পরিবেশ কাহিনি

ঠাণ্ডা! শৈত্য! শীতল! মস্তিষ্কের কেন্দ্রস্থলে এই একটাই সংকেত পোঁছাচ্ছে আপাতত। স্নায়ু-জালের শাখা-প্রশাখা গুলো এখনো অচেতনতায় আচ্ছন্ন। হঠাৎ একটা যান্ত্রিক সংকেত সচল হয়ে উঠল। একটা নির্দিষ্ট ক্রমে পরিমিত বৈদ্যুতিক প্রবাহ এসে সটান আঘাত করল হৃদযন্ত্রে। সঙ্গে সঙ্গে অজস্র তারের জট বেয়ে জাগরণ বার্তা ধেয়ে এল শরীরটার সমস্ত প্রয়োজনীয় বৃত্তীয় ব্যবস্থায়। জাগো! জাগো হে নরদেহ! শতাব্দীব্যাপী জড় অবস্থা কাটিয়ে আবার জীবিত হও।

     দেহটার আধার থেকে বিশেষ সংরক্ষক তরল নির্গত হচ্ছে, আর তার জায়গায় ২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার ২১% অক্সিজেন ও ৭৯% নাইট্রোজেনের মিশ্রণ এসে আধারটাকে পূর্ণ করছে। বিদ্যুতের প্রবাহে প্রবলভাবে কেঁপে উঠল দেহটা। স্নায়ুমণ্ডল ধীরে ধীরে সচকিত হয়ে উঠছে। শরীরটার শিরা-ধমনী দখল করে থাকা কৃত্রিম কালচে তরলটা ক্রমে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে যকৃত, মজ্জা ও প্লীহা নিঃসৃত তাজা রক্তকণিকায়। অন্য দিকে অযুত-নিযুত ন্যানোবট ইতিমধ্যেই লেগে পড়েছে শরীরটার হাড়-মজ্জা-মাংশপেশী মেরামত করতে। নিপুণ নিয়ন্ত্রণে মানুষে প্রাণ সঞ্চার করছে যন্ত্র।

     একুশ ঘণ্টা পনেরো মিনিট! দেহ প্রস্তুত! এবার চেতনা ফিরছে মানব দেহটায়। দীর্ঘ অনভ্যাসে হৃদ্‌স্পন্দন, স্নায়ু, মাংশপেশী ও ফুসফুসের সম্মিলিত জড়তায় এখনও প্রবলভাবে কাঁপছে শরীরটা। কাশির দমক উঠছে থেকে থেকে। এভাবে কাটল আরও কয়েক ঘণ্টা। ক্রমে স্থিতিশীল হল শরীরবৃত্তীয় সমস্ত প্রক্রিয়া। চোখের পাতায় দেখা দিল কম্পন। যন্ত্রের হাত থেকে শরীরের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরিত হল মস্থিষ্কের চেতনার হাতে। চোখ মেলল মানবদেহ। কয়েক মিনিট অন্ধকারে চোখকে অভ্যস্ত হয়ে নিতে দিয়ে খুব ধীর গতিতে আধারটার ভেতরে ফুটে উঠল হালকা আলো। সরে যেতে থাকল আধারের ওপরের আবরণ। ধীরে ধীরে উঠে বসবার চেষ্টা করল মানুষটা। কিন্তু মাথাটা কয়েক ইঞ্চি তুলতেই চোখে অন্ধকার দেখে আবার এলিয়ে পড়ল সমস্ত শরীর। ঐটুকু পরিশ্রমেই প্রবল বিদ্রোহে হাঁফাতে লাগল তার ফুসফুস ও হৃদযন্ত্র। আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে রইল অনেকক্ষণ। আবার চেষ্টা করল সে মাথা তোলবার। এবারে একটু বল ফিরে এসেছে মনে হল শরীরে। অনেক কষ্টে দুই কনুইয়ে ভর দিয়ে মাথাটা একটু তুলে চারপাশে চেয়ে দেখল সে। চারপাশে যতদূর দেখতে পেল ততদূর পর্যন্ত তারই মতো কফিন-আকৃতির আধারের সারি। দূর আকাশে ছড়িয়ে থাকা তারার মতো বিন্দু বিন্দু আলো ফুটে রয়েছে এই কফিন সমুদ্রের মাঝে মাঝে। এই আলোর সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। সঙ্গে কফিনের ডালা খোলার মৃদু যান্ত্রিক ঘড়ঘড়ানিটাও। সময় হয়েছে। তাই পূর্বনির্ধারিত যান্ত্রিক ব্যাবস্থাপনায় এক একটি করে দেহে পুনঃজাগরিত হচ্ছে মানবজাতি।

     মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় সুদীর্ঘ সময় নিজেদের সংরক্ষণ করে আবার পুনরুজ্জীবিত হওয়ার এই চিত্র আমরা কল্পবিজ্ঞানের গল্প-উপন্যাস, বা ছবির পর্দায় বহুবার দেখেছি। অস্তিত্ব রক্ষার এই ব্যাবস্থার কখনও প্রয়োজন হয়েছে শত-সহস্র বছরের মহাকাশ যাত্রায় নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে, কখনও বা ধ্বংসপ্রাপ্ত মানুষের বাসের অযোগ্য পৃথিবীতে মাটির তলায় সৃষ্ট বাঙ্কারে নিজেদের প্রজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে অনুকূল অবস্থার জেগে ওঠার অপেক্ষায়। এই পৃথিবী মানুষের বসবাসের অযোগ্য হওয়ার অনেক কারণ আমরা পেয়েছি। পরমাণু যুদ্ধ, ভিনগ্রহের জীবদের আক্রমণ, বাতাসে মারণ ভাইরাস, রোবটদের পৃথিবী দখল থেকে শুরু করে অজানা ডার্ক ম্যাটারে তৈরি তারার আকর্ষণে পৃথিবীর কক্ষচ্যুত হয়ে অনন্ত মহাকাশে প্রক্ষিপ্ত হওয়া, কোনও কিছুই বাদ যায়নি।

     বিষদ বিশ্লেষণ করলে দেখলে দেখা যাবে যে, সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই কল্পিত কারণগুলোরও বিবর্তন ঘটেছে। উনবিংশ শতকে টেলিস্কোপ আবিষ্কৃত হওয়ার পরে এই আশঙ্কা ছিল দৃষ্টিগোচর হওয়া মঙ্গলের কল্পিত খাল কাটা বুদ্ধিমান জীব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও শীত-যুদ্ধের আমলে তা বদলে হয়েছিল পরমাণু যুদ্ধের বিকিরণে বিষিয়ে যাওয়া বাতাস, জীন-বিজ্ঞান আবিষ্কারের পরে তাই আবার হয়ে দাঁড়ায় মানুষের সৃষ্ট মারণ ভাইরাস; আর নব্বইয়ের দশকে কম্পিউটারের প্রসারের ফলে তা হয়েছিল যন্ত্রের পৃথিবী দখল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে যদি পৃথিবীর বিনাশের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য কারণ খোঁজা হয় তাহলে মনে হয় এদের সবার চেয়ে বেশি সম্ভাব্য কারণ হওয়া উচিত আবহাওয়ার পরিবর্তন।

     আর এই সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই গত দশ-পনেরো বছর ধরে পরিবেশ ও আবহাওয়ার বিপর্যয় বিশ্ব সাহিত্যের ও প্রধানত কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের নতুন সৃষ্টিতে একটা সামাজিক চালচিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। সাহিত্যের এই ধারাটিকে একটা বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করতে ২০০৫ সালে তাইওয়ানের একজন ইংরিজি সাহিত্যের শিক্ষক ও ব্লগার ড্যান ব্লুম একটি শব্দের প্রবর্তন করেন। সেই শব্দটি হল ক্লাই-ফাই (cli-fi) অর্থাৎ ক্লাইমেট-ফিকশন।

ক্লাই-ফাই শব্দটির প্রণেতা ড্যান ব্লুম

     কল্পবিজ্ঞানে পরিবেশ বা আবহাওয়া সংক্রান্ত বিপর্যয়ের ভাবনা কিন্তু নতুন নয়। সংখ্যায় বেশি না হলেও পরিবেশ ও আবহাওয়া সংক্রান্ত বিপর্যয় কল্পবিজ্ঞানের গল্পে সাম্প্রতিক কালের বহু আগেই আত্মপ্রকাশ করেছে। এই বিষয়ে সব চেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা হল ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত কিংবদন্তি কল্পবিজ্ঞান লেখক জুলে ভার্নের হারিয়ে যাওয়া উপন্যাস ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি’। সুদূর ১৮৮৩ সালেই জুলে ভার্ন প্যারিস শহরে অস্বাভাবিক শৈত্যপ্রবাহকে কেন্দ্র করে উপন্যাস রচনা করে গেছেন। পরবর্তী সময়ে ষাটের দশকে ব্রিটিশ লেখক জে জি ব্যালার্ড-এর লেখায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে (ব্যালার্ডের কিছু জনপ্রিয় উপন্যাস হল ‘দ্য উইন্ড ফ্রম নো হয়ার’, ‘দ্য ড্রাউন্ড ওয়ার্ল্ড’ ও ‘দ্য বার্নিং ওয়ার্ল্ড’)। তবে বলাই বাহুল্য পরিবেশ ও আবহাওয়া নিয়ে কল্পবিজ্ঞানের প্রসার ও ক্লাই-ফাই একটি আলাদা কল্পবিজ্ঞানের উপধারা হিসেবে স্বাতন্ত্র লাভ করেছে একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব-উষ্ণায়ণ, এল নিনো, পৃথিবীর ওজোন স্তরে ছিদ্র ইত্যাদি প্রাকৃতিক অবক্ষয় গল্পের পাতা ছেড়ে ঘোর বাস্তব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর।

     আধুনিক ক্লাই-ফাই-এর বিষয়ে লিখতে বসলে ড্যান ব্লুম, অর্থাৎ যার সঙ্গে আপনাদের পরিচয় আমি ইতিমধ্যে করিয়েছি “ক্লাই-ফাই” শব্দটির প্রণেতা হিসেবে, তাঁর কথা সবার আগে বলতেই হয়। ড্যান ব্লুম জন্মসূত্রে আমেরিকান হলেও বর্তমানে টোকিয়োর বাসিন্দা। ১৯৬৭ সালে ব্লুম যখন হাইস্কুলের ছাত্র, সেই সময়ে ইংরিজি সাহিত্যের ক্লাসে ব্লুমের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত নিল শ্যুট রচিত বিখ্যাত ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস ‘অন দ্য বিচ’-এর। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে পরমাণু যুদ্ধের হাত থেকে কোনওক্রমে রক্ষা পাওয়া কিছু মানুষ বিচ্ছিন্ন বসতি স্থাপন করে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে। বাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ও বাকি মানবজাতির বিলুপ্তি সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিত ঐ দলটির তেজস্ক্রিয় মেঘ ও তার থেকে হওয়া বৃষ্টির ফলে অবধারিত মৃত্যুর আগমনের আশঙ্কায় দিনযাপনের মর্মান্তিক চিত্র হল এই ‘অন দ্য বিচ’ উপন্যাস।

     কিশোর ব্লুমের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল এই ডিস্টোপিয়ান কাহিনি। পরবর্তি সময়ে একবিংশ শতাব্দীর গোঁড়ায় এসে ব্রিটিশ পরিবেশ বিজ্ঞানী জেমস লাভলকের মানব সভ্যতার ভয়াবহ বিলুপ্তির ভবিষ্যতবাণী সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধ দৈবাৎ হাতে এসে পরে ব্লুমের। লাভলকের হুঁশিয়ারি গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়ে যায় ব্লুমকে। তার মনে ভেসে আসে সেই কৈশোরে পড়া ‘অন দ্য বিচের’ বিভীষিকাময় কাহিনি। সাহিত্যের অধ্যাপক ব্লুম মনস্থির করেন যে মানবসমাজকে এই অনিবার্য বিপদের সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে তুলতে হলে সাহিত্য, সিনেমার মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা, ও পরিবেশ ধ্বংসের ফলে আবশ্যম্ভাবি বিপর্যয়ের চিত্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকারী উপায়। সেই উপলক্ষেই ব্লুম প্রতিষ্ঠা করেন cli-fi.net নামক একটি ওয়েবসাইট। পরিবেশ সংক্রান্ত গবেষক, সাহিত্যিক, মিডিয়া ও চিত্রপরিচালকদের একজোট করে সাহিত্য ও বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সাহায্যে আবহাওয়া পরিবর্তন সংক্রান্ত সচেতনতা বাড়ানোই এই ওয়েবসাইটের উদ্দেশ্য।

     পরিবেশ বা প্রকৃতি তো সব সময়েই সাহিত্যের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। সে কালিদাসের মেঘদূতই হোক, ওয়ার্ডসয়ার্থের প্রকৃতিচিত্রই হোক বা রবীন্দ্রনাথের বর্ষাপ্রেম। প্রকৃতির প্রাচুর্য্য, উর্বরতা, নৈসর্গ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় কখনও হয়েছে রোমান্টিকতার উৎস, কখনও বা তা হয়ে উঠেছে দৈবী আশির্বাদ। কিন্তু বাস্তবে প্রকৃতি নিষ্ঠুর। আদি অনন্তকাল ধরে প্রকৃতি এক হাতে গড়ে তো অন্য হাতে ভাঙ্গে। তার কোলে চলে জীবে জীবে খাদ্য-খাদকের নিষ্ঠুর সংগ্রাম। বিবর্তনের চক্রে ঘটে প্রজাতির উৎপত্তি ও বিলুপ্তি। আধুনিক যুগে প্রকৃতির এই রূপ সাহিত্যে উঠে এসেছে বহুবার সাহিত্য ও সিনেমায় রিয়েলিজম-এর প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ ও একবিংশ শতাব্দীর প্রকৃতির রূপ ভিন্ন। মানুষের সর্বগ্রাসি লোভ ও ঔদ্ধত্বের বলি একবিংশ শতকের প্রকৃতি। কিন্তু প্রকৃতি প্রবল। মানব সভ্যতার চরম উন্নতি সত্ত্বেও প্রকৃতির প্রত্যাঘাতের সামনে সে আজও নিরুপায়। আর হাজার হাজার বছরের অত্যাচার এর প্রতিবাদে আজ প্রকৃতি প্রত্যাঘাতে প্রবৃত্ত। এই প্রত্যাঘাতে আজ মানুষের অস্তিত্ব যতটা বিপন্ন, ততটা সভ্যতার ইতিহাসে আর কখনও হয়নি। আগামী কয়েকটা দশক হয়ত মানুষের নিজের অস্তিত্ব সুরক্ষিত করবার শেষ সুযোগ। আর এই বাস্তবের সঙ্গে সারা পৃথিবীর পরিচয় ঘটানোই ক্লাই-ফাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। এবং ক্লাই-ফাই ধীর কিন্তু শক্তিশালী পদক্ষেপে সেই উদ্দেশ্যেই এগিয়ে চলেছে।

     একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বসাহিত্যে ক্লাই-ফাই নিয়ে আলোচনা করতে হলে একবিংশ শতাব্দীর কয়েকটি অসামান্য কাজের উল্লেখ করতেই হবে। সেরকমই কয়েকটি গল্প ও উপন্যাস নিয়ে এবার বলব।

ফার নর্থ (২০১০), লেখক- মার্সেল থিরো

     ফার নর্থের গল্পের শুরু একটি সাইবেরিয়ান জনপদে। গল্পের নায়িকা মেকপিস হ্যাটফিল্ডের বাবা ঐ জনপদের প্রথম বাসিন্দাদের মধ্যে একজন। যান্ত্রিক সভ্যতায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি উত্তরে জনবিরল এক এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। সাইবেরিয়া সম্পর্কে যা শুনে এসেছিলেন, সেই বরফ শীতল জীবনযাপনের অযোগ্য জায়গার বদলে তিনি এসে দেখতে পান সুন্দর উর্বর অঞ্চল, নদীনালায় প্রচুর মাছ, জঙ্গলে প্রচুর বন্যপ্রাণী। মেকপিসের জন্মও এখানেই। সে কোনওদিন যান্ত্রিক সভ্যতা বা বড় শহর চোখে দেখেনি। তবে ইতিমধ্যে তাদের সেই সাইবেরিয়ান নন্দনকানন ধ্বংসপ্রাপ্ত। দক্ষিণ থেকে আগত বুভুক্ষু মানুষের স্রোত সামলাতে সেই এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ রিক্ত। এই অবস্থায় একদিন মেকপিসের গ্রামের কাছে ভেঙে পড়ল একটা বিমান। অবাক বিস্ময়ে সে প্রথম প্রত্যক্ষ করল সভ্যতার এক নিদর্শন। প্রবল কৌতূহলে সেই সভ্যতার স্বরূপ জানতে সে ঘোড়ার পিঠে চেপে বেরিয়ে পড়ল এক অ্যাডভেঞ্চারে। কী হল তার এই অ্যাডভেঞ্চারের পরিণাম? সেটার বিবরণ উহ্যই থাক এখানে। কিন্তু ফার নর্থ যে কারণে উল্লেখযোগ্য তা হল এই প্রথম উপন্যাস যেখানে পরিবেশ বা প্রকৃতি ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে মানব সভ্যতার ধ্বংসের বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব কমে অচল হয়ে পড়েছে বিমান পরিষেবা। ভেঙে পড়া বিমানটার দুর্ঘটনাও সেই কারণেই। বড় বড় বিমানবন্দর গ্রাস করে নিয়েছে ঘন জঙ্গল। আবহাওয়ার পরিবর্তন ও সভ্যতার ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে ভেঙে পড়া বিমান এখানে একটা রূপক। গল্পে মেকপিসের মুখে একই সুরে শোনা গিয়েছে কিছু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও অঙ্কের মূর্ত অবস্থা হিসেবে বিমানের অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যের কথা, আর সঙ্গে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষেরও সুন্দর সৃষ্টির ধ্বংসের প্রতি আক্ষেপ।

আই এম উইথ বিয়ারস(২০১১ তে প্রকাশিত গল্পসংগ্রহ), সম্পাদনা মার্ক মার্টিন

     বর্তমান যুগের বেশ কিছু দিকপাল লেখকের লেখা পরিবেশ সংক্রান্ত ছোটগল্পের সংগ্রহ এই বইটি। হেলেন সিম্প্সন, ডেভিড মাইকেল সহ বেশ কিছু অন্যন্ত খ্যাতিমান লেখনের লেখা রয়েছে এই বইয়ে। বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক কচকচি বা পরিসংখ্যানের উর্ধ্বে উঠে পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর স্বরূপ গল্পের মাধ্যমে সাধারণের বোধগম্য করে তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে এই বইটির প্রত্যেকটি গল্পে।

ব্যাক টু দ্য গার্ডেন (২০১২) ক্লারা হিউম

     এই উপন্যাসও ফার নর্থের মতো একটা অ্যাডভেঞ্চারধর্মী সন্ধানী যাত্রা নিয়ে। পাঁচজন নগরসভ্যতা পরিত্যাগ করা অরণ্যবাসীর যাত্রার বিবরণ। একজন পথ হারানো ফিল্মস্টার এসে পরে তাদের অরণ্যনিবাসে। সেই ফিল্মস্টারকে তার পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আবহাওয়া বিপর্যয় উত্তর একটা সভ্যতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই যাত্রা; খানিকটা ‘উইজার্ড অফ অজ’ এর যাত্রার ঢঙ্গে নানা অভিজ্ঞতা ও মানুষের সংস্পর্শ লাভ করে যাত্রিদল আবার ফিরে আসে তাদের গ্রামে। কিন্তু পরিবর্তিত মানুষ হয়ে, কিছু নৈরাশ্য ও কিছু আশার আলো নিয়ে।

এগুলো ছাড়াও সাম্প্রতিক কালের আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ক্লাই-ফাই হল

  • ‘দ্য হিলার’ (২০১৩), লেখক – আনতি তোউমাইনেন
  • ‘অডস আগাইন্সট টুমরো’ (২০১৩), লেখক – নাথানিয়েল রাইখ
  • ‘সোলার’ (২০১০), লেখক – ইয়ান ম্যাকোয়েন
  • ‘ওয়াইল্ড ওয়ানজ’ (২০১৩), লেখক – জন মুয়ালেম
  • ‘অরিক্স এন্ড ক্লার্ক’ (২০০৪), লেখক – মার্গারেট এটউড

     ক্লাই-ফাই নিয়ে গত দশ-পনেরো বছরে আরও বেশ কিছু গল্প ও উপন্যাস লেখা হয়েছে। হলিউড ও খুব একটা পিছিয়ে নেই। হলিউডে নির্মিত ক্লাই-ফাই সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রথম প্রয়াস অবশ্যই ১৯৯৫ এ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘ওয়াটার-ওয়ার্ল্ড’। এর পরে আরও কিছু সিনেমার উল্লেখ করতেই হয়, যেমন ২০১২ (২০০৯), স্নো-পিয়ারসার (২০১৩), ডে আফটার টুমরো (২০০৪), ওয়াল-ই (২০০৮)। তবে সাধারণার্থে ক্লাই-ফাই না হয়েও পরিবেশ সমস্যার নিয়ে সবচেয়ে বাস্তব-সম্মত চিত্রায়ন সম্ভবত হয়েছে ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ক্রিস্টোফার নোলান নির্দেশিত ‘ইন্টারস্টেলার’-এ। ওই ছবির প্রথম কয়েক-মিনিটে যে পরিবেশ বিপর্যস্ত পৃথিবীর ছবি দেখান হয়েছে তার মতো বাস্তবসম্মত চিত্রায়ন সম্ভব তার কোনও চলচ্চিত্রে হয়নি। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হওয়া পৃথিবী যে আস্তে আস্তে সবার অগোচরে তার উর্বরতা, তার বাস্তুতন্ত্র ও বিষাক্ত দূষণ শোষণ করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে তার ভবিষ্যৎ পরিণতির রুঢ় বাস্তব আজকে বসে ধারণা করা মানবজাতির পক্ষে সম্ভব নয়, সিনেমা এই বাস্তব সম্ভাবনাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকারী মাধ্যম। ও সেই কাজটাই নোলান সফলভাবে করেছেন ইন্টাস্টেলার-এ।

     তবে চলচ্চিত্র হোক বা উপন্যাস, আজ অবধি প্রকাশিত সমস্ত ক্লাই-ফাই কাহিনিতে একটা সাধারণ বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে এসেছে ডিসটোপিয়া। যেহেতু বর্তমান সমাজ ও পৃথিবীতে আমরা এখনও দূষণ ও পরিবেশ সমস্যার কোনও বাস্তবসম্মত ও নির্ভরযোগ্য সমাধান খুঁজে বার করতে পারিনি, তার প্রতিফলন ক্লাই-ফাই এর ক্ষেত্রেও পড়েছে। সব ক্লাই-ফাইতেই বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পরে মানুষের অস্তিত্ব ও মনুষ্যত্ব রক্ষা করবার সংগ্রামই প্রাধান্য পেয়েছে অন্য সব কিছু ছাপিয়ে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এমন কোনও উল্লেখযোগ্য ক্লাই-ফাই এর সন্ধান আমরা পাই না যেখানে মানুষের অসামান্য মেধার প্রয়োগে দুর্যোগ এড়ানোর উদাহরণ বা সমতুল্য আশাবাদী কোনও বিষয়বস্তু প্রাধান্য পেয়েছে। ক্লাই-ফাই নিয়ে সমালোচকদের আর একটা অভিযোগের জায়গা হল বেশিরভাগ ক্লাই-ফাই গল্প বা উপন্যাস সাহিত্যের রসোত্তির্নতার থেকে আবহাওয়া সংক্রান্ত বিপর্যয় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বিবরণের ভারে ভারাক্রান্ত। এর সম্ভাব্য কারণ হয়ত ক্লাই-ফাই এর প্রবর্তনের মূলে থাকা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সম্ভাব্য বিপর্যয় সংক্রান্ত সচেতনতা প্রসারের প্রয়াস। তবে ড্যান ব্লুম এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন যে, এই সাহিত্যের ধারাটি এখনও নবীন। সময়ের সঙ্গে এর সাবালকত্ব প্রাপ্তি হবে ও ভবিষ্যতের ক্লাই-ফাই এই সমস্ত দোষ-ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে পারবে বলেই তিনি আশা করেন।

     ভারতীয় সাহিত্যে ক্লাই-ফাই এর প্রসারের শুরুটা একটু দেরিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে আবহাওয়া সংক্রান্ত বিপর্যয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ভারতবর্ষ তার অন্যতম। সুতরাং ক্লাই-ফাই এর গুরুত্ব ভারতবর্ষের সাহিত্য ও সিনেমায় ঠিক কতটা তা সহজেই অনুমান করা যায়। ভারতবর্ষে এই বিষয়ে প্রথম পদক্ষেপ সম্ভবত নিয়েছেন আইআইটি কানপুর-এর বিশিষ্ট অধ্যাপক ডঃ টি রবিচন্দ্রন। তার ব্যাবস্থাপনায় সেখানে ক্লাই-ফাই এর প্রচার ও প্রসার এবং সেই সূত্র ধরে আবহাওয়া সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক সমস্যা নিয়ে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ-সংক্রান্ত পাঠক্রম শুরু হয়েছে ২০১৫ সাল থেকেই। তবে ভারতীয় সিনেমা বা সাহিত্যে পরিবেশ ও আবহাওয়া সমস্যা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনও কাজ এখনও অবধি আমরা পাইনি। তবে ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেই আশা রাখা যায়।

তথ্যসূত্রঃ

  1. http://cli-fi.net/
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Climate_fiction
  3. https://www.theguardian.com/environment/climate-consensus-97-per-cent/2017/oct/18/clifi-a-new-way-to-talk-about-climate-change
  4. https://www.dissentmagazine.org/article/cli-fi-birth-of-a-genre
  5. https://link.springer.com/chapter/1057/978-1-137-55124-5_7

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!