাশ সারা হয়ে গেছে। কার্সন খাওয়া শুরু করতে জিজ্ঞাসা করল, “বাবা স্পেস শীপটায় কেউ বেঁচে ছিল?”

     “আমাদের মতো স্পেস শীপ হলে থাকত না। আমি আমার ক্রু মেম্বারদের পাঠিয়েছি যদি কোনও খোঁজ পাওয়া যায়। থ্যাংক ইউ ফর দ্য ব্রেকফাস্ট। যদি কোনও খবর পাই তোমাকে জানিয়ে দেব।”

     বাবা বেরিয়ে যাওয়ার পর মলি নিজের ঘরে ফিরে গেল। প্রজাপতি বেড়াল জেগে উঠেছে। মলি নিজের হাত বাড়িয়ে বলল, “গুড মর্নিং ইউ প্রীটি ক্রিয়েচার।”

     কিন্তু ক্যাটারফ্লাইটা ওর কাছে এল না। কিছু একটা সমস্যা হয়েছে ওর। নিজের সোনালি ছোপ ছোপ ডানা জোড়া ঝটপটিয়ে উঠল। অ্যান্টেনা উঁচিয়ে শোনার চেষ্টা করল যেন। মাইককে তোলা দরকার। কিছু একটা করতে হবে।

     দরজা খোলা মাত্র ক্যাটারফ্লাইটা তীর বেগে মলির পায়ের কাছে এসে পড়ল। সারা ঘরময় ছুটোছুটির পর আধা দৌড় আধা উড়ান দিয়ে একটা খোলা জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

     বাবাকে ডাকতে গিয়েও ডাকল না। বাবার এমনিতেই অনেক সমস্যা। ভাইয়ের ঘরে ছুটে গিয়ে তাকে ঝাঁকুনি দিয়ে তুলল।

     মাইক উঠে বসে লম্বা হাঁই তুলল। “কি ব্যাপার?”

     “শিগগির ওঠ। ক্যাটারফ্লাইটা পালিয়েছে।”

     মলি জানলার দিকে দৌড়ে গেল। মাইকও গেল তার পিছু পিছু। চোখে পড়ল প্রাণীটা মরুভূমির দিকে ডানা ঝটপটিয়ে ছুটছে। ক্রমশ একটা পাহাড়ের গা ঘেঁষা বেগুনি ছায়াময় খাদে অদৃশ্য হয়ে গেল।

     “আমারই ভুল। কিন্তু এখন কি করব?” আফসোসের গলায় বলল মলি।

     মাইক জিনসের ভেতর বিশেষ একটা জ্যাকেট গুঁজতে গুঁজতে বলল, “ওটা ফলো করা অফকোর্স।” তারপর পায়ে মোকাসিন জুতো গলিয়ে নিল।

     ড্রয়ার হাতড়ে একটা চকচকে নল বার করল মাইক। একটা ছোট্ট রকেট, নাম পারসন প্রোপেলার। রকেটটা ছুঁড়লে মাধ্যাকর্ষণ বল কমে যায়। এটা পরে নিলে অনেক দ্রুত ছোটা যায়। “নিজেরটা নিয়ে আয়। আর যতগুলো বাড়তি ফুয়েল পিলস্ আছে সঙ্গে নিয়ে নে। ওটা দারুণ স্পীডে পালাচ্ছে।”

     মলি নিজের পারসন প্রোপেলার আর তাতে শক্তি সরবরাহের জন্য এক মুঠো জ্বালানি বড়ি নিয়ে এল। মাইকও নিজের সাজ সরঞ্জাম গুছিয়ে নিল। দুজনে পরস্পরের পোশাকের স্ট্রাপ লাগিয়ে দিল। বাইরে এসে পোশাকের বোতাম টিপে চালু করল।

     খুদে প্রোপেলার রকেট ছুঁড়তেই ওরা মাটি ছেড়ে সামান্য ভেসে উঠল। একটা স্টিয়ারিং ব্যবস্থাও আছে। আর থামার দরকার হলে আর একটা বিপরীতমুখী রকেট ব্রেকের কাজ করবে। ঝড়ের বেগে ছুটতে ছুটতে ক্যাবেজা পাহাড় চূড়া চোখে পড়ল। মাথাটা মানুষের মুখের মতো বলে এর স্প্যানিশ নাম ক্যাবেজা। কিন্তু ক্যাটারফ্লাই সুন্দরীর কোথাও দেখা নেই।

     কিছু দূরে পোড়া চিহ্ন। গরমে বালি কোথাও কোথাও সবজে পাথরের চেহারা নিয়েছে। পোড়া পাথুরে রাস্তাটা চলে গেছে পুড়ে কালচে হয়ে যাওয়া মরু উদ্ভিদে ছাওয়া জমি চিরে। শেষ হয়েছে একটা ভুষোর দাগ লাগা খাড়া পাথরে ধাক্কা খেয়ে।

     মাইক চিৎকার করে উঠল, “আমার মনে হয় এখানেই স্পেস শীপটা ভেঙে পড়েছে।”

     বাতাসে ভেসে ভেসেই পোড়া দাগগুলো খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ওরা। একটা বিকিরণ মাপার যন্ত্রও আছে সঙ্গে। যন্ত্রটা থেকে পিঁক পিঁক আওয়াজটা কমে আসা মানে ক্ষতিকর কোনও রশ্মির ভয় নেই। নিশ্চিত হয়ে মাইক আর মলি মাটিতে নেমে এল। খাড়া পাথরটার সামনে সেই মহাকাশ নৌকোটার ধ্বংসাবশেষ ডিমের খোলার মতো ভেঙে পড়ে আছে।

     ক্যাটারফ্লাইটা পৃথিবীতে যে ক্যাপসুলের মতো বস্তুটা আশ্রয় করে নিরাপদে নামতে পেরেছিল সেরকম একটা জিনিস চোখে পড়ল। তবে এটা অনেক বড়ো। এর মধ্যে আবার একজন যাত্রীও রয়েছে। ক্যাটারফ্লাইটা ভাঙা প্লাস্টিকের খোলের কাছে বসে অত্যন্ত ঘাবড়ে গিয়ে চেঁচাচ্ছে।

     মাইক ও মলি স্থির অচৈতন্য ছেলেটার দিকে এগিয়ে গেল। নিশ্বাস প্রশ্বাসে বুকটা ওঠা নামা করছে দেখে আশ্বস্ত হল। ক্যাটারফ্লাইটা ওর হাত চাটায় আঙুলে সামান্য নড়াচড়া এখনো।

     অনেকটা মানুষেরই মতো। দেখে মনে হল মাইক বা মলির চেয়ে বছর খানেক বা দুয়েকের বড়ো। ছেলেটা ওদের চেয়ে লম্বা এবং বেশ রোগা। চুল অদ্ভুতভাবে কোঁচকানো। চুলের রং না বাদামি না সবুজ। আঙুলগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে লম্বা, ডগায় শুষের নেওয়ার রন্ধ্র। আঙুল দেখে মলির গেছো ব্যাঙের সূক্ষ্ম পায়ের কথা মনে হল। ছেলেটার গায়ে একটা রুপোলী রঙের তন্তুর পোশাক।

     ছেলেটা মৃদু শব্দ করে চোখ খুলল। চোখ দুটো হলদে এবং ভাস্বর। মাইক ও মলিকে দেখে কনুইয়ে ভর করে উঠে বসল। বেড়াল প্রজাপতি লাফ দিয়ে তার কোলে চড়ে আহ্লাদে ‘মিউ মিউ’ করতে লাগল।

     ছেলেটার মুখ হাসিতে ভরে গেল। নিজের পুষ্যিকে জড়িয়ে ধরল। মাইক ও মলিকে অবাক করে বিশুদ্ধ ইংরেজিতে বলল, “ও কোরাক! থ্যাংক গুডনেস! আমি ভেবেছিলাম তুমি আর নেই।”

     নিজের নাম শুনে সামনের থাবায় ভর করে লাফিয়ে উঠল। ছেলেটার হাতে মাথা ঘষে পিঠ বাঁকিয়ে নানাভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে লাগল। মাইক আর মলি হাসতে ছেলেটাও হেসে উঠল। নিজের পুষ্যিকে দু হাতে জড়িয়ে থাবড়াতে লাগল।

     মাইক জিজ্ঞাসা করল, “তুমি উঠতে পারবে? হাঁটতে? হাড় ভাঙেনি তো? অনেকটা পড়েছ।”

     ছেলেটা সাবধানে উঠে দাঁড়াল। নিজের আঘাতগুলো পরখ করতে লাগল। মাথায় এক জায়গায় ফোলা আর কনুই ছড়ে যাওয়া ছাড়া বিশেষ কিছু হয়নি।

     মাইক উৎফুল্ল হয়ে আবার বলল, “তুমি বেশ লাকি বলতে হয়।”

     মলির পারসন প্রোপেলার থেকে একটা ক্লিপ বার করল মাইক। তারপর নিজের প্রোপেলার থেকেও একটা ক্লিপ বের করে দুটোকে একসাথে জুড়ল। একটা ভার বহন করার কেরিয়ার তৈরি হল। সেটাকে নিজের আর মলির রকেটের মাঝখানে বেঁধে ছেলেটাকে বলল, “যদি এটাতে আমাদের মাঝখানে বসতে পারো, আমরা তোমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারি। এমনি হাঁটলে পৌঁছনো সম্ভব নয়।”

     ছেলেটা লাগেজ কেরিয়ারটার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে হাসল। তারপর সেখানে বসে পড়ল। বেস স্টেশনে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল ওরা।

     ক্যাটারফ্লাই বগলে ছেলেটাকে দুই ভাই-বোন বাবার অফিসে নিয়ে গেল। চিন্তাক্লিষ্ট মানুষটা এত অবাক হলেন চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার জোগাড়। ক্যাপ্টেন নিজের সুরক্ষা কর্মীদের উদ্দেশে হাঁক পাড়লেন।

     মুহূর্তের মধ্যে বিচিত্র ছেলেটাকে পাকড়াও করে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হল। মাইক ও মলি আশ্চর্য হলেও ছেলেটা হল না। বরং যাওয়ার সময় ছেলেটা ওদের সবাইকে হাত নেড়ে গেল।

     “ভেবো না। আমরা একটু পরেই তোমাকে দেখতে যাব।” নতুন বন্ধুকে কথাটা বলে বাবাকে প্রশ্ন করল, “ওকে ওখানে পাঠালে কেন বাবা? ও যথেষ্ট ফ্রেন্ডলি আর চোটও বলতে গেলে কিছুই লাগেনি।”

     ক্যাপ্টেন কার্সন একটা তালিকা তৈরি করছিলেন। সেখান থেকে মুখ তুলে তাকালেন। বিজ্ঞানীরা সবাই এই অল্প বয়সী অদ্ভুত মহাকাশ থেকে আসা ছেলেটাকে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে চায়। বললেন, “আসলে আমি ওকে ওর প্রোটেকশনের জন্য হসপিটালে পাঠালাম। যতদিন না ওর সম্পর্কে ভালো করে জানতে পারছি ও ওখানে নিরাপদে থাকুক। কোনও অজানা রোগ জীবাণুও থাকতে পারে। কিংবা আমাদের কোনও অসুখও ওর সকে যেতে পারে। ওদের জগতে হয়তো কোনও শিশুরোগ নেই। কিন্তু এখানে যদি মিজল বা মাম্পস্ কিছু একটা ধরে যায়?”

     “আমি নিশ্চিত ও আমাদের বন্ধু।” মলি মাইকের কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করল।

     ওরা দুজন পরস্পরের দিকে চোখে মুখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল। ওদের কেন মনে হচ্ছে ওই নক্ষত্র বালক বন্ধু। অবশ্য এভাবে অন্ধ বিশ্বাস করা ঠিক নয়। ও যে শান্তি ও বন্ধুত্ব নিয়েই এসেছে সেই ব্যাপারে আগে নিশ্চিত হতে হবে।

 

নতুন বন্ধু

     যখন ক্যাপ্টেন কার্সন হাসপাতালের অপেক্ষা ঘরে এলেন, মাইক ও মলি ছুটে এল দেখা করতে। তারা জানত ছেলেটাকে নিয়ে হলের ওপারে একটা ঘরে একদল বিজ্ঞানী পরীক্ষানিরীক্ষা করছে।

     “স্টার বয় ঠিক আছে তো?” দুজনেরই প্রশ্ন।

     ক্যাপ্টেন কার্সন হেসে বললেন, “বেশ ছেলেটি। আমাদের সায়েন্টিস্টরা যেমন ওর কাছ থেকে অনেক কিছু জানছে ওও শিখছে তেমনি। যথেষ্ট হেলদি মনে হল। ডাক্তারদের ধারণা ওর শরীরে কোনও রোগ নেই, আর আমাদের কোনও রোগ বালাইও ওকে ছোঁবে না। তোরা কি দেখতে চাস?”

     “অফ কোর্স।”

     “ওকে এখন ছাড়া হচ্ছে। কি মনে হয় ওকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে?”

     উত্তরটা ওদের মুখেই লেখা ছিল। উচ্চারণ করে বলার আগেই সেই নক্ষত্র বালক তার ক্যাটারফ্লাই কোরাককে নিয়ে হাজির। মলি লক্ষ করল, ওদের দুজনেরই হাঁটার ভঙ্গি একই রকম, লাফিয়ে লাফিয়ে। ছেলেটা ওদের দেখে লাজুক হাসল। কোরাক তার পায়ে ঠোক্কর খেতে খেতে চলল।

     “আমরা কি বাইরে যেতে পারি স্যর? মানে আবার কোনও বিজ্ঞানী আমাকে ধরে ফেলার আগে? আর একটাও প্রশ্ন যদি শুনি…”

     ক্যাপ্টেনের কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত ওরা তিনজন বাইরে লনে অপেক্ষা করতে লাগল। মলির প্রচণ্ড কৌতূহল হচ্ছে। বলল, “আমরা ক্যাটারফ্লাইটার নাম জানি –”

     ছেলেটার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল, “ক্যাটারফ্লাই কি জিনিস?”

     মলি কোরাককে দেখিয়ে বলল, “আমরা এমন জীব কোনওদিন দেখিনি । আমাদের বেড়াল আছে, প্রজাপতিও আছে। ও তো হাফ বেড়াল, হাফ প্রজাপতি, তাই।”

     ভিনগ্রহী হেসে বলল, “দুটোর কম্বিনেশন।”

     “আমরা কিন্তু রীতিমতো অবাক তুমি আমাদের ভাষা এমন চমৎকার বলছ কি করে।”

     মাইক বলল, “ধর যদি তুমি আরও খানিকটা দক্ষিণে পড়তে যেখানে শুধু স্প্যানিশ বলা হয়। তুমি কি স্প্যানিশও জানো?”

     “সেটা আর একটা ভাষা তো? হ্যাঁ বুঝতে পারি।”

     “আর ফ্রেঞ্চ, জার্মান বা রাশিয়ান?”

     “আমাদের জগতে সব ভাষাই বুঝতে পারি, কিন্তু আমরা বিশেষ বলি না এখানে যেমন বলছি।”

     “তাহলে নিজেদের মধ্যে কথা বলো কি করে?”

     “একটু সময় পেলে হয়তো তোমাদের দু’জনকে শেখাতে পারব।”

     মলি বলে উঠল, “আমরা যেটা জানতে চাই সেটা হল তোমার নাম। এই এই করে কতক্ষণ ডাকব?”

     “আমার নাম লুরু। মনে হয় নিজের সম্পর্কে আর একটু বলা উচিৎ। আমার বাবা রেগাস নক্ষত্র মানুষদের নেতা। আমাদের বাড়ি এখান থেকে অনেক অনেক দূরে এক নক্ষত্রলোকের গ্রহে।”

     “তুমি বাড়ি ফিরবে কি করে? সেখানে পৌঁছনোর মতো স্পেশ শীপ নেই আমাদের। আমাদেরগুলো অন্য গ্রহে যেতে পারে শুধু।” মলি উদ্বিগ্ন গলায় বলল।

     “আমার বাবা আমাকে ঠিক খুঁজে নেবে।”

     আইরিশ টেরিয়ার কেলি সবাইকে দেখতে পেয়ে বেশ খুশি। ছুটে এসে লেজ নাড়িয়ে তিনজনকে শুঁকতে লাগল। “ভুক ভুক।” কুকুরের ভাষা না জানলেও বেশ বোঝা গেল কেলি বলছে, “তোমাদের দেখতে পেয়ে আমি খুশি।”

     কেরি লাফ দিয়ে মলির কোলে উঠে মলির গাল চেটে দিল। তারপর মাইকের ঘাড়ে লাফ চড়েও আদর করল। কিন্তু লুরুকে অভ্যর্থনা জানানোর চেষ্টা করতেই ক্যাটারফ্লাইটা আপত্তি জানাল। থুতু ছিটিয়ে চেঁচিয়ে করে কেরিকে অবাক করে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

     “ইয়াও! ই-য়াও!” মাইক, মলি বা কেরি কেউই ক্যাটারফ্লাইয়ের ভাষা বোঝে না। তবু বেশ বুঝতে পারল ও বলছে, “এইও! এই ছেলেটা আমার, একদম ছোঁবে না!”

     কেরিও ডেকে উঠল। কোরাক ডানা ঝাপটিয়ে লুরুর মাথায় গাছে চড়ার মতো করে চড়ে বসল। লুরুর কোঁকড়ানো চুল খামচে কোরাকের সাহস বেড়ে গেল। কেলির পিঠে লাফিয়ে নেমে বসল। কেলি লাফিয়ে ছোটাছুটি শুরু করল। হাঁকডাক শুরু করতেই বেচারা ভয় পেয়ে গেল।

     মাইক মলি দুজনেই হাসতে শুরু করল। কিন্তু স্টার বয়ের মুখে উদ্বেগ দেখে থেমে গেল। মলি বোঝাতে লাগল, “ভেবো না। ওরা কেউ কাউকে আঘাত করবে না। এটা আমাদের পৃথিবীতে কুকুর বেড়ালের খুব কমন খেলা। কেলি ঘরে গিয়ে মাইকের বিছানার তলায় ঢুকলেই কোরাক পিঠ থেকে খসে পড়বে। তারপর মা কোরাককে ব্রেকফাস্ট দেবে –” কথাটা বলেই ঘড়ির দিকে তাকাল মলি। “এই যা, আমরাও তো আমাদের জলখাবার ভুলে গেছি। চটপট না করলে কিন্তু দুপুরেও খেতে দেরি হবে। মাইক বাবার জন্য ডেস্কে চিরকুট লিখে বাড়ি যাই চল।”

     হাঁটতে হাঁটতে মাইক একটু ভাবুক স্বরে বলল, “তোমাদের মুখে কথা না বলার দরকার কেন হয় না, কারণটা বোধহয় আন্দাজ করতে পারছি লুরু। জন্তুদের কথা বোঝা অনেক সহজ।”

     “তোমার মুখ দেখেই যেমন বোঝা গেল কোরাক ঘায়েল হতে পারে ভেবে তুমি বেশ টেনস্‌ড।” মলি যোগ করল। “তোমাদের ভাষা কি লোকে কি ভাবছে সেটা বোঝার চেষ্টা করে?”

     নক্ষত্র বালক হেসে বলল, “পেটে কিছু পড়লে হয়তো শেখাতে পারব।”

     অতিথি হিসেবে থাকার পর ছেলেটাকে মলির বেশ ভালো লাগতে শুরু করেছে। কেলি আর কোরাকও নিজেদের মজাদার যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও তিনটি ছেলেমেয়ের মধ্যে ভালোই বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। ক্যাপ্টেন আর মিসেস কার্সনও মহাকাশ থেকে আসা ছেলেটিকে ভালোবেসে ফেলেছেন।

     প্রফেসর গ্লীম লুরুকে মানমন্দিরে একবার দেখা করতে বলেছেন। লুরুরও অতিকায় দূরবীনটার ব্যাপারে প্রবল আগ্রহ। কিন্তু মলি লক্ষ্য করল লেন্সে চোখ রাখতেই ছেলেটা কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে দূরবীনে চোখ রেখে তাকিয়েই রইল।

     লুরু সরে মাইকে জায়গা দিতে মলি তাকে চাপা গলায় প্রশ্ন করল প্রশ্ন করল, “কোনও গোলমাল দেখলে? আকাশে কি দেখলে?”

     লুরু মলির দিকে না তাকিয়েই বলল, “না না, কিছু না”

     মলি তার কাঁধে আশ্বাসের হাত রেখে বলল, “বাবার কাছ থেকে নিজের বাড়ি থেকে এত দূরে তোমার মন খারাপ করছে, তাই না? আমরা তোমায় ফেরত পাঠানোর কথা নিশ্চয়ই ভাবব।”

     লুরু কেমন ধারা গলায় বলল, “আমি নক্ষত্র মানুষদের কথা ভাবছিলাম।”

     ঠিক সেই মুহুর্তে মানমন্দিরের আলো চলে গেল। হাতড়ে হাতড়ে বিকল্প বিদ্যুৎ চালুর সুইচ কিংবা ফ্লাশ লাইট খুঁজে পাওয়ার আগেই আলো চলে এল। প্রফেসর গ্লীম ভাবলেন ছোটখাটো বিদ্যুৎ বিভ্রাট। কথা বলতে বলতে মলির লুরুর অস্বাভাবিক আচরণের কথা মনে ছিল না।

     পরের দিন লুরু সারাটা সকাল নিজের ঘরে থেকে একেবারে দুপুরের খাবার খেতে বাইরে এল। শ্রীমতী কার্সনের কাছে ক্ষমাও চেয়ে নিল, কিন্তু কিছু খুলে বলল না। খাওয়া শেষ করে ঘুমোবে বলে আবার নিজের ঘরে চলে গেল।

     মাইক আর মলি বই হাতে গান শুনতে শুনতে অপেক্ষা করতে লাগল স্টার বয়ের কখন ঘুম ভাঙে। তারা পরিকল্পনা করেছিল লুরুকে পাহাড়ের মধ্যে একটা গুহা দেখাবে। মাইক অস্থির হয়ে বলল, “এখনই শুরু না করলে অন্ধকার হওয়ার আগে ফিরে আসা যাবে না”

     মলি বলল, “কাল রাত থেকে ও কেমন অদ্ভূত বিহেভ করছে দেখেছিস? টেলিস্কোপ দিয়ে দেখার সময় ওর কিছু একটা চোখে পড়েছে।”

     “আমি গিয়ে ওকে ডেকে তুলি। আমাদের সঙ্গে যাবে না পড়ে পড়ে ঘুমোবে?”

     হল পেরিয়ে লুরুর ঘরে কাছে গিয়ে ভেজানো দরজায় আঘাত করল। “লুরু।” কিন্তু কোনও উত্তর এল না। দরজায় জোরে জোরে মেরে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল মাইক।

     “এই আওয়াজেও ঘুম ভাঙল না। ভেতরে গিয়ে দেখে আসি মলি।”

     নক্ষত্র বালক ঘরে নেই। বিছানার চাদর টানটান, কোনও কোঁচ নেই। কেউ ঘুমোয়নি ওখানে। মাইল আর মলি পরস্পরের দিকে তাকাল। লুরু কোথায়?

     “তোমরা কি আমায় খুঁজছ?”

     চারপাশে তাকিয়ে ওরা দেখল লুরু হলে দাঁড়িয়ে। মনে হল ছাদ থেকে এল।

     “বাইরে চমৎকার ছায়া। আমি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ে ছিলাম।”

     দুই ভাইবোন আবার নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। লুরুর মুখ রোদে লাল, দ্রুত শ্বাস পড়ছে। মোটেই ছায়ায় ঘুমোয়নি। স্টার বয় হাসল, তারপর নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

     “কি ব্যাপার বল তো?” মাইকের প্রশ্ন মলিকে। “আবার ঘুমেরে মধ্যে হাঁটলে আমরা কিন্তু ফলো করব।”

 

ক্যাবেজায় বিপদ

     পরের দিন ক্যাটারফ্লাইটা সকালে খেতে বেরোল না। মলি লুরুকে প্রশ্ন করল, “কোরাককে দেখেছ?”

     লুরু জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওদের দিকে তা ফিরেই উত্তর দিল, “সকাল থেকে দেখছি না।”

     “তাহলে চলো ওকে খুঁজি।”

     “কোনও লাভ নেই।” বিষণ্ণ গলায় কথাগুলো বলে লুরু যোগ করল, “মানে হয়তো রেডি হলেই ফিরে আসবে।”

     “তোমার কি মনে হয় কোরাক কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে?

     “বোধহয় পাহাড়ের দিকে গেছে।” লুরু যেন বেশ ভেবেচিন্তে বলল।

     লুরুকে আর কিছু না বলে হাঁটতে বেরিয়ে মাইককে জানাল। মলি বসার ঘর ঝাড়পোঁছ করার সময় মাইক ভ্যাকিউম ক্লীনার নিয়ে হাত লাগাল। লুরু আবার নিজের ঘরে দরজা দিয়েছে।

     “আমি বুঝতে পারছি না ওর কি কোরাকের জন্যও কোনও চিন্তা নেই?” যন্ত্রের আওয়াজ ছাপিয়ে একটু চেঁচিয়ে বলতে হল কথাগুলো মলিকে।

     “কেন থাকবে না? মনে হয় ওর পেট কোথায় যেতে পারে ও জানে; কিন্তু কিছু করার তো নেই।”

     লুরু আবার কোথায় অদৃশ্য হয়েছে। বসার ঘর পরিষ্কার করে লুরুর ঘরে গিয়ে আবিষ্কার করল ওরা। মাইক মলির দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল।

     “দুজনেই কোথায় গায়েব হল কিছুই বুঝতে পারছি না।”

     মাইক উত্তর দিল না। মাইক কিছু একটা শুনছিল, তবে তা মলির কথা নয়। ঘাড় কাত করে শুনতে গিয়ে মুখ হাঁ হয়ে ওর। মলিও কিছু শুনতে পেল। একটা কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কোথায়? হ্যাঁ, চিনতে পারছে যেন। গলাটা চেনা লাগছে।

     “এই লুরুর আমাদের দরকার মাইক। কিন্তু সেটা ও বলছে না কেন?”

     মাইক ওকে থামিয়ে বলল, “চুপ চুপ, শোন…। ওই দ্যাখ…”

     কি দেখবে? মলি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তারপর মনের মধ্যে একটা ছবি ফুটে উঠল। একটা পাহাড়…একটা খোদাই করা মানুষের মাথা… একটা পোড়া জায়গা।”

     “ক্যাবেজা পিক!” চেঁচিয়ে উঠল মলি। “মানুষের মাথার খোদাই করা পাহাড় চূড়া। লুরু ওখানেই গেছে আর খুব সম্ভবত কোরাকও ওর সঙ্গেই আছে।”

     মাইক আতঙ্কিত গলায় বলল, “কোথাও একটা সঙ্কেত বিঘ্ন ঘটছে না? আমি কোনও শব্দ বা ছবি পাচ্ছি না, কিন্তু মনে হচ্ছে ও আমাদের শাসাচ্ছে মলি। ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়।”

     “কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে থাকব, কিছুই করব না? ওদেরও তো কোনও বিপদ হয়ে থাকতে পারে।”

     মাইক বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। তবে যেতে রাজি হল। নিজেদের পারসন প্রোপেলার পরস্পরকে গায়ে এঁটে নিতে সাহায্য করল। তারপর মরুভূমির ওপর দিয়ে ছুটে চলল। মাথা পাহাড়ের কাছে যেখানে ওরা লুরুকে প্রথম আবিষ্কার করে তার যত কাছাকাছি যাচ্ছে তত যেন ছবিটা পরিষ্কার হচ্ছে।

     মাইক মলির বাহু ধরে চাপা গলায় বলল, “আমার মনে হয় আমাদের থামা উচিৎ… অন্তত কোথাও লুকোই।”

     “কেন, কি জন্য?”

     “লুরু আমাকে কিছু একটা বলছে। পরিষ্কার বুঝতে পারছি না, কোনও বিপদের সংকেত দিচ্ছে আমারা যেন আর না এগোই।”

     নিজের রকেটের উল্টোমুখী রকেট ছুঁড়ে নিজের প্রোপেলার থামাল। মলিরটাও থামিয়ে দিল। দিয়ে দু’জনে একটা নড়বড়ে পাথরের ওপর দাঁড়াল। পাথরটা একটা গুহার মুখের বেশ খানিকটা ঢেকে রেখেছিল। মাইক মলিকে ঠেলে আড়ালে নিয়ে গেল। নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে ইশারা করল।

     নদী খাত ধরে কিছু একটা উঠে আসছে। ওরা ভয়ে গুহার আরও ভেতরে অন্ধকারে সেঁধিয়ে গেল। গুহামুখের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে।

     সেখান দিয়ে তাকিয়ে দেখল একজন নক্ষত্র পুরুষ। প্রকাণ্ড চেহারা। লুরুর মতোই বিচিত্র কোঁচকানো চুল। আঙুলগুলোও লুরুর মতোই লম্বা আর সূক্ষ্ম। তবে লুরুর মতো মুখখানা শান্ত স্নিগ্ধ সুন্দর নয়। বরং বেশ কুৎসিত, আর রীতিমতো রাগী ও সন্দিগ্ধ হাবভাব। খাদের দিকে কিছু একটা খুঁজছিল। তারপর যে পথে সেই পথ ধরেই ফিরে গেল।

     মলি এতক্ষণে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফিসফিসে বলল, “আমাদের দেখে ফেললে কি হত মাইক? যা ভয় পেয়েছিলাম না…”

     “আমিও তো।” লুরুর মুখটা মনে পড়ায় বলল, “কিন্তু কে ছিল? আমি শিওর একটা বদমাশ।”

     মলি লুরুর গলার আওয়াজও শুনতে পেল। “লোকটার নাম অ্যাস্ট্রো। আমাদের দুনিয়ায় একটা ইম্পরট্যান্ট দপ্তর সামলায়। কিন্তু আমার বাবা ওকে বিশ্বাস করে না। বাবার ধারনা অ্যাস্ট্রো নানা গোলমাল বাধায়।”

     মাইক বলল, “সেটা আমারও মনে হল। আচ্ছা লুরু, ও আমাদের কথাবার্তা শুনতে পেন না কেন?”

     “একমাত্র ভালো মনের ফ্রেন্ডলি মানুষরাই মনের কথা বুঝতে পারে। অ্যাস্ট্রোর পক্ষে আমার বা তোমাদের মনের কথা পড়া সম্ভব নয়।”

     মলি স্বস্তির শ্বাস ফেলল, “ভাগ্যিস! কিন্তু ও পৃথিবীতে কি করছে লুরু?” পরক্ষণেই কিছু মনে পড়ায় বলল, “তুমি একেই প্রফেসর গ্লীমের টেলিস্কোপে দেখতে পেয়েছিলে, তাই না?”

     “হ্যাঁ, আমি অ্যাস্ট্রোর স্পেস স্কিফ দেখেছিলাম। ও আমাদের সঙ্গে তোমাদের লোকজনদের মধ্যে গণ্ডগোল পাকাতে এসেছে।

     “তুমি সোজা বাড়ি চলো লুরু। ওই উন্মাদটাকে একা ছাড়ো। এখানে আর এক মুহূর্ত নয়, শুনলে?”

     মাইক প্রশ্ন করল, “লোকটা কি ধরণের ঝামেলা পাকাতে চলেছে। নিশ্চয়ই একা একা যুদ্ধ করার কথা ভাবছে না।”

     “ও চায় তোমার বাবার আর প্রফেসর গ্লীমের অফিস থেকে সিক্রেট প্ল্যান আর কাগজপত্র এনে ওকে দিই। ওর ধারণা সেগুলো দিয়ে ও প্রমাণ করা যাবে পৃথিবীর লোক মহাকাশের সমস্ত বুদ্ধিমত্তাধারী জীবদের ধ্বংস করতে চায়।”

     “কি বোকা বোকা ব্যাপার! আমাদের আদৌ তেমন কোনও প্ল্যান নেই। আমরা শান্তি চাই, যুদ্ধ নয়। বাড়ি এসো। লোকটা নিজের ছিটিয়াল মাথা নিয়ে যা খুশি প্ল্যান বানাক।”

     “পারব না, মাইক। অ্যাস্ট্রো আমার কোরাককে নিয়ে গেছে। ওর কথা মতো কাজ না করলে ও কোরাককে মেরে ফেলবে। কিন্তু আমি বন্ধুদের জিনিস কি করে চুরি করি?”

     মাইক ও মলি দেখল লুরুর বিষাদ হঠাৎ ভয়ে পরিণত হল। ঢোক গিলে চিৎকার করল, “দৌড়ও! আ্যাস্ট্রো সন্দেহ করেছে আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি আর তোমরা কাছাকাছিই ছিলে। জলদি পালাও!”

     “তোমায় একা ফেলে, অসম্ভব…”

     “কোরাকে বাঁচাতে আমাকে তো থাকতেই হবে। শিগগির পালাও তোমরা..”

     মাইক মলিকে হ্যাঁচকা টেনে বলল, “আমাদের আর বেশি সময় নেই, কুইক…”

     বস্তুত তাদের কাছে আদৌ সময় ছিল না। আ্যাস্ট্রো খাদের বাঁক ঘুরে ফিরে তাকাতেই ওদের দেখতে পেল। মুখ রাগে জ্বলছে। নিজের গতি বাড়িয়ে উড়ে চলে ওদের সামনে।

     কোনও কিছু পরিকল্পনার সময় ছিল না, কিন্তু ভাগ্যক্রমে দুই ভাইবোনের সেই মুহূর্তে একই বুদ্ধি মাথায় এল। প্রোপেলার রকেট ছুঁড়ে ঝট করে চোখের অ্যাস্ট্রোর আড়ালে চলে গেল। গতি বাড়িয়ে চলে গেল গুহার মুখের দিকে যেখানে বড়ো পাথরটা কোনওমতে টাল সামলে আছে।

     “লোকটাকে এইখানে আনতে হবে। আমাদের একটাই সুযোগ। রিস্ক নিতে ভয় করছে। ভয়ে মাথা গুবলেট না হলেই হল।”

     মলি বুদ্ধি দিল, “আমি গুহার মুখে দাঁড়াই। তুই বড় পাথারটার আড়ালে দাঁড়া”

     “খুব সাবধান কিন্তু। তুই ওর সামনে আটকা পড়ে যেতে পারিস। এই, ও চলে এসেছে।“

     ভালো করে ভাবার আগেই অ্যাস্ট্রো মলিকে গুহার সামনে দেখে ফেলল। নক্ষত্র মানব পাশব উল্লাসে গর্জন করে গুহা দিকে ঝাঁপ দিল। পৃথিবীবাসী বাচ্চা দুটোর আর রেহাই নেই। মাইক যত জোরে পারে একটা পাথর ছুঁড়ল। মলি তখনই গুহার ভেতর সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ল। কিন্তু দৈত্যাকার লোকটার হাত তার কাঁধ খামচে ধরে প্রায় ভেঙে ফেলার জোগাড়। কিন্তু মাইকের ছোঁড়া পাথরটা অ্যাস্ট্রোর গায়ে লাগতে তার হাত ফস্কে মাইকের হাত ধরে বেরিয়ে এল।

     তারপর দুজনে মিলে নিজেদের সর্ব শক্তি দিয়ে নড়বড়ে পাথরটাকে ঠেলতে লাগল। প্রকাণ্ড পাথরটা বজ্র গর্জন করে গড়িয়ে পড়ল। ধূলোর বিশাল ধোঁয়ায় ভরে গেল চারপাশ। আর অ্যাস্ট্রোকে বন্দী করে গুহার মুখটা বন্ধ হয়ে গেল।

     দুজনেই চিৎকার করল। “চল। রাক্ষসটা মাটি খুঁড়ে বাইরে আসার আগেই আমাদের হেল্প করার ফোর্স আনতে হবে।”

 

সময় সীমা

     মাইক ও মলিকে নিয়ে সুরক্ষা কর্মীরা অফিসে ঢোকায় ক্যাপ্টেন কার্সন ও প্রফেসর গ্লীম বেশ অবাক হয়ে গেলেন।

     “বাবা, আমাদের অ্যাস্ট্রোকে ধরতে হবে। শিগগির করো! ও গুহা থেকে বেরিয়ে আসার আগেই ধরতে হবে।” দুজনেই এক সাথে বলে উঠল।

     “আগে বসো, শান্ত হও। দশ পর্যন্ত গোন। তারপর ঠিকঠাক গুছিয়ে বলো।” প্রফেসর গ্লীম বললেন।

     নক্ষত্র মানবের পৃথিবীতে আগমন এবং তার অশান্তি বাধানোর অভিসন্ধির ব্যাপারটা দুজনে মিলেই বলল ওরা। কার্সন সবটুকু বোঝার আগেই মিলিটারি পুলিসের উড়ন্ত বাহিনীকে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর চারজন রওনা হল ক্যাবেজা চূড়ার দিকে। বালির ওপর দিয়ে যাত্রাপথে ক্যাপ্টেন পুরো গল্পটা প্রথম থেকে শুনলেন।

     “এই অ্যাস্ট্রোও কি লুরুর মতো স্কাই স্কিফে করে এসেছে? তাহলে স্পেস ওয়ার্নিং সিস্টেম মিস করল কি করে?” প্রশ্ন করলেন ক্যাপ্টেন কার্সন।

     প্রফেসর গ্লীম কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, “প্রশ্ন তো অনেক, কিন্তু আমাদের কাছে উত্তর খুব কম। গত রাতে আমাদের খানিকক্ষণের জন্য বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল মনে আছে? লোকটা এখানে এল কি ভাবে তার উত্তরটা হয়তো এর মধ্যে লুকিয়ে আছে। আমাদের ব্ল্যাক আউট করল কি ভাবে?”

     ক্যাবেজা শৃঙ্গে পৌঁছে মাইক আর মলি প্রথম জীপ থেকে লাফিয়ে নামল। দেখল লুরু সেখানে ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। ক্যাটারফ্লাইটা ওর পেছনেই।

     লুরু বলল, “তোমরা অ্যাস্ট্রোকে বন্দী করার পর আমি কোরাককে উদ্ধার করি। ওকে অ্যাস্ট্রো নিজের তাঁবুতে বেঁধে রেখেছিল।” তারপর ক্যাপ্টেন কার্সনকে বলল, “স্যার অ্যাস্ট্রো খুবই ডেঞ্জারাস। খুব সাবধান।”

     ক্যাপ্টেন কার্সন পাথর চাপা গুহাটার দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর লাউড স্পীকারে অ্যাস্ট্রোর উদ্দেশ্যে বললেন, “গোটা এলাকাটা আমরা ঘিরে ফেলেছি। যদি শান্তভাবে বেরিয়ে আসো, তোমার কোনও ক্ষতি হবে না। তোমাকে স্পেস রিসার্চ সেন্টারের বেসে রাখা হবে নিরাপত্তা দিয়ে যতদিন না তোমাদের লোকজন এসে নিয়ে যাচ্ছে।”

     কয়েক মুহূর্ত সব নিস্তব্ধ। তারপর অ্যাস্ট্রোর গমগমে আওয়াজ প্রতিধ্বণিত হল, “আমি বাইরে আসছি পৃথিবীবাসী, একটাই কারণে, আমার পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়িত করার সময় নয়।”

     ক্যাপ্টেন কার্সন নিজের সৈনিকদের ইশারা করলেন। তারা গুহার মুখ থেকে প্রকাণ্ড পাথরখানা ঠেলে সরাল। কয়েক মুহূর্ত ঢালুর কিনারে দাঁড়িয়ে থেকে পাথরটা সশব্দে নীচে গড়িয়ে পড়ল। ধূলোর ধোঁয়ায় ভরে উঠল চারপাশ।

     ধূলোর মেঘ ফুঁড়ে অ্যাস্ট্রো লাফিয়ে বেরিয়ে এল, যেন বোতল খোলা পেয়ে ছিটকে জিন বেরিয়ে এসেছে। বিকট শব্দে ঘাবড়ে মাইক আর মলির চুল খাড়া হয়ে উঠল।

     “মনে কোর না আমি তোমাদের ভয় পাই পৃথিবীর মানুষ।” নিজের বেল্টে আটকানো একটা ছোট্ট কৌটো দেখিয়ে বলল অ্যাস্ট্রো, “আমার কাছে যা শক্তিশালী অস্ত্র আছে তোমারা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না। আমি যখন খুশি এখানে থেকে পালাতে পারি। আর তারপর নক্ষত্রলোকের নেতা রেগাস জানবেন পৃথিবীর মানুষগুলো কতটা বিপজ্জনক ও ঘৃণ্য।” অ্যাস্ট্রোর চোখ ঝিকমিকিয়ে উঠল। ছোট বাক্সটা অর্ধেক উল্টে সে পালানোর উদ্যোগ করল।

     কার্সন চেঁচিয়ে উঠলেন, “টেক হিম।”

     সৈনিকরা তাদের পারসন প্রোপেলার তাক করল। কিন্তু অ্যাস্ট্রো ওর বাক্সের গায়ে একটা ছোট বোতাম টিপতেই সবাই মাটি ছেড়ে শূন্যে ছিটকে পড়ল। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে রকেটগুলো অকেজো হয়ে যেতে সব বালি ওপর আছড়ে পড়ল।

     অ্যাস্ট্রো খুব সহজে দৌড়ে পালাচ্ছিল। কিন্তু মাত খেল মানুষের প্রাচীনতম অস্ত্রটির কাছে। মলি একটা পাথর তুলে ছুঁড়ে মারতেই সে সৈনিকদের মাঝে চিৎপটাং। লোকটা ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই সৈনিকরা তাকে ধরে ফেলল। যেগুলো অস্ত্র বলে সন্দেহ হচ্ছিল সে সমস্ত কিছু অ্যাস্ট্রোর কাছ থেকে কেড়ে তার হাত পা বেঁধে ফেলল।

     প্রফেসর গ্লীম উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “দারুণ মলি। আজ থেকে আমার বল টীমে তুমিও একজন।”

     অ্যাস্ট্রোকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল, মাথায় একটা আব ছাড়া আর কোনও আঘাত লেগেছে কিনা পরীক্ষা করে দেখতে। সেখানে তাকে কড়া প্রহরায় রেখে বেরিয়ে আসার সময় হঠাৎ সাইরেন বাজতে শুরু করল। স্পেস ওয়ার্নিং সিস্টেমের হুঁশিয়ারি।

     সেই সঙ্গে বুলহর্নের চিৎকার, “ইমার্জেন্সি…ইমার্জেন্সি…”

     তারপর সাইরেনের গোঙানি নিজে থেকেই মিলিয়ে এল, লাউডস্পীকারও আচমকা থেমে গেল। প্রতীক্ষাকক্ষের আলো দপদপ করে নিভে গেল। হাই-ফাই সিস্টেম থেকে ভেসে আসা মৃদু বাজনার আওয়াজও বন্ধ হয়ে গেল।

     সারা হাসপাতাল জুড়ে দরজাগুলো খোলা শুরু হল। মৃদু গুঞ্জন ক্রমশ তীক্ষ্ণ ভয়ার্ত শব্দে পরিণত হল। একজন সৈনিক ছুটে এল, “ক্যাপ্টেন! ইলেকট্রিসিটি পুরো ফেল করেছে স্যর! সমস্ত কমিউনিকেস ব্লকড্‌। গাড়ি আর ট্রাকগুলোও নড়ছে না। এমনকি একটা ফ্লাশ লাইটের ব্যাটারিও কাজ করছে না।”

     ক্যাপ্টেন দ্রুত আদেশ দিলেন, “শিগগির হেডকোয়ার্টারে যাও। আমার এক্সিকিউটিভ অফিসারদের বলো ইমার্জেন্সি প্ল্যান এক্স-টু চালু করতে –” ক্যাপ্টেনের গলা থেমে গেল। মুখের অভিব্যক্তি অদ্ভূত । মাথা ঘোরালেন এমন ভঙ্গিতে যেন কিছু শুনছেন। জওয়ানরাও সতর্ক হয়ে কিছু শোনার চেষ্টা করতে লাগল।

     শব্দটা মাইক ও মলির কানেও গেছে। শান্ত কণ্ঠস্বরটা মনে হল আকাশ থেকে আসছে। তাদের মুখ আতঙ্কে সাদা হয়ে গেল। একবার পরস্পরের দিকে আর একবার বাবার দিকে তাকাতে লাগল।

     গম্ভীর আকাশ-বাণী নির্দেশ দিল, “মূল উৎক্ষেপণ স্থানে সবাই যাও, এক্ষুণি… সবাই…”

     সবচেয়ে উদ্বেগের কথা সকলেই সেই আদেশ যন্ত্রচালিতের মতো পালন করল, এমনকি ক্যাপ্টেন কার্সন ও তাঁর অফিসাররাও। তারা ক্যাপ্টেনকে অনুসরণ করে মার্চ করতে করতে বেরিয়ে গেল। প্রফেসরও বাদ গেলেন না। মাইক ও মলিও সম্মোহিতের মতো চলল। তাদের নামতা পড়ে মন বিক্ষিপ্ত করার কৌশল কোনও কাজে লাগল না।

     ডাক্তার, নার্স, রুগী যারা হাঁটতে সক্ষম সবাই সারি বেঁধে হাসপাতাল ছেড়ে চলল। নীচে বেসের দপ্তর, গবেষণাগার, যন্ত্রপাতির ঘর – এসব জায়গা থেকে আরও অনেকে মিছিলে যোগ দিল। লঞ্চ প্যাডের চারপাশ ভিড় বেড়েই চলল। কেউ নড়ছে না, কথাও বলছে না।

     সেই সম্মোহক কণ্ঠস্বর এবার বলল, “আমি রেগাস, এই পৃথিবী থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে থাকা নক্ষত্রবাসীদের নেতা। আমরা নিজেদের নক্ষত্র মহাকাশযান নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলাম। তোমাদের গ্রহ যার নাম জানতে পেরেছি পৃথিবী, সেই দিকেই আসছিলাম। কিন্তু একটা প্রচণ্ড ক্ষমতাসম্পন্ন তরঙ্গ এবং কিছু মারাত্মক রেডিয়াশনের জন্য ওঠা অন্তরীক্ষ ঝড়ের ফলে দেরি হয়ে গেল। তোমাদের উপগ্রহ ছুটে যাওয়ার জন্যই এই তরঙ্গের অস্থিরতা।”

     মলি আর মাইক পরস্পরের হাত চেপে ধরল। প্রফেসর গ্লীমের তত্ত্ব মনে পড়ল, একটা উপগ্রহ ছোঁড়া হলে সে স্পেসে তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে ঠিক যেমন জলের মধ্যে সাবানের খণ্ডটা করেছিল।

     “আমার ছেলে লুরু একটা ছোট অন্তরীক্ষ নৌকায় ভাসার সময় সেই ঝড়ের মুখে পড়ে। ওর সঙ্গে ওর পুষ্যি কোরাকও ছিল। তরঙ্গগুলোই লুরুর মহাকাশযানকে কক্ষচ্যুত করে, আর তোমাদের পৃথিবীর মহাকর্ষ তাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে আসে। তোমাদের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে নামার সময় যানটিকে তো ছাই হয়ে যায়। আমারা ভেবেছিলাম লুরুও বুঝি বেঁচে নেই।”

     ভিড়ের সবাই নিশ্চুপ হয়ে ছিল। শুধু নিশ্চুপ নয়, নিস্পন্দ যেন। হাত পা মাথা কিছুই নড়ছে না কারও। হৃৎস্পন্দনও যেন বন্ধ হয়ে আছে।

     গম্ভীর গলা বলে চলল, “কিন্তু আনন্দের কথা, আমাদের ভুল ভাঙল। জানতে পেরেছি আমার ছেলের তেমন কিছু চোট লাগেনি। লুরু তার তার পোষা প্রাণীটিকে এই পৃথিবীর দু’জন অল্প বয়সী মানুষ খুঁজে পেয়েছে।”

     “মানে আমরা!” মাইক বোনের কানে ফিসফিস করল।

     “আমার নক্ষত্রযান কিছ্ক্ষণের মধ্যে পৃথিবীতে অবতরণ করবে। দুপুর বারোটা নাগাদ তোমাদের মাথার ওপর আমাদের দেখতে পাবে। আমি চাই আমার ছেলে আর তার পুষ্যিকে নিরাপদে ফিরিয়ে দাও। নাহলে এই জায়গাটা আমরা ধ্বংস করে ফেলব, একজনও রেহাই পাবে না।”

     বেশ কিছুক্ষণের জন্য নীরব রইল কণ্ঠস্বরটি। সম্ভবত সবাইকে বোঝার সময় দিচ্ছিল। তারপর আবার শুরু করল।

     “এবার তোমরা নিজেদের ঘরে বা কাজে ফিরে যেতে পারো। কিন্তু কি বললাম মনে রেখো।”

     দেখা গেল সবাই আবার নড়াচড়া করতে পারছে। কিন্তু সবাই এত ভয় পেয়েছে যে নিজেদের মধ্যে বিশেষ কথা বলছে না। বরং শূন্য আকাশে কোনও ভয়াবহ দৃশ্য উদয় হওয়ার আগেই যেন পালাতে পারলে বাঁচে।

     কিন্তু প্রকাণ্ড মহাকাশ ঘাঁটি এলাকা তখনও নির্জীব রয়ে গেছে। একটাও আলো জ্বলছে না, কোনও মোটরের আওয়াজ নেই। আজানা শক্তির আবেশে যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে তা ঠিক হওয়ার নাম নেই। সবকিছু থমকে আছে।

     মলি কাঁপা গলায় বলল, “বারোটা বাজতে আর মোটে দু’ ঘণ্টা।”

 

শান্তি প্রস্তাব

     লুরু ক্যাপ্টেন কার্সনকে দুশ্চিন্তা ত্যাগ করতে অনুরোধ করল। “আমার বাবার পৃথিবীবাসীর ক্ষতি করার কোনও প্ল্যান নেই। যদি নক্ষত্রযানে আক্রমণ না করা হয়, তাহলে তোমাদের আমাদের দু তরফের মানুষজন শান্তিতে দেখা সাক্ষাত করতে পারে।”

     মাইক শুনে কিছুটা ধাতস্থ হল। “আমার মনে হয় তোমার বাবার কাছে কালো রঙের একটা বাক্স আছে যেটা অ্যাস্ট্রো মতো কিন্তু তার চেয়েও বড় আর পাওয়ারফুল। না হলে আমাদের মিসাইলগুলো ছুঁতে পর্যন্ত পারল না?”

     ক্যাপ্টেন কার্সন নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আমাদের কাছে ওই কালো বাক্সটা থেকে বাঁচার মতো অনেক অনেক শক্তিশালী অস্ত্র আছে। আর আমি সেগুলো প্রয়োগের অর্ডার দিয়ে এসেছি।”

     লুরু আঁতকে উঠে ক্যাপ্টেনের বাহু আঁকড়ে ধরল, “স্যর, আমার বাবার শিপে অ্যাটাক করবেন না। বাবা কিন্তু কথা দিয়েছে আপনারা কিছু না করলে তারাও শান্তি বজায় রাখবে।”

     “নিশ্চিত হব কি করে? অ্যাস্ট্রো কি করতে পারে দেখার পর আমাদের বাঁচার একটাই উপায় হল স্টারশিপটাকে তাড়িয়ে দেওয়া। আমি ওটা দেখামাত্র ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছি।”

     মলি চিৎকার করল, “তাহলে আগেরটা ক্যানসেল করতে আর একটা অর্ডার দাও বাবা।”

     “তা ছাড়া আটকাবে কি করে? ওই কালো বাক্সটায় তো কোনও কিছুরই এফেক্ট হচ্ছে না।”

     “আমি প্রফেসর গ্লীমকে সান ফার্নেসে পাঠিয়েছি। উনি স্টার শিপের গায়ে সান মিরর তাক করবেন। এখন তো তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাবে না। সময়ও নেই…অ্যাটাক বন্ধ করার মেসেজ পাঠানো সম্ভব নয়। ”

     সান ফার্নেস অর্থাৎ সূর্য চুল্লিটি ঘাঁটি থেকে অনেকটা দূরে মরুভূমির মধ্যে একটি পাহাড়ের চূড়ায়। আর ওই প্রকাণ্ড সূর্য দর্পণ প্রায় চোদ্দতলা বাড়ির সমান উঁচু। সূর্যরশ্মি অন্য একটি আয়নায় ফোকাস করা তার কাজ। দ্বিতীয় আয়নাটা তার ওপর পড়া সমস্ত সূর্যরশ্মির উত্তাপকে মাত্র পাঁচ বর্গ ইঞ্চিতে কেন্দ্রীভূত করে। ঐ ছোট্ট বর্গক্ষেত্রটার তাপমাত্রা গিয়ে দাঁড়াতে পারে সূর্যের প্রায় অর্ধেক। এর সর্বনাশা উত্তাপকে বন্দুকের গুলির মতোই নিক্ষেপ করা যায়। সামনে যা পড়বে মুহূর্তে ছাই হয়ে যাবে।

     মলি গোঙানির স্বরে বলল, “কিন্তু খবরটা প্রফেসরকে দিতেই হবে, যে করে হোক। ফোন বা রেডিও চলার মতো ইলেক্ট্রিসিটি নেই যখন তখন ড্রাম বাজাও, ধোঁয়ার সিগন্যাল দাও। কিছু একটা করো…”

     মলির বাকি কথাগুলো মাইক শেষ করল। “নইলে ওই সান ফার্নেস আমাদের সঙ্গে নক্ষত্রমানবদের যুদ্ধ বাধিয়ে দেবে…” মাইক কিছু একটা ভাবার জন্য থামল।

     মলির মাথায় মনে হয় কিছু একটা উদয় হয়েছে। ব্যাপারটা ধরে ফেলল, “আয়না! বাবা, আয়নাটাকে যুদ্ধ বাধানোর বদলে যুদ্ধ থামানোর কাজে লাগানো যায় না? ধরো আমরা যদি ওর সবচেয়ে উঁচু গ্যান্ট্রিতে চাপি?”

     মলি সবাইকে কাটিয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটল। বেরিয়ে এল ড্রেসিং টেবিলের আয়না হাতে করে। লুরু মলির সঙ্গে হাত লাগা। মাইক ও কার্সন ছুটলেন এলিভেটরের দরজা খুলতে।

     ওপরে তারের জাল সরিয়ে উঠতে উঠতে রকেটকে বেশ দেওয়া সবচেয়ে উঁচু ক্রেনে পৌঁছল। এই উচ্চতা থেকে আশা করা যায় তাদের বার্তা হয়তো দূর পাহাড়ের চুড়োয় থাকা প্রফেসর পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে।

     আয়নাটা এমনভাবে রাখা যে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে চোখ ঝলসে দিচ্ছে। মাইক নিজের শার্ট খুলে সেটাকে শাটারের মতো ঝুলিয়ে দিল। এবার ওই শাটার খোলা বন্ধ করে আন্তর্জাতিক ড্যাশ আর ডট কোড পাঠানো যাবে।

     “সবাই প্রে করো যাতে প্রফেসর গ্লীম এদিকে তাকিয়ে আমাদের তৈরি ব্লিংকটা দেখতে পান।” মাইক উত্তেজিত।

     ক্যাপ্টেন কার্সন বার্তা পাঠানো শুরু করলেন। এক এক ঝলকে এক-একটি বার্তা মরুভূমি পেরিয়ে চলল। “মে ডে…মে ডে…মে ডে…ডু নট…আবার শোনো… ইউএফও-র ওপর মিরর অন করো না। আমার মেসেজ পড়তে পারছ গ্লীম? ইউএউও-টাকে ল্যান্ড করতে দাও। এই অর্ডার আগের অর্ডারগুলোকে বাতিল করে জারি। সান ফার্নেসে এসো, সান ফার্নেসে এসো।”

     দূরের পাহাড়ে তলোয়ারের মতো চলন্ত আলোর ঝলকানি ইঙ্গিত দিল সূর্য দর্পণটিকে নির্দিষ্ট দিকে ঘোরানো হল। তার মানে গ্লীম ক্যাপ্টেনের সিগন্যাল দেখতে পাননি। সূর্যের অপরিমেয় উত্তাপ জমা হচ্ছে তাতে যার বিধ্বংসী ক্ষমতা অস্ত্র ঠাসা রকেটের চেয়ে কম নয়।

     ক্যাপ্টেন কার্সন চাপা গলায় গরগর করলেন, “গ্লীম মেসেজটা দেখতেই পায়নি। এই দুপুরের রোদে দূর থেকে বিন্দুর মতো ফ্লাশ চোখে পড়ে নাকি?”

     “কিন্তু আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে স্যর, যতক্ষণ সময় আছে থামার ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।” বলল লুরু

     ক্যাপ্টেন কার্সন লাগাতার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন, “শাটার বন্ধ করো…শাটার বন্ধ…আমায় পড়া যাচ্ছে গ্লীম? শাটারগুলো বন্ধ করো।”

     শাটার বন্ধ…শাটার বন্ধ…আমায় পড়তে পারছ গ্লীম?…শাটারগুলো বন্ধ করো।”

     হঠাৎ সেই লম্বাটে আলোর ঝলক ম্লান হয়ে গেল। লম্বা আয়না যেটা সূর্যালোক কেন্দ্রীভূত করে সেটা শাটারে ঢাকা পড়েছে। তাদের আলোক-বার্তা ওপাশে পৌঁছেছে। গ্যান্ট্রির ওপর চারজনেই স্বস্তির শ্বাস ফেলল, খুব বাঁচা গেছে!

     পাহাড় চূড়ায় একটা ছোট্ট উজ্জ্বল ফুটকি দপদপ শুরু করল। ফিরতি বার্তার শব্দ ভেসে এল। ক্যাপ্টেন পড়লেন, “শাটার আদেশ অনুযায়ী বন্ধ করা হয়েছে। অত কায়দার আর দরকার নেই ডিক কার্সন। কিন্তু ওখানে হচ্ছেটা কি ? একটা গবেষণাকেন্দ্রকে যোগাযোগের জন্য কোন আদ্যিকালের মতো হেলিওগ্রাফ ইউজ করতে হচ্ছে?”

     সকলেই হেসে ফেলল। তারপর একটা হস্তচালিত লিফ্‌টে করে নেমে এল নীচে। নামতে না নামতেই নীল আকাশে চোখে পড়ল কতগুলো দাগ যেগুলো দ্রুত বড় হচ্ছে।

     অকস্মাৎ পায়ের নীচে মাটি নড়ে উঠল। বাতাস যেন তাদের চারপাশর জলের মতো বইছে। মাইক মুখে তামার স্বাদ পেল। কানের কাছে ইঞ্জিনের গর্জন শুনে মলির ঘুম পেতে লাগল। তাদের মাথার ভেতর কে যেন শান্তভাবে নির্দেশ দিচ্ছে “লঞ্চপ্যাডে যাও। গিয়ে লুরুকে নিয়ে এসো তার বাবার কাছে।”

     মহাকাশ ঘাঁটির মানুষজন আবার যেন ঘুমের মধ্যে চলা শুরু করল। ক্যাপ্টেন কার্সন, তাঁর সৈনিকরা, ল্যাবরেটরি ও ওয়ার্কশপের বিজ্ঞানীরা, শ্রীমতী কার্সন, মাইক, মলি, এমনকি মলিদের টেরিয়ার আর লুরুর ক্যাটারপিলারটাও ঘুমন্ত পদযাত্রায় শামিল হল।

     ক্রমশ আকাশের ওই দাগটা অতিকায় অন্তরীক্ষ জাহাজে পরিণত হল। মেঘের মতো গর্জন থামিয়ে সেটা ধীরে ধীরে উপগ্রহ অবতরণ ক্ষেত্রে নামল। অনেকটা ঝিনুকের খোলার মতো দেখতে – অবশ্যই ঝিনুকটা যদি হাজারখানা হাতির সমান বড় হয়।

     খোলসের বন্ধ পাতাদুটোর মধ্যে একটা দরজা দেখা দিল। খোলা দরজা দিয়ে নেমে এল সিঁড়ি। উপস্থিত সবার মধ্যে আতঙ্কের একটা স্রোত বয়ে গেল।

     সিঁড়ির দু-পাশে দুটো বাহুর মতো অদ্ভূত জিনিস যেগুলোকে সিঁড়িটার যন্ত্র বলেই মনে হচ্ছে সেগুলোর ধাতব গায়ে সজীব সবুজ আলোর আভা। একটা বাহু এগিয়েও গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে; সেখানে অন্য বাহুটি উৎক্ষেপণ ক্ষেত্রটিকে ভালো করে পরীক্ষা করল। একটু পরেই যান্ত্রিক বাহুদুটি অন্তরীক্ষ জাহাজের ভেতর আবার গিয়ে সিঁধোল।

     মলি চাপা গলায় প্রশ্ন করল, “কি করছে বল তো?”

     মাইক একটু ভেবে বলল, “মনে হয় জায়গাটাকে পরীক্ষা করছে। মনে তো হয় ওদের খুব কিছু দেখার আছে। তারা ভালো করেই জানে লুরু পৃথিবীতে দিব্যি আছে।”

     একটা লম্বা বিরতি। তারপর লম্বা দরজাটা আবার খুলে গেল। হুকুমকর্তা এবার সবার সামনে এল। রেগাস, নক্ষত্রবাসীদের রাজা। বিশাল লম্বা, মাথায় সবজে-বাদামি এলোমেলো কোঁকড়া চুল মুখ ও ঘাড়ের ওপর কেশরের মতো ঝাপটা মারছে। তার হলদে চোখে আভা, সূর্যের আলো পড়ে রূপোলী পোশাক ঝলমল করছে। রাজার মতোই দর্শন বটে।

     নিজের হাত বন্ধুত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে তুলে রেগাস বলল, “তোমাদের নেতা আমার সামনে আসুক আর আমার ছেলেটাকে নিয়ে আসুক।”

     লুরু উৎসাহে চিৎকার করে দৌড়োতে লাগল। ক্যাপ্টেন কার্সনও তাঁর ছেলেমেয়েদের নিয়ে সিঁড়িটার দিকে এগোতে লাগলেন। নক্ষত্র বালক তার বাবার বাহুতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর বেশ গর্বিতভাবে তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

     ক্যাপ্টেন কার্সন মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, “স্যর, আপনি যদি শান্তিবার্তা নিয়ে এসে থাকেন তাহলে পৃথিবীতে আপনাদের স্বাগত।”

     রেগাস বেশ অবাক হয়ে বলল, “শান্তি নয় কেন? তোমাদের জগৎ অধিকার করার কোনও পরিকল্পনা নেই আমাদের। আমার ছেলের দুর্ঘটনা না ঘটলে এখানে আসতামই না। আমরা আসলে জনবসতি বিহীন জায়গাগুলোর সন্ধান করছি। তোমাদের পৃথিবী আমাদের কাজে লাগবে না।”

     “আমাদের সম্পর্কে এত কিছু জানার জন্য তো আপনাকে অনেকটাই কাছে আসতে হয়েছে। তোমাদের মহাকাশ জাহাজ আমাদের কাছে প্রথমে ছিল ইউএফও মানে অজানা উড়ন্ত বস্তু। ওই আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট আমাদের স্পেস ওয়ার্নিং সিস্টেমকে অকেজো করে দিয়েছে।”

     রেগাস হাসল, “তাই তো। আমরা নজর রাখছিলাম। আমায় ক্ষমা করবেন, যা দেখেছিলাম আমাদের ভালো লাগেনি।”

     মাইক দেখল তার বাবা ক্যাপ্টেন কার্সন থেকে বিজ্ঞানী গ্লীম সহ মহাকা ঘাঁটির সমস্ত কর্মীর মুখ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছে। নক্ষত্রলোকের নেতা অতগুলো হতবাক মুখ দেখে হেসে ফেলল। “আমি দেখলাম তোমাদের ধারণা অন্তরীক্ষ থেকে আসা আগন্তুকরা বুঝি তোমাদের পৃথিবী অধিকার করতে চায়। আমরা এখনও পর্যন্ত মহাবিশ্বের সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব। এই ব্রহ্মাণ্ডে এরকম কোটি কোটি জগৎ রয়েছে। যেসব জায়গাগুলোয় ইতিমধ্যেই জনবসতি রয়েছে সেগুলো আমরা মোটেই বিরক্ত করি না। আমরা তোমাদের চেয়ে দশ লক্ষেরও বেশি বছর প্রাচীন এবং অনেক বেশি সভ্য। মশাই একটা বাচ্চা দুনিয়া নিয়ে তাকে লালন-পালনের ঝামেলা নেব কেন?”

     প্রফেসর গ্লীম ফার্নেস থেকে ফিরে এসে মাইকের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বললেন, “নক্ষত্র বাসীরা আমাদের চায় না খুব ভালো কথা..” তারপর ফিসফিসে বললেন, “কিন্তু এর মধ্যে মেজাজ বিগড়ানোর মতো কিছু না হলেই হল…”

     ঠিক ওই সময় মলিদের পোষা টেরিয়ার কেলি লুরুর ক্যাটারফ্লাইটার কোরাকের পিছু ধাওয়া করে বাতাস কাটানোর উঁচু মাস্তুলটায় নিয়ে গিয়েছে।

 

কুকুর বেড়ালের ঝগড়া

     সবার নজর লেকির দিকে। সে ভয়ানকভাবে ডাকছে। কোরাক মাস্তুলটার ধারে কোনঠাসা। উপস্থিত সকলে ভয় পেয়ে গেল। এই রে! নক্ষত্রলোকের ওই তাগড়াই লোকগুলো না এসব দেখে রেগে যায়।

     প্রফেসর গ্লীমের বড় হাতটা মাইকের কাঁধে রাখলেন। “আমি এমনটাই আশঙ্কা করছিলাম।” গ্লীম চিৎকার করলেন, “না, একদম না! ছেড়ে দাও!”

     মনে হচ্ছে অ্যাস্ট্রো নামের আপদটা উঠে এসেছে। কোনওভাবে প্রহরীদের বোকা বানিয়ে মহাকাশ ঘাঁটিতে ঢুকে পড়েছে। একটা গোলমাল পাকানোর পেয়েছে এবার। সে পৃথিবীর মানুষদের দিকে একটা অজানা অস্ত্র তাক করে রাখল। যদি শয়তানটা কোরাককে মেরে ফেলে আর রেগাসের ধারণা হয় সেটা পৃথিবীবাসীর কাজ, তাহলে অনেক কিছুই হতে পারে…।

     প্রফেসর গ্লীম হঠাৎ মাইককে সরিয়ে নক্ষত্রমানবটার ওপর হুড়মুড়িয়ে পড়লেন। প্রফেসরের পকেট থেকে একটা ক্ষীণ আলোর আভাস। মাইক রুদ্ধশ্বাসে বুঝতে পারল কোনওভাবে গ্লীমের পকেট ল্যাম্পটির সুইচ অন হয়ে গেছে।

     নক্ষত্রমানুষদের পৃথিবীর বিদ্যুৎ সংযোগ নষ্ট করা গোপন অস্ত্রটি তার মানে এই মুহূর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে না। তার মানে লঞ্চপ্যাড থেকে রকেট উৎক্ষেপণ সম্ভব!  সেগুলোর ইলেকট্রনিক মস্তিষ্ক রেগাসের মহাকাশযানের বারোটা বাজাতে পারে। অনুসন্ধানকারী অন্য মহাকাশযানগুলিকেও মেরে তাড়াতে পারে।

     মাইকের মুখ হাঁ হয়ে গেছে, বোনের হাতে আনমনে চাপ পড়েছে। মলিও প্রফেসরের পকেট থেকে বিচ্ছুরিত মৃদু আলোটা লক্ষ্য করেছে এবং মাইকের ইশারাও বুঝতে পেরেছে।

     মলি ভাইয়ের কানে চাপা গলায় বলল, “একদম না! আমি জানি প্রফেসর গ্লীম এসেছেন। ওনার পার্সন প্রোপেলার কাজ না করলে এত তাড়াতাড়ি এলেন কি  করে? কিন্তু রকেটগুলোর কথা ভুলেও ভাবিস না। ওভাবে কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।”

     কিন্তু মাইক বুঝলেও আর কেউ যদি ব্যাপারটা লক্ষ্য করে থাকে আর সুযোগ বুঝে রকেটগুলো ছুঁড়ে দেয় তাহলে? ঘাবড়ে গিয়ে মানুষ অনেক হঠকারিতা করে ফেলে যার ফলে শান্তির সম্ভাবনা থাকলেও লড়াইয়ের দিকে মোড় নেয়।

     মলি আর ভাবার জন্য অপেক্ষা করল না। ছুট লাগাল। এত জোরে সে এর আগে কখনও দৌড়য়নি। উপস্থিত সবাই কাণ্ড দেখে রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল। সবাইকে অবাক করে সে নক্ষত্রলোকের মহাকাশযানটির মধ্যে ঢুকে পড়ল। এবার নিশ্চয়ই কেউ রকেট ছোঁড়ার নির্দেশ দেবে না।

     নিজের ভয় গোপন করে মহাকাশযানটির ভেতরের করিডোর দিয়ে হাঁতে লাগল। এমনকি যে অদ্ভূত -দর্শন নক্ষত্র মানুষরা তার চারপাশ ঘিরে ধরল তাদের দিকে তাকিয়ে হাসারও চেষ্টা করল।

     মাইক প্রফেসর গ্লীমের উদ্দেশ্যে চেঁচাল, “আমায় কাঁধে তুলে ধরুন।” প্রফেসার তখনও অ্যাস্ট্রোকে শক্ত করে ধরে রেখেছেন। তারপর অ্যাস্ট্রোকে ধমকাল, “তুমিও ধরো। কোনওরকম গোলমাল নয়।”

     মাইকের গলার স্বরে যথেষ্ট দাপট ছিল। অ্যাস্ট্রোর মুখ থেকে রাগ যেন খানিকটা দূর হল। তাহলে কি পৃথিবীবাসীরা সত্যিই শান্তি চায়? সে আস্তে আস্তে নিজের অস্ত্র বেল্টে গুঁজে রাখল। অধ্যাপকও নিজের বজ্রমুষ্টি কিছুটা আলগা করলেন। তারা দুজনে মিলে মাইককে ওপরে তুলে ধরল। তারপর নিজেদের কাঁধে একটা স্ট্যান্ড লাগিয়ে নিল মাইককে দাঁড় করিয়ে রাখতে।

     ভিড়ের ওপর দিয়ে মাইক নক্ষত্রনেতার দিকে হাত নাড়াল। “স্যর, প্লীজ এই বোকার বেহদ্দটাকে কোনও গণ্ডগোল পাকাতে দেবেন না। আমাদের কুকুরটা আপনারদের ক্যাটারফ্লাইয়ের কোনও ক্ষতি করবে না। আমাদের পৃথিবীতে কুকুর ও বেড়ালরা নিজেদের মধ্যে এমনিই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে। বিকট হল্লা হলেও কেউই চোট পায় না। আপনার ক্যাটারফ্লাই আপনার কাছে নিরাপদেই ফিরবে।”

     নক্ষত্র নেতা গরগর করল, “তুমি বলছ তুমি আমার ছেলের পুষ্যিকে বাঁচাতে পারবে?”

     “হ্যাঁ স্যর, যে ভাবে হোক, করবই।” মাইক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।

     “তাহলে মেয়েটা দৌড়ে আমাদের যানে ঢুকে পড়ল কেন?” রেগাসের গলায় চাপা গর্জন।

     “ও আমার বোন। ওর বিশ্বাস আপনাদের জাহাজে গেলে আমরা যে আপনাদের ক্ষতি চাই না সেটা বোঝানো যাবে।”

     এবার রেগাসের গর্জন থেমে মুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। “তোমার কি ধারণা তোমরা আমাদের ক্ষতি করতে পারো? তবে তোমার বোনের সাহস আছে। বেশ, আমি অপেক্ষা করছি আমার ছেলের পুষ্যির জন্য।”

     প্রফেসর গ্লীম আর অ্যাস্ট্রো মাইককে মাটিতে নামাল। গ্লীম হাত দিয়ে নিজের দু’চোখ আড়াল করে মাস্তুলটার দিকে তাকালেন। “আমাদের ইম্‌মিডিয়েট একটা উপায় ভাবতে হবে। ক্যাটারফ্লাইটার ডানাদুটোর পক্ষে শরীরটা ভারি। নামার চেষ্টা করলে পড়ে যাওয়ার চান্স বেশি।”

     মাইক বলল, “ওই পোলটায় চড়া ইমপসিবল। কোনও অ্যাক্রোব্যাটের পক্ষেও সম্ভব নয়। আপনারা ওখানকার ইন্সট্রুমেন্টন্স সারান কি করে?”

     “বাতাসে মাস্তুলের পতাকা উড়তে শুরু করলে একটা স্ক্যাফোল্ড মানে টেম্পোরারি পোল বা মই বানিয়ে নিই।”

     “কতক্ষণ লাগে তাতে?”

     “মোটামুটি থাউজ্যান্ড মান আওয়ার।”

     “কিন্তু আমাদের তো অত সময় নেই। একটা হেলিকপ্টার হয় না?”

     “তাহলে তো ক্যাটারফ্লাইটা শিওর ভয় পেয়ে ঝাঁপ মারবে।”

     মাইক চিন্তায় পড়ে গেল, “স্ক্যাফোল্ড না, হেলিকপ্টার না, অ্যাক্রোব্যাট নয়, এরোপ্লেনও নয়, বেলুন…….” মাইক চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে আবহাওয়া স্টেশনে যে প্লাস্টিক বেলুন ব্যবহৃত হয় একটা দেখে লাফিয়ে উঠল, “আমরা তো ওটাতেও চড়তে পারি।”

     অধ্যাপক মাইকের পিঠ চাপড়ে বললেন, “হতে পারে। বেলুনটা তোমায় তুলে পারবে মনে হয়।”

     ক্যাপ্টেন কার্সন বায়ুমণ্ডল পরখ করার জন্য ছোট একটা বেলুন আনালেন। তার লোক লস্কর বেলুনের নীচে একটা আসন লাগিয়ে দিল। তারপর গ্যাস ভরা শুরু হল।

     মাইক বেলুনের নীচে ঝুলন্ত আসনে বসে বসে পড়ল। একটা ছোট ঝাঁকুনি দিয়ে বেলুন ওপরে ওঠা শুরু করল। বেগের চোটে দোদুল্যমান আসন থেকে মাইক পিছলে যাবার যোগাড়। মাস্তুলের ডগার উচ্চায় পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত শক্ত করে আঁকড়ে বসে রইল মাইক। তারপর মাটির গ্রাউন্ড ক্রিউরা বেলুনটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল। এবার বেলুনটাকে মাস্তুলের কাছে নিয়ে যেতে হবে যাতে মাইক ক্যাটারফ্লাইটার নাগাল পায়।

     মাইক ধরার জন্য তার সীট থেকে শরীর অনেকটা বার করে আনল। প্রায় ধরে ফেলেছে, এমন সময় দমকা বাতাসে বেলুনটা মাস্তুলের দিক থেকে অনেকটা সরে গেল। বেলুনটা কিছুটা নেমে এল। মাইক এখন হেড কোয়ার্টারের মাথার পতাকা দেখতে পাচ্ছে। বাতাসের দমক থামতে সে ইশারা করল, “আপ।”

     নীচের গ্রাউন্ড ক্রু আমার কসরত করে বেলুনটাকে মাস্তুলের কাছাকাছি নিয়ে এল। মাইক সামনের দিকে ঝুঁকল। এবার এতটাই কাছে চলে এসেছে যে ক্যাটারফ্লাইটার চোখের আতঙ্ক বেশ বোঝা যাচ্ছে। সে মাস্তুলের সরু কিনারা আর বেলুনের মাঝামাঝি চলে এল। কিন্তু পিছলে গিয়ে কোনও রকমে সামলে আবার পিছিয়ে গেল।

     আসনের তলায় একটা দড়ি পেয়ে মাইক সেটা দিয়ে এক পায়ে ফাঁস লাগিয়ে নিল। তারপর মাস্তুলটার দিকে ভেসে গিয়ে কোরাককে ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। যেন নরম লোমের ওপর দিয়ে মাইকের হাত ব্রাশ বুলিয়ে গেল।

     মাইক কোরাককে কাছে টানার চেষ্টা চালাতে তার বোধহয় মনে পড়ে গেল সে উঠতে পারে। সে নিজের ছিট-ছিট ডানা মেলল।

     সর্বনাশ! মাইক ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। কোরাক পড়ে মরলে লুরু কি ভাববে? রেগাসই বা কি করবে? আর যেসব নক্ষত্র-মানুষরা তাদের মহাকাশযানের মধ্যে মলিকে ঘিরে রয়েছে, তারা?

     ক্যাটারফ্লাইটা খানিকটা ঝটপটিয়ে উড়ে গেল। কিন্তু তারপর তার ছোট ডানা ভারি শরীরটাকে আর ভাসিয়ে রাখতে না পারায় আসতে আসতে নীচে পড়ে যেতে লাগল। মাইকের মনে হল এখনও তাকে ধরা সম্ভব।

     নিজের পায়ে বেলুনের সীটে বাঁধা দড়ির এক প্রান্ত ফাঁস দিয়ে পরানোই ছিল। সেটা এঁটে এবার নিজে কোরাকের দিকে লাফিয়ে পড়ল। দড়ির ঘষায় মাইকের হাতের তালু ছড়ে গেল। কোরাককে তবু ধরা গেল না।

     তবে তার পড়ার গতিবেগ কমিয়ে ফেলা গেল। কোরাক শেষ পর্যন্ত লুরুর ঘাড়ে এসে নামল। কানে এল সমবেত মানুষজনের উল্লাস আর হাসির শব্দ। এত নিশ্চিন্ত লাগল মাইকের যে নিজের হাতের জ্বালার কথা খেয়াল রইল না। নক্ষত্রবাসী ও পৃথিবীবাসী যাদের মধ্যে আর একটু হলে যুদ্ধ বাধতে চলেছিল এখন নিজেদের মধ্যে হাসি মস্করায় মেতে উঠেছে।

     সবচেয়ে নিশ্চিন্ত, মলি হাসি মুখে নক্ষত্রলোকের জাহাজ থেকে তাদের সঙ্গেই বেরিয়ে আসছে।

 

১০

নক্ষত্রলোকে দস্তখত

     ক্যাপ্টেন কার্সন মলিকে নিজের বুকে তুলে চুমুতে ভরিয়ে দিলেন। মাইকের দিকে চোখ পড়তে বললেন, “আই আম সো প্রাউড অব ইউ। দুই বিশ্বের হয়তো লড়াই বাধতে বসেছিল, তোমরা থামিয়ে দিয়েছ।”

     “আমাদের বদলে যে কেউ থাকলে এমনটাই করত বাবা।”

     “কিন্তু কেউ তো নিজে থেকে এগিয়ে আসেনি তোদের মতো।”

     মাইক লুরুকে বলল, “এবার তোমার নিজের জগতে ফেরার পালা। মনে হচ্ছে না, সময়টা একটু বাড়াতে পারলে ভালো হোত?”

     সবাই হেসে উঠল। রেগাস ক্যাপ্টেনকে বলল, “আমি দেখছি যাতে অ্যাস্ট্রো আর ঝামেলা না পাকায়। মনে হচ্ছে শান্তি থাকাটাই যে মঙ্গল সেটা ও বুঝতে শুরু করেছে। যদিও আমাদের মধ্যে দূরত্ব অনেক তবু আপনাদের পৃথিবীবাসীর কাছে থেকেও আমাদের কিছু শেখার আছে।”

     কার্সন অবাক হয়ে বললেন, “আপনারা তো আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জানেন, তাই না?”

     “আমাদের সভ্যতা হাসতে প্রায় ভুলে গিয়েছিল। আপনাদের মতো যদি জীবনের মজাদার দিকগুলো আমাদের চোখে পড়ত…”

     মাইক মলির কানে কানে বলল, “এই কাজটা আমি দারুণ এনজয় করব। দূরদূরান্তরে নক্ষত্রলোকে গিয়ে তাদের শেখানো মজার জিনিষগুলো কি করে খুঁজে পেতে হয়।”

     “আমিও…” মলি ফিক হেসে ফেলল। তারপরেই মনে পড়ল নক্ষত্রের লোকেরা অন্যের মনের কথা বুঝতে পারে।

     রেগাস ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “নিশ্চয়ই। তোমরা অবশ্যই সেখানে যাবে। হাসি মজা দিয়ে কি করে সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় আমাদের শেখাবে। তারপর যাওয়া আসা লেগে থাকবে। নিজেদের বিজ্ঞান প্রযুক্তিও পরস্পর ভাগ করে নেব।”

     সবাই নক্ষত্রলোকের রাজার প্রতি কৃতজ্ঞ। এ যেন জ্ঞান-বৃক্ষের পাকা ফল পৃথিবীবাসীর হাতে টুপ করে খসে পড়তে চলেছে।

     রেগাস মাইক ও মলির মাথায় নিজের সূক্ষ্ম হাত দিয়ে আলত থাবড়ে দিল। “তোমাদের ইতিহাস বইতে যখন এই সময়ের কথা লেখা হবে তোমাদের দু’জনের কথাও হয়তো স্মরণ করা হবে নক্ষত্রলোকে নিজেদের হস্তাক্ষর নিজেদের চিহ্ন রাখার জন্য।।”

     কোরাক লুরুর কাঁধে বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল। সে তার সোনালি খর্বকায় ডানা ঝটপটিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে খানিক উড়ে গিয়ে ঝপাস করে গিয়ে বসল অধ্যাপক গ্লীমের ঘাড়ে তাঁর লাল দাড়ি খামচে।

     কেলি দেখাদেখি বিজ্ঞানীর গা বেয়ে উঠে কোরাককে ধরার চেষ্টা করল। কোরাক কেলিকে দেখে বেড়ালের মতোই প্রফেসরের গা বেয়ে নেমে এসে ছুট লাগাল। তারপর দু’জনে পাশাপাশি হাঁটে লাগল।

     “তোমাদের দুনিয়ায় প্রচুর হৈ-হল্লা।” রেগাস বলল ক্যাপ্টেন কার্সনকে।

     “বাচ্চারা থাকলে হবেই। আপনি আমার সঙ্গে আসুন না, আমাদের স্পেস ট্রাভেলে কতটা প্রগ্রেস হয়েছে একটু দেখবেন চলুন। এই হট্টগোল থেকেও একটু সরে থাকতে পারবেন।”

     তাঁরা দুজন ভেতরে যেতে মাইক আর মলি কেলিকে পাকড়ে কলার পরিয়ে দিল। তারপর ধমকে চুপ করাল। লুরু তার ক্যাটারফ্লাইকে নিজেদের মহাকাশযানে নিয়ে গিয়ে তুলল। তাদের যান ছাড়ার প্রস্তুতি চলেছে। তাই সবাই ব্যস্ত।

     কেলিকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে তার ছানাদের কাছে রাখার সময় মাইক আর মলি দু’জনের মাথাতেই একসাথে একটা বুদ্ধি খেলে গেল।

     মলি মনে মনে বলল, ‘এটা দারুণ হবে। করলে হয়’

     মাইকও নিজের মনে বলল, ‘সবচেয়ে জোরালো যেটা সেটাই বেছে নেব’। বলেই নিজের বোনের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। চোখ উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছে। ‘দেখছিস? আমরা নিজেদের মধ্যে শব্দ ছাড়াই কথা বলছি! তারা আমাদের কিছুটা নো-হাউ অলরেডি শিখিয়ে গেছে’

     মলি তাদের পরিকল্পনা কার্যকরী করতে বেশি উদ্বেল। ‘আমি একটা বাস্কেট আর কিছু খাবার নিয়ে আসি’

     তারা যখন উৎক্ষেপণ ক্ষত্রে ফিরে এল তখন মহাকাশ জাহঅজটি ছাড়ার মুখে। রোবটগুলো ব্যস্ত, বারবার যন্ত্রপাতি পরখ করা চলছে। উপস্থিত সবাই আবাক হয়ে সেই আশ্চর্য দৃশ্য দেখছে।

     শ্রীমতী কার্সনও এসেছেন সঙ্গে। বললেন, “আমার মনে হয় ওরা হার্মফুল নয়। তবে আমার হয়ে কাজ করার আইডিয়াটা ঠিক মনে হচ্ছে না।”

     রেগাস মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রের ভেতর থেকে ক্যাপ্টেন কার্সন ও অধ্যাপক গ্লীমের সঙ্গে বাইরে এসেছে। মন্তব্য করল, “বেশ ভালো। আপনারা তো মহাকাশ গবেষণার সঠিক পথেই এগোচ্ছেন। আমারা যেটা দেখাতে পারি….” বলতে বলতে তার গম্ভীর মুখ হাসিতে ভরে উঠল। তর্জনী ও আর বুড়ো আঙুল দিয়ে বৃত্তাকার মূদ্রায় দারুণ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে কথা শেষ করল, “এই ব্যাগে সেটা আছে।”

     জনতার দিকে হাত তুলে রেগাস ঘোষণা করল, “এবার আমাদের লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে। খুব শিগগিরি হয়তো আমাদের মহাকাশে দেখা হবে।”

     সবাই উৎসাহে হৈ হৈ করে উঠল। মানুষের উচ্চগ্রামের গলা উত্তেজনায় আরো চড়ল। পৃথিবীতে এবার নতুন যুগের সূচনা হতে চলেছে। বহিশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তৈরি রকেটগুলো অদূর ভবিষ্যতে মহাকাশ পাড়ি দিতে কাজে লাগানো হবে।

     ‘প্রথম শিপটায় আমি যাব’। মাইক মনে মনে বলল।

     “অবশ্যই।” লুরু আন্তরিক গলায় জবাব দিল। সে তাদের যানের সিঁড়ি দিয়ে ছুটে নেমে এসেছে। হাতে একটা পুঁটলি যেগুলো চকচকে কাপড় জড়ানো। এই কাপড় দিয়েই নক্ষত্রবাসীদের পোষাক পরিচ্ছদ তৈরি। পুঁটলিটায় তার দুই বাহু উপচে উঠেছে।

     “আমি বিদায় বলব না। আমি জানি আমাদের আবার দেখা হবে, আর তাতে খুব দেরি নেই।” লুরু মাইক আর মলিকে বলল।

     শ্রীমতি কার্সন এগিয়ে গিয়ে লুরুর হাতে একটা মোড়ক ধরিয়ে দিলেন। “ভালো থেকেও লুরু। তোমার পছন্দের কিছু কুকি আমাদের পৃথিবীতে তৈরি।”

     লুরু হাসল। তবে তার হলদেটে চোখে জল চিকচিক করে উঠল। নিজের বোঁচকা সামলে মোড়কটা নিজের পোশাকের খাঁজে রেখে শ্রীমতী কার্সনকে জড়িয়ে ধরে লাজুক ভঙ্গিতে একটা চুমু খেলো। “অনেক ধন্যবাদ। আপনার মতো একজন পৃথিবীর মাকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।”

     ক্যাপ্টেন কার্সনের হাত জড়িয়ে বলল, “আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ স্যর।” তারপর প্রফেসর গ্লীমকে বলল, “ভবিষ্যতে আকাশে নিজস্ব যান নিয়ে ভাসার আগে আপনার কাছে থেকে শিডিউল জেনে নেব।”

     লুরু মলি ও মাইকের হাতে এবার এই পুঁটুলিটা দিয়ে বলল, “আমরা যতক্ষণ না চলে যাচ্ছি ততক্ষণ একে চাপা দিয়ে রেখো। কোরাক জাহাজে গিয়ে নিজের বাচ্চাদের গুনছে। নিশ্চয়ই খেয়াল করবে না একটা কম।”

     মলি বোঁচকায় আলতো আঘাত করে একটা বাচ্চা কিটেনফ্লাইয়ের অস্তিত্ব টের পেল। ছানাটা অল্প অল্প কুঁই-কুঁই শব্দ করছে। এটা ওদের সঙ্গে আনন্দেই থাকবে মলির ধারণা।

     মাইক তার হাতে ধরা ঢাকা দেওয়া টুকরিটা লুরুর দিকে বাড়িয়ে দিল, “তুমিও এটাকে সাবধানে রেখো। কেলিও তার বাসায় ঢুকে এতক্ষণ ছানাদের নাক গুণছে!”

     লুরু তার সূক্ষ্ম আঙুল টুকরিতে ঢুকিয়ে দেখল। ছোট্ট কুকুর ছানা তার আুঁল চেটে দিতেই মুখটা খুশিতে ভরে গেল। বলল, “এই ছানাটাও বড় হয়ে নক্ষত্র-কুকুর হয়ে উঠবে।” তার গলায় বেশ আমুদে ভাব।

     লুরু সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল। রোবটগুলো শেষবারের মতো সব পরখ করে দেখে নিল। শেষবারের মতো বিদায় নেওয়া হাত নাড়ানাড়ির পালা চুকতে প্রকাণহদ মহাকাশযানটার দরজা বন্ধ হল।

     জাহাজটার গা থেকে ঠাণ্ডা সবজে আলোর বিচ্ছুরণ আসতে আস্তে বেগুণি হয়ে গেল। তারপর প্রচণ্ড গর্জন করে সেটা নিমেষে আকাশে উঠে গেল।

     দূর আকাশে একটা ছোট্ট তারা চোখে পড়ল। হয়তো মাইক আর মলিরা তাদের সম্পর্কেও জানবে একদিন।

 

কঃ সঃ মূল গল্প: সাইন অ্যামং দ্য স্টারস্‌, লী প্রিসলি 

2 thoughts on “নক্ষত্রলোকে দস্তখত

  • October 21, 2018 at 1:14 am
    Permalink

    মহাজাগতিক প্রাণীদের সাথে শান্তি চুক্তি কল্পনা যায়। কিন্তু আমরা মানুষ হয়েও যেন নিজেদের মধ্যে তা কল্পনা করতে পারি না। আপসোস আমাদের বিবেক হীনতার জন্য।

    Reply
  • November 11, 2018 at 12:30 pm
    Permalink

    Besh valo laglo.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!