পরিত্রাতা

রচনা  : সুমন সেন

অলঙ্করণ :

২০৩৬ সালঃ

স্টাডি সিস্টেম পাল্টেছে এখন। এখন আর জোর করে স্টুডেন্টদের অপ্রিয় বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করতে হয় না। এখন প্রতি বছর স্কুলে কাউন্সিলিং হয় এবং ফলাফল হিসেবে যে স্টুডেন্টের যে সাবজেক্টে বেশি মনযোগ, তাকে সেই নিয়েই পড়াশোনা করতে দেওয়া হয় স্কুল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে।

     মায়ের মুখে শুনেছে নিতাই, কোনও একটা সময় ছিল, যখন টেনথ স্ট্যান্ডার্ড-এর পর ‘মাধ্যমিক’ নামক একটি পরীক্ষা পর্যন্ত সকল স্টুডেন্টদের কিছু কমন সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করতে হত। কিন্তু এখন আর তা হয় না। এখন খেলাধুলো নিয়েও পড়াশোনা হয়, পুতুল বানানো নিয়েও পড়াশোনা হয় এবং নাচ-গান-নিয়েও পড়াশোনা হয়। কাউন্সিলিং-এ যা ফলাফল বেরোবে, আগামী বছরটা স্টুডেন্টদের সেটা নিয়েই পড়তে হবে। তবে এখন পড়াশোনার খরচ বিস্তর বেড়ে গিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখে যায়, স্টুডেন্টদের স্ট্রিম প্রতি বছরই পাল্টাতে হয়। ফলে প্রতি বছরই নতুন নতুন সেটআপ করতে হয়।

     একজন সিঙ্গল মাদারের একমাত্র ছেলে নিতাই; এমনিতে খুব স্মার্ট সে, কিন্তু পড়াশোনা বেশি দূর করতে পারেনি। সিক্সথ স্ট্যান্ডার্ড-এর পর স্কুল থেকে বিদায় নিতে হয় তাকে। এক্ষেত্রে পারিবারিক আর্থিক অনটনই ছিল প্রধান কারণ। অন্যান্য বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ আয়ের দ্বারা সংসার ও ছেলেমেয়েদের ভরণ পোষণ হয়। কিন্তু নিতাইয়ের বাবা নেই। তাছাড়া তার মায়ের কাজটাও খুব একটা বড় কিছু না। একটা প্রাইভেট কোম্পানির ব্যাক অফিসে কাজ করে সে।

     মা-কে অবশ্য খুব ভালোবাসে নিতাই। যখন স্কুলে পড়ত তখন থেকেই, বাড়তি কিছু আয়ের জন্য টর্চ লাইট বিক্রি করত সে। তারপর যখন স্কুল ছেড়ে দিল, তখন থেকে বিভিন্ন ধরনের কাজ করছে সে।

     পড়াশোনা না করলেও তার বন্ধু ছিল অনেক। সকল বিষয়ের উপর আগ্রহও ছিল অগাধ। বন্ধুরাই অনেক সময় তাদের পড়াশোনার অনেক জিনিস শিখিয়ে দিত তাকে। আজকাল মানুষের মধ্যে ‘ঈর্ষা’ নামক জিনিসটা তেমন আর নেই। অথচ ভাবতেও অবাক লাগে, কোনও একটা সময় ঈর্ষাই নাকি মানুষদের চালিত করত। মায়ের মুখে নিতাই শুনেছে অতীতের গল্প। ‘ধর্ম’ নিয়ে নাকি খুব মাতামাতি চলত তখন। এটাকে কেন্দ্র করে অনেক দাঙ্গা-হাঙ্গামাও হয়েছে। একবার তো পুরো দেশব্যাপী যুদ্ধ লেগে গিয়েছিল নাকি। পরে মানুষ বুঝেছে নিজের ভুল। এখনও ধর্ম আছে, তবে যার ধর্ম তার অন্তরে…

     ইতিহাস, ভূগোল, সাধারন বিজ্ঞান— সব মায়ের কাছেই শিখেছে নিতাই। তাছাড়া বিভিন্ন রকমের কাজের প্রতি জ্ঞান রয়েছে তার। কিছু বন্ধুদের থেকে শিখেছে, কিছু শিখেছে কর্মরত মানুষদের থেকে আর কিছু নিজে চেষ্টা করে। সমস্ত জিনিস মনযোগ সহকারে দেখা এবং বোঝা— তার যেন চরিত্রেরই একটা অংশ। এক কথায় বলা যায়, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, সমস্ত কিছুতেই তার অল্প-স্বল্প জ্ঞান রয়েছে।

 

২০৫১ সালঃ

     নিতাইয়ের এখন ২৫ বছর বয়স। অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে কয়েক বছরে। যা আশা করা গিয়েছিল, তার থেকেও অনেক বেশি ভয়ানক পরিস্থিতি গ্রাস করেছে পৃথিবীকে। পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু জায়গা এখন জলের তলায় ডুবে রয়েছে। মোটামুটি সারা পৃথিবীর অবস্থা প্রায় একই রকম। নেদারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, চিন— প্রভৃতির বেশ কিছু জায়গা এখন জলের তলায়। বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য সুমেরীয় বরফ গলে জল হয়েছে। ফলে সমুদ্রতলের উচ্চতা বেড়েছে, এবং তার ফলস্বরূপ পৃথিবীর স্থলভাগ আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে জলের তলায়। সুমেরুতে জমে থাকা বরফের এতটুকুও অবশিষ্ট নেই এখন। গ্রীষ্মের সময় সেটি গরম জলের সমুদ্র।

     এখন আর বাংলাতে ষড়ঋতু অবশিষ্ট নেই। এখন আছে দুটি ঋতু। যথাক্রমে, ১) গ্রীষ্মকাল ও ২) শীতকাল। গ্রীষ্মে হয় প্রচণ্ড গরম এবং শীতে প্রবল ঠান্ডা। বছরে বৃষ্টি যখন খুশি আসে, নিজের ইচ্ছামতো। শীত ও গ্রীষ্মের মাঝের ব্যাবধানটা যেন হঠাৎই আসে আর চলে যায়। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গঙ্গা নদীর উৎস এখন আর হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ নয়, এখন তার উৎস হল বঙ্গোপসাগর। যদিও গঙ্গা বলে এখন আর নির্দিষ্ট কিছু নেই, সেটি অনেক প্রশস্থ হয়েছে এবং গভীরতা কমেছে। এখন পশ্চিমবঙ্গ বলতে বোঝায়, কয়েকটি ছোট-বড় দ্বীপের সমন্বয়। যেখানে মাসে অন্তত একবার সুনামি আসবেই।

     সুনামির সময় বড় বড় ব্রিজগুলো খুব কাজে লাগে কলকাতার মানুষের। বিশেষত হাওড়া ব্রিজ। যতই জলতল বাড়তে থাকে ব্রিজগুলির উপর লোকসংখ্যাও ততই বাড়তে থাকে। তখন ব্রিজগুলোই হয় মানুষের থাকা-খাওয়ার জায়গা। সরকার থেকে খাদ্য বিতরণ চলে প্রতিটা ব্রিজে। শহরের বহু হাইরাইজ ভেঙে গুঁড়িয়ে জলের তলায় মিশে গিয়েছে। যেগুলি বেঁচে রয়েছে, সেগুলিতেও তখন ব্রিজের মতোই পরিস্থিতি হয়। মোদ্দা কথায়, পৃথিবী ধ্বংসের দিন শুরু হয়ে গিয়েছে। যার প্রথম ধাপেই মারা গিয়েছে বহু মানুষ। যার মধ্যে ছিল নিতাইয়ের মা-ও। যারা প্রাথমিক ভাবে পরিস্থিতি সামলাতে পেরেছে, তারা এখন খুব সংগ্রাম করে বাঁচে।

     একটা জিনিস নিতাইয়ের খুব ভালো লাগে, সেটা হল, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বিভেদ ব্যাপারটা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। এখন সবাই সবাইকে সাহায্য করে। অবশ্য খুব একটা মন থেকেও নয়, নিজেরা ভবিষ্যতে সাহায্য পাবে বলে। অবশ্য নিতাইয়ের মানসিকতা এরকম নয়। তার চোখের সামনে আজও ভাসে সেই দিনটার কথা, যেদিন তার মা মারা গিয়েছিল।

     বছর সাতেক আগের ঘটনা। সেদিন প্রথম অত বড় একটা সুনামি এসেছিল। তার খবর অবশ্য আগে থেকেই পেয়ে গিয়েছিল নিতাই ও তার মা। পাশেই একটা হাই স্কুলের বিল্ডিংয়ে পাড়ার বাকি সকলের সঙ্গে আস্তানা গেড়েছিল তারা। যথারীতি সুনামি আসে। এরই মধ্যে একটা ছয় বছরের বাচ্চা স্কুলের জানালা দিয়ে বাইরে জলে পড়ে যায়। ব্যাপারটা অনেকের দৃষ্টির অগোচরে থাকলেও, থাকেনি নিতাইয়ের মায়ের। তিনি সঙ্গে আনা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যাগটা নিতাইকে সামলাতে বলে জানলা থেকে ঝাঁপ দেন বাইরে। বাচ্চাটিকে বাঁচাতে পারলেও নিজে আর ফিরে আসতে পারেননি। সুনামির একটা ঢেউ আচমকাই আছড়ে পড়ে তার শরীরে এবং তাকে ছিটকে ফেলে স্কুলের দেওয়ালে। মাথায় প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হন তিনি। রক্তাক্ত অবস্থায় তলিয়ে যেতে থাকেন জলে। নিতাই তার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছিল মা-কে বাঁচানোর। কিন্তু ঘোলাটে জলে নেমে সে কিছুই দেখতে পায়নি। হাতড়ে হাতড়ে পেয়েছিল, গাছের ডাল, ভাঙা সাইকেল, স্কুটারের অংশ ইত্যাদি। মা-কে আর পায়নি সে। তখন কেউ সাহায্য করতে আসেনি তাকে। সকলেই সন্ত্রস্ত, নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত।

     এই সব বিশ্ব-উষ্ণায়ন, সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি প্রভৃতি নিয়ে অবশ্য সরকারের টনক নড়েছিল বেশ কয়েক বছর আগেই। তবুও অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। বছর দশেক আগে সরকার থেকে আইন করে সমস্ত খনিজ তেলে চলা ব্যক্তিগত গাড়িগুলো ব্যান করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের এখন প্রধান বাহন সাইকেল। তাছাড়াও ব্যাটারি এবং বায়ো-গ্যাস চালিত স্কুটার-এর চল রয়েছে। তবে ব্যাটারি চার্জ দেবার জন্য বিদ্যুৎ এবং বায়ো-গ্যাসের যা গগনচুম্বী দাম, তাতে অনেকেই ওরকম স্কুটার ব্যবহার করে না টাকা বাঁচানোর জন্য। মঙ্গল গ্রহে কলোনি তৈরি শুরু হয়েছে। যদিও ফলাফল খুব একটা ভালো হয়, তবুও বহু মানুষের এখন চিন্তার বিষয় হল, কীভাবে তারা এই গ্রহ ছেড়ে ওই গ্রহে পাড়ি জমাবে!

     সরকার থেকে আরও অনেক কিছু আইন হয়েছে। যেমন, বিনা অনুমতিতে গাছ কাটা বন্ধ, বাধ্যতামূলক ভাবে কল-কারখানার বর্জ্য পদার্থ রি-সাইকেল করে কাজে লাগানো ইত্যাদি ইত্যাদি। এত আইন করা সত্ত্বেও বিশেষ কিছু লাভ হয়নি। সিদ্ধান্ত অনেক দেরিতে নেওয়া হয়েছিল। যেটা করা উচিত ছিল ২০১০ সালে, সেটা হয়েছে ২০৪০-৪১ সালে। অবশ্য পরিবেশের পরিবর্তনও এসেছে খুব তাড়াতাড়ি, আশ্চর্যজনক ভাবে।

     এইরকম একটা সংকটময় পরিস্থিতিতে নিতাই চাইলেই একা একা ভালোভাবেই সারাজীবনটা কাটিয়ে দিতে পারত। তার এই ২৫ বছরের জীবনের অভিজ্ঞতায় প্রায় কোনও কাজই এমন নেই, যা সে জানে না। মা যখন মারা যায় তখন একজনও আসেনি তাকে সাহায্য করতে। এমতাবস্থায় প্রায় সকলেরই একটা প্রতিশোধপরায়ণ মনোবৃত্তি তৈরি হয়। অথচ নিতাই সকলের থেকে একেবারে উল্টো। তার কথায়, তার মা মারা গেছে অপরকে সাহায্য করতে গিয়ে, তাই সেও চায় তারও মৃত্যু আসুক অপরকে সাহায্য করতে গিয়েই। তার পরিবার তো নেই-ই, কোনও প্রেমিকাও নেই তার। ছিল কয়েক বছর আগে একজন প্রেমিকা। তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে লন্ডনে এক বিত্তবান ছেলের সঙ্গে। কোনও পিছুটান নেই বলেই হয়তো এরকম মানসিকতার পরিচয় দিতে তার বাধে না। কাঠের বাড়ি বানানো, ভেলা অথবা নৌকা বানানো— প্রভৃতি কাজে সে প্রচণ্ড পারদর্শী। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তার বুদ্ধি ও কৌশলের জুড়ি মেলা ভার। কিছু অ্যান্ড্রয়েড আছে মানুষকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করার জন্য, তবে তাদের ইন্টেলিজেন্স, নিতাইয়ের মতো অতটা পোক্ত নয়। তাছাড়া হলফ করে বলা যেতে পারে, হৃদয় নামক জিনিসটি অন্য যেকোনও মানুষের থেকে নিতাইয়ের অনেক বেশি আছে, অ্যান্ড্রয়েড-এর যেটা একেবারেই নেই।

 

২০৫৩ সালঃ

     সকাল সকাল রেডিওতে খবরটা শুনল নিতাই। আর রক্ষে নেই! এ’বার সকলকে মরতে হবে, একসঙ্গে!

     নিতাই এখন একটি বড় হাইরাইজ বিল্ডিংয়ে থাকে, আরও ২০০-২৫০ জনের সঙ্গে। প্রায় প্রত্যেকেই নিজের কাছের মানুষদের হারিয়েছে।

     আজ প্রচণ্ড বড় সুনামি আসতে চলেছে। প্রায় দেড়শো মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট ঢেউ ধেয়ে আসছে সুন্দরবনের (যেটি এখন সম্পূর্ণরূপে জলের তলায়) উপর দিয়ে। কলকাতায় ঢুকতে ঢুকতেও যেটি ১১০-১২০ মিটার উচ্চতা নিয়ে আছড়ে পড়বে নগরীর বুকে। সমস্ত হাইরাইজগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যাবে এক ঝটকায়। হাওড়া ব্রিজও আর টিকে থাকতে পারবে না এই জলের তোড়ে। এখন মানুষের বাঁচার একটাই রাস্তা, কলকাতা ছেড়ে কোনও উঁচু জায়গার দিকে পালানো। কিন্তু সেটা একেবারেই অসম্ভব, কারণ অত সময় নেই।

     “একটা কাজ হতে পারে, আমরা যদি TRD (Tsunami Rescue Department)-এর হেডকোয়ার্টারে যাই, তবে ওখান থেকে আমরা এয়ারশিপ পেয়ে যাব। তাতে চড়ে যদি পুরুলিয়ার দিকে যেতে পারি, তবে হয়তো বা বেঁচে যেতেও পারি! আমার কাছে খবর আছে, ওখানকার দুটো এয়ারশিপের মধ্যে একটা এখনও রয়েছে। এখন যদি ওটা ওড়ানোর মতো একজন লোক পাওয়া যায় তবেই…” –এক প্রবীণ পরামর্শের সুরে বললেন।

     সকলে জমায়েত হয়েছে একটি হলে। ভাবনাচিন্তার বেশি সময় নেই। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।

     “তবে তো ভালই… আমরা অপেক্ষা না করে TRD-তে একটা খবর দিই, ওরাই তো এসে নিয়ে যাবে আমাদের!” একজন বলল।

     “সেটা হবে না। TRD-এর সমস্ত অফিসার, ক্লার্ক, এমনকী সাফাই-কর্মীও খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরিবার নিয়ে একটা এয়ারশিপ সমেত পালিয়েছে কলকাতা ছেড়ে। তারা আর কোনওদিন আসবে না আমাদের বাঁচাতে।” –প্রবীণ বললেন।

     হঠাৎ একটি বাচ্চা মেয়ে বলে উঠল, “নিতাইদা জানে তো এয়ারশিপ ওড়াতে, সে আমাদের সকলকে ঠিক বাঁচিয়ে দেবে।”

     সকলের দৃষ্টি আটকে গেল নিতাইয়ের দিকে। সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল প্রথমে। তারপর বলল, “না, না, মানে… আমি একবার একটা চপার উড়িয়েছিলাম… কিন্তু প্রায় ২০০ জন যাত্রীবাহী ওইরকম একটা এয়ারশিপ…! না, না, এটা আমার দ্বারা হবে না। তাছাড়া এতগুলো প্রাণের ঝুঁকি…!”

     “তুমি ছাড়া এই ঘরে এমন আর একজন নেই যে কোনওদিন কোনও চপার উড়িয়েছে। সুতরাং, পারলে তুমিই পারবে আমাদের সাহায্য করতে। তাছাড়া আমরা তো এমনিতেও মরব। একটা চেষ্টা করতে ক্ষতি কথায়? আমাদের সকলের অনুরোধে তোমাকে এই ঝুঁকিটা গ্রহণ করতেই হবে নিতাই।” –প্রবীণ মানুষটি বললেন।

     “তুমি পারবে দাদা। আমি জানি।” –বাচ্চা মেয়েটি নিতাইয়ের হাতটা ধরে বলল।

     কিছু একটা ভেবে রাজি হয়ে গেল নিতাই। “এখানে সুনামি আছড়ে পড়বে আর পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যেই। আর TRD বেস-এ যেতে আমাদের সময় লাগবে প্রায় আধঘণ্টা, যদি ঠিকঠাক ভাবে চলি। সুতরাং, আর সময় নষ্ট নয়, তাড়াতাড়ি…” –নিতাই বলল।

     সকলেই নিজের নিজের স্ব-বাহী বোটগুলো নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

     মানুষ এখন বহুজনবাহী বড় বড় বোটে চাপে না। একজনের জায়গা বিশিষ্ট ছোট বোটের মাধ্যমে চলাফেরা করে জলভাগে। আবার স্থলভাগ আসলে বোটটাকে পিঠে তুলে নেয়। অধিকাংশ সময় দলবদ্ধ ভাবেই চলাফেরা করে। এমনটা করার ফলে বোট বিপর্যস্ত হলেও সকলকে বিপদের সম্মুখীন হতে হয় না, দলচ্যুত হলেও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে, এবং অনেকক্ষেত্রে দলচ্যুতকে পরে খুঁজেও পাওয়া যায়।

     যদিও বেঁচে থাকার জন্য এইরকম প্রায় সকল বুদ্ধি বা কৌশলই নিতাইয়ের অবদান। তবুও সে কোনও সময় তার কৃতিত্বের পরোয়া করে না। সব সময় সকলকে স্বার্থহীন ভাবে সাহায্য করে যায়।

     TRD-তে পৌঁছোনো খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। ইতিমধ্যে জলতল অনেক বেড়েছে, প্রবাহও বেড়ে গিয়েছে অনেক। তবুও শেষমেশ তারা পৌঁছেছে সেখানে। তবে সময় লেগে গিয়েছে অনেক বেশি, চল্লিশ মিনিটের উপর।

     দু’বারের চেষ্টাতেই অবশ্য এয়ারশিপের ইঞ্জিন চালু হয়েছে। বেস থেকে উপরে উঠতে এখনও কিছুক্ষণ সময় লাগবে।

     ইতিমধ্যে সুনামি এসে আছড়ে পড়েছে হাওড়া ব্রিজের উপর। ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিল ব্রিজটাকে। ব্রিজে আছাড় খাওয়ার ফলে ঢেউয়ের উচ্চতাও এক ঝটকায় অনেকটা কমে গিয়েছে।

     এয়ারশিপের স্যাটেলাইট টিভির দিকে তাকিয়ে বাঙালির গর্ব রবীন্দ্র সেতুর এমন হাল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল সকলে।

     বেস ছেড়ে আকাশে উঠেছে এয়ারশিপ। শিপ চালাতে চালাতে জানালা দিয়ে তার প্রিয় নগরীর দৃশ্যটা একবার দেখে নিল নিতাই। যেখানে তার জন্ম, তার মায়ের মৃত্যু – সেই জায়গা এখন সম্পূর্ণরূপে জলের তলায়। আর কোনওদিন হয়তো এখানে ফিরে আসবে না সে। চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার।

 

২০৫৫ সাল, অযোধ্যা পাহাড়ঃ

     “হ্যালো স্যার, আমার নাম ডেভিড ফিঞ্চ। আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। মঙ্গলে কলোনি বানানোর দ্বিতীয় মিশন ‘সবকি মঙ্গল হো ২’ -এর মিশন লিডার আপনাকে নির্বাচিত করা হয়েছে। আপনাকে ওখানে থাকতে হবে এবং কলোনির মানুষদের নেতৃত্ব দিতে হবে। ISRO মিশনটার সমস্ত প্রোডাকশন ইউনিটগুলো দেখছে আর NASA এটিকে তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিয়েছে।” –ডেভিড ফিঞ্চ বলল নিতাইকে।

     “কিন্তু… আমি তো…” –নিতাই অপ্রস্তুত হয়ে বলল।

     “চিন্তা করবেন না স্যার। আমরা আপনার ব্যাপারে সব জানি। আর আমরা ভুল সিদ্ধান্ত নিইনি।” –ফিঞ্চ বলল।

2 thoughts on “পরিত্রাতা

  • July 16, 2018 at 1:01 am
    Permalink

    সখেদে জানাই, এতে গল্প-টল্প কিচ্ছু পেলাম না। আছে ক্লাস টেনের উপযোগী একটা স্পেকুলেটিভ রচনা, আর কিছু হাবিজাবি আবেগ। কল্পবিশ্ব-তে, যেখানে আমরা সুমিত বর্ধন, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, পার্থ দে, সোহম গুহ-র মতো লেখকের কলমে অনন্য লেখা পড়ে অভ্যস্ত, সেখানে এই গল্প চূড়ান্ত হতাশ করল।

    Reply
  • Pingback: পরিত্রাতা | কল্পবিশ্ব পত্রিকা – Suman Sen

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!