নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে – আনাতলি দ্‌নেপ্রভ

মার মৃত্যুর পরে আমাকে মর্গ থেকে কিনে সোজা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল উডরপের বাড়িতে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও ব্যাপারটা নেহাতই সাদামাটা। যেমন সাদামাটা আমার ঘটনাচক্রে মর্গে পৌঁছনোটা। নিউ ইয়র্কের একটা হোটেলের বাথরুমে আমি আমার হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করেছিলাম। হোটেলের ভাড়া বাকি না থাকলে বোধ হয় অত তাড়াতাড়ি আমার খোঁজ পড়ত না আর আমার লাশটাও অত শিগগিরি পাওয়া যেত না। কিন্তু আমার দেনার পরিমাণ নেহাত কম ছিল না আর কিছুটা সেই কারণেও আমি ইহজগত ছেড়ে অন্য এক জগতে পালিয়ে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম। তবে আমি সব চেয়ে আগ্রহী ছিলাম আমার বাপ-মা-এর মুখোমুখি হয়ে তাদের ও তাদের মত সভ্য সমাজের অহেতুক ভার বাড়ানো অদূরদর্শী প্রজনণকারীদের সম্পর্কে আমার মনের কথা ব্যক্ত করতে।

     পরে জানতে পেরেছি যে উডরপের আমাকে কিনতে আঠারো ডলার ও ন-সেন্ট খরচ হয়েছিল। এর মধ্যে তিন ডলার ও ন-সেন্ট লেগেছিল আমাকে যে কম্বলটায় জড়িয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল সেটা কিনতে। তাই সেটা বাদ দিয়ে আমার দাম ছিল পনেরো ডলার। সেটাই ছিল বিভিন্ন ডাক্তারি গবেষনার জন্য কেনা বেওয়ারিশ লাশের বাজারদর। কাজেই সবকিছু আইন-কানুন মেনেই হয়েছিল। কিন্তু এই সংক্রান্ত আইনে একটা ফাঁক আছে বলে আমার মনে হয়। মনে হয় মর্গের বেওয়ারিশ মড়া বিক্রি করবার আগে সেটা যথেষ্ট সময় রেফ্রিজারেটরে রেখে ভালোমত ঠাণ্ডা করে তবেই ক্রেতার হাতে ছাড়া উচিত।

     উডরপ আমাকে নিয়ে মর্গ থেকে নিজের গ্রীন ভ্যালির কটেজ অবধি কি প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালিয়েছিল তা আমি বেশ আন্দাজ করতে পারি! তাড়াহুড়ো না করলে যে তার সব খরচ জলেই যেত। আমার পরিবর্তে একটা পুরোনো কম্বল আর একটা বেওয়ারিশ লাশের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দায়িত্ব ছাড়া আর কিছুই তার প্রাপ্তির ভাঁড়ারে জমা পড়ত না।

     আমাকে পুনরুজ্জীবিত করার সময়েও সমস্ত প্রক্রিয়া নিয়মমাফিক করা হয়েছিল। আমাকে ওরা প্রথমে তিন লিটার রক্ত ও একটা এড্রিনালিন ইঞ্জেকশন দিয়েছিল; তার পরে আমার শরীরে ঢোকানো হয় গ্লুকোজ ও কড লিভার তেল, আর আমাকে মুড়ে দেওয়া হয় রাশি রাশি বৈদ্যুতিক ও তাপ পরিবাহী তারের জটলায়। কিছুক্ষণ এই প্রক্রিয়া চলার পরে উডরপ যখন আমার শরীরে বিদ্যুৎ সঞ্চালন বন্ধ করে ততক্ষনে আমি কোন যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই নিঃশ্বাস নিচ্ছি আর আমার হৃদপিণ্ডও যেন কিছুই হয় নি এমন ভঙ্গিতে আবার সচল হয়ে উঠেছে।

     চোখ মেলে প্রথমেই উডরপ আর একজন তরুনীকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম।

     “কেমন বোধ করছ?” একটা সাদা রঙের কোট পড়া সখের কসাই সদৃশ উডরপ জিজ্ঞাসা করল।

     “খুব ভালো, স্যার। ধন্যবাদ, স্যার”।

     “আমি কোন স্যার নই। আমি উডরপ, হ্যারি উডরপ, ডক্টর অফ মেডিসিন অ্যান্ড সোশিওলজি, রেডিও-ইলেক্ট্রনিক্স ইন্সটিটিউটের সম্মানিক সদস্য,” ঘরঘরে গলায় বলে উঠল হ্যারি। “তোমার নিশ্চই খিদে পেয়েছে?”

     আমি মাথা নাড়লাম।

     “ওকে এক পাত্র স্যুপ এনে দাও”।

     উডরফের পাশে চেয়ারে বসে থাকা তরুনী আজ্ঞা পালন করতে চলে গেল। হ্যারি ইডরফ আমার কোনরকম অনুমতির তোয়াক্কা না করে আমার জামা তুলে একটা কোন তরল পদার্থ ইঞ্জেকশন দিয়ে আমার শরীরে প্রবেশ করিয়ে দিল।

     “এইবার তোমাকে পূর্ণ জীবিত বলা চলে”।

     “হ্যাঁ স্যার”।

     “হ্যারি উডরপ”।

     “হ্যাঁ স্যার, হ্যারি উডরপ”।

     “আশা করি তোমার বোধ-বুদ্ধি খুব একটা উন্নত নয়”।

     “আমারো সেরকমই মনে হয়”।

     “তোমার লেখাপড়া কদ্দূর?”

     “প্রাই নিছুই নয় বলা যায়। কোন এককালে একটা ইউনিভার্সিটির স্নাতক ডিগ্রী পেয়েছিলাম বটে। তবে সেটা সেরকম কিছু নয়”।

     আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম যে উচ্চশিক্ষিত কোন লোকের এই মুহূর্তে হ্যারির খুব একটা প্রয়োজন নেই।

     “হুম। তা সেখানে ঠিক কি কি শিখেছিলে?”

     আমার মনে হল যে আমার বিদ্যেবুদ্ধি জাহির না করাটাই সেই পরিস্থিতিতে উচিত পন্থা হবে। তাই বললাম –

     “গল্‌ফ, নাচগান, মৎস্য-শিকার আর মহিলাদের পশ্চাৎধাবন”।

     “বেশ। তবে সুজান-এর ওপর তোমার বিদ্যে প্রয়োগ করতে যেও না যেন”।

     “কে সে?”

     “যে মেয়েটি তোমার সাপার আনতে গেল”।

     “এখন কি রাত্রি?”

     “না আসলে এখন গত পরশুর সকাল। আর তুমি একটু বেশিই প্রশ্ন করে থাকো”।

     আমি বুঝলাম যে ডক্টর অফ মেডিসিন অ্য়ান্ড সোশিওলজি, রেডিও-ইলেক্ট্রনিক্স ইন্সটিটিউটের সম্মানিক সদস্য, হ্যারি উডরপ কে বেশি প্রশ্ন করা আমার মত একটা প্রাক্তন মৃতদেহর একদম উচিৎ নয়।

(২)

     “তুমি এল-ডোরাডো প্রজেক্টের অংশ হতে চলেছ। কি নাম তোমার?”

     “হ্যারি”।

     “সমস্যার কথা। বস এখানে অন্য কোন হ্যারির উপস্থিতি মোটেও পছন্দ করে না। তোমার ভুল হচ্ছে না ত? মৃত্যুর পরে এরকম হয়ে থাকে”।

     “কিন্তু এল-ডোরাডো কি?”

     “সে এক আনন্দ, সম্বৃদ্ধি ও সামাজিক ভারসাম্যে পূর্ণ জগত। সেখানে না আছে কোন কমিউনিস্ট না আছে বেকারত্ব”।

     “তুমি একদম টিভির ঘোষিকাদের মত করে কথা বল”।

     “এল-ডোরাডোতে তোমার ভূমিকা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”।

     “তাই নাকি? তা কি সেই ভূমিকা?”

     “তুমি হবে শ্রমজীবী”।

     “সেটা কে?”

     “ -‘কে’ নয়, বল ‘কি’। শ্রমজীবী অর্থাৎ প্রোল্যাতেরিয়েত”।

     আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ ব্যাপারটা হজম করবার চেষ্টা করলাম, তার পড়ে বললাম

     “তুমি একেবারে নিশ্চিত যে আমাকে মৃত অবস্থা থেকে আবার বাঁচিয়ে তোলা হয়েছে?”

     “একেবারে নিশ্চিত”।

     “আর এল-ডোরাডো তে তোমার ভূমিকা কি?”

     “আমি হব শিল্পপতি-সঙ্ঘ”।

     সুজান চলে গেল, আর তার কছুক্ষণ পড়েই হ্যারি উডরপ এসে উপস্থিত হল।

     “এবার থেকে আমরা আর তোমাকে খাওয়াবো না”।

     “চমৎকার! আপনি কি এখন অনাহারে মৃত্যুর প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করবেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

     “এই ঠাট্টাটা মোটেই ভালো নয়”।

     “তাতে কি? আমি কি খাবো তাহলে?”

     “তোমাকে কাজে যেতে হবে”।

     “আমাকে যে কম্বলটা করে নিয়ে এসেছিলেন সেটা আশা করি ফেলে দেন নি; যদি আমাকে আবার মর্গে নিয়ে যেতে হয়…”।

     “চিন্তা করো না। আমার বানানো উন্নত ও সুবিন্যস্ত সামাজিক ব্যবস্থায় তোমার কাজ পেতে কোন অসুবিধে হবে না”।

     “কিন্তু আমাকে চাকরীর খোঁজে অনেক ঘোরাঘুরি ত করতে হবে। সেটা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না”।

     “তোমাকে কোথাও যেতে হবে না”।

     “তাহলে কিভাবে…”।

     “তোমাকে শুধু বসে বসে একটা বোতাম টিপতে হবে। চাকরীর জন্য নির্বাচিত হলেই তুমি মাইনে পাবে। আর মাইনে পেলেই তুমি তা দিয়ে খাবারও কিনতে পারবে”।

     “তাহলে আমাকে এখুনি সেই বোতামের কাছে নিয়ে চলুন”।

     “তোমার মানসিক অবস্থা এখনো স্থিতিশীল নয়। তুমি যথেষ্ট উদ্যম নিয়ে ওই বোতাম টিপতে এখনো প্রস্তুত নও”।

     “আপনি যতটা উদ্যম চান আমি ঠিক ততটাই উদ্যম নিয়ে বোতাম টিপব!”

     “না। সত্যি কথা বলতে কি যথেষ্ট পরিমাণ উদ্যমী হতে হলে তোমাকে আরো দু-এক ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে হবে”।

     “আমি আপনার নামে অভিযোগ জানাবো”।

     “সেটা তুমি করতে পারবে না, কারণ তোমার কোন অস্তিত্বই নেই”।

     “কিভাবে?”

     “তোমার অনেকদিন আগেই মৃত্যু হয়েছে”।

(৩)

     একটা বিশালকার হলঘরের তিনটে কোনায় তিনটে বিশালকায় যন্ত্র; এই হল এল-ডোরাডো। তিনটে যন্ত্রই পরস্পরের সঙ্গে একরাশ তার দিয়ে সংযুক্ত। একটা যন্ত্র একটা কাঁচের আবরণ দিয়ে আলাদা করে রাখা হয়েছে। হ্যারি উডরপ হলের মাঝখানে একটা নিয়ন্ত্রণ প্যানেলে বসে আছেন। উডরপ এর কথা শোনা যাচ্ছে লাউড স্পিকারে:

     “এযাবত কিছু স্কিজোফ্রেনিক, অধ্যাপক আর রাজনীতিজ্ঞ আমাদের সমাজের উন্নতি এর নামে কিছু অর্থহীন অপদার্থ কমিটি, সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অর্থনৈতিক চক্র ও সামাজিক সমস্যার সমাধানের মন্ত্রীসভা গঠন করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে নি। যেখানে মাত্র চারশ-দুই ট্রায়োড, এক হাজার চারশ একানব্বইটা রেসিস্টর আর চারশ একানব্বইটা ট্র‍্যান্সিস্টর ব্যবহার করেই এইসব সমস্যার সমাধান হতে পারে। এই দেখো, এই হল আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থার ছবি।“

     হ্যারি উডরপ আমার আর সুজান-এর সামনে এসে একটা বড় কাগজ মেলে ধরল।

     “এই ডানদিকে এটা হল ‘উৎপাদন প্রকোষ্ঠ’; আর বাঁদিকে এটা হল ‘ব্যবহার প্রকোষ্ঠ’। এর মাঝে রয়েছে নেগেটিভ ও পসিটিভ ফিডব্যাক। এবারে ট্রায়োড টিউবগুলোর নানারকম বিন্যাস-অবিন্যাস ও আমাদের এই ‘সমাজের’ বিভিন্ন অংশকে সেই সমন্বয়ে সাজিয়ে অতিউৎপাদন বা বৈদ্যুতিক তরঙ্গের বিস্তারের অস্থিরতাকে এড়িয়ে চলতে হবে। এটা করতে পারলেই আমাদের সব সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়ে যাবে। “

     কথা বলতে বলতে হ্যারি উডরপ যথেচ্ছভাবে হাত ছুঁড়ছিল আর মাথা ঝঁকাচ্ছিল। মনে হল এটা ওঁর একটা বদভ্যাস।

     “কিন্তু আমি এইসব কিছুর থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় করতে চলেছি।“ বলে চলল হ্যারি।

     “আমি এতে মানবিক চিন্তাধারা আর কার্যকলাপ সংযোজন করতে চাই। কিন্তু এই সিস্টেমে কোন সীমিত বুদ্ধি রোবট সংযোজন করা একাধারে খরচসাপেক্ষ ও নিরর্থক। আর সেইজন্যই আমার তোমাকে প্রয়োজন—” দেখলাম হ্যারির ডানহাতের তর্জনী সটান আমার দিকে নির্দেশ করছে। “আর তোমাকেও,” এবার  তার  আঙুল সুজানের  দিকে।

     সে নিজের সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। নিজের হাত দুটো কোমরের পেছনে সঙ্গবদ্ধ করে নিয়ন্ত্রণ প্যানেল ঘিরে পায়চারি করতে শুরু করল।

     “এখানে —” তার মুষ্ঠিবদ্ধ ডানহাতটা দিয়ে হঠাৎ কন্ট্রোল প্যানেলের ঢাকনার ওপরে একটা দৃঢ় আঘাত করে হ্যারি বলে উঠল “আমাদের ‘সমাজের’ মস্তিষ্ক-  অর্থাৎ  ‘সরকার’। এই ওপরের  নিয়ন  লাইটটা  রাষ্ট্রপতি;  মানে  এর কাজ হল সবরকম  টেনশন সামাল দেওয়া। সুতরাং!”

     আমরা  তন্ময়  হয়ে   ‘রাষ্ট্রপতি’ কে দেখে চলেছিলাম। ওটা কিরকম একটা স্নিগ্ধ রক্তিম আলো ছড়িয়ে চলেছে- এমন সময়ে উডরপের গলার স্বরে আবার সম্বিত ফিরে পেলাম।

     “এবার নিজের নিজের কাজে লেগে পড় তোমরা! তুমি – ‘উৎপাদনে’ যাও! আর তুমি ‘ব্যবহারে’ যাও”।

     “একটা নিখাদ ইলেক্ট্রনিক মডেলিং উন্মাদ!” মনে মনে বলে উঠলাম আমি। “ইউনিভার্সিটি তে অধ্যাপকেরা একবার বলেছিল বটে যে রেডিও ইলেক্ট্রনিক মডেলিং ব্যবহার করে যা খুশী মডেল বানানো সম্ভব। কচ্ছপ, লেদ যন্ত্র, গ্রহান্তরের মহাকাশ-যান, এমন কি একটা জলজ্যান্ত মানুষের মডেল-ও। হ্যারি উডরপ এখানে আমাদের রাষ্ট্রের একটা ইলেক্ট্রনিক মডেল বানিয়ে ফেলেছে। আর শুধু বানিয়েই থেমে যায় নি; এবারে সে এটাকে একদম নিখুঁত ও সুসমন্বিত করে তুলতে চেষ্টা করে চলেছে। দেখা যাক এই কাজে সে কতটা সাফল্য অর্জন করতে পারে”।

     আমি ডানদিকের মেশিনে গিয়ে বসলাম। সুজান বাঁদিকে কাঁচের আবরণে আচ্ছাদিত ‘ব্যবহার-প্রকোষ্ঠ’র ভেতরে অদৃশ্য হল।

     “এবারে কি করব?” আমি প্রশ্ন করলাম উডরপ কে।

     “তুমি নিজের জীবনে যা করতে। কাজ।”

     “খুব ভালো উপদেশ। কিন্তু আমার পেটে এখন বাঘের খিদে”।

     “প্রথমে তোমাকে উৎপাদন প্রকোষ্ঠে কাজ জোগাড় করতে হবে”।

     “কিভাবে?”

     “তোমার ডানদিকে যে সাদা রঙের বোতামটা আছে সেটায় চাপ দাও”।

     “আর ও কি করবে?” আমি সুজানের দিকে দেখিয়ে প্রশ্ন করলাম হ্যারিকে।

     “ব্যবসায়ীরা যা করে থাকে”।

(৪)

     আমি নিশ্চল হয়ে একটা ধাতবিক বাক্সের সামনে বসে ছিলাম। ওটার সামনের দরজায় নানারকম যন্ত্রাংশ ঝকঝক করছিল; বিভিন্ন রঙের অজস্র বোতাম ও বিভিন্ন আকারের হাতল ওটা থেকে চতুর্দিকে বেরিয়ে এসেছিল। এই যন্ত্রেই হ্যারি আমাদের সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো মডেল করেছে। পার্থিব সব বস্তু এই যন্ত্রে বৈদ্যুতিক শক্তিরূপে সৃষ্ট হয়ে ‘উৎপাদন’ ও ‘ব্যবহার’ প্রকোষ্ঠে পাঠাবার ব্যবস্থা রয়েছে।

     আমি সাদা রঙের বোতামটায় চাপ দিলাম।

     “তোমার পেশা?” যন্ত্রের থেকে গমগমে স্বরে প্রশ্ন ভেসে এল।

     “ওহ-হো এ তো একদম আসল জীবনের মতই! যন্ত্রটা আমার পেশা জানতে আগ্রহী”।

     একটু ভেবেচিন্তে উত্তর দিলামঃ “শিল্পী”।

     “আমাদের কোন প্রয়োজন নেই”।

     উত্তর শুনে আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টি নিয়ে উডরপের দিকে তাকালাম।

     “আমিও কি আমার সাদা বোতামটায় চাপ দেব?” সুজান প্রশ্ন করল উডরপকে।

     “নিশ্চই!”

     “আর তাতে কি হবে?”

     সমস্ত ব্যবস্থায় সৃষ্ট উদ্বৃত্ত তোমার কাছে পৌঁছে যাবে।

     সুজানের প্রকোষ্ঠের তড়িৎচালিত সুইচে একটা খুট করে শব্দ হল।

     আমি আবার সাদা রঙের বোতামটায় চাপ দিলাম।

     “তোমার পেশা?”

     “ডেন্টিস্ট”।

     “আমাদের কোন ডেন্টিস্টেরও প্রয়োজন নেই”।

     সুজান আবার ওর বোতামে চাপ দিল আর যন্ত্র থেকে ওর জন্য একটা প্যাকেট বেরিয়ে এল।

     “তোমার পেশা?” যন্ত্রটা নির্বোধের মত আবার প্রশ্ন করল আমাকে।

     “মেকানিক”।

     “একমাস পরে এসো”।

     এই ইলেক্ট্রনিক মডেলটা দেখছি একদম বাস্তবের মতই কাজ করছে। উডরপের পাল্লায় পড়বার আগে আমাকে আমার জীবনে আমাকে বহুবার কাজের খোঁজে যেতে হয়েছে আর একদম এই প্রশ্ন ও উত্তরগুলোই শুনতে হয়েছে!

     “এভাবে হবে না বস!” আমি উডরপের দিকে ফিরে বললাম।

     “এই! এদিকে তাকাবে না। আমি চেঞ্জ করছি। দেখি এই নতুন পোষাকটায় আমাকে কিরকম মানায়।“ চিৎকার করে বলে উঠল সুজান।

     “বস, আমি এক মাস বসে থাকতে পারবো না”।

     “আবার চেষ্টা কর। আমি ‘কর্মখালি’ পরিবাহী ট্রায়োড টিউবের গ্রীডের ঋনাত্বক বায়াস কমিয়ে দিলাম”।

     সুজান আবার ওর বোতামে চাপ দিল। কিন্তু এবার যন্ত্র থেকে কোন কিছুই বের হল না।

     “নিশ্চই কিছু গোলমাল হয়েছে” প্রতিবাদের স্বরে বলে উঠল ও।

     হ্যারি আমার দিকে নির্দেশ করে বলে উঠল।

     “ও যখন ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ সৃষ্টি করতে পারবে, তোমার যন্ত্র আবার সচল হয়ে উঠবে। আমরা এখন ক্যাপিটাল এক্যুমুলেশন পর্যায়ে রয়েছি”।

     আমি আবার সাদা বোতামে চাপ দিলাম।

     “তোমার পেশা?”

     “বন্দরের মালবাহক”।

     “তোমাকে বহাল করা হল”।

     একটা হাতল লাফিয়ে যন্ত্রটার থেকে বের হয়ে এসে প্রায় আমার পেটে গোত্তা মারছিল আর একটু হলে।

     “কাজ কর!” নিয়ন্ত্রণ প্যানেল থেকে চেঁচিয়ে উঠল হ্যারি।

     “কিভাবে?”

     “ওই হাতলটা ধরে ওপর-নিচ ঘোরাতে থাকো”।

     আমি তাই করতে লাগলাম। হাতলটা ঘোরাতে বেশ মেহেনত করতে হচ্ছিল।

     “এরকম কতক্ষণ করে যেতে হবে?”

     “যতক্ষণ না তুমি তোমার মজুরী পাচ্ছ”।

     “আর সেটা কিভাবে পাবো?”

     তোমার সামনের বাক্সটার থেকে কিছু টোকেন বের হয়ে আসবে। সেই টোকেন ব্যবহার করে তুমি খাবার, পানীয়, আমোদ প্রমোদের সামগ্রী ইত্যাদি যা ইচ্ছে কিনতে পারবে”।

     হাতলটা ঘোরাতে ঘোরাতে আমার হাত টনটন করতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্তের জন্য থামলাম আমি।

     “কর কি! কর কি!” চিৎকার করে উঠল হ্যারি।

     “একটু বিশ্রাম নিচ্ছি”।

     “তুমি কাজ থেকে বরখাস্ত হয়ে যাবে যে!”

     আমি আবার হাতলটা ধরে পাগলের মত ঘোরাতে শুরু করলাম সময় নষ্টের ঘাটতি পূরণ করতে।

(৫)

     হাতল ঘোরাতে ঘোরাতে মনে মনে ভাবছিলাম আমাকে ‘বরখাস্ত’ করবার পদ্ধতিটা কি হতে পারে? আমার মনে হল হাতলটা ঘুরিয়ে আমি কিছু পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপন্ন করছি যা আমার এই হাতলেই ফিরে আসছে আর এটাকে বাক্সের বাইরে বের করে রাখছে। ওই শক্তি সরবরাহ থেমে গেলে বাক্সটা হাতলটাকে আবার নিজের ভেতরে ফিরিয়ে নেবে।

     “আমার যন্ত্রটা আবার সচল হয়েছে”। ঘোষনা করল সুজান।

     আমার কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছিল।

     “আমি আমার মজুরী কখন পাবো?”

     উডরপ ‘রাষ্ট্রপতিকে’ নিয়ে কিছু একটা কাজে ব্যস্ত ছিল। আমার দিকে দৃষ্টিপাত না করেই বিড়বিড় করে বলল “আমি তোমার যন্ত্রটায় নজর রাখছি। সর্বোচ্চ সম্ভাভ্য লাভের অঙ্কে পৌঁছতে হবে এটাকে”।

     “আমি আমার টোকেন কখন পাবো?” আবার প্রশ্ন করলাম আমি।

     “যখন তুমি থাইরোট্রনটা সচল করবার মত যথেষ্ট পরিমাণ ভোল্টেজ ওটার এনোডে সরবরাহ করতে পারবে”।

     “আমার প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে”।

     “তুমি খুব খারাপ একজন শ্রমিক। প্রত্যেকবার হাতল ঘুরিয়ে তুমি মাত্র দেড়-ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করছ। আরো দ্রুত ঘোরাতে হবে তোমাকে”।

     সুজান আবার তার বোতামে চাপ দিল। তার থেকে আর একটা পোষাক বেরিয়ে এল ওর জন্য।

     “আমার আর পোষাকের প্রয়োজন নেই”

     “তাহলে তোমার কি প্রয়োজন?”

     “যা আপনি দেবেন বলেছিলেন। একটা নাইলনের কোট”।

     “আমি এখুনি তোমার মেশিনে ওর কনডেনসার থেকে আরো নেগেটিভ ভোল্টেজ সরবরাহ বাড়াচ্ছি”।

     আমি জানতাম! উডরপের এই এক্সপেরিমেন্টে বৈদ্যুতিক শক্তি ধনসম্পদের ভূমিকা পালন করছে। আর সে ক্রমাগত উৎপাদন-প্রকোষ্ঠ থেকে উৎপন্ন ধনসম্পদ “ব্যবহার-প্রকোষ্ঠ” তে চালান করে চলেছে অর্থাৎ শিল্পপতি-সঙ্ঘের পকেটে।

     “এ অন্যায়! সমস্তকিছু কেন ও-ই পাবে?”

     আমার যন্ত্র থেকে একটা ‘খুট’ করে শব্দ হল আর আমার সামনের বাক্স থেকে কয়েকটা টোকেন ঝড়ে পড়ল।

     “নাও! এই তোমার মজুরী”।

     আমি গুনে দেখলাম আমি ঠিক পাঁচটা তামার টোকেন পেয়েছি।

     “এবার এগুলো দিয়ে কি করব?”

     “ব্যবহার-প্রকোষ্ঠে যাও ওখানে একটা ভেন্ডিং যন্ত্র রয়েছে। সেখানে এগুলো ব্যবহার করতে পারো”।

     আমি একথা শুনেই একছুটে কাঁচের দেওয়ালের ওধারে পৌঁছে গেলাম।

     “আরে! শ্রীমান অক্কাপ্রাপ্ত যে!” বেশ খুশিয়াল স্বরে বলে উঠল সুজান। “তোমাকে এবার এই ভেন্ডিং মেশিন ব্যবহার করতে হবে”।

     আমার টোকেনের বদলে জুটল এক পাত্র স্যুপ, একটা কাটলেট আর এক মগ বিয়ার।

     ঈশ্বরের অসীম করুনা!

     আমার প্রথম কেজো দিন শেষ। সুজান ওর পাওয়া একগাদা কম্বলের রাশি নিয়ে ঘুমোতে চলে গেল।

     দেখা যাক আগামীকালটা কিরকম হয়!

(৬)

     পরের দিন ‘উৎপাদন-প্রকোষ্ঠে’ পৌঁছে দেখলাম আমার আগের দিনের ঘোরানো হাতলটা আর নেই। সুজান ‘রাষ্ট্রপতির’ পাশে একটা আরামকেদারায় বসে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছিল।

     “কি ব্যপার?” আমি আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম।

     “তোমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে”। মুচকি হেসে দেয়ালের ঘড়িটার দিকে চেয়ে জবাব দিল সুজান।

     ঘড়িতে আটটা বেজে পাঁচ মিনিট হয়েছে।

     “কেন? বরখাস্ত করা হল কেন?”

     “দেরী করে কাজে আসবার কারণে। আবার কাজ খোঁজ”।

     “তুমি এই বিয়ার কোথায় পেলে?”

     “তোমার অবশিষ্ট টোকেন ব্যবহার করে। ওগুলো এখন আমার সম্পত্তি”।

     এরকম নির্লজ্জ ব্যাপার জীবনে কোনোদিন দেখি নি।

     “তোমার পেশা?” আবার প্রশ্ন করল যন্ত্রটা।

     “জাহাজঘাটের মালবাহক”।

     “প্রতিকূল অতীত-নজীর” জবাব দিয়ে যন্ত্রটা স্তব্ধ হয়ে গেল।

     মানে এই যন্ত্রটার একটা স্মৃতিশক্তি রয়েছে। আমার দেরীর জন্য বরখাস্ত হওয়ার ঘটনাটা ও ওর স্মৃতিকোষে সংরক্ষন করে রেখেছে। এটাও একদম বাস্তব জীবনের মতই। হয়ত সত্যিই এই বৈদ্যুতিক আর্থ-সামাজিক মডেলের কোন প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। কিন্তু তবুও আমি সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হতে পারলাম না। লক্ষ লক্ষ জীবন্ত মানুষের সামগ্রিক সামাজিক জীবনের মত অত্যন্ত জটিল ব্যাপারকে কি সত্যি কিছু রেডিও টিউব, রেসিস্টর আর ট্রান্সিস্টরের মাধ্যমে ঠিকঠাক বুঝে ফেলা সম্ভব?

     আমি আমার পরবর্তী কর্তব্য সম্পর্কে ভাবছিলাম। আমার চোখ গিয়ে পড়ল হলের মধ্যের নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের ওপরে। ওটা যদি সত্যিই এই সম্পূর্ণ মডেলের মস্তিষ্ক হয়ে থাকে, তাহলে ওটাকে আরো উন্নত করা যায় না কি? যাতে আমার আর্থ-সামাজিক জীবন আরে অনুকূল হয়?

     “তুমি খুব পেটপাতলা বলে মনে হয় না। আমি কি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি?” সুজানকে প্রশ্ন করলাম।

     “কেন?”

     “আমি এই সমাজের একটু উন্নতি করবার চেষ্টা করতে চাই”।

     “তা কর না”।

     আমি নিয়ন্ত্রণ-যন্ত্রের কাছে গিয়ে একটা এলোপাথাড়ি হাতল ধরে টান মারলাম। তার পড়ে আর একটা, ও আরো একটা। কম করে একশটা হাতল সেই যন্ত্রেটা থেকে বেরিয়ে রয়েছিল। যন্ত্রটা পাগলা হয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করতে শুরু করল। রাষ্ট্রপতি  স্নিগ্ধ শান্ত আলো বর্ষন ছেড়ে হঠাৎ উজ্জ্বল মোমবাতির শিখার মত গনগনে হয়ে জ্বলে উঠল। কি করা উচিৎ ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। যে ভাবেই হোক, সেই কাজের হাতলটা আবার যন্ত্র থেকে বার করানোটাই আমার উদ্দেশ্য ছিল। সব গুলিয়ে যাওয়ায় আমি ‘রাষ্ট্রপতি’ কে ওর সকেটের থেকে উপড়ে নিয়ে নিজের পকেটে পুরে ফেললাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে উডরপের গলা ভেসে এল।

     “বাহ! এ দেখছি একটা বিদ্রোহ! দারুন ব্যাপার! সরকারের বিরুদ্ধাচরণ? দূর্দান্ত! ভোল্টেজ সমান্তরক-টা কোথায়? উচ্চতম কর্তৃপক্ষের পতন? অভূতপূর্ব! দেখি, এবার রাষ্ট্রপতিকে ফেরত দাও দেখি”।

     আমি সুড়সুড় করে নিওন টিউবটা ফেরত দিলাম।

     “এই মানবীয় আচরণের ব্যাপারটাও ভাবতে হবে। সরকারকে সবার নাগালের ঊর্ধ্যে নিয়ে যেতে হবে। ‘সরকার’ কে একটা সুরক্ষিত আচ্ছাদনে রেখে একটা হাই ভোল্টেজ তারের বেড়ায় ঘিরে দিতে হবে। মনে হয় দুহাজার ভোল্ট হলেই কাজ হয়ে যাবে। আর ‘রাষ্ট্রপতি’কে একটা আলাদা নিশ্ছিদ্র ঘণ্টার মত ধাতব জালের আড়ালে রাখব। ওর জন্য পাঁচ হাজার ভোল্ট-এর বৈদ্যতিক নিরাপত্তা থাকবে। তাহলেই সরকার সবরকম অভ্যন্তরীণ গোলমালের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবে”।

(৭)

     আমার সবরকম বিদ্রোহী সত্ত্বা ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। হ্যারি উডরপ হাই-টেনশন লাইন দিয়ে বৈদ্যুতিক মস্তিষ্ককে অভেদ্য নিরাপত্তায় মুড়ে রেখেছে।

     “আমাকে যা হোক কিছু কাজ দিন”। অসহায় ভাবে ভিক্ষা চাইলাম উডরপের কাছে।

     “আবার চেষ্টা করে দেখ, আমি সব পোটেনশিওমিটারগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবার আগেই চেষ্টা করছি”।

     আমি আবার গিয়ে “কর্মখালি” বোতামটায় চাপ দিলাম। মেশিনের লাউড স্পিকারে হঠাৎ এক জনপ্রিয় বেতার-গায়কের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো-

     “কি সুখেই তুমি চিরনিদ্রায় গেলে

     আমার হাল্কা নীল এই আলিঙ্গনের কোলে…”

     আর তার পরেই যন্ত্রটার থেকে একসাথে তিন তিনটে হাতল লাফিয়ে বেরিয়ে এল আর বেরিয়েই তারা নিজের থেকেই গানের ছন্দে ঘুরতে শুরু করল। আর যন্ত্র থেকে ঝর্ণার জলের মতই অঝোর ধারায় অনেকগুলো টোকেনও বেরিয়ে পড়ল।

     “কি সৌভাগ্য বস! মনে হচ্ছে আমরা সত্যি সত্যিই এল-ডোরাডো খুঁজে পেয়ে গেছি”। টোকেন কুড়োতে কুড়োতে আমি উল্লসিত হয়ে বলে উঠলাম।

     “তোমার মুণ্ডু,” ঘড়ঘড়ে গলায় বলল হ্যারি। “ব্যবহার-প্রকোষ্ঠে কিস্যু নেই। ওটা পুরো শূন্য”।

     আমি দৌড়ে কাঁচের আচ্ছাদনে পেরিয়ে ভেন্ডিং মেশিনে গিয়ে একটা টোকেন ওটায় ফেললাম। কিন্তু ওটা কোন সাড়াশব্দ করল না। আমি মরিয়া হয়ে আর একটা টোকেন দিলাম। কিন্তু তাতেও ওর কোন ভাবান্তর দেখা গেল না।

     “হুম, তাই ত। উৎপাদন স্রেফ পাগলা হয়ে গেছে”।

     হ্যারি উডরপের মডেল সুনির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই কার্যকর। পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার একটা নড়বড়ে স্থিতাবস্থার ওপরে নির্ভরশীল। তাই যে মুহুর্তে কোনোরকমে সেই সীমানা বাইরে তাকে বার করে আনা হয়েছে, সে অসংলগ্ন আচরণ করতে শুরু করেছে। সব ঘেঁটে গিয়ে ওটা একটা অর্থহীন বৈদ্যুতিক সিস্টেমে পরিণত হয়েছে যার মধ্যে কোনরকম কার্য্য-কারণ পারম্পর্য্য নেই।

     হ্যারি পোটেনশিওমিটার-গুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেই একটা বাদে বাকি সব হাতল মেশিনের ভেতরে চলে গেল। গানটাও সপ্তম থেকে প্রথমে মেয়েলি খাদে নামল ও তার পরে আবার উচ্চ-সপ্তকে একটা মীড় মেরে থেমে গেল। আমি অবশিষ্ট হাতলটার ওপরে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার সর্বশক্তি দিয়ে ওটা ঘোরাতে আরম্ভ করলাম; আমার ইতিমধ্যে অর্জিত বদনাম মুছে ফেলতে।

     “তোমার টোকেনগুলো ফেরত দাও”। হ্যারি বলে উঠল।

     “কেন?”

     “তুমি ওগুলো কোন কাজ না করেই পেয়েছ। সেটা অনুচিত”।

     “তাহলে ও কেন কিছু না করেই সব কিছু পাচ্ছে?” আরামকেদারায় ঘুমন্ত সুজানের দিকে দেখিয়ে আমি প্রশ্ন করলাম।

     “বোকা বোকা প্রশ্ন না করে যা বলছি তাই কর। টোকেন ফেরত দাও”।

     অগত্যা দিতেই হল। তবে ওর অলক্ষ্যে দুটো টোকেন সরিয়ে রাখতে সক্ষম হলাম। সুজান সমস্ত দিনটা ঘুমিয়েই কাটালো আর আমি দিনের শেষে আরো সাতটা টোকেন উপার্জন করতে পারলাম। উডরপ ইতিমধ্যে ‘সরকার’এর সুরক্ষা আরো জোরদার করে ফেলেছে আর তা করতে গিয়ে দু বার আমার কনডেনসার-এ জমানো সমস্ত শক্তি ফাঁকা করে ফেলেছে। লক্ষ্য করলাম ও এই ইলেকট্রনিক মডেল নিয়ে অত্যন্ত অনুভূতিপ্রবণ; প্রায় মোহগ্রস্তই বলা যায়। পড়ে সুজান বলেছিল যে উডরপ ঐ এল-ডোরাডো প্রোজেক্টের জন্য একটা বিশাল অঙ্কের অনুদান পেত।

     সেদিন আমি আমার খাওয়ার জন্য মাত্র দুটো টোকেন খরচ করলাম। যদিও ওতে আমার পেট সম্পূর্ণ ভরল না, তবে আমার চৈতন্য উদয় হয়েছিল যে দূর্দিনের জন্য কিছু সঞ্চয় করা প্রয়োজন।

(৮)

     পরদিন সকালে দেখলাম সুজান থুম মেরে বসে আছে। ওর চোখ লাল।

     “শিল্পপতি সঙ্ঘের কান্নাকাটি কি হেতু?” আমি একটু খোঁচা মেরেই প্রশ্নটা করলাম।

     আমি সেদিন সময়ের আগেই কাজে এসেছিলাম। আমার পকেটে রাখা আগের দিনের টোকেনগুলোর শব্দে মনটা বেশ ফুরফুরেও ছিল।

     “অসহ্য!” বলল সুজান।

     “কি অসহ্য?”

     “উনি সব ফেরত নিয়ে নিয়েছেন। আমার পোষাকগুলো, অন্তর্বাস, কোট সব”।

     “উনিটা কে?”

     “উডরপ”।

     “কেন?”

     “সবকিছু আবার শূন্য থেকে শুরু করতে চান। সব জিনিষপত্র আবার ভেন্ডিং মেশিনে ভরে ফেলেছেন”।

     আমি আমার হাতল ছেড়ে সুজানের কাছে গেলাম। আমার ওর অবস্থা দেখে করুনা হচ্ছিল।

     “আমার এই খেলাটা একেবারেই পছন্দ নয়”। বললাম সুজানকে।

     “আমারো এটা আর একদম পছন্দ নয়”।

     “যাই হোক। হ্যারি আবার সব ঠিকঠাক করে দেবে”।

     “আমি জানি না এই খেলার মানে কি। আমি শুধু এটাই জানি যে এটা অসহ্য- কারোকে কিছু দিয়ে আবার সেটা কেড়ে নেওয়া”।

     উডরপ ঘরে এসে ঢুকল।

     “ঠিক কি ধরনের প্রেমালাপ চালাচ্ছ তোমরা? নিজের নিজের জায়গায় যাও! মানে হয় আমি থাইরোট্রনের পোটেনশিয়াল একটু বেশিই বাড়িয়ে দিয়েছি। তাই তুমি ফাঁকি মারছ অথচ এখনো তোমাকে বরখাস্ত করে নি”।

     “এক সেকেণ্ড, বস!”

     আমি আমার হাতলটা লক্ষ্য করে দৌড় মারলাম। কিন্তু ততক্ষণে দেরী অয়ে গেছে। হাতলটা কখন যেন হাওয়া হয়ে গেছে। উডরপের ঠোঁটের কোনায় প্রসন্নতার হাসি ফুটে উঠল।

     “গোল্লায় যাক”। মনে মনে বললাম আমি। “আমার পকেটে আজকের মত যথেষ্ট টোকেন রয়েছে”।

     সুজান চোয়াল শক্ত করে চুপচাপ বসে ছিল। ওর যন্ত্রটা ব্যবহার করবার কোন চেষ্টাই ও করল না। আমি প্রবল অনিচ্ছাতেও সাদা বোতামটায় ক্রমাগত চাপ দিচ্ছিলাম আর প্রত্যেকবার এক একটা পেশার নাম বলছিলাম। কিন্তু কোনটারই চাহিদা ছিল না। আমাদের এই ‘সমাজ’-এর পক্ষে কি ডাক্তার, শিক্ষক, টেকনিশিয়ান ও রাঁধুনীর চাহিদায় একটা সম্পৃক্ত অবস্থায় কোনদিনও পৌছনো সম্ভব? আমি আবার বোতামে চাপ দিলাম।

     “পেশা?”

     “সাংবাদিক”।

     “তোমাকে বহাল করা হল”।

     আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। যন্ত্রটার থেকে একটা টাইপরাইটার বসানো ডেস্ক বেরিয়ে এলো। এই হ্যারির বলিহারি! সব কিছু আগে থেকে প্ল্যান করে বানিয়ে রেখেছে!

     “প্রেস কিন্তু আমাদের সমাজে একটা অত্যন্ত লাভজনক ব্যাবসা”। বলল উডরপ।

     “তোমার আয় তোমার জনপ্রিয়তার ওপরে নির্ভর করবে। তোমার লেখা সুজানের যত পছন্দ হবে, তুমি তত বেশি টোকেন পাবে। এবার শুরু কর”।

     উডরপ এই বলে হল থেকে বেরিয়ে গেল।

     আমি টাইপরাইটারের সামনে বসে ভাবতে লাগলাম। তার পরে টাইপ করলাম

     “অসাধারণ! অস্বাভাবিক! অসামান্য, চমকপ্রদ! তেজস্ক্রিয়তার ফলে বিবর্তনে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন প্রানীর! কথা বলা গাধা! অঙ্ক বিশারদ কুকুর! হোমিওপ্যাথ বনমানুষ! গায়ক শুওর! পোকার খেলা মোরগ!”

     “কি আবোল তাবোল!” ওর মেশিন থেকে একটা কাগজ টেনে নিয়ে সুজান মন্তব্য করল।

     “এরকম লিখতে থাকলে আমি আর পড়ব না। তুমি না খেয়ে মরবে”।

     “তোমার পছন্দ হচ্ছে না?” আমি প্রশ্ন করলাম।

     “না”।

     “আচ্ছা, আমি অন্য কিছু চেষ্টা করি তাহলে”।

     “অসামান্য! চমকপ্রদ! আঠারোজন বিলিয়নিয়ার আর বেয়াল্লিশজন মিলিওনিয়ার তাদের সব সম্পদ বিলিয়ে দিলেন শ্রমিকদের মধ্যে…”

     “শোন স্যাম, বা আর যাই তোমার নাম হোক! আমি তোমার বোকাবোকা আবোলতাবোল আর পড়ব না”।

     “আচ্ছা আমাকে আর একটা সুযোগ দাও”।

     “দেবো না”।

     “প্লিজ সুজান!”

     “আমি চাই না পড়তে”।

     “ওহ, সুজ্যি!”

     “খবরদার, আমাকে ওই নামে ডাকবে না!”     

     আমি লিখলাম –

     “সুজ্যি, তুমি একজন অসামান্য মেয়ে। আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি”।

     ও কিছু বলল না।

     “আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি কি পড়ছ?”

     “হ্যাঁ”। শান্তভাবে বলল ও “তারপর?”

     “নতুন জীবন পাওয়ার পড়ে যখন তোমাকে প্রথম দেখলাম, তখন থেকেই আমি তোমার প্রেমে পড়েছি। সেই থেকে আজ অবধি এই নির্বোধ প্রোজেক্টে জীবনপাত করার মাঝে সব সময়ে আমি ভেবে চলেছি কিভাবে তোমার সাথে এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া যায়। শুধু তুমি আর আমি। তুমি চাও না এখান থেকে মুক্তি পেতে?”

     “হ্যাঁ” যন্ত্র থেকে আমার লেখা কাগজটা টেনে নিয়ে ও শান্তভাবে উত্তর দিল।

     “আমি ভেবে এই প্ল্যান করেছি- আমার একটা পেশা আছে। আমরা উডরপের খপ্পর থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের কাজ খুঁজব। এই বৈদ্যুতিক নির্বোধ ব্যাপারস্যাপার আর নয়। আমরা একসঙ্গে থাকলে আমাদের পক্ষে এটা করা মোটেও কঠিন হবে না। সত্যি বলছি, তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে আমি বুঝতে পেরেছি যে হাতের ধমনী কেটে মৃত্যু ডেকে আনা চরম নির্বুদ্ধিতা”।

     “আমারো তাই মনে হয়েছে” অস্ফুট স্বরে বলল সুজ্যি।     

(৯)

     ঘরে ঢুকে যন্ত্রের ডায়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা তুড়ি মেরে উডরপ বলল –  

     “বাহ! কাজকর্ম ভালো এগোচ্ছে মনে হচ্ছে। যন্ত্রে টেনশনের মাত্রা স্থিতিশীল! কোনরকম ফেজ এর পার্থক্যও চোখে পড়ছে না। আমরা উৎপাদন আর ব্যবহারে সুসামঞ্জস্যের দিকে চলেছি”।

     “অবশ্যই বস,” আমি বললাম। “আমাদের সোসাইটি কখনো না কখনো ত ভদ্রভাবে চলবেই”।

     “এইভাবেই চালিয়ে যাও। এই অবস্থাটার ছবি এঁকে সংরক্ষণ করা দরকার”। এই বলে সে চলে গেল।

     “আজ রাতে এখানেই দেখা কর। আমরা জানালা দিয়ে লাফিয়ে বাইরে পড়ব”।

     “ঠিক আছে”।

     দিন শেষ হতে হতে আমি প্রায় দশটা অসহ্য রিপোর্ট লিখলাম আর একগাদা টোকেন সংগ্রহ করলাম। সুজানও পাতার পর পাতা তার যন্ত্র থেকে টেনে চলল শুধু ঐ বৈদ্যুতিক বোকাবাক্সটাকে এটা দেখাতে যে ও আমার লেখা কতটা আগ্রহ নিয়ে পড়ে চলেছে। সুসামঞ্জস্য সম্পূর্ণ হল আর হ্যারি উত্তেজনায় লাফাতে লাফাতে তার এলডোরাডোর ছবি আঁকতে থাকল আর মিলিয়ন ডলারে তা বিক্রি করবার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে রইল। বিক্রি হবেই ত, মানবসুলভ সব ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া যে তার মডেলে ধরা পড়েছে!

     আমি আমার সমস্ত টোকেনগুলো দিয়ে যতগুলো পারলাম স্যাণ্ডউইচ কিনে পকেটে ভরলাম।

     রাত্রিবেলা পা টিপে টিপে জানালার দিকে এগোতে এগোতে আমরা ‘শিল্পপতি সঙ্ঘের’ সামনে এসে একবার থামলাম।

     “তুমি কাল ভেন্ডিং যন্ত্র ব্যবহার কর নি”।

     “করলে তোমার আয় কমে যেত যে”।

     “তোমার পোষাকগুলো আর কোটটা আমরা নিয়ে যেতে পারি”।

     “গোল্লায় যাক!”

     “আমি একটা চিঠি লিখে যাব হ্যারির জন্য যে ওগুলো আমি চুরি করেছি। এমনিতেই আমার কোন অস্তিত্ব নেই। আমি ত পৃথিবীর কাছে মৃত”।

     “কি দরকার? ওগুলো বয়ে হাঁটতেও আমাদের অনেক বেশি পরিশ্রম হবে”।

     আমরা জানালা বেয়ে ওপরে উঠে বাইরের পাঁচিলের অপর দিকে লাফিয়ে একটা পিচঢালা বড়রাস্তায় এসে পড়লাম, রাস্তাটা মনে হল কোন বড় শহরের দিকে গেছে। দূরে বড় শহরের পরিচিত লালচে উন্মত্ত আকাশ ঝুলে রয়েছে দিগন্তের ওপরে। আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে কয়েক মুহূর্ত সেই দৃশ্য দেখলাম। সুজান আমার দিকে সরে এসে আমার গাঁ ঘেঁষে দাঁড়ালো।

     “কোন ভয় নেই। আমরা আর একা নই। আমাদের একজনের অন্যজন রয়েছে এখন”।

     আমি ওর কাঁধের ওপর হাত রেখে ওকে আরো কাছে টেনে নিলাম। তার পরে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। পথে শুধু একবার আমি একটা ল্যাম্পপোস্টের সামনে এসে কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে আমার প্রতি আস্থায় পূর্ণ ওর চোখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলাম-

     “সুজ্যি, তুমি উডরপের কাছে কিভাবে পৌঁছেছিলে?”

     এর উত্তরে কোন কথা না বলে ও ম্লান হেসে ওর বাঁ হাতটা বাড়িয়ে ধরে আমাকে ওর মণিবন্ধটা দেখালো। দেখলাম ওর ফ্যাকাশে চামড়ার ওপরে জেগে রয়েছে একটা লালচে লম্বা দাগ।

     “তুমিও?”

     ও শুধু মাথা নাড়ল।

     তারপরে আমরা এগিয়ে চললাম, আমরা এখন দুজন যাদের কোন অস্তিত্ব নেই।

অনুবাদ প্রসঙ্গেঃ

আনাতলি দ্‌নেপ্রভ (Анатолий Днепров) (Anatoly Dneprov) ছদ্মনামে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লিখে সোভিয়েত ইউনিয়ন-এ শ্রদ্ধা, সম্মান ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন পেশাদার স্কাউট, সাংবাদিক, পদার্থবিদ ও বিজ্ঞান অ্যাকাদেমির গবেষনাগার কর্মী Anatoly Petrovich Mickiewicz। জন্ম: ১৭ নভেম্বর, ১৯১৯ ইউক্রেনের দ্‌নেপ্রপেত্রভ্‌স্ক শহরে (তাঁর ছদ্মনামের উৎস এটিই), মৃত্যু: ১৯৭৫, মস্কোয়। সাইবারনেটিকস তাঁর প্রিয় বিষয়। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও সেলফ রেপ্লিকেটিং মেসিন সম্পর্কে তাঁর ভবিষ্যৎদর্শন বর্তমানে বিস্ময়করভাবে ফলে যেতে দেখা যাচ্ছে। ১৯৫৮য় ‘নৌকাডুবি’, ‘সেইমা’ (সোভিয়েত কল্পবিজ্ঞানে রোবোটের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রথমদিকের কাজ), ১৯৬০ এ ‘কাঁকড়া দ্বীপ’, ‘ম্যাক্সওয়েল সমীকরণ’ তাঁকে প্রশংসা ও খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়।

বর্তমান গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে। মিরা গিনসবার্গ কৃত ইংরেজি অনুবাদটি প্রথম ছাপা হয় গ্যালাক্সি পাবলিসিং কর্পোরেশন কর্তৃক প্রকাশিত ফ্রেডেরিক পোহল (Frederik Pohl) সম্পাদিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স ফিকশন’ পত্রিকার জুন ১৯৬৮ সংখ্যায়। বর্তমান অনুবাদটি সেখান থেকেই করা। এস জি ফিলিপস প্রকাশিত মিরা গিনসবার্গ সম্পাদিত ‘লাস্ট ডোর টু আইয়া’ (১৯৬৮) সংকলনে এবং ম্যাকমিলান প্রকাশিত ভ্লাদিমির গাকভ সম্পাদিত ‘ওয়ার্লডস স্প্রিং’ (১৯৮১) সংকলনে গল্পটি স্থান পেয়েছে।

কৃতজ্ঞতা: আনাতলি দ্‌নেপ্রভ, মিরা গিনসবার্গ, ফ্রেডেরিক পোহল, গ্যালাক্সি পাবলিসিং কর্পোরেশন

2 thoughts on “নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে – আনাতলি দ্‌নেপ্রভ

  • January 1, 2018 at 2:14 pm
    Permalink

    খুব ভাল লাগল। এ ধরনের কল্পবিজ্ঞানের গল্প আগে পড়ি নি। ধনতান্ত্রিক মডেল নিয়ে এত চমৎকার রসিকতা, সত্যি অভাবনীয়।

    Reply
    • January 24, 2018 at 3:53 am
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ গল্পটি পড়ে মন্তব্য লেখার জন্য।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!