পিউপা

দেবলীনা চট্টোপাধ্যায়

অলংকরণ:অঙ্কিতা

“এই মুহূর্তে বাংলা তথা ভারতীয় কল্পবিজ্ঞানের চেহারাটা ঠিক কেমন? তারই আভাস মিলবে ২২-২৪ নভেম্বর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগ ও বাংলার প্রথম কল্পবিজ্ঞান-ফ্যান্টাসি বিষয়ক ওয়েব পত্রিকা ‘কল্পবিশ্ব’ আয়োজিত আন্তর্জাতিক কল্পবিজ্ঞান সমাবেশ ‘ওয়র্কশপস অব হরিবল ক্রিয়েশন’-এ। মেরি শেলির অমর সৃষ্টি ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ প্রকাশের ২০০ বছর উপলক্ষেই এই অনুষ্ঠান। ইংরেজি বিভাগের প্রেক্ষাগৃহে এই সমাবেশে থাকবেন এণাক্ষী চট্টোপাধ্যায়, অমিতানন্দ দাশ, রণেন ঘোষ…”

     চোখের সামনেটা কেমন ঝাপসা হয়ে এল। খবরের কাগজটা কোলের ওপর এলিয়ে পড়েছে। কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা! সেমিনার! আবার!

     নভেম্বরের সকাল। কলকাতায় চিটচিটে গরমের ভাবটা এখনও থাকলেও আমার বারাসতের এই ছায়াঘেরা ফ্ল্যাটটা সকাল সন্ধে বেশ মিহি কুয়াশার ঠান্ডা চাদর মুড়ে যাচ্ছে। টবের চন্দ্রমল্লিকা গাছটায় ক’টা ছোট্ট ছোট্ট ফুল হয়েছে। রাণুর মায়ের অবদান। একটা হলদে-কমলা প্রজাপতি ফুরফুর করে উড়ে এসে বসল বেগুনি চন্দ্রমল্লিকায়। নয়নাভিরাম দৃশ্য। কিন্তু আমার মাথার মধ্যে যেন ওই হলদে-কমলার মধ্যে এক ফোঁটা কালচে সবুজ মিশে যাচ্ছে… একটা কদাকার শুঁয়োপোকা আস্তে আস্তে নিজের চারদিকে তৈরি করছে পাঁশুটে রঙের খরখরে খোলস…

     পিউপা।

     পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে তুলে নিলাম খসড়া খাতাটা। উল্টোদিকের দেওয়ালে তখন চলতে শুরু করেছে একটা চলমান দৃশ্য… একটা সেমিনার হল… বছর পনেরো আগের এক দুপুর…

     লাউঞ্জের এককোণে রাখা কফি মেশিনটা থেকে এক কাপ কফি নিয়ে সবে আয়েশ করে চুমুক দিয়েছি, এমন সময় নজর পড়ল উল্টো দিকটায়। সেকি! রবীন্দ্রনাথের ফোটোটার নীচে একা একা দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছেন ডঃ মজুমদার। কেমন যেন জড়োসড়ো। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না! বিশ্ববিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট্রির প্রাক্তন অধ্যাপক ও গবেষক ডঃ প্রশান্ত মজুমদার যাদবপুরের ছেলেপুলেদের ডাকা এই সেমিনারে আসছেন শুনেই এখানে আসার ব্যাপারে নেচে উঠেছিলাম আমি! না হলে তো এডিটর সুনীলদা নতুন ইনটার্ন ছেলেটাকে পাঠিয়েই দিচ্ছিল। ব্যাপারটা এমনিতে বেশ নতুন। যাদবপুর ইউনিভার্সিটির কিছু ছাত্র আর প্রাক্তনী মিলে কল্পবিজ্ঞানের ওপর একটা ম্যাগাজিন বের করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাতে এই প্রথম! সেই উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই সেমিনারে বেশ কয়েকজন তাবড় তাবড় সাহিত্যিকদের পাশাপাশি জীববিজ্ঞানের গবেষক, ভূপর্যটক, ইতিহাসবিদ, কার্টুনিস্ট এরকম নানা ক্ষেত্রের গুণীজনদের ডাক পাঠানো হয়েছে। তবে এই অতিথি তালিকায় নিঃসন্দেহে সব থেকে সাড়া জাগানো নাম ডঃ মজুমদারের। আরও আশ্চর্য্যের বিষয়, এখানে এসে জানতে পারলাম ডঃ মজুমদার এই সেমিনারের খবর পেয়ে নিজে থেকেই যোগাযোগ করেছেন উদ্যোক্তাদের সঙ্গে! এমন বিখ্যাত গুণী মানুষের চারপাশে কৌতূহলী মানুষের ভিড় ঘিরে থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু…

     “স্যার, অটোগ্রাফ প্লিজ!”, একটা বেঁটেখাটো মেয়ে পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে এসে খাতায় সই করিয়ে নিয়ে গেল। আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন ডঃ মজুমদার। অবশ্য ওঁর স্পিচের সময় থেকেই এই ব্যাপারটা আমার চোখে ঠেকেছে। আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল জীবজগতের ওপর বিবর্তনের প্রভাব। প্রায় সকলের বক্তব্যেই ঘুরে ফিরে এসেছে বিবর্তনবাদের ইতিহাস, কিছু প্রাণীর ওপর চমকপ্রদ ভাবে বিবর্তনের প্রভাব, লেখক-কার্টুনিস্টদের সৃষ্টিতে সেই বিবর্তনের সঙ্গে কল্পনার মিশ্রণ, সর্বোপরি কল্পবিজ্ঞানের জগতে এর প্রয়োগ। সবার শেষে বলতে উঠলেন ডঃ মজুমদার। কিন্তু তাঁর বক্তৃতা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই চাপা গুঞ্জন আর মুখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু হয়ে গেল শ্রোতাদের মধ্যে। প্রকৃতির খেয়ালে প্রাণীকুলের মধ্যে যুগ যুগ ধরে যেসব পরিবর্তন হয়ে আসছে, ডঃ মজুমদারের দাবী সেই পরিবর্তনকে নাকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়! বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নানারকম কেমিক্যাল প্রয়োগের ফলে মানবশরীরে নাকি কিছু স্থায়ী বিবর্তন ঘটানো যায়, যা মানবজাতিকে আরও শক্তিশালী, প্রায় অজর-অমর করে তুলবে! তারপর থেকেই বাকিদের মুখে ওঁকে নিয়ে বাঁকা হাসি দেখছি। কেউ কেউ মাথার ওপর আঙুল ঘুরিয়ে ইশারা করছে, কেউ কেউ তো বলেই ফেলছে, “দুর মশাই! এ আবার হয় নাকি! কিছু একটা বললেই হল!” কেউ বলছে, “আরে পড়ে পড়ে পাগল হয়ে গিয়েছে! শুনেছি দুম করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদেশ থেকে চলে এসেছে, এখন কী করে কোথায় থাকে কেউ জানেও না। পাগলামির জন্য ওখান থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে কিনা কে জানে!” আমার অবশ্য তেমন চমক লাগেনি। বহুবার সাধারণ মানুষের বোধবুদ্ধিতে আসে না এমন বেশ কিছু ঘটনার মধ্যে গিয়ে পড়েছি আমি। তা ছাড়া বহু বছর আগে শৈশবকালে এক বৃদ্ধা শিখিয়ে দিয়ে গেছেন… যাক গে, শেষ হয়ে যাওয়া কফির কাপটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে গিয়ে সটান দাঁড়ালাম প্রোফেসরের সামনে, “নমস্কার ডঃ মজুমদার, আমি বিতংশ খাসনবীশ। আনন্দবাজার থেকে আসছি। আপনার স্পিচটা খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল। যদি আপত্তি না থাকে তাহলে কোথাও বসে একটু কথা বলা যেতে পারে? আপনার রিসার্চটা নিয়ে একটু ডিটেইলসে জানতে চাই।”

     “অ্যাঁ!”, থতমত খেয়ে চোখ বড় বড় করে তাকালেন ভদ্রলোক। তাঁর ঝুলে যাওয়া চোয়াল দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ব্যাপারটা তাঁর কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত। কোনওমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ… মানে… চলুন… রাস্তার উল্টো দিকটায় একটা কফি শপ আছে…”

     “আচ্ছা, ব্যাপারটা কি সত্যি সম্ভব?” স্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে বললাম। আলাপ পরিচয় পর্ব সারার পর বেশ সহজ হয়েছেন প্রোফেসর। এই যাদবপুর থেকেই কীভাবে পড়াশোনা শেষ করে বিদেশে পাড়ি দেওয়া, আর তারপর হিউম্যান ইভোলিউশনের ওপর রিসার্চ… মনে হচ্ছিল বহু দিন পর কারও সঙ্গে খোলা মনে গল্প করছেন। কখন যেন ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ তে নেমে এসেছেন। আমার প্রশ্নটা শুনে যেন একটু আনমনা হয়ে গেলেন। আমি অবশ্য ততক্ষণে পুরোদস্তুর সাংবাদিকের খোলসে ঢুকে পড়েছি, “মানে, বিবর্তন তো একটা প্রাকৃতিক ব্যাপার, সেটাকে…”

     “রক্তের রং হয় কেন লাল?” হঠাৎ একটা অদ্ভুত ঘোরলাগা গলায় সুর করে বলে উঠলেন ডঃ মজুমদার। ওঁর ঘাড়ের কাছে বোধহয় কোনও পোকা-টোকা কামড়েছে, ফ্যাটফেটে ফ্যাকাসে রঙের ওপর কালচে দাগ। সেটা একটু চুলকে নিয়ে লাইনটা শেষ করলেন, “সেটা জানলেই হবে কামাল!”

     “সে তো ক্লাস ফাইভের বাচ্চাও জানে” মুখ ফসকে তাচ্ছিল্য ছিটকে এল আমার গলা থেকে, “হিমোগ্লোবিনের জন্য, আবার কি?”

     “হুমম। এই হিমোগ্লোবিনটা আসলে কি বলো তো?”, প্রোফেসরও দুঁদে শিক্ষকের মতো পড়া ধরতে শুরু করলেন।

     “ওই তো, এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ, আয়রণ আর প্রোটিনের এক রকমের অক্সাইড…”, বলতে বলতে সবে ভাবতে শুরু করেছিলাম এবার হিমোগ্লোবিনের কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন জানতে চাইলেই গেছি, এমন সময় এমন একটা অদ্ভুত কথা বলে উঠলেন প্রোফেসর যে মিনিট কয়েকের জন্য সব ভাবনা চিন্তায় ফুলস্টপ পড়ে গেল!

     আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে আড়চোখে চারদিক দেখে নিয়ে নীচু স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠলেন প্রোফেসর, ঠিক যেন বাচ্চাদের গল্প শোনাচ্ছেন… “ঠিক! ঠিক! কিন্তু… মানে, ধরো, যদি ওই আয়রণের জায়গায় অন্য কিছু জুড়ে যায়? অন্য কোনও মেটাল? কোনও ট্রানজিশন মেটাল? হয়তো সেই মেটালের অক্সাইড হিমোগ্লোবিনের থেকে অনেক অনেক বেশি অক্সিজেন সরবরাহ করবে শরীরে? তার ফলে কী হবে জানো? মানুষের কর্মক্ষমতা কয়েকশো গুণ বেড়ে যাবে! বার্ধক্যের প্রভাব অনেক কমতে থাকবে, সহজে বুড়ো হবে না মানুষ! আর তখন শুধু মস্তিষ্ক বা বুদ্ধির দিক দিয়ে নয়, শারীরিক শক্তির দিক দিয়েও মানুষ হয়ে উঠবে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী! অমর হবে মানুষ!”

     প্রোফেসরের গলার মধ্যে একটা অদ্ভুত চাপা উল্লাস ঠিকরে বেরোচ্ছিল, আমার গা-টা কেমন শিরশির করে উঠল। কপাল অব্দি নেমে আসা কান ঢাকা টুপির নীচ দিয়ে খুদে খুদে চোখগুলো অস্বাভাবিক রকমের জ্বলজ্বল করছে! কিন্তু এসব কি ভয়ঙ্কর কথা বলছেন ডঃ মজুমদার! মানুষের রক্তে অন্য কোনও ধাতু মেশানোর ফল… “কিন্তু বিষক্রিয়া?” মাথার ভেতর চলতে থাকা কথাগুলো অস্ফুটে বেরিয়ে এল আমার মুখ দিয়ে।

     “হবে না! হবে না!”, বুড়ো আঙুল নাড়তে নাড়তে ছোট বাচ্চাদের মতো আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলেন ডঃ মজুমদার, “তুমি তো বেলাকে দেখোনি, দেখলে বুঝতে পারতে!” তারপর যেন আনমনে বলে উঠলেন, “দেখো, যে গবেষণার কাজে হাত লাগিয়েছি তা শেষ পর্যন্ত সফল হবে কি না আমার জানা নেই, তবে এটুকু বলতে পারি সেটা হলে মানব সভ্যতার ধারাটাই পাল্টে যাবে হয় তো! আমারও ইচ্ছে করে সবার সামনে তুলে ধরি আমার এই অত্যাশ্চর্য সন্ধানের কথা। তাই তো এই সেমিনারের খবর পেয়ে নিজেই ছুটে এসেছিলাম…”, বলতে বলতে কেমন যেন ম্লান হয়ে এল তাঁর গলা। বিষণ্ণ স্বরে বললেন, “ভেবেছিলাম ইয়ং জেনারেশনের ছেলেমেয়ে এরা, মনের দরজাটা খোলা, নতুন জিনিসকে সহজ ভাবে গ্রহণ করার ক্ষমতা এদের আছে… কিন্তু…”, বারদুয়েক মাথা নেড়ে চুপ করে গেলেন ভদ্রলোক। ততক্ষণে আমার মাথার মধ্যে একটা দারুণ বুদ্ধি জেগে উঠেছে। একসময় এই মানুষটি সম্পর্কে নামকরা প্রফেসর আর পন্ডিতরা যে কতটা উচ্ছ্বসিত ছিলেন সেটা নিজের চোখে দেখেছি! সেই তিনি যখন এতটাই নিশ্চিত হয়ে কিছু বলছেন, তখন সেটা একেবারে ফেলনা হতে পারে না। একটা চমকে দেওয়া স্টোরির গন্ধ আমি ততক্ষণে পেয়ে গেছি। এই সুযোগ কোনওমতেই ছাড়া যায় না!

     আমার প্রস্তাবটা শুনে চমকে উঠলেন তিনি। একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলে উঠলেন, “তুমি সত্যিই যেতে চাও?”

     নাহ, যাদবপুরের সেই তরতাজা ছেলেগুলোর উদ্যোগ শেষমেশ সাফল্য পায়নি সেবার। বাংলার প্রথম কল্পবিজ্ঞান পত্রিকার স্বপ্নটা অধরাই থেকে গেছিল কোনও কারণে। কিন্তু এক বৈশাখি বিকেলে ঘটে যাওয়া সেই সেমিনার আর প্রোফেসর মজুমদারের সঙ্গে আলাপ আমাকে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল এক অকল্পনীয় অভিজ্ঞতার সামনে, সেই রোমহর্ষক ঘটনার সামনে যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম একমাত্র আমি।

     নাকি বেলাও?

     ডঃ মজুমদারের সাদা অ্যাম্বাসাডরে চড়ে রওনা দিয়েছিলাম। ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে নামখানা পেরিয়ে বাসন্তীপুর বলে একটা জায়গায় ওঁর বাড়ি। “আমার জন্মস্থান আসলে কিন্তু উত্তর কলকাতা, বুঝলে! শ্যামবাজারে পৈতৃক বাড়ি ছিল। বিদেশ থেকে যখন ফিরলাম ততদিনে মা-বাবাও মারা গেছেন, একটাই বোন বিয়ে করে অস্ট্রেলিয়ায় সেটল্‌ড। ভাইবোনে আলোচনা করে বেচে দিলাম বাড়িটা। আসলে আমার রিসার্চটা তো এইরকম ভিড়ে ঠাসা কলকাতা শহরে সম্ভব নয়, তাই বাসন্তীপুরের ওখানে কিছুটা জমি কিনে বানিয়েছি আমার ল্যাব”, গাড়ি চালাতে চালাতে বলছিলেন প্রোফেসর। সূর্য পশ্চিমে ঢলতে শুরু করলেও রোদের তেজ এখনও বেশ ভালোই, রীতিমতো ঘামছিলাম। ডঃ মজুমদারের অবশ্য তেমন তাপ-উত্তাপ আছে বলে মনে হল না। গলা অবধি বোতাম লাগানো ফুলহাতা জামা, ফুলপ্যান্ট, পায়ে বুটজুতো, এমনকি এই গরমেও গলায় একটা পাতলা স্কার্ফ আর কান ঢাকা সুতির টুপি সত্বেও বেশ চনমনেই লাগছিল ওঁকে। শহর ছাড়াতেই অবশ্য হালকা হালকা ঠান্ডা হাওয়ার ঝলক ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করল চোখে মুখে। দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত, ছোট ছোট বাজার এলাকা পেরিয়ে নামখানার পরে ডানদিকে একটা ভাঙাচোরা রাস্তায় ঢুকে গেল গাড়ি। এখানে এসে দৃশ্যপট পালটে গেল ধীরে ধীরে। প্রথম প্রথম বিচ্ছিন্ন কয়েকটা দোকানঘর ছাড়া তেমন কোনও ঘর-বাড়ি নজরে পড়ছিল না। দু-দিকে শুনশান বালিয়াড়ি, মাঝে মাঝে বুক সমান উঁচু কেয়া জঙ্গল, নারকেল গাছের সারি। বুঝতে পারছিলাম সমুদ্রের কাছাকাছি এসে পড়েছি। ডঃ মজুমদার আপনমনে বকবক করে যাচ্ছিলেন। আমি একবার ওঁর ‘বেলা’র প্রসঙ্গে ঢোকার চেষ্টা করতেই, “আরে চলোই না! নিজের চোখেই দেখতে পাবে!” বলে সহর্ষ পিঠ চাপড়ানি এসেছে উল্টোদিক থেকে। এইভাবে প্রায় আধঘণ্টা চলার পর গাড়ি যখন থামল, তখন সূর্যের শেষ আলোটাও প্রায় মিলিয়ে এসেছে কালচে আকাশের বুক থেকে। গাড়ি থেকে নেমেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল! ধু ধু বালিয়াড়ি আর রুক্ষ অনুর্বর জমির মধ্যে দাঁড়িয়ে শুধু একখানা ছোট একতলা বাড়ি! জায়গায় জায়গায় কেয়া ঝোপ আর দূরে নারকেল গাছের সারি ছাড়া আর কোথাও কিচ্ছু নেই! একেবারে প্রকৃত অর্থে যাকে বলে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’! এইরকম একটা জনমানবহীন খাঁ খাঁ জায়গায় থাকেন ডঃ মজুমদার! মাঝেমধ্যেই ওঁর কথাবার্তা অসংলগ্ন লাগছিল বটে, কিন্তু এরকম একটা বেয়াড়া জায়গায় যে আমাকে এনে ফেলবেন ভাবিনি। সেমিনারের ওই ছেলেগুলোর কথাই ঠিক নয়তো? ডঃ মজুমদার কি আদৌ সুস্থ?

     সাত-পাঁচ ভাবনার মধ্যেই কানে ভেসে এল প্রোফেসরের নরম গলা, “নিশ্চয়ই এমন জায়গায় বাড়ি দেখে একটু অকওয়ার্ড ফিল হচ্ছে তোমার? আরে টেনশন করো না ইয়ংম্যান! চলো চলো, আমার ডেরায় চলো, সব বুঝতে পারবে!” অগত্যা! পা বাড়ালাম মজুমদার বাবুর পেছন পেছন। এ ছাড়া উপায়ও তো ছিল না!

     বাড়িটা বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো। পেছন দিকটায় বেড়া দিয়ে ঘিরে ছোট বাগান, কুমড়ো-বেগুন কয়েকরকম সব্জীর চাষ হয়েছে। তবে সবেতেই বেশ যত্নের ছাপ স্পষ্ট। ঢুকে একটা সরু মতো প্যাসেজের এক দিকের একটা রুমে নিয়ে গিয়ে বসালেন ডঃ মজুমদার। ছোট্ট বাহুল্যবর্জিত ঘর। একদিকে একটা কাঠের আলমারি, একটা খাট, গোটা দুই প্লাস্টিকের চেয়ার আর একটা নীচু টেবিল। “তুমি একটু বোসো, আমি এক্ষুণি আসছি”, বলে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেলেন প্রোফেসর। আমার ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠছিল। মনের মধ্যে একটার পর একটা প্রশ্ন কিলবিল করতে করতে উঠে এসে ছোবল মারছিল, আর একটু একটু করে ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙছিল আমার। টেবিলের উল্টো দিকটায় একটা খোলা জানালা দিয়ে শন শন করে হাওয়া আসছে। কোত্থাও কোনও শব্দ নেই, একটা ঝিঁঝির ডাক অব্দি না। এরকম ভয়ঙ্কর শব্দহীনতার মধ্যে দিনের পর দিন কীভাবে থাকতে পারে মানুষ! মরা চাঁদের আলোয় দূরে সিল্যুয়েটের মতো দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছের সারির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ পেছন থেকে আওয়াজ শুনলাম, “এসো বিতংস, একটু জলখাবার খেয়ে নাও…”

     কিছু কিছু দৃশ্য থাকে যেগুলো মানব মস্তিষ্কের সচলতম অংশটার দেওয়ালে মোটা মোটা দাগে খোদাই হয়ে যায়। তার রূপ-রস-গন্ধ-পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ স্মৃতির অতলে পাতলা সর ফেলতে থাকে বছরের পর বছর ধরে। ডঃ মজুমদারের ডাকে পেছন ঘুরতেই একটা অভাবনীয় দৃশ্যে আমার বুকের ভেতর অব্দি দমাস করে এক ভীষণ জোর ধাক্কা লাগল!

     দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন ডঃ মজুমদার। আর তার একপাশে একটা থালা হাতে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুতদর্শন জীব! হ্যাঁ, জীবই বটে! যদিও বাহ্যিক রূপ অনুযায়ী তাকে একজন বছর পঞ্চাশেকের মহিলা বলেই মনে হয়। পরনে লুঙ্গির মতো কিছু একটা, উর্ধাঙ্গে ফতুয়ার ওপর দিয়ে গামছা বাঁধা সাঁওতাল রমণীদের মতো, চুলের পেছনের দিকটায় বিশাল বড় এক জটা, সামনের চুলগুলোতে সাপের লেজের মতো সরু সরু বিনুনি করে তাতে রংবেরঙের পুঁতির মতো কিসব লাগানো। চ্যাপ্টা নাক, পুরু ঠোঁট আর কুতকুতে চোখগুলো দেখে বোঝা যায় সম্ভবত নিগ্রো জাতির লোক। কিন্তু সবথেকে আশ্চর্যজনক হচ্ছে তার গায়ের রং।

     সবুজ।

     হাত-পা-মুখমণ্ডল, এমনকি চোখের সাদা অংশটা পর্যন্ত থানকুনি পাতার রসের মতো কালচে সবুজ! এ কোন জাতীয় জীব? নাকি সবুজ রং মেখে সং সেজেছে? কিন্তু তাহলে চোখের ভেতরটা অব্দি…

     “মিট বেলা! মাই মোস্ট প্রেশিয়াস জেম!”, দুদিকে হাত ছড়িয়ে অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ গলায় ঘোষণা করলেন ডঃ মজুমদার! ঠিক যেমন জাদুকর তার আস্তিনের ভেতর থেকে সঠিক তাসটা বের করে মিলিয়ে দেয় সবকিছু!

     আমার মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। সেই ঘন সবুজ রং যেন আমার চেতনায় কেমন একটা অসাড়তার ছায়া ফেলছিল, ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল আমার! এই জিনিসটা আসলে কি? কোনও জন্তু, নাকি প্রোফেসরের তৈরি কোনও রোবট? কী নিয়ে রিসার্চ করছেন প্রোফেসর? আমার মুখভঙ্গী লক্ষ করে এগিয়ে এলেন ডঃ মজুমদার, হাত ধরে বসালেন চেয়ারে। “বেলা, খাবারটা রেখে চলে যাও” বলামাত্র দম দেওয়া পুতুলের মতো হাতের বড় ট্রে-টা টেবিলে নামিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে চলে গেল সে। মুড়ি-নারকোল মাখা একটা বাটি আর চায়ের একটা কাপ আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে সান্ত্বনামাখা গলায় প্রোফেসর বললেন, “আমি চেয়েছিলাম আগে তুমি দেখো বেলাকে। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়াল যে কতরকম ভাবে ছড়িয়ে পড়ে তার সন্তানদের মধ্যে, তারই একটা ধারণা দিতে চেয়েছিলাম তোমায়! এবার আমার বোঝাতে সুবিধে হবে।”

     “প্রকৃতির খেয়াল মানে?”, তখনও ঘোর কাটেনি আমার, “এ আপনার তৈরি কোনও যন্ত্র নয়? আচ্ছা, সেটা না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু এর ওপর কিছু এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে নিশ্চয়ই এইরকম বানিয়েছেন আপনি! ছিঃ! একজন অসহায় মহিলাকে এই জনশূন্য জায়গায় নিজের গিনিপিগ বানিয়ে রেখে দিয়েছেন!”, প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম আমি!

     “আমি কিচ্ছু করিনি! বিশ্বাস করো!” ককিয়ে উঠলেন বৃদ্ধ, “ও এইরকম ই! ওকে যবে থেকে পেয়েছি এইরকমই দেখছি! তুমি একটু ধৈর্য্য ধরে প্লিজ শোনো আমার কথাটা!” জলে পড়া মানুষের মতো করে আমার হাতটা খামচে ধরলেন ডঃ মজুমদার। একদৃষ্টে বোঝার চেষ্টা করছিলাম তাঁর অভিব্যক্তি। কতটা সত্যি লুকিয়ে আছে ওই আকুতির পেছনে? নাকি পাগলামি?

     ট্রের ওপর থেকে একটা জলের গ্লাস তুলে নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নিলেন প্রোফেসর। খানিক যেন গুছিয়ে নিলেন নিজেকে। তারপর ভারী গলায় বলতে শুরু করলেন, “গোড়া থেকে বলি। প্রায় বছর চারেক আগের কথা। ইউনিভার্সিটি থেকে কয়েকজন অধ্যাপক-সহকর্মী মিলে গেছিলাম নাইজেরিয়া, আরেক অধ্যাপক বন্ধুর বাড়িতে ক’দিন ছুটি কাটানোর জন্য। মূল শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে তার দাদুর তৈরি খামারবাড়ি। ভরপুর রিল্যাক্স করার জন্য একদম আদর্শ। একদিন সকালে একটু হাঁটতে বেরিয়েছি, হঠাৎ একটা গোলমাল কানে এল। দেখি এক জায়গায় একটা গাছের সঙ্গে কাকে যেন বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে, আর তাকে ঘিরে উত্তেজিত স্বরে আলোচনা করছে স্থানীয় উপজাতির বেশ কিছু আদিবাসী। ভিড় ঠেলে এগোতেই দেখতে পেলাম গাছের গোড়ায় দড়ি বাঁধা অবস্থায় বসে আছে এক মহিলা, যার গায়ের রং ঘন সবুজ! স্বাভাবিক ভাবেই চমকে গেছিলাম। সঙ্গের বন্ধুটি বাকিদের কথোপকথন বুঝে যা বলল তার মানে দাঁড়ায়, গ্রামবাসীদের দাবী এই মহিলা আসলে ডাইনি! এই গ্রামের আদি বাসিন্দা এ নয়, বেশ কিছু মাস আগে থেকে এই গ্রামে এসে ঘাঁটি গেড়েছে। তারপর থেকেই নাকি জ্বর হয়ে মাঝেমাঝেই মারা যাচ্ছে গ্রামের লোক! ও সবুজ রাক্ষসী ছাড়া আর কিছু নয়! এদিকে দুর্বোধ্য ভাষায় মন্ত্র পড়তে পড়তে এক মুঠো করে ধুলো ছুঁড়তে আরম্ভ করেছে বিকটদর্শন এক লোক, সম্ভবত কোনও তান্ত্রিক হবে। আদিবাসীরাও বিষ মাখানো তির-ধনুক নিয়ে তৈরি, ওই গাছের সঙ্গেই তির দিয়ে গেঁথে মারা হবে ডাইনিকে। কিন্তু আমার কেমন জানি খটকা লাগছিল। এমনিতে এই সব ভুত-প্রেত-ডাইনিতে ছিটেফোঁটাও বিশ্বাস নেই আমার। গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় অসহায় ভাবে কেতরে পড়ে আছে মেয়েটি, চোখ দিয়ে অনবরত জল ঝরে চলেছে। শরীরের অবস্থা দেখে বোঝা যায় গ্রামবাসীদের কিল-ঘুঁষিও হজম করতে হয়েছে তাকে। ডাইনিই যদি হবে তো নিজের ক্ষমতাবলে নিজেকে মুক্ত করছে না কেন সে? আমার বিজ্ঞানমনস্ক মন বলছিল সম্ভবত কোনও বিরল রোগের শিকার এই মহিলা। আর অপুষ্টি-আক্রান্ত এই ধরনের জঙ্গলি গ্রামগুলোতে মানুষ এমনিতেই নানা কারণে রোগে ভুগে মরে, তাই ব্যাপারটা হয়তো একেবারেই কাকতালীয়।” একটানা বলে গিয়ে একটু দম নিলেন প্রোফেসর।

     আমি চুপ করে শুনছিলাম। আমাকে চায়ের কাপের দিকে ইশারা করে ডঃ মজুমদার আবার বলতে শুরু করলেন, “তারপর কীভাবে ওই গ্রামবাসীদের কবল থেকে ওকে উদ্ধার করে আনলাম, সে বিরাট গল্প… সেসব বলে তোমাকে বোর করব না। ইউনিভার্সিটিতে ফিরে আসার পর ওকে নিয়ে রিসার্চ করতে গিয়ে প্রথম বারেই একটা বড় ধাক্কায় আমার ধারণাটা চুরমার হয়ে গেল। সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল ওই মহিলা, শরীরে কোনওরকম রোগের বালাই নেই! এরপর ওর শরীর থেকে নানারকম দেহরস সংগ্রহ করলাম, যার সবটাই সবুজ। পড়ানো তখন আমার মাথায় উঠেছে। প্রায় দিনই বেলাকে নিয়ে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট করি, ক্লাস নেওয়ায় বন্ধ। এমনকি ক্যান্সারের মেডিসিন নিয়ে আমি যে রিসার্চটা করছিলাম সেটা থেকেও মন উঠে গেল। দিনের পর দিন এভাবে চলতে থাকায় একদিন ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ শোকজ করল। চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। এমনিতেও ওখানে ওকে কেউ সহ্য করতে পারত না, চলে এলাম দেশে। তার জন্য কম কষ্ট করতে হয়নি আমাকে! রীতিমতো প্রস্থেটিক মেকআপ দিয়ে ওর আসল চামড়া লুকিয়ে কোনওমতে নিয়ে তো এলাম, কিন্তু এইভাবে দিনের পর দিন তো রাখা যায় না! কলকাতার বাড়িতে ওকে একবার দেখে ফেলে পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধের হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল! এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ কেন এই জনমনিষ্যিহীন তেপান্তরের মাঠে বাড়ি বানিয়েছি?” চায়ে লম্বা একটা চুমুক দিলেন প্রোফেসর।

     মনে মনে প্রশ্ন সাজিয়ে নিচ্ছিলাম। নিঃসন্দেহে ডঃ মজুমদারের এই বেলাকে নিয়ে রিসার্চের ব্যাপারটা যথেষ্ঠ অভিনব, এবং সাধারণ মানুষের ভুল বোঝাটাই স্বাভাবিক। কিছুটা মুড়ি-নারকোল মুখে চালান করে বললাম, “তো আপনার রিসার্চ কতদূর এগোল? এই সবুজ রঙের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলেন?”

     এবার যেন ভারী উৎসাহ পেয়েছেন ভদ্রলোক! নড়েচড়ে বসে বললেন, “সেসব তো বলছি, তার আগে বলো তো বেলাকে দেখে কত বয়স বলে মনে হয়?”

     “কত হবে!”, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, “বছর পঞ্চাশেক! দশ বছর প্লাস-মাইনাস করে নিন।”

     “হয়নি, হয়নি, ফেল!” হ-য-ব-র-ল এর সেই কাকেশ্বর কুচকুচের মতো মাথা নেড়ে বললেন প্রোফেসর, “ওর বয়স কম করে আশি বছর!”

     “কি বলছেন!” চমকে উঠলাম আমি, “দেখে তো…”

     “দেখে বোঝা যায় না তো?”, আমার মুখের কথা কেড়ে নিলেন প্রোফেসর, “কিন্তু আমি সব তলিয়ে দেখেছি, ওকে নিয়ে ওর গ্রামে পর্যন্ত গেছি। সেখানে গিয়ে আরও অনেক ইন্টারেস্টিং তথ্য আমার হাতে উঠে এসেছে! বেলা জন্মের সময় থেকে এরকম ছিল না! আর পাঁচটা মানুষের মতোই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল সে! প্রায় বছর তিরিশেক আগে থেকে তার শরীরের রং ধীরে ধীরে পাল্টাতে থাক আর একদিন পুরোপুরি সবুজ হয়ে যায়! কোনও জীবাণুর প্রভাব হতে পারে! বুঝতেই পারছ… আফ্রিকার আদিবাসী গ্রাম… ওর পরিবার পরিজন তাড়িয়ে দেয়, গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয় বেলা। এরপর তিরিশটা বছর এখানে ওখানে লুকিয়ে, কখনও সার্কাসের দলে, কখনও জিপসিদের দলে মিশে শেষমেশ গিয়ে পড়েছিল ওই গ্রামে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য্যের ব্যাপার এই যে, যবে থেকে ও গ্রাম ছেড়েছে তবে থেকে আজ অব্দি ও একটুও বুড়োয়নি! বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের চামড়া কুঁচকোয়, চুল পাকে, দাঁত পড়ে, হাড় কমজোরি হয়ে যায়… সেসব কিছু দেখছ ওর মধ্যে?”

     বিহ্বল হয়ে মাথা নাড়লাম। সত্যি এ এক অদ্ভুত ব্যাপার? কী করে একজন সুস্থ সবল মানুষের দেহ এভাবে ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে যেতে পারে? যেটা শরীরের ওপর কোনো বিষক্রিয়া তো করেই না, উল্টে বার্ধক্যকে আটকে দেয়! “কিছু ধরতে পারলেন? ঠিক কি কারণে এমন হচ্ছে?” ব্যগ্র স্বরে বললাম।

     “ওটাই তো!”, আফশোষের গলায় বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেন ডঃ মজুমদার, জানলার পাশে গিয়ে দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে উদাস গলায় বলতে থাকলেন, “অনেকটা এগিয়েছি, জানো! প্রায় লাস্ট স্টেজে আছি! ওর সবরকম দেহতরল নিয়ে পরীক্ষা করে বুঝেছি এই সবুজ রঙের উৎপত্তি প্রথম ওর বোন-ম্যারোতে। বোন ম্যারো থেকে কী তৈরি হয় জানো তো?”

     “রক্ত?”

     “ঠিক! রক্ত। ওর রক্ত প্রথমে সবুজ হয়েছে, তারপর সেই সবুজ রঞ্জক পদার্থ ধীরে ধীরে ওর চামড়ার কোষে কোষে, মেলানিনে, গ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়ে সবটা সবুজ করে তুলেছে। হ্যাঁ, এই সবুজ রংটা কোনও রক্তরঞ্জকেরই প্রভাব বলে মনে হয় আমার। কারণ আর কোনও পার্থক্য তো নেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে, শুধু শরীরে প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেন ছাড়া! রক্ত থেকে প্রতি মুহূর্তে সরবরাহ হচ্ছে প্রচুর অক্সিজেন!”

     “অক্সিজেন! মানে, এই এজিং আটকে যাওয়ার পেছনে অক্সিজেন দায়ী?”

     “হ্যাঁ, হ্যাঁ, অক্সিজেন!” হঠাৎ আমার দিকে ঘুরে চেয়ারের কানাটা খামচে ধরলেন ডঃ মজুমদার! উত্তেজনায় চকচক করছে তাঁর চোখদুটো! “সে যে কি পরিমাণ অক্সিজেন তুমি কল্পনা করতে পারবে না! শুধু এজিং এর ব্যাপারটা দেখছ! ওর শারীরিক ক্ষমতার ব্যাপারে তাহলে শোনো। এই বাড়িটা একার হাতে তৈরি করেছে বেলা! হ্যাঁ! সম্পূর্ণ একার হাতে! জানি না ও কোথা থেকে এসব শিখল, কিন্তু মাটি কোপানো, ইঁট গাঁথা সব কিছুই একা করেছে ও! এক অদ্ভুত শরীর ওর। খাওয়ারের প্রায় দরকার হয় না বললেই চলে, ঘুমও খুব কম। আর ব্রেন? আমার কাছে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলা শিখে নিল! কি একটা অদ্ভুত নাইজেরিয়ান নাম ছিল ওর, আমার দ্বারা উচ্চারণ হত না… ওই ই বলল ‘আমার নাম বেলা রাখুন’! আমাকে তো রিসার্চের কাজেও অ্যাসিস্ট করে ও, অসম্ভব বুদ্ধি! বেসিক্যালি সি ইজ আ সুপার উওম্যান!” দুদিকে হাত ছড়িয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন ডঃ মজুমদার!

     হতবাক হয়ে বসে ছিলাম আমি। এ যে সত্যি সমস্ত চিন্তা-ভাবনার বাইরে! “মানব জগতে তো এক বিরাট বিপ্লব ঘটে যাবে” বিড়বিড় করে বললাম, “যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে যাবে! খাদ্যের জোগান কম লাগলে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরে আসবে, রোগ-জ্বালা বিদায় হবে! এ যে অসাধ্য সাধন করেছেন আপনি প্রোফেসর!” আমার গলা ঠেলেও উঠে এল উত্তেজনা।

     “ওই লাস্ট স্টেজটাতেই তো আটকে গেছি”, ডান হাত দিয়ে বাম হাতের তালুতে ঘুঁষি মারলেন ডঃ মজুমদার, “কোনও ট্রানজিশন মেটাল আছে ওই সবুজ রঞ্জকের পেছনে, আন্দাজ করতে পারছি… কিন্তু সেটা যে কী সেটাই এখনও…”, দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। আস্তে আস্তে চেয়ারে এসে বসলেন। ঠোঁট কামড়ে কী যেন খানিক ভেবে নিয়ে বললেন, “তবে কি জানো বিতংস, আরও একটা উপায় আছে।”

     “কি?”,উৎসুক স্বরে জিজ্ঞাসা করলাম।

     “দাঁড়াও”,বলে উঠে দাঁড়ালেন প্রোফেসর। চোখ-মুখ আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এক এক করে মাথা থেকে টুপি খুললেন,গলার স্কার্ফও। তারপর গলার কাছ থেকে শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করলেন। চমকে উঠলাম আমি! এ আবার কি পাগলামো শুরু করলেন বৃদ্ধ! অস্বস্তিভরা গলায় উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “আপনি চেঞ্জ করে নিন, আমি বরং…”

     “আরে দাঁড়াও দাঁড়াও! লজ্জা পেও না… হা হা হা…”, বলতে বলতে যখন শেষ বোতামটার পর শার্টটা খুলে রাখলেন পাশের ডিভানটার উপর তখন যেন একটা চাবুক পড়ল আমার মাথায়!

     খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন ডঃ মজুমদার। আর তাঁর ফ্যাটফেটে চামড়ার ওপর সারা শরীর জুড়ে ফুটে আছে চাকা চাকা সবুজ ছোপ! দিনের আলোয় জামার ফাঁক দিয়ে যে সামান্য দাগটা দেখে আমার পোকার কামড় মনে হয়েছিল, তা আসলে ঘন সবুজ রঙের কিছু দাগ! এই জন্যই এত গরমের মধ্যেও এভাবে নিজেকে ঢেকে রাখেন প্রোফেসর! আমার মাথার ভেতরটা যেন চট করে পড়ে নিলেন ডঃ মজুমদার। পরম তৃপ্তির গলায় নিজের শরীরে হাত বুলিয়ে বলে উঠলেন, “তুমি গিনিপিগের কথা বলেছিলে না? আমিই হচ্ছি সেই গিনিপিগ! কি আর করব বলো, এ ছাড়া তো এমন কেউ ছিল না যার ওপর এক্সপেরিমেন্ট করতে পারি! অগত্যা…! বেলার এই সবুজ রক্তের রহস্য এখনও উদ্ধার না করতে পারলেও সেটা ব্যবহারের একটা উপায় আমি বের করেছি! হ্যাঁ, ইঞ্জেকশন দিয়ে নিজের রক্তে মিশিয়ে দেওয়া! আর দেখো…”, বলতে বলতে দু-হাত ছড়িয়ে এক পাক ঘুরে নিলেন প্রোফেসর, “তার ফলও ফলতে শুরু করেছে! এখন আমি অনেক বেশি ভাবতে পারি, জোরে দৌড়তে পারি, ঠান্ডা বা গরমের কোনও আলাদা অনুভব হয় না, খাবারও কম লাগে! এই যে সবুজ ছোপ দেখছ, এ খুব তাড়াতাড়ি আমার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। গোটা আমিটাই সবুজ হয়ে উঠব। আর সেই সঙ্গে বিপুল শক্তিশালী, ক্ষুরধার বুদ্ধির এক অজর-অমর মানুষ! জানি, সবাই প্রথমে দেখে ভয় পাবে, নাক সিঁটকোবে। কিন্তু তারপর আমার ক্ষমতার পরিচয় পেলে সবাই ধন্য ধন্য করে উঠবে! কি বলো বিতংস? করবে না?” বলতে বলতে আমার মুখের সামনে ঝুঁকে পড়লেন ডঃ মজুমদার।

     আর ঠিক তক্ষুণি আমি দেখলাম, প্রোফেসরের শরীরের দাগগুলো যেন ক্রমশ বড় হচ্ছে… আরও বড়… আমি কি ভুল দেখছি?

     রাত প্রায় দেড়টা বাজতে চলল। ঘুম আসছে না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছিলাম। এই ফাঁকা প্রান্তরে হু হু করে বাতাস ছোটে, তাই গরমটাও এখন কম। তার ওপর এই ঘরটায় বেশ বড় বড় ক-টা জানালা আছে, মনে হচ্ছে সমুদ্রের ধারে শুয়ে আছি। ঘুমোনোর জন্য আদর্শ পরিবেশ, তাও যেন ঘুমটা ঠিক আসছে না। মাথার মধ্যে হাজার হাজার চিন্তা বীজ ফুঁড়ে চারাগাছের মতো গজিয়ে উঠছে। আচ্ছা, সত্যিই কি ধীরে ধীরে পুরো সবুজ হয়ে যাবেন ডঃ মজুমদার? কত দিন সময় লাগবে? আর তারপর? তাঁর রক্ত নিয়ে আরেকজন, সেখান থেকে আরেকজন… এইভাবে কি পৃথিবীর সব মানুষ হয়ে উঠবে ‘সবুজ মানুষ’? কোনও মৃত্যু থাকবে না, রোগ থাকবে না, খাদ্যসঙ্কট থাকবে না… কেমন হবে সে পৃথিবী? বেলার মুখটা মনে পড়ছে। রাতের খাবার দিতে এসে একটু হেসেছিল। ওর দাঁতগুলোও সবুজ। মানষের শরীরে এত সবুজের আধিক্যে আমার যেন কেমন অস্বস্তি লাগছে। অবশ্য মা ছোটবেলায় বলত, ‘মানুষের রূপ কিছুই নয়, গুণটাই আসল…’

     “আঁআঁহহহ্!” একটা আর্তনাদে আমার চিন্তার সুতোগুলোতে কেমন জট পাকিয়ে গেল! কে চিৎকার করছে? এই জনশূন্য পুরীতে প্রাণী তো মাত্র আমরা তিনজন… বেলা বা প্রোফেসরের কিছু হল নাকি? কিন্তু ওদের শরীরে তো কোনও রোগ-জ্বালা-কষ্ট হয় না… তাহলে কি প্রোফেসরের অনুমান ভুল? এরকম গাদাখানেক ভাবনায় জড়াতে জড়াতে উঠে পড়লাম বিছানা ছেড়ে। কি ব্যাপার দেখতেই হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন যন্ত্রণায় ছটফট করছে! শব্দের অভিমুখ লক্ষ্য করে হাঁটা লাগালাম। প্যাসেজের শেষপ্রান্তে বাগানের লাগোয়া ঘরটা থেকে আওয়াজটা আসছে। দরজাটা ভেজানোই ছিল, “কি হল ডঃ মজুমদার?”, বলতে বলতে তড়িঘড়ি ঘরটায় ঢুকেই পাথর হয়ে গেলাম।

     একটা ছোট্ট সাদা আলোয় ঘরটা ভরে আছে। ঘরের একপাশে একটা খাটের ওপর শুয়ে কাতরাচ্ছেন প্রোফেসর। পাশে রিডিং টেবিলের ওপর বই ছড়ানো, রিডিং ল্যাম্প জ্বালা। ডঃ মজুমদারের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছি না আমি… বুঝতে পারছি একটুকরো বরফের কুচি আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ভাসতে ভাসতে নীচের দিকে চলে যাচ্ছে! কারণ আমার সামনে কাটা পাঁঠার মতো যন্ত্রণায় ছটফট করছে প্রোফেসরের যে শরীরটা, সেটার রং ঘন সবুজ! শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি যেন শিল্পীর নিপুণ তুলিতে রাঙানো হয়েছে, কোথাও ফাঁক নেই এতটুকু! প্রচন্ড যন্ত্রণায় যেন উঠে বসার, কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন প্রোফেসর… মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ করে উঠে আসছে দুর্বোধ্য কিছু শব্দ! ভীষণ দিশেহারা লাগছে আমার! কিন্তু প্রোফেসরের কাছে ছুটে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই যেন একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্কে মাটিতে গেঁথে গেল আমার পা দুটো।

     “ওওওহহহ্!!” এবার চিৎকারটা ছিটকে এল আমার গলা দিয়ে! ভীষণ দুর্বল লাগছে হাঁটু গুলো… গলার কাছটা শুকিয়ে কাঠ…

     কারণ আমার চোখের সামনে তখন একটু একটু করে ফুলছে ডঃ মজুমদারের শরীরটা!

     ঠিক বেলুনের মতো।

     একটু একটু করে বড় হচ্ছে… দানবের আকৃতি ধারণ করছে শরীরটা…

     এমন সময় কে যেন শান্ত স্বরে বলে উঠল, “খোলস ছাড়ছে। একটু পরে ঠিক হয়ে যাবে।”

     এই অপ্রত্যাশিত স্বরে আমার শরীরে যেন বিদ্যুৎ চমক লাগল! সচকিত হয়ে দেখলাম ঘরের এক কোণে প্রোফেসরের খাটের মাথার কাছে মহীরুহের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে বেলা। প্রথম বারের জন্য তার গলার আওয়াজ ভেসে এল আমার কানে! “কী বললে?”, চিৎকার করে উঠলাম আমি, “কী হচ্ছে এসব? কী করেছ তুমি প্রোফেসর কে?”

     “আমি কিছু করিনি।” আবার সেই আশ্চর্য্যরকম শান্ত ধীর স্বরে বলে উঠল বেলা। “প্রোফেসর নিজেই আমাদের ঠাঁই দিয়েছেন নিজের শরীরে। এবার খোলস ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে”।

     “খোলস! কীসের খোলস! কী বলছ তুমি!”, আমি স্থির থাকতে পারছিলাম না, কারণ প্রোফেসরের শরীরটা ফুলেই চলেছিল, আর তার সঙ্গে বাড়ছিল তাঁর মরণাপন্ন আর্তনাদ!

     “কেন, সাপের খোলস ছাড়া দেখেননি? বা শুঁয়োপোকার প্রজাপতি হয়ে বেরিয়ে আসা? ব্যাপারটা সেরকমই। আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা।” কনকনে ঠান্ডা একটা উত্তর ভেসে এল।

     আমার মাথার ভেতরে শিরা-উপশিরাগুলো যেন দলা পাকিয়ে যাচ্ছে! মাথাটা দু-হাতে চেপে ধরলাম! খোলস ছাড়া! এ কি সম্ভব! একটু ক্ষণ চুপ করে থেকে নিস্তরঙ্গভাবে আবার বেলা বলে উঠল, “ভয় পাবেন না বিতংস বাবু। আমরা কাউকে আক্রমণ করি না। কিন্তু আমাদেরও তো একটু থাকার জায়গা চাই? যারা স্বেচ্ছায় আমাদের নিজের শরীরে জায়গা দেয়, তাদের আমরা আমাদের উপকার ফিরিয়ে দিই। প্রোফেসরের যে নতুন শরীরটা তৈরি হবে, সেটা হবে সম্পূর্ণ রোগমুক্ত, অমর। এটা উপকার নয়?”

     “তোমরা মানে? তোমরা কারা? কি চাও?”, খাঁচায় বন্দী বাঘের মতো অসহায়ভাবে গর্জে উঠলাম আমি!

     “আমরা এই বিশাল মহাকাশেরই সামান্য কিছু জীব, আপনাদের মতোই।” কোমল স্বরে বলে চলল বেলা। “মঙ্গল আর বৃহস্পতির মাঝখানে যে গ্রহাণু পুঞ্জ আছে, তারই মধ্যে ধুলোর মতো একটা গ্রহাণুতে থাকতাম আমরা। আসলে আমাদের থাকার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, জানেন! মহাকাশেও তো দূষণ বাড়ছে! আপনাদের পাঠানো মহাকাশযানগুলো ভেঙেচুরে ধাক্কা খাচ্ছে ছোট ছোট পাথরের মতো আমাদের গ্রহগুলোকে, ধ্বংস করছে। আমরা কোথায় যাবো বলুন? একটা উল্কার গায়ে লেগে একবার এসে পড়েছিলাম পৃথিবীতে। এখানে এসে দেখলাম আমাদের থাকার জন্য সবথেকে উপযুক্ত পরিবেশ কোনটা জানেন? মানুষের শরীর। মানুষের শরীরের মতো নিশ্চিন্ত আশ্রয় আর কিছু নেই আমাদের। ঢুকেও পড়েছিলাম একটা মানুষের শরীরে, কিন্তু একবার প্লেনে যেতে যেতে প্লেন ক্র্যাশ হয়ে সে লোকটা মারা গেল। আবার ছিটকে বাইরে পড়লাম একটা আঙুর গাছের ওপর। একদিন কাজ করতে করতে খিদের চোটে সেই গাছ থেকে আঙুর পেড়ে খেল বেলা। ফের ফিরে পেলাম ঘর বাড়ি, বেলার শরীরেই নিশ্চিন্তে থাকতে শুরু করলাম। তারপর প্রোফেসর নিজে নিয়ে এলেন, নিজের শরীরে জায়গা দিলেন…

     “কিন্তু এটা কি? এরকম বিশ্রীভাবে ফুলে উঠছে কেন ওঁর শরীর? তোমরা বলছ তোমরা হিংস্র নও, তাহলে এটা কী করছ!”, বলতে বলতে পিছিয়ে গেলাম দু-পা… আমার সারা শরীরের রক্ত যেন জমাট বাঁধতে শুরু করেছে… আর কতক্ষণ নিজেকে ধরে রাখতে পারব জানি না… কিন্তু তার আগেই যে ভয়াবহ ঘটনাটা ঘটে গেল আমার সামনে তা কোনও মানুষের বীভৎসতম কল্পনাতেও আসবে না!

     প্রচন্ড শব্দে বিস্ফোরণ করে টুকরো টুকরো হয়ে ফেটে গেল প্রোফেসরের শরীরটা! আর তার ভেতর থেকে নদীর স্রোতের মতো গলগল করে বেরিয়ে আসতে থাকল চটচটে সবুজ রঙের তরল! শৃঙ্খলাবদ্ধ বাধ্য সৈনিকের মতো তারা লাইন দিয়ে সরু ঝরনার মতো বেয়ে যেতে লাগল বেলার পায়ের কাছে… আর সেই সময় আমার কানে এল…

     “ওটা আমাদের একটা স্বভাব। আমরা যে শরীরে প্রবেশ করি সেই শরীরে ছড়িয়ে পড়ার পর যখন আমাদের পুরো জীবনচক্র সম্পূর্ণ হয়, তখন আমরা বেরিয়ে আসি সেই খোলস ফাটিয়ে। প্রজাপতি যেমন রঙবেরঙ এর ডানা মেলে উড়ে আসে পিউপা ভেঙে! আপনাদের শরীরটা আমাদের পিউপা। বুঝলেন বিতংস বাবু?”

     আমার চোখের সামনে যেন সব ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে আসছে… শরীরের সব ওজন যেন জড়ো হচ্ছে পায়ের কাছে… হাঁটু ভেঙে আসছে আমার… কোনমতে দরজার পাল্লা ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আবছা চোখের সামনে দেখলাম সেই সবুজ স্রোত থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে একটা মানবশরীর! রোগা, লম্বা এই শরীরটা আমার চেনা। বিখ্যাত সায়েন্টিস্ট ডঃ প্রশান্ত মজুমদার। সম্পূর্ণ উলঙ্গ একটা শিশু যেভাবে ভূমিষ্ঠ হয়, সেভাবে একটু একটু করে গড়ে উঠছে প্রোফেসরের শরীরটা। বেলার ঠান্ডা নরম স্বরটা বলে চলেছে, “আমাদের শুধু একটু থাকার জায়গা চাই বিতংস বাবু, আর কিছু না। তার বদলে আপনাকে অনেক কিছু ফিরিয়ে দেব আমরা। অমর হতে চান না আপনি? শুধু একটু জায়গা দিন…” একটু একটু করে কি এগিয়ে আসছে বেলার অবয়বটা? “না, এ হতে পারে না! এরকম হতে পারে না!”, অস্ফুটে বিড়বিড় করে কোনওমতে টেনে হিঁচড়ে নিজের শরীরটাকে দরজার বাইরে বের করে আনলাম… কাঁপতে থাকা শক্তিহীন হাতে দরজার শেকল তুলতে তুলতে শুনতে পেলাম ভেতর থেকে ভেসে এল বেলা আর প্রোফেসরের যুগল কণ্ঠস্বর…

     “কেন হবে না বিতংসবাবু? সবই হয়! জানেন না? আসলে হয়-না বলে কিছু হয় না!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!