নক্ষত্রের আলো – আইজাক আসিমভ

নক্ষত্রের আলো

মূল লেখক – আইজাক আসিমভ

বাংলা অনুবাদ -‌ সুদীপ্ত চক্রবর্তী

অলংকরণ – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য্য 

থাগুলো একেবারে পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট ভাবেই আর্থার ট্রেন্টের কানে প্রবেশ করল। শব্দগ্রাহক যন্ত্রটির ভেতর থেকে ভারী ও রাগত গলার স্বরটা যেন বুলেটের মতো ছিটকে বেরিয়ে এসে তাকে বিদ্ধ করছিল।

     ‘‌ট্রেন্ট, তোমার পালাবার কোনও পথ নেই। আর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই তোমার যাত্রাপথ আমরা অবরুদ্ধ করতে পারব। তুমি যদি বাধা দেওয়ার ন্যূনতম চেষ্টাও করো, তাহলে তোমাকে মহাশূন্য থেকে চিরকালের জন্য নিশ্চিহ্ন করে দেব।’‌

     ট্রেন্ট কোনও উত্তর দিল না। ঠোঁটের কোনে একটা মিচকে হাসি ঝুলিয়ে সে বসেই রইল। তার কাছে কোনও অস্ত্র-‌শস্ত্র নেই, লড়াই করার কোনও প্রয়োজনও নেই। ওদের সময়সীমা দু’‌ঘণ্টা শেষ হওয়ার অনেক আগেই তার মহাকাশযান অতিমহাশূন্যে লাফ দিয়ে এমন এক জায়গায় চলে যেতে সক্ষম হবে যেখানে ওরা আর তার টিকিও কোনওদিন স্পর্শ করতে পারবে না। এই মুহূর্তে ট্রেন্টের কাছে যে এক কিলোগ্রাম মতো ক্রিলিয়াম আছে তা দিয়ে কয়েক সহস্র রোবটের মস্তিষ্ক তৈরির কাজ অনায়াসেই শেষ করা সম্ভব। তাছাড়া এই মহাশূন্যে যে কোনও গ্রহে এই এক কেজি ক্রিলিয়ামের জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকা পাওয়া যাবে, কোনও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে না, কোনও জবাবদিহিও করতে হবে না।

     ব্রেইনমেয়ার বুড়োটার মাথাতেই খেলেছিল এই পরিকল্পনাটা। তবে বাস্তবে রূপ দিতে ওকে খাটতে হয়েছে তিরিশটা বছর। সত্যিই এটা তার সারাজীবনের খাটনির ফসল।

     ‘‌দেখো বাপু, এই কাজটা একবার করলে কিন্তু আর এখানে ফেরা যাবে না। আর সেই কারণেই তোমাকে আমার দরকার। কোনও মহাকাশযান নিয়ে মহাকাশে পাড়ি জমানোর ক্ষমতা আমার নেই। সেটা তোমার আছে।’‌

     ট্রেন্ট মাথা নাড়িয়ে আপত্তি জানিয়ে বলে, ‘‌মহাকাশে পাড়ি জমানোটা কোনও কাজের কাজ নয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা ধরা পড়ে যাব, মিঃ ব্রেইনমেয়ার।’‌

     ‘‌আমরা যদি ঠিকঠাক লাফটা দিতে পারি তাহলে ওরা কখনওই আমাদের নাগাল পাবে না। আর একবার যদি আমরা অতিমহাশূন্যে চলে যেতে পারি তাহলে চোখের পলকে কয়েক মুহূর্তে আমরা বহু আলোকবর্ষ দূরে চলে যেতে সক্ষম হব।’‌

     ‘‌আমাদের ওই লম্ফনের ব্যাপারটা ধরতে পুলিশের একবেলা মতো সময় লাগবে। আর তারপরেই মহাবিশ্বের সমস্ত উপনিবেশে মুহূর্তের মধ্যে খবর পাঠিয়ে দেবে।’

     ‌‘‌না, তুমি যেরকম বলছ, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়।’‌ ব্রেইনমেয়ার উত্তেজিত হয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ট্রেন্টের হাত ধরে। ‘‌সব উপনিবেশে খবরাখবর এরা পাঠাবে না। কাছাকাছি যে উপনিবেশগুলো আছে শুধু সেখানেই খবর পাঠাবে। এই সৌরমণ্ডলের ব্যাপ্তি বিশাল। গত পঞ্চাশ হাজার বছর ধরে যে সমস্ত উপনিবেশ তৈরি হয়েছে এই বিশালতার কারণেই একের সঙ্গে অপরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।’‌

     বৃদ্ধ ব্রেইনমেয়ার আবেগ জড়ানো কণ্ঠে বলে চলে, ‘‌সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ তার আদিমতম গ্রহকে পৃথিবী নাম দিয়েছিল। এই সৌরমণ্ডল সেই পৃথিবীর মতো নয়। কাতারে কাতারে মানুষ বর্তমানে সেই তৈরি করা উপনিবেশগুলিতে বসতি গড়ে তুলেছে। কিন্তু সব উপনিবেশের মানুষই শুধুমাত্র তার কাছের উপনিবেশগুলির সঙ্গেই সংযোগ রক্ষা করে চলেছে।’

     ব্রেইনমেয়ার আরও বলে, ‘‌আমরা যদি এই সমস্ত ঝামেলাকে পাশ কাটিয়ে মহাশূন্যে একবার লম্ফন দিতে সক্ষম হই তাহলে হয়তো পঞ্চাশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের কোনও গ্রহে চলে যেতে পারি। আর তখন আমাদের খুঁজে বের করা উল্কাবৃষ্টির মাঝ থেকে কোনও বিশেষ পাথরের টুকরোকে খুঁজে বের করার সমান হয়ে দাঁড়াবে।’‌

     ট্রেন্ট এই কথাতেও আশ্বস্ত হয় না। বলে, ‘‌আমরাও তাহলে হারিয়ে যাব। মানুষের তৈরি উপনিবেশ আছে এমন কোথাও, কোনও গ্রহে পৌঁছানোরও কোনও সম্ভাবনা থাকবে না।’

‌     ব্রেইনমেয়ার চারদিকে একবার ভাল করে দেখে নিল। যদিও চারপাশে কেউ কোথাও ছিল না, তবুও গলার স্বর অনেকটা খাদে নামিয়ে বলল, ‘‌এই সৌরমণ্ডলে উপনিবেশ রয়েছে এমন প্রতিটি গ্রহের খুঁটিনাটি ও যাবতীয় তথ্য-‌পরিসংখ্যান আমার নখদর্পনে। এর জন্য আমি তিরিশটা বছর সময় দিয়েছি। সব কাগজপত্র-‌ফাইল দেখেছি। কয়েক হাজার আলোকবর্ষ মহাশূন্যে চষে বেড়িয়েছি। হয়তো যে কোনও মহাকাশযান চালকের থেকেও বেশি। এই সফরের ফলাফল, প্রতিটি গ্রহের অবস্থানের সঠিক তথ্য দুনিয়ার সবথেকে উন্নত কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে সংরক্ষণ করেছি।’‌

     এইবার ট্রেন্ট মাথা তুলে বৃদ্ধ ব্রেইনমেয়ারকে লক্ষ্য করে।

     ব্রেইনমেয়ার সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ না করে বলে চলে, ‘‌আমি কম্পিউটার তৈরির নক্সা করি। আমার তৈরি কম্পিউটার অতুলনীয়, সবার সেরা। আমি এই মহাবিশ্বের সমস্ত উজ্জ্বল নক্ষত্রের একদম সঠিক অবস্থান নির্ণয় ও চিহ্নিত করেছি। আর সেই সবকিছুই কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে ভরে রাখা আছে। আমরা যদি একবার মহাশূন্যে লাফ দিতে পারি তাহলে ওই কম্পিউটার গোটা মহাকাশকে বর্ণালী বীক্ষণের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করবে আর কম্পিউটারে ভরে রাখা তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। যখন কম্পিউটারে সংরক্ষিত মানচিত্র ও মহাকাশে দৃশ্যমান উজ্জ্বল নক্ষত্রের অবস্থানগত মিল খুঁজে পাবে তখনই আমাদের সঠিক গন্তব্য-‌গ্রহ নির্দিষ্ট করতে হবে। একবার সেই কাজটি করতে পারলেই কম্পিউটার দ্বিতীয়বার লাফ দেবার জন্য আমাদের নির্দেশ দেবে। আর আমরা যদি সেই অনুযায়ী কাজ করি তাহলে মনুষ্যবসতি আছে এমন কোনও গ্রহের কাছাকাছি পৌঁছে যাব।’‌

     ‘‌বড়ই জটিল ও গোলমেলে বিষয়।’‌

     বৃদ্ধ একটু থেমে বলে, ‘‌কিন্তু এ হিসেবে কখনওই ভুল হবে না, হতে পারে না। আমার তিরিশটা বছরের সাধনা, পরিশ্রম কখনওই বিফলে যেতে পারে না। এতে সফল হলে, কোটিপতি হয়ে খুব বেশি হলে বছর দশেক জীবনটাকে উপভোগ করতে পারব আমি। কিন্তু তুমি বয়সে আমার থেকে অনেক ছোট। তুমি দীর্ঘদিন এর ফলভোগ করতে পারবে।’

     ‌‘‌আচ্ছা, প্রথম যে লাফটা মহাশূন্যে আমরা দেব তা তো কোনও বিচারবিবেচনা ছাড়াই। আর সেই লম্ফনের ফলে আমরা যদি কোনও নক্ষত্রের মধ্যে গিয়ে ঢুকি, তাহলে তো দফারফা।’

     ‌‘‌ট্রেন্ট, তার সম্ভাবনা কয়েক কোটির মধ্যে একভাগও নয়। ফলে সেই সম্ভাবনা নেই বলাটাই ভাল।’

     ‌‘‌আচ্ছা, অন্যরকমও তো হতে পারে। আমরা লম্ফনের ফলে উজ্জ্বল নক্ষত্র থেকে এত দূরে পৌঁছাতে পারি যেখানের সঙ্গে ওই কম্পিউটারে সংরক্ষিত মানচিত্রের কোনও মিল নেই। অথবা আমাদের লম্ফনটা এমন হল যে আমরা এক বা দুই আলোকবর্ষ দূরে গিয়েই থেমে গেলাম আর পুলিশ তো আমাদের তখনও পিছু ছাড়েনি।’

     ‌‘‌এইসব সম্ভাবনা নেই বললেই চলে সেকথা আগেও বলেছি। তবে যদি একান্তই দুশ্চিন্তা করতে চাও তাহলে এমনও ভাবতে পারো যে মহাকাশযান নিয়ে রওনা হওয়ার মুহূর্তে তুমি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হলে। এবং এইটা হওয়ার সম্ভাবনা আগের ঘটনাগুলোর থেকে অনেক বেশি।’‌

     ‘‌মিঃ ব্রেইনমেয়ার, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আমার থেকে বয়সজনিত কারণে আপনারই বেশি।’‌

     বৃদ্ধ ব্রেইনমেয়ার মাথা নাড়লেন, ‘‌ওসব নিয়ে মাথা আমি ঘামাতে চাই না। আমার কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সবকিছু একের পর এক করে যাবে।’‌‌

     ট্রেন্ট সেইদিন ব্রেইনমেয়ারের কথার কোনও উত্তর দেয়নি। যখন বুড়ো ব্রেইনমেয়ার একটা ব্রিফকেসে ক্রিলিয়াম নিয়ে হাজির হল তখন পরিকল্পনামাফিক মহাকাশযান নিয়ে ট্রেন্টও ওড়বার জন্য তৈরি। আসলে ট্রেন্টকে ব্রেইনমেয়ার খুবই বিশ্বাস করত, তাই পরবর্তী কাজগুলো তাড়াতাড়ি শেষ করতে ট্রেন্টকে কোনও অসুবিধায় পড়তে হয়নি। একহাত বাড়িয়ে ব্রিফকেসটা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অপর হাতটা অস্বাভাবিক দ্রুততায় এগিয়ে গেল ব্রেইনমেয়ারের দিকে। মারণাস্ত্র হিসেবে ছুরির কোনও তুলনাই নেই। ঠিকমতো চালাতে জানলে মুহূর্তে মৃত্যু আর কোনও শব্দও নেই। ছুরিটা ব্রেইনমেয়ারের দেহ থেকে আর তুলে নিল না ট্রেন্ট। ছুরির বাটে থেকে গেল আঙুলের ছাপ। সেসব নিয়ে অবশ্য ট্রেন্ট একেবারেই চিন্তিত নয়, কারণ কিছু সময়ের মধ্যেই সে চলে যাবে সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

     এই মুহূর্তে সে মহাকাশযান নিয়ে মহাকাশের অনন্ত গভীরে প্রবেশ করেছে। যদিও পেছনে তাড়া করে আসছে মহাকাশ-‌প্রহরী পুলিশের দল। তারাই বারবার ট্রেন্টকে সতর্ক করছিল। এইবার তাকে এই মহাবিশ্ব থেকে চিরতরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য লম্ফনটা দিতে হবে। ট্রেন্ট বুঝতে পারল, ভেতরে ভেতরে তার একটা উত্তেজনা হচ্ছে। অবশ্য প্রত্যেকটি লাফের সঙ্গেই এই উত্তেজনার আনুভূতিটা জড়িয়ে থাকে। কোনও চিকিৎসক বিষয়টি ধরতে হয়তো পারবেন না, কিন্তু প্রতিটি মহাকাশযান চালকেরই এই অনুভূতির অভিজ্ঞতা হয়।

     ঠিক লম্ফনের মুহূর্তেই মহাকাশযান ও তার চালক ট্রেন্টের কাছে সবকিছুর অস্তিত্ব লোপ পেল। এক মহাকাশ থেকে অপর মহাকাশে লম্ফনের সময়কালীন শূন্যতা, ভারহীনতা, সময়হীনতার মধ্যে পদার্থ, শক্তি সব অস্তিত্বহীন হয়ে গেল। আবার পরমুহূর্তে তা সব ফিরেও এল। ট্রেন্টও যেন নিজের অস্তিত্ব আবার অনুভব করতে পারল। এতক্ষণে সে মহাবিশ্বের অন্য কোনও প্রান্তে পৌঁছে গেছে।

     ট্রেন্ট নিজের মনেই একবার হাসল। যাক, তাহলে সে এখনও বেঁচে আছে। লাফটা একটু বেশি জোরেই হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এই মহাকাশে নক্ষত্রগুলো খুব কাছাকাছি নয়। আগের মহাকাশ নক্ষত্রে একদম ভর্তি ছিল। এই মহাকাশের বেশ কিছু নক্ষত্র ‘‌এফ’‌ শ্রেণিভূক্ত বা তার চেয়েও হয়তো উন্নত। কম্পিউটার নিশ্চয়ই তার সংরক্ষিত তথ্যের ভাণ্ডারের সঙ্গে এই মহাকাশের মিল খুঁজে পেয়ে যাবে। বেশি সময় লাগবার কথা নয়।

     কিন্তু হায়!‌ মিলল না, মিল খুঁজে পেল না। মিনিট গেল, ঘণ্টাও চলে গেল। কম্পিউটারের মনিটরে বিভিন্ন রকমের আলো জ্বলতেই থাকল। মহাকাশের কোনও মানচিত্র বা নকশা ভেসে উঠল না।

     ট্রেন্ট একবার মাথা চুলকাল। কিন্তু মনিটরে মানচিত্র ফুটে উঠছে না কেন?‌ এই মহাকাশের সঙ্গে সাযুজ্য থাকা মানচিত্র কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে থাকতেই হবে। ব্রেইনমেয়ার তাকে তার তিরিশ বছরের সাধনা ও পরিশ্রমের ফল দেখিয়েছে। সে কখনওই নক্ষত্রের অবস্থান চিহ্নিত করায় কোনও ভুল করতে পারে না।

     তবে হঠাৎই ট্রেন্টের মনে হল যে, কিছু নক্ষত্র প্রতিনিয়ত জন্ম নেয় আবার কিছু নক্ষত্র মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আবার এটাও ঠিক যে কিছু নক্ষত্র স্থানও পরিবর্তন করে। কিন্তু এইসব মহাজাগতিক ঘটনা অত্যন্ত ধীর লয়ে ঘটে, লক্ষ লক্ষ বছরও লেগে যায়। তাই ব্রেইনমেয়ারের তৈরি মহাকাশ মানচিত্র লক্ষ বছরের আগে পরিবর্তিত হতে পারে না।

     কিন্তু একটা কথা মনে হতেই ট্রেন্ট আতঙ্কে, ভয়ে শিউরে উঠল। না!‌ না!‌ এ কিছুতেই হতে পারে না। অসম্ভব। লম্ফনের ফলে একটা নক্ষত্রের ভিতরে গিয়ে পড়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে একবার ব্রেইনমেয়ার বলেছিল বটে। বর্তমানে যে আশঙ্কা ট্রেন্ট করছে সেটা ঘটবার সম্ভাবনা তো আরও কম।

     এদিকে মহাকাশযান অনবরত চড়কিপাক কাটছে অসীম মহাশূন্যের বুকে। কখন আবার ওই উজ্জ্বল নক্ষত্রটা দেখা যায় সেই আশায় ট্রেন্ট অপেক্ষা করতে লাগল। যে মুহূর্তে দেখা গেল, তখনই কাঁপা কাঁপা হাতে সে মহাকাশযানের টেলিস্কোপটা সেই নক্ষত্রের দিকে ফোকাস করল। যতটা সম্ভব বাড়িয়ে দিল টেলিস্কোপটার ক্ষমতা। সে দেখতে পেল উজ্জ্বল নক্ষত্রটির চারপাশে ফুটন্ত গ্যাসীয় পদার্থ থেকে নির্গত বাষ্পীয় আবরণ।

     এবারে ট্রেন্ট বুঝতে পারল আসলে ওটা একটা নোভা। একটি ক্ষুদ্র অদৃশ্যপ্রায় নক্ষত্র থেকে এটি উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হয়েছে। আর গত মাস ছয়েকের মধ্যেই এই মহাজাগতিক ‌ঘটনাটা ঘটেছে। এটা অত্যন্ত নীচুশ্রেণির নক্ষত্র বলেই কম্পিউটারের হিসেবের মধ্যে আসেনি। যখন ব্রেইনমেয়ার মহাকাশের তথ্য, নক্ষত্রের অবস্থান ইত্যাদি পরিসংখ্যান সংগ্রহ করেছে তখন নিশ্চয়ই ওটা ওখানে ছিল না বা যদি থেকেও থাকে তবে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে ছিল না। তাই এই তথ্য, এই নক্ষত্রের অবস্থান কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে থাকা মানচিত্রে ঠাঁই পায়নি। আর এখন কম্পিউটার তাই হন্যে হয়ে এই নক্ষত্রের আশেপাশের সঙ্গে মিল খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

     ‘‌এই নক্ষত্রটাকে নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। এটাকে ছেড়ে অন্য কোথাও চলো .‌.‌.‌’‌ ট্রেন্ট নিজেই চিৎকার করে বলে ওঠে। তার ওই চিৎকার মহাকাশযানের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে সংরক্ষিত নির্দেশানুযায়ী কোনও উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখা গেলেই কম্পিউটার তার নিজস্ব সংরক্ষিত মানচিত্রের সঙ্গে সেই নক্ষত্রের অবস্থান মিলিয়ে দেখবে। মিলে গেলেই প্রয়োজনীয় নির্দেশ ও সঙ্কেত দেবে। কিন্তু যতক্ষণ না মিলবে কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়েই যাবে। কিছুতেই সে থামবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত মিল খুঁজে পায় বা কম্পিউটার চালু রাখার শক্তি নিঃশেষিত হচ্ছে। কিন্তু তার অনেক আগেই মহাকাশযানের অক্সিজেন ফুরিয়ে গিয়ে তা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। আর তার সঙ্গেই ট্রেন্টের হৃদ্‌স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবে।

     অসহায়ভাবে ট্রেন্ট মহাকাশযানের চালকের আসনে এলিয়ে পড়ল। কম্পিউটারের পর্দায় ফুটে উঠছে বিভিন্ন রকমের আলোর অর্থহীন মানচিত্র। ট্রেন্ট অনিবার্য মৃত্যুর ভয়াবহ যন্ত্রণার মুহূর্ত গুনতে লাগল।

     শুধু একবার তার মনে হল, বুড়ো ব্রেইনমেয়ারের মৃতদেহ থেকে ছুরিটা তুলে সঙ্গে নিয়ে এলেই ভাল হত। তাহলে এই যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর প্রতীক্ষা থেকে নিজেই নিজেকে মুক্তি দিতে পারত।

গল্প পরিচিতিঃ আইজাক আসিমভ লিখিত ‘‌Star Light’‌ ‌গল্প থেকে অনুবাদ করা হয়েছে। ১৯৬২ সালের অক্টোবর মাসে ‘‌Scientific American’‌‌-‌এ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৬৮ সালে ‘‌Asimov’s Mysteries’‌ সংকলনে গল্পটি ঠাঁই পায়। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!